‘সিমসা মাতা’ আজও স্বপ্ন দেন সন্তানহীনাদের
‘সিমসা মাতা’ আজও স্বপ্ন দেন সন্তানহীনাদের
হিমালয় জুড়ে অজস্র মিথ, অজস্র জানা অজানা গল্প ছড়িয়ে রয়েছে। সেরকমই এক মিথ জড়িয়ে আছে হিমাচলের সিমসা মাতার মন্দিরকে নিয়ে। যে মন্দিরে গেলে নাকি দৈব কৃপায় সন্তান লাভ করেন নিঃসন্তান মহিলারা। আর সেকারণে হিমাচলেরই নয় সারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে নিঃসন্তান মহিলারা এই মন্দিরে আসেন পুজো দিতে।
এখন প্রশ্ন এই মন্দিরে এসে পুজো দিলেই কি রাতারাতি সন্তান লাভ করেন কেউ? অবশ্যই না। কারণ সন্তান লাভের জন্য প্রার্থনা এবং সে সম্পর্কিত বেশ কিছু নিয়ম আছে এই মন্দিরে যেগুলি মেনে চললে কিংবা দেবীর ইঙ্গিত পেলে এই অসাধ্য সাধন হতে পারে।
এখন এই মন্দিরের বিচিত্র অলৌকিক কর্মকাণ্ড জানতে হলে আমাদের যেতে হবে হিমাচলের মাণ্ডি উপত্যকায়।
হিমাচল প্রদেশের মন্ডি জেলার অন্তর্গত লাড়াভাদোতে আছে সিমসা মাতার মন্দির। এই মন্দিরটি যেখানে অবস্থিত সেই জায়গার পরিবেশ অসাধারণ। হিমাচলই নয়, পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রাজ্য পঞ্জাব, হরিয়ানা এমনকি চণ্ডীগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে প্রচুর নিঃসন্তান মহিলা আসেন এই মন্দিরে পুজো দিতে। এই মন্দির সারা হিমাচল জুড়ে প্রসিদ্ধ সন্তানদাত্রী মন্দির হিসেবে। কারণ মানুষের বিশ্বাস, এই মন্দিরে শতরঞ্চি পেতে শুয়ে থাকলেই নাকি দেবীর কৃপায় সন্তান লাভ করেন নিঃসন্তান মহিলারা।
মন্দিরটি অত্যন্ত সাদামাঠা। কিন্তু সিমসা মাতার প্রভাব দেখতে হলে মন্দির দর্শনে যান বিশেষ বিশেষ তিথিতে। মন্দিরে তখন তিলধারণের জায়গা থাকে না।
সত্যিই কি এই মন্দিরে গেলে সন্তানহীন নারীরা সন্তান লাভ করেন ? আর কীভাবে কার্যকর হয় এই দেবীর কৃপা? যে-কোনো সন্তানহীন মহিলা গিয়ে মানত করলেই কি তার সন্তান হয়? এমন হাজারো প্রশ্নের রহস্য লুকিয়ে আছে এই মন্দিরের অভ্যন্তরে।
নবরাত্রির সময়ে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে পালিত হয় বিশেষ উৎসব। এলাকায় উৎসবটি পরিচিত ‘সলিন্দরা’ উৎসব নামে। স্থানীয় ভাষায় ‘সলিন্দরা’ শব্দের অর্থ স্বপ্ন পাওয়া। এই উৎসবের সময়েই নিঃসন্তান দম্পতিরা আসেন এই মন্দিরে।
মন্দিরের কিছু বিশেষ রীতি রেওয়াজ সম্বন্ধে এবার জেনে নেওয়া যাক। সলিন্দরা’ উৎসব চলাকালীন মন্দিরে শুধুমাত্র সন্তানাকাঙ্ক্ষী মহিলারা প্রবেশ করেন। ন্দিরে পুরুষ প্রবেশ তখন পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। সন্তানাকাঙ্ক্ষী মহিলাদের প্রত্যেককে একটি করে শতরঞ্চি দেওয়া হয়। তারপর তাদের মন্দির চত্বরে শতরঞ্চি পেতে শুয়ে থাকতে বলা হয়। পুজো শেষে দিনরাত। তারা সেখানে শুয়ে থাকেন।
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত তাদের জানান, দু’-এক রাত্রি শুয়ে থাকার পরেই দেবী মহিলাদের স্বপ্ন দেবেন। তাদের দেবীর স্বপ্নাদেশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। মহিলারা অপেক্ষা করতে থাকেন। অবশেষে স্বপ্নের মাধ্যমে দেবী সিমসা মাতা তাদের আশীর্বাদ করেন। সিমসা মাতার আশীর্বাদ পেয়ে তারা বাড়ি ফিরে যান। আর বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরে স্বপ্নপ্রাপ্ত মহিলাদের গর্ভসঞ্চার হয়।
এ বড়োই আশ্চর্যের। আর এর কোথাও কোনো ব্যাখ্যা নেই। অনেক বিজ্ঞানী, গবেষক থেকে সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা বিভিন্নভাবে এই মন্দিরকে চুলচেরা নিরীক্ষণ করেছেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় কেউই কিছু জানাতে পারেননি। কারও কাছে এবিষয়ে কোনো সদুত্তর নেই।
অবশ্য এই মন্দিরে শুলেই যে দেবীর আশীর্বাদসূচক স্বপ্নদর্শন সম্ভব হবে, তা কিন্তু একেবারেই নয়। এমনকি স্বপ্ন দেখলেই যে সন্তানলাভ হবে, এমনটাও নয় ।
বলা হয়, দেবী যে স্বপ্ন দেন, তা হয় প্রতীকী ইঙ্গিতবাহী। সেই প্রতীকের অর্থোদ্ধার করতে পারলেই জানা সম্ভব, কোনো মহিলা সন্তান লাভ করবেন কিনা। এমনকি আসন্ন সন্তানটি ছেলে হবে নাকি মেয়ে- তাও নাকি জেনে ফেলা সম্ভব।
কী রকম সেই ইঙ্গিত? বলা হয়, কোনো মহিলা যদি স্বপ্নে আম দেখেন, তা হলে তার পুত্রসন্তান হবে। আবার কোনো মহিলা যদি স্বপ্নে দেখেন ঢ্যাঁড়শ, তা হলে তিনি কন্যাসন্তানের জননী হবেন। আর যদি স্বপ্নে কোনো পাথর, ধাতু বা কাঠের টুকরো কিংবা এই সমস্ত উপাদানে তৈরি কোনো জিনিসের দর্শন মেলে, তা হলে সেই মহিলাকে সারা জীবন নিঃসন্তানই থাকতে হবে। তাঁর সন্তান হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই বিষয়গুলির কিন্তু কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই কিন্তু যাদের সন্তান হয়েছে তাঁদের সন্তান কীভাবে সন্তান হল তার কোনো উত্তর কিংবা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কারও কাছেই নেই।
তবে এই নিঃসন্তানদের সন্তান হওয়ায় আলোচনা বা সমালচনার শেষ নেই, তা বলাই বাহুল্য। ভক্তেরা ব্যাখ্যার ধার ধারেন না। তাদের বিশ্বাসই একমাত্র সম্বল। নবরাত্রিতে গেলে আপনি মন্দির চত্বরে যেমন দেখতে পাবেন পাঞ্জাব থেকে আসা মহিলাকে তেমনি দেখবেন রাজস্থানী, গুজরাটী মহিলাদেরও। মন্দিরে শিখ মহিলা যেমন বিশ্বাসের সঙ্গে আসেন তেমনি আসেন গাড়োয়ালী মহিলারাও। কারও সন্তান নেই বলে যেমন মানত করতে আসেন কিছু মহিলা, তেমনি কেউ আসেন সন্তানহীন ননদকে, মেয়েকে, ভাবিকে নিয়ে। কেউ কেউ মন্দির চত্বরে জোর দিয়ে গর্বের সঙ্গে বলে, “দু-বছর আগে এই মন্দিরে শুয়েই আমার ছেলে হয়। এ বার তাই নিয়ে এসেছি আমার ননদকে।”
সিমসা মাতা মন্দিরে বিস্ময়ের সামগ্রী আরও রয়েছে। মন্দিরের পাশেই দেখা মেলে একটি বিশালাকার পাথরের। বলা হয়, এই পাথরটিকে দু’হাতে প্রাণপণ ঠেলে একচুল নড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু ডান হাতের কড়ে আঙুলের সাহায্যে সামান্য ঠেললেই নাকি হেলে যায় পাথরটি। স্থানীয়রা তাই পাথরটিকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করেন। চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
সিমসা মাতার কাছে পুজো দিতে কিংবা শতরঞ্চি পেতে মন্দিরে দেবীর স্বপ্নাদেশ পাওয়ার জন্য থাকার বিষয়টি যেমন রহস্যজনক তেমনি এই পদ্ধতির পরেই কোনো মহিলা সম্ভাবসম্ভবা হলেই মনে মনে আপনার মাথায় এই প্রশ্নটাই বারেবারে ঘুরতে থাকবে… তাহলে কি সত্যিই দেবীর কৃপা নাকি শুধুই বিশ্বাস? কোনটা ঠিক তা আজও কারও জানা নেই… ভারতের সনাতন দর্শন চিরকাল একথাই বলে এসেছে যে আপনাকে সব কিছু মানতে হবে বিশ্বাস করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। বিশ্বাসের শক্তি অনেক বড়ো তা অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করে। সন্তানহীনের কোলে তুলে দেয় সন্তান।
