রহস্যময় অঘোরী সাধুদের গল্প
নেপালের পশুপতিনাথ মন্দিরের ঠিক একেবারে পেছেন বাগমতী নদী। বাগমতীর তীরে হরিদ্বার বেনারসের মতো সেখানেও সন্ধ্যা আরতি হয়।
আরতির সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম এক মাতাজি শিবতাণ্ডব করছেন। আরতি শেষ হতেই কী খেয়াল হল যেদিকে আরতি হচ্ছিল সেদিকে গেলাম। আরতি শেষে হঠাৎ করে অন্ধকার নেমে এল। আর তারপরই দেখলাম পরিবেশ কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠল। আরতিস্থলের একটু কাছে গিয়ে দেখলাম মাতাজির আশেপাশে বেশ কয়েকজন অঘোরী সাধু ঘুরছে। মাথায় জটা। কালো পোশাক। চোখ লাল। ভরপুর গাঁজার গন্ধ বের হচ্ছে শরীর থেকে। তারা ওই সুন্দরী মাতাজির হাতে কিছু একটা দিয়ে দূরে চলে গেল।
বাগমতীর অন্য তীরে তখন একটি শবদেহ এসেছে। সাদা কাপড়ে মোড়া শবদেহটিকে বাগমতীর জলে স্নান করানো চলছে। সিঁদুর মাখিয়ে পুজোপাঠ চলছে। মৃতদেহ দাহকার্য হয় বাগমতীর ওই ঘাটেই। মৃতদেহ দাহের আগে তার যাবতীয় নিয়মবিধি পালনের কাজ যখন চলছে তখন বাগমতীর এপারে সুন্দরী মাতাজি নির্জন ঘাটে ধ্যানমুদ্রায় বসলেন।
অন্ধকার নেমে এসেছে। সন্ধে সাড়ে সাতটা। আরতি শেষে কার্যত এপাশের ঘাট পুরোপুরি শুনশান। কোনো লোকজন জনপ্রাণী নেই। এক নিস্তব্ধ পরিবেশ। আমি ওপরের একটি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। তার দু-ধাপ নীচে মাতাজি ধ্যানে বসেছেন। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মাতাজিকে আর মাতাজির ঠিক উলটো দিকে মানে বাগমতী নদীর অন্য পাড়ে সাদা কাপড়ে মোড়া শবদেহটিকে। মাতাজি অঘোরীদের দেওয়া সেই কাঠের টুকরোগুলি নিজের সামনে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় রাখলেন। নিজের ঝোলা থেকে একটি শিশি বের করলেন, কিছু চিহ্ন আঁকলেন। তারপর একমনে ধ্যানে বসলেন। চোখের পাতা ফেলিনি। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ওপর থেকে নীচের দিকে। আপনারা বললে বিশ্বাস করবেন না, হঠাৎ করে না জানি কী বিচিত্র উপায়ে মাতাজির সামনে থাকা কাঠগুলো জ্বলে উঠল।
আমি কেমন যেন চমকে উঠলাম। কোনো কেমিক্যাল নেই কিচ্ছু নেই। যদি থাকে তাহলে অগ্নি সংযোগ হল কীভাবে? এসব ভাবছি তখনই ফোন বেজে উঠল। ধরতে একটু পাশে সরেছি। চোখের পলক পড়েনি, এগিয়ে এসে দেখলাম মাতাজি ভ্যানিশ! আর তার সামগ্রী? মানে কাঠ, আগুন ইত্যাদি… তাও বেমালুম গায়েব। আর মাতাজি তাকেও দেখতে পেলাম না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে কোথায় গেল? শুনশান ঘাটে দাঁড়িয়ে আছি আমি একা।
পরে মেলানোর চেষ্টা করলাম মাতাজি অঘোরীদের সঙ্গে শবসাধনা করছিলেন। ওই মৃতদেহ থেকে শক্তি নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল।
হিমালয়ের আনাচে-কানাচে দেখা মিলবে অঘোরীদের। নেপালের কাঠমান্ডুর ‘অঘোর কুঠী’ অঘোরীদের বহু প্রাচীন তীর্থ। কথিত রয়েছে, বাবা সিং শাবক নামের এক রামভক্ত সন্ন্যাসী এই তীর্থের প্রতিষ্ঠাতা। আবার উত্তরাখণ্ডের গুপ্তকাশীর কালীমঠ আর এক গুরুত্বপূর্ণ অঘোরী-তীর্থ। কেদারনাথের নিকটবর্তী এই তীর্থ একটি শাক্তপীঠ। সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম এই পীঠস্থানে অঘোরীদের অনায়াস যাতায়াত। ভারতীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বেশ বড়ো রকমের প্রভাব রয়েছে এই অঘোরী সম্প্রদায়ের সাধুদের, বলা যায় ভারতকে চিহ্নিত করতে হলে যেসব চিহ্ন ব্যবহার করা হয় তার একটা এই সাধুরা। হিমালয়ের আনাচেকানাচে এবং বেনারসে সবচেয়ে বেশি অঘোরী সাধু দেখা যায়।
অঘোরী সাধুদের লোকজন যতটা শ্রদ্ধা-ভক্তি করে তার থেকে বেশি মানুষ তাদেরকে ভয় করে। তাদের ভয় পাওয়া লোকের সংখ্যাই বেশি। অঘোরীদের সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে প্রথমেই জানতে হবে কীভাবে একজন অঘোরী সাধু হন। আর অন্যান্য সাধুদের থেকে অঘোরী সাধুদের পার্থক্য কী—
অঘোরীরা মূলত দেবতা ‘শিব’-এর পূজারি। তারা বিশ্বাস করে শিবই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, ধ্বংসকারী এবং সব কিছুর পরিচালনাকারী। শিবের মহিলা রূপ মৃত্যুর দেবী ‘কাল ভৈরব বা মহাকালী’-এর উদ্দেশেই তারা প্রার্থনা করে এবং এ-কারণেই তারা মৃত্যুভয়কে পেছনে রেখে আসে। অঘোরীদের মতে, “শিবই সব কিছু। হিন্দুধর্মের সব দেবতাই শিবের কোনো না কোনো রূপ।”
কালো পোশাক আর বিশাল জটাধারী অঘোরী সাধুদের দেখলেই চেনা যায়। ধ্যান করার জন্য সাধারণত তাঁরা শ্মশানের মতো নির্জন জায়গাকেই বেছে নেন। এছাড়াও হিমালয়ের ঠান্ডা গুহা, রাজস্থান, গুজরাটের নিষ্প্রাণ মরুভূমি, এমনকি বাংলার ঘন জঙ্গলেও তাঁদের দেখা মেলে। তবে বেনারস এবং নেপালের পশুপতিনাথ যেহেতু শিবের প্রিয় জায়গা, তাই বেনারসের গঙ্গার তীরে আপনি প্রচুর অঘোরী সাধু দেখতে পাবেন আর পাবেন নেপালের পশুপতিনাথ মন্দিরে ও মন্দিরের বাইরে বাগমতী নদীর তীরে।
অঘোরীদের জন্য চুল বা গোফ-দাড়ি কাটা একেবারে নিষিদ্ধ। সাধারণত কালো পোশাক পরতে দেখা গেলেও অনেক সময় তাঁদেরকে দেখা যায় নাগাদের মত নগ্ন অবস্থায়। নাগাসাধুদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য আছে অবশ্য অনেক দিক থেকে। শ্মশানে ধ্যান করার সময় তারা পোড়ানো মৃতদেহের ছাই সারা শরীরে মেখে তার ওপরে বসেই ধ্যান করা শুরু করেন, এ সময় তাদের পরনে থাকে শুধুমাত্র একটি কৌপিন। এছাড়া রুদ্রাক্ষের মালা আর মানুষের খুলি তো গলায় থাকেই। অঘোরীদের অনেকেই সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ঘোরেন। পার্থিব সব কিছু ঝেড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে তারা এটি করে থাকেন!
অন্যান্য সাধুদের সঙ্গে ও নাগাদের সঙ্গে অঘোরীদের একটি বড়ো পার্থক্য হল অঘোরীদের খাবার। অন্যান্য সাধুরা যেখানে নিরামিষাশী, সেখানে অঘোরীরা খেতে পারেন যে-কোনো কিছুই। আবর্জনা থেকে শুরু করে মানুষের মাংস এমনকি মানুষের মলমূত্র পর্যন্তও তাঁরা খান। কারণ? কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন শিব সবচেয়ে খারাপের মধ্যেও বিদ্যমান।
অঘোরীদের মূলমন্ত্রই হচ্ছে “অশুদ্ধের মধ্যে বিশুদ্ধতাকে খুঁজে বের করা।” তা ছাড়া তারা বিশ্বাস করেন মলমূত্র খাওয়া তাঁদের ভেতরের আত্ম-অহমিকাকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। বেঁচে থাকার জন্য তারা যতটুকু দরকার ততটুকুই খান। তাঁদের কাছে খাবারের স্বাদ বা চেহারা কোনো বিষয় নয়। তবে বেনারস ও নেপালের কাঠমান্ডুর মতো শহরেও কেউ তাঁদেরকে নরমাংস খেতে বাধা দেয় না, কারণ তাঁদের খাওয়ার জন্য শ্মশানের পোড়া ও আধপোড়া মৃতদেহ থাকেই।
ধ্যান করার জন্য অঘোরীরা বেছে নেন শ্মশানকে। একেবারে মধ্যরাত থেকে তাঁরা পোড়া মৃতদেহের দাহের স্থানের ওপর বসে ধ্যান শুরু করেন। তারা বিশ্বাস করেন এই সময়টিতে কোনো মানুষ বা কোনো আত্মা ঘোরাফেরা করে তাঁদের ধ্যানের মনোযোগ নষ্ট করতে পারবে না। এছাড়া তাঁরা ধ্যান করার আগে খানিকটা গাঁজাও টেনে নেন যাতে ধ্যানের মনোযোগ আরও সুদৃঢ় করতে পারে। এছাড়া তাঁরা দাবি করেন, গাঁজার ঘোর তাঁদেরকে আত্মা দেখতে সাহায্য করে। যদিও গাঁজা টানার পরেও তাঁরা থাকেন নির্লিপ্ত।
অঘোরীদের অনেকেই দাবি করেন তাদের কাছে পৃথিবীর সব রোগেরই ঔষধ রয়েছে, যা ক্যানসার এমনকি এইডসকেও সারিয়ে তুলতে পারে! সে পদ্ধতি জানলেও তারা তার প্রয়োগ করতে পারেন না। বারণ আছে। কারণ তাতে তাঁর অর্জিত শক্তি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। মৃত্যু হতে পারে তাঁর। দেবতা রুষ্ট হয়ে তাঁকে মেরে ফেলতে পারেন। অঘোরীরা শক্তি সংগ্রহ করেন পোড়ানো মৃতদেহগুলি থেকে। আর এই সংগ্রহ করার পদ্ধতিকে তারা নিজেদের ভাষায় ‘মানুষের তেল’ বলে।
অঘোরীদেরকে বলা হয় পৃথিবীর সেরা কালো জাদুকর বা ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান। যদিও তারা দাবি করেন, তাঁরা এই ক্ষমতা কখনও মানুষের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন না, বরং মানুষের উপকার করেন। কোনো অসুস্থ মানুষের রোগকে তাঁরা কালো জাদুর সাহায্যে মৃতদেহে ঢুকিয়ে দেয় এবং মৃতদেহ পুড়িয়ে রোগটিকে ধ্বংস করে ফেলে!
অঘোরীরা বিশ্বাস করেন ডানমার্গ বা ভালো পথের চেয়ে বামমার্গ বা খারাপ পথ দ্বারা দেবতার সান্নিধ্য পাওয়া যায় খুবই দ্রুত। এই পদ্ধতি কার্যকরও হয় গভীরভাবে। যদিও এভাবে সান্নিধ্য পাওয়ার মতো সাহস শুধু অঘোরীদেরই আছে। অমাবস্যার মধ্যরাতে তারা কালীকে খুশি করার জন্য মৃতদেহের সঙ্গে মিলিত হয়! মেরোনাথ নামক এক অঘোরী সাধু এক জায়গায় লিখছেন, “আমাদের এই কাজকর্ম বাইরের দুনিয়ায় অতি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা নোংরামির মধ্যে বিশুদ্ধতা পাওয়ার চেষ্টা করি। যদি কেউ মৃতদেহের সঙ্গে মিলিত হবার সময়ও দেবতার ওপর মনোযোগ রাখতে পারে তবে বুঝতে হবে সে সঠিক পথে রয়েছে।” এছাড়াও তাঁরা বিশ্বাস করেন, এর ফলে তাঁদের মধ্যে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার সৃষ্টি হয়। মিলিত হবার সময় অন্যান্য সাধুরা মন্ত্র জপ করেন।
অঘোরী সাধুদের মধ্যে বোধহয় সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন তৈলঙ্গস্বামী। যা-ই হোক, বেনারস শহরের কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের এক পুরোহিত একদিন দেখতে পান তৈলঙ্গস্বামী তার অদ্ভুতভাবে শিবের পুজো করছেন। দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তৈলঙ্গস্বামীকে চড় মেরে তাকে মন্দির থেকে তাড়িয়ে দেন এবং পরের ঘটনা সহজেই অনুমেয়। পরদিন সকালেই পুরোহিত আকস্মিকভাবেই মারা যান।
অঘোরীরা এককথায় শৈব সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। শিবের উপাসক তাঁদেরই একটি সম্প্রদায় হল, অঘোরী। অঘোরী শব্দের তাৎপর্য হল—এই বৈষয়িক বিষয়ের ঘোর যাঁদের কেটে গেছে এবং আধ্যাত্মিক জগৎে জীবনকে উৎসর্গ করেছেন যাঁরা। অঘোরীরা উগড় বা ঔঘড় নামেও পরিচিত। স্বচ্ছন্দতন্ত্রে অঘোর উপাসনার কথা আছে। অঘোর শিবেরই রূপান্তর মাত্র। স্বচ্ছন্দ ভৈরবের পাঁচটি মুখ। অঘোর হ’ল সেই পাঁচটির মধ্যে দক্ষিণ মুখটি। গোরক্ষনাথ নামক এক হিন্দু সন্ন্যাসী ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই এই অঘোরীদের উদ্ভব। তিনি নাথপন্থীদেরও শুরু।
সতেরো শতকের একটি গ্রন্থ, “দবিস্তান” -এ অঘোরীদের উল্লেখ আছে। ঐতিহাসিক ডব্লিউ ক্রুক সাহেব বলেছেন, তিনি নিজে দেখেছিলেন অঘোরীদের এক সম্প্রদায়কে, যারা মৃতদেহের ওপর বসে নিজ সম্প্রদায়ের গান করে, যতদিন না সেই দেহ পচে যায়। পরে সেই দেহ তাদের আহার হয়। অঘোরীদের উল্লেখ পাওয়া যায় পঞ্চদশ শতকে আনন্দগিরি রচিত “শঙ্করবিজয়” বইতে, সপ্তম-অষ্টম শতকে ভবভূতির “মালতীমাধব” নাটকে, একাদশ শতকে কৃষ্ণমিশ্র রচিত “প্রবোধ-চন্দ্রোদয়” নাটকে।
শ্মশানচারী অঘোরী সন্ন্যাসীদের নিয়ে কথা ও কাহিনির চল এদেশে কম নয়। অঘোরী এবং নাগা সন্ন্যাসীদের নিয়ে এদেশের সাধারণ মানুষের কৌতূহলও ব্যাপক। অনেকেরই ধারণা অঘোরপন্থা গুপ্ত ও গুহ্য। এবং সেই কারণেই তাঁরা তাঁদের উপাসনাকে গোপনে রাখেন। কিন্তু একটু নজর করলেই জানা যায়, অঘোরী সন্ন্যাসীরা আদপেই জন-বিচ্ছিন্ন নন। তা ছাড়া, তাঁরা তাঁদের উপাসনাকেও গোপন রাখতে চান না।
অঘোরীদের গমনাগমন মূলত শাক্ত তীর্থগুলিতে। তবে, বিশেষ কয়েকটি মন্দির বা দেবস্থানকে তাঁরা তাঁদের উপাসনাক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেন। জন্মচক্র, তা থেকে মুক্তি এবং মোক্ষের সাধনাই অঘোরীদের কাছে মুখ্য কাজ। তাঁদের ক্রিয়া-কর্ম রাত্রিকালীন। তাঁরা এমনিতেও নিশাচর। কিন্তু তাই বলে তাঁরা ‘অপ্রকাশ্য নন। মজার ব্যাপার এই, তাঁরা শৈবসাধক হলেও শাক্তদের সঙ্গে তাঁদের কোনো বিরোধ নেই। তাই বলে যে-কোনো শাক্ততীর্থে অঘোরীদের দেখা মিলবে, এমন নয়।
আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বহু জায়গা আজও রয়েছে, যা অঘোরী সাধুদের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। সেইসমস্ত জায়গার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কিছু জায়গার মধ্যে অন্যতম হল বীরভূমের তারাপীঠ। কথিত আছে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে মাতা পার্বতীর চক্ষু খণ্ডিত হয়ে এই তারাপীঠে প্রথিত হয়েছিল। সেই থেকে তারাপীঠ শক্তিপীঠ নামেও পরিচিতি। বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই তারাপীঠ মহাশ্মশানে অঘোরী সন্তগণ তাঁদের তপস্যা ও সাধনায় ব্রতী হয়েছেন। এর পরে হল হিংলাজ ধাম, যা বর্তমানে পাকিস্তানের বালুচিস্তান রাজ্যে হিঙ্গল নদীর তীরে অবস্থিত। মাতার ৫২ পীঠের মধ্যে এই হিংলাজ পীঠ উল্লেখযোগ্য। বিস্তীর্ণ মরু অঞ্চল ও দুর্গম পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় একে মরুতীর্থ হিংলাজও বলা হয়। বিন্ধ্যাচল পর্বতশ্রেণিও অঘোরী সন্তদের এক অন্যতম পীঠস্থান। কথিত আছে দুর্গা মাতা মহীষাসুরকে বধ করার পর এই বিন্ধ্যাচলেই উপবিষ্ট হয়েছিলেন। জানা যায়, এখনও এই বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণির বহু গুহায় অঘোরী তান্ত্রিক সাধুরা নিজেদের সাধনায় মগ্ন রয়েছেন। অঘোরী সস্তদের চতুর্থ পীঠস্থান হল চিত্রকূট, তীর্থস্থল হিসেবে পরিচিত এই চিত্রকূটের স্ফটিকশিলা মহাশ্মশান আজও অঘোর সস্তদের অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। এর পর কালীমঠ, হিমালয়ের কাছে গুপ্তকাশী থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই অঘোর পীঠস্থানে বহু অঘোরী বাস করেন। উড়িষ্যায় অবস্থিত পুরীর জগন্নাথ মন্দিরও অঘোরীদের অন্যতম পীঠস্থানগুলির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য। কথিত আছে এখানে মাতা পার্বতীর পায়ের খণ্ড প্রোথিত হয়েছিল। পুরীর স্বর্গদুয়ার মহাশ্মশান অঘোরী সন্তদের প্রসিদ্ধ সাধনাস্থল। দক্ষিণ ভারতের মাদুরাইয়েও অঘোরীদের কপালেশ্বর মন্দির রয়েছে, যেখানে বসবাসরত অঘোরীরা অঘোরী বিধি অনুযায়ী কপালেশ্বর মায়ের পুজো-অর্চনা করেন। এর পর রয়েছে কলকাতার কালীঘাট। কথিত আছে, এই কালিঘাটে ও দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর মন্দিরে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব মাতা কালিকার উপাসনা করতেন, যা অঘোরীদের অন্যতম পীঠস্থান হিসেবেও পরিচিত।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক আপনি কোন কোন মন্দিরে গেলে অঘোরীদের দেখা পাবেন-
* অঘোরীদের উৎস কাশীতে। এই প্রাচীন শহরে তাঁদের দেখা পাওয়া যায় নিয়মিতই। এখান থেকেই তাঁরা বিভিন্ন তীর্থে গমন করেন।
* নেপালের কাঠমান্ডুর ‘অঘোর কুঠী’ অঘোরীদের বহু প্রাচীন তীর্থ। কথিত রয়েছে, বাবা সিং শাবক নামের এক রামভক্ত সন্ন্যাসী এই তীর্থের প্রতিষ্ঠাতা।
* বিন্ধ্যাচলও অঘোরীদের কাছে পবিত্র উপাসনাক্ষেত্র। কাশীর কাছেই এই শাক্ততীর্থ। এখানে অঘোরীরা প্রায়ই সমবেত হন। দেবী বিন্ধ্যবাসিনীর মন্দিরকে ঘিরে প্রচুর গুহা রয়েছে। এই গুহাগুলিই অঘোরীদের আস্তানা। এখানেই ধ্যান ও অন্যান্য ক্রিয়া সম্পন্ন করেন তাঁরা।
* গুপ্তকাশীর কালী মঠ আর এক গুরুত্বপূর্ণ অঘোরী-তীর্থ। কেদারনাথের নিকটবর্তী এই তীর্থ একটি শাক্তপীঠ। সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম এই পীঠস্থানে অঘোরীদের যাতায়াত অনাবিল।
* কলকাতা শহরে অঘোরীদের দেখা মেলে প্রায়শই। কালীঘাট ও দক্ষিণেশ্বর তাঁদের কাছে পবিত্র তীর্থ। তবে, পশ্চিমবঙ্গে যে মন্দিরটিতে সারা বছরই অঘোরীদের দেখা মেলে, সেটি তারাপীঠ।
* মাদুরাইয়ের কপিলেশ্বর মন্দিরটি অঘেরীদের প্রিয় তীর্থ। এই মন্দিরের নিকটবর্তী একটি আশ্রমে তাঁরা প্রায়ই সমবেত হন।
* চিত্রকূটের দত্তাত্রেয় মন্দিরে ত্রিনাথের দর্শন অঘোরীদের কাছে পবিত্র কর্তব্য। কিংবদন্তি অনুসারে, দত্তাত্রেয় অঘোরপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। বেদ ও তন্ত্রের সম্মিলন তিনিই ঘটান বলে বিশ্বাস করেন অনেকেই।
সুদূর আফগানিস্তানের কাবুলেও অঘোরী তীর্থ বিদ্যমান। অঘোর রতনলালজি নামের এক সন্ন্যাসী এখানে প্রথম আসেন এবং আশ্রম তৈরি করেন। তাঁর প্রয়াণও হয় এখানেই। রতনলালজির সমাধি অঘোরীদের কাছে পবিত্র তীর্থ।
* অঘোরপন্থীদের প্রধান গুরু কিনারাম হিংলাজ মাতার আশীর্বাদধন্য ছিলেন বলে বিশ্বাস। পাকিস্তানের মরুতীর্থ হিংলাজকে তাই অঘোরীরা অন্যতম গন্তব্য হিসেবে ধরেন।
আসলে ‘অঘোরী’ শব্দটি শুনলেই অনেকে আঁতকে ওঠেন। কালো পোশাকে আচ্ছাদিত, জটাজুটধারী এই সন্ন্যাসীরা এমন কিছু আচারে বিশ্বাসী, যা শুনলে তথাকথিত ‘সভ্য’ সমাজের সদস্যরা শিউরে উঠতে বাধ্য। প্রথমত তাঁরা শ্মশানচারী, তার ওপরে তাঁরা সর্বাঙ্গে চিতাভস্ম মেখে থাকেন। প্রায়শই নগ্ন অঘোরী সাধুদের দর্শন পাওয়া যায়। সর্বোপরি তাঁদের খাদেখাদ্যভেদ একেবারেই নেই। এমনকি অঘোরীরা মৃতদেহ খেতেও অভ্যস্ত। এই ভয়াবহ বর্ণনা স্বাভাবিকভাবেই গৃহীজীবনে শঙ্কার হিল্লোল তোলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ভারতীয় অধ্যাত্মমার্গে অঘোরী সম্প্রদায় মোটেও পরিত্যাজ্য নয়। উলটে বিরল সম্মান পেয়ে থাকেন অঘোরীরা। এখানেই প্রশ্ন জাগে—ঠিক কী কাজ করছে এই সম্ভ্রমের পেছনে?
উত্তর খুঁজতে গেলে প্রবেশ করতে হবে এমন কিছু প্রসঙ্গে, যা সাধারণত আলোচনাবৃত্তে আসে না। প্রথমেই ভাবতে হয় ‘অঘোরী’ শব্দটিকে নিয়ে। এই শব্দের উৎসে রয়েছে ‘অঘোর’ শব্দটি। এর অর্থ অন্ধকারের বিলয়। আবার এই শব্দটি ভয়হীনতাকেও বোঝায়। কিন্তু মজার ব্যাপার এই—অঘোরীদের বেশিরভাগ আচারই সাধারণ মানুষের ভীতি উদ্রেককারী। অঘোরীরা বিশ্বাস করেন শিবের বৈনাশিক রূপে। এক তীব্র শৈব ভাবনা থেকে তাঁরা শিবানুসারী জীবনযাপনে উদ্যোগী হন। শ্মশানবাস তার মধ্যে প্রধান।
চিতাভস্ম গায়ে মাখা, পচা, নোংরা খাবারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা বস্তুতপক্ষে ইন্দ্রিয়জয়েরই একটি দিক। অঘোরী সাধুরা মৃতদেহ ভক্ষণ, মূত্রপান ইত্যাদি অভ্যাস করেন। ১৭ শতকের সন্ন্যাসী বাবা কিনারামের সূত্রেই এই আচারগুলি অঘোরীদের কাল্টে প্রবেশ করেছে বলে জানা যায়। অঘোরীরা নিয়মিত শবসাধনা করে থাকেন। মৃতদেহ থেকে হাড় ছাড়িয়ে তা নিজেদের শরীরে ধারণ করেন, সঙ্গে রাখেন।
নরকপাল তাঁদের কাছে একান্ত প্রয়োজনীয় এক সামগ্রী। এটিকে অনেক সময়েই তাঁরা পানপাত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। অঘোরীদের এই আচারগুলির পেছনে সবথেকে বড়ো যুক্তিটি হল, কত কম উপকরণে জীবনধারণ করা যায়, তার অভ্যাস রাখা। এই যুক্তিতে তাঁরা প্রায়শই নগ্ন থাকেন। নগ্নতার সপক্ষে আর একটি যুক্তি হল এই—প্রকৃতি থেকে দূরে সরতে রাজি নন তাঁরা।
অঘোরীদের এই অদ্ভুত আচরণ তাঁদের সম্পর্কে বিস্তর কিংবন্তির জন্ম দিয়েছে। অনেকেরই বিশ্বাস, অঘোরীরা কালো জাদুতে পারদর্শী। অথবা তাঁদের অতিলৌকিক ক্ষমতা বর্তমান। আসলে কোনো অতিলৌকিকতা প্রদর্শন অঘোরীদের লক্ষ্য নয়। তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য মোক্ষলাভ, অর্থাৎ জীবন ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিলাভ। বলাই বাহুল্য, এই লক্ষ্য ভারতীয় অধ্যাত্মমার্গের সকলেরই। এইখানেই অঘোরীরা ভারতীয় সন্ন্যাস পরম্পরার সঙ্গে একাত্ম। কোনো তর্ক কখনোই ওঠে না অঘোরীদের সাধন-উদ্দেশ্য নিয়ে।
মধ্যযুগীয় কাশ্মীরি কাপালিকতন্ত্র থেকেই অঘোরীদের উৎপত্তি বলে মনে করে অনেকেই। এঁদের প্রাচীন নাম ‘কালমুখ’। তা ছাড়া কিনারামের ঐতিহ্যের কথা সব অঘোরীই স্বীকার করেন। অঘোরীরা শক্তি আরাধক। শিব, অনেক সময় কালী বা তারার উপাসনা করে থাকেন। কিন্তু তাঁদের আদর্শ শিবত্ব। এই জায়গায় মূলধারার শাক্ত তান্ত্রিকদের সঙ্গে তাঁরা সহমত। তাঁদের আরাধ্য পুরুষ দেবতাদের মধ্যে শিব ছাড়াও কালভৈরব, মহাকাল, বীরভদ্র প্রমুখ রয়েছেন।
এমনিতে অঘোরীরা মুক্তপুরুষ। কোনো বন্ধনেই তাঁরা আবদ্ধ নন। কোনো ভেদ-দর্শনে তাঁরা বিশ্বাস করেন না। এমনকি পবিত্রতা-অপবিত্রতার ভেদরেখাও তাঁরা মানেন না।
যে-কোনো বস্তুতেই ঈশ্বর রয়েছেন—এটা অঘোরীদের নিশ্চিত বিশ্বাস। এই সর্বেশ্বরবাদ তাঁদের মধ্যে অনুপম মাধুর্যের জন্ম দেয়।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে অঘোরীরা কখনোই খারাপ ব্যবহার করেন না। তাঁদের দূরে সরিয়েও রাখেন না। নেপাল কিংবা কাশীতে তাঁদের মূল সাধনক্ষেত্রে। তাঁরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বহুপ্রকার ভেষজ ও জৈব ওষুধে দিয়ে থাকেন। এছাড়া তন্ত্রের বিভিন্ন অলৌকিক র জ্ঞান তাঁদের করায়ত্ত। বিপন্ন মানুষকে সে-বিষয়ে পরামর্শ দিতে তাঁরা দ্বিধাবোধ করেন না। সর্বোপরি, অঘোরীরা একান্তভাবেই নির্বিরোধী এক সম্প্রদায়। তাই আপাত-বীভৎসতাগুলিকে দূরে সরিয়ে হিমালয়ের বিভিন্ন জায়গায় অঘোরীরা পূজিত হন।
অঘোরীরা পুজো করেন শিবের। এছাড়াও মৃত্যুর দেবী কালীসাধনাও করে থাকে এঁরা। বারাণসীর অঘোরী মেরোনাথ এক সাক্ষাৎকারে ফোটোগ্রাফার এবং লেখক ডাভোর রস্তুহারকে বলেন, “সনাতন হিন্দু দর্শনে প্রত্যেকটি প্রভুর একটিমাত্র রূপ থাকে। বিভিন্ন গোত্র বিভিন্ন দেবদেবীর পুজো করে। তাদের মতো করে নৈবেদ্য প্রদান করে। শিব আর মা কালী যখন ভক্তদের কাছ থেকে বলি আশা করে, তখন ভক্তরা কিন্তু তা মান্য করতে নিরুৎসাহিতা দেখিয়ে থাকে। আমরাই একমাত্র গোত্র, যারা মা-কালী এবং শিবের আশা মতো নৈবেদ্য প্রদান করে থাকি।”
হিমাচলের এক অঘোরী সাধু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “সাধুরা তিনটি বিষয় থেকে নিজেদের দূরে রাখে—মাংস, মদ এবং যৌনাচার। তবে অঘোরীরা এক্ষেত্রেও ভিন্ন। তাঁরা মনে করেন, মা কালী এই তিনটি বিষয়কেই খুব পছন্দ করেন। মাংস যে শুধু পশুর হবে, তা নয়। তারা এক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ করেন না। মানুষের মাংসও তাঁরা ভক্ষণ করেন, তবে মৃত। আস্তাকুঁড় থেকে নোংরা উচ্ছিষ্ট খাবার উঠিয়ে খান অঘোরীরা। এক্ষেত্রে তাঁরা মনে করেন, খাদ্যের ব্যাপারে কোনো ভিন্নাদর্শ থাকা উচিত নয়। মানুষের ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্ট, মৃতদেহ, এমনকি মলমূত্রও ভক্ষণ করেন অঘোরী সাধুরা।
অঘোরীদের মতে, মা-কালী যৌনাচারে খুশি হন। তাই তাঁরা খোঁজ করতে থাকেন উপযুক্ত একটি মৃতদেহের। সমাধি থেকে সদ্য তাজা লাশ উঠিয়ে এনে তার সঙ্গে শুরু করেন অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার। অঘোরীদের মনে আর একটি বিচিত্র বিশ্বাস রয়েছে। তাদের ধারণা মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচার তাদেরকে দিতে পারে অতুলনীয় ক্ষমতা। গভীর রাতে সমাধিস্থলে গিয়ে অঘোরীরা এই ক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা মৃতদেহ কিংবা কোনো এক নারীকে বেছে নেন। চারদিকে ঢাকের বাদ্য বাজতে থাকে। তবে যার সঙ্গে যৌনক্রিয়া করা হবে, তাকে কোনো ধরনের জোর করা হয় না। নিজেদের ইচ্ছাতেই কাজটি হয়ে থাকে। এভাবে অঘোরীরা মনে করেন তাদেরকে মা-কালী পৃথিবীতে দেবেন অতুলনীয় ক্ষমতার আস্বাদ।
মেরোনাথ তাঁর দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা যা করি, তা বাইরের বিশ্বের কাছে শুনতে পাগলামি মনে হলেও আমাদের কাছে খুবই নৈমিত্তিক একটি ব্যাপার। নোংরার মাঝে শুদ্ধতা খুঁজে পাওয়া, এটিই আমাদের মূলমন্ত্র। মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচার কিংবা মৃতদেহ ভক্ষণ করার পাশাপাশি একজন অঘোরী যদি ঈশ্বরকে খুঁজে পায়, তাহলে বুঝতে হবে সে সঠিক পথেই আছে।”
ঘৃণা বিশ্বের বুকে ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না, এটাই অঘোরীদের বিশ্বাস। এমনকি কুকুর বেড়াল গোরু ছাগলের সঙ্গে বসে তারা খাবার ভক্ষণ করে থাকে। তারা মনে করে সামান্য প্রাণী তাদের খাবার নষ্ট করছে, এটা ভেবে যদি চিন্তিত হয়ে যায়, তাহলে প্রভু শিবের সঙ্গে কখনও মিলিত হওয়া সম্ভব হবে না। মানুষ তাদেরকে নানাভাবে কটুকথা বলে, হেয় করে। এসব কিছুই অঘোরীরা পাত্তা দেয় না। মানুষকে ঘৃণা করা তাদের স্বভাবে নেই। তারা অনেক উঁচু স্তরের এবং সে স্তরে যেতে এসব বিষয় আমলে না নেয়াই ভালো, এমনটাই বিশ্বাস অঘোরীদের।
একজন অঘোরী তান্ত্রিকের হাতে মানুষের খুলি বা ‘কপাল’ থাকাটা সত্যিকারের পরিচায়ক। অনেক সময় এজন্য এদেরকে কাপালিক বলেও অভিহিত করা হয়। জলে যেসব মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয় কিংবা যেসব মৃতদেহ ভেসে ওঠে, তাদের খুলিটা সংগ্রহ করেন অঘোরী সাধুরা। এসব খুলিতে করে তাঁরা পানাহার করেন, আবার কেউ কেউ ভিক্ষাও চেয়ে থাকে। তখন এই খুলিকে ভিক্ষার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
অঘোরীরা সমাধিকে পবিত্র ভূমি বলে বিবেচনা করে থাকেন। শুদ্ধ এবং অশুদ্ধ, পবিত্র এবং অপবিত্র, উচিত এবং অনুচিতের মধ্যকার ফারাকটা তারা সমাধিস্থলে নেই বলে মনে করেন। এজন্য গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, অঘোরীরা একে একে এসে জমায়েত হন সমাধিক্ষেত্রে। বেজে ওঠে ঢাকের বাদ্যি, গুনগুনিয়ে ওঠে সম্মিলিত কণ্ঠে মন্ত্র।
বেনারসের মণিকর্ণিকা ঘাটের শ্মশানে অঘোরীদের ক্যানিবালিজম বা মানুষের মাংস খাওয়া স্বাভাবিক একটি বিষয়। তাই বলে ভাববেন না যে তারা জীবিতের মাংস খান। সমাধিস্থ মৃত মানুষের দেহ কবর খুঁড়ে তুলে সেগুলো ভক্ষণ করেন অঘোরীরা। মাঝে মাঝে সেগুলো আগুনে ঝলসিয়েও খাওয়া হয়। পর্যাপ্ত মাংস খেয়ে নেবার পর বাকি মৃতদেহের ওপর বসে তাঁরা পুজো শুরু করেন, চলে সারারাত। তবে কিছু কিছু অঘোরী রয়েছে যারা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যান। তাঁরা জীবিত মানুষের ওপর হামলা করে মাংস খাওয়া শুরু করেন। তাই অঘোরীদের এই ধরনের ক্রিয়াকলাপের জন্য বারাণসীর মানুষ অনেক বেশি সতর্ক আচরণ করে। সমাধিস্থলেও বাড়ানো হয়েছে সতর্কতা।
বেশিরভাগ অঘোরীই মাদক সেবন করে থাকেন। এক্ষেত্রে তাদের পছন্দ হচ্ছে মারিজুয়ানা। এটি সেবন করার মাধ্যমে তাঁরা মনে করেন এভাবে ঈশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া সহজতর হয়। এই মাদক সেবন করার ফলে যোগব্যায়াম করতে সুবিধা হয় বলে ধারণা তাঁদের। তবে মারিজুয়ানার মতো একটি মাদক সেবন করার পরও তাঁদের ব্যবহার খুব শান্ত এবং নম্র থাকে।
অঘোরীপন্থীদের কথা চিনা পর্যটক, হিউএম সাংও লিখে গেছেন। তিনি লিখছেন, “অঘোরীরা নগ্ন থাকে সকল ঋতুতেই। শরীরে ভস্ম মাখে। আর মাথায় থাকে হাড়ের মুকুট। কখনো কখনো কিছু অঘোরী সাধু গাছের ছাল পরে অথবা বাঘের চামড়া। তাদের পানপাত্র হল মানুষের মাথার খুলি।”
হিমালয়, বেনারস পার হয়ে চলে আসি বাংলার অঘোরীদের কথায়। অঘোরীরা শক্তির উপাসক। বাংলায় শিব ছাড়াও অঘোরীদের আরাধ্যা দেবী দুর্গা, কালী অথবা চামুণ্ডা। পঞ্চম শতকেও পূর্ব বাংলায় শক্তি আরাধনার আভাস মেলে। পুজোর এক অন্যতম অঙ্গ ছিল নরবলি। কালিকাপুরাণে নর হত্যার কথা আছে। এখন তার বদলে ছাগল, পায়রা বা মোষ বলি দেওয়া হয়। যেমন বৈষ্ণবদের পুজোয় কোনো ফল বলি দেওয়া হয়। এগুলি নৃশংসতা থেকে সরে এসে প্রতীকী বলির উদাহরণ।
অষ্টাদশ শতকে অঘোরীদের এক নতুন সম্প্রদায়ের জন্ম হয় বেনারসে। নীরায়ের কানুরাম নামের এক সাধু কান্নুরাম নামের এক লোককে প্রথম এই মন্ত্রে দীক্ষা দেন। এই সম্প্রদায়কে “কান্নীরাম” বলে। ব্রহ্মের অস্তিত্ব মানেন তাঁরা। তাঁরা উলঙ্গ এবং মৌনী। এদের মূল শিক্ষা হল, জীবনে আনন্দ, দুঃখ, ঠান্ডা অথবা গরম সব কিছুকেই সমান জ্ঞান করা। অনেকটা গীতার “স্থিতধী” স্তরের কথা।
তাঁদের দীক্ষা দেওয়া হয় কীনারামের সমাধিস্থলে। মির্জাপুর থেকে ছয় মাইল দূরে এক অষ্টভুজা মন্দিরের কাছে দীক্ষার প্রথা সম্পন্ন হয়। দীক্ষা প্রণালীতে কানে চুপি চুপি মন্ত্র বলা হয়। সঙ্গে বাজে শাঁখ ও নানান বাজনা। মাথা কামিয়ে ন্যাড়া করা হয়। এর পর মরার খুলি করে ন্যাড়া মাথায় মূত্র ঢালা হয়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের চিহ্ন হিসেবে কপালে তাঁরা ত্রিপুণ্ড্রক চিহ্ন আঁকে, হাতে রুদ্রাক্ষের মালা। আবার মানুষের দাঁতের মালাও অনেকে পরেন। অঘোরীরা এর পর মদ খেয়ে নীচু জাতির কাছে ভিক্ষা করতে যায়। প্রথম বারো বছর শিক্ষানবিশ থাকতে হয় পূর্ণ অঘোরী সাধু হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগে। এই বারো বছরের শিক্ষানবিশের জীবনের প্রথা বৌদ্ধ পন্থাতেও দেখা যায়। এই শ্রেণির অপর সম্প্রদায়ের নাম, স্বরভঙ্গি।
এক অঘোরী সাধুর কথা শোনা যাক। তিনি ছিলেন আদিতে পাতিয়ালার মানুষ নেপাল, জগন্নাথ, মথুরা সহ ভরতপুর সব জায়গায় ঘুরে তীর্থ করেন। সবার দেওয়া খাবারই খান, জাতিভেদ মানেন না। তিনি নিজে নরমাংস খেতেন না। তাঁর কথা মতো, তাঁর সম্প্রদায়ে এমন সাধু আছেন যাঁরা মানুষকে খেয়ে তাকে আবার বাঁচিয়ে তুলতে পারেন। তারা ঘোড়া ছাড়া সব পশুর মাংস খান। অনেকের মতে, হিন্দিতে ঘোড়া শব্দের সঙ্গে ‘ঘোরী’ শব্দ জড়িয়ে থাকায়, তাদের এই সিদ্ধান্ত। যদিও তা খুব একটা যুক্তিযুক্ত নয়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, আদিকাল থেকেই ভারতে ঘোড়ার মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। অশ্বমেধ যজ্ঞে হত্যা করা ঘোড়ার মাংসও খাওয়া হত না। যদিও এর বিপরীত মতও আছে আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র, কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র বা বাজসনেয়ী সংহিতাতে এবং ঋগ্ বেদেও।
কেবল ভারতের অঘোরী সম্প্রদায়ই নয়, ভারতের বাইরেও ধর্মীয় জগতে উন্নতি সাধনের জন্য নরমাংস খাওয়াকে আবশ্যক মনে করা হয়। ঐতিহাসিক ম্যাকডোনাল্ড মনে করেন, মধ্য এশিয়ার ওঝারাও নরমাংস খায়। অলৌকিক ক্ষমতা তাতে বাড়ে বলে তাদের ধারণা। উগান্ডা ও বল্টু আফ্রিকার অনেক জায়গায় বিশ্বাস করে, ডাকিনী-যোগিনীরা মড়ার মাংস খাওয়ার জন্য গুপ্তসমিতিতে দেখা করে রাত গভীর হলে। ভারতের মালাবার উপকূলেও জাদুকরদের মধ্যে এই প্রথা ছিল।
অঘোরীরা ছাড়াও পূর্ব আফ্রিকার লোকেরাও বিশ্বাস করে যে মড়ার খুলিতে পানীয় পান করলে অলৌকিক ক্ষমতা বাড়ে। কেল্টিক জাতির মধ্যেও এমন পাত্র ছিল। এমনকি পুরোনো জার্মান দেশেও। তারা বিশ্বাস করত, এমন মড়ার খুলিতে পান করলে, মৃগী রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে।
হিমালয় অঞ্চলে তুষার ঝড়ের সময় মহিলাদের হত্যা করে তাদের খুলি দিয়ে ঢাক তৈরি করত অঘোরীরা। সেই ঢাক বাজিয়ে ভূত-প্রেত তাড়ানোর কাজ চলত।
ব্রিটিশ আমলে আইন বলবৎ করে অঘোরীদের নগ্ন থাকা, নরহত্যা ও নরমাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও কোনো আচার রীতি বা স্বভাব আইন বলবতের মাধ্যমে বন্ধ করা অসম্ভব। এখনও এই অঘোরীরা আছেন। সাধনা রীতির মধ্যে কিছু পরিবর্তন হয়তো ঘটেছে সময়ের সঙ্গে বাঁচার তাগিদে, তবে তা কেবল বাহ্যিক দিক। দর্শন একই আছে। অঘোরীরা সচরাচর সাধারণ মানুষের সামনে আসেন না এবং কথাও বলেন না। আর সাধন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা তো করেনই না। বর্তমানে কিছু কিছু অঘোরী সাধুদের নানান তথ্যচিত্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় দেখা গেলেও, তা খুবই সামান্য।
অঘোরীদের নিয়ে লিখলে আস্ত একখানা বই হয়ে যায়। ভারতের শাক্ত তীর্থগুলি ছাড়াও বিশেষ কয়েকটি মন্দির বা দেবস্থানকে অঘোরীরা তাদের উপাসনাক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেন। আবার যে-কোনো শাক্ততীর্থে গেলেই যে অঘোরীদের দেখা মিলবে এমনটাও নয়।
