অষ্টম অধ্যায় – মিসিং লিংকগুলো আর মিসিং নেই
ফসিলের কথা লিখতে গিয়ে আগের অধ্যায়গুলোতে প্রাসঙ্গিকভাবেই প্লেট টেকটনিক্স, মহাদেশীয় সঞ্চরণ, রেডিওঅ্যকটিভ ডেটিংসহ এন্তার বিষয়ের আলোচনা চলে এসেছে। তবে এবার বোধ হয় অধ্যায়টি শেষ করার সময় এসেছে, চলুন, বিবর্তনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ের আলোচনার মধ্য দিয়েই ইতি টানা যাক ফসিলের আলোচনার। তত্ত্বকথা তো অনেক হলো এই অধ্যায়ে, তাই এবার চেষ্টা করবো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে না ঢুকে এক্কেবারে সহজ ভাষায় মিসিং লিঙ্ক-এর ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করার। ‘মিসিং লিঙ্ক বা ‘হারানো যোগসূত্র’ কথাটা বহুলভাবে প্রচলিত হলেও এটা কিন্তু ঠিক বৈজ্ঞানিক কোন শব্দ নয়। এই মিসিং লিঙ্কগুলো হচ্ছে জীবের বিবর্তনের মধ্যবর্তী স্তরের এমন কিছু ফসিল যারা তাদের আজকের আধুনিক প্রজাতি এবং তার পূর্বপুরুষদের মধ্যে বিশাল কোন গ্যাপ বা ফাঁক পুরণ করে। অর্থাৎ, আগের প্রজাতি এবং তার থেকে বিবর্তিত হওয়া পরের প্রজাতি – এই দুই প্রজাতি বা ট্যাক্সোনমিক (Taxanomic, শ্রেণীবিন্যাসগত) গ্রুপেরই কিছু কিছু বা মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করে এমন জীবের ফসিলকে অবস্থান্তরিত বা মধ্যবর্তী ফসিল (Transitional Fossil) বা সাধারণভাবে মিসিং লিঙ্ক বলা হয়।
বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই ধারণা করে আসছেন যে, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সেই ডায়নোসরগুলো থেকেই আজকের আধুনিক পাখির উৎপত্তি ঘটেছে। কিন্তু বললেই তো হল না, এটা তো আর মুখের কথা নয়, কোথায় ডায়নোসর আর কোথায় পাখি! ডায়নোসর কথাটা শুনলেই আমাদের মনে যে দৈত্যের মত দেখতে প্রাণীগুলোর চেহারা ভেসে ওঠে তাদেরকে দোয়েল বা ময়নার মত গোবেচারী পাখিগুলোর পূর্বপুরুষ বানিয়ে দিলেই হল নাকি? কিংবা ধরুন, বেশীরভাগ প্রাণীর বিবর্তনের ইতিহাস বেশ সহজেই নির্ধারণ করা গেলেও তিমি (মাছ!) বা ডলফিনদের নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। কি সৃষ্টি ছাড়া জীবই না এই বিশাল বপু সামুদ্রিক প্রাণীগুলো! সমুদ্রেই থাকে ষোল আনা সময়, সাতরে বেড়ায় মাছের মতই, কিন্তু বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিচার করলে তো এদেরকে কোনভাবেই মাছ বলে স্বীকার করে নেওয়া যায় না! মাছের কি এদের মত ফুসফুস থাকে নাকি তারা বাচ্চা প্রসব করে? আসলে তারা স্তন্যপায়ী প্রাণী, কিন্তু তাহলে তারা পানিতে নেমে এলো কখন বা কি করে? বিজ্ঞানীরা যখন বললেন, এরা আসলে ডাঙ্গার জীবন থেকে সমুদ্রে বিবর্তিত হয়েছে তখন কি মহা হৈ চৈ না পড়ে গিয়েছিলো চারদিকে! বিবর্তনবাদ বিরোধীরা রীতিমত দাবী করতে শুরু করলো মিসিং লিঙ্কগুলো দেখাও, আর না হলে এরকম ভাঁওতাবাজী বন্ধ কর। মাটি থেকে তিমি মাছের পূর্বপুরুষের পানিতে বিবর্তনের মধ্যবর্তী ধাপগুলো দেখাতে না পারলে এই দাবীর কোন যৌক্তিকতাই নেই! ব্যাপারটা আসলেই তো গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিতে এরকম বড় বড় পরিবর্তন যদি ঘটেই থাকে এবং বিবর্তনের নিয়মানুযায়ী অত্যন্ত ধীর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি বছর ধরেই তা যদি ঘটে থাকে, তাহলে তো তাদের বিভিন্ন মধ্যবর্তী স্তরের ফসিল বা অন্য কোন প্রমাণও তো থাকতে হবে! এরকম উদাহরণ কিন্তু বিবর্তনবাদের জগতে অনেকই আছে। তাদের সম্পর্কে এই প্রশ্ন জাগাই স্বভাবিক যে কোথায় গেলো মাঝামাঝি স্তরের প্রাণীগুলো বা তাদের মধ্যবর্তী ফসিলগুলো?
আমরা জানি যে, মূলত প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বছরের ধীর পরিবর্তনের মাধ্যমে এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির উৎপত্তি ঘটে। আমরা আগে এও দেখেছি যে, এক প্রজাতির বিভিন্ন জীবদের মধ্যেই বিভিন্ন রকমের প্রকরণ থাকে, ধীর গতিতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারায় অধিক সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অংশটি হয়তো দ্রুত গতিতে সংখ্যায় বাড়তে থাকে। তার ফলে প্রজাতির এই অংশের মধ্যে এই ধরনের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সঞ্চারিত এবং সঞ্চিত হতে হতে এক সময় তারা উপ- প্রজাতিতে পরিণত হয়ে যায়। এই নতুন উপ-প্রজাতির বেশ কয়েক রকমেরই পরিণতি হতে পারে – তারা এরকম একটা উপপ্রজাতি হয়েই চিরতরে টিকে থাকতে পারে, বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে, অথবা আবার বিবর্তনের মাধ্যমে এক নতুন প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। আর যদি প্রজাতির একটি অংশ তার মুল প্রজাতি থেকে ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে বিবর্তনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তরান্বিত হতে পারে। নিজস্ব গতিতে বিবর্তিত হতে হতে তারা তাদের পূর্বপুরুষের থেকে এতই বদলে যায় যে, তাদের মধ্যে আর প্রজনন ঘটা সম্ভব হয় না। সাধারণত, তখনি আমরা তাদেরকে নতুন প্রজাতি বলে ধরে নেই।
তারপর এই নতুন প্রজাতি এবং তাদের পূর্বপুরুষেরা বিবর্তনের ধারায় নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে, ফলে বিলুপ্ত হয়ে না গেলে ক্রমাগতভাবে নতুন প্রজাতির সাথে তার পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্যগত বিচ্ছিন্নতা বাড়তেই থাকে। কোটি কোটি বছরের ক্রমাগত পরিবর্তনের ফলে এক সময় তাদের মধ্যে পার্থক্য বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়াতে পারে যে এরা একসময় সম্পর্কযুক্ত ছিলো তা নির্ধারণ করাই হয়তো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এমন অবস্থায় আমাদের সেই ফসিল রেকর্ডই ভরসা, মধ্যবর্তী যে স্তরগুলো তারা পার করে এসেছে লক্ষ কোটি বছরের বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়, তার প্রমাণগুলো লুকিয়ে আছে সেই প্রাণীগুলোর অতীতের ফসিলের মধ্যে। যেমন ধরুন, আমার জানি যে, জলের প্রাণীর থেকেই বিবর্তিত হয়ে ডাঙ্গার প্রাণীর উৎপত্তি ঘটেছিলো প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি বছর আগে ডেভোনিয়ান যুগে। এটা তো আর রাতারাতি ঘটেনি। বিবর্তনের তত্ত্ব যদি ঠিক হয়ে থাকে তাহলে ধাপে ধাপে এই পরিবর্তন ঘটেছে, ধীরে ধীরে পানি থেকে উঠে এসে লক্ষ কোটি বছরের ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে মাটির জীবনে অভ্যস্ত হতে হয়েছে তাদের। সেভাবে হিসেব করলে তো নিশ্চয়ই একটা সময় ছিলো যখন পা বা কোন অংগের উপর ভর করা মাছের বিবর্তন ঘটেছিলো যারা হয়তো পানি এবং মাটি দু’জায়গাতেই আংশিকভাবে টিকে থাকতে পারতো, যাদের থেকেই হয়তো এক সময় উভচর প্রাণী এবং পরে সরীসৃপের বিবর্তন ঘটেছে। নিশ্চয়ই তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে কালের পরিণতিতে একসময়ে। অনেকদিন পর্যন্ত এরকম কোন ফসিল পাওয়া না গেলেও বিজ্ঞানীরা একরকম নিশ্চিতই ছিলেন যে এই পথেই বিবর্তন ঘটেছে মাটিতে বাস করা প্রাণীগুলোর। সৃষ্টিতত্ত্ববাদীরা প্রায়ই ফসিল রেকর্ডের এই গ্যাপ বা ফাঁকটি তুলে ধরে বিবর্তন তত্ত্বের ত্রুটি প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন। তাদের মুখে ছাই দিয়ে, গত শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা মাছ থেকে উভচর প্রাণীর বিবর্তনের প্রায় প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী ধাপের ফসিলই আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই তো কিছুদিন আগে ২০০৬ সালের প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা চার পাওয়ালা এমনই এক মাছের ফসিলের সন্ধান পেয়েছেন যা দিয়ে আসলে এখন এই বিবর্তনের মোটামুটি প্রত্যেকটা ধাপই দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠেছে আমাদের সামনে। এ রকম ধরণের গুরুত্বপূর্ণ মিসিং লিঙ্কগুলোর আবিষ্কার বিবর্তনের তত্ত্বকে শুধু যে শক্তিশালীই করেছে তাই নয়, বিবর্তনবাদ তত্ত্ব যে কতখানি সুদৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তাও জোরালোভাবে প্রমাণ করে ছেড়েছে। চলুন তাহলে এবার এরকম কিছু উদাহরণ নিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাক।
পাখি তাহলে ডায়নোসরেরই উত্তরসূরি!: ১৮৫৯ সালে ডারউইন যখন বিবর্তনের তত্ত্বটি প্রস্তাব করেন তখন পাখির বিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে কিন্তু তিনি বেশ মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলেন। বিবর্তনের অনুক্রমে পাখি ঠিক কোথায় পড়বে? আপাতদৃষ্টিতে এখনকার বা জানামতে আগেকার কোন প্রাণীর সাথেই তো এর তেমন মিল পাওয়া যাচ্ছে না! অনেকেই তখন এই দুর্বলতাটকে কাজে লাগিয়ে বিবর্তন তত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছিলেন। ডারউইনের আমরণ বন্ধু, হ্যা, আমাদের সেই থমাস আপনি যাকে কিনা ডারউইনের ‘বুল ডগ’ বলে ডাকা হত) আবারও এগিয়ে এলেন তাকে সেই যাত্রায় রক্ষা করতে। ১৮৬০ সালে বিজ্ঞানীরা প্রায় ১৫ কোটি বছরের পুরনো জুরাসিক যুগের এক্কেবারে শেষের দিকের সময়ের কোন এক অজানা জীবের পালক আবিষ্কার করেন। তার পরের বছরই তারা জার্মানীতে খুঁজে পেলেন অদ্ভুত একটি প্রাণীর ফসিল আর্কিওপটেরিক্স (Archaeopteryx ) – একদিকে তার যেমন আছে পাখির মত পাখা এবং পালক, আবার অন্য দিকে দিব্যি পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে ডায়নোসরের মত লম্বা লেজ এবং দাঁতয়ালা চোয়ালের অস্তিত্ব।
চিত্র ১.১ : আর্কিওপটেরিক্সের ফসিল
(সৌজন্যঃ http://www.ruf.rice.edu/~queller Bios 334/links.htm)
তবে তার মধ্যে আধুনিক পাখির কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেও বেশীর ভাগ বৈশিষ্ট্যই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডায়নোসর থেরাপদের (therapod) সাথেই বেশী মিলে যায়। এই আর্কিওপটেরিক্স এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া মিসিং লিঙ্ক বা মধ্যবর্তী ফসিলের মধ্যে সবচেয়ে বহুলভাবে আলোচিত একটি ফসিল। হাক্সলি সেই সময়েই সদ্য পাওয়া এই ফসিলটি পরীক্ষা করে বললেন, মনে হচ্ছে, আসলে পাখিগুলো হয়তো একধরণের ডায়নোসর থেকেই বিবর্তিত হয়েছে। সেদিন ফসিলবিদ্যার জগতে মহা হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল ব্যাপারটি নিয়ে। তারপর আরও বেশ কয়েকটি এ ধরণের ফসিলই পাওয়া গেছে গত প্রায় দেড়শো বছরে। কিন্তু তাদের সবারই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পাখির কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেও বেশীরভাগ বৈশিষ্ট্যই ছিলো
একধরনের ছোট আকারের ধেরাপড় ডায়নোসর বৈশিষ্ট্যের কাছাকাছি। তাই খুব পরিষ্কার একটা ধারণা থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা তাদের ডায়নোসর থেকে পাখির বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটিকে এতদিন তত্ত্বে রূপ দিতে পারছিলেন না। আরও কিছু মধ্যবর্তী ফসিলের অস্তিত্ব না খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত এই গোলমেলে ব্যাপারটা নিয়ে শেষ সিদ্ধান্তে পৌছুনো একটু কঠিনই হয়ে যাচ্ছিলো।
দেড় শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে বিজ্ঞানীদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত মনে হচ্ছে ব্যাপারটার একটা দফা রফা হতে চলেছে। গত কয়েক বছরে চীনে যে অসংখ্য ফসিল পাওয়া গেছে তারা ধেরাপড় ডায়নোসর থেকে ক্রমান্বয়ে পাখিতে রূপান্তরের বিভিন্ন স্তরকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে আমাদের চোখের সামনে। সম্প্রতি চীনে পাওয়া সায়নোসরপটেরিক্সের ফসিলের গায়ে ছোট ছোট পালকের নমুনা পাওয়া গেছে, কডিপটেরিক্সের হাতে এবং লেজে পাওয়া গেছে বেশ চওড়া ধরণের পালক, আবার বিজ্ঞানীরা মায়ক্রোব্যাট্ট গুই নামে এক অদ্ভুত চার পাখাওয়ালা ডায়নোসরের ফসিল আবিষ্কার করেছেন যার সবগুলো পাখায়ই উড়ার সহযোগী পালক দেখতে পাওয়া যাচ্ছে (চিত্র ৮.২ -৮.৪)।
চিত্র ৮.২ : সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হওয়া বিভিন্ন ধরণের থেরাপড় ডায়নোসরের বৈশিষ্ট্য দেখানো হয়েছে উপরের ছবিতে
চিত্র ৮.৩: থেরাপড ডায়নোসর থেকে আধুনিক পাখির বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপের ছবি (সৌজন্যঃ Scientific American, Feb 1998, The Origin of Birds and their Flight’)
বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রকমের পালকের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া গেছে এই ফসিলগুলোর মধ্যে। আসলে পাখিতে বিবর্তিত হওয়ার অনেক আগেই বিভিন্ন ধরণের থেরাপড ডায়নোসরের মধ্যে পালকের উত্তব ঘটে। পালক বা পাখা থাকলেই যে ওড়া যাবে তাও তো নয়, ওড়ার জন্য এক ধরনের বিশেষ ধরণের পালকের প্রয়োজন হয়। তাই পালকের উন্মেষ ঘটার অনেক পরে বিশেষ ধরণের অপ্রতিসম আকারের পালকের বিবর্তন না ঘটা পর্যন্ত আসলে এই ডায়নোসরগুলোর পক্ষে উড়াল দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এ ধরণের যত নতুন নতুন ফসিলের আবিষ্কার হচ্ছে ততই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন যে, আর্কিওপটেরিক্সের অনেক আগেই ডায়নোসরদের মধ্যে তথাকথিত পাখিসুলভ কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা দিতে শুরু করেছিলো, যেমন ধরুন সরু সরু হাত পার গঠন, বা পালকের বিবর্তন। আবার আধুনিক পাখিগুলোর কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন, লেজের হাডডিগুলোর জোড়া লেগে ছোট হয়ে যাওয়া, দাঁত বা হাতের নখরের বিলুপ্তি ঘটার মত ঘটনাগুলো ঘটেছে আর্কিওপটেরিক্সেরও বেশ পরে। থেরাপড ডায়নোসরের সাথে আর্কিওপটেরিক্স এবং আধুনিক পাখীর শারীরিক গঠনের তুলনামুলক চিত্রটি (চিত্র ৮.৪) দেখলে বিবর্তনের এই পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো বেশ পরিষ্কারভাবে ধরা পরে।
চিত্র ৮.B: (ক) থেরাপড ডায়নোসর
এই তুলনামুলক পরীক্ষা থেকে বিজ্ঞানীরা যে শুধু ডায়নোসরের সাথে আধুনিক পাখির বিবর্তনের সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন তাইই নয়, এই পরিবর্তনগুলো কিভাবে ঘটেছিলো তা সম্পর্কেও একটা পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কিছুদিন আগে ঘুমন্ত অবস্থায় ফসিল হয়ে যাওয়া হাঁসের মত আকারের এক ধরণের ডায়নোসরের ফসিল পাওয়া গেছে যাকে দেখলে মনে হবে আজকের দিনের কোন পাখি যেনো ঘুমিয়ে আছে তার শরীরের মধ্যে মাথাটা গুঁজে দিয়ে।
পা ওয়ালা মাছের ডাঙ্গায় উঠে আসা : প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে প্রাণীজগতের বিবর্তনের ইতিহাসে যেনো এক বিপ্লব ঘটে গেলো। প্রায় একশো কোটি বছর আগে পৃথিবীর মাটিতে আদি কোষী জীবের অস্তিত্ব দেখা গেলেও তা শুধু বিভিন্ন ধরণের সরল প্রকৃতির জীবাণুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। ৪৭-৫৫ কোটি বছর আগে প্রথমবারের মত পৃথিবীর মাটিতে আদি উদ্ভিদ এবং ফার্নের অস্তিত্ব দেখা দেয় কিন্তু তখনও প্রাণীর বিকাশ সীমাবদ্ধ ছিলো শুধুমাত্র জলেই, ডাঙ্গায় উঠে আসার আয়োজন আসলে শুরু হয়েছিলো তারও অনেক পরে ৫। ফসিল রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে, প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে ডেভোনিয়ান যুগে জল থেকে ডাঙ্গায় প্রাণীর বিবর্তন ঘটতে শুরু করে। ডেভোনিয়ান যুগটি ছিলো খরার যুগ, পানির উচ্চতা কমে আসছিলো তখন পুকুর, নদী, সমুদ্রে। আর এ সময়েই এক ধরণের মাংসল পিন্ডের মত পাখনা বিশিষ্ট (Lobe Finned Fish বলা হয় এদেরকে, Lungfish এবং Coelocanth উভয়েই এই দলের অন্তর্ভুক্ত; আর এখন আমরা যে আধুনিক মাছ দেখি তার বেশীর ভাগই ছড়ানো পাখা বিশিষ্ট মাছের উত্তরসুরী যাদেরকে বলে Ray Finned Fish) এক ধরণের মাছের বিবর্তন ঘটে, তাদের এই মাংসল পাখনার সাথে চতুষ্পদী প্রাণীর হাত পা’র প্রচুর মিল রয়েছে। ফুলকার সাহায্যেই বেশীর ভাগ সময় শ্বাস প্রশ্বাস চালালেও ফুসফুসের সাহায্যে তারা আবার মুক্ত অক্সিজেন গ্রহণ করতেও সক্ষম ছিলো অর্থাৎ ডেভোনিয়ান যুগের খরার সময় তাদের এই বৈশিষ্ট্যগুলো অল্প পানিতে বা পানির মাঝখানের শুকনোয় চলে ফিরে বেড়াতে সাহায্য করতো। আর ওদিকে খরা যত বাড়তে থাকলো, প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়মেই, ততই এ ধরণের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণীগুলোই টিকে থাকার জন্য বিশেষ সুবিধা পেতে থাকলো। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ডাঙ্গায় উঠে আসার জন্য কিন্তু চতুষ্পদী প্রাণীর মধ্যে হাত পার উদ্ভব ঘটেনি, এর বিবর্তন ঘটেছিলো ক্ষরার সময় পানিতে টিকে থাকার জন্য, যা পরবর্তীতে তাদেরকে ডাঙ্গার জীবনে অভিযোজিত হতে সাহায্য করেছিলো। একই ধরণের ব্যাপার আমরা লক্ষ্য করেছিলাম পাখা এবং পালকের বিবর্তনের ক্ষেত্রেও, উড়ার জন্য তাদের পালকের উৎপত্তি ঘটেনি, কিন্তু পরবর্তীতে তাই ডায়নোসরদের উড়তে সাহায্য করেছিলো। অনেকে মনে করেন যে, ডেভোনিয়ান যুগে মাটিতে উদ্ভিদের ব্যাপক বিকাশও সাহায্য করেছিলো প্রাণীদেরকে মাটিতে উঠে আসতে। পানির ধারে মাটিতে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ এবং তাদের পানিতে ছড়িয়ে থাকা মূলগুলো বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করেছিলো।
সে যাই হোক, বিজ্ঞানীরা মাছ থেকে উভচর প্রাণীতে রূপান্তরের এই ধীর প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের প্রাণীরই ফসিল খুঁজে পেয়েছেন। ১৯৩৮ সালে আফ্রিকার মাদাগাস্কারের উপকুল এলাকায় এমন এক জীবন্ত মাছ (Laimeria chalumnae) ধরা পড়ে যাকে ৭-৮ কোটি বছর আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে মনে করা হত। এর মধ্যে মাছ থেকে উভচর প্রাণীর বিবর্তনের এতগুলো মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যে, একে যেনো রীতিমত এক ‘জীবন্ত ফসিল ই বলা যায়। অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বিজ্ঞানীরা এই মিসিং লিঙ্কটিকে ‘অতীতের সময় পড়ার যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। মাংসল পাখনাবিশিষ্ট এই মাছ ৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, আর তারা অন্যান্য মাছের মত ডিম পারে না, সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে। পরবর্তীতে এই প্রজাতির আরও বেশ কিছু মাছই ধরা পড়েছে।
