রহস্যময় মন্ত্র ‘ওম মণিপদ্মে হুম’
রহস্যময় মন্ত্র ‘ওম মণিপদ্মে হুম’
হিমালয়ের পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে গেলে দেখবেন অজস্র জায়গায় একধরনের কাপড়ের চেন ফ্ল্যাগ ঝুলছে। যাকে তিব্বতিরা ‘প্রেয়ার হুইল’ বলে। এই প্রার্থনা পতাকা কারও কারও গাড়িতেও ঝোলানো থাকে। বাইকের সামনে, বাড়ির দরজায় ঝোলানো থাকে। আর সেই ফ্ল্যাগগুলির নান-রঙের ছোট্ট ছোট্ট বক্সের মত অংশটিতে লেখা থাকে “ওম মণিপদ্মে হুম” কথাটি। প্রচুর বৌদ্ধ মনাস্ট্রির দরজায়, মঠের দেয়ালেও লেখা থাকে এই কথাটি। এই কথাটির মানে কী?
হিমালয়ের অজস্র মঠ মনাস্ট্রি ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে আজ ‘ওম মণিপদ্মে হুম’ মন্ত্রটির নেপথ্যের যে বিরাট ইতিহাস ও মিথ লুকিয়ে আছে সেই গল্পেরই কিছু অংশ এটি। কারণ এই শব্দটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে হলে আস্ত একখানা বই লেখা হয়ে যাবে।
হাজার হাজার বছর ধরে হিমালয়ের উত্তর অংশে দাঁড়িয়ে আছে তিব্বত নামের রহস্যময় এক রাজ্য। আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগের কথা। দুর্গম পর্বতমালা, কঠোর আবহাওয়া, তুষারের শীতলতাসহ সকল প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে, ক্লান্তিকর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে, ভারতের বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং-এর দুর্গম রাস্তা ধরে ১০৪২ সালে আমাদেরই বাংলাদেশের এক কৃতি সন্তান পৌঁছোলেন তিব্বতে। সঙ্গে সঙ্গে একদল ঘোড়সওয়ার ছুটে এসে তাঁকে অভ্যার্থনা জানাল। সেই ঘোড়সওয়ারদের হাতে তীক্ষ্ণ বর্ষার মাথায় পতপত করে উড়ছে শ্বেত পতাকা, সুর তোলা বাদ্যযন্ত্রে বাজছে স্বাগত বাজনা আর সেই সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে পবিত্র মন্ত্র—’ওম মণিপদ্মে হুম।’
তিব্বতের গু-জে-এর রাজা স্বয়ং গার্ড অব অনার দিয়ে বরণ করেছিলেন বাংলার এই জ্ঞানতাপসকে, নাম তাঁর শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। অতীশ দীপঙ্করের জন্ম বাংলার বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে। তাঁকে ‘11th century Tibetan Buddhist master’ বা ‘একাদশ শতাব্দীর তিবেতান বুদ্ধগুরু’ বলা হয়।
ওম মণিপদ্মে হুন মন্ত্রটি বাংলার বজ্রযানী তান্ত্রিক বৌদ্ধদের মন্ত্র হলেও বহির্বিশ্বে এই মন্ত্রকে তিব্বতের মন্ত্র হিসেবেই সবাই জানে।
খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ শতক থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ এই ৮০০ বছর ধরে তৎকালীন বাংলায় বৌদ্ধ ভাবধারা বিস্তার লাভ করে। আর সেই সময়ে বাংলায় ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে। বৌদ্ধরা দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি ‘মহাযান’ ‘এবং অন্যটি ‘হীনযান’। ‘মহাযান’ অর্থ-’মহৎ মার্গ’ অর্থাৎ যে মহৎ পথে যান বা শকট চলে সেই পথ। মহাযানীরা মনে করেন প্রতিটি মানুষের ভেতরেই বুদ্ধ বিদ্যমান। সে বুদ্ধত্ব অর্জন করতে হলে দরকার সাধনা ও জ্ঞানের, প্রজ্ঞার। যে ব্যক্তি বুদ্ধ নির্দেশিত নির্বাণে উপনীত হতে এবং বুদ্ধত্ব লাভে আগ্রহী, সে যে মহৎমার্গ বা উপায় অবলম্বন করে তারই নাম ‘মহাযান’। হীনযানীরা বুদ্ধত্ব লাভে আগ্রহী নয়, তারা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের এবং তপস্যার মাধ্যমে নির্বাণ লাভে আগ্রহী। এজন্য মহাযানীরা এ মতকে হীন মনে করে। দুটি সম্প্রদায়ের বিভক্তির এটিই মূল কারণ।
৫২০ খ্রীষ্টাব্দে গুপ্তযুগের পতনের পরে ভারতবর্ষে ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বেশ অবনতি ঘটেছিল। গুপ্তযুগের সমাপ্তির পর থেকেই মায়াবিদ্যা ও যৌন-অতীন্দ্রিয়বাদের আদিম ধারণা ভারতীয় ধর্মে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল।
এই ধারণা বৌদ্ধমতকেও প্রভাবিত করেছিল। যার ফলে অষ্টম শতকে বাংলা ও বিহারে মহাযান বৌদ্ধধর্ম পরিবর্তিত হয়ে ‘বজ্রযান’ নামে একটি মতবাদ গড়ে ওঠে। বিক্রমপুর বা বিহারের বিক্রমশীলা মঠটি ছিল বজ্রযানী বৌদ্ধদের অন্যতম সাধনমার্গ। একাদশ শতকে এই মঠের বজ্রযানী সাধকগণ তিব্বতে ধর্ম প্রচার করতে গিয়েছিলেন। তাদেরই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অতীশ দীপঙ্কর। এই বজ্রযানী সম্প্রদায়ের প্রধান মন্ত্র হল, ‘ওম মণিপদ্মে হুম’। যার শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় ‘মণিই প্রকৃত পদ্ম। কিন্তু এই মন্ত্রের মাঝেই লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ বজ্রযান তথা বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষা।
‘ওম মণিপদ্মে হুম’ ছয়টি শব্দাংশের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংস্কৃত মন্ত্র, যা বৌদ্ধ সভ্যতার চার হাতওয়ালা ছায়াদেবতা ‘অবলোকিতেশ্বর’-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। অবলোকিতেশ্বর হলেন বোধিসত্ত্বগণের অন্যতম। যিনি সকল বোধিসত্ত্বের মধ্যে প্রকাশমান করুণার আধার। মূলধারার মহাযান বৌদ্ধধর্মে ইনিই হলেন সর্বাধিক পূজিত বোধিসত্ত্ব এবং সর্বাপেক্ষা অধিক সমাদৃত। অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্ব প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে যতক্ষণ এই পৃথিবীতে একটিও প্রাণী বদ্ধ থাকবে ততক্ষণ তিনি নির্বাণলাভ করবেন না। অবলোকিতেশ্বর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন তিব্বতি ভাষায় তাঁর নাম ‘চেনারেজিং’।
তিনি হাতে পদ্ম ধারণ করে থাকেন বলে কখনো ‘পদ্মপাণি’ হিসেবেও অভিহিত হন। আবার তিনি লোকেশ্বর অর্থাৎ জগতের প্রভু নামেও পরিচিত। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মানুসারে অবলোকিতেশ্বর দলাই লামা এবং কারমাপা রূপে জীবকুলের মঙ্গলার্থে এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন।
বজ্রযানীগণ বিশ্বাস করতেন দেবদেবীদের করুণা ভিক্ষা করে লাভ নেই। এদের বাধ্য করতে হবে। যে গ্রন্থে এই বাধ্য করার উপায় সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে তাকে বলা হয় ‘তন্ত্র’। মন্ত্র এবং যন্ত্র -এ দুই হল বজ্রযানের সাধনার উপকরণ। যে কারণে বজ্রযানকে বলা হয় ‘তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম’। আর ‘যন্ত্র’ হল ‘মোহিনী প্রতীক’, যা সঠিকভাবে আঁকতে হয়। মোহিনী প্রতীক হল ‘Religious Symbolism’, যা মার্কিন লেখক ড্যান ব্রাউন আধুনিক পাঠকের কাছে অনেকাংশে পরিচিত করে তুলেছেন। আর পদ্মকে বৌদ্ধধর্মে বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বজ্রযানীদের প্রধান দেবী হলেন তারা। ইনি ছিলেন বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বদের স্ত্রী। মাতঙ্গী, পিশাচী, ডাকিনী, যোগীনি প্রমুখ তুচ্ছ দেবীও বজ্রযানীদের আরাধ্য ছিল। “ওম মণিপদ্মে হুম’ মন্ত্রটি বুদ্ধ এবং প্রজ্ঞাপারমিতার এবং বোধিসত্ত্ব এবং তারাদেবীর মিলনের প্রতীক।
মহাযানী পন্থার অন্যতম দেবী ছিলেন প্রজ্ঞাপারমিতা। মহাযানীরা বুদ্ধত্ব লাভে আগ্রহী এবং বোধিসত্ত্ব মতবাদে বিশ্বাসী। বোধিসত্ত্ব হচ্ছেন তিনি, যিনি বারবার জন্মগ্রহণ করেন এবং অপরের পাপ ও দুঃখভার গ্রহণ করে তাদের কামনা বাসনাদূর করেন। মহাযানীপন্থায় যে কয়েকজন বোধিসত্ত্ব রয়েছেন তার মধ্যে অবলোকিতেশ্বর, মঞ্জুশ্রী এবং বজ্রপাণি প্রধান। প্রজ্ঞাপারমিতাকে বোধিসত্ত্বেরই গুণাবলির মূর্ত রূপ বলে মনে করা হত। বোধিসত্ত্বদের স্ত্রী কল্পনা করা হয়েছিল।
এই দেবীই ছিলেন দেবতাদের প্রকৃত শক্তি। দেবতাকে মনে করা হত সুদূর এবং অজ্ঞেয় এবং দেবীকে সক্রিয় মনে করা হত। মহাযানীরা বিশ্বাস করতেন যে দেবতাকে পেতে হলে দেবীর সাহায্য নিতে হয়। আর তারজন্য প্রধান্য দেওয়া হয়েছিল অতীন্দ্রিয়বাদ।
সে যাই হোক, “তম মণিপদ্মে হুম’ মন্ত্রটিকেই বুদ্ধ ধর্মের সকল শিক্ষার বীজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওম, মা, নি, পদ, মে, হুম এই ছয়টি শব্দাংশের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রটির প্রতিটি শব্দাংশ আলাদা আলাদা শিক্ষা প্রদান করে। শব্দগুলো সাধারণত কিছু পবিত্র পাথর, যা ‘মণি পাথর’ নামে অভিহিত করা হয় তার গায়ে খোদাই করা থাকে। অথবা কাগজ বা কাপড়ে লিখে প্রার্থনাচক্রে বা প্রেয়ার হুইলে লাগানো থাকে। এই মন্ত্রটি চক্রে একবার ঘোরানো হলে এর পর যতবার ঘুরতে থাকে ততবারই মন্ত্রটি উচ্চারিত হয় বলে ধারণা করা হয়। শব্দগুলোকে বিভিন্ন বৌদ্ধ মনাস্ট্রিতে নানাভাবে অনুবাদ করে থাকে।
অনেক ভাষাবিদই মনে করেন যে ‘মণিপদ্ম’ একটি যৌগিক শব্দ। সংস্কৃতে কোনো বড়ো হাতের অক্ষর না থাকায় মন্ত্রটি অনুবাদ করতে গিয়ে বড়ো ও ছোটো হাতের অক্ষরজনিত কারণে এর ভাবার্থ পরিবর্তিত হয়ে যায়।
‘মণিপদ্ম’-কে একত্রে ‘পদ্মের রত্ন’ বা ইংরেজিতে ‘লোটাস ইন দ্য জিয়েল’ বলা হয়। সংস্কৃতে ‘মণি’-কে কখনো কখনো দেবী চিন্তামণির সঙ্গেও তুলনা করা হয়ে থাকে; পদ্মফুলের মাঝে যার অবস্থান।
ডোনাল্ড লোপেজের মতে, বৌদ্ধসভ্যতার দেবতা অবলোকিতেশ্বরের একটি উপাধিকে নির্দেশ করে মণিপদ্ম। এটি পূর্বে ‘ওম’ ও পরে ‘হুম’ শব্দের মাঝে অবস্থিত, যা ভাষাগত অর্থ ছাড়াই ব্যবহৃত হয়।
লোপেজ আরও বলেন যে, অধিকাংশ তিব্বতি বৌদ্ধগ্রন্থে মন্ত্রকে অনুবাদ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন—চেংরিগ সাধনায় এই ছয়টি শব্দ ছয়টি রাজ্যের অস্তিত্বের প্রতিনিধিত্ব করে।
পদ্মফুল বিশুদ্ধতার প্রতীক। সুতরাং ‘প্রকৃত পদ্ম’; মানে ‘প্রকৃত বিশুদ্ধতা’ হতে পারে। তাহলে ‘মণি” শব্দটি কী অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, এই মন্ত্রের মধ্যেই বুদ্ধের শিক্ষা রয়েছে। বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বুদ্ধ-প্রকৃতি বিদ্যমান। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই বিশুদ্ধতার বীজ রয়েছে, এটার উন্নয়ন সাধন করে বুদ্ধত্বে রূপান্তরিত করতে হবে। আমাদের সাধারণ দেহ, বাক্য ও মন বিশুদ্ধ হয়ে রূপান্তরিত হবে বুদ্ধের পবিত্র দেহে, বাক্যে ও মনে। আর ‘ওম মণিপদ্মে হুম’ সেই পথটির অনুশীলন করে।
স্বামী শিবানন্দ এক লেখায় লিখছেন, ওম মানে হল ‘সব’ বা অল। ‘ওম’ হল ইশ্বর ও ব্রহ্মার নাম ও প্রতীক। ‘ওম’ হল জগতের আদি নামশব্দ কিংবা উচ্চারণ। ওম মানবের ত্রিগুণিত অভিজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। ওম থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সমগ্র মহাবিশ্ব টিকে আছে এই ‘ওম’-এর ওপর আবার বিলীনও হবে ‘ওম’-এ।
ওম শব্দটিকে বিচ্ছেদ করলে আমরা পাই। এখানে ‘অ’ ‘বিষ্ণু’, ‘উ’ ‘মহেশ্বর বা শিব’ ও ‘ম্’ ‘ব্রহ্ম’-কে নির্দেশ করে। একে মনে করা হয় সকল মন্ত্রের আদি ধ্বনি। সামবেদের শব্দ অবয়বের প্রথম অবয়ব ওম। ভাগবত অনুসারে পরমেষ্ঠ আত্মসংযম করার পর, তাঁর হৃদয়াকাশ হতে এই শব্দ উৎপন্ন হয়েছিল। হৃদয়াকাশে আত্মার নিকট হতে এর উৎপত্তি। এটি নিজের আশ্রয় ও সাক্ষাৎ ব্রহ্মবাচক; সৰ্ব্বমন্ত্র ও উপনিষদ স্বরূপ। এটিই বেদের সনাতন বীজ।
‘অ’ শারীরিক সমতলকে প্রতিনিধিত্ব করে। ‘উ’ মানসিক এবং নাক্ষত্রিক সমতল, বুদ্ধিমান আত্মার জগৎ, সকল স্বর্গ। ‘ম’ গভীর ঘুমের দশা-কে প্রতিনিধিত্ব করে, এমনকি সকল কিছু যা কিনা জাগ্রত অবস্থায়ও অজানা, এবং সেইসব কিছু যা কিনা আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির নাগালেরও বাইরে। এইভাবে ‘ওম’ ই সব আমাদের জীবন, চিন্তন ও বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি। সমগ্র বিশ্বজগৎ ‘ওম’ থেকে উদ্ভূত, ‘ওম’এ অবস্থিত এবং ‘ওম’ এই বিলীন হবে।
‘মণি’ শব্দের অর্থ রত্ন, ফসিল, কেউ কেউ একে বীজকোশও বলে থাকেন। বিশুদ্ধ রত্ন হল ভালোবাসা ও দয়ার প্রতীক। এবং তা জ্ঞানদীপ্ত হওয়ার বাসনাকে প্রতীকী রূপ দান করে। ‘মণি’ হল ‘মায়া’, ‘বাসনা’, ‘সংসার’ও ‘নির্বাণ’-এর উদ্ভব।
পদ্মে’ মানে, কমল যা কিনা প্রজ্ঞার, জ্ঞানের, উদ্দীপনার প্রতীক। একটি পদ্মফুল যেমন পাঁক থেকে ওঠে তেমনি প্রজ্ঞাকে মানব অবস্থা থেকে স্বর্গীয় গুণ অর্জন করা পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়। সকল প্রজ্ঞার মূল প্রজ্ঞা হল ‘নীরবতা ও শূণ্যতার প্রজ্ঞা’। ‘পদ্মে’ মানে শূন্যতা।’ হম’ প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক পদ্ধতির সংযুক্তি ঘটায়। এটা অবিভাজ্যতা, স্থবিরতা, যাকে আন্দোলিত করা যায় না। এটা জ্ঞানদীপনের মননকে উপস্থাপন করে। ‘হুম’ যন্ত্রণাকে ধ্বংস করে।
বৌদ্ধ শাস্ত্রে একে এভাবেও দেখা হয়ে থাকে—’ওম মণিপদ্মে হুম’ অর্থাৎ দেবকুলে(ওম), অমরকুলে(ম), মানুষরূপে(নি), পশুরূপে(প), হতাশরূপে (দ্মে), নারকিরূপে(ছম বা হ্রং) -পুনর্জন্ম নিরোধ করে। এই মতানুসারে পুনর্জন্মের ছয় অবস্থাসূচক ছয় বর্ণ উক্ত ছয় অক্ষরে আরোপিত হয়ে থাকে। আবার কখনো একে বৌদ্ধশাস্ত্রের আত্মায় ছয়টি পরিশোধনের নির্দেশক হিসেবে ভাবা হয়। এই ছয়টি পরিশোধন হল—গৌরব বা অংহ (এম), ঈর্ষা বা কাম (মা), আবেগ বা আকাঙ্খা (নি), অজ্ঞতা বা কুসংস্কার (প), লোভ (স্মে), ঘৃণা (হুম)। কখনো একে বৌদ্ধধর্মের ছয়টি রঙের নির্দেশক হিসেবে কল্পনা করা হয় সাদা (ওম), সবুজ (ম), হলুদ (নি), নীল (প), লাল (স্মে), কালো(ম)। এখানে কালো মূলত বাকি পাঁচটি রঙের সমন্বয় হিসেবে দেখানো হয়।
কখনো মহাযানীদের ছয় পারমিতাকে এই ছয়টি শব্দাংশ দ্বারা নির্দেশিত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই ছয় পারমিতা হল-দান (ওম), শীল (ম), ক্ষাস্তি (নি), বীর্য(প), ধ্যান (স্মে) ও প্রজ্ঞা (ম)। এই ছয় পারমিতার মধ্যে প্রজ্ঞাপরিমিতাকে মূখ্য রুপে দেখা হয়েছে। প্রজ্ঞা পারমিতার মৌলিক অর্থ হচ্ছে জ্ঞানের পূর্ণ পরাকাষ্ঠা অর্থাৎ উচ্চতর জ্ঞান লাভের উপায়, যা শূন্যতার প্রতিপাদক। প্রজ্ঞাপারমিতার বুৎপত্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে “অষ্ঠ সহস্র প্রজ্ঞাপারমিতা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে সর্বধর্ম অনুপলদ্ধকে প্রজ্ঞা পারমিতা বলা হয়েছে। এর গুরুত্ব প্রতিপাদনে শত সাহসিকা প্রজ্ঞাপরিমিতাতে বলা হয়েছে চন্দ্র, সূর্য যেমন চতুদ্বীপ উদ্ভাসিত করে তদ্রূপ প্রজ্ঞাপরিমিতা ও অন্য পারমিতা সমূহকে পরিশোধিত করে।
বৌদ্ধ মন্ত্র ‘ওঁ মণিপদ্মে হুম’ শরীরের অভ্যন্তরে প্রজ্ঞা ও করুণার মিলন। বৌদ্ধতন্ত্রে বজ্ৰ, মণি এই শব্দগুলো লিঙ্গের প্রতীক। আর যোনি বোঝাতে ব্যবহৃত হয় পদ্ম, ত্রিভূজ। দেহতত্ত্বের এই সাধনায় সুষুম্না কাণ্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সুষুম্নার বাঁয়ে ইড়া, ডানে পিঙ্গলা ও ভেতরে চিত্রিণী ও বজ্রাখ্যা নাড়ি অবস্থিত। বজ্রযান, কালচক্রযান ও সহজযানে এই নাড়িগুলোকে প্রায়ই নদী বলে উল্লেখ করা হয়। সুষুম্নায় থাকে সাত পদ্ম, নারীত্বের সাত কেন্দ্র। মূলাধার(কক্সিস),সাধিষ্ঠান(অণ্ডাশয়), মণিপুর(নাভি), অনাহত (হৃদয়), বিশুদ্ধ (কণ্ঠ), আজ্ঞা (কপাল) ও সহস্রার (মস্তিষ্ক)। এইসব পদ্মের দলসংখ্যা আলাদা। সহস্রার পদ্মের দলসংখ্যা হাজার, তাই এর অন্য নাম সহস্রদল পদ্ম। বৌদ্ধ তন্ত্রে চারটি চক্র ধরা হয়। নির্মাণচক্র (নাভি), ধর্মচক্র (হৃদয়), সম্ভোগচক্র (কণ্ঠ) এবং মহাসুখচক্র (মস্তিষ্ক)। ইড়া-পিঙ্গলা সুষুম্না বৌদ্ধতন্ত্রে হয়ে যায় ললনা-রসনা-অবধূতী। মূলাধারে সুপ্ত নারীত্ব কুলকুণ্ডলিনীকে মস্তিষ্কে প্রেরণ করাই তন্ত্রসাধনা। এখানেই মিলিত হয় পুরুষ ও প্রকৃতি। নাথেরা বলেন শিব-শক্তির মিলন। বৌদ্ধদের কাছে করুণা (পুরুষ) ও প্রজ্ঞার (নারী) এই মিলনই মহাসুখ। বৌদ্ধমন্ত্র ‘ওঁ মণিপদ্মে হুম’ শরীরের অভ্যন্তরে প্রজ্ঞা ও করুণার মিলনেরই প্রতীক। এইপুরুষ আদি বুদ্ধ বা বজ্রধর। তাঁর সাধনসঙ্গিনী প্রজ্ঞাপারমিতা। আদি বুদ্ধর অধীনে আছেন পাঁচ দিকের অধীশ্বর পঞ্চ ধ্যানী বুদ্ধ। পূর্বে অক্ষোভ্য (রং নীল, সঙ্গিনী-লোচনা), পশ্চিমে অমিতাভ (রং– লাল, সঙ্গিনী—পাগুরা), উত্তরে অমোঘসিদ্ধি (রং সবুজ, সঙ্গিনী শ্যামা তারা), মধ্যে বৈরোচন (রং—সাদা, সঙ্গিনী—শ্বেততারা) ও দক্ষিণে রত্নসম্ভব(রং—হলুদ, সঙ্গিনী—মামকী)।
এই বিমূর্ত প্রজ্ঞাপারমিতা মূর্ত হয়ে ওঠেন তারাদেবীতে, যিনি শেষদিন অবধি ছিলেন অতীশ দীপঙ্করের প্রেরণা। পঞ্চ ধ্যানীবুদ্ধ ও বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বরের প্রভাব। ছিল অতীশের ওপর। অতীশকে বুঝতে তাঁর অতীশ কি পঞ্চ ‘ম’-কারের সাধনা করতেন? মানে মাছ, মাংস, মদ, মুদ্রা ও মৈথুন। তান্ত্রিক অতীশকে জানা যায় না বিশদে। এই পথ তিনি ধরেছিলেন না ছেড়েছিলেন তা নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। তবে অতীশ চিরকাল প্রাচীন সনাতন বৌদ্ধধর্মে আস্থাশীল ছিলেন।
অদ্বয়বজ্র ও রাহুলগুপ্তর কাছে তন্ত্রশিক্ষার পর গুহ্যজ্ঞানবজ্র শ্রামণ্য নেন। ওদন্তপুরী মহাবিহারের আচার্য শীলরক্ষিতের কাছে ভিক্ষুধর্মে দীক্ষান্তে নাম হয় অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। বয়স তখন ঊনত্রিশ। দুবছরে মহাযান ও হীনযান বৌদ্ধধর্মে অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করেন অতীশ। এমনটাই দাবি করেছেন তিব্বতিয় ঐতিহাসিকরা। সুবর্ণদ্বীপে আচার্য ধর্মকীর্তির কাছেও শাস্ত্রশিক্ষা করেন বারো বছর। চুয়াল্লিশ বছর বয়সে ভারতে ফিরে অতীশের বাকি জীবনের অনেকটাই কাটে বিক্রমশীল মহাবিহারে। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় অতীশ বিক্রমশীলেই তৎকালীন পাল রাজা নয়পাল ও কলচুরি রাজ কর্ণের মধ্যে এক কূটনৈতিক মৈত্রীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। আনুমানিক ১০৪২ সালে প্রায় ষাট বছর বয়সে তিব্বত যাত্রা করেন অতীশ। মহাযানী বৌদ্ধ ধর্মে, ব্যক্তিগত অহমিকা বর্জন করে যারা আর্তের সেবায় নিয়োজিত হন তারাই বোধিসত্ত্ব হিসেবে পরিচিত। এই বোধিসত্ত্বরা গভীর শ্রদ্ধায় পূজিত হন মহাযানী বিশ্বে। সম্ভবত আর্তের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা বোধিসত্ত্বদের জীবন থেকেই পেয়ে থাকবেন অতীশ। এর আগে শান্তরক্ষীত, পদ্মসম্ভব ও কমলশীল তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। বিশেষ করে তিব্বতে বজ্রযানী বৌদ্ধধর্মের প্রবক্তা পদ্মসম্ভব বা গুরু রি পো চে ক্রমশ কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। তিব্বতের প্রাচীন পোন ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের সংঘাত অনিবার্য ছিল। পরে বজ্রযানী তান্ত্রিকরাও নানা উপদলে ভেঙে যায়। মারণ, বশীকরণ, নারী সম্ভোগে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অতীশ তিব্বতে বিভিন্ন মনাস্ট্রি নির্মাণের কথা বলেন ও সেখানে বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি দৃঢ় করেন। অতীশের শিষ্য ব্রোম তোন পা জন্ম দেন কাদমপা সম্প্রদায়ের এবং ক্রমে এখান থেকেই তৈরি হয় গেলুকপা সম্প্রদায়। দলাই লামা, পাঞ্চেন লামারা এই সম্প্রদায়েরই উত্তরাধিকার। এর পরে এই লামাতন্ত্র তিব্বতে কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল সে খবর পাই শরৎচন্দ্র দাশের বিবরণে। তবে অতীশ আর ভারতে ফিরে আসতে পারেননি। তিব্বতের মানুষের কাছে তিনি জোবোজে বা প্রভু হয়ে যান। হাতে সময় থাকলে শরৎচন্দ্র দাসের তিব্বত নিয়ে বইটি পড়ে দেখতে পারেন।
‘ওম মণিপদ্মে হুম’ মহামন্ত্রটির সম্ভাব্য কিছু ব্যাখ্যায় অনেকে মনে করেন যে ‘আহা মণিই প্রকৃত পদ্ম’! পদ্মফুল বিশুদ্ধতার প্রতীক। সুতরাং ‘প্রকৃত পদ্ম’ মানে ‘প্রকৃত বিশুদ্ধতা’ হতে পারে। তাহলে ‘মণি’ শব্দটি কী অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? বলা হয় যে, মণি মানে মন বা মন্ত্র যার মধ্যে বুদ্ধের শিক্ষা রয়েছে।
বিহারের বিক্রমশীলা বিহারটি ছিল বজ্রযানী বৌদ্ধদের অন্যতম কেন্দ্র। একাদশ শতকে এই মঠের বজ্রযানী বৌদ্ধরা তিব্বতে ধর্ম প্রচার করতে গিয়েছিলেন। তিব্বতে আজও অসংখ্যবার ওম মণিপদ্মে হুম’ জপ করা হয়। এই মন্ত্রটি বুদ্ধ এবং প্রজ্ঞাপারমিতার এবং বোধিসত্ত্ব এবং তারাদেবীর যৌনমিলনের প্রতীক। তবে বজ্রযান কেবলই যৌন সাধনপন্থা নয়, বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের একটি রহস্যময় রূপ।
এভাবে বজ্রযান হয়ে উঠেছিল যৌন-অতীন্দ্রিয়বাদী শক্তি। তবে বজ্রযানে ধ্যানের গুরুত্বকে অবহেলা করা হয়নি। বজ্রযানীর উদ্দেশ্য ছিল যৌনচর্চার মাধ্যমে দেবীর কৃপা লাভ করে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা অর্জন। যা একটি ধর্মীয় আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা থেকে ভারতবর্ষের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। বজ্রযানী সাধকদের বলা হত সিদ্ধ অথবা সিদ্ধাচার্য। এঁদের সংখ্যা ছিল ৮৪। পূর্বে মহাযান পন্থার বই-পুস্তক লেখা হয়েছিল সংস্কৃত ভাষায়। বজ্রযানী সিদ্ধাচার্যগণ লিখেছিলেন বাংলার আদি রূপ। তাদের ভাবনার সংকলনই—চর্যাচর্যবিনিশ্চয় বা চর্যাপদ। চর্যাপদই বাংলা ভাষার আদিরূপ।
চর্যার কবিরা ছিলেন পূর্ব ভারত ও নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী। কেউ পূর্ববঙ্গ, কেউ উত্তরবঙ্গ, কেউ বা রাঢ়ের অধিবাসী ছিলেন। কেউ কেউ বিহার, কেউ ওড়িশা, কেউ বা আবার অসম বা কামরূপের বাসিন্দাও ছিলেন। এঁরা ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ক্ষত্রিয়, বণিক এমনকি অন্ত্যজ শ্রেণি থেকেও এসেছিলেন। কেউ কেউ রাজবংশজাতও ছিলেন। এঁরা পূর্বাশ্রমের পিতৃপ্রদত্ত নাম ত্যাগ করেছিলেন বলে নাম দেখে এঁদের জাতি স্থির করা যায় না। এঁরা হিন্দুধর্মের সনাতন শাস্ত্রবিধান মানতেন না বলে এঁদের বেদবিরোধী ও নাস্তিক আখ্যা দেওয়া হয়। সাধনার নামে গোপনে কেউ কেউ যৌনাচারও করতেন বলে আধুনিক গবেষকগণ মত প্রকাশ করেন।
হিন্দুশাস্ত্রে যখনই কোনো মন্ত্র উচ্চারিত হয়, তা শুরু হয় ‘ওম’ দিয়ে। আর শেষ হয় ‘স্বহা’ উচ্চারণ করে। ইষ্টদেবতা যেই হন, তাঁর উদ্দেশে মন্ত্র সব সময়ই শুরু হয় ‘ওম’ দিয়ে। বৈদিক, পৌরাণিক বা বীজমন্ত্র—কোথাও এর অন্যথা হয় না। ‘ওম’ শব্দের উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় উপনিষদে। এবং সেখানেই বলা হয়েছে এই শব্দের নানা অর্থ। যেমন, ওম মানে ব্রহ্মাণ্ড, ওম মানে আত্মা, ওম মানে পরমাত্মা। আর এই মন্ত্র উচ্চারণ করলে তার মুক্তি নিশ্চিত।
