সে আমার ছোট বোন ● অভিষেক ঘোষ (শিবাঙ্গণ)
সে আমার ছোট বোন – অভিষেক ঘোষ (শিবাঙ্গণ)
– “দাদা, এই দাদা, এদিকে একবার আয় না রে।”
– “আসছি।”
– “ঠিক আছে।”
– “হুমম”
– “দাদা, তোর অনেক দেরি হবে, তাই না রে?”
– “না রে, আসছি, জাস্ট দু’ মিনিট।”
– “দু’… মিনিট, বাবা রে বাবা, এত্ত দেরি…”
– “আসছি রে, একটু ওয়েট কর, সুমি, এখুনি আসছি।”
– “ঠিক আছে, না মানে দু’ মিনিট বললি তো…”
– “এই তো, আসছি।”
– “একটু তাড়াতাড়ি, প্লিজ।”
– “কেন রে, কী হয়েছে?”
– “না, কিছু হয়নি। এ… এমনি, আয়, বলছি।”
– “কেন রে? কিছু প্রবলেম?”
– “না না, প্রবলেম কিছু নয়…”
– “একটু দাঁড়া, আমার এই হয়ে গেছে।”
– “জানিস দাদা, সেদিন আমাদের হোস্টেলে একটা বড় সাপ বেরিয়েছিল। গো… গোখরো। সবাই তো ভয় পেয়ে একসা, সঞ্চিতা, রিনি, বিশাখা তো খাটের ওপর উঠে…”
– “সে কী রে, বলিসনি তো, সাংঘাতিক ব্যাপার। তারপর…?”
– “তারপর আর কী? সা… সা… সাপটাকে তো তাড়াতে হবে… তা… তাই না?”
– “সে তো বটেই, তো তোদের হোস্টেলের দারোয়ান…”
– “সে তো ভয়েই কাত, শেষমেশ আমিই…”
– “তুই গোখরো সাপ তাড়ালি?”
– “হ্যাঁ, তাড়ালাম তো। একটা লাঠি দিয়ে…”
– “সে কী রে, এ তো বিশাল সাহসের কাজ, যদি সাপটা তোকে…”
– “কে… কেন? আমার কি সা… সাহস নেই, নাকি?”
– “না, সেটা নয়, তাও গোখরো সাপ বলে কথা…”
– “দাদা, তোর হল রে, আর কত দেরি হবে তোর আসতে?”
– “এই তো, আসছি রে, একটু দাঁড়া…”
– “দ্যাখ, তোর যদি না আসতে ইচ্ছা করে তো ছেড়ে দে। আ… আসতে হবে না।”
– “যাচ্ছি, বললাম তো…”
– “সে তো, সেই এক ঘণ্টা ধরে বলছিস, আয় না রে, প্লিজ।”
– “কী হয়েছে রে?”
– “কী আবার হবে, এমনি ডাকছি, আয় না, প্লিজ…”
– “যাচ্ছি। তুই কি ভয় পেয়েছিস?”
– “ছেড়ে দে, আসতে হবে না তোকে, তোর মনে হচ্ছে, আমি ভয় পেয়ে তোকে ডাকছি। ভুলে যাস না, আমি নিজে…”
– “তুই নিজে, কী?”
– “গো… গো… গোখরো সাপ তাড়িয়েছি।”
– “হ্যাঁ, আমি জানি তো, তুই খুব সাহসী। তো… এখন কী হয়েছে?”
– “এই দাদা, আয় না… আয় না রে, তাড়াতাড়ি।”
– “কী জ্বালা রে বাবা, বলছি তো যাচ্ছি।”
– “সে তো সেই কখন থেকে বলছিস, কিন্তু আসছিস কই, দ্যাখ আমি কিন্তু এবার…” (গলাটা কেঁপে উঠছে সুমির)
– “জাস্ট দু’ সেকেন্ড।”
– “তুই রাখ তোর দু’সেকেন্ড, আসতে হবে না তোকে, তোর বোন মরে যাক, তাও তুই শুয়ে থাক, ঘুমো। এই আমি বলে দিলাম, আমি মরে যাবার সময় ডাকলেও আর কোনওদিন তুই আসবি না, কোনওদিন না।”
– “কীসব আজেবাজে কথা বলছিস? এই তো…”
– “থাক তুই তোর ঘরে, দরকার নেই আমার এমন দাদার, তুই জানবি তোর বোন মরে গেছে।”
– “এ তো মহাফ্যাসাদ হল।”
– “আমি তোর ফ্যাসাদ, তাই না? আমার জন্য তোকে ফ্যাসাদে পড়তে হচ্ছে, তাই না রে?” (কেঁদে ফেলে সুমি)
– “আরে না না, সেটা কখন বললাম?”
– “শোন, আমি হেব্বি সাহসী। আমি যখন একা গো… গো… গোখরো সা… সাপ তাড়াতে পেরেছি, তখন আমি এবারও পারব। তোর হেল্প আমার লাগবে না। থাক তুই তোর মতো।”
– “এই তো এসে গেছি। কী হয়েছে রে?”
নিজের ঘরে একটু শুয়েছিল রনি, ও এসে সুমির ঘরে ঢোকে। ঘরে ঢুকেই রনি দেখতে পায়, ওর বোনটা একরকম কাঠের মতো বিছানায় বসে আছে, ভয়ে মুখটা সাদা হয়ে আছে, ওকে দেখেই একরকম ঝাঁপ দিয়ে দাদার গলাটা আঁকড়ে ধরে সুমি।
– “কী রে, কী হয়েছে, এত ভয় পেয়ে গেছিস কেন?”
সুমি ভয়ে ভয়ে হাতের ইশারায় বিছানার কোণে বসে থাকা বাচ্চা আরশোলাটাকে দেখিয়ে দেয়।
রনি নিজেকে সংযত করে, সুমি দুঃখ পাবে ভেবে। সুমি তখনও ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে আছে।
সুমির কানে ফিসফিস করে রনি, “আচ্ছা সুমি, তুই তো গোখরো সাপ একা তাড়িয়েছিস, তাও এই আরশোলাটার বেলা একটু ভয়-ভয় করে তাই না রে?”
– “না রে, দাদা, আসলে এই আরশোলাটা দেখলে আমার কেমন যেন গা গুলোয়, গা-টা ঘিন ঘিন করে, তাই তোকে ডাকলাম, এমনিতে আমি ওটাকে তাড়িয়েই দিচ্ছিলাম। তুই এসে গেলি যখন, তুই না থাকলে তো আমিই…”
সুমির চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে রনি, “হ্যাঁ, সে তো দেখতেই পেলাম।”
* * * * *
– “দাদা, এই দাদা, এদিকে একবার আসবি রে?”
ডাকটা এবার যেন অনেক স্পষ্ট করে শুনতে পায় রনি, ধড়মড় করে উঠে বসে বিছানায়, সুমি ডাকছে। ঠিক আগে যেমন ভাবে ডাকে। কোনও সামান্য সামান্য বিষয়ে ভয় পেয়ে যায় সুমি, মাকড়শা, গঙ্গা ফড়িং, ভিমরুল তো দূরের কথা সামান্য আরশোলা দেখলেও ওর ভয়ের শেষ নেই, দাদার ডাক পরবে। রনিকে গিয়ে সেটাকে সুমির চক্ষের আড়ালে না পাঠানো অব্দি, ওর স্বস্তি নেই। বায়না করেই যাবে। আসলে, ভীষণ ভয় পেয়ে যায় সুমি। বাইরে প্রকাশ করে না, এমন একটা ভাব দেখায় যেন কত না সাহস, আসলে ভিতুর ডিম একটা, ওর যত সাহস ওর দাদাকে ঘিরে।
উঠে পড়ে রনি, বিছানা থেকে নেমে স্লিপারটা পায়ে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, দরজার দিকে। এবার সুমির গলার স্বরটা আরও একটু স্পষ্ট হয়, “তোর আসতে কি অনেক দেরি হবে রে?” কিছু বলে না রনি, ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়ায় সুমির ঘরের দরজায়। আলতো চাপ দিতে দরজাটা খুলে যায়, ভিতরে ঢোকে রনি। ওই তো, সুমি বিছানায় বসে, মুখটা আবার সেই সাদা ফ্যাকাসে, তার মানে কিছু একটা দেখে আবার ভীষণ ভয় পেয়েছে।
একটু থমকে দাঁড়ায় রনি। ও জানে আজ সেকেন্ড ডিসেম্বর। বাইরে বেশ কনকনে ঠান্ডা। জানলার বাইরে বেশ ঘন কুয়াশা জমে আছে, রাত তখন প্রায় একটা।
– “দাদা, কেমন আছিস রে?”
– “ঘাড় নেড়ে হেসে ওঠে রনি। ভালো, তুই কেমন আছিস?”
এবার হাসিটা যেন একটু নিষ্প্রাণ। তবু হাসে সুমি, “ভালো। কিন্তু তুই তো এখন আর আমার ঘরে আসিসই না।”
– “না মানে, সেরকম কিছু নয়…”
– “আমাকে ভুলেই গেছিস বল?”
– “না রে, তা নয়, আসলে এত কাজের চাপ?”
– “কী এত কাজ রে দাদা, যে তোর একমাত্র বোনটার একটু খোঁজ নিতে পারিস না। আমি রোজ অপেক্ষা করি তুই আসবি, অথচ আসিসই না। আমার কোনও খোঁজই তুই নিস না। আমি কি খেলাম, না খেলাম, কিচ্ছু না।”
– “না মানে, তুই খেয়েছিস আজকে?”
– “নাহ, ভালো লাগছে না।”
– “কেন রে, ভালো লাগছে না বলে খাবি না?”
মুখটা করুণ করে ওর দিকে তাকায় সুমি। “না রে, দাদা, রোজ ওই একই খাবার খেতে আর ভালো লাগছে না রে। ওরাও আর খেতে চাইছে না।”
– “ওরাও আর খেতে চাইছে না” কথাটা শুনে বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে রনির।
– “দ্যাখ না, আমার বন্ধুরা, না খেয়ে না দেয়ে, কেমন রোগা হয়ে যাচ্ছে। আমি চেষ্টা করি, ওদের জন্য একটু ভালো কিছু খাবার জোগাড় করতে, কিন্তু রোজ পাই না রে।”
– “তুই কিছু খাবি? আমি খাবার এনেছি তোর জন্য, এই দ্যাখ, তোর জন্য তোর ফেবারিট, চিকেন কষা।”
‘চিকেন কষা’ কথাটা শুনে সুমির চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করে ওঠে। সত্যিই ওর ভীষণ খিদে পেয়েছিল, তবু ও নিজেকে নিয়ে ভাবে না, ও ওর বন্ধুদের নিয়েই বেশি চিন্তিত।
রনি একটু এগিয়ে এসে ওর সঙ্গে করে নিয়ে আসা বড় পাত্রটা সুমির বিছানার একটা কোণে রাখে, যাতে ভর্তি করে রাখা চিকেন কষা। রনি সন্ধেবেলায় সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল।
– “ওখানে, অত দূরে রাখছিস কেন, দাদা? দে আমার হাতে এনে দে।”
– “না মানে, এই তো।”
– “দাদা, সত্যি করে একটা কথার উত্তর দিবি?”
– “বল না, কেন দেব না?”
– “দাদা, তুই আমাকে ভয় পাস, তাই না?”
কথাটা শুনে বুকটা কেঁপে ওঠে রনির, “না না, কী যে বলিস, ভয় পাব, কেন?”
– “সে তুই যাই বল, আমি জানি, তুই আমাকে ভয় পাস, কিন্তু আমি কী করব বল?”
রনি দেখতে পায়, সুমির চাদরের তলা থেকে এক এক করে ওর বন্ধুরা বেরিয়ে আসছে, ওদের লক্ষ্য খাটের কোণায় রাখা চিকেনের পাত্রটা। এক এক করে তিনটে বিষধর গোখরো সাপ বেরিয়ে আসে। সত্যিই ওই ইঁদুর ছুঁচো ব্যাঙ খেয়ে খেয়ে ওদের আর মন ভরছিল না। কিন্তু সুমি আর তার বেশি কিছু পাবেই বা কোথা থেকে, ওর এই ছোট্ট কুঠুরির মতো ঘরটার বাইরে তো এই দশ বছর বেরোইই না। সেই ২০১২ সালের ২রা ডিসেম্বর থেকে এই ঘরে নিজেকে বন্দি করে রেখেছে ও।
দিনটার কথা মনে হতে আজও শিউরে ওঠে রনি। ওদের পরিবারের জন্য একটা ভয়ঙ্কর অশুভ দিন ছিল ওই দিনটা। সুমি তখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে আর রনি সবে কলেজ শেষ করে চাকরির জন্য চেষ্টা শুরু করেছে। ওই দিনটা ছিল, সুমির জন্মদিন। প্রতিবারের মতো ওরা নিজেদের মতো করে জন্মদিনের একটা আয়োজন করেছিল। সুমির ইচ্ছাতেই ওর হোস্টেল থেকে বিশাখা, সঞ্চিতা, রিমিদেরকেও ইনভাইট করেছিল সেদিন। আর ছিল ওদের কলেজের অনীক, রক্তিমরা, সবাই মিলে খুব আনন্দ হই হই করেছিল। তারপর কথা ছিল, নীচে একতলার একটা ঘরে অনীকরা রাতে থেকে যাবে, আর সুমির ঘরের পাশের উল্টোদিকের ঘরটায় বিশাখারা। বেশ অনেক রাত পর্যন্ত ওরা ভীষণ আনন্দ, মজা করেছিল। তারপর প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ, সব মিটলে ওরা ঘুমোতে চলে যায়। নীচের ঘরে অনীকদের পৌঁছে দিয়ে রনি সেদিন ঘুমোতে গিয়েছিল। সুমির বাবা মাও সেদিন খুব আনন্দ করেছিলেন, সুমিকে আনন্দ করতে দেখে।
কিন্তু পরদিন সকালে যখন ওদের ঘুম ভাঙল, তখন ওদের জন্য একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি অপেক্ষা করে ছিল, যার পূর্বাভাস ওরা কেউ পায়নি। রনিরা সুমির ঘরে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল, ওর ছিন্নভিন্ন নিথর শরীরটা মাটিতে লুটিয়ে পরে রয়েছে। সারা শরীরে অজস্র আঘাতের চিহ্ন, কালসিটে পরে যাওয়ার কালো জমাট রক্তের ছোপ আর কোথাও তখনও টাটকা রক্ত চুঁইয়ে পরছে। কী ভয়ঙ্কর কষ্ট সুমি পেয়েছে ভেবে শিউরে উঠেছিল রনি। কিন্তু পাশের ঘরে বিশাখা আর নীচের ঘরে অনীকরা কেউ নেই, সঙ্গে ওরা যে গাড়িটা করে এসেছিল সেটাও ছিল না। কারওর বুঝতে বাকি ছিল না, ওরা সুমির চরম সর্বনাশ করে, ভোররাতে পালিয়েছে। ডাক্তার সুমিকে পরীক্ষা করে বলেছিলেন, ও মারা গেছে, বারংবার ওর ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। যার জন্য ওর শরীর থেকে অসম্ভব রক্তক্ষরণ হয়েছিল। আর শারীরিক ভাবে নিস্তেজ হয়ে পরলে ওকে গলা টিপে মেরে ফেলা হয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী ভোররাতের দিকেই ওই নিকৃষ্ট কাজটা করা হয়েছিল।
সব কাজ মিটিয়ে যখন বিধ্বস্ত বাড়ির লোকজন বাড়ি ফিরে এসেছিল, তখন অনেক রাত হয়ে গেছে। কিন্তু সেদিন অনেকরাতে ফিরে রনি চুপ করে ওর ঘরে বসেছিল। নিজেকে ভীষণ অসহায় অপরাধী মনে হচ্ছিল ওর, ওর এত আদরের বোনকে এভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হল, ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। তারপর কখন যে ওর চোখটা বন্ধ হয়ে এসেছিল, ওর নিজেরও খেয়াল ছিল না।
হঠাৎ একটা ক্ষীণ কণ্ঠ ওর কানে আসে, “দাদা, এই দাদা, একবার আসবি রে?”
চমকে ওঠে রনি, এ তো সুমির গলা, কিন্তু…
ও ছুটে গিয়েছিল সুমির ঘরে, সুমি বিছানায় বসে, ওর মুখটা ফ্যাকাসে সাদা, সাড়া গায়ে রক্তের ছোপ, চোখমুখে অসীম যন্ত্রণার আঁধার। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না, রনি। সুমি সামনে পা দুটো ছড়িয়ে বসে আছে, আর ওর হাতে ধরা সেই সাপলুডো খেলার বোর্ডটা। রনির মনে পড়ে, ও যখন গতকাল রাতে শেষ ওর ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তখন ওরা সাপলুডো খেলছিল, ও বলেছিল, ‘দাদা, তুই শুতে যা, আমরা এই শেষ দানটা খেলেই শুয়ে পরব।’
তারপর থেকে প্রতিবছর একটা করে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু হয়, ঠিক ওই ২রা ডিসেম্বর রাতে। রনি, সুমির ঘর থেকে ওর ডাক শুনতে পায়, ওর মনে হয়, সুমি যেন ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকছে, “দাদা, এদিকে একবার আসবি রে।”
* * * * *
আজ ২০২২ সাল, সেই ২রা ডিসেম্বর। এর মাঝে প্রত্যেক তেসরা ডিসেম্বর সকালে দেখা গেছে, সুমির বন্ধুরা একজন করে মারা গেছে, বিশাখা, সঞ্চিতা, রিমি, অনীক, রক্তিম, প্রত্যেকে। আর ওদের প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ ছিল বিষধর সাপের কামড়। এই ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার পর ওরা সব্বাই সব রকমের প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, গুনীন, ওঝা, তান্ত্রিক সবকিছু। কিন্তু কোনও রক্ষে হয়নি। ঠিক ওই নির্দিষ্ট দিনে কোথাও থেকে ভয়ঙ্কর বিষধর গোখরো সাপ ওদের কামড় দেয়, আর ওরা কয়েকমুহূর্তের মধ্যে বিষক্রিয়ায় মারা যায়। কয়েকজনের বাড়ির লোকেরা পরে জানিয়েছিল, ওই সময় রাতে ওঁদের ঘর থেকে ভয়ঙ্কর একটা হাসির শব্দ নাকি ওঁরা পেয়েছেন। কেউ বিশ্বাস করেছে, কেউ করেনি। কিন্তু তদন্তে সাপের কামড় ছাড়া আর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু, রনি জানে এসব খুনগুলো সুমিই করেছে, ওর সাপলুডো খেলার বোর্ডের সাপগুলো দিয়ে, যেগুলো ওর নির্দেশ মতো খুন করে, আবার মিলিয়ে গেছে বোর্ডের ছবিগুলোতে। তাই কোথাও ওদের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
* * * * *
আজ তাই ডাক পেয়েই রনি, এসে দাঁড়ায় সুমির ঘরে, সেই একদৃষ্টি, সেই এক বসার ভঙ্গি। কিন্তু এই এত বছরে আজ প্রথমবার সুমির ডাকে ওর ঘরে আসতে একটু ভয় লাগছে রনির। ওর সব বন্ধুদের তো ও শেষ করে দিয়েছে, রনি তো ভেবেছিল, ওর প্রতিশোধ পূর্ণ করার পর সুমির মুক্তি হয়ে যাবে, ও এবার আর ফিরে আসবে না। কিন্তু ও তো ডাকছে। তাও সুমির বন্ধু গোখরো সাপগুলোর জন্য রনি চিকেনের ব্যবস্থা করে রেখেছিল। সেটা নিয়েই ও এগিয়ে যায় সুমির দিকে। কিন্তু সত্যি বলতে কি ও চেয়েছিল সুমি যেন আর ফিরে না আসে। কিন্তু সেটা বাস্তবে হয়নি, এই লৌকিক জগৎ আর অলৌকিক জগতের দোলাচলে পরে, সুমি এবারেও ফিরে এসেছে।
– “কী রে, দাদা, তুই কি ভয় পাচ্ছিস, আমার কাছে আসতে?”
সুমির কথায় সম্বিত ফেরে রনির, “না না, ভয় পাব কেন? আর তুই আমার নিজের বোন, তোকে আমি ভয়…”
– “জানিস তো দাদা, আগে আমি কত ভিতু ছিলাম, তাই না বল? কিন্তু জানিস তো আমি আর কিছুতে এখন ভয় পাই না, এই দ্যাখ…”
নিজের হাতটা রনির দিকে এগিয়ে দেয় সুমি, তাতে দুটো বিষধর গোখরো সাপ জড়িয়ে রয়েছে। বাইরে কাঁচের জানলা দিয়ে যেটুকু আলো এসে পরছে, তাতে ঘরে একটা অদ্ভুত আলো আঁধারির পরিবেশ, আর তারমধ্যে ওই সাপগুলোর ভয়ঙ্কর শরীরটা কেমন যেন একটা মায়ার আবহ তৈরি করেছে। রনির ভয় করছে, তবু ও ঘর ছেড়ে যেতে পারছে না, ওর হাত পা শিথিল হয়ে আছে।
– “দাদা জানিস, আজই আমার শেষ ফিরে আসা, আর আমি তোর কাছে কোনওদিন ফিরে আসব না। আমি ওদের সব্বাইকে ওদের শাস্তি দিয়েছি।”
– “তুই?”
– “হ্যাঁ রে, আমি, আর আমি সেটা করেছি আমার ওই গোখরো বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে, মরে যাওয়ার আগে ওদের যন্ত্রণায় কাতরানো মুখগুলো দেখে আমার ভীষন ভালো লাগত, আমার মনটা আনন্দে ভরে যেত, বিশ্বাস কর।”
রনি বুঝতে পারে, ওর সন্দেহই সঠিক। সুমিই প্রত্যেক বছর এক এক করে ওদের মেরেছে।
– “দাদা, জানিস তো, প্রতিবছর ওরা এক এক করে আমার হয়ে ওদের শেষ করে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু, আমি তো ওদের প্রতিদানে কিছু দিতে পারিনি, তাই না? ওই ইঁদুর, ছুঁচো, ব্যাঙ ধরে ধরে এনে ওদের খেতে দিয়েছি, আর ওরাও শুধু মাত্র বন্ধুত্বের জন্য মুখ বুজে আমার কাজ করে দিয়েছে। তবু জানিস তো, আমি বেশ বুঝি এইসব খেয়ে ওদের পেট ভরছে না, ওরা ক্ষুধার্ত। ওদের আরও ভালো খাওয়ার দেওয়া উচিত।”
– “তুই বল, ওরা কী খেতে চায়।”
– “না রে দাদা, আমার হাতে আর বেশি সময় নেই, আমাকে যে এবার যেতে হবে, সঙ্গে ওদেরও।”
– “তাহলে?”
– “জানিস দাদা, আমি অনেক ভেবে দেখেছি, সেদিন শুধু ওরাই অন্যায় করেনি। আর একজনও করেছিল।”
– “আরেক জন, কে সে?”
– “জানিস দাদা, আমি তোর নাম করে সেদিন অনেকবার ডেকেছি, তুই ছাড়া আর কাকে আমি ডাকব বল? কিন্তু তুই সেইদিন, একমাত্র সেইদিনই আমার ডাক শুনলি না।”
– “আরে, সেদিন আমি তো ঘরে গিয়ে একদম ঘুমিয়ে…”
– “মিথ্যা বলিস না, দাদা।”
– “বিশ্বাস কর, সুমি, আমি…”
– “আমি তোকে বিশ্বাস করি দাদা, কিন্তু সেইদিন তুই যদি আমার ডাক শুনে আমাকে বাঁচাতে ওপরে আসতিস, তবে তো আমাকে ওভাবে মরতে হত না, বল। তাই দোষ তো তোরও সেদিন ছিল, তাই না বল?”
– “কয়েকবার প্রতিবাদ করে, অবশেষে মাথা নিচু করে নেয় রনি। ও জানে, সুমিকে ভুল বোঝানো সম্ভব নয়।”
– “দিতাম রে, দাদা, আমি তো সত্যিই চেয়েছিলাম তোকে ক্ষমা করে দিতে, কিন্তু বন্ধুত্বের প্রতিদান আমি তাহলে কী করে দেব, বল?”
– “মা… মা… মানে…? কী বলছিস তুই?”
– “ওই যে বললাম, আমার গোখরো সাপেরা ভীষণ ক্ষুধার্ত, ওদের জন্য…”
– “আমি ওদের জন্য খাবার নিয়ে আসছি, কী আনব বল?”
হো হো করে হেসে ওঠে সুমি, “ওরা তোর আনা খাবার খাবে না রে, ওদের এখন দরকার তাজা মাংস।”
একটা তীব্র আর্তনাদ করে রনি পড়ে যায়, ওর সারা শরীরে তখন বিষধর সাপেরা ধীরে ধীরে পেঁচিয়ে ধরছে, ওদের পাশবিক উল্লাসে ছোবলের পর ছোবল বসাতে থাকে রনির গায়ে, বুকে, মাথায়, চোখে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে রনি, ও বুঝতে পারে ওর সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে বিষক্রিয়ায়। দম বন্ধ হয়ে আসছে, ধীরে ধীরে। ভুলের শাস্তি যে এত বিষম হবে, সে কথা ও কল্পনাও করেনি, কোনওদিন।
সুমির কাজ শেষ, ও চলে যায় বাইরের ঘোলাটে অন্ধকারে, ও ওর বন্ধুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, যেমনটা ওর বন্ধুরা ওর সঙ্গে করেছিল। ওর দেওয়া কথামতো ও ওদের জন্য তাজা নরমাংস দিয়ে গেল, না হলে যে, বন্ধুত্বের ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাসটাই অবলুপ্ত হয়ে যাবে।
.
অভিষেক ঘোষ (শিবাঙ্গণ)
তিনি চেষ্টা করেন কাগজে কলম দিয়ে কিছু আঁকিবুঁকি কাটতে। বেশিরভাগ পাতাই নষ্ট হয়, তাঁর মধ্যে কোনও কোনওটা, কোনও বিমূর্ত আকৃতি পেলে সেটাই হয়ে যায় গল্প। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর, তারপর ম্যানেজমেন্টের ডিগ্রি। বর্তমানে এক বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। লেখক বলেন, “তবু লিখতে ভালোবাসি বলে লেখা, মস্তিষ্কের পুষ্টির আশায়।”
