রহস্যে ঘেরা মানস-কৈলাস
রহস্যে ঘেরা মানস-কৈলাস
ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানেও প্রতিবছর কয়েকশো তীর্থযাত্রী কুমায়ুন হিমালয়ের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম তিব্বতে প্রবেশ করে। উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় থেকে ৯ নম্বর জাতীয় সড়কে আসকোট। তারপর চুলা হাইওয়ে ধরে প্রচুলা পর্যন্ত। তারপর বাকি অংশ কৈলাস মানস সরোবর রোডে লিপুলেখ গিরিপথ পর্যন্ত মোট ১৮০ কিমির যাত্রা। গিরিপথ থেকে সরোবরের দূরত্ব ৯০ কিমি।
৬০০ কিমির অধিক দীর্ঘ পথ এটি। আপনি প্রথমে বিমানে দিল্লি থেকে কাঠমান্ডু চলুন। তারপর নেপাল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বতে প্রবেশ করতে পারেন। কৈলাস ও মানস সরোবর পশ্চিম তিব্বতে অবস্থিত।
কৈলাস গ্যাঙ্গডিস পর্বতের চূড়া, যা তিব্বতের হিমালয় পর্বতমালার একটি অংশ। এটি এশিয়ার বৃহৎ সিন্ধু নদী, শতদ্রু নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ প্রভৃতি প্রাচীন নদীগুলোর উৎসস্থান। একে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং ‘বন’ ধর্ম—এই চারটি ধর্মের তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কৈলাস পর্বতের কাছেই তিব্বতের মানস সরোবর এবং রাক্ষসতাল অবস্থিত।
সংস্কৃতে কেলাস বা Crystal শব্দটি থেকে কৈলাস কথাটির উৎপত্তি। কারণ বরফে ঢাকা কৈলাসকে দেখে মনে হয় স্ফটিক। তিব্বতি ভাষায় এর নাম গাঙ্গো রিনপোচে। তিব্বতে বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভবাকে বলা হয় রিনপোচে। তাঁর থেকেই নামকরণ হয়েছে কৈলাস পর্বতের। অর্থ হল বরফের তৈরি দামি রত্ন।
এটি অত্যন্ত পবিত্র একটি হ্রদ। বৌদ্ধধর্মানুসারে ত্রিপিটকে বর্ণিত পালি ভাষায়, ‘অনবতপ্ত” বা। ‘অনোতত্ত্ব’ হ্রদ হল মানস সরোবর। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে এই মহাপবিত্র হ্রদের কাছেই মায়াদেবী সিদ্ধার্থকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন।
কৈলাস পাহাড়ের আবহাওয়ায় এমন কিছু আছে যাতে নাকি মানুষের চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ দ্রুত ফুটে ওঠে। সাধারণভাবে মানুষের নখ-চুল যে হারে বাড়ে কৈলাস পাহাড়ে অন্তত ১২ ঘণ্টা কাটালে নাকি এই বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ হয়ে যায়। এরকমই হাজারো বিস্ময়ের ধারক ও বাহক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধ্যানস্থ মহাদেবের আবাস কৈলাস পর্বত।
কৈলাস পর্বতকে দেবাদিদেব মহাদেবের আবাস বলে বর্ণনা করেছে হিন্দু পুরাণ। ২২০০০ ফিট উচ্চতাবিশিষ্ট এই পর্বত তার চেহারার দিক থেকেও স্বাতন্ত্রপূর্ণ। তার ওপরে এই পর্বতের সন্নিহিত মানস সরোবরের অবস্থান একে অন্য মহিমা দান করেছে। সবমিলিয়ে কৈলাস এক দুর্লভ তীর্থ। কিন্তু কৈলাসের রহস্যময়তাও কিছু কম নয়। কৈলাস সংক্রান্ত আলোচনায় বার বার উঠে এসেছে এমন কিছু রহস্য, যার সমাধান সম্ভব হয়নি কোনো কালেই।
দেখা যাক কৈলাস-রহস্যের কয়েকটি বিষয়।
এই কৈলাস পর্বতকে মানুষের তৈরি বলেও জানিয়েছেন অনেকেই। কোনো গোপন কাল্টের উপাসনাস্থল হিসেবে তাঁরা কৈলাসকে ব্যক্ত করেন। খুঁটিয়ে দেখলে কৈলাসের আকৃতি যে পিরামিডের মতো তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
পশ্চিম তিব্বতের এই পর্বত কেবল হিন্দুদের কাছেই নয়, জৈন, বৌদ্ধ, তিব্বতের প্রাচীন ‘বন’ ধর্ম—সব ক’টিই কৈলাসকে পবিত্র বলে মনে করে। কৈলাস পর্বতকে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈনধর্মের পবিত্র স্থান হিসেবে মানা হয়। আর হিন্দুরা মনে করে যে, দেবাদিদেব মহাদেব ওখানেই বাস করেন। বৌদ্ধরা মনে করে—কৈলাস পর্বতের অধিষ্ঠাতা দেবতা বুদ্ধ, আর জৈনরা মনে করে—তীর্থঙ্কর ঋষভনাথ এখানেই শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। যে এই পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করেছে তারই নাকি মৃত্যু হয়েছে। শোনা যায়—কয়েক শতাব্দী ধরে বেশ কয়েকজন বেপরোয়া পর্বতারোহী কৈলাসে ওঠার চেষ্টা করেন, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা উধাও হয়ে যান।
কৈলাস পর্বত সম্পর্কে শোনা যায় এই পর্বতে কেউ নাকি উঠতে পারে না, এটাই এই পর্বতের বিশেষত্ব। অন্যান্য পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করা গেলেও কৈলাসে আরোহণ অসম্ভব, অনেকেই চেষ্টা করেছেন, তবে পারেনি কেউই, কিন্তু কেন?
১৯৯৯ সালে রাশিয়ার ডাক্তার মুলদাশিক কৈলাস পর্বতের রহস্য উন্মোচনের জন্য কয়েকজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে কৈলাস পর্বতের আশেপাশে বেশ অনেকদিন অতিবাহিত করেন। ডাক্তার মুলদাশিফ কৈলাস থেকে ফিরে ফিরে এসে একটি বই লেখেন-’Wheree dowe come from’ যেখানে কৈলাস সম্পর্কে অনেক কথা লেখেন তিনি। তিনি লেখেন-কৈলাস পর্বতে প্রাচীন একটি পিরামিড আছে যেটি ছোটো ছোটো আরও অনেক পিরামিড দিয়ে ঘেরা। এটির সূত্র মেক্সিকোর টেওটিহুয়াকান ও গিজা পিরামিডের সঙ্গে যুক্ত
এক ব্রিটিশ গবেষক মানস কৈলাসের তদন্ত করার পর জানান—পিরামিড দিয়ে তৈরি এই পাহাড়ে রাতের নিস্তব্ধতায় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি আজব ফিশফিশের শব্দ আসে। কোনো এক রাতে কৈলাস পাহাড়ের ভেতর থেকে পাথর পড়ার আওয়াজ আসে। উনি আরও লেখেন—’কৈলাস পর্বতের এলাকা সোজাসুজি পৃথিবীর জীবনের সঙ্গে জড়িত। যখন তপস্বীদের রাজ্য তথা পিরামিড আর পাথরের দর্পণকে মিলিয়ে একটি যোজনাবদ্ধ নকশা বানানো হয় তখন সেটা দেখে হয়রান হয়ে যাই। কারণ সেই নকশা ডি.এন.এ. অণুর স্থানিক নকশা ছিল। কৈলাস পাহাড় নিয়ে গবেষণা করা বৈজ্ঞানিক নিকোলাই রোমনভ জানান—কৈলাস পর্বতের চারিদিকে একটি অলৌকিক শক্তি বয়ে চলে।’
কৈলাস পর্বতে বাস হর-পার্বতীর। হিন্দুধর্মের সনাতন বিশ্বাস। আসুন জেনে নিই এই পবিত্র ভূখণ্ড নিয়ে কিছু কথা। শুধু হিন্দুধর্মই নয়। কৈলাস এবং মানস সরোবর পুণ্যভূমি বলে মনে করা হয় বৌদ্ধ জৈন এবং ‘বন’ ধর্মবিশ্বাসেও। ভৌগোলিকভাবে কৈলাস পাহাড় আছে তিব্বত মালভূমিতে চিন-তিব্বত ভূখণ্ডে। ছ’টি পর্বত শ্রেণি পদ্মফুলের পাপড়ির মতো ঘিরে আছে কৈলাস পাহাড়কে। ২২ হাজার ফিট উচ্চতার কালো পাথরের এই পাহাড়কে প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর স্তম্ভ বলে মনে করা হয়। যা নাকি ধরে রেখেছে পৃথিবীর ভর। শুধু ভারতেই নয়, ইউরোপের অকাল্টবাদীরা কৈলাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, এখানে নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত শক্তির অবস্থান। অনেকেই তাই বিনা বাধায় এটা নেনে নিয়েছেন যে এই কৈলাস যাবতীয় অতিপ্রাকৃতের কেন্দ্রবিন্দু।
পুরাণ অনুযায়ী কৈলাস পর্বতের চারটি পাশ স্ফটিক, চুনি, সোনা এবং লাপিস লাজুলি দ্বারা গঠিত। এই তথ্য নিয়ে নানান বিতর্ক আছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে আলো পড়ে এইসব পাথর বা ধাতুর বিভ্রম কৈলাস অবশ্যই তৈরি করে।
কৈলাস অঞ্চলে অবস্থিত হ্রদগুলির আকৃতিও কিন্তু বেশ রহস্যময়। মানস সরোবর পূর্ণ গোলাকার এক জলাশয়। রাক্ষসতালের আকৃতি অর্ধচন্দ্রাকার। এরা নাকি সূর্য ও চন্দ্রের শক্তিকে প্রকাশ করে।
তিব্বতি তান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুযায়ী কৈলাসে তাঁদের দেবতা ডেমচমংয়ের আবাস। হিন্দুদের মতে এখানে বাস করেন শিব। জৈন-ধারণায় কৈলাসের বাসিন্দা তাঁদের প্রথম তীর্থঙ্কর। এই তিন ধর্ম অনুসারে কৈলাসে আরোহণ নিষিদ্ধ। কেবল এটুকুই জানা যায়, ১১ শতকের তিব্বতি মহাযোগী মিলারেপাই একমাত্র কৈলাসে আরোহণ করেছিলেন।
সংস্কৃতে ‘কৈলাস’ থেকে পর্বতের নাম কৈলাস। অনেকে বলেন, ‘কেলাস’ ইংরেজিতে ক্রিস্টাল অর্থাৎ স্ফটিক শব্দটি থেকে কৈলাস’ কথাটির উৎপত্তি। তিব্বতি ভাষায় এর নাম ‘গাংস রিনপোচে’। তিব্বতিতে ‘গাংস’ বা ‘কাং’ শব্দের অর্থ তুষারশৃঙ্গ; আর ‘রিনপোচে’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় অমূল্য কিছুকে সে ব্যক্তি বা বস্তু, যা-ই হোক সম্মান জানাতে। যে কারণে তিব্বতি ধর্মগুরু পদ্মসম্ভবকে বলা হয় ‘গুরু রিনপোচে’ অর্থাৎ ‘অমূল্য প্রভু’। যা-ই হোক, ‘গাংস’ আর ‘রিনপোচে দুয়ে মিলে কৈলাস’ হল ‘তুষারের অমূল্য মণি’।
কিংবদন্তি অনুসারে শুধুমাত্র বৌদ্ধ ধর্মগুরু মহাযোগী মিলারেপাই পা রাখতে পেরেছিলেন কৈলাসশীর্ষে। ফিরে এসে তিনি নিষেধ করেছিলেন এই পর্বত জয় করতে। আধুনিক পর্বতারোহীদের মতে, কৈলাস পর্বতের শীর্ষে ওঠা দুরূহ। পশ্চিম তিব্বতের ৬,৬৩৮ মিটার তথা ২১,৭৭৮ ফুট উঁচু এই পর্বত হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতের প্রাচীন ‘বন’ ধর্ম, সকলের কাছেই এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। হিন্দু পুরাণে কৈলাস পর্বতকে ‘শিবের লীলাধাম’ বলা হয়। শিব ও তাঁর সহধর্মিণী দুর্গা এবং তাঁদের অনুচরেরা কৈলাস পর্বতে বাস করেন। জৈনধর্ম অনুসারে, তাদের প্রথম তীর্থংকর আদিনাথ ঋষভদেব কৈলাসে নির্বাণলাভ করেন। ইউরোপের অকাল্টবাদীরা কৈলাস পর্বতকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, এখানে অতিপ্রাকৃত শক্তির অবস্থান। অনেকের মতে, এই স্থান যাবতীয় অতিপ্রাকৃত ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্র। মোদ্দা কথা, বিশ্ববাসীর কাছে কৈলাসের একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে।
কৈলাসের অদূরেই মানস সরোবর, তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে এর দূরত্ব ১,২১৩ কিমি। পুরাকালে ব্রহ্মা কৈলাস পর্বতে মানসিক শক্তির সাহায্যে এক সরোবর নির্মাণ করেন। ব্রহ্মার মানস-উদ্ভূত, তাই নাম ‘মানস সরোবর’। মানস সরোবর পাহাড়ে ঘেরা হ্রদ বটে, তবে এক সমুদ্র বিশেষ। ৪০০ বর্গকিমিরও বেশি এলাকা জুড়ে এর বিস্তৃতি। দেখতে অনেকটা ডিম্বাকার। পূর্ব দিকে সাড়ে ২৫ কিমি, দক্ষিণে ১৬ কিমি, পশ্চিমে প্রায় ২১ কিমি এবং উত্তরে ২৪ কিমি। কোনাকুনি দৈর্ঘ্য সাড়ে ২২ কিমি থেকে ২৫ কিমি। সাগরবক্ষ থেকে ১৫,০৬০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই হ্রদের সর্বাধিক গভীরতা ৩০০ ফুট পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে। পশ্চিম দিকে রাক্ষসতাল তথা রাবণ হ্রদ ও উত্তর দিকে কৈলাস পর্বত। ১৫,০১০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত রাক্ষসতালও কিছু কম যায় না। এর বিস্তৃতি ২৫০ বর্গকিমি এলাকা জুড়ে।
বাংলা ভাষায় একটা কথা আছে—’মান্ধাতার আমল’। সেই রাজা মান্ধাতাই নাকি প্রথম মানস সরোবরের সন্ধান পান। এই হ্রদের তটেই তিনি ধ্যাননিমগ্ন থাকেন। তাই তাঁর নামে সরোবরের দক্ষিণ তীরের শৈলশ্রেণির নামকরণ করা হয় মান্ধাতা শৈলশ্রেণি, গুরলা মান্ধাতা। পুরাণ মতে, মানস সরোবর ৫১ সতীপীঠের অন্যতম। দেবীর হস্তখণ্ড পতিত হয়েছিল এই স্থানে। মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ এবং ‘কুমারসম্ভব’-এ কৈলাস ও মানস সরোবরের উল্লেখ আছে। সপ্তম শতাব্দীর বিখ্যাত নাট্যকার কবি বানভট্ট তাঁর ‘হর্ষচরিত’ গ্রন্থে মানস সরোবরকে ‘পদ্মদিঘি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এছাড়া অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানও এখানে সাধনা করেছন।
দেবতাত্মা হিমালয়কে আক্ষরিক অর্থে উপলব্ধি করা যায় একমাত্র মানস-কৈলাসে এলেই। কৈলাসের রহস্য অসীম। কিন্তু তার পার্শ্ববর্তী মানসের রহস্যও কিছু কম নয়। এখানে উল্লিখিত হল মানস-সংক্রান্ত রহস্যের কয়েকটি। মানস সরোবরে রাত কাটাতে এসে অনেকেই দেখেছেন রাতের অন্ধকার আকাশে দু’টি উজ্জ্বল আলো দপদপ করছে। একটু নজর করে দেখা গিয়েছে একটি আলো অন্যটিকে অনুসরণ করছে। সাদা রঙের এই আলোগুলি বিন্দুপ্রতিম। কিন্তু এরা এতটাই উজ্জ্বল যে, এদের দিকে নজর যেতে বাধ্য। মাঝে মাঝে এই আলোর দাক্ষিণ্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মানস। চোখ ফেরানো কঠিন হয়ে ওঠে তখন সেই সৌন্দর্য থেকে। এই আলোর প্রকৃত সত্য আজও অনাবিষ্কৃত। লোকবিশ্বাস, ভোর রাতে শিব-পার্বতী মানস সরোবরে অবগাহন করতে আসেন। এই আলোর শিখাই আসলে দেবাদিদেব মহেশ্বর ও পার্বতী। আবার কিছু মানুষের বিশ্বাস—আপনি যদি এই আলোগুলি দেখতে পান তাহলে তা হল কৈলাসে আপনার আত্মোপলব্ধি হয়েছে। শিখাদুটি আত্মোপলব্ধির শিখা। যদিও তা মানতে অনেকেই রাজি নন। অতএব এর পেছনে থেকে যাওয়া প্রকৃত সত্য কী তা আজও অনেকের কাছে অজানা।
প্রায়শই অনেকেই ব্রাহ্মমুহূর্তে মানস সরোবরে জলোচ্ছ্বাসের শব্দ শুনতে পেয়েছেন, তার তীরে তাঁবুতে বাসরত পুণ্যার্থী-পর্যটকদের অনেকেই। কেউ কেউ সেই সময়ে শুনেছেন গহনার ঝনাৎকারও। কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাঁরা সরোবরের জলে আলোড়ন দেখেছেন। কিংবদন্তি অনুসারে ব্রাহ্মমুহূর্তে নাকি সপ্তর্ষিমণ্ডল থেকে সাত ঋষি নেমে আসেন সরোবরের পবিত্র জলে স্নান করতে। এই জলোচ্ছ্বাস নাকি তাঁদেরই দ্বারা সৃষ্ট।
আর একটি বিষয়েও মানস সরোবর অনন্য। খুব খারাপ আবহাওয়াতেও এই সরোবরের জল স্থির থাকে। এমনকি, মানসের যমজ হ্রদ রাক্ষসতাল যখন ঝড়ে-ঝঞ্ঝায় উত্তাল, মানস তখন একাবারেই স্থির। এই রহস্য ভূবিজ্ঞানীদের যথেষ্ট প্রহেলিকায় রেখেছে দীর্ঘকাল ধরে।
আমরা ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি কৈলাস শিব ঠাকুরের বাড়ি। সেখানে দেবাদিদেব মহাদেব জগজ্জননী মাতা পার্বতীকে নিয়ে থাকেন। সেখানে কার্তিক-গণেশ থাকেন। আরও থাকেন ভূতনাথের অনুচর নন্দী-ভৃঙ্গী প্রমুখ। যাই হোক হিন্দুদের চির পবিত্র তীর্থভূমি কৈলাস, সঙ্গে মানস সরোবর। কত সাধু-সন্ত এখানে তপস্যা করেছেন যুগে যুগে। কৈলাস ও মানস সরোবর এখন ভারতের অংশ নয়। কারণ চিন তিব্বত দখলের পর হিমালয়ের ওই অংশ এখন চিনের।
হিন্দুদের প্রাচীনতম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ঋগবেদ কৈলাস কিংবা মানস সরোবরের কথা না থাকলেও মেরু পর্বতের কথা আছে। অনেকে এই মেরু পর্বতকেই বেদের দেবতা রুদ্রের আবাস্থল গণ্য করেন। ঋগবেদের রুদ্র শিবেরই সমার্থক। সেকালে সুমেরু পর্বতকে পৃথিবীর মধ্যবিন্দু হিসেবে গণ্য কর হত। পৌরাণিক যুগে এসে আমরা কৈলাস ও মানস সরোবরের নানা বর্ণনা পাই। বাল্মীকি রামায়ণের বালকাণ্ডে সরযু নদীর উৎপত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে ব্রহ্মা কৈলাস পর্বতে তার মন থেকে এক সরোবর সৃষ্টি করেছেন, তাই তার নাম মানস সরোবর। সরোবর থেকে নিঃসৃত নদী তাই তার নাম সরযু।
এই মানস সরোবর থেকে উৎপত্তি হয়েছে মহাপবিত্র চারটি নদী যথাক্রমে: সাংপো বা ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, শতদ্রু এবং বর্ণলী বা ম্যাপ ছু। এই বর্ণলী নদী নেপাল হয়ে ভারতে এসে মেশে কালী নদীর সঙ্গে আর কালী নদীর উপনদী হল সরযূ। বাল্মীকি রামায়ণে এসব পৌরাণিক ভাষায় প্রায় হবহু বর্ণিত আছে। মহাভারতের বিখ্যাত রাজা মান্ধাতা প্রথম মানস সরোবরের খোঁজ পান। তিনি সেখানে তপস্যা করেন, তাই তার নামে সরোবরের দক্ষিণ তীরের শৈলশ্রেণির নামকরণ করা হয়, যার নাম গুরলা মান্ধাতা।
এখানে কৈলাসকে দেবাদিদেব শিব জ্ঞানে পুজো করা হয়। তীর্থযাত্রীরা বেলপাতা ধূপ কর্পূর ইত্যাদি সঙ্গে করে নিয়ে যান। এখানে অনেক সাধনগুহা আছে। বহু সাধক এখানে সাধনা করেছেন। তার মধ্যে একজন হলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ। তিনি প্রথম কৈলাসে যান ১৯২৮ সালে, তারপর ১৯৩৬-৩৭ সালে এবং তৃতীয়বার ১৯৪৩-৪৪ সালে। তিনি এখানে সাধনভজন করেন, নৌকো নিয়ে মানস সরোবর ভ্রমণ করেন। তিনি প্রথম বর্ণনা করেন কীভাবে শীতকালে সরোবরের জল জমে যায় আবার কেমন করে সেটা গলে জল উৎপন্ন হয়। তিনি ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, শতদ্রু এবং বর্ণলী নদীগুলির উৎসমুখ পরিদর্শন করে তার সঠিক বিবরণ দেন। ১৯৩৮ সালে তাঁর ‘Pilgrims companion to the holy kailas and manasarovar’ বইটি প্রকাশিত হয়। ১৯৩৯ সালে বের হয় ‘Exploration in tibet’। তিনি এই অঞ্চলের সঠিক মানচিত্র তৈরি করেন, যেটি সার্ভে অফ ইন্ডিয়া নির্ভুল বলে গণ্য করে। ১৯৪৯ সালে তার “kailas manasarovar’ প্রকাশিত হয় ইংরেজিতে।
এই পবিত্র মানস সরোবরে স্নান করে তীর্থযাত্রীরা কৈলাস শিখরের দিকে মুখ করে বসে শিবপুজো করে থাকেন।
পুরাণ মতে মানস সরোবর ৫১ পীঠের অন্যতম একটি পীঠস্থান। এই পীঠের দেবী দ্রাক্ষায়ণী ভৈরব অমর। সরোবরের পশ্চিম তীরে একটি ছোটো পর্বতে অনেকগুলি গুহা আছে। তার মধ্যে সব থেকে বড়ো যেটি সেখানে রয়েছে হর পর্বতীর মূর্তি ও শিবলিঙ্গ। ওপরে একবার বলে এসেছি কোন কোন পুরাণে সুমেরু পর্বতকে কৈলাস পর্বত বলা হয়েছে। ব্রহ্মপুরাণের ৩৯তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে—সুমেরু পর্বতে জ্যোতিস্থল নামে এক রত্নময় বিচিত্র শৃঙ্গ আছে। ওই শৃঙ্গ সর্ব লোকের নমস্কৃত, অপ্রমেয় ত্রিলোকবাসীরা এর পুজো করে থাকে। পুরাকালে দেবাদিদেব মহাদেব ওই রত্নখচিত গিরিতটে উপবিষ্ট ছিলেন। তার পাশেই বসেছিলেন দেবতারা। এছাড়া ছিলেন অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং কৈলাসের রাজা বৈশ্রবণ। সবাই মহাদেবের উপাসনা করেছিলেন। মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সময় অর্জুন হিমালয় এবং তিব্বত অঞ্চল জয় করে ওই স্থানের রাজাদের থেকে যজ্ঞের জন্য বহু ধনরত্ন নিয়ে আসেন। ব্যাসদেবও কৈলাসে গিয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে নিয়ে কৈলাস ভ্রমণে যান।
কৈলাসের অবস্থান ইয়ালাং-সাংপো সন্ধিতে, এখানেই ইওসিন যুগের মহাদেশগুলো মিলিত হয়েছিলো আর আশেপাশের পাললিক শিলার রূপান্তর ঘটিয়েছিল। এই কংগ্লোমারেটের সঙ্গে শিলার ভার্টিক্যাল জয়েন্ট একত্রিত হয়ে, বরফ আর শিলার গায়ে তৈরি করেছিল একটা স্বস্তিকা। স্বস্তিকা, যেটা পবিত্রতার চিহ্ন, প্রায় সব কয়টি ধর্মে। স্বস্তিকা, যেটাকে গত শতাব্দীতে নাৎসিরা ব্যবহার করেছিল।
তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম নিয়ে এসেছিলেন যে পদ্মসম্ভব আর প্রথম জৈন হিসেবে খ্যাত তীর্থংকর, দুজনেই এখানে বোধিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। আঞ্চলিক তিব্বতীয় বনপো ধর্মের মানুষ একে ডাকে নয়তলা স্বস্তিকা পর্বত নামে। এর চূড়াতে কোনো বরফ জমে না, কারণ এটা এতটাই খাড়া। বরফ নীচে পড়ে যায়, গলে যায়, আর উৎপত্তি হয় পবিত্র সেই নদীগুলোর। এই মরুভূমির মতো এলাকাতে এটাই শ্বেতশুভ্র পর্বত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, হিমালয়ের প্রথম ও প্রধান রেঞ্জ হিসেবে।
কেউ এখন পর্যন্ত এর চূড়ায় ওঠেনি, যদিও লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী হাজার হাজার বছর ধরে এই সরোবরের চারপাশে ঘুরেছে, জ্ঞান আর পুনর্জন্মে সুখী হবার আশায়। অনেকেই বারবার অবনত হয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেছে এর চারপাশে যে ৫০ কিলোমিটার ট্র্যাক আছে, সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে। পর্বত আরোহণ জগতের বিখ্যাত নক্ষত্র রেইনহোল্ড মাইসনার এর চূড়াতে আরোহণ করার জন্য চায়না সরকারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।
২০১৫ সালে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার জন্য তিব্বত যাওয়ার দ্বিতীয় নাথুলা পাস খুলে দিয়েছিল চিন। ৫৩ বছর পর পর্যটকদের জন্য খুলে দেয় এই পথ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ মিটার উচ্চতায় সিকিমের এই নাথুলা পাসের উদবোধনের কথা চিন সফরের সময় ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ২০১৩ সালে উত্তরখণ্ডে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই নাথুলা পাস। উদ্বোধনের পর নাথুলা পাস পেরিয়ে তিব্বতে যান ৪৪ জন তীর্থযাত্রী। প্রথম দফায় কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার অনুমতি পেয়েছিলেন ২৫০ জন তীর্থযাত্রী। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে বয়স্ক মানুষ বেশি থাকেন। তাই বয়স্কদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেয় চিনা দূতাবাস। প্রথম পদযাত্রী হিসেবে নাথু লা পেরোন ভারতের চিনা রাষ্ট্রদূত লে ইউচেং। এই পথের সাহায্যে নাথুলা থেকে কৈলাসের ১,৫০০ কিলোমিটার পথ বাসে যাতায়াত করতে পারবেন তীর্থযাত্রীরা। এই পথ পুরোনোটির থেকে বেশি সুরক্ষিত বলে জানিয়েছেন লে ইউচেং। এর মধ্যেই তিব্বতে শুরু হয়ে যায় নতুন ভারতীয় হোটেল তৈরি, গাইডদের ট্রেনিং দেওয়ার কাজ। পুরোনো পথে দুর্গমতা সত্ত্বেও গত এক দশকে ৮০,০০০ মানুষ কৈলাসযাত্রা করেন। প্রতি বছর ১৮টি দলে মোট ১০০০ জন তীর্থযাত্রী কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার অনুমতি পান বলে জানিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। ২৩ দিনের তীর্থে মাথাপিছু খরচ পড়ে প্রায় ২ লক্ষ টাকা।
উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস এবং সিকিমের নাথুলা দিয়ে মানস সরোবর যাওয়া যায়। ২০১৭ সালে ডোকা লা সমস্যা চলাকালীন নাথুলা দিয়ে ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের মানস সরোবর যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয় চিন।
মানস কৈলাস আপনি চাইলেই যেতে পারবেন এমনটা মোটেও নয়। অনেক নিয়ম বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পৌঁছোতে হয় কৈলাস। সবচেয়ে বড়ো কথা মহাদেব যদি চান তবেই আপনার যাত্রা সফল হবে।
জাতি-ধর্ম -বর্ণ নির্বিশেষে মানস কৈলাস এক বিচিত্র জায়গা। দেবাদিদেব মহাদেবের তপস্যাস্থল। অতএব যখনই কৈলাস যাবেন একগুচ্ছ বিস্ময় আপনার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে।
