রূপকুণ্ডের রহস্যময় ‘কঙ্কাল হ্রদ’
চলুন এবার যাওয়া যাক হিমালয়ের এক রহস্যময় পাহাড়ি হ্রদে। যে হ্রদে দীর্ঘকাল যাবত পড়ে রয়েছে প্রচুর মানুষের কঙ্কাল। একটা-দু’টো নয়, কয়েকশো কঙ্কাল। হিমালয়ের কোলে পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতায় উত্তরাখণ্ডের রূপকুণ্ড হ্রদ ও তার চারপাশে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের কঙ্কাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাই এই হ্রদ ‘কঙ্কাল হ্রদ’ বা ‘রহস্য-হ্রদ’ নামেও পরিচিতি। এই কঙ্কাল নিয়ে কয়েক যুগ ধরে চলছে বহু গবেষণা।
হাওড়া থেকে ট্রেনে প্রথমে হরিদ্বার বা হলদোয়ানি অথবা কাঠগোদামও যেতে পারেন তারপর ভাড়া গাড়ি শেয়ার কিংবা বাসে কর্ণপ্রয়াগ। বাস চলে এই রাস্তায়, তবে বেশ কম। কর্ণপ্রয়াগ থেকে থারালি হয়ে লোহাজং কিংবা ওয়ান অবধি পৌঁছে যান। তারপর ৫ থেকে ৭ দিনের ট্রেকিং। এরপর ৭০ কিমি রাস্তা আপনাকে পায়ে হেঁটে যেতে হবে।
আট হাজার ফিটের উচ্চতায় লোহাজং স্থানটি বেশ শীতল ও মনোরম। ট্রেকিংয়ের দরকারি কিছু জিনিসপত্র ভুলে গেলে সব কিছুই কিনতে পাবেন এখানে। চাইলে ভাড়া নিতে পারেন। আরও ওপরে উঠলে টেন্টও ভাড়া মিলবে, কিনতেও পাবেন।
লোহাজং থেকে ৭ কিমি দূরে দিদিনা। যদিও অনেকেই গাড়িতে চলে যান ওয়ান নামক স্থানে। সেখান থেকেই ট্রেক শুরু করে। আপনি প্রকৃতি প্রেমিক হলে দিদিনা হয়ে চলুন। ওক-পাইন-রডডেনড্রনের জঙ্গলে দেখতে দেখতে চলুন। ছবিত মতো পাহাড় আর তার কোলে ছোট্ট ছোট্ট গ্রামগুলি বেশ সুন্দর। একদম হাতে আঁকা ছবির মতো।
নীলগঙ্গা নদী পার হলে আরও চড়াই বাড়বে। মেঘ রোদ কুয়াশা অতিক্রম করে পৌঁছে যান দিদিনায়। হোম-স্টে তে থেকে যান। আগে থেকে বুকিং থাকলে ভালো। দিদিনা মোটামুটি ৮০০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত।
পরদিন ভোরবেলায় উঠে পড়ুন, ব্রেকফাস্ট সেরে যাত্রা শুরু করুন। জঙ্গনের মধ্যে দিয়েই কঠিন চড়াই পার হতে হবে। গাইড এবং পোর্টার সঙ্গে নেবেন অতি অবশ্যই। ঘণ্টা পাঁচেক হেঁটে খুপাল টপ। এখান থেকে এবার আলি বুগিয়ালের পথে যাত্রা শুরু।
আলি বুগিয়াল। এক বিস্তীর্ণ সবুজ এলাকা। যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে তাহলে আপনি অনেক তুষারশৃঙ্গ দেখতে পাবেন। আরও ঘণ্টা তিন-চারেক হেঁটে পৌঁছোন রেদিনীবুগিয়াল।
বেদেনীবুগিয়াল পৌঁছোতে প্রায় ৮-৯ ঘণ্টা সময় লাগবে। রাস্তা ১৪ থেকে ১৫ কিমি। বড্ড চড়ায় হওয়ার জন্য একটু বিশ্রাম নেবেন। তারপর আবার হাঁটবেন। বেদেনীবুগিয়ালের উচ্চতা প্রায় ১২০০০ ফুট। এখান থেকে সোনালি রোদের মধ্যে দিয়ে কিছু দূরেই ত্রিশূল, নন্দাঘুন্টি দেখতে পাওয়া যায়।
এখানে ফরেস্টের বেশ কয়েকটি হাট ও কিছু সাদামাঠা কটেজ আছে। চাইলে টেন্টেও থাকতে পারেন। সবুজ ঘাসের কার্পেটের ওপর টেন্টে থাকার মজা আলাদা।
সময় করে বেদিনীকুণ্ডটি দেখে নিন। আর তার পাশে থাকা ছোট্ট মন্দিরে পুজো দিন। বর্ষার পর কুণ্ডে যখন জল থাকে তখন নন্দাঘুন্টি আর ত্রিশূলের অসাধারণ প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়।
পাথরনাচুনিতে ফরেস্ট হাট, কটেজ আছে। পাহাড়ের মাথায় কলু বিনায়কের মন্দির। কঠিন চড়াই রাস্তা। কলু বিনায়ক-এর ছোট্ট একটা মন্দির আপনার মন ভরিয়ে দেবে।
একটা দিন কাটান বাগুয়াবাসা ক্যাম্পে। তারপর আবার হাটা শুরু। এই পথে বরফ বাড়বে। আর বরফে হাঁটা একটু সমস্যার হবে। মনের জোরে হাঁটুন। ধীরে হাঁটুন কিন্তু সতর্কভাবে হাঁটুন। পা টিপে টিপে এবং সাবধানে। ‘ধ্যান হটি দুর্ঘটনা ঘটি’। একটি ভুল পদক্ষেপ আর মৃত্যু নিশ্চিত। প্রায় ঘণ্টা দশেক ট্রেক করে রেস্ট নিন।
কপালে থাকলে এই পথেই ব্রহ্মকমল, হেমকমলের মতো দুষ্প্রাপ্য ফুলগুলি দেখতে পাবেন। বরফ কেটে পথ বানাতে হতে পারে, তাই বরফ কাটার জিনিসপত্র অতি অবশ্যই সঙ্গে নেবেন।
রূপকুণ্ড পৌঁছে সেখানকার পরিবেশ দেখে আপনি মোহিত হয়ে যাবেন। হিমালয়ের কোলে পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতায় রূপকুণ্ড।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ মাইল উঁচুতে এর অবস্থান। এই হ্রদটি দেখতে সারা পৃথিবী থেকে মানুষজন আসেন। এবার এই হ্রদের বেশ কিছু অলৌকিক বিষয় নিয়ে আলোচনায় আসি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই হ্রদে খুঁজে পাওয়া গেল ২০০টি মানুষের কঙ্কাল। বিশ্বজুড়ে খবরটি ছড়িয়ে গেল মিশাইলের বেগে। কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে এল কঙ্কাল হ্রদ। গবেষক আর বিশ্লেষকরা একের পর এক তত্ত্ব আর মতামত দিতে লাগল। বেশিরভাগ জনের মতামত ভুল প্রমাণিত হতে লাগল। দেখতে দেখতে পৃথিবীর সেরা একটি রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেল রূপকুণ্ড। আশ্চর্যের বিষয়, এই হ্রদের কঙ্কালগুলির কাদের আর কীভাবে সেখানে এল তার সমাধান কেউ খুঁজে পায়নি।
কঙ্কাল হ্রদ। কঙ্কাল ছড়িয়ে থাকার মধ্যেই এক রহস্য নিহিত আছে। যে রহস্য আজও পৃথিবীর অমীমাংসিত রহস্য হয়েই টিকে আছে। রূপকুণ্ড হ্রদে মানুষের কঙ্কাল খুঁজে পাওয়ার কথা মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্ববাসী জেনেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন ব্রিটিশ পেট্রোল বাহিনী এই পথ ধরে এগোচ্ছিল তখন হঠাৎ চোখ আটকে যায় তাদের। মানুষের খুলি আর শরীরের হাড় দেখতে পেয়ে থামে তারা। প্রথমে একটি কঙ্কাল তারপর আর একটি। এক, দুই, তিন করে যখন কঙ্কালের বহর বাড়ছিল তখন তারা ভয়ংকর ভয় পেয়ে যায়। তারা সেবার ২০০ কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছিলেন। এই দেহগুলো কাদের হতে পারে তা নিয়ে চালানো হয় গবেষণা। কিন্তু খুব বেশি কিছু জানা যায়নি। ব্রিটিশ সেনার আধিকারিকরা ভাবলেন এই দেহগুলি জাপানি সৈন্যদের হতে পারে। কোনো দুর্যোগ, প্রাকৃতিক কারণে বা দস্যুদের হামলায় হয়তো তারা প্রাণ হারিয়েছে।
এর দীর্ঘদিন পরে আধুনিক বিভিন্ন যন্ত্র কাজে লাগিয়ে কঙ্কালগুলির পরীক্ষা করে সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়। এখনও কেউ নিশ্চিত করেনি যে এই মানুষগুলোকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের প্রাণ গেছে?
কেউ কেউ বলেছেন কঙ্কালগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৮৫০ অব্দের। কঙ্কালগুলি কাদের আর কঙ্কালগুলি হ্রদে কীভাবে এল তা এখনও পৃথিবীবাসীর কাছে অজ্ঞাত। পৃথিবীতে রহস্যের শেষ নেই। এখনও বহু রহস্যময় বিষয় রয়েছে যেগুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। কঙ্কাল হ্রদে পাওয়া কঙ্কাল রহস্য তার মধ্যে অন্যতম।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে জানা যায়, রূপকুণ্ড হ্রদটিকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টজন্মের আগে থেকেই রহস্য চালু ছিল। তখন অনেক মুনি আর ঋষির নামে বিভিন্ন গল্প চালু ছিল হ্রদটিকে কেন্দ্র করে। তবে ১৯৪২ সালের দিকে একজন বনরক্ষী হঠাৎ হ্রদটি এবং অনেক গণকবর আবিষ্কার করেন। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যদিও পরবর্তীতে জানা যায়, কঙ্কালগুলো ১২ থেকে ১৫ শতকের সময়কার। কিন্তু মানুষের মনে আজও ভাবনা ঘুরপাক খায় এই ভেবে, কেন ১৬ হাজার ফুট উঁচুতে একসঙ্গে এতগুলো মানুষের কঙ্কাল পড়ে রয়েছে?
বিজ্ঞানীরা কঙ্কালগুলো এবং প্রাপ্ত গহনা পরীক্ষা করে জানান, এগুলো কোনো রাজকীয় বাহিনী বা একদল তীর্থযাত্রীর। এমনও হতে পারে, এই মানুষগুলো কোনো তীব্র তুষারঝড়ের কবলে মারা গিয়েছিল। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হাজির করেন একদল নৃতত্ত্ববিদ। তাদের মতে, ওই অঞ্চলে বসবাসরত কোনো গোষ্ঠী গণহারে আত্মহত্যা করেছিল। এটাই রয়েছে এই রহস্যের মূলে।
আর একদল অবশ্য বলে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় এই রাজকীয় বাহিনী বা তীর্থযাত্রী দলের মানুষগুলোর মৃত্যু হয়েছে। এ হ্রদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ মাইল উঁচুতে অবস্থিত। অনেক পর্যটক এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ মানচিত্র ঘেঁটে এবং বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালিয়েও হ্রদটির সন্ধান পায়নি। আবার এমনও হয়েছে, অল্প একটু চেষ্টাতেই অনেকে দেখতে পেয়েছেন হ্রদটিকে। সবচেয়ে বড়ো কথা—এটি সবাই দেখতেও পান না। এর আশপাশের এলাকাও ছিল অতিরিক্ত ঠান্ডা। অনেকদিন পর্যন্ত কেউই এই হ্রদটির কথা জানত না। কারও বর্ণনায় এই হ্রদের কথা পাওয়া যায়নি। এটি একটি হিমবাহ হ্রদ। এটির অবস্থান ভারতের উত্তরখণ্ডে। এছাড়া অনেকে বলেন ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে মানুষ জানত এই কঙ্কালগুলোর কথা। কারা এই হতভাগ্যরা? কীভাবে তারা মারা গেল? যুগের পর যুগ কৌতূহলী মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। এই হ্রদটির উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ঠিক যে সময় থেকে এ হ্রদটি পৃথিবীর মানুষের কাছে পরিচিত হল, তখন থেকেই এর সঙ্গে রহস্যের ব্যাপারটি জুড়ে যায়।
এক প্রসিদ্ধ ব্রিটিশ গবেষক তাঁর লেখায় লিখেছেন, “ভারতে অবস্থিত রূপকুণ্ড হৃদটিকে মানুষজন রহস্যময় অভিশপ্ত কঙ্কাল হ্রদ হিসেবেই চেনে। এখানে ৫০০-র মতো মানুষের কঙ্কাল মিলেছে। এ কারণে রূপকুণ্ড হ্রদের নাম লোকমুখে হয়ে যায় কঙ্কাল হ্রদ। ১৯৪২ সালে নন্দাদেবী রিজার্ভ পার্কের রেঞ্জার এইচ কে মাধওয়াল এই কঙ্কালগুলো প্রথম আবিষ্কার করেন। প্রথমে মনে করা হয়েছিল এগুলো জাপানি সৈন্যদের কঙ্কাল, যারা ওই অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছিল কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডায় তারা মারা যায়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। স্থানীয় ব্রিটিশ প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে দেখল কঙ্কালগুলো অন্তত এক শতাব্দী প্রাচীন। অনেকে ভাবলেন এটা জম্মু-কাশ্মীরের রাজা জেনারেল জরাইয়ার সিংয়ের সেনাদের, যারা বালিতস্তান আক্রমণের সময় হারিয়ে গিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে ভারতীয় সরকার সেখানে সার্ভে টিম পাঠায়। তারা সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে রেডিয়ো কার্বন ডেটিং করে জানা গেল এগুলো অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাব্দীতে হবে। তখন অনেকে ধারণা করলেন এরা মোহাম্মদ বিন তুঘলকের সেনাবাহিনী হবে, যারা তিব্বত দখল করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। তবে ১৯৫৬ সালের পদ্ধতি ছিল অনেক ত্রুটিপূর্ণ। অনেকে ধারণা করলেন এরা কোনো মহামারির শিকার হয়েছে।”
এ অঞ্চলের নীচের জনপদগুলোতে এই হ্রদ নিয়ে একটি লোককাহিনি প্রচলিত আছে, প্রাচীনকালে কনৌজের রাজা যশোয়াল এখানে আসেন নন্দাদেবীর উপাসনা করতে, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে আসেন বাঈজি। এতে এই স্থানের পবিত্রতা নষ্ট হয়। তাদের ওপর অভিশাপ বর্ষিত হয়। তাদের ওপর শিলাবৃষ্টি হয় এবং তারা হ্রদের ভেতর নিক্ষিপ্ত হয়। অধিকাংশ মানুষ এই লোককাহিনিকে গালগল্প বলে ধরে নিলেও এর ভেতর কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য লুকিয়ে আছে। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, কনৌজের রাজা যশোয়াল, তার রানি ও পরিষদবর্গসহ নন্দী দেবীর মন্দিরে তীর্থযাত্রার জন্য গিয়েছিলেন। আজও প্রতি ১২ বছর অন্তর রূপকুণ্ডে নন্দী দেবীর মন্দিরে তীর্থযাত্রার আয়োজন করা হয়।
বেশ কিছু কিংবদন্তিতে এই অদ্ভুতুড়ে হ্রদের উল্লেখ আছে। স্থানীয় আদিবাসী তো বটেই, গোটা বিশ্ববাসীর কাছেই রূপকুণ্ড একটি মৃত্যু-বিভীষিকার নাম। ২০০৩ সালে ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক চ্যানেলের উদ্যোগে একদল গবেষক এই রহস্য ভাঙার উদ্যোগ নেন। এর নেতৃত্ব দেন জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর ড. উইলিয়াম সাঙ্। দলটিতে ভারতীয় বিজ্ঞানীরাও ছিলেন। তাঁরা নানা হাড়গোড়ের নমুনা সংগ্রহ করেন। দলটি একটি বিশাল সাফলা লাভ করে যখন তাঁরা একটি অক্ষত দেহ উদ্ধার করেন। হিমালয়ের বরফশীতল তাপমাত্রা দেহটিকে সংরক্ষণ করে রেখেছিল। এতে তাঁরা ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে সুবিধা পেলেন। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা কঙ্কালের খুলিতে অগভীর আঘাতের চিহ্ন পেলেন। পুনের ডেকান কলেজের প্রফেসার ডা. সুভাষের মতে এই অগভীর আঘাতের কারণ কোনো তুষারধস নয়, বরং গলফবলের মতো ছোটো কঠিন বস্তুর আঘাতের ফলাফল। একই সঙ্গে কয়েকশো মানুষ মাথায় একই রকম আঘাত পেল এবং মারা গেল এটা নিশ্চয়ই ওপর থেকে আঘাত করেছে। তাদের ধারণা এটা শিলাবৃষ্টি হবে। প্রফেসার ড. উইলিয়াম সাঙ্ স্থানীয় একটি পালাগানের কথা স্মরণ করেন, যেখানে বলা হয়েছে রুষ্ট দেবী পাপিষ্ঠদের ওপর এমন শিলা নিক্ষেপ করেন, যা পাথরের থেকেও ভারী। এছাড়াও বিজ্ঞানীরা কাপড়, জুতা, কাচের চুড়ি, বাঁশের লাঠি উদ্ধার করেন। এ থেকে বোঝা যায় তারা তীর্থযাত্রী ছিলেন। সেখানে এখনও বরফের নীচে ৬০০ দেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে। এই নমুনাগুলো ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিয়ো কার্বন এক্সিলেটর ইউনিটে পাঠানো হয়। সেখানকার গবেষকরা জানান, নমুনাগুলো ৮৫০ খ্রিস্টপূর্বের। যা ১৯৫৬ সালের রিপোর্টের আরও বহু আগে। হায়দরাবাদের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় লাশের হাড়ের নমুনা থেকে তিনটি এমন জিন পাওয়া গেল, যা মহারাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের আর কোথাকারও মানুষের ভেতরে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখানে আরও কিছু মানুষের চেহারা হিমালয়ের আশপাশের মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর। অতএব এটা বলা স্বাভাবিক যে, তীর্থযাত্রীরা স্থানীয়দের কুলি হিসেবে নিয়োগ করেছিল। রূপকুণ্ড থেকে স্থানীয় মানববসতির দূরত্ব ৩৫ কি.মি। তাই বাইরের লোকেরা স্থানীয়দের সহায়তা ছাড়া সেখানে যেতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। এটা ধারণা করা যায় আজ থেকে ১৩০০ বছর আগে এক হাজারের মতো লোক হিমালয়ের ওপরে অজানা পরিবেশে চলছিল। তাদের সঙ্গে কুলি হিসেবে ছিল স্থানীয়রা। সেখানে পুরুষ, মহিলা এবং শিশু ছিল। হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হল। পালানোর কোনো উপায় ছিল না। শিলার আঘাতে একে একে মৃত্যুর মুখে পতিত হল সবাই। কিছুক্ষণের ভেতর রূপকুণ্ড হয়ে গেল এক মৃত্যুপুরী। তাদের দেহ হ্রদের উপর পতিত হল। কিছু বরফ চাপা পড়ল। দিন পেরিয়ে মাস হল, মাস পেরিয়ে বছর, তারপর শতাব্দীও কেটে গেল।
এক ব্রিটিশ লেখক তাঁর লেখায় লিখছেন, “ভারত বিশ্ব মানচিত্রে আলাদা সৌন্দর্য ধারণ করে আছে। এখানে আছে ঊষর মরুভূমি, আছে বরফাচ্ছন্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চল। আছে রহস্যঘেরা কয়েকটি স্থানও। ককেশীয় অঞ্চলের মানুষদের কাছে ভারত ছিল তান্ত্রিকদের পুণ্যভূমি। আবার ইউরোপবাসীর কাছে জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চল, বুনো মানুষের বসবাস। কিন্তু যুগের হাওয়ায় এসব রহস্য এখন আর হালে পানি পায় না। কিন্তু তার পরও ভারতের কয়েকটি অঞ্চল ঘিরে মানুষের মধ্যে আজও রহস্য ঘুরপাক খায়। তেমনি একটি অঞ্চল হিমালয়ের রূপকুণ্ড হ্রদ। এই রূপকুণ্ড সত্যিই রূপের আধার। রহস্যের শেষ নেই যেন। কোথাও শুনতে পাওয়া যায় এই হ্রদে এমনও কিছু স্থান আছে, যেখান থেকে মানুষ আর কখনও ফিরে আসে না। সে রহস্য বুকে নিয়ে কঙ্কাল হ্রদ চির রহস্যের এক আধার হয়ে রয়েছে।”
এক জার্মান গবেষক লিখছেন, “রূপকুণ্ডের এই কঙ্কাল হয়তো জাপানিদের। সে-সময় জাপানিরা ভারতের মাটিতে নিজেদের ঘাঁটি স্থাপনের চেষ্টা চালাচ্ছিল। এ অঞ্চলটিই ছিল ভারতে প্রবেশের একমাত্র রাস্তা। কিন্তু দুর্গম ও ভূ-প্রাকৃতিক কারণে শেষরক্ষা হয়নি। অতিরিক্তি ঠান্ডার কারণে জাপানি সৈন্যদের মৃত্যু ঘটে। সেখান থেকেই হয়তো এত কঙ্কাল।
পরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, কঙ্কালগুলো জাপানিদের নয়। বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করে। ভূমিকম্প, আত্মহত্যা ইত্যাদি নানা তত্ত্ব বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকে। ২০০৪ সালে রহস্যের একটা সমাধান পাওয়া যায়। জানা যায়, কঙ্কালগুলো প্রায় ১২০০ বছরের পুরোনো। অনুমান করা হয়, একদল তীর্থযাত্রী স্থানীয় গাইড বা পোর্টারের সঙ্গে যাত্রা করছিলেন। কিন্তু যাত্রা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যান তাঁরা।
খুলি ও কাঁধে আঘাতের চিহ্ন দেখে অনুমান করা হয়, সামনে থেকে এমন কিছু তাদের ওপর পড়েছিল, যা তারা সামলাতে পারেননি। আবার স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, এই পাহাড় আসলে এক দেবীর বাসস্থান। বাইরের কেউ যদি এখানে প্রবেশ করার চেষ্টা করে, তবে তিনি নিজের শক্তি প্রয়োগ করে লোহার মতো কঠিন শিলা বর্ষণ করান, যাতে কেউ বেঁচে ফিরতে না পারে। আর আশ্চর্যের ব্যাপার হল, গবেষণায় মৃত্যুর কারণ হিসেবে শিলাবৃষ্টিকে দায়ী করা হয়েছে।”
কিছু ব্রিটিশ গবেষকরা মিলে একটি টিম গঠন করে ও রূপকুণ্ড হ্রদে দীর্ঘ গবেষণা চালায়, তারপর তারা যে রিপোর্ট জমা দেয় তাতে উঠে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক তথ্য। সেই রিপোর্টে দাবি করা হয়, রূপকুণ্ডে পাওয়া হাড়গুলির মধ্যে বেশ কিছু অন্তত আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। কোনও এক অজানা কারণে সে সময়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা থেকে এত দূরে ভারতের হিমালয়ের পার্বত্য এলাকায় এসে মৃত্যু হয়েছিল ভিনদেশি দলটির। কেন, কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছিল, কেনই বা তারা এখানে এসেছিল, তা অবশ্য এখনও অজানা। গবেষণাপত্রটি ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ জার্নাল-এ প্রকাশিত হয়েছে।
তবে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, রূপকুণ্ডে পাওয়া সব কঙ্কাল কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের নয়। জিন-পরীক্ষাতে বেশ কিছু তফাত ধরা পড়েছে এদের মধ্যে। যা থেকে বিজ্ঞানীদের অনুমান, এরা সকলেই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্য ছিল না। এরা আলাদা-আলাদা গোষ্ঠীর। বিভিন্ন সময়ে রূপকুণ্ডে এসেছিলেন। অন্তত দু’টি পর্বে তারা এসেছিলেন।
লক্ষ্ণৌয়ের ‘বীরবল সাহনি ইনস্টিটিউট অব প্যালিয়োসায়েন্সেস’-এর এক গবেষক বলেন, “অনেক দিন ধরেই রূপকুণ্ড নিয়ে গবেষণা চলছে। কঙ্কালগুলো কাদের, তারা কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে মারা যায়, এসব নিয়ে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা থেকে যা জানা যাচ্ছে, তাতে এটুকু স্পষ্ট, সত্যিটা আমাদের কল্পনায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেক বেশি জটিল।”
রূপকুণ্ডের ওইসব কঙ্কাল থেকে পাওয়া ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, ভারতে পাওয়া সব চেয়ে প্রাচীন মানুষের ডিএনএ সেগুলি। জিনগতভাবে ভিন্ন অন্তত তিনটি গোষ্ঠীর। হায়দরাবাদের ‘সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি’-র কুমারস্বামী থঙ্গরাজ বলেন, “একাধিক গোষ্ঠীর কঙ্কাল যে রয়েছে, সেটা আমরা প্রথম জানতে পারি ৭২টি কঙ্কালের মাইটোকনড্রিয়াল ডিএনএ পরীক্ষা করে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ডিএনএগুলির সঙ্গে বর্তমান ভারতের মানুষের সঙ্গে অনেক মিল। আবার কিছু ডিএনএ-র সঙ্গে পশ্চিম ইউরেশিয়ার জনগোষ্ঠীর মিল প্রচুর।” পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া কঙ্কালগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম ভাগের ২৩টি কঙ্কালের সঙ্গে ভারতের বর্তমান মানুষের জিনগত মিল পাওয়া গিয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে ১৪টি কঙ্কালের সঙ্গে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার বাসিন্দাদের সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষ করে ক্রিট ও গ্রিসের। এবং শেষ তথা তৃতীয় ভাগের কঙ্কালগুলির সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাসিন্দাদের জিনগত মিল রয়েছে।”
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়াডাওয়িন হার্নের কথায়, “আমরা সত্যি চমকে গিয়েছি। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার প্রাচীন বাসিন্দাদের কঙ্কালগুলি নিয়ে। এ ধাঁধা তাহলে আর ভারতে আটকে রইল না। প্রশ্ন তুলে দিল, তা হলে কি অত বছর আগেও পৃথিবীর সম্পূর্ণ অন্য প্রান্ত থেকে রূপকুণ্ড দর্শনে আসত মানুষ!”
