রহস্যে ঘেরা মাউন্ট এভারেস্ট
জানেন কি পাইলটরা মাউন্ট এভারেস্টের ওপরের আকাশপথ দিয়ে বিমান ওড়ান না কেন? কেন তারা এড়িয়েই চলেন এই আকাশপথ। জানেন কি এর নেপথ্যে কী কারণ লুকিয়ে আছে?
বেশিরভাগ বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলি সরাসরি হিমালয় পর্বতমালার ওপর দিয়ে বিমান চলাচল এড়িয়ে চলেন। কারণ হিমালয় পর্বতমালার একাধিক চূড়ার উচ্চতা ২০,০০০ ফুট—কিংবা তার থেকেও বেশি। যার মধ্যে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ২৯,০৩৫ ফুট। আর বেশিরভাগ বাণিজ্যিক বিমান সর্বাধিক ৩০ হাজার ফুচ উচ্চতা পর্যন্ত উড়তে পারে। হিমালয় পর্বতমালার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় পর্বতচূড়া থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ওড়ার জন্য বিমানগুলিকে বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের নীচের অংশের দিক বরাবর এগিয়ে যেতে হয়। আর স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের বায়ুস্তর অত্যন্ত পাতলা। এই বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রাও অত্যন্ত কম থাকে। আর যার ফলে বাতাসে টালমাটাল পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে এবং তা অনেকাংশেই যাত্রীদের অসুবিধার কারণ হতে পারে। পাশাপাশি এই স্তরে বায়ুর চাপ অনেকটাই শক্তিশালী এবং পর্বতের উপস্থিতির কারণে বিমান চলাচল অনেকটাই জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আকাশপথ সমতল ভূমির ওপর দিয়ে হলে কী হয় আপদকালীন জরুরি অবতরণের প্রয়োজন হলে পাইলট বিমান অবতারণ করতে পারে। কিন্তু এভারেস্টের চারপাশে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে কোনো সমতলভূমি নেই। ফলে হঠাৎ করে জরুরি অবতরণের প্রয়োজন হলে তা সম্ভব হয় না। তাই পার্বত্য অঞ্চলে বিমান অবতরণের ঝুঁকির জন্য এভারেস্টের ওপর দিয়ে বিমান চলাচল নিষিদ্ধ। এই একই কারণে তিব্বতের ওপর দিয়েও বিমান ওড়ে না। অনেকে তিব্বতের লাসার প্রসঙ্গ এনে নানান অলৌকিক ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। আর ঠিক একই রকম কারণে জরুরি অবতরণগত সমস্যার কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বিমান চলাচল করে না।
এছাড়া সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল কিংবা পার্বত্য অঞ্চলে অক্সিজেনের অভাব একটা বড়ো সমস্যা। সেকারণে পার্বত্য অঞ্চলে ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় বিমান চালানো মানে মৃত্যুকে স্বাগত জানানো। এর পাশাপাশি, এই ধরনের এলাকায় জনবসতি কম হওয়ার জন্য রাডার পরিসেবার অস্তিত্বও প্রায় নেই বললেই চলে, সুতরাং পাইলটেরও ভূমির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের কোনো চান্স নেই। আরও একটা বিষয় আছে, সেটি অত্যন্ত গোপন এবং নিরাপত্তা বিষয়ক। ভারতীয় বায়ুসেনা এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সের প্রশিক্ষণ চলে হিমালয়ের পার্বত্য উপত্যকা অঞ্চলে। এভারেস্টের আশেপাশে ভারতীয় বায়ুসেনার বেশ কিছু বেস-ক্যাম্প আছে। সে কারণে বাণিজ্যিক বিমান এই অঞ্চলে ওঠা-নামা পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ। দেয়াল মানচিত্রে এই দূরত্ব পরিমাপ করলে আপনার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবে না। কারণ আমাদের পৃথিবী কিন্তু আয়তকার নয়, গোলাকার। বিষয়টি বোঝার জন্য আপনি একটা গ্লোব নিন। এবার গ্লোবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্য এশিয়ার কোনো দেশ চিহ্নিত করুন। এবার একটি সুতোর সাহায্যে বিমানের যাত্রাপথ এবং সমুদ্রের ওপরের যাত্রাপথ মেপে দেখুন, দেখতে পাবেন সোজা পথের চেয়ে বাঁকানো পথই স্বল্পদৈর্ঘ্যের।
এবার চলে আসি মাউন্ট এভারেস্টের বেশ কিছু গল্পে। আপনি যদি কাউকে প্রশ্ন করেন, সর্বপ্রথম কে এভারেস্ট জয় করেছিলেন? মনে মনে হয়তো আপনি ভেবে নিয়েছেন যে, উত্তরে তিনি স্যার অ্যাডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগের নাম বলবেন। কিন্তু আপনি যদি কোনো ব্রিটিশ নাগরিককে এই প্রশ্ন করেন তাহলে সে আপনাকে চমকে দিয়ে কি উত্তর দেবে জানেন? – জর্জ ম্যালোরি এবং তাঁর সহযোগী অ্যান্ড্রু অরভিন। অ্যান্ড্রুর ডাকনাম ছিল স্যান্ডি। কেউ কেউ স্যান্ডি অরভিনও বলে থাকেন।
ব্রিটিশ নাগরিকের মুখে এই দুই পর্বতারোহীর নাম শুনে মোটেও অবাক হবেন না। কারণ অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। ব্রিটিশ নাগরিকরা বেশিরভাগই বিশ্বাস করেন না যে হিলারি ও নোরগে প্রথম মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন। তাদের স্থির বিশ্বাস, হিলারি এবং নোরগেরও ত্রিশ বছর আগে সর্বপ্রথম এভারেস্ট জয় করেছিলেন ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরি এবং তাঁর সহযোগী স্যান্ডি।
ব্রিটিশদের এই বিশ্বাস যে একেবারেই অমূলক তা কিন্তু নয়। এভারেস্টকে বলা হয় পৃথিবীর তৃতীয় মেরু। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেই পৃথিবীর দুই মেরুতে মানুষ তার পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছিল। বাকি ছিল শুধু এভারেস্ট। আর এভারেস্টের চূড়ায় নিজেদের পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার জন্য সবার আগে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ পর্বতারোহীরা এবং সে কারণেই বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ১৯২১ সালে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করার প্রথম পরীক্ষামূলক চেষ্টাটিও করেছিল তারা। এই পরীক্ষামূলক অভিযানের একজন সদস্য ছিলেন ইংল্যান্ডের মবেরিতে ১৮৬৬ সালে জন্ম নেয়া জর্জ ম্যালোরি। এই অভিযান হয়েছিল তিব্বতের দিক দিয়ে। তিব্বতের পথে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার রাস্তা আবিষ্কার করেছিলেন জর্জ ম্যালোরি এবং গাই বুলক
জর্জ ম্যালোরি ছিলেন একজন ধর্মযাজক। পাদ্রীদের বংশধর জর্জ উইনচেস্টার কলেজে পড়াশোনার করার সময় তাঁর একজন শিক্ষকের অধীনে আল্পস পর্বতমালায় ভ্রমণে গিয়েছিলেন এবং আল্পসের অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছিলেন। সেই প্রথমবার তাঁর পর্বতারোহণের দক্ষতা প্রকাশ পেল। তারপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হলেন জর্জ।
শিক্ষকতার পাশাপাশি চলল পর্বত অভিযান। জর্জ কখনও যেতেন আল্পস পর্বতে আবার কখনও বা যেতেন ওয়েলস পর্বতে। দক্ষ পর্বতারোহী হওয়ার জন্য প্রায়শই পর্বতারোহণ করতেন। দক্ষতা ঝালাই করে নিতেন বিভিন্ন অভিযানের মধ্য দিয়ে। তৎকালীন সময়ের অন্যান্য পর্বতারোহণকারীরা খেয়াল করেছিলেন, জর্জের পর্বতারোহণের কৌশল, দক্ষতা অন্যদের থেকে একেবারেই আলাদা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জর্জ ম্যালোরি ফ্রান্সের হয়ে যুদ্ধে যোগ দিলেন। ১৯১৯ সালে যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি আবার শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করলেন। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁর মধ্যে থেকে তখনও কাটেনি।
১৯২১ থেকে ১৯২৪ এই সময়ের মধ্যে তিনটি এভারেস্ট অভিযান চালানো হয়েছিল। এই অভিযানে যে ২৬ জন যোগ দিয়েছিলেন তার মধ্যে ২০ জনই যুদ্ধের ভয়াবহতার সাক্ষী ছিলেন। জর্জ দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটেনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আল্পাইন ক্লাবের সদস্য ছিলেন। তাই ক্লাবটি যখন ১৯২১ সালে সর্বপ্রথম এভারেস্ট জয়ের অভিযান পরিচালনার কথা ভাবছিল, স্বাভাবিকভাবে এই অভিযাত্রিক দলের সদস্য জর্জ ম্যালোরিই ছিল তাদের অন্যতম পছন্দ।
জর্জদের সেই গ্রুপের অভিযান ছিল নিছক পরীক্ষামূলক। এভারেস্ট জয় করতেই হবে এমন কোনো পরিকল্পনা তাদের ছিল না। পরীক্ষামূলক অভিযানের জন্য তারা নর্থ পোলের বেশি ওপরে উঠতে পারলেন না। তারা শুধু রাস্তা আবিষ্কার করলেন ও ফিরে এলেন। ফলে চূড়ায় ওঠার নেশাও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেল। ফলে এর পরের বছর ১৯২২ সালেই আর একটি অভিযান চালানো হল, যা ছিল এভারেস্ট জয়ের সর্বপ্রথম পরিকল্পিত অভিযান। সেই অভিযানে ৭ জন শেরপা তুষার ঝড়ের কবলে পড়ে মারা গেলেন। এই অভিযানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরি। ব্যর্থ মন নিয়ে এভারেস্টের চূড়ার অনেকটা কাছ থেকে ফিরে এলেন তিনি। অনেকেই ধরে নিলেন তাঁর আর এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা হবে না।
দেখতে দেখতে জর্জের বয়স বেড়ে ৩৬-এর কোঠায়। ৩ সন্তানের জনক হয়েছেন তিনি। কিন্তু যাই হোক এভারেস্টের নেশা তাঁকে আর ছাড়তে চায় না। যে করেই হোক এভারেস্ট তাকে জয় করতেই হবে—এটাই ছিল জর্জের ধ্যান-জ্ঞান। তাই শেষবারের মতো আবারও এভারেস্টে জয়ের নেশায় ছুটলেন তিনি।
১৯২৪ সালে এভারেস্ট জয়ের অদম্য ইচ্ছা নিয়ে আবারও অভিযানের পরিকল্পনা করলেন জর্জ ম্যালোরি। এই অভিযানের পরিকল্পনা করতে দেখে একটু অবাক হয়ে পড়লেন জর্জের স্ত্রী রুথ। সন্তান এবং পরিবারের কথা বলে স্ত্রী তাঁকে বোঝাতে চাইলেন যে, তাঁকে পরিবারের পাশে, সন্তানদের পাশে থাকা খুব প্রয়োজন। কিন্তু মন যার পড়ে আছে এভারেস্টে তাঁকে কি আর ফেরানো যায়। স্ত্রীর মন রক্ষার্থে জর্জ স্ত্রীকে বললেন, “এবার যদি এভারেস্ট জয় করতে পারি তাহলে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় তোমার একটা ছবি রেখে আসব।”
স্ত্রীকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে, স্ত্রীর নিষেধ সত্ত্বেও জর্জ ম্যালোরি যাত্রা করলেন এভারেস্টের দিকে। ১৯২৪ সালে জর্জের এভারেস্ট অভিযানের অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে লাগলো জর্জ ম্যালোরির নাম। নিউইয়র্কে বেশ বড়ো করে ম্যালোরিকে নিয়ে হল সাংবাদিক সম্মেলন। এই সাংবাদিক সম্মেলনে ম্যালোরিকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, “আপনি কেন মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে চান?” জর্জ উত্তর দিলেন, “বিকজ ইটস দেয়ার!”
এবার তাঁর সঙ্গী হলেন মাত্র ২২ বছর বয়সি অ্যান্ড্রু অরভিন ওরফে স্যান্ডি। ১৯২৪ সালে অনুষ্ঠিত অভিযানের প্রথম দুটির প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না তারা। এদিকে জুন মাস, আসছে মৌসুমি আবহাওয়া। দেরি করা সম্ভব নয়। সেখান থেকেই স্ত্রীকে একটি চিঠি লিখলেন জর্জ। চিঠির বয়ান বড়ো মর্মস্পর্শী, “বর্ষাকাল এগিয়ে আসছে। এর পর আর ওঠার সুযোগ পাবো কি না জানি না। আমি এখানে পড়ে থাকতে চাই না। পরশুদিন আমরা যাত্রা শুরু করতে চাই।”
তারপর জর্জ আর স্যান্ডি এভারেস্ট জয়ের পণ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো অভিযান শুরু করলেন। ৪ জুন তারা দুজন অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্প থেকে রওনা হয়ে পরের তিন দিনে ৬ নম্বর বেস-ক্যাম্পে পৌঁছোলেন। ৮ জুন দুজন ৬ নম্বর বেস-ক্যাম্প থেকে রওনা হয়ে সেদিন দুপুরের মধ্যে চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন। শুরু হল প্রবল তুষার ঝড়! পরেরটা চাপা পড়ে যাওয়া ইতিহাস। যে ইতিহাস মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এভারেস্টে চাপা পড়ে যায়। হিমালয়ের এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস বড়ো বিচিত্র।
প্রশাসন জানিয়েছিল, জর্জ আর অ্যান্ড্রুকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল এভারেস্টের ৮,৬০০ মিটার উচ্চতায়। সেখান থেকে চূড়ায় উঠতে তাদের বাকি ছিল আর মাত্র আড়াইশো মিটার। আশা করা যায়, খুব কাছাকাছিই চলে গেছিলেন তারা। কিন্তু তাদেরকে আর কখনও দেখা যায়নি। প্রচণ্ড তুষার ঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন দুজনই জর্জ আর অ্যান্ড্রু?
এই দুই পর্বতারোহীর মৃত্যু এভারেস্ট পর্বতারোহণের ইতিহাসে এক বড়ো রহস্যের জন্ম দেয়। সকলের মনেই প্রশ্ন দানা বাঁধে, তারা কি পেরেছিলেন শেষপর্যন্ত এভারেস্ট জয় করতে? নাকি তার আগেই মারা যান?
১৯৩০ সালের এক অভিযানে অরভিনের আইস অ্যাক্স বা কুঠার খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ৮,৪৪০ ফুট উচ্চতায়। তারপর ১৯৯১ সালের এক অভিযানে ১৯২০ সালের অভিযানে ব্যবহৃত অক্সিজেন ক্যানটি খুঁজে পায় একটি অভিযাত্রী দল। এভাবেই ছোটো ছোটো কিছু নমুনা পাওয়া যাওয়ায় ১৯৯৯ সালে জর্জ আর অ্যান্ড্রুকে খুঁজতে একটি অভিযান হয়। যে অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ম্যালোরি আর অরভিনের মৃতদেহ আর তাদের ক্যামেরাগুলি খুঁজে বের করা। কারণ, যদি ক্যামেরাটি খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো সেখান থেকে জানা যেতে পারে তারা এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিলেন কী রাখেননি।
ওয়াখেন হেমলের একজন জার্মান লেখক, যিনি নিজে একজন অভিযাত্রীও। ১৯৯৯ সালের যে দলটি এভারেস্টে জর্জ ম্যালোরির মরদেহ খুঁজে পায় তিনি ছিলেন সেই দলের একজন সদস্য। জর্জ ম্যালোরির জীবন এবং রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলো ছেলেবেলা থেকেই তাকে খুব টানত। তিনি লিখছেন, “আমার বাবাও ছিলেন একজন পর্বতারোহী। আমার বয়স যখন ছয় বা সাত বছর, তখন তিনিই প্রথম আমাকে এসব গল্প শোনান। তখন থেকেই জর্জ ম্যালোরি এবং তার সঙ্গী আরভিন সম্পর্কে শুনতাম। তাদের সম্পর্কে খবরের কাগজে যা ছাপা হত তা আমি সংগ্রহ করে রাখতাম। এসব খবরের মধ্যে একটি ছিল ১৯৭৫ সালের, যেখানে একজন চিনা পর্বতারোহী দাবি করেছিলেন যে এভারেস্টের উত্তর পাশ দিকে আরোহণের সময় তিনি একজন বৃদ্ধ ইংরেজের মরদেহ দেখতে পেয়েছেন। এটা ম্যালোরি কিংবা আরভিন ছাড়া আর কারও হতে পারে না। কিন্তু সমস্যা হল ওই চিনা পর্বতারোহী ঠিক কোথায় এই মরদেহটি খুঁজে পান সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য তুলে ধরেননি। পরে তিনি নিজেও এক তুষারধসে প্রাণ হারান।” মি. হেমলেব লিখছেন, “আমার হাতে শুধু একটি প্রমাণ ছিল। তা হল চিনা পর্বতারোহীর ক্যাম্পের একটি ছবি। সম্ভবত, সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়েই তিনি মরদেহটি দেখতে পান। আমি ছবিটি বিশ্লেষণ করি এবং ওই ক্যাম্পের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হই। এটা যখন আমি ইন্টারনেটে প্রকাশ করি তখন একটি আমেরিকান অভিযাত্রী দলের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। জর্জ ম্যালোরির মরদেহ খুঁজে বের করে পর্বতারোহণের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো এক রহস্যের সমাধান করার আশায় যে কটি দল অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল এই মার্কিন দলটি ছিল তাদের মধ্যে একটি। জর্জ ম্যালোরিই প্রথম এভারেস্ট জয় করতে পেরেছিলেন কি না সে সম্পর্কেও তারা নিশ্চিত হতে চাইছিলেন। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি।’
ওয়াখেন হেমলেব লিখছেন, “আমেরিকানরা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এই বলে যে তারা যদি তার দেওয়া তথ্য ব্যবহার করতে পারে তবেই তারা তাকে অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসেবে সঙ্গে নেবে। এটা ছিল আমার প্রথম হিমালয় আরোহণ। সব কিছুই ছিল আমার কাছে একেবারে নতুন সব সরঞ্জাম, অক্সিজেনের বোতল, দড়ি-কাছি—এগুলো সম্পর্কে ধারণা ছিল না। কিন্তু আমার কাছে এটা ছিল ছেলেবেলার স্বপ্নপূরণ।” ওয়াখেন হেমলের লিখছেন, যেহেতু আমার পর্বতারোহণের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, তাই আমাকে থাকতে হয়েছিল পর্বতের বেস-ক্যাম্পে। সেখানে আমার দায়িত্ব ছিল টেলিস্কোপ এবং ওয়্যারলেস ব্যবহার করে আরোহী দলকে পথনির্দেশনা দেওয়া। অভিযান শুরু হওয়ার পাঁচ সপ্তাহ পর অভিযাত্রী দলটি প্রথম টের পেলেন তারা রহস্য সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন। বেশ কিছু সময় অপেক্ষার পর বেস ক্যাম্প থেকে দেখা গেল এভারেস্টের ওপর থেকে ছায়া সরে গিয়েছে এবং সূর্যালোক পর্বতের গায়ে গিয়ে পৌঁছোচ্ছে। তখন নাটকীয় সব ঘটনা ঘটতে লাগল।
আট হাজার দুশো মিটার উচ্চতায় ছিল আর একটি ক্যাম্প। নাম তার ক্যাম্প সিক্স। এই ক্যাম্প-সিক্সেই অভিযাত্রীরা খুঁজে পেলেন একটি জলের বোতল। যেটি এসেছিল ১৯৭৫ সালের চিনা অভিযান থেকে। সেখানে তারা খুঁজে পেলেন অন্যান্য আরও বেশ কয়েকজন অভিযাত্রীর মরদেহ। যারা এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। অভিযাত্রীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা জায়গা মতো পৌঁছে গিয়েছেন।
ওয়াখেন হেমলেব লিখছেন, “অভিযান শুরু করার আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছিল যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো আবিষ্কার হলেই শুধুমাত্র বেতারের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে এবং কোড ওয়ার্ড ব্যবহার করা হবে। যাতে অন্য কেউ যদি সেই বেতার বার্তা আড়ি পেতে শোনে তাহলে তারা কিছু বুঝতে পারবে না। তাই ঠিক করা হয়েছিল ‘বোল্ডার’ শব্দটার অর্থ হবে হয় ম্যালোরি কিংবা অরভিনের মরদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে। আর ‘গোরাখ’ শব্দটার মানে হবে এই দুজনের কোনো একজনের ক্যামেরাটি পাওয়া গিয়েছে। এটার গুরুত্ব এই জন্য যে ম্যালোরি যদি সত্যিই এভারেস্টের চূড়ায় উঠে থাকেন, তাহলে সেই প্রমাণ থাকবে ক্যামেরার ছবিতে। সকাল প্রায় ১১টার দিকে সঙ্গী অভিযাত্রী কনরাড এঙ্কা প্রথম একটি ম্যাসেজ পাঠালেন। কিন্তু সমস্যা হলে সেই মেসেজের আসল অর্থ কী সেটা আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। তারপর টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলাম অভিযাত্রীরা রাতের বেলা যেখানে ক্যাম্প তৈরি করেছিলেন সবাই সেখানে এসে জড়ো হচ্ছেন। কিন্তু বেলাশেষে সন্ধে ছটার দিকে যে শেষ রেডিয়ো বার্তা এল সেখানে একজন খুবই সতর্কভাবে বলল, ওয়াখেন তুমি এই খবর শুনে খুব খুশি হবে। আমি বুঝতে পারলাম হয় ম্যালোরি, নয়তো অরভিনের মরদেহ তারা শেষপর্যন্ত খুঁজে পেয়েছে।”
তিন দিন পর অভিযাত্রীরা বেস-ক্যাম্পে নেমে এল। সঙ্গে নিয়ে এল ম্যালোরির পোশাক আর কিছু নমুনা। ওয়াখেন হেমলেব লিখছেন, “অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেছিল জর্জ ম্যালোরির মৃতদেহ। আর বেস ক্যাম্প থেকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সব কিছুই ম্যালোরির পোশাকের মধ্যেই পাওয়া গেছিল। শুধু ছিল না তাঁর স্ত্রীর ছবি, যে ছবিটি তিনি এভারেস্টের চূড়ায় রেখে আসার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাঁর স্ত্রীর কাছে।
তাহলে কি এভারেস্টের চূড়ায় রেখে এসেছিলেন সেই ছবি আর নেমে আসার সময় তুষার ঝড়ে তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল? এই অভিযানে ম্যালোরির গগলসটিও পাওয়া গিয়েছিল তাঁর জামার পকেটে। চোখের গগলস পকেটে থাকার কারণে তাঁদের এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ় করে। শেষবার তাঁদেরকে যেখানে দেখা গেছিল সেখান থেকে চূড়ায় উঠতে গেলে সন্ধ্যার আগেই উঠে যাওয়া সম্ভব ছিল, অর্থাৎ তাঁরা চূড়ায় উঠেই আগে গগলসটি খুলে পকেটে রেখে দিয়েছিলেন। কারণ রাতের বেলা বা সন্ধ্যার পর গগলস পরার প্রয়োজন নেই। হাজারো প্রশ্নের মধ্য দিয়ে শেষ হল সেবারের অভিযান।”
এদিকে সেই অভিযানের ছবি প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় বিতর্ক। একাধিক ব্রিটিশ পর্বতারোহীরা বিরূপ ভাষায় আক্রমণ করে বসেন এই অভিযাত্রী দলটিকে শুধু তাই নয়, ম্যালোরির পরিবারের সদস্যরা এই অভিযাত্রীদের কাজের বিরোধীতা করেন। অবশেষে ম্যালোরির পরিবারের ইচ্ছে অনুযায়ী আমেরিকান অভিযাত্রীরা ম্যালোরির মরদেহ এভারেস্টের ঢালেই রেখে আসেন। ম্যালোরির পরিবার কেন এধরনের আচরণ করল তা কেউ জানে না। জর্জ ম্যালোরির মরদেহ আবিস্কারের পর ওয়াকেন হেমলের আরও তিনবার এভারেস্টে উঠেছিলেন। হেমলেব এর পর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন নিউইয়র্ক টাইমসকে সেখানে তিনি বলেন, “আমেরিকান অভিযাত্রীরা ম্যালোরির মরদেহ এভারেস্টের ঢালেই রেখে আসতে বাধ্য হলেন। একটা ইতিহাস চাপা পড়ে থেকে গেল এভারেস্টের বুকে।” এর পর চলে একাধিকবার এভারেস্ট অভিযান কিন্তু অরভিনের মৃতদেহ বা তাঁর কোডাক ক্যামেরার কোনোটিরই আর খোঁজ মেলেনি।
ম্যালোরি আর অরভিনের এভারেস্ট অভিযান নিয়ে নানা সময়ে নানা বিতর্ক হয়েছে। এসেছে বিভিন্ন তত্ত্ব, এসেছে ম্যালোরি এবং অরভিনের এভারেস্ট জয় করা নিয়ে অনেক গল্প কিন্তু কেউই জোর গলায় বলতে পারেননি যে তারা এভারেস্ট জয় করতে পেরেছিলেন কি না। শেষমেশ সব রহস্যের সমাধান করতে এগিয়ে আসেন জর্জ ম্যালোরির ছেলে। তিনি বলেছিলেন, “শুধু এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে পারাটাই এভারেস্ট জয় করা নয়, সেখান থেকে সফলভাবে নেমে আসাও এর অংশ।” ম্যালোরির ছেলে হয়তো অনেকটা আক্ষেপ নিয়েই কথাটি বলেছিলেন। তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়, আসলেই কি ম্যালোরি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় নিজের পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছিলেন?
.
এবার মাউন্ট এভারেস্টের কিছু অলৌকিক গল্প বলি। এভারেস্টে নাকি অশরীরী ছায়ামূর্তি দেখা যায়! আর এ নিয়ে নানান গল্প ছড়িয়ে রয়েছে হিমালয়ের আনাচে কানাচে। বৌদ্ধধর্মের তন্ত্রমন্ত্র ও নানা রকম কুসংস্কারে বিশ্বাসী শেরপারাই শুধু নয় পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষিত অনেক পর্বতারোহীও এভারেস্টে বিভিন্ন অস্বাভাবিক অবয়বের উপস্থিতি টের পেয়েছেন বলে বিভিন্ন সময় দাবি করেছেন।
এভারেস্ট অভিযানের একেবারে শুরুর দিকের কথা। সেই অভিযানের ঘটনা। বিখ্যাত ব্রিটিশ পর্বতারোহী ফ্রাঙ্ক স্মিথ বেশ কয়েকবার মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণের চেষ্টা করেছেন। ১৯৩৩ সালে প্রথমবারের মতো এভারেস্ট আরোহণের সময় স্মিথ তাঁর পাশে অদ্ভুত কিছুর উপস্থিতি অনুভব করেন। এভারেস্টের নর্থ রিজ ধরে ৮৫৬৫ মিটার উচ্চতায় তিনি তখন একা একা আরোহণ করছিলেন। ব্যখ্যাতীত এই ঘটনাটির কথা তিনি তাঁর বই ‘ক্যাম্প সিক্স’-এ লিখে গেছেন, “…অদ্ভুত দুটি বস্তু আকাশে ভাসতে দেখলাম। একটু ভালোভাবেই তাকাতে বস্তু দুটির অবয়ব স্পষ্টত হল। তারা দেখতে একেবারে ঘুড়ি বেলুনের মতো ছিল। এদের একটির ওপর আবার খাটো করে অপরিণত ডানা ও আর একটির গা থেকে বেড়িয়ে ছিল পাখির ঠোঁটের মতো স্ফীত কিছু, যেখান থেকে চায়ের কেটলির মুখ দিয়ে বাষ্প উদগিরণের মতো ধোয়া বের হচ্ছিল। এক জায়গায় স্থির হয়ে তারা ভাসছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে জীবন্ত কিছু স্পন্দিত হচ্ছিল। বস্তু দুটি আমার হৃৎস্পন্দনের চাইতেও ধীরে স্পন্দিত হচ্ছিল।”
স্মিথ আরও দাবি করেন, নর্থ পোলের ঢাল বেয়ে তিনি যখন একাকী আরোহণ করছিলেন তখন অন্য কারও উপস্থিতির অনুভূতি তাকে অবাক করে দেয়। সেই অশরীরী ছায়ামূর্তিকে এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে স্মিথ তাকে দেওয়ার জন্য পকেট থেকে এক টুকরো কেকও বের করেছিলেন।
ভূতের সঙ্গে কিনা কেক ভাগাভাগি। ভাবা যায়। তাহলে কি যারা অশরীরী আত্মার কথা বলেন তারা ঠিক? আসলে কি সত্যিই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে অতৃপ্ত আত্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছে? অশরীরি কোনো কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে এভারেস্টে? এই ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে এভারেস্টের মৃত্যুমিছিলের ইতিহাসে একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।
এখন পর্যন্ত ২২০ জনেরও অধিক পর্বতারোহী এভারেস্টে মারা গেছেন। দূর্গম ও দুরহ এভারেস্টের ঢালে মৃতদেহ উদ্ধার করা একই সঙ্গে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ব্যয়বহুল হওয়ায় বেশির ভাগ মৃতদেহই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ মৃতদেহই এভারেস্টের ঢালে চির তুষারাবৃত ও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। এত লাশ এখানে জমা হয়ে আছে যে পৃথিবীর সর্বোচ্চ কবরস্থান এটিকে বলাই যায়।
কিছু লাশ রয়ে গেছে এভারেস্ট আরোহণের বহুল ব্যবহৃত ট্রেইলের একদম পাশেই। আসতে যেতে নতুন আরোহীদের প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয় এদের সঙ্গে। সাদা তুষারে নিথর পড়ে থাকা মৃত পর্বতারোহীদের গায়ের রংবেরঙের পোশাক আর গিয়ারের জন্য এভারেস্টের উত্তর-পূর্ব রিজের নামই হয়ে গেছে তাই রেইনবো ভ্যালি বা রামধনু উপত্যকা।
প্রাচীনকাল থেকেই হিমালয়ের কোলে বাস করা জাতিগোষ্ঠীদের বিশ্বাস, হিমালয় জুড়ে দেবতাদের রাজত্ব। তিব্বতের ধর্মমতে তন্ত্র-মন্ত্র, দেবী দেবতা ও দানবের প্রভাব বেশ বলিষ্ঠ। শেরপারা বিশ্বাস করে, পর্বতে অপঘাতে যারা মৃত্যুবরণ করে, যাদের শেষকৃত্যটুকুও হয় না, তাদের আত্মা কখনোই নির্বাণ পায় না, স্বর্গ-নরক কোথাও তাদের জায়গা হয় না। চিরকাল তারা অতৃপ্ত আত্মা হিসেবে বিক্ষিপ্তভাবে পর্বতে ঘুরে বেড়ায়। আর পর্বতে এরকম আত্মার সংখ্যা এত বেশি যে বাড়ি ফিরতে দেরি হলেই তারা ভাবেন এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটল।
শেরপারা হিমালয়কে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভয়ের দৃষ্টিতে দেখে। তারা মনে করে হিমালয়ের দেবী খেপে গেলে তিনি ভয়ানক শাস্তি দেবেন। দেবীর আক্রোশে অপঘাতে মৃত্যু ঘটবে আর তাদের আত্মা অতৃপ্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে। শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য, রোমাঞ্চ আর স্থানীয় মিথের আখড়া এই হিমালয় ধারণ করে এমন কিছু রহস্য, যা এখনও আমরা ঠিকঠাকভাবে বুঝে উঠতে পারিনি।
তাহলে, সাগরমাথায় পেম্বা আর স্মিথের অভিজ্ঞতা কি প্রমাণ করে শেরপাদের বিশ্বাসই সঠিক? সংশয়বাদীরা অবশ্য বলেন পর্বতারোহীদের এই অবাস্তব কিছুর সংস্পর্শে আসা বা অশরীরী কোন ছায়া দেখার ঘটনাকে মানুষের মন ও মস্তিষ্কের ওপর কঠিন পরিবেশ ও অতি উচ্চতায় প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে, শারীরিক দুর্বলতায়, অবিশ্বাস্য রকম ঠান্ডায়, ক্ষুধার্ত পেটে, স্বপ্ন অক্সিজেনে ও অতি উচ্চতাজনিত অসুস্থতার সংমিশ্রণে মানব মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতা সহজেই নড়বড়ো হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সব কিছু মিলিয়ে এক ধরনের ইন্দ্রজালের মতো হ্যালুসিনেশন তৈরি করে।
এই অন্য কারও অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করার বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন, FOP বা Feeling of Presence। মাইকেল সারমা’র ‘দ্যা বিলিভিং ব্রেইন’ বইয়ে এই হাইপোথিসিস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই হাইপোথিসিস অনুযায়ী এফওপি সিনড্রোম শুধু পর্বতারোহীদেরই হয় না। এটা হতে পারে মেরু অভিযাত্রী, নিঃসঙ্গ নাবিক অথবা নিরবিচ্ছিন্ন অনুশীলনরত কোনো ক্রীড়াবিদের সঙ্গেও। অর্থাৎ প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক চাপে থাকা যে-কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন এফওপি এফেক্টে।
এই হাইপোথিসিসকে কেন্দ্র করে ২০১৪ সালে বৈজ্ঞানিকভাবে একটি গবেষণা করা হয়েছিল এভারেস্টে। সে-বছর সুইস বিজ্ঞানীদের একটি দল ভূত দেখা সংক্রান্ত গবেষণায় অংশগ্রহণ করতে স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করেন। মানব মস্তিষ্কের যে অংশে মোটর সেন্সরি সিগন্যাল গৃহীত হয় সেই অংশটি নিয়ে গবেষক টিম গবেষণা চালায়।
পরীক্ষা শেষে গবেষকরা বলেন, অশরীরী ছায়া দেখা বা এই এফওপি এফেক্ট আসলে মস্তিষ্ক দ্বারা সৃষ্ট এক ধরনের মায়া। আমরা যখন প্রচণ্ড রকম মানসিক চাপে থাকি বা মারাত্মক শারীরিক পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে যাই বা নিঃসঙ্গতা থেকে বিষণ্ণ থাকি তখন আমাদের অবচেতন মনের চিন্তা ও কল্পনা মস্তিষ্কে এক ধরনের ইলিউশন বা ভ্রম তৈরি করে।
হিমালয়ের অতি উচ্চতায়, মারাত্মক ক্লান্ত অবস্থায় অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে এফওপি সিন্ড্রোম হবার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। ১৯৭৫ সালের ব্রিটিশ এভারেস্ট অভিযানের অভিযাত্রী দলের সদস্য ডোগাল হাসটন ও ডগ স্কট এরকমই এক ভয়াল রাতের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছিলেন।
হাসটন ও স্কট এভারেস্ট সামিট করে নীচে নামার সময় তাঁদের অক্সিজেন সিলিন্ডারে ত্রুটি দেখা দেয়। খারাপ আবহাওয়া থেকে বাঁচতে তারা আট হাজার মিটারের ওপরে ডেথজোনের একটা জায়গায় তুষার খুঁড়ে গুহা বানিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কোনও ধরনের খাবার-দাবার, স্লিপিং ব্যাগ ছাড়া ক্লান্ত শরীরে তারা দীর্ঘ রাত কেটে যাবার প্রতীক্ষা করছিলেন। এক সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা অতিরিক্ত অক্সিজেন ফুরিয়ে যায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায় যখন তাঁদের সঙ্গে থাকা স্টোভের বিউটেন গ্যাসও শেষ হয়ে যায়। এমন অবস্থায় সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন কি না সে ব্যাপারে তারা কেউই আশাবাদী ছিলেন না।
এমন সময়ে দুজন অনুভব করেন গুহায় তাদের সঙ্গে তৃতীয় আর একজন উপস্থিত হয়েছে। তাকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার উপস্থিতি দুজনই টের পাচ্ছিলেন। সারারাত ধরে সেই অদৃশ্য অশরীরি তার শরীরের উত্তাপ দিয়ে দুজনের হিম হয়ে যাওয়া শরীরকে গরম করার চেষ্টা করে গেছে, সেই সঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলে কীভাবে রাতটুকু কাটিয়ে দেওয়া যাবে এই ব্যাপারে উপদেশ দিয়ে যাচ্ছিল।
পিটার হিলারি থেকে শুরু করে লিংকন হল বা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পর্বতারোহী রেইনহল্ড মেসনার ও তাঁদের পর্বতাভিযানের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এমন এক অশরীরী ছায়ার উপস্থিতির কথা বলেছেন।
এভারেস্টের এমন আর একটি রহস্যময় ঘটনার কথা বলি। ১৯৯৬ সালে এভারেস্ট অভিযানে এক ভয়াবহ ঝড়ের কবলে পড়ে মারা যান আট অভিযাত্রী, ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েন আরও অনেকে। এভারেস্ট আরোহণের ইতিহাসে ভয়াবহতম এই বিপর্যয় নিয়ে জন ক্র্যাকায়ার লিখেন তাঁর বেস্ট সেলার বই ‘ইনটু থিন এয়ার’। এই বইয়েই বর্ণনা করা হয়েছে অদ্ভুত রহস্যময় ঘটনাটি। ঝড় যখন এভারেস্টের দেয়ালে আঘাত হানে জন তখন নীচে নেমে আসছিলেন। ক্যাম্প ফোরের কাছাকাছি এসে তাঁর মনে হয় তাঁর দলসঙ্গী অ্যান্ডি হ্যারিস সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েকবার ডাকাডাকি করলেও সেই ছায়ামূর্তি তার কোনো উত্তর দেয়নি। অনেক পরে আবিষ্কার হল দুর্ভাগা অ্যান্ডি হ্যারিসের মৃতদেহ ক্যাম্প থেকে অনেক ওপরে নিথর পড়ে আছে। তাহলে জন আসলে কাকে দেখেছিল সেই সময়? এটা কি তার ভ্রম ছিল, নাকি এভারেস্টের হিমশীতল এই রাজ্যে আসলেই আছে কোনো অশরীরী?
পৃথিবীর সর্বোচ্চ এই পর্বতের অশরীরি রহস্যকে আধুনিক বিজ্ঞান আর গবেষকেরা হয়তো নানাভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারেন, কিন্তু ওই বিশেষ মুহূর্তের অভিজ্ঞতা তাই বলে মিথ্যে হয়ে যায় না। যেমন মিথ্যে হয়ে যায় না দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠার অনুভূতি, যেমন মিথ্যে হয়ে যায় না অন্ধকার নির্জন রাতে শ্মশানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময় গা ছমছমে অনুভূতি—যদিও আমাদের জানা থাকে ভয় পাবার কোনো কারণই নেই। তারপরেও অজানা কারণে শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়, হাতের লোম দাঁড়িয়ে যায়। তেমনি সব ব্যাখ্যার পরেও চির তুষারাবৃত হিমালয় তার সব সৌন্দর্য, রোমাঞ্চ, লোকগাথা আর কিংবদন্তির সঙ্গে ঢাকা থাকে রহস্যের মোড়কে।
মাউন্ট এভারেস্ট নিয়ে কিছু তথ্য :
মাউন্ট এভারেস্টের কিন্তু শুধু একটিই নাম নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই এভারেস্টকে বিভিন্ন নামে ডেকে থাকে-
১. নেপাল এই এভারেস্টকে ‘সাগর মাথা’ বা ‘গডেস অফ দ্য স্কাই’ নামে ডেকে থাকে। ‘চোমোলুংমা’ বা মাদার গডেস অফ দ্য ইউনিভার্স নামে ডেকে থাকেন তিব্বতিরা।
২. কেন্টন কুল নামে এক পর্বতারোহী ২০১১ সালে এভারেস্টের চূড়া থেকে প্রথমবার টুইটারে টুইট করেছিলেন।
৩। গুগল তাঁর google map-এ মাউন্ট এভারেস্টের সম্পূর্ণ ছবি দেওয়ার জন্য তাদের একটি দলকে ১২ দিন ধরে ছবি তুলিয়েছিল।
৪. ‘মাউন্টেন স্পাইডার’, হ্যাঁ। এভারেস্টে চড়তে হলে এই স্পাইডারদের মুখোমুখি আপনাকে হতেই হবে। হিমালয়ের শৃঙ্গে চড়তে গেলে কোনোভাবেই আপনি এদের এড়িয়ে যেতে পারবেন না। এই মাউন্ট স্পাইডারদের ৬৭০০ মিটার ওপরেও দেখতে পাওয়া যায়।
৫. ব্রিটিশ নাগরিক অ্যান্ড্রু ওয়া ১৮৮৭ সালে মাউন্ট এভারেস্টের নাম দিয়েছিলেন।
৬. মাউন্ট এভারেস্টের ৮০০০ মিটার ওপরকে ‘ডেথ জোন’ বলা হয়ে থাকে। কারণ, ৮০০০ মিটার ওপরে পর্বতারোহীরা পাহাড়ে এক অজানা অসুস্থতায় পড়েন। এমনকি তাঁরা দিক নির্দেশনাও হারিয়ে ফেলেন। আর অক্সিজেনের অভাবতো আছেই। যার ফলে অনেক পর্বতারোহীর মৃত্যুও ঘটে।
৭. আপনি চাইলেই ফ্রি-তে মাউন্ট এভারেস্টে চড়তে পারবেন না। এর জন্য আপনাকে প্রায় ৩০ হাজার ডলার গুনতে হবে।
৮. আপনি শুনলে অবাক হয়ে যাবেন মাউন্ট এভারেস্টকে বিশ্বের সবচেয়ে নোংরা এভারেস্ট বলা হয়ে থাকে। কারণ, মাউন্ট এভারেস্টে প্রচুর বিয়ারের ক্যান থেকে শুরু করে অক্সিজেনের ভারী ভারী বোতল দেখতে পাওয়া যায়। যা গুনে শেষ করা যাবে না। তাই এটি বিশ্বের সবচেয়ে নোংরা পর্বত।
৯. একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে প্রতি ১০ পর্বতারোহীর ১ জন পর্বতে চড়তে গিয়ে মারা যায়।
১০. বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষই মাউন্ট এভারেস্টে চড়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই সফল হননি।
হিলারি, নাকি তেনজিং-কে ছিলেন প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী?
“১৯৫৩ সালের ২৯ মে-র সেই সকাল থেকেই, যখন তেনজিং নোরগে এবং আমি প্রথমবারের মতো পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করতে সক্ষম হলাম, আমাকে এক মহান অভিযাত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হতে থাকে। কিন্তু আমি আসলে স্রেফ এক পোড় খাওয়া কিউয়ি, যে জীবনের বহু প্রতিকূলতাকে উপভোগ করেছে মনে-প্রাণে।” -ন্যাশনল জিয়োগ্রাফিক পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এটাই ছিল এভারেস্ট বিজয়ী এডমন্ড হিলারির প্রতিক্রিয়া।
এভারেস্ট শিখর থেকে নামার পথে অনেকটা সময় পরে প্রথম যে মানুষটির সঙ্গে হিলারি ও তেনজিং-এর দেখা হল, তিনি ছিলেন সেই ঐতিহাসিক অভিযানের আর একজন কিউয়ি, এডমন্ড হিলারির ঘনিষ্ঠ বন্ধু জর্জ লোয়ে। যিনি হিলারি এবং তেনজিং-এর জন্য গরম স্যুপের পাত্র নিয়ে বেশ খানিকটা উপরের দিকে এগিয়ে আসছিলেন। বন্ধুকে দেখতে পেয়ে হিলারি বললেন তাঁর সেই অমর বাক্য—Well, George, we knocked the bastard off.”
এভারেস্ট থেকে নেমে আসার পরই একাধিক প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন দক্ষ পর্বতারোহী এডমন্ড হিলারি এবং শেরপা তেনজিং। প্রথম এভারেস্ট শিখরে কে উঠেছিলেন—হিলারি না তেনজিং? এই প্রশ্ন জন্ম দিল এক ঐতিহাসিক বিতর্কের। মাউন্ট এভারেস্টের নামকরণ থেকে প্রথম পরিমাপকর্তা নিয়ে যেমন বিতর্কের অবসান নেই, ঠিক তেমনই এভারেস্ট শীর্ষে প্রথম আরোহণের কৃতিত্ব কার—তা নিয়েও বিতর্ক তুঙ্গে।
হিলারির হিমালয় কেন্দ্রিক আত্মজীবনী ‘High Adevntures এবং View from the Summit’—এই দুটি গ্রন্থেই হিলারি লিখছেন—’আমরা একসঙ্গে শীর্ষে পৌঁছালাম।… ‘ A few more whacks of the ice axe in the firm snow, and we stood on top.’
বিতর্ক বাঁধল এবার একটি ছবিকে কেন্দ্র করে। এভারেস্ট শীর্ষে মানুষের প্রথম আরোহণের ছবিটি আজও পৃথিবীর সেরা আলোকচিত্রগুলির মধ্যে একটি। ছবিটি জনসমক্ষে প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে জোর শোরগোল পড়ে যায়। সেই চিত্রটিতে দেখা যায়, এভারেস্টের বরফসাদা শৃঙ্গে পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আর কেউ না, শেরপা তেনজিং। আর সেই ছবিটি তুলেছেন এডমন্ড হিলারি। ছবি তোলা অবধি না হয় ঠিকই ছিল, কিন্তু এভারেস্টে হিলারির কোনো ছবি নেই কেন? অনেক প্রশ্নের পর হিলারি স্বয়ং এর কারণ জানান। এভারেস্টে আরোহণের পর হিলারি জানতে পারেন, তেনজিং ক্যামেরা ব্যবহার করতে জানেন না। অতএব তাঁকে দিয়ে ছবি তোলানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এভারেস্টের স্মৃতি হিসেবে তাই হিলারি তেনজিং-এর ছবি তুলে দেন, যা পরে ইতিহাস রচনা করে। সে-যুগে সেলফি থাকলে হয়তো এই বিতর্ক উঠতই না।
এদিকে, এভারেস্ট জয়ের পর তেনজিংকে নিয়ে শুরু হয়ে গেছে এক অদ্ভুত আন্তর্জাতিক লড়াই। তেনজিং ভারতের, না নেপালের? তবে তেনজিংকে নেপালি নাগরিকের চেয়ে ভারতীয় প্রমাণ করতে ব্যগ্র হল একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তেনজিংকে ভারতে রাখার ব্যবস্থা করলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। দার্জিলিং-এ হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট স্থাপন করে তেনজিংকে সেখানকার প্রথম ডিরেক্টর করে দিলেন তিনি।
কিন্তু ‘এভারেস্ট শিখরে প্রথম কে উঠেছে’—এই বিতর্কের অবসান হল না। সারা বিশ্বের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে হিলারি ও তেনজিং ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। সাংবাদিকদের সমস্ত জল্পনা-কল্পনায় জল ঢেলে তেনজিং তাঁর আত্মজীবনী—’Man of Everest’-এ স্পষ্টভাবে জানালেন, হিলারিই প্রথম শিখর জয় করেছিলেন এবং সেই চল্লিশ ফুট উঁচু আপাত-অসম্ভব পাথুরে দেওয়ালটি, যার নামকরণ পরবর্তীতে করা হয় ‘হিলারি স্টেপ’, অতিক্রমের উপায় হিলারিই খুঁজে বের করেন এবং তেনজিং তাঁকে কেবল অনুসরণ করে শিখরে পৌঁছেছিলেন।
কিন্তু তাতেও যখন মানুষের জল্পনা থামল না তখন তেনজিং মানুষের কৌতূহলে বিরক্ত হয়ে বলতে বাধ্য হলেন – “যদি এভারেস্টে হিলারির এক কদম পেছনে থেকে দ্বিতীয় মানুষ হিসেবে আরোহণ কোনো লজ্জাজনক বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে এই লজ্জা নিয়েই আমাকে বাকি জীবন অতিবাহিত করতে হবে।”
এদিকে কিছু সাংবাদিক এভারেস্টের সেই ছবি নিয়ে তেনজিংকে প্রশ্ন করলে তেনজিং বলেন একেবারে এক অন্য কথা। তেনজিং বলেন, তিনি হিলারির ছবি তুলে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে হিলারি নিষেধ করেন এবং বলেন, শিখরে কে আগে উঠেছে’ – সেটা কাউকে না বলতে।
অন্যদিকে, এভারেস্ট জয়ের সংবাদে আপ্লুত ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ ‘নাইটহুড’ উপাধিতে ভূষিত করেন হিলারি এবং অভিযানের মূল নেতা জন হান্টকে। তেনজিং নোরগে ব্রিটিশ উপনিবেশের নাগরিক না হওয়ায়, বিদেশির জন্য সর্বোচ্চ সম্মান ব্রিটিশ এম্পায়ার মেডেল বা জর্জ মেডেল লাভ করেন। ব্রিটিশ সংবাদসংস্থার এক সূত্র থেকে জানা যায়, তেনজিংকেও নাকি নাইটহুড দেবার প্রস্তাব উঠেছিল সে-সময়, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর তাতে আপত্তি ছিল। যদিও নেপালের রাজা হিলারি ও তেনজিং উভয়কেই সম্মানিত করেন।
এডমন্ডের পেশা ছিল মৌমাছি পালন আর শখ ছিল অবসর মরশুমে নিউজিল্যান্ডের নানা পর্বত আরোহণ। মৌমাছিপালক মানুষটি ‘স্যার” উপাধি পাওয়ার পর বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন–“আমি সেই ধরনের মানুষ নই, যার উপাধির প্রয়োজন আছে।” আর শেরপা তেনজিংও হিলারির কৃতিত্বকে বরাবর সম্মান জানিয়ে এসেছেন। বিতর্ক যাই থাক, থাক, হিলারি ও তেনজিং ছিলেন একে অপরের প্রিয়জন।
এডমন্ড ছিলেন চিরকালের এক প্রচারবিমুখ মানুষ। ভাবলেও অবাক হতে হয়, তিনিই প্রথম অভিযাত্রী যিনি তিন-তিনটি মেরু—উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু এবং ‘এভারেস্ট’ যাকে বলা হয় ‘থার্ড পোল’ বা তৃতীয় মেরু—জয় করেন। তিন মেরু জয়ী হিসেবে খুব কম মানুষই তাঁর নাম জানে। আরও একটা অজানা কথা, উত্তর মেরু জয়ে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন চাঁদে পা দেওয়া প্রথম মানুষ নীল আর্মস্ট্রং!
মাউন্ট এভারেস্ট ও রাধানাথের গল্প
মাউন্ট এভারেস্টের কথা যখন হচ্ছে তখন এই বাঙালির কথা না বললে এভারেস্টের আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকে। রাধানাথ শিকদারের কৃতিত্বকে ব্রিটিশ সরকার কৌশলে চেপে গেছিল কিন্তু কেন? আসুন জেনে নেওয়া যাক এর নেপথ্যে কি রহস্য লুকিয়ে ছিল।
দেরাদুন শহর
সে সময়ে সাধারণ মানুষকে উচ্চপদস্থ ইংরেজ অফিসাররা জোর করে পয়সা না দিয়ে পরিশ্রম করিয়ে নিত। এটাই নাকি ছিল রেওয়াজ। কিন্তু অমানবিক এই কাজের প্রতিবাদ করলেন এক সাহসী বাঙালি যুবক। যিনি সেই সময় দেরাদুনের গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার অফিসে চাকুরিরত। এই যুবকের নাম রাধানাথ শিকদার।
রাধানাথের পরিচারক-কে দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার এইচ ভ্যানসিটার্ট সাহেব বিনা পয়সায় তাঁর নিজের মালপত্তর বহন করিয়ে নিচ্ছিলেন। যা দেখে রাধানাথ আপত্তি করেন এবং ম্যাজিস্ট্রেটের মালপত্তর আটকে রাখেন। শুধু তাই নয়, ম্যাজিস্ট্রেটকে সশরীরে তাঁর কাছে আসতে বাধ্য করেন। ম্যাজিস্ট্রেট এলেন। উভয়ের মধ্যে হল উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়।
রাধানাথ তো সাহেবের মালপত্তর ফেরত দিয়ে দিলেন, কিন্তু ক্রোধে অগ্নিশর্মা ম্যাজিস্ট্রেট রাধানাথের বিরুদ্ধে দিলেন মামলা ঠুকে। মামলায় হারলেন রাধানাথ। জরিমানা হল দু’শো টাকা। সেই আমলে দুশো টাকা মানে অনেকটাই অর্থ। যাই হোক, রাধানাথ কোনোরকম গ্রাহ্য না করে জরিমানার দু’শো টাকা মিটিয়ে দিলেন। মামলা মিটল। কিন্তু রাধানাথের এই প্রতিরোধের ফলে ইংরেজদের এই বেগার খাটিয়ে নেওয়ার মতো অমানবিক কাজ সেখানে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
কলকাতার জোড়াসাঁকোর ছেলে রাধানাথ। পিতা তিতুরাম। রাধানাথের পড়াশোনা শুরু কলকাতার ৪৮নম্বর চিৎপুর রোডের ‘ফিরিঙ্গি’ কমল বসুর বিদ্যালয়ে। পরে ভরতি হন হিন্দু কলেজে। হিন্দু কলেজেই রাধানাথ ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে পান ইয়ং বেঙ্গলের ডিরোজিওকে। আর গণিতের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন ড. জন টাইটলারকে। এই সময়ে আইজ্যাক নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া’ সমগ্র ভারতে প্রথম চর্চা করেছিলেন রাধানাথ শিকদার এবং রাজনারায়ণ বসাক আর সেটা সম্ভব হয়েছিল তাঁদের শিক্ষক ড. টাইটলারের জন্যই।
হিন্দু কলেজে পড়াকালীন গণিত বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে মুগ্ধ করে। ছাত্র থাকাকালীন তিনি নিজেই জ্যামিতির একটি সম্পাদ্য সমাধানের পদ্ধতি আবিষ্কার করে সবাইকে চমকে দেন।
এদিকে কর্নেল উইলিয়াম ল্যাঙ্কটনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ভারতীয় উপমহাদেশে গ্রেট ট্রাইগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভের কাজ শুরু হয়। হায়দ্রাবাদে ল্যাম্পটনের প্রধান সহকারী হয়ে কাজ শুরু করেন জর্জ এভারেস্ট। তাঁদের সঙ্গে ছিল একটি বড়ো থিয়োডোলাইট যন্ত্র। যার সাহায্যে ল্যাঙ্কটন ও জর্জ এভারেস্ট জিটিএস পদ্ধতিতে এই উপমহাদেশে জরিপের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন।
এভারেস্ট এবং ল্যাম্পটন বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বুঝতে পেরেছিলেন, নেপালের জঙ্গলে ওই যন্ত্রকে প্রায় একত্রিশ ফুট উচ্চতায় না বসাতে পারলে পর্বতশৃঙ্গগুলির উচ্চতা পরিমাপ করা বেশ কঠিন কাজ হবে।
ইতিমধ্যে কাজ চলতে চলতেই ল্যাঙ্কটন মারা যান। যার ফলে ব্রিটিশ সরকার জর্জ এভারেস্টকেই সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত করে। ভারতের সার্ভেয়র জেনারেল জর্জ এভারেস্ট কাজের জন্য তখন একজন দক্ষ, তরুণ গণিতবিদকে খুঁজছিলেন। তাঁর বন্ধু ড. জন টাইটলার তাঁর প্রিয় ছাত্র রাধানাথের নামটি সুপারিশ করে দিলেন এভারেস্টের কাছে। টাইটলারের সুপারিশে এভারেস্ট রাধানাথকে নিয়োগ করলেন। রাধানাথ সার্ভেয়র জেনারেলের অফিসে মাসে ৩০টাকা বেতনের চাকরিতে যোগ দিলেন।
ধীরে ধীরে রাধানাথ গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্ভেয়র হন এবং দেরাদুনের সিরোজ অঞ্চলে জরিপের কাজে যুক্ত হন। এই জরিপের কাজের জন্য এভারেস্ট বেশ কিছু নিজস্ব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। মেধাবী রাধানাথ এভারেস্টের কিছু পদ্ধতির পরিমার্জন করে দিলেন। এভারেস্ট খুশি হন রাধানাথের ওপর।
জর্জ এভারেস্টই প্রথম ভারতের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিশাল এলাকা সম্বলিত পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর ওপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সার্ভের কাজ শুরু করেন। সার্ভে করতে করতে জর্জ সিদ্ধান্ত নেন হিমালয়ের সবচেয়ে উচ্চ শৃঙ্গের অবস্থান তিনি নির্ণয় করবেন।
সুযোগ-সুবিধাবিহীন, পদে পদে বিপদ থাকা সত্ত্বেও জর্জ এই কাজটি এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি কাজটি শেষ করতে পারলেন না। কারণ তার আগেই চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার সময় উপস্থিত হল। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর এভারেস্ট চলে গেলেন ইংল্যান্ডে এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন।
জর্জ এভারেস্ট অবসর নেওয়ার আগে তাঁর The Great Arc of India’-র কাজটি সম্পূর্ণ করেন। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং ভয়ংকর সমস্যাসংকুল একটি জরিপের কাজ। এভারেস্ট অবসর নেওয়ার পর তাঁর জায়গায় এলেন অ্যান্ড্রু ওয়াহ। এদিকে রাধানাথ শিকদার দেরাদুনের সার্ভে অফিস থেকে কলকাতার সার্ভে অফিসে বদলি হয়ে গেলেন।
ভাবলেও অবাক হতে হয়, এই পাঁচ বছরের মধ্যে হিমালয় পর্বতের প্রায় ঊনআশিটি শিখরের উচ্চতা নির্ণয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। এগুলির মধ্যে একত্রিশটি শিখরের নামকরণ হয়েছিল স্থানীয় নামে আর বাকিগুলিকে রোমান অক্ষরের সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করা হত।
অ্যান্ড্রু ওয়াহ হিমালয় পর্বতমালার পূর্বপ্রান্তে একটি নতুন শৃঙ্গ আবিষ্কার করেন। তিনি ধারণা করেন এর উচ্চতা তখন পর্যন্ত জানা পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার থেকে বেশি হতে পারে। এর নাম রাখা হল Peak-XV বা ‘পিক ফিফটিন’। হিমালয় পর্বতের সব শৃঙ্গের উচ্চতার মাপগুলি তখন জমা পড়ছিল কলকাতার গণনা বিভাগে। যার নেতৃত্ব ছিলেন রাধানাথ। জমা পড়া পরিসংখ্যানের মাঝেই একদিন রাধানাথ আবিষ্কার করলেন এই পিক ফিফটিনই পৃথিবীর সবথেকে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ। তাঁর হিসাব অনুযায়ী পিক ফিফটিনের উচ্চতা ২৯,০০২ ফুট। তিনি দেরাদুনে অ্যান্ড্রু ওয়াহকে বিষয়টা জানালেন। রাধানাথের মনে হল এ এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। ওয়াহসাহেব কাউকে কিছু না জানিয়ে দেরাদুনে কর্মরত এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান হেনেসি সাহেব ও তাঁর সহযোগীদের বিষয়টা ক্রসচেক করতে বললেন। স্বীকৃতি পেল রাধানাথের কৃতিত্ব।
সে বছর রয়্যাল জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটি ঘোষণা করল ‘পিক ফিফটিন’ই বিশ্বের উচ্চতম শৃঙ্গ।
“সাধারণত পর্বতের নাম সেই অঞ্চলের মানুষ যে নামে ডাকে সে নামেই নির্দিষ্ট হবে” –এরকম এক নিয়ম চালু করেছিলেন জর্জ এভারেস্ট নিজেই। সেই অর্থে সদ্য আবিষ্কৃত ‘পিক ফিফটিন’-কে নেপালিরা ডাকত ‘সাগরমাথা’ বলে আর তিব্বতিরা ডাকত ‘কুমুলুংমা’ নামে, যার অর্থ ‘পৃথিবীর জননী’। অন্যদিকে তখন নেপাল ও তিব্বত বিদেশিদের জন্যে একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। তার সঙ্গে দু’দেশে দুধরনের নাম। যে কারণে নামকরণ নিয়ে বেশ সমস্যা দেখা দিল।
হিমালয় পর্বতমালার অন্য শৃঙ্গগুলোকে তাদের আঞ্চলিক নামেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু হিমালয়ের এই সর্বোচ্চ শৃঙ্গটি আবিষ্কৃত হওয়ার পর, ওয়াহসাহেব যখন এর নির্দিষ্ট একক কোনো আঞ্চলিক নাম পেলেন না তখন তিনি আঞ্চলিক নামের প্রতি আর উৎসাহ না দেখিয়ে লন্ডনে রয়্যাল জিয়োগ্রাফিকাল সোসাইটির কাছে লিখিতভাবে সমস্যার কথা জানালেন এবং প্রস্তাব দিলেন তাঁর গুরু ‘জর্জ এভারেস্ট’-এর নামে এই সর্বোচ্চ পর্তশৃঙ্গের নামকরণ করার জন্য।
প্রস্তাব গ্রাহ্য হল। শোনা যায়, প্রচারবিমুখ এভারেস্ট নিজে কিন্তু এই প্রস্তাবে একেবারেই সম্মত ছিলেন না। তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন। কিন্তু তাঁর বিরোধিতাকে কেউ খুব একটা আমল দিল না। ‘পিক ফিফটিনে’র নাম হয়ে গেল ‘মাউন্ট এভারেস্ট’। ব্রিটিশ সরকার জর্জ এভারেস্টকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করে। মাউন্ট এভারেস্ট স্বীকৃতির এক বছর পরই জর্জ এভারেস্ট মারা যান।
দুঃখের বিষয় এটাই, এভারেস্টের উচ্চতা পরিমাণ করলেও রাধানাথের কৃতিত্বকে ব্রিটিশ সরকার চেপে যায়।
সার্ভে বিভাগের এক ম্যানুয়াল প্রকাশিত হত, নাম ‘A Manual of Surveying for India’ যার লেখক ছিলেন, আর স্মিথ এবং এইচ এল থুইলিয়ার। এই গ্রন্থে তাঁরা রাধানাথের অবদানের কথা উল্লেখ করলেন প্রথম। কিন্তু তাঁরা তাঁদের গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণে রাধানাথের নাম মুছে দিলেন। ‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’ নামক সংবাদপত্রে এই ঘটনাকে ‘মৃতের ওপর ডাকাতি’ বলে কটাক্ষ করা হয়।
রাধানাথের আবিষ্কারের কথা প্রথম প্রকাশ্যে আনেন ভারতের প্রাক্তন সার্ভেয়ার জেনারেল কর্নেল সিডনি জেরাল্ড বুরার্ড। বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার’-এর একটি সংখ্যায় “Mount Everest : The Story of a Long Controversy” শিরোনামে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক নিবন্ধ লেখেন। তারপরই সারা বিশ্ব জানতে পারে এই অসাধারণ গণিতবিদ সম্পর্কে।
রাধানাথ একজন সাহিত্য অনুরাগীও ছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র। প্যারীচাঁদ মিত্রকে তিনি ‘মাসিক পত্রিকা’ প্রকাশে সহায়তা করেন। কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করার পর তৎকালীন জেনারেল এসেম্বলিজ ইন্সটিটিউশনে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন রাধানাথ। পরে জার্মানির “Natural History Society of Bavaria-র সম্মানজক সদস্যপদ পান। বিয়ে করেননি তিনি। সংসার-বন্ধন মুক্ত ছিলেন গণিতজ্ঞ রাধানাথ।
শেষ জীবনে রাধানাথ থাকতেন চন্দননগরের গোন্দলপাড়ার গঙ্গার ধারে তাঁর নিজের বাগানবাড়িতে। সেখানেই মারা যান রাধানাথ।
