রুদ্রাক্ষের যত অলৌকিক গল্প
রুদ্রাক্ষ কিনতে হরিদ্বারের একটা বেশ নামজাদা দোকানে গেছি। দোকানদার রূদ্রাক্ষ দেখাচ্ছেন। দাম বলছেন। হাতে নিয়ে দেখছি। চোখের সামনে এনে দেখছি এসব চলছে। একটা একমুখী রুদ্রাক্ষ দেখে বেশ মনে ধরল। দামটা বেশ বড়ো অম্লের। কিন্তু নেব যখন ঠিক করে ফেলেছি তখন কী আর করা যাবে। দোকানদারের কাছে এক গ্লাস জল চাইলাম। দোকানদার এনে দিল। আমি তাতে রুদ্রাক্ষ ফেলে দিলাম। আর তারপরই সিদ্ধান্ত নিলাম রুদ্রাক্ষটি আমি নেব না। দোকানের মালিককে সেকথা বলতেই উনি মৃদু হাসলেন ও বললেন, ইয়ে মাল আপকো সারা দুনিয়ামে নেহি মিলেগা। আমি তাকে সরাসরি বললাম রুদ্রাক্ষটা জাল। মালিক হাঁ হয়ে শুনলেন আমার কথা। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “জাল! কেয়া বোল রহে হো আপ! আপ সাবিত কর সকেঙ্গে ইয়ে জাল হ্যায়।” আমি শুনে বললাম প্রমাণ তো আপনার চোখের সামনে। দোকানের মালিক হঠাৎ চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসলেন যদি আমি রুদ্রাক্ষটা জাল সেটা যদি প্রমাণ করতে পারি তো তিনি ওই রুদ্রাক্ষটি আমায় গিফট দেবেন।
ব্যস আমি আবারও এক গ্লাসে পরিষ্কার জল আনালাম আর একমুখী রুদ্রাক্ষকে সেই জলে ফেলে দিলাম। পরীক্ষা শেষ দেখা গেল সেই একমুখী রুদ্রাক্ষটি জলে ভাসছে। রুদ্রাক্ষের নিয়মই তাই, আসল হলে ডুবে যাবে আর নকল হলে ভাসবে।
অনেক চেষ্টা করেও মালিক তাকে ডোবাতে পারলেন না।
নির্দিষ্ট একটি গাছের বীজ হল রুদ্রাক্ষ। পাহাড়ের একটি উচ্চতায় এই গাছ দেখা যায়। হিমালয়ের কোলে রুদ্রাক্ষগাছ দেখা গেলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই গাছের কাঠ দিয়েই রেলের স্লিপার তৈরি হয়। তাই প্রচুর সংখ্যক রুদ্রাক্ষ গাছ কেটে ফেলায় ভারতে এই গাছের সংখ্যা কমে এসেছে। নেপাল, মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় রুদ্রাক্ষগাছ হয়। দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালাতেও রুদ্রাক্ষগাছ দেখা গেলেও হিমালয়ের কোলে যে রুদ্রাক্ষ হয়, তার গুণগত মান বেশি ভালো।
রুদ্রাক্ষ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ। রুদ্র+অক্ষ= রুদ্রাক্ষ। যার অর্থ হচ্ছে—রুদ্রদেবের চক্ষু। রুদ্র কথাটা এসেছে—রুদ+নিচ-রোদি (রোদন করানোর (কর্তৃ) অর্থাৎ যিনি রোদন করান। পুরাণে আছে, ব্রহ্মা কল্পারম্ভে সৃষ্টি চিন্তায় মগ্ন ছিলেন, এমন সময় এক বালক মূর্তি তার ললাট হতে আবির্ভূত হয়ে, কাঁদতে কাঁদতে ইতস্তত ভ্রম করতে লাগলেন। ব্রহ্মা তাকে রুদ্র নামে অবহিত করে রোদনে নিবৃত্ত হতে বললেন এবং তাকে রুদ্র, ভব, শৰ্ব্ব, ঈশান, পশুপতি, ভীম, উগ্র ও মহাদেব ইত্যাদি অষ্ট নামে ডাকতে লাগলেন। ইনিই একাদশ মূর্তিতে একাদশ রুদ্র নামে প্রসিদ্ধ। এই একাদশ রুদ্র হচ্ছেন—অজ, একপাদ, অহিব্রধু, পিনাকী, অপরাজিত, ত্র্যম্বক, মহেশ্বর, বৃষাকপি, শম্ভু, হর, এবং ঈশ্বর। শিবের সংহার মূর্তিকেই বলে রুদ্র।
পুরাণ বলছে, ত্রিপুরাসুরের বধের পর শিবের আঁখি থেকে অশ্রুবিন্দু পতিত হয়েছিল। এই অশ্রুবিন্দু থেকে এই বৃক্ষ ও ফলের উৎপত্তি। ইংরেজিতে যাকে বলে, utrasum bead I
সাধারণত রুদ্রাক্ষের মালা গেঁথে গলায় পরা হয়। ১০৮ টি রুদ্রাক্ষ দিয়ে মালাটি গাঁথা হয়। একটি রুদ্রাক্ষকে লকেট হিসেবে রেখেও অনেক মালা গাঁথা হয়। একটি একটি করে রুদ্রাক্ষ দিয়ে মালা গাঁথাই নিয়ম। এই অতিরিক্ত রুদ্রাক্ষটিকে বলে বিন্দু। রুদ্রাক্ষের মালায় বিন্দু থাকা অবশ্য প্রয়োজনীয়। না হলে রুদ্রাক্ষ থেকে নির্গত শক্তি বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকবে এবং যে ব্যক্তি ওই মালা পরেছেন, তার মধ্যে এক ধরনের আলস্য দেখা দিতে পারে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য কম করে ৮৪টি রুদ্রাক্ষ ও একটি বিন্দু লাগবেই। রুদ্রাক্ষের মালা সুতো বা রেশম দিয়ে বাঁধা উচিত। বেশি টাইট করে রুদ্রাক্ষের মালা গাঁথা ঠিক নয়। এতে রুদ্রাক্ষের ভেতরে ফাটল ধরতে পারে। রুদ্রাক্ষের মালা সব সময় পরে থাকা যায়। শুধু গরম জলে ও কেমিক্যাল যুক্ত সাবান দিয়ে স্নান করার সময় এই মালা খুলে রাখবেন।
এই রুদ্রাক্ষের মালাতেও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ জাত-পাতের ব্যবস্থা করে রেখেছে। এই রুদ্রাক্ষ চারটি রঙে পাওয়া যায়। ১. শ্বেতবর্ণ, ২. রক্তবর্ণ, ৩. পীত্ বা হলুদবর্ণ ৪. কালো বা শ্যামবর্ণ। বলা হয়ে থাকে—এই শ্বেতবর্ণ বা সাদা রঙের রুদ্রাক্ষ ব্রাহ্মণগণ ধারণ করবেন. রক্ত বা লাল আভাযুক্ত রুদ্রাক্ষ ক্ষত্রিয়গণ ধারণ করবেন। পীত্ বা হলুদ আভাযুক্ত রুদ্রাক্ষ বৈশ্যগণ ধারণ করবেন। আর শ্যাম বা কালো রঙের আভাযুক্ত রুদ্রাক্ষ শূদ্র-জাতির লোকেরা পরিধান করবে। পণ্ডিতদের অসামান্য পাণ্ডিত্যের জন্য কৃতিত্ব অবশ্য প্রাপ্য। হাস্যকর এই ব্যবস্থা।
রুদ্রাক্ষের মালা সবাই পরতে পারেন। বিশেষ করে কাজের সূত্রে যাদের এদিক-ওদিক ঘুরতে হয়, তাদের জন্য এই মালা বিশেষ উপকারী। এই কারণেই সাধু-সন্ন্যাসীরা রুদ্রাক্ষ পরেন। কারণ বিশেষ করে আগেকার দিনে সাধু-সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। যে কোনো স্থান থেকে এক ধরনের শক্তি নির্গত হয়। এই শক্তি সবার জন্য অনুকূল না-ও হতে পারে। রুদ্রাক্ষ প্রতিকূল শক্তির সামনে ঢাল হিসেবে কাজ করে। রুদ্রাক্ষের শক্তি সেই প্রতিকূলতাকে হারিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
রুদ্রাক্ষ একমুখী থেকে ২১ মুখী পর্যন্ত হতে পারে। এই বিভিন্ন ধরনের রুদ্রাক্ষের আলাদা আলাদা কাজ রয়েছে। যে কোনো এক ধরনের রুদ্রাক্ষ কিনে মালা গেঁথে গলায় ঝুলিয়ে দিলেই হয় না। কোন রুদ্রাক্ষের কী কাজ, তা জেনে তবেই ধারণ করা উচিত। একমুখী রুদ্রাক্ষের শক্তি সবচেয়ে বেশি। তাই অনেকেই একমুখী রুদ্রাক্ষ ধারণ করতে আগ্রহী। কিন্তু যে কেউ তা ধারণ করেনেিল ফল কিন্তু ভালোহবে না। যে কারওর জন্য সবচেয়ে উপকারী ও নিরাপদ হল পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষ। নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষ ধারণ করতে পারে।
রুদ্রাক্ষের দানাগুলির মধ্যে একরকম অদ্ভুত চুম্বকীয় শক্তি ও বিদ্যুৎশক্তি নিহিত থাকে। এটা শুধু সাধুসন্তদের কথা নয়। আধুনিক বিজ্ঞান, এমনকি চিকিৎসা বিজ্ঞান একথা স্বীকার করে। বস্তুগত দিক থেকে এর গুণ বা প্রভাব অনস্বীকার্য। ভারতের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশেও রুদ্রাক্ষের চাহিদা ও প্রয়োগ দিন দিন বাড়ছে।
রুদ্রাক্ষের গাছ খানিকটা আমাদের জলপাই গাছের মতো দেখতে। তবে পশ্চিমবঙ্গে বা বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে দু-চারটে গাছ থাকলেও রুদ্রাক্ষের গাছ এখানে নজরে পড়ে না। আসলে এটি পাহাড়ি অঞ্চলের একটা বুনো গাছ। ভারতের হিমালয়ের জঙ্গলে অর্থাৎ উত্তরকাশী, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী ইত্যাদি জায়গায় এমনকি দক্ষিণ ভারতেও এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া, তিব্বত, চিনের কিছু অংশে, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, জাভা, সুমাত্রা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই আধ্যাত্মিক গুণসম্পন্ন গাছের দেখা পাওয়া যায়। বর্তমানে এই গাছের ফলের ব্যবসায়িক মূল্য বৃদ্ধি হওয়ার জন্য, কেউ কেউ এর চাষ শুরু করেছেন। কিন্তু সেটা চোখে পড়ার মতো নয়।
ভৌগোলিক ও জাতিগত কারণে এই ফলের বিভিন্ন আকার, অর্থাৎ ছোটো থেকে বড়ো ও আকৃতি অর্থাৎ অর্ধচন্দ্রাকৃতি থেকে চ্যাপটা, গোল ইত্যাদি হয়। যেমন ইন্দোনেশীয় রুদ্রাক্ষ আমাদের বুনো কুলের মতো হয়। নেপালের রুদ্রাক্ষ গোল হয়। এখানেই গোল একমুখী রুদ্রাক্ষ দুর্লভ হলেও পাওয়া যায়। দক্ষিণ ভারতের রুদ্রাক্ষ একমুখী ও অর্ধ-চন্দ্রাকৃতি হয়।
আদি শঙ্করাচার্য রুদ্রাক্ষ ধারণ করতেন। এমনকি তার ভাবধারায় যে সব সন্ন্যাসী আছেন, তারা সবাই রুদ্রাক্ষ ধারণ করেন। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের অনেকেই রুদ্রাক্ষ ধারণ করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রত্যেকদিন রুদ্রাক্ষের মালায় জপ করতেন। জপ্ শেষে মায়ের পাদপদ্মে এই মালা রেখে দিতেন। স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে শরীর ছাড়ার আগে এই রুদ্রাক্ষের মালা নিয়ে জপে বসেছিলেন। রুদ্রাক্ষের মালা জপ্ করতে করতেই তার মহাসমাধি হয়েছিল। ভারত সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা, প্রণবানন্দজি এই রুদ্রাক্ষের মালা ধারণ করতেন এবং সবাইকে ধারণ করতে বলতেন। ত্রৈলঙ্গস্বামী, ভোলানন্দ গিরি, বালানন্দ ব্রহ্মাচারী, স্বামী নিগমানন্দ, বাবা লোকনাথ, সাধক রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, বামাখ্যাপা, আনন্দময়ী মা-র মতো একাধিক সাধক সাধিকারা রুদ্রাক্ষ ধারণ করতেন। শুনলে হয়তো অবাক হতে পারেন অনেক রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী রুদ্রাক্ষ ধারণ করতেন। যেমন ইন্দিরা গান্ধি রুদ্রাক্ষের মালা ধারণ করতেন এই রুদ্রাক্ষ মালাটি তিনি সাধিকা আনন্দময়ী মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। ভারতের হাজার হাজার যোগী-সন্ন্যাসী আজও এই রুদ্রাক্ষের মালা জপ করেন।
ভারতের একাধিক মঠ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানে গেলে দেখবেন সন্ন্যাসীদের শরীর ছাড়ার পরে, তাদের স্মৃতিজড়িত ঘরে, সেই রুদ্রাক্ষের মালাটি যত্ন করে রাখা আছে। ওই সাধক বা সাধিকা যে মালাটি ব্যবহার করতেন তা আশ্রমে বা মঠে সযত্নে রক্ষিত আছে।
সবাই অবশ্য জাতপাতের বিচারে বা হিসেব করে রুদ্রাক্ষ ধারণ করেন না। আসলে সমস্ত জাতির লোক তা সে ব্রাহ্মণ হোক বা চণ্ডাল হোক, গুণবান হোক বা গুণহীন হোক, রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে, দ্রব্য বা ফলের গুণ ধারণকারীকে আশ্রয় করবে, এ-ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এটা সত্য যে, প্রকৃতির যে কোনো দ্রব্য বা ব্যক্তি কিছু না কিছু গুণ তার চারিদিকে বিচ্ছুরিত করছে। তন্মাত্রার মধ্যে এইসব গুণ মিশে যায় এবং কাছাকাছি জিনিস বা ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে। তা সে আপনি বিশ্বাস করুন আর না করুন, ঔষধের গুণ আপনাকে প্রভাবিত করবে। তা সে ঔষধের গুণ আপনি জেনেই খান আর না জেনেই খান।
এখন কথা হচ্ছে, সাধুরা ভগবানকে পাওয়ার জন্য, বা রমতাজীবন কাটানোর জন্য রুদ্রাক্ষ ধারণ করেন, এটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু সাধারণের জন্য, রুদ্রাক্ষ ধারণের কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? দেখুন রুদ্রাক্ষের প্রশংসা শুধু হিন্দু শাস্ত্রে বা পুরাণে আছে তাই নয়, বর্তমানে, ইউরোপ ও আমেরিকাতে পর্যন্ত এই রুদ্রাক্ষের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। ওইসব দেশে, রুদ্রাক্ষের অলৌকিক এবং ঔষধীয় গুণ সমূহের সম্পর্কে নিত্য-নতুন গবেষণা হচ্ছে। এর ফলে, এই অদ্ভুত বুনো ফলের অদ্ভুত শক্তি ও গুণ সমূহ প্রকাশ হচ্ছে। একজন ব্রিটিশ গবেষক লিখছেন, রুদ্রাক্ষের দ্বারা অসম্ভব কাজকেও সম্ভব করা যেতে পারে। ভ্রমণকারী ব্যক্তির পথের বাধা দূর হতে পারে। মানুষ কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পারে। এমনকি তারা বলছেন, রুদ্রাক্ষের দ্বারা জীবনের দিশার পরিবর্তন হতে পারে। আমেরিকার গবেষক শ্রীমতী সুসন একটি গবেষণাপত্রে লিখছেন, রুদ্রাক্ষের প্রয়োগে ইন্সিত সন্তান লাভ করা যেতে পারে। শারীরিক দুঃসাধ্য রোগ নিরাময় হতে পারে। আসলে রুদ্রাক্ষের যে সব আশ্চর্যগুণ নিহিত আছে, তা এখনও অপ্রকাশিত। আমাদের তন্ত্রশাস্ত্রে রুদ্রাক্ষের যে গুণাগুণ বলা হয়েছে সেটা শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। হাজার এক রোগে রুদ্রাক্ষের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। এই গাছের মূল দিয়েও আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারে অনেক রোগের উপশম করা হয়।
কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি, বহু সাধু-সন্তরা গলায়, হাতে এগুলো পরিধান করে থাকেন। এর কারণ কী? এর প্রথম কারণ, যারা ঈশ্বরচিন্তায় মগ্ন থাকতে চায়, তাদের এই রুদ্রাক্ষের মালা এক অসাধারণ একাগ্রতা এনে দেয়। চিত্ত ঈশ্বরে নিবিষ্ট হয়। একে আপনি দ্রব্যগুণ বলতে পারেন। একজন স্বামীজি বলছিলেন, একমুখী রুদ্রাক্ষ নিয়ম মতো ধারণ করলে, সে বারো দিনের মাথায় সংসার ত্যাগ করবে। অর্থাৎ সংসারের সঙ্গে তার এমন তিক্ততা সৃষ্টি হবে, যে সে আর সংসারে থাকতে পারবে না। তবে সুখের কথা হচ্ছে, সেই একমুখী রুদ্রাক্ষ অতি দুর্লভ, একমাত্র নেপালে সেটি পাওয়া যায়। তাও সাধারণ মানুষ এটি সংগ্রহ করে কাছে রাখতে পারবে না। এটি নাকি রাজপরিবারের সম্পত্তি।
দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, সাধুদের জীবনে রুদ্রাক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষত শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। সাধুদের বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। সেখানে দু-ধরণের শক্তিই থাকে ভাল খারাপ। এই দুই শক্তির মধ্যে ভালো শক্তিকে নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষেত্রে রুদ্রাক্ষের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
তৃতীয় কারণ, এঁরা যেখানে যা পায় তাই খায়। আপনার শরীরের পক্ষে অনুপযোগী কোনো খাবারের এমনকি জলের ওপরে যদি রুদ্রাক্ষের মালা রাখেন অর্থাৎ মালাটা উঁচু করে ধরেন, তবে উপযুক্ত খাদ্যের ওপরে মালা ক্লক ওয়াইজ ঘুরবে, খারাপ বা বিষাক্ত খাবার হলে মালা অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ, ঘুরবে। ফলত সাধুরা খাবার গ্রহণে সতর্ক হতে পারবে। রুদ্রাক্ষের মালা ধারণকারী সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশি সময় না খেয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ ক্লান্তিহীন জীবনের জন্য, এই মালা খুব উপকারী। এছাড়া এঁরা অনেক সময় জলে, জঙ্গলে, পাহাড়ে ঘুরে বেড়ান। সেখানে সাহসী থাকবার জন্য, এমনকি হিংস্র জীব জন্তুদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য এই রুদ্রাক্ষ নাকি অব্যর্থ কাজ করে।
চতুর্থ কারণ, এই মালা ধারণ করলে যেমন একাগ্রতা বাড়ে, তেমনি ধ্যানস্থ অবস্থায় শরীরে কোনো খিদেবোধ থাকে না, ফলত যতক্ষণ ইচ্ছে ধ্যানে নিমগ্ন থাকা যায়।
এই রুদ্রাক্ষের প্রায় ৬৫ ভাগ পাওয়া যায় ইন্দোনেশিয়ার জাভা, সুমাত্রা এবং বোর্নিও দ্বীপে, ২৫ ভাগ পাওয়া যায় নেপালে, সবিশেষে ভোজপুর জেলায় এবং বাকি সব ভারত-বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।
পরিপক্ক রুদ্রাক্ষ গাছের শেকড়ে ঝাউ-শিমুল গাছের মতো অধিমূল বা বা ট্রেসিং দেখা যায়। গাছের ফল দেখতে গাঢ় নীল রঙের, যে কারণে এর ইংরেজি এক নাম ব্লুবেরি বিডস্। মূলত রঙটা নীল দেখা যায় স্ট্রাকচারাল টেক্সচার-এর কারণে, যেমন দেখা যায় ময়ূরের পেখমে। এই ফলের বহিরাবরণ সরিয়ে নিলে রুদ্রাক্ষ বেরিয়ে পড়ে, যা হতে পারে বহুমুখী। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই ফল মৃগীরোগীদের জন্যে উৎকৃষ্ট। হিমালয়ের সাধুরা তৃষ্ণা নিবারণের জন্য একে ব্যবহার করেছেন। স্বাদে টক বলে নেপালের মানুষ তৈরি করেছেন আচার-জাতীয় মুখরোচক খাবার। প্রাচীনকালে বসন্ত-গুটির প্রলেপে এবং যক্ষ্মা ও শ্লেষ্মার আধিক্যে ব্যবহৃত হত রুদ্রাক্ষ-ঘষা ক্বাথ।
রুদ্রাক্ষ ফলের এই বহুমূল্য বীজের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর মুখ অর্থাৎ লোকিউল বা বীজকোষের বিভাজন-রেখার গভীর দাগই বিশেষ প্রয়োজনীয়। মুখ-সংখ্যা দিয়েই এর গুণের পরিমাপ ও দাম নির্ধারিত হয়। সাধারণত পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষই দেখতে পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি। তবে ১ থেকে শুরু করে ৩৮ মুখী পর্যন্ত রুদ্রাক্ষের সন্ধানও পাওয়া যায়। সহজলভ্য নয় বলে ১৪ থেকে ২১ মুখী রুদ্রাক্ষের মূল্য বেশি। গৌরীশঙ্কর, ত্রিযুতি রুদ্রাক্ষ-জগতে পরিচিত হলেও সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। গৌরীশঙ্কর রুদ্রাক্ষ দেখতে দুটি রুদ্রাক্ষ-বীজ একসঙ্গে জোড়া দেওয়া মনে হয়, যাকে শিব ও পার্বতীর প্রতীক বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধদের দেখা যায় কলাবতীর শক্ত বীজের সঙ্গে রুদ্রাক্ষের দানা মিশিয়ে সংকর মালা তৈরি করতে। যাবতীয় নানামুখী রুদ্রাক্ষের মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ বোধ হয় সুশ্রী এবং গোলাকার একমুখী রুদ্রাক্ষ, যা আজকাল মেলা ভার। শোনা যায় ভারতের এক ধনী কোম্পানির মালিকের কাছে ৭০ লক্ষ টাকা দামের একমুখী রুদ্রাক্ষ আছে।
অভিজ্ঞতা ও বিজ্ঞানের আলোকে আলোকিত মানবকুলে রুদ্রাক্ষের চাহিদা উত্তরোত্তর বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ নেই। আমাদের প্রতিবেশি রাজ্য নেপালে সবচেয়ে বেশি রুদ্রাক্ষের চাষ হয়, কিন্তু তা প্রয়োজন মেটাবার জন্য যথেষ্ট নয়। রুদ্রাক্ষের সব বীজকোষে বীজ থাকে না, প্রায় ২০ শতাংশ শূন্য থাকে। শক্ত বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গমের জন্যে সময় লাগে ৬ মাস। নেপালের মতো উপযুক্ত আবহাওয়া না পেলে এই গাছ তেমন ফলবতী হতে পারে না। উভলিঙ্গী ফুল হওয়া সত্ত্বেও এসব গাছে ফুল ধরতে ৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। একটা গাছে যদি ফল ধরে হাজার দুয়েক, তবে তার প্রায় অর্ধেক ঝরে পড়ে অপরিপক্ক অবস্থায়। ফলে চাহিদা মেটাতে অসাধু উপায় অবলম্বন করতে হয়।
এখন বিভিন্ন ধাতুর গুঁড়ো মিশিয়ে উৎকৃষ্ট আঠা দিয়ে আজকাল তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম রুদ্রাক্ষের মালা, বাজুবন্ধ ও ব্রেসলেট, যা সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝা দুষ্কর। তবে বীজকোষের বিভাজন রেখাগুলো সূক্ষ্মভাবে দেখলে অনেকটা টের পাওয়া যায়। এসব নকল রুদ্রাক্ষ গরম জলে সেদ্ধ করলে আঠা খুলে যায়।
কৃত্রিম রুদ্রাক্ষ তৈরির আর একটি বিশেষ উপাদান হল গ্যালালিথ। এটা তৈরি হয় দুধের ক্ষীরের সঙ্গে ফরম্যালডিহাইড মিশিয়ে। গ্যালা শব্দের অর্থ দুধ আর লিথ অর্থ পাথর, যে-কারণে এর আর এক নাম মিল্ক-স্টোন। এই পাথর এক সময় প্রচুর ব্যবহৃত হত বোতাম, চিরুনি ইত্যাদি তৈরিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুধের আকাল পড়াতে গ্যালালিথ-এর ব্যবহার কমে যায় কিন্তু একেবারে লুপ্ত হয় না। জলনিরোধক, শক্ত, সহজে রং গ্রহণকারী এবং দীর্ঘস্থায়ী এই বস্তুকে ধারালো হাতিয়ার দিয়ে কেটে তৈরি হচ্ছে রুদ্রাক্ষ। এসব হল কৃত্রিম রুদ্রাক্ষ, কিন্তু ভদ্রাক্ষ নামে আর এক প্রকারের বীজের কথা শোনা যায় যা দেখতে না কি অবিকল রুদ্রাক্ষের মতো, কিন্তু কার্যকারিতায় এক নয়। যে-কোনো রুদ্রাক্ষ পরীক্ষা করার একটি উপায় হল, একটি দানা সুতোয় ঝুলিয়ে দুপাশে তামার মুদ্রা রাখলে চৌম্বকীয় আবেশে দানাটা একটু ঘুরে যায়। এই চৌম্বকীয় আবেশই রুদ্রাক্ষের মূল গুণ, যার জোরেই এত কেরামতি।
বিভিন্ন শাস্ত্রে এক থেকে চোদ্দমুখী পর্যন্ত রুদ্রাক্ষ ব্যবহারের যে নিয়ম, আচার ও অনুষ্ঠানের উল্লেখ আছে। শাস্ত্রে রুদ্রাক্ষ যে এক থেকে চোদ্দমুখী পর্যন্ত হয়ে থাকে সে-বিষয়ে বিশদে বলা হয়েছে। মুখ অর্থাৎ বাইরে থেকে দেখলে রুদ্রাক্ষের গায়ে চোদ্দটি পর্যন্ত শিরা বা দাগ দেখতে পাওয়া যায়। আসলে রুদ্রাক্ষটি যদি ঠিক মাঝ বরাবর কাটেন তবে দেখতে পাবেন সেখানে চোদ্দটি গর্ত আছে। আর গর্তের মধ্যে চোদ্দটি বীজ আছে। যা থেকে রুদ্রাক্ষ গাছ হতে পারে। তো এক-একটা রুদ্রাক্ষ ফলের মধ্যে এমনি এক থেকে চোদ্দটি পর্যন্ত গর্ত দেখা যায়। আপনি যদি রুদ্রাক্ষটাকে এক্সরে করেন, তো দেখতে পাবেন, রুদ্রাক্ষের মধ্যে এমনি সব গর্ত আছে। যে রুদ্রাক্ষে যতগুলো গর্ত সেই অনুযায়ী বাইরে দাগ দেখা যায়। বা বলা যেতে পারে, সেই রুদ্রাক্ষের ততগুলো কোয়া। এই শিরা বা কোয়া অনুযায়ী রুদ্রাক্ষকে ১৪ ভাগে ভাগ করা হয়। এর এক-একটার এক এক রকম গুণ বা শক্তি আছে। যেমন :
একমুখী রুদ্রাক্ষ
রুদ্রাক্ষের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রেণিকে ‘শিব’ নামে অভিহিত করা হয়। রুদ্রাক্ষের যেসব গুণাগুণের কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে সে সমস্তই এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। খুবই দুর্লভ শ্রেণির রুদ্রাক্ষ এবং অত্যন্ত মূল্যবানও বটে। বলা হয়, এই রুদ্রাক্ষ ধারণে মানুষ অপরাজেয় হয়। বিশেষ আধ্যাত্মিক উন্নতিও ঘটে। রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন করতে হয়, ‘ও ওইং মন্ত্র ১০৮ বার উচ্চারণ করে ডান বাহুতে বা কণ্ঠে এ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে লোকপ্রভাবিনী শক্তির স্ফুরণ ঘটে। রাশিচক্রে রবিগ্রহ, পাপপীড়িত, পাপ গ্রহদৃষ্ট, নীচস্থ পাপযুক্ত বা যে-কোনোভাবে পীড়িত হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উপরোক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কারপূর্বক জপ করে ধারণ করলে রবিগ্রহের সমস্ত কুফল নষ্ট হয়। আগেই বলা হয়েছে এটি দুর্লভতম রুদ্রাক্ষ। এই একমুখী রুদ্রাক্ষের দেবতা স্বয়ং শিব। বেশিরভাগ রুদ্রাক্ষ পঞ্চমুখী অর্থাৎ পাঁচটি গর্তসম্পন্ন হয়ে থাকে। কিন্তু এটিতে কেবলমাত্র একটি গর্ত থাকে। বলা হয়ে থাকে, এই একমুখী রুদ্রাক্ষের দর্শনেও পুণ্য হয়। পূজন বা ধারণ করতে পারলে তো কথাই নেই। একমুখী রুদ্রাক্ষ যিনি কাপাল জোরে পেয়ে গেছেন, তিনি যে সৌভাগ্যশালী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইনি জীবনের সমস্ত বাধা-বিপত্তি থেকে মুক্ত থাকেন। আধ্যাত্মিক জগতের জ্ঞান ও অনুভূতি তার বিনা আয়াশে হয়ে থাকে। মানুষ জন্ম-জন্মান্তরের সুকৃতির ফলে এই একমুখী রুদ্রাক্ষ লাভ করে থাকেন। এটি পাবার পরে, জীবনে আর কিছু চাইবার থাকে না। যাঁর কাছে এটি আছে,এমনকি যিনি এর পুজোঅর্চনা করবার মতো সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তিনি অবশ্যই নমস্য। শোনা যায়, অবতার গোরখনাথের গুরুদেব, কৌল-অবধূত মৎস্যেন্দ্রনাথের কাছে, অর্থাৎ নেপালের পশুপতিনাথের মন্দিরে এই একমুখী রুদ্রাক্ষ ছিল, এবং এখনো সেটা সুরক্ষিত আছে। ওঁ হ্রীংনমঃ।
গৌরীশঙ্কর রুদ্রাক্ষ ও গণেশরুদ্রাক্ষ: এই একমুখী রুদ্রাক্ষের সঙ্গে, আরও দুটি রুদ্রাক্ষের কথা বলা দরকারি, যা প্রকৃতির এক অপূর্ব এবং আশ্চর্য্য সৃষ্টি। যার মধ্যে একটি হচ্ছে, গৌরীশঙ্কর রুদ্রাক্ষ, ও অন্যটি গণেশ রুদ্রাক্ষ। এই রুদ্রাক্ষ দুটি প্রাকৃতিক ভাবে একটু অন্য রকম। প্রথমটি অর্থাৎ গৌরীশঙ্কর রুদ্রাক্ষ আসলে দুটি রুদ্রাক্ষের প্রাকৃতিক মিশ্রণ। প্রাকৃতিক ভাবে দুটি রুদ্রাক্ষ একত্রে জোড়া থাকে। এটি বিভিন্নমুখী হতে পারে। অর্থাৎ দুই বা ততোধিক গর্ত থাকতে পারে এর ভেতরে। ভাগ্যক্রমে যদি এটি দুটি শিরা ওয়ালা হয় তবে এটি একমুখী রুদ্রাক্ষের মতো কাজ করে। গৌরীশঙ্কর রুদ্রাক্ষের পুজো হয়। এটি ধারণযোগ্য নয়।
গণেশ রুদ্রাক্ষ সাধারণত একটাই রুদ্রাক্ষ, কিন্তু এই রুদ্রাক্ষের গায়ে একটি গনেশের শুঁড়ের মতো দেখতে পাওয়া যায়। এটিও বিভিন্নমুখী হতে দেখা যায়, বেশিরভাগই ৫ মুখী। তবে এটি যে-কোনো মুখী হতে পারে। আসলে এটি যতমুখী হবে সেই অনুযায়ী ফল দান করবে। এটির দেবতা শ্রী শ্রীগণেশ। এই গণেশ রুদ্রাক্ষের সাধারণত পুজো করা হয়। এটি ধারণ করা হয় না।
দ্বিমুখী রুদ্রাক্ষ
এজাতীয় রুদ্রাক্ষকে ‘হরগৌরী’ নামে অভিহিত করা হয়। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে মনের একাগ্রতা, জীবনে শাস্তি এনে দেয়। অজ্ঞাতসারে গোহত্যা-জনিত পাপের স্খলন হয়। কুলকুণ্ডলিনী শক্তি সম্পর্কে চেতনার সঞ্চার করে। মন্ত্র উচ্চারণ সহযোগে এই রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন হয়। মন্ত্র পাঠ করে ডান হাতে বা কণ্ঠে এ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে ত্রিজন্মসঞ্চিত পাপরাশি দূরীভূত হয়। রাশিচক্রে কেতুগ্রহ নীচস্থ, পাপপীড়িত বা যে-কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক ‘ওঁ শ্রীং’ মন্ত্র ১০৮ বার জপ করে ধারণ করলে কেতুগ্রহের সমস্ত কুফল নষ্ট হয়।
ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষ
এজাতীয় রুদ্রাক্ষের নাম ‘অগ্নি’। অতীত পাপ বিনষ্ট করে, মানুষের সৃজনীশক্তির বিকাশ সাধন করে, চিরকর্মচঞ্চল জীবনীশক্তিকে উন্নীত করে, ম্যালেরিয়া রোগ নিবারণ করে। মন্ত্রপাঠ করে দু’বাহুতে ধারণ করলে অসাধারণ শক্তির সঞ্চার হয়। রাশিচক্রে মঙ্গল বা যে-কোনোভাবে পীড়িত হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কারপূর্বক ‘ওঁ ধ্ৰুং ধ্ৰুং মন্ত্র ১০৮ বার জপ করে ধারণ করলে মঙ্গল গ্রহের সমস্ত কুফল নষ্ট হয়।
চতুর্মুখী রুদ্রাক্ষ
জ্যোতিষশাস্ত্রে এর নাম ‘ব্রহ্মা’। মনের ক্রিয়াকলাপের ওপরে এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষের প্রভাব চমৎকার। সে-কারণে উন্মত্ততা, অনিদ্রা, বিষাদময়তা ইত্যাদি মানসিক রোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করা হয়। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি হয়। তুচ্ছ বিষয়ে মানসিক অস্থিরতার উপশম হয়, মানসিক অবসাদ দূর হয়, উদ্বেগ, ভয়, খিটখিটে স্বভাব ও আত্মহনন-চিন্তা ইত্যাদির প্রকোপ হ্রাস করে, বক্তৃতা-ক্ষমতা, কর্মতত্পরতা ও বুদ্ধি-বৃদ্ধির উন্মেষকারক এ রুদ্রাক্ষ মন্ত্রপাঠ করে কণ্ঠে ধারণ করতে হয়। রাশিচক্রে চন্দ্রগ্রহ নীচস্থ, পাপযুক্ত ও পাপপীড়িত হয়ে দ্বিতীয়ে, ষষ্ঠে, অষ্টমে-দ্বাদশে অবস্থান করলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কার করে ওঁ হ্রীং হ্রং’ মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর ডান হাতে ধারণ করলে চন্দ্রগ্রহের সমস্ত কুফল নষ্ট করে বিভিন্ন শাস্তি ও সুখ আনয়ন করে।
পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষ
সর্বাধিক পরিচিত এবং সর্বত্রই এ রুদ্রাক্ষ পাওয়া যায়। এ রুদ্রাক্ষ দুই শ্রেণির হয়ে থাকে। এর নাম ‘কালাগি রুদ্র’। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে নিষিদ্ধ খাদ্যগ্রহণ ও নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদনের পাপ অপনোদন হয়, মানসিক প্রশান্তি আসে। শিবের পঞ্চাক্ষরী মন্ত্র সহযোগে সন্ধ্যাকালে দেহের যে-কোনো অংশে ধারণ করলে অখাদ্য ভোজনজনিত পাপ নষ্ট হয়। রাশিচক্রে শনিগ্রহ, রবিযুক্ত হলে লগ্নে, দ্বিতীয়ে, ষষ্ঠে, সপ্তমে, অষ্টমে, দ্বাদশে অবস্থান করলে বা যে কোনোভাবে শনিগ্রহ পাপপীড়িত, নীচস্থ ও অশুভ গ্রহযুক্ত হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক ‘ওঁ হ্রীং মন্ত্ৰ ১০৮ বার জপের পর ধারণ করলে শনিগ্রহের সমস্ত অশুভ ফল নষ্ট হয়।
ষড়মুখী রুদ্রাক্ষ
এজাতীয় রুদ্রাক্ষের নাম ‘কার্তিকেয়’। ছাত্রদের পক্ষে ও যারা দুরারোগ্য রোগে ভুগছেন তাদের পক্ষে এ রুদ্রাক্ষ বিশেষ উপকারী। জ্ঞানবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ রুদ্রাক্ষর চমত্কার কার্যকারিতা লক্ষ করা যায়। মন্ত্রযোগে রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করা হয়। ভূত-প্রেতাদি দ্বারা অনিষ্ট সাধনের ক্ষেত্রে প্রতিকাররূপে ধারণীয়। মানসিক অবসাদ, স্বভাবের উগ্রতা ও নানা রোগের উপকারকারী এ রুদ্রাক্ষ। রাশিচক্রে শুক্র কন্যায় নীচস্থ, অশুভ গ্রহযুক্ত দ্বিতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ, অষ্টম, দ্বাদশে অবস্থান করলে বা অশুভ হলে এ গ্রহের শাস্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক ‘ওঁ ওইং হ্রীং মন্ত্ৰ ১০৮ বার জপের পর ধারণ করলে শুক্রগ্রহের সমস্ত অশুভ ভাব নষ্ট হয়।
সপ্তমুখী রুদ্রাক্ষ
এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষের নাম অনন্ত মাতৃকা। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে সামাজিক প্রতিষ্ঠা, অর্থ মান, যশ ও প্রতিপত্তি লাভের পথ সুগম হয়ে থাকে। রাশিচক্রে রাহুগ্রহ রবি ও চন্দ্র যুক্ত হয়ে লগ্নে দ্বিতীয়ে, চতুর্থে, পঞ্চমে, ষষ্ঠে, সপ্তমে, অষ্টমে, নবমে, দশমে এবং দ্বাদশে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উক্ত রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হয়। “ওঁ হ্রীং মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে রাহু গ্রহের সমস্ত কুফল বিনষ্ট হয়।
অষ্টমুখী রুদ্রাক্ষ
এই রুদ্রাক্ষের দুটি নাম বিনায়ক ও বটুকভৈরব। শনিগ্রহ ও রাহুর অশুভ প্রভাব খর্ব করে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে হঠাৎ আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। দুষ্কৃতীকারীদের হাতে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রাশিচক্রে শনি ও রাহু অশুভ থাকলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি সংস্কারপূর্বক পুরুষের ডান বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বাম বাহুতে ধারণীয়। ‘ও রুং রং’ মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর উক্ত রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব দূরীভূত হয়।
নবমুখী রুদ্রাক্ষ
এ রুদ্রাক্ষের নাম মহাকাল ভৈরব। ধারণে জীবনে উন্নতির সূচনা যায়, সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জয়লাভ করা হয়। দুর্ঘটনা ও হঠাৎ মৃত্যুর হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। ধারণের পূর্বে মন্ত্র উচ্চারণ করে এ রুদ্রাক্ষের উজ্জীবন বা প্রাণসঞ্চার করেনাতে হয়।
মন্ত্রপাঠের পর উচ্চারণ করতে হয়। বুদ্ধিবৃত্তিজনিত কাজকর্মের ক্ষেত্রে নানাভাবে প্রচুর সুফল দান করে এ রুদ্রাক্ষ। রাশিচক্রে বৃহস্পতি গ্রহ মকরে নীচস্থ, মকরস্থানে অবস্থান করলে, বা মকরস্থ হলে এবং ষষ্ঠ, অষ্টম, দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে কিংবা কোনোভাবে অশুভ হলে এ গ্রহের শান্তির নিমিত্ত উপরোক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধ সংস্কারপূর্বক ‘ওঁ হ্রং’ মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর পুরুষের দক্ষিণ বাহুতে এবং স্ত্রীলোকের বামবাহুতে ধারণ করলে সকল অশুভ বিনাশ হয়।
দশমুখী রুদ্রাক্ষ
এ শ্রেণির রুদ্রাক্ষ দুর্লভ। এর নাম মহাবিষ্ণু। মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা, সুনাম, খ্যাতি, সম্মান, পার্থিব সমৃদ্ধি, কর্মদক্ষতা এবং ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনে সহায়ক এ রুদ্রাক্ষ। প্রেতাদি কর্তৃক অনিষ্টকর প্রভাব থেকেও মুক্ত হওয়া যায়। রাশিচক্রে বুধ গ্রহ নীচস্থ শত্রুযুক্ত ও শত্রুক্ষেত্রগত, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ, অষ্টম ও দ্বাদশ স্থানে অবস্থান করলে বা কোনোভাবে পীড়িত হলে উক্ত রুদ্রাক্ষ যথাবিধি মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক সংস্কার করে ও হ্রীং মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর ধারণ করতে হয়। মন্ত্রপাঠ ও জপ করে জপের পর উক্ত রুদ্রাক্ষ কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ দূরীভূত হয়।
একাদশমুখী রুদ্রাক্ষ
এটি একটি বিশেষ জাতের রুদ্রাক্ষ। এর নাম মহামৃত্যুঞ্জয়। মেয়েদের নানা অসুখের ক্ষেত্রে একান্তভাবেই সুফল প্রদানকারী, আত্মবিশ্বাসের অভাব ঘটলে, আত্মহনন চিত্তা এসে মন ও মেজাজ খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠলে এ রুদ্রাক্ষ ধারণে তার উপশম হয়। মন্ত্র উচ্চারণযোগে রুদ্রাক্ষ উজ্জীবিত করে ধারণ করা প্রয়োজন। রাশিচক্রে শুক্র ও মঙ্গল অশুভ থাকলে মন্ত্রে যথাবিধি সংস্কার করে ‘ওঁ হ্রীং’ মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর ডান হাতে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ প্রভাব নাশ হয়।
দ্বাদশমুখী রুদ্রাক্ষ
এর নাম অর্ক বা আদিত্য। এ রুদ্রাক্ষ রবি ও রাহুর অশুভ প্রভাবকে প্রশমিত করে। রবি যখন মকরে বা কুম্ভরাশিতে অবস্থিত হয়ে অশুভদশা প্রাপ্ত হয় তখন এ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে সকল কুফল নষ্ট হয়। ব্যবসায়িক মন্দা বা অসাফল্য নিবারণ করতে মন্ত্র সহযোগে এ রুদ্রাক্ষকে উজ্জীবন করে ধারণ করতে হয়। ‘ওঁ হ্রাং হ্রীং মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর রুদ্রাক্ষটি কণ্ঠে ধারণ করলে সমস্ত অশুভ বিনষ্ট হয়।
ত্রয়োদশমুখী রুদ্রাক্ষ
এর নাম কাম। এর ধারণে সর্বভাবেই কামনীয় বিষয়ের প্রাপ্তিযোগ ঘটে। এ রুদ্রাক্ষ ধারণে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিপূরণ হয়। চিন্তামণি মন্ত্র সহযোগে এ রুদ্রাক্ষ উজ্জীবন করতে হবে। অতঃপর ‘ওঁ ক্ষৌং নমঃ’ মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর ডান হাতে ধারণ করলে সমস্ত পাপ দূর হয় ও সকল মনোরথ সিদ্ধ হয়। এর ধারণে চন্দ্র ও শুক্রের অশুভ প্রভাব নাশ হয়ে থাকে।
চতুর্দশমুখী রুদ্রাক্ষ
এই রুদ্রাক্ষ শ্রীকণ্ঠ নামে পরিচিত। এই রুদ্রাক্ষ ইন্দ্রিয় সংযমে সাহায্য করে। পঞ্চমুখ হনুমানমন্ত্র সহযোগে একে উজ্জীবিত করতে হয়। মন্ত্রপাঠ করে বীজমন্ত্র জপ করে ধারণ করলে শুক্রগ্রহের সমস্ত অশুভ বিনষ্ট হয়। ওঁ তমাং’ মন্ত্র ১০৮ বার জপের পর ধারণ করলে বৃহস্পতি ও রবির সমস্ত অশুভ প্রভাব নষ্ট হয়ে থাকে।
স্কন্দপুরাণানুযায়ী রুদ্রাক্ষ ধারণের কিছু নিয়ম ও বিধি আছে। সেগুলি না মেনে ধারণ করলে ফল তো দূরের কথা, উলটে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। শুদ্ধ চিত্তে সঠিক মন্ত্রোচ্চারণাদি করে রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে তার সুফল অবশ্যই মেলে। আর অন্যদিকে যেহেতু নকল রুদ্রাক্ষের বা কুলবীজের মালার সংখ্যাই অধিক, প্রতারিত হবার আশঙ্কা আছে প্রতি মুহূর্তে। তাই বিশেষজ্ঞের মতে রুদ্রাক্ষ ঠিকমতো না চিনে ধারণ করা উচিত নয়।
