যে গ্রামে আজও লুকিয়ে হয় নরবলি
যে গ্রামে আজও লুকিয়ে নরবলি হয়
আমরা এবার যাব সিমলা থেকে সামান্য দূরের একটি গ্রামে। গ্রামটির নাম ধামী গ্রাম। এই গ্রামে কার্তিক মাসে কালীপুজোর দিনে একে অপরকে লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ার এক অদ্ভুত উৎসব হয়। যে উৎসবের নাম পাথর ছোড়া উৎসব বা ‘Stone Throwing Festival’
আপনি শুনে হয়তো একটু অবাক হচ্ছেন। পাথর ছোড়া হচ্ছে। রক্তপাত হচ্ছে। লোকজন আহত হচ্ছে। কিন্তু তাতে লোকজনের কোনো হেলদোল নেই। কারণ হিমালয়ের কোল ঘেঁষা গ্রামটিতে এটাই নাকি দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। এটাই প্রাচীন রীতি। আর শতাব্দীপ্রাচীন এই পাথর ছোঁড়া উৎসবের ব্যতিক্রম হয় না কোনো বছরই।
চলুন এবার যাওয়া যাক হিমাচল প্রদেশের ধামী গ্রামে। যেখনে বছরে একবার হই হই করে সাধারণ মানুষজন মেতে ওঠেপাথর ছোড়া উৎসবে। প্রতিবছর এই পাথর ছোড়া উৎসবের মধ্য দিয়েই জমে ওঠে হিমাচলের কালী পুজো।
সিমলা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে ধামী গ্রাম। গাড়ি ভাড়া করে গেলেই সুবিধা। এই ‘পাথর ছোঁড়া উৎসব’ গ্রামের অতি পুরোনো প্রথা। আর তা নিয়ে নানান মিথ ও গল্প জড়িয়ে আছে।
কালী মন্দিরের পূজারি জানালেন গ্রামের কালী পুজোর বিশেষ রীতিও নাকি এই পাথর ছোড়া উৎসব, আর যদি এই উৎসব না হয় তো দেবী রুষ্ট হন। দেবীর প্রকোপ থেকে তখন বাঁচা বেশ মুশকিল হয়ে পড়ে। তাই গ্রামের প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও এই উৎসবে যোগ দেন ও আনন্দে মেতে ওঠেন। প্রথম প্রথম অনেকেই অন্য চোখে দেখেন পরে তাতে অভ্যস্ত হয়ে যান।
উৎসবের দিন কালীমাতার ভক্তরা দু’দলে ভাগ হয়ে যান। তারপর একে অপরকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকেন। এই পাথর ছোড়া কিন্তু হয় একেবারে সিরিয়াসভাবে। আর একে অন্যকে আঘাত দেওয়ার জন্যই ছোড়া হয়। আর এর কেউ একজন যখনই এই পাথরের ঘায়ে আহত হয়ে যান ও তার রক্তপাত শুরু হয় তখনই অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেন ভক্তরা।
আহত ভক্তের রক্ত দিয়েই তিলক এঁকে দেওয়া হবে দেবীমূর্তিতে। তারপর শুরু হয় বিশেষ পুজো। উৎসবের দিন প্রায় ১০ থেকে ২০ মিনিট ধরে চলে এই পাথর ছোড়াছুড়ি। কারও আহত হয়ে রক্তপাতের খবর মিললেই পাথর ছোড়ায় ইতি টানা হয়। আর আহতদের ঢাক-ঢোল বাজিয়ে মহাসমারোহে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরে। আহতদের মধ্যে হয় প্রথম যিনি আহত হয়েছেন তাঁকে কিংবা সবচেয়ে বেশি যিনি জখম হয়েছেন সেই ব্যক্তিকে প্রথমে কালীমন্দিরে দেবীমা’র সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর কেটে যাওয়া অংশের রক্ত দিয়ে দেবীর ললাটে এঁকে দেওয়া হয় রক্ততিলক। তারপর শুরু হয় বিশেষ পুজো।
ওই ব্যক্তিকে পুজো চলাকালীন অনেক নিয়মের মধ্যে থাকতে হয়। দেবীর রক্তাভিষেকের জন্য অনেকেই নিজেকে প্রস্তুত রাখেন আহত হওয়ার জন্য। রক্তপাতের জন্য তৈরি থাকেন অনেকেই। তাই আগ্রহী ভক্তদেরকেই এই উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
গ্রামবাসীরা জানাচ্ছেন, এই প্রথা শুরু করেছিলেন গ্রামের রাজ পরিবারের সদস্যরা। এখনও রাজ পরিবারের বংশধররাই অংশ নেন এই উৎসবে। তাদের ঠিক করে দেওয়া দু’টি দল পরস্পরকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে। তবে দর্শকদের লক্ষ্য করেও অনেক সময় পাথর ছোড়া হয়। স্থানীয়রা তাই কেউ কেউ এই উৎসসবকে ‘পাথর কা মেলা’ বলে থাকেন।
স্থানীয় গবেষকের কথায়, পাঁচশো থেকে সাতশো বছরের পুরনো এই উৎসব। এখনও কোনো বিধি নিষেধ না মেনেই এই রীতি পালন করা হয়। স্থানীয় এই উৎসবের উদ্যোক্তা ছিলেন নাকি এই গ্রামেরই এক বাসিন্দা। এই গ্রামের মন্দিরে সেযুগে হত নরবলি। আর সে নরবলি বন্ধের জন্য একদিন এক ব্যাগ পাথর নিয়ে এসে পূজারিদের আক্রমণ করে। সবার মাথা ফেটে যায়। কেউ কেউ মারা যায়। মন্দির রক্তে ভেসে যায়। সেই থেকে যারা সেদিন মারা গেছিলেন তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে মন্দির চত্বরে আয়োজন করা হয় এই খেলার। আবার কেউ কেউ বলেন দেবীর নির্দেশেই ওই ব্যক্তি পূজারির মাথায় ঢিল ছুড়ে মারেন। বলি বন্ধ হল। নিষ্ঠুর বলি প্রথার বিকল্প হিসেবে প্রচলিতয়ে গেল এই পাথর ছোঁড়া উৎসব। মন্দির প্রাঙ্গণে বেশ জাঁকজমকেই পালিত হয় এই প্রথা। উৎসবকে ঘিরে ভিড়ও হয় দেখার মতো। কালীপুজোর দিন হিমাচলের পাথর কা মেলা’ দেখতে দর্শকদের ঢল নামে গ্রামে।
গ্রামের বর্ষীয়ান এক ব্যক্তি অবশ্য জানালেন এক অন্য গল্প। তাঁর মতে, এই উৎসবকে ঘিরে অনেক জনশ্রুতি আছে। তার মধ্যে যেটি সবচেয়ে প্রচলিত সেটি হল প্রায় পাঁচশো বছর আগে হিমাচলের ধামীতে কালীপুজোয় নরবলি দেওয়া হত। স্থানীয় রাজ পরিবারে নতুন রাজা তাতে আপত্তি জানায়। রাজার হস্তক্ষেপে নরবলি বন্ধ হয়ে যায়।
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রাজার কাছে জানতে চান তিনি কেন বলি বন্ধ করে দিতে চান। রাজা জানান, রানি মানুষ হত্যার বিপক্ষে। নরবলি কোনোভাবেই মানুষের হিতের জন্য হতে পারে না। এ অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও ঘৃণ্য প্রথা। আর এই প্রথা রাজা ও রানি কেউই পছন্দ করতেন না। তাই রাজা ও রানির উদ্যোগে বন্ধ হয়ে যায় নরবলি।
এদিকে সেবছর নরবলি বন্ধ হওয়ায় গ্রামে দেখা দিল অন্ন সংকট। গ্রামের পুরোহিতরা দলবেঁধে গেলেন রাজার কাছে। রাজাকে বোঝালেন ও বললেন, “রাজন নরবলি বন্ধ হয়েছে কিন্তু দেবীর অভিষেক তো রক্ত ছাড়া হবে না। আর দেবী রক্ত না পেলে তুষ্ট হবেন না। উলটে রুষ্ট হবেন। গ্রামে নেমে আসবে ঘোর বিপদ তখন কী হবে। দেবীকে যেভাবে হোক রক্ত তো দিতেই হবে। আর রক্ত দিয়ে দেবীকে পুজো করার যে সনাতন রীতি রয়েছে তার কী হবে?”
তখনই এক পুরোহিত পাথর ছুঁড়লেন মন্দিরের পুরোহিতের দিকে। পুরোহিতে মাথায় পাথর লাগলো। রক্ত কপাল থেকে গাল বেয়ে পড়তে শুরু করল। তারপর পুরোহিত ও রাজা মিলে দেবীর রক্তাভিষের বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে চালু করলেন পাথর ছোড়া উৎসব। ‘Stone Pelting’ বা পরস্পরের দিকে পাথর ছোঁড়ার রেওয়াজ। পাথরের আঘাতে কেউ না কেউ আহত হবেন আর তার রক্তেই হবে দেবীর পুজো।
আবার অন্য রকম মতও রয়েছে। শোনা যায়, হিমাচলের দু’টি গ্রাম হ্যালগ ও জ্যামগের দুই রাজ পরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থির হয়। কিন্তু, নানা কারণে সেই বিয়ে ভেঙে যায়। জ্যামগের রাজকুমারকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে গ্রামেরই কিছু বাসিন্দা। সেই দুঃখেই গায়ে আগুন দিয়ে আত্মঘাতী হন তাঁর বাগদত্তা হ্যালগের রাজকুমারী। তাঁকে ‘সতী’ মনে করেই দুই গ্রামের গ্রামবাসীরা একে অপরকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে সেই ঘটনার প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করেন। সেই থেকেই নাকি এই উৎসবের সূচনা।
স্থানীয় এক লোকগবেষক অবশ্য জানিয়েছেন এক মারাত্মক কথা। তাঁর কথায়, “হিমাচলের ধামীতে কালীপুজোয় নরবলি দেওয়া হত। রাজপরিবারের বংশধরদের মধ্যে বলি দেওয়া নিয়ে বিরোধ বাধে। রাজপরিবারের এক ছেলেকে বলি দেওয়া নিয়ে দুপরিবারে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। তারপর বন্ধ হয়। তবে আজও তন্ত্রমতে সেই প্রাচীন মন্দিরে নরবলি দেওয়া হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকলেও বিষয়টি সত্যি। বলির পরেই দেহটি পাহাড় থেকে বস্তাবন্দী করে খাদে ফেলে দেওয়া হয় কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পাথর ছোড়া উৎসবের রক্তের সঙ্গে নরবলির রক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।”
