হিমালয়ের ‘ইয়েতি’ রহস্য
হিমালয়ের ‘ইয়েতি’ রহস্য
হিমালয় নিয়ে নানান অভিজ্ঞতার গল্প বলছি। ইয়েতির কথা হবে না তাও আবার হয় নাকি! আসলে ইয়েতি ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে, কারণ এখনও অবধি যতজন ইয়েতি নিয়ে আলোচনা করেছেন তাতে একজনের লেখার সঙ্গে অন্যজনের লেখার মিল নেই। একজনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্যজনের অভিজ্ঞতার মিল নেই। তবে ইয়েতির ব্যাপারে একটা বিষয় কিন্তু বেশ স্পষ্ট যা হল তিব্বত-নেপাল হিমালয়ের বরফে ঢাকা অঞ্চলে এমন কিছু রহস্যময় প্রাণী আছে যাকে অনেকেই দেখেছে, যার পায়ের ছাপ মিলেছে। কিন্তু চোখের নিমেষে সে মিলিয়ে গেছে। দেখা দেওয়ার পরই বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে।
ইয়েতি নিয়ে রয়েছে নানা মিথ, নানা রহস্য। গল্প-কমিকসও কিন্তু তাতে পিছিয়ে নেই। ‘তিব্বতে টিনটিন’ তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। টিনটিনের জনপ্রিয় কমিক সিরিজের তিব্বতে টিনটিন পর্বে ইয়েতির উল্লেখ আছে। টিনটিনের স্রষ্টা হার্জকে অনেকেই মিঃ পারফেকশনিস্ট বলে ডাকতেন। টিনটিনকে নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনিগুলি লেখার আগে সেই জায়গার ছবি, কাহিনি, ক্ষেত্রসমীক্ষার রিপোর্ট, ফোটোগ্রাফ সমস্ত কিছু জোগাড় করতেন তিনি। নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ সেরে তারপর লিখতে বসতেন। ‘তিব্বতে টিনটিন’-এ লামাদের রহস্যময় জীবনের চিত্র যেমন হার্জ এঁকেছিলেন, তেমনি ইয়েতির প্রসঙ্গও তিনি এনেছিলেন। কারণ তখন ইয়েতি নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় বেশ আলোচনা চলছিল।
এখন প্রশ্ন হল ইয়েতিকে নিয়ে কী কী রিপোর্ট পেয়েছিলেন হার্জে? ‘তিব্বতে টিনটিন’-এ ইয়েতিকে এমন একটি জীব হিসেবে হার্জ দেখিয়েছেন যে মানুষের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য নকল করতে পারে। টিনটিনকে দেখে সে তেড়ে এসেছিল। গল্পে ইয়েতি শুধু পাহাড়ি কোনো জন্তু নয়, বরং মানুষের মতো তার মনও রয়েছে। সে এমন একটি প্রাণী, যার মানবিক নানা গুণ রয়েছে।
‘ইয়েতি’ একটি তিব্বতি শব্দ। কেউ কেউ প্রাণীটিকে ‘মানব ভল্লুক’ বলে উল্লেখ করেন। কেউ বলেন কাং আদমি। কেউ ইয়েতিকে বলেন মিগোই বা মিগো। যার অর্থ বনমানুষ। আবার নেপালি শব্দ বান মানচিও বলতে নাকি ইয়েতিকেই বোঝায়, পাহাড়ি মানুষদের কাছে ইয়েতি বেশ পরিচিত শব্দ। নেপাল বা তিব্বতের জনশ্রুতি বলছে, ইয়েতি ওরফে ‘মিরকা’-কে যে দেখবে তার মৃত্যু হবে, বা তাকে নাকি ইয়েতি মেরেই ফেলবে। যার সঙ্গে অস্ত্র হিসেবে থাকে একটা বিশাল পাথর এবং পাহাড়ে শিস দিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়।
গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার ইয়েতির খোঁজ করেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে তিনি সিন্ধু উপত্যকা জয়ের সময় ইয়েতির গল্প শুনে ইয়েতি দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয়রা তাকে জানিয়েছিল, ইয়েতি কম উচ্চতায় বেঁচে থাকতে পারে না, তাই তাদের পক্ষে ইয়েতি ধরে সম্রাটের সামনে হাজির করা সম্ভব নয়।
পৃথিবীর বিখ্যাত সব পর্বতারোহী—জন হান্ট, তেনজিং নোরগে, রেইনহোল্ড মেসনার—এঁদের স্মৃতিচারণে ইয়েতির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। শুধু ইয়েতিদের খোঁজেই দু’দুটো অভিযান হয়েছে হিমালয়ে। কিন্তু এত কিছুর পরেও বেশির ভাগ জীববিজ্ঞানী ইয়েতির অস্তিত্বকে মানতে চান না।
ইয়েতির অস্তিত্ব নিয়ে জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও নানা মতানৈক্য রয়েছে।
ইয়েতির অস্তিত্বের সব থেকে প্রাচীন যে রিপোর্টটি পাওয়া যায়, সেটি ১৮৮৯ সালে সিকিমের। এর পর ১৯২১ সালে কর্নেল সি কেক হাওয়ার্ড বেরির নেতৃত্বে একদল অভিযাত্রী এভারেস্ট অভিযানে বের হন। ২২ সেপ্টেম্বর হাওয়ার্ডের নেতৃত্বে ম্যালোরি, ওলস্টন এবং মোর্সহেড পৌঁছোন লাকপা গিরিবর্তের ওপর। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখলেন বরফের ওপর বিশাল বিশাল পায়ের ছাপ। তিন সাহেব আশ্চর্য হলেও, সঙ্গী শেরপারা এতটুকু অবাক হলেন না। তাঁরা ওগুলোকে ইয়েতির বলে চিনতে পারলেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০ হাজার ফুট ওপরে এই ছাপগুলো সাহবেদের বেশ ভাবাল। সেখানে হিমবাহের জায়গাটি চিহ্নিত করে তাঁরা ফিরলেন। তুষারশৃঙ্গ এভারেস্ট থেকে জায়গাটি মাত্র ৭৮৬ ফুট নীচে অবস্থিত। জায়গাটির নাম ‘রংবুক’, হিমালয়ের বুকে যেটি অশান্ত ও রহস্যময় স্থান বলে পরিচিত। জায়গাটির আয়তন ২৬৫ বর্গকিলোমিটার এবং সব সময় সেখানে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া বয়। হাওয়ার্ড ফিরে এসে জানান, “আমরা বরফের ওপর কিছু বিশাল পায়ের ছাপ খুঁজে পায়েছি। সেগুলো কার জানা যায় না। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছে সেগুলি ছিল “মিথো-কাংমি’র। এই মিথো কাংমি শব্দটির আক্ষরিক অনুবাদ করলে হয় ‘মনুষ্য-ভল্লুক তুষারমানব’।
দেশে ফেরার পর অভিযাত্রী দলটির কয়েকজন সদস্যের সাক্ষাৎকার নেন হেনরি নিউম্যান নামে একজন সাংবাদিক। তিনি ‘মিথো’ শব্দটির ভুল অনুবাদ করেন ‘কুৎসিত’ হিসেবে। পরে তিনি ‘কুৎসিত’-এর স্থলে ‘জঘন্য’ বা abominable শব্দটি প্রয়োগ করেন। নিউম্যানের হাত ধরে এই কিংবদন্তি ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় শেরপাদের ইয়েতি-দর্শনের গল্পগুলো অভিযাত্রীদের মাধ্যমে অনূদিত হতে থাকে। সেই সঙ্গে এই গল্পের নতুন ডালপালা ছড়ায় পশ্চিমি দুনিয়ায়।
১৯২২ সালে এভারেস্টে অভিযান চালায় দ্বিতীয় অভিযাত্রী দল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সি জি ব্রুসের নেতৃত্বে। তিনি প্রথমেই গেলেন রংবুক মনাস্ট্রির লামার সঙ্গে দেখা করতে। লামাকে ব্রুস ইয়েতির কথা বলতে লামা খুব সহজভাবে বললেন, “রংবুক উপত্যকার ওপর অংশে পাঁচটা ইয়েতি বাস করে।” সেই অভিযানে বেশ কয়েকজন পর্বতারোহী সেখানে অদৃশ্য হয়ে যায়। ওই অভিযাত্রী দলটিতে একজন চিকিৎসক ছিলেন। তাঁর নাম আলেকজান্ডার কিউলাস্ক। অভিযান চলাকালীন তিনি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার সময় তিনি বার বার প্রলাপ বকছিলেন। প্রলাপের সময় তিনি বলছিলেন, “এক লোমশ দানব আসছে। বিরাট বড়ো। ওর হাত থেকে নিস্তার নেই।” এ-কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতেই চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
১৯২৩ সালে এভারেস্ট অভিযান শেষে ব্রিটিশ অভিযাত্রী মেজর আলান ক্যামেরুন জানান, “অভিযান চলাকালে আমি হিমালয়ের হিমরেখার ঊর্ধ্বে খাড়া বরফের প্রাচীরের গা-ঘেঁষে সংকীর্ণ একটা পথে একদল মানবাকৃতির প্রাণীকে হেঁটে যেতে দেখেছি।”
ইয়েতিকে প্রথম চাক্ষুষ করার খবর শোনা গেছিল ১৯২৫ সালে। গ্রিক ফোটোগ্রাফার এন এ টমরাজি বেশ জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, তিনি সাদা বরফের ঢালে লোমশ জানোয়ারটাকে স্পষ্ট দেখেছিলেন। কিন্তু ক্যামেরা বার করার আগেই সে পালিয়ে গেছিল।
১৯৫০-এর দশকে ইয়েতি নিয়ে মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়। ইয়েতির সন্ধানে অভিযাত্রী ও পর্বতারোহীরা অসংখ্য অভিযান পরিচালনা করেন হিমালয় অঞ্চলে। এমনকি হলিউড অভিনেতা জেমস স্টুয়ার্টও ইয়েতির গল্পে জড়িয়ে যান। তিনি সে-সময় তার লাগেজে ‘ইয়েতির’ একটি আঙুল বয়ে বেড়াতেন।
মার্কিন অভিযাত্রী আঙুলটি নেপালের কোনো এক গুম্ফা থেকে সংগ্রহ করেন। পরে স্টুয়ার্টের সহযোগিতায় আঙুলটি ভারতের বাইরে পাচার করা হয়। দীর্ঘ ৬১ বছর পর এডিনবার্গ চিড়িয়াখানার বিশেষজ্ঞরা সেটির ডিএনএ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে আঙুলটি ইয়েতির নয়। আঙুলটি ছিল এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর।
তবে ১৯৫১ সালে ব্রিটিশ পর্বতারোহী এরিক শিপটন তিব্বতের মেংলুং লা থেকে ফিরে, বরফের ওপর ইয়েতির স্পষ্ট পায়ের ছাপের ছবি প্রথম লন্ডন টাইমস-এ ছাপিয়ে, ইয়েতির অস্তিত্বের দাবি জোরালো ভাবে পেশ করেন। ছাপগুলোর মাপ ছিল ১২ ইঞ্চি লম্বা আর ৫ ইঞ্চি চওড়া।
১৯৫৪ সালে প্রাণিতত্ত্ববিদ বার্নাড হিউভেলম্যানস ইয়েতির অস্তিত্ব নিয়ে বলেন, “প্রাগৈতিহাসিক মানুষের একটা পর্যায় ছিল জাইগ্যানটোপিথেকাস, ইয়েতি হয়তো তারই শেষ নিদর্শন।”
১৯৬০ সালে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা প্রথম অভিযাত্রী স্যার এডমন্ড হিলারি শুধুমাত্র ইয়েতি খোঁজার জন্য হিমালয় জুড়ে একটি অভিযান করেন। সেই অভিযান শেষে একটি জন্তুর মাথার খুলিও নিয়ে আসেন তিনি। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীকালে বলেন, সেটি ইয়েতির নয়। সেই জন্তুর মাথাটি হেলমেট আকারের ঢাকনার মতো দেখতে। সেই মাথাটি দেখতে ছিল হিমালয়ের পার্বত্য এলাকার ছাগলের মতো এক প্রাণীর সেই রোমাঞ্চকর গল্পে আসছি একটু পরে।
প্রখ্যাত প্রাণীবিজ্ঞানী সভার্সন হিউভেলম্যানস ইয়েতি প্রসঙ্গে বলছেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ওরা আছে। অতি আদিম যুগের মনুষ্যগোত্রের অবশিষ্টাংশ হল ইয়েতি….”
প্রথম ইয়েতির পূর্ণাঙ্গ ছবি তোলার কৃতিত্ব দাবি করেন ব্রিয়ার্ন সামলোভিচ আসফেনাজি। তিনি কাশ্মীরের খিলানমার্গ অঞ্চল থেকে একটি ইয়েতির ছবি তুলে কাশ্মীর সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেয়নি। ১৯৮৭ সালে সেই একই জায়গায়, আর এক বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী ক্রিস বনিংটন ৪,৮০০ মিটার উচ্চতায় ইতস্তত ছড়ানো ইয়েতির পায়ের ছাপের ছবি তুলে
১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় গবেষক মিরা শ্যাকলির “স্টিল লিভিং? ইয়েতি, সাসকোয়াচ, অ্যান্ড দ্য নিয়ান্ডারথাল এনিগমা।” এই বইয়ে দু’জন হাইকারের ইয়েতি দেখার কথা বলছেন মিরা। তিনি লিখছেন, “১৯৪২ সালের কোনো একদিন দুই হাইকার আমাদের থেকে সিকিমাইল দূরে বরফের ওপর দুটো কালো বিন্দু চলাচল করতে দেখেছিলেন। এত দূর থেকে দেখার পরেও তারা খুব স্পষ্ট বিবরণ দিয়েছিলেন। তার উচ্চতা একেবারে আট ফুটের কম ছিল না। চৌকো মতো মাথা।” ১৯৪২ সালে যে দু’জন অভিযাত্রী মিরা শ্যাকলির ‘স্টিল লিভিং?’ বিশালাকার কোনো প্রাণী দেখেছিলেন, তবে তার রং কালো। ইয়েতির উচ্চতা তাদের কথায় ৬ থেকে ১০ ফুট। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও হিমালয়ের পার্বত্য পার্বত্য এলাকার স্থানীয় মানুষের বক্তব্যকে সামনে রেখে ইয়েতির পায়ের ছাপ দেখে তারা ইয়েতির ওজন নির্ধারণ করেন ৯০ থেকে ২০০ কিলোগ্রামের কাছাকাছি। শুধু তাই নয়, গায়ে অসংখ্য রোম থাকার জন্য ইয়েতির ওজন বেশি হয়। বিভিন্ন পর্বতারোহীদের থেকে ইয়েতি প্রসঙ্গে নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনে অনেক চমকে দেওয়ার মত কথাও লিখেছেন কেউ কেউ।
আর একজন ইয়েতি দেখে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন, “ইয়েতির আকার গড়পড়তা মানুষের মতোই। মাথা ভরতি লম্বা চুল থাকলেও মুখমণ্ডল আর বুকে রোমের বালাই নেই বললেই চলে। লালচে-বাদামি দু’পেয়ী প্রাণীটি মনোযোগ দিয়ে শেকড় তুলছিল আর সময়ে সময়ে চড়া ও তীক্ষ্ণ গলায় কান্না করছিল।”
কিংবদন্তি অভিযাত্রী রেনহোল্ড মেজনার নেপাল ও তিব্বতে গিয়ে ‘মাই কোয়েস্ট ফর দ্য ইয়েতি : কনফ্রন্টিং দ্য হিমালয়াজ ডিপেস্ট মিস্ট্রি’তে লেখেন বড়ো ভাল্লুককেই আসলে ইয়েতি বলে ভুল করেন অনেকে।
এবার পর্বতারোহী রাইনহোল্ড মেসনারের ইয়েতি দেখার গল্প শোনা যাক। ১৯৮৬ সালের মার্চে সেদিন মেসনার একটা বিশেষ রুট ধরে চলছিলেন। সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। জঙ্গলের খাড়াই বেয়ে ওঠার সময় হঠাৎ তার সামনে বিশাল ও কালো রংয়ের কিছু একটা উদয় হল। বিস্মিত মেসনার দেখলেন প্রাণীটি দৌড়ে এক গাছ থেকে আর এক গাছের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। তার দৌড়ানোর ভঙ্গি মানুষের মতোই, কিন্তু স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত। গাছের শাখা-প্রশাখা বা বরফের ওপর থাকা গর্ত কিছুকেই পরোয়া করছে না। দশ গজের মতো গিয়ে প্রাণীটি চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ল এবং তারপরই মেসনারের চোখের সামনে হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল।
সেদিন রাতে চাঁদের আলোয় সেটিকে আবারও দৌড়াতে দেখেন মেসনার। সাত ফুটের চেয়েও বেশি লম্বা, বলিষ্ঠ ও চটপটে শরীর। ছোটো ছোটো পা, পশমে ঢাকা দেহ আর লম্বা, শক্তিশালী হাতওয়ালা প্রাণীটি রাগত স্বরে শব্দ করছিল। সেই রাতে আবারও গাছপালার আড়ালে হারিয়ে যায় প্রাণীটি।
১৯৮৬ সালে অ্যান্থনি উলরিজ নামক আর একজন হাইকার ইয়েতি দেখেছেন বলে দাবি করেন। তিনি দেড়শো মিটার দূর থেকে একটি ইয়েতিকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন। তিনি দু’টি ছবিও তুলে নেন।
সেই ছবি পরখ করে দেখা যায়, সেগুলো কোনো মেকি ছবি নয়। ইয়েতির অস্তিত্বে বিশ্বাসী মানুষদের মধ্যে ছবিজোড়া ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। পরের বছর গবেষকেরা উলরিজের ইয়েতি দর্শনের স্থানে গিয়ে বুঝতে পারেন, উলরিজ আসলে একটি পাথুর-পৃষ্ঠের ওপরের অংশ দেখতে পেয়েছিলেন।
ইয়েতিকে নিয়ে গল্পগাথা শেরপাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল একটা সময় পর্যন্ত। তারপর পশ্চিমি অভিযাত্রীরা হিমালয়ে পা ফেললে তাদের হাত ধরে ইয়েতির গল্প ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপ, আমেরিকা সহ সারা বিশ্বে। আরও ভয়ংকর, রোমাঞ্চকর কাহিনির মাধ্যমে ইয়েতি সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ল। সেই থেকে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ইয়েতি একটা মিথে পরিণত হয়ে যায়।
পর্বতারোহী রাইনহোল্ড মেসনার ১৯৮৬ সালে ইয়েতি দেখার পর অনেকবার সেই ইয়েতির খোঁজে ছুটে বেড়ান হিমালয় পর্বতমালা, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, ভারত, মঙ্গোলিয়া, ও কাজাখাস্তানের আনাচেকানাচে। বারো বছরের খোঁজ শেষে মেসনার সিদ্ধান্তে পৌঁছোলেন, ইয়েতি আসলে একপ্রকার ভাল্লুক ছাড়া আর কিছু নয়! মেসনারের হিসেব মতে, ইয়েতির এই কিংবদন্তি মূলত একপ্রজাতির ভাল্লুক আর শেরপাদের হিমালয়ী বুনো জন্তুর গালগল্পের সমন্বিত রূপ। মেসনার লিখছেন, “এখনও পর্যন্ত ইয়েতির যতগুলো পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে সেগুলো সব একই প্রজাতির ভাল্লুক। সুতরাং, ইয়েতির ব্যাপারটি একদিক থেকে বাস্তব।” মেসনার ইয়েতিকে দুপেয়ে জন্তু হিসেবে দেখতে নারাজ। তার মতে, মানুষ বাস্তবতার চেয়ে গাঁজাখুরি গল্প বেশি পছন্দ করে।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের প্রাইমেট বায়োলজির অধিকর্তা অ্যানাটমিস্ট, নৃতত্ত্ববিদ জন নেপিয়ার বলেন, বরফের ছায়াকে ভুল দেখেছেন একাধিক অভিযাত্রী। নেপিয়ারের এই কথা ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। কেউ কেউ ইয়েতির প্রকাশিত ছবি নিয়ে নেপিয়ারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন।
২০০৭ সালে আমেরিকার এক টিভি সঞ্চালক জোস গেটসও রহস্যময় পায়ের ছাপের কথা বলেন। কিন্তু কোনো প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি।
২০১০ সালে একদল শিকারি রোমবিহীন চারপেয়ে একটি প্রাণী দেখতে পেয়েছিল, তাদের দাবি সেটিই নাকি ছিল ইয়েতি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, বড়োসড় বিড়ালজাতীয় কোনো লোমশ প্রাণী সেটি। যেটির রোগের কারণে সারা শরীরের রোম হারিয়েছিল। সেই বিশালাকার প্রাণীর উপস্থিতি, অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়।
২০১০ চিনের অভিযাত্রীরা একটি প্রাণীকে পাকড়াও করেন। সেগুলিকে সিভেট বা ভামজাতীয় বিড়াল বলে শনাক্ত করে হিমালয় বিশেষজ্ঞরা। ২০১৩ সালে অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানী ব্রায়ান সাইকস, ইয়েতির রোম হিসেবে দাবি করা একটি নমুনা থেকে ডিএনএ পরীক্ষা করেন।
তবে বেশিরভাগ গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে ইয়েতির হাড়, চুল, রোম এসব নিয়ে যা যা পরীক্ষাই হয়েছে, সেগুলির বেশিরভাগই গোরু, ঘোড়া কিংবা ভালুকের জিন। একদল গবেষক বলেন, ৪০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার বছর আগের প্রিস্টোসিন যুগের ভালুকের ডিএনএ-র সঙ্গে মিল আছে ইয়েতির। বিজ্ঞানী রোনাল্ড এইচ পাইন ও ইলিসের ইগিতেরেজ বলেন, সাধারণ বাদামি ভাল্লুকের ডিএনএ থাকার সম্ভাবনা আছে ইয়েতির মধ্যে। ইয়েতির নমুনা বলে যেগুলি গবেষকরা হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করেছেন তার ডিএনএ আসলে এশীয় ভাল্লুক, হিমালয়ের ভাল্লুক, তিব্বতীয় ভাল্লুক ও কুকুরের। তাই টিনটিন গল্পে দেখা পেলেও বাস্তবে প্রমাণ এখনও মেলেনি।
মেসনারের ভাল্লুক তত্ত্বের আপাত সমর্থন মিলেছে ২০১৪ সালে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক অধ্যাপক, ব্রায়ান সাইকস ইয়েতির কিছু কথিত নমুনা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ও তার দল ইয়েতির পশমের ডিনএনএ পরীক্ষা করেন। এসব নমুনার মধ্যে মেসনারের প্রদত্ত নমুনাও ছিল।
এর পর তারা এসব নমুনা ডিএনএ অন্যান্য প্রাণীর জিনোম সিকোয়েন্সের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তারা দেখতে পান, লাদাখ ও ভুটানে পাওয়া ইয়েতির দুটো নমুনার সঙ্গে একধরনের মেরুভাল্লুকের প্রায় শতভাগ জিনগত মিল রয়েছে। তবে এই ভাল্লুক প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে।
গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছোন, হিমালয় অঞ্চলে হয়তো এমন একধরনের ভাল্লুকের বাস রয়েছে, যেগুলো মূলত বিলুপ্ত মেরুভাল্লুক বা Ursus maritimus জাতের ও বাদামী ভাল্লুকের বা Ursus arctos-এর মিলিত সংকর প্রজাতির। আর এই সংকর জাতের প্রাণীটিই হয়তো কোনোভাবে ইয়েতি মিথ সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে।
কিন্তু মেরুভাল্লুক হিমালয় অঞ্চলে বাস করে না। সুতরাং প্রশ্নের মুখে পড়ল সাইকসদের গবেষণা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর দুই অধ্যাপক রস বারনেট ও সিরিডোয়েন এডওয়ার্ডস সাইকস-এর গবেষণালব্ধ ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করেন। এবারের গবেষণায় একটি বড়ো রকমের ভুল ধরা পড়ে।
সাইকস তার গবেষণায় ইয়েতির নমুনার সঙ্গে প্লাইস্টোসিন কালের মেরুভাল্লুকের যে মিল খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন, তা পুরোপুরি সত্য নয়। বরং বারনেটদের গবেষণা মোতাবেক এই মিলটি মূলত আধুনিক মেরুভাল্লুকের। তা-ও মিলের মাত্রাটা যৎসামান্য।
বারনেট ও এওয়ার্ডসের দাবি অনুযায়ী তাহলে কি হিমালয়ে মানুষের অজান্তে মেরুভাল্লুক বাস করছে? কিন্তু এই দুজন গবেষক দাবি করলেন, “ইয়েতিকে নিয়ে গবেষণার বিষয়টি আদৌ ওরকম কিছু নয়, বরং যে নমুনা-পশমগুলো পরীক্ষা করা হয়েছিল, সেগুলোর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত, Damaged DNA ছিল।”
নিউইয়র্কের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শারলট লিন্ডকিস্ট এর আগে ২০০৪ সালে আর্কটিক নরওয়ে অঞ্চলে মেরুভাল্লুকের এক লক্ষ বিশ হাজার বছর পুরোনো একটি চোয়ালের হাড় আবিষ্কার ও তার বিশ্লেষণ করেন। এর প্রায় এক দশক পরে তিনি অক্সফোর্ডে সাইকসের গবেষণার খবরটি জানতে পারেন।
সাইকসের দলের দাবি, “হিমালয়ের কোনো সুউচ্চ অবস্থানে হয়তো কোনো সংকর জাতের ভালুক এখনও বাস করে আসছে। কিন্তু লিন্ডকিন্স্ট এই দাবি মেনে নিতে পারেননি। এছাড়া সাইকসদের গবেষণা পদ্ধতি নিয়েও তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি, কারণ ওই দলটি ডিএনএ-র তুলনামূলক ক্ষুদ্র ও সীমিত অংশ নিয়ে গবেষণা করেছিল। লিন্ডকিভস্ট পুনর্নিরীক্ষণের সিদ্ধান্ত নিলেন।”
এর পর নতুন গবেষণা শুরু হয়। সেখানে ২৪টি ইয়েতির নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এগুলোর মধ্যে ছিল ইয়েতির দাঁত, ত্বকের অংশবিশেষ, চুল, পশম ইত্যাদি। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, দাঁতটি ছিল একটি গৃহপালিত কুকুরের। বাকি নমুনাগুলোর উৎস মূলত হিমালয়ী ও তিব্বতি বাদামি ভালুকের একটি উপ-প্রজাতি, এবং একটি এশিয়ান কালো ভালুক।
গবেষণাটির ফলে ইয়েতি রহস্যের সমাধানের পাশাপাশি আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করেন গবেষকেরা। তারা বিপন্ন এশিয়ান ভালুকের একটিফ্যামিলি-ট্রি তৈরিতে সক্ষম হন, যা এই প্রাণীটিকে রক্ষায় যথেষ্ট সহায়ক হবে বলেই গবেষকরা মনে করছেন।
সন্ধানের শেষ এখানেই নয়। এবার বিষয়টি নিয়ে পুনরায় গবেষণা শুরু করেন স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের এলিসার গুতেরেজ ও কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের রোনাল্ড পাইন। গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছোলেন যে, “নমুনা দুটোর উৎস বাদামি ভালুক ছাড়া আর কিছু নয়।”
এই গবেষণার পর সাইকস ও তার দল নিজেদের ভুল স্বীকার করে বিবৃতি দিলেন। তাঁরা বললেন, “আমাদের পরীক্ষিত নমুনাগুলি কোনোভাবেই নরবানরের সঙ্গে মেলে না।”
বিখ্যাত ইয়েতি গবেষক মাইকেল ওয়ার্ড জানান, “প্যাংবোচে মনাস্ট্রিতে সযত্নে রক্ষিত রয়েছে ইয়েতির মাথার খুলি। অনেক বৈজ্ঞানিক জানিয়েছেন সেটি নাকি আসলে একটি হিমালয়ান নীল ভালুকের খুলি। ব্রিটিশ সংবাদপত্রে এই খুলিটি সম্পর্কে বড়ো বড়ো করে লেখা হয়, ‘The scalp kept on the Pangboche Monastery is the only evidence of existence of Yeti in the world. ‘
২০১৭ সালে এক অভিযাত্রীর তোলা ইয়েতির পায়ের ছাপের ছবি নিয়ে বেশ বিতর্ক হয় ইউরোপজুড়ে। ইয়েতি নিয়ে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দাবি করা হয়, যাঁরা ওই পায়ের ছাপকে ইয়েতি-র বলে দাবি করছেন, সেটা আদৌ ইয়েতির নয়। সেগুলো ভালুকের। হিমালয়ে তিন ধরনের ভালুক দেখা যায়-এশিয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, টিবেটান ব্রাউন বিয়ার এবং হিমালয়ান ব্রাউন বিয়ার। ওই সমীক্ষায় দাবি করা হয়, যে পায়ের ছাপকে ইয়েতির বলে দাবি করা হয়েছে, আদৌ তা ইয়েতির নয়।
৯ এপ্রিল ২০১৯। ভারতীয় সেনারা তাদের স্বীকৃত টুইটারে ইয়েতির পায়ের ছাপের ছবি শেয়ার করেন। ব্যস তাকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বে শোরগোল পড়ে যায়। ৯ এপ্রিল ভারতীয় সেনার মাউন্টেনিয়ারিং এক্সপিডিশন দল নেপালের মাকালু বেস ক্যাম্পে গিয়েছিল। তাঁদের দাবি, মাকালু-বরুণ ন্যাশনাল পার্কের কাছে বিশাল আকারের একটি পায়ের ছাপ দেখতে পান। সেই পায়ের আকৃতি মেপে দেখেন তাঁরা। পায়ের আকৃতি ছিল ৩২x১৫ ইঞ্চি। যদিও একটি পায়েরই চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে বলে জানায় সেনা। ভারতীয় সেনার শেয়ার করা এই ছবি ইয়েতির অস্তিত্বের প্রসঙ্গকে ফের উসকে দেয়। যদিও বিজ্ঞানীরা তাকে ইয়েতির পায়ের ছাপ বলতে নারাজ।
বরফে ঢাকা হিমালয়ের বুকে কি এবার সত্যিই ইয়েতির সন্ধান মিলল? ভারতীয় সেনার টুইট ঘিরে এই প্রশ্ন ঘিরে উত্তাল হয় সারা দেশ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ প্রশ্ন তোলে বিশালাকৃতির পায়ের ছাপ কার? ইয়েতির, নাকি ভালুকের?
এই প্রশ্ন ঘিরে জল্পনা বাড়তে থাকে। অভিযাত্রী দলের টুইটারে শেয়ার করা সেই পায়ের ছাপকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে ওঠে। হিমালয়ের রহস্যময় ইয়েতির অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্কিত প্রশ্নটি ফের একবার মাথাচাড়া দেয় নানা মহলে। ভারতীয় সেনা যে পায়ের ছাপকে ইয়েতির বলে দাবি করে, সেটি ভালুকের, না কি অন্য কোনো প্রাণীর তা স্পষ্ট না হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
গল্পের বইয়ে ‘ইয়েতি’র কথা অনেকেদিন ধরেই পাঠকরা পড়ে আসছেন। দানবাকৃতি, অনেকটা গোরিলার মতো দেখতে এমনই নানা রকমভাবে বর্ণনা করা হয়েছে প্রাণীটিকে। ‘তুষারমানব’ হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে তার। এই তুষারমানবকে নিয়ে নানান রকম গল্পকথা প্রচলিত থাকলেও, তার অস্তিত্ব নিয়ে সবাই সন্দিহান। কারণ এখনও পর্যন্ত ইয়েতি আছে না নেই তা প্রমাণিত হয়নি। তাই গল্পকথাতেই সীমিত থেকে গেছে ‘ইয়েতি’।
কাকাবাবু যেবার খোঁড়া পা নিয়ে হিমালয়ে যাবেন বলেছিলেন, তখন খোদ সত্ত্বই বিশ্বাস করতে পারেনি ইয়েতি আছে না নেই। শেষে তারা হিমালয়ে গেলেন। সন্তু প্রথমদিকে বুঝতে না পারলেও শেষে বুঝল কাকাবাবু নিশ্চিত একটা ইয়েতি ধরে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দেবেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু সিরিজের ‘পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক’ যারা পড়েছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন, শেষ অবধি কাকাবাবু হিমালয়ে কী খুঁজে পেয়েছেন। ইয়েতিকে নিয়ে এই অভিযান বাঙালি গোগ্রাসে গিলেছে।
বাঙালির অতিপ্রিয় ঘনাদাও ইয়েতি দেখেছিলেন। শুধু দেখেনইনি, ইয়েতিরই কারণে তিনি এভারেস্টের মাথায় টুপি’ও পরিয়েছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘টুপি’ গল্পে লিখেছিলেন, মোহান্ত সেজে তিব্বতের থিয়াংবোচি মঠ থেকে একটি প্রাচীন তিব্বতি পুথি নিয়ে উধাও হয়ে যান ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেনের ঘনশ্যাম দাস ওরফে ঘনাদা। সেখানেই হিমালয়ের এক গুহায় ইয়েতির দেখা পান তিনি।
চিতার চামড়া গায়ে জড়ানো আর মাথায় ইগলের পালক-ওয়ালা সেই সভ্য ইয়েতিরা ঘনাদার সঙ্গীর উল্লাস শুনেই এক দৌড়ে হাওয়া! পরের দিন আবার তারা হানা দেওয়ায় ঘনাদা ল্যাসো ছুড়ে ইয়েতি পাকড়ালেন। কিন্তু ঘনাদাকে নিয়েই দৌড়ে ইয়েতি সোজা এভারেস্টের চূড়ায়। আর সেই সময়েই টুক করে নিজের মাথার টুপি ঘনাদা পরিয়েছিলেন এভারেস্টের মাথায়। যেহেতু হিলারি এবং তেনজিংয়ের এভারেস্ট অভিযানের আগেই ‘টুপি’ গল্প লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, তাই বলাই যায় সবার প্রথম এভারেস্ট জয় করে মাথায় টুপি পর্যন্ত পরিয়েছিলেন ঘনাদা।
শেষপর্যন্ত যে ইয়েতিকে ঘনাদা কলকাতায় আনতে পারেননি, সেই দুঃখ বোধহয় বাঙালির কোনো দিনও যাবে না। আসলে ঘনাদার ল্যাসোর দড়ি ছিঁড়ে যাওয়াতেই এই বিপত্তি ঘটেছিল। অবশ্য ঘনাদা সম্পর্কে টেনিদা তো কপালে হাত ঠুকে বলেই ছিলেন, “ঘনাদা।! তিনি তো মহাপুরুষ। ইয়েতি কেন, তার দাদামশাইয়ের সঙ্গেও তিনি চা-বিস্কুট খেতে পারেন।”
যারা ইয়েতি দেখেছেন তারা পুংলিঙ্গ ইয়েতি দেখেছেন না কি স্ত্রীলিঙ্গ ইয়েতি দেখেছেন সে নিয়ে অনেকেই বেশ মজার মজার লেখা লিখেছেন। যেমন স্ত্রী-ইয়েতির দর্শন কিন্তু পেয়েছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ সৃষ্ট গুলসম্রাট ব্রজরাজ কারফর্মা, মানে ব্রজদা! এবং এভারেস্টের আশেপাশে সেই নারী-ইয়েতি বরফের ওপর গান গাইছিল। কী ভাষায় সেই গান? তা একমাত্র ব্রজদাই বুঝতে পেরেছিলেন।
তবে ব্রজদারও বক্তব্য ছিল, ১৮৫২ সালে হাইজাম্প মেরে তিনিই প্রথম এভারেস্ট ডিঙিয়েছিলেন!
এছাড়াও, ‘শুকতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত সব্যসাচীর ‘টারজান’-এরও হিমালয়ে ইয়েতির সঙ্গে মোলাকাত হয়েছিল। তারা আবার এক সময়ে টারজানকে নিজেদের জাতভাই মনে করে ‘ইয়েটি ইয়েটি’ বলে চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশও করেছিল।
আবার, কমিকসের অতিমানব গার্থ-এর এক অভিযানে তো প্রমাণ হয়েই গিয়েছিল যে, আসলে ইয়েতিরা এই পৃথিবীর প্রাণীই নয়! তারা সকলেই ভিনগ্রহী!
তুষার রাজ্যে এভারেস্ট থেকে মাত্র ৭৮৬ ফুট নীচে অবস্থিত একটি জায়গার নাম হল রংবুক। রহস্যময় এই স্থান ২৬৫ বর্গকিলোমিটারের। এই জায়গাটি সবসময়ই ঝড় ও তুষারপাতে অশান্ত। এখানে যারা গিয়েছেন তাঁরাই হারিয়ে গিয়েছে অথবা মারা গিয়েছেন। মনে করা হয় এখানেই নাকি সেই আদিম প্রানীর বসবাস। এই অঞ্চলে আজ পর্যন্ত অনেক অভিযান হয়েছে কিন্তু কেউ বেঁচে ফিরে আসেনি। এর পাশাপাশি অঞ্চলে অভিযান করা মেজর ক্যামেরুন জানিয়েছিলেন তিনি হিমরেখার ঊর্ধ্বে খাড়া শৈলপ্রাচীরের গা ঘেঁষে একটা পথে একদল মানবাকৃতি মানুষকে হেঁটে যেতে দেখেছেন।
ইয়েতির আদি উৎস তিব্বত ও নেপালের হিমালয় অঞ্চলে বাস করা শেরপাদের লোকগাথা। মূলত তিব্বত অঞ্চলেই ইয়েতি মিথের প্রথম উৎপত্তি। পরে শেরপাদের মাধ্যমে তা নেপাল ও হিমালয়ের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। শেরপাদের এসব লোকগল্পগুলি সংগ্রহ করেছিলেন শিব ধাকাল নামের একজন লেখক। ১২টি গল্পের সেই সংগ্রহটির নাম “ফোক টেইলস অফ শেরপা অ্যান্ড ইয়েতি।”
শেরপাদের এই গল্পগুলিতে ইয়েতিকে সবসময় ভয়ংকর প্রাণী হিসেবে দেখা হয়েছে। কখনো ইয়েতিকে অনিষ্টকারী হিসেবে, কখনো দুর্ভোগের উৎস হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আসলে প্রত্যেক গোষ্ঠীরই কিছু কাল্পনিক চরিত্র থাকে, যা ভয়ের উদ্রেক করে, মানুষের চোখে সেগুলো জুজুর মতো কাজ করে। ইয়েতি হচ্ছে শেরপাদের সেই ‘জুজু’।
শেরপারা হিমালয়ের দুর্গম তুষারাবৃত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় তাদের জীবিকার জন্য। এসব অঞ্চলে রয়েছে পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি। তুষারধস, বরফের চোরা গর্ত এসব তো আছেই, পাশাপাশি রয়েছে জন্তু-জানোয়ারের আক্রমণের ভয়। এই আক্রমণকারী জানোয়ারদের কাছ থেকে সাবধান থাকার জন্য শেরপাদের যে জুজুর ভয় দেখানো হয়, তা হচ্ছে ইয়েতি। আমরা যে জুজু শব্দ ব্যবহার করি তার মানে ইয়েতি।
এক শেরপা গবেষক জানিয়েছেন, “এই জুজুর সৃষ্টির পেছনে হয়তো এমন উদ্দেশ্য ছিল যে, শেরপাদের বাচ্চাকাচ্চারা যেন তাদের আবাসস্থল ছেড়ে দূরে কোথাও চলে না যায়। কারণ বরফের বিশাল প্রান্তরে একবার হারিয়ে গেলে তার আর ঘরে ফেরার কোনো উপায় নেই। সুতরাং শেরপা বাচ্চাদের যদি ইয়েতির ভয় দেখানো যায়, তাহলে তারা নিশ্চয়ই ঘর থেকে এদিক-সেদিক বেপরোয়াভাবে ঘুরে বেড়াবে না, হারিয়ে যাবে না।”
হিমালয়ে ইয়েতির পায়ের ছাপ, খুলি, পশম, হাড় বা দাঁতের টুকরা ইত্যাদি পাওয়ার দাবি করেন পর্বতারোহীরা। কিন্তু অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়-এগুলো ছিল মূলত অন্যান্য পর্বতচারী জন্তু, যেমন ভালুক, অ্যান্টিলোপ, বানর ইত্যাদির অংশ।
২০১১ সালে রাশিয়ান সরকারের ইয়েতি আবিষ্কারের নেশা চাপে। পশ্চিম সাইবেরিয়ায় তারা ইয়েতি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে মিলিত হয়। গবেষক জন বাইন্ডারনাজেল দাবি করেন, ইয়েতি গাছে বাসা বেঁধে থাকে। দলটির কাছে ইয়েতির অস্তিত্বের ‘সন্দেহাতীত প্রমাণ’ থাকার কথা বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলে দেয়।
কিন্তু সব ভন্ডুল করে দেন আর এক বিজ্ঞানী জেফ মেলড্রাম। তিনি সন্দেহ করেন, ইয়েতির গাছে বাসা বাঁধার ব্যাপারটি আগাগোড়া ভুয়া। পরে প্রমাণিত হয়, যেসব গাছের মোচড়ানো ডালপালাকে ইয়েতির বাসা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল, সেগুলো আসলে মনুষ্যনির্মিত হাতিয়ার দিয়ে কাঁটা হয়েছে। মেলড্রাম সিদ্ধান্তে পৌঁছোন, ওই অঞ্চলে পর্যটকদের আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে রাশিয়ান সরকার এই নাটকটি মঞ্চস্থ করেছে!
এসব গবেষণা থেকে গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোন যে, ইয়েতি মূলত হিমালয় অঞ্চলে বাস করা ভাল্লুক জাতীয় প্রাণী ও স্থানীয় মিথের একটি সমন্বিত কিংবদন্তি।
সেই হিসেবে এক অর্থে ইয়েতির ধারণা সত্য। কারণ এর মূল উৎস ভাল্লুক জাতীয় প্রাণী থেকে। কিন্তু বাস্তবে মানুষের মতো দেখতে বিশাল দেহের কোনো রোমশ দুপেয়ে প্রাণী হয়তো হিমালয়ে বাস করে না, বা কখনোই করেনি।
তারপরও মানুষ এখনও ইয়েতির সন্ধানে ছুটছে, পপ কালচারে স্থান পেয়েছে ইয়েতি। ইয়েতি বর্তমানে ‘ক্রিপটোজুওলজি’র অংশ হয়ে উঠেছে। ক্রিপটোজুওলজি হচ্ছে প্রমাণের অভাবে অস্তিত্বহীন এমন সব কথিত প্রাণী বিষয়ক গবেষণা।
নেপাল সরকার ১৯৫০-এর দশকে ইয়েতি শিকারের জন্য লাইসেন্স বিক্রি করা শুরু করে। ইয়েতিকে নিয়ে মানুষের আগ্রহের কোনো কমতি নেই। শেরপারা এখনও বিশ্বাস করে ইয়েতি শুধু তাদেরকেই দেখা দেয়, যারা ইয়েতির অস্তিত্বে বিশ্বাস করে।
ভুটানের সাক্তেং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়েতি সংরক্ষণ করা। ইয়েতি মিথকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল অর্থনৈতিক চক্র। নেপালে ‘ইয়ক অ্যান্ড ইয়েতি’ নামের পাঁচতারা হোটেল রয়েছে, আরও আছে ইয়েতি এয়ারলাইন্স। সুতরাং বলা যায়, একসময়ের রহস্যময় ইয়েতি এখন মানুষের জীবনের সঙ্গে ভিন্নভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
ফলে নিঃসন্দেহে ইয়েতির আবেদন কখনও কমবে না। হিমালয়ের সাহসী শেরপারা ইয়েতিকে দেখবে আতঙ্ক ও শ্রদ্ধার চোখে, আর দুনিয়ার আধুনিক মানুষ ইয়েতিকে দেখবে তাদের দৈনন্দিন ভোগবাদী জীবনের একটি সুবিধাজনক উপযোগ হিসেবে!
নেপাল অবশ্যই বিশ্বের এক অন্যতম পর্যটনস্থল। যেখানে সারা বছরই দেশ-বিদেশ থেকে মানুষের আনাগোনা লেগে থাকে। পর্যটন থেকে বড়ো অঙ্কের ব্যবসা পায় নেপাল। তাদের অর্থনীতির বড়ো ভরসা সেই পর্যটনকে আরও বৃহত্তর পর্যায়ে পৌঁছে দিতে, মানুষকে নেপালে আসতে উৎসাহ দিতে শুরু হয়েছে ‘ভিশন ২০২০’। সেই প্রকল্পকে সামনে রেখে কাঠমান্ডুকে সাজিয়েছে সরকার। সেখানে বসেছে হিমালয়ের পৌরাণিক তুষার দানব ইয়েতি-র মূর্তি। একটা নয় অনেকগুলি। আর তাতেই ফাঁপরে পড়েছে নেপাল সরকার।
এক ইয়েতি গবেষক জানিয়েছেন, “বহুকাল ধরে চলে আসা লোককাহিনি অনুযায়ী এটি হিমালয়ের পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা তুষার প্রাণী। ইয়েতি কেউ দেখেননি। কিন্তু তার নাকি অস্তিত্ব আছে। এমনই এক বিশ্বাস চলেই আসছে। মানুষের কাছে অন্যতম কৌতূহলের বিষয়ও ইয়েতি। ইয়েতি-র দেখা না পাওয়া গেলেও তার চেহারা নিয়ে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে পাহাড়ি মানুষের কাছে।”
ইয়েতির কথা মাথায় রেখে সেই চেহারার আদলেই ২২টি ইয়েতির ফাইবার গ্লাসের মূর্তি বানিয়ে তা কাঠমান্ডু শহরের বিভিন্ন জায়গায় বসায় নেপাল সরকার। আর তা বসানোর পরই শুরু হয় বিতর্ক। যার জেরে পরে বিপুল অর্থ খরচ করে বসানো সেইসব মূর্তি এক-এক করে খুলে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর নেপালে আবার বসানো হয় ইয়েতির মূর্তি। অনেকে বলেন, “মূর্তিগুলি জাপানি সুমো ফাইটারদের মতো। কেউ বলছেন হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবতাদের তুলে ধরছে এই মূর্তিগুলি। মূর্তিগুলির ওপর যেভাবে দেবতাদের ছবি দেওয়া হয়েছে তাতে অনেকে আবার ওই মূর্তিগুলির সামনে বসে পুজোও শুরু করেছেন। বেশ কয়েকজন পুরাণ গবেষক শোনান আরও মারাত্মক কথা। তাঁরা বলেন, “ইয়েতি হল পৌরাণিক দানব। যা মানুষের যাবতীয় ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করছে।”
বৌদ্ধনাথ ও বসন্তপুর এলাকায় বসানো দুটি ইয়েতি মূর্তির সারা গায়ে আঁকা দেবতাদের ছবির ওপর পেন্ট করে দেন স্থানীয় মানুষজন। শেষ অবধি ধর্মীয় সমস্যাকে সামনে রেখে এত খরচ করে তৈরি ইয়েতি ম্যাসকট সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় প্রশাসন। ১০৮ জন শিল্পী এই ইয়েতি ম্যাসকট তৈরি করেন। তৈরি করতে ৪ মাস সময় নিয়েছিলেন তাঁরা। সেই ম্যাসকট খুলে নিতে হয় নেপাল সরকারকে।
অনেক গল্প হল। এবার যে গল্পটি দিয়ে ইয়েতি অভিযানের ইতি টানব তা বেশ রোমাঞ্চকর। এই গল্পের নায়ক এভারেস্ট অভিযানের নায়ক এডমন্ড হিলারি।
ইয়েতিদের সন্ধানে অনেক দুঃসাহসিক অভিযানও পরিচালিত হয়েছে এতক্ষণ তার অনেকগুলির গল্প শুনলেন। কিন্তু এইসব অভিযানগুলির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযান ছিল স্যার এডমন্ড হিলারির ইয়েতি অভিযান।
১৯৬০-৬১ সালের দিকে হিলারিকে ওই এলাকায় পাঠায় শিকাগোর ওয়ার্ল্ড বুক অফ এনসাইক্লপিডিয়ার প্রণেতারা। এই হিলারই শেরপা তেনজিংকে নিয়ে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন। কেউ কেউ বলেন ইয়েতির সন্ধানে বেরিয়েই হিলারির নাকি এভারেস্টর প্রতি টান তৈরি হয়।
যাই হোক হিলারি তার সঙ্গীদের নিয়ে হিমালয়ের পথে রওনা হলেন নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে শুরু হল তাদের যাত্রা। দুর্গম পথে চলতে চলতে তারা তিব্বতের এক গ্রামে এসে পৌঁছোলেন। গাঁয়ের নাম খুমজুং। হিমালয়ের এই গ্রাম শেরপাদের গ্রাম বলে পরিচিত। একদিন গ্রামের একটি মঠ দেখতে গেলেন হিলারি। গিয়ে দেখলেন সেখানে সযত্নে রক্ষিত আছে একখানা চামড়া। মঠের অধ্যক্ষ হিলারিকে বললেন, “আমাদের বিশ্বাস এটি ইয়েতির চামড়া।”
চামড়াটি গর্বের সঙ্গে মঠাধ্যক্ষ দেখালেন হিলারিকে। চামড়াটি দেখে হিলারির মনে হল চামড়াটি বেশ পুরোনো। হিলারি কিছুক্ষণ মন দিয়ে চামড়াটি দেখে অনুমান করলেন সেটি মানুষের চামড়া। চামড়াটির মাথার দিককার চুলগুলি লম্বা।
হিলারির আশ্চর্যের সঙ্গে মঠাধ্যক্ষকে জিজ্ঞাসা করলেন যে চামড়াটি কোথা থেকে এলো। হিলারির প্রশ্নের উত্তরে মঠাধ্যক্ষ লামা হিলারিকে শোনালেন এক রোহমর্ষক কাহিনি। গল্প অনেকটা এরকম, প্রায় দুশো বছর আগে ইয়েতিরা খুমজুং গ্রামটি দখল করে নেয় এবং গ্রামবাসীদের ধরে ধরে খেয়ে ফেলতে শুরু করে। অবস্থা ক্রমে এমন দাঁড়ায় যে গ্রামে মানুষের চেয়ে ইয়েতিদের সংখ্যা বেড়ে যায়। এমন সময় একজন বিজ্ঞ লামা ইয়েতিদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য একটি অভিনব পরিকল্পনা করেন। তিনি দেখলেন ইয়েতিরা অনুকরণপ্রিয়। মানুষ যা করে ইয়েতিরাও তাই অনুকরণ করে। বিজ্ঞ লামা তাদের এই অনুকরণপ্রিয়তাকেই কাজে লাগালেন তাঁর পরিকল্পনায়। তিনি গ্রামে এক মহোৎসবের আয়োজন করলেন। সেখানে সমবেত গ্রামবাসী ও ইয়েতিদের মধ্যে বিতরণ করা হল চাঙ জাতীয় বন্যমদ। লামার শিখিয়ে দেয়া বুদ্ধিমতো গ্রামের লোকজন গোগ্রাসে মদ পানের ভান করল, কিন্তু আসলে পান করল না। তারপর মাতাল হয়েছে এরকম ভাব করে কোমরের খাপ থেকে তলোয়ার বের করে পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করে বসল। শুরু হল এক রক্তক্ষয়ী লড়াই। যুদ্ধে প্রায় সবাই জখম হয়ে লুটিয়ে পড়তে লাগল। মনে হল তাদের কেউই আর বাঁচবে না।
এদিকে মদ পানে মত্ত ছিল ইয়েতিরাও। মানুষের দেখাদেখি প্রচুর চাঙ পান করে ইয়েতিদেরও প্রচুর নেশা হয়েছিল। এবার মানুষের মতো তারাও নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি শুরু করে দিল। ওদিকে হয়েছে কী মানুষের ব্যবহৃত তলোয়ারগুলো ছিল কাঠের। যার ফলে তারা কেউই নিহত বা জখম হয়নি। কিন্তু মরার ভান করে পড়ে রইল তারা। আর যখন দেখল ইয়েতিরা মদের নেশায় চুর হয়ে গেছে তখন তারা যে যার মত সরে পড়ল।
এদিকে ঘটনাস্থলে ইয়েতিদের কাছাকাছি স্থানীয়রা কাঠের অস্ত্রের জায়গায় একরাশ লোহার ধারালো অস্ত্র ফেলে রেখে দিল। রাতের আঁধারে স্থানীয় গ্রামবাসীরা অদৃশ্য হয়ে গেল।
ইয়েতিরা কিছুক্ষণ পরে দেখে তাদের পাশে অনেক অস্ত্র পড়ে আছে। নেশার ঘোরে তারা সেগুলি কুড়িয়ে নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করতে শুরু করল। ধারলো তীক্ষ্ণধার অস্ত্রগুলির ফলা তারা একে অপরকে ঢুকিয়ে দিতে শুরু করল। আর এর ফল হল মারাত্মক।
রাত পেরিয়ে সকাল হল। গ্রামবাসীরা ভয়ে ভয়ে ঘরের দরজা খুলল আর খুলে দেখল, ইয়েতিদের প্রায় সবাই মরে পড়ে আছে। শুধু একটি ইয়েতি মাতাল হয়ে পড়ে আছে এক পাশে। গ্রামবাসীদের যত রাগ গিয়ে পড়ল ওই ইয়েতির ওপর। তারা ওই ইয়েতিটাকে হত্যা করে তার গা থেকে চামড়াটা ছাড়িয়ে নেয়।
হিলারির চমক ভাঙল। লামা বললেন, “এই সেই ইয়েতির চামড়া। হিলারিকে চুপচাপ দীর্ঘক্ষণ নিরীক্ষণ করল চামড়াটি। লামা ধীর কণ্ঠে হিলারির কাছে এগিয়ে এসে বললেন, “এই বস্তুটি বহুকাল মঠে সংরক্ষিত আছে। আমরা কেউই এর বয়স জানি না। এখানে কিছু লিপি আছে যাতে এর উল্লেখ আছে।”
হিলারি সারারাত ধরে তার সঙ্গে থাকা অভিযাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করলেন এ-বিষয়ে পরদিন সকালেই গেলেন মঠের লামার কাছে। তাঁর কাছে একটি প্রস্তাব রাখলেন হিলারি। তারা হিলারি লামাকে বললেন, “বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষার জন্য আমরা চামড়াটি ইউরোপ ও আমেরিকায় নিয়ে যেতে চায়।”
লামা জানিয়ে দিলেন, “ওই চামড়া মঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শধু তাই নয়, গ্রামের বাইরেও নিয়ে যাওয়া যাবে না।” বহু আলোচনার পর গ্রামের লোকজন লামাকে বোঝালেন। স্থানীয় গ্রামবাসীদের অনুরোধে লামা ইয়েতির সেই চামড়া ছ’সপ্তাহের জন্য ধার দিতে রাজি হলেন। যার বিনিময়ে গ্রামের লোকজনকে আট হাজার টাকা দিতে হল হিলারিকে। কেউ কেউ বলেন টাকার অঙ্কটা ছিল আরও বেশি। আট নয়, আশি হাজার টাকা দিতে হয়েছিল হিলারিকে।
“হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড” পত্রিকায় বড়ো করে শিরোনাম দিয়ে খবর বের হল। সেখানে লেখা হল, “স্যার এডমন্ড হিলারি খুমজুং গ্রাম থেকে ইয়েতির চামড়াসংগ্রহ করেছেন। খুমজুং গ্রামের লোকেদের সঙ্গে তার চুক্তি হয়েছে যে সেটি নেওয়ার অর্থাৎ ২৫ নভেম্বর থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে তা মঠে ফেরত দিতে হবে। এই অল্প সময়ের পূর্ণ সদ্বব্যবহার করে ইয়েতি রহস্যের উত্তর পাওয়ার জন্য তিনি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। ইয়েতির মাথার চামড়াটি প্রথমে চিকাগোর ন্যাচারাল হিস্ট্রির জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হবে। পরে তা লন্ডনের জুলজিক্যাল কাউন্সিলে নিয়ে যাওয়া হইবে। বিশেষজ্ঞদের রায় নেওয়ার জন্য আরও বেশ কিছু জায়গায় সেটি নিয়ে যাওয়া হবে।
খুমজুং গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গে স্যার এডমন্ড হিলারির চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তি অনুযায়ী ইয়েতির ওই চামড়া প্রথমবারের জন্য খুমজুং গ্রামের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
মাকালু শৃঙ্গে এডমন্ডের বৈজ্ঞানিক ও গবেষণামূলক অভিযানের সঙ্গী তিনজন শেরপা খুমজুংয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইয়েতির মাথার চামড়া ফিরিয়া দেওয়ার বিষয়ে জামিন হয়েছে বলে জানা গেছে। শুক্রবার স্যার এডমন্ড কলিকাতায় এসে পৌঁছোন। ইয়েতির মাথার চামড়া সম্পর্কে তিনি কোনোপ্রকার মতামত প্রকাশে অক্ষমতার কথা জানান এবং বলেন যে, তিনি বিশেষজ্ঞদের কাছে ওই দ্রব্যটি নিয়ে গিয়ে দেখাবেন। তিনি বলেন, তিনি ইয়েতির গমনাগমনের পথ দেখেছেন তবে অন্য প্রাণীর গমনাগমনের ফলেও ওই পথ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান কর্মসূচি অনুযায়ী শনিবার তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাত্রা করবেন। খুমজুং গ্রামের মোড়ল খুম্বচুম্বি এবং প্রাণীতত্ত্ববিদ শ্রীমার্লিন পার্কিন্স তাঁর সঙ্গে যাচ্ছেন। এডমণ্ড হিলারি শুক্রবার কলিকাতা বিমান বন্দরে নন্দাঘুন্টি বিজয়ী দলের নেতা সুকুমার রায়ের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং নন্দাঘুন্টি বিজয়ের জন্য তাঁকে ও দলের অন্যান্য সদস্যদেরকে অভিনন্দন জানান। তিনি শ্রী রায়ের কাছ থেকে অভিযানের যাত্রাপথ ও তাঁদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।”
হিলারি ও তাঁর দলবল তিব্বত থেকে কাঠমাণ্ডু হয়ে ব্যাংকক হয়ে শিকাগো পৌঁছোলেন বিমানযোগে। সেখানে একদফা পরীক্ষা চলল সেই ইয়েতির চামড়ার।
জাতীয় ইতিহাস জাদুঘরের বিজ্ঞানীরা ইয়েতির সেই চামড়া পরীক্ষা করলেন। তারপর সেখান থেকে হিলারি ও তাঁর দল প্যারিস হয়ে গেলেন লন্ডনে। সেখানকার রয়্যাল জুলজিক্যাল সোসাইটির বিশেষজ্ঞরা বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালালেন ইয়েতির সেই চামড়ার।
কিন্তু দুঃখের বিষয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনোটিতেই ইয়েতি সম্পর্কিত কোনো আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এল না। অনেক সংবাদপত্র জিনিসটা ভুয়া বলে শিরোনাম দিয়ে বড়ো বড়ো অক্ষরে খবর ছেপে দিল। হিলারি ও তার দল কোথাও কোনো আশার আলো দেখতে না পেয়ে ক্ষুণ্নমনে কাঠমান্ডু হয়ে তিব্বতে ফিরে গেল। আর যাদের জিনিস তাদের কাছে ফেরত দিয়ে দিল।
লামাকে হিলারি যখন জানাতে গেলেন এই চামড়া কার তার কোনো সদুত্তর তিনি পাননি। চামড়াটি আদৌ ইয়েতির কিনা তাও তিনি জানতে পারেননি। তখন হিলারির কথা শুনে লামা কোনো পাত্তাই দিলেন না। লামা মৃদু হেসে বললেন, “তোমাদের পরীক্ষায় আমাদের কী আসে যায়। বিচিত্র ও রহস্যময় এ পৃথিবীর কতটুকুই বা জান তোমরা? সব কিছুর উত্তর কি বিজ্ঞান দিতে পারে?”
