রহস্যে ঘেরা আলেকজান্ডারের বংশধরদের গ্রামে
পাহাড়-পর্বতে বেষ্টিত ভারতের হিমাচল প্রদেশ। সেই প্রদেশের একটি দুর্গম গ্রামের নাম মালানা। নানা কারণে এই গ্রামটি বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত, তবে রহস্যময়। প্রাচীন ভারতের অন্যতম গ্রাম। বলা হয়ে থাকে মালানা বিশ্বের প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক গ্রাম। অন্তত মালানার অধিবাসীরা তা-ই মনে করেন। গ্রামটিকে অনেকে ‘মালানা নালা’ নামেও চিনে থাকেন।
এই গ্রামে প্রবেশের সবচেয়ে সহজ রাস্তাটি হল জারি নামক স্থান থেকে ট্যাক্সি করে যাওয়া। তবে আপনি চাইলেই এই গ্রামে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই গ্রামে প্রবেশের আগে স্থানীয় সেনা কর্তৃপক্ষকে আপনার আগমনের কারণ জানাতে হবে এবং আপনার বায়োডেটা জমা দিতে হবে। আপনার আগমনের কারণে তারা সন্তুষ্ট না হলে আপনাকে মালানা গ্রামে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আপনি পারমিশন
পাবেন না ওই গ্রামে প্রবেশ করার। তাই মালানায় যাওয়ার আগে অবশ্যই আপনাকে কারণ ঠিক করেই যেতে হবে। আর হ্যাঁ, আপনি সাংবাদিক হলে একটা এক্সটা অ্যাডভান্টেজ পাবেন। তাও সঠিক কারণ দেখাতে হবে আপনাকে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কুল্লু ভ্যালির পার্শ্ববর্তী ‘পার্বতী’ উপত্যকায় মালানা গ্রামের অবস্থান, যা আজও পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এক স্থান। নেই কোনো ভালো পথ। পাহাড়ের দুর্গম পথ অতিক্রম করে আপনাকে পৌঁছোতে হবে সেখানে। তার ওপরে আবার গ্রামটির অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৬৫২ মিটার উঁচুতে।
হাজারো প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে সারা বিশ্ব থেকে প্রচুর মানুষ সেখানে ভিড় জমায়। তারা কারা? শুধুই পর্যটক? নাকি আমাদের মতো অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষজন? নাকি নতুন স্টোরির খোঁজে সাংবাদিক কিংবা নতুন লেখার প্লটের খোঁজে লেখক?
আপনি শুনলে অবাক হবেন এইসব মানুষজন ছাড়াও এক বিশেষ শ্রেণির মানুষ ভিড় জমান মালানাতে। যারা গাঁজার নেশা করেন তারা। আসছে গল্পে।
কুল্লু ভ্যালিতে মোট তিনটি পাহাড় রয়েছে। সেই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে মালানা নদী। আর সেই নদীর তীরেই সবুজ, পাহাড়ি এই গ্রাম। রহস্যময় এই গ্রামের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কোনো মিল নেই। এমনকি তাদের ব্যবহৃত ভাষা কানাসি বিশ্বের আর কোথাও প্রচলিত নেই।
একটু আগেই যেটা বলছিলাম, এক শ্রেণির মানুষ সব বাধা অতিক্রম করে এই মালানায় ভিড় জমান। যারা ভিড় জমান তারা মূলত বিশ্বের বড়ো বড়ো মাদকসম্রাট। মালানায় উন্নত মানের গাঁজা চাষ ও গাঁজা থেকে বিভিন্ন মাদক তৈরি করা হয়, যা সংগ্রহ করার জন্য মাদক সম্রাটরা মালানায় আসেন। মালানায় গাঁজা থেকে এমন কিছু মাদক তৈরি হয়, যা বিশ্বের আর কোথাও তৈরি করা সম্ভব হয়নি বলে কথিত আছে। মালানা গ্রামবাসীর মূল অর্থনৈতিক উৎসও এই মাদক ব্যাবসা।
১৯৯৪ এবং ১৯৯৬ সালে পরপর দু-বার বিশ্বের সবেচেয়ে ভালো এবং দামি হাশিশ উৎপাদনের রেকর্ডটিও মালানাবাসীর দখলে। গাঁজার সবচেয়ে ভালো প্রজাতিটিই এই অঞ্চলে জন্মায় এবং মালানাবাসীরা নিজস্ব পন্থায় এই গাঁজাকে প্রক্রিয়াজাত করে। বিভিন্ন দেশের মাদকসম্রাটরা মালানা থেকে হাশিস তৈরির বিশেষ প্রক্রিয়া জেনে নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে বলেও জানা যায়।
মালানার অধিবাসীরা এইসব মাদক উৎপাদন পদ্ধতি গোপন রাখেন। নব্বইয়ের দশকে মালানায় একবার একসঙ্গে ১২ জন পর্যটকের লাশ পাওয়া যায়; তখন তাদের লাশ নিয়ে বিভিন্ন গল্প প্রচলিত হয়। তার মধ্যে অন্যতম হল, এরা পর্যটকের বেশে মালানায় উৎপাদিত বিভিন্ন মাদকের ফর্মুলা গোপনে বা জোরাজুরি করে জেনে নিতে চেয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মালানার মাদক প্রস্তুতকারীরা তাদের হত্যা করে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে ফেলে রাখে।
গাঁজার উৎপাদন ভালো হয় পাহাড়ি ভূমিতে। এজন্য মালানা প্রাকৃতিকভাবেই গাঁজা চাষের উপযোগী। গাঁজা সরাসরি মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এ থেকে আরও উন্নত মানের মাদক তৈরি করা যায়। এর মধ্যে চরস ও হাশিশ খুবই বিখ্যাত। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রচলিত গাঁজার চুরুটের সঙ্গে চরসের বেশ মিল আছে। চরসে গাঁজা পাতার সঙ্গে বিভিন্ন ফুলের রস মিশিয়ে তা সেবন করা হয়। আর উন্নত প্রজাতির বাছাইকৃত গাঁজা বৃক্ষের যে স্থানে কুঁড়ি ধরে সেই স্থান থেকে সংগ্রহকৃত আঠা থেকে তৈরি করা হয় হাশিশ। মালানায় উৎপাদিত এই বিশ্বখ্যাত হাশিশকে মালানা ক্রিম নামেও অবিহিত করা হয়।
হাশিশ একটি প্রাচীন মাদক, যা নেশাদ্রব্য হিসেবে খুবই কার্যকরী। হাশিশ নিয়ে নানা কিংবদন্তি আছে। কথিত আছে, ক্রুসেডের সময়ে একদল দুর্ধর্ষ যোদ্ধাদের হাশিশ খাওয়ানো হত যাতে তারা প্রতিপক্ষের লোকদের নির্দ্বিধায় হত্যা করে ফেলতে পারে। ফলে হাশিশ অনেক আগে থেকেই ঘাতক মাদক। আর এই হাশিশের জন্যই সারা বিশ্বের অসংখ্য মাদকসম্রাট মালানায় ভিড় জমান।
মাদক সম্রাটদের পাশাপাশি এখন প্রতিবছর বেশ কিছু পর্যটকও মালানায় ঘুরতে যান। তবে সবার জন্য কড়াকড়ি ব্যবস্থাপনা। গ্রামে ঢুকতে প্রথমেই একটি চেকপোস্ট। সেখানে আপনাকে তল্লাশি যতটা না মুখ্য, তার চেয়ে মুখ্য আপনি কী কারণে মালানায় প্রবেশ করতে চান তার সঠিক উত্তর দিতে পারা। যদি আপনি তাদের মনমতো উত্তর দিতে না পারেন তবে আপনাকে খালি হাতে ফিরে আসতে হতে পারে। যেটা একটু আগেই বলছিলাম। কারণ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ভেতরে প্রবেশের পর কোনো কিছু স্পর্শ করতে পারবেন না আপনি, এটাই আইন। কোনো কিছু স্পর্শ করে ফেললে গুনতে হবে জরিমানা। আপনি তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো আলাপ-আলোচনা বুঝতে পারবেন না; কেননা তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। সেই ভাষার নাম কানাসি। কানাসি নিয়ে দুটি মত প্রচলিত আছে।
প্রথমত, সেখানে যেহেতু মাদকের মতো একটি নিন্দনীয় ব্যাবসা পরিচালিত হয়, যার সঙ্গে বিশ্বের বড়ো বড়ো মাদক ব্যবসায়ীদের সংযোগ, সেহেতু সেসব ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের থেকে নিজেদের কথাবার্তা গোপনে সেরে নিতে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে তারা এই কানাসি ভাষা তৈরি করে নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এটি স্বতন্ত্র একটি ভাষা, যা প্রাচীনকাল থেকেই এখানকার অধিবাসীরা ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, এই ভাষা ভারত কিংবা বিশ্বের অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয় না। কানাসি ভাষার এই রহস্য উদ্ঘাটন করার জন্য সুইডেনের বিখ্যাত আপসালা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গবেষণা চালায়। সেখানকার এক গবেষক বলেন, কানাসি একটি অলিখিত এবং অপরিচিত ভাষা। স্পষ্টভাবে এ ভাষাকে বিপন্নপ্রায় ভাষার অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তিনি আরও বলেন, কানাসি ভাষা চিন-তিব্বতি ভাষা পরিবারের অন্তর্গত, যা মালানা গ্রামে ব্যবহৃত হয়। ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবার থেকে কানাসি ভাষা পুরোপুরি আলাদা। ফলে এই ভাষা অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে, যা প্রাগৈতিহাসিক যুগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি ভাষাবিজ্ঞানের যে ছক, তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
তবে এই ভাষা এখনও ভাষাবিদদের কাছে রহস্যময়। হিমাচল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ইনস্টিটিউট অফ ট্রাইবাল স্টাডিজের পরিচালক ভি কে ভয়েড বলেন, “মালানাবাসীর ভাষার সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের ভাষার কোনো মিল নেই। এমনকি কুল্লু রাজ দরবারে ব্যবহৃত ভাষার সঙ্গেও এর কোনো মিল পাওয়া যায় না। এটি বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণে সৃষ্ট ভাষা হতে পারে। তারা তাদের ভাষায় ব্যবহার করে এমন ৫০০-৬০০ শব্দ আমরা সংগ্রহ করে গবেষণা চালাচ্ছি। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করছি, কোন শব্দটি কোন ভাষা থেকে নেওয়া হয়েছে। এটা সফলভাবে করতে পারলে বোঝা যাবে, তাদের ভাষার আদি উৎস কী।”
আমাদের কাছে কানাসি ভাষা এখন পর্যন্ত তাই রহস্যময়। শুধু তাদের ভাষাই রহস্যময় নয়; রহস্যময় তাদের ধর্মবিশ্বাসও। ভাষার মতোই প্রচলিত কোনো ধর্মেও তাদের বিশ্বাস নেই। অন্য কোনো ধর্মের সঙ্গে তাদের ধর্মের মিলও পাওয়া যায় না। একজন দেবতাকে কেন্দ্র করে তাদের ধর্মবিশ্বাস যাপিত হয়। সেই একমাত্র দেবতার নাম ‘জমলু ঋষি’। হিন্দু পুরাণগুলোতে এই ঋষির নাম পাওয়া যায়। তাই ধারণা করা হয়, মালানাবাসী এখনও আর্য-পূর্ববর্তী সময়ের সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী।
ভারতবর্ষে সাধারণত দেখা যায়, প্রায় সকল দেবতার মন্দিরে পুজো হয়ে থাকে, কিন্তু জমলু ঋষির জন্য সে ধরনের কোনো পুজোর ব্যবস্থাপনা নেই। তবে উৎসবে তাকে সর্বশক্তিমান দেবতা হিসেবে স্মরণ করা হয়ে থাকে। প্রচলিত পদ্ধতিতে পুজো না করলেও সবার ঘরে ঘরে তার আধ্যাত্মিক বাণী সংরক্ষিত আছে। এছাড়া দুটি প্রাচীন মন্দির আছে, সেখানেও জমলু ঋষির বিভিন্ন বাণী দেয়ালে অঙ্কিত রয়েছে, কিন্তু কোনো পুজোর আয়োজন সেখানে হয় না।
মালানা গ্রামের পরিচালনা পদ্ধতিতে এই জমলু ঋষির প্রভাব অত্যধিক। সমাজের একজন তার প্রতিনিধিত্বের শক্তি লাভ করেন। তাকে ‘গুরু’ নামে অভিহিত করা হয়। সমস্ত গ্রাম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হলেও তার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব থাকে সবার ওপরে।
লেখার প্রথমে একটা কথা বলেছিলাম, মালানা কি বিশ্বের প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক গ্রাম? এই উত্তর অনুসন্ধান করার আগে এই দাবি তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে খানিকটা
আলোচনা করা প্রয়োজন। গণতন্ত্রের আলোচনা আসলেই প্রাচীন নগর রাষ্ট্র গ্রিসের প্রসঙ্গ চলে আসে প্রথমেই। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে গ্রিসের রাজধানী এথেন্স ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য শহরে যে রাজনৈতিক পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল তা থেকেই গণতন্ত্রের উৎপত্তি।
স্বভাবতই আমরা যখন মালানা গ্রামকে ‘প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক’ গ্রাম বলছি, তখন নিশ্চয়ই সেই প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গে এর কোনো ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে; আর তা হচ্ছে, এখানকার অধিবাসীরা মনে করেন তারা গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বংশধর।
এখন আমরা তাদের এই দাবির ন্যায্যতা নিয়ে কিছুটা অনুসন্ধান করব। ঐতিহাসিকদের সূত্রানুসারে, তাদের এই দাবির পক্ষে-বিপক্ষে মতামত রয়েছে। পক্ষের দাবি অনুসারে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে যখন ভারত অভিযানে আসেন তখন তার সঙ্গে বিপুল সংখ্যক শ্বেত সৈন্য ছিল। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ভারতবর্ষে প্রায় ১৯ মাস অবস্থান করেন। কিন্তু যখন ভারত ত্যাগ করেন তখন আর সকল সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি।
এমন একটি অংশকে তিনি হিমাচলের পাহাড়বেষ্টিত গ্রাম মালানায় বসবাস করার আদেশ দেন। সেসব প্রশিক্ষত সৈন্যরা যখন সেখানে বসবাস শুরু করে, তখন তারা তাদের মূল জন্মভূমি গ্রিসের আদলেই শাসনব্যবস্থা প্রণয়ন করে। সেই ব্যবস্থাপনা এখনও পর্যন্ত বজায় আছে। হিমাচলের স্থানীয় এক লোকগবেষকের লেখা একটি প্রবন্ধ পড়ে জানা যায়, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সঙ্গে বা গ্রিকদের সঙ্গে মালানার অধিবাসীদের যোগসূত্রের একটি বিষয় আছে।
কথিত আছে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনীর একটি অংশ ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে একটি বিচ্ছিন্ন গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা ভারতের পাঞ্জাবে অবস্থিত পুরী রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। সেসব সৈন্যদের দৈহিক গঠনের সঙ্গে মালানার অধিবাসীদের মিল রয়েছে। পাশাপাশি সেসময়ের কিছু চিত্রকর্ম এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। যেমন একটি চিত্রকর্মযুক্ত তরবারি সেখানকার একটি মন্দিরে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এই জন্মসম্বন্ধীয় সংযোগ ঐতিহাসিকদের দ্বারা স্বীকৃত নয়। এমনকি আমি সেখানকার অনেক অধিবাসীদের এ-বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি; অনেকেই জানেন না এই উপকথার উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে।
গ্রিসের আদলেই মালানায় দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে। আইনসভায় উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ দুটি ভাগ রয়েছে। উচ্চকক্ষের সদস্যরাই মূল ক্ষমতার অধিকারী। এই কক্ষের সঙ্গে আবার জমলু ঋষির একটি আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রত্যেক সদস্যই একমাত্র দেবতা জমলু ঋষির স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত।
মালানা গ্রামের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানিয়েছেন, দেবতাই চূড়ান্ত ক্ষমতাবান। আমরা তার প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হই মাত্র। এখানে তিন ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রয়েছে, তাদের মধ্য অন্যতম ‘গুরু’। ‘গুরু’ হলেন প্রকৃত দয়ার সাগর, তার দয়া সমস্ত গ্রামকে ঘিরে রাখে, আমাদের রক্ষা করে। তিনি আমাদের পক্ষ হয়ে জমলু ঋষির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
অন্যদিকে মালানার অধিবাসীদের গায়ের রং অনেকটা সাদা; হিমাচলের মানুষ থেকে অনেকটা ভিন্ন। শরীরের গঠনও গ্রিকদের মতো। ফলে এটিও তাদের গ্রিক সংযোগের দাবিকে শক্তিশালী করে।
সর্বোপরি, এই আইনসভার কারণেই মালানাদের গ্রিক সংযোগের দাবি সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে। যদি তাদের এই দাবি সঠিক হয়ে থাকে তবে মালানাই প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক গ্রাম।
তবে খেয়াল রাখতে হবে, প্রাচীন গ্রিসে যেসব গণতান্ত্রিক এলাকা ছিল তা ‘নগর’ বা ‘নগর রাষ্ট্র’ আর মালানা হল ‘গ্রাম’ অর্থাৎ বিশ্বের প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক গ্রাম। আর সেজন্যই মালানার অধিবাসীরা সম্পূর্ণ সবুজে ঘেরা তাদের গ্রামকে বলে থাকেন ‘হিমালয়ের এথেন্স’।
যে গ্রামের অধিকাংশ জিনিস আজও রহস্যে ঘেরা। মাদকদ্রব্যের মধ্যে বিশ্বে চরস খুবই বিখ্যাত। হিমালয়ের এই অঞ্চলে উৎপাদিত গাঁজা থেকে তৈরি করা চরস পৃথিবী বিখ্যাত। আর এই কারণে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ এই গ্রামে শুধুমাত্র চরসের খোঁজে এই গ্রামে ঘুরতে যায় গবেষক কিংবা লেখক হিসেবে। আপনিও ভারতের ‘প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক’ গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে চলেই যেতে পারেন। হিমালয় প্রেমিক যারা হিমাচল যাবেন তারা কিন্তু অবশ্যই একটা চেষ্টা চালাবেন মালানা যাওয়ার।
