Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    মানুষ শক্তির উৎস – সমরেশ বসু

    সমরেশ বসু এক পাতা গল্প190 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৯. তিন বছর ধরে

    ০৯.

    তারপরেও, তিন বছর ধরে, সজল অনেক বার এসেছে। হিসাব করলে, সপ্তাহে দু-তিন দিন তো বটেই। এসেছে, হেসেছে, গল্প করেছে, গান করেছে, নেচেছে। আর সেই যে প্রথম দিন থেকে, আমার পিছনে লেগেছিল, সেটা আর ছাড়েনি। আমিও প্রথম দিন যা ছিলাম, তিন বছরে সেই রকমই আছি। আমি পারতপক্ষে ওর কাছে না যাবার চেষ্টা করেছি। কথা বলতে চাইনি। ওর দিকে তাকাতে চাইনি। কিন্তু ও গান করলে শুনতে ইচ্ছা করেছে। ভাল না লাগলেও, নাচ দেখতে ইচ্ছা করেছে। ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে, কলেজ স্ট্রিটের কলেজে পড়ছিল। রমুদাও সেখানে পড়ছিল। ওদের বন্ধুরা প্রায় সকলেই। একমাত্র বেচারি ঋতা, সেই কলেজে অ্যাডমিশন পায়নি। ওর হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট তেমন ভাল ছিল না। তবে, ওকে বেচারি বলব না। রমুদাকেই বলব। রমুদার বড় আশা ছিল, ঋতাকে নিয়ে, নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে, কলেজ স্ট্রিটে কলেজে যাবে। সেটা আর হয়নি।

    ঋতা দক্ষিণ কলকাতার একটা কলেজে ভরতি হয়েছিল। বাড়ি থেকে আর বেশি দূরে যেতে চায়নি। এখন তো রমুদা আমাকে আর দীপুকে নিয়ে বেরোয়। আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পরে, কলেজে ঢুকেছি। আমিও কলেজ স্ট্রিটে পড়তে যাইনি। এমনকী কো-এডুকেশন কলেজেও পড়তে যাইনি। মামাকে আগেই বলে দিয়েছিলাম, আমি মেয়েদের কলেজে পড়ব। মামা বলেছিলেন, খুব ভাল। মামিমা বলেছিলেন, বিন্দু, তুই বড্ড সেকেলে।

    সেকালের কি একালের, জানি না। ছেলেদের কলেজে আমার যেতে ইচ্ছা করেনি। এখন রমুদা আগে আমাকে আমার কলের্জে নামিয়ে, দীপুকে নিয়ে কলেজ স্ট্রিটে চলে যায়। দীপুও কলেজ স্ট্রিটে পড়ে। আমার আর দীপুর কলেজে প্রবেশ, রমুদাদের বেরিয়ে যাবার সময় হল। তবে কলেজ স্ট্রিটে একেবারে যাই না, তা নয়। রমুদা জোর করে নিয়ে চলে যায়। কফি হাউসে আড্ডা হয়। মিহির শ্যামল। বিপ্লব রাখী, ওরাও থাকে। সজল তো থাকেই। এমনকী দীপু আর দীপাও থাকে। দীপু আর দীপা কেমন অদ্ভুত। ওদের বন্ধুত্ব এক রকম আছে। দীপা কলেজ স্ট্রিটে পড়ে।

    আমাদের কলেজে সে রকম রাজনীতি হয় না। ছেলেদের সব কলেজেই হয়। আমি সে সব নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাই না। বাকিদের মধ্যে, বিপ্লব আর শ্যামল খুব ছাত্র রাজনীতি করে। আমাদের দীপুও কম যায় না। রমুদার সে রকম নেই। তবে সকলেই বামপন্থী। তার মধ্যে ভাগাভাগি আছে। বিপ্লব ও শ্যামল যে পার্টির সঙ্গে আছে, দীপু সেই পার্টিতে নেই। ওদের মধ্যে প্রায়ই তর্কাতর্কি হয়। তর্কের মধ্যে আর ছাত্র রাজনীতি থাকে না। পার্টিনীতি নিয়েই কথা হয়। পার্টির নেতাদের নিয়ে কথা হয়। আর পার্টির নীতি এবং কৌশল। সকলের দাবি, তাদের পার্টি নীতি এবং নেতারাই সঠিক।

    কিন্তু যে কথা বলছিলাম। সজল ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে পড়ে। কিন্তু ও অদ্ভুত গল্প বলতে পারে, গল্প বানাতেও পারে। ওর অধিকাংশ গল্পই অবিশ্যি হাসি আর ফাজলামিতে ভরা। যেমন, এক দিন আমরা আমাদের বাড়িতে রমুদার ঘরে সবাই বসে আছি, নানান কথার মধ্যে, সজল হঠাৎ বলল, আমি একটা খুব ভাল রূপকথা বলছি।

    সবাই বলল, বলো।

    সজল আরম্ভ করল, এক যে ছিল রাজা, তার ছিল এক রানি। রাজারানির মনে কোনও দুঃখ থাকবার কথা না। রাজার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। রাজকুঠরিতে হিরা মুক্তা জহরত সোনাদানা অঢেল৷ রাজ্যের প্রজারা সুখে আছে। এমনকী, রাজার সোনার চাঁদের মতো দুই পুত্র আছে। রাজপুত্রদের প্রজারা সবাই ভালবাসে। সবই আছে। কিন্তু এত সব থাকা সত্ত্বেও রাজার মনে সুখ নেই, রানির মনে সুখ নেই। কেন?…

    এই পর্যন্ত বলে সজল একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমি যেন ছেলেবেলায় ফিরে গিয়েছিলাম। হাঁ করে রূপকথা শুনছি। সজল আবার শুরু করল, কারণ, রাজারানির মনে বড় দুঃখ, তাঁদের একটিও কন্যা নেই। এত ধনদৌলত, পুত্র থাকা সত্ত্বেও একটি কন্যার জন্য তাঁদের মন কাঁদে। রুপোর থাম দেওয়া সোনার মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে কন্যা পুতুল খেলবে, খেলাপাতি দিয়ে রান্না করবে, বাবা-মাকে এনে সেই রান্না খেতে দেবে, রাজারানি মিছিমিছি খেয়ে, কন্যাকে আদর করবেন, তার জন্যে তাঁদের মন কাঁদে। রাজকন্যা তার পুতুলের বিয়ে দেবে, রাজা তার জন্য ধূমধাম করবেন, প্রজাদের নেমন্তন্ন করে খাওয়াবেন, মনে বড় শখ। কিন্তু কন্যা না থাকলে কী করে তা হয়!…

    সজল আবার চুপ করল। আমরা সবাই একমনে শুনছি। সজল একটু থেমে শুরু করল, তখন মা ষষ্ঠী রাজারানিকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, তোমাদের তো আর পুত্রকন্যা হবে না। তবে পাশের রাজ্যে, রাজার বোনের বিয়ে হয়েছে এক গরিব সওদাগরের সঙ্গে। তাঁর কয়েকটি মেয়ে আছে। প্রথম মেয়েটিকে তোমরা গিয়ে নিয়ে এসো, সেই তোমাদের কন্যা হবে।…

    এই পর্যন্ত শোনার পরে, আমার ভুরু কুঁচকে উঠল। মনে সন্দেহ ঘনিয়ে এল, সজলের রূপকথায় যেন বাস্তবের ছায়া দেখা যাচ্ছে। কী একটা মতলব যেন রয়েছে। কিন্তু আর কারোর মনে তখনও কোনও সন্দেহ নেই। সবাই শুনছে। সজলের মুখে কোনও বিকার নেই। আমি অন্য দিকে তাকিয়ে, কান খাড়া করে রাখলাম। সজল বলে চলেছে, তখন রাজা গিয়ে তাঁর ভগ্নিকে ধরলেন, তাঁর বড় মেয়েটিকে তিনি নিজের কাছে নিয়ে রাখবেন। রাজার ভগ্নি এবং ভগ্নিপতি রাজি হলেন। কন্যাটির সারা অঙ্গে রূপ আর ধরে না। (এই সময়ে, রমুদার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল। ওর গোঁফের ফাঁকে চোরা হাসির ঝিলিক দেখতে পেলাম। বেশ, বলুক সজল কী বলতে চায়। আবার তেমনি বুদ্ধিমতী। রাজা আদর করে তাকে রাজবাড়িতে নিয়ে এলেন। রাজারানির আদরে সে বড় হতে লাগল। দিনে দিনে যেন কন্যার রূপ আরও ফুটতে লাগল। কিন্তু কন্যাটির মধ্যে একটা কী গোলমাল, সে হাসে না, কথা বলে না, সবসময়েই ভুরু বাঁকিয়ে, ঘাড় বাঁকিয়ে থাকে।..

    এ পর্যন্ত শোনার পরে, আমি উঠে দাঁড়াতে গেলাম। তার আগেই, ঋতা আমার শাড়ির আঁচল চেপে ধরে রেখেছে। উঠতে পারলাম না। মনে মনে বললাম, মিথ্যুক। ঋতা বলল,’ শোনাই যাক না। রূপকথা তো।

    সজল আবার শুরু করল, রাজারানি ভাবিত হয়ে পড়লেন। ওঝাকে ডাকলেন। যেমন-তেমন ওঝা না, রাজওঝা। সে এসে কন্যাটিকে দেখল। রাজওঝা তো! এক পলক দেখেই বুঝে ফেলল। রাজাকে গিয়ে বলল, আপনার কন্যার সব ভাল, কিন্তু মনে মনে তার বড় রূপের দেমাক। রূপের দেমাকের জন্য হয়েছে কী, কন্যাটির হৃদয়ে ভালবাসা রূপ দিয়ে চাপা পড়ে আছে।

    আমি জোর করে ঋতার হাত থেকে আঁচল ছাড়াবার চেষ্টা করলাম। বললাম, ছেড়ে দাও, আমার অনেক কাজ আছে। এ সব গাঁজাখুরি রূপকথা শোনবার আমার সময় নেই।

    ইতিমধ্যে সকলেই হাসতে আরম্ভ করেছে। ঋতা বলল, শেষটুকু শুনে যাও না! সজল, তাড়াতাড়ি বল।

    সজল ঠিক কলের পুতুলের মতো তাড়াতাড়ি বলল, তখন রাজা ওঝাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী করে এই ব্যাধি সারানো যায়? ওঝা বললে, মহারাজ, এ ব্যাধি কোনও ওষুধ-বিষুধে সারবে না। কন্যার মনের মতো বর যখন আসবে, তখন আপনিই এই ব্যাধি সেরে যাবে।

    রাখী বলে উঠল, কবে সেই বর আসবে?

    সজল বলল, রাজাও সেই কথা ওঝাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। ওঝা বলল, মহারাজ, আরও বছর চারেক পরে, পূর্ণিমা রাত্রে, চাঁদের বুক থেকে সে টুপ করে নেমে আসবে। জানবেন, তার নাম প্রেম। নটে গাছটি মুড়োলা, আমার কথাটি ফুরোলো।

    সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। আমি সেই ফাঁকে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। তাই বলছিলাম, সজল শুধু ভাল গল্প বলতে পারে না, বানাতেও পারে। আজকাল অবিশ্যি সবই বুঝতে পারি। সজল গল্প শুরু করলেই, পালিয়ে যাই। নয় তো কিছু না বলে, চুপ করে বসে থাকি। তবে, কেবল আমাকে নিয়ে না– মাঝে মাঝে ও অন্য গল্পও বলে। সে সবই বইয়ে পড়া গল্প। আমি ভাবি, এত গল্পের বই পড়ার সময় পায় কোথায়। দেশি-বিদেশি যত রাজ্যের হাসির গল্প ওর ঝুলিতে আছে। অন্য গল্প যখন বলে, তখন আমার ভাল লাগে। আমাকে নিয়ে গল্প বললেই রাগ হয়।

    শুধু কি গল্প! কত রকমে যে আমাকে উত্ত্যক্ত করেছে। উত্ত্যক্ত–হ্যাঁ, তখন তা-ই মনে হয়েছিল। আজ ভাবি, সজল, সারা জীবন তোমার কাছে উত্ত্যক্ত হওয়ার জন্য বসে থাকব। পূর্ণিমার চাঁদ থেকে, কবে তুমি টুপ করে নেমে আসবে!’ বুকের কাছে ব্যথা করে উঠছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।…ওকে এক দিন অপমান পর্যন্ত করলাম।

    সেদিন বাড়িতে কেউ নেই, আমি আর মামিমা ছাড়া। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। আমার ঘরে বসে, আমিও রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়ছি। কোনও দিকে খেয়াল নেই, গল্পে একেবারে ডুবে গিয়েছি। হঠাৎ পিছন থেকে দুটি ভেজা ঠাণ্ডা হাত, আমার দুই গালে এসে চেপে ধরল। আমি প্রথমটা ভয়ে চমকে উঠলাম। তারপরেই মনে করলাম, রমুদা। বলতেও গেলাম, রমুদা ছেড়ে দে।’ কিন্তু পিছন ফিরেই দেখলামসজল। রাগে আমার গায়ে যেন আগুন ধরে গেল। আমি গলা তুলে ফেঁজে বললাম, কেন তুমি আমার গালে হাত দিলে? কী ভেবেছ তুমি?

    সজল অপ্রস্তুতের হাসি হেসে বলল, রেগে গেলে?

    নিশ্চয় রেগে যাব। কেন তুমি আমার ঘরে এসেছ। কেন তুমি ভেজা হাত আমার গালে দিয়েছ।

    সজল বলল, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে যে।

    ভিজুকগে, তুমি হাত দেবে কেন। চলে যাও তুমি আমার ঘর থেকে।

    সজল এক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। ওর ভেজা জামা-প্যান্টের জল ঘরের মেঝেয় পড়েছে। দরজা পর্যন্ত ওর ভেজা জুতোর ছাপ। আমি ঘর থেকে বেরোইনি। পরে শুনেছি, মামিমার সঙ্গে দেখা করে, ও রমুদার শুকনো পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরে, এক কাপ চা খেয়ে চলে গিয়েছে। তারপরে কয়েক দিন আসেনি। ভেবেছিলাম, আসবে না। এসেছে। দেখে মনে হয় না, ওর কোনও ভাবান্তর হয়েছে।

    অনেক সময় ভেবেছি, সজল কী চায় আমার কাছে। রমুদা আর ঋতা যে রকম, সে রকম? অসম্ভব, আমি তা কোনও দিনই পারব না। ইতিমধ্যে সজল সম্পর্কে যেটুকু জেনেছিলাম, তা হল, ও ওর দাদার কাছে থাকে। বাবা নেই, মা আছেন। দাদার আর্থিক অবস্থা ভাল না। তাঁরও কয়েকটি ছেলেমেয়ে আছে। সজলকে তিনি ভবিষ্যতে তাঁর পাশে দাঁড়াবার আশা করছেন।

    সজল বি. এস. সি পাশ করে, শিবপুরে এঞ্জিনিয়ারিং-এ ভরতি হল। যাবার আগে, আমাকে বলে গেল, বিন্দু, (অনেক চেষ্টা করেও, এই নাম ডাকাটা ওকে ছাড়াতে পারিনি) এখন থেকে আর রেগুলার তোমাকে জ্বালাতন করতে আসা যাবে না।

    বললাম, বেঁচে যাই।

    সজল বলল, তা জানি। তবে মাঝে মাঝে আসব।

    তখন আমাকে জ্বালাতন কোরো না।

    কথা দিতে পারলাম না।

    বলে একটু চুপ করে থেকে, আবার বলল, আর একটা কথা বিন্দু, আমার ওপর রাগ কোরো না।

    সজল কথাটা বলে জবাবের জন্য দাঁড়াল না। এক বার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে চলে গেল। সেই মুহূর্তে, কেন জানি না, আমার মনটা কেমন খচ করে উঠল। ও যেন আমার দিকে কেমন করে তাকিয়ে গেল। যেন ওর চোখের দৃষ্টিতে কী একটা কষ্ট। ওর মুখটা বারে বারে মনে পড়তে লাগল। আর তার সঙ্গে ওর গল্প হাসি গান, আমার কানের কাছে বাজতে লাগল। মনটা যেন মেঘের মতো ভার হয়ে উঠল। আমার কিছু ভাল লাগল না। তাড়াতাড়ি আমার ঘরে গেলাম, জানালা খুলে রাস্তার দিকে দেখলাম। সজলকে দেখতে পেলাম না।

    রমুদার বন্ধুরা, অনেকে অনেক কিছু পড়তে চলে গেল। রমুদার আর পড়া হল না। রমুদা কোনও রকমে কেমিস্ট্রিতে পাশ করে বেরিয়ে এল। ওর কথা থেকে, বোঝা গেল, ও আর পড়াশোনা করতে চায় না। মামা জোর করলেন না। ওকে ব্যবসার দিকে নিয়ে যেতে চাইলেন। রমুদাও তা-ই চাইল।

    রমুদার মধ্যে কিছু কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে ওকে গম্ভীর আর বিরক্ত দেখাত। যেটা ওর একেবারেই ছিল না। সিগারেট তো আগে থেকেই খাচ্ছিল। কয়েক দিন, মামার বোতল থেকে, লুকিয়ে ড্রিঙ্কও করেছে। ও একলা করেনি, বন্ধুরা সবাই করেছে। আমি সাক্ষী মাত্র, কিন্তু মনে মনে খুব রাগ হয়েছে। ড্রিঙ্ক করে ওদের অমন হাসি-ইয়ার্কি মোটেই ভাল লাগেনি।

    পাশ করার পরে, রমুদা অনেকটা বাইরের লোক হয়ে গেল। মামার সঙ্গে কাজে চলে যায়। সেখান। থেকে একলা একলা কোথায় যায়, কেউ জানে না। আমাদের বাড়িতে ঋতার আসা অনেক কমে গিয়েছে। রমুদার সঙ্গে আজকাল ওর বাইরেই দেখা হয়। ঋতাও পড়া ছেড়ে দিয়েছে। বীথি দীপা আসে। মিহির বিপ্লব শ্যামল রাখীরাও আসে। রাখী ইংরেজিতে এম. এ. পড়ছে, মিহির ডাক্তারি। শ্যামল আর বিপ্লব ফেল করেছে, আবার পড়ছে। আমার খুব সন্দেহ, ওদের পড়া হবে কি না। রাজনীতি ছাড়া, আর কোনও কিছু নিয়েই ওরা মাথা ঘামায় না। দীপুটা এখনও পড়াশোনা ভালই চালাচ্ছে। কিন্তু রাজনীতিও করে চলেছে।

    ওদের মুখেই, সুবীরের নাম আমি প্রায়ই শুনি। রমুদার মুখেও শুনেছি। সে একজন বামপন্থী ছাত্রনেতা হয়ে উঠেছে। এবং সুবীর পড়াশোনায় খুব ভাল। প্রফেসররা নাকি তাকে সম্মান দিয়ে থাকে। দীপুর কথায় বুঝতে পারি, সুবীর ওর খুব প্রিয়। শ্যামল আর বিপ্লব সুবীরকে পছন্দ করে না। সুবীরকে ওরা সমালোচনা করে। দীপুকে বলেছি, এক দিন তোর সুবীরদাকে বাড়িতে নিয়ে আসিস।

    দীপু বলেছে, সুবীরদা ভীষণ সিরিয়স টাইপের ছেলে।

    তা হোক না, সিরিয়স টাইপের ছেলেদের এ বাড়িতে আসতে নেই?

    এসে কী হবে! তুই রাজনীতি করিস না, মার্কস লেনিনের কিছুই বুঝিস না। সুবীরদার সঙ্গে কী কথা বলবি?’

    তোর সুবীরদা বুঝি মার্কস লেনিন ছাড়া কিছুই বলে না?

    ও সব ছাড়া সুবীরদা অন্য চিন্তা করে না।

    তবে পাশ করে কী করে? টুকলিফাই?

    খবরদার যমুনা, সুবীরদার সম্পর্কে ও সব বলবি না। প্রফেসররা পর্যন্ত সুবীরদাকে রিগার্ড করে।

    সে তো আজকাল প্রফেসররাও পলেটিকস করে। যাদের দলে সুবীর আছে, সেই সব প্রফেসররাই রিগার্ড করে।

    দীপু চটে গিয়ে বলেছে, তার কোনও ধারণা নেই, তোর সঙ্গে কথা বলা চলে না।

    দীপাও ঠিক একইভাবে আমার সঙ্গে তর্ক করে। দীপু যা করে, যা বলে, দীপাও তাই করে। রাজনীতির কিছু বুঝি না ঠিকই। কিন্তু ওদের সঙ্গে তর্ক করে যাই সমানে। আমার সেই ইস্কুলের বন্ধু রমা, যে রাজনীতি করত, ও এখন আরও বেশি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসে। আমাকে বলে, তুই রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে থাকিস কী করে। তোর কি কিছুই মনে হয় না?

    জিজ্ঞেস করি, কী মনে হবে?

    দেশের বর্তমান অবস্থাকে তুই মেনে নিতে পারিস? তোর মনে হয় না, এ শাসনব্যবস্থা বদলানো দরকার? কিছু লোক সুখ ভোগ করবে, আরামে থাকবে, আর কোটি কোটি মানুষ না খেতে পেয়ে মরবে, এটা কখনও মেনে নেওয়া যায়?

    আমার সহজ বুদ্ধি থেকেই বলেছি, না, তা যায় না।’

    রমা বলে, কিন্তু সে কথা বললে তো হবে না, কিছু করতে হবে। আমরা চাই শ্রমিকরাজ কায়েম করতে। আমাদের দেশে শ্রমিকরা, কৃষকরা লড়ছে, আমাদেরও তাদের সঙ্গে লড়তে হবে।

    আমি ওকে খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, তা বলে সবাইকেই পলেটিকস করতে হবে?

    রমা খুব জোর দিয়ে বলে, সারটেনলি।

    কিন্তু সবাই কি পলেটিকস করছে?

    যাতে করে, আমাদের সেই অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে। করে না, তা-ই বা বলি কী করে। তুই আমি এখনও ভোটার হইনি। কিন্তু কোটি কোটি লোক ভোট দেয়, ডিফারেন্ট পার্টিকে ভোট দেয়, তার মানে, সেটা তো পলেটিকস করাই হল।

    এ সব কথার আমি কোনও জবাব দিতে পারি না। কিন্তু সব মানুষকে পলেটিকস করতে হবে, এটা আমি যেন ঠিক ভেবে উঠতে পারি না। আমি তো কোনও উৎসাহ বোধ করি না। রমা এক এক সময় আমার ওপর চটে যায়, রেগে যায়, কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। এমনকী, আমাকে বলে, তোরা হলি বড়লোক, তোরা এ সব বুঝবি না। তোরা গাড়ি চেপে কলেজে যাবি, বাড়ি আসবি।

    মনে মনে দুঃখিত হয়েছি। আমার গরিব বাবা-মা, ভাইবোনের (এখনও যথেষ্ট গরিব, বাবা আরও পরে তাঁর অবস্থা ফিরিয়েছেন, তার সঙ্গেও রাজনীতির যোগ আছে) কথা ওকে বলিনি। ভারতবর্ষের সমস্ত গরিব মানুষেরা পলেটিকস করছে, এ কথা আমি শুনিনি। রমা যেভাবে ভোট দেওয়ার রাজনীতির কথা বলে, তার সঙ্গে কি ওর রাজনীতি করা মেলে?

    সবই অস্পষ্ট লাগে। রমাকেও একেবারে উড়িয়ে দিতে পারি না। সবাই মিলে কিছু না করলে, কিছু বদলানো যায় না। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা শুনেছি, ইংরেজরা আমাদের দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে। তখন আমি নিতান্তই খুকি। কিছু জানি না, দেখিনি। শুনেছি, সারা ভারতবর্ষের লোক আন্দোলন করেছে। কিছু করতে হলে, সেই রকমই করতে হয়। কিন্তু রমা যেভাবে পলেটিকস করে, আমাকেও করবার জন্য বলে, আমি তা পারি না। আমাদের কলেজে অনেক মেয়ে আছে, আমাদের ইউনিয়নও আছে, ইলেকশন হয়, কিন্তু কয়েকজন ছাড়া কেউ রাজনীতি করে না। সকলের দ্বারা সবকিছু হয় না।

    রমা আমাকে মার্কস আর লেনিনের বই পড়তে দিয়েছে। সত্যি বলতে কী, আমি সব কথা বুঝতে পারি না। এখনও পারি না। রমাও আমাকে সব বুঝিয়ে দিতে পারে না। জানি না, ভবিষ্যতে কোনও দিন পারব কি না। আপাতত এ সব বইকে আমার অথই সমুদ্রের মতো মনে হয়। থই পাই না।

    রমা মাঝে মাঝে সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলে। আমি জিজ্ঞেস করি, তা হলে তোর দাদা ইলেকশনে দাঁড়ান কেন?

    রমা বলে, সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি চাই, সেই অবস্থা তৈরি করতে সময় লাগবে। তার মধ্যে নির্বাচনের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।

    আর নির্বাচনেই যদি জিতে যাওয়া যায়?

    রমা ভুরু কুঁচকে বলেছে, তা আবার কখনও হয় নাকি! রক্তপাতহীন বিপ্লব হয় না।

    কিন্তু যদি তোরা ভোটেই সব জিতে যাস, তা হলে?

    রমা ঘাড় নেড়ে বলে, তা হয় না।

    কেন?

    রমা পাগলের মতো উত্তেজিত হয়ে কথা খোঁজে, তা হলে তা হলে আমরা বেশি জিততে থাকলে, ওরা আমাদের বিরুদ্ধে মিলিটারি আর পুলিশকে লেলিয়ে দেবে।

    আমার স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই বলেছি, তখন তো পুলিশ, মিলিটারি সব তোদের হাতেই থাকবে, লেলিয়ে দেবে কেন?

    রমা হঠাৎ হেসে বলে, তোর মাথায় কিছু নেই যমুনা, ওয়ার্থলেস। তা হলে আর বুর্জোয়া বলেছে কেন? ওরা যখন দেখবে, কেবলই হেরে যাচ্ছে, তখনই ওরা মিলিটারি ডেকে নিয়ে আসবে।

    তা হলে আর নির্বাচনের দরকার কী, যুদ্ধ করলেই হয়!

    রমা আমার বোকামিতে জোরে হেসে ওঠে। বলে, তোর কাছে সব ব্যাপারটা ছেলের হাতের মোয়া। আমরা যা করছি, সবই সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি, বুঝলি?

    আর তর্ক করতে পারি না। কিন্তু রমা আমাকে ভাবায়। রমা চলে গেলেও, আমার মনের মধ্যে, সে সব কথা ঘোরাফেরা করে। আবার এই রমাকেই যখন জিজ্ঞেস করি, বীরুর খবর কী,অমনি ওর মুখের চেহারা বদলে যায়। চোখ দুটো যেন অন্য এক আলোয় চিকচিক করে ওঠে। বলে, কী আর করবে, আইন পড়ছে। এখন বলে, সি. এ পড়বে।’ আমি জানি বীরু বি. কম পাশ করেছে। জিজ্ঞেস করি, দেখা হয়?’ রমার মুখ ঝকঝকিয়ে ওঠে; বলে, রোজ-মানে অলমোস্ট রোজ।তারপরে একটু থেমে বলে, ব্যাপারটা ভারী বিচ্ছিরি, জানিস যমুনা।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, কোন ব্যাপারটা?’ রমার মুখ একটু ভার হয়ে ওঠে; বলে, এই দেখা হওয়াটা। রোজ এক বার দেখা না হলে ভীষণ খারাপ লাগে। কেন এ রকম হয়, আমি বুঝতে পারি না।

    যে রমা এত বোঝে, এ ব্যাপারটা বুঝতে পারে না! আমি তো বুঝিই না। রমার উদাস মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। একটু পরেই রমার চোখমুখ আবার ঝলমলে হয়ে ওঠে। বলে, দেখা না হলে, বীরুর ওপর আমার খুব রাগ হয়। তারপরে দেখা হলে, আমি আর কথা বলতে চাই না। বীরু তখন মুখ কাঁচুমাচু করে মেলাই বাজে বকতে থাকে।

    বীরুর মুখটা মনে করে আমার ভীষণ হাসি পেয়ে যায়। রমাও হেসে ওঠে।

    এখন আমার নিজের কলেজের অনেক বন্ধু। অনেকেই আমাদের বাড়িতে আসে। কলেজেও আমার নিজের মনের মতো একটা দল হয়ে গিয়েছে। তবে, মেয়েদের কলেজ হলেও, আলোচনার মধ্যমণি সেই ছেলেরাই। নৈবেদ্যের কলার মতো। অনেকটা জায়গা জুড়ে সে থাকে না, কিন্তু সকলের ওপরে থাকে। যাকে বলে অ্যাফেয়ারস’, আমার অনেক বন্ধুরও তা আছে। কয়েক জনের ছেলেবন্ধুর সঙ্গে পরিচয়ও হয়েছে। আমাদের বাড়িতে সকলের অবারিত দ্বার। মামিমার উদার মনের জন্যেই সেটা আরও সম্ভব হয়েছে। মাঝে মাঝে অবাক লাগে, কোনও ছেলের বিষয়েই মামিমার মনে কোনও প্রশ্ন নেই। সব ছেলের সঙ্গেই তাঁর পরিচয় হওয়া চাই, কথা বলা চাই।

    এখন আমি বাড়ি থেকে অনেক বেশি বেরোই। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতার কোনও জায়গায় বেড়াতে যেতে আর বাকি রাখি না। সিনেমা রেস্তোরাঁতেও খুব যাই। ভিক্টোরিয়া আর গঙ্গার ধার আমার সবথেকে ভাল লাগে। শুধু তা-ই বা কেন, সাদার্ন অ্যাভিন্যু থেকে ভবানীপুর হেঁটে যেতেও ভাল লাগে। চিৎপুরের ট্রামে চেপে, জোড়াসাঁকো যেতে আরও ভাল লাগে। ময়দানে দাঁড়িয়ে ভিড় করে, মুখের মধ্যে ফুচকা পুরে দেওয়ার যেন তুলনা নেই।

    ইতিমধ্যে সজল কয়েক বার এসেছে। সজলকে দেখে, আমি যেন চমকে উঠেছি। কীসের চমকানো, কেন চমকানো, তা বুঝতে পারি না। মনে হয়, আমার ভিতরে সজলের চিন্তাটা কোথায় জেগে থাকে, ওকে দেখলেই চমকে উঠেছি। বলে উঠেছি, ওহ, তুমি এসেছ?’ সজল ওর স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে বলেছে, ভয় পেলে নাকি?’ভয় পাব কেন? কিন্তু বলতে পারি না, হঠাৎ আমি যেন খুশি হয়ে উঠেছি। অথচ খুশি হওয়ার কথাটা আমার নিজেরও জানা ছিল না। বুঝতে পারতাম না, আমি মনে মনে ওর। জন্য অপেক্ষা করে থাকি কিনা। ওকে দেখলে তাই বোধ হয় চমকে উঠি। জানতাম না, এই চমকানোটা আসলে একটা ঝড়ের সংকেতের মতো। বজ্রগর্ভ মেঘ যখন অনেক দুরে থাকে, দূর থেকে এগিয়ে আসতে থাকে, তখন বিদ্যুৎ-চমকের ঝিলিকটা নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়েও দেখা যায়। আমার চমকানোটাও সেই রকম। মেঘ আসছিল, ঝড় আসছিল।

    কলেজের দ্বিতীয় বছরে, আমার জীবনে একটি ঘটনা ঘটল। নিজেকে যে কত কম চিনি, কম জানি, এই ঘটনাটা আমাকে তা বুঝিয়ে দিল। হয়তো সেটা আমার বিভ্রম বা মোহ, তবু ভোলবার নয়। আমার মধ্যে যে কর্মের উদ্যোগ আছে, সেটা জানা গেল, যখন আমি ইউনিয়নের সমাজ-সংস্কৃতি বিভাগের সেক্রেটারি হলাম। ইতিমধ্যে সাহিত্য এবং কবিতার বিষয়ে আমার অনুরাগ বেড়েছে। পড়াশোনাও মন্দ চলছে না। সাহিত্যিক ও কবিদের সম্পর্কে অগাধ কৌতূহল, তাঁদের নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়, তর্ক বাধে। অনুরাধাদি আমাদের বাংলার অধ্যাপিকা। সেক্রেটারির কাজে তিনি আমাকে মাঝে মধ্যে উপদেশ দিয়ে থাকেন। এক দিন তিনি আমাকে বললেন, কবি অংশুমালী গুপ্তকে এক বার কলেজে ডাকো। সেমিনার করতে বলছি না, ওঁকে একলা ডাকো, ওঁর কবিতার বিষয়ে বলতে বলল।

    শুনেই আমরা উৎসাহিত হয়ে উঠলাম। এখন কবি অংশুমালী গুপ্তকে নিয়ে আমাদের মধ্যে সবথেকে বেশি আলোচনা হয়। আমার তো অসম্ভব প্রিয়, ওঁর সব কটা বই আমার কাছে আছে। ওঁকে বাস্তবধর্মী রোমান্টিক কবি বলা হয়। অনুরাধাদি ওঁকে চেনেন, উনি নিজেও কবিতা লেখেন। অনুরাধাদি অংশুমালীবাবুর ঠিকানা দিলেন। আমাদের কলেজের কাছেই থাকেন। আমরা একটা দিন স্থির করে নিয়ে, কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে ওঁকে আমন্ত্রণ জানাতে গেলাম। একটা বাড়ির তেতলায় উনি একলা থাকেন। অথচ শুনেছি, উনি বিবাহিত। চাকর আমাদের দরজা খুলে, একটা ঘরে বসতে দিল। একটু পরেই অংশুমালী গুপ্ত এলেন। পায়জামা পাঞ্জাবি পরা, স্বাস্থ্যবান উজ্জ্বল পুরুষ। একমাথা ঢেউ খেলানো রুক্ষ চুল। বয়স দেখে মনে হল তিরিশের বেশি না। উদাস চোখে যেন কীসের একটা ঝিলিক খেলছে। মুখে হাসি। দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মুগ্ধ বললে বোধ হয় কম বলা হয়, তাঁর চোখে চোখ পড়তে, মনে হল যেন সম্মোহিত হয়ে গেলাম।

    তেমন কোনও কৌতূহল বা বিস্ময় নেই আমাদের দেখে। হাসিমুখে আমাদের সকলের মুখের দিকে দেখলেন। আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম, কপালে হাত তুলে নমস্কার করলাম। উনি বললেন, বসুন।

    বসুন’ শুনে আমরা সবাই লজ্জা পেয়ে গেলাম। বন্ধুরা আমার দিকে ফিরে তাকাল। আরও অনেক সাহিত্যিক বা কবির সঙ্গে কথা বলেছি, এতটা লজ্জায় জড়োসডো হয়ে পড়িনি। বললাম, আমরা কলেজ থেকে এসেছি।

    বললেন, দেখে তাই মনে হচ্ছে। কোন কলেজ?

    কলেজের নাম বললাম। বন্ধুরা জানিয়ে দিল, আমি সেক্রেটারি। আমার দিকে তাকিয়ে দেখলেন। মুখে সেই হাসি, এবং একটা সারল্য মাখা, তথাপি ওঁর চোখে যেন কী আছে। চোখ নামিয়ে নিলাম। বললেন, কী ব্যাপার, বলুন।

    আমি বলে উঠলাম, আমাদের আপনি বলবেন না।

    বললেন, সহজে তুমি বলা যায় না। চেষ্টা করা যাবে।

    আমি আমন্ত্রণ পত্র লিখে নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি পড়লেন। পড়ে উচ্চারণ করলেন, যমুনা মিত্র। তারপরে বললেন, সাত তারিখে, শনিবার বেলা দুটোয়?

    বলে আমাদের দিকে তাকালেন, হাসিটি আর একটু উজ্জ্বল করে বললেন, যাওয়া যাবে।

    আমরা সবাই খুশি হয়ে উঠলাম। জানতে চাইলাম, ওঁকে কীভাবে এসে আমরা নিয়ে যাব। উনি বললেন, তোমরা কলেজের গেটে থেকো, আমি চলে যাব।

    ফিরে এলাম আমরা। সকলেই ওঁর চেহারা, কথা আর হাসি নিয়ে কলকল করতে লাগল। দারুণ চেহারা, হিরো, হাসিটা মিষ্টি, একদম ভয় করে না, এমনি সব কথা। আমি তেমন কলকল করতে পারলাম না। আমি যেন কেমন, যাকে বলে উন্মনা, তাই হয়ে উঠলাম। অনুরাধাদিকে জিজ্ঞেস করলাম, ওঁর ফ্যামিলির কারোকে দেখতে পেলাম না তো?

    অনুরাধাদি বললেন, শুনেছি ওঁর স্ত্রী বাংলার বাইরে কোথাও থাকেন, চাকরি করেন।

    এর বেশি কিছু বললেন না, আমারও কৌতূহল প্রকাশ করা উচিত না। কিন্তু অংশুমালী যেন আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন। বাড়ি গিয়ে ওঁর কবিতার বইগুলো টেনে নিলাম। পাতা খুলোম। পাতায় পাতায় কবিতা নেই, কেবল অংশুমালী গুপ্তর মুখ। তখনই ওঁর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করল। ওঁর ঘরে টেলিফোন দেখেছি। গাইডে খুঁজে, নাম বের করে, টেলিফোন করে বসলাম। আমার নামটা শুনে প্রথমে একটু থমকে গেলেন। আমার বুকটা অন্ধকারে ঢেকে গ্রেল। পরমুহূর্তেই বললেন, ওহ্, যমুনা মিত্র!

    হ্যাঁ।

    বলুন।

    বলুন না, বলো।

    বলো।

    বাড়িতে এসেই আপনার বই নিয়ে বসেছি।

    সেই জন্যই বোধ হয় তোমার মুখটা আমার বারে বারে মনে পড়ছে।

    লজ্জায় আর খুশিতে কথা বলতে পারলাম না। উনি একটু থেমে বললেন, বলো৷

    বললাম, সাত তারিখে তো কলেজে আসছেনই। মাঝে মাঝে যদি আপনার সঙ্গে দেখা করি?

    জবাব এল, খুব খুশি হব।

    আর কিছু বলতে পারলাম না, বললাম, ছাড়লাম।

    ছাড়া নয়, ধরা হল। ঘটনা সংক্ষিপ্ত করা যাক। কলেজে ওঁর বক্তৃতা, ওঁর মতোই অপূর্ব হল। ওঁর নিজের কথা, অন্যান্য আরও কবির কথা বললেন, কারোর বিরুদ্ধে একটি কথাও বললেন না। বক্তৃতার পরে, প্রিন্সিপ্যাল রেণুদির ঘরে, ওঁকে বসিয়ে খাইয়ে, বিদায়ের সময় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। তারপরে শুধু একটিই কথা। আমি অংশুমালীর অকূল টানে ভেসে গেলাম। কোথায় ভেসে গেল আমার পিউরিটানিজম, শরীর সম্পর্কে আমার কঠিন শীতলতা এবং পাপবোধ। মনে করলাম, ওঁকে আমার সবই দিয়ে দিলাম, উনি সব নিয়ে নিলেন।

    উনি আমাদের বাড়িতেও কয়েক বার যাওয়া-আসা করলেন। মামা এবং মামিমার সঙ্গে আলাপ হল। মামিমা এক দিন আমাকে ঠাট্টা করে বললেন, অংশুমালীর বিয়ে না হলে, তোর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতুম। জানি না মামিমা কিছু বুঝতে পেরেছিলেন কি না। কিন্তু আমি বিয়ের কথা কোনও দিনই ভাবিনি। আমি একটা আচ্ছন্নতা এবং ঘোরের মধ্য দিয়ে চলেছিলাম।

    ইতিমধ্যে সজল অনেক বার এসেছে। সবসময়ে ওর সঙ্গে দেখা হয়নি। হলেও, আমি যেন কেমন থমকে গিয়েছি। কেন যেন ওর দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারি না। অথচ ওর কাছে তো কোনও অন্যায় করিনি। তবু সজলের সামনে এ রকম হয় কেন, বুঝতে পারি না। মনে হয়, সজলও আর আগের মতো নেই। একটু যেন গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। কথা একটু কম বলে। অবিশ্যি ওর আসল বন্ধু রমুদা আজকাল বাড়ি থাকে না। কার সঙ্গেই বা বেশি আড্ডা দেবে, হাসবে নাচবে গাইবে!

    কলেজে আমার তৃতীয় এবং শেষ বছর। শেষপর্যন্ত দেখলাম, অংশুমালী নিজেই আস্তে আস্তে আমার কাছ থেকে সরে দাঁড়ালেন। প্রথমে বুঝতে পারিনি, আমিও আস্তে আস্তেই বুঝতে পারলাম। যখন পারলাম, মনটা খারাপ হয়ে যেতে লাগল। বিমর্ষ হয়ে পড়তে লাগলাম। কেমন কষ্ট হতে লাগল। একটা শূন্যতা বোধ করতে লাগলাম।

    সংক্ষিপ্ত করতে চাইলেও পাথরের নিটোল মূর্তির গায়ে যেমন, কোনও কারণে এক-আধটি দাগ লেগে যায়, প্রত্ন ও শিল্পের ইতিহাসে যার সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না–আমার বেলায় তা সম্ভব না। আমি তো পাথরের মূর্তি না। আমার এই সামান্য জীবনের ইতিহাস, আমি নিজে প্রায় পুঙ্খানুপুঙ্খ জানি। আচ্ছন্নতা আর ঘোরের মধ্যেও, আমি নিজেকে সম্পূর্ণ নগ্ন দেখেছি, অংশুমালীর বুকে। তেরো বছর বয়সের সেই উদ্যতফণা সাপিনীর প্রতিরোধের কথা এক বারও মনে আসেনি, বরং আমার শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু, (আহ্ বিন্দু, আমি সেই বিন্দু!) বড় তৃষ্ণায় অংশুমালীর ঠোঁটের পাত্রে তৃষ্ণা মিটিয়েছি। কেন? না, এর কোনও ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। অংশুমালীর মধ্যে কী আছে, আমি জানি না, তথাপি আমার কেবলই মনে হয়েছে, তাঁকে আমি যেন স্পর্শ করতে পারছি না, দেখতে পাচ্ছি না, চিনতে পারছি না, আর তাই আমার ভিতরে একটা তীব্র অস্থিরতার বেগ যেন অংশুমালীকে ছিন্নভিন্ন করে দেখতে চেয়েছে। তাই বলছিলাম, আমি নিজেকে কত কম চিনি।

    তাঁকে আমি কতটুকু চিনেছি? নিঃসঙ্গ একাকী একটি লোক, সংসারের মধ্যে থেকেও যিনি সংসারের মধ্যে নেই। তাঁর সংসারকে, জীবনকে দেখার সঙ্গে যেন এই সংসারজীবনেরও কোনও মিল নেই। এ অযোগ্যতা কার, আমি বুঝি না। তাঁর, না সংসারের! বুঝেছি, ট্র্যাজেডি বলতে যা বোঝায়, সেটাই তাঁর জীবনের উৎস। অথচ অবদের মতো তাঁর ঠোঁটের হাসি বাঁকা না, ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে নেই, কিন্তু দুর্বাসার মতো ক্রুদ্ধ, রাগে যেন দপদপ করছেন, তবু কী অসম্ভব শান্ত, প্রসন্ন, আবেগে ভরপুর, যা আমি অনুভব করেছি আমার রক্তে। ওঁর কবিতায় হয়তো উনি কিছুটা ব্যক্ত, কিন্তু জীবন যে যে-কোনও শিল্পের থেকে বড়, ওঁর সঙ্গে না মিশলে আমি তা জানতে পারতাম না। মিকেল অ্যাঞ্জেলোর নগ্ন আদমকে দেখে যেমন মনে কোনও গ্লানি আসে না, আমি নিজে নগ্ন হয়ে, ওঁর বুকের কাছে, ওঁকে দেখেও আমার মনে কোনও গ্লানি আসেনি।

    তাঁর কাছে আমার একটি বড় পাঠ, প্রতিটি নদী স্বতন্ত্র, তবু সব নদী যে পথ দিয়েই হোক, সমুদ্রে যায়। এ অংশুমালীর কবিতার কথা। আমাদের সকলের স্বাতন্ত্র, সকলের একাত্মতার সংগ্রাম। স্বাতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে, মানুষ কোনও মৌমাছিতন্ত্র গড়ে তুলতে পারে না, তা সে যে কোনও তন্ত্রের জন্যই হোক। সেইজন্য নিরন্তর ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে, মানুষ সংগ্রাম করে চলেছে, তার শেষ নেই। শেষ নেই কোনও কিছুরই, শেষ ব্যবস্থা বলেও পৃথিবীতে কিছু থাকতে পারে না। হত্যা, ষড়যন্ত্র এবং পদানত করে রাখার দুর্গম আকাঙ্ক্ষা যাদের,’শেষ ব্যবস্থা’ তারাই হাঁকে, আর মানুষকে চিরদিনই তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। ক্ষুধার অন্ন নিয়ে যেমন কোনও আপস চলে না, তেমনই আপস চলে না, স্বাতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে, মৌমাছিতে পরিণত হওয়া। সেই কারণে, মানুষ চিরকাল বিদ্রোহী, আবার একই সঙ্গে, মানুষ তার নিজের কাছে বড় পরাধীন, কেননা, সে দেবতা নয়। মানুষ সেখানে, সংগ্রামী বলার থেকে, কঠিন তপস্যায় রত বলাই ভাল।

    আমি যে অংশুমালীর সব কথাই বুঝতে পেরেছি, তা বলতে পারি না। না বোঝার মধ্যেও, চিন্তা আর মনের মধ্যে, এক ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। আমার মধ্যে তা-ই হয়েছে। কিন্তু এ সব কথাও অনেকখানি যেন নিজেকে চোখ টেপবার মতো লাগছে। আসলে আমি তো অংশুমালীর কাছে কোনও পাঠ নিতে চাইনি, শিখতেও চাইনি। আমি চেয়েছি কেবল অংশুমালীকে। তিনি আমাকে স্বপ্নাতুর করেছেন, আমি চেয়েছি, তিনি আমাকে নিয়ে যা খুশি করুন। যা খুশি বলতে যদি কেবলমাত্র উপলক্ষ হয়ে ওঠে আমার এই শরীর, তা হলে বলি, এ শরীরে জোয়ার তখনই উত্তাল, অংশুমালীকে দর্শনমাত্র। কিন্তু তিনি আমাকে গর্ভবতী করেননি, অথচ কৌমার্য হরণ বলে কথাটার যদি কোনও অর্থ থাকে, দেহের সে সংযোগ থেকে আমরা বিরত ছিলাম না। অংশুমালী শরীরের ক্ষেত্রে শিল্পী, তার মধ্যে বিজ্ঞা আর কল্পনা আছে। আমি ওঁর সুখ আর যন্ত্রণাকে একসঙ্গেই অভিব্যক্ত হতে দেখেছি। আমার কোনও যন্ত্রণা ছিল না, কেবল সুখ-সুখ-সুখের স্বপ্ন।

    কী আশ্চর্য, তাই না? আমি নিজেকে কত কম জানতাম।

    .

    এখন বুঝতে পারি, উনি ঠিকই করেছিলেন। একটা অন্ধ পরিণতির দিকে চলতে চাননি। তাতে কার কতটা বেজেছিল জানি না। আমার বয়স কম, মনে করি, আমারই বেজেছিল বেশি। এ সময়ে সজলের। গলার স্বর শুনলে, আমি আরও বেশি চমকে উঠি। আমার শূন্যতা যেন ভরে উঠতে চায়। অথচ ওর সামনে যেতে পারি না। এখন ঘর থেকে বেরিয়ে, ওর সামনে যেতেই যেন সংকোচ হয়। সজলও বিশেষ ডাকাডাকি করে না। যাবার আগে এক বার বলে যায়, বিন্দু, চলি। খুব লেখাপড়ায় মন দিয়েছ দেখছি।

    কিছু বলতে পারি না। ওকে ভীষণ ডাকতে ইচ্ছা করে, পারি না। এ অবস্থার মধ্যেই, এক দিন ছুটির দিনে, রমুদা বাড়িতে। ও এখন একেবারে বদলে গিয়েছে। ঋতার সঙ্গে এখন আর কোনও সম্পর্ক নেই। শুনতে পাই, ঋতা এখন অন্য জীবন নিয়ে মেতেছে। প্রায়ই নাকি এখানে সেখানে অনেকের সঙ্গে দেখা যায়। তাও সবসময় সুস্থ অবস্থায় নয়। এও শুনেছি, ঋতার এখন টাকার বড় দরকার। রমুদা এক দিনই শুধু আমাকে বলেছিল, জানিস বিন্দু, ঋতা চলে যাবার পরে, আমার পুরনো জীবনটা কোথায় হারিয়ে গেছে।’..ওকেও এখন অনেক মেয়ের সঙ্গে ঘুরতে দেখা যায়। রমুদার জীবনের কথা ভাবলে আমার ভয় লাগে।

    যাই হোক, আজ রমুদা বাড়িতে। অনেক দিন পরে রাখী এল। সজল এল। দীপু আর দীপা আছেই। আর একটি মেয়ে এসেছে, নাম রুমনি, রমুদার বান্ধবী, একসঙ্গে কলেজে পড়ত। মামিমা সবাইকে খেয়ে যাবার কথা বললেন। রমুদা ওর ঘরে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। এখন রমুদা আর দীপুর ঘর আলাদা। সজল গান করল। রেকর্ড বাজিয়ে, ও আর রাখী, রুমি আর রমুদা নাচল। দীপু বলল, অল বুর্জোয়া ভাইসেস।

    সজলের সঙ্গে আমার কয়েক বার চোখাচোখি হল। হাসল। কিন্তু তার বেশি কিছু না। ও আমাকে চটাবার জন্য কোনও গান করল না, গল্প বলল না। আমার বুকের মধ্যে টনটন করে উঠল। চোখে জল। এসে পড়ার ভয়ে আমার ঘরে পালিয়ে এলাম। তবু জল রোধ করতে পারলাম না। নিজেকে কেমন যেন অপাঙক্তেয় লাগছে।

    একটু পরেই রমুদা এসে ডাকল, কী হল যমুনা, চলে এলি যে? আয়।

    মুখ না ফিরিয়েই বললাম, যাচ্ছি চলো।

    বুঝতে পারছি, রমুদা তবু খানিকক্ষণ ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। তারপরে চলে গেল। ওখানে গিয়ে আমি কী করব। সজল নাচছে রাখীর সঙ্গে, রমুদা রুমির সঙ্গে, দীপু কথা বলছে দীপার সঙ্গে। আমাকে কারোর দরকার নেই। আমার রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে। দুটো গাড়িই বসে আছে, ইচ্ছা করলে গাড়ি নিয়েও বেরিয়ে যাওয়া যায়।

    আসতে পারি?

    সজল! ও আজকাল এ রকম করেই কথা বলে। সেই ঘটনার পর থেকে, না বলে ঘরে ঢোকে না। ওর কোনও দোষ নেই। সেই ঘটনার কথা মনে করেও, এখন আমার বুকের মধ্যে কী রকম কষ্ট হচ্ছে। তেমনি মুখ না ফিরিয়েই বললাম, এসো।

    সজল ঘরের ভিতরে এল। আমি খাটের ওপরে বসে ছিলাম। ও আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি মুখ তুলে তাকাতে পারছি না। সজলের ওপর কেমন অভিমান হচ্ছে। আমার গায়ে ওর ছায়া পড়েছে। জিজ্ঞেস করল, ও ঘরে যাবে না?

    মুখ না তুলেই বললাম, ভাল লাগছে না।

    শরীর খারাপ করেছে?

    না।

    মন?

    কিছু বললাম না। সজলেরও কোনও সাড়া পাচ্ছি না। অথচ ও আমার সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি আস্তে আস্তে মুখ তুলে ওর দিকে তাকালাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দেখলাম ওর চোখে কৌতূহল আর জিজ্ঞাসা। কী যেন ভাবছে, আমার চোখের দিকে দেখছে। জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে বিন্দু?

    আমি আবার মুখটা নামিয়ে নিয়ে মাথা নাড়লাম। কিন্তু আবার সঙ্গে সঙ্গে সজলের মুখের দিকে। তাকালাম। ওর বড় বড় কালো চোখ দুটোতে কখনওই তেমন তীক্ষ্ণতা ফোটে না। অথচ এমন গভীর, যেন ওর কালো তারায় কিছু আছে। ও একটু হাসল, বলল, আজ তো তোমাকে কিছু বলিনি।

    বললাম, তোমার বলতে ভাল না লাগলে বলবে কেন?

    সজল একটু সরে, আমার মুখোমুখি খাটের ওপর বসে পড়ল। জিজ্ঞেস করল, তার মানে?

    আমি মুখ নামিয়ে বললাম, মানে আবার কী! আমাকে আর তোমার কিছু বলতে ইচ্ছে করে না।

    সজল বলল, তুমি রেগে যাও, তোমাকে রাগাতে চাই না।

    বললাম, তবে রাগিয়ো না।

    সজল অসহিষ্ণুর মতো বলে উঠল, এই বিন্দু, তুমি কী বলছ, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

    আমি মুখ তুলে ওর দিকে তাকালাম। ওর চোখেমুখে অসহায় জিজ্ঞাসা, অবাক শিশুর মতো দেখাচ্ছে। অদ্ভুত ছেলে, এমন মুখ করে আছে, যেন হাত থেকে চিল ছোঁ মেরে খাবার নিয়ে নিয়েছে। আমার হাসি পেয়ে গেল। আমাকে হাসতে দেখে, ও আরও অবাক হয়ে গেল। বলল, যাহ, আমার নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে।

    নিঃশব্দে হাসছিলাম, এবার শব্দ করে হেসে উঠলাম। আমিই বা কী মেয়ে! একটু আগেই চোখে জল ছিল, আবার এখন হাসছি। একটু যদি নিজেকে বুঝতে পারি! আবার হঠাৎ হাসি থেমে গেল। বললাম, সজল, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছ তো?

    ওর বিস্ময় আর ঘোচে না। জিজ্ঞেস করল, কীসের ক্ষমা, কেন?

    তোমাকে এক দিন এ ঘরে যা-তা বলেছিলাম।

    বলতে বলতেই, আমার চোখ ছলছল করে উঠল। আমি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলাম, মুখ নামিয়ে নিলাম। সজল এবার ব্যগ্র স্বরে ডেকে উঠল, বিন্দু!’ ডেকেই ও আমার একটা হাত টেনে ধরল। আমি ওর সেই হাতটা জোরে চেপে ধরলাম। সজল আর এক হাত দিয়ে, আমার চিবুক ধরে মুখ তুলতে চাইল। আমি জোর করে মুখ নামিয়ে রাখতে চাইলাম। আমার কান্না পাচ্ছে, আবার লজ্জাও করছে। সজল জোর করে আমার মুখ তুলল, বলল, দেখি, তাকাও।

    চোখের পাতা তুলে ওর দিকে তাকালাম। আর ভেজা চোখেই লজ্জায় হেসে উঠলাম। সজলও হেসে উঠল, বলল, কী মেয়ে রে বাবা!

    আমি সজলের হাতটা দিয়েই আমার মুখ ঢাকা দিলাম। সেই অবস্থাতেই বললাম, তুমি আজকাল আমাকে একদম ভুলে গেছ।

    সজল প্রায় ধমকের সুরে বলে উঠল, মিথ্যুক মেয়ে! আমি কোন সেই শিবপুর থেকে ছুটতে ছুটতে এখানে আসি, নিজেদের বাড়ি পর্যন্ত যাই না, হোস্টেলে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে বলে, আর আমি ভুলে গেছি?

    গেছই তো।

    মিথ্যুক তুমি। তুমিই বরং আমার সঙ্গে কথা বলতে চাওনি৷

    তুমি কিচ্ছু বোঝ না।

    সজল আমার মুখ থেকে ওর হাতটা সরিয়ে, আমার নাক টিপে দিল। আমি ওর কপালের সামনের চুল এলোমেলো করে দিলাম। ও ওর কালো বড় চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমিও তাকিয়ে রইলাম। তারপরে আমার লজ্জা করল, হাসি পেল। সজলও হেসে উঠল।

    শালা, তুমি এখানে. আইসক্রিম হয়ে গেছ। রমুদার গলা। রমুদার কথাবার্তা আজকাল এ রকম হয়েছে।

    আমি হেসে উঠলাম। বললাম, আইসক্রিম কী রে রমুদা, আমরা কথা বলছি তো।

    রমুদা বলে উঠল, না যমুনা, তোকে আইসক্রিম বলব না। তোকে দেখে মনে হচ্ছে, বরফ গলেছে।

    সজলটা মুখে একরাশ হাসি নিয়ে হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কী বোকা দেখাচ্ছে ওকে! ও রমুদার কথার জবাব পর্যন্ত দিচ্ছে না। আমি রমুদাকে বললাম, বরফ আবার কী গলবে?

    রমুদা বলল, গলছে দেখতে পাচ্ছি বাবা।

    বলে সজলের কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে বলল, কী রে কথা বলছিস না যে?

    সজল বলল, কী আবার বলব। আমি তো বিন্দুর সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।

    সে তো দেখতেই পাচ্ছি। এতদিন তুই বলে এসেছিস, এ বার বিন্দুও বলছে। তুমি শালা, আমার বোনের সঙ্গে রোমান্স করছ?

    সজল বলল, উই আর ফ্রেন্ডস।

    রমুদা বলল, আই উইল কিক য়ু রাসকেল।

    সজল বলল, আমি এখন গান করব।

    রমুদা বলল, আই শ্যাল অবজারভ দ্য ইভনিং।

    রাখীও এসে পড়ল এ ঘরে। জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার, তোমরা এখানে?

    রমুদা বলল, এখানে রোমিও-জুলিয়েত প্লে চলছে।

    সজল লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। আমার হাত ধরে টেনে তুলে বলল, চলো, রমুর ঘরে যাই। রাখী আয়, আরও নাচব।’

    রাখী আমার দিকে চেয়ে হাসল, বলল, কেন রে সজল, কী হয়েছে তোর?

    সজল বলল, হাতির পাঁচ পা দেখেছি। বলে আমার হাত ধরেই ঘরের বাইরে গেল।

    রমুদার ঘরে এলাম। রমুদার আলমারিতে আজকাল মদের বোতল থাকে। ও বোতল বের করল। আমার দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। আমাকে গেলাস এনে দিতে হবে। বলল, চারটে। আমি নীচে গিয়ে, চারটে গেলাস নিলাম। হরিকে বললাম, কেউ যেন না দেখতে পায়, ফ্রিজ থেকে চারটে সোডার বোতল দিয়ে যাস।

    সজল বলল, আমি ড্রিঙ্ক করব?

    বলে আমার দিকে তাকাল। আমি আঙুল তুলে, এক চিমটির মাপ দেখালাম। রমুদা বলল, শালা, আই শ্যাল কিক য়ু।

    দীপু বলল, সব অধঃপতিত জেনারেশনের প্রতিনিধি।

    রমুদা বলল, থাম, লেকচার দিসনে। দীপু হাসল। সজল গান ধরল, রূপসাগরে ডুব দিয়েছি, অরূপ রতন আশা করি।…

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleমহাকালের রথের ঘোড়া – সমরেশ মজুমদার
    Next Article অশ্লীল – সমরেশ বসু

    Related Articles

    সমরেশ বসু

    প্রজাপতি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    গঙ্গা – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    বিবর – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    অকালবৃষ্টি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    নয়নপুরের মাটি – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    সমরেশ বসু

    শ্রীমতি কাফে – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }