মির্জাপুরের পাশের বসতি-হেলাতলা
এ ছাড়াও মির্জাপুর মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিমে ঋষিদের বসতির দক্ষিণে (বি, কে, স্কুল পার্শ্ববর্তী পঞ্চবীথি কবরখানা রোড) কয়েকটি মুসলিম পরিবারের বাস ছিল। অবশ্য পূর্ব থেকেই বেনেখামার মুসলিম বসতিপূর্ণ গ্রাম ও এ অংশ বেনে খামার গ্রামের উত্তর পূর্ব কোণে অবস্থিত বিধায় এ সময়ে সঠিক গ্রাম সীমানার অভাবে নির্দিষ্ট করে কোন এলাকাধীন বলা কঠিন। তবে মির্জাপুর মাঠ এলাকা হওয়া স্বাভাবিক।
চার্লীগঞ্জ বা সাহেবের হাটের পূর্বে ও মির্জাপুর মাঠের পরামানিকদের বসতির পশ্চিম পাশে হেলাতলার অবস্থিতি রয়েছে। বর্তমান সময়েও হেলাতলা ও হেলাতলার মোড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা ও রাস্তার আধিক্য এক সময়ের ঘন বসতির আভাস দেয়। হেলাতলা খালিশপুর পরগনা অধীন মৌজা। মৌজা গঠনকালে মৌজাধীন প্রধান জনপদ বা সর্বজন পরিচিত কোন নামে মৌজার নামকরণ করা হোত যাতে সহজে মৌজার অবস্থান বোঝা যায়। এভাবে ভাবতে গেলে মৌজা গঠন কালের পূর্বে এখানে সমৃদ্ধ জনপদ ছিল বলে অনুমান করা যায় ও হেলাতলার মোড় ব্যবহৃত কথাও এখানে বসতির ইংগিত পাওয়া যায়। সম্ভরতঃ ভৈরবের দু’পাশ দিয়ে যখন বৈদ্য-কায়স্থ গ্রামগুলো গড়ে উঠেছিল সে সময় হেলাতলায় অনুরূপ বসতি ও গ্রাম গড়ে ওঠে। হেলাতলা নামের উৎপত্তির সঠিক কারণ জানা যায় না তবে হেলাতলা থেকে হেলাতলায় উদ্ভব বলে মনে হয়। অঞ্চলে হেতালবুনিয়া, হেতালতলা ইত্যাদি নামে অনেক গ্রাম আছে। সাতক্ষীরার নিকটে প্রাচীন সমৃদ্ধ গ্রাম হেতালতলার সাথে এখানের কোন সম্পর্ক ছিল কিনা বোঝা যায় না। মির্জাপুর সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার জনবসতি শূন্য হওয়ার সময় ওই কারণে ও সময়ে সম্ভবতঃ হেলাতলা জনবসতি শূন্য বা হালকা হয়ে পড়ে। পরবর্তী বসতি চার্লীগঞ্জের হাটের দক্ষিণ দিকে রেল লাইন বসানোর সময় পূর্বে ক্লে রোড পর্যন্ত রেলসীমানা ও রেল বসানোর পর বাজার সম্প্রসারিত হয়ে পূর্বদিকে সরে এলে অবশিষ্ট হেলাতলা তুলশীতলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পূর্ব দিকের সামান্য অংশ ও নামের স্মৃতি উত্তরসূরীদের জন্যে রেখে যায়। উল্লেখ্য কাঠালতলা তালতলা-ফুলতলা-হিজলতলা ইত্যাদি তলা যুক্ত নামের গাছের তলা বুঝায় এবং এ ক্ষেত্রে হেতালতলা থেকে হেলাতলা হওয়া স্বাভাবিক।
হেলাতলার রথ নামে পরিচিত একখানা প্রাচীন রথ ও নদীতীরে জগন্নাথ মন্দির হেলাতলার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সন্ধেহমুক্ত করতে সহায়তা করে। এই জগন্নাথ মন্দির বর্তমান ঠাকুরবাড়ী গলির সোজা কাপড় পট্টিতে নদীর পাড়ে ছিল। মূল মন্দির ভাঙ্গনে নদী গর্ভস্থ হলে পূর্ব মন্দির সোজা দক্ষিণে সরে ক্ষুদ্রাকারে পুনঃ নির্মিত হয়। বর্তমান শতকের মাঝামাঝি এ মন্দিরও নদী গর্ভ স্থ হয়। হেলাতলার রথ ও মন্দির কখন এবং কার দ্বারা নির্মিত হয় তা জানা যায় না। তবে মহকুমা সদর প্রতিষ্ঠার পর চার্লিগঞ্জে নড়াইল জমিদারের তহসিল অফিস নির্মিত হলে কাছারীর নায়েব জোড়া মন্দিরের (শিববাড়ী) কাছ থেকে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রথখানা উদ্ধার করে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ও মেরামত করে কাছারির পাশে একটা টিনের ঘরে (ঘরটি রথ রাখার জন্য তৈরী) এনে রাখেন। রথ যাত্রা উপক্ষক্ষে এই রথ টেনে এনে হেলাতলার মোড়ে রাখা হত এবং কাছারির পুবদিকে চার্লিগঞ্জের হাটের বটতলার মেলার পত্তন করেন। ক্রমে এই মেলা বড় মেলায় রূপ নেয় এবং উল্টো রথের দিন হেলাতলার মোড়ে এই মেলা বসত। চার্লিগঞ্জের হাটে মেলার প্রচলনের পূর্বে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় এ মেলা হেলাতলার মোড়েই হত এবং নিকটে রথ রাখার ব্যবস্থা ছিল।
হেলাতলায় নববর্ষ উপলক্ষে ১লা বৈশাখ আরো একটা হেলার সন্ধান পাওয়া যায়। বহু আগে থেকে এখানে এ মেলা হোত। মেলা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে বর্তমান শতকের গোড়ায় হেলাতলা মোড়ের নবাগত সোনা ও সুদের ব্যবসায়ী প্রতাপ চৌধুরী (পোদ্দার) চড়ক পুজো ও মেলার পুনঃ প্রবর্তন করেন।
হেলাতলার পূর্বদিকে ও মির্জাপুর মাঠের উত্তরে নদীর পাড়ে কালীবাড়ী বেশ পুরাতন। এই কালীবাড়ী কখন -কারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ও কোন জনবসতির কালীমন্দির ছিল তার কোন তথ্য বা এ সম্পর্কে কোন জনশ্রুতি শোনা যায় না। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এ কালীবাড়ী এক সময়ের সমৃদ্ধ জনবসতি হেলাতলার কালীমন্দির। হেলাতলার বিবর্তনের সাথে কালীবাড়ীর সম্পর্ক নিবিড়। পররর্তী সময়ে এ এলাকার নতুন জনবসতি গড়ে ওঠার সাথে মন্দিরটা আবার প্রাণ ফিরে পায়। যতদূর জানা যায় গত শতকের মাঝামাঝি সেনহাটীর মহাদেব ঠাকুর মন্দিরের সেবাইত নিযুক্ত হন। যাই হোক বর্তমান কালীবাড়ীর মূল মন্দির বর্তমান শতকের গোড়ার দিকে নদীর ভাঙ্গনে নদী গর্ভস্থ হবার উপক্রম হলে পূর্বের মন্দিরের দক্ষিণে ডাঃ ফনি রায়, রূপলাল নাগ, নগেন সেন (উকিল, কংগ্রেস নেতা), বসন্ত হালদার ও প্রসন্ন মিত্রের উদ্যোগে নতুন মন্দির নির্মিত হয়। বর্তমান মন্দির ও নদীর ভাঙ্গনে হুমকির সম্মুখীন। উল্লেখ্য স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কয়েকটা পাথরের মুর্তি এ মন্দিরে সংরক্ষিত ছিল।
মির্জাপুর মাঠের লাগোয়া জনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলোর সাথে মির্জাপুরের বিবর্তনের সম্পর্ক নিবিড়। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী অনেক অবলুপ্ত বসতির নাম ও জনশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দেয় প্রাচীন জনপদের। মহকুমা সদর থেকে জেলা সদরে রূপান্তরিত হওয়ার পর মির্জাপুর মাঠে নতুন করে গড়ে ওঠা বসতির জায়গায় সঙ্ক লান হয়নি। তখন পাশের গ্রামগুলোও নতুন বসতিতে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, কিন্তু অবলুপ্ত জনপদগুলো জনশ্রুতি হিসাবে রয়ে যায়।
