হিমাচলের রক্তাক্ত ‘পাথর ছোড়া’ উৎসব
হিমাচলের রক্তাক্ত ‘পাথর ছোড়া’ উৎসব
এবার আমরা একটু যাব চম্পাওয়াতের দিকে। এখানে রাখি বন্ধনের দিন হয় পাথর ছোড়া উৎসব। আর এই উৎসব ঘিরে বেশ উন্মাদনা দেখা যায় স্থানীয়দের মধ্যে। উত্তরখণ্ডের বেশ কিছু এলাকায় ‘বাগওয়াল’ প্রথা উদযাপিত হয়। যা পাথর ছোড়া উৎসব নামেই পরিচিত।
তবে এই দুই গ্রামের উৎসবের দিন অবশ্য আলাদা আলাদা। সিমলার ধামীতে পাথর ছোড়া উৎসব হয় কালীপুজোর দিন আর চম্পাওয়াতে হয় রাখি বন্ধনের দিন। রাখি বন্ধন উপলক্ষ্যে কুমায়ুনে একটা সময় বেশ জনপ্রিয় খেলা ছিল ‘স্টোন পেল্টিং’ বা ‘পাথর ছোঁড়ার প্রথা’। স্থানীয় ভাষায় একে ‘বাগওয়াল প্রথা’ বলে। নিয়ম মেনে একদল অন্যদলের দিকে পাথর ছড়ত। অনেক সময় এই খেলা হত ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের। আবার অনেক সময় হত ভাইয়ের সঙ্গে বোনেদের। খেলায় জখমদের নিয়ে যাওয়া হত মন্দিরে। তাদের রক্ত দিয়ে দেবীপুজো শুরু হত।
তবে ২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট এই প্রথার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তারপর থেকে এর আয়োজনের সামান্য বদল হয়। এখন আর রাখির দিনে পাথর ছোঁড়া হয় না। পাথরের জায়গায় ছোড়া হয় ফুল এবং ফল।
চম্পাওয়াত জেলার দেবীধুরা গ্রামের বাসিন্দারা ফল এবং ফুল ছোড়ার মাধ্যমে এই উৎসব পালন করেন এখন। পাথরের পরিবর্তে ফুল ও ফল ছোড়ার রেওয়াজ শুরু হওয়ায় অনেকেই এখন এই উৎসবে অংশ নেন।
দেবীধুরা জনপদের জাগ্রত দেবী হলেন দেবী বরাহী দেবী। বরাহী দেবী মন্দিরের সামনে রাখির দিন বিকেলে শুরু হয় খেলা। খেলা চলে দশ বারো মিনিট ধরে। কোনো কোনো সময় খেলা বেশ জমে ওঠে। তখন আধাঘণ্টাও চলে। এই বাগওয়াল প্রথায় অংশগ্রহণের জন্য প্রচুর মানুষ ভিড় জমান চম্পাওয়াতের বিভিন্ন গ্রাম থেকে। এই উত্সবের জন্যে আট থেকে দশ কুইন্টাল ফলের আয়োজন করে মন্দির কর্তৃপক্ষ। আর থাকে বিশ কুইন্টাল ফুল।
এবার চলুন এই বাগওয়াল প্রথার উৎসের খোঁজ করা যাক। এই বাগওয়াল প্রথা কিন্তু আজকের নয়। এই প্রথা বহু প্রাচীন। এই প্রথার সন্ধান মেলে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনিতে।
পুরাণ অনুসারে এই দেবীধুরা গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিলেন বরাহী দেবী। একবার অসুররা স্থানীয় মানুষদের নানাভাবে ক্ষতি করা শুরু করে। অতিষ্ঠ মানুষজন ঠিক করে তাঁরা দেবীর কাছে প্রার্থনা জানাবেন। তো এখানকার চারটি সম্প্রদায়- ওয়ালিক, চামিয়াল, গাহারওয়াল এবং লামঘারিয়ারা দেবীর কাছে প্রার্থনা করা শুরু করে। প্রাণরক্ষার জন্যে তারা একজোট হয়ে বেশ জাঁকজমক করে দেবীর আরাধনা শুরু করেন। দেবী তুষ্ট হলেন। ভক্তদের প্রার্থনায় সাড়া দিলেন ও তাঁদের সব সমস্যার সমাধান তিনি করে দেবেন বলেও জানান। সবই ঠিক ছিল কিন্তু দেবী জানান তাঁর একটি দাবি আছে। যা,ভক্তদের পূরণ করতে হবে। ভক্তরা সদ্য অসুরদের হাত থেকে মুক্ত হতেই আবার ‘পুনরায় আগের মতো জেগে উঠলেন। সাতপাঁচ না ভেবেই জানিয়ে দিলেন দেবীর যে-কোনো ইচ্ছেকেই তারা পূরণ করবেন।
দেবী ভক্তদের জানালে প্রতি বছর নরবলি দিতে হবে। এটুকুই তার দাবি। নরবলি শুরু হল। এভাবেই বেশ চলছিল। রীতি মেনে এক বছর যখন নরবলির জন্যে এক ব্যক্তিকে দেবীর সামনে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ওই ব্যক্তির মা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন। পরিবর্তে দেবী বলেন প্রতি বছর এই চার সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে পাথর ছুড়ে আঘাত করে রক্তপাত ঘটালে তবেই তিনি ভুষ্ট হবেন। এই রীতির জন্যে বেছে নেওয়া হয় রাখি বন্ধনের দিনটিকে।
অনেক সময়ই এই উৎসব চলাকালীন অনেক মানুষ আহত হন। পাথরের জায়গায় কেউ কেউ ফল ছুড়ে একে অপরকে আঘাত করেন। কিন্তু তাতেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো সময় ফল নির্বাচনে ভুল হয়ে যায়। শক্ত ফল দিয়ে আঘাত করার জন্যেই অনেকেই আহত হন। এই উৎসব প্রসঙ্গে স্থানীয় এক আধিকারিক এক সাক্ষাৎকারে জানান, “বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও অনেকেই পাথর ছুড়েই এই উৎসব পালন করেছেন। লুকিয়ে নরবলিও হয়। আমরা যতটা সম্ভব প্রশাসনের তরফ থেকে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করি। তাও এই ধরণের ঘটনা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।”
কথিত আছে, শতশত বছর আগে গ্রামের এক ছেলে প্রেম করে এক মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায়। জাম নদী পার হওয়ার সময় তাদের ওপর পাথর ছুড়ে হামলা চালায় মেয়ের গ্রামের লোকজন। ছেলেটি মারা যায়। ছেলের গ্রামের লোকজন তাই আজও মেয়ের গ্রামের লোকদের শিক্ষা দিতে তাদের পাহাড়ি নদী এপার থেকে ওপারে পাথর ছোড়ে।
শুধুমাত্র হিমালয়ের পাহাড়ি উপত্যকাই নয় মধ্যপ্রদেশ উত্তরপ্রদেশেও এধরনের বিভিন্ন খেলা দেখা যায়। যেমন উত্তরপ্রদেশে হোলিতে হয় ‘লাঠমার’ হোলি। যেখানে লাঠির আঘাতের পর হোলি খেলা হয়। পুরুষদের এখানে নারীরা বা রাধাবেশি নারীরা লাঠিপেটা করেন।
আবার চারশ’ বছর ধরে চলে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী ‘গোতমার’প্রথা। এই প্রথা অনুযায়ী জাম নদীর দুইপাশে সওয়ারগাঁও ও পাঙ্কুরনা গ্রামের বাসিন্দারা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে শুরু করেন একে অপরকে পাথর ছোড়ার খেলা। এই পাথর ছোড়ার মধ্যে যে গ্রামের বাসিন্দারা নদীর বুকে লাগানো পতাকা আগে দখল করতে পারবেন, সেই গ্রাম জয়ী বলে বিবেচিত হবে।
বিচিত্র এই ভারতবর্ষ আর বিচিত্র এখানকার প্রথা। যস্মিন দেশে যদাচার। তাই হয়তো অনেক বিচিত্র প্রথা ব্রিটিশরাও আইন করে বন্ধ করতে পারেনি। তা আজও চলছে।
