রহস্যে মোড়া শেরপাদের গ্রাম ‘খুমজুং’
রহস্যে মোড়া শেরপাদের গ্রাম ‘খুমজুং’
হিমালয়ে অনেক কঠিন ট্রেকরুট আছে, যেমন কালিন্দী খাল ট্রেক, চাদর ট্রেক, অডেনস কল ট্রেক, ট্রান্স-জাঁস্কর ট্রেক। এগুলি তুলনা মূলকভাবে এভারেস্ট বেস-ক্যাম্প ট্রেকের চেয়ে অনেক কঠিন, কিন্তু এভারেস্ট এভারেস্টই। পথের শেষে তার দেখা মেলার অনুভূতি আর কোনো ট্রেকে নেই। চলুন এভারেস্ট বেস-ক্যাম্পের দিকে যাওয়া যাক আর সেই পথ ধরেই আমরা পৌঁছে যাব শেরপাদের গ্রামে। আর সেই গ্রামে গিয়ে আমরা জানব শেরপাদের জীবনের নানান অজানা কথা। খুটিনাটি বিষয়। কেমন ভাবে তারা থাকে, কী খায়, এভারেস্ট চড়া ছাড়া আর কী কী করতে ভালোবাসে, এমন অজস্র কথা। চলুন হাজারো উত্তরের খোঁজে যাওয়া যাক শেরপাদের গ্রামে।
প্রথম দিন কাঠমান্ডু। আপনি বিমানেও যেতে পারেন। কলকাতা থেকে ট্রেনে রক্মৌল হয়েও নেপাল প্রবেশ করতে পারেন। নেপালের হাজারো প্রবেশ পথ। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ট্রেকিং করে পৌঁছে যান লুকলা।
ঘনসবুজ অরণ্য আর দুধসাদা হিমালয়ের রূপ দেখতে দেখতে পৌঁছে যান লুক্লার তেনজিং-হিলারি এয়ারস্ট্রিপ, উচ্চতা ২৮০০ মিটার। তারপর আবার যাত্রা শুরু লুকলা থেকে তিন-চার ঘণ্টার ট্রেক করে পৌঁছোন ফাকদিং প্রায় ২৬০০ মিটার। বিশ্ববিখ্যাত ট্রেকরুটটি এগিয়ে চলবে শেরপাদের গ্রামগুলির মধ্যে দিয়ে। অবিস্মরণীয় সৌন্দর্য নিয়ে পথে দেখা দেবে দুধকোশি নদী আর উপত্যকার ল্যাডস্কেপ। ব্যাকড্রপে পাহাড়ের গায়ে সদ্য জমা বরফ আপনাকে আনমনা করে দেবে।
রাতটা থেকে যান ফাকদিংয়ে। পরের দিন ফাকদিং থেকে রওনা দিন নামচেবাজারের দিকে। ছবির মতো বেশ কিছু গ্রামের মধ্যে দিয়ে তিন ঘণ্টা ট্রেক করে জোরসালে গ্রামে এসে পারলে লাঞ্চ সেরে ফেলুন। পাহাড়ি গ্রামে সাধারণ খাবার ভাত কিংবা চাপাটি। সামান্য ডাল। সবজি। আচার। আর চাইলে চিকেন পাবেন।
পাঁচটি সাসপেনশন ব্রিজ পথে আপনাকে পেরোতে হবে। কাঁপন ধরানো গভীর গিরিখাত ও শৈলশিরা আপনার যাত্রাপথের সঙ্গী হবে। অবাক চোখে আপনাকে স্বাগত জানাবে কুসুম কাংগু, থামসারকু এবং কুম্বিয়েলা শৃঙ্গের দল।
ঘণ্টা সাতেক ট্রেক করে ফাকদিং থেকে পৌঁছে যান নামচেবাজার, ৩৪৫০ মিটার। উচ্চতা ও আবহাওয়ার সঙ্গে নিজের শরীরকে টিউন করাতে পারলে ভালো হয়। কারণ তা না হলে পদে পদে আপনি বেশ সমস্যার সম্মুখীন হবেন।
আপনি যে পথে হাঁটছেন, হাঁটতে হাঁটতে একবার ভাবুন এই পথে হেঁটে গেছেন পৃথিবীর সেরা পর্বতারোহী ম্যালোরি, আরভিন, হিলারি, তেনজিং, মেসনাররা। জাস্ট আপনারা গায়ে কাঁটা দেবে। আপনার মতো রুকস্যাক পিঠে নিয়েই তাঁরা এভারেস্ট জয় করেছেন। বিশ্বাস করুন মনে মনে একটা শিহরন অনুভব করবেন। এমন মনে করলেই দেখবেন একটা অদ্ভুত এনার্জি কাজ করতে শুরু করেছে মনমধ্যে। ট্রেকের আনন্দ নিতে নিতে হাঁটতে হবে। একটা কথা মনে রাখবেন, হিমালয়কে প্রণাম করে যাত্রা শুরু করবেন। কারণ ধ্যানমগ্ন মহাদেবকে যদি আপনি সম্মান না করে বের হন তো আপনার যাত্রা বিফল। তাই কোনোভাবেই নিজের ক্ষমতা জাহির করবেন না। হিমালয় আপনার চেয়ে কোটিগুণ শক্তিশালী। আপনি তার কাছে তুচ্ছ। তাই ঈশ্বরকে সহায় করে হাঁটাই ভালো।
নামচেবাজারে কাটান একটা দিন পুরো। হিমালয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করুন প্রাণভরে।
আশপাশের সবুজ পাহাড়ে একটু নিজের মতো ঘোরাঘুরি করুন। ফটো তুলুন মন ভরে। সিকিমের ছাঙ্গু লেকের কাছে থাকা ইয়াক কিংবা মানালির হিড়িম্বা মন্দিরের বাইরে থাকা ইয়াকদের থেকে নেপালের এই ইয়াক বা চমরি গাইগুলি আকারে বেশ বড়ো। নানা পোজে ছবি তুলুন প্রাণ ভরে। নামচেবাজারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তিব্বতীয় বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্বাদ নিন। এ পথের শেষ বড়ো বাজারের এখানে। সেকারণেই নাম নামচেবাজার বা নামচি বাজার। কেনাকাটার ঝোঁক থাকলে কিনতে পারেন অ্যান্টিক কিছু সামগ্রী। স্থানীয় বৌদ্ধদের নানান নিদর্শন নেড়ে চেড়ে দেখতে পারেন। কিনতেও পারেন দরদাম করে। ট্রেকিং গিয়ার থেকে বিয়ার সবই পাবেন।
নামচেবাজার থেকে পরদিন আবার শুরু ট্রেকিং। এবার গন্তব্য খুমজুং বা শেরপাদের গ্রাম।
নামচেবাজার থেকে দু’-তিন ঘণ্টায় ট্রেক করে পৌঁছে যান খুমজুংয়ে। খুমজুংয়ের উচ্চতা ৩৭৮০ মিটার। মেঘছোঁয়া উপত্যকার ভেতর দিয়ে এই হাঁটাপথ সত্যিই নৈসর্গিক। হাঁটতে হাঁটতে এক স্বর্গীয় অনুভূতি লাভ করবেন আপনি।
পবিত্র পর্বত খুম্বিয়েলার পদতলে অবস্থিত খুমজুং। শেরপাদের গ্রামে পৌঁছেই একটু জিরিয়ে নিন। চা খান। ঘন দুধের চা। চমরি গাইয়ের দুধের চা। কেউ কেউ মাখন চা বলেন। এই চা লে-লাদাখে বেশ পরিচিত। একটু বিশ্রাম সেরে ঘুরে দেখুন খুমজুং গ্রাম। দেখে নিন ইয়াক ফার্ম। তারপর পৌঁছে যান খুমজুং মনাস্ট্রিতে।
মেডিটেশনে আগ্রহ থাকলে একমনে একটু ধ্যান সেরে নিন মনাস্ট্রিতে। খুমজুং মনাস্ট্রিতে ইয়েতি নামক অলৌকিক প্রাণীর মাথার একটি খুলি আছে। বিশ্বাস করা বা না-করাটা আপনার ব্যাপার।
খুমজুং থেকে আপনার মন চাইলে একদিনের জন্য যেতে পারেন ফরৎসে। এটিও ট্রেকিং রুট। ছ’ঘণ্টা সময় লাগবে ফরৎসে গ্রামে পৌঁছোতে। ফরৎসের উচ্চতা ৩,৮১০ মিটার। এই যাত্রাপথের সৌন্দর্যে আপনি মোহিত হয়ে যাবেন। ছবির মতো সুন্দর সাজানো গোছানো গ্রাম ফরৎসে।
ফিরে আসি খুমজুংয়ের গল্পে। শেরপাদের এই গ্রাম নিয়ে যত গল্পই বলি না কেন তা সহজে শেষ করা যাবে না। খুমজুং নেপালের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সাগরমাথা জাতীয় উদ্যানের অংশ। সারা পৃথিবীর পর্বতারোহীদের কাছে অতি পরিচিত এই অঞ্চল। এর উত্তরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখর এভারেস্ট, যার নেপালি নাম সাগরমাথা। জীবিকাসূত্রে এখানকার সব পরিবারই পর্বতারোহণ ও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত। গ্রামে যুবাপুরুষের দেখা মেলে না সেভাবে। স্বল্পকালীন পর্বতারোহণ মরশুমে যুবক পুরুষরা বিভিন্ন অভিযাত্রীদলে শেরপার কাজে যোগ দেন।
এডমন্ড হিলারির শিখরবিজয়ী দলের অনেক শেরপাই ছিলেন খুমজুং আর পড়শি-গ্রাম খুন্দের বাসিন্দা। খুমজুংকে ভালোবেসেছিলেন স্যার হিলারি। আর খুমজুংয়ের সঙ্গে তাই হিলারির সম্পর্ক এক ইতিহাস তৈরি করেছে।
খুমজুং এলে তাই কিন্তু অতি অবশ্য একটি জায়গা যেতে ভুলবেন না। সেটি হল স্যার এডমন্ড হিলারি স্থাপিত “হিলারি স্কুল”। খুমজুং-এ শুধু স্কুলই খুলে দেন নি হিলারি। তিনি খুন্দেতে একটি হাসপাতালও করে দেন শেরপাদের জন্য। খুম্বু উপত্যকার এখন সবচেয়ে বড়ো এই হিলারি স্কুল। স্কুলটির পোশাকি নাম খুমজুং সেকেন্ডারি স্কুল। লোকমুখে ‘হিলারি স্কুল’ নামেই পরিচিত। বহুদূর থেকে পাহাড় ডিঙিয়ে পায়ে হেঁটে পড়তে আসে পড়ুয়ারা। স্কুলের বাচ্চাদের নীল পোশাক যেন হিলারির মানবিক ভাবনার গভীরতাকে বোঝায়। স্কুলপড়ুয়ারা অনেকেই ভবিষ্যতের এভারেস্ট অভিযাত্রী।
এবার আসুন একটু জেনে নেওয়া যাক শেরপাদের সম্বন্ধে। সে অনেককাল আগের কথা। হিমালয়ে পর্বতারোহণ তখনও শখের জিনিস হয়ে ওঠেনি। তিব্বতের পূর্বদিক থেকে একদল মানুষ নেপালে পাড়ি জমায়। দুই অঞ্চল তখনো একই দেশ ছিল। তারা নিজেদের ‘শার-ওয়া’ বলে ডাকত। তারা আজ আমাদের কাছে পর্বতের অতিমানব ‘শেরপা’ বলে পরিচিত।
হিমালয় ট্রেকিংয়েই হোক আর ভ্রমণেই হোক শেরপাদের গুরুত্ব অপরিহার্য। তাদের নিয়ে অনেকের মধ্যে বেশ কিছু জিজ্ঞাসা থাকে। অনেক প্রশ্ন আসে তাদের নিয়ে। অনেকেরই এ ব্যাপারে কৌতূহল আছে।
শেরপাদের নিয়ে বিভিন্ন সময় হিমালয় ভ্রমণ করতে করতে জেনেছি। তারই দু’চার কথা এখানে বলছি। শেরপারা জাতিগতভাবে সাধারণ কুলি নয়। ক্যাম্প প্রস্তুত করা, অন্য শেরপাদের নিয়ন্ত্রণ করা, কোনো শেরপার কাঁধে ভার বেশি হয়ে গেল কি না, ট্রেকিং দলের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবা এগুলো তাদের কাজ। তা ছাড়া সেবা গ্রহণকারী অভিযাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ, পুরো রাস্তায় তাদের সাহায্য করা থেকে শুরু করে অভিযাত্রী যখন ক্যাম্পে ফিরে আসেন তখন যেন চা গরম থাকে, তা দেখাশোনা করার দায়িত্বও একজন শেরপার।
শেরপা জাতিগোষ্ঠী ছাড়াও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর কিছু মানুষ এই কাজ করে থাকেন। তবে তা শুধু বেস ক্যাম্প পর্যন্ত। এর পরের ক্যাম্পগুলো থেকে সামিট পর্যন্ত যেতে বেশি দক্ষতার শেরপাদের প্রয়োজন হয়। এদের বেশিরভাগই আসেন শেরপা জাতিগোষ্ঠী থেকে। উচ্চতার ঝুঁকি আর দক্ষতার পাশাপাশি আন্তরিক এই দায়িত্ব পালনের জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে শেরপারা ভালোটাকা পান। জীবনের ভয়কে তুচ্ছ করে একজন দক্ষ শেরপা দু’মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করে থাকেন।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় শেরপারা নেপালের সোলুখুম্বু উপত্যকায় পাংবোচি গ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন জনগোষ্ঠীর অন্যতম। উপত্যকাটি বর্তমানে জাতীয় উদ্যান। শেরপাদের গ্রাম থেকেই এভারেস্টে ওঠার পথ শুরু হয়।
১৯৭৬ সালে আমেরিকার একটি গবেষণায় বলা হয়, হাজার বছর ধরে পৃথিবীর অন্যতম বেশি উচ্চতায় আর হিমালয়ের তাপমাত্রায় থাকতে থাকতে শেরপাদের শরীর ওই আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। তাদের শরীর তাদেরকে বেশি উচ্চতায় আর কম অক্সিজেনে বেঁচে থাকার মতো করে প্রস্তুত করেছে। হিমোগ্লোবিনে বাঁধা তাদের শরীরের এনজাইমগুলো আমাদের থেকে একটু আলাদা গোছের। তাদের হৃৎপিণ্ড শর্করাকে কাজে লাগায়, আর ফুসফুস কম অক্সিজেনে থাকার জন্য বেশ উপযোগী।
এই গবেষণার পর আরও অনেক গবেষণা হয়েছে তাদের জিনতত্ত্বের বিষয়ে। এই মতকে সামনে রেখে একদল গবেষক বলেন, “আমরা, আমাদের ছেলেমেয়েরা, তাদের ছেলেমেয়েরা যদি শেরপাদের এলাকায় গিয়ে বসতি গড়ি তাহলে আশা করা যায়, আমাদের বংশে একদিন শেরপাদের মতো শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মানুষ তৈরি হবে।” এখন এ-বিষয়ে তর্কের খাতিরে বলা যতটা সহজ করা ততটাই কঠিন।
অবশ্য আপনি যদি রেইনল্ড মেসনারের মতো হয়ে থাকেন তাহলে ভিন্ন কথা। তিনি এভারেস্টের শিখরে একাই চলে গিয়েছিলেন, কোনো অক্সিজেন ছাড়া। এছাড়া তিনি পৃথিবীর ১৪টি ৮,০০০ মিটারের বেশি পর্বতের সবগুলোকে জয় করে ফেলেছেন।
বিখ্যাত শেরপারা জাতিগোষ্ঠীগতভাবে অবশ্যই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিবার এভারেস্ট সহ পুরো হিমালয়ের সব পর্বতে সামিট করার সর্বোচ্চ রেকর্ডধারী। ১৯৫৩ সালে স্যার এডমন্ড হিলারির সঙ্গে তেনজিং নোরগে শেরপার প্রথমবার এভারেস্ট বিজয় শেরপাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো অর্জন। তিব্বত ও ভারত তেনজিংকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। খ্যাতিতে পিছিয়ে নেই আপা শেরপাও। তিনি ২০১১ সাল পর্যন্ত ২১ বার এভারেস্ট জয় করে ফেলেছেন। স্ত্রীকে তিনি কথা দিয়েছিলেন ২১তম বারের পর আর এভারেস্টে উঠবেন না। ২০১৮ সালের মে মাসে কামি রিতা শেরপা এই রেকর্ড ভেঙে ২২তম বার এভারেস্ট অভিযান শেষ করেন। এটা পৃথিবীতে সর্বোচ্চবার এভারেস্ট জয়ের রেকর্ড।
এখন এই প্রশ্ন সবার মধ্যেই বেশ নাড়া দেয় যে, শেরপারা সবসময় এভারেস্টের আশেপাশেই কেন থাকে? এর উত্তর খোঁজ করে অবাক হয়েছিলাম। শেরপারা শুধু এভারেস্টের আশেপাশেই থাকে এই ধারণাটাই ভুল। শেরপাদের রক্তে আছে ভ্রমণের নেশা।
একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রায় ৬০০ বছর আগে জ্ঞানগঞ্জ বা সাংগ্রি-লা খুঁজতে তিব্বত থেকে সোলুখুম্বু অঞ্চলে এসে পৌঁছেছিল একদল মানুষ। সেখানে তারা জীবনকে উন্নততর করে তোলার সুযোগ পায়। তারপর কেটে যায় অনেকগুলো বছর। শুরু হয় এভারেস্ট অভিযান। এভারেস্ট অভিযান বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গেই স্বচ্ছল হয়ে ওঠে শেরপাদের জীবন। তাদের সন্তানেরা কাঠমান্ডু থেকে শুরু করে দেশের বাইরে পর্যন্ত পড়তে যায়। একটি ব্রিটিশ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫,০০০-এর বেশি শেরপা দেশের বাইরে বসতি গড়েছেন। পাহাড়ে চড়া ছাড়াও বিভিন্ন পেশার সঙ্গে তারা যুক্ত। বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক শেরপাই পাহাড় চড়া ছেড়েছেন। তারা কেউ বা পর্বত আরোহণ সম্পর্কিত ব্যাবসা করেন, কেউ বা ট্যাক্সি চালান। কেউ কেউ তো বিমানও চালান। প্রবাসী শেরপাদের অর্ধেকের বেশি থাকেন আমেরিকায়। এছাড়া ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা জার্মানিতেও আছেন অনেক শেরপা ও তাদের পরিবার।
শেরপা মানেই যে তাকে পাহাড়ে চড়তে হবে এমন ধারণাটাও ভুল। শুধু তাই নয়, শেরপা মানেই যে তাকে পাহাড় ভালো বাসতে হবে এটাও নয়। শেরপা জাতিগোষ্ঠীর এক প্রবীণ ব্যক্তি জানিয়েছেন, “উচ্চতম পর্বতগুলোর মাথায় দেবতাদের বাস, আর এ স্থান জয় করা নয়, সম্মান করে দূর থেকে দেখা উচিত। পর্বতের শীর্ষে পৌঁছোনোর মোহ এসেছে সুদূর ইউরোপ থেকে। এমনকি যেসব শেরপারা দক্ষতার সঙ্গে পাহাড় জয় করে ফেলেন, তাদের অনেকের বিশ্বাস পাহাড়ে দুর্ঘটনা হয় দেবতার প্রতি যথাযথ সম্মান না দেখানোর কারণে। এভারেস্ট অভিযান শুরু করার আগে তারা পুজো করে দেবতার অনুমতি ও সহায়তা প্রার্থনা করেন।”
নেপালের এক পাহাড়ি গ্রামে এক চায়ের দোকানে বসে থাকা এক শেরপাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আচ্ছা আপনাদের শেরপাদের অনেকের নামেই বেশ কিছু কমন নাম আছে, যেমন লাকপা, পাসাং, তেনজিং কিংবা পেমবা হয় কেন? “একটু খোঁজ খবর করে দেখবেন শেরপাদের কারওরনাম লাকপা দর্জি, তো কারওর নাম দর্জি লাকপা। তাদের মধ্যে একই কিছু নাম আছে যে নামে বহুজনকে পাওয়া যায়। এই বিচিত্র ব্যপারটা আমায় বেশ ভাবিয়েছিল। তাই হাতের কাছে এক শেরপাকে পেয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেলেছিলাম। সাংবাদিকসুলভ মন থেকে নিস্তার কোথায় বলুন!
উত্তরে সেই শেরপা ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে জানালেন, “এরকম মিলের পেছনে একটা কারণ, আমদের সমাজে শিশুরা সপ্তাহের যে বারে জন্মগ্রহণ করে, সেই বারের নামে শিশুর নামকরণ করার প্রবণতা আছে। এভাবেই কারও নাম দেওয়া হয় পাসাং। পাসাং মানে শুক্রবার, আবার পেমবা মানে শনিবার। এই নাম দিয়ে অনেক শেরপার নামকরণ করা হয়। এছাড়া গুণের নামেও তাদের নাম হয়, যেমন লামো। লামো মানে সুন্দর। তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের পুথির পাতা থেকে উঠে আসা তেনজিং শেরপা সমাজে বহুল ব্যবহৃত অনেকগুলো নামের মধ্যে একটি।’
তুষার পর্বতের অতিমানব হয়ে উঠতে গেলে তো সাধারণ মানুষের খাওয়া-দাওয়া চলবে না। তাহলে কী খেয়ে বেঁচে থাকে শেরপারা? খুব সহজ উত্তর, ডাল-ভাত। হ্যাঁ, ডাল-ভাত নেপালেরও একটি প্রধান খাবার। সাধারণত শেরপারা একবাটি ভাতের সঙ্গে একটু সবজি আর ডাল দিয়েই ভোজন সারেন। দুর্গম পাহাড়ের পথ পেরোতে, বারবার উঠতে নামতে তাদের শরীরের ওপর যে ঝক্কি যায় তার জন্য শর্করাসমৃদ্ধ খাবার তাদের ভীষণ দরকার। ভাতের শর্করা আর ডালের আমিষ তাদের পেশিক্ষয় থেকে বাঁচায় ও সুস্থ রাখে।
রক্তের সূত্রে হিমালয়ের এই রক্ষাকর্তাদের গল্প যতই দুঃসাহসিক শোনাক না কেন, তারাও কিন্তু দিনের শেষে আমার আপনার মত সাধারণ মানুষ। তুষারধ্বস সহ নানা দুর্ঘটনায় তাদেরও মৃত্যু ঘটে। উচ্চতার দোষে বা এমনিতেই যখন অভিযাত্রীরা বিভিন্ন উদ্ভট আচরণ শুরু করেন, তখন এমনও নজির আছে যে সেই সব অভিযাত্রীরা নিজেদের শেরপাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে আসে। এভারেস্টে উঠতে গিয়ে আজ পর্যন্ত যত অভিযাত্রীর মৃত্য হয়েছে তাদের এক-তৃতীয়াংশই কিন্তু শেরপা।
১৯৩৯ সালে একটি নাৎসি আরোহী দল এভারেস্ট অভিযানে যায়। মাঝপথে ঝড়ের কবলে পড়ে অভিযাত্রীদেরকেই উলটে বয়ে নিয়ে ফিরতে হয়েছিল শেরপা দলকে। একজন শেরপা কখনোই তার জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। অভিযানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো তারাই করেন, দলের সামনে দড়ি-মই ঠিক করা থেকে দলের নিরাপত্তা বৃদ্ধিও তাদের দায়িত্ব। কিন্তু নিরাপত্তা সীমার বাইরে গিয়ে, দুর্যোগে, দুর্ঘটনায় বা স্বাস্থ্যগত কারণে যদি কোনো অভিযাত্রী মারা যান, তাহলে তা শেরপার দায় নয় মোটেও।
হিমালয় পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্ট জয়ের ইতিহাসে নেপালের শেরপারা একটি অবিচ্ছেদ্য নাম। হাসিখুশি উচ্ছল চেহারা, গায়ে প্রচণ্ড শক্তি—এই হচ্ছে শেরপা গোষ্ঠীর মানুষের পরিচয়। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে নিউজিল্যান্ডের এডমন্ড হিলারির সঙ্গে শেরপা তেনজিং নোরগে যখন প্রথম এভারেস্ট জয় করেন, তখন হিমালয়ের বাসিন্দা শেরপাদের পরিচিতি দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর অনেকেই এভারেস্ট জয় করেন। তাদের পথপ্রদর্শক সহযোগী হিসেবে শেরপারা বরাবরই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। বলতে গেলে, হিমালয় অঞ্চল সফরে গেলে শেরপা গাইড ছাড়া চলা দায়। ২৯ হাজার ৩৫ ফুট বা ৮,৮৫০ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট জয় করার অভিযানে নেমে এ পর্যন্ত কয়েকশো অভিযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। আর তাতেই বোঝা যায়, এ অভিযান কত ঝুঁকিপূর্ণ আর দুঃসাহসের। সেই দুর্গম পার্বত্যাঞ্চলে বিরূপ পরিবেশে শেরপারা বাস করছে যুগ যুগ ধরে। মাউন্ট এভারেস্টের কাছে খুম্বু উপত্যকায় কয়েক হাজার শেরপার বাস। সারা নেপালে শেরপা আছে দশ হাজারের বেশি।
ব্রট কোবার্ন নামে একজন এভারেস্ট-বিশেষজ্ঞ শেরপাদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘উঁচু পাহাড়ে ওঠার সময় শেরপাদের মধ্যে অতিমানবের শক্তি দেখা যায়।’
হিমালয়ের কোলে শেরপাদের অনেক গ্রাম সমতল থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত, অর্থাৎ যা কিনা ৪,২৬৭ মিটার উঁচুতে। এসব গ্রামে গাড়ি চলাচলের পথ দূরে থাক, হেঁটে চলার পথও নেই। অথচ শেরপারা সেখানে দিব্যি স্বচ্ছন্দে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, পিঠের ওপর অনেক ভারী বোঝা নিয়ে তারা এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যান।
কিছু শিশু রোজ হাজার দেড়েক ফুট উঁচু ঢাল বেয়ে উঠে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যায়। মানে যার উচ্চতা প্রায় ১৫০ তলা বাড়ির সমান। তবে এভারেস্টে আরোহণের ঝুঁকির কাছে তাদের এ কষ্ট নস্যি। এই ঝুঁকি নিয়ে সর্বকনিষ্ঠ এভারেস্ট বিজয়ী হিসেবে বিশ্ব-রেকর্ড গড়েছে যে দুই কিশোর ও কিশোরী, তারাও কিন্তু শেরপা। যার মধ্যে একজন তেম্বা শেরি। ২০০১ সালের ২২ মে মাত্র ১৬ বছর বয়সে এভারেস্ট জয় করে সে। একই সঙ্গে সর্বকনিষ্ঠ এভারেস্ট বিজয়ী হিসেবে তেম্বা দীর্ঘ ২৭ বছরের রেকর্ড ভাঙে। ১৯৭৪ সালে ১৭ বছর বয়সে এভারেস্ট জয় করে ওই রেকর্ড গড়েন শম্ভু তামাং। তেম্বার আগে ১৪-১৫ বছরের কিশোরেরা এভারেস্ট জয়ের চেষ্টা যে করেনি তা নয়, কিন্তু আরোহণজনিত ক্লান্তি, আঘাতের কারণে জখম, অক্সিজেন-সংকট—এসব কারণে কিছুদূর গিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। তবে তেম্বার কথা আলাদা।
২০০০ সালের জুনেই সে এভারেস্ট জয় করতে যাচ্ছিল। চূড়া থেকে সে যখন ৭০ ফুটেরও (২২ মিটার) কম দূরে রয়েছে, এমন সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফিরে আসতে বাধ্য হয় সে। প্রচণ্ড বরফ পড়ায় তাঁর শরীরের কিছু অংশ অবশ হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা তাঁর ভালো র জন্য ডান হাতের তিনটি ও বাঁ হাতের দুটি আঙুল কেটে ফেলেন। এমন ঘটনায় তেম্বার এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন মিলিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সে যে অসমসাহসী, পরের বছরই তা প্রমাণ করে।
২০০৩ সালের ২৪ মে এভারেস্ট জয় করে সর্বকনিষ্ঠ আরোহণকারী হিসেবে নতুন রেকর্ড করে মিং কিপা। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৫ বছর। তবে একা নয়, বড়ো বোন লাখপা শেরপা ও ভাই মিংমা জ্ঞালু শেরপাও তাঁর সঙ্গে এভারেস্ট জয় করে।
২০১৯ এর নভেম্বর থেকে বিশ্বজুড়ে করোনার প্রভাব পড়তে শুরু করল। দেখতে দেখতে হিমালয়কেও গ্রাস করল করোনা মহামারি। আর তার জেরে প্রথমবারের মতো বন্ধ হল এভারেস্ট অভিযান! ৩ হাজার শেরপা হয়ে পড়লেন বেকার। বাধ্য হলেন তাদের পেশা বদলাতে। ২৪ মার্চ কাঠমান্ডু থেকে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প লুম্বা যাওয়ার ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল প্রশাসন। তার দু-তিনদিনের মধ্যেই হয়তো নেপাল সরকার অভিযাত্রীদের এভারেস্ট অভিযানের অনুমতিপত্র দিতে শুরু করত। কিন্তু করোনার জন্য সব ভেস্তে যায়। ২০২০-২১ এর এভারেস্ট অভিযান বন্ধ হয়ে যায় প্রথমবারের জন্য। সব থেকে খারাপ খবর ২০২০-২১ সালে নেপালে এভারেস্ট অভিযানের মরশুম শুরুই হয়নি। এভারেস্ট অভিযানের জন্য ৭৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেয় নেপাল সরকার। মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত চলে এই সময়। ২০২০-এর মার্চ থেকেই করোনার হানার জন্য এভারেস্ট অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় নেপাল সরকার। যার জেরে কর্মহীন হন প্রায় তিন হাজার শেরপা।
এই সময় সারা বিশ্বের বহু পর্যটক নেপালে থাকেন। কিন্তু এবছর একজন পর্যটকেরও দেখা নেই সেখানে। ভূমিকম্পে ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পরও নেপালে পর্যটকরা এসেছিলেন। এভারেস্ট বেস ক্যাম্প পুরো খালি হয়ে রয়েছে। ২০১৯-এর মে মাসের শেষের দিকে এভারেস্ট অভিযানের সময়সীমা শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে অভিযাত্রী, শেরপা ও গ্রাউন্ড স্টাফরা ফিরে এসেছিলেন। এবার সেখানে মরশুম শুরুই করা যায়নি। সংবাদসংস্থা সূত্রে খবর, এভারেস্ট অভিযান থেকে নেপালের জিডিপি-র চার শতাংশ আয় আসে। সরকার আন্দাজ করেছিল, এবার অন্তত ২০ লাখ পর্যটক নেপালে ভিড় জমাবেন। কিন্তু কিছুই না হওয়ায় বিপাকে পড়ে সরকার। যার জেরে ভারতীয় মুদ্রায় ন’হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছে নেপাল সরকার। ১১ লাখ মানুষের চাকরি সংকট রয়েছে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসবের মধ্যে সব থেকে সমস্যায় পড়েছেন শেরপারা। তাঁরা এবার পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।
গ্রামে চাষবাস করছেন অধিকাংশ শেরপা। এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের সব থেকে নিকটবর্তী গ্রামটি ২০ কিমি দূরে অবস্থিত। গ্রামের নাম খারিখোলা। এই গ্রাম থেকে সাধারণত বেস ক্যাম্পে পৌঁছোতে লাগে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা। কিন্তু শেরপারা তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছোতে পারে। এই গ্রামে অধিকাংশ শেরপা অভিযাত্রীদের এভারেস্টে চড়তে সাহায্য করেন। এবার কাজ নেই। তাই আপাতত চাষবাস শুরু করেছেন তাঁরা। প্রবল আর্থিক অনটন দেখা দিয়েছে সেখানে। করে ফিরবে শেরপাদের হাল আর কবে থেকে আবার শুরু হবে এভারেস্ট অভিযান সেটাই এখন দেখার।
