নবম অধ্যায় – আমাদের গল্প
ধরুন, দেড় দুই লক্ষ বছর আগে কোন এক বুদ্ধিমান মহাজাগতিক প্রাণী, আমাদের কল্পনার সেই উড়ন্ত সসারে করে পৃথিবীতে পদার্পণ করলো। সেই সময়ে আফ্রিকার এক কোণে ঘুড়ে বেড়ানো আমাদের আধুনিক মানুষের প্রজাতি Homo sapiens দের দেখে কি ভাবতো তারা? তারা কি বিবর্তনের পরিক্রমায় এই পৃথিবীতে আমাদের টিকে থাকা নিয়ে কোন বড়সড় বাজী ধরতে রাজী হত? তারা কি ভুলেও কল্পণা করতে পারতো যে এই প্রজাতিটিই খুব নিকট ভবিষ্যতে সারা পৃথিবীটাকে দখল করে নেবে? চারদিকের নির্মম প্রকৃতির সাথে টেক্কা দিয়ে টিকে থাকার জন্য কি আছে তাদের? প্রয়োজনীয় কিছুই নেই – থাবা নেই, ধারালো দাঁত নেই, শিং বা লোম কিছুই নেই, অত্যন্ত দুর্বল দেখতে অদ্ভুত এক দ্বিপদী প্রাণী! জানি, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতই শোনাচ্ছে, কিন্তু ব্যাপারটাকে ঠিক উড়িয়েও দেওয়া যায় না। এখন স্বভাবতই তাহলে প্রশ্ন করতে হয়, সে অবস্থা থেকে আমরা টিকে গেলাম কি করে? শুধু টিকে গেছি বললেও তো ভুল বলা হবে – মাত্র দেড় দুই লাখ বছরে ফুলে ফেপে সংখ্যায় ছয়শো কোটি তো ছাড়িয়ে গেছিই, পৃথিবীব্যাপী প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করছি, ইদানীংকালে আবার পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মহাবিশ্বের দিকেও দিয়েছি হাত বাড়িয়ে। কিন্তু কি করে সম্ভব হল সেটা? বৈচিত্রময় এই বিশাল প্রকৃতি জগতের এক ক্ষুদ্র অংশ এই মানব প্রজাতির অনন্যতার উৎসটি আসলে কোথায়? দু’টি বৈশষ্ট্যের কথা তো চোখ বন্ধ করেই বলা যায়ঃ মানুষই একমাত্র প্রাণী যে দুই পায়ের উপর ভর করে দাঁড়াতে শিখেছে, আর ওদিকে আবার খুব অসাধারণ রকমের বড় মস্তিষ্কেরও বিবর্তন ঘটেছে যা অন্য কোন প্রাণীতে ঘটতে দেখা যায় নি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অত্যন্ত সুপরিচিত জীববিজ্ঞানী, এডওয়ার্ড উইলসনের গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ২০ লক্ষ বছর আগে থেকে শুরু করে আড়াই লাখ বছর আগে পর্যন্তও আমাদের মস্তিষ্কের আকার প্রতি এক লাখ বছরে প্রায় এক চামচের সমান করে বেড়েছিলো ১। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, ধীর গতিতে হলেও এখনও আমাদের মস্তিষ্কের বিবর্ধন ঘটে চলেছে। আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশটি আমাদের বুদ্ধিমত্তার সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত সেই সেরিব্রেল করটেক্স কে যদি টেনে ফ্ল্যাট করে বিছিয়ে দেওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে যে তা চার পৃষ্ঠা জুড়ে জায়গা করে নিচ্ছে। আমাদের সবচেয়ে কাছের পূর্বসুরী শিম্পাঞ্জীদের সেরিব্রেল করটেক্স নেবে মাত্র এক পাতার সমান জায়গা, বানরেরটা নেবে একটি পোষ্টকার্ডের সমান আর ইঁদুরের ক্ষেত্রে তা নেবে মাত্র একটা স্ট্যাম্পের সমান জায়গা।
পার্থক্যটা চোখে পড়ার মতই, তাই হয়তো সাফল্যের পাল্লাটাও বেশ ভারী। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, উহু, মস্তিষ্কের আকারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটাই বোধ হয় একমাত্র কারণ নয়! তাহলে তো আমাদের মত বড় মস্তিষ্কের অধিকারী নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির মানুষরাও একই রকম সাফল্য অর্জন করতে পারতো – তাদের মত প্রজাতির তো তাহলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা নয়। একদিকে মস্তিষ্কের বিকাশ আবার অন্যদিকে আমাদের শরীরে সময় মত সাহায্যকারী মিউটেশনগুলোর ফলশ্রুতিতেই ঘটেছে ভাষার উৎপত্তি ও ব্যবহার, তার সাথে পাল্লা দিয়ে ঘটেছে সাংস্কৃতিক বিবর্তন এবং বিকাশ ঘটেছে জটিল এক সামাজিক ব্যবস্থার। এখানেই তো শেষ নয়, গত কয়েক লক্ষ বছরে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটতে থাকা পরিবেশগত পরিবর্তনের ব্যাপারটাকেও তো এই সমীকরণ থেকে বাদ দিয়ে দিলে চলবে না। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে টিকে থাকার জন্য মানুষ যত নতুন ভাবে অভিযোজিত হয়েছে বিবর্তনের নিয়মে ততই বিকশিত হয়েছে তার নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ,
//আজকে মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে পূর্নাংগ কোন ধারণা পেতে হলে শুধু তার বিবর্তনের পিছনের বিজ্ঞানটা পড়লেই হবে না। বরং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি দিয়ে মানুষের চারপাশের পারিপার্শ্বিকতার পরিবর্তনের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিকাশের জটিল প্রেক্ষাপটটাকেও ঠিক মত বিশ্লেষণ করতে হবে।//
আমরা জানি যে, এই মহাবিশ্ব প্রায় ১৪’শ কোটি বছর আগে সৃষ্টি হলেও আমাদের এই বুড়ো পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ শ’ কোটি বছর আগে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, প্রাণের জন্ম হতে লেগে গিয়েছিলো আরও প্রায় একশো কোটি বছর। আর মানুষের উৎপত্তি? সে তো সে দিনকার কথা! আদিম এক কোষী প্রাণ, ব্যকটেরিয়া, বহুকোষী প্রাণী, আ্যলজি, অমেরুদন্ডী প্রাণী, বিভিন্ন মেরুদন্ডী প্রাণীর উৎপত্তি, বিকাশ বা বিলুপ্তির ধাপ বেয়ে, বিবর্তনের চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মানুষের আদি পূর্বপুরুষদের উদ্ভব ঘটলো মাত্র ৫০-৬০ লাখ বছর আগে। সে সময়ে মানুষ এবং অন্যান্য বনমানুষের মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কিছু প্রজাতিরা পায়ের উপর ভর করে দাঁড়াতে শিখলেও তার থেকে আধুনিক মানুষের পুর্বপুরুষদের উদ্ভব ঘটতে লেগে গেছে আরও প্রায় ৩০ লক্ষ বছর। আর আমাদের নিজেদের প্রজাতি অর্থাৎ Homo sapiens দের গল্পের শুরু তো সেদিন, মাত্র দেড় লাখ খানেক বছর আগে। ভূতাত্ত্বিক নিয়মে হিসাব করলে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের ব্যাপারটা এক্কেবারেই আনকোরা। শুধু তো তাইই নয়, বিবর্তনের ধারায় যেমন অগুনতি জীবের উৎপত্তি ঘটেছে ঠিক তেমনি তাদের একটা বড় অংশ বিলুপ্তও হয়ে গেছে। একইভাবে আমরা ফসিল রেকর্ড থেকে দেখতে পাই যে, মানুষেরও বিভিন্ন প্রজাতির উৎপত্তি ঘটেছে, আবার আমাদের প্রজাতি ছাড়া বাকিরা বিলীন হয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়। বিবর্তনের ইতিহাসে অনিয়শ্চতার তো কোন শেষ নেই, ডাইনোসরের মত অতিকায় প্রাণী বহুকাল ধরে পৃথিবীর বুকে রাজত্ব করেও শেষ পর্যন্ত হারিয়ে গেছে। সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ভয়ঙ্কর কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে মহাপরাক্রমশালী ডায়নোসরগুলো বিলুপ্ত হয়ে না গেলে সেই সময়ের অত্যন্ত নগন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো হয়তো এত বিকশিত হতে পারতো না। অর্থাৎ, অন্যান্য সব প্রাণীর মতই আমাদের উদ্ভবও তো কোন পূর্ব-নির্ধারিত ব্যাপার নয়। আমরা আজকে এখানে আছি কোন ‘নীল নক্সা’র ফলশ্রুতিতে নয়, বরং ঠিক তার উলটো কারণে, বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ঘটনাগুলো যেভাবে ঘটেছে তা না ঘটলেই হয়তো আজকে আর আমরা এখানে থাকতাম না। প্রখ্যাত বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী এবং ফসিলবিদ স্টিফেন জে. গুল্ড তাই বলেছিলেন, “মানুষ আগে থেকে নির্ধারিত বিবর্তনের কোন ধারার শেষ ফসল নয় বরং মানুষ হচ্ছে আকস্মিকভাবে উদ্ভুত মহাজাগতিক এক অনুচিন্তার ফলাফল। বিশাল শাখা প্রশাখাসহ যে প্রাণবৃক্ষের বিবর্তন ঘটেছে মানুষ হচ্ছে তার একটা ছোট্টো শাখামাত্র। একরকম নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, এই গাছের বীজটাকে যদি আবার নতুন করে বপন করা হয় তাহলে এই শাখাটা আবার একই রকমভাবে একই জায়গায় জন্ম নেবে না’।
আসলে মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসটা যে একটু অদ্ভুত এবং অন্য প্রাণীদের থেকে একটু বেশী জটিল সেটা কিন্তু স্বীকার করে নিতেই হবে! একদিক দিয়ে বিচার করলে, তা অন্যান্য সব প্রাণীর মতই প্রাকৃতিক নিয়মে বিবর্তনের ধারায় ঘটে যাওয়া এক আকস্মিক ঘটনা ছাড়া আর কিছুই নয়, আর অন্যদিকে থেকে চিন্তা করলে, তা হচ্ছে অকল্পনীয় বুদ্ধিমত্তা, ভাষা ও সভ্যতার বিকাশের এবং সেই সাথে প্রকৃতির সাথে টেক্কা দেওয়ার এক অনন্য ইতিহাস। মানুষের এই অভূতপূর্ব বুদ্ধিমত্তা একদিকে যেমন তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে সামনের দিকে তেমনি তাকে উৎসাহী করে তুলেছে নিজের উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করতে। অদম্য কৌতুহল ছিলো তার, কিন্তু জ্ঞানের মাত্রা তখনও এমন অবস্থায় পৌঁছেনি যে সে তার নিজের উৎপত্তির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে পারবে বা উপলব্ধি করতে পারবে যে, কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও সে আসলে প্রকৃতির অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে তো মানুষের পক্ষে তার উৎপত্তির রহস্য বৈজ্ঞানিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব ছিলো না। যেখানেই তার জ্ঞানের পরিসীমা আটকে গেছে সেখানেই সে জন্ম দিয়েছে হাজারো কল্পকাহিনী, উপাখ্যান আর নানা রকমের সৃষ্টিতত্ত্বের। তাই সবার মত প্রকৃতির অধীন হয়ে থেকে তার তো আর পোষালো না, সে আরও অনেক বেশী জানতে চায়, বুঝতে চায়, নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা চায়, প্রকৃতিকে জয় করতে চায়। প্রকৃতির বিশালত্ব, নির্মমতা, হিংস্রতার সামনে ‘অসহায় কিন্তু বুদ্ধিমান’ মানুষ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অনবরত লড়াই করেছে প্রকৃতির বিরুদ্ধে, আবার অন্যদিকে তার সামনেই মাথা নুইয়ে তৈরি করেছে নানা ধরণের কাল্পনিক স্রষ্টার। সহজাত বুদ্ধি আর অদম্য কৌতূহল আছে তার, কিন্তু অজ্ঞতা এবং কালের সীমাবদ্ধতাও তো অপরিসীম! আসলেই তো অবাক করা ব্যাপার – চারদিকে ফুলে ফলে সম্পদে ভরা পৃথিবী, তেষ্টা মেটাতে, বেঁচে থাকতে, ফসল ফলাতে পানির দরকার, অজানা কারণে বৃষ্টি হয়ে তা ঝরে পড়ছে আকাশ থেকে, তাকে তাপ দেওয়ার জন্য সূর্য উঠছে একদিকে, দিনের শেষে ডুবে যাচ্ছে আরেক দিকে এর সবই তার জন্য তৈরি নয় তো কি? আবার ওদিকে আগুন, মহাপ্লাবন, বজ্রপাত, সাইক্লোনগুলো কি যেনো এক আজানা কারণে তাকে শাস্তি দিয়ে যাচ্ছে! মহাবিশ্বের ছোটো এক গ্রহের আরও ছোটো এই মানুষ প্রজাতি তার চারদিকের প্রকৃতি এবং মহাবিশ্বের বিশালতায় পুলকিত, অভিভূত এবং ভীত! আর তা থেকেই সে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য দেব দেবতা, অলৌকিক সব সৃষ্টিকর্তার এবং সৃষ্টিতত্ত্বের, আর তারপর মহা গর্বে, মিথ্যা আস্ফালনে নিজেকে বসিয়েছে তার কেন্দ্রে। মহাবিশ্বের সমস্ত আয়োজনের উপলক্ষ্য নাকি সে, সেই নাকি ‘সৰ্বশ্ৰেষ্ঠ সৃষ্টি’!
কিছুদিন আগে মিশরের এক ফেরাউনের কয়েক হাজার বছরের পুরনো সমাধি খুঁড়ে বিচিত্র সব জিনিষ পাওয়া গেছে, নরবলি দেওয়া কঙ্কাল থেকে শুরু করে ৭০ ফুট লম্বা ১৪টি নৌকার পর্যন্ত কি না পাওয়া গেছে সেই সমাধির ভিতরে! পরজন্মে রাজাদের দাস দাসী তো লাগবেই, সে জন্যই এ নরবলি; তার সাথে নৌকাগুলোও দিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যাতে চরে ফেরাউনের আত্মা পরপারে পাড়ি জমাতে পারবে! এখন হয়তো এ ধরণের কাহিনীগুলো শুনলে আমরা চমকে উঠি কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখুন – আমাদের চারপাশে পৃথিবীর আনাচে কানাচে, সব জাতি, গোষ্ঠি, সমাজ এবং সভ্যতার মধ্যেই বহু রকমের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং ধর্মীয় রীতিনীতির অস্তিত্ব দেখা যায়। বহুকালের সঞ্চিত সামাজিক অভিজ্ঞতার সাথে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে আমরা তৈরি করেছি এই সৃষ্টিতত্ত্বগুলো, আর তদানিন্তন সামাজিক রীতিগুলোকে তার সাথে বেঁধে দিয়ে বলেছি এটাই নিয়ম, এটাই ধর্ম এবং একমাত্র জীবন বিধান। শুধুই যে অজ্ঞতা থেকে, ভীতি থেকেই কল্পকাহিনীগুলোর জন্ম দিয়েছে তাও কিন্তু নয়, সমাজের অধিপতিরা তাদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্যও ভর করেছে ধর্মের উপর, একে পুঁজি করে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শোষণকে বৈধতা দিয়েছে। আর সত্যিকারের জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা যেনো সাধারণ মানুষ পর্যন্ত না পৌঁছায় তার জন্য তৈরি করে রেখেছে বিভিন্ন নিয়মাবলীর। আড়াই হাজার বছর আগে সেই প্রাচীণ গ্রীস দেশে বিজ্ঞান তার সঠিক গতিতেই এগুতে শুরু করেছিলো। কিন্তু প্লেটো এবং বিশেষ করে এরিস্টোটল সেই সময়ের দাসপ্রথাভিত্তিক নিবর্তনমূলক সমাজব্যবস্থাকে গ্রহনযোগ্যতা দেওয়ার জন্য শক্তিশালী এক ভাববাদী দর্শনের জন্ম দিলেন যার মূলে ছিলো অপরিবর্তনশীলতা এবং জীবের শ্বাসত স্থায়ীত্বের তত্ত্ব ৪। আর এই স্থবির ধারণার উপর ভর করেই রোমান সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠলো খ্রীস্টিয় ধর্ম। গত হাজার বছরেরও বেশী সময় ধরে শাষকচক্রের সাথে মিলে ধর্মীয় অনুশাষণগুলো কিভাবে বৈজ্ঞানিক অগ্রসরতার টুটি চেপে ধরেছে সেই কাহিনীতে এখন আর ঢুকছিনা, যারা মানব সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে কিছু হলেও ধারণা রাখেন তারা সবাই এ সম্পর্কে কম বা বেশী জানেন। এটুকুই শুধু বলা যায় যে, এখনও আমাদের চারপাশে এ রকম দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার কোন শেষ নেই। কিন্তু মানুষের ইতিহাসের আরেকটি দিক না বললে গল্পটার একটা দিক না বলাই থেকে যাবে। আমরা উপরে মানুষের কল্পনার কথা বলেছি, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রতিরোধের কথা বলেছি কিন্তু তার বিরুদ্ধে মানব সভ্যতার অনন্ত সংগ্রামের কথাটা এখনও বলা হয়নি। যুগে যুগে মানুষের সৃজণীশক্তি, অজানাকে জানার অদম্য কৌতুহল এবং বুদ্ধিমত্তা তাকে একদিকে যেমন কল্পণা করতে শিখিয়েছে তেমনি আবার নতুন নতুন চিন্তা এবং আবিষ্কারেরও খোরাক জুগিয়েছে। কালের পরিক্রমায় নতুন নতুন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে সে যখন অজানা বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পেরেছে, তখনই সব বাঁধা অতিক্রম করে, পুরনো ভুলের এবং প্রতিরোধের দেওয়ালগুলোকে ভেঙ্গে চুড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মানুষ শত অত্যাচার সহ্য করেছে, এমনকি মৃত্যকেও বরণ করে নিয়েছে। তাই আমাদের সভ্যতার ইতিহাসে এ ধরণের প্রতিরোধ এবং সংগ্রামের কাহিনীর কোন শেষ নেই। তার এই কল্পণাশক্তি এবং সেই সাথে যুক্তি দিয়ে, বস্তুবাদী চিন্তা দিয়ে তার চারদিকের সব কিছুকে বিশ্লেষণ করে দেখার অসীম ইচ্ছা এবং সর্বোপরি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার নিরন্তর সংগ্রামের কারণেই জ্ঞান-বিজ্ঞান আজকে এখানে এসে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
সে যাই হোক, চলুন আমরা ফিরে যাই মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের গল্পে। আমরা জানি যে, ষোড়শ শতাব্দীতে এসে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণাটা হাজার বছর ধরে টিকে থাকা মধ্যযুগীয় ধর্মীয় এবং সামাজিক স্থবিরতার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তারপরও তো প্রায় কয়েকশ বছর লেগে গিয়েছিল সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে। আমরা দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখেছি কিভাবে বহু বাঁধা বিঘ্ন পেরিয়ে জীববিজ্ঞান শেষ পর্যন্ত ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেরিয়ে এসেছিলো সেই ‘প্রজাতির পৃথক পৃথক সৃষ্টি’ এবং স্থির প্রজাতির মতবাদের ভ্রান্তি থেকে! প্রথমাবারের মত আমরা জানতে পেরেছিলাম আমাদের উৎপত্তি এবং বিকাশের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটা। তারপর প্রায় দেড়শো বছর কেটে গেছে, বিজ্ঞানের অত্যাধুনিক শাখাগুলো প্রতিদিনিই আরও জোরালোভাবে এই বিবর্তন তত্ত্বের সঠিকতা প্রমাণ করে চলেছে, কিন্তু প্রাচীন চিন্তার আচলায়তন ভেঙ্গে আমাদের সমাজে তা কিন্তু এখনও জায়গা করে নিতে পারেনি। পৃথিবীতে যে গুটিকয়েক তত্ত্ব সমস্ত পুরনো ঘুণে ধরা রক্ষণশীল ভ্রান্ত চিন্তা ভাবনা ও প্রথাকে সমূলে আঘাত করেছে তার মধ্যে বিবর্তনবাদ অন্যতম। তাই তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধেরও মাত্রাটা যে একটু বাড়াবাড়ি রকমের বেশি হবে তা তো জানা কথাই। মানব সভ্যতার সমগ্র ইতিহাস জুড়েই আমরা এর পুনরাবৃত্তি দেখে এসেছি। অন্যান্য জীবের বিবর্তন নিয়ে কথা বললে যাও বা ঠিক আছে, কিন্তু মানুষের বিবর্তনের প্রসংগ আসলেই আমাদের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সেই ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন এবং আলফ্রেড ওয়ালেস যখন প্রথম বিবর্তনের তত্ত্বটি প্রস্তাব করলেন তখন চার্চের বিশপের স্ত্রীর মুখ থেকে যে আতঙ্কবানী বের হয়ে এসেছিলো তা যেনো আজকের দিনেও প্রাসংগিক বলে মনে হয়। তিনি আর্তনাদ করে বলেছিলেন।
//বনমানুষ থেকে আমাদের বিবর্তন ঘটেছে! আশা করি যেনো এটা সত্যি না হয়, আর যদি তা একান্তই সত্য হয়ে থাকে তবে চলো আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি সাধারণ মানুষ যেনো এটা কখনই জানতে না পারে!//
সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সত্যকে সরিয়ে রাখার প্রচেষ্টা তো আর নতুন কিছুই নয়। এখনও বিশ্বব্যাপী সেই চেষ্টার যেন কোন কমতি নেই!
ডারউইন প্রথমে তার ‘প্রজাতি উৎপত্তি’ বইটিতে মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে তেমন কিছুই বলেন নি (শুধু বলেছিলেন, ‘light will be thrown on the origin of man and his history’ ), এবং সেই সময়ের সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার এই নিশ্চুপতার কারণটা বোঝা তেমন কঠিনও নয়। ১৮৫৭ সালে জার্মানির ডুসেল নদীর উপত্যকায় নিয়েন্ডারথাল নামক জায়গায় বেশ কিছু আদিম মানুষের করোটি আবিষ্কৃত হয়। তখন জার্মানীর প্রখ্যাত অধ্যাপক স্কাফ হাউসেন ফসিলগুলো পর্যবেক্ষণ করে প্রস্তাব করেন যে, এগুলো আসলে মানুষের কোন বিলুপ্ত আদিম প্রজাতির হাড়গোড়। এদের নাম দেওয়া হয় নিয়েন্ডারথাল মানুষ ৬। তখনকার শিক্ষিত সমাজ কিন্তু তার কথা বিশ্বাস করেননি। ওদিকে ডারউইনের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং বিজ্ঞানী টি এইচ হাক্সলি সে সময়ই মানুষের বিবর্তনের বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং এপ বা বন মানুষের সাথে মানুষের সাদৃশ্য এবং বৈসাদৃশ্যগুলো তুলে ধরে ১৮৬৩ সালে ‘Evidence as to Man’s Place in Nature’ নামক বইটি প্রকাশ করেন। এর পর ডারউইন যখন “The Descent of Man and selection with respect to Sex’ বইটি বের করেন ততদিনে মানুষের বিবর্তনের বিষয়টি বুদ্ধিজীবী মহলে মোটামুটিভাবে সুপরিচিত হয়ে গেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে জার্মান বিজ্ঞানী আর্নেষ্ট হেকেল তার বিখ্যাত ‘সৃষ্টির ইতিহাস’ বইয়ে লিখেছিলেন যে, বনমানুষ থেকে মানুষের বিবর্তন যদি সত্যিই ঘটে থাকে তবে মানুষও নয় আবার ঠিক বনমানুষও নয় এমন ধরণের মধ্যস্থিত ফসিল পাওয়া যাবে। তিনিই প্রথম বিবর্তনের মধ্যবর্তী অবস্থার এরকম ফসিলগুলোকে হারানো যোগসূত্র বা ‘missing link’ বলে আখ্যায়িত করেন ৬। তার কথাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে – গত একশো বছরে এমন অসংখ্য ফসিলের সন্ধান পাওয়া গেছে যা থেকে মানুষ এবং বনমানুষের মধ্যবর্তী অবস্থার বিবর্তনের ধাপগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধু ত তাইই নয়, এথেকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রজাতির (Homo sapiens) মানুষ ছাড়াও আরও অন্যান্য প্রজাতির মানুষও বিচরণ করেছে, এমনকি অনেক সময় একাধিক প্রজাতির মানুষ একই সময়ে তাদের সম্মিলিত পদচারণায় মুখরিত করে তুলেছে আমাদের এই ধরণী। অর্থাৎ, আমরা নিজেদেরকে যতই বিশেষ এক ‘সৃষ্টি” বলে দাবী করি না কেনো আমরাও আসলে অন্য কোন পূর্ববর্তী প্রজাতি থেকেই বিবর্তিত হয়েছি, অন্যান্য জীবের মতই আমাদের পূর্বপুরুষদেরও বিবর্তন ঘটেছে বিভিন্ন ধারায়, প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় তাদের মধ্যেও উদ্ভব ঘটেছে বিভিন্ন ধরণের প্রজাতির। এই মুহুর্তে আমরা ছাড়া আর কোন মানব প্রজাতির অস্তিত্ব না থাকলেও অতীতে যে তা ছিলো তা নিয়ে কিন্তু দ্বিমত প্রকাশের কোন অবকাশই আর নেই।
গত একশ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মানুষ এবং এপের মধ্যবর্তী স্তরের যে সমস্ত ফসিল খুঁজে পেয়েছেন তা থেকে মানব বিবর্তনের একটা পরিষ্কার চিত্র পাওয়া কিন্তু আর কোন কঠিণ ব্যাপার নয়। এখন সমস্যাটা আর ‘যথেষ্ট পরিমাণে ফসিল পাওয়া যাচ্ছে না’ তা নয় বরং ঠিক তার উলটো। এত রকমের মানুষের পুর্বপুরুষের প্রজাতির এবং তাদের মধ্যবর্তী স্তরের ফসিল পাওয়া যাচ্ছে যে তাদেরকে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঠিক ঠাক মত শ্রেনীবিন্যাস করাটাই বিজ্ঞানীদের জন্য এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানী আর্নেষ্ট হেকেলের মনোবাঞ্ছা যে এভাবে পূরণ হবে তা হয়তো তিনি নিজেও আশা করেননি। তার উপরে আবার গত কয়েক দশকে ডেটিং পদ্ধতির যে অভুতপূর্ব উন্নতি ঘটেছে তার ফলে সঠিকভাবে ফসিলের বয়স এবং প্রকৃতি নির্ধারণ করার ক্ষমতাও বেড়ে গেছে বহুগুণ। আরও উন্নত পদ্ধতির রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে ঠিকমত আগ্নেয়শীলা পাওয়া যাচ্ছে না বা যেগুলো রেডিওকার্বন ডেটিং এর সময়সীমার আওতায় পড়ছে না সেখানে এখন ইলেকট্রন স্পিন রেসোনেন্স এবং ইউরেনিয়াম সিরিজ ডেটিং এর মত অত্যাধুনিক পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। সিটি স্ক্যান নামের ত্রিমাত্রিক এক্স-রে পদ্ধতিটি মূলত চিকিৎসাবিদ্যার জন্য আবিষ্কৃত হলেও এখন তার মাধ্যমে ফসিলের বাইরের এবং ভিতরের আভ্যন্তরীণ গঠণের ছবি তোলা সম্ভব হচ্ছে, মাইক্রোস্কপিক পদ্ধতির মাধ্যমে হাড়ের বা দাঁতের গঠন বের করে ফেলা যাচ্ছে, আবার আইসোটোপিক পর্যালোচনার মাধ্যমে বিলুপ্ত প্রজাতিগুলোর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কেও বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়া মানুষ এবং এপের দৈহিক গঠনের তুলনামুলক বিচার থেকেও বহু তথ্য বেড়িয়ে এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের সাথে এপের পার্থক্যগুলো যত বেশী না পরিমাণগত তার চেয়ে অনেক বেশী গুণগত। মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রকমের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছেঃ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের আকার- বিশেষতঃ মস্তিষ্কের আকার মানুষের অনেক বড়, বনমানুষের সাথে তাদের হাত এবং পায়ের আকারের অনুপাতেও পার্থক্য রয়েছে, গায়ের লোম পড়ে গেছে অনেকাংশেই, চামড়ার রঞ্জকবস্তু এবং বুড়ো আঙ্গুল নাড়াবার ক্ষমতাও মানুষের অনেক বেশী। আগে মানুষের সাথে বনমানুষের পার্থক্যকে যত বড় বলে মনে করা হত আধুনিক গবেষণার ফলে তা ক্রমশঃ যেন কমে আসছে। অনেকেই এখনও বৃটিশ বিজ্ঞানী রিচার্ড ওয়েন (Richard Owen, 1804-1892) এর বলা কিছু ভুল তথ্যকে সত্য বলে মনে করে বসে আছেন ওয়েন মনে করেছিলেন যে, তিনি মানুষ এবং বনমানুষের মধ্যে বিশাল এক পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন যা দিয়ে প্রমাণ করা যায় যে মানুষ এবং বনমানুষ একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়ে আসেনি। তিনি বলেন মানুষের মস্তিষ্কে হিপোক্যাম্পাস নামের একটি বাড়তি উপাংগ রয়েছে যা কিনা বনমানুষের মধ্যে নেই। কিন্তু ডারউনের বন্ধু টি এইচ হাক্সলি তখনই তা ভুল প্রমাণ করেন, প্রকৃতপক্ষে মানুষ এবং এপ দুই গ্রুপেরই মধ্যে এই উপাংগটির অস্তিত্ব রয়েছে।
এ তো গেলো একটা দিক, অন্যদিকে জেনেটিক্স এবং জিনোমিক্সের আধুনিক গবেষণা এবং পর্যালোচনাকে বাদ দিলে তো বিবর্তনের গল্প বলাই এখন আর সম্ভব নয়। গত দুই তিন দশকে বিজ্ঞানের এই শাখাটি বিবর্তনবাদ এবং মানুষের বিবর্তনের পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী সব তথ্য এবং সাক্ষ্য হাজির করেছে যার সাথে অংগস্থানবিদ্যা এবং ফসিলবিদ্যা থেকে আলাদা আলাদাভাবে পাওয়া তথ্যগুলো প্রায় হুবহু মিলে যাচ্ছে। আর দু’এক জায়গায় যেখানে অমিল বা সংশয় ধরা পড়ছে সেখানে বিজ্ঞানীরা সুযোগ পাচ্ছেন আরও নতুন নতুন গবেষণার মাধ্যমে ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার। বিজ্ঞানের তিনটি শাখা থেকে স্বতন্ত্রভাবে পাওয়া এই সম্মিলিত তথ্যগুলো বিবর্তনবিদ্যাকে অত্যন্ত সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। মানুষ এবং তার কাছাকাছি প্রজাতিগুলোর জিনোমের অনুক্রম বা সিকোয়েন্সিং এর মাধ্যমে আমরা মানুষের বিবর্তন নিয়ে যে বিস্তারিত সব তথ্য পেতে শুরু করেছি।
চিত্র ১.১ : শিম্পাঞ্জি, ওরাং ওটাং, গরিলা এবং মানুষের মধ্যে বংশগতীয় পার্থক্যের তুলনা
এখন আবার প্যালেও আনবোপলজী নামে বিজ্ঞানের একটি নতুন শাখা তৈরি করা হয়েছে, এরা মানুষের বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করে। নৃতত্ত্ববিদ্যার অংশ হলেও এখানে জীববিদ্যা, ভূতত্ত্ববিদ্যা এমনকি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের সমস্ত গবেষণাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আসলে যতই দিন যাচ্ছে ততই আরও বেশী করে পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে মানুষের বিবর্তনকে শুধুমাত্র জীববিজ্ঞানের সীমার মধ্যে রেখে বিচার করলেই হবে না। বুদ্ধিমত্তা এবং ভাষার অচিন্তনীয় বিকাশের ফলে মানুষ এমন এক জটি সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যে, বিবর্তনের প্রক্রিয়াও তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। আবার অন্যদিকে, মানুষ ছাড়া আমাদের খুব নিকটাত্মীয়রাও, যেমন ওরাং ওটাং, গরিলা, বা শিম্পাঞ্জিও, যেহেতু বেশ জটিল সামাজিক বন্ধন তৈরি করে, তাই মানুষের বিবর্তন বুঝতে হলে এই প্রজাতিগুলোরও জেনেটিক গঠন এবং বৈশিষ্ট্য তো বুঝতে হবেই এবং তার পাশাপাশি এদের ব্যবহার এবং প্রবণতাগুলোকেও বোঝাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘মানুষের বিভিন্ন প্রজাতি’ বলতে কি বুঝায় তা আরেকবার একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। জীববিদ্যার সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রজাতি বলতে আমরা বুঝি এমন এক জনপুঞ্জ যারা নিজেদের মধ্যে প্রজননে সক্ষম, কিন্তু অন্য জনপুঞ্জ থেকে প্রজননের দিক থেকে তারা বিচ্ছিন্ন। যেমন ধরুন, বিভিন্ন ধরণের বিড়াল প্রজাতি বললে আমরা বুঝি তার মধ্যে রয়েছে, ঘরের সাধারণ বিড়াল থেকে শুরু করে, বাঘ, চিতা বাঘ, সিংহ, জাগুয়ার, বন্য বিড়াল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতি।
//হ্যাঁ, মানুষ এবং তার পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন প্রজাতি বলতেও আমরা সেরকম ওই বিভিন্ন ধরণের মানুষের কথাই বুঝি। এখন সারা পৃথিবী জুড়ে মানুষের একটাই প্রজাতি টিকে রয়েছে বলে ব্যাপারটা ঠিকমত বুঝে ওঠা আমাদের জন্য যেনো একটু কষ্টকরে হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের প্রজাতির মানুষের সাথে কিছুটা মিল রয়েছে, আবার অমিলগুলোও চোখে পড়ার মতই, কিন্তু আবার বংশগতীয় দিক থেকে এতটাই ভিন্ন যে, তারা আমাদের সাথে প্রজননে অক্ষম–এমন বিভিন্ন ধরণের মানুষ নামক জীব পৃথিবীতে ঘুড়ে বেড়িয়েছে? হ্যা, বেশ অবিশ্বাস্য হলেও ব্যাপারটা আসলে সেরকমই।//
এই বইটা তো শুরুই করেছি সেরকম এক ধরণের মানব প্রজাতির (Homo floresiensis বা যাদেরকে সাধারণ ভাষায় হবিট বা বেটে মানুষও বলা হয়) বর্ণনা দিয়ে। একটু পরেই আমরা আরও দেখবো যে, শুধু Homo floresiensis বা নিয়ান্ডারথাল প্রজাতিই নয়, বিবর্তনের ধারায় মানুষ এবং এপের মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিভিন্ন রকমের প্রজাতি এবং ক্রমশঃ সময়ের সাথে সাথে আজকের আধুনিক মানুষের কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বিভিন্ন ধরণের মানব প্রজাতি এই পৃথিবীতে বিকশিত হয়েছিল।
গত কয়েক দশকে আণবিক জীববিদ্যা, জেনেটিক্স, জিনোমিক্সের বিভিন্ন আবিষ্কারগুলো প্রাণের বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে এক নতুন পর্যায়ে উত্তোরিত করেছে। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না করলে একুশ শতকে বসে লেখা কোন বিবর্তনের গল্প সম্পুর্ন হতে পারেনা। তাই ভাবছি এই নতুন জ্ঞানের আলোয় আমাদের পূর্বপুরুষদের গল্পটা কি রূপ নিয়েছে তা নিয়েই না হয় আগে আলোচনা করা যাক, তারপর আমরা দেখবো ফসিল রেকর্ডগুলো তার সাথে একমত হচ্ছে কিনা। এখানে ডিএনএ র গঠন বা কিভাবে জেনেটিক তথ্য ডিএনএ র ভিতর সঞ্চিত থাকে বা আণবিক জীববিদ্যার সাম্প্রতিক সবগুলো আবিষ্কার উল্লেখ করার সুযোগ বা সময় কোনটাই নেই বলে শুধু মানুষের বিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কারের কথাই উল্লেখ করবো। আসলে সত্যি কথা বলতে কি মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে গত কয়েক শতাব্দী ধরে এত কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে যে শুধু তা নিয়েই একটি বড়সড় বই লেখা যায়। এখানে একটি অধ্যায়ের ছোট্টো পরিসরে তার সবকিছু ব্যাখ্যা করার প্রয়াসকে এক ধরণের ধৃষ্টতা ছাড়া আর কি যে বলা যায় তা ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু কি আর করা, সময় এবং সুযোগের সীমাবদ্ধতাটাকে মেনে নিয়ে আপাতত এখানেই এর কয়েকটি অংশ তুলে ধরা যাক।
জিনের আলোয় ফিরে দেখা
বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তার ‘Unweaving the Rainbow’ বইতে বলেছিলেন যে, ডিএনএ হচ্ছে ‘মৃতের জেনেটিক বই’- আমাদের পুর্বপুরুষের ইতিহাসের রোজনামচা যেন তারা। বিবর্তনবিদ্যা বলে যে, জীবের শরীরের সবকিছুই তার পূর্বপুরুষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আর এদিকে ডি এন এ র মধ্যে বিস্তারিতভাবে লেখা রয়েছে সেই কাহিনীর পূর্ণ ধারাবাহিক বিবরণী – কখন আমাদের পূর্বপুরুষেরা কিভাবে বিবর্তিত হয়েছে, কোন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ করেছে, প্রজননের ইতিহাস থেকে শুরু করে কোথায় কখন কোন মিউটেশন তাদের বিবর্তনের গতিকে নিয়ে গেছে নতুন দিগন্তে – সবকিছু লেখা আছে আমাদের ডি এন এ র ভিতরে। প্রজননের মাধ্যমে পরের প্রজন্ম তৈরির ধারাবাহিকতা যদি ছিন্ন না হয় তাহলে ডিএনএ-এর ভিতরে লেখা তথ্যগুলো এক অণু থেকে আরেক অণুতে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হতে থাকে। প্রতিটি জীব তার দেহকোষের ভিতরে হাজার লক্ষ এমনকি কোটি বছর ধরে এই ঐতিহাসিক তথ্য বয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা মোটে গত কয়েক দশক ধরে আণবিক জীববিদ্যার প্রভূত অগ্রগতির ফলে সঠিকভাবে ডিএনএ -এর ভিতরে লেখা এই তথ্যগুলো পড়তে এবং বুঝতে শুরু করেছি। ডঃ রিচার্ড ডকিন্স মনে করেন যে পৃথিবীতে যদি একটাও ফসিলের অস্তিত্ব না থাকতো বা কেঊ যদি তাদেরকে কোন ম্যাজিক করে উড়িয়ে দিত তাহলেও পৃথিবী জোড়া জীবের বিস্তৃতির প্যাটার্ণ এবং তাদের জেনেটিক তথ্য থেকেই সম্পূর্ণ বিবর্তনের ইতিহাস বর্ণনা করা সম্ভব হতো ১১। কথাটা শুনতে অতিরঞ্জণ বা ঔদ্ধত্য বলে মনে হলেও, আজকে একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় দাঁড়িয়ে, আণবিক জীববিদ্যার সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলোকে একটু মনযোগ দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেই বোঝা যায় যে, কথাটা আদৌ মিথ্যা নয়।
মানুষের জিনোমের সিকোয়েন্সিং বা অনুক্রমের ঐতিহাসিক প্রথম খসড়াটি প্রকাশিত হয় ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এই প্রজেক্টে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৩ সালে এর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয় ১২। এর কিছুদিন পরেই, ২০০৫ সালে, আমাদের বিবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শিম্পাঞ্জির জিনোমও পড়ে শেষ করা হয়। (ওদিকে আবার গত কয়েক বছরে ইঁদুর, মৌমাছি, ইষ্টসহ বেশ কয়েকটি জীবের জিনোমের অনুক্রমও বের করা হয়েছে, www.ncbi.nih.gov/Genbank বা www.genome.ucsc.edu ওয়েব সাইটগুলোতে এখন মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি সহ বিভিন্ন জীবের জিনোমের অনুক্রমের বিস্তারিত তথ্য রাখা আছে) ১৩। পৃথিবী জোড়া ৬৭ জন বিজ্ঞানী এই শিমাঞ্জি সিকোয়েন্সিং এ্যন্ড এ্যনালিসিস কনসোরটিয়ামে অংশগ্রহণ করেন, নেচার জার্নালের ২০০৫ সালের সেপটেম্বর ইস্যুতে মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির জিনোমের তুলনামুলক বিশ্লেষণের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয় ১৩। ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের(NHGRI) এর ডিরেকটর ফ্রান্সিস কলিন্স এর মতে, এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস, শারিরীক গঠন, বিভিন্ন ধরণের অসুখ বিসুখের উৎপত্তি বুঝতে হলে বিবর্তনের ধারায় উদ্ভুত এবং অত্যন্ত কাছাকাছি সম্পর্কিত বিভিন্ন জীবের জিনোমের সাথে আমাদের জিনোমের তুলনামুলক ব্যাখ্যা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
শিম্পাঞ্জি এবং মানুষের জিনোমের পরীক্ষার সাথে ফসিল রেকর্ড এবং শারীরবিদ্যার তুলনামুলক ব্যাখ্যা থেকে বিজ্ঞানীরা আগে শিম্পাঞ্জি এবং মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে যা ভেবেছিলেন তা প্রায় হুবহু মিলে যাচ্ছে। এদের বর্তমান জিনোমের মধ্যে সাদৃশ্য প্রায় ৯৯% এবং তাদের প্রোটিনের গঠনও খুবই কাছাকাছি। ডি এন এ র সন্নিবেশন (Insertion) এবং বিলুপ্তি (Deletion) হিসাব করলে এই সাদৃশ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৬% এ। প্রোটিন লেভেলে বিচার করলে দেখা যায় যে তাদের ২৯% জিন একই প্রোটিনের কোডিং এ নিয়োজিত। অর্থাৎ, দু’টো মানুষের ডি এন এ তুলনা করলে যে পার্থক্য দেখা যাবে, একটা মানুষ এবং শিম্পঞ্জির মধ্যে সে পার্থক্যটা মাত্র ১০ গুণ বেশী, কিংবা ধরুন ইঁদুরের সাথে মানুষের যে পার্থক্য তার তুলনায় শিম্পাঞ্জির সাথে পার্থক্য ৬০ গুণ কম ১৩! বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, মানুষ এবং শিম্পাঞ্জিতে কিছু কিছু জিন অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় ক্রমাগতভাবে দ্রুতগতিতে বদলে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে শব্দ শোনা এবং বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় জিন, স্নায়ুতন্ত্রের সংকেত আদান প্রদানের জিন, শুক্রানু তেরির জিনসহ আরও কয়েকটি জিন। এদিকে আবার দেখা যাচ্ছে যে বিবর্তনের ধারায় মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির ডি এন এ তে ইঁদুর বা খরগোশের চেয়ে অনেক বেশী পরিমাণে ক্ষতিকর
মিউটেশন ঘটেছে। তার ফলে একদিকে যেমন তাদের অসুখের পরিমাণ বেড়েছে কিন্তু অন্যদিকে আবার তা তাদেরকে পরিবেশের সাথে অভিযোজিত হতে বাড়তি সুবিধা করে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা মানুষের জিনোমের এই ধরণের মিউটেশনগুলো আরও খতিয়ে দেখছেন।
//শিম্পাঞ্জি, অন্যান্য প্রাইমেট বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রানীর সাথে আমাদের মিলগুলো বোঝা যেমন দরকার ঠিক তেমনিভাবেই গুরুত্বপূর্ণ এদের সাথে আমাদের পার্থক্যগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারা। তাহলেই হয়তো আমরা বলতে পারবো কোন কোন পরিবর্তনগুলোর ফলে আমরা মানুষে বিবর্তিত হয়েছি, কিংবা ঠিক কোন কোন বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে আমরা তাদের থেকে বুদ্ধিমত্তায় এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এত আলাদা হয়ে গেছি। ইতোমধ্যেই আমরা এই ধরনের বিশ্লেষণ থেকে এমন কিছু কিছু তথ্য জানতে পেরেছি যা আমাদের সাস্থ্য এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে।//
যেমন ধরুন, দেখা যাচ্ছে যে, শিম্পাঞ্জি এবং মানুষের সাধারণ পূর্বসুরী থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর মানুষ Caspase- 12 নামক জিনের কার্যকরিতা হারিয়ে ফেলেছে যার ফলেই সে এখন আলজাইমারস বা স্মৃতিভংশ (Alzheimer’s) রোগে আক্রান্ত হয়। এখন আমরা যদি শিম্পাঞ্জির মধ্যে এই জিনের কাজগুলোকে ঠিকমত বুঝতে পেরে আমাদের শরীরে মধ্যে তার প্রয়োগ ঘটাতে পারি তাহলে হয়তো এই মারাত্মক রোগটির একটি স্থায়ী ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিভিন্ন রোগের সাথে আমাদের জেনেটিক গঠনের বিবর্তনের ইতিহাস যে কি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত তা এখন ধীরে ধীরে আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
বিজ্ঞানীরা জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া তথ্যগুলোর ক্রস পরীক্ষণ করে যত সঠিকভাবে প্রজাতির উৎপত্তি এবং বিকাশের সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারেন ব্যাপারটা কিন্তু কয়েক দশক আগেও ঠিক এত সহজ ছিল না। ফসিল রেকর্ড পড়ার জন্য এত অত্যাধুনিক উপায়গুলো যেমন তাদের হাতে ছিল না, ঠিক তেমনিভাবে ডিএনএ বা আণবিক গঠণের তুলনামুলক বিশ্লেষণের পদ্ধতিগুলোও তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। আজকের দিনে ব্যাপারটা কিন্তু আর সেরকম নেই। আমরা এখন যে কোন ফসিলের আবিষ্কারকে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার বিভিন্ন ধরণের স্বতন্ত্র পরীক্ষা দিয়ে এক বার দু’বার নয়, বহুবারই যাচাই করে নিতে পারি। মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের সময়সীমা নির্ধারণের ব্যাপারটা এর এক উজ্জ্বল নমুনা। যেমন ধরুন, গত শতাব্দীর প্রথম দিকে কিন্তু মানুষের তেমন কোন মধ্যবর্তী ফসিলের সন্ধান পাওয়া যায়নি, অনেকেই তখন মনে করতেন যে, মানুষ হয়তো অন্যান্য বনমানুষদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলো প্রায় ৫ কোটি বছর আগে। তারপর ধীরে ধীরে যখন আরও অনেক ফসিল পাওয়া যেতে শুরু করলো, ওদিকে আবার বিজ্ঞানীরা মানুষের সাথে ওরাং ওটাং, গরিলা, শিম্পাঞ্জির মিলগুলো আরও ভালো করে বুঝতে শুরু করলেন তখন মনে করা হত যে, হয়তো দেড় কোটি বছর আগে মানুষের বিবর্তন ঘটতে শুরু করেছিল। বিংশ শতাব্দীর মধ্যেভাগে ডিএনএর আবিষ্কারের পর আমাদের সামনে আণবিক জীববিদ্যার গবেষণার দুয়ার খুলে যায়। এখন শুধু অতীতের ফসিল থেকেই নয়, আমাদের নিজেদের শরীরের জলজ্যান্ত ডিএনএর ভিতরেই আমরা পড়ে ফেলতে পারছি আমাদের বিবর্তনের ইতিহাস। সত্তরের দশকে মানুষ এবং অন্যান্য এপদের প্রোটিনের এমাইনো এসিডের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে জানা যায় যে, বিবর্তনের যাত্রায় মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনাটা ৫০ লক্ষ বছরের বেশী পুরনো হতে পারেনা। এদিকে আবার গত তিরিশ, চল্লিশ বছরে ফসিলবিদেরা আফ্রিকা থেকে মানুষের ‘আধা’ এবং ‘সম্পূর্ণ’ আদিপুরুষদের যে সব ফসিল খুঁজে পেয়েছেন তা থেকেও কিন্তু আমরা এখন একই ধরণের তথ্য পেতে শুরু করেছি। পরবর্তীকালে করা বিভিন্ন আণবিক গবেষণা এবং ডিএনএ সংকরায়ণের ফলাফলগুলোও এই একই সময়ের কথাই বলেছে। আর এদিকে আজকের জিনোমিক্সের অত্যাধুনিক গবেষণা থেকেও আমরা এ বিষয়ে অত্যন্ত জোড়ালো সাক্ষ্য পেতে শুরু করেছি। ২০০৬ সালের মে মাসে এমআইটি এবং হার্ভার্ড ইউনিভারসিটির বিজ্ঞানীরা নেচার জার্নালে যে গবেষণাটি প্রকাশ করেন তা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি তাদের সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল ৫৪ লক্ষ থেকে ৬৩ লক্ষ বছর
মানুষের জিনোম : কিছু মজার তথ্য
| মানুষের জিনোমে ৪৬ টি করে ক্রোমোজোম এবং বিলিয়ন ডি এন এ বেস রয়েছে। ডি এন এর ভিতরে ৪ ধরণের বেস AT C এবং G রয়েছে। খুব সংক্ষপে বলতে গেলে বলতে হয়, জিন হচ্ছে এই বেসগুলোর বিভিন্ন রকমের সমন্বয়ে তৈরি ডি এন এ র অংশ যারা আমাদের শরীরের বিভিন্ন ধরণের প্রোটিনের কোড নির্ধারণ করে। ব্যাপারটা অনেকটা লিখিত ভাষার মত। কতগুলো অক্ষর দিয়ে যেমন আমরা হাজার হাজার শব্দের জন্ম দেই তেমনিভাবে এই ৪ টি বেসের সমন্বয়েই হাজার হাজার জিনের উদ্ভব ঘটে। | |
| – ডি এন এর মধ্যে উল্লেখিত তথ্যগুলোকে যদি কাগজে কলমে লেখা হয় তাহলে তা দিয়ে ২০০টা ৫০০ পৃষ্ঠার ডিকশেনারী ভরিয়ে ফেলা যাবে। এর মধ্যেই লেখা রয়েছে আমাদের কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরের সব তথ্যাবলী। – মানুষের শরীরে ১০০ ট্রিলিয়ন কোষ আছে, এবং তাদের ভিতরে যে পরিমাণ ডি এন এ রয়েছে তাদের সবগুলোকে কে পাশাপাশি করে সাজালে এখান থেকে সূর্য পর্যন্ত ৬০০ বার আসা যাওয়া করা যাবে। – মানুষের জিনোমে ২০,০০০ – ২৫,০০০ জিন রয়েছে। দু’টো মানুষের মধ্যে ডি এন এর পার্থক্য মাত্র ০.২%, অর্থাৎ, ৫০০ টি বেসের মধ্যে মাত্র একটি তে পার্থক্য দেখা যায়। আর শিম্পাঞ্জির সাথে আমাদের জিনোমের পার্থক্য হচ্ছে ২% এর কম। |
আগে এবং তাদের আলাদা হয়ে যাওয়ার ইতিহাসটি বেশ জটিল। কিছুদিন আগেও বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে এই দুই প্রজাতির মধ্যে প্রজননে বিচ্ছিন্নতা ঘটেছিল ৬০-৮০ লক্ষ বছর আগে, কিন্তু এখন জেনেটিক তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, তা আসলে ঘটেছে আরও পরে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন যে, সম্পূর্ণভাবে আলাদা হয়ে যাওয়ার আগে এই দুই প্রজাতি বা উপপ্রজাতির মধ্যে বেশ লম্বা সময় ধরে প্রজনন ঘটেছিল যা আমাদের ক্রোমোজোম × এর মধ্যে গভীর ছাপ ফেলে গেছে। কে জানে, এ জন্যই হয়তো আমরা এত লম্বা সময় ধরে আফ্রিকা জুড়ে ‘না-এপ না-মানুষ’ জাতীয় মধ্যবর্তী ফসিলের সন্ধান পাচ্ছি! পরবর্তীতে ফসিল রেকর্ড নিয়ে আলোচনার সময় আমরা এ বিষয়টি দেখতে পাবো। উপরে বলা গবেষণাটিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, গরিলা এবং অন্যান্য প্রাইমেটদের জিনোমের গবেষণা থেকে এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাবে এবং বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই তার কাজ শুরু করে দিয়েছেন১৪।
এবার আসা যাক আণবিক জীববিদ্যার কল্যাণে বিবর্তন তত্ত্বের একটি উল্লেখযোগ্য সংশয়ের নিষ্পত্তি কিভাবে ঘটলো সেই গল্পে। শিম্পাঞ্জি, গরিলা, ওরাং ওটাং সবার মধ্যে ক্রোমোসোমের সংখ্যা ৪৮, হঠাৎ করেই দেখা যাচ্ছে যে, একই হোমিনয়ডিয়া দলের সদস্য হওয়া স্বত্ত্বেও, মানুষের ক্রোমোসোমের সংখ্যা হয়ে গেছে ৪৬। বিবর্তনের তত্ত্বানুযায়ী এরা যদি একই পুর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়ে থাকে এবং অন্যদের সবার মধ্যে ৪৮টি ক্রোমোসোমের অস্তিত্ত্ব থাকে, তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে এখন প্রশ্ন করতে হবে, মানুষের জিনোম থেকে দু’টো ক্রোমোজোম কোথায় হারিয়ে গেল? বিবর্তন তত্ত্ব যদি ঠিক হয়ে থাকে তাহলে তো একদিন হঠাৎ করে ক্রোমোজোম দু’টো হাওয়া হয়ে যেতে পারে না, তাদের কোন না কোন রকমের চিহ্ন থাকতেই হবে মানুষের জিনোমের মধ্যে। আর যদি এ ধরণের কোন নমুনা একেবারেই না পাওয়া যায় তাহলে তো বিবর্তনবাদের মুল বিষয়টি নিয়েই সন্দেহের অবকাশ থেকে যাচ্ছে। জীববিদরা প্রকল্প দিলেন যে, যেহেতু সব বনমানুষদের মধ্যে এখনও ৪৮টা ক্রোমোজোম আছে কিন্তু এদের দলের মধ্যে শুধুমাত্র মানুষেরই দু’টো ক্রোমোজোম কম আছে তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, শেষ সাধারণ পুর্বপুরুষ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর বিবর্তনের পথে চলতে চলতে কোন এক সময়ে মানুষের প্রজাতির মধ্যে আদি দু’টো ক্রোমোজোম সংযুক্ত হয়ে গিয়েছিল, যা অন্যান্য বনমানুষদের ক্ষেত্রে ঘটেনি। শেষ পর্যন্ত, এই তো কিছুদিন আগে, ২০০২ সালে বিজ্ঞানীরা দেখালেন যে, আসলে শিম্পাঞ্জিদের যে ১২ এবং ১৩ নম্বর ক্রোমোজোম (এখন তাদেরকে ২A এবং ২B বলে নামকরণ করা হয়েছে, নীচের ছবিতে মানুষের ক্রোমোজোম ২ এর সাথে শিম্পাঞ্জি, গরিলা এবং ওরাং ওটাং এর এই দুইটি ক্রোমোসোমের তুলনা দেখানো হয়েছে) রয়েছে সে দু’টো মানুষের মধ্যে মুখোমুখীভাবে সংযুক্ত হয়ে ক্রোমোজোম ২ তৈরি করেছে১৬। এই দু’টো ক্রোমোজোমের সংযুক্তির বিন্দুটির গঠন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা থেকেও মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের আরও অনেক তথ্য বের হয়ে এসেছে, কিন্তু তা নিয়ে এখানে আর আমি বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। আসলে এ ধরণের ক্ষেত্রগুলোতেই আমরা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে বিবর্তনবাদের শক্তি এবং সঠিকতা বুঝতে পারি। কোন সঠিক তত্ত্ব থেকে বিভিন্ন ধরণের প্রকল্প বা পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয় যা অবৈজ্ঞানিক কোন কিছুর উপর ভিত্তি করে দেওয়া সম্ভব নয়।
