যমরাজ আর চিত্রগুপ্তের দেখা মেলে যেখানে
হিমাচলের রহস্য খুঁজতে খুঁজতে এবার একটু অন্য ধরনের একটা মন্দিরে যাওয়া যাক। যমরাজ আর চিত্রগুপ্তের মন্দির। শুনে একটু আশ্চর্য হলেন। যমরাজ তো মৃত্যুর দেবতা তা আপনি বেঁচে থাকতে খামোখা যমরাজের মন্দিরে যাবেন কেন? আর চিত্রগুপ্ত যিনি আপনার পাপ-পুণ্যের হিসেব রাখেন তার কাছেই বা আপনি সশরীরে হিসেব দিতে যাবেন কেন? তাই তো! আপনি কেন যমরাজের মন্দির যাবেন! চলুন দেখে নেওয়া যাক এই মন্দির ঘিরে কী রহস্য অপেক্ষা করছে।
দিল্লি থেকে প্রায় (00 কিলোমিটার দূরে হিমাচলপ্রদেশের চম্বা জেলায় ভারমোর এলাকায় রয়েছে যমরাজের মন্দির। ভারমোর এলাকার এই প্রাচীন মন্দিরটি ভারতের একমাত্র যমরাজের মন্দির। ধর্মেশ্বর মহাদেব মন্দির নামেই এটি পরিচিত। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে যমরাজ হলেন মৃত্যুর দেবতা। মন্দির সংলগ্ন মানুষজনের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর এই মন্দিরেই মৃত ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় যমরাজের। সিমলা থেকেই ভারমোর যাওয়া ভালো। দূরত্ব কমবেশি প্রায় ১০ ঘণ্টা। যাত্রাপথের পুরোটাই পড়বে জাতীয় সড়ক ও কাংড়া লিঙ্ক রোড। নিকটবর্তী বিমানবন্দর গাগাল। এটি ভারমোর থেকে ১৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গাগাল থেকে বাস
বা যে কোনো গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যায় ভারমোর। নিকটবর্তী স্টেশন পাঠানকোট ক্যান্টনমেন্ট। এটিও ভারমোর থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে। পাঠানকোট স্টেশন থেকে বাসে বা যে কোনো গাড়িতে যেতে হবে ভারমোর। ভারমোর ছবির মতো সুন্দর এলাকা। হিমাচলপ্রদেশের কাংড়া উপত্যকার অন্যতম আকর্ষণ এই ভারমোর।
হিন্দু পুরাণ মতে মৃত্যুর দেবতা হলেন যমরাজ বা লোকপাল। শাস্ত্রে কথিত হয়েছে, যমরাজই ছিলেন প্রথম মানুষ, যিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাঁর এই প্রথমতার কথা মাথায় রেখে শিব তাঁকে মৃত্যুর অধিপতি পদে অধিষ্ঠিত করেন। মৃত্যুর পরে স্বয়ং যম, অথবা যমদূতেরা এসে পরলোকে নিয়ে যান মৃত ব্যক্তির আত্মাকে।
জীবদ্দশায় সেই ব্যক্তির কৃতকর্মের ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুর পরে তার স্থান স্বর্গে হবে নাকি নরকে হবে তা স্থির করেন যমরাজ। শাস্ত্রে কথিত হয়েছে, মৃত্যুর আগেই যমরাজ কোনো মানুষকে চারটি চিঠি পাঠান, যেগুলিতে নিহিত থাকে তার আসন্ন মৃত্যুর লক্ষণ।
এই বিশ্বাসের মূলে রয়েছে পুরাণে উল্লিখিত ‘যম-অমৃতে’র কাহিনি।
যমুনা তীরবর্তী একটি গ্রামে থাকতেন অমৃত নামের এক ঈশ্বরভক্ত মানুষ। তিনি ছিলেন মৃত্যুভয়ে ভীত। তার পরিকল্পনা ছিল, যাকে খুশি করে তিনি অমর হয়ে যাবেন। যমকে সন্তুষ্ট করার জন্য কঠোর তপস্যা শুরু করেন তিনি। যম তাঁর তপস্যায় খুশি হয়ে একদিন দেখা দিলেন অমৃতকে।
যম বললেন, “শোনো, জীবদ্দশায় আমার দেখা কেউ পায় না। তুমি পেয়েছ। বলো, কী চাও ?”
অমৃত বললেন, “ঠাকুর, আমি অমর হতে চাই।” যা বললেন, “মৃত্যু থেকে কারও মুক্তি নেই। যে জন্মেছে তাকে মরতে হবেই। তবে তোমার ইচ্ছার কথা মাথায় রেখে আমি তোমাকে একটি প্রতিশ্রুতি দিলাম। তোমার মৃত্যু যে আসন্ন তা বোঝাতে তোমাকে চারটি চিঠি আমি পাঠাব। সেই চিঠিগুলি পাওয়ার পর তুমি নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করো।”
অমৃত নিশ্চিন্ত হয়ে ধর্মকর্ম সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে বিলাসব্যসনে মত্ত জীবনযাপন শুরু করল। তার কোনো চিন্তাই রইল না মৃত্যু নিয়ে। সে এই ভেবে নিশ্চিন্ত রইল যে, মৃত্যুর আগাম ইঙ্গিত যমরাজের কাছ থেকে সে নিশ্চয়ই পাবে। এদিকে তার বয়স বাড়তে থাকল। একসময় তার মাথার চুল পেকে গেল। আরও পরে দাঁত পড়ে গেল। তারপর চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে শুরু করল। একসময় বয়সের ভারে একেবারে নিশ্চল হয়ে গেল সে। তখনও তাঁর কাছে যমরাজের চিঠি এসে পৌঁছোল না। অমৃত নিশ্চিন্ত হয়ে দিনযাপন করতে লাগল। সে নিজেকে অমর ভাবতে শুরু করল।
একদিন রাত্রে হঠাৎ যমদূত এসে হাজির অমৃতের সামনে। অমৃত বুঝল, তাঁর মৃত্যুর সময় হয়ে গেছে। যমদূতের সঙ্গে সে চলল পরলোকে। মনে তখন যমরাজের প্রতি একরাশ ক্ষোভ তাঁর। যমরাজ তাঁকে কথা দিয়েছিলেন, মৃত্যুর আগে চারটি চিঠি পাঠাবেন তাঁকে, কিন্তু শেষপর্যন্ত একটি চিঠিও পাঠাননি। যমরাজের সামনে উপনীত হওয়ার পর অমৃত একরাশ ক্ষোভ নিয়ে যমরাজকে বললেন- “আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন, মৃত্যুর আগে চারটে চিঠি পাঠাবেন। কিন্তু আপনি তা করেননি। কথা রাখেননি আপনি।” ফারাজ হেসে বললেন, “তুমি কি ভেবেছিলে, আমি কাগজের উপরে নিজে হাতে চিঠি লিখে তোমাকে পাঠাব? মূর্খ তুমি। শোনো, তোমার শরীরই ছিল আমার কাগজ, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তোমার শারীরিক পরিবর্তনগুলো ছিল আমার কলম, আর সময় ছিল আমার বার্তাবাহক। আমি তোমাকে আমার কথামতো চারটি চিঠিই পাঠিয়েছিলাম। তোমার চুল পেকে যাওয়ার ঘটনা ছিল আমার প্রথম চিঠি, তোমার দাঁত পড়ে যাওয়ার ঘটনা আমার দ্বিতীয় চিঠি, যখন তোমার দৃষ্টিশক্তি কমে আসা শুরু হল তখন তুমি পেলে আমার তৃতীয় চিঠি, আর চতুর্থ চিঠিটি তুমি পেয়েছিলে যখন তুমি পঙ্গু হয়ে গেলে। কিন্তু তোমার দুর্ভাগ্য, তুমি আমার পাঠানো একটি চিঠিরও পাঠোদ্ধার করতে পারোনি।”
হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, মৃত্যুর আগে যে কোনো মানুষই এই চারটি চিঠি পেয়ে থাকেন। এবং প্রথম চিঠিটি পাওয়ার পর থেকেই নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে। মানবদেহের বয়সোচিত ক্ষয়ই তার মৃত্যুর পূর্বাভাস।
ভারমোর এলাকার প্রাচীন মন্দিরটি ভারতের মাটিতে যমরাজের একমাত্র মন্দির। মন্দিরের নাম ধমেশ্বর মহাদেব মন্দির। মন্দিরের আশেপাশের মানুষজনের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর এই মন্দিরেই নাকি মৃত ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় যমরাজের। এখানে বসেই তাদের বিচার করেন যমরাজ। কারণ স্থানীয় মানুষজন মনে করেন, স্বয়ং যম এই মন্দিরেই বাস করেন। একা যম নন, এই মন্দিরের একটি আলাদা ঘরে বসে থাকেন চিত্রগুপ্তও। তাঁর কাজ হল, জীবদ্দশায় মানুষের পাপপুণ্যের হিসাব রাখা। মন্দিরটি নাকি পাহারা দেয় দুটি চার চোখওয়ালা কুকুর, যারা আদপে যমরাজেরই পোষ্য।
মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা কাহিনি। বলা হয়, মন্দিরের ভেতর নাকি একটি শূন্য প্রকোষ্ঠ রয়েছে। সেখানে নাকি স্বয়ং যমরাজের শাসন চলে। এই প্রকোষ্ঠে একবার কেউ প্রবেশ করলে সে আর জীবিতাবস্থায় বেরিয়ে আসে না। ইতিপূর্বে কেউ কেউ নাকি সাহস করে এখানে ঢুকেছিলেন, পরের দিন তাঁদের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল।
এইসব কাহিনির ব্যাখ্য নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি খোঁজা বৃথা, কারণ ভারতের অনেক মন্দিরে অনেক অলৌকিক কার্যকলাপ হয়, যার ব্যাখ্যা হয় না। তা বলাই বাহুল্য। ভক্তের বিশ্বাস আর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এক্ষেত্রে এক জায়গায় মেলে না। কিন্তু বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে যমরাজের এই মন্দির বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ভক্তদের কাছে। প্রাচীন এই মন্দির তার আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য এবং গঠনগত সৌন্দর্যের কারণে পর্যটকদের কাছেও বিশেষ প্রিয় হয়ে উঠেছে।
যমরাজের এই ঘরের চারদিকে রয়েছে চারটি অদৃশ্য দরজা। সোনা, রুপো, তামা আর লোহায় তৈরি। যমরাজ ফয়সালা শোনানোর পরে যমদূত এসে কর্মফল অনুযায়ী এই চারটি দরজার একটি দিয়ে আত্মাকে স্বর্গ বা নরকে নিয়ে যায়। গরুড়পুরাণেও অবশ্য যমরাজের দরবারের চারদিকে এমনই চারটি দরজার কথা উল্লেখ আছে।
