রহস্যে ঘেরা পঞ্চকেদার পরিক্রমা
রহস্যে ঘেরা পঞ্চকেদার পরিক্রমা
‘কেদার থেকে বেঁচে’ ফেরার পর সেই অভিজ্ঞতার কথা লিপিবদ্ধ করার পর হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি আস্তিক-নাস্তিক উভয়পক্ষের কাছ থেকেই। নাস্তিকরা বলেছেন, যোগাযোগ প্রভাব এসবের জন্য বেঁচে ফিরে এসেছি তো আস্তিকদের কেউ কেউ এখনও বিনা কারণে আমায় প্রণাম জানায় কিংবা শ্রদ্ধা সহকারে নমস্কার জানায়।
আমার বেঁচে ফেরার কারণ কিংবা আমার ঈশ্বর বিশ্বাসের চেয়েও একটা বড়ো বিষয় আমি আজও ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করি এবং তা হল অন্যকে সহায়তা করা, বিনা কারণে অন্যের সমালোচনা না করা, নিজের ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে ঊর্ধ্বে গিয়ে ভাবা, স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক ভাবনা থেকে বের হয়ে বৃহত্তর স্বার্থে কিছু ভাবা আর সর্বোপরি নিষ্ঠার সঙ্গে ঈশ্বরকে স্মরণ….
‘শিব’ জগতের সব কিছুর আধার, সব বা সমস্ত থেকে শব বা শবদেহ সবেতেই শিব বিরাজমান। শিব এক অদ্ভুত শক্তি।
‘ওঁ নমঃ শিবায়’ এই মন্ত্রে অসাধ্য সাধন হয় তা অনেকেই জানেন। আর শিব মানেই হিমালয়। আর হিমালয় মানে এক অদ্ভুত রহস্যের হাতছানি। হিমালয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আলোচিত জায়গা হল পঞ্চকেদার। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত হাজারো কষ্ট, প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে এই পঞ্চকেদার পরিক্রমা করেন ও লাভ করেন এক বিচিত্র অলৌকিক অভিজ্ঞতা। পঞ্চকেদার মানে—
কেদারনাথ
তুঙ্গনাথ
মদমহেশ্বর
রুদ্রনাথ
কল্পেশ্বর
.
কেদারনাথ
প্রথমেই কেদারনাথের কথা।
“জয় শ্রী কেদারেশ্বর ভগবান কি জয়” এই মন্ত্র যারা কেদারনাথ তীর্থযাত্রা করেন তারাই উচ্চারণ করেন।
কেদারনাথ মহাদেব শুধু একটি মন্দির নিয়ে গঠিত এমনটা নয়। এখানে মহাদেবের মূর্তি পাঁচ ভাগে পাঁচ জায়গায় বিভক্ত। যাদের একসঙ্গে পঞ্চকেদার বলে। আমরা এই পঞ্চকেদার পরিক্রমা করব।
পুরাণ বলছে, শিবের বয়স যত, কেদারখণ্ড ততটাই প্রাচীন। বেনারসের কাশী বিশ্বনাথের পরই কেদারের স্থান। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এই কেদারনাথ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ব্রাহ্মণ-বধজনিত পাপ ও আত্মীয়হত্যার জন্য অনুতাপে ভুগতে থাকেন পঞ্চপাণ্ডব।
সেই পাপ থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে পঞ্চপাণ্ডব মহর্ষি বেদব্যাসের পরামর্শে হিমালয়ে গেলেন মহাদেব দর্শনে। কেদারখণ্ডে রয়েছে তার বিশদ বর্ণনা, কিন্তু মহাদেব ঠিক করলেন তিনি পাণ্ডবদের দর্শন দেবেন না। পাণ্ডবদের ব্রহ্মহত্যার যে পাপ তার প্রায়শ্চিত্ত হয় না। মহাদেব গেলেন পালিয়ে। এদিকে পাণ্ডবরা নাছোড়বান্দা। শিবের পিছু নিলেন পাণ্ডবরা। শিব দেখলেন মহা বিপদ। শেষে আর কোনো পথ না পেয়ে শিব নিলেন ছদ্মবেশ। মহিষের রূপধারণ করে লুকিয়ে রইলেন হিমালয়ে। একদিন সেই মহিষরূপী শিব দেখে ভীম চিনে নেন। ব্যস! শিব আর পারলেন না নিজেকে লুকিয়ে রাখতে। মহাদেব কিছু বোঝার আগেই তাকে জাপটে ধরে ফেললেন ভীম। ভীম যখন শিবকে জাপটে ধরেন মহিষের মুখ তখন ছিল পৃথিবীর দিকে এবং পশ্চাদভাগ ছিল কেদারের দিকে। ভীম মহিষের কুঁজ সহ পশ্চাদভাগ ধরে ফেলেন। শিব থেকে গেলেন কেদারে। মহিষের কুঁজ-রূপী অংশ তাই পূজিত হয় কেদারেশ্বর রূপে। অন্যদিকে মহিষের নাভি প্রতিষ্ঠিত হল মদ-মহেশ্বরে। মহিষের বাহু প্রতিষ্ঠিত হল তুঙ্গনাথে, মহিষের মুখ প্রতিষ্ঠিত হল রুদ্রনাথে আর মহিষের জটা প্রতিষ্ঠিত হল কল্পেশ্বরে।
হিমালয়ের এই পাঁচ পুণ্যভূমি ‘পঞ্চকেদার’ নামে পরিচিত। কথিত আছে, কেদারে এসে পঞ্চকেদার দর্শন না করলে নাকি কেদার-দর্শনের পুণ্য সম্পূর্ণ হয় না। একদা ভগবান নরনারায়ণ মাটি দিয়ে মূর্তি গড়ে পুজো করেন শিবের। ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন শিব। তারপর থেকেই তিনি কেদারে বাস করতে শুরু করেন। সেই থেকে কেদারে বাস দেবাদিদেবের।
শীতকালে প্রচণ্ড তুষারপাতের কারণে কেদারনাথের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। নভেম্বর মাসে দেয়ালির পর একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় মন্দির। আর মন্দির খোলা হয় অক্ষয় তৃতীয়ার দিন। মূল মন্দির মোটামুটি ছ’মাস বন্ধ থাকে। লোকালয় স্তব্ধ হয়ে যায়। পুরোহিতরা নেমে আসেন গুপ্তকাশী কিংবা উখিমঠে। কিন্তু দেবতার পুজো বন্ধ থাকে না, ভগবান কেদারনাথও নেমে আসেন ওইসময়। তখন তার অস্থায়ী ঠিকানা হয় উখিমঠ। এখানে কিছুদিন থেকে আবার শীত শেষে ছ’মাস পর তিনি ফিরে যান কেদারনাথে। পালকিতে চড়ে শিবের এই অবরোহণ এবং আরোহণের নাম ‘ডোলিযাত্রা’। শিবের নামা এবং ওপরে ওঠাকে কেন্দ্র করে উৎসব পালিত হয় এখানে। তবে ডোলিযাত্রা দেখার ভাগ্য সবার হয় না।
কেদারনাথ মন্দিরের দ্বার খোলার পর ভিড় উপচে পড়ে। উখিমঠ থেকে শিব ফিরে যান স্বস্থানে। তবে ২০১৩ সালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর কেদারনাথের ডোলিযাত্রার পথ পালটে গিয়েছে। ধ্বংসলীলা যতই হোক, কেদারনাথের মন্দিরটি অক্ষতই ছিল। মন্দিরে থাকা হাতে গোনা কয়েকজনই সেদিনের সেই বিপর্যয় থেকে বেঁচে যায়। কেদারনাথকে চোরাবালিতাল লেকের ওই বিপুল জল থেকে বাঁচিয়ে দেয় একটি প্রস্তরখণ্ড। যার নাম হয়ে যায় দেবশিলা। এই শিলাতেই ওই বিপুল জলধারা দুভাগে ভাগ হয়ে যায় ও মন্দির এবং মন্দিরের ভেতরে থাকা ভক্তদের বাঁচিয়ে দেয়।
কেদারনাথের এই মন্দিরটির নির্মাণকর্তা আদি শঙ্করাচার্য। কেদারনাথ মন্দিরের প্রথম নির্মাতা পাণ্ডবরা। তারা পাথর দিয়ে কেদারনাথের মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। পুরাণের নানা দেবদেবীর মূর্তি দিয়ে সাজানো মন্দির। মন্দিরের দরজায় নন্দীর বড়ো একটি মূর্তি রয়েছে। কথিত আছে, নন্দী নাকি শিবের রক্ষণাবেক্ষণ করেন। পাহাড়ের অন্য দিকে আছেন ভৈরবনাথ। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে বিশেষ পুজোর জন্য আগাম বুকিং নেওয়া হয়।
বিপর্যয়ের পর কেদার আর আগের মতো নেই। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর অনেক কিছু চেনা যায় না। শোনপ্রয়াগে একটা চেকপোস্ট রয়েছে, যেখানে যাত্রীদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড পরীক্ষা করা হয়। কার্ড ছাড়া পুণ্যার্থী বা ভ্রমণার্থীদের কেদার যাওয়ার এখন আর অনুমতি দেওয়া হয় না। এটা উত্তরাখণ্ড সরকারের নতুন নিয়ম বিনায়ক চতুর্থী এবং দেয়ালিতে খুব জাঁকজমক করে উৎসব হয় এখানে। শ্রাবণ মাসে রাখিপূর্ণিমার ঠিক আগে অন্নকূট মেলা হয়।
কেদারনাথ বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো সময় হল গ্রীষ্মকাল। মানে মে মাসে মন্দির খোলার ঠিক পর পরই। কারণ তারপরই বর্ষা চলে আসে। সাইট সিয়িং এবং ট্রেকিংয়ের জন্য আদর্শ সময়। বর্ষাকালে সাধারণত কেউ যায় না কেদারে এবং শীতকালে প্রায় ছ’মাসের কাছাকাছি কেদারনাথ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। স্থানীয় লোকজনও থাকেন না ওইসময়। শিব তখন থাকেন গুপ্তকাশী বা উখিমঠে।
কেদারনাথের মতো বরফ খুব কমই দেখা যায়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগে শোনপ্রয়াগ থেকে যাত্রা শুরু করে গৌরীকুণ্ড, জঙ্গল চটি, চিরবাসা ভৈরব ভীমবলি, রামওয়াড়া, গোরুর চটি হয়ে কেদারনাথ পৌঁছোতেন যাত্রীরা। ২০১৩-র বিপর্যয়ে ধুয়ে-মুছে গিয়েছে রামওয়াড়া থেকে বাকি পথটা। এখন ভীমবলি থেকে লিঞ্চোলি, বদিয়ার পুছ হয়ে কেদারনাথ মন্দিরে পৌঁছোতে পারেন দর্শনার্থীরা। আবার লিঞ্চোলি থেকে বদিয়ারপুছ পুরো রাস্তাই বরফের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। হেলিপ্যাডও রয়েছে এখানে। দু’ধারে দশ-বারো ফুট দেয়াল মাঝে বরফের ওপর চলার পথ। শুধু বরফ আর বরফ, সঙ্গে অপরূপ মোহময়ী রহস্যঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তীর্থস্হানের স্নিগ্ধ বাতাবরণে এক ঐশ্বরিক পরিবেশ, নিমগ্ন হিমালয়ের গাম্ভীর্য—সবমিলিয়ে কেদারনাথ এক বিস্ময়কর দেবভূমি।
হাওড়া থেকে প্রথমে ট্রেনে হরিদ্বার। দুন এক্সপ্রেস, কুম্ভ এক্সপ্রেস, উপাসনা এক্সপ্রেস-এ যেতে পারেন হরিদ্বার। হরিদ্বার থেকে গাড়ি নিয়ে সীতাপুর, সেখান থেকে রাত্রিবাস করে শোনপ্রয়াগ পৌঁছোন। শোনপ্রয়াগে চেকপোস্ট আছে। মেডিকেল চেক-আপ হয়। তারপর চার কিলোমিটার দূরে গৌরীকুণ্ডর যাত্রা শুরু। এই পথে সরকারি শেয়ার জিপের ব্যবস্থা আছে। হেঁটেও গৌরীকুণ্ড পৌঁছোনো যায়। গৌরীকুণ্ড থেকে সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে ভীমবলি। এখানে মন্দাকিনীর ওপর একটা ব্রিজ তৈরি হয়েছে। ব্রিজ পেরিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার গেলে লিঞ্চোলি। লিঞ্চোলি থেকে কেদার পাঁচ কিলোমিটার। হরিদ্বার থেকে বাসে রুদ্রপ্রয়াগ চলে যেতে পারেন। রুদ্রপ্রয়াগ থেকে রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি যাচ্ছে কেদারনাথ, অন্যটি যাচ্ছে বদ্রীনাথ। অপূর্ব এই বাসযাত্রা। বিমানে হরিদ্বারের কাছে জলিগ্রান্ট এয়ারপোর্টে নেমে আধঘণ্টা সফরে হৃষীকেশ পৌঁছোতে পারেন, তারপর জোশীমঠ। উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন স্থান থেকে হেলিকপ্টারেও কেদার পৌঁছোনো যায়।
তুঙ্গনাথ
উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তার ‘হিমালয়ের পথে পথে’ গ্রন্থে গাড়োয়ালকে বাঙালিদের কছে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। যে যুগে এই পথ ছিল দুর্গম সে-যুগে যেমন পর্যটক আসার কোনো খামতি ছিল না, এ-পথে এ-যুগেও তার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম নেই। পঞ্চকেদারে প্রথম কেদারের পথে আমাদের যাত্রা শুরু। আমরা যাব তুঙ্গনাথের পথে। তুঙ্গনাথ ‘তৃতীয় কেদার’ বলে পরিচিত। উখিমঠ থেকে গাড়িপথে ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে চোপতা পৌঁছে যাবেন। চোপতা থেকে তুঙ্গনাথ মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার। চোপতা থেকে সাড়ে চার কিলোমিটারের হাঁটা পথ তুঙ্গনাথ। প্রায় ৮,৮০০ ফুট উচ্চতার চোপতাকে অনেকে উত্তরাখণ্ডের মিনি সুইৎজারল্যান্ড বলেন। কারণ, সবুজ বুগিয়াল, “বুগিয়াল” অর্থাৎ মাঠ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণভূমি, পাখির ডাক, চারপাশের পাহাড় মন ভরিয়ে দেবে আপনার। চোপতা, উখিমঠ, সারিগ্রাম, গোপেশ্বর এই এলাকাগুলির প্রকৃতি আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেবে। তুঙ্গনাথ পুণ্যভূমি। তুঙ্গনাথ উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত।
গবেষকদের মতে তুঙ্গনাথ পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতায় শিবমন্দির। পঞ্চকেদার পরিক্রমার অন্যতম মন্দির এই তুঙ্গনাথ। এর উচ্চতা ১২,০৭৩ ফুট। পঞ্চকেদার গুলি হল কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, কল্পেশ্বর, রুদ্রনাথ আর তুঙ্গনাথ। পঞ্চকেদার নিয়ে একটা জনশ্রুতি আছে। মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধর পর পাণ্ডবরা যখন পাপের আগুনে পুড়ছেন তখন তারা ঠিক করেন যে ভ্রাতৃহত্যার পাপ মোচন করতে তারা শিবের পুজো করবেন। সেই ইচ্ছায় শিবের সন্ধানে তারা বারাণসীতে গিয়ে হাজির হন। কিন্তু মহাদেব এই পাপীদের হাতে ধরা দিতে রাজি হলেন না তাই তিনি একটি মহিষের রূপ ধারণ করলেন আর হিমালয় পর্বতমালার, উত্তরাখণ্ডের গুপ্তকাশীতে চলে যান। পাণ্ডবরাও তাকে নানা জায়গায় খুঁজতে খুঁজতে উত্তরাখণ্ডে এসে হাজির হলেন আর এদিকে শিবও এ-পাহাড় ও পাহাড়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন; পেছনে পেছনে ধাওয়া করলেন পাণ্ডবরা। যেখানে যেখানে পাণ্ডবরা মহিষরূপী শিবকে ধরেও ধরতে পারেনি মানে কোথাও লেজ ধরেছে কোথাও শিং ধরেছে, কিন্তু শিব তবু পিছলে পালিয়ে গিয়েছেন সেই স্থানগুলিই পঞ্চকেদার নামে পরিচিত হয়। তুঙ্গনাথকে তৃতীয় কেদার বলা হয়।
তুঙ্গনাথেরও ওপরে ১৩,১২৩ ফুট উচ্চতায় এই পাহাড়ের চুড়োয় আছে চন্দ্রশিলা, যেখান থেকে হিমালয়ের ৩৬০ ডিগ্রি কোণে চারপাশের বরফে ঢাকা শৃঙ্গগুলি দেখা যায়। চৌখাম্বা, নন্দাদেবী, নন্দাঘুণ্টি, কামিট, পালকি, নীলকণ্ঠ, সুদর্শন, মেরু-সুমেরু, শিবলিঙ্গকে দেখুন প্রাণভরে। চন্দ্রশিলার চুড়োয় একটা ছোট্ট মন্দির রয়েছে, গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে নিবেদিত। গাড়োয়াল ভ্রমণের এক অন্যতম অংশ এই তুঙ্গনাথ-চন্দ্রশিলা যা বাঙালিদের অতি পরিচিত স্থান।
মদমহেশ্বর
উখীমঠ থেকে গাড়ি চেপে চলুন মনশুনা, যোগাসু ও ওনিওনা ছাড়িয়ে রাঁশির কাছাকাছি। সুন্দর হাঁটাপথে পৌঁছে যান রাঁশি গ্রামে। রাশি থেকে আরও ঘণ্টা দুয়েক হাঁটলেই গৌণ্ডার। গৌণ্ডার থেকে এক কিলোমিটার দূরে বানতোলি। মার্কণ্ডেও গঙ্গা ও মদমহেশ্বর গঙ্গার সংগমস্থলের নিকটে এই ছোট্ট সুন্দর জায়গাটিতে চাইলে কিছুটা সময় থাকতে পারেন। রাত্রিবাসের ব্যবস্থা আছে। এখান থেকে কঠিন চড়াইপথ শুরু। বড়ো বড়ো গাছপালার মধ্য দিয়ে প্রশস্ত পথ। ক্রমে মদমহেশ্বর গঙ্গাকে দূরে রেখে পৌঁছে যান খাডোরা চটিতে। বড়ো বড়ো ঘাস আর গাছে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল ধরে উঠতে থাকুন। প্রায় কিলোমিটার দশেক খাড়া পথ ধরে উঠে এবার নিশ্বাস ফেলুন। চার হাজার ফুট উচ্চতায় আপনার জন্য অপেক্ষা করছে মদমহেশ্বরের অপার্থিব সৌন্দর্য।
পাহাড়ের কোলে ছোট্ট মদমহেশ্বর মন্দিরটি অসাধারণ। এখানে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ধীরে ধীরে চলুন বুড়ো মদমহেশ্বেরের মন্দিরে। ছোট্ট মন্দির, কিন্তু অদ্ভুত একটা আকর্ষণ ক্ষমতা আছে। এখান থেকে চারপাশের দৃশ্য অপূর্ব। চৌখাম্বা ও মান্দানি শৃঙ্গমালাকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। ছোট্ট জলাশয়টি দেখে ফিরে যান মদমহেশ্বরে। একই পথে একটানা নামতে শুরু করুন। পৌঁছে যান বানতোলিতে। বানতোলি থেকে আবার রাঁশি। রাকেশ্বরী মন্দিরটি দেখে নিন। আর এই মন্দিরকে ঘিরে থাকা গ্রামে একটা রাত কাটাতেই পারেন।
রুদ্রনাথ
আবার চোপতার পথে চলুন। বাসে বা ছোটো গাড়ি করে ২৮ কিমি দূরে মণ্ডলে পৌঁছে যান। তারপর সেখান থেকে অনুসূয়া গ্রাম। জাগ্ৰত অনুসূয়া মায়ের মন্দিরটি দেখে নিন। ছোট্ট গ্রামটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ।
তারপর ওই চড়াই পথ ধরে চলুন অত্রিমুনির আশ্রম। মন্দির দর্শন শেষে ঘনবনের মধ্য দিয়ে একটানা চড়াই পথে উঠতে থাকুন। একসময় দেখবেন গাছপালা বেশ কমে আসবে। এরই মধ্যে দিয়ে উঠে আসবেন রুদ্রনাথওয়ালা গিরিশিরার ওপরে অবস্থিত নওলা পাস। সেখান থেকে নন্দাদেবী সহ একাধিক শৃঙ্গমালা দেখা যায়। তারপর ওই পথের উত্তর-পূর্বদিক ধরে হাঁটতে থাকুন পৌঁছে যাবেন রুদ্রনাথ মন্দিরে। নির্জন পরিবেশে এ জায়গাটি ভালো লাগবে। মহিষরূপী শিবের মস্তক অংশটি এখানে পূজিত হয়।
কল্পেশ্বর
বুগিয়ালের মধ্য দিয়ে নেমে আসবেন পানার বুগিয়ালে। এখান থেকে দু’টি পথ। আপনি ধরবেন বাঁদিকের পথটি। পৌঁছোন কালাপানি নালা নামে একটি জায়গায়। নালাটি পেরিয়ে আরও খানিকটা চলার পর পৌঁছে যাবেন দুমক গ্রামে। দুমক থেকে দেবগ্রাম পৌঁছে যাবেন। দেবগ্রাম থেকে সহজপথে এক কিলোমিটার দূরে কল্পগঙ্গার ওপর পুল পেরিয়ে কল্পেশ্বর মন্দির। নদীর বামতটে পাথরের নীচে অন্ধকারের মাঝে এই মন্দিরটি। মহাদেবের জটা অংশটি রয়েছে এখানে। দর্শনের শেষে একই পথে ফিরে চলুন দেবগ্রামে।
সালনা থেকে হেলাং গাড়ি পথ ধরে চলতে পারে না। চামোলী-যোশীমঠ বাসরাস্তার উপর অবস্থিত হেলাং পঞ্চকেদার পদযাত্রার শেষ পর্যায়। হেলাং থেকে গাড়ি পথে চামোলী হয়ে হরিদ্বার ফিরে যেতে হয়।
আপনারা কেদারনাথ ঘুরতে গেলে পঞ্চকেদার অবশ্যই যাবেন। কথায় বলে, কেদারনাথ হল মুক্তির, পাপ প্রায়শ্চিত্তের একটা জায়গা। এখান থেকে পঞ্চপাণ্ডব মহাদেবের দর্শনের পর স্বর্গলাভ করেছিল। কোটি কোটি মানুষ সাধু-সন্ত-মহাত্মা তাই যুগের পর যুগ ধরে হিমালয়কে আবিষ্কার করে চলেছেন বিশ্বাসের সঙ্গে আস্থার সঙ্গে ভক্তির সঙ্গে…
* লেখক ২০১৩ সালের কেদার বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন
