অলৌকিক মিথে ঘেরা অমরনাথ
হিমালয়ের আলোচনা হচ্ছে অথচ অমরনাথের কথা হবে না তা কখনো হতে পারে। অমরনাথ যাত্রা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে হয়ে থাকে। আর তার জন্য মুখিয়ে থাকেন হিন্দু দর্শনার্থীরা। অমরনাথ হিন্দুদের প্রধান তীর্থক্ষেত্রের মধ্যে একটি যা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে অবস্থিত। এটি একটি শৈব তীর্থ। অমরনাথের গুহাটি সমতল থেকে ৩,৮৮৮ মিটার বা ১২,৭৫৬ ফুট উঁচুতে অবস্থিত।
এই তীর্থ ক্ষেত্রটি হিন্দুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত। গুহাটি পাহাড় ঘেরা আর এই পাহাড় গুলি সাদা তুষারে আবৃত থাকে বছরের অনেকটা সময় ধরে। এমনকি এই গুহার প্রবেশপথও বরফে ঢাকা থাকে।
গ্রীষ্মকালে খুব স্বল্প সময়ের জন্য এই দ্বার প্রবেশের উপযোগী হয়। তখন লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী অমরনাথের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। অমরনাথের গুহাতে চুইয়ে পড়া জল জমে শিবলিঙ্গের আকার ধারণ করে। জুন-জুলাই মাসে শ্রাবণী পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় অমরনাথ যাত্রা। শেষ হয় জুলাই-অগস্ট মাসে গুরু পূর্ণিমার সময় ছড়ি মিছিলে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অমরনাথ যাত্রায় যোগদান করেন।
পৌরাণিক মতে, পার্বতীকে গোপনে সৃষ্টি রহস্য বোঝাতে নির্জনে পাহাড়ে গুহা নির্মাণ করেছিলেন মহাদেব। অমরনাথে কবে থেকে তীর্থ যাত্রা শুরু হয় তা সঠিকভাবে জানা যায় না। একটি তথ্যসূত্র থেকে ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে রাজা আরজরাজা বরফ নির্মিত এই শিবলিঙ্গে পুজো দিতেন। ধারণা করা হয় রানি সূর্যমতী ১১ শতকে অমরনাথের এই ত্রিশূল, বানলিঙ্গ ও অন্যান্য পবিত্র জিনিসগুলি উপহার দেন। এছাড়াও প্রাচীন শাস্ত্র ও বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে এ সম্পর্কিত বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মধ্যযুগে অমরনাথের কথা মানুষ ভুলে গিয়েছিল কিন্তু ১৫ শতকে তা আবার আবিষ্কৃত হয়। প্রচলিত আছে কাশ্মীর একসময় জলে প্লাবিত হয়ে যায় এবং কাশ্যপমুনি সে জল নদীর মাধ্যমে বের করে দেন। তারপর ভৃগুমুনি অমরনাথ বা শিবের দেখা পান। এভাবে আবার অমরনাথের প্রচার শুরু হয়। বর্তমানে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ অমরনাথ যাত্রা করেন।
জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তীর্থে যেতে পহেলগাও শহর অতিক্রম করতে হয়। পহেলগাও থেকে অমরনাথ যেতে পাঁচ দিন সময় লাগে। অমরনাথে যাওয়ার জন্য আগে প্রত্যেক যাত্রীর রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। সেটি অত্যন্ত জরুরি। অমরনাথ শ্রাইন বোর্ড (SASB) যাত্রা শুরুর মোটামুটি মাসখানেক আগে যাত্রা শুরুর ও শেষের তারিখ ঘোষণা করা হয়। জম্মু-কাশ্মীর ব্যাংক থেকে ফর্ম সংগ্রহ করতে হয়। পূরণ করা ফর্মটি ২টি পাসপোর্ট ছবি ও শারীরিক সক্ষমতার ডাক্তারি শংসাপত্রসহ নিকটবর্তী জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজমের অফিসে জমা দিতে হয়। এছাড়া আপনি চাইলে স্থানীয় কিছু নির্দিষ্ট উল্লিখিত ব্যাংক বা সরকারি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। সেখান থেকেও আগাম পারমিশন করিয়ে অমরনাথ যাত্রা করতে পারেন।
তীর্থ যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন মন্দির, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন যাত্রাপথে বিনামূল্যে খাবার, চিকিৎসাসেবা ও বিশ্রামের জন্য তাঁবু সরবরাহ করে থাকে। মন্দিরের কাছে স্থানীয়রা শত শত তাঁবুর ব্যবস্থা করে তীর্থযাত্রীদের রাত্রি যাপনের জন্য। জম্মু থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরবর্তী কাটরা পর্যন্ত বাস ও ভাড়া গাড়ি চলে। শেষ ১৪ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পৌঁছোতে হয় মন্দিরে। যাঁরা হাঁটতে পারবেন না তাঁদের জন্য রয়েছে ডান্ডি ও ঘোড়ার ব্যবস্থা। কাটরা শহরের ট্যুরিস্ট রিসেপশন সেন্টার থেকে যাত্রা-স্লিপ অর্থাৎ ‘পরচি’ সংগ্রহ করতে হয়। পুজোর উপকরণ আর নগদ টাকা পয়সা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ নিষেধ। নিকটতম রেলস্টেশন জম্মু। জম্মু থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরবর্তী কাটরায় নিয়মিত বাস যায়।
শৈবতীর্থ হিসেবে অমরনাথকে এক বিশেষ গুরত্ব প্রদান করে হিন্দু ঐতিহ্য। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে পরিগণিত না হলেও তুষারলিঙ্গ অমরনাথের মহিমা একেবারেই স্বতন্ত্র। এখানে সন্নিবিষ্ট হল অমরনাথ-সংক্রান্ত ৮টি তথ্য, যা পুরাণ এবং শৈব ঐতিহ্য থেকে সংগৃহীত।
১। পুরাণ অনুসারে, শিব পার্বতীকে অমরত্ব শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে অমরনাথ গুহাকে বেছেছিলেন।
২। পহলগাম, যেখান থেকে অমরনাথ যাত্রা শুরু হয়, সেই স্থানে শিব তাঁর ষাঁড় নন্দীকে রেখে গিয়েছিলেন। চন্দনওয়াড়িতে তিনি তাঁর শিরস্থ চন্দ্রকে রেখে যান এবং শেষনাগে তিনি তাঁর দেহে বিচরণরত সর্পকুলকে রাখেন। গণেশকে রাখেন মহাগণেশ পর্বতে। তার পরে বায়ু, অগ্নি, জল, মৃত্তিকাকে রাখেন পঞ্জতরণী নামক স্থানে। প্রায় সব নির্মোক ত্যাগ করেই তিনি পার্বতীকে নিয়ে অমরনাথের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
৩। যখন শিব পার্বতীকে অমরত্ব সম্পর্কে জ্ঞানদান করছিলেন, তখন সেখানে কোনো জীবিত প্রাণী ছিল না। কেবল একটি পায়রার ডিম সেখানে থেকে গিয়েছিল। কথিত আছে এই ডিম থেকে একজোড়া পায়রা জন্মায়। এবং তারা অবধারিতভাবে অমরত্ব লাভ করে। এদের নাকি আজও গুহার ভেতরে দেখা যায়।
৪। অমরনাথ গুহাটি আবিষ্কার করেন বুটা মালিক নামে এক মুসলমান মেষপালক। তিনি এখানে এক সন্ন্যাসীর দেখা পান। সন্ন্যাসী তাঁকে একটা থলিতে কিছু কয়লা দান করেন। পরে সেই কয়লা সোনায় পরিণত হয়। বুটা সেই স্থানে ফিরে যান। কিন্তু সেই সন্ন্যাসীকে আর দেখতে পাননি। বদলে তিনি অমরনাথ লিঙ্গ দেখতে পান।
৫। অমরনাথ তুষারলিঙ্গের বৃদ্ধি চন্দ্রকলার উপরে নির্ভরশীল। শিবলিঙ্গ ছাড়াও আরও দু’টি লিঙ্গ এই গুহায় রয়েছে। এদের পার্বতী ও গণেশ মনে করা হয়।
৬। অমরনাথ গুহার বয়স আনুমানিক ৫০০০ বছর।
৭। প্রতি বছর অগণিত মানুষ অমরনাথ যাত্রা করেন। শ্রাবণে এই যাত্রা শুরু হয়।
৮। দু’টি পথে অমরনাথ যাত্রা সম্পন্ন হয়—পহলগাম রুট এবং এবং বালতাল রুট।
