হিমালয়ের অদ্ভুত ‘চুম্বক পাহাড়’
হিমালয়ের অদ্ভুত ‘চুম্বক পাহাড়’
লাদাখের লেহ থেকে কারগিলের দিকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার গেলেই দেখা মিলবে এই রহস্যময় পাহাড়ের। কারগিলে যাওয়ার সড়কেই এই চুম্বক পাহাড়। এই পাহাড়ের আশ্চর্য এক গুণ হচ্ছে, কেউ যদি এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে রাখেন, তারপরও সেই বন্ধ গাড়ি না থেমে ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেন ২০ কিলোমিটার গতিতে গাড়িকে টেনে নিয়ে যায়।
কাশ্মীর বা হিমাচলের মত লাদাখের পাহাড়ে কিন্তু সেরকম সবুজের আভাস দেখা যায় না। এখানে সেরকম বৃষ্টিপাত না হওয়ার ফলে গাছপালার সংখ্যা আশ্চর্যজনক ভাবে কম। এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মরুভূমির কিছুটা মিল আছে। আর সেখানে এক পাহাড়ের গায়ে বড়ো বড়ো করে লেখা আছে ম্যাগনেটিক হিল। এটাই কি সেই ম্যাগনেটিক হিল যা শাহরুখ খানের ‘জব তক হ্যায় জান’ সিনেমায় দেখা গেছিল ?
এই পথে যাওয়ার সময় ড্রাইভার গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে স্টিয়ারিং ধরে, ব্রেক থেকে পা সরাতেই দেখবেন অদ্ভুতভাবে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। প্রথমে মনে হবে ডাউন হিল তাই গাড়ি নেমে যাচ্ছে। কিন্তু না, একটু পরে আপ হিলেও দেখবেন গাড়ি আগের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। অবাক বিস্ময়ে সবাই তাকিয়ে থাকবেন আর ভাববেন এটা কীভাবে সম্ভব? যে কেউই আকস্মিকতায় অভিভূত হয়ে যায় এপথে এলে।
এই পাহাড়ের সামনে কোনো যান-বাহনের গাড়ির পেট্রোল খরচ করতে হয় না ম্যাগনেটিক হিলের সামনে চিহ্নিত করা আছে এই বিশেষ পয়েন্টেকে। যেখানে গিয়ে দাঁড়ালে যে কোনো যানবাহন চুম্বক শক্তির আকর্ষণে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, বা ওই পাহাড়ের বিশেষ কোন শক্তি যে কোন বাহনকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। কোনটা যে সঠিক তা আজও কেউ জানে না।
লাদাখের এই পাহাড়কে চুম্বক পাহাড়’ বলে ডাকা হয়। এই পাহাড়ের চূড়ার দিকে যে সড়ক সেটা ধরে গাড়ি চালিয়ে যেতে যেতে যদি কেউ গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দেন এবং গিয়ারকে নিউট্রাল পজিশনে রাখেন, তবে দেখা যাবে সেই গাড়ি খাড়া রাস্তা বেয়ে নিজে নিজেই চলতে শুরু করেছে অদ্ভূতভাবে এবং তার গতি নেহাত মন্দ নয়। ২০ থেজে ২২ কিলোমিটার প্রতিঘণ্টা বেগে সেই গাড়ি এগিয়ে যাবে। এই মজার কারণে ‘ম্যাগনেটিক হিল’ আজ জনপ্রিয় পর্যটনক্ষেত্র।
চুম্বক পাহাড় কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এধরনের পাহাড়ের অস্তিত্ব নেই। ওই এলাকায় যা ঘটে, তা একেবারেই দৃষ্টিভ্রম। ওই স্থানটিতে পাহাড়, রাস্তা ইত্যাদি এমন ভাবে অবস্থিত যে, এলাকাটিকে খাড়াই বলে মনে হয়। আসলে রাস্তাটি সমান্য উৎরাই-যুক্ত। সেই ঢালু পথ বেয়েই নিউট্রাল গিয়ারে থাকা গাড়িটি গড়াতে থাকে। দৃষ্টিবিভ্রমে মনে হয়, তা খাড়াই বেয়ে উপরে উঠছে।”
এই চুম্বক পাহাড় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা গল্পকথা চালু রয়েছে। কেউ কেউ এসব ঘটনার মধ্যে ঐশ্বরিক বা অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাব আছে বলে মনে করে থাকেন। লেহ থেকে কারগিলের সড়ক পথে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা এড়াতে লাদাখ প্রশাসন ওই সড়কটির দুই প্রান্তে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসিয়েছে।
অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, ডাউন হিলে চলার পথে হয়তো গ্র্যাভেটির কারণে গাড়ি নীচে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু না, আপ হিলেও গাড়ি যেহেতু আপনা আপনি সমানভাবে সামনের দিকে এগিয়ে চলে তাই আশ্চর্য হতেই হয়।
পর্যটকরা এই পথে দারুণ রোমাঞ্চ অনুভব করলেও বিমান উড়ে যাওয়ার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এই অঞ্চল দিয়ে উড়ে যাবার সময় পাইলটরা খুব বেশি কড়া নজর রাখেন যাতে করে তাদের বিমানের গতিপথ ভুল না হয়ে যায়।
স্থানীয়দের মাঝে এই পাহাড়টিকে ঘিরে বিভিন্ন মিথ প্রচলিত আছে। তাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন এখানে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে যা এই ঘটনা ঘটায়।
তবে, আরও অবাক করা ব্যাপার হল এই ম্যাগনেটিক হিলের এই চৌম্বকীয় আকর্ষণ শুধু যে লোহার বস্তুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় তা নয়, অন্যান্য যে-কোনো বস্তুর ক্ষেত্রেই এই আকর্ষণ সমানভাবে কাজ করে। এই সড়কের ধারে বা এই অঞ্চলের যে-কোনো জায়গার কিছুটা উঁচু স্থানে দাঁড়ালে তীক্ষ্ণ রকমের এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
অনেকেই এই শব্দকে ভৌতিক কোনো কিছু মনে করে। পরে বিজ্ঞানীরা জানান, পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে এমন গ্র্যাভিটি হিল আছে সেখানেই এই শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এই শব্দ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের তরঙ্গে ঘর্ষণের ফলে উৎপাদিত হয়। এছাড়াও এই ম্যাগনেটিক হিলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর জলেও গ্র্যাভিটির সূত্র ধরে ভিন্ন দিকে বয়ে চলার চেষ্টা করে।
স্থানীয়রা ছাড়া বাহিরের মানুষজন অনেক পরে এই ম্যাগনেটিক পাহাড় সম্পর্কে জানতে পারে। তৎকালীন সময়ে কাশ্মীর কর্তৃপক্ষ এই অঞ্চলের চৌম্বকীয় আকর্ষণের ব্যাপার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করার প্রয়োজন মনে না করার ফলে এখানে বেশ কিছু মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।
পরবর্তীতে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের কার্গিল যুদ্ধ হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলের সার্বিক চেহারার বেশ পরিবর্তন হয়। বর্তমানে লাদাখ কর্তৃপক্ষ এই সড়কটির দুই প্রান্তেই সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়ার পর থেকে এখানে দুর্ঘটনা কমে যায়।
এখানকার ভৌগোলিক প্রকৃতি একটি চৌম্বকীয় আকর্ষণ এমনভাবে তৈরি করে যে পার্বত্য রাস্তায় যে গাড়ির নীচে যাওয়ার কথা, চুম্বক ক্ষেত্রের প্রভাব মাধ্যাকর্ষণকে অতিক্রম করে তাকে উপরে টেনে নেয়। এই নিয়ে অবশ্য অনেক মতভেদ ও আছে, কারওর মতে এটি হল দেখার ভুল – Optical Illusion.
এর কাছেই পাথর সাহিব, সেটি গুরু নানকের স্মৃতি বিজড়িত একটি সুন্দর গুরুদ্বোয়ারা আছে। গুরু নানক তিব্বত ভ্রমণ করে ফেরার পথে এই গুরুদ্বোয়ারাতেই বিশ্রাম নিয়েছিলেন।
***
