হিমালয়ের অলৌকিক ‘পাগলা মধু’
‘পাগলা মধু’র নাম শুনেছেন? এই পাগলা মধু শুধুমাত্র পৃথিবীর একটি স্থানে পাওয়া যায়। সেটি হল হিমালয়। হিমালয়ের মৌমাছিরা এই মধু সংগ্রহ করে।
হিমালয়ের মৌমাছির কিছু বিশেষত্ব আছে। সেখানকার মৌমাছিগুলি সাধারণ মৌমাছির মতো নয়। আকারে এরা সাধারণ মৌমাছির থেকে অন্তত পাঁচ গুণ বড়ো এবং এরা অন্য মৌমাছির তুলনায় বেশি বিষাক্ত এবং এদের কামড় বা হুলের ব্যথাও অনেক বেশি।
মৌমাছিগুলির সাধারণ অবস্থান হল সুউচ্চ গ্রানাইটের পাহাড়ের কয়েকশো ফুট উঁচু কোনো এক খাড়া ঢালের গায়ে। হিমালয়ের মৌমাছিগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের মধু উৎপাদন করে। মধুর প্রকার সাধারণত মরশুমের ওপর নির্ভর করে। মৌসুমি ফুলের বিভিন্ন রস আরোহণ করে হিমালয়ান মৌমাছিগুলি মধুও উৎপাদন করে ভিন্ন ধরনের। তবে মার্চ ও এপ্রিল মাসে এরা এক ভিন্ন ধরনের মধু উৎপাদন করে।
পাঁচ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে মধু তার ঔষধি গুণের জন্য দুনিয়া জুড়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অ্যালার্জি হোক বা আঘাতের ক্ষত, মধুকে চিকিৎসাক্ষেত্রে যতভাবে ব্যবহার করা হয়, অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্যকে ততভাবে ব্যবহারের নজির নেই। মিশরের ফ্যারাওদের মৃত্যুর পর তাদের যাত্রার সঙ্গী কিংবা সদ্যোজাত শিশুর প্রথম খাবার-মধুর ব্যবহারের প্রচুর প্রমাণ রয়েছে।
নেপালের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এমন এক মধু পাওয়া যায়, যা খেলে অনুভূত হয় অদ্ভুত মাদকতা। নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি খেয়ে ফেললে বাস্তব-অবাস্তব জ্ঞানও হারিয়ে ফেলতে পারেন আপনি!
নেপালকে সবাই আধ্যাত্মিকতা আর রহস্যমণ্ডিত জগতের সেতুবন্ধন হিসেবে দেখে। নেপালের দুর্গম ভূপ্রকৃতি আর অনন্য জীববৈচিত্র্যের মাঝে এমন কিছু জিনিসের সন্ধান পাওয়া যায়, যা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। তেমনই এক জিনিস হল ‘পাগলা মধু’!
হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায় বসবাস করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মৌমাছি—এপিস ডোরসাটা ল্যাবোরিওসা। এই মৌমাছিদের নেপাল, ভুটান, ভারত এবং চিনের ইউনান প্রদেশের হিমালয় পার্বত্য এলাকায় ৮,২০০ থেকে ১,৮০০ ফুট ওপরে পাওয়া যায়। তবে নেপালেই সবচেয়ে বড়ো মৌমাছির প্রজাতি রয়েছে, যারা তিন সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। তবে আকার নয়, এই মৌমাছিদের বিশেষত্ব আসলে অন্য জায়গায়!
এই মৌমাছি রডোডেনড্রন নামে এমন এক গাছের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে, যার মধুতে গ্রায়ানোটক্সিন নামে বিষাক্ত যৌগ থাকে। গ্রায়ানোটক্সিন হ্যালুসিনেশন ঘটাতে পারে। এই গ্রায়ানোটক্সিন মিশ্রিত মধু তাই চিকিৎসা দ্রব্য হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর এই মধু একমাত্র নেপালের কুলুং উপজাতির লোকেরা সংগ্রহ করে, তাও বছরে মাত্র দু’বার।
নেপাল হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল অন্নপূর্ণা পর্বতশ্রেণির পাদদেশে বসবাস এই কুলুং উপজাতির। একমাত্র এই উপজাতির সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাজার ফুট উঁচুতে চড়ে মধু সংগ্রহ করে। এই মধু সংগ্রহ তাদের সংস্কৃতির অংশ। তাদের জীবিকা নির্বাহের এটিই একমাত্র পদ্ধতি নয়। কিছুটা লোকাচার এবং ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই তারা এমনটি করে।
এক দশকেরও কিছুমাত্র আগে বিচ্ছিন্ন এই জনপদের সঙ্গে বহির্বিশ্বের সংযোগ ঘটে। এর পর থেকে এই অঞ্চলের মধু এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকাতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও এর বহু আগে থেকে এই অঞ্চলের মধু চিন, জাপান এবং কোরিয়ায় ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হত।
জেনফোন, অ্যারিস্টটল এবং স্ট্রাবোর লেখায় এই মধুর উল্লেখ পাওয়া যায়। জেনোফোন তার বিখ্যাত ‘আনাবিস’ গ্রন্থে এক গ্রিক সেনাদলের উল্লেখ করেছেন,
যারা বর্তমান তুরস্ক অঞ্চলে এরকম এক মধু পান করে অসুস্থ হয়ে যায়, আবার কয়েক ঘণ্টা পর সুস্থও হয়ে ওঠে। মাঝের এই সময়টিতে তারা যেন প্রবল ঘোরের মধ্যে ছিল। ফলে সেনাদল এটিকে কোনো জাদুর প্রভাব ভেবেছিল। পরে তারা জানতে পারে যে তারা মধু খেয়েছিল।
৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যখন রোমান সেনাপ্রধান পম্পেই এশিয়া মাইনরে রাজা মিথ্রিদাতেসের সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন, তখন রাজা মিথ্রিদাতেস কৌশলে রোমান বাহিনীকে এই মধু পান করান এবং আক্রমণ করে পরাজিত করেন।
পশ্চিমি বিভিন্ন দেশে এই মধুকে ঔষধি দ্রব্য ভাবা হয়। সকালে খাওয়ার আগে অনেকে হালকা গরম দুধের সঙ্গে খুব অল্প পরিমাণ মিশিয়ে পানও করে।
এই মধু পান করলে দেহে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তুরস্কের মধুর মতো নেপালি মধুতে অসুস্থ হতে কাউকে দেখা না গেলেও এই মধু ঝিমুনি, মুখে লালার বৃদ্ধি এবং হৃৎকম্পন ধীর গতির কারণ। এছাড়া বেশি পানে চোখের সামনে অবাস্তব কিছু ঘটার কথাও বলে অনেকে।
এক বিখ্যাত ডকুমেন্টারি মেকার এই মধু পান করে মন্তব্য করেছেন যে, এটি অনেকটা মাদক সেবনের অনুভূতি দেয়, তবে অনেক ধীরগতিতে। অনেকের বিশ্বাস, এই মধু যৌনশক্তিও বৃদ্ধি করে। বহির্বিশ্বে এই মিথের ভিত্তিতেই নেপালি মধুর বাড়বাড়ন্ত হলেও মধুটির এই বিশেষ উপযোগিতা নিয়ে কোনো গবেষণা আজ অবধি হয়নি।
হিমালয়ের মৌমাছিরা অনেক রকমের মধু সংগ্রহ করে। মধু কেমন হবে তা নির্ভর করে কোন ঋতুতে মৌমাছি কোন ফুলের মধু সংগ্রহ করছে তার ওপর। যেমন বসন্তে নেপাল জুড়ে ফোটে রডোডেনড্রন। নেপালের জাতীয় ফুল এই রডোডেনড্রন। এই ফুল নীল এবং গোলাপি রঙের হয়। বসন্তকালে এই ফুলে ছেয়ে যায় নেপাল। হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বতের পাদদেশ জুড়ে এই ফুল দেখতে অসাধারণ লাগে। এই ফুলের রেণু আর মধু আকর্ষণ করে এখানকার বিশাল আকারের মৌমাছিদের। মৌমাছিরা ফুলে ফুলে ঘুরে সংগ্রহ করে এই ফুলের মধু আর রেণু। তারপর সেই মধু জমা করে পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত মৌচাকে।
এই মধু সংগ্রহ খুবই কষ্টসাধ্য কাজ। গ্রামবাসীরা দল বেঁধে মধু সংগ্রহ করে, তাও বছরে মাত্র দু’বার। প্রায় ৩০ জনের মতো থাকে দলে। প্রত্যেকে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়ার আগে দেবী রাংকেমির কাছে প্রার্থনা করে। ওদের বিশ্বাস, তিনিই তাদের রক্ষা করবেন। এর পর খাড়া পাহাড় বেয়ে প্রায় চার ঘণ্টার যাত্রা। তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গা, যেখান থেকে শুরু হবে মধু সংগ্রহের প্রস্তুতি।
মধু সংগ্রহের এই রীতি যেমন প্রাচীন, তেমনই প্রাচীন মধু সংগ্রহকারীদের পোশাকও। এত বড়ো মৌমাছির আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য তাদের কাছে কোনো সুরক্ষাকারী পোশাক নেই। হাতের কাছে যেমন পোশাক পায়, তাই দিয়েই কাজ চালায়। অনেক গ্রীষ্মের গরমেও শীতের সোয়েটার আর ট্রাউজার পরে, কেউবা মশারি আর বাঁশ দিয়ে হেলমেটের মতো বানিয়ে মাথা ও চোখ রক্ষা করে।
পাহাড়ের গা-ঘেঁষে মৌমাছিরা ঝুলন্ত মৌচাকে মধু জমা করে। এখান থেকে মধু সংগ্রহ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে কিছু নির্ভীক মানুষ হাজার বছরের ঐতিহ্য আর বিশ্বাসের কারণে জীবন বাজি রেখে মধু সংগ্রহ করে। প্রথমে তারা জংলি লতা এবং বাঁশ দিয়ে ঝুলন্ত মই তৈরি করে। বর্তমানে অবশ্য আঁশের তৈরি দড়ির ব্যবহার বাড়ছে মই বানাবার ক্ষেত্রে। তারা এই মই ঝুলিয়ে দেয় পর্বতের গা-ঘেঁষে, যেখানে মৌচাক রয়েছে। এর পর একজন দলপতির নির্দেশনায় দলের সদস্যরা মই বেয়ে ধীরে ধীরে নামতে থাকে। কয়েকজনের হাতে থাকে ২৫ ফুট লম্বা বাঁশ, যার মাথায় ছুরি বাঁধা থাকে মৌচাক কাটার জন্য।
কারও পিঠে থাকে বাঁশের ঝুড়ি এবং হাতে থাকে কয়েক মুঠো জ্বলন্ত খড়। সবার গায়েই থাকে ভারী এবং মোটা পোশাক। একদিকে গরমে নাজেহাল অবস্থা, অন্যদিকে এক হাতে ঝুড়ি আর বাঁশ সামলানো—এরকম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় মৌচাকের কাছে পৌঁছোয় তারা। কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হয় এখান থেকে।
মৌচাকের যত কাছে তারা পৌঁছোয়, মৌমাছিরা তত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। খড়ের ধোঁয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে যায়। প্রত্যেকের ওপর এই তিন সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের মৌমাছিরা তাদের বিষাক্ত হুল নিয়ে আক্রমণ চালায়। এই অবস্থায় কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সমুদ্রপৃষ্ঠের হাজার ফুট ওপরে এক হাতে বাঁশ আর দড়ির মই ধরে রাখা অসম্ভব হলেও, কুলুং উপজাতির লোকেরা অবলীলায় কাজটি করে যায়। বাঁশের সঙ্গে লাগানো ছুরির খোঁচায় মধু ভরতি মৌচাক এসে পড়ে নীচে ধরে রাখা ঝুড়ির মধ্যে।
প্রতি খোঁচার সঙ্গে হাজার খানেক মৌমাছি আক্রমণ শুরু করে। তাদের জোড়াতালির পোশাক ঠেকাতে পারে না মৌমাছির আক্রমণ। তাও এই লোকেরা পর্যাপ্ত মধু সংগ্রহ করে তবেই ক্ষান্ত হয়। প্রত্যেকে যখন জীবন নিয়ে পাহাড়ে উঠে আসে, তখন সবাই ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। সবার গায়ে কমপক্ষে চার-পাঁচটা মৌমাছির হুল। সকলে এর পর নদীতে গিয়ে নিজেদের পরিষ্কার করে। তবে সব ক্লান্তি-কষ্ট দূর হয়ে যায় এই অমৃত সুধা পান করলে।
এক মরশুমে মাত্র তিনদিনে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ গ্যালন মধু সংগ্রহ করা হয়। এর পর এই মধুকে ছাঁকনিতে দিয়ে মৌচাক আর মৃত মৌমাছির অবশিষ্টাংশ থেকে আলাদা করা হয়। তিন দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে এই মধু নিয়ে যাত্রা শুরু হয় গ্রামের দিকে।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এই মধু বহির্বিশ্বে বিক্রি করার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাদের গ্রামের একমাত্র পড়াশোনা জানা ব্যক্তি—জাঙ্গি। তিনিই মধু বেচা কেনার সব কাজ করে থাকেন। এই গ্রামের মানুষদের মধ্যে তারই একমাত্র পাকা বাড়ি আছে শহরে। তার আয় কত—তা কেউই জানে না। এই মধু তিনি কত টাকায় বিক্রি করেন, তার খোঁজও কেউ নেয় না। গ্রামের লোকদের শুধু ভোজ্য তেল, ব্যাটারি, নুডুলস আর বিয়ার হলেই চলে!
তবে যা-ই হোক, এই ‘পাগলা মধু’ নেপালিদের পাগল করে না। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই মধু সংগ্রহ করে, এই মধু সেবনে সাধারণ মানুষদের মতো তাদের নেশা হয় না। হয়তো বছরের পর বছর পান করার ফলে তাদের ওপর এর প্রভাব কম। তবে তারা যে ঘোরের মধ্যে থাকে, সেটি বোঝাই যায়।
বহির্বিশ্বে এই মধু এলএসডির প্রাকৃতিক রূপের মতো। ভেষজ চিকিৎসায় এর চাহিদা কম নয়। তবে জীবনের ঝুঁকি ও সে তুলনায় আর্থিক নিরাপত্তা না থাকার কারণে কুলুং উপজাতির লোকেরা ধীরে ধীরে এই পেশা ছেড়ে দিতে চাইছে। ফলে মধু আমদানি-রপ্তানিকারকদের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত এই প্রাচীন ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখাও দুরূহ হয়ে পড়বে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কুলুং সম্প্রদায়ের মানুষেরা অনেকটাই বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। এক কথায় বলা যায় দেশের অন্যান্য অপরাপর জনগোষ্ঠী থেকে একেবারে আলাদা এদের বসবাস। হোংগু উপত্যকার পাশ থেকে বয়ে চলা হোংগু নদী আর তার আশেপাশের বনজঙ্গল ঘিরে একটি গ্রাম যার নাম সাদির। এই সাদির গ্রামটি জুড়েই তাদের পৃথিবী আবর্তিত। সাদির গ্রামের বাইরে যাওয়ার তাদের তেমন কোনো প্রয়োজন হয় না। এই গ্রামের বৃদ্ধরা এখনও নেপাল বলতে শুধুমাত্র কাঠমুন্ডুকেই বোঝে। কাঠমাণ্ডু তাদের গ্রাম থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
কাঠমান্ডুর দরবার স্কোয়ারে আলাপ হয়েছিল এক লোকগবেষকের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে জানতে চেয়েছিলাম পাগলা মধু নিয়ে। তা কথায় কথায় তিনি জানিয়েছিলেন, “কুলুং সম্প্রদায়ের মানুষরাই হিমালয় থেকে পাগলা মধু সংগ্রহের কাজ করেন। হিমালয়ের হোংগু উপত্যকার কয়েকশো ফুট উপরে পাগলা মধুর মৌচাক অবস্থিত। কুলুং সম্প্রদায়ের একজন মৌয়াল মাউলি ধান। মাউলির বাবাও ছিল একজন মৌয়াল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবার হাতে মাউলির মধু সংগ্রহের হাতেখড়ি হয়।
বাঁশ আর দড়ির তৈরি ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে কয়েকশো ফুট উঁচুতে উঠে মধু সংগ্রহের কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল ছোটো মাউলির কাছে। মৌচাকটি পাথরের ওপর থেকে খুলে নেবার সময় মৌমাছি তার হাতে, পায়ে, মুখে সর্বত্র হুল ফুটাতে শুরু করলে ব্যথায় কাতর হয়ে যেত সে। তবু শক্ত করে দড়ি ধরে রাখতে হত দীর্ঘক্ষণ। মৌচাকটি সম্পূর্ণ আলাদা না করে নামতে পারত না সে।
কুলুং সম্প্রদায়ের সবাই মধু সংগ্রহের কাজটি বহু আগে ছেড়ে দিয়েছে। প্রায় পনেরো বছর তো হয়েছে তাদের এই পেশা ছেড়ে দেয়ার। তাই এর পর মাউলিকে একাই এই কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে।
কাজটি মাউলির জন্য কখনোই শখের বা নেশার ছিল না। সে এই কাজের ইতি টানতে চেয়েছে বহুবার। কিন্তু পারেনি। খাদ্যশস্য এবং শাকসবজিতে সে স্বয়ং-সম্পূর্ণ থাকলেও তেল, লবণ, পোশাকসহ আরও কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে তার অর্থের প্রয়োজন ছিল। তাই আর কেউ কাজটি না করলেও মধু সংগ্রহের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি তাকে করতেই হত। তিনি তার সম্প্রদায়ের শেষ ব্যক্তি যে এই মধু সংগ্রহের কাজ একাই দীর্ঘদিন করেছে।
মাউলির পরিবার বেশ বড়ো। তার তিনজন স্ত্রী ছিল। ছয়জন সন্তান রেখে তারা মৃত্যুবরণ করে। সন্তানদের মাউলিই পালন করেছে। তার দুই কন্যা বিধবা হবার পর তারাও তার সঙ্গে থাকতে শুরু করে। ফলে তার কাঁধে তার পাঁচজন নাতি-নাতনির দায়িত্বও ছিল। এভাবেই জীবনের ৪২ বছর কাটিয়েছেন মাউলি।
মাউলি ধানের বয়স এখন ৫৭ বছর। গত বছর জুলাই মাসেই নিজের কাজের সমাপ্তি টেনেছে এই মৌয়াল। কুলুং সম্প্রদায়ের শেষ ব্যক্তি হিসেবে মধু সংগ্রহ পেশার এবং রীতির ইতি টানে সে।
হয়তো মাউলির এই ইতিহাস সম্পর্কে আমরা কখনোই জানতে পারতাম না। ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফির একটি টিম মাউলির অবসরের পুরো ঘটনাটি এবং তার অবসরের পূর্বের শেষ মধু সংগ্রহের ভিডিয়ো চিত্র ধারণ করে। যার ফলে ইতিহাসের একটি গোষ্ঠীর রীতির সমাপ্তির দলিল থেকে যাবে চিরকাল।
ভিডিয়োটিতে মৌয়াল মাউলির কর্মজীবনের ক্রান্তিলগ্নের কিছু মুহূর্তেরও অংশ রয়েছে। মাউলি বলে, ‘আমার সন্তানেরা স্কুলে পড়ালেখা করছে, তাদের আর এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা গ্রহণ করতে হবে না।’
মাউলি তার এই কাজ করতে করতে এখন ক্লান্ত। মৌয়াল পেশাটি ছেড়ে দিয়ে এখন বাকিটা জীবন সে নির্বিঘ্নে কাটাতে চায়।
মাউলি একটা ইন্টারভিউয়ে তার শেষ মধু সংগ্রহের বর্ণনা দিয়েছে বেশ প্রাণবন্তভাবে। তার সেই মধু সংগ্রহ ক্যামেরাবন্দি করে ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক চ্যানেল। জুলাই মাসে মাউলি ধান তার সহযোগী আসধন কুলুংকে সঙ্গে নিয়ে শেষবারের মতো হোংগু উপত্যকায় চড়েছিল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির কর্মকর্তাদের বিস্ময় বাড়িয়ে দিয়ে কোনোরকম নিরাপত্তা দড়ি ছাড়াই উপত্যকার ওপর থেকে ঝুলানো বাঁশ এবং দড়ির তৈরি ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে আড়াইশো ফুট ওপরে উঠে যায় সে।
তার কাঁধে ঝোলানো ছিল একটি বড়ো বাঁশ তার সঙ্গে দড়িতে বাঁধা একটি ঝুড়ি এবং ধোঁয়া জ্বালানোর কিছু সরঞ্জাম। মৌচাক থেকে ১০ ফুট দূরত্বে থেকে বাঁশের আগায় ধোঁয়া জ্বালিয়ে সেটি মৌচাকের কাছে নেয়। ধোঁয়ার তীব্রতায় অল্পক্ষণের মধ্যেই মৌচাক থেকে মৌমাছিগুলি বেরিয়ে আসতে শুরু করে এবং মাউলির শরীরে হুল ফুটায়। অবাক করা বিষয়টি হল প্রতি মুহূর্তে এত এত হিমালয়ান মৌমাছির কামড় খাওয়া সত্ত্বেও মাউলি বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না। তার চেহারায় ব্যথার কোন ছাপ ছিল না। সে আপন সুরে গুণগুণ করে একটি মন্ত্র জপতে থাকে।
কুলুংদের বিশ্বাস মন্ত্রটি ক্রোধান্বিত মৌমাছিদের শান্ত করে। মন্ত্র জপতে জপতে পরিপূর্ণ মৌচাকটি কাঁধে ঝুলে থাকা ঝুড়িতে ভরে নেয় মাউলি। এই পুরো প্রক্রিয়াতে মাউলির দু’ই ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ঝুলে থেকে বিষাক্ত সব মৌমাছির কামড় খেয়ে মধু সংগ্রহের কাজ করার এই অফুরন্ত শক্তি মাউলি কোথায় পায় সে কথা একমাত্র সে-ই জানে।
এই পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে মাউলির কোনো খেদ নেই। বরং কুলুং সম্প্রদায়ের শেষ মৌয়াল হিসেবে দীর্ঘদিন পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে সে গর্বিত। সে এটা ভেবেও গর্বিত যে, সে-ই তার সম্প্রদায়ের পাহাড়ে চড়া সর্বশেষ মৌয়াল।
সে এটা ভেবে শিহরিত হয় যে, তার ভিডিয়ো চিত্রটি দেখার পর পৃথিবীর মানুষ জানতে পারবে যে নেপালের প্রত্যন্ত এক ছোটো গ্রামে এরকম একটি পেশা ছিল। মৌচাকের মৌমাছিগুলি যদি বুঝতে পেরে থাকে যে মাউলি আর তাদের বাসা ভাঙতে আসবে না তাহলে হয়তো তারাও অনেক খুশি হবে।
দরবার স্কোয়ারে সূর্য অস্তাচলে। নেপালি ভদ্রলোক মাউলির গল্প বলে একটু নিশ্চুপভাবে বসে রইলেন তারপর বললেন, “মাউলি আমার ভাই!”
