ইংরেজ সাহেবের বাংলো ● অমিতাভ সাহা
ইংরেজ সাহেবের বাংলো – অমিতাভ সাহা
রাহুল আর অদিতির বিয়ের বছর তিনেক হল। ওরা দিল্লিতে থাকত। বিয়ের পরপরই কোভিডের দরুন লকডাউন হয়ে গেল। সকলের মতো ওরাও গৃহবন্দি হয়ে পড়ল। লকডাউন শিথিল হতেই দু’জনে হানিমুনে কাছাকাছি কোনও হিলস্টেশনে যাবার প্ল্যানিং করল। প্ল্যানমাফিক রাহুল অদিতিকে নিয়ে পার্সোনাল কার ড্রাইভ করে রওনা হল নৈনিতালের উদ্দেশে। সকালে দিল্লি থেকে বেরিয়ে বিকেল নাগাদ ওরা নৈনিতাল পৌঁছে গেল। নৈনিতালে বছরের বেশিরভাগ সময়েই ট্যুরিস্টদের ভিড় থাকে। কিন্তু তখন জাস্ট লকডাউন উঠেছে, তাই অতটা ভিড় ছিল না। বাজারের সব দোকানও খোলা ছিল না। নব বিবাহিত দম্পতির ট্যুরিস্টদের ভিড় নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনও দরকার ছিল না। ওরা নৈনিতালের মনোরম পাহাড়ি পরিবেশে একে অপরের সান্নিধ্যে কিছু সুন্দর সময় কাটাতে এসেছিল।
ওরা একটা হোটেলে গিয়ে উঠল। সন্ধেবেলা হোটেল থেকে বেরিয়ে পায়ে হেঁটেই নৈনি লেকের চারধারে ঘুরে বেড়াতে লাগল। পাহাড়ের কোলে বিশালাকার লেকটিতে সন্ধেবেলাতেও কিছু ট্যুরিস্ট বোটিংয়ের মজা নিচ্ছিল। রাহুল অনেকক্ষণ ধরে লেকের ধারে একটা বেঞ্চে অদিতির হাত ধরে বসে রইল। আঁধার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে দূরে পাহাড়ের গায়ে নির্মিত বাড়ি-ঘর গুলিতে ধীরে ধীরে টুনিবাল্বের মতো আলো জ্বলে উঠছিল আর অন্ধকার পাহাড়ের অনেকটা অংশ জুড়ে সেই আলোকসজ্জার আলো লেকের জলে প্রতিফলিত হয়ে নয়নাভিরাম রূপ নিয়েছিল। ন’টা নাগাদ হোটেলে ফিরে ডিনার অর্ডার করল। লকডাউনে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার পর নৈনিতালে এসে ওদের দু’জনেরই বেশ ভালো লাগছিল। লেকের ধারে মার্কেটে কিছু কেনাকাটা করে ন’টা নাগাদ হোটেলে ফিরে ওরা ডিনার অর্ডার করল। ডিনারের পর অদিতি বিছানায় আরাম করে শুয়ে টিভি দেখতে লাগল আর রাহুল হোটেল থেকে বেরিয়ে আবার লেকের ধারে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। রাতের খাবারের পর ওর সিগারেট খাওয়ার অভ্যেস ছিল। রাস্তার ধারেই একটা সাইনবোর্ডে শহরের ম্যাপ আঁকা ছিল। ম্যাপে নৈনিতাল এবং আশপাশের কিছু ফেভারিট ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন পয়েন্টিং করা ছিল। আর অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা ঘন জঙ্গল যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল কিলবেরি। রাহুল মোবাইল বের করে ম্যাপের একটা ছবি তুলে নিল। পাশেই একজন স্থানীয় লোক বিড়ি খাচ্ছিল। রাহুলকে ছবি তুলতে দেখে বলল, “সাহেবজী! এখানে ঘুরতে এসেছেন নিশ্চয়ই?”
| — | “হুঁ…” |
| — | “ভালো হয় যদি একজন গাইড নিয়ে নেন। গাইড আপনাকে পুরো নৈনিতাল ভালো করে ঘুরিয়ে দেবে।” |
| — | “তার দরকার হবে না।” |
| — | “না সাহেব। না জেনে-শুনে কোনও জায়গায় গেলে আবার বিপদে পড়তে পারেন। এখানে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে আপনার যাওয়া ঠিক নয়।” |
গাইড নেওয়ার আইডিয়াটা রাহুলের ভালো লাগল না। ওরা এখানে হানিমুনে এসেছে আর গাইড সঙ্গে নিয়ে ঘোরা মানে কাবাব মে হাড্ডি। তাই রাহুল লোকটার কথার গুরুত্ব না দিয়ে হোটেলে ফিরে এল। হোটেলে ফিরে দেখল, অদিতি ঘুমিয়ে পড়েছে। ও পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। মোবাইলে তোলা ম্যাপের ছবিটা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে দু’জনে ব্রেকফাস্ট করে নিল। ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে আগের রাতের তোলা ছবিটা দেখতে দেখতে রাহুল অদিতিকে বলল, “চলো, চায়না পিক ঘুরে আসি। ওখান থেকে কুমায়ুন হিমালয়ের অসাধারণ ভিউ দেখতে পাওয়া যায়।” ওদের গাড়ি তো ছিলই। দু’জনে বেরিয়ে পড়ল চায়না পিকের উদ্দেশে। রাস্তা ফাঁকা ছিল, গাড়িঘোড়া বিশেষ ছিল না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ওরা চায়না পিকে পৌঁছে গেল। এটি নৈনিতালের সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ হওয়ায় অন্যতম ট্যুরিস্ট অ্যাট্র্যাকশন। রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় চায়না পিক থেকে গোটা নৈনিতাল শহর দৃশ্যমান হচ্ছিল। চায়না পিকে পৌঁছে অনেকক্ষণ ধরে এদিক ওদিক ঘুরে পেছনের তুষারাবৃত হিমালয় নিয়ে অনেক সেলফি তুলল। ওখানে দিনের বেলাতেও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া বইছিল। ঠান্ডার আমেজ নিতে নিতে একটা দোকানে গিয়ে দু’কাপ চা আর ম্যাগি অর্ডার করল। গরম গরম ম্যাগি খেতে খেতে রাহুল দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, এই রাস্তায় আরও এগিয়ে গেলে কী পড়বে? কোনও ভালো জায়গা আছে দেখার মতো?”
দোকানদার বলল, “সাহেব! আরও এগিয়ে গেলে কিলবেরির জঙ্গল পড়বে আর কিছু নেই। সুন্দর জঙ্গল আর ইংরেজ আমলের কিছু পুরনো বাংলো আছে। কিন্তু ওখানে কেউ থাকে না। এজন্য ওখানে কেউ যায় না। না মোবাইলের নেটওয়ার্ক আছে, না কোনও জনবসতি, না দোকানপাট। এমন জায়গায় কে যাবে?”
রাহুল বলল, “আচ্ছা! ইংরেজ আমলের বাংলো! তাহলে তো খুব সুন্দর জায়গা হবে। বাংলোগুলো অক্ষত আছে না ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে?”
দোকানদার বলল, “দরজা জানালা অনেক জায়গায় ভাঙা, কিন্তু বাংলোর ছাদ ও দেওয়াল মজবুত পাথরের তৈরি, তাই এখনও অক্ষত আছে। আমি দূর থেকে দেখেছি, কখনও কাছে যাইনি”।
একটু থেমে দোকানদার বলল, “একটা কথা বলব সাহেব? ওখানে যাবেন না”।
রাহুল আশ্চর্য হয়ে বলল, “কিন্তু কেন?”
| — | “কারণ বলতে পারব না। ওখানে কেউ যায় না। এজন্যই বললাম। আপনি পুরো নৈনিতাল ঘুরে দেখুন। অনেক ভালো ভালো জায়গা আছে। কিন্তু কিলবেরির জঙ্গলে না যাওয়াই ভালো।” |
রাহুল ভাবতে লাগল, কী এমন আছে ওই জঙ্গলে, যে দোকানদার যেতে বারণ করছে। ওর মনে ওখানে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছে জাগতে লাগল। দোকানদারের পেমেন্ট করে গাড়িতে উঠে রওনা হল কিলবেরির জঙ্গলের উদ্দেশে। অদিতিও দোকানদারের কথা শুনে ওখানে যেতে মানা করছিল কিন্তু রাহুল বলল, “জঙ্গলের মধ্যে পুরনো বাংলোগুলোই একবার দেখি আসি চলো।”
|| ২ ||
কয়েক কিলোমিটার যাবার পর ওরা কিলবেরি পৌঁছে গেল। সত্যিই খুব ঘন জঙ্গল ছিল কিন্তু ওই জঙ্গলে একেবারেই ভয় লাগছিল না। সুন্দর সবুজে ঘেরা নির্জন অরণ্য। নব বিবাহিত জুটির এমন নিরালায় একান্তে সময় কাটাতে ভালো লাগারই কথা। রাহুল গাড়ি চালাচ্ছিল আর বিকেলের মিঠে রোদে অদিতির সঙ্গে রাস্তার দু’পাশে জঙ্গলের মনোরম রূপ উপভোগ করছিল। দু’পাশে উঁচু উঁচু পাইন গাছের সারির মধ্য দিয়ে সরু পিচের রাস্তা এগিয়ে চলছিল। রাস্তার ধারে পাথরের তৈরি একটা উঁচু গেট চোখে পড়ল। বোঝা যাচ্ছিল, ব্রিটিশ আমলে তৈরি। মজবুত গেটটা দাঁড়িয়ে ছিল দৃঢ়তার সঙ্গে। গেটের মধ্য দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা চলে গেছে। রাহুল অদিতিকে বলল, “ওই দোকানদার বলেছিল না, এই জঙ্গলে ব্রিটিশদের তৈরি অনেক বাংলো আছে, বোধহয় গেটের মধ্য দিয়ে এই রাস্তাটা ওই বাংলোগুলোর দিকেই যাচ্ছে। চলো না ভেতরে গিয়ে দেখি।”
অদিতি ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “না রাহুল। আমরা ছাড়া এখানে আর কেউ নেই। চলো ফিরে যাই।”
রাহুল বলল, “আরে ভয় পাচ্ছ কেন। দ্বিতীয়বার আর এখানে আসার সুযোগ পাব না। এতদূর যখন চলেই এসেছি, তখন ভেতরে গিয়ে একবার দেখি না কী আছে।” – এই বলে রাহুল গাড়ির স্টিয়ারিং ওই গেটের দিকে ঘুরিয়ে নিল। গেট পেরিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে অনেকটা এগিয়ে গেল, কিন্তু কোনও বাংলো চোখে পড়ল না। দু’দিকে উঁচু উঁচু গাছের সারি ছাড়া আর কিছু ছিল না।
রাহুল বলল, “যাই বলো, জায়গাটা কিন্তু ভীষণ সুন্দর। এরকম জায়গা আমার খুব ভালো লাগে।”
অদিতি বলল, “কিন্তু জঙ্গল ছাড়া তো কিছুই নেই এখানে!”
রাহুল হেসে বলল, “আরেকটু এগিয়ে দেখি। বাংলো দেখতে না পেলে গাড়ি ঘুরিয়ে নেব।”
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় রাহুলের গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল। চারপাশে নানান পাখির কলকাকলি, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর পাইন গাছের ভেতর দিয়ে ঢেউ খেলে যাওয়া বাতাসের শন শন শব্দের সঙ্গে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ মিলে এক যুগলবন্দি তৈরি করছিল। অনেকটা যাবার পরেও যখন কিছু দেখা গেল না, তখন অদিতি বলল, “রাহুল, এতক্ষণ ধরে আমরা শুধু চলেই যাচ্ছি। না রাস্তা শেষ হচ্ছে, না জঙ্গল। অনেকটা ভেতরে এসে পড়েছি আমরা। এখন প্লিজ গাড়ি ঘুরিয়ে নাও।”
অদিতির কথাই ঠিক ভেবে রাহুল গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলতে শুরু করল। খানিক দূর আসার পরেই একটা আওয়াজ হল, যেন গাড়ির চাকায় কিছু ফেঁসে গেছে। তারপর একটা জোরে শব্দ হয়ে পেছনের টায়ার পাংচার হয়ে গেল। ওরা গাড়ি থেকে নেমে দেখল, পেছনের চাকায় লোহার কাঁটা লাগানো একটা তার জড়িয়ে গিয়েছে।
অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল, “এত বড় কাঁটার তার তুমি দেখতে পেলে না!”
| — | “কী জানি, কোত্থেকে এল। চোখেই পড়ল না।” |
| — | “এখন জলদি টায়ার পালটাও আর চলো এখান থেকে।” |
| — | “হ্যাঁ দাঁড়াও। এখুনি বদলে দিচ্ছি।” |
রাহুল ডিকি খুলে স্টেপনি বের করল কিন্তু জ্যাক খুঁজে পেল না। মনে পড়ল, জ্যাক তো গাড়িতে ঢোকাতেই ভুলে গেছে। এই রাস্তায় তো আগে পিছে আর কোনও গাড়িও নেই যার কাছে হেল্প চাইবে। চট করে মোবাইল বের করল, কিন্তু কোনও নেটওয়ার্ক ছিল না। অদিতিকে জিজ্ঞেস করল, “দ্যাখো তো, তোমার ফোনে নেটওয়ার্ক আসে কিনা।” কিন্তু অদিতির ফোনেও নেটওয়ার্ক ছিল না।
রাহুল আফসোসের সুরে বলল, “ইস্! কী বিপদে পড়লাম। বিকেল গড়াতে চলল আর ফোনেও নেটওয়ার্ক নেই। এখন কী হবে!”
অদিতি বলল, “আমি প্রথমেই মানা করেছিলাম এখানে আসতে।”
রাহুল উত্তেজিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমারই ভুল। কিন্তু এখন কী করব সেটা আগে ভাবো।”
অদিতি বলল, “চলো না, পায়ে হেঁটেই ফিরে যাই। পিচের রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে কোনও গাড়ি দাঁড় করিয়ে লিফট নিয়ে নেব।”
রাহুল বিস্ময়ের সুরে বলল, “পায়ে হেঁটে! কম সে কম সাত-আট কিলোমিটার হাঁটতে হবে পিচের রাস্তায় পৌঁছতে হলে। হেঁটে যেতে যেতে সন্ধে নেমে যাবে। আর ওখানে পৌঁছলেই যে গাড়ি পাব, সে সম্ভাবনা কম। আসার সময় আমাদের আগে-পিছে আর কোনও গাড়ি দেখলে? তার চেয়ে বরং দেখি কাছেপিঠে যদি কোনও বাড়ি-ঘর চোখে পড়ে।”
আর কোনও অপশন ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগোতে লাগল ওরা। রাহুলের আশা ছিল, সামনে কোন বাড়ি-ঘর নিশ্চয়ই থাকবে। কিন্তু অদিতি নিরাশ হয়ে পড়েছিল।
|| ৩ ||
প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর পথে একটা ঝরনা পড়ল। নিঝুম অরণ্যে কুলকুল শব্দে ঝরনার জল বয়ে চলছিল। অগভীর হলেও ঝরনা পার হবার জন্য একটা কাঠের পুল ছিল। পুল পেরিয়ে আরও খানিকটা গিয়ে ওরা একটা বড় বাংলো দেখতে পেল। ইংরেজ আমলের বিশাল আলিশান বাংলো। কালের নিয়মে কয়েকশো বছর পুরনো বাংলোর বাইরের চাকচিক্য খানিকটা ম্লান হলেও বেশ আকর্ষণীয় লাগছিল বাংলোটি।
রাহুল আর অদিতি বাংলোর দিকে যত এগিয়ে যাচ্ছিল, বাংলোটি আরও বিশালাকার ধারণ করছিল। বাংলোর সামনে একটি ফোয়ারা ছিল। ফোয়ারায় ধুলো, মাটি আর শুকনো ঝরা পাতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
অদিতি বলল, “রাহুল, আমার তো মনে হয় না এখানে কেউ থাকে! চলো ফিরে যাই।”
রাহুল বলল, “এখন আর ফিরে যাবার উপায় নেই। চলো ভেতরে গিয়ে দেখি কেউ আছে কিনা।”
ওরা দু’জনে বাংলোর মূল ফটকে গিয়ে দাঁড়াল। ফটকের পাশেই দেখল, একটা ধামায় তাজা সবুজ ঘাস রাখা। ফটকটি বিশাল বড় আর লোহার তৈরি। কয়েকশো বছর ধরে বাংলোর প্রবেশপথ আগলে সদর্পে দাঁড়িয়ে ছিল ফটকটি। রাহুল সবলে ধাক্কা দিল আর ফটকটা ক্যাঁ-অ্যাঁ-চ আওয়াজ করে খুলে গেল। বাংলোর ভেতরে ঢুকে দু’জনের মুখ হাঁ হয়ে গেল। আলিশান বাংলোর দেওয়ালে বড় বড় তৈলচিত্র টাঙানো ছিল, যার মধ্যে পেন্টিং করা ছিল ইংরেজ শাসকদের ছবি। সুদৃশ্য নকশা আঁকা বড় বড় স্তম্ভ, যা বাংলোর ছাদ সযত্নে ধরে রেখেছিল। ছাদ থেকে ঝোলানো রংবেরঙের বড় বড় কাচ দিয়ে সাজানো ঝাড়বাতিটি দেখে মনে হচ্ছিল অগাধ ধনসম্পদের অধিকারী কোনও ইংরেজ অফিসারের বাংলো। সামনে দোতলায় যাবার সাপের মতো প্যাঁচানো উঁচু উঁচু রেলিং দেওয়া সিঁড়ি দেখে মনে হচ্ছিল যেন চাঁদে যাবার সিঁড়ি। চারদিকে ধুলো, মাটি আর মাকড়সার জালে ভরা ছিল, তাতেও বাংলোর গ্ল্যামার খুব একটা কমেনি। বাংলো দেখে ওরা দু’জন এমন মোহিত হয়ে হয়েছিল, যে ভুলেই গিয়েছিল, এখানে আশ্রয় খুঁজতে এসেছে।
বাংলোর মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে কখন সন্ধে নেমে গেছে, বুঝতেই পারেনি। চারপাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকতে শুরু করল। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে শুরু হল বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি। ওপরে কী আছে দেখার জন্য সিঁড়ি বেয়ে ওরা উঠে গেল দোতলায়। সামনেই একটা ঘরে জানালার কাচের পাল্লা দিয়ে বাইরের বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল। সেই আলোয় চোখে পড়ল, একটা টেবিলের উপর ডাঁই করে রাখা কাগজের স্তূপ, টেবিলের সামনে নকশা আঁকা কিছু পুরনো কাঠের চেয়ার আর পাশেই একটা আলমারি। দেখে মনে হচ্ছিল স্টাডি রুম। বাইরে দুরন্ত বিদ্যুতের ঝলকানি, হাওয়ার দাপট আর মাতাল করা বৃষ্টির শব্দ। তার পাশেই একটা আলিশান বেডরুম ছিল। বেডরুমে গিয়ে একটা ব্যাপার যা ওদের আশ্চর্য লাগল, তা হল বেডের উপর পাতা চাদর। টান টান করে পাতা। বেড দেখে মনে হচ্ছিল, ওখানে এখনও কেউ ঘুমোয়। একদম পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু পুরো ঘরে কেমন যেন একটা চাপা দুর্গন্ধ।
অদিতি বলল, “এই বিছানা এত পরিষ্কার! নিশ্চয়ই এখানে কেউ থাকে।”
রাহুল বলল, “তুমি ঠিকই বলছ। আওয়াজ দিয়ে দেখি কে আছে এখানে।”
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে আওয়াজ দিল, “কেউ আছেন এখানে? আমাদের একটু হেল্প করুন।” কোনও জবাব এল না।
আবার আওয়াজ দিল, কিন্তু কোনও সাড়া নেই।
তখন রাহুল বাংলোর এক কোণায় একটা ঘরের দরজা দিয়ে হালকা ধোঁয়া বেরোতে দেখল। অদিতিকে বলল, “ওটা মনে হয় রান্নাঘর। ওখানে নিশ্চয়ই কেউ থাকবে। দাঁড়াও, দেখে আসছি।”
| — | “আচ্ছা যাও। কিন্তু তাড়াতাড়ি এসো।” |
রাহুল দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল, তারপর ভেতরে ঢুকে গেল। ও ঠিকই আন্দাজ করেছিল। ওটা রান্নাঘরই ছিল। পুরনো দিনের কেরোসিন লন্ঠন জ্বালানো ছিল। ওখানে বড় বড় দুটো চুলো ছিল আর চুলোর উপর বড় বড় তামার হাঁড়ি রাখা ছিল। হাঁড়িতে রান্না হচ্ছিল। কিন্তু রান্নাঘরে কেউ ছিল না। রান্নাঘরটা বেশ বড় ছিল, এক কোণায় শুকনো জ্বালানি কাঠ ঢিপি করে রাখা ছিল। আরেক কোণায় ছিল কিছু বাসন-কোসন, আর একটা বেতের ঝুড়ি, যার মধ্যে কিছু পুরনো কাপড় রাখা ছিল। পাশে একটা লোহার ড্রামও ছিল, যার উপর লোহার ঢাকনা দেওয়া ছিল। রান্নাঘরের মেঝে জলে ভেজা ছিল। বাইরের বৃষ্টির জল কোনভাবে চুঁইয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ করেছিল। হাঁড়ি থেকে যে গন্ধ আসছিল, তাতে মনে হচ্ছিল, চুলোয় রাখা দুটো হাঁড়িতে মাংস রান্না হচ্ছে। রাহুল হাঁড়ির ঢাকনা সরিয়ে দেখতে চাইল, কিন্তু ঢাকনা গরম ছিল। পাশেই রাখা বেতের ঝুড়ি থেকে একটা ন্যাকড়া নিল। ওটা কারো ছেঁড়া জামা ছিল, যাতে রক্তের দাগ লেগে ছিল। রাহুল ওই ন্যাকড়া দিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা সরাল আর লণ্ঠনের আলোয় ভেতরে যা দেখল, তাতে ওর চোখদুটো বড় বড় হয়ে উঠল। হাঁড়ির মাংসের মধ্যে চোখে পড়ল কবজি থেকে কাটা একটা মানুষের হাত। এমন দৃশ্য দেখে ওর হাত থেকে লোহার ঢাকনা মেঝেতে পড়ে গিয়ে প্রচণ্ড শব্দ হল। কৌতূহল বশত পাশেই রাখা বড় লোহার ড্রামটার ঢাকনাও রাহুল সরিয়ে দেখল। ওর মধ্যে একটা মানুষ কেটে টুকরো টুকরো করে রাখা ছিল। বুঝতে দেরি হল না, ওরা খুব ভুল জায়গায় এসে পড়েছে। রাহুল খুব দ্রুত রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। চিৎকার করতে করতে অদিতিকে ওখানে থেকে পালাতে বলল। অদিতি দৌড়ে মূল ফটকের কাছে গিয়ে ফটকটি খোলার জন্য ধাক্কা দিতে লাগল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা আগেই যে ফটক ঠেলে ওরা প্রবেশ করেছিল, তা আশ্চর্যজনকভাবে জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। রাহুলও প্রচন্ড বল প্রয়োগ করল, কিন্তু ফটকটি ওর জায়গা থেকে এক চুলও নড়ল না।
মূল ফটকের বাইরে একটা ঘোড়ার চিঁ-হিঁ শব্দ ভেসে এল। বাইরে কোন ঘোড়সওয়ার ছিল। রাহুল অদিতিকে চুপ করে থাকতে বলল আর দরজায় লাগানো বড় লোহার হ্যাচবোল্ট ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল, যাতে করে বাইরে যে ছিল, সে ভেতরে আসতে না পারে। এরপর দু’জনে খুব সাবধানে ভেতরে গিয়ে একটা ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। ওই ঘরের জানালার পাল্লা ভাঙা ছিল, কিন্তু জানালায় লোহার গ্রিল লাগানো ছিল। জানালা দিয়ে পালানোর উপায় ছিল না।
অদিতি রাহুলকে জিজ্ঞেস করল, “রান্নাঘরে কী দেখলে?”
রাহুল করুণ স্বরে বলল, “অদিতি! আমরা এখানে খুব বাজেভাবে ফেঁসে গেছি। যে এখানে থাকে, সে মানুষ খুন করে কেটে রান্না করে খায়।”
একথা শুনে অদিতি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমরা এখান থেকে বেরোব কী করে?”
রাহুল বলল, “এখানকার সব দরজা বন্ধ আর জানালায় গ্রিল লাগানো। আমরা বাইরে বেরোতে পারব না।”
অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমরা কি তাহলে মরতে চলেছি?”
রাহুল আবেগভরে অদিতিকে জড়িয়ে ধরে বলল, “না, আমি তোমার কিচ্ছু হতে দেব না।”
রাহুল জানালার কাছে গিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল। বাইরে চাঁদের আবছা আলোয় দূরে জঙ্গলের কাছে একটা গাছের ডাল নড়ছিল। ভালো করে লক্ষ করে দেখল, ওখানে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে, ওরা বাংলোর দিকেই তাকিয়ে ছিল। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। শুধু এটুকু বোঝা যাচ্ছিল, ওখানে দু’জন দাঁড়িয়ে। তখনই রাহুলের নজর বাংলোর কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা একটা ঘোড়ার দিকে গেল। ধবধবে সাদা ঘোড়া আর ঘোড়ার উপর একজন লম্বা চওড়া লোক বসে ছিল। ঘোড়াটা বাংলোর মূল ফটকের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। রাহুল আর অদিতি ঘোড়াটার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তখুনি আকাশে আচমকা বিদ্যুৎ চমকাল আর বিদ্যুতের আলোর ঝলকানিতে চারদিক ক্ষণিকের জন্য আলোকিত হয়ে উঠল। সেই আলোয় ওরা দেখতে পেল, ঘোড়ার উপর যে লোকটা বসে ছিল, তার ধড়ের উপর মাথা ছিল না। লোকটা ইংরেজ সাহেবের পোশাক পরে ছিল। রাহুল আর অদিতি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না, একজন মস্তকবিহীন ইংরেজ অফিসার ঘোড়ায় চড়ে বাংলোর ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
ভেতরে রান্নাঘরে চুলোয় রান্না হতে থাকা মানুষের মাংস আর বাইরে দাঁড়িতে থাকা এক জীবিত স্কন্ধকাটা। এমন ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, দু’জনে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।
রাহুল অদিতিকে বলল, “আমি বাইরের জঙ্গলে গাছের ফাঁকে একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। ওদের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে হবে।”
অদিতিও বাইরে তাকিয়ে ওই দু’জনকে গাছের আড়ালে দেখতে পেল। ওই দু’জন দূর থেকে ওদের জানালার দিকেই তাকিয়ে ছিল।
রাহুল আর অদিতি জানালা দিয়ে হাত বের করে ইশারা করে ওদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। কিন্তু ওরা নির্বিকার হয়ে চেয়ে রইল। রাহুল আর অদিতি একটা জোরে শব্দ শুনল। কেউ সবলে ঠেলে মূল ফটকটা খুলছিল। ফটকটা ক্যাঁ-অ্যাঁ-চ আওয়াজ করে খুলে গেল। ওরা ঘরের আড়াল থেকে লুকিয়ে মূল ফটকের দিকে দেখতে লাগল। ফটক দিয়ে ঘোড়াটা ভেতরে এল আর সেই সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে চড়া সেই স্কন্ধকাটা। রাহুল আর অদিতির গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল আর ওরা থরথর করে কাঁপতে লাগল। একজন জীবিত স্কন্ধকাটা দেখে ভয়ে অজ্ঞান হতে বসেছিল। ওরা দেখল, বাংলোর ঠিক মাঝামাঝি ঝোলানো কাচের ঝাড়বাতির নীচে একটা বড় টেবিল ছিল আর তাতে কয়েকটা ডেকচি রাখা ছিল। স্কন্ধকাটা ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়ার পিঠে রাখা একটা ঝোলা নামাল। ওই ঝোলা হাতে নিয়ে রোবটের মতো হেঁটে হেঁটে খাবার টেবিলে এসে চেয়ার টেনে বসল। তারপর ঝোলা থেকে কিছু বের করল। রাহুল আর অদিতি ওদের ঘর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে এসব দেখছিল। স্কন্ধকাটা ঝোলা থেকে একটা কাটা মুণ্ডু বের করেছিল, যা থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছিল। সাহেব কাটা মুণ্ডুটা তাঁর ধড়ের উপর রেখে আলতো মোচড় দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে মুণ্ডুটা ওই সাহেবের ধড়ের সঙ্গে এমনভাবে আটকে গেল যেমন চুম্বক লোহার সঙ্গে আটকায়। এরপর সাহেব টেবিল থেকে ডেকচি নিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। তারপর রান্নাঘর থেকে ডেকচি ভরে রান্না করা মানুষের মাংস নিয়ে এল আর টেবিলে বসে জংলী জানোয়ারের মতো ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খেতে লাগল। ঘোড়াটা ফটকের পাশেই রাখা সবুজ ঘাস খাচ্ছিল।
রাহুল দেখল, বাংলোর মূল ফটক খোলা আর ওই ইংরেজ সাহেব খেতে ব্যস্ত ছিলেন। রাহুল আর অদিতির কাছে পালানোর সঠিক সুযোগ ছিল। ওরা শ্বাস বন্ধ করে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে ফটকের দিকে যেতে লাগল। ওদের নজর মাংস খেতে খাকা ওই ইংরেজ সাহেবের দিকেই ছিল, যে খেতে এত মগ্ন ছিল যে, কোনও হুঁশই ছিল না যে, ওর পিঠের পেছন পেছন দু’জন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অত্যন্ত সাবধানে রাহুল আর অদিতি মুখ্য ফটক পর্যন্ত পৌঁছল আর তারপর উর্ধশ্বাসে দৌড়ে পালাল। বাইরে বেরিয়ে ওদের ধড়ে প্রাণ এল আর ওরা প্রাণপণে জঙ্গলের দিকে দৌড়তে লাগল। জঙ্গলে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে ওরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
রাহুল হাঁপাতে হাঁপাতে অদিতিকে বলল, “থ্যাঙ্ক গড। কম সে কম ওই স্কন্ধকাটার বাংলো থেকে তো বাইরে আসতে পেরেছি। এখন এই জঙ্গল থেকে বাইরে বেরোতে হবে।”
কিন্তু অদিতি একদম চুপ করে ছিল। ও বিস্ময়ের সঙ্গে তখনও ওই বাংলোর দিকেই চেয়ে ছিল।
রাহুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “অদিতি! কী হল তোমার?”
অদিতি এক হাত তুলে ওই বাংলোর দিকে ইশারা করল। রাহুলও বাংলোর দিকে তাকাল। ওর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। ওর মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। রাহুল দেখল, ওই বাংলোর জানালা দিয়ে হাত বের করে দু’জন ইশারা করছিল। একজন ছেলে আরেকজন মেয়ে। ওরা সাহায্যের জন্য কাতর আকুতি জানাচ্ছিল। ওরা দু’জন আর কেউ নয়, রাহুল আর অদিতিই ছিল, যারা ওই বাংলো থেকে কখনওই বেরোতে পারেনি।
আজও ওদের গাড়ি জঙ্গলে বেওয়ারিশ অবস্থায় পড়ে থাকতে থাকতে জংলি লতাপাতায় ঘিরে ফেলেছে। আজও ওই বাংলো থেকে রাতবিরেতে সাহায্যের জন্য দু’জনের কাতর আর্তনাদ শুনতে পাওয়া যায়। আজও ওই জঙ্গলে ঘোড়ায় চড়া স্কন্ধকাটা ওই ইংরেজ অফিসারকে টহলরত অবস্থায় দেখা যায়।
.
অমিতাভ সাহা
কোচবিহার শহরের বাসিন্দা। শখের বশে লেখালিখি করেন। ছোটবেলায় লেখালিখির শুরু। তবে মাধ্যমিকের সময় থেকে পড়াশোনার চাপে ও কেরিয়ার গড়ার লক্ষ্যে দীর্ঘ দশ-বারো বছর লেখালিখির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না। এখন চাকরি জীবনে এসে লেখালিখির প্রতি আবার একটা টান অনুভব করছেন। মূলত ছোটগল্প লিখতেই পছন্দ করেন। “উত্তরবঙ্গ সংবাদ” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কয়েকটি অণুগল্প। তাছাড়া ছোটদের ওয়েব ম্যাগাজিন ‘জয়ঢাক’ ও ‘একপর্ণিকা’-য় লেখকের লেখা কয়েকটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে।
