Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    বিবর – সমরেশ বসু

    সমরেশ বসু এক পাতা গল্প235 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ০৮. যা ভাবা গিয়েছিল ঠিক তাই

    যা ভাবা গিয়েছিল, ঠিক তাই, মিঃ চ্যাটার্জী গেটের ওপর দাঁড়িয়ে, কোর্টের হাতা টেনে ঘড়ি দেখছেন, গোঁফদাড়ি কামানো তেলতেলে মুখখানি গম্ভীর, যে কারণে আমার দিকে ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করল না বোধ হয় নিচু দৃষ্টি গভীর চাকার দিকে, (ওখানেই যাবে তুমি) যেন আপাতত চাকার দিকে তাকিয়েই দেরীর কারণটা অনুমান করার চেষ্টা হচ্ছে। অথচ দিব্যি রোদে দাঁড়িয়ে ছিলেন, পায়ের কাছে শুকনো পাতা অনেক ছড়ানো, নিশ্চয়ই দু-একবার পায়চারী করতে গিরে মচমচ, শব্দ হয়েছে, বেশ তো মম জাজ আসার কথা, কিন্তু তা বুড়ো খোকনটির ভাল লাগার কথা না, খালি তৃতীয় পক্ষ আর কোথা থেকে কত উপর টাকা পাওয়া যায়, তার চিন্তা।

    আমি বললাম, গুডমর্নিং স্যার।

    মর্নিং। না তাকিয়েই জবাব দিলেন চ্যাটার্জি, যেন আমি কোন অপরাধ করে এসেছি, যেন আমার মুখের দিকে তাকালেই সতীত্ব নাস, হয়ে যাবে।

    আমি ড্রাইভারের দিকে সরে গেলাম, সেটাই নিয়ম, সুপিরিয়রকে ভাল জায়গাটা ছেড়ে দিতে হবে, (সম্বন্ধী) ঘদিচ, বৃষ্টি-বাদলার সমার বা গ্রীষ্মকালে গায়ে রোদ ঝড়ি পড়তে পারে তখন সুপিরিয়র ড্রাইভারের পাশেই চলে যান, সেটাও ওই একই নিয়মে, (যে নিয়মে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলেছে) এবং অনেক দিনই লক্ষ্য করেছি, আসলে উনি চান, আমি যেন পেছনের সীটে গিয়ে ব্যাস, যাতে বুড়ো সামনের দিকে বেশ হাত-পা খেলিয়ে বসতে পারেন, কিন্তু সে গুড়ে বালি। তা আমি কোনদিনই বসি না, জানি, ওঁর উপায় নেই আমাকে বলেন পেছনে গিয়ে বসতে, এবং বললে যে সে কথা থাকবে না, আর না থাকার দরুন যে অবস্থাটি। হবে, সেটার মুখেমুখি বুড়ো দাঁড়াতে চান না বলেই বলেন না। গাড়িটা বেরিয়ে যাবার আগেই, আমি একবার বাড়ির দিকে তাকিয়ে নিলাম, যদি চ্যাটার্জির তৃতীয় পক্ষটিকে দেখা যায়, কিন্তু কোথায়, একটা কাক-পক্ষীও দরজা-জানালায় নেই, কোনদিনই দেখতে পাইনি। কিন্তু আমার ধারণা আমিই দেখতে পাই না, ভেতর থেকে নিশ্চয়ই আমাকে দেখেছে, সে সব ফোকড়-ফাঁকড় আমার জানা নেই। গাড়ী চলেছে এবার কলকাতার, কী বল, হা-মুখে যেখানে সবকিছু খাওরা হয়, এবং গোটা দশেক পাকস্থলীতে তা গিয়ে পড়ে, হজম বা বদহজম যাই হোক, সেটা টের পাওয়া যায়।

    পেপার দেখেছেন নাকি?

    চ্যাটার্জি সামনের দিকে তাকিয়ে বললেন, আর আমার প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে উঠল, পেপারের প্রথম পাতায় নীতার উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা একটা ছবি। আমিও না তাকিয়েই বললাম, না। কেন, বিশেষ কোন খবর আছে নাকি স্যার?

    চ্যাটার্জি সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন আমার কথাটা (বুড়ো খচ্চর) কানেই যায়নি, কিংবা উনিই যেন গাড়িটা চালাচ্ছেন, এমনি একটা ভাব করে, গাড়িটা যখন পর পর দুটো লরীকে ওভারটেক করে গেল, তখন অনেকটা নিশ্চিত হয়ে, হাতের কাগজটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। যেন বলবার কষ্টটা উনি আর করতে পারছেন না, বা আমার সঙ্গে অত কথা বলার ইচ্ছে। ওর নেই, তাতে মান যেতে পারে। বললেন, দেখুন।

    প্রথম পাতাটাই আগে খুলে দেখলাম, এবং প্রথম ছবিটাই, এটা ঠিকই, একটি মেয়ের, আর শুয়েই আছে, কিন্তু নাচের একটা বিশেষ ভঙ্গিতে, যেন শুয়ে আছে, পিঠটাও খোলাই, বুকের একটা পাশও প্রায় দেখা যাচ্ছে, (বেশ ডবকা) উরুতের অনেকখানি খোলা, তবে একটা পা প্রায় ঘাড়ের কাছে উঠেছে, মুখে হাসি, নিচে ইংরেজীতে লেখা আছে, শীতের নতুন আগন্তুক, এ পাখির জন্ম স্পেনে, মা অস্ট্রেলিয়ান, বাপ ইটালিয়ান, পাখি নাচ শিখেছে প্যারিসে, জয় করেছে ইউরোপ ও আমেরিকা, নাম মিস মারিয়া গ্রেহাম, এবার আপনাদের অভিবাদন জানাচ্ছে। ওর বিশ্বাস কলকাতাবাসীকে ও খুশী করতে পারবে। তা পারবে, কতটা গা দেখাতে পারবে, তার ওপরে নির্ভর করছে, যদি পুরোটা পারে, (ইয়াহু!) তা হলে বিশ্বাস রাখাই উচিত, এবং কতটা শরীর দোলাতে পারবে, যার অর্থ, সবাই যাতে ওখান থেকেই কোন মেয়েমানুষের কাছে ছুটতে পারে।

    পাঁচের পাতা দেখুন।

    চ্যাটার্জি আবার বললেন, বুড়োর লক্ষ্য পড়েছে, আমি মিস মারিয়াকেই দেখছি, এবং পাতা ওলটালাম, পাঁছের পাতায় দেখলাম, ছবি আছে, তবে ফিতে কাটার ছবি, যা দেখবার কোন দরকারই নেই, তাও পুরুষ। কিন্তু কই, নীতার ছবি বা খবর তো কোথাও দেখছি না, এক পাশে একটি লোকের ছবি, সে কী সব বলেছে, তারই ফিরিস্তি, যাতে আমার কোন মাথাব্যথাই নেই। এবং তার মা থাকে, পাক-বর্ডার, চাল ডাল সরষের তেল…

    বুঝলেন কিছু?

    কোন, খবরটার কথা বলছেন, তাই বুবালাম না, অতএব কী বোঝার কথা বলছেন, জানি না, তাই আমি চ্যাটার্জির মুখের দিকে তাকালাম, আর (খচ্চর) বুড়ো সেই বাইরের দিকেই চোখ রেখেই কথা বলছেন। আমি বললাম, কোন, সংবাদটা ঠিক বুঝতে পারছি না।

    কেন, ওই তো, ও পাশে ছবি দিয়েছে, হরলাল ভট্টাচার্য, দেশপ্রেমিক, কীভাবে দেশের ইণ্ডাস্ট্রি বাড়ানো যাবে, হাতে-কলমে কাজ করে তিনি দেখাচ্ছেন, ইতিমধ্যেই একটা ছোটখাটো যন্ত্রপাতির কারখানা তৈরির ব্যাপারে উনি অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছেন, আট বিঘা জমির ওপরে কারখানার বিল্ডিং তৈরি হতে চলেছে…।

    ঢ্যাটার্জি বলে চলেছেন, আর আমিও তখন কাগজ দেখে চলেহি, এক পাশে যে ছবিটা রয়েছে, কী সব ফিরিস্তি দিরেছে বলে আমি মনে করেছিলাম, সেটাই আসলে খবরটা, যে কারণে তখন একবার আমার মনে হয়েছিল লোকটার মুখটা আমার যেন চেনা চেনা লাগছে, তবু মনোযোগ দেবার কোন কারণ ছিল না। রোজ একই মুখ খবরের কাগজে দেখা যায়, চেনা চেনা মনে হওয়াটা আশ্চর্যের কিছুই নয়। কিন্তু এই লোকটা, একটি ঘোরেল মালবিশেষ, আমি খুব ভালই চিনি একে, এর সঙ্গে মাসখানেক আগে আমাকে দেখা করতে যেতে হয়েছিল, একটা ইনভেসিটগেশনের জন্যে, এবং এই চোরের শিরোমণিটি, এই হরলাল ভট্টাচার্য, ইতিমধ্যেই কয়েক লক্ষ টাকা, আমাদের ইণ্ডাস্ট্রির বিভাগ থেকে খেয়ে (লোন যার নাম, ধার করা যাকে বলে, শালা, কার ঝাড়ে কে বাঁশ কাটে) বসে আছে, কারণ, সে একটা মস্তবড় কারখানা করবে, তার জন্যে তার টাকা দরকার, এবং বড়কর্তারা অনেকেই তার চেনা, সে নাকি একজন দেশপ্রেমিক, শুধু তাই নয়, আবার লাঞ্ছিত, অতএব তাকে বিশ্বাস করা হয়েছিল, লোন অনুমোদন করা হয়েছিল, কয়েক লক্ষ টাকা পেয়েছে, আরো পাবে, যদিচ দু বছরের মধ্যে, মালটি বোধহয় কেবল মাল নিয়েই থাকছে, কোন কাজই করেনি, অথচ, কাগজপত্রে, নথিপত্র যাকে বলে, মাপ, প্ল্যান, সব কিছুতে সব ঠিক আছে, আমার ওপরেই আমার অফিসের কর্তৃপক্ষ ভার দিয়েছিল, ব্যাপারটা জানবার জন্যে, লোকটার সঙ্গে দেখা করে সব বিষয় খোঁজ নেবার জন্যে কতখানি খাঁটি কাজ হয়েছে, না কি সবই ভুয়া, টাকাটা গাড়িতে-বাড়িতে-মদে-মাগীতেই গেল। ওই জাতীয় সব ব্যাপারেই যে টাকাটা গিয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই, কারণ ব্যক্তিটি খুব মারাত্মক, যথার্থ স্থানে তিন বিঘে জমি ছাড়া কিছুই হয়নি। এ সব আবার আমাদেরই দেখতে হয়, জানাতে হয়, তদন্ত করতে যেতে হয়, (অনেকটা চোরের সাক্ষী গাঁটকাটার মত, কে যে কাকে ধরে। এস বাবা, ভাণাভাগি করে নিয়ে নিই, কী দরকার ঝামেলার তদন্ত করে রিপোর্ট করতে হয়, শাস্তির ব্যবস্থা করতে হয়। যদিচ মূল কারণ হল, ইণ্ডাস্ট্রিতে উৎসাহ দেওয়া, ইণ্ডাস্ট্রি তৈরী করা, আর এমন জায়গায় তৈরী করা যেখানে মেলাই কলোনীটলোনী আছে, ছোকরারা সব বেকার বসে আছে, ছুঁড়িদের পেছনে লাগছে, আর দলাদলি মারামারি করছে, তাদের যাতে ওসব কারখানায় কাজকর্ম দিয়ে, দুটো খাইয়ে পরিয়ে ঠাণ্ডা করে রাখা যায়, কারণ পেটে ভাত না থাকলেই, যৌবন জলতরঙ্গ যেন বেশী বান ডেকে ওঠ) অর্থাৎ একদিকে ইণ্ডাস্ট্রি, আর একদিকে বেকারনাশ, যদিও বেকার নাশন করা ঠিক আমাদের সরাসরি দেখতে হয় না, তবু এটা একটা মস্ত বড় কথা। যদি কর্তৃপক্ষ বোঝে, হ্যাঁ এই লোকটিকে টাকা দিয়ে সাহায্য করলে, একটা কাজ হবে, তাহলে তাকে তার কাজের—যাকে বলে ব্যাপ্তি, তাই বুঝে, টাকা দেওয়া হয়। অনুমোদনটা অবিশ্যিই অনেক ওপরের কর্তাদের ব্যাপার, আমাদের মতামত পরামর্শও চাওয়া হয়, (আমি তো এখনো বালক, যাদের পরামর্শ চাওয়া হয়, তারা সব ঘাগী বয়স্ক লোক। আমার মতামতের তেমন দামই দেওয়া হয় না। কারণ অনুমোনের পরে যাকে বল সর্বাঙ্গীণ কুশল আমাদেরই দেখতে হয়, যে কারণে এই সব পার্টি, আমাদেরকে হাতে রাখতে চায়। আর এই সব ধারের টাকায় এমন মধু, হাতে পেলেই সব রাজা, যেন, এক একটা রাহাজানি বেশ তালের মাথাতেই করা গেছে, এবার দেখা যাক, কদ্দূর কী করা যায়, এখন তো রূপোট হোক। তা হোক এবার আমরা পেছনে লাগলাম, কই কী হচ্ছে মশাই এই বলে গোঁফে তা দিতে দিতে, বেড়ালের গোঁফ, তা দেবার উদ্দেশ্য সবাই জানে) অনেকটা যাকে বলে, ইঁদুরের পেছন পেছন ঘোরা। কই কী হচ্ছে মশাই এই চলল খালি, আর পার্টি বেগতিক দেখে, হাতে কিছু গুঁজে দেয়, যাতে কোন রিপোর্ট না হয়, এদিকে একটা মিছিমিছি খেলনা সাজাবার চেষ্টা হতে থাকে, কিন্তু কই, কী ইচ্ছে মশাই থামছে না, আবার কিছু গুঁজতে হয়, আর তাড়াতাড়ি, খেলনা কী ভাবে ভেঙে যাগ, অর্থাৎ আপ্রাণ চেষ্টা করেও লোকটা যেন কিছুতেই তার কাজে কৃতকার্য হতে পারল না, বেচারী অবিশ্যি কিছু ভুল ত্রুটিও করে ফেলেছে, খানিকটা অভিজ্ঞতার দরুন বেজার লস, দিনে এখন একেবারে সর্বশান্ত হয়ে গিয়েছে, এমনিভাবে সমস্ত ব্যাপারটা, যাকে বলে উদঘাটিত হয়। তেমন ফেরে পড়লে, মামলা মোকদ্দমা শান্তি সবই হয়ে যেতে পারে, সবই নির্ভর করে, লোকটা নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারল কি না, (প্রমাণ একটা চাই, হুঁ হুঁ বাবা, ছেলেখেলা নয়) না পারলে (মূর্খ! যাও মরো গে।) আমরা তো ধোঁয়া তুলশীপাতাটি হয়ে আছি, ঠাকুরের পায়ে নয়, গাছে। বাঁচবার চেষ্টা-চরিত্র যে করি না তা নয়। বেগতিক দেখলে দাও পুছিয়ে, তারপরে ভাজার মাছটি ধরে কবল নাড়াচাড়া, ওলটাতেও পারি না মাইরি। আমরা কী করব, কী-ই বা করার আছে, যা করার তাই করি। অবিশ্যি অনেক একগুঁয়ে মালও দেখেছি। একটা কিছু স্বার্থক দাঁড় না করিরে ছাড়ে না, তাদের আবার আমি বুঝতে পারি না কী ধাতু দিয়ে গড়া, যদিও জানি এ ধরণের মাল আরো মারাত্মক কারণ বুঝতে পেরেছে, একবার যদি কিছু একটা দাঁড় করাতে পারি, তাহলে, অনেক দূর যাওয়া যাবে, অনেক উঁচুতে উঠা যাবে, তারপর যত খুশি র‍্যালা কর, কেউ বলবার নেই। তখন সেও সেখানে রুবি দত্ত যাদের হাতে রাখতে চায়। তার মানে এই লোকটা জানে, ওপরে ওঠবার মইয়ের কোথার কোথায় পা রাখতে হবে, কোথায় পা দিলে পড়ে যেতে হবে না, যাকে বলে, টাকা খালি খাবে না, টাকা তৈরীও করবে, এবং টাকা যে তৈরী করতে পারবে, তার কাছে সবাই টিট, জগৎ বশ। এক মালকে জানি, তাকে আট লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল, সে এখন পাঁচ কোটি টাকার সম্পত্তি তৈরী করেছে। একটা কারখানার জমির জন্যেই নাকি সে তিনটে লোককে খুন করিয়েছিল, (শালা পায়ে পড়তে ইচ্ছে করে, মাইরি!) নিজের এক সত্‌ভাইকে ভিখিরি করে দিয়েছিল, (অনেকটা আমার বাবার মত, জগদীন্দ্রনাথ তাঁর ভাইয়েদের, মানে আমার কাকাদের পয়সা কিছু মেরেছিলেন, তবে ভিখিরী করতে পারেননি, উনি অবিশ্যি বলেন, সব বাজে কথা, পিতৃ সম্পত্তি সবাই সমান ভাগ করে নিয়েছি।) বোধহয় তার কিছু টাকা ছিল, এবং নিজের মেয়েকে পরের হাতে তুলে দিয়েছিল। পরের হাতে তুলে দেবার মানে অবিশ্যি আমি বুঝি না, কার না কার হাতে সে নিজেকে তুলে দিতই, এ ক্ষেত্রে হয়তো বাপের কথা অনুযায়ী অন্যান্যদের হাতে তুলে দিয়েছিল, তা সে বিয়ে করলেও তাই দিত, এখন লাভ হয়েছে এই, সে এখন যার হাতে খুশী নিজেকে তুলে দিতে পারে। দিয়েও থাকে। যেটা সে বিয়ে হলে পারত না, মনে মনেই রাখতে হত, এখন বরং তার আর সে সব ভয় নেই। সে সম্পত্তি ভোগ করছে, গাড়ি চেপে বন্ধুবান্ধবী নিয়ে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে, জানে বাপ তাকে কিছুই বলবে না, বলতে পারবে না। হয়তো পাঁচ কোটির আরো কোন রহস্য মেয়ের জানা আছে। বাপের হাত পা বাধা, একমাত্র খুন করে ফেলতে পারে। তারই বা দরকার কি, যা হচ্ছে হোক না, টাকা থাকলে আবার দুর্নাম কিসের। আগেকার লোকদের নাকি আবার টাকা পয়সা থাকলে, যেরকম মানমর্যাদা হত, তাতে, তাদের বাড়ির মেয়েরা বাইরে কিছু করে বেড়ালে ইজ্জত যেত। যাই হোক, এ রকম লোকও দেখা গিয়েছে, যে সত্যি একটা কিছু দাঁড় করিয়েছে, দশ লক্ষকে পাঁচ কোটিতে তুলেছে।

    এখন, এই যে হরলাল ভট্টাচার্য নামক লোকটি, (দু’দে মাল) এ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাভ করে কয়েক লক্ষ টাকা ইতিমধ্যেই নিয়েছে, এখন সেটা পরিষ্কারই বোঝা যাচ্ছে, কিছুই করেনি আর এ বিষয়ে তদন্ত করবার জন্যে আমাকেই পাঠানো হয়েছিল। লোকটা তো কলকাতাতেই বসে আছে, কই কী হচ্ছে মশাই বলে যতই খোঁচাচ্ছিলাম, ততই যেরকম তপড়াচ্ছিল, তাতে প্রায় বিশ্বাস করেই নিয়েছিলাম, বোধহয় আর একটা পাঁচ কোটির খেলা দেখাবে, কিন্তু গাড়ি অফিসপাড়ায় ঢুকল, মানুষের ভিড় বাড়ছে। তার কোন উদ্যোগ আয়োজন দেখছিলাম না। সবই প্রায় কাগজ পত্রেই চলছিল, যত রকমের ব্যয় ও লেনদেন, তার কোন, যাকে বলে প্রত্যক্ষ বা বাস্তব, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। একেবারে ওপরের কর্তাদের টনক না নড়লেও, বিভাগীয় কর্তাদের সৎ অফিসারদের এবং ডিরেক্টরদের টনক না নড়ে উপায় ছিল না, কেন না, পরে তারা বেকায়দায় পড়ে যাবে, তুমি তোমার কাজে গাফিলতি করেছ কেন? তুমি কেন নিয়ম অনুযায়ী, কতদূর কী হচ্ছে, রেগুলার ইনভেস্টিগেট করা, রিপোর্ট দেওয়া ইত্যাদি করনি তাকে এই বলে দায়ী করা হবে, এবং তার মাথায় শাস্তি নেমে আসবে। অতএব, আমাদের চুপ করে বসে থাকার উপায় ছিল না, শুধু যে কাজের দায়িত্বেই, তা নয়, ওসব দায়িত্ব-টায়িত্ব থোড়াই কেয়ার করি, যা দেখব বুঝব তাই রিপোর্ট করা একশন নেওয়া চালিয়ে তো যাবই, আরো বসে থাকার উপায় ছিল না, লোকটা কোন রকমে উপুড়হস্তই করছিল না, অর্থাৎ মালকড়িও ছাড়ছিল না কিছু। ওর যা হবার, তা তো হবেই, আমরা ফাঁকে পড়ি কেন, এই হল আমাদের কথা। অতএব কী হচ্ছে মশাই আর নয়। কদ্দূর কী করছেন, একটু দেখান এই নিয়মেই চলতে হচ্ছিল এবং দেখা যাচ্ছিল বেশ ডাঁটের সঙ্গে প্রায় হুটআউট করে দিচ্ছিল। আমার তো মনে হত, ও আমাকে প্রায় একটা কুকুরের বাচ্চার মত দেখত, কাগজপত্র দেখাত, যেন দয়া করে দেখাচ্ছে, এবং কতক্ষণে ওর ওখান থেকে চলে আসব, তাই ভাবত। শালুক চিনেছে…যাই হোক তার পরে হিসাবপত্রের ফিরিস্তি নিয়ে, কলকাতা থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে, একেবারে স্পটে, যাকে বলে অভিযান চালালাম, এবং সেখানে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম, ওখানে অনেক লোকই একটা কারখানা হবার আশায় অনেকদিন ধরে হা পিতাশ করে রয়েছে, এমন কি অনেকে ওখানকার কারখানার কাজ পাবে, এই সিদ্ধান্ত হওয়ায় অন্য জায়গায় তাদের কাজেই নেওয়া হয়নি, কারণ তারা যখনই বলেছে, তারা অমুক জায়গা থেকে এসেছে, তখনই তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, লোকাল ফ্যাক্টরীতেই (তা যবেই হোক, উল্লুক!) তাদের কাজ নিতে হবে। ওখানকার লোকেরাই আমাকে দেখাল, বিঘে তিনেকের মত জাগা কেনা হয়েছে, সেখানে মিনিমাম আট বিঘের কথা, (টাকা পেলে তাই কিনবে কথা ছিল) কিন্তু করোগেটের টিন একটি টালির ছোট ঘর, হাজার পাঁচেক ইঁট এক জায়গায় থাক দেওয়া যাতে অন্তত বোধহয় দুটো বর্ষাই গিয়েছে, এত শ্যাওলা পড়েছে, ব্যস, লোকটা নিজের টাকার হিসেব তো তানেক দূরের কথা, আমাদের কয়েক লক্ষ টাকার দশ হাজারের মালও সেখানে ছিল না। আরো জানা গিয়ে ছিল, ওখানে জমির মূল্য কম, সাত আটশো টাকা বিঘে, যেটা কম করে তিন চার হাজার টাকা করে দেখানো হয়েছে।

    যাই হোক, আমি তো সমস্ত রিপোর্ট ঠিক করে, আমার চীফ-এর পরামর্শে আর একবার লোকটার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, আর তা-ই বা কোথায়, নিশ্চয় সেটা কোন ফ্যামিলি কোয়ার্টার না, কতগুলো টিস্‌ঢিসে ছুঁড়ি, এদিকে এদিকে ঘুরছিল মাঠ ঘেঁষা বড় বাড়িটায়, যেটাকে বাগান বাড়ি বলেই বোধহয় ঠিক হয়। (জানা গিয়েছে, ব্যাপারটা ঠিক তাই, মহাশয় একটি হারেম নিয়েই আছেন। ওখানে, তাও, আবার কী সব আশ্রম-টাশ্রমের নাম দেওয়া আছে) কারণ ছুড়িগুলোর ভাবভঙ্গি দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল, খাটের গর্গ আর ঢলাঢনির ছা ওদের গায়ে। যাই হোক, এতে আমার পিতৃদবের আপাততঃ কিছুই যায় আসে না, কিন্তু মহাশয়ের দেখা যখন পেলাম, এবং তদন্তের মোটামুটি ফলটা যখন দুঃখের সঙ্গে, ইট ইজ রিগ্রেট টু……) তুলে ধরলাম, তখন দেখি, আমাকে তাড়া করে আসে। সত্যি বলতে কি, লোকটাকে তখন আমার সাহসী, যাকে বলে বাহাদুরের বাচ্চা বলে মনে হচ্ছিল, ফিরে এসে তখনি আমার চীফকে প্রথম শ্রেণীর অফিসার একজন, তাকে সবই বললাম। তারপরে, সবাই অর্থাৎ যে সব অফিসারেরা এ কেসটার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা সবাই স্থির করলেন, ডিটেল রিপোর্টটা আমি সাবমিট করে দেব খোদ কর্তার কাছে, এবং লোকাটার ব্যবহার ও অসততার (আমি লিখেছি, একটা রিয়্যাল সৎ ও নিষ্পাপ একজন অফিসার ওহ!) বিষয়ে সব জানিয়ে, তার শাস্তির জন্যেও মতামত জানাব। স্থির করা মাত্র আমি তাই করলাম, তদন্তকারী অফিসার হিসেবে, লোকটা যে টাকা নিয়ে প্রায় ছিনিমিনি খেলছে, (কেন রে খচ্চর, আমাদের কিছু ছাড়লেই পারতিস) কারণ বছর খানেকের ওপর টাকা ব্যয়ের কোন হিসেবই দেখতে পারছে না, এবং ভারপ্রাপ্ত অফিসারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, তাকে অকারণে নাজেহাল করা, সমস্ত বিষয়ে, যাকে বলে, নিখুঁত করে লিখে, বিরাট এক রিপোর্ট, সইসাবুদ করে, এবং রিপোর্টটা যে পেশ করেছি, সে জন্যে আর সুপিরিয়রদের মতামত নিয়েছি, এটা জানার জন্যে নিয়মমত, তাদের সই করিয়ে, খোদ কর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।

    পাঠিয়ে দিয়েছি, মানে মাসখানেক আগে দিয়েছিলাম ছিল, আজ দেখছি লোকটা হঠাৎ কোথায় কোথায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছে, দেশে দেশে শিল্প গড়তে হবে, দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ (তার মানে, আরো কয়েক লক্ষ টাকা বোধহয় চায়) হতে হবে, ইত্যাদি। ইতিমধ্যে গাড়ীটি অফিস বিল্ডিং-এর সীমানার মধ্যে ঢুকল, আমি কাগজটা ভাঁজ করে চ্যাটার্জির হাতে তুলে দিলাম। গাড়ী দাঁড়াল, নেমে গিয়ে দু জনেই লিফট-এ উঠলাম এবং লিফট-এ ঢ্যাটার্জি জিজ্ঞেস করলেন, কী রকম বুঝলেন ব্যাপারটা?

    ধরিবাজ ব্যাটা।

    চ্যাটার্জির চোখ সেই সামনের দিকে, যেন আমার ভাদ্রবউ, তাকালেই চিত্তির। লিফট থামল। বেরিয়ে গিয়ে ডিপার্টমেন্টের করিডর দিয়ে দুজনেই এগিয়ে চলমান, এবং অফিসের কেরানীকুল যে কেউ কেউ দেখছে সে বিষয়ে আনি সচেতন, শালা এল ঘণ্টা কুমার রূপ দেখাতে এল, মারব একদিন লেংগি শালাকে এসব কথাবার্তা যাকে বলে মুখরোচক আলোচনা যে হচ্ছে তাতেও কোন সন্দেহ নেই, এবং চ্যাটার্জির সম্পর্কে নিশ্চয়ই, শালা বুড়ো আজ একেবারে এলিয়ে পড়েছে রে, ছুঁড়ির রপোটে আমসত্ত্ব হয়ে গেছে এই রকম কথাবার্তা (হয়তো এ সবই, যাকে বলে অধস্তন কর্মচারীদের বিক্ষোভের রকমফের) চলছে।

    চ্যাটার্জি তার চেম্বারে ঢোকার আগে (সেই না তাকিয়েই) আবার বললেন, ধড়িবাজ তো বটেই কিন্তু মতলবটা ……।

    আমি বলে উঠলাম, রিপোর্টের ফলটা বোধ হয় ফলেছে, তাই একটা কোন ওয়ে আউট খুঁজছে।

    চ্যাটার্জি আমার দিকে তাকালেন, তার লোকটা চোখ এত বিচ্ছিরি সাদা, ঠিক মনে হল যেন, ধবধবে সাদা কৃমির মত, যেদিকে তাকিয়ে থাকতে আমার গায়ের মধ্যে কী রকম করে, যদিচ তার মধ্যে কোন তীক্ষ্ণতা নেই, অথচ যেন কী একটা আছে, যে কারণে আমি চুপ করলাম। চ্যাটার্জি নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন, একটা শব্দ করে গেলেন, হুম।

    হুম! ইডিয়েট! এই বলতে বলতে আমি আমার চেম্বারের দিকে এগিয়ে গেলাম এবং সত্যি আমার আবার নীতার কথা মনে পড়ল, আর কনুয়ের কাছে, বাঁ কনুয়ের কাছে হাত চলে গেল, যেতেই আমি প্রায় যেন, নীতার নরম গলাটা অনুভব করলাম। চেম্বারে ঢুকতে যাবার আগেই, বেয়ারা আমাকে সেলাম করল, রোজই করে, আর রোজই একবার ঘাড়টা যেভাবে কোয়ার্টার ইঞ্চি না নাড়ালে নয়, তাই নাড়িয়ে চেম্বারে ঢুকলাম, টেবিলে ঢাকা দেওয়া জল আগেই খেলাম, খেয়েই লেভেটরিতে, প্রায় মিনিটখানেক, বেরিয়েই, আগে এক কাপ কফির অর্ডার করলাম, তারপরে–নাঃ ফোন বেজে উঠল, (শালা) তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—হ্যালো–স্পীকিং ও গুডমর্নিং স্যার, (ব্লাডি চীফ!) ইয়েস স্যার, জাস্ট নাউ, (কি হল, ডাকে কেন?) ও, ইমিডিয়েটলি স্যার।

    কী হতে পারে? চীফ, মানে মিঃ বাগচি আমাদের সকলের মাথার ওপরে, অনেকটা যাকে বলে কাঁচাখেকো দেবতা, অফিসে আসতে না আসতেই ডাকছে কেন? লালবাজারের কেউ এসে ওখানে বসে আছে নাকি, কিছু প্রমাণপত্র হাতে নাতে পেয়ে গিয়েছে নাকি, এখান থেকেই একেবারে ধরে নিতে যাবে? চট করে লেভেটরিতে ঢুকে, আয়নায় একবার নিজেকে দেখে নিলাম, ঠোঁট চেপে, ভুরু কুঁচকে দেখলাম, একবার চোখ মারলাম, তারপর চালাও পানসি, দেখা যাক কী হয়। বেরিয়েই চীফ-এর দরজা ঠেলে, তবু একবার বললাম, মে আই—।

    ও ইয়েস, কাম কাম, সীট ডাউন প্লীজ।

    যাক লোকটা একলা, ঘরে আর কেউ নেই, এখন একমাত্র যদি ওঁকে লালবাজার থেকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে থাকে, সেটা আলাদা। কিন্তু চীফ যে এটা সেটা নিয়ে অকারণ দেরী করছেন, সেটা যেন আমার কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছে, যার থেকে মনে হয়, যা বলতে চান, সেটা বলতে কোথাও আটকাচ্ছে, যার জন্যে মনে হচ্ছে গুরুতর কিছু। বলে ফেললেই তো হয় বাবা, অত ভ্যানতারা কিসের, আমার তো সাফ জবাব কাছেই।

    হ্যাঁ, কথাটা হচ্ছে, হরলাল ভট্টাচার্যের কেসটা একটু অসুবিধে ফেলেছে।

    ও এতক্ষণে বোঝা গেল, চ্যাটার্জি কেন বারেবারেই বলেছিলেন, কিছু বুঝলেন? কিন্তু কি অসুবিধে ফেলেছে, সেটা না জানলে, কিছুই বলতে পারছে না, কারণ আমাদের কি অসুবিধায় পড়তে হতে পারে, আমি এখনো ঠিক আন্দাজ করতে পারছি না। যতদূর মনে আছে, হরলাল ভট্টাচার্যের ব্যাপারটা ঠিকমত ব্যবস্থা করতে পারলে, আমার এফিসিয়েন্সির জন্যে, এক কিছু জাম্প হতে পারে, অর্থাৎ চাকরীতে উন্নতি হতে পারে, এই রকম কথাবার্তা আমার সুপিরিয়ররা বলেছিলেন। কিন্তু চীফ-এর মুখটা তো দেখছি বাংলার পাঁচের মত দেখাচ্ছে, যেন মোটেই স্বস্তি নেই, সুখ নেই, খুব বেকায়দায় গড়ে গিয়েছেন। জানিনা শরীরের কোন অংশে ফোঁড়া হয়েছে কি না।

    বললাম, অসুবিধে? মানে আমার দিক থেকে কোনরকম—?

    উম্‌?

    চীফ যেন জিজ্ঞাসা করছেন, (আমাকে আবার জিজ্ঞেস করবার কী আছে, লোকটা ন্যাকা নাকি?) এমনি একটা শব্দ করে বললেন, উম্‌ না—মানে, তোমার রিপোর্টটা, যেটা তুমি হরলাল ভট্টাচার্যের নামে করেছ, এ্যাজ এ্যান ইনভেস্টিগেটর, সেটা উইদড্র করতে হবে।

    উইদড্র?

    হ্যাঁ, ফাইলটার খোদ কর্তার সই হয়ে বেরিয়ে এসেছে, তুমি জান, যে জন্যে তিনি এখন হাত কামড়াচ্ছেন।

    হাত কামড়াচ্ছেন?

    হ্যাঁ, কারণ এ দপ্তরে গতকালই ওটা প্রচার করা হয়ে গেছে, শুধু তাই নয়, দুর্নীতি বিরোধী সংঘের কাছে তার কপি চলে গেছে।

    সে তো আমি জানি, মানে, আমরা সবাই জানি।

    জানি, কিন্তু ভুল জানি।

    ভুল জানি?

    হ্যাঁ, ভুল, মানে ভুল, বুঝলে না, আমি তোমাকে ঠিক কী বলব–।

    লোকটা আমার কাছে প্রায় একটা খচ্চর হয়ে উঠেছে, সেটা তো বরাবরই, এখন অনেকটা অমায়িক খচ্চর হয়ে উঠেছে, যার কোন মতলর বোঝা কঠিন, অর্থাৎ নিশ্চয়ই বেকায়দায় একটা কিছু ঘটেছে, যেটা ঠিক লোকটার, যাকে বলে এই অত্যন্ত শান্তভাব, নীচু হয়ে যাওয়া গলার স্বরের সঙ্গে মিলছে না। তার থেকে অনেক কঠিন, খারাপ ভয়ংকর কিছু একটা ঘটেছে, অথচ সোটাকে চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন তো কিছুই নয়, প্রমাণ করা। কেসটা দপ্তরে প্রচার করা হয়েছে, সেটা সবাই জানে, দুর্নীতি বিরোধী সংঘের কাছে (কার দুর্নীতি কে সামলায়। ক্ষমতাবান হলে কোন নীতিই তাকে ছুঁতে পারে না।) কেসটা গিয়েছে, সেটাও সবাই জানে, কিন্তু খোদ কর্তা আঙুল কামড়াচ্ছেন, (সর্বনাশ আর দেখতে হবে না, একটা দারুন কিছু ঘটেছে নিশ্চয়।) এবং গোটা ব্যাপারটা ভুল, তার মানে কী? যেন ভাবটা হচ্ছে, হাত থেকে তীর, তীর আর এখন কোথায়, বুলেট ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে, এবং সেটা ভুল হয়েছে।

    চীফ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, কাল রাত্রি দশটা নাগাদ কোথায় ছিলে?

    এই মেরেছে, আবার এ কথা জিজ্ঞেস করছে কেন? নিশ্চই এ ভুলের সঙ্গে গতকাল রাত্রের কোন যোগাযোগ নেই। ফেরেববাজী হচ্ছে না কি আমার সঙ্গে?

    বললাম, একটু আড্ডা দিতে গেছলাম।

    বাড়িতে তোমাকে কিছু কেউ বলেননি?

    বাড়িতে? লোকটা যেন সাবলাইম এর হয়ে উঠছে, মনে হচ্ছে, কী বলতে চা, আবার বাড়ির কথা কেন? নিশ্চয়ই কাল রাত্রের কথা বাড়ির কেউ জানে না, এবং এই মুহূর্তে বাড়ির সকলের মুখগুলো আমি একবার মনে করার চেষ্টা করলাম, খুঁজে দেখতে চাইলাম, মুখগুলোতে এমন কোন ভাব ছিল কি না, যেন সবাই একটা কিছু জানে আমার সম্পর্কে, একটা কিছু বলতে চায় অথচ বলতে পারছে না। কিন্তু না, সেরকম কিছু তো আমার মনে পড়ছে না।

    বললাম, কই, না তো?

    আমি তোমাকে বাড়িতে কাল রাত্রে ফোন করেছিলাম।

    ও, তাই নাকি, একসট্রিমলি–

    কিন্তু না পাওয়াতে আজ সকালের অপেক্ষাতেই ছিলাম। আজ সকালে পেপার দেখেছ নিশ্চয়?

    হ্যাঁ, হরলাল ভট্টাচার্যের ইণ্ডাস্ট্রর ওপরে লেকচার–

    হ্যাঁ, খুব জ্ঞানী লোক, বুঝলে, হি ইজ এ ট্যালেণ্টেড ম্যান, জীনিয়স, এ প্যাট্রিয়ট, এ সাফারার।

    চীফের বোধহয় গলাই ভিজে গেল না কি, কথা আটকে গেল, অথচ যাকে আমি একটা নিকৃষ্ট শুয়োর বলেই জানি, মানে যাকে বলে পরিচয় পেয়েছি, এবং আমার সঙ্গে সকালেই এমন কি এই সাবলাইম খচ্চর ব্যক্তিটিও একমত ছিল, সে হঠাৎ এসব কথা আমাকে বলছ কেন? নিশ্চয় আমার সঙ্গে ইরারকি করছে না যে, একটা চোরকে ট্যালেণ্টেড, একটা শয়তানকে জীনিয়স—অবিশ্যি আমিও একটি রামউল্লুক নিশ্চয়ই, তা নইলে চোরকে শয়তানকে, ট্যালেণ্টেড জীনিয়স বলা যাবে না, এসব ভাবছি কেন। কত রামগাড়লই ওসব, কী বলে, ‘বিসেসনে ভূসিত’ হচ্ছে, তা কি আর দেখতে পাচ্ছি না।

    চীফ আবার মুখ খুলল, এখন কথা হচ্ছে, হরলাল বাবুর সম্পর্কে আমাদের রিপোর্টটা, মানে তোমার ইনভেস্টিগেশনের রিপোর্টটা, যাকে বলে, ভুল হয়েছে, হি ইজ এ গ্রেট ম্যান, (বাস্টার্ড আমার উক্তি।) তার সম্পর্কে, আর একটু কীন্‌ মানে, কানসা্স্‌— অর্থাৎ এলার্ট হওয়া উচিত ছিল, মানে আমাদের সকলেরই উচিত ছিল। প্রচার করা না হয়ে গেল, ওটা তো তখনই চেপে দেওয়া যেত, কোন ঝামেলাই ছিল না, এখন, আর একটা রিপোর্ট লিখে, মানে ফারদার ইনভেস্টিগেশনে তুমি যেন আসল খবরটা জানলে, এভাবেই হরলালবাবুর উপর থেকে চার্জগুলো তুলে নিতে হবে, মানে উইদড্র, যাকে বলে, আমার কথাটা।–

    টেলিফোনটা বেজে উঁচুল, চীফ ধরলেন, ইয়ে স্পীকিং, ইয়েস ইয়েস, দ্যাটস অল রাইট, হি উইল সী ইউ ইমিডিটেলি।

    রিসিভারটা রেখে তিনি ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন, তোমার চেম্বারে কে একজন জরুরী কারণে দেখা করার জন্য বসে আছে। ওটা সেরেই, তুমি আবার আমার এখানে চলে এস, কী ভাবে উইদড্র করা যায় সেটা আলোচনা করা যাবে, আই লাইক টু হেলপ ইউ, মিঃ চ্যাটার্জির সঙ্গে আমি কথা বলছি, মিঃ ঘোষকেও ডাকছি।

    আমি উঠলাম, এবং সনস্ত ব্যাপারটাকে আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম, যেটা আমার মাথায় এখনো পুরোপুরি ঢুকবে ঢুকবে করেও ঢুকতে চাইছে না, যদিচ, (আমি যেন নিজের সঙ্গে চালাকি করছি।) ব্যাপারটা তো জলের মতই পরিষ্কার বলে বোধ হচ্ছে। হরলাল সম্পর্কে যে রিপোর্টটা করা হয়েছে, অর্থাৎ যা আমি করে ফেলেছি, (বমি করার মত তিক্তভাবেই আমি সব উগরে দিরেছি।) তা আবার আমাকে অমৃতের মত চেটে চেটে গিলতে হবে। এবং—

    একটা কথা–।

    দরজার কাছ থেকে ফিরে তাকালাম। চীফ বললেন, কাল পরশুর মধ্যে কোন বিজনেস করনি তো?

    বিজনেস, অর্থাৎ ঘুষ খাওয়ার ওটাই আমাদের কোড ল্যাংগুয়েজ। করিনি বলেই যতদূর মনে হল, অবিশ্যি কাল পরশুর সব কথা ভেবে এখন সেটা বের করতে গেলে আমার অনেক সময় লেগে যাবে। নীতার কথাটা এখনো আমার মনে আছে, মনে হয় এটা ভুলতে দু-একদিন সময় লাগবে, বাদবাকী অনেক কথাই এখন আর মানে নেই।

    বললাম, (যেন একটু লজ্জাই পেয়েছি, এমনিভাবে; এখন আমার নিজেকেই সাবলাইম বলে মনে হচ্ছে।) না তো।

    আচ্ছা ঠিক আছে, ঘুরে এস।

    বেরিয়ে এলাম, কিন্তু আবার এ কথা জিজ্ঞেস করল কেন বুঝতে পারলাম না। এখন কি আমাকে ভর দেখাবার চেষ্টা হচ্ছে, অর্থাৎ ভাবিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা বুঝতে পারছি না, কারণ বিজনেস, যদি কিছু হত, তাহলে চীও নিশ্চয় জানতে পারত, তাকে ফাঁকি দিলে মালকড়ি গেলা অসম্ভব। অবিশ্যি কোন সময়েই যে, (আমার চেম্বারে ঢুকলাম, একটা লোক বসে আছে। হাত তুলে নমস্কার করল, আমিও জবাব দিলাম হার তুলে।) তা গিলিনি, এমন বলা যাবে না, তবে খুবই সাবধানে, যা কখনই এখানে খবর আসবে না, যেহেতু জানি, তা হলে ঘরের শত্রুই বিভীষণ হয়ে উঠবে।

    কিন্তু শীত আর আমার লাগছে না, তাই কোটটা খুলে ব্রাকেটে ঝুলিয়ে টাই-টা একটু টেনে দিলাম, এবার অপেক্ষমান লোকটার দিকে ফিরে তাকালাম, যার মাথায় একটি বেশ বড় টাক, গোল মুখখানি বেশ ফু্লো ফুলো, অনেকটা খোকা খোকা ভাব, কালো চোখ দুটি বেশ চকচকে, (পাকস্থলীটা বোধহয় তাজা আছে এখানো, কি খেয়ে!) যাকে বলে এক একটা গাল ফুলো গম্ভীর মুখে বাচ্চা যেমন থাকে, মুখে বিশেষ ভাব খেলে না, কিন্তু চকচকে চোখ দিয়ে সবই কৌতূহলী হয়ে দ্যাখে, সেইরকম। নিরীহ গোবেচারা গোছেরই, গরম কাপড়ের সার্টটা গলা অবধি বন্ধ, কিন্তু টাই বাঁধেনি, কোট নেই, পেটের অনেকখানি উঁচুতে, বেলট দিয়ে ভুরি বাঁধবার চেষ্টা হয়েছে। আমি, স্বভাবতই যা করে থাকি, ভুরু টান টান করলাম, মুখে একটি গম্ভীর অমায়িকতা টেনে আনলাম, টেবিলের ওপর থেকে একটা ফাইল ধরে কাছে টেনে নিলাম, (ব্যস্ত তো।) এবং তার ফিতে (লাল নয়) খুলতে খুলতে বললাম, বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি।

    দুনিয়ার জন্য সব কিছু করবার জন্যই যে এখানে সিদ্ধিদাতা গণেশ হয়ে বসে আছি, আর লোকাটি নিশ্চয়ই কোনরকম কাজের জন্যেই এসেছে, যা এ ডিপার্টমেন্টের মধ্যে পড়ে।

    লোকটা বলল, আপনি নিশ্চয়ই খুব ব্যস্ত, কিন্তু আমার না এসে উপার ছিল না।

    এ আবার অন্যরকম গাওনা ধরে দেখছি। আমি লাস্ট কি না, সেটা আমার কাছেই থাক, তোমার কি দরকার সেটা বলে এখন কাটো দিকিনি চাঁদ। কিন্তু লোকটার গলা অদ্ভুত মোটা, কার যেন ওথেলোর পার্ট এরকম গলায় শুনেছিলাম, মনে হচ্ছে। তবু বলতে হয়, তাই নাকি কি ব্যাপার বলুন।

    লোকটা সেইরকম, অনেকটা যেন নরকের সিপাইদের মতই, সেইরকম মোটা গলায় বলল, আমি আসছি, আপনার গিয়ে, ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ থেকে একটা ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব এসেছে আমার ওপর, তাই আসতে হল।

    ওরে শালা, এই কথাটাই প্রথম আমার মনে হল, এবং সঙ্গে সঙ্গে সাবধান। এই বলে আমি নিজেকে হুঁশিয়ার করে দিলাম, আর তৎক্ষণাৎ মুখের ভাব, যেটা এখন আমার স্বাভাবিকভাবে রক্ষা করা উচিত, অর্থাৎ অফিসারদের মতই, নিতান্ত সামান্য একটু কৌতূহল ছাড়া আর কিছুই না, এমনিভাবে, যাকে বলে ঈষৎ ভুরু কুঁচকে তাকালাম। চীফ যে কেন কাল-পরশু কোন বিজনেস হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করছিলেন, এখন বুঝতে পারলাম, যার মানে, আমার ঘরে যে ইনটেলিজেন্সের লোক বসে আছে। সেটা উনি টেলিফোনেই খবর পেয়েছিলেন। আমি লোকটার দিকে আবার ভাল করে তাকালাম, চেহারা দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই, মালের আগমন কোথা থেকে।

    অনেকটা অবাক হবার মতই জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার বলুন তো, আমাদের অফিসের ব্যাপারে–

    না, না, লোকটা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, (আরে সে তো আমিও জানি তুমি আর কি বলবে।) আপনাদের অফিসের ব্যাপার কিছু না, আমি আপনাদের কাছেই এসেছি কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে একটু সময় আমাকে দয়া করে দিতে হবে।

    দয়া করে? তুম্‌বো মুখখানি দেখে, এমনি কিছু বোঝা না গেলেও, মাল বেশ ফেরেরবাজ আছে, বোঝা যাচ্ছে, বলছে দয়া করে। তুমি ঘুঘু ধরার জন্যে ফাঁদ পাততে এসেছ, তবুও মুখের বুলিটি ছাড়নি।

    বললাম, কিন্তু সেটা না শুনলে তো কিছুই বলতে পারছি না, আমার আবার আজকেই একটা জরুরী কাজ পড়ে গেছে, সেটি ইমিডিয়েটলি সুপিরিরদের সঙ্গে বসে ফয়সালা করে ফেলতে হবে। (একটু হাসলাম) মানে আমিও একটা ইনভেসিটগেশন নিয়েই গোলমালে পড়ে গেছি। তবু আপনার কথা আমি নিশ্চয়ই শুনব, য়ামাকেই যখন আপনার জিজ্ঞাসাবাদের দরকার।

    আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনাকেই মানে আপনার কাজের ক্ষতি করে …

    লোকটা এসব অমায়িক কথাবার্তা বলে যেতে লাগল, আমি ভাবতে লাগলাম ব্যাপাররটা কতদূর গড়িয়েছে। অর্থাৎ আমার দিকে কতখানি গড়িয়েছে, সেটা আমার জানা দরকার। আন্দাজী ঢিল মারতে এসেছে, নাকি ডেফিনিট কিছু পেয়েছে।

    বললাম, ঠিক আছে, আপনি বলুন, বিষয়টা কী শুনি।

    বিষয়টা স্যার এক খুন।

    খুন? (সে তো জানিই, তবু আমাকেই তো সব থেকে বেশী অবাক হতে হবে।) কে, কোথায়?

    সেন্ট্রাল ক্যালকাটা,–নং বাড়ির সাত নম্বর এ্যাপার্টমেণ্টে–।

    লোকটাকে কথা শেষ করতে দিলাম না, (হওয়া উচিত আর কী) বলে উঠলাম, বলেন কী ওটা আপনি যা বলছেন, নীতার এ্যাপার্টমেণ্ট।

    নীতা রায়।

    হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন না, সে আমার, কী বলব আই মীন–

    প্রেমিকা, সেটাই বলা দরকার, কারণ (সে যদি মরেই থাকে আহা!) আমি তো তাকে খুন করতে পারি না।

    লোকটা গম্ভীর হয়ে, কী জানি ব্যথিত হয়েই কিনা, মুখটা নামিয়ে রাখল একটু এবং সেভাবেই বলল, জানি ওর সঙ্গে আপনার খুবই হৃদ্যতা ছিল, উনি কাল রাত্রে ওর ঘরে খুন হয়েছেন।

    খুন? নীতা খুন?

    আমি প্রায় চীৎকার করেই উঠলাম, (কী জানি লোকটা এর পরে বলবে কি না, আর সেটা আপনিই করেছেন।) ঠিক যেভাবে আচমকা ভয়ে দুঃখে অবাক হয়ে, যাকে বলে, আর্তনাদ করে উঠতে হয়, তাই করে উঠলাম, হাউ, হু–হু ডান ইট?

    ইনভেস্টিগেটর ওর ফুলো ফুলো মুখে একরকমের সমবেদনা বা সান্ত্বনার হাসি ফুটিয়ে তুলতে চাইল, বলল, সেটা জানবার জন্যেই আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।

    আমি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলাম, কিন্তু আমি তো কিছুই জানি না। মশাই।

    যা জানেন, তা বললেই হবে, অর্থাৎ (লোকটা এখন ঠিক গিরগিটির মত আমার দিকে তাকিয়ে আছে।) মিস সম্পর্কে যা জানেন, তা বললেই হবে, যাতে কিছুটা সাহায্য হয়।

    নিশ্চয়, কী ভাবে সাহায্য করতে পারি বলুন, এর সম্পর্কে, আমি যা যা জানি, সবই আমি বলব।

    আচ্ছা, মিস, রায়ের সঙ্গে আপনার শেষ কবে দেখা হরেছে, মনে করতে পারেন কি একটু?

    তা হবে দিন দশ বারো, কিন্তু একটা কথা, কী ভাবে ও খুন হয়েছে?

    দম বন্ধ হয়ে, মানে, এখনো পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট এসে পৌঁছায়নি, তবে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, দম বন্ধ করেই মারা হয়েছে।

    আমি নিজেই একটা কষ্টের ভাব করে, যেন সেই বিভীষিকা দেখছি, এমনিভাবে চুপ করে (কথা বলতে পারছি না আহা।) রইলাম, যদিচ, আমার চোখের সামনে গত রাত্রের, ঠিক দম বন্ধ হওয়ার মুহূর্তটাই ভেসে উঠল এবং তৎক্ষনাৎ আমার তলপেটের খামচানো জায়গাটা সুড়সুড়িয়ে উঠল। নিশ্চয়ই আমার ও জায়গাটা দেখতে চাইবে না সেখানে এখনো দাগ রয়েছে।

    আপনার সঙ্গে কি কাল ওঁর দেখা হয়েছিল?

    দেখেছ, জিজ্ঞেস করার ভঙ্গিটা দেখেছ লোকটার, (খচ্চর!) যখন আমি বলছি, দশ বারো দিন আগে দেখা হয়েছিল, তখন আবার কাল দেখা হয়েছিল কিনা জিজ্ঞেস করবার মানে কী? দেখে থাকলে বলে দাও না বাপু। রেড হ্যাণ্ড হলে স্বীকার করে ফেলব, এ আর বেশী কথা কী।

    বললাম, তাহলে তো আপনাকে বলতামই।

    লোকটা যেন বিব্রত হল, বলল, না, তবু একবার জিজ্ঞেস করা কর্তব্য। আচ্ছা আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়?

    আমার–?

    হ্যাঁ, মানে আপনার সঙ্গে তো ওঁর খুবই, যাকে বলে ইয়ে ছিল, (পীরিত ছিল, বল না বাবা।) আপনাকে হয়তো কখনো কিছু বলে থাকতে পারেন।

    কী বলে থাকতে পারে?

    এই ধরুন, বিশেষ লোক ওঁর প্রতি খারাপ ব্যবহার করে, খুনের ভয়-টয় দেখায়।

    না, সেরকম কখনো কিছু বলেনি তো। আর আমি তো কাউকে খুন করবার মত ভাবতে পারছি না।

    ওঁর কোন শত্রু ছিল বলে জানতে?

    না, অন্তত আমার কাউকে কখনো কিছু মনে হয়নি। জানি না, ভেতরে ভেতরে যদি কিছু থাকে।

    লোকটা চুপ করে, খানিকক্ষণ পা দোলাল, মোটা আঙুল দিয়ে টেবিল ঠুকতে লাগল, যদিও মুখ দেখে কিছুই বোঝাবার উপায় নাই, এর পরে কী জিজ্ঞেস করতে পারে। মুখ না তুলেই, যেন অনেকটা সঙ্কোচ করেই, লোকটা বলল, কিছু মনে করবেন না, আপনার কি মানে হয়, মিস রায় খুব ফেয়ার লাইফ লীড করতেন? মানে, আপনার সঙ্গে তো ওঁর খুবই ইয়ে ছিল, তবু মানে আপনার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বলে, কিছু জানতেন?

    প্রতিদ্বন্দ্বী, নীতার পুরুষ বন্ধুরা কেউ আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল নাকি? আমরা কি কেউ কারুর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীতা বলতে যা বোঝার, তার কি কোন অস্তিত্ব আজকাল আছে? আমি তো জানি না। সবটাই নীতার ইচ্ছা, মনে ধরে গেলেই হল, যেমন আমি যখন কোন মেয়ের কাছে যাই, তখন কি আমি ভাবি সে নীতার প্রতিদ্বন্দ্বিনী? সে নীতার প্রতিদ্বন্দ্বিনী হতে যাবে কেন, সে তখন শুধু আমারই ইচ্ছাকে মেটাবার জন্যে থাকে, নীতার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই।

    বললাম, না, ঠিক সেরকম তো কাউকে মনে হয়নি।

    সে রকম কিছু থাকাটা কি খুব অসম্ভব ছিল মনে হয়?

    এর কোন জবাব কি দিতে পারলাম না।

    আচ্ছা, ওঁর ওখানে কাদের যাতায়াত ছিল, এরকম কিছু নাম-ধাম আপনি বলতে পারেন?

    তা পারি।

    আমি যতগুলো নাম জানতাম, সবগুলোই বলে দিলাম, সবাই আগে জবাবদিহি করে মরুক তো। অনেকেই তো ওই ঘর ওই খাটে র‍্যালা করে গিয়েছে, দেখা যাক না, তাদের মধ্যে কাউকে ফাঁসানো যায় কি না। লোকটা নামগুলো সব লিখে নিল, কিন্তু লোকটা আমার সম্পর্কে কতটা কী জেনেছে, কিছুই বোঝা গেল না, এবং আমিই জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম লোক কি না, আর তা যদি হয়, তাহলে, কিছু একটা জেনে শুনেই এসেছে কি না, কে জানে।

    বললাম, আচ্ছা, ব্যাপারটা কী হয়েছে না হয়েছে, একটু জানতে পারি কী?

    নিশ্চয়ই। কাল রাত বারোটার সময় পুলিশের বছে টেলিফোনে খবর দেওয়া হয়, মিসি রায় তাঁর ঘরে শুয়ে আছে, ভিতর থেকে দরজা বন্ধ, ঘরে বাতি জ্বলছে, কিন্তু হাজার ডাকাডাকিতে তিনি দরজা খুলছেন, না। বাড়ির মালিক জানান, ব্যাপারটা তার কাছে সন্দেহজনক মনে হচ্ছে, অতএব (এসব তো আমার জানাই ছিল।) পুলিশকে না জানিয়ে তিনি পারছেন না। মেড সারভেণ্ট বাইরে থেকে এসে অপেক্ষা করছিল, তাহাকে অবিশ্যি আমরা এ্যারেস্ট করেছি–।

    চিত্রাকে?

    নামটা এবার আমার স্পষ্টই মনে পড়ে গেল। লোকটা বলল, হ্যাঁ, কারণ মেয়েটার প্রকৃতি ভাল না, একবার একটা হোটেল থেকে প্রসটিটিউশনের দায়ে ধরা পড়েছিল, যদিও রেহাই পেয়ে যার, তবু সন্দেহজনক চরিত্র। তার ঘরের দরজাটা যেহেতু বাইরে থেকে টেনে দিলেই লক্ হয়ে যায়, সেইহেতু ঝি-টায়ে সন্দেহ না করার কোন কারণ নেই, অবকোর্স এর পক্ষে খুন করবার কোন মোটিভ আমরা পাইনি। বিকজ —ঘরের মল্যবান জিনিসপত্র কিছুই খোয়া যায়নি, যেটা ওর পক্ষে সম্ভব ছিল, অবিশ্যি এটাও ওবাড়ির সবাই বলছে, ঝিটা নাকি মিস রায়ের খুবই বিশ্বস্ত ছিল। ওর এনতেজারিতে সব কিছুই থাকত, তবু একে এ্যারেস্ট না করে উপায় ছিল না, বিশেষ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। পাড়াগাঁয়ের আশিক্ষিত মেয়ে তো, হঠাৎ ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে পারে, সেজন্যই ওকে আটকানো হয়েছে। যাই হোক, পুলিশ মোটামুটি খুন সন্দেহ করে প্রস্তুত হয়েই যায়, মেকানিককে দিয়ে দরজা খুলিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখা শী ইজ ডেড, সম্ভবত গলা টিপেই মারা হয়েছে, বিকেলেই সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে। আপনার খরবটা ঝিয়ের কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি…।

    কী বলতে চায় লোকট, আমার কী খবর পেয়েছে? চিত্রা নিশ্চয় আমাকে কাল দেখতে পায়নি? তাও জানি না অবিশ্যি, বোধহয় আসার সময় রাস্তায় কোথাও ছিল কিনা। বললাম, কী খবর?

    আপনারর, মানে, আপনাদের, যারা আপনারা মিস রায়ের ওখানে যাওয়া-আসা করতেন। আপনি যাদের নাম বললেন, প্রায় সব নামই ঝি পুলিশকে জানিয়েছে, তাতেই আপনার কাছে আসতে পারলাম।

    আপনারা কাকে সন্দেহ করছেন, অর্থাৎ কাউকে সেরকম কিছু মনে হচ্ছে কি না।

    আমি এ পর্যন্ত আপনাকে নিয়ে তিনজনের সঙ্গে দেখা করেছি, সন্দেহ কাউকেই কিছুই করিনি। তবে কী জানেন তো, কামাদের কাজটাই স্যার এমন, সবাইকেই সন্দেহ করতে হয় আমাদের, আবার কাউকেই ঠিক সন্দেহ করতে পারি না।

    খুনীর কোন চিহ্নও কি পাওয়া যায়নি?

    এ বিষয়ে আপনাকে কিছু বলতে পারলাম না, কিন্তু আপনি এই অল্প সময়েই মেলা সিগারেট খেলেন, চেন স্মোকার যাকে বলে।

    লোকটা তুম্‌বো মুখে হাসল, যদিও হাসিটা ঠিক হাসি বলে মনে হয় না, মাংসের তাল একটু, যাকে বলে, বিস্ফারিত হল মাত্র এবং এই সিগারেট খাওয়ার দ্বারা কী বলতে চাইছে সেটা বুঝতে পারলাম না। লোকটা কি ভাবছে, আমি নার্ভাস হয়ে গড়েছি বলে, এত ঘন ঘন সিগারেট খাচ্ছি? তা ছাড়া, গতকাল রাত্রে নীতার ঘরে যে সিগারেট আমি খেয়েছি, এ সে সিগারেট নয়, অতএব ব্র্যাণ্ড দেখে কিছু বোঝা যাবে না, সে গুড়ে বালি।

    বললাম, তা যা শোনালেন, তাতে একটু বেশী সিগারেট খাব, এই আর—।

    টেলিফোন বেজে উঠল, রিসিভার তুললাম, চীফের গলা শোনা গেল, লোকাটা গেছে? এদিকে তো আর দেরী করা যায় না, ইমিডিয়েটলি, একটা পালটা রিপোর্ট তোমাকে তৈরী করে ফেলতে হবে।

    বললাম, হ্যাঁ, আমার মনে হচ্ছে স্যার, উনি এবার উঠবেন, উঠলেই আমি যাচ্ছি।

    রিসিভার নামিয়ে রাখলান এবং লোকটার মুখের দিকে তাকালাম, দেখলাম দুমবার পাছার মত একতাল মাংসের মধ্যে দুটো চোখ, কী বলব, আপাতদৃষ্টিতে খুবই নিরীহ, সেই গাল ফুলা খোকনের মত, যার চোখের মণিগুলো অদ্ভুত ঢকচকে, যেদিকে তাকায়, যা দ্যাখে, তার মধ্যেই যেন তলা অবধি ডুবে যায়, সবই দেখতে পায়, অথচ ঠিক শেয়ালের মত শেয়ানা ধূর্ত নয়, সাপ —অর্থাৎ তীক্ষ্ণ নয় যে অন্ধকারের মধ্যে খুঁজে দেখছে, তবু যেন সবই তার চোখে ধরা পড়ে যাচ্ছে। এখন এ লোকটাকে আমার ডিভাইন খচ্চর বলে মনে হচ্ছে, যাদের অনেকটা কী বলা যায়, যেন একজন পূণ্যবান ধর্মযাজক, ঈশ্বরের উপাসক, জয়গুরু বাবা, ওয়াঁকেই প্রাণটি সঁপে দিয়ে বসে আছি এমনি একটি ভাব, কিন্তু একটি আধলা দর্শনী চোখ ফাঁকি পড়ার উপায় নেই, একটিও ডবকা ছুঁড়ি শিষ্যার, যাকে বলে দেহখানি পবিত্র ভাবে, নিষ্কামভারে চেটে নেওয়া বাদ যাচ্ছে না, একটিও শাঁসালো মক্কেল নজর এড়িয়ে যেতে পারে না, এরকম লোকটাকে ডিভাইন খচ্চর বলা যায় বোধহয়। তাই এবার লোকটির প্রতি আমার ঘৃণা হতে লাগল, রাগ হাতে লাগল।

    লোকটা বলল, আপনার মূল্যবান সময় অনেক নষ্ট করে দিয়েছি, কিন্তু কী করব বলুন। কাজের দায়িত্ব, না এসে উপায় নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত এর একটা কিনারা না করতে পারছি, মানে খুনীকে না বের করতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত হয়তো আপনাকে আরো কয়েকবার বিরক্ত করতে হতে পারে। আর জানেন তো কাগজওলারা কী রকম পেছনে লাগে। যতই দেরী হবে, ততই অযোগ্য বলে শহরে মাত করতে থাকবে, অথচ এমন নয় যে খুনী এসে আমাদের কাছে নিজেদের থেকে ধরা দেবে। তা হলে তো সব গোল মিটেই যেত। আচ্ছ এখন উঠি—

    কিন্তু ডিভাইনটি উঠল না, বরং এই জঘন্য খোকন নিরীহ চোখে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, আপনি গতকাল রাত্রে কোথায় ছিলেন?

    আমি প্রায় একটা ফাইলের ফিতে খোলারই উদ্যোগ করেছিলাম, এবং যে মুহূর্তে বুঝলাম, যাজকের মত নিরীহ ফাঁদ পাতনেওয়ালাটির আসল কথাই এবার বোধহয় শুরু হতে যাচ্ছে, তখন সোজা কথা বলতে আমার আর ইচ্ছা করল না, দেখতে ইচ্ছা করল, বিরক্তি দেখিয়ে লোকটাকে এখনকার মত সরানো যায় কিনা, কারণ নতুন রিপোর্ট তৈরী করার জন্যে কোন তাড়া আমি এখনো ঠিক বোধ করছি না, কিন্তু এই কী বলে, তদন্তকারীকে বলবার কথাগুলো একটু ভেবে দিতে চাই। কী বলছি না বলছি, সেগুলো এবং ভবিষ্যতে আর কী বলা যায়, তা ভাববার সময় না পেলে, মুখ খুলতে পারছি না। বললাম কলকাতায় আমাদের একটা বাড়ি আছে।

    লোকটা তাড়াতাড়ি ঘাড় নেড়ে, অনেকটা যেন ভুলই হয়েছে, এমনিভাসে হাসি হাসি ভাব করে, (জানি না ওটা হাসি কি না) বলল, কথাটা বোধহয় ঠিক জিজ্ঞেস করা হল না। আমি জানতে চাইছিলাম, কাল সন্ধ্যাবেলা থেকে রাত্রি এগারোটা নাগাদ আপনি কোথায় ছিলেন?

    রাত্রি এগারোটার সময় রাস্তায়, সন্ধ্যাবেলাও রাস্তায়।

    লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন খোকন কিছুই বুঝতে পারল না, এবং বললও তাই, কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না।

    আমার অনেক কাজ আছে। জানার কথাও আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। (উল্লুক।)

    খোকন তেমনি তাকিয়ে রইল, নিষ্পাপ ধর্মযাজকটি, ভগবানের কাছে মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে বসে আছে যেন। বলল, ডাক্তারের অভিমত হচ্ছে, সন্ধ্যে থেকে রাত এগারটার মধ্যে মিস রায় বোধহয় খুন হয়েছেন, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, সে সময়টা আপনি কোথায় ছিলেন।

    কেন জিজ্ঞেস করছেন?

    যাতে জানতে পারি, আপনি ওসময়ে মিস রায়ের এ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন কি ছিলেন না।

    সে কথা তো আমাকে আগেই বলেছি, নীতার সঙ্গে গতকাল আমার দেখাই হয়নি।

    বলেছিলেন বুঝি, আমার একেবারে মনেই ছিল না। কিন্তু কোথায়, ছিলেন, তা বললেন না।

    আপনি কোথায় ছিলেন?

    লোকটা চুপ করে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। দুম্‌বা! তারপর খসখসে মোটা গলায় বলল, আমি? আমার সঙ্গে তো মিস রায়ের আলাপ ছিল না বা যাতায়াত ছিল না, তাই এ ক্ষেত্রে আমার কথাটা ঠিক আসে না।

    তবে কি আমার পরিচিত যে কোন লোক খুন হবে, আর তার খুন হবার সময় আমি কোথায় ছিলাম, তা আমাকে মনে রাখতে হবে?

    আইন তাই বলে, রাখতে পারলেই ভাল, নইলে অসুবিধেয় পড়তে হয়। এই আর কি। আপনি যদি একটু মনে করতে পারতেন ভাল হত, বিশেষ করে, এ ব্যাপারে আপনি যখন সন্দেহের উর্ধ্বে নন।

    তার মানে, বলতে চান আমার দ্বারাও নীতা খুন হতে পারে?

    পারে না কী?

    আপনার সঙ্গে সত্যি আমার কথা বলার সময় নেই আর, আমিও একটি। ইনভেস্টিগেশন নিয়ে ব্যস্ত।

    লোকটা এবার উঠে দাঁড়াল, এবং সেই গালফুলো মুখে, খোকন চোখে তাকিয়ে অভিনেতার মত মোটা গলায় বলল, তা হলে বললেন না কোথায় ছিলেন?

    আমি সিগারেট ধরিয়ে বললাম, শুনতেই যখন চান, তখন শুনেন, আমি যে কোথায় ছিলাম, তা আমার নিজেরই মনে নেই, বেজায় মাল টেনে ছিলাম কি না।

    মাল?

    মাল জানেন না?

    মদের কথা বলছেন?

    লোকটা সত্যি, ডিভাইন খচ্চর শুধু না কিছুটা সাবলাইম খচড়ামিও __ করা আছে মনে হচ্ছে।

    আবার বলল, মদ্যপান করেন নাকি?

    মরে যাই, মদ্যপান করেন নাকি তারপরে বলবে, ও আপনি স্ত্রীলোকের সংসর্গও করেন নাকি এবং তারপরে, আপনি বস্ত্র পরিধান, আহারাদিও করে থাকেন ইত্যাদি বাদ যাবে না। বললাম, হ্যাঁ মশাই, মাল-টাল খেতে থাকি। তারপরে এও মনে করতে পারছি না কোন মেয়ে-টেয়ের ঘরে গেছলাম কি না হয়তো তাও গেছলাম।

    গেছলেন কি না, তা মনে করতে পারছেন না?

    না, ঝোঁকের মাথায় ওসব আমার কিছু মনে থাকে না।

    কোন মেলে কোথায় থাকে, কিছু মনে করতে পারেন?

    না।

    মিস রায় কি না, মনে করতে পারেন।

    হ্যাঁ। পারি, নীতা নয় (শ্যালক একটি, তোমার ফেরেববাজী বুঝি না, না?) ওকে আবার আমি ভালবাসি কি না, মনে, বাসতাম, তাই ওর কাছে গেলে সে কথা আমার মনে থাকে। (মাইরি এ কথাটা মিথ্যে বলিনি, নীতার কাছে গেলে সত্যি মনে থাকে, ভালবাস্‌সা অবিশি। জানি না।)

    আর যেসব মেয়ে টেয়ের কাছে, মানে আপনি যেরকম বলছেন, গিয়ে-টিয়ে থাকেন, তাদের বুঝি ভালবাসেন না?

    আপনি যত মেয়ের কাছে যান, সবাইকে কি ভালবাসেন?

    আমি? আমি তো কোন মেয়ের কাছে–।

    যান-টান না। তবে অনেকেই তো গিয়ে থাকে, বেশ্যাদের কাছে কিংবা হাফ গেরস্থ মেয়ে, কিংবা আরো কত রকম আছে, নিশ্চয় সেসব খবর আপনার রাখেন, মাঠে ময়দানে শুড়িখানার পাশের বাড়িতে, পাড়ায়, সবই তো আর প্রেম (ভালবাস্‌সা) নয়, গা চুলকানিই বেশী, (সবটাই যদিও) সেটাই বলছিলাম।

    টেলিফোন বেজে উঠল আবার, চীফের গলা, কী হল, লোকটা যায়নি এখনো?

    লোকটা যাতে চলে যায়, আমি সেভাবেই বললাম, উঠে দাঁড়িয়েছন, এবার যাবেন বোধ হয়।

    এবার যেতে বল, পরে হবে, আর দেরী করা যায় না। চাটার্জি, ঘোষ সব আমার ঘরে।

    রিসিভারটা নামিয়ে রাখলাম, লোকটি তখন আমার চেম্বারটার চারদিকে সেই নিরীহ চোখে দেখছে।

    বলল, আচ্ছা যাচ্ছি, তবু আপনি একটু মনে করবার চেষ্টা করবেন, সন্ধ্যে থেকে রাত্রি এগারটা অবধি কোথায় ছিলেন। দরকার হলে আবার আসব, নমস্কার।

    লোকটা বেরিয়ে গেল, আর আমার মনে হল যে, কাল রাত্রের কথা সব ওর জানা। লোকটা যেন আমাকে অর্থাৎ আমার ভেতরটাকে পরিষ্কারই দেখতে পাচ্ছিল, স্বপ্নের মত, জলের তলায় একটা মরা মেয়েকে স্পষ্ট দেখার মত। এবার এরকমও মনে হচ্ছে লোকটা যেন এখান থেকে যায়নি, (খোয়াব দেখছি বোধ হয়।) আমার সামনেই রয়েছে, আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

    কিন্তু এসব ভাববার এখন জানার সময় নেই, আর একটা পালটা রিপোর্টের জন্য মামদোরা সব বসে আছে। আচ্ছা, ব্যাপারটা তা হলে কী দাঁড়াচ্ছে, একটু ভেবে নেওয়া যাক, (যেন ভেবেই কিছু করা যাবে। যা করবার তা করতেই তো হবে।) কারণ, সমস্ত বিষয়টা পূর্বাপর আমার নিজের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার। এখন যা ব্যপারটা দাঁড়াচ্ছে, তা হল হরলাল ভট্টাচার্য (হরিণঘাটার অস্ট্রেলিয়ান শুয়োরের চেয়েও দামী।) কয়েক লক্ষ টাকা, একটা ইণ্ডাস্ট্রি করবে বলে, যাকে বলে, আত্মসাৎ, তাই করেছে এবং তার সম্পর্কে ইনভেস্টিগেট করে, যা রিপোর্ট করা উচিত, একজন দায়িত্বশীল অফিসার হিসেবে, তাই করেছি, আর টাকাটার একটা উপযুক্ত হিসাব, কাজের মান অনেকদিন শেষ হয়ে যাওয়ার দরুন, যে-কাজ কিছুই হয়নি, তার সমস্ত টাকাটা এক মাসের মধ্যে সুদসমেত ফিরিয়ে দেওয়া, না দিতে পারলে গুরুতর শাস্তি, স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে শোধ করার নির্দেশ, ইত্যাদি, এভাবেই আমার রিপোর্ট ও মতামত জানিয়েছিলাম। আমার ওপরওলারা সকলেই এটা সমর্থন করেছেন, এমন কি খোদ কর্তা সই করে ছেড়ে দিয়েছেন, যার পরে আর কোন কথাই থাকতে পারে না, যে কারণে দু একদিন আগেই, এই দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে পারে এরকম সব দপ্তরেই প্রচার করা হয়ে গিয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, হরলাল ভট্টাচার্য এমন ক্ষমতার অধিকারী, স্বংয় খোদ কর্তার পর্যন্ত টনক নড়ে গিয়েইে, (তার মানে কোনরকম ভর-টয় আছে, কোনরকম ভাবে হরলালের কাছে টিকি বাঁধা আছে, নিজের ব্যক্তিগতভাবে বা দলের কোন সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে, তা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না, কেননা এরকম বাঁধাবাঁধি না থাকলে, খোদ কর্তা ছেড়ে কথা কইতেন না, তিনিও হয়তো দাঁতে দাঁত চাপছেন, আর হরলালকে শুয়োরের বাচ্চা বলছেন, তবুও নিরুপায়, যে কারণে, হয়তো তার নির্দেশেই হরলালকে খবরের কাগজে ইণ্ডাস্ট্রির ওপর একটা স্টেটমেন্ট দেওয়ানো হয়েছে, যত ত্রুটি শুধরে নেওয়া যেতে পারে।) তিনি এই মুহূর্তেই ভুল শোধরানোর মত পালটা রিপোর্ট সাবমিট করতে হুকুম দিয়েছেন। তার মানে, হরলাল টাকাটা মারুক, তাতে কিছু যায় আসে না, কিন্তু তার জন্যে তাকে শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, যত তাড়াতাড়ি তার নামে যে কলঙ্কজনক রিপোর্টটা বেরিয়ে গিয়েছে, সেটাকে এখনই তুলে নিতে হবে। যে জন্যে, বাগচি বলছেন, হরলাল ট্যালেণ্ট, জীনিয়স, প্যাট্রিয়ট, সাফারার, যাকে বলে পলেটিক্যাল সাফারার, তা-ই, অতএব, বাণ মারলে যেমন বাণ তুলেও নেওয়া যায়, সেই ভাবেই, আমাকেই, কেননা আমিই তো এখানে ইনভেস্টিগেটর ছিলাম। রিপোর্ট করেছি) আবার পালটা লিখতে হবে, (বাগচির কথা থেকে যা বুঝেছি) অত্যন্ত রিগ্রেটের সঙ্গে যে, আমার তদন্তের মূলেই এমন কিছু ত্রুটি থেকে গিয়েছিল যে, সমগ্র ব্যাপারটা অত্যন্ত ভুলভাবে রিপোর্ট করা হয়েছে। হরলাল ভট্টাচার্য (চোট্টা) আসলে অনেক দূর, যাকে বলে অগ্রসর তাই হয়েছেন, অর্থাৎ কেলেঙ্কারী ধামাচাপা দিতে হলে যা যা করা উচিত, তাই করতে হবে।

    কিন্তু একটা বিষয়ে আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করছি, আমি আমার নিজেকে ঠিক চিনতে পারছি না। গতকাল রাত্রেও আমার ঠিক এইরকম হয়েছিল, অর্থাৎ আমি যে আমার সেই সুখের গর্তের মধ্যে, বেশ নিশ্চিন্ত আরামে ছিলাম, এবং বেশ শক্তভাবেই, যাকে বলে দৃঢ় হয়েই ছিলাম, সেখানে যেন ঠিক সেই সুখ ও আরাম বোধ করছি না। কেন, তা জানি না, আর এই জন্যই, জঘন্য ব্যাপার যেটা, আমার মনে হয়, আমাকে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, ঠিক যেন চিনতে পারছি না। সব থেকে ব্যাপার যেটা, সেই কুৎসিৎ স্বাধীনতা যাকে বলে বীভৎস আর ভয়ংকর, তার যে কী গতিবিধি, আমি ঠিক ধরতে পারছি না। সে যেহেতু, আমারই ইচ্ছা সেইহেতু অন্য কোন গর্তে গিয়ে সে বাস করতে পারে না, সে আমার গর্তে, আমার পরাধীনতার সুখের গর্তেই কোনরকমে থাকে, অনেকটা যাকে বলে খাঁচায় বন্ধ বাঘের মত। কিন্তু বাঘের মত হলেও আমার পরাধীনতার (ওগো আমার পরাধীনতা, তুমি কি স্‌সোন্দর।) এতই ক্ষমতা, এত দাপট যে, স্বাধীনতাকে ঠিক যেন ব্যাটারি চার্জ করে রেখে দিয়েছে, তার ট্যাঁ-ফো-টি করার যো নেই। তবু সে যে কখন কোন দিকে নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে, পরাধীনতার দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজতে খুঁজতে কোন খানে যে দুম করে লাফিয়ে পড়বে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। গতকাল রাত থেকেই এটি আমার বেশী করে মনে হচ্ছে, কারণ সে যে সুখের গর্তের দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে খুঁজে বেড়ায় সব সময়ে, সেটা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, এবং ফাঁক পেলেই লাফ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে, সেটাও জানা গিয়েছে। সেইজন্যেই কালরাত্রি থেকেই এখন এই মুহূর্তে আরো বেশী করে মনে হচ্ছে, আমি যেন আমাকে ঠিক চিনতে পারছি না, বুঝতে পারছি না। অথচ আমি তো ইনটেলিজেন্সের লোকটাকে ঠিক মিথ্যে কথা শুছিয়ে বলতে পেরেছি, সেখানে তো (ঘুঘু) কোনরকম গোলমাল করিনি, বা আমার ওই নোংরা কুৎসিৎ স্বাধীনতা ঘাউ করে লাফিয়ে উঠে বলেনি, হ্যাঁ মশাই, নীতাকে আমিই খুন করেছি, কারণ, আমি আর, কী বলে, আসক্তি আর মিথ্যের সঙ্গে যেন ঠিক পেরে উঠছিলাম না। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি যা বলেছেন সে কথা এখন আমি বুঝতে পারছি, আপনি যা বলছেন, নীতা যদি আমাকে না-ই চেয়ে ছিল এবং ছলনা করছিল, তখন ওকে না খুন করে, একে ছেড়ে গেলাম না কেন, (যেমন কিনা মহৎ নায়কেরা করে থাকে বা বলে থাকে, ওগো, তুমি যখন আমাকে ভালবাস্‌সিতে পার নাই, তখন আর তোমার হৃদয়ের বোঝা চাইতে চাহি না, উঃ কে এই ন্যাকাদের বোঝাবে, ছাড়িয়ে তো যাইবে হে, মহত। কিন্তুক কুথাক্‌ যাইবে হে, চলিয়া গেলেই কি তোমাদের ভালবাস্‌সা স্বর্গীয় হইয়া যায় গঁ?) কিন্তু একে ছেড়ে যাওয়াও যা, ওকে কী বলব, নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াও তাই, মানে মেরে ফেলা। কী রকম? তা হলেই তো বিপদে ফেলবেন মশাই, অত কথা কি আমি বলতে পারি, মানে নিজেকে কি ঠিক অতটা আমি চিনি? এই ধরুন না কেন, নিজের শরীরের যে কোন অংশই তো ভালবাসি, খুবই ভালবাসি, তবু একেক সময় তাকেও কেটে বাদ দিয়ে দিতে হয়। যে অংশটা না হলে চলে না, অথচ রাখলে কষ্ট, কারণ সে কোন কাজেই আসতে চায় না, সে থেকেও নেই, অথচ ইচ্ছে, সে থাকুক, যা কখনো সম্ভব নয়, এ অবস্থায় কেটে ফেলাই ভাল। তবু জানা গেল, সে নেই। হ্যাঁ, আমি তখন, যাকে বলে অঙ্গহীন তবু একটা সেই যে পচে যাওয়ার দরুন সব সময়ের যন্ত্রণা, অনেকটা সেপ্‌টিকের মত অবস্থা যাকে বলে, তার হাত থেকে বাঁচা যায়, একটা বেশ নীরোগ ব্যবস্থা, তৃপ্তি, হ্যাঁ—আঃ আর ব্যথা নেই, এইরকম অবস্থা।

    কই, আমি তো তুম্‌বো মুখো লোকটাকে সেসব কথা বলিনি, তখন তো ঠিক নিজেকে বাঁচিয়ে, আমার গর্ত থেকে দিব্যি সুতো ছেড়ে যাচ্ছিলাম, তবু এখন আমার এরকম মনে হচ্ছে কেন, যেন নিজেকে আমি চিনতে পারছি না। তলপেট টাঁটাচ্ছে, লেভেটরীতে যাই, গিয়ে পেট খালি করতে করতেই আয়নায় নিজেকে দেখলাম, আর চোখ টিপে বলে উঠলাম, এই দোহাই মাইরি, আমার সঙ্গে এরকম করিস না। এই দেখ, ঠিক ফুলকো রুচির গ্যাস বেরুচ্ছে, পেটটি খোঁচাতে আরম্ভ করেছে। ফোন বেজে উঠল আবার, বাজুকগে, তার আমার জবাব দিতে ভাল লাগছে না, বাজারে শালা বাজ বলে আয়নায় তাকালাম। আবার ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল, আমি আমার প্রতিবিম্বের দিকেই তাকিয়ে রইলাম, এবং জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা তোর ঠিক কি হচ্ছে, আমি কে সত্যি করে বল তো। কিছু না? তুই জানিস কচু বলে একবার মুখ বেঁকিয়ে ভেংচে দিলাম। দিয়ে হাসতে যাব, তার আগেই, টেবিলের ওপর ঠক ঠক শব্দে পিছনে ফিরে তাকালাম, (লেভেটরির দরজা খোলাই ছিল।) দেখলাম বাগচি, চ্যাটার্জি, ঘোষ তিনজনেই আমার চেম্বারে টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে, তিনজনেই আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, তিনজনের চোখেই রাগের সঙ্গে খানিকটা অবাক হওয়াও রয়েছে। আমি পিছন ফিরে বোতাম বন্ধ করে, ফ্লাশ টেনে বেরিয়ে এলাম।

    বাগচি মানে চীফ্‌ প্রথমে অনেকটা ধমকের সুরে বলে উঠলেন, এর মানেটা কী? বেয়ারা বললে, সেই লোকটা তো অনেকক্ষণ চলে গেছে, তুমি যাচ্ছিলে না কেন?

    চ্যাটার্জি বললেন, ছেলেমানুষ আপনারা, একটা কাজের গুরুত্ব বোঝেন না।

    ঘোষ বললেন, সীট ডাউন, সীট ডাউন, এখানেই বলা যাক, এখানেই কথাবার্তা সেরে নেওয়া যাক, তার অন্য ঘরে গিয়ে দরকার নেই। বেয়ারাকে বলে দেওয়া যাক, এখন যেন কেউ এ ঘরে না আসে, আর কেউ খোঁজ করলে যেন বলে দেয়, আমার চার জনেই এখন ব্যস্ত আছি।

    বলে ঘোষ আমার দিকে তাকালেন, অবিশ্যি অনুমতির জন্যে নয়, উদ্দেশ্য বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডেকে আমিই নির্দেশ দিই, যদিচ, তার কোন লক্ষণই আমার মধ্যে আমি দেখলাম না, কারণ এই লোক তিনটে, যাদের ধারণা তারা আমার সুপিরিয়র এবং বস, তাদের এত যাকে বলে কাজের গুরত্ব এবং ব্যস্ততা (বড্ড কাজের আঠা দেখছি দাদ্‌দা!) আমাকে কোন রকমেই নাড়া দিচ্ছে না, যে কারণে আমার ভাবভাঙ্গ দেখে চীফ-এর ভুরু দুটো কপালের মাঝখানে মুখোমুখি দুটো ইংরেজী অক্ষর জেড এর মত হয়ে উঠল। চ্যাটার্জি এবার যেন একটু অবাক হলেন, আর সেই সঙ্গে চোয়াল শক্ত করে একাটা, কী বলে, ক্রোধের অভিব্যক্তি তাই ফুটে উঠল। একমাত্র ঘোষ যেল অবাক হলেন না বা রাগ করলেন না, কারণ স্যার-এর আমার ধারণা, তিনি আমাকে একটু বোঝেন, কারণ উনি যে আবার মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে এক টেবিলে এক আধ পাত্তর খেয়ে থাকেন, (একে বলে লিবারাল, কেননা বয়স্ক সুপিরিয়র তো!) যদিচ সে কথা চীফ বা বাগচী বা চ্যাটার্জি জানেন না, কিন্তু তার সঙ্গে যে মামার একটু বেশী ভাব, সেটা তারাও জানেন, উনিও সেটা প্রমাণ করলেন এই ভাবে, ও কিছু নয়, ছেলেটা একটু এইরকমই, যে কারণে উনি নিজেই বেয়ারকে ডেকে নির্দেশ দিলেন ও বললেন, বসুন আপনারা কাজটা আরম্ভ করা যাক, বসো হে, আর দেরী নয়।

    বলতে বলতে উনি একবার একচোখ ছোট করে আমাকে স্নেহ ও শাসনের ইশারা করলেন, এবং তার সঙ্গে একটি আশ্বাসের ঘাড় নাড়ানো, (বলদ কোথাকার! ভালবেসে–) যার মানে বোধহয় আজ আমার সঙ্গে এক আধ পাত্তর হবে। এরা তিনজনই বসলেন, আমিও বসলাম, আর বাগচি, যাকে বলে, খুবব বিচক্ষণের মতই অল্প সময়ের মধ্যে একটা চিন্তা করে নিয়ে আমার ব্যবহারের কারণ সন্ধান করার জন্যেই যেন জিজ্ঞেস করলেন, ইনটেলিজেন্সের ওই অফিসারটা এসেছিল কেন তোমার কাছে?

    কথাটা যেহেতু চITটার্জি বা দোষ কেউই জানতেন না, ওঁরা খুবই অবাক হলেন–শুধু অবাক নয়, একটি ভয় পাওয়াও আছে, কারণ প্রত্যেকেই পাকা পুকুর চোর এবং ঘুষখোর, যে কারণে টীফ তার ঘরে আমাকে আগেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, দু একদিনের মধ্যে কোন বিজনেস করছি কিনা।

    আমি বললাম, একটা খুনের খোঁজ খবর করতে।

    খুন?

    তিনজনেরই যেন পিলে অবধি দাবড়ানি খেয়ে উঠল। বললাম হ্যাঁ, সেই রকমই তো বলছিল।

    কে কোথায়? তিনজনই এমন ঝাঁপিয়ে এল আমার দিকে, যেন খুব মজা পেয়েছে, অথচ একটু ভয় ভয় ভাব, আসলে ভয় নয়, কারণ জানে তো, ওরা কাউকে খুন করেনি।

    নীতা, ওর এ্যাপার্টমেণ্টে, কথাটা এভাবে সোজা বলে দিলেই হয়, এবং তাই বলতে গিয়েই, হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, কনুইটা গলায় চেপে বসার সময় ও আমার দিকে কেমন করে তাকিয়েছিল, সেই মুখটা আমার মনে পড়ে গেল, যখন ওর প্রথমে দাঁতে দাঁত চেপে বসে ছিল, নিশ্বাস নেবার জন্য নাকের পাটা দুটো ফুলে উঠেছিল, (ওদের তিনজনকে জবাব দিলাম, একটি মেয়ে, তার নিজের ঘরে।) আর চোখের তারায়, যে তারা দুটো তখন যেন অনেক বড় হয়ে। উঠছিল, ভীষণ অবাক হওয়ার জন্যে, ভীষণ অবাক হলে আর ভয় পেলে, যেরকম হয়, সেরকম ভাবে, ও যেন আমাকে বলছিল, একি আমাকে সত্যি মেরে ফেলেছ নাকি? এবং ওর চেপে রাখা দাঁতগুলো তথা ভংয়কর বিশ্রী ভাবে বেরিয়ে পড়েছিল, আর তারপরে আস্তে আস্তে দাঁতে দাঁত ছেড়ে গিয়েছিল, যেন একটা অসহ্য কষ্ট, মুখটা হাঁ হয়ে যাচ্ছিল.. আচ্ছা, আমি কি সত্যি ওকে মেরে ফেলেছিলাম? বা, আচ্ছা, আমার কি কোন কষ্ট, অনেকদিনের কষ্ট, নাকি ওটা রাগ…।

    কে মেয়েটা? তোমার চেনা নাকি?

    কারণ আমি যেন সত্যি জানতেই পারলাম না, নীতাকে মেরে ফেলছি, কারণ আমার যেন কেমন তখন মনে হচ্ছিল, আমি এখন কাকে বলছিলাম, না না, আর আমাকে পেছু ডাকিস না কিন্তু তা যে নীতাকে মেরে ফেলা, (হ্যাঁ, আমার চেনা–মানে—বন্ধু—মানে–। ওদের তিনজনকে জবাব দিলাম।) আমি কি তা সত্যি জানতাম? এমন কি, ও যখন আমার তলপেটটা খামছে ধরেছিল, যেন আমাকে ও মেরে ফেলতে চেয়েছিল, এত জোরে ধরেছিল, তখন একটা ঘৃণা এবং রাগ, যেন যুদ্ধ চলছিল, কিন্তু আচ্ছা তলপেটটা খামচে ধরা আসলে ভীষণ কষ্টে একটা কিছু আঁকড়ে ধরার মত বোধহয়, কারণ ওর হাত দুটো তখন আমার শরীরের তলার এমনভাবেই ছিল যে, কনুইটা সরাবার জন্যে গলার কাছে হাত তুলে নিয়ে আসার উপায় ছিল না। কিন্তু কথাটা তা নয়–,

    কে সে, নাম কী?

    কথাটা হচ্ছে, যে নীতার কাছে যাবার জন্যে (নীতা রায় ওদের বললাম।) শুধু যাবার জন্যে এক পা তোলা কেন, ও মরে যাবার সময়ে এর নিশ্বাসের গন্ধটা আমার মনে পড়ছে, আর ওর নিশ্বাসের গন্ধের জন্যে আমার বুক অবধি ফাটল ধরা মাঠের মত হা করে থাকত, সেই নীতাকে আমি মেরে এসেছি।

    চীফ বাগচি বলে উঠলেন, ও দেয়ার ইজ দি কজ্‌, মানে তুমি শকড। তা সে কথাটা বলবে তো

    এই কথা আমার কানে এল, এবং ওঁরা নিজেদের মধ্যে কী সব বলাবলি এ করলেন, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, কারণ আমি যেন ঠিক অফিসে নেই বা কোথায় রয়েছি, কিছুই জানি না, অথচ সেই অচেনা জায়গা থেকে এখন অফিসেই আমার রুমে ঢুকতে চাইছি, এবং সেই চেষ্টা ফলবতী হতে হতেই, ত্রিমূর্তি আনার চোখের সামনে ভেসে উঠল, আর চীফ-এর কথা এবার পরিষ্কারই শুনতে পেলাম, হ্যাঁ, আমি তা ডিনাই করছি না, আঘাত পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কি আর করা যাবে, মানুষের জীবন…।

    যাক্‌ আমি যে এ অচ্ছেদ্দা, অর্থাৎ ইগ্‌নোর করিনি, আসলে আমি যাকে বলে, আঘাতে বিপর্যস্ত ও এটা আবিষ্কার করতে পেরে, (ইউরেকা! ইউরেকা!) তিন মদ্দই খুব খুশি, শুধু তাই নয়, সববেদনায় মুখগুলো সব ঝুলে পড়ছে পাঁচের মত, এমন কি, (আহা, মরে যাই।) আবার সান্ত্বনাও দিচ্ছে, মানুষের জীবন!…আহা, যে জীবন নাকি একটি নিটোল ঘুষের স্বর্গ, উচ্চপদে অধিষ্ঠিত, আস্তে আস্তে মৌজ করে চলা, লোককে উপদেশ দেওয়া, (আসলে দুনিয়া রসাতলে যাক তাতেও ক্ষতি নেই, নিজেদের সুখের জন্য সব চালিয়ে যাবে।) আশাবাদী হও, দুঃখ তো আছেই, তবু ঈশ্বরের দেওয়া দার—আর তেমনি সান্ত্বনা, (বড় ব্যথা।) মানুষের জীবন।…

    মানুষের জীবন, যাকে বলে হৃদয়ঙ্গম করেই, ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চীফ আবার বললেন, কিন্তু এই জরুরী কাজটা আগে সারতেই হবে। কোন উপায় তো নেই। আমার মত তুমি এইভাবে রিপোর্টটা কর, সমস্ত রিপোর্টটা ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে, যে কারণে, হরলাল ভট্টাচার্য সম্পর্কে একটা ভুল ধারণার সৃষ্ট হয়েছে, একটু দুঃখ-টুঃখ প্রকাশ করে বলতে হবে, হরলাল ভট্টাচার্য এক জন বিরাট কর্মী মানুষ, তার কর্মের ক্ষেত্র এত বিভিন্ন দিকে দিকে বিস্তীর্ণ যে একটা বড় কাজ এত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ করে ওঠা সম্ভব না ওর পক্ষে, যে কারণে কিছু রং ইনফর্মেশনের জন্যে এরকম একটা ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্ট তোমাকে দিতে হয়েছে। হোয়াট ডু য়্যু থিঙ্ক?

    বাগচি ঘোষকে আর চ্যাটার্জিকে জিজ্ঞেস করলেন। ঘোষ বললেন, হ্যাঁ এ ছাড়া ওটাকে আর কীভাবে উইদড্র করা যেতে পারে।

    চ্যাটার্জি বললেন, শুধু এই নয়, সম্ভব হল হরলালের একট ডিটেল ওয়ার্কের ফিরিস্তি দেওয়া যেতে পারে।

    আমি বললাম, মানে ইমাজিনারী।

    সবটাই তো তাই। আর বুদ্ধিও তো শুনলাম রুবি দত্তই খোদ কর্তাকে দিয়েছে।

    যাক, জাহাবাঁজ মাগী নামক স্ত্রীলোকটি তা হলে এর মধ্যে ঢুকে পড়ছে। পড়বেই, খুবই স্বাভাবিক, কারণ খোদ কর্তা তার প্রেমিক, সে বিপদে পড়লে তাকে পরামর্শ সে দিয়েই থাকে। তাকে নিশ্চয়ই হরলাল ভট্টাচার্যই গিয়ে ধরেছিল, কিংবা সুজাসুজিই কোন ভয় দেখিয়েছিল, যাতে খোদ কর্তা হেঁদিয়ে পড়েছিলেন আর পড়বার তো জায়গা একমাত্র রুবিদত্তর কোলেই, তখন সে এসব পরামর্শ দিয়েছে।

    বাগচি হঠাৎ যেন অনেকটা ফুঁসে ওঠার ভঙ্গিতে বললেন, বাট দ্যাট চ্যাপ, দ্যাট গ্রেট ব্লাণ্ডারার হরলাল, এখন এসল জীনিয়স সাফারার, যাই বল হোক না কেন, এই কয়েক লক্ষ টাকা ফুঁকলে কিসে, আমি তাই ভেবে পাই না।

    এবং এর হিসেবও কোনদিন পাওয়া যাবে না।

    চ্যাটার্জি বললেন, এবং তিনজনেরই যেন এইমাত্র পকেটমার গিয়েছে, এইরকম একটা ভাব করে, চুপচাপ গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন খানিকক্ষণ, (যার অর্থ হল, এতগুলো টাকা থেকে একটা ভাগও পাওয়া গেল না, তবু নিজেদের ভেবে মরতে হচ্ছে। ঠিক যেন তিনটি শোকমগ্ন মুখ যাদের কী বলে, শোকসন্তপ্ত, যদি বেঁচে থাকত।) আর কোন আশাই নেই। কিন্তু, আমি ঠিক কী বলতে চাইছি, বুঝতে পারছি না, এবং কিছুতেই নিজেকে চিনতে পারছি না, প্রায় যেন ভুলতেই বসলাম, আমার ঘরে আরো তিনটি লোক রয়েছেন, এবং তারা সবাই একটা ক্রাইসিসের জন্য লড়ছেন।

    বাগচি বলে উঠলেন, যাই হোক, মনের মধ্যে গুছিয়ে নিয়ে, স্টেনোগ্রাফারকে ডেকে একটা রিপোর্ট তৈরী করে ফেল, যাতে আজই সব ঠিক করে ফেলা যায়।।

    আর আমি শুনলাম আমার গলা দিয়ে লেল, না, রিপোর্ট যা করার, তা করা হয়েছে, আর নতুন করে কিছু করার দরকার নেই।

    শোনা মাত্রই, আমার গত কাল রাত্রের কথা আবার মনে পড়ে গেল, যখন আমি নীতার গলায় কনুইটা চেপে ধরেছিলাম, অর্থাৎ সেই বীভৎস জানোয়ারটা, স্বাধীনতা যার নাম, সেই কুৎসিত নোংরাটা যেন কথা বলে উঠল।

    ওরা তিনজনে মি এক সঙ্গেই বলে উঠলেন, তার মানে?

    তার মানে, আমি পারব না।

    আমার গলা দিয়ে বেরুল, যার কোন যুক্তি আমার জানা নেই, আর কি মনে হল, আমার তলপেটে নীতা যেমন করে খামছে ধরেছিল, তেমনি করেই, ওদের তিনজনের, তার মানে কথার বাদ! স্বর আমার বুকের মধ্যে, হ্যাঁ, তাই মনে হল, আমার বুকের মধ্যেই খামচে ধরল, আর তা ছাড়াতে গিয়ে, তার মানে, আমি পারব না, এই কথা যেন শেষবারের মত, যে নীতার গলার কনুই চেপে বসেছিল তেমনি বসল। আর আমি যে আমার সুখের জীবিকাটিকে হত্যা মানে খুন করছি, এ কথাটা আমার মনে হল না, কারণ আমি ঠিক যেন জানতেই পারছি না আমি কি করছি, তবু এ কথা আমাদের মানতেই হবে, আমি যাকে বলে একটি শান্তি-প্রশান্তি বোধ করছি।

    বাগচি চেঁচিয়ে উলেন, তুমি এর পরিণাম জান?

    জানি। খুন যে করে ফেলেছি, তা ঠিক না জানলেও তার পরের অবস্থাটা এখন আমার হল, আমি দেখলাম, আমার এই সাজানো জীবিকার সুন্দর ঘরটা, টেবিল, ফাইল, আলমারী, সব মরে পড়ে রয়েছে, এরকম আবার হয় নাকি, তা জানি না, কিন্তু দেখছি হচ্ছে, তার আমি কী করব।

    চ্যাটার্জি বলেন, যেটা আপনি হামেশাই করতে অভ্যস্ত, সকালবেলাই সেটা গিলে মরেছেন নাকি?

    বললাম, না। (বুড়ো খচ্চর, তোর মত মকরধ্বজ আর মোদক মারি না, তৃতীয় পক্ষের কাছে ছোকরা থাকবার জন্যে।)

    ঘোষাল বলে উঠলেন, আচ্ছা তোমার এরকম ধারণা হয়নি তো যে, আমরা হরলালের কাছ থেকে টাকা খেয়ে বসে আছি, কিন্তু তোমাকে দিয়েই ব্যাপারটা মিটিয়ে নিচ্ছি?

    না।

    তবে? বাগচি খেঁকিয়ে উঠলেন প্রায়, তুমি কোন সাহসে বলছ, তুমি পারবে না?

    তা আমি সত্যি জানি না, কোন সাহস থেকে বলছি, তবে এটা বুঝতে পারছি, কেউ যেন আমাকে আমার গর্তের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে, যার অর্থ, (উরে শালা।) আমার বাসাই ভেঙে যাচ্ছে, আমার, যাকে বলে আশ্রয়, সেখান থেকেই আমাকে সরে পড়তে হবে, আমি থাকব কোথায়, বসব কোথায়, দাঁড়াব কোথায়, তাই তো বুঝতে পারছি না। অর্থাৎ আমার গর্তের যে সব ভাইটাল টান, যেগুলো আমাকে ধরে রেখেছে, তারাই যদি সব বেরিয়ে পড়ে, তা হলে আমার আস্তানা কোথায়।

    চ্যাটার্জি বললেন, আমার মনে হচ্ছে, আপনি ব্যাপারটার গুরুত্ব এখনো বুঝতে পারেননি, এখনো ছেলেমানুষী করেছেন, কিন্তু সব সময়ে কী আর তা করা চলে, এ ধরনের কথাবার্তা বলবেন না। যা বলা হচ্ছে, তা করে যান।

    ঘোষ বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে তো যথেষ্ট বিচক্ষণ বলেই জানি, অল্প বয়সে এতটা উন্নতি করেছ, তোমার সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। কর্তারা সবাই তোমার কাজে খুশী, তোমার কাছ থেকে তো ঠিক এরকম, হঠাৎ একটা কথা আশা করা যায় না।

    বাগচি ভুরু কুঁচকে আমাকে দেখছিলেন, যার অর্থ দাঁড়ায়, ওর এখনো দৃঢ় বিশ্বাস, আমি যা বলেছি, কাজে আমি তা কখনই করব না। আর সেই ভেবেই বোধহয় বললেন, আজকালকার ছেলেদের মতিগতি সত্যি কিছু বোঝার উপায় নেই। দেশটা এদের জন্যে একেবারে গোল্লায় যেতে বসেছে, কী বলছে, কী করছে, একটা রেসপেকট নেই, একটু বিনয় নেই, যাচ্ছেতাই। এইজন্যই। বুঝলে হে ছোকরা, এইযে তোমাদের আজকাল এইসব পোশাক-আশাক নেত্য কেত্য সব হয়েছে, অল ইরেসপনসিবল বখাটে…যাই হোক, সময় অনেক চলে গেছে, আর দেরী করা যায় না।

    হ্যাঁ। আমি মনে মনে বললাম, আমাদের জন্যে, এই ছোকরাদের জন্যে দেশটা গোল্লায় যাচ্ছে, আর তোমরা এই ঘাগীরা, স্বর্গ রচনা করছ। দেশের লোকেরা তোমাদের চেনে না। যত দোষ ছোকরাদের পোশকে-আশাকে, আর তোমাদের ভদ্র আর শালীন পোশাকের তলায় সব সাচ্চা, এই ‘ন্যায়ের সুন্দর’ রাজত্বটি তোমরা চালাচ্ছ। আমরা কাদের ছেলে, আর তোমরা কাদের বাবা, তা তোমরা জান না। আমরা সব ভূঁইফোড়, মরে যাই।

    চ্যাটার্জি হেসে (ওঃ কী ভাগ্যি, শ্যালকটি হেসেছে, ঝকঝকে সাদা দাঁত, অনেক টাকা দাম, হাম খাবার সময় খুলে যায় কি না কে জানে।) একটু চোখ নাচিয়ে, (এতদিন শুনলাম, লোক বউয়ের সঙ্গে কী ভাবে কথা বলে।) বললেন, তারপরে আপনি ভাবছেন, হরলাল ভট্টাচার্য সেটাও প্রমিস করেছ, দেবে, বেশ মোটাই দেবে, যার পরিমাণ, মফস্বলে কয়েক কাঠা জমি হয়ে যাবে, বুঝলেন?

    ঘোষ বললেন, ওকি তা করবে নাকি? আখের গুছোবার বদলে অন্য জায়গায় গিয়ে খরচ করে বসে থাকবে।

    ঘোষ মদ আর মেয়েমানুষের কথা বলেছন, ওঁর ধারণা। ওঁকে আমি রেসপেকট করি (পাছায় লাথি) তাই ওসব (খারাপ) কথা আমার সামনে বললেন না। আমি বললাম, আপনারাই কেউ উইদড্র করুন না।

    তিজনেই রেগে, চোখ পাকিয়ে (খোকনকে শাসন হচ্ছে।) তাকালেন আমার দিকে, এবং বাগচী আবার খেঁকিয়ে উঠলেন, কেন করব, তোমার কেস, তুমি উইদড্র করবে।

    আমার যা বলার, তা আমি বলে দিয়েছি আপনাদের। আমি বেশ শান্ত  ভাবেই বললাম, কারণ আমি আমার কাজ অনেক আগেই শেষ করেছি, এখন অনেকটা সেই প্রশান্তির মধ্যেই ডুবে রয়েছি যাকে বলে, এবং সিগারেটের প্যাকেট বের করে, বাগচির সামনে চাকরি-জীবনে যা করিনি, তা করলাম, সিগারেট বের করে, ঠোঁটে গুঁজতে গুঁজতে বললাম, ইফ ইউ অল পারমিট মী প্লীজ—তারপরে কাঠি জ্বালিয়ে ধরিলে নিলাম। তাকে মেরে ফেলার পর, অনেকক্ষণ আমার এরকমই কেটেছিল, ঠিক যা করেছি, তা ভাবতে না পারার দরুণ অথচ একটা কী বলে প্রশান্ত মেজে সিগারেট খেয়েছিলাম, তারপর কী হবে না হবে, (যেমন সব চিহ্ন লোপাট ইত্যাদি) কিছুই মাথায় আসছিল না।

    চ্যাটার্জি বলে উঠলেন, কেন, কী হল হঠাৎ আপনার? চুরি জোচ্চোরি ফেরেববাজী আপনার কাছে নতুন নাকি? সুষ খাবার জন্যে তানেক ফাইলই তো ওলটপালট করে দিয়েছেন।

    আমি এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললাম, আর ভাল লাগে না।

    বাগচি বোধহয় রাগের চোটে চেয়ারে বসে কাঁপছিলেন। ঘোষ বলে উঠলেন, কোন পলিটিকস তোমার মাথা খায়নি তো?

    আজ্ঞে না, এ মাথায় খচ্চরের দাঁত বসে না।

    বোঝা গেল, খচ্চর শব্দটি সবাইকেই বিশেষ আহত করল, যে কারণে তিনজনেই একটু অবাক হয়েই তাকালেন, ভাবলেন, আমার মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে কিনা, যদিচ তা ভাবলে আমার কিছুই করার নেই, কারণ আমি আমার ভিতরটা তো আর ওদের দেখাতে পারছি না যে, ঠিক সেখানে কী কী ঘটেছে, এবং আমার স্বাধীনতা নামক যে জঘন্য পর্দাটা আমার সুখের গর্তের সঙ্গে, ওদের সঙ্গে, দপ্তরের সঙ্গে, কে জানে গোটা দেশের সঙ্গেই কি না, বিশ্বাসঘাতকতা করে বসল, সেটা বোঝার ক্ষমতা আমার নাই সত্যি।

    বাগচি উঠে দাঁড়ালেন, অনেকটা বীরপুরুষের মত, (বেশী ওরকম করা উচিত নয় বাপু, প্রেসার ফট করে দেবে।) টেবিলে হঠাৎ একটা চাঁটি মেরে বললেন, ইউ-ইউ ডোন্ট থিঙ্ক, দ্যাট–যে তুমি না করলে এটা পড়ে থাকবে। আমরা অনেক ভালভাবেই এটা ম্যানেজ করব। কিন্তু তুমি মনে রেখ, তোমাকে আমি স্পেয়ার করব না, কিছুতেই না, তোমাকে—তোমাকে–।

    বললাম, তাড়িয়ে ছাড়বেন।

    ইউ উইল সী দ্যাট। আসুন আপনারা। বাগচি গটগট করে বেরিয়ে গেলেন। বাকী দুজন আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত হা করে তাকিয়ে রইলেন, যেন ব্যাপারটা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না। যদিচ, তাদের চোখেও খুন করারই একটা ইচ্ছা জেগে উঠেছে বলে আমার মনে হচ্ছে, ইচ্ছে যাকে বলে, অর্থাৎ স্বাধীনতা, তাকে ওরা আমার মত পান, অতএব ওই তাকিয়ে থাকাই সার। অবিশ্যি, এটা-ঠিকই, এই ইচ্ছে বা স্বাধীনতা ঠিক এরকম ক্ষেত্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে পারে না, কারণ আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখলাম, পরাধীনতার সুখ যেখানে বেশ বিনা বাধাতেই গর্তের মধ্যে বাস করে, তখন সেই সুখকে বজায় রাখার জন্য স্বাধীনতা কোন কাজই করে না, এমন কি তার যে কোন অস্তিত্ব আছে, তাও গর্তের কোথাও টের পাওয়া যায় না।

    ওরা দুজনেও বেরিয়ে যাবার আগে, চ্যাটার্জি জিজ্ঞেস করলেন, কেসটার কাগজপত্র, ইনভেস্টিগেশনের রিপোর্ট সব কোথায়?

    এখানেই আলমারীতে আছে, তবু আমি (ঘোড়া-গাধার বাচ্চাকে) বললাম,

    ওগুলো সবই বাড়িতে রয়েছে।

    ওগুলো তো আপনাকে নিয়ে আসতে হবে।

    দেখা যাবে।

    তার মানে, আপনি ওগুলো আটকাতে চান?

    আটকেও যে আমি কিছু করতে পারি না, তা জানি, কারণ অফিসের খবরাখবর আইন অনুযায়ী বাইরে প্রকাশ করতে পারি না, আর করলেও খবরের কাগজে, যাকে বলে কেলেঙ্কারী ফাঁস করা, যেটা আপাততঃ চ্যাটার্জি সন্দেহ করছেন, তাতেও কোন লাভ নেই, সেহেতু ওরকম অনেক কেলেঙ্কারি আজ অবধি ফাঁস হয়েছে, আরও হবে, তাও লোকেরা জানে, কিন্তু কারুরই কিছু যায় আসে না। যেমন আমার জন্যে সত্যি উইদড্র আটকে থাকবে না… অনেক ভালভাবেই হবে, বাগচি মিথ্যে বলেননি, তবু আমি বললাম, বুঝতে পারছি না।

    দুজনেই বেরিয়ে গেলেন, এবং বাগচি যে এতক্ষণ আমার পিতৃদেবকে টেলিফোনে খবর দিয়েছেন, (দুজনে আবার স্যাঙাত কি না।) তাতে কোন সন্দেহ নেই, তাই এখন মোটামুটি ঠিক করে নেওয়া যায়, আমি কোন টেলিফোনই ধরব না, বেয়ারাই ধরবে, বলে দেবে সাব কামরে মে নহী হ্যায়।

    বেয়ারাকে ডেকে আমি সে কথা বলে দিলাম, আর দেখলাম, ওর চোখে যাকে বলে বিস্ময়, তাই রয়েছে, যদি সেটা প্রকাশ করবার সাহস নেই, তবে কিছু একটা অনুমান করেছে, কারণ সব কথাই ও শুনেছে কিছু কিছু বুঝতেও পেরেছে নিশ্চয়।

    আমি অন্যান্য কিছু কাগজপত্র নিয়ে কাজে মনোযোগ দিতে চাইলাম, কিন্তু দিতে পারলাম না, কারণ এটা সেই নীতার মৃত দেহে উত্তাপ খোঁজার মত চেষ্টা। এ বিষয়ে এখন আর কোন সন্দেহ নেই, চাকরটিকে আমি হত্যা করেছি, বাগচি আমাকে স্পেয়ার করবে না। আর বাগচি যা বলছেন, সেটা খোদ কর্তারই হুকুম এবং স্বয়ং খোদ কর্তার সঙ্গে লড়ে, এখানে চাকরি বাঁচিয়ে রাখা, আর চিতার আগুনের মধ্যে ঢুকে বেঁচে থাকবার চিন্তা একই, অতএব একে আমি মেরেই ফেলেছি বলতে হবে, এবং সত্যি বলতে কি, নীতাকে গত রাত্রে মেরে ফেলার আগে, মনে মনে যেমন অনেকবারই মেরে ফেলেছি, এই চাকরিটাকে, যাকে আমার ছেনাল বলে মনে হয়েছে, অর্থাৎ কর্মের সততা ও জনসেবা, ইত্যাদি সব বাতুল বলে আমার মনে হয়েছিল যখন, তখনই মনে মনে একেও অনেকবারই মেরে ফেলেছি, কিন্তু হাত তুলতে সাহস পাইনি, কারণ আমার গর্তের সুখের মধ্যে এ বেশ জমিয়েছিল, আমার পরাধীনতায়, যাকে বলে, অতি অন্তরঙ্গ মাসে চার পাঁচ দিন হলেও নীতার সঙ্গ যেমন সুখ দিত, (সুখ? আমি জানি না, আমি জানি না, কিন্তু সেই যে কবে, তখন বাইশ বছর না তেইশ বছর ছিল বোধহয়, আমি নীতার পায়ের তলায় মুখ গুঁজে দিয়েছিলাম, আর নীতা হঠাৎ কেঁদে ফেলেছিল, বলেছিল, না, না, তুমি সত্যি বলতে পারনা, আমাকে কখনো সত্যি বলতে দাওনি—কেন এ কথা বলেছিল এখন আর আমার মনে নেই, তবে ও খুব কেঁদেছিল, তারপরে হঠাৎ আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে, ফুঁসে উঠে বলেছিল, তুমি একটা মিথ্যুক, বলতে পার না, আমি তোমার সঙ্গে এক ঘরে থাকতে চাই শুধু? আমিও তাই-তাই-তাই, লম্পট কোথাকার। বেরিয়ে যাও আমার ঘর থেকে, এরকম বলেছিল, তবু কাঁদছিল, গায়ের ওপর পড়ে চুল টানছিল, তবু বলছিল, ‘সুখখোর, সব সুখখোর’—কিন্তু এসব কথা এখন আমার মনে পড়ছে কেন, সুখখোর কথাটার জন্যে? যেহেতু তার সংসর্গের সুখের কথা আমি চিন্তা করছিলাম?) এও সেই রকমের, তবু যে নীতার ব্যাপারে একটা ঘৃণা ও অনাসক্তি ছিল, আশ্চর্য, চাকরিটার ব্যাপারেও তাই ছিল।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅকালবৃষ্টি – সমরেশ বসু
    Next Article গঙ্গা – সমরেশ বসু

    Related Articles

    সমরেশ বসু

    প্রজাপতি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    গঙ্গা – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    অকালবৃষ্টি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    নয়নপুরের মাটি – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    সমরেশ বসু

    শ্রীমতি কাফে – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    সমরেশ বসু

    সওদাগর – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }