‘দ্রৌপদী প্রথা’-র রহস্য
মহাভারতে দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী থাকা নিয়ে আজও নানা আলোচনা সমালোচনা হয়ে থাকে। একজন স্ত্রীর কিনা পাঁচ স্বামী! আর সে রকম প্রথা যদি আজকের দিনেও মেনে চলা হয় তো আপনি তাকে কীভাবে দেখবেন? আপনি কি জানেন ভারতের এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে আজও মহিলারা দ্রৌপদীর মতো একাধিক স্বামীকে নিয়ে সংসার করেন?
গাড়োয়ালে স্বামী বিবেকানন্দও এই প্রথা দেখে চমকে উঠেছিলেন। আর সেই রীতি কি নিছক প্রথা, নাকি মানুষের তৈরি সংস্কার নাকি প্রাচীন কালের সাক্ষ্য বয়ে চলা নিছক এক কুসংস্কার! কোনটা? এই উত্তরের খোঁজে প্রথমেই পৌঁছে গিয়েছিলাম উত্তরাখণ্ড।
উত্তরাখণ্ডের সেই গ্রামে যাওয়ার আগে আমরা একটু জেনে নিই দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী থাকার নেপথ্যে কী কারণ ছিল। কেন দ্রৌপদীকে বিয়ে করতে হয়েছিল পঞ্চপাণ্ডবকে। মহাভারতের কাহিনিতে দ্রৌপদী পঞ্চপাণ্ডবের একমাত্র স্ত্রী যিনি অনেক জায়গাতেই অভিভাবিকা। তাদের নানাভাবে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ থাকতে শিখিয়েছেন। শেষদিন পর্যন্ত পাশে থেকেছেন।
দ্রৌপদীর প্রকৃত নাম যাজ্ঞসেনী। যজ্ঞের আগুন থেকেই তার জন্ম। বলা হয়ে থাকে পৌরাণিক পঞ্চবতী বা পঞ্চকন্যার নাম উচ্চারণ করলে সকল পাপ দূর হয়ে যায়। ‘পঞ্চকন্যা” বলে প্রসিদ্ধ যে-পাঁচজন পুরাণের নারী, তারা হলেন—সীতা, সাবিত্রী, অহল্যা, দ্রৌপদী ও অরুন্ধতী। এছাড়া অন্য আর এক দলের মতে, পৌরাণিক ‘পঞ্চকন্যা’ হলেন অহল্যা, কুস্তি, দ্রৌপদী, তারা ও মন্দোদরী। এই দুই অভিমতের পঞ্চকন্যার ভেতরেই যে দু-জন নারীর উপস্থিতি দেখা যায়, তারা সীতা-সাবিত্রীও নয়, কুন্তী-মন্দোদরীও নয়। তাঁরা হলেন দ্রৌপদী ও অহল্যা।
স্বয়ম্বর সভায় নিজে পছন্দ করে অর্জুনকে মাল্যদান করার পরেও কেন তাঁর মতো এক তেজস্বিনী নারী অন্যের চাপিয়ে দেওয়া পঞ্চপান্ডবের স্ত্রী হতে অস্বীকৃতি জানালেন না, এটার ব্যাখ্যা দু-তিন রকম। একটি পূর্ব জন্মের গল্প। দ্বিতীয়টি যুধিষ্ঠিরের কাছে মাতৃআজ্ঞা ছিল শিরোধার্য অর্থাৎ তোমারা যা এনেছো তা সমান ভাগে ভাগ করে নাও। আর তৃতীয় ব্যাখ্যা আধুনিক ব্যাখ্যা যা হল সে-সময়ে নারীর মতামতের কোনো মূল্য ছিল না কেউ তা বিশেষ গ্রাহ্য করত না।
মহাভারত লেখা হয়েছিল ক্ষত্রিয় যুগে অর্থাৎ সে-যুগে রাজতন্ত্রে পুরুষতন্ত্রের দাপট ছিল অনেক বেশি। তবে একটা সত্যি কথা দ্রৌপদীর সয়ম্বর সভা থেকে যুধিষ্ঠির কিন্তু আগে বের হয়ে যান। সে মা’কে এসে জানাতেই পারতেন যে ভাইয়েরা সয়ম্বর সভা থেকে রাজকন্যা জিতে আনছে। বুদ্ধিমান যুধিষ্ঠির তা জানান না কুন্তীকে। কারণ যুধিষ্ঠির ভালোভাবেই জানতেন সুন্দরী দ্রৌপদীকে পাঁচ ভাই-ই মনে মনে কামনা করেছে। সেই জায়গায় সে বাড়ির বড়ো ছেলে হিসেবে দ্রৌপদীকে লাভ করলে ভাইয়ে ভাইয়ে বিদ্বেষ বাড়বে। আর যদি পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে দ্রৌপদীকে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া যায় তাহলে কেউ কারো প্রতি রুষ্ট হবে না। কৌশলী যুধিষ্ঠির তাই ব-কলমে এই খেলা খেলেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে দ্রৌপদীর মাধ্যমেই কিন্তু মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের প্রথা শেষ হয়ে যায়। কারণ দ্রৌপদীর সন্তানেরা কেউই আর বেঁচে থাকেনি। যুদ্ধের শেষে এবং যে কায়দায় অশ্বত্থামা ঘুমন্ত শিশুদের হত্যা করে, তাকে স্রেফ একটা আচম্বিত যবনিকাপাত ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু নিহত হলেও তার ঔরসজাত ভ্রূণ তখন তার স্ত্রী উত্তরার গর্ভে। সেই সন্তান পরীক্ষিৎ-ই শেষে রাজা হল। যাই হোক মহাভারতের মজার বিষয় হল মহাভারতের হাজারো ব্যাখ্যা হয়। যে যেভাবে নিজের মতো যুক্তি দিতে পারেন।
পান্ডবরা বকরাক্ষস বধের পর পাঞ্চাল রাজ্যের দিকে যাত্রা করেন। তখন মহামুনি ব্যাসদেবের সাথে তাঁদের দেখা হয়। তখন ব্যাসদেব প্রসঙ্গক্রমে দ্রৌপদীর পূর্বজন্মবৃত্তান্ত পান্ডবদেরকে বলেন-–“কোনো তপোবনে সর্বাঙ্গসুন্দরী সর্বগুণসম্পন্না এক ঋষিকন্যা বাস করতেন। নাম নলায়ণী। সেই রমণী উপযুক্ত পতি লাভ না করতে পেরে অত্যন্ত ব্যথিতা হয়েছিলেন। তখন তিনি উপযুক্ত পতি লাভের ইচ্ছায় মহাদেবের তপস্যা করতে শুরু করেন। তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব তার সমক্ষে উপস্থিত হলে, মহীয়সী সর্বগুণসম্পন্ন পতিলাভের বর প্রার্থনা করেন। কিছুটা ইতস্তত হওয়ায় সেই রমণী পাঁচবার শিবের কাছে একই বর প্রার্থনা করেন। তখন শিব বললেন, “হে ঋষিকন্যা আমার বরের প্রভাবে তুমি পাঁচ পতি প্রাপ্ত হবে।” তখন ঋষিকন্যা বললেন, “প্রভু আমি তো আপনার কাছে এক পতি প্রার্থনা করেছি।” শিব বললেন, “কিন্তু একই প্রার্থনা পাঁচবার করেছ তাই তুমি পঞ্চস্বামী প্রাপ্ত হবে।”
ব্যাসদেব পাণ্ডবদের বললেন, “সেই ঋষিকন্যাই এখন দ্রুপদের কন্যারূপে যজ্ঞ থেকে জাত হয়েছে। তাঁর সাথেই তোমাদের পাঁচ ভাইয়ের বিয়ে হবে। তাই তোমরা পাঞ্চালদেশ যাও।” একথা বলে ব্যাসদেব প্রস্থান করলেন। তারপর পাণ্ডবগণ দ্রুপদরাজ্যে এসে এক কুমারের গৃহে আশ্রয় নিলেন।
দ্রুপদরাজ কন্যা দ্রৌপদীকে বিবাহ দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন কিন্তু অগ্নি থেকে উদ্ভূত কন্যাকে পাত্রস্থ করার জন্য অগ্নিধারণক্ষম উপযুক্ত পাত্র নির্বাচন প্রয়োজন। তাই রাজা দ্রুপদ এক বিচিত্র প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন। সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে দ্রৌপদীর জন্য রাজা ও রাজপুত্রগণ আসতে লাগলেন।
পান্ডবগণও ব্রাহ্মণবেশে সেই স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত হলেন। বড় বড় ক্ষত্রিয় মহারথীগণ সেখানে দ্রুপদের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হলেন, ব্রাহ্মণবেশী অর্জুন সেখানে অনায়াসে লক্ষ্যভেদ করে পাঞ্চালী দ্রৌপদীকে জয় করলেন। তারপর পান্ডবগণ দ্রৌপদীকে নিয়ে কুটিরে ফিরে এলেন। ভীম ও অর্জুন মাতা কুন্তীর উদ্দেশে বললেন, “মা, আজ এক রমণীয় বস্তু ভিক্ষা লাভ করেছি।” কুন্তী দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা পান্ডবগণকে না দেখেই বললেন, “তোমরা যা এনেছো তা সকলে মিলে ভোগ করো।” পরে তিনি দ্রৌপদীকে দেখে বললেন, “হায়। আমি বড়োই কষ্টের কথা বলে ফেলেছি।”
ব্যাসদেব বলছেন, “মানুষের বিবাহে এরূপ বিধান নেই, তবে পাণ্ডবগণ দেবতাদের অবতার, দ্রৌপদী স্বর্গলক্ষ্মীর অবতার সুতরাং পূর্বসুকৃতিবশত মহাদেবের অনুগ্রহে দ্রৌপদী পঞ্চপান্ডবের পত্নী হবেন।”
তারপর কুন্তী দ্রৌপদীর হাত ধরে যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে বললেন-“পুত্র ভীম ও অর্জুন দ্রুপদ কন্যাকে আমার কাছে ভিক্ষা বলায়, আমিও অনবধানবশত ভিক্ষা মনে করেই বলে ফেলেছি—তোমরা সকলে মিলে ভাগ করে নাও। আমার এই কথা কীভাবে সত্য হতে পারে, এ বিষয়ে যা সঙ্গত হয়, কোনো পাপ যেন দ্রৌপদীকে স্পর্শ করতে না পারে ও দ্রৌপদীও যেন তাতে সম্মত হয় তার উপায় বলো।” কিছুক্ষণ চিন্তা করে যুধিষ্ঠির অর্জুনকে দ্রৌপদীর পাণিগ্রহণ করার কথা বললে অর্জুন মায়ের বাক্যের প্রতি নিষ্ঠা হেতু তাতে অস্বীকৃতি জানালেন।
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তখন ব্যাসদেবের বাক্য স্মরণ করলেন। তারপর তিনি বললেন, “কল্যাণীয়া দ্রৌপদী আমাদের সকলেরই ভার্যা হবে।” তখন কৃষ্ণ ও বলরাম সেখানে এসে উপস্থিত হন। তারপর কৃষ্ণসহ সকলেই দ্রুপদরাজ প্রাসাদে গমন করেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির দ্রুপদকে সমস্ত বৃত্তান্ত বললেন। তখন দ্রুপদ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “স্বয়ং ধর্মের প্রতিভূ আপনি কীভাবে এমন অধর্ম করতে পারেন? তখন যুধিষ্ঠির বললেন—“মহারাজ, ধর্ম অতি সূক্ষ্ম বিষয়; সুতরাং, আমরা এর গতি বুঝতে পারি না; তাই প্রাচীনেরা যে পথে গিয়েছেন, আমরাও সেই পথের অনুসরণ করে চলি।”
এমন সময় মহর্ষি ব্যাসদেব সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। যথাসম্মান প্রদানের পর দ্রুপদ ব্যাসদেবের নিকট দ্রৌপদীর বিবাহের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন-“একটি স্ত্রী বহু পুরুষের পত্নী হবে, অথচ তাতে কেন পাপ হবে না?”
তখন ব্যাসদেব দ্রুপদের হাত ধরে তাকে নিয়ে অন্য একটি কক্ষে প্রবেশ করলেন। তারপর ব্যাসদেব দ্রুপদকে পঞ্চপান্ডব ও দ্রৌপদীর পূর্বজন্মের বৃত্তান্ত বলতে শুরু করলেন, “মহারাজ, পুরাকালে নৈমিষারণ্যে দেবতারা এক যজ্ঞ করছিলেন। সেই যজ্ঞের যম পুরোহিত হওয়ার কারণে মানুষদের মারছিলেন না। পৃথিবীতে মানুষ ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে ইন্দ্র, চন্দ্র, বরুণ আদি দেবগণ যজ্ঞস্থানে আসছিলেন, তখন পথিমধ্যে একটি স্বর্ণপদ্ম গঙ্গায় ভেসে আসতে দেখে উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেবরাজ ইন্দ্র দেখলেন, এক রমণী গঙ্গায় নেমে রোদন করছে ও তাঁর অশ্রুবিন্দু হতে স্বর্ণপদ্ম সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ জিঙ্গেস করলে রমণী ইন্দ্রকে নিকটবর্তী হিমালয়ের ওপরে নিয়ে গেলেন। সেখানে এক যুবক এক যুবতীর সাথে পাশা খেলছিল। তারা ইন্দ্রের আগমনে তাঁকে সম্মান না জানানোয় ইন্দ্র ক্রোধিত হলেন। বাক্যবাণ প্রয়োগ করলেন। যুবক ইন্দ্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করা মাত্রই ইন্দ্র পাথরের ন্যায় স্থবির হয়ে পড়লেন। পাশাখেলা শেষে যুবকবেশী শিব ক্রন্দনরত রমণীকে বললেন, ইন্দ্রকে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে। রমণীর স্পর্শে ইন্দ্র চেতনা ফিরে পেল শিব তাকে তার বল দ্বারা একটি পর্বতকে সরাতে বললেন। পর্বত সরিয়ে ইন্দ্র সেখানে চার তেজস্বী পুরুষকে গর্তের ভেতর দেখতে পেলেন।
তখন শিব বললেন, “এরাও তোমারই মতো ইন্দ্র ছিল। অহংকারে মত্ত হওয়ার কারণে আমি তাদের আবদ্ধ করে রেখেছি। তুমিও সেখানে প্রবেশ করো।” তখন ইন্দ্ৰ ভয়ে কম্পিত হয়ে শিবের অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। তখন শিব বললেন, “তোমরা মর্ত্যে গিয়ে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করো।”
তখন পূর্বের ইন্দ্রগণ বললেন, “আমরা মর্ত্যলোকে যাব, তবে আমাদের ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের মাধ্যমে জননীর গর্ভে স্থাপন করুন।”
মহাদেব তাঁদের অভিলাষ পূর্ণ করার অঙ্গীকার করলেন। তবে, পঞ্চম ইন্দ্ৰ মহাদেবকে বললেন, দেবগণের কার্য সম্পাদনের জন্য আমি আমার অংশকে পঞ্চম ইন্দ্র করে পাঠাব। পূর্বের ইন্দ্রগণই এবার যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেবরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। আর পূর্বে মহাদেব যে স্বালক্ষীকে তাঁদের পত্নী হওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন, তিনিই দ্রৌপদীরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন।
তারপর ব্যাসদেব দ্রুপদকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করে পান্ডবগণের পূর্বের ইন্দ্ররূপ দর্শন করালেন। তা দর্শন করে দ্রুপদরাজ অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন এবং পূর্বে দ্রৌপদীর যে জন্মবৃত্তান্ত পাণ্ডবগণকে বলেছিলেন, তা পুনরায় দ্রুপদকে শোনালেন। সেই স্বৰ্গলক্ষী পরবর্তীকালে ঋষিকন্যা হয়ে তপস্যা করে পান্ডবগণকে পতিরূপে লাভ করেন।
ব্যাসদেব বললেন—“মানুষের বিবাহে এরূপ বিধান নেই, তবে পান্ডবগণ দেবতার অবতার দ্রৌপদী স্বর্ণলক্ষীর অবতার; সুতরাং, পূর্বসুকৃতিবশত এবং মহাদেবের অনুগ্রহে এক দ্রৌপদী পঞ্চপান্ডবের পত্নী হবেন।” দ্রৌপদীর বিবাহ নিয়ে প্রশ্ন, বিবাহ অনুষ্ঠিত অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।
যদি শোনেন, বর্তমানে কোনো মেয়ে একসাথে পাঁচ ভাইকে বিয়ে করে দিব্যি সংসার করছে আপনি হয়তো চমকে যাবেন। এটা শুনে নিশ্চয় প্রথমে অবাক হবেন আর তারপর ভাববেন ভারতের মত জায়গায় যেখানে নারীবাদীরা পান থেকে চুন খসলেই অবরোধে নামেন। সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়াল জুড়ে লেখালেখি করে ছয়লাপ করেন তারা এবিষয়ে নিশ্চুপ কেন?
অনেক আলোচনা হল দ্রৌপদীকে নিয়ে এবার আলোচনায় আসছি ‘দ্রৌপদী প্রথা’ নিয়ে। এই প্রথার জন্য আমাদের যেতে হবে দেবভূমিতে।
চলুন যাওয়া যাক উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ে। সেখানে মেয়েদের সাথে এমন ঘটনায় ঘটে চলেছে যুগের পর যুগ ধরে। দ্রৌপদীর মতোই এখানকার অনেককেই একই পরিবারের পাঁচ ভাইয়ের সাথে বিয়ে করতে হয়। আসুন আপনাদের সাথে কলিযুগের দ্রৌপদীদের পরিচয় করিয়ে দিই এবং জেনে নিই কী কারণে তাদের এমন কাজ করতে হয়।
কিছু ব্যক্তিগত কারণের জন্য উত্তরাখণ্ডের এই দ্রৌপদীদের নাম গোপন রেখে পরিবর্তে কাল্পনিক নাম ব্যবহার করা হল।
উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা দিপ্তীর বয়স ১৯-এর আশেপাশে। তাকে বিয়ে করতে হয়। একই পরিবারের পাঁচ ভাইকে। শুনলে অবাক লাগতে পারে যে দিপ্তীকে কিন্তু সব ভাইয়ের সাথে একইরকম ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ সামাজিকভাবে স্ত্রী হওয়ার কারণে পাঁচ ভাইয়ের সাথেই শারীরিক সম্বন্ধ করতে হয়। এটা ভেবেই অনেকে ভয়ে বিয়ের আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় তা না হলে আত্মহত্যা করে।
দিপ্তী এভাবে শারীরিক সম্পর্ক করতে করতে স্বাভাবিকভাবেই একদিন গর্ভবতী হয়ে পড়ল। দিপ্তীর গর্ভে জন্ম নিল এক পুত্রসন্তান। দিপ্তী সন্তানের জন্ম দিল ঠিকই কিন্তু সে নিজেও জানে না তার সন্তানের আসল বাবা কে। দীপ্তির পাঁচ স্বামীর এই ব্যাপারটি নিয়ে প্রথমদিকে খারাপ লাগলেও এখন আর কোনো সমস্যা নেই। দিপ্তী আর তার সন্তানকে নিয়ে বেশ সুখেই সংসার করছে।
এবার আরেক মেয়ে তিতলির পাঁচ স্বামীকে নিয়ে ঘর সংসার করার গল্প। বছর সাত আগে তিতলির হিন্দু রীতি-রেওয়াজ মেনে বিয়ে হয়, সুধীরের সাথে। তারপরই তিতলিকে তার স্বামীর অন্য চার ভাইয়ের সাথেও বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তিতলির কথায়, “আমার এধরণের সম্পর্কে কোনো আপত্তি নেই, বরং আমি নিজেকে বেশ সৌভাগ্যবতী মনে করি কারণ আমি পাঁচ স্বামীর ভালোবাসা পায়। আমার পাঁচ স্বামীই আমাকে ভীষণ ভালোবাসে এবং সবাই আমার খেয়াল রাখে ও যত্ন করে।
পাঁচ স্বামীই তিতলিকে ভালোবাসে তিতলিকে। তিতলি নিজেও জানে যে, আমাদের দেশে এরকমভাবে একাধিক বিয়ে করা বেআইনি, কিন্তু সে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে বলে, “আমাদের এখানে মেয়ের সংখ্যা খুবই কম, তাই বাধ্য হয়েই আমাদের এই কাজ করতে হয়। এমতাবস্থায় এই জায়গায় এরকমই রীতি রয়েছে যে, বাড়ির এক ভাইয়ের সাথে যে মেয়ের বিয়ে হবে, সেই মেয়েটিকে তার স্বামীর বাকি ভাইদের অর্থাৎ দেওরদের বিয়ে করতে হবে।
নির্দিষ্ট প্রথা মেনেই হয় বিয়ে। এই প্রথা আমাদের অঞ্চলের বেশিরভাগ পরিবারেই পালন করে। পাঁচ ভাইয়ের সাথে বিয়ে করে তাদের সঙ্গে সংসার ধর্ম পালন করার জন্য আমাকে অনেকেই কলিযুগের দ্রৌপদী নামে অভিহিত করে।”
পাহাড়ের আরেক দ্রৌপদী বলছেন, “শৈশব শেষে মাত্র কৈশরে পা দিলাম ঠিক তখনি আমার বিয়ে হয়ে যায়। জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে সংসার করতে হয় একই পরিবারের তিন ছেলের সঙ্গে এবং আমাকে বাধা করা হয় প্রতিটি ছেলের সংসারে অন্তত একটি করে ছেলে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য। আমি পারিনি।” সে বলে এলাকার বৃদ্ধরা বলে, “এই প্রথার ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে না, আবার সম্পত্তি, জায়গা-জমি ভাগ বাটোওয়ারার ঝামেলাও থাকে না।”
এক সরকারি সমীক্ষার রিপোর্ট থেকে জানা যায় দ্রৌপদী প্রথা অনেকের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। বিশেষ করে কিশোরী এবং তরুণীদের কাছে। উত্তরাখণ্ড ছাড়াও উত্তরপ্রদেশের বেশ কিছু গ্রামে গেলে দেখা মেলে একজন করে দ্রৌপদীর। অর্থাৎ, একই পরিবারের একাধিক ছেলের জন্য একজন স্ত্রী রয়েছে।
মার্কণ্ডেয়পুরাণে এ প্রসঙ্গে কী বলা হয়েছে—“অনন্তর দেবগণ প্রজাসকলের উপকার করে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলেন। তখন স্বয়ং ধর্ম তেজোভাগ দ্বারা স্বর্গ হতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলেন। তখন স্বয়ং ধর্ম ইন্দ্রদেহজাত সেই তেজ কুন্তীগর্ভে নিক্ষেপ করেন, তার দ্বারা যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়। পবনদেব ইন্দ্ৰসম্বন্ধীয় যে তেজ কুত্তীগর্ভে নিক্ষেপ করেন, তাতে ভীমসেনের জন্ম হয় এবং কুত্তীগর্ভেই ইন্দ্রের বলার্ধ দ্বারা অর্জুনের জন্ম হয়। আর ইন্দ্রের লাবণ্যধারী অশ্বিনীকুমারদ্বয় দ্বারা মাদ্রীগর্ভে নকুল ও সহদেব নামে যমজ কুমারের জন্ম হয়। সুতরাং ইন্দ্রই এই পাঁচ অংশে অবতীর্ণ হন।” মার্কন্ডেয় পুরাণে বলা হয়েছে একই কথা। দ্রৌপদী হল ইন্দ্রপত্নী শচী। তাই এখানে দ্রৌপদীর বিবাহ পঞ্চপান্ডবরূপী ইন্দ্রের সঙ্গেই হয়েছে।
অনেক মহাভারত বিশ্লেষক এই প্রশ্ন হামেশাই করেন কুন্তী কেন তাঁর বাক্য ফিরিয়ে নিলেন না। মাতা কুন্তী তাঁর বাক্য ফিরিয়ে নিতে পারতেন কিন্তু তিনি তা নেননি, কারণ সে-সময় কথার অনেক মূল্য ছিল। ধার্মিকগণ তাঁদের সত্যতা, বচন রক্ষা করতেন। দশরথ কৈকেয়ীকে কথা দিয়েছিলেন যে, তাকে দুটি বর দেবেন যখন কৈকেয়ী বরস্বরূপ তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় শ্রীরামকে চাইলেন, তখন দশরথ তাঁর কথা ফিরিয়ে নিতে পারতেন, কিন্তু তাঁর প্রাণ বহির্গত হওয়ার উপক্রম হলেও তিনি তা করেননি। আবার, প্রভু শ্রীরামও পিতৃসত্য পালন করেছিলেন। এমনকি মাতা কৈকেয়ী যখন তার ভুল বুঝতে পেরে শ্রীরামকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, তখনও শ্রীরাম প্রত্যাবর্তনে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আবার, পিতামহ ভীষ্ম হস্তিনাপুরের রাজসিংহাসনে আসীন রাজার প্রতি তাঁর আনুগত্য রাখার বচন হেতু দুর্যোধনের অন্যায় অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করেছিলেন, অর্থাৎ সে সময় বাক্যের অনেক মর্যাদা ছিল। তাই কুন্তীদেবী দ্রৌপদীর প্রতি কোনো অবিচার না করেই তার বাক্য রক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন।
পান্ডবরা মায়ের আদেশ মেনে নিয়েছিলেন কারণ মা গুরুসম। তাই, মায়ের আদেশ সন্তানের উলঙ্ঘন করা উচিত নয়। কুন্তী ভুল করে বলে ফেললেও তা পঞ্চপান্ডবদের প্রতি ছিল আদেশস্বরূপ।
অনেকরই প্রশ্ন, দ্রৌপদী পঞ্চপান্ডবের সাথে কীরূপ আচরণ করতেন? এই প্রশ্ন শুধু আমাদেরই নয়। মহাভারতে পরীক্ষিৎপুত্র জনমেজয় নিজেই এ প্রশ্ন করেছেন-“একা দ্রৌপদী পঞ্চপান্ডবের ধর্মপত্নী হয়ে কীভাবে ধর্ম রক্ষা করে চলতেন?” উত্তরে বৈশম্পায়ন সবিস্তারে পাণ্ডবগণের সাথে দ্রৌপদীর আচরণ বর্ণনা করেন। বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর পান্ডবরা ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে গেলেন। নারদ মুনি সেখানে হাজির। অভ্যর্থনা জ্ঞাপনের পর নারদ মুনি পান্ডবদেরকে বললেন—“ দ্রৌপদী তোমাদের ধর্মপত্নী, তাই দ্রৌপদীকে নিয়ে তোমাদের মধ্যে যেন বিবাদ উপস্থিত না হয়, তেমন নিয়ম করো। কারণ, পুরাকালে সুন্দ ও উপসুন্দ নামে দুই ভাইয়ের মধ্যে অত্যন্ত আন্তরিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিলোত্তমা নামে এক স্ত্রীর জন্য পরস্পরকে বধ করে।” তারপর নারদ মুনি তাদের সুন্দ-উপসুন্দের কাহিনী সবিস্তারে বললেন। নারদ মুনির কথা শোনার পর পান্ডবরা দেবর্ষি নারদের সমক্ষে একটি নিয়ম করলেন যে, “ দ্রৌপদী একেক জনের ঘরে একেক বৎসর অবস্থান করবে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কেউ দ্রৌপদীর সঙ্গে বসবাসকালে, অন্য যে কেউ সেখানে প্রবেশ করলে, বারো বছর বনে বাস করবেন।” দ্রৌপদী এক বছর এক পতির গৃহে বাস করার পর যখন অন্য পতির গৃহে যেতেন, তখন অগ্নিসম্ভূতা দ্রৌপদী অগ্নিস্নান করতেন।
এবার একটু কিন্নর কৈলাসের পথে যাওয়া যাক। কারণ কিন্নর কৈলাসেও রয়েছে এই দ্রৌপদী প্রথা। হিমাচলের কিন্নর অঞ্চলে আজও এক তরুণীর সঙ্গে একই পরিবারের সব ভাইদের বিয়ে দেওয়া হয়। এখানে মহিলাদের বহুবিবাহের প্রথা চালু আছে এখনও রয়েছেন দ্রৌপদীও।
এখানকার স্থানীয়দের বিশ্বাস, পাণ্ডবরা যখন রাজ্য থেকে ১৩ বছরের জন্য নির্বাসিত হয়েছিলেন, তখন তাঁরা এই কিন্নরেই লুকিয়ে ছিলেন। সেখান থেকেই নাকি মহিলাদের বহু বিবাহের প্রচলন শুরু হয়। এই অঞ্চলের বহু কিন্নর এখনও নিজেদের পাণ্ডবদের বংশধর হিসেবে দাবি করেন। তবে এই নিয়ে বিতর্ক রয়েছে কারণ মহাভারতে পাণ্ডবদের অনেক আগে থেকেই কিন্নরদের কথা উল্লেখ আছে। সেখানে এখনও একই পরিবারের সব ভাইদের সাথে একটি তরুণীর বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর সন্তান জন্ম দিলে পরিবারের সবচেয়ে বড় ভাইকে বাবা বলে সম্বোধন করে এবং বাকি ভাইরা কাকা।
কিছু সচেতন ব্যক্তি এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও তাদের সংখ্যা অনেক কম। রক্ষণশীল সমাজের সামনে তাদের নীতি কথা কাজে আসে না। উলটো রক্ষণশীল সমাজ এই ‘দ্রৌপদী প্রথা’র অনেক ভালো দিকও বের করেছে। তাদের মত, ছেলের বিয়ের সময় যাতে জমির ভাগাভাগি করতে না হয়, তাই এক তরুণীর সাথে পরিবারের সব ভাইদের বিয়ে দেওয়া হয়। পাহাড়ের এই রেওয়াজ পুরনো। কিন্নরের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি এখন আগের থেকে অনেক ভাল। তাই এই প্রথার চল আগের থেকে অনেকটাই কমেছে।
কিন্তু কেন এরকম রীতি? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এর পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হল আর্থিক-সামাজিক পরিস্থিতি। পাহাড়ি, দুর্গম এলাকায় কিন্নরের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। প্রতিটি পরিবার পিছু ছিল অল্প কিছু জমি। সেই জমি ভাগাভাগি করে নিলে প্রত্যেক ভাইদের ভাগে যেটুকু জমি থাকত তা দিয়ে সংসার চালান ছিল অসম্ভব।
দ্রৌপদী সম্ভবত পুরাণের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও বিতর্কিত নায়িকা। পাঁচ স্বামীর সঙ্গে যাতে শান্তিপূর্ণভাবে দ্রৌপদী বাস করতে পারেন, নারদ মুনি নিয়ম করে দেন, দ্রৌপদী এক বছর এক স্বামীর সঙ্গে থাকবেন। অন্য স্বামীরা তখন অপেক্ষা করবেন। এক বছর পর অগ্নির ভেতর দিয়ে গিয়ে পুনরায় পবিত্র ও সতী হয়ে তিনি দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে থাকতে শুরু করবেন। এভাবে প্রতি স্বামীকে চার বছর অপেক্ষা করতে হবে এক বছর দ্রৌপদীর সঙ্গলাভের জন্যে। অর্জুন একদা এই নিয়ম ভঙ্গ করার অপরাধে তাঁকে এক বছরের জন্যে ব্রহ্মাচর্যে যেতে হয়েছিল আরও দূরের এক বনে। সেখানে গিয়ে অবশ্য অর্জুন ব্রহ্মাচর্যের বদলে আরও তিনখানি বিয়ে করেন-চিত্রাঙ্গদা, কৃষ্ণের বোন সুভদ্রা ও উলুপীকে।
দ্রৌপদী তাঁর স্বামীদেরকে শুধু শান্তিতে রাখেননি, সকলের আগে ঘুম থেকে উঠে সামান্য কিছু খেয়ে সারাদিন সমস্ত কাজকর্ম শেষে সকলের পরে শুতে যেতেন। তবে দ্রৌপদী একটা নিয়ম করে দেন তাঁর স্বামীদের, যা তাঁদের মেনে চলতে হয়। দ্রৌপদী জানতেন তাঁর স্বামীদের কারো কারো আরও স্ত্রী রয়েছে। কিন্তু দ্রৌপদীর নির্দেশে তাঁরা কেউ প্রাসাদে ঢুকতে পারতেন না। তাঁদের সঙ্গে মিলিত হতে হলে তাঁর স্বামীদের বাড়ির বাইরে গিয়ে সেই স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হতে হতো। কৃষ্ণের সহোদরা অর্জুনের স্ত্রী সুভদ্রার বেলায় শুধু এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন দ্রৌপদী। পাঁচ স্বামীর মধ্যে অর্জুনের প্রতি দ্রৌপদীর কিছুটা পক্ষপাতিত্ব থাকলেও কৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভামার কাছে দ্রৌপদী স্বীকার করেছেন, পাঁচজন স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে তাঁকে কতগুলো কঠিন নিয়ম মেনে চলতে হয়। দ্রৌপদী অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, বাস্তববাদী নারী। তিনি তাঁর প্রতি অন্যায় আচরণের জন্যে প্রতিশোধ চাইতেন, মুখ বুজে সহ্য করতেন না অবিচার। প্রতি স্বামীর সঙ্গে দ্রৌপদীর একটি করে পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর পাঁচটি পুত্রকেই ঘুমন্ত অবস্থায় বধ করে অশ্বত্থামা। অশ্বত্থামার মা একজন ধর্মপ্রাণ নারী ও গুরু। সেই বিবেচনায় এবং পাঁচ পুত্রকে হারিয়ে নিজের শোকাতুর অবস্থা অনুধাবন করে সকলের পরামর্শ ও উপদেশ অগ্রাহ্য করে অশ্বত্থামাকে তিনি ক্ষমা করে দেন। দ্রৌপদী চান না তাঁর মতো করে আর একটি মা এমন প্রচন্ড শোকে পান্ডুর হোক।
উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, উত্তরপ্রদেশের মত পঞ্জাবের লুধিয়ানা, জলন্ধরের মত কয়েকটি এলাকায় মহাভারতেই দোহাই দিয়ে ‘দ্রৌপদী প্রথা’-র নামে সাত বা আট ভাই একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে ভাগাভাগি করে নেয়। এধরনের প্রথা প্রাচীনযুগে কেরালার তিয়ান্স সম্প্রদায় এবং তিব্বতীয় উপজাতীয়দের মাঝে প্রচলিত ছিল।
এইসব ‘বিয়ে’ কখনোই ধর্মীয় বা সামাজিক বিধি-বিধান মেনে হয় না। তাই এ সংক্রান্ত কোনও প্রমাণপত্র বা সাক্ষী-সাবুদ একেবারেই পাওয়া যায় না। আর তাই হিন্দু বিবাহ আইন বা ভারতীয় দণ্ডবিধির কোনও ধারাই একে শাস্তিযোগ্য বা অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না। উত্তরাখণ্ডের এক উচভপদস্থ কর্মকর্তা লিখছেন, “এ ধরনের কোনও প্রথা প্রচলন, সমাজে যার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তা ঠেকানো কঠিন। কোনও নারী এর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আইনের দ্বারস্থ হয়েছে এমন ঘটনাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অপরদিকে এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এসব গ্রামে সমাজপতি আর পরিবারগুলোর মাঝে রয়েছে মজবুত এক সমঝোতা।”
পুরাণ, বায়ু পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণে দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামীর কারণ বর্ণিত রয়েছে।
