পাতালে প্রবেশের আশ্চর্য এক গুহা
‘পাতাল’ প্রায় সব সংস্কৃতির এক কমন বিষয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ যেমন আকাশকে নিয়ে ভেবেছে, তেমনই ভেবেছে পাতালকে নিয়ে। মাটির নিচে কী আছে তা নিয়ে সবারই এক অপার বিস্ময় পাতালকে নিয়ে। পাতাললোকের রহস্য নিয়ে মানুষের গবেষণার অন্ত নেই। পুরাণ হোক কিংবা আধুনিক সাহিত্যে পাতাল নিয়ে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে সর্বত্র। সাহিত্যিক জুলে ভার্নের কল্পনাতেও পাতাল এক অন্য মাত্রা পেয়েছে। তিনি তাঁর নিজস্ব মহিমায় উপস্থাপিত করেছেন পাতালকে।
গ্রিক পুরাণের দেবতা হাডেসকে পাতালের অধীশ্বর বলে বলা হয়েছে। অন্যদিকে ‘রামায়ণ’-এ উল্লিখিত মহীরাবণ পাতাললোকেরই বাসিন্দা। আবার বিভিন্ন হিন্দু পুরাণ শাস্ত্রে পাতাল অর্থে নরককেই বোঝানো হয়েছে। অনেকের মতে স্বর্গ- মর্ত্য-পাতালের মধ্যে পাতাল পৃথিবীর একেবারে নীচের গভীর অংশে স্থিত, যেখানে সাধারণের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ।
শাস্ত্রকারদের মতে যমরাজ পাতাললোকের অধীশ্বর। একটু রামায়ণের কথা মনে করুন সীতার পাতালপ্রবেশের সেই অধ্যায়। যেখানে সীতা বলছেন, “হে ধরিত্রী তুমি দ্বিধাবিভক্ত হও। আমি তাতে প্রবেশ করব।”
এই প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে। পাতালের এইসব অনুষঙ্গ আমাদের একটা প্রশ্নে এনে দাঁড় করায়। সেটা এই— পাতালে প্রবেশের কোনো দ্বার কি সত্যিই রয়েছে? না, কোনো খনিগর্ভ বা মানব-সৃষ্ট গহ্বর নয়, এমন কোনো দ্বার, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কিংবদন্তি-পুরাণ কিংবা কোনো রহস্য ?
পাতাল নিয়ে এত কথা কেন এল? পাতালেপ্রবেশ আদৌ সম্ভব কিনা তার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আমারা পৌঁছে যাব হিমালয়ের এক গ্রামে। হিমাচলপ্রদেশের সেই গ্রামে গিয়ে অবাক হবেন এটা শুনে যে সেখানে আছে পাতালে প্রবেশের এক আশ্চর্য গুহা।
ব্যস লেগে পড়ুন গুহার খোঁজে। গুহা খুঁজতে হলে প্রথমেই পৌঁছে যান হিমালয়ের কোলে পিথোরাগড় জেলায়। হিমাচল প্রদেশের এই জেলাতেই গঙ্গোলিহাট বলে রয়েছে একটি ছোট্ট শান্ত জনপদ। তারই ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পাতাল ভুবনেশ্বর মন্দির। নামেই মন্দির, আসলে এই একটি প্রাকৃতিক গুহা। সরু গুহামুখ দিয়ে কার্যত হামাগুড়ি দিয়ে টেনে-হিচড়ে পাতালে অর্থাৎ মাটির নীচে নামতে হবে। প্রবেশদ্বার থেকে প্রায় ৯০ মিটার নীচে রয়েছে এক অত্যাশ্চর্য গুহামন্দির। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০ মিটার। এটাই পাতাল ভুবনেশ্বর নামে পরিচিত, যাকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি।
আচ্ছা গুহার গল্পে যাওয়ার আগে কীভাবে গাঙ্গোলিহাট পৌঁছোবেন তা একটু জেনে নেওয়া যাক। কাঠগুদাম বা হলদোয়ানি থেকে যারা গঙ্গোলিহাটের উদ্দেশে যাত্রা করবেন, তাদের জন্য তিনটি পথ আছে। প্রথমটি রামগড়-মুক্তেশ্বর হয়ে, দ্বিতীয়টি ধানাচুলি-নাটাডল হয়ে, আর তৃতীয়টি ভীমতাল-আলমোড়া-বেরিনা হয়ে একটি রাস্তা। প্রতিটি পথই অতুলনীয় সৌন্দর্য্যে ভরা। আবার কৌশানী থেকে আলমোড়া-রানিখেত হয়েও পৌঁছে যাওয়া যায় পাতাল ভুবনেশ্বর। হাওড়া থেকে সরাসরি কাঠগোদাম যাওয়ার জন্য একটি ট্রেন আছে। এছাড়া হাওড়া থেকে সপ্তাহে একদিন ছাড়ে লালকুয়া এক্সপ্রেস। সেটিও কাঠগোদামের দুটি স্টেশন আগে পর্যন্ত যায়। কাঠগোদাম, হলদোয়ানি বা লালকুয়া থেকে গাড়িতে সরাসরি পৌঁছে যাওয়া যায় পাতাল ভুবনেশ্বর।
পাতাল ভুবনেশ্বর মন্দির আসলে একটি গুহা। ১০ মিটার গভীর ১৬০ মিটার চওড়া এই গুহা। শারীরিক কারণে অনেকেই আগে থেকে গুহার ভেতরে না ঢোকার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। বয়স্ক অসুস্থ মানুষরা যাতে ভেতরে প্রবেশ না করেন, এমন অনুরোধ লেখা আছে বোর্ডে। আর তা দেখে বয়স্করা ফিরে যান। কেউ বলেন অপরিসর প্রবেশপথ, তার ওপর ৮২ ধাপ সিঁড়ি নামতে হবে তা শুনে অনেকেই পিছিয়ে যান। কেউ কেউ শিকল ধরে ঝুলে নামতে হবে দেখে রিস্ক নেন না। সবমিলিয়ে একটা বয়সের পর দু-একজন বেপরোয়া রিস্ক নিয়ে পাতালপ্রবেশ করেন।
আর যারা ভেতরে ঢোকেন তারা ফেরেন নায়কের মতো। তাদের ঘিরে ছোটোখাটো ভিড় জমে যায়, অভিজ্ঞতা শোনার জন্য। আপনার দেখে মনে হবে এরা বুঝি কোনো শৃঙ্গ জয় করে ফিরলেন। আর যারা পাতালপ্রবেশ করলেন না !
কয়েক শতাব্দীর মিথ আর বিশ্বাস জড়িয়ে আছে এই মন্দির ঘিরে। স্কন্দপুরাণে উল্লেখ আছে এই গুহার কথা। এই গুহা আবিস্কার নিয়ে এক কাহিনি আছে। রাজা ঋতুপর্ণ একবার জঙ্গলের মধ্যে এক হরিণের পিছু ধাওয়া করেন কিন্তু কিছুতেই তার নাগাল পাচ্ছিলেন না। যতবার শর সন্ধান করতে যান ততবার ব্যর্থ হন। এক সময় হরিণ তার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়। তাকে অনুসরণ করতে করতে রাজা এক গুহার সামনে উপস্থিত হন। গুহার দ্বাররক্ষী শেষনাগ ঋতুপর্ণকে পথ দেখিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়। রাজা সেখানে অমরনাথ, কেদারনাথ সহ বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তির দর্শন লাভ করেন। সেখানে রাজা প্রচুর ধনরত্ন ও অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করেন। শেষনাগ রাজাকে গুহার কথা কাউকে বলতে নিষেধ করে দেয়। একথা কাউকে বললে রাজার মৃত্যু হবে এমন কথাও বলে দেয়। কোনো এক দুর্বল মুহুর্তে ঋতুপর্ণ তার রানির কাছে গুহার কথা বলে ফেলায় তৎক্ষনাৎ তার মৃত্যু হয়। এর পর রানি গুহায় আসেন এবং ভেতরে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি নির্মাণ করেন।
আবার কারও মতে, স্বয়ং মহাদেব নাকি সত্যযুগে এই গুহা নির্মাণ করেছিলেন। কলিযুগে আদি শঙ্করাচার্য এই গুহায় সাধনা করেন। ‘স্কন্দপুরাণ’ থেকে জানা যায়, ঋতুপর্ণ মারা যাওয়ার পর গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। আদি শঙ্করাচার্য সেই গুহাটিকে খুঁজে পান ও পুনরায় পাতাল ভুবনেশ্বরকে প্রতিষ্ঠা করেন।
লোকবিশ্বাস, এই গুহাটির নাকি পৃথিবীর সমান বয়স। গুহায় প্রবেশ করতে গেলে ৮২টি ধাপ বেয়ে নামতে হয়। গুহার ভেতরে অক্সিজেনের অভাবও রয়েছে। গুহার বাইরে বিজ্ঞপ্তি রয়েছে—‘দুর্বলহৃদয় ব্যক্তিদের প্রবেশ নিষেধ’। কিন্তু হৃদয় সামলে প্রবেশ করলে দেখা মিলবে আশ্চর্য সব স্ট্যালাগমাইটের। যাদের এক একটির আকৃতি কোনো না কোনো হিন্দু দেবতার মতো। সেই সঙ্গে রয়েছে ‘মহাপ্রস্থান’-এ যাওয়ার পথ। যা নাকি পাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত ।
প্রাকৃতিক-রাসায়নিক ক্রিয়াকলাপের এক শৈল্পিক প্রকাশ এই পাতাল ভুবনেশ্বর । গুহার প্রবেশপথটি এক থেকে দেড় মিটার চওড়া। ফলে উলটো মুখে, প্রথমে শরীরের নিম্নাংশ ভেতরে ঢুকিয়ে পাতাল প্রবেশ শুরু করতে হয়। তারপর শরীরটিকে টেনে- হিচড়ে নীচের দিকে নামাতে হয়। গাইড ছাড়া এখানে প্রবেশ করবেন না। পাতালে
নামতে শুরু করবেন আর আপনার কানে আসবে ‘জয় পাতাল ভুবনেশ্বরের জয়’ পাতাল ভুবনেশ্বরের ধ্বনিত কেঁপে ওঠে পাতালপথ।
গুহার দুপাশে লোহার রড ও শিকল ধরে ভেজা স্যাঁতসেঁতে পথেই নীচে নামতে হবে আপনাকে। কথিত আছে এটিই অনন্তনাগের পিঠ। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী শেষনাগের পেটই হল এই পাতাল ভুবনেশ্বর গুহা। ফলে সেই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে প্রায় চল্লিশ ধাপ সিঁড়ি আপনাকে নামতে হবে। যেগুলি সিঁড়ি বললেও সিঁড়ি নয়, আসলে এবড়োখেবড়ো পাথরখণ্ড। তা বেয়ে নেমেই খানিকটা খোলামেলা জায়গা। খোলামেলা মানে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় এই আর কী। আন্দাজ আপনি মূল ভূমিতল থেকে প্রায় ৩০ মিটার নীচে এসে পড়েছেন। গুহার চারপাশে আলো-আঁধারি নানান রহস্য। আপনার মনমধ্যে একটা ভয় কাজ করবে। আপনি পাতালে প্রবেশ করেছেন, চারপাশের পরিবেশ আপনাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাবে।
আসলে এ এক অপার রহস্যই বটে, তেত্রিশকোটি দেবতাই যেন ঠাঁই নিয়েছেন এই পাতাললোকে। কত যুগ-যুগান্ত ধরে চুনাপাথরের গুহায় জল চুইয়ে চুইয়ে বালি, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হওয়া এক একটি অপার ঐশ্বর্যের স্থাপত্য গড়ে উঠেছে প্রকৃতির আপন খেয়ালে।
ভূ-রাসায়নিক স্ট্যালাগমাইট আর স্ট্যালাগমাইটের মধ্যে মিশে গেছে পৌরাণিক গল্পগাথা। গণেশের মাথা কাটা যাওয়ার কাহিনি, সমুদ্রমন্থনের কাহিনি, পবননন্দনের পাতাল অভিযানের কাহিনি। গুহায় ঢুকেই দেখতে পাবেন মহা জটাজুটধারী মহাদেবের মূর্তি প্রায় ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। তারই নীচে অসংখ্য শিবলিঙ্গ। ওপর থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে দুধ। সে কোন অনন্তকাল থেকেই এই প্রক্রিয়া হয়ে চলছে। গুহার ভেতরে চারিদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা অসংখ্য পৌরাণিক মূর্তি দেখতে পাবেন। যা প্রকৃতির আপন খেয়ালেই সৃষ্টি হয়েছে। তবে গুহার নীচে অক্সিজেনের অভাব থাকে। তাই বেশিক্ষণ থাকলে শ্বাসকষ্ট হবে। তাই চক্ষু সার্থক করে একইপথে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে আসুন। শান্ত ও স্নিগ্ধ হিমালয়ের অনুভূতি পেতে হলে একরাত থাকতেই পারেন পাতাল ভুবনেশ্বরে। এখান থেকেও পঞ্চচুল্লি শিখরের দর্শন মেলে।
অতীতের কোনো এক সময়, এই বাংলার কোনো এক গাঙ্গুলিমশাই এই অঞ্চলে এসে হাট স্থাপন করেন, তিনি একটি কালীমন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এখানে। গাঙ্গুলিমহাশয়ের নাম অনুযায়ী, এলাকার নাম হয় গঙ্গোলিহাট। আবার স্থানীয় লোকগাথা অনুযায়ী, সরযু ও রামগঙ্গা এই এলাকায় মালার মতো শোভা পায়। স্থানীয় ভাষায় এই দুই নদী ‘আওয়ালি’ মানে ‘মালা’ র মতো শোভা পায় বলে এই এলাকার নাম হয়েছে গঙ্গোলিহাট। গঙ্গা এবং আওয়ালি মিলে ‘গাঙ্গোলি’। আর ঘাট মানে বাজার।
শহরের কেন্দ্রেই ‘হাটকালি’ মাতার মন্দির। এই শহরের আশেপাশেই রয়েছে বেশ কয়েকটি গুহামন্দির। যেমন, শৈলেশ্বর, মুক্তেশ্বর, ভোলেশ্বর এবং পাতালভুবনেশ্বর।
