ডক্টর আমন আলি ● মৌমিতা জোয়ারদার
ডক্টর আমন আলি – মৌমিতা জোয়ারদার
লোলেগাঁও-এর অনতিদূরে একটা গ্রাম কাফের। নির্জন পাহাড়ের বুকে সেই গ্রামে হাতেগোনা কয়েকটি বাড়ি, খুবই অল্প জনবসতি আর গোটা তিনেক হোটেল। কিছু ট্যুরিস্ট আসে এখানে, যারা লোলেগাঁও-এর থেকে নির্জন পাহাড়ি এলাকা ভালোবাসে। এখানে হোটেলগুলোর মধ্যে সব থেকে চালু ‘শৈলবালা ইন’।
‘শৈলবালা ইন’-এর মালিক হলেন নির্মল চক্রবর্তী। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে লিজ নিয়ে হোটেলটি চালু করেন চক্রবর্তী বাবু। তখন তাঁর বয়স কতই বা হবে? বড় জোর কুড়ি-একুশ। সবে কলেজে ঢুকেছেন। এমন সময় হঠাৎ বাবার অকালপ্রয়াণে মাকে নিয়ে অথৈ জলে পড়েন তরুণ নির্মল চক্রবর্তী। বাবা এক ছোট প্রাইভেট সংস্থায় কাজ করতেন। বাবার মৃত্যুর পর তখন কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছেন নির্মলবাবু। তখন প্রস্তাবটা দেন তাঁর এক বিত্তশালী দূর সম্পর্কের মামা। কাফেরে হোটেলের উদ্দেশ্যে বানিয়েছিলেন বাড়িটা সেই মামা। নির্মলবাবুকে হোটেলটা লিজে নেওয়ার প্রস্তাব দেন সেই মামা। নির্মলবাবুর আর্থিক অক্ষমতা দেখে করুণা হয় সেই মামার। মামা বলেন, ‘তুই হোটেলটা চালা, প্রথম প্রথম কিছুই দিতে হবে না আমায়, পরে ব্যাবসা দাঁড়ালে আমায় কিছু দেবার কথা ভাবিস।’ হাতে যেন চাঁদ পেয়েছিলেন তিনি।
মাকে নিয়ে কলকাতা ছেড়ে চলে এসে হোটেল ব্যাবসা শুরু করেন নির্মল চক্রবর্তী। মা শৈলবালা দেবী গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের বিধবা। স্বপাকে রেঁধে খান। পূজা অর্চনা নিয়ে কেটে যায় তাঁর দিন। ঠাকুরঘরে নারায়ণ শিলা রয়েছে। এহেন শৈলবালা দেবীর প্রথম দিকে আপত্তি ছিল ছেলের এই হোটেল ব্যাবসা নিয়ে। বাড়িতে বাইরের লোকজন আসবে, কে কোন জাতের জানা নেই। কিন্তু সংসারের আর্থিক সঙ্কটের কথা ভেবে ছেলের ব্যাবসায় সায় দিলেও, ছেলেকে তাঁর মাথায় হাত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন কোনও বেধর্মের লোক যেন তার হোটেলে না থাকে। এরপর আস্তে আস্তে মা লক্ষ্মীর দয়ায় নির্মল চক্রবর্তীর হোটেল ব্যাবসা জমে উঠল। মা’র নামেই নাম রাখেন হোটেলের – ‘শৈলবালা ইন’। চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি পেল। এরপর নির্মল বাবুর সংসার হল।
এখন তিনি প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায়। তাঁর একমাত্র কন্যার বিয়ে হয়ে গেছে। মা গত হয়েছেন বছর দশেক হল। স্ত্রী এবং তিনি থাকেন ওই ‘শৈলবালা ইন’-এর দোতলায়। শৈলবালা দেবীর মৃত্যুর পর এখন আর কোনও বাধা-নিষেধ নেই। সব ধর্মের লোকই আসে তাঁর হোটেলে।
বর্ষা নেমে গেছে পাহাড়ে। চলবে প্রায় পুজো পর্যন্ত। সকাল থেকে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। পাহাড়ে বৃষ্টি নামলে টানা দু’-তিন দিন চলে। আজ ছিল হাটবার। একাই হাটে গিয়েছিলেন নির্মলবাবু। বাজার করে এনে হোটেলে শাটার তুলে মালপত্র তুলছিলেন। বছরের এই সময়টায় কোনও ট্যুরিস্ট আসে না। হোটেলের কুক শ্যাম আর বয় ছোটকাকেও তাই ছুটি দিয়ে দেন এই ক’মাসের জন্য। সন্ধ্যা নেমে গেছে পাহাড়ি রাস্তায়। কোনও আলো নেই। যেদিকে তাকানো যায় নিকষ কালো অন্ধকার। তার মধ্যে অঝোরে বৃষ্টি। পাহাড়ের গায়ে দু’-একটা বাড়িতে টিমটিমে আলো দেখা যাচ্ছে। ‘শৈলবালা ইন’ ছাড়া এখানের সব হোটেল বন্ধ থাকে এসময়। মালিকরা হোটেল বন্ধ করে নীচে চলে যায়। শন শন করে পাইন গাছের বনের মধ্যে দিয়ে হাওয়া বইছে। ‘শৈলবালা ইন’-এর সামনে একটা সাদা অ্যাম্বাস্যাডার এসে দাঁড়াল।
কে এল এই দুর্যোগে? একটু চমকে গেলেন চক্রবর্তী বাবু। একজন কালো স্যুট পরা ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন ‘শৈলবালা ইন’-এর দিকে। টিমটিমে আলোয় নির্মলবাবু দেখলেন ভদ্রলোকের মুখের খানিকটা ঢাকা একটা কালো হ্যাট-এ। নির্মলবাবু মালপত্তরের ব্যাগ তুলছিলেন রিসেপশনে।
ভদ্রলোক নির্মলবাবুকে শুধোলেন, “দাদা, এটা কি আপনার হোটেল?”
নির্মলবাবু বললেন, “হ্যাঁ বলুন কী করতে পারি আমি আপনার জন্য?”
স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক একটু থেমে বললেন, “একটু বিপদে পড়ে গেছি আর কী, আমি আলিপুরদুয়ার থেকে স্ত্রীকে নিয়ে লাভা এসেছি কাল। নিজেই ড্রাইভ করে আজ লোলেগাঁও এসেছিলাম দুপুরবেলা। ভেবেছিলাম লাভা ফিরে যাব। কিন্তু এত বৃষ্টি বেড়ে গেল…”
তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে চক্রবর্তী বাবু বললেন, “ও এই ব্যাপার? আমার হোটেলে ঘর চাই আপনার আজ রাতের জন্য? আসুন, আসুন…” টেবিলের কাছে ডেকে নিয়ে গেলেন সেই ভদ্রলোককে চক্রবর্তী বাবু।
মনে মনে ভাবলেন, “কার মুখ দেখে আজ ঘুম থেকে উঠেছি কে জানে? এই অফ-সিজনে এক রাতের ভাড়া তো জুটে গেল!”
রেজিস্টার খাতাটা বের করে ধুলো মুছে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিলেন চক্রবর্তী বাবু।
“হেঁ হেঁ, এখানে আপনার নাম, ঠিকানা, বয়স সব লিখুন, এই নিন পেন।”
ভদ্রলোক কোনও কথা না বলে খাতাটা নিয়ে লিখে চক্রবর্তী বাবুর দিকে ঠেলে দিলেন খাতাটা।
বৃষ্টি বেড়েই চলেছে। অন্ধকারের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কাচের জানলা দিয়ে সেই আলো এসে পড়ছে রিসেপশনে।
“হয়ে গেছে লেখা?” খাতাটা টেনে নিয়ে নির্মলবাবু দেখলেন নামের জায়গায় লেখা ‘ডক্টর আমন আলি’।
মুহূর্তে যেন কোথায় হারিয়ে গেলেন নির্মলবাবু।
আজ থেকে প্রায় বছর পঁচিশ আগের কথা। তখন সদ্য ব্যাবসা শুরু করেছেন নির্মল বাবু। আশেপাশে আর কোনও হোটেল ছিল না তখন। সেদিনও সন্ধেবেলায় এরকম অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। একটা গাড়ি এসে থেমেছিল তার হোটেলের সামনে। এক বছর তিরিশের তরুণ রিসেপশনে এসে একটা ডবল বেড রুম চেয়েছিল সেই রাতের জন্য সে আর তার স্ত্রী থাকবে বলে। সেই যুবক আরও বলেছিল সেই দিনই তাদের লাভা ফিরে যাবার কথা। কিন্তু ওয়েদার খারাপ থাকায় সে ফিরতে পারছে না। রেজিস্টারে নাম ফিলাপ করার পর নির্মলবাবুর চোখে পড়েছিল বোর্ডারের নাম ‘ডক্টর আমন আলি’। সে মুহূর্তে তাঁর মনে পড়ে যায় মায়ের মাথায় হাত রেখে দিব্যি খাবার কথা। খাতা থেকে মুখ তুলে সেদিন সেই যুবককে নির্মলবাবু বলেছিলেন, ‘সরি দাদা, আমি আপনাকে রুম দিতে পারব না। আর হাফ কিলোমিটার গেলেই লোলেগাঁও পাবেন। সেখানে হোটেল পেয়ে যাবেন।’ অবাক হয়ে যুবক বললেন, ‘কিন্তু একটু আগেই তো আপনি রাজি ছিলেন, এই খারাপ ওয়েদার এর মধ্যে ড্রাইভ করাটা খুব রিস্কি… এখানে আর কোনও হোটেলও নেই… শুধু আজকের রাতটা…’
ইতস্তত করে নির্মল বাবু বললেন, ‘আসলে আমরা চক্রবর্তী, গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবার। আমার মা চান না…’
তাঁর কথা শেষ হবার আগেই ঈষৎ হেসে সেই যুবক বললেন, ‘ওকে, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। আসলে বিপদে পড়েই… শুধু একটা রাতের জন্য…’ বলতে বলতে রিসেপশন থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে যায় সেই যুবক ।
দু’দিন পর বৃষ্টি থামতে হাটে খবরটা পেয়েছিলেন নির্মলবাবু। কে একজন ডাক্তারের গাড়ি শৈলবালা ইন থেকে কিছুটা দূরে পাহাড়ী রাস্তার ঢালে গড়িয়ে পড়ে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। ডাক্তারের গাড়িতে নাকি তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীও ছিল। বৃষ্টি থামার পর গাড়ির মধ্যে থেকে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ডাক্তারের কোটের পকেট থেকে কাগজপত্র থেকে জানা গেছে তাঁর নাম আমন আলি।
সেই ঘটনার পর থেকে বেশ কিছুদিন রাতে ঘুমাতে পারেননি নির্মল চক্রবর্তী। বলতেও পারেননি সেদিনের কথা কাউকে। শুধু অনুশোচনার আগুনে ছাই হয়ে গিয়েছিল তার অন্তরের অন্তঃস্থল।
“কী হল! কী ভাবছেন?” স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক ভদ্রলোকের গলায় হুঁশ ফিরল নির্মল চক্রবর্তীর। তাঁর চোখ দুটো স্থির হয়েছিল রেজিস্টার খাতায় লেখা লাল কালিতে লেখা নামটার দিকে। ডক্টর আমন আলি। গলাটা তাঁর শুকিয়ে আসছিল, মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হচ্ছিল না।
“এই নিন আপনার পেনটা”, বলে স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক খাতার ওপর রাখলেন পেনটা। রিসেপশনের টিমটিমে আলোয় চক্রবর্তী বাবু দেখলেন মানুষ নয়, একটা কঙ্কালের হাত খাতার ওপর। হাতের আঙুলের হাড়ের ফাঁকে ধরা লাল পেনটা।
পরদিন সকালে আকাশে মেঘ সরে গিয়ে সূর্য দেখা দিয়েছিল। প্রভাতী সূর্যের আলোয় পাহাড়ি গ্রাম ‘কাফের’ যেন নতুন রূপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল।
‘শৈলবালা ইন’-এর রিসেপসনের টেবিলে মাথা রাখা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল হোটেলের মালিক নির্মল চক্রবর্তীর মৃতদেহ, চোখদুটো ছিল খোলা, ত্রাস বিস্ফোরিত। স্থানীয় ডাক্তার এসে ডেথ সার্টিফিকেটে লিখেছিলেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এর কারণে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। ডেড বডির মাথার নীচে রাখা খোলা খাতাটার পাতার উপরে জ্বলজ্বল করছিল লাল কালিতে লেখা একটা নাম – ‘ডক্টর আমন আলি’।
.
মৌমিতা জোয়ারদার
জন্ম শিল্পশহর আসানসোলে। বিজ্ঞানের ছাত্রী হলেও বাংলা পড়তে আর লিখতে ভালোবাসেন। সেই ভালোবাসার টানেই নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো লিখে ফেলেন। আর সেই লেখাগুলোই ছোটগল্পের রূপ নিয়ে নেয়। বেশ কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন ও প্রতিযোগিতায় সমাদৃত হয়েছে তাঁর লেখা।
