‘বারণাবত’ মৃতদের বাঁচিয়ে তোলার অলৌকিক গ্রাম
রাজকুমারী ঈশ্বরা চন্দ্রগুপ্তের মৃতদেহ নিয়ে এলেন বারণাবতে এই বিশ্বাসে যে চন্দ্রগুপ্ত বেঁচে উঠবেন কারণ এখানকার শিব মন্দিরে এমন কিছু অলৌকিক পাথর আছে, যাতে মৃতদেহকে রেখে বিশেষ পুজো করলে প্রাণ সঞ্চার হয় মৃতদেহে। চন্দ্রগুপ্তের প্রাণ বেঁচেছিল কিনা তা জানা যায় না কিন্তু তাঁকে নিয়ে যে তাঁর স্ত্রীবারণাবত এসেছিলেন তার প্রমান মেলে এখানকার একটি শিলালিপি থেকে। উত্তরাখণ্ডের বারণাবত এক অদ্ভুত অলৌকিক রহস্যেঘেরা স্থান যার অনেক কার্যকলাপের ব্যাখ্যা আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদীরা দিতে পারেন না। হিমালয়ের এক অন্যতম অলৌকিক রহস্যেঘেরা অঞ্চল এই বারণাবত। উত্তরাখণ্ডের এই সফরে একই সঙ্গে সঙ্গী হতে পারে পর্বত, প্রকৃতি এবং পুরাণ।
আসলে উত্তরাখণ্ড জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে নানা কিংবদন্তি আর লৌকিক বিশ্বাসের গল্প। আর এর টানেই আমরা বারে বারে ছুটে যাই হিমালয়ের গড়োবালে। আধ্যাত্মিকতা আর অ্যাডভেঞ্চারের টানে।
কত পৌরাণিক আখ্যান যে জড়িয়ে আছে উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীর এই পর্বতচূড়ায় তা বলে শেষ করা যাবে না। কথিত আছে, এখানে বসেই ব্যাসদেব রচনা করেছিলেন আঠারোটি পুরাণ। স্কন্দপুরাণে এই পর্বতের শিখরকে ‘বারণাবত’ বলা হয়েছে।
মহাভারত বলছে, এখানেই হয়েছিল জতুগৃহ কাণ্ড। বিদুরের বুদ্ধির জোরে পাণ্ডবরা এখান থেকেই বেঁচে ফিরেছিলেন। পাণ্ডবদের নদীতে পৌঁছে দেওয়া সেই সুড়ঙ্গের একটা অংশ আজও জীবিত। স্থানীয় গাড়োয়ালিরা যাকে ‘মহাতপা বিল’ বলে পুজো করে। বিশ্বাস করে, আজও ঋষি মহাতপা সূক্ষ্ম দেহে লীন হয়ে আছেন বিলের জলে। ধর্মভীরু হাজার হাজার পাহাড়ি আজও শিখরের শিবমন্দিরে পুজো দিতে আসেন। শিবঠাকুরের এমন দুর্গম দেশে যেতে হলে আপনাকে বেশ শক্তসামর্থ্য হতে হবে। কয়েক কিলোমিটার ‘ট্রেক’ করে এই পাহাড়প্রেমিকরা পৌঁছে যান বারণাবতের শিখরধামে।
হরিদ্বার থেকে যাত্রা শুরু করুন ধনৌলটি থেকে বা সরাসরি হৃষীকেশ হয়ে তেহরি, দোবাটা হয়ে পৌঁছে যান প্রায় ৪,০০০ ফুট উচ্চতার উত্তরকাশী। উত্তরকাশীর প্রাচীন নাম বারণাবত। অনেকের মতে এখানেই নাকি মহাভারতের জতুগৃহ তৈরি হয়েছিল। গঙ্গা ছাড়াও এই শহরের দু’পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বরুণা ও অসি নদী। এখানকার বিশ্বনাথ মন্দির অবশ্যই দ্রষ্টব্য। বিশ্বাস, কিরাতরূপী শিবের সঙ্গে অর্জুনের যুদ্ধ হয়েছিল এখানে।
জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি পথে হাঁটতে মন্দ লাগবে না। মুসৌরির কিছু পর থেকেই যমুনা আপনার সঙ্গে সঙ্গে চলবে। কিছুটা চলার পরেই পাহাড়ের কোলে অপরূপ জনপদ। নাম, লাখামণ্ডল। যার আর এক নাম মোরাগ্রাম। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনা নদী। এই পথে আর একটু গেলেই যমুনোত্রী। যমুনা নদীর উৎস।
বিশালাকার মোরা শিবমন্দির চত্বরে গিয়ে থামুন। শোনা যায় একসময় এখানে অনেক মন্দির ছিল। যার অনেকগুলিই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই এলাকার মাটি খনন করে মহাভারতীয় যুগের অনেক নিদর্শন পাওয়া গেছে।
লাখামণ্ডলের প্রাচীন নাম মোরা। কারণ চন্দ্রগুপ্তের মা’র নাম ছিল মুরা। আর চন্দ্রগুপ্ত তার মায়ের নামেই নিজ রাজবংশের নামকরণ করেন চাণক্যের নির্দেশে। আর সেই সূত্রেই তাঁর রাজবংশের নাম হয় মৌর্য্য। আর মুরার নামে এই মন্দিরের নাম হয় মোরা বা মুরা শিবমন্দির।
বিশাল পরিসর জুড়ে মোরা শিবমন্দির। মন্দিরের বেদিতে বৃহদাকারের শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গের সামনে দু’টি মূর্তি। যার একটি মানব ও আর অন্যটি দানব। স্থানীয় বাসিন্দারা আজও মনে করেন, মৃত্যুর পরে মানুষের মৃতদেহকে এই মন্দিরে এনে রাখা হত, মানব ও দানবমূর্তির মধ্যে থাকা একটি বিশেষ শিলার ওপরে। মন্দিরের পূজারি পুজো করার পরে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মৃত শরীরে প্রাণসঞ্চার হত।
মন্দিরের পূজারির থেকে জানা যায় অনেক অজানা ইতিহাস। পূজারি বললেন, “উত্তরাখণ্ডের বারণাবত অতিপ্রাচীন জনপদ। এই এলাকার মোরা গ্রামে মৃত মানুষ পুনর্জীবন লাভ করে এই আশায় বহু মানুষ আসেন এখানে। সিংহপুরা প্রদেশের রাজকুমারী ঈশ্বরা রাজকুমার চন্দ্রগুপ্তের মৃতদেহ নিয়ে এসেছিলেন এখানে। রাজকুমারের দেহে নতুন প্রাণসঞ্চার হয়েছিল কি না, তা আমাদের কারও জানা নেই কিন্তু গ্রামের একটি শিলালিপি থেকে এবিষয়ে জানা যায়। আর রাজকুমারী তাঁর স্বামীর কল্যাণের উদ্দেশ্যে মোরা গ্রামে স্থাপন করেছিলেন একটি শিবমন্দির। যা আজও একইভাবে রয়েছে। এই অঞ্চলে জাকজমকপূর্ণভাবে শিরবন্দনার শুরু। সেই তখন থেকেই।”
পাহাড়ি রাস্তার কিছুটা পথ হাঁটার পরে দেখতে পাবেন একটি বিশালাকার গহ্বর। শোনা যায় জতুগৃহ থেকে প্রাণ বাঁচাতে এই সুড়ঙ্গ পথই ধরেছিলেন পঞ্চপাণ্ডব ও কুম্ভী। আর একই পথ ধরে মনে বিশ্বাস আর সাহস নিয়ে প্রবেশ করুন সুড়ঙ্গে। সুড়ঙ্গ বেশ গভীর। তাতে প্রচুর বাঁক। খুব বেশি দূর অবধি যাওয়া যায় না। তবে এখানকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এখানকার কাঠের বাড়ির গুলির নির্মাণকৌশল চোখ টানে। অপূর্ব সব কাঠের কাজ। কেউ কেউ বলেন এখানকার কাঠখোদাই শিল্পের কারিগররা মহাভারতীয় যুগের। আজও বারণাবতে পাণ্ডবদের জন্য রাজপ্রাসাদ বানানো কারিগরদের বংশধরেরা জীবিত আছেন।
মন্দিরচত্বর ছাড়িয়ে একটু এগোতেই গ্রানাইট পাথরের একটি শিবলিঙ্গ দেখতে পাবেন। গাইডের কথা মতো শিবলিঙ্গে জল ঢালতে বিশেষ বিশেষ দিনে বেশ ভিড় হয়। এই শিবলিঙ্গের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে এক অলৌকিক কাহিনি। একশো বছর আগের কথা, কোনো এক ব্যক্তি বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে মাটি খুঁড়ে পান এই শিবলিঙ্গের। এক সাধু পরে একে প্রতিষ্ঠা করেন। অনেক সাধুর মতে এই শিবলিঙ্গ নাকি জ্ঞানগঞ্জের অলৌকিক শিবলিঙ্গ।
মোরা তিনরাত কাটাবেন। কথায় আছে, বারণাবতে তিন রাত কাটানো পূণ্যের কাজ। পাপের থেকে মুক্তি এবং দশ অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়। বারণাবতে তিনটে দিন কাটিয়ে চলুন যমুনোত্রী। তবে চাইলে অন্য পথে হরসিল হয়ে গঙ্গোত্রী ও গোমুখও ঘুরে নিতে পারেন। তারপর বারণাবত থেকে মুসৌরি, ধনৌলটি ঘুরে নিন। সেখান থেকে দেরাদুন কিংবা হরিদ্বার হয়ে ফিরে চলুন। উত্তরকাশী থেকে ট্রেকিং পথে নচিকেতা তাল ও ডোডি তাল যেতে পারেন। এখান থেকে গঙ্গোত্রীর দূরত্ব প্রায় একশো কিমির কাছাকাছি। গঙ্গোত্রীর পথে কিছুদূর গেলেই পাবেন আপেল বাগান। হরসিলের প্রকৃতি আপনাকে মুগ্ধ করবে। হরসিলের উচ্চতা প্রায় ৮,৫০০ ফুট। পাইন গাছের সবুজে মোড়া এক শান্ত নির্জন জনপদ। এখান থেকে সাততাল লেকটি ঘুরে দেখুন। হরশিল থেকে অসংখ্য ঝর্না পার হয়ে পৌঁছে যান গঙ্গোত্রীতে। গঙ্গামায়ের মন্দিরে পুজো সারুন। অক্ষয় তৃতীয়া থেকে দীপাবলি পর্যন্ত খোলা থাকে এই মন্দির। সন্ধ্যারতি দেখবেন। গঙ্গোত্রী থেকে গোমুখের পথে যেতে পারেন। কঠিন চড়াই উতরাই পথ ধরে গঙ্গার উৎস দর্শন করে নিন। উত্তরকাশী থেকে হনুমানচটি আসতে পারেন। বাস না পেলে আর একটু এগিয়ে ধারাসু বা বারকোট থেকেও হনুমানচটি আসতে পারেন। এখান থেকে হেঁটে, ঘোড়ায় বা ডান্ডিতে যমুনোত্রী ঘুরে নিন।
উত্তরকাশী এক বিচিত্র অনুভূতির জায়গা। যেখানে পুরাণ, ইতিহাস, বাস্তব, সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এখানেই আছে অপ্সরা পর্বত বা পরী পর্বত। পরী-রাজ্য বলেও এর পরিচিতি আছে। এর প্রাচীন নাম মন্দার পর্বত। এখানে নাকি এখনও স্বর্গের অপ্সরারা নেমে আসেন বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। এই অঞ্চলকে ঘিরে রয়েছে কেদার, বদ্রী গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী। এই চারধামের মাঝে মাথা তুলেছে ব্যাস পর্বত। এর গুরুত্ব তাই বুঝতেই পারছেন। এক অলৌকিক শক্তি এই অঞ্চলে কাজ করছে সবসময়।
কত পৌরাণিক আখ্যান যে জড়িয়ে রয়েছে উত্তরকাশীর এই পর্বতচূড়ায় তা
বলে শেষ করা যাবে না। কথিত আছে, এখানে বসেই ব্যাসদেব রচনা করেছিলেন আঠারোটি পুরাণ। যুগে যুগে প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝাপটা সামলে এখনও সেই ব্যাসগুফার কিছু অংশ বেঁচে আছে। গুফা থেকে নীচের দিকে ঝুঁকলে চোখে পড়বে মহাভারতের সেই দগ্ধ জতুগৃহের অংশ।
মহাভারতের ‘জতুগৃহদাহ’। একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক এই অংশটুকু। পাণ্ডু ও মাদ্রীর মৃত্যুর পর কুন্তী তার পাঁচ সন্তানকে নিয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে আসেন। পাশুর ও কৌরবরা দ্রোণাচার্যের কাছে তাদের শিক্ষা সম্পন্ন করে। গুরু দ্রোণ শিষ্যদের কাছে গুরুদক্ষিণা হিসেবে তার প্রতারক বন্ধু পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে পরাজিত করতে বলেন। রাজকুমারদের সঙ্গে যুদ্ধে দ্রুপদ পরাজিত হলে দ্রুপদ দ্রোণকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এই সময় কর্ণ কৌরবদের পরম মিত্রে পরিণত হয়। এদিকে সর্বজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির যুবরাজ পদে অভিষিক্ত হলে কৌরবরা ঈর্ষান্বিত হয়, এমনকি ‘পুত্রস্নেহে অন্ধ’ ধৃতরাষ্ট্রও দুর্যোধনকে রাজা হিসেবে দেখতে চান।
কৌরবরা তাদের মাতুল শকুনির সঙ্গে পরামর্শ করে ও পাণ্ডবদের গোপনে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। শকুনির নির্দেশে স্থপতি পুরোচন বারণাবত নামক স্থানে বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ দিয়ে ‘জতুগৃহ’ নামে এক সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণ করে ও সেখানে পাণ্ডব ও কুম্ভীকে ছুটি কাটাবার পরামর্শ দেয়। বিদুর শকুনির ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে পাণ্ডবদের সাবধান করে দেয় ও পালিয়ে যেতে বলেন। এদিকে জতুগৃহে আগুন লাগলে পাণ্ডবরা একটি সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে যান ও হস্তিনাপুরে রটে যায় আগুনে পুড়ে পাণ্ডবদের মৃত্যু হয়েছে। পাণ্ডবদের মারতে গিয়ে পুড়ে মারা যায় কৌরবদের ভৃত্য পুরন্দর। কৌরবদের চোখে ধুলো দিয়ে বিদুরের তৈরি যে সুড়ঙ্গপথে পাণ্ডবরা পালিয়ে গিয়েছিল তার শ’আটেক মিটার এখনও বর্তমান আছে বারণাবতে। বিশ্বাসীরা তাই বলে থাকেন।
মহাভারতের বারণাবত বা উত্তরকাশী শহরের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট উঁচুতে শিখর ধাম। সমুদ্রপৃষ্ঠের হিসাব ধরলে উচ্চতা দাঁড়ার সাড়ে আট হাজার ফুট। ব্যাসপর্বতে আছে কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন ব্যাসগুফা। শিখরধামের ৯০০ মিটার দূরে ব্যাস পর্বত। এই শিখরধামেই হনুমান মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কুষাণ যুগের স্বর্ণমুদ্রা পেয়েছিল গাড়োয়ালিরা। পুরাণ মতে, এখানেই পাণ্ডবমাতা কুন্তী শিবের দেখা পেয়েছিলেন। সেই শিবমন্দির আজও দেখা যায়। মহাভারতের বারণাবত পর্ব তো বটেই, অনেক পুরাণেই উল্লেখ রয়েছে এই শিবমন্দির, ব্যাসপর্বতের। ব্যাস পর্বতের কাছে মন্দার পর্বত। পুরাণ মানলে, সমুদ্রমন্থনের সময় এই পর্বতকেই ‘ডালের কাটা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
স্কন্দপুরাণের কেদারখণ্ডে জ্বলজ্বল করছে শিখর বারণাবত। যার একদিকে যমুনোত্রী, ভাগীরথী পিক ১, পিক ২, নীলপর্বত। অন্যদিকে, সমুদ্রমন্থনের সেই মন্দার পর্বত! শিখর পর্বতের পাশেই ব্যাসপর্বত, ব্যাসগুহা, ব্যাসকুণ্ড। বাঘ- ভল্লুকের অভয়ারণ্য।
এখানে বসেই পাণ্ডবমাতা কুন্তী শিবের তপস্যা করেছিলেন। কুন্তীর মনোকামনা পূরণ হয়েছিল। মহাদেব এখানে তাই মনোকামেশ্বর রূপে পূজিত। পুরাণের পাতা উলটে সেই উত্তরকাশীর শিখর বারণাবত। এখনও এখানকার মানুষ অনুভব করেন জতুগৃহের সেই লেলিহান আগুন। গলে যাওয়া লাভার চিহ্ন এখনও দেখা যায় পাহাড়ের গায়ে।
