হিমালয়ের এক অদৃশ্য যোগী ‘মহাবতার বাবাজি’
হিমালয়ের এক অদৃশ্য যোগী ‘মহাবতার বাবাজি’
বছরে একবার হঠাৎ করে উধাও হয়ে যান দক্ষিণের সুপারস্টার অভিনেতা রজনীকান্ত। উধাও হওয়া দিনগুলিতে তিনি কোথায় যান কিংবা কোথায় থাকেন তা নিয়ে বিশদ কিছু জানা যায় না। বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায় বছরের সেই নির্দিষ্ট সময় তিনি নাকি পাড়ি জমান উত্তরাখণ্ডে।
উত্তরাখণ্ড, মানে দেবভূমি। যে পথে পাণ্ডবরা যাত্রা করেছিলেন মহাপ্রস্থানের পথে। সেই পথ ধরেই যান অভিনেতা রজনীকান্ত। আর রজনীকান্ত উত্তরাখণ্ডের কোথায় যান শুনলে আপনি একটু অবাকই হবেন। সাউথের সুপারস্টার যান একটি পাহাড়ি গুহায়।
সাউথের সুপারস্টার রজনীকান্ত, যাকে ঘিরে সবসময় একটা বিরাট সুরক্ষাবলয় থাকে, তিনি উত্তরাখণ্ডের এক গুহায় কী জন্য যান? এই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ পেতে লেগে যান বেশ কয়েকজন। অনেকটা সময় ধরে অনুসন্ধান। তারপর উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা যায়, রজনীকান্ত উত্তরাখণ্ডে যান মহাবতার বাবাজির গুহায়। মহাবতার বাবাজি মানে যাকে ঘিরে কয়েক যুগ ধরে আসছে নানান মিথ। নানান গল্প। হিমালয়ের বুকে সবচেয়ে অলৌকিক সাধক। যাকে সহজে দেখা যায় না। চাইলেই দেখা পাওয়া যায় না। তিনি চাইলেই কেবল দেখা হয়।
অলৌকিক জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে যেমন হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে, কিন্তু আজও সেই রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি। আদৌ জ্ঞানগঞ্জ আছে না নেই তা জানা যায় না তেমনি এই মহাবতার বাবাজির গল্পও একই। মহাবতার বাবাজিও জ্ঞানগঞ্জের সাধক।
চলে আসি আবার রজনীকান্তের কথায়। যে গুহায় রজনীকান্ত যান সেই গুহা অবধি গাড়ি পৌঁছোয় না। তাহলে সেই গুহা অবধি কীভাবে যান আমাদের এই সুপারহিরো? মানে হাজারো ভক্তদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে। শোনা যায় ছদ্মবেশ নেন সুপারহিরো।
সিনেমার পর্দায় অনেক অবাস্তবকে বাস্তব করেছেন রজনীকান্ত তাই তাঁর অনুরাগীরা সবসময় তাঁদের সুপারহিরোর কাছ থেকে অনেক বেশি স্টান্ট প্রত্যাশা করেন। ব্যক্তিজীবনেও এই সুপারহিরো তাই স্টান্ট দেখাতে পিছপা হন না। হয়তো তাই প্রতিবছর লোকজনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ছদ্মবেশে এই গুহায় পৌঁছে যান রজনীকান্ত। বিষয়টি মোটেও সহজসাধ্য নয় তা বেশ বুঝতেই পারছেন।
রীতিমতো ট্রেক করে পাহাড় ডিঙিয়ে সেই গুহায় পৌঁছোন সুপারস্টার। শুধু ছদ্মদেশই নয় এই গুহায় পৌঁছোনোর যাত্রাপথে তিনি খুবই সাধারণ আহার করেন। খুবই সাধারণ জীবনযাপন করেন পুরো যাত্রাপথে।
এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে থেকে জানা যায়, কুমায়ুন হিমালয়ের আলমোড়া জেলায় এক পাহাড়ি গ্রামে কিছুদিন আশ্রয় নেন সুপারস্টার রজনীকান্ত। সেই গ্রামের কাছেই অবস্থিত তাঁর গন্তব্যস্থল।
এতক্ষণ ধরে রজনীকান্তের রহস্যময় গুহায় যাওয়ার কথা শুনলাম। কোথায় আছে সেই গুহা? জানা গেছে গুহাটি আলমোড়ায় অবস্থিত। যে আলমোড়া থেকে সামান্য দূরেই মায়াবতী। বিবেকানন্দের ড্রিম প্রোজেক্ট-মায়াবতী। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বেদান্ত চর্চা কেন্দ্র। বেদান্ত সোসাইটি।
এই আলমোড়ার একটি গ্রামেই আশ্রয় নেন সুপারস্টার রজনীকান্ত। সব ছেড়ে এই আলমোড়ার গ্রামে কী খুঁজতে আসেন রজনীকান্ত। রজনীকান্ত নাকি সেই গুহায় ধ্যানে বসেন। আর এই গুহাতে নাকি থাকেন এক রহস্যময় যোগীপুরুষ। তাঁর সঙ্গে নাকি দেখা করতে যান রজনীকান্ত। কে এই যোগী পুরুষ? এই যোগী পুরুষই কি তাহলে ‘মহাবতার বাবাজি”?
‘মহাবতার বাবাজি’, যিনি অনেক জায়গায় বাবাজি মহারাজ নামেও পরিচিত।
তাঁর পরিচয় কী? আসলে এই সাধকের সম্বন্ধে সাধারণ মানুষজন খুব কম জানেন। কারণ তাঁর একাধিক বিষয়ে নিষেধ রয়েছে বলেই জানা গেছে। তাঁর একটি মাত্র ছবি আঁকা হয় যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ীর সহায়তায়।
দুনাগিরির এক পাহাড়ে সমুদ্রতল থেকে ৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি গুহাতেই কখনো সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করছিলেন মহাবতার বাবাজি। যে গুহাতে যান রজনীকান্তের মতো মানুষরা। আর শোনা যায় সেই গুহাতেই নাকি ইচ্ছে হলে তিনি দেখা দেন।
অনেকেই আছেন যারা বিশ্বাস করেন মহাবতার বাবাজির কথা। কেউ বা করেন না। সবাইকে বিশ্বাস করতেই হবে এমন কথাও নেই। যুক্তি-তক্কের দোকান খুলে বসেন বেশ কিছু যুক্তিবাদী মানুষ। কেউ বা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলেন, “আবার একজন বাবাজিকে নিয়ে বসলেন। অন্য কথা বলুন।” সব কিছুর ঊর্ধ্বে একটা কিছু তো আছেই ওনার মধ্যে যার টানে আজ মহাবতার বাবাজিকে নিয়ে আলোচনা করতে এলাম। ওনাকে নিয়ে খোঁজের গল্প শোনাতে এলাম। আর কী এমন কারণ যার জন্য আমি না, এত এত মানুষ তাঁর খোঁজ করেন। আমরা তো ছেড়েই দিন, তাঁর গুহায় গিয়ে মেডিটেশনে কেন বসেন দক্ষিণের সুপারস্টার রজনীকান্ত?
মহাবতার বাবাজি যোগসাধক শ্যামাচরণ লাহিড়ি মহাশয়ের গুরু। তাঁর প্রকৃত নাম বা পরিচয়—সবই কিংবদন্তিতে আচ্ছন্ন। পরমহংস যোগানন্দ তাঁর আত্মজীবনী ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ আ যোগী’-তে তাঁর কলকাতার বাড়িতে বাবাজি মহারাজের অতিলৌকিক অবস্থিতির কথা লিখেছেন।
রজনীকান্তের রহস্যময় যাত্রা প্রসঙ্গে একবার তিনি মুখ খুলেছিলেন। তাঁর কথায়, “১৯৭৮ সালে এয়ারপোর্টের একটি বইয়ের দোকান থেকে পরমহংস যোগানন্দের ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ আ যোগী’ বইটি কিনি। কিন্তু সে-সময়ে আমার ইংরেজি তেমন দুরস্ত ছিল না। ফলে বইটি পড়ে উঠতে পারিনি। পরে আমি গ্রন্থটি পাঠ করি এবং বাবাজি সম্পর্কে পরিচিত হই।”
মহাবতার বাবাজির প্রকৃত পরিচয়ের মতো তাঁর সময়কালও রহস্যাবৃত। পরমহংসের বিবরণ অনুযায়ী, বাবাজি নাকি যীশুখ্রিস্টের সমসাময়িক। অর্থাৎ তিনি ২০০০ বছরেরও আগে জন্মেছিলেন। কিন্তু যুগে যুগে তিনি দেখা দিয়েছেন। তাঁর দেখা পেয়ে ধন্য হয়েছেন অনেক সাধক। শ্যামাচরণ লাহিড়ীর মত মানুষ তাঁর কৃপা পেয়েছেন। তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন। মহাবতার বাবাজির কাছে দীক্ষা নিয়েছেন পরমহংস যোগানন্দের মতো ক্রিয়াযোগীরা।
লোকবিশ্বাস, বাবাজি আজও অবস্থান করেন তাঁর গুহায়। ভক্ত রজনীকান্ত তাঁকেই পরম গুরু বলে মানেন। তাই প্রতি বছর কুমায়ুনের গুহায় তাঁর ছদ্মবেশে তীর্থযাত্রা। মহাবতার বাবাজির গুহায় দীর্ঘ সময় তিনি ধ্যান করেন এবং আত্মমগ্ন হয়ে কাটান।
সাধনার জোরে অমরত্ব লাভ করেছেন এমন নজির খুব কমই আছে জগৎে, মহাবতার বাবাজি এমনই একজন সিদ্ধ যোগী। যুগে যুগে তাঁর অবতরণ করার জন্য তাঁকে মহাবতার বলা হয়।
বলা হয়, মহাবতার বাবাজি গুরুদের শুরু বা জগৎগুরু। আদি শঙ্করাচার্যের পর তিনিই আদি গুরু। তাই তাঁকে মহাবতার বাবাজি বলা হয়। ক্রিয়াযোগের তিনি প্রাণপুরুষ। ধ্যান, আধ্যাত্মিকতা ও আসনকে তিনি এক সূত্রে গেঁথেছেন কয়েক হাজার বছর আগে। পরবর্তীতে তার পথ অনুসরণ করে আধ্যাত্মিক পথে এগিয়েছেন তার সুযোগ্য শিষ্যরা যার মধ্যে শ্যামাচরণ লাহিড়ী, যুক্তেশ্বর গিরি, পরমহংস যোগানন্দ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
মহাবতার বাবাজি কে তা নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য গল্প, কিংবদন্তি ও রহস্য। কেউ কেউ মনে করেন ক্রিয়াযোগের মাধ্যমে তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন। কঠোর সাধনার মাধ্যমে তিনি সময়কে জয় করে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেছেন এবং আশ্চর্যজনক ভাবে হাজার হাজার বছর ধরে স্বশরীরে বিরাজ করছেন এই পৃথিবীতে। একাধিক বার তার সাক্ষাৎ লাভ করে ধন্য হয়েছেন একাধিক সাধক।
শোনা যায় হিমালয়ের এক দুর্গম স্থানে শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়কে দীক্ষা দিয়েছিলেন স্বয়ং মহাবতার বাবাজি। পরমহংস যোগানন্দ তাঁর ‘অটো বায়োগ্রাফি অফ এ যোগী’ বইয়ে মহাবতার বাবাজির সঙ্গে তাঁর দর্শনের কথা বলেছেন।
বিভিন্ন মার্গের যোগী একাধিকবার মহাবতার বাবাজির তাঁদের সামনে আসার কথা বলেছেন। হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে মহাবতার বাবাজির রহস্যময় উপস্থিতির কথা সবাই স্বীকার করেছেন।
বাবাজির জন্মবৃত্তাস্ত নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না, তবে মনে করা হয় তামিলনাড়ুর কোনো এক গ্রামে তার জন্ম। তবে তার সঠিক বয়স নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। কারওর মতে পাঁচ তো কারওর মতে দুহাজার বছরের কিছু বেশি তাঁর বয়স। যোগবলে তিনি তারুণ্যকে ধরে রেখেছেন তাই দেখলে মনে হয় এক যুবক। বাবাজির ইচ্ছে না থাকলে তাকে দর্শন করা যায় না। তিনি ঝড়ের গতিতে প্রকট হন, আবার মহাশূন্যে মিলিয়ে যান। কেউ কেউ বলেছেন আদি শঙ্করাচার্যেরই এক অন্য রূপ মহাবতার বাবাজি। কারণ আদি শঙ্করাচার্যও পূর্বাশ্রমে দক্ষিণের বাসিন্দা ছিলেন। আবার একদল সাধক দাবি করেন গুজরাতের স্বামী নারায়ণই মহাবতার বাবাজি।
লোকবিশ্বাস, হিমালয়ের কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে রয়েছে জ্ঞানগঞ্জ নামের এক স্থান। আর সেখানে আছে একটি রহস্যময় মঠ। যেখানে সিদ্ধ পুরুষ ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারে না। বাবাজি সেই মঠেই থাকেন, শুধু তাই নয় তিনি জ্ঞানগঞ্জের আচার্য। সূক্ষ্ম দেহে তিনি সর্বত্র বিচরণ করেন আবার প্রয়োজন হলে নিজ দেহ ধারণ করে প্রকট হন। তবে তাঁর দর্শন অতি দুর্লভ ঘটনা এবং তাঁর দর্শন পাওয়া তাই সৌভাগ্যের। হাতে গোনা কয়েকজন আজ অবধি তাঁর দর্শন করতে পেরেছেন। কিছু রহস্য হয়তো আজীবন রহস্যই হয়ে থেকে যায়, কারণ তার খোঁজ শেষ হয় না। মহাবতার বাবাজিও তেমন একটি খোঁজ।
এবার আমরা একটু মহাবতার বাবাজির সন্ধানে যাব উত্তরাখণ্ডের কুকুছিনা গ্রামে। বেড়ানোর জায়গা হিসেবে কুকুছিনা কোনোভাবেই জনপ্রিয় নয়। অতএব অনেকেই প্রথমবার এই নাম শুনলেন। কুকুছিনার যেটুকু নামডাক আছে তা কিন্তু তার আধ্যাত্মিকতার জন্য। যারা হিমালয়ের অলৌকিক বিষয় তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন তারা এই অঞ্চলের নাম জেনে থাকবেন। হিমালয়ের রহস্য আর আধ্যাত্মিকতা—এই দুইয়ের টানেই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে কুকুছিনায় মানুষজন ছুটে আসেন। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কুকুছিনার। পাহাড়-জঙ্গল-বারনা-ফুল-পাখি কী নেই। সব যেন কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা ছবির মতো। হাজার হাজার বছর আগের জনপদ কুকুছিনা। আজও এই প্রাচীন জনপদ দণ্ডায়মান।
‘কুকুছিনা’ নামের একটা ইতিহাস আছে। পাণ্ডবরা তখন অজ্ঞাতবাসে। তাঁদের খুঁজে বের করতে চতুর্দিকে ছুটল কৌরব সেনারা। এদিকে পাণ্ডবরা ঘুরতে ঘুরতে উত্তরাখণ্ডের এক প্রান্তিক গ্রামে পৌঁছোল। কৌরবদের ধাওয়া করাই সার হল। পাণ্ডবদের খোঁজ পেল না কৌরবরা। এদিকে পাণ্ডবরা হেঁটে চলেছে পাহাড়ি পথ ধরে। যেতে যেতে তাদের পথ শেষ হল একটা গ্রামে। যে গ্রামের পরে শুধুই দুর্গম পাহাড় আর গভীর অরণ্য। পাণ্ডবরা সেই গ্রামে দেখল নানান অলৌকিক কর্মকাণ্ড চলছে।
সেই রহস্যময় অঞ্চলেই আত্মগোপন করল পাণ্ডবরা। অন্যদিকে কৌরবরাও ছাউনি বানিয়ে শুরু করল পাণ্ডবদের খোঁজ। কৌরবরা তন্ন তন্ন করে পাহাড়ের চারপাশ খুঁজে শেষে নিরাশ হল। কৌরব সেনারা শুরু করল জঙ্গল অভিযান। কিন্তু কোনো লাভ হল না। কেউ-ই হদিশ পেলেন না পাণ্ডবদের।
এই রহস্যময় গ্রামে পাণ্ডবদের ছাউনি থেকে জায়গার নাম হয় কুকুছিনা। ছাউনি শব্দ স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় ‘ছিনা” হয়ে যায়। অন্যদিকে স্থানীয় কিছু গাড়োয়ালবাসী বলেন কৌরব ছাউনি থেকেই গ্রামটির নাম হয়ে যায় ‘কুকুছিনা।” ‘কৌরব’ স্থানীয় ভাষায় হয়ে যায় ‘কুকু’ এবং ‘ছাউনি’ থেকে ‘ছিনা’হয়ে যায়।
যারা ভারতীয় অধ্যাত্মবাদ নিয়ে চর্চা করেন তারা একবার হলেও অতি অবশ্যই ঘুরে দেখুন কুকুছিনা। যারা গতানুগতিক ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন না, হিমালয়কে অন্যভাবে আবিষ্কার করতে চান তারা দুটো দিন ঘুরে দেখুন কুকুছিনা। কলকাতা থেকে কাঠগুদামের পথে হলদুয়ানি স্টেশনে নেমে সেখান থেকে রানিখেত। ট্রেন পাবেন হলদুয়ানি পর্যন্ত। সেখান থেকে রানিখেত। রানিখেত থেকে দ্বারাহাট। কাছাকাছি পন্থনগর বিমানবন্দরেও প্লেন ওঠা-নামা করে। সেখান থেকেও হলদুয়ানি আসা যায়। তারপর পাহাড়যাত্রা। হলদুয়ানি থেকে রানিখেত ৫৭ কিলোমিটার। রানিখেত থেকে দ্বারাহাট ৩২ কিলোমিটার। দ্বারাহাট থেকে কুকুছিনার দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। সবমিলিয়ে ১০৩ কিলোমিটার রাস্তা। সরাসরি বাস যায় দিনে একবার। গাড়িও ভাড়া নেওয়া যায়। কিন্তু অর্থের সাশ্রয় ও আকর্ষণীয় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে তিন খেপে তিন বার গাড়ি বদল করেননি। চাইলে রানিক্ষেত পর্যন্ত বাস, তারপর দুবার গাড়ি বদল। এই ভাবে বদলে বদলে গেলে একটা আলাদা অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
চারপাশের পাহড়ি গ্রামের কেন্দ্রস্থল দ্বারাহাট। জায়গার নাম শুনেই বুঝতে পারছেন ‘দ্বারাহাট’ মানে ‘হাট’ বা বাজার। পাহাড় ডিঙিয়ে প্রায় বিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় স্থানীয়দের বাজার করতে। প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন জিনিসপত্র কিনতে আশপাশের গ্রামের মানুষ এই দ্বারহাটে আসেন।
ইচ্ছে করলে এই পাহাড়ি গঞ্জে এক রাত কাটিয়ে নিতে পারেন। হোটেল আছে। আগে থেকে যোগাযোগ থাকলে আশ্রয় মিলতে পারে যোগানন্দ আশ্রমে। ‘অটো-বায়োগ্রাফি অফ যোগী’ বইটা যাঁদের পড়া অথবা পরমহংস যোগানন্দ সম্পর্কে কিংবা ‘ক্রিয়াযোগ’ বিষয়ে যাঁরা অবগত, তাঁরা এই আশ্রম বিষয়ে অপরিচিত নন। ‘মহাবতারবাবা’র কথাও তাঁদের জানা। আশ্রমে থাকলে অনেক অজানা বিষয় জেনে নিতে পারবেন আপনি।
যোগানন্দ আশ্রমে কাটিয়ে যাওয়া যাক কুকুছিনার পথে। দ্বারাহাট থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ধুধৌলিতে একটি সরকারি অতিথিশালা আছে। সেখানে থাকতে পারেন। কুকুছিনা থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে দুনাগিরি মাতার মন্দির। রাস্তা থেকে একটু ওপরে। নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত নানা মাপের শয়ে শয়ে ঘণ্টা বাঁধা। ঘণ্টা দেখতে দেখতে ৫০০ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠু পড়ুন। এখানকার মানুষের কাছে দুনা গিরিমা অত্যন্ত জাগ্রত। পুজো দিন। মন্দির থেকে চারপাশ দুচোখ ভরে দেখুন। হিমালয়ের রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবে। মন্দির লাগোয়া হলঘরে দিনভর চলছে ভাণ্ডারা। চাইলে দুমুঠো খেয়ে নিতে পারেন। লুচি, পুরি, সবজি ও হালুয়া। চাইলে অনুদান দিতে পারেন। না দিলেও ক্ষতি নেই। কর্তৃপক্ষের কোনো দাবি নেই। তারা খাইয়েই সন্তুষ্ট।
কুকুছিনাতে থাকার বিখ্যাত জায়গা জোশীজির গেস্ট হাউস। গেস্ট হাউসের ঘর বেশ আরামপ্রদ। সঙ্গে ‘ইকোফ্রেন্ডলি’। বিদেশি ধাঁচের কটেজও আছে গেস্ট হাউসে। আপনি এখানে এসে অবাক হবেন এটা দেখে যে হিমালয়ের রহস্য আর আধ্যাত্মিকতার টানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে কত মানুষ এসেছেন।
হাতে সময় নিয়ে গেস্ট হাউস ঘুরে দেখুন। গেস্ট হাউসে আছে বিরাট একটি প্রার্থনাকক্ষ। আছে মেডিটেশন রুম সেখানে আপনি চাইলে চুপ করে মেডিটেশন করতে পারেন। নির্দিষ্ট কোনো দেবদেবীর পুজো হয় না জোশীজির প্রার্থনাকক্ষে।
জোশীজির গেস্ট হাউসের দেয়ালে টাঙানো আছে মহাবতার বাবাজির চিত্র। একজন জানালেন চিত্রটি কাল্পনিক। শুধু মহাবতার বাবাজিই নয়, মহাবতার বাবাজির শিষ্য আর তাঁদের শিষ্যদেরও ছবি আছে। জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে যারা দীর্ঘ পড়াশোনা বা চর্চা করেছেন তারা মহাবতারবাবাজির অনেক শিষ্য এবং তার শিষ্যদের অনেকের ছবি দেখে চিনতে পারবেন। আছে যিশুখ্রিস্টের ছবি!
গেস্ট হাউসের কর্ণধার গিরিশ জোশীর কথায়, “এখানকার মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী মহাবতার যোগী প্রাচীন ক্রিয়াযোগ চর্চার মাধ্যমে অবিনশ্বর শরীর ধারণ করেছেন। আড়াই হাজার বছর ধরে তিনি এই জঙ্গল, পর্বতের গুহায় অবস্থান করছেন। তাঁর কৃপা ও আশীর্বাদে ভক্তরা কখনো কখনো তাঁর দর্শন পেয়েছেন বলেও শোনা গেছে।”
জোশীজির অতিথিনিবাসের ঠিক উলটো দিকের পাহাড়ে আছে ‘বাবাজি কা গুহা’। হাতে সময় নিয়ে দেখতে যাবেন গুহা। পাহাড়ি ঝরনা ও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাথুরে সিঁড়ি ভেঙে তিন কিলোমিটার গিয়ে বাবাজি কা গুফা। যাঁরা ট্রেক করতে ভালো বাসেন, তাঁদের বেশ ভালোলাগবে। সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে বাবাজি কা গুফা দেখতে যান। প্রায় ঘণ্টা চারেক সময় নিয়ে বের হবেন। শুকনো খাবার আর জল নেবেন।
আপনি কিছুটা পথ চলার পর দেখবেন একটি পাহাড়ি কুকুর আপনার সঙ্গ নিয়েছে। প্রথমে আপনি অবাক হবেন না, কিন্তু কিছুক্ষণ পথ চলার পর আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন। দেখবেন কুকুরটি কিছু একটা দিকনির্দেশ করছে। আপনি সামান্য সময় থেমে যান, তারপর আবার কুকুরটির দেখানো পথ ধরে এগিয়ে চলুন। আপনি ওই কুকুরটির দেখানো পথ ধরে গেলে পৌঁছে যাবেন বাবাজি কা ওফা। আশ্চর্যের বিষয় কুকুরটি আপনাকে পথ দেখাতে দেখাতে কেন বাবাজির গুহার কাছাকাছি পৌঁছে দিচ্ছে? সে জানল কীভাবে আপনি বাবাজি কা ওফা-তেই যাচ্ছেন? আশ্চর্য হওয়া আরও বাকি আছে। কুকুরটি গুহার কাছাকাছি এসেই হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যাবে। আপনি অনেক খুঁজেও আর সেই কুকুরটিকে দেখতে পাবেন না। এ যেন মহাপ্রস্থানের পথে আপনি স্বয়ং যুধিষ্ঠির!
এই মহাভারতীয় অত্যাশ্চর্য দর্শনের জন্য কুকুছিনায় এসে আপনাকে বাবাজি কা গুহা দর্শনে যেতেই হবে। নিজে অনুভব করুন গায়ে কাঁটা দেবে আপনার।
বাবাজি কা গুহা আপনাকে বাইরে থেকে দেখতে হবে। কারণ ভেতরে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সে কারণে যাওয়ার আর উপায় নেই। পাঁচিল তুলে গুহার মুখ পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকবিশ্বাস, এই গুহার ভেতরেই নাকি পাণ্ডবদের যুদ্ধাস্ত্র রাখা আছে। একথা শুনে আপনি চমকে উঠবেন। আর আপনার অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মন গুহার ভেতরে প্রবেশ করার উপায় খুঁজতে থাকবেন। কিন্তু কোনো লাভ নেই। আপনি কোনোভাবেই প্রবেশ করতে পারবেন না। আপনার সব চেষ্টা বিফল করে দিয়ে মহাবতারবাবাজি মনে মনে হাসবেন।
বাবাজি কা গুহা যে পাহাড়ে তার মাথায় রয়েছে মহাবতারবাবার শিষ্য বলবন্ত গিরির আশ্রম—নাম, ‘পাণ্ডব খোলি’। পাণ্ডবরা নাকি সেখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। বলবন্ত গিরির শিষ্য রাম সিং আশ্রম দেখাশোনা করেন। পাণ্ডব খোলির ওপরে ধীরে ধীরে উঠতে হবে। হাঁটা পথই ভরসা। কুকুছিনা থেকে সকালের দিকে বেরিয়ে হাতে সময় নিয়ে দেখতে যান পাণ্ডব খোলি। কারণ আপনার সবমিলিয়ে সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। চাইলে আশ্রমে রাত কাটাতে পারেন।
কুকুছিনায় প্রচুর বিদেশি দেখতে পাবেন। ভারতীয় অধ্যাত্মবাদ নিয়ে সারা বিশ্বে চর্চা হয় আর সেই চর্চার জন্য এই কুকুছিনাতেও ছুটে আসেন শয়ে শয়ে বিদেশি। যে জায়গার নাম ভারতেরই প্রচুর মানুষ জানেন না সেই জায়গায় এত বিদেশি এসে ক্রিয়াযোগ শিখছেন শুনলে আপনাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হবে।
কুম্ভমেলায় যেমন হরেক রকম বাবাজি পাইলটবাবা, যোগীবাবা, গন্ধবাবাদের দেখতে পান, কুকুছিনাতেও আপনি পাবেন হরেক রকম বাবাজি-মাতাজি। দেখা মিলবে ‘রাশিয়ানবাবা’র, যিনি সুদূর রাশিয়া থেকে এ-দেশে এসে গেরুয়া ধারণ করেছেন। পাহাড়ে জঙ্গলে আধ্যাত্মিকতার পাঠ নিয়েছেন। আশ্চর্য হবেন তিনি সংস্কৃতে কথা বলছেন কিংবা হিন্দি জানেন। এমনকি চোস্ত গাড়োয়ালি ভাষায় কথা বলছেন। শুধু রাশিয়ানই বা বলি কেন, দেখা মিলবে আমেরিকানবাবা, আফ্রিকানবাবা, ফ্রেঞ্চবাবা, চাইনিজবাবা। এরা সবাই কুকুছিনায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন অথবা সাধনা করছেন।
দলে দলে বিদেশিরা আসেন এখানে ‘ক্রিয়াযোগ’-এর চর্চা করতে। শ্বাস-প্রশ্বাসের বিশেষ ক্রিয়ার দ্বারা নিজের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই বিশেষ পদ্ধতিকে এককথায় ক্রিয়াযোগ’ বলে। মহাবতারবাবার কাছ থেকে তাঁর শিষ্যরা এই বিদ্যা শিখেছিলেন। যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের মাধ্যমে ‘ক্রিয়াযোগ’ অনেক মানুষের কাছে পৌঁছোয়। ‘ক্রিয়াযোগ’কে অনেক যোগী অনেকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইদানীং পাহাড়কে নতুনভাবে আবিষ্কারের প্রবণতা অনেকটাই বেড়েছে। বেড়েছে তরুণ প্রজন্মের হিমালয় প্রেম। একটা অন্য রকম অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে তাই বহু মানুষ ছুটে যাচ্ছেন হিমালয়। ক্রিয়াযোগের টানে। আধ্যাত্মিকতার টানে। আর একশ্রেণির ভক্তিপ্রবণ মানুষের জন্য বাড়ছে অধ্যাত্ম-পর্যটন। আর যে পর্যটনের জেরে সংস্থান হচ্ছে স্থানীয় মানুষের রুজিরোজগার।
কেউ যদি এইসব আধ্যাত্মিকতায় আগ্রহী না হন, তা হলেও কুকুছিনায় এসে তিনি বেশ প্রশান্তি অনুভব করবেন। দু’চোখ ভরে প্রাকৃতিক মাধুর্যকে উপভোগ করতে পারবেন। দেখবেন সূর্যোদয় সূর্যাস্ত। মন ভরে যাবে।
আর আধ্যাত্মিকতার টানে আসা মানুষ ক্রিয়াযোগের কথা ভাবতে ভাবতে নির্জন পাহাড়ি গ্রামে হারিয়ে যেতে চাইবেন। চমক ভাঙলে দেখবেন নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করেছে আপনাকে। পাখির ডাক অদ্ভুতভাবে শুনতে শুনতে কেমন যেন অস্থির হয়ে যাবেন। আর ভাববেন বেদান্তের সেই আমোঘ লাইন, “জগৎ সত্য ব্রহ্ম মিথ্যা, নাকি জগৎ মিথ্যা ব্রহ্ম সত্য।”
মহাবতারবাবাজির আলোচনা সম্পূর্ণ হবে না যদি না শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়েরকথা বলি। শ্যামাচরণ অবিভক্ত বঙ্গপ্রদেশের নদিয়া জেলার ঘূর্ণী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এখন কৃষ্ণনগর শহরের একটি পাড়া সেটি। রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবার।
শিশু অবস্থাতেই তাঁর মা মারা যান। শ্যামাচরণের মা ভগবান শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। শ্যামাচরণের সম্পর্কে খুব কম জানা যায়। শোনা যায় যখন তার তিন-চার বছর বয়স তখন একদিন তিনি গলা অবধি বালিতে সমাহিত হয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। তা দেখে বন্ধুবান্ধবরা চমকে যায়। এইধরনের বিভিন্ন ধ্যান শ্যামাচরণ প্রায়শই করতেন। এদিকে প্রবল বন্যায় শ্যামাচরণের পূর্বপুরুষের বাড়ি গেল নষ্ট হয়ে। শ্যামাচরণের বয়স তখন পাঁচ।
শ্যামাচরণের পরিবার চলে গেল বারাণসীতে। আর প্রাচীন কাশী নগরীতেই শুরু হল নতুন জীবন। জানা যায় তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত হয় কাশীতেই। কাশীতে বসবাসকালীন শাস্ত্রপাঠ ও ধর্মসাধনায় বিশ্বাসী তাঁর পিতা গৌরমোহন, যিনি নিজে প্রত্যহ ঋগবেদ পাঠ করতেন, বালক শ্যামাচরণকে বেদজ্ঞ মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ নাগভট্টের কাছে কিছুকাল বেদশিক্ষার্থী রূপে পাঠান। গঙ্গায় স্নান করে বেদ পাঠ এবং পুজো তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের অংশ ছিল। গৌরমোহন প্রাচীন ধর্ম সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী হলেও শ্যামাচরণকে শিশুকাল থেকেই উর্দু এবং হিন্দি অধ্যয়ন করান, পরে সরকারি সংস্কৃত কলেজে বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি, ফরাসি এবং ইংরেজি শিখতে পাঠান।
১৮৪৬ সালে শ্যামাচরণের বিয়ে ঠিক হয় কাশীমনির সঙ্গে। তাঁদের দুই পুত্র ছিল, তিনকড়ি ও দুকড়ি। আর ছিল তিন কন্যা, হরিমতি, হরিকামিনী এবং হরিমোহিনী। শ্যামাচরণের দুই পুত্রও সাধনমার্গের পথেই জীবন অতিবাহিত করেন। শোনা যায়, সাধুসন্ত হিসেবে তাঁদেরও বেশ নামডাক ছিল বেনারসে।
১৮৬১ সালে, শ্যামাচরণকে হিমালয়ের পাদদেশে রানিখেতে বদলি করা হয়। একদিন, পাহাড়ের পথে হাঁটছেন শ্যামাচরণ। সেসময় হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন কেউ একজন তাঁকে ডাকছে। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও কিছুক্ষণ পর তিনি শুনতে পেলেন একটি কণ্ঠস্বর। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। আবার কিছু সময় পর শুনতে পেলেন সেই একই কণ্ঠস্বর। আরও খানিকটা পথ ওপরে ওঠার পর দেখলেন এক সৌম্য পুরুষ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। শ্যামাচরণ থামলেন। প্রণাম জানালেন সৌম্যকে।
শ্যামাচরণের কথায় এই সৌম্য গেরুয়াধারীই মহাবতার বাবাজি। মহাবতার বাবাজি তাঁকে সঙ্গে করে নায়ে গেলেন। তাঁকে দীক্ষা দিলেন। শ্যামাচরণের কথায়, “মহাবতারবাবাজি আমাকে ক্রিয়াযোগের বিভিন্ন কৌশল শেখালেন। আধ্যাত্মিক নানা বিষয়ে উপদেশ দিলেন। তারপর আমায় বললেন, বাকি জীবনটি ক্রিয়াযোগের কথা প্রচারের জন্য উৎসর্গ করতে। আমি উনার কথামতো বেনারসে ফিরে গেলাম, সেখানে সক্রিয়ভাবে ক্রিয়াযোগের মার্গ অন্বেষণ শুরু করলাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নতি হল। বুঝতে পারছিলাম এএক অদ্ভুত বিচিত্র পথের সন্ধান দিয়েছেন মহাবতারবাবাজি। আমার কাছ থেকে ক্রিয়াযোগ শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রচুর পরিমাণে লোক আসতে লাগল। লোকজনের চাপে ছোটো ছোটো সভা সংগঠিত করতে শুরু করলাম। এই নিয়ে বেশ চলছিল। কিন্তু পরে আমি উনার অনেক খোঁজ করি ওই পথে, কিন্তু মহাবতারবাবাজির দেখা পায়নি।”
ক্রিয়াযোগ ছাড়াও ভগবত গীতার ওপর শ্যামাচরণ “গীতা সভা”তে নিয়মিত ভাষণ দিতে যেতেন। জাতিগত বৈষম্য সে-যুগে বেশ শক্তিশালী ছিল। সবাই চাইলেই সব কিছু করতে পারতেন না। হিন্দু, মুসলমান ও খ্রিস্টান নির্বিশেষে শ্যামাচরণ সব ধর্মবিশ্বাসের মানুষজনকে উন্মুক্তভাবে ক্রিয়াযোগে দীক্ষা দেন। তিনি তাঁর ছাত্রদের বলেছিলেন, “তোমরা এতদিন ধরে যা অনুশীলন করছ তা যেমনভাবে থাকার সেভাবেই থাকবে। তার সঙ্গে ক্রিয়াযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। মুক্তপুরুষ হয়ে যোগসাধনা করবে, নিজস্ব ধর্মের রীতিনীতি মেনে চলা নিজস্ব ব্যাপার।”
১৮৮৬ সালে পেনশনে অবসর গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনি কর্মজীবনে হিসাবরক্ষক ও তাঁর পরিবারের দায়িত্বভারের দ্বৈত ভূমিকা এবং ক্রিয়াযোগের শিক্ষকতাকে অব্যাহত রাখেন।
বহু মানুষ, ভক্ত, সাধক তাঁকে দর্শন করতে আসতেন। বেশির ভাগ সময় তিনি তাঁর বৈঠকখানা ঘরে থাকতেন। সবার জন্য দর্শন অবারিত ছিল। তিনি মাঝে মাঝেই পরম চৈতন্য সমাধির স্পন্দনহীন অবস্থা প্রদর্শন করতেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি সাধারণ মানুষকে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে যোগদীক্ষা দেন। মালি, পোস্টম্যান, রাজা, মহারাজা, সন্ন্যাসী, গৃহস্থ, নিম্নবর্ণ উচ্চবর্ণ থেকে বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান, পারসি নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষদের দীক্ষা দেন। তাঁর নাম হয়ে যায় “যোগীরাজ”।
সে-সময়ে, একজন ব্রাহ্মণের পক্ষে সববর্ণের মানুষের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠতা সহজ ছিল না। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাও বেশ কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু শ্যামাচরণ তা পেরেছিলেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে পঞ্চানন ভট্টাচার্য, যুক্তেশ্বর গিরি, প্রণবানন্দ, কেশবানন্দ ব্রহ্মচারী, ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল এবং পরমহংস যোগানন্দের পিতামাতা ছিলেন। অন্যান্য যাঁরা শ্যামাচরণের থেকে ক্রিয়াযোগ দীক্ষা গ্রহণ করেন তাঁরা হলেন বেনারসের ভাস্করানন্দ সরস্বতী, দেওঘরের বালানন্দ ব্রহ্মচারী, বেনারসের মহারাজা ইশ্বরীনারায়ণ সিংহ বাহাদুর ও তাঁর পুত্র।
ডঃ অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বই ‘পুরাণ পুরুষ’ গ্রন্থে, লাহিড়ীর ২৬টি গোপন ডায়েরির একটি অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে লেখেন, শ্যামাচরণ শিরডির সাঁইবাবাকে ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত করেছিলেন। এ-কথা শুনে অনেকেই চমকে যান।
শ্যামাচরণ তাঁর শিষ্য, পঞ্চানন ভট্টাচার্যকে ক্রিয়াযোগ শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর জন্য কলকাতায় একটি সংস্থা চালু করার কথা বলেছিলেন। প্রতিষ্ঠিত হয় আর্য মিশন ইন্সিটিটিউশন। সেখান থেকে শ্যামাচরণের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বই, গীতার বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। শ্যামাচরণ নিজে বাংলা ও হিন্দিতে গীতা থেকে উদ্ধৃত অংশ নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করেন। শ্যামাচরণ সে-যুগে গীতার হাজার হাজার কপি বই মুদ্রণ করান ও বিনামূল্যে তা বিতরণ করেন। সে সময়ে এটি একটি বিরল কাজ ছিল।
১৮৯৫ সালে তিনি তাঁর শিষ্যদের একত্রিত করতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বুঝতে পারেন যে তিনি শীঘ্রই শরীর ছেড়ে যাবেন। তাঁর মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তিনি কেবল বলেছিলেন, “আমি বাড়ি যাচ্ছি, সান্ত্বনা পাও, আমি আবার আসব।” এর পর উত্তর দিকে তিনি তাঁর শরীরকে প্রায় তিন বার ঘোরান এবং শরীর ত্যাগ করে “মহসমাধি” নেন। লাহিড়ী মহাশয় ১৮৯৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দেহত্যাগ করেন।
শোনা যায় শ্যামাচরণ লাহিড়ী ছবি তুলতে দিতেন না। তিনি একবার মাত্র ছবি তুলিয়েছিলেন বা কেউ কেউ বলেন আঁকার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাঁর একটিমাত্র ছবিই তাই চিরপরিচিত। সেটিই একমাত্র দেখতে পাওয়া যায়। আর শ্যামাচরণ লাহিড়ীর বর্ণনা অনুযায়ীই একবার এক আর্টিস্ট এঁকেছিলেন মহাবতারবাবাজির একটি মাত্র ছবি। যা আজও আমাদের কাছে মহাবতার বাবাজির একমাত্র ছবি বলেই পরিচিত। সেই রহস্যময় মহাবতার বাবাজির ছবির দিকে অনেকটা সময় তাকিয়ে থাকুন তারপর দেখুন কী হয়!
