Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    শালঘেরির সীমানায় – সমরেশ বসু

    সমরেশ বসু এক পাতা গল্প321 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৪. চা পাবার আগে

    ঘুম ভেঙে চা পাবার আগেই গাঁয়ের কয়েকজন ছেলে এবং স্কুলের একজন মাস্টারমশাই এলেন। তাঁদের কাছে আমায় স্বীকার করতে হল, আজ খেলার মাঠে সংবর্ধনা সভায় আমি যাব।

    তারা চলে যাবার পর চা খাওয়ার সময় পিসি জিজ্ঞেস করলেন, তুই কি এখন বার হবি টুপান?

    –হ্যাঁ, পিসি। এক বার উপীনকাকার বাড়ি যাব।

    তা হলে আজ দুপুরে আমার একটু কাজ আছে।

    –কী কাজ পিসি।

    সীতানাথ যে সব কাগজপত্তর রেখে গেছে সেগুলান তোকে দিতে লাগবে না?

    সীতানাথ আমার বাবার নাম। কাগজপত্র মানে, বাবা তাঁর সঞ্চয়ের যে সব বিলি ব্যবস্থা করে গেছেন, তারই হিসেব-নিকেশ। বিলি ব্যবস্থা বলা ভুল। আমার জন্য কী সঞ্চয় তিনি রেখে গেছেন, তারই হিসেব আসলে। কী আছে না আছে, আমি কিছুই জানি না। জমির একটি মোটামুটি হিসেব জানি। জেলে বসে চিঠিপত্রে যতটুকু জানতে পেরেছি, দু-একটি মামলা মোকদ্দমা এখনও বোধ হয় ঝুলছে। কিংবা ডিসমিস হয়ে গেছে এর মধ্যে। এখন অঘোর জ্যাঠাই প্রায় সব দেখাশোনা করেন। এবার সব দায়িত্ব হয়তো তিনি আমার ওপর চাপাতে চাইবেন।

    কুসুম রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করল, কাল কেমন খেলে টোপনদা?

    বললাম, খুব ভাল।

    কিন্তু আশ্চর্য। পিসি আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।

    জামাকাপড় পরে বেরুতে যাচ্ছি। দেখলাম, কুসুম বারান্দায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। কুসুমের বড় বড় চোখ দুটিতে এখনও শিশুর বিস্ময়। কিন্তু করুণ।

    জিজ্ঞেস করলাম, কী রে?

    কুসুম হেসে চুপি চুপি বলল, আজ একটু চা খেয়েছি।

    -ও, তাই এখানে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছ? কিন্তু, অমন খালি গায়ে রয়েছিস কেন শীতের মধ্যে? জামা নেই?

    আছে। ধুয়ে দিয়েছি।

    তার মানে একটিই আছে। পিসি বোধ হয় প্রাণ ধরে, আমারই ফিরে আসার ভয়ে দিতে পারেননি। এখনও পারবেন না হয়তো।

    আমি বেরিয়ে গেলাম। পুবপাড়ায় অনেকের সঙ্গে দেখা হল উপীনকাকার বাড়ি যাবার পথে। সকলের সঙ্গেই কথা বলতে হল।

    সামনেই তামাইয়ের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। আমার মাথার উপরে পুবপাড়ার সেই হেঁতাল গাছ। জলা বিল অঞ্চলের হেঁতাল গাছটি কী করে এই পাথুরে মাটিতে জীবনধারণ করে বেঁচে রয়েছে জানিনে। সাধারণত উঁচু দেশের কঠিন মৃত্তিকায় এ গাছ দেখা যায় না। গ্রামের লোকে বলে, মামনসার থান। দেবী এখানে অধিষ্ঠিত আছেন। আছেন কি না, সে খবর জানিনে। তবে ছোট একটি পাথর আছে। কেউ কেউ জল দেয়। সাপে কামড়ালে অব্যর্থ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য এই হেঁতাল গাছের গোড়ায় তাকে আনতে দেখেছি। কিন্তু কোনওদিন মৃত্যুবরাধ হতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সাপ ধরা যাদের কাজ, সেই সাপুড়েরা হেঁতাল গাছটিকে নমস্কার না করে যায় না। শুধু শালঘেরির সাপুড়ে নয়, বাইরে থেকে যারা আসে, তারাও। অনেক সময় দেখেছি, হেঁতালের সরু সরু ডাল কেটে নিয়ে যায় সাপুড়ে বেদেরা। বলে, এ ডাল হাতে থাকলে, যত বিষাক্ত ভয়ংকর সাপই হোক, দুরে পালিয়ে যাবে। অতএব, সাপুড়ে মাত্রেই হেঁতালের ডাল কাছে রাখে। তা ছাড়া হেঁতালের ফুলের গর্ভে যে ছোট একটি ফল ধরে, তাকে সাপুড়েরা বলে শিবফল। ফলটির বিশেষত্ব হল, দেখায় যেন একটি ক্ষুদ্র শিবলিঙ্গের মতো। সাপুড়েরা সেই ফুলের বড় কাঙাল। কেন জানিনে।

    আশেপাশে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন শিবমন্দির। ছোট একটি কাঁকুরে মাঠ পেরোলেই উপীনকাকার বাড়ি। এই হেঁতালের তলায় দাঁড়িয়ে তামাইয়ের ওপারে শালবনের আকাশে অনেক সূর্য ওঠা, চাঁদ ওঠা দেখেছি। তখন আমার ভুবন জুড়ে, মহাকালের ধ্বনিতে শুধু রক্ত ছিটিয়ে দেবার কলকলোচ্ছল নিমন্ত্রণের বাণী বেজেছে। অথিরবিজুরি ঝলক আমার প্রাণের শিরায় উপশিরায়। গোপন রাখতে পারি কি না পারি, সেই আনন্দে, সেই ভয়ে, আমার সব কথাকে আমি এক ফুটোন্মুখ ফুলের পাপড়িতে চেপে দিয়েছি।

    তখন ওই শালবনের দুর্নিরীক্ষ্য জটলায় অরণ্যের কী মন্ত্রণাসভা বসেছিল, আমি জানিনে।

    কিন্তু এটা জানি, আমার চোখের তৃষ্ণা বুক অবধি গিয়ে পৌঁছেছিল তখন। আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ ফেরাতে সময় চলে যেত। বুকের মধ্যে দারুণ দহন, পরম তৃষ্ণা, আমার স্বাভাবিক আচরণকে বদলিয়ে দিত। খেয়াল করিনি, উপীনকাকা কিংবা কাকিমার চোখে কখনও অজান্তে বে-আবরু হয়ে পড়েছি কি না। যদিও তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন্ন যাত্রার কাল পর্যন্ত আমার প্রাণের আবরু চোখের ঢাকা খুলে বারে বারে দাঁড়িয়েছি ঝিনুকের সামনে। তখন যেন এক অদৃশ্য ঘরকাটা দাগের মধ্যে ঘুরে মরছি আমি আর ঝিনুক। অচেনা সূত্রে সূত্রে, ভাগ্যের কড়ি চালায়, কাছে আসি, দুরে যাই, চোখে চোখে দেখি। কিন্তু সেই দাগকাটা ঘরে আমাদের মনে মনে বসত।

    তারপরেই তো হেঁতাল তলার আহ্বান পেলাম একদিন। সন্ধ্যাবেলা, বুঝি চৈত্র মাস। উপীনকাকা বাইরে বেরিয়েছিলেন একটু কাজে। কাকিমা রান্নাঘরে। আমি ঠাকমার কাছে বসেছিলাম দাওয়ায়। ঝিনুক শোবার ঘর থেকে রান্নাঘরে, রান্নাঘর থেকে উঠোনে, কাজে কিংবা অকাজেই ঘুরে ফিরছিল। এস্ত চকিত হয়ে বারে বারে ঝিনুককেই খুঁজে ফিরছিল আমার চোখ। অথচ ঝিনুক যেন আমাকে দেখতে পাচ্ছিল না। সে যেন ঘরকন্নাতেই ব্যস্ত হয়ে ফিরছিল।

    সহসা এক সময় আমার চোখে পড়েছিল, তামাইয়ের ওপারে শালবনের মাথায় চাঁদ। জ্যোৎস্না পড়েছে উঠোনে। আর উঠোনের ওপারে বাইরের দরজার কোল আঁধারে যেন কে দাঁড়িয়ে। আমি চোখ বিস্ফারিত করে দেখবার চেষ্টা করলাম, কে?

    বুঝে ওঠবার আগেই, দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল সেই মূর্তি। আমার বুকের মধ্যে হঠাৎ যেন রক্ত চলকে উঠল। কী মনে হল, জানিনে। মুহূর্তে আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঠাকমার হয়তো বসে বসে চোখ বুজে এসেছিল। আমি নিঃশব্দ পায়ে বাড়ির বাইরে চলে গেলাম। চিনতে ভুল করিনি। দেখলাম, ঝিনুক মন্থর পায়ে হেঁতাল তলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

    কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখলাম, হেঁতালের ছায়ান্ধকারে ঝিনুক অদৃশ্য হয়ে গেল। স্থির হয়ে, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আমি সেইদিকেই এগিয়ে গেলাম পায়ে পায়ে। কাছে গিয়ে দেখলাম, হেঁতালের গায়ে হেলান দিয়ে, ঝিনুক শালবনের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার দিকে সে ফিরে তাকাল না। ঠোঁট দুটি যেন আবহমানকাল ধরে অনড়, আবদ্ধ। চুল বাঁধা গা ধোয়া পরিচ্ছন্নতার ওপরে, জ্যোৎস্না ও হেঁতালের ছায়ায় ঝিনুককে যেন কেমন সুদূর অবাস্তব মনে হল সহসা।

    একটা তীব্র আবেগে আমার স্বর কেঁপে গেল। আমি ডাকলাম, ঝিনুক।

    ঝিনুক চকিতে এক বার চোখের পাতা তুলে আমার দিকে দেখল। মনে হল, এক বার যেন ওর ঠোঁটের কোণ কাঁপল। আমি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর ঝিনুক নিজেই সহসা আমার একটি হাত ধরল। আমি দুহাত দিয়ে ঝিনুকের সেই হাতটি তুলে নিলাম। কিন্তু স্থির হতে পারলাম না। হাতটি আমার বুকের ওপর টেনে নিলাম।

    ঝিনুক আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল। আমি ডাকতে চাইলাম। গলায় স্বর ফুটল না। ভাবলাম ঝিনুক কিছু বলবে। কিন্তু কিছুই বলল না ও। কেবল ওর একটি হাতের আঙুল দিয়ে আমার গাল স্পর্শ করল। আমি ওকে দুহাতে বেষ্টন করলাম।

    হঠাৎ একটা শব্দে চমকে উঠলাম। প্রায় দিগম্বর, কালো কুচকুচে একটি বৃদ্ধ আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

    আমি যেন শিউরে উঠলাম। একটা সাপ যেন আমার সারা গায়ে কিলবিলিয়ে উঠল। বললাম, কে?

    –এজ্ঞে, আমি জগা বাউরি। আপনাকে চিনতে লারলাম।

    যেন সেই মুহূর্তেই আবিষ্কার করলাম, আমি হেঁতাল তলায় দাঁড়িয়ে। স্বপ্নাচ্ছন্নতা কেটে গেল। উপীনকাকার বাড়ি যেতে হবে আমাকে। কিন্তু জগা বাউরিকে আমিও চিনতে পারলাম না। বললাম, চিনবে না, নতুন এসেছি।

    –অ। তাই মনে হল বটে, শালঘেরিতে লতুন মুখ। কুথা যাবেন?

    কাছেই।

    –অ। আচ্ছা, নমস্কার বাবু।

    চলে গেল সে।

    আর শালবনের দিকে তাকিয়ে সহসা মনে হল, আজ সেই নিমন্ত্রণের ডাক নেই। আমার চোখের কাজল কে মুছিয়ে দিয়ে গেছে। ঘুম ভাঙা চমকে দেখছি, এ অরণ্য আমার সেই সৃষ্টি নয়। ও আমার খেলার ঘরের সাধ মেটাতে প্রান্তর জুড়ে নেই। শিকড় ওর অনেক গভীরে। অনেক বয়সের আদিম রেখা ও জটিলতার রহস্য ওর অন্ধকারে। যা আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে।

    আজ তবু শালবনের ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে, এই হেঁতালগাছের তলায় আমার রক্তের কপাটে ধাক্কা শুনি। সামনেই ওই বিস্তীর্ণ পাথুরে প্রান্তরে আমার কথারা সব বুঝি বীজ হয়ে ছিল। সূর্যোদয়ে তারা যেন বিষাক্ত ফল আর কাঁটা ঝোপে অঙ্কুরিত হয়ে উঠেছে।

    আমি ফিরে গেলাম হেঁতালগাছের তলা থেকে। উপীনকাকার বাড়ির দরজা খোলা। ঢুকেই দেখলাম, মাটির দাওয়ায়, চৌকির ওপরে গালে হাত দিয়ে রমু বই পড়ছে। বছর চোদ্দো বয়স। সে অমুর পরেই। উপীনকাকার মা বুড়ি ঠাকমা বসে আছেন উঠোনের এক পাশে রোদে। চোখে দেখতে পান না ভাল। কোলের ওপর একটি লাঠি। সামনে বড়ি শুকোচ্ছে। ঠাকমার উদ্দেশ্য, রোদ পোহানো এবং বড়ি পাহারা দেওয়া।

    রমু আমার দিকে খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখে ওর চেনা অচেনার আলোছায়া। তারপরেই তড়াং করে লাফিয়ে উঠে বলল, টোপনদা না?

    বললাম, চিনতে পারছিস?

    শিখিয়ে দিতে হয় না। রমু এসে পায়ে হাত দিল। কিন্তু দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ও অমুর মতো ঠিক শান্ত প্রকৃতির নয়। হাতে পায়েও অমুর চেয়ে শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে। দু চোখে চঞ্চল দৃষ্টি।

    বলল, জানি, আপনি এসেছেন। আজ তো আপনি বক্তৃতা করবেন মাঠে।

    বললাম, বক্তৃতা করব না। বাড়ি বাড়ি যেতে পারিনে, তাই সকলের সঙ্গে মাঠেই দেখা করব।

    রমু বলল, তা কেন? আজ যে মিটিং হবে।

    হেসে বললাম, ওই হল আর কী।

    ঠাকমা ইতিমধ্যে বার দুয়েক কে, কে করেছেন। ফিরে বললাম, আমি টোপন, ঠাকমা।

    –টোপন? উত্তরপাড়ার সীতুর ছেলে টোপান?

    সীতা মানে সীতানাথ, আমার বাবা।

    ঠাকমার পায়ে হাত দিয়ে বললাম, হ্যাঁ ঠাকমা, চিনতে পারছ না?

    ঠাকমা মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ছাড়া পেয়েছিস? যমেরা ছেড়েছে তোকে? জয় মা কালী, জয় মা শালেশ্বরী। ফিরে এসেছিস ভাই? সীতুটা থাকতে থাকতে যদি আসতিস। বউমা, অ বউমা!

    রমুও ততক্ষণ কাকিমাকে ডাকতে গেছে। আমি নিজেই ঘরের দিকে গেলাম। কাকিমা বেরিয়ে আসছিলেন। সাদা থানটা যেন আমার দু চোখে ছুঁচের মতো বিধল। একেবারে নিরাভরণা কাকিমা। আমাকে দেখে তাঁর খুব উচ্ছ্বাস নেই। বিরূপতাও নেই।

    আমি প্রণাম করলাম। মাথায় হাত দিয়ে, আঙুলটি ঠোঁটে ছোঁয়ালেন কাকিমা। আমার হাত ধরে চৌকিতে বসিয়ে দিয়ে বললেন, বস।

    কাকিমার রং কালো হয়ে গেছে। ঘোমটার পাশ থেকে বেরিয়ে-পড়া চুলে সাদার লক্ষণ টের পাওয়া যায় না। তবে জট পাকিয়েছে। বললেন, ঝিনুকের বাবা

    –শুনেছি কাকিমা। জেলেই শুনেছি। উপীনকাকা—

    কথার মাঝখানেই কাকিমা বলে উঠলেন, ওই, বলে কে বাবা? যিনি চলে যান সংসার থেকে, তিনি মনে করেন, খুব একটা কাজের কাজ করেছি। তা মনে করুন, আমি আর কী করব।

    আমার বাকরুদ্ধ হল। মৃত স্বামীর প্রতি এমন অভিমান আমি আর কোনওদিন দেখিনি। চুপ করে রইলাম।

    কাকিমা জেবড়ে বসলেন মাটিতে। জেলে থাকা, শরীর-গতিকের কথা জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। চা খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু রান্নার জন্যে কাকিমাকে উঠতে হবে, সেই ভেবে বললাম, খাব না।

    তবু তিনি নিরস্ত হলেন না। রমুকে বললেন একটু জল গরম করতে। বুঝলাম, রমু কাকিমাকে রান্নাবান্নায়ও সাহায্য করে।

    কাকিমা হঠাৎ বললেন, ভবেন ঝিনুককে বিয়ে করেছে, জানিস টোপন?

    –জানি কাকিমা।

    –তোর কাকার কিন্তু বাবা খুবই অস্বস্তি ছিল। তা উনি কী করবেন? মেয়েও মত দিল। মেয়ের মত ছাড়া কোনওদিন তো উনি কিছু করতে চাননি।

    বলবার আগেই আমি আন্দাজ করেছিলাম, ঝিনুকের আপত্তি উপেক্ষা করে, কোনও কাজ তাকে দিয়ে করানো সম্ভব নয়। উপীনকাকার দ্বারা তো একেবারেই তা অসম্ভব ছিল। কিন্তু কাকিমার মুখ থেকে সোজাসুজি কথাটা শুনে, আবার নতুন করে একটা তীক্ষ্ণ বিদ্ধ কষ্ট ও বিস্ময়ে হঠাৎ কথা বলতে পারলাম না। কী ভাবে সম্মতি দিয়েছিল ঝিনুক? কথা বলে? না, নিঃশব্দে ঘাড় নেড়ে? তার মনের মধ্যে কী ছিল তখন? অতীতের সেই দিনগুলি, সেই বছরগুলি, ওর মনের কোথায়, কী ভাবে অবস্থান করছিল?

    নিঃশব্দ প্রশ্নগুলি যেন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যেতে লাগল। একটা কঠিন পাথরে গিয়ে আঘাত খেয়ে, মুখ থুবড়ে, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃতের মতো নিশ্চুপ হয়ে গেল।

    তাড়াতাড়ি বললাম, ভালই হয়েছে কাকিমা।

    তা জানি না বাবা। সংসারে কত কী ঘটে। সব কি বুঝি, না জানি? কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল সব তখন। আমি বলেছিলাম, একী শুনছি ঝিনুক। ভবেন নাকি তোকে বিয়ে করতে চায়? তোর বাবাও নাকি রাজি হয়ে গেছে? বললে, হ্যাঁ। আমি বললাম, কী রকম? ঝিনুক বললে, তা জানি না মা। বাবা বললে, একজনের কোনও খবর নেই, কী করব, বুঝি না। তোর যদি অমত না থাকে– আমি বললাম, তোমার যা ইচ্ছা। তা ছাড়া আমার আর কী হবে মা? বোঝ, আমি কি তা বলেছি? কী জানি বাবা!

    আমি তাড়াতাড়ি বললাম, এ সব থাক কাকিমা। ওরা দুজনেই আমার আপন। কাল রাতে ঝিনুকের বাড়িতে খেয়েও এসেছি। আপনি উপীনকাকার কথা বলুন। কী হয়েছিল ওঁর?

    কাকিমা বললেন, সেই তো বলছি টোপন। আমি কি কিছু বুঝি? গত বছর এমন সময়ে হঠাৎ ঠাণ্ডা লাগল। বুকে সর্দি বসে গেল। এক সপ্তাহের মধ্যেই, দৌড়, দৌড়, দে দৌড় করে পালাল। কী বুঝব, কী জানব, বল। এদের সবই এরকম।

    এদের বলতে বুঝি কাকিমা ঝিনুকের কথাও বললেন। যাদের কোনও কিছুই তিনি বুঝতে পারেননি। কারণ, কোনও ব্যাপারটাই কাকিমাকে নোটিশ দিয়ে আসেনি। যাদের কাছে এসেছিল, তারাই কি নোটিশ পেয়েছিল? কে জানে।

    রমু ডাকল, মা, জল গরম করেছি।

    যাই।

    কাকিমা উঠে বললেন, বস টোপন, চা করে নিয়ে আসি। বলে চলে গেলেন। আমি ঘরের দিকে চোখ তুললাম। অবস্থা এমন কিছু ভাল ছিল না উপীনকাকার। কিন্তু রুচি ছিল। দুটি আলমারি ভরতি বই। টেবিলেও থরে থরে বই সাজানো। মাটির দেয়ালে গান্ধীজি, রবীন্দ্রনাথ আর রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ছবি। তামাই সভ্যতা আবিষ্কারের বীজ উপীনকাকাই প্রথম আমার মধ্যে রোপণ করেছিলেন।

    এ ঘর একসময়ে ঝিনুকের খবরদারিতেই থাকত। যদিও ও খুব গোছালো নয়। তবু উপীনকাকার প্রয়োজনে যখন যেটার খোঁজ পড়ত, ঝিনুকই এগিয়ে দিতে পারত।

    উঠে টেবিলের কাছে যেতে গিয়ে, পাশের ঘরের দিকে নজর পড়ল। ওটা ঝিনুকের এক্তিয়ারে ছিল। ওই ঘরটিই বড়। কাকিমা ঝিনুকদের নিয়ে ওঘরে শুতেন। উপীনকাকা এ ঘরে। উপীনকাকার ঘরের সংলগ্ন, বারান্দার পাশের ঘরটি ঠাকমার। বসে আড্ডা দেবার জায়গা ছিল, মাটির বারান্দায় চৌকির ওপর। যেটা আজও ঠিক পাতা আছে।

    আলমারির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। অধিকাংশ দেশি-বিদেশি ইতিহাসের বই। কিছু প্রত্ন-স্থপতি বিদ্যার বইও আছে।

    কাকিমা রান্নাঘর থেকে বললেন, মিষ্টি খেয়ে তো চা ভাল লাগবে না টোপন। ঝাল দিয়ে মুড়ি খাবি?

    আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, বাড়ি থেকে এইমাত্র খেয়ে এসেছি কাকিমা। আজ একটু চা দিন শুধু।

    চা নিয়ে এসে আবার বসলেন। আমি অমুরমুর পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করলাম। চা খাওয়ার পর কাকিমা হঠাৎ বললেন, টোপন, ফিরে যখন এসেছিস, একটা কাজ করিস তো বাবা।

    বলুন।

    মাঝে মাঝে এসে, আলমারির বইগুলোন একটু পড়িস। ওগুলোন আলমারিতে যে একেবারে দম চাপা হয়ে রইল।

    যেন উপীনকাকাকেই সেখানে রুদ্ধ থাকতে দেখেন কাকিমা। প্রয়োজনে কেউ এসে একটু মুক্তি দিলে তিনিও বোধ হয় একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।

    বললাম, আসব কাকিমা। আমার নিজের দরকারেই আসব।

    কিন্তু এ কাকিমা সে কাকিমা নন। সেই শান্ত পরিশ্রমী, উপীনকাকার আওতার বাতাসে তাল দিয়ে ফেরা চিরকালের লজ্জাবতী প্রেমিকা নন। ইনি উদাসিনী, বিবাগিনী। তবু রুদ্ধ অভিমান বয়ে বেড়াচ্ছেন যেন।

    আমার ভবিষ্যৎ কাজের কথা শুনে বললেন কাকিমা, উনি-ই তোর মাথাটা খারাপ করে গেছেন। এখন কি খালি শাবল কোদাল নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরবি নাকি?

    বললাম, উপীনকাকার সে ইচ্ছে ছিল। আমার নিজেরও সেই ইচ্ছে।

    এমন সময় বাইরে ইন্দিরের গলা শোনা গেল, কখন আসব তালে বড় বউদিদি?

    ঝিনুকের গলা শোনা গেল, দুপুরে খেয়ে-দেয়ে এসো।

    তারপরেই উঠোনে ঠাকমার গলা শোনা গেল, ঝিনকি এলি নাকি লো?

    –হ্যাঁ ঠাকমা। তোমার কোমর ব্যথা কেমন আছে?

    –আর ভাই কোমর ব্যথা। খালি কনকনাচ্ছে। ভবেন কোথা?

    –এই স্কুলে বেরিয়ে গেল।

    বোঝা যায়, ঝিনুক প্রায়ই আসে। প্রায়ই আসার বাধা যেটুকু, সেটুকুও দিল্লি গিয়ে বসে আছে। শাশুড়ি থাকলে বাড়ির বউয়ের যখন তখন বাপের বাড়ি আসা চলে না। ভবেনের দিক থেকে কোনও প্রশ্নই নেই নিশ্চয়।

    ঠাকমা বললেন, ঘরে দেখগে যা আজ কে এসেছে। নতুন মানুষ এসেছে বাড়িতে।

    তার জবাবে কোনও প্রশ্ন শোনা গেল না ঝিনুকের গলায়। কয়েকটা মুহূর্ত যেন মূছাপ্রাপ্ত নিঝুমতায় কেটে গেল।

    কিন্তু আজ এমন সময়েই ঠিক এল ঝিনুক? এ কি শুধু দৈবের যোগাযোগ? কাকিমাও কান পেতে ছিলেন বাইরের কথাবার্তায়।

    ঝিনুক আসায় যেন কোথায় একটি আপত্তির ইঙ্গিত পাওয়া গেল কাকিমার উৎকর্ণ মুখের ভাবে। তিনি ডাকলেন, ঝিনুক!

    কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।

    আবার ডাকলেন, ও ঝিনুক!

    ঠিক পাশের ঘর থেকেই ঝিনুকের গলা পাওয়া গেল, কী বলছ মা।

    ঝিনুক রান্নাঘরের পাশ দিয়ে, অন্য দরজা দিয়ে এসে পাশের ঘরে ঢুকেছে।

    কাকিমা বললেন, আবার এলি কী করতে শুধু শুধু?

    ঝিনুকের কোনও জবাব নেই।

    কাকিমা আমার দিকে ফিরে বললেন, দেখ দিকি টোপন, ওর শাশুড়ি এরকম বাপের বাড়ি আসা পছন্দ করে না, তবু আসবে। সে এখানে না থাকলে কী হবে, দিল্লিতে বসে সব সংবাদ পায়। ভাবে, মা-ই মেয়েকে ডেকে ডেকে পাঠায়। এ বাড়িতে আর আমি কী করতে ডাকব। বাপ থাকতে আসতিস, সে একটা কথা ছিল। আমার কাছে আর এসে কী হবে।

    আশ্চর্য! কাকিমা আগে এত কথা বলতেন না। আর এখন যাই বলেন, সব কথার নদী উপনদী শেষ পর্যন্ত একই সাগরে গিয়ে পড়ে। উপীনকাকার প্রসঙ্গ ছাড়া কথা শেষ হয় না।

    আর ঝিনুককেও আসতে বারণ যতটা শ্বশুরবাড়ির আপত্তিতে, ততটা নিজের জন্য নয়। আসলে সেটাও তাঁর মান অভিমানের বিষয়।

    এ বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই। কিন্তু আমি বুঝি নির্লজ্জ। যে মন আমার ছিল দুঃস্বপ্নে আচ্ছন্ন, চিররহস্যের দরজায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে, আমার সেই মনে রক্তধারা সহসা নাচের ছন্দ পেল। আশ্চর্য, সব যেন এমনি অবুঝ। সে নাচে যে শুধু ত্রাসের কলরোল! মনে হল, পুবপাড়ার আকাশের রং গেল বদলে। তবু তামাইয়ের ওপারে, এখন এই প্রাক দুপুরের স্তব্ধ শালবীথির ছায়া যেন হঠাৎ ডাক দিয়ে উঠল আমাকে। স্তব্ধ প্রাণ উঠল থরথরিয়ে। কিন্তু তাতে সেই হাসির ঝংকার যে বাজে না। মরণ যেন চুপি চুপি, নিঃশব্দে ফিরছে সেখানে। পরাজয় আর অপমানের গ্লানি এখুনি গ্রাস করবে আমাকে। পালাই, পালিয়ে যাই।

    আমি বিদায় নিয়ে উঠতে চাইলাম। পারলাম না। ঝিনুক এসে এ ঘরে ঢুকল। এসে দাঁড়াল বইয়ের আলমারির কাছে। সহজভাবেই জিজ্ঞেস করল, কখন এলে টোপনদা।

    বললাম, এই খানিকক্ষণ আগে।

    স্নান করেনি ঝিনুক। কাল রাতের খোঁপার বাঁধন এখন বেণী হয়ে লুটোচ্ছে। শুধু কালকের শাড়িটি বদলে একটি লালপাড় সাদা শাড়ি পরে এসেছে। জামাটিও সাদা। আলমারির কাছে ওর ছায়া পড়ে ঘরের রংও যেন একটু সাদা দেখাচ্ছে।

    আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ভব কাল ঠিকমতো বাড়ি ফিরেছিল?

    ঝিনুক বলল, হ্যাঁ।

    আমিই আবার কাকিমার দিকে ফিরে বললাম, ওপারের শালবনে নাকি বাঘের উৎপাত হচ্ছে। এপারেও পা বাড়িয়েছিল। কাল তাই ভব একটা লোহার ডাণ্ডা নিয়ে বেরিয়েছিল।

    কাকিমা বললেন, হ্যাঁ, বাঘ শালঘেরিতেও কয়েক দিন ঢুকেছিল শুনেছি। শালেশ্বরীতলার ওখানে মুচিপাড়ায় হামলা করে গেছে। তোদের পাড়াতেও তো ঢুকেছিল, না ঝিনুক?

    ঝিনুক বলল, হ্যাঁ। কিন্তু সে তো অনেক দিন হল। আর তো কিছু শুনিনি।

    আমি বললাম, তবু সাবধানে থাকা উচিত। এক বার যখন হামলা করে গেছে, খিদে পেলে আবার আসতে কতক্ষণ।

    ঝিনুক বলল, তা বটে, বিশ্বাস নেই। কিন্তু লোহার ডাণ্ডাটা ও কখন নিয়েছিল, দেখতে পাইনি তো।

    কাকিমা উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন, চান করে এসেছিস নাকি ঝিনুক?

    না।

    কথা বল টোপনের সঙ্গে। তারপরে চান করতে যাবি। জেলেপাড়ার বউটা আজ আর একটু মাছ দিয়ে গেল না এখনও। কী দিয়ে যে খাবি।

    বলতে বলতে তিনি বেরিয়ে গেলেন। ডাকলেন, রমু, ও রমু।

    ঝিনুক বলল, রমু যে স্কুলে চলে গেল এখুনি। ওর সঙ্গে আমার পথে দেখা হয়েছে।

    চলে গেল? ধান বেচার টাকাগুলোন আটকে রেখে দিল বিশু। ওর স্কুলের মাইনে দেয়া হল না। আজ। ঘ্যানঘ্যান করছিল সকাল থেকে।

    কাকিমা চুপ করলেন। বোধ হয় রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলেন।

    ঝিনুক আলমারির দিক থেকে মুখ ফেরাল। কোনও ভূমিকা না করেই বলল, তুমি আজ এখানে আসতে পার, সেই ভেবেই এসেছি টোপনদা।

    কখনও কখনও সত্যি কথা সোজা করে বললে চমক লাগে।

    মনে হয়, তাতে সত্যের মর্যাদা যতটুকু থাকে, তার থেকে বেশি দুর্বিনয় বে-আবরু হয়ে পড়ে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

    –আসতে নেই?

    প্রায়ই তো সংসার ফেলে চলে আস শুনছি।

    ঝিনুক চুপ করে রইল। ওর মুখ কোনওদিনই ভাবলেশহীন নয়। কিন্তু ভাব চাপতে পারে খুব। দেখলাম, মুখ গম্ভীর হচ্ছে ক্রমেই। মুখের ছায়ার সঙ্গে তাল রেখেই যেন কানের সোনার ফুলে রক্তাভ পাথরে দ্যুতি আরও বেশি ঝলকাচ্ছে। ওর দেহের অনাবৃত অংশে সেই রক্তমৃত্তিকায় চলকে যাওয়া রোদের বেলা বাড়ছে যেন। তাতে চোখ রাখা যায় না।

    ঝিনুক বলল, কাল রাতে দুই বন্ধুতে কী কথা হল?

    আমি বললাম, বন্ধুরা যেমন বলে। অর্থহীন, অনেক কথা।

    হেসে হালকাভাবেই বললাম আমি। কিন্তু ঝিনুকের গাম্ভীর্য তাতে টলল না। বলল, শুনতে পারি একটু?

    ঝিনুকের মুখ দেখে কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু সন্দেহ হল, গতকাল রাত্রে ওর সঙ্গে ভবেনের কিছু কথা হয়ে থাকবে বা। অথচ আমি তো এ সবের মধ্যে নিজেকে জড়াতে চাইনি। ভিতরে ভিতরে একটি দ্বিধাযুক্ত পীড়া অনুভূত হলেও, প্রায় হেসেই জিজ্ঞেস করলাম, কেন, ভব কিছু বলেছে নাকি?

    না। তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাই।

    –কোন বিষয়ে?

    ঝিনুক চোখ তুলল। সেই চোখে অবিশ্বাসের ছায়া। বলল, ভেঙে বলতে হবে?

    হয়তো মুহূর্তে দুর্বল হয়ে পড়লাম। তাই মনের দ্বিধা এবং পীড়া আমাকে রুষ্ট ও বিমুখ করে তুলল। আমি শক্ত হবার চেষ্টা করলাম। বললাম, যে কথা বলাবলির কোনও মানে হয় না, তাই নিয়ে আর আলোচনা করতে আমার ইচ্ছে হয় না ঝিনুক।

    কী তোমার ইচ্ছে হয় টোপনদা?

    বিচিত্র প্রশ্ন। কী আমার ইচ্ছে হয়, তা কি সব নিজেই জানি। যদি জানতে পারি, তা কি ঝিনুককে বলা যায়?

    বললাম, ইচ্ছে হয়, তোমাকে আর ভবেনকে সুখী দেখতে।

    যদি তা না দেখতে পাও?

    তা হলে কষ্ট পাব। কারণ, ভবেনের তো কোনও দোষ নেই।

    –আমার দোষ আছে, এই তো?

    –না, তোমারই বা দোষ কী। দোষ কারুরই নেই।

    ঝিনুক ওর সেই টানা চোখের দূরবিসারী কটাক্ষচ্ছটায় আমার প্রতি রন্ধ্র খুঁজে দেখতে লাগল পুরনো দিনের মতো। ওর চেনা ঠোঁটে সেই চেনা হাসিটি দেখতে পেলাম, যে আমার সকল অন্ধকারের মধ্যে দূর আকাশের নিঃশব্দ হাউইয়ের মতো জ্বলে উঠেছে।

    বলল, টোপনদা, জেলে বসে একটি কাজ ভাল শিখেছ।

    কী?

    –মনে কুলুপকাটি আঁটতে শিখেছ খুব।

    ঠোঁটের ডগায় তীক্ষ্ণ তিক্ত বিদ্রূপ উপচে পড়তে চাইল, আমার এই হাট করে খোলা মনে আমি কুলুপ আঁটিনি। যে এঁটেছে সে-ই জানে, আমার অজান্তে সে এঁটে দিয়ে গেছে। চাবির খোঁজটুকুও আমার অজানা।

    কিন্তু সে বিদ্রুপের বিষক্রিয়া আমার দেখতে ইচ্ছে করে না। শুধু ভাবলাম, মনে কুলুপ আঁটতে পারছি কোথায়? যে কপাটের প্রতি রন্ধ্রে নিষ্টেপিষ্টে আগল বন্ধ করেছি, তার সব বাঁধন মড়মড়িয়ে ঝরঝরিয়ে যাচ্ছে।

    ঝিনুক আবার বলল, কিন্তু আমি তো অন্ধ হইনি এখনও। আমি যে তোমার সবই দেখতে পেলাম।

    আমি গম্ভীর হবার চেষ্টা করে বললাম, কী দেখতে পেলে ঝিনুক?

    ঝিনুক বলল, দেখতে পাচ্ছি, তুমি রাগ করেছ, মান করেছ, ভুলতে চাইছ। ঘেন্নাও বুঝি করতে চাও। করতে পারলে তুমি বেঁচে যাও।

    ঝিনুকের কথার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বিচার করতে পারলাম না। এখন আবার মনে হল, সহজ কথা খুব সহজ করে বললে বোধ হয় অসত্য বলে মনে হয়। কিন্তু এই একতরফা বিচারে, যুগপৎ একটি নিশ্বাস ও হাসি চাপতে পারলাম না।

    প্রতিবাদ করে বললাম, এই কি সব সত্য দেখতে পেলে?

    ঝিনুক আলমারির গা থেকে একটু সরে এল। দূরের ঝোড়ো শালবন থেকে যেন বাতাসে ভেসে এল ওর গলা, আর তোমার কষ্ট? টোপনদা, ঝিনুকের বড় সাহস তুমি জান। কিন্তু ও কথাটা বলতে আমার সাহস হয় না।

    আমার যেন নিশ্বাস আটকে গেল। ঝিনুক নীচের দিকে তাকিয়ে, বাসি আলতা-পরা পায়ের আঙুলে মাটি খুঁটতে লাগল। ওর এত ভয় আমি কখনও দেখিনি। তার স্বরে আমি এমন শালবনের বাতাসের হাহাকার কখনও পাইনি। আমারও যেন ভয় করতে লাগল।

    তাড়াতাড়ি বললাম, এ সব কথা থাক ঝিনুক।

    সে কথার কোনও জবাব না দিয়ে ঝিনুক কয়েক মুহূর্ত নিচু মুখে নিশ্ৰুপ হয়ে রইল। তারপর হঠাৎ মুখ তুলে বলল, ওঘরে যাবে টোপনদা?

    চমকে উঠলাম। ওঘরটায় যাবার সাহস আমার প্রথম থেকেই কম ছিল। সহসা জবাব দিতে পারলাম না।

    একটা সময় এসেছিল, যখন প্রাণে প্রাণে, রক্তে রক্তে একটা অন্ধ বেগের দাপাদাপি হুডোহুড়ি লেগেছিল। একদা জ্যোৎস্নাবিধৃত সন্ধ্যায় হেঁতালের তলায় তার শুরু হয়েছিল। তারপর থেকে এই লোক সংসারের সঙ্গে একটা লুকোচুরির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আমার আর ঝিনুকের। সেটা কতখানি গর্হিত হয়েছিল, এখনও তার সঠিক বিচারে আমি আনভাবী।

    তখন সন্ধ্যাবেলা এ ঘরে আলো জ্বলত, উপীনকাকা পড়াশোনা আলোচনা করতেন। কাকিমা থাকতেন রান্নাঘরে। বারান্দায় থাকতেন ঠাকমা, অমুরমুকে নিয়ে। এঘর থেকে পাশের ঘরে যাবার এক দেওয়াল, এক দরজা নয়। খড়ের ছাউনি, মাটির দেওয়ালের এই দুটি ঘরের মাঝখানে সরু একটি গলি আছে।

    সন্ধ্যাবেলায় সবখানে যখন আলো, তখন পাশের ঘরটা থাকত অন্ধকার। সে সময়ে ঝিনুকের থাকার কথা, হয় বারান্দায়, না হয় কাকিমার সাহায্যার্থে রান্নাঘরে। তাই ও থাকত। ওর সাড়া পাওয়া যেত। কিন্তু মাঝে মাঝে হঠাৎ ঝিনুকের কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যেত না। হয়তো তখন, উপীনকাকার মহেঞ্জোদারোর ধ্বনিত স্বপ্ন গুঞ্জরিত হত। আর আমি সহসা উকর্ণ হয়ে উঠতাম। পাঁচ হাজার বছর আগের সিন্ধু উপত্যকা থেকে, তামাই উপত্যকার শালঘেরির এই কুটিরে আসতাম ফিরে। বাইরে সাড়া-শব্দহীন ঝিনুকের অস্তিত্ব সহসা যেন অতি নিকটে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠত। স্তব্ধতার মধ্য থেকে একটি শব্দহীন আহ্বানে আমার বুকের রক্ত চলকে উঠত। পাশের ঘরের খোলা দরজার অন্ধকার যেন দুটি আয়ত চোখ মেলে তাকাত আমার দিকে। আমি পায়ে পায়ে যেতাম সেই অন্ধকার ঘরে। দ্রুত নিশ্বাসের স্থলিত শব্দ, একটি পরিচিত অস্পষ্ট গন্ধ অনুসরণ করে এগিয়ে যেতাম। তারপর দুটি থরোথরো রাত, আরও দুটি থরোথরো হাত আঁকড়ে ধরত। দুরন্ত কিন্তু ভীরু ইচ্ছাগুলি, পৃথিবীর সময় থেকে চুরি করা কয়েকটি মুহূর্তে, হাতের স্পর্শে ঝংকৃত হত। অস্থির চঞ্চলতায় তখন একটি বোবা অপূর্ণতাই আসলে কষ্ট হয়ে বাজত। ডাকতে চাইলেও ঠোঁট উচ্চারণে অসমর্থ হত। কিন্তু চুরি করা সময় আমাদের ভীরু আড়ষ্টতার মুখ চেয়ে থাকত না।

    সে সব প্রাত্যহিক না হলেও, এই লুকোচুরি প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারপরে দিনের বেলা যখন আমরা দুজনে এঘরে যেতাম, রাত্রের কথা মনে করে একটি হাসি উদ্বেল হয়ে উঠত আমাদের।

    আজ ঝিনুক কেন ডাকে। ওঘরে কেমন করে যাই। স্মৃতিচারণে ইচ্ছে নেই। সে অপ্রতিরোধ্য বেগে আসে। ভয়কে যে দূর করতে পারিনে।

    ঝিনুক এসে হাত ধরল আমার। বলল, এসো।

    মহাকালের অট্টহাসি শুনতে পেলাম আমি। তার চক্রপিষ্ট তারার আর্তনাদ আমার বুকে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় বিদ্ধ হল। ঝিনুক যেন একটি ভয়ংকর পরীক্ষায় হাত দিল। আমার সমস্ত সততা, সমাজবোধ, বন্ধুত্ব, অত্যন্ত অসহায় বিস্ময়ে, ব্যথায় ও ভয়ে চমকে উঠল। আমি ঝিনুকের হাত সরাবার জন্য হাত তুলতে উদ্যত হয়ে ডাকলাম, ঝিনুক!

    ঝিনুক যেন অত্যন্ত সহজে আমাকে আকর্ষণ করল। বলল, এসো টোপনদা, মা আসবে এ ঘরে।

    ঝিনুকের হাতে নিয়তির অমোঘ নির্দেশ ছিল কি না জানিনে। আমি সভয়ে বলে উঠলাম, ঝিনুক, কী একটা শুরু হবার ভয় লাগছে আমার।

    ঝিনুক বলল, শুরুর কথা বলছ কেন? সেকি আজ হয়েছে? এসো টোপনদা।

    এমন ভয়ংকর অসম্ভব কথা এত সহজে কেমন করে বলছে ঝিনুক? আমি উঠে দাঁড়াতে ঝিনুক আমার হাত ছাড়ল। পাশের ঘরে গেলাম। কাছে দাঁড়িয়ে ঝিনুক তাকাল আমার দিকে। দেখলাম, শালঘেরির রাত্রির আকাশে, কোন অতীত যুগে খসে-পড়া দুটি রহস্যময়ী তারা আমার সামনে। তার রোদ-রং শরীরে লালপাড় শাড়ির রক্তবন্ধনী ঢেউ দিয়ে ফিরছে। রৌদ্রাভা তার সাদা জামার আলোকোচ্ছাসে!

    আমি বললাম, ঝিনুক, সন্দেহ হয়, আমরা নিজেদের অপমান করছি।

    ঝিনুক তার এলানো আঁচল তুলে, সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিজেকে দেখিয়ে বলল, দেখো তো টোপনদা, অপমান কোথায়? আমার কোথায় অপমান বলো? সে অপমান কী?

    এ আহ্বানে আমাকে নতুন করে দেখতে হল ঝিনুককে। কে জানে এ শুধু আমার সেই সুখ-দুঃখের সেতু স্রষ্টা জীবনদেবতারই দেখাবার ভুল কিনা। দেখলাম, সামনে আমার উদার আকাশ, নীচে অরণ্যতল। সেখানে কয়েক কথা; পাথর চাপা মাটিতে কত কালের লিখন আঁকা, অনেক দাহনের অজানা ইতিহাস! যা প্রচ্ছন্ন রেখেছে মহাকাল, সে তো একজনের অগোচরে, আর একজনের আদিম গভীরে ঢাকা পড়ে থাকা অসমাপ্ত সৃষ্টির ব্যাকুলতা। কালের দাগে তত্ত্ব খুঁজতে গিয়ে আকাশ অরণ্যের এ অসীমকে আড়াল করা যায় কেমন করে? কারণ, এ দেখাটা তো শুধু সৃষ্টিকর্তা হয়ে দেখা নয়, সৃষ্টিকর্তা হয়ে দেখতে হয়।

    কিন্তু আমার যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। ভয়েই বুঝি স্বর রুদ্ধপ্রায়। দেখলাম, ঝিনুক মুখ তুলে দাঁড়িয়ে। ওর নাসারন্ধ্র স্ফুরিত। আবদ্ধ ঠোঁট জোর করে টিপে রেখেছে। আর ওর চোখ দুটি যেন প্রাণের সকল পরিচয় প্রকাশ করে হাট করে খোলা দরজার মতো।

    ঝিনুক বলল, তা হলে আমি কী করব টোপনদা?

    আমি রুদ্ধশ্বাস হয়ে ওকে থামবার জন্যে ডাকলাম, ঝিনুক!

    ঝিনুক থামল না। বলল, আমি তো জানি টোপনদা, তোমার ভেতরটা কেন কেন করে মরে যাচ্ছে। আমারও মরেছে, এখনও মরছে। কিন্তু কী বলতে হবে জানি না। মাঝে মাঝে কেবল মনে হয়, তুমি চলে গেলে, আমি যেন তোমার পিছু পিছু দৌড়চ্ছিলুম। তারপর তোমাকে যখন আর দেখতে পেলাম না, তখন যেদিকে পা গেল, সেদিকেই ছুটতে লাগলাম। টোপনদা, তখন মনে হল, কে যেন আমার সঙ্গ নিল। আমাকে ডাকল, আমাকে

    বলতে বলতে ঝিনুকের চোখ মুখ, গলার স্বর বদলে গেল। দ্রুত নিশ্বাস, অস্বাভাবিক চকিত চোখ, গলায় যেন জ্বর বিকার। আমি ওকে আবার থামাতে গেলাম। পারলাম না। কারণ, আমিও যেন উৎকর্ণ বিস্ময়ে ঝিনুকের কথাগুলি শুনছিলাম।

    ঝিনুক বলল, তারপরে হঠাৎ, একেবারে আচমকা তোমাকে দেখতে পেলাম। তোমার মনে আছে টোপনদা, তুমি চলে যাবার সময় বলেছিলাম, আমার ভয় করছে, ভীষণ ভয় করছে। ভয়টা আসলে তোমাকে ছেড়ে থাকার ভয়, যে জন্যে ছুটছিলাম। তারপরে কে যেন আমাকে ধরে ফেলল, সে ঠিক তোমার মতো করে আমাকে আদর করল। যেই করল, সেই আমি তোমাকে দেখতে পেলাম। দেখলাম, এখন তোমার যেমন চোখমুখের ভাব, এমনি ভাব করে তুমি আমার দিকে শিকের আড়াল থেকে তাকিয়ে রয়েছ। দেখতে পেলাম, আমি কোথায়! তৎক্ষণাৎ ছিটকে গেলাম। কিন্তু টোপনদা, স্বপ্নের কথা কি কখনও সত্যি হয়? এ যেন উদ্ভট স্বপ্নের মতো, কিন্তু এ কোনও জবাব নয়। বিশ্বাস অবিশ্বাসেরও কিছু নেই। তবে, এইটুকুই আমার জানা, এর বেশি কিছু জানি না।

    আমি সভয় বিস্ময়ে বলে উঠলাম, আর থাক, থাক ঝিনুক, তুমি চুপ করো।

    ঝিনুক চুপ করল। চুপ করে শান্ত স্বাভাবিক হতে চাইল। মুখ ফিরিয়ে নিল, কিন্তু চুপ করে থাকতে পারল না। বলল, আমি কী বলছি, আমি জানি না। আমাকে কেটে কেটে দেখো, আমি কিছুই জানি না। তুমি আবার শুরুর কথা বললে, মান অপমানের কথা বললে, তাই হঠাৎ এত কথা বললাম। টোপনদা, আর একজনও কেন কেন করে মরেছে অনেকদিন। রাগ করেছে, কেঁদেছে, পাগলের মতো ব্যবহার করেছে, শেষ পর্যন্ত ভয় দেখিয়েছে, শাসন করেছে, কিন্তু তাকেও বলতে পারিনি, কী করে কী হয়েছে। তারপরে সে যেন ধুঁকতে লাগল, আমিও ধুঁকতে লাগলাম। আর তুমি এসে পড়লে।

    ঝিনুকের গলায় উত্তেজনা ফুটতে দেখেছি কম। আজ ও যেন উত্তেজনায় থরথর করছে। বললাম, ঝিনুক, আর কিছু বলল না। চুপ করো।

    ঝিনুক আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, চুপ করব?

    –হ্যাঁ।

    আমি জানি, ঝিনুকের দুর্বোধ স্বপ্নবিকারের কথাগুলি থেকে একটি দুর্বিষহ অর্থ প্রকট হয়ে উঠেছে। ও যদি কেঁদে ভাসাত, তবে সমস্ত ব্যাপারটা একটি নিম্ন স্তরের স্তোক হয়ে উঠত। দেখছি, ওর চোখে জল নেই। স্বগতোক্তি ও আত্মধিক্কারের উত্তেজনায় সহসা ফুরিত হয়ে উঠেছে। তাতে, পরের সর্বনাশের যন্ত্রণা কতখানি আছে জানিনে। ওর নিজের সর্বনাশের কথাটা চেপে রাখতে পারছে না। সহ্য করতেও পারছে না। দেখছি, মানুষ তার নিজের কাছে কত অপরিচিত, দুয়ে, আর তার জন্যে কী অপরিসীম যাতনা। খোলা মাঠে, সোজা পথ ভেঙে, অনেক রৌদ্রে বৃষ্টিতে কষ্ট করে চলাটা জীবন নয়। আরও দুর্নিরীক্ষ্য, গভীর, কুটিল, ওই শাল অরণ্যের মতো জটিল, ছায়ান্ধকারে পরিপূর্ণ। গতকাল রাত্রে ভবেনকে দেখে সেই গানের ভাষায় মনে হয়েছিল, মাটি আছে, কিন্তু ফুলের বাহার নেই, ফসল ফলল না, কান্নাকে ঢেকে রেখেছে হাসি দিয়ে। আজ এখন ঝিনুককে দেখে, সেই গানেরই আর এক কলি মনে হল, ঘরে গেল না, পারে ফিরল না। মাঝখানে ও কীসের প্রতীক্ষায় যে বসে! কার ডাকে ও কোথায় যাবে। কে ওকে ডাকবে।

    আর সভয়ে দেখছি, এই বিড়ম্বনা ও সর্বনাশের মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে। এর পরে আর ঝিনুকের কথা শুনতে আমার সাহস হয় না।

    ঝিনুক বলে উঠল, সেই কি আমার সান্ত্বনা টোপনদা।

    বললাম, না ঝিনুক, এটা সান্ত্বনা নয়। সান্ত্বনা হল একটা পরিণতিকে মেনে নেওয়া।

    পরিণতি?

    ঝিনুক আমার দিকে তাকিয়ে, কী বলতে গেল। পারল না। ঠোঁট নড়ে গেল, এবং পরমুহূর্তেই ওর চোখের গভীরে একটি ছায়া দেখে আমি যেন শিউরে উঠলাম। আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, আমি তোমার আর ভবেনের কথা বলেছি। কষ্ট করে হলেও তোমরা দুজনে একটা পরিণতিকে মানবে, আঁকড়ে ধরবে। তা ছাড়া কোনও সান্ত্বনা নেই ঝিনুক। নইলে।

    জানি কী বলবে। শালঘেরি ছেড়ে চলে যাবে তুমি।

    অসহায় বিস্ময়ে ঝিনুকের দিকে তাকালাম। অস্বীকার করতে পারলাম না।

    ঝিনুক বলল, তুমি তো দুদিন এসেছ। চলে গেলে নতুন কী হবে? তার চেয়ে, টোপনদা, পরিণতি থাক। তোমার কাছে একটা সান্ত্বনা চাই। আর কোনওদিন চোখের আড়াল হতে পাবে না।

    কথা বলতে চাইলাম। ঝিনুকের সঙ্গে চোখাচোখি করে থমকে গেলাম। ওর এক চোখে যেন একটি অমোঘ নিষ্ঠুর নির্দেশ এবং আর এক চোখে করুণ ব্যথিত প্রার্থনা ফুটে উঠতে দেখলাম। কথা জোগাল না আর।

    ঝিনুক আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে উঠল। ওর সেই ওপরে নিস্তরঙ্গ, অন্তস্রোতে দুরন্ত প্রবাহ, সেই স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে নিয়ে এল। কয়েক মুহূর্তের জন্য ওর ওপরে গভীরে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

    ও গিয়ে দাঁড়াল বাইরের জানালার কাছে। পুবপাড়ার সেই ফুল, যাকে দেখে ভুলেছিলাম।

    সত্য কখনও মিথ্যা হয় না। তার রূপান্তর হয়। সেই রূপান্তরিত সত্য আমার চারপাশে কোমরে হাত দিয়ে, হেসে, তবু জ্বতে একটি রহস্যের কুঞ্চন নিয়ে ঘিরে রইল।

    শালঘেরির অরণ্য কি এত দিন আমাকে এইজন্যই ডেকেছে হাতছানি দিয়ে? তার ধূলায় বসে আমি হাসতে পারলাম না। বনের আড়ালে গিয়ে কাঁদতেও পারলাম না। দুয়ের মাঝে এক ভয়ংকর আড়ষ্টতা নিয়ে, ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

    ঝিনুক ডাকল, টোপনদা!

    যেন অনেক দূর থেকে জবাব দিলাম, বলো।

    –এখানে এসো।

    ওর কাছে গেলাম।

    ভেবেছিলাম, ঝিনুক হাসছে। কিন্তু ও হাসছে না। আমার দিকে তাকিয়ে, তামাইয়ের ওপারে শালবনের দিকে তাকাল। বলল না, ওই দেখো, তামাইয়ের ওপারে শালবন।নীরবে শুধু তাকাল।

    তার সংকেতে আমি শালবনের দিকে তাকালাম।

    কাল রাত্রের মতো বাতাস নেই। বন স্তব্ধ। বিস্তীর্ণ বালি কাঁকরের প্রান্তরটা রোদ পোহাচ্ছে। তবু ওই দূর বনের গন্ধটাকে আমি চিনতে পারছিলাম আমার পাশের বাসি বেণীর গন্ধে।

    কাকিমা এলেন। বললেন, খেয়ে যাবি টোপন?

    না, কাকিমা। পিসি বসে থাকবে।

    তবে যখন যেদিন ইচ্ছে হয়, খেয়ে যাস। তুই সেধে খাস বলে তোকে আমার যেচে খাওয়াতে লজ্জা করে।

    ঝিনুকের সঙ্গে চোখাচোখি করে হেসে বললাম, সেই ভাল কাকিমা।

    কাকিমা ঝিনুককে বললেন, ঝিনুক, নাইতে যা, বেলা করিস না।

    আমি বললাম, চলি কাকিমা।

    কাকিমা বললেন, আয়গে।

    আমার আগে ঝিনুক বেরিয়ে গেল বাইরে। আমি উঠোনে এসে ঠাকমার কাছে গিয়ে বললাম, চলি ঠাকমা।

    যাচ্ছ?

    –হ্যাঁ।

    –আবার এসো। কী আর বলব বলল। কানা বাড়িটায় এখনও পড়ে আছি।

    ঝিনুক দরজার কাছে পাঁচিলে লেপটে দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটা খোলা। দরজাটা পার হবার আগে বললাম, চান করতে গেলে না ঝিনুক।

    ঝিনুক বলল, এবার যাব।

    চলি।

    ঝিনুক ঘাড় কাত করল। বাইরে গিয়ে হেঁতালগাছটার তলা পর্যন্ত পৌঁছে, একবার ফিরে না তাকিয়ে পারলাম না। দেখলাম, অর্ধেক পথ এসে দাঁড়িয়ে আছে ঝিনুক।

    বললাম, আবার কোথায়?

    ঝিনুক বলল, কোথাও নয়।

    বলে ঝিনুক ছোট একটি ঘোমটা তুলে তাকিয়ে রইল। আমি এক বার গাছটার দিকে তাকিয়ে, আর একবার পিছন ফিরে তাকালাম। তারপর উত্তরের পথে চলে গেলাম।

    .

    প্রায় পাড়ার কাছাকাছি এসে মনে পড়ল কুসুমের কথা। আবার পশ্চিমে বাঁক নিলাম।

    শালঘেরির বাজার বড়। দোকানপাটও কম নয়। যুদ্ধের সময়ে দেখছি, ব্যবসা বাণিজ্য না কমে বরং অনেক বেড়েছে। জেলা শহরের সঙ্গে মোটরবাসের যোগাযোগের জন্যেই শালঘেরির পসার ভাল। গড়াইয়ের ওদিককার লোকেরা অনেকেই শালঘেরিতে দোকান বাজার করতে আসে। যত দূর জানি, গড়াই থেকে এখনও জেলা শহরে যাবার কোনও মোটর রাস্তা তৈরি হয়নি। যদিও গোরুর গাড়ির পথে সারা জেলায় ঘোরা যায়।

    কাপড়ের দোকানে ঢুকতেই মালিক শ্ৰীশ পাল চিৎকার করে আমন্ত্রণ করল। সেটা সওদার জন্যে নয়, গ্রামবাসী বলে। দু-চার কথার পর দুখানি তৈরি ব্লাউজ কিনে নিলাম। একটি ছিটের আর একটি সাধারণ ফ্লানেলের।

    পিসির আশার চেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফেরায় তিনি খুব খুশি। কুসুম তখনও আমিষ ঘরের রান্নায় ব্যস্ত।

    পিসিকে জামা দুটি দেখিয়ে বললাম, দেখো তো পিসি, কেমন?

    কার জন্যে রে?

    কুসুমের জন্যে।

    পিসির দাঁতহীন মুখে একটি অনির্বচনীয় হাসি দেখলাম। চুপি চুপি বললেন, খুব ভাল হয়েছে। কিন্তু অনেক দামের জিনিস এনেছিস নাকি?

    না, দাম বেশি নয়।

    সঙ্গে সঙ্গে পিসি মুখখানি কালো করে বলল, কার জন্যেই বা এনেছিস। ও দস্যি কি এসব রাখতে পারবে নাকি? দুদিনে ছিঁড়বে, কুটিকুটি করবে।

    ও আসরে আর আমার ঠাঁই নেই। ওটা কুসুম আর পিসির খেলা। দেখলাম, কুসুম গুটি গুটি বেরিয়ে এসেছে। মুখে একটু সলজ্জ হাসি।

    বলল, জেটি, আমার?

    পিসি বললেন, হলে কী হবে। তুই তো এর মর্যাদা দিতে পারবি না।

    কুসুম ও কথায় কান না দিয়ে আমার দিকে ফিরে বলল, আমার জন্যে এনেছ টোপনদা?

    বড় বড় চোখ দুটিতে কুসুমের বিস্মিত খুশিটা যেন থমকে আছে।

    বললাম, হ্যাঁ।

    কুসুম বলল, দাও না জেটি, ছুঁড়ে দাও না দেখি।

    ছোঁবার উপায় নেই পিসিকে। পিসি জামা দুটি ছুঁড়ে দিলেন। কুসুম নীল ফ্লানেলের জামাটা হাতে নিয়ে বলল, মা গো! এ যে গরম জামা টোপনদা!

    শীতে গায়ে দিবি বলেই তো এনেছি।

    কুসুম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জামাটি দেখতে লাগল। তার কৃতজ্ঞ খুশির হাসিটুকু ফ্লানেলের নীলে ঝিকমিকিয়ে উঠল।

    পিসি বললেন, যা, রান্না শেষ করগা। এখুনি নেয়ে এসে খেতে চাইবে।

    .

    সারাদিনে আর বিশ্রাম পেলাম না। দুপুরে পিসি দলিল দস্তাবেজ বার করলেন। অঘোর জ্যাঠাকেও আগেই নিশ্চয় খবর দেওয়া ছিল। তিনিও এসে বসলেন। কোথায় কোন গ্রামে কতখানি জমি আছে, ভাগ বর্গা কাদের ওপর দেওয়া আছে, তাদের নামধাম সবিস্তারে ব্যক্ত করলেন। চাষের খরচ, ফসলের পরিমাণ, বাৎসরিক মোট আয়ের একটা গড়পড়তা হিসেব, কিছুই বাদ দিলেন না। এত বিস্তৃত হিসেব আমার কোনওকালেই জানা ছিল না। যদিও শ দুই বিঘা জমি ছাড়াও বসতবাটি, ওটা আমার জানাই ছিল। কিন্তু নগদের পরিমাণটা একটু অবাক করেছে আমাকে। বাবার যে এত পুঁজি ছিল, তা জানতাম না। প্রায় বিশ হাজার টাকা রেখে গেছেন পোস্ট অফিসে। ইন্সিওরেন্সের একটি চেক আমার নামে জমা আছে। তা ছাড়া মায়ের গহনা।

    আমার সমূহ কাজটা যেন হেসে হাত বাড়িয়ে দিল আমাকে। কাজের উত্তেজনাটা আমাকে আর একবার ঝাঁকিয়ে দিয়ে গেল। মিহিরবাবু আমাকে জানিয়েছিলেন, কাজের অনুমতি পেলেও গভর্নমেন্ট ব্যয়ে পরাভুখ হতে পারে। তখন নিজের অর্থ প্রয়োজন। তামাইয়ের মাটির তলার আবিষ্কার হিসেবে এ টাকা সামান্যই। তবু কিছু কাজ হবে। নিজের জন্য ভবিষ্যৎ তো দেখতেই পাচ্ছি। আমার আর পিসির ভরণপোষণ। কুসুমের একটি বিয়ে। এইটুকু হাতে রেখে, বাকিটুকু নিয়ে, তামাইয়ের গর্ভে আমার যাত্রা।

    অঘোর জ্যাঠা আমাকে নানানভাবে বোঝালেন, যেন আমি বিদেশে চাকরি নিয়ে চলে না যাই। গ্রামেই থাকতে হবে, সব দেখাশোনা করতে হবে। লেখাপড়া শিখলেই যে শহরে চাকরি করতে যেতে হবে, এমন কোনও কথা নেই, ভূসম্পত্তি রক্ষা করা, তা থেকে আয় করাটাও একটা কাজ। বসে থাকবার তো কোনও প্রশ্নই নেই। বিয়ে-থাওয়া আছে, ভবিষ্যতে সংসার বড় হবে। এমন কী, অঘোর জ্যাঠা ইঙ্গিতও করলেন, সামনের ফায়ূনেই যদি বিয়েটা চুকিয়ে ফেলা যায়, তবে ভাল হয়। সেই চেষ্টাই উনি দেখবেন। সে কথা শুনে, পিসির চোখে আবার জল এসে পড়ল। কারণ, বাবা জীবিত নেই, আমার বিয়েতে তিনি উপস্থিত থাকবেন না।

    শুনে যাওয়া ছাড়া আমার কিছু করবার নেই। লাভ নেই প্রতিবাদ করে। কেবল একটি অনুরোধ আমি অঘোর জ্যাঠাকে না করে পারলাম না। যে কটা মামলা মোকদ্দমা চলছে, সেগুলি যেন ডিসমিস করে দেওয়া হয়। বলা বাহুল্য, এ প্রস্তাব অঘোর জ্যাঠার তেমন ভাল লাগল না। বললেন, তা দিতে বলল, দেব। কিন্তু ভবিষ্যতে মামলা-মোকদ্দমা তো তুমি এড়িয়ে চলতে পারবে না বাবা। জমি থাকলেই মামলা। সোনা থাকলেই যেমন তোরঙ, তেমনি।

    তা ঠিক। কিন্তু অঘোর জ্যাঠাকে এখন জানাতে পারলাম না, জমিজমা এভাবে রক্ষা করা আমার আয়ত্তে থাকবে না। যাবার আগে অঘোর জ্যাঠা জানিয়ে গেলেন, শীঘ্রই আবার কথা হবে।

    বিকেলে গেলাম স্কুলের মাঠে। বুঝলাম, রাজনীতি আজ ওপর থেকে নেমে, সদরের চৌহদ্দিময় হয়েছে। দেখলাম, বিয়াল্লিশের চেয়েও ব্যাপক এবং গভীর চেতনা স্তব্ধ হয়ে আছে সর্বত্র। যে কথা বলতে পারে, সে তীব্রভাবে বলছে। যারা পারে না, সেই সকল মানুষেরাও অস্থির।

    আমার সংবর্ধনাটা উপলক্ষ মাত্র। গ্রামের মানুষের ভিতরের বাইরের প্রতীক্ষার উন্মাদনা দেখে এলাম।

    হয়তো স্বাধীনতা আসবে। আর সেই ভবিষ্যতের জন্য, প্রাণের এই প্রচণ্ড বেগটুকুই বোধ হয় আমাদের একমাত্র সম্বল। কারণ, সেই কথাগুলি কিছুতেই ভুলতে পারিনে যে, ইংরেজরা হয়তো একদিন চলে যাবে, কিন্তু কী ভয়ংকর নিঃস্ব দুর্ভাগা ভারতবর্ষকে সে পিছনে ফেলে যাবে।

    হয়তো আমি সংশয়বাদী। জানিনে, পলায়নী মনোবৃত্তি আমার মধ্যে আছে কি না। কিন্তু রাজনীতি আমার কাজ নয়। করবও না কোনওদিন। তবু ইন্দিরের কথা বার বার মনে হয়। দেখলাম, সভায় এসে বসেছে সে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চাবুক মারার ভঙ্গিতে চুপ করাচ্ছিল। তার বুড়ো চোখে যে স্বপ্নের ছায়া আমি দেখেছি, সেই স্বাধীন, বুভুক্ষাহীন সুখী ভারতের কোনও চিহ্ন আমি দেখতে পাই নে। আমাদের শেষ সম্বল, শতাব্দীর চাপা পড়ে থাকা প্রাণের বেগ দিয়ে হয়তো নতুন ভারত গড়ে তুলতে পারব।

    সভার শেষে ভবেন ছাড়ল না। ওর সঙ্গে ওদের বাড়ি গেলাম। আর এই যাওয়াটা কোনওদিন থামল না। কারণ, ওই যাওয়াটাই সত্য, ফিরে আসাটাই বোধ হয় আত্মপ্রবঞ্চনা।

    .

    শালঘেরিতে বসন্ত এসেছে।

    এখন শেষ বসন্ত। যাবার আগে এখন সে পূর্ণ বিরাজিত। ফুটতে না ফুটতেই পরম লগ্ন এসে যায়। পরম লগ্নের অবকাশের আগেই দিন শেষ হয়ে আসে। যদিও কালবৈশাখীর কিছু দেরি আছে, মনে হয় ঈশানে তার আয়োজন থেমে নেই।

    এখন সেই দিনশেষের পরম লগ্ন। শালঘেরির গেরুয়া ধুলো বিবাগের মন্ত্র নিয়েছে। মাটি ছেড়ে সে আকাশে উঠেছে। এ পাড়া থেকে ও পাড়ায় ধাবিত। গাছ মানে না, পাতা মানে না, জীব মানে না। সবাইকে সে ছুপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

    শালঘেরির আকাশ জুড়ে শিমুল পলাশের উচ্ছল মাতামাতি। মাটির গভীরের সব লজ্জা তাদের রক্তঠোঁটে আকাশমুখী হয়েছে। শিমুল পলাশের রক্তোচ্ছাসে শালের শ্বেতকণিকারা পেয়েছে উজ্জ্বলতা।

    ইতিমধ্যে তামাইয়ের ধারে আমার চিহ্নিত স্থানের জমি চেয়ে পাইনি। পাওয়া যাবে না তা জানতাম। তাই কিছু কিছু জমি আমাকে কিনতে হয়েছে। কারণ, কলকাতায় চিঠি দিয়ে মিহিরবাবুর কথায় জানা গেছে, গভর্নমেন্ট এখন এ ধরনের কোনও কাজেই অগ্রসর হবে না। মূলত রাজনৈতিক আবহাওয়াই তার জন্যে দায়ি। তবে, আমার লিখিত রিপোর্টটা আর্কিওলজি বিভাগের সবাইকেই খুব কৌতূহলিত এবং উৎসাহিত করেছে। সংবাদপত্রে একটি প্রবন্ধও লিখেছিলাম, সম্ভাবনাময় তামাই নাম দিয়ে। যে সব ছোটখাটো জিনিসগুলি পেয়েছিলাম তামাইয়ের ধারে, তার ফটোও তুলে দিয়েছিলাম। তাতে কলকাতার কয়েকজন পণ্ডিত ব্যক্তি আমাকে উৎসাহিত এবং নিরুৎসাহিত দুই-ই করেছেন।

    শালঘেরি, এবং শালঘেরির আশেপাশে যারা রাজনীতি করে, আমার বিষয়ে হতাশাজনিত কারণে তারা বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ হল। বিয়াল্লিশের রাজনৈতিক কারাবাসী আমি। এ সময়ে আমার নীরবতা তাদের ভাল লাগল না। তামাই সম্পর্কে উৎসাহ তাদের কাছে এক ধরনের ভীরুতা, ব্যঙ্গ বিদ্রুপের কারণ হয়ে উঠল। বিলাসিতাও বলা যায়। কিন্তু উপায় নেই। তাদের দরজায় দরজায় গিয়ে আমার বোঝাবার কিছু নেই। জানি, যে প্রত্যক্ষ কাজের সঙ্গে আমার নাড়ির টান নেই, সেই কাজের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে গেলে, অকারণ ভেজাল বাড়াব। সাহায্য না করে ক্ষতিই করে ফেলব। পরকে দিয়ে নিজের মূল্য যাচাই করাতে পারি, কিন্তু সেটা পরের দেওয়া পোশাক পরে নয়। একান্ত আত্ম-পরিচয়েই তা সম্ভব।

    সব থেকে অবাক করল ইন্দির। প্রথমে লক্ষ করে দেখিনি, সে আমাকে এড়িয়ে চলেছে। ভেবেছিলাম, বুড়ো মানুষ, সবসময় আমাকে ঠাহর করে উঠতে পারে না। কয়েক দিন সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখেছি, সে যেন অন্যমনস্ক হয়ে চলে যায়।

    তারপরে একদিন হঠাৎ ভবেনদের বাড়ি থেকে বেরুবার মুখে, মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল; আমি স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলাম, ভাল আছ ইন্দির।

    ইন্দির খাপছাড়াভাবে বলল, আজ্ঞা, আমাদিগের আবার ভাল মন্দ। আপুনি ভাল তো?

    দেখলাম, ইন্দিরের দাঁড়াবার ইচ্ছে নেই। তার গলাতেও যেন তেমন আন্তরিকতার সুর বাজে না। আমার মুখের দিকে তাকাবারও তার একটি বিশেষ ভঙ্গি ছিল। সেদিন দেখলাম, তার চোখ অনিচ্ছুক। ভাবলাম, কোনও কারণে ইন্দিরের মন বিব্রত আছে। তবু কেমন যেন একটু খটকা লাগল। চকিতে মনে হল, ইদানীং ইন্দির আর তেমন করে কথা বলে না। এবং একটি সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসায় মন বিদ্ধ হল, ভবেনদের বাড়িতে আসা নিয়ে, ঝিনুকের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে, এ বাড়ির পুরনো বুড়ো সহিসের মনে কোনও নৈতিক প্রশ্ন জেগেছে কি না।

    জিজ্ঞেস করলাম, শরীরটা কি ভাল নেই ইন্দির?

    আজ্ঞা, বুড়া মানুষের শরীল, উয়ার আর ভাল মন্দ কী।

    সন্দেহ আমার ঘনীভূত হল। কিন্তু ওকে আর বিরক্ত না করে পা বাড়ালাম।

    ইন্দির বলে উঠল, মরবার আগে এ্যাটটা সাধ ছিল কী, এই দেশটাকে আপনারা স্বাধীন করবেন, দেখে যাব। শালঘেরিতে তো আপুনিই ছিলেন, আমাদিগের কত আশা, স্বরাজ লিয়ে আসবেন। তা, গরজ বড় বালাই দাদাবাবু। ক্যানে, আপনকার ধন দৌলুতের অভাব কী? আপুনি দুধেভাতে ছিলেন, থাকবেনও বটে।

    অপমানে ও ক্ষোভে আমার ভিতর বাহির কালো হয়ে উঠল সহসা। জিজ্ঞেস করলাম, কথাগুলো কার কাছে শুনলে ইন্দির?

    ইন্দির বলল, দশজনে বুলে শুনি।

    দশজনে একদা বলেছিল, আমার ফাঁসি হয়ে গেছে। ইন্দির তাই বিশ্বাস করেছিল। আজও সেই দশজন যা বলছে, সে তাই অনায়াসে বিশ্বাস করেছে। তখন যদি বা সংশয়ের অবকাশ ছিল, আজ তা নেই। আজ সে প্রত্যক্ষই দেখছে, আমি রাজনীতি থেকে দুরে। সন্দেহ হয়, আমার তত্ত্ব ইন্দিরকে বোঝাতে চাইলেও তা বোধগম্য হবে না তার। আমার নিজের অপমানবোধ ও ক্ষোভ দেখে, মনে মনে না হেসে পারলাম না। ইন্দিরের দোষ কী!

    বললাম, ইন্দির কয়েকজন লোকে যা বলে, তাই বললে। কিন্তু সংসারে সব লোক এক কাজ করে না। তুমিও না, আমিও না। আমি যদি স্বদেশি না করি, তাতে কি মন্দ হয়ে যাই।

    ইন্দির সংকুচিত হয়ে পড়ল। ঘাড় নেড়ে, জিভ কেটে বলল, আ, ছি, আপনাকে কি মন্দ বুলতে পারি দাদাবাবু? কিন্তুক, আপুনি স্বদেশির জন্যে জেল খেটে এলেন।

    বললাম, ইন্দির, ওটা ভূমিকম্পের মতো। তখন সবাইকেই বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়।

    ইন্দির ঘাড় নেড়ে বলল, আজ্ঞা, রাগ করবেন নাই গ আমার কথায়। মুখ মানুষ।

    আর দাঁড়াইনি। জানি, ইন্দিরের ধারণা আমি বদলাতে পারিনি। সম্ভবও নয়। যে প্রচারটা সবথেকে সস্তা, আকর্ষণীয়, সেই প্রচারই চলছে আমার নামে। রাজনীতি যে বিবাদ এবং বিদ্বেষ ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারে না, এগুলিতে তাই প্রমাণ করে। করুক, তাতে কিছু যায় আসে না। আমি আমার আকৈশোর লক্ষ্যভেদের পথ ছেড়ে আসতে পারি নে।

    তবু এ সব অনেকটাই জীবনের বাইরের। অস্বীকার করতে পারিনে, আমার ভিতরের প্রবাহে কী এক অস্পষ্ট রহস্যের ঝংকার, কোন এক অলৌকিকতার অন্ধকার ছায়ায় নিয়তি টেনে নিয়ে চলেছে। ঝিনুকের চোখেই যেন সেই নিয়তির আঙুল দোলে।

    ইতিমধ্যে অঘোর জ্যাঠা কয়েক বার আমাকে বিব্রত করেছেন, নিজেও ব্যর্থ হয়েছেন। নিজেই কন্যা দেখে আলাপ আলোচনা করেছেন। আমাকে মেয়ে দেখতে যাবার আমন্ত্রণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত আমাকে স্পষ্টই জানাতে হয়েছে, উনি যেন এখন এ সব চেষ্টা না দেখেন। ক্ষুব্ধ হয়েছেন, বিরক্ত হয়েছেন। পিসিমার প্রাণে বেশ একটু ভয়ও ধরিয়ে দিয়েছেন।

    আজকাল রেণু মেয়েটি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসে। পাটনায় সে থাকত, লেখাপড়া শিখেছিল। কুসুমের ভাষায়, মেমসাহেবদের মতো যে চুল বেঁধে দিতে পারে এবং মিথ্যা কলঙ্কের জন্য স্বামী যাকে ঘরে নেয় না।

    কলঙ্কের ঘটনা কী, তা জানি নে। রেণুর চোখমুখ দেখে, কোথাও তার সন্ধান পাইনি। বয়স বছর বাইশ-চব্বিশ হবে বা। শ্যামবর্ণ, একহারা রেণুর ডাগর দুটি চোখ। মুখখানি মিষ্টি। কিন্তু সন্ধ্যাবেলার দলছাড়া হরিণীর মতো ও যেন এক অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে আছে। বিষণ্ণ, ক্লান্ত, তবু ভয়চকিতা। কপালে কখনও সিঁদুরের টিপ দেখিনি। সিঁথিতে ঈষৎ আভাস থাকে। অনেক সময় কুমারী বলে ভুল হয়। তখন আমার বুকের মধ্যে চমকে ওঠে। মনে হয়, ঝিনুক আর রেণুর মধ্যে একটি জায়গায় কোথায় মিল আছে। ঘরে নয়, পরে নয়, মাঝখানে যে দাঁড়িয়ে।

    কিন্তু তফাতও আছে। তফাত যেখানে, সেখান থেকেই রেণু তো নতুন জীবনের দিকে যাত্রা করতে পারে। কেউ কি ওকে ডাক দেবার নেই। ভেবে আবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করি, ডাক দিলেই যেতে পারে কি?

    মাঝে মাঝে রেণু বলে, টোপনদা, একটা কোনও কাজকর্ম পেলে করতাম। কিন্তু এখানে থেকে যে কিছুই হবে না।

    রেণু বাইরে যেতে চায়। শহরে, অনেক লোকের ভিড়ে, যেখানে মানুষের পরিচয় শুধু কাজের লোক বলে। তারপরে যার সংবাদ আর কেউ রাখে না। কিন্তু ওর সীমাবদ্ধতা আছে। লেখাপড়া ততোধিক জানা নেই ওর। যদিও সেই বিদ্যে নিয়েই কয়েকটি মেয়েকে বাড়িতে পড়ায়। নিজে যায় শালঘেরির বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রীদের বাড়িতে। তবু নিজেই বলে, ইচ্ছে করে, অনেক পড়ি। কিন্তু মন বসাতে পারিনে কিছুতেই।

    স্বাভাবিক। আজন্ম যে জীবনটা রক্তের মধ্যে পাক দিয়ে রয়েছে, এত সহজে তার ভাঁজ খোলা যায় না। তাই বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সমস্ত মনটা জুড়ে বসে থাকে। অন্যদিকে তা বসবে কেমন করে। তা ছাড়া, রেণু জীবিকার দ্বারা আত্মনির্ভরশীল হবে, সেটাও ওর অভিভাবকদের কাছে গ্রাহ্য নয়।

    রেণু অসহায়। ওর জন্যে যে কষ্ট বোধ করি, সেটাও অসহায়। ইচ্ছে করে, ওকে বলি, এ সংসারের যাবৎ বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করুক। সাহস পাইনে। হয়তো আমাকে ও বিশ্বাস করে, শ্রদ্ধা করে, তাই কথার দাম দেয়। বিদ্রোহ করতে গিয়ে যদি ভেঙে পড়ে, আমাকে ভুল বুঝবে। যদিও আমার বক্তব্য প্রায় তাই।

    .

    মিহিরবাবু শালঘেরিতে আসছেন আগামী কাল। সপরিবারে আসছেন বেড়াতে। তাঁর স্ত্রী এবং এক শিশুপুত্র। আমাদের গ্রামের বিবরণ শুনে তিনি লোভ সংবরণ করতে পারেননি। তা ছাড়া তামাইয়ের ব্যাপারেও তাঁর অসীম উৎসাহ। আমি মিহিরবাবুর জন্যেই মাটি কাটার কাজ আরম্ভ করিনি।

    কিন্তু মিহিরবাবু এসে কাজে হাত দিতে বারণ করলেন। জানালেন, কিছুকাল অপেক্ষা করাই ভাল। তা ছাড়া, গোবিন্দ সিংহ নামে এক প্রত্নতত্ত্ববিদ আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছেন। এই ভদ্রলোকের চিঠি আমি আগেই পেয়েছিলাম। একদা গোবিন্দবাবু সিন্ধু উপত্যকা খননের কাজে দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন। অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন, অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা গিয়েছে। কয়েকবার সাময়িক পত্রিকায় তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কাহিনী পড়েছি। গভর্নমেন্টের সঙ্গে রাজনৈতিক বিবাদে তাঁকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে তিনি আমাকে সাহায্য করতে চেয়েছেন শুনে, আমার নিজের প্রতি বিশ্বাস বাড়ল। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক অবস্থা একটু না দেখে আসতে পারবেন না।

    মিহিরবাবু তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে কয়েকদিন প্রায় উৎসব চলল। ঝিনুক নিজেও একদিন নিমন্ত্রণ করল ওঁদের। প্রাচীন মন্দিরের দেশ শালঘেরি মিহিরবাবুকে রীতিমতো মুগ্ধ করেছে।

    দিন সাতেক পরে ওরা ফিরে গেলেন।

    পিসি স্বভাবতই একটি অজানা ভয়ে ও বিস্ময়ে থমকে আছেন। আমার কাজের অর্থ তাঁর কাছে পরিষ্কার নয়। জমির অভাব না থাকা সত্ত্বেও শুধু মাটি খুঁড়ে দেখবার জন্যে নিষ্ফলা জমির পিছনে এত টাকা খরচ করাটাকে তিনি আদপে সুস্থ মস্তিষ্কের লক্ষণ বলেই বোধ হয় বিশ্বাস করেন না।

    শুধু কি আমার এই কাজ? আমি জানিনে, তবে পিসি আজকাল সবসময়েই একটু অভিমান করে থাকেন। বিয়ে না করাটা তার একটি কারণ জানি। তার চেয়েও বড় কারণ বুঝি ঝিনুক। তাঁকে আমি কখনও ঝিনুকের নাম করতে শুনিনি।

    তবে, একটি কথা আবিষ্কৃত হয়েছে। আমার মায়ের গহনার একটি হিসেব দিতে গিয়ে পিসি বলেছিলেন, আমার মায়ের একটি আংটি দিয়ে নাকি বাবা ঝিনুকের বউভাতের দিন আশীর্বাদ করেছিলেন। পরে আমি সেটা ঝিনুকের হাতে দেখেছি।

    কুসুম তেমনি আছে। আগের চেয়ে অবশ্য একটু পরিবর্তন হয়েছে। যতক্ষণ বাড়িতে থাকি প্রায় সবসময় কাছে কাছে থাকে। কী দিয়ে কতটুকু আমার মন রাখা যায়, যত্ন নেওয়া যায়, ওটাকে ও ধ্যান করে ফেলেছে। সবসময় ভাল লাগে না। বিরক্তি বোধ করি, ধমকও দিই। তখন দুটি বড় বড় ভীরু চোখে থমকানো কান্না নিয়ে তাকিয়ে থাকে। পালিয়ে যায় মাথা নিচু করে।

    তখন আমারও কষ্ট লাগে। ওর ওই চোখ দুটিকে সরাতে পারিনে আমার চোখ থেকে। কিন্তু ওকে ডেকে ভোলাবার আগেই চোখে পড়ে যায়, দরজায় ফাঁক দিয়ে কুসুম আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই সঙ্গেই হয়তো পিসিকে লুকিয়ে কোনও চৌর্য এবং নিষিদ্ধ খাবার খাওয়া হচ্ছে। ১৮৬

    দেখে ফেলে জানান দেওয়াটা খেলার রীতি নয়। না জানার ভান করেই গলা তুলে ডাকতে হয়। তখন কাছে আসতে আসতে কিন্তু কুসুমের মুখ ভার হয়ে যায়। আর থমকানো কান্নার বদলৈ দেখা যায়, একটি রুদ্ধ হাসিই থমকে আছে ওর চোখে। আর কিছু বলবার আগেই কুসুম মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠে, যাও! আমার সঙ্গে আর কথা বলল না।

    তারপরে ওর কিশোরী গলায় হাসি নিঝরের মতো কলকলিয়ে ওঠে।

    যদি ঠিক লক্ষ করে থাকি, তবে একটা বিষয় একটু আশ্চর্য! মাঝে মাঝে ওকে আশ্চর্য রকম নীরব হয়ে যেতে দেখেছি। তখন ও আমার সামনে থেকে সরে সরে থাকে। ডাকলে জবাব পাই সংক্ষিপ্ত। কাছে এলে দেখতে পাই, ওর দুটি চোখের অতলে বিরক্ত হওয়ার তিরস্কার। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে জবাব পাওয়া যাবে না। পিসি তো তখন কুসুমের ওপর খেপে বারুদ হয়ে যান। তখন ওর রান্না ভাল হয় না, কাজে ভুল বারে বারে। কথায় কথায় পিসির সঙ্গে ঝগড়া। পিসি তো প্রায় তাড়িয়েই দিতে যান, দূর হ, দূর হ মুখপুড়ি।

    তারপরে ও কখন থেকে যে আবার হাসতে, কথা কইতে আরম্ভ করে, কেউ টেরও পায় না। পিসি বলেন, মাথায় ভূত আছে। শ্বশুরবাড়ি যেয়ে জ্বালাবে।

    তবে ওর শরীরটা একেবারেই ভাল নয়। আজ জ্বর, কাল সর্দি আছেই। শৈশবে ম্যালেরিয়ায়-ভুগে পিলেখানি বেশ বাগিয়েছে। এর ওপরে কুসুমের অসহ্য পাকামি, মাসে মাসে সে পিসির সঙ্গে একটি করে উপোস করবেই। বক ধমকাও, যা খুশি তাই কর, কুসুম শুনবে না। পিসি মুখে আপত্তি করলেও, অন্তরে যে সায় আছে, তা বুঝতে পারি। বুঝতে পারি পিসি মনে মনে বেশ খুশি।

    কিন্তু ছেলেমানুষের এ সব আমার ভাল লাগে না। তা ছাড়া কুসুমের অপুষ্ট শরীরে উপোসটা শুভ নির্দেশ নয়। ও আমার সব কথা শোনে। ওইটে শোনে না।

    এ ব্যাপারে ওর কাছে আমি বিস্ময়কর রকম অসহায়ভাবে পরাভব মেনেছি। তার কাহিনীটা সামান্য, আমার অবাক হওয়াটা তুলনায় অসামান্য।

    এ মাসেরই কয়েকদিন আগে উপবাসের সেই দিনটি গেছে। খবরটা আমার জানা ছিল। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠেই, কুসুমকে শুনিয়ে পিসিকে ঘোষণা করে দিলাম, কুসুমের উপোস করা চলবে না। যদি কুসুম উপোস করেই, তবে যেন আমার জন্যে রান্নাবান্না না করে। ছেলেমানুষের এ সব পাকামি আমার একেবারেই ভাল লাগে না। লেখা নেই, পড়া নেই, যত সব সৃষ্টিছাড়া গেঁয়োবৃত্তি। যদি উপোস করেই, তবে আর রান্নার ভেঁপোমি করে দরকার নেই। আমি বাইরে কোথাও খাওয়ার পাট মিটিয়ে নেব।

    কথাগুলি বলেছিলাম বেশ রূঢ় রুক্ষু সুরে, গম্ভীর মুখে। ভেবেছিলাম, এই রকম একটা কিছু না লাগে কি না।

    লেগেছিল। দেখেছিলাম, পিসি স্তম্ভিত বিস্ময়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ও পায়ে পায়ে কাছে এগিয়ে এসেছিলেন। তারপরে আস্তে আস্তে তাঁর দৃষ্টি শান্ত হয়ে এসেছিল। বলেছিলেন, কুসির উপোসের জন্যে তুই বাইরে খেয়ে আসবি, তাই কি কখনও হয় টুপান? ও আজ থেকে আর উপোস করবে না। আমি বারণ করে দিচ্ছি।

    কুসুমকে দেখতে পাইনি আর। আমি বেরিয়ে গিয়েছিলাম। পরিবেশ এবং আবহাওয়াটা বড় বেশি গম্ভীর ও ভারী হয়ে উঠেছিল। যেন একটা স্তব্ধতায় থমকে গিয়েছিল। একটু যে অনুশোচনা না হয়েছিল, এমন নয়। এতটা রূঢ় না হলেও বোধ হয় চলত। অথচ কয়েক বার বারণ করার পরেও যখন মানেনি, তখন আর কী ভাবে বলা যেত বুঝিনে। আসলে আমি পিসিকেই তটস্থ করতে চেয়েছিলাম। উপোস পুণ্যি, ইত্যাদির বড় আশ্রয় তো তিনিই।

    আমি জানি, আর বিশ্বাসও করি, অসহায় মানুষেরাই সবথেকে বেশি কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়। নানান ধরনের অদৃষ্টবাদ, ঝাড়ফুক-মাদুলি, এ সবই তাদের দৈন্যের দেয়ালে মাথা কোটা। কুসুম যে রোজ শিব পুজো করে, গ্রামের অধিকাংশ মেয়েরাই যে করে, তার কারণ তো একটাই। একটি ভাল বর। যে দেশে মেয়েদের ইচ্ছে বলতে কিছু নেই, সবকিছুই ঘটে পরের ইচ্ছেয়, সেখানে কতকগুলি অসহায় আকুতিস্বরূপ ব্রতপুজো তো থাকবেই। নিজের ভাগ্যটাকে অন্তত যাতে ধুয়ে মুছে বেশ ঝকঝকিয়ে রাখা যায়।

    কিন্তু ভাগ্যকে জীবনের পাটে ফেলে এমন করে ধোয়া যায় না। শিক্ষাই একমাত্র অন্ধকারকে দূর করতে পারে। কুসুম লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হবে, এটা দেখতেই আমার ইচ্ছে হয়। তা ছাড়া, আর একটি কথাও নিজের কাছে স্বীকার না করে উপায় নেই। কুসুম যে ছেলেমানুষ, এই বাস্তব ও সত্যের মধ্যে এমন কিছু দেখতেই আমার ভাল লাগে না, যাতে ওকে সংসারের ক্ষেত্রে বড় বলে মনে হয়। কোনওরকম সমকক্ষতার দাবি একেবারেই মানতে পারিনে।

    মনের দ্বিধা ও অস্বস্তি নিয়ে ঝিনুকদের বাড়িতেই গিয়েছিলাম। ঝিনুক শুনে বেশ খুশি হয়েছিল। তার মতে অনেক আগেই নাকি কুসুমকে আমার শাসন করা উচিত ছিল। পিসি তো এত কাল প্রশ্রয় দিয়েই আসছিলেন। আমিও নাকি তাই দিয়ে দিয়ে মেয়েটির ক্ষতি করছিলাম। একটু শক্ত হয়ে নাকি ভালই করেছি।

    দুপুরবেলা বাড়ি ফিরে মনে হয়েছিল, সকালবেলার স্তব্ধতা তখনও যেন থমথম করছে। আমার সাড়া পেয়ে পিসি গলা তুলে বলেছিলেন, কুসি, টুপানের চানের জল ভোলা আছে তো?

    রান্নাঘর থেকে জবাব এসেছিল, আছে।

    যে বউটি বাসন বাজে, সেই জল তুলে রেখে যায়। আমি প্রত্যহের মতোই স্বাভাবিক গলায় বলেছিলাম, কুসুম, রান্না কত দূর?

    জবাব এসেছিল, হয়ে গেছে।

    এত সংক্ষিপ্ত জবাব পাবার কথা নয়। তারপরেও, তাড়াতাড়ি নেয়ে এসো, বেলা অনেক হয়েছে। বেরোলে তুমি বাড়ি আসতে ভুলে যাও। ইত্যাদি কিছুই শুনতে পাইনি।

    স্নান করে খেতে বসেছিলাম। পিসি অদুরেই বসেছিলেন। জানতাম, আমার খাওয়া হলেই, পিসি মন্দিরে চলে যাবেন। কুসুমও যেত, কিন্তু সেদিন কুসুমের যাওয়া হবে না। কারণ দরকার নেই। উপোস বন্ধ পুজোও বন্ধ।

    থমকে গিয়েছিলাম কুসুমের মুখ দেখে। আমার সঙ্গে ঝগড়া করে মুখ ভার করা তো ওর রোজই আছে। তাতে মুখের অমন ভাব তো কখনও দেখিনি। আমাকে যখন ভাত বেড়ে দিতে এসেছিল, দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন একটা প্রচণ্ড শোকে শীর্ণ হয়ে গেছে। চোখ দুটি লাল ফোলা ফোলা। খুব কেঁদেছে নিশ্চয়। কাঁদুক। আমি বলেছিলাম, কুসুম, রাগ করছিস নাকি!

    জবাব দিয়েছিল, না।

    পিসি বলে উঠেছিলেন, রাগ করবে কেন? তুই কি ওর মন্দের জন্যে বলেছিস? আমি ওর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারি না বলে কিছু বলি নাই। সত্যিই তো আজকাল আবার এ সব আছে নাকি?

    পিসির এতটা সমর্থন আমার হজম হচ্ছিল না। বরং একটু সন্দিগ্ধ চোখেই ওঁর দিকে তাকিয়েছিলাম। পিসি হাঁটুর কাছে কাপড় তুলে, নিচু মুখে সলতে পাকাচ্ছিলেন। কুসুম সেখানে ছিল না। নিশ্চয় রান্নাঘরে দরজার আড়ালে ছিল। কিন্তু এরকম তো আমি চাইনি। কুসুম কেঁজে, পা দাপিয়ে, দু বার জিভ ভেংচে তারপর হেসে উঠত, তবেই ঠিক হত। সেটাই তো আশা করেছিলাম। অথচ উলটো ফল দেখছিলাম। যেটাকে রোধ করতে চেয়েছিলাম, সেটাই ঘটছিল। কুসুমকে আরও বেশি ভারী ও গম্ভীর করে তুলেছিল।

    আবহাওয়াটা হালকা করার জন্যে আমি রান্নার খুব প্রশংসা করছিলাম, চমৎকার বেঁধেছিস কুসুম। এমন হেঁচকি অনেক দিন খাইনি।

    পিসি বলেছিলেন, মন দিলে তো ভালই পারে।

    কুসুমের কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। আমার খাওয়া শেষ হতেই পিসি উঠে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, আমি যাচ্ছি, অ লো কুসি, তুই খেয়ে নে তাড়াতাড়ি। তারপরে মন্দিরে আসিস। টুপান তুই শুয়ে পড় গা যা।

    পিসি চলে গিয়েছিলেন। আমি মুখ ধুয়ে দালানেই ছিলাম। প্রত্যহের মতো, আমার পাতের কাছেই কুসুম ভাত বেড়ে নিয়ে বসবে, সেটা দেখবার অপেক্ষাতেই আসলে দালানে এদিক ওদিক করছিলাম। দেরি হচ্ছে দেখে বলেছিলাম, কই কুসুম খেতে বসলি না?

    আমার কথা শেষ হবার আগেই দেখছিলাম, কানা উঁচু ছোট থালায়, প্রত্যহের মতোই কুসুম নিজের ভাত বেড়ে নিয়ে এসেছে। মুখ নিচু। খোলা চুল রুক্ষু, মুখের একপাশ দিয়ে এলিয়ে পড়েছে। চান করে ও সকালবেলাতেই। সেদিন তেল দেয়নি। উপোসের দিন তেল দেয় না মাথায়। সম্ভবত আমার বারণ করবার আগেই ওর নাওয়া হয়ে গেছিল। রান্নার কাপড়টি পিসিরই একটি জীর্ণ থান। তাতে হলুদের দাগের অন্ত নেই। সেলাই জোড়াতালির শেষ নেই। অপুষ্ট একহারা রোগা কুসুমকে তখন দেখাচ্ছিল অত্যন্ত করুণ। ঢলঢলে জামার ফাঁকে কণ্ঠা বেরিয়ে পড়েছিল। মুখ একেবারে দেখতেই পাচ্ছিলাম না। আমার এঁটোর সামনে থালা রেখে, ও জবুথবু হয়ে বসেছিল। আমি অস্বস্তিবোধ করলেও তাড়াতাড়ি হেসে একটা কিছু ঠাট্টা করবার উপক্রম করছিলাম।

    থমকে গিয়েছিলাম। কুসুমের শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল, আর মাথাটা ক্রমেই নুয়ে পড়ছিল। আমি দুপা এগিয়ে গিয়ে বলেছিলাম, কী হল রে।

    কুসুমের রুদ্ধ কান্নার বেগ তাতে কমেনি। বরং আরও জোরে শব্দ করে কেঁদে উঠেছিল। আমি প্রথমে একেবারে হতচকিত হয়ে পড়েছিলাম। তাড়াতাড়ি ওর কাছে গিয়ে ডেকেছিলাম, কুসুম শোন।

    কুসুম কান্নারুদ্ধ গলায়, থেমে থেমে কোনওরকমে বলেছিল, তোমার পায়ে পড়ি টোপনদা, পুজো হয় করব না, কিন্তু আমাকে আজ খেতে বলো না।

    কয়েক মুহূর্ত স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। বিরক্ত যে না হচ্ছিলাম, তা নয়। কিন্তু ওভাবে জোর করে যে কাউকে খাওয়ানো যায় না, তা বুঝতে পারছিলাম। একী দুর্ভেদ্য অন্ধতা। একটা মেয়ে, ভয়ংকর দারিদ্র্যের মধ্যে লালিত, পেট পুরে দু বেলা দুটি খেতে পাওয়া যার কাছে পরম ভাগ্য, সে তার বিশ্বাসের জন্যে খেতে চায় না, এর কী বিহিত আছে, বুঝতে পারি নে। ওর সেই ভয় ও অসহায় অবস্থা দেখে আমার কষ্টও হচ্ছিল।

    বলেছিলাম, খেলে কী হবে কুসুম!

    ও বলেছিল, আমার পাপ হবে।

    –পাপ? কেন?

    –আমি যে দিব্যি করেছি। এটা নিয়ে সাতটা উপোস হচ্ছে, আর পাঁচটা হলেই হয়ে যায়। আর করতে চাইব না।

    অবাক হয়ে বলেছিলাম, কার কাছে দিব্যি করেছিস?

    –তাঁরী পাড়ার ডেঙা শিবের কাছে।

    ডেঙা শিব! আমাদের এই জেলায় ডেঙা মানে ছোট, বেঁটে। তাঁরী পাড়ার মন্দিরে যাঁর অবস্থান, তিনি এই নামেই পরিচিত। এবং ডেঙা শিবঠাকুরটি যে অত্যন্ত জাগ্রত, তাও ছেলেবেলা থেকেই শুনে এসেছি। কুসুমের কথা শুনে আবার কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারিনি। সত্যি বলতে কী, হাসিও পাচ্ছিল। বলেছিলাম, আচ্ছা যা, ওঠ, এগুলো সব সরিয়ে পরিষ্কার করে ফ্যাল।

    তবুও কুসুম নিচু হয়ে, বাঁ হাতে আঙুল খুঁটছিল। বলেছিল, তুমি রাগ করছ না তো?

    বলেছিলাম, রাগ করে আর কী করব। তুই তো কেবল কাঁদবি। তবু ওতে পাপটাপ সত্যি হয় না

    কুসুম বলেছিল, মানত করে ফেলেছি যে।

    কীসের মানত?

    কুসুম ওর বড় বড় ভেজা চোখ তুলে এক বার তাকিয়েছিল। অন্য সময় হলে কুসুম নিশ্চয় এরকম একটা গূঢ় সংবাদ ফাঁস করত না। তখন না করে পারেনি। যদিও কুসুম লজ্জায় পড়ে গেছিল। দ্বিধা কাটিয়ে বলেছিল, বাবার যেন সুমতি হয়, আর

    –আর?

    –তারকের সঙ্গে যেন বিয়ে না হয়।

    এর থেকে পরিষ্কার আর কী হতে পারে। এবং এরকম দুটি কামনার পরিবর্তে, ডেঙাশিবের দরবারে বছরে বারোটা দিন উপোস করে থাকা কি খুবই তুচ্ছ নয়? তাতে লিভার খারাপ হোক, গ্যাসট্রিকের ব্যথাই হোক, এমন মনস্কামনা সিদ্ধির মতো পরম শান্তি আর কী আছে।

    খুব গম্ভীর হয়েই বলেছিলাম, তবে কার সঙ্গে বিয়ে হবে, সেটাও নিশ্চয় মানত করেছিস?

    কুসুম ভ্রূকুটি করে তাকিয়ে বলেছিল, তাই বুঝি আবার কখনও মানত করা যায়?

    যায় না?

    –মোটেও না।

    তারপরেই কুসুম তাড়াতাড়ি এঁটোকাঁটা পরিষ্কার করতে আরম্ভ করেছিল। আমি আমার ঘরে গিয়ে ঢুকেছিলাম। আর কেন যেন বারে বারেই ঝিনুকের কথা মনে পড়েছিল। তার কোনও উপোস মানতের কথা আমার জানা ছিল না। ভাবছিলাম, দুজনেই মেয়ে, অথচ কত তফাত। কুসুম যখন বড় হবে, তখন কি আর ওই সব বিশ্বাস কাজ করবে? না কি জীবনের প্রত্যক্ষ গতিই কোনও জটিল বিড়ম্বনার সৃষ্টি করবে? তা যেন না করে। কুসুমের প্রার্থনা তো অতি সাধারণ। এটুকু যেন সার্থক হয়। ও তো অনেক সহজ। ওর কষ্ট যেন কম হয়।

    আবার কুসুমের মুখ উঁকি দিয়েছিল। মনে হয়েছিল পেট পুরে খেলেও কারুর মুখ অমন উজ্জ্বল আর তৃপ্ত দেখায় না। আমিষ ঘেঁটে স্বভাবতই আবার স্নান করে, ধোয়া শাড়ি পরেছিল। কুসুমের শাড়ি পরার যে কী প্রয়োজন, জানিনে। অকারণ অনেকখানি বড় দেখায়। বলেছিল, টোপনদা, যাচ্ছি।

    গম্ভীর গলাতেই বলেছিলাম, দেরি করিস না যেন।

    না, পিসির সঙ্গেই আসব।

    আমি মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিলাম। কুসুম তখনও দাঁড়িয়েছিল।

    কী হল!

    কুসুমের চোখের পাতা পড়ছিল না। আমার ভিতর পর্যন্ত যেন দেখতে চাইছিল। বলেছিল, সত্যি সত্যি রাগ করনি তো?

    বলেছিলাম, না, পালা এখন।

    কিন্তু রাত্রেরটা ঠিক থাকবে তো?

    ওটাই বোধ হয় আসল জিজ্ঞাস্য ছিল। আমি যে আবার কুসুমের ব্রাহ্মণ। আমাকে খাইয়ে তবে ওর জলগ্রহণ। আমি শালঘেরিতে এসে পৌঁছুবার আগে ওর ব্রাহ্মণ ছিলেন ইস্কুলের হেডপণ্ডিত মশাই। যাই হোক উপোস যখন মেনেছিলাম, ব্রাহ্মণ-ভোজন মানতে আর আপত্তি কী। বলেছিলাম, হবেখন।

    পরমুহূর্তেই কুসুম আমাকে অবাক করে দিয়ে, গড় গড় করে বলতে আরম্ভ করেছিল, come if you are readyযদি তৈরি থাকো তো এসো। The sun sets in the west-সূর্য পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। It rained all dayসারাদিন বৃষ্টি হল।… আর-আর It is five minutes to one–এখন একটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি।

    হুশ করে একটা প্রকাণ্ড নিশ্বাস নিয়ে বলেছিল, হয়েছে টোপনদা। ভুল হয়নি? ও হ্যাঁ, মিনিটস, এম আই এন ইউ টি ই এস, মিনিটস। হয়েছে?

    কথা বলার তো অবসরই পাচ্ছিলাম না ওর কাণ্ড দেখে। বলা শুনেই মনে পড়েছিল, ওকে যে ট্রান্সলেশন করতে দিয়েছিলাম, ওগুলো তারই জবাব। এবং উপোসের অনুমতি দেবার প্রতিদান হিসেবেই যে কুসুম সেই মুহূর্তে আমাকে নির্ভুল ট্রান্সলেশন উপহার দেবে একেবারেই বুঝতে পারিনি। তাই কয়েক মুহূর্ত ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলাম, মুখস্থ করে ফেলেছিস বুঝি?

    কুসুম ঘাড় কাত করে ভুরু কুঁচকে বলেছিল, ইস! ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখ না বলতে পারি কি না পারি। ক্রিয়া পদের বিভিন্নতা বলে যেগুলোন পড়তে বলেছিলে, তার থেকেই তো করেছি।

    আমিও সহজে ছাড়বার পাত্র ছিলাম না। বলেছিলাম, বটে? আচ্ছা, তাড়াতাড়ি সেই কথাটার ইংরেজি বল তো, আমি চাই এটা এখুনি করা হোক।

    কুসুম এক মুহূর্ত জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নেড়ে ফিসফিস করেছিল। তারপরেই বলে উঠেছিল, I want it done at once.

    একেবারে নির্ভুল জবাব। আমি বিস্মিত প্রশংসায় ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিল, হয়েছে?

    বলেছিলাম, খুব ভাল হয়েছে।

    জবাবে কুসুমের জিভ বেরিয়ে পড়েছিল কোঁচকানো ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে। এক বার নয়, তিন বার জিভ ভেংচে ও ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল। ভয় পেয়েছিলাম, আছাড় খেয়ে না পড়ে। তারপর আপন মনে একলা ঘরে না হেসে পারিনি। কার যে কীসে আনন্দ! উপোস করাটা কি কুসুমের কাছে কেবল ছেলেমানুষি খেলা। সমস্ত ঘটনাটা তো আমার কাছে সে রকমই মনে হয়েছিল। সেই হাসিখুশির আবহাওয়া তো আমি এক কথাতেই থমথমিয়ে তুলেছিলাম। কী লাভ! ওই খুশিটুকু থেকে ওকে বঞ্চনা করলে, নিজেও হয়তো কিছুটা বঞ্চিত হতাম।

    তাই এই পরাভবকে আমি স্বীকার করেছি। স্থির করেছি, এ বিষয়ে ওকে আর কিছু বলব না। পিসিমা যে কী খুশি হয়েছিলেন, তাঁর মুখের অনির্বচনীয় হাসি এবং মুখ-পুড়ির ওই ঠিক সাজা বলা থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু ঝিনুক বিরক্ত হয়েছিল। ও মেনে নিতে পারেনি। আমি যে কুসুমকে অন্যায়ভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছি, এ বিশ্বাস থেকে ওকে টলানো যায় না। বলে, এখন বুঝবে না, পরে বুঝবে।

    কী যে বুঝতে হবে জানিনে। আমি ঝিনুককে বোঝাতে পারিনে, আমার জীবনের আবর্তে, অন্তস্রোতের টান ভাঁটায় কুসুম কোনও সমস্যা নয়। মোটামুটি তার ভাল মন্দের খবরদারি করতে পারি। আবার যেমন ইচ্ছে, তেমন করে আর গড়তে পারিনে। বকিঝকি ধমকাই শাসন করি, স্নেহ ও আদর করি, তবু জানি ও হরকাকার মেয়ে। আমার সব কিছুই সীমাবদ্ধ। এ সব মানলে, পরে বোঝাবোঝির আর কী থাকতে পারে, আমি জানিনে। অতএব, এ বিষয়ে ঝিনুকের সঙ্গে তর্ক ত্যাগ করেছি। ও যা বলে, শুনে যাই।

    তবু, জীবনের চার পাশে অনেক অসহায়তা সত্ত্বেও ছেলেমানুষ কুসুমের নানান উদ্দীপনা, ওর হাসিখুশি ছুটোছুটি আমার ভাল লাগে। ওর উপোসের প্রার্থনার মধ্যে একটি ভারী তেজালো সৎ মেয়েকে আমি দেখতে পাই।

    আর কুসুমকে দেখতে হয়, যখন হরলালকাকার সঙ্গে কথা হয়, ঝগড়া করে। সে চেহারা আলাদা। আমার একটু লজ্জা করে, বিরক্ত ও বিব্রত হয়ে উঠি, কিন্তু কুসুমকে সামলানো যায় না।

    প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলাতেই এক বার হরকাকা আসেন তাঁর বউঠানের সঙ্গে দেখা করতে। তখন তো এক প্রস্থ ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ছুঁড়ে মারা আছেই। কুসুম সে সব আড়াল থেকেই মারে, হরকাকা শুনেও না শোনার মতো নির্বিকার থাকেন। আমি অনেকদিন বারণ করেছি, শত হলেও বাবা তো, অমন করে বলিস না।

    তখন যে কুসুম ঠোঁট বাঁকায়, তা দেখবার মতো। বলে, বাপের বুঝি বিচার আচার নেই। আমি মায়ের মতন নয় যে, ছেড়ে কথা কইব।

    কুসুমের জন্য মাঝে দুবার নগেন ডাক্তারকে ডাকতে হয়েছিল। খবরটা হরলালকাকা জানতে পেরে, দু বারই ছুটে এসেছেন। প্রথমবার এসে, ভর দুপুরে আমাকে ডেকে বললেন, হাঁ হে টোপন, নগা শুদুরকে তুমি আমার মেয়েকে দেখতে ডাকিয়েছিলে।

    নগেন ডাক্তারকে উনি ওই নামেই ডাকেন। বললাম, হাঁ, তাতে কী হয়েছে?

    অবাক হবার অবসর না দিয়ে হরলালকাকা চিৎকার করে উঠলেন, কী হয়েছে? আমার মেয়েকে দেখবে নগা শুদুর? কেন, দেশে কি আর ডাক্তার নেই?

    অন্তত এ গাঁয়ে নেই, তা জানতাম। আর হরলালকাকাকে ধরলে, আছেই বলতে হবে। বললাম, আমাদের বাড়িতে অসুখ বিসুখ হলে উনিই তো আসেন বরাবর।

    –তা আসুক গে, কিন্তু আমার মেয়েকে সে দেখবার কে?

    আমার দ্বিতীয় জবাবের আগেই, কুসুম জ্বর গায়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। দেখলাম কুসুমের মুখ উত্তেজনায় দপদপ করছে। অথচ মুখে একটি বিকৃত হাসির ধার। তীব্র গলায় বলল, তবে কি আপনাকে ডাকতে হবে?

    কুসুমের কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে হরকাকা বলে উঠলেন, তোমাকে আমি বারণ করে দিচ্ছি টোপন।

    কথা শেষ করতে পারলেন না হরকাকা। কুসুম বলে উঠল, হ্যাঁ, হরলাল ডাক্তারকে যদি না ডাক এবার থেকে, তা হলে দেখে নেব।

    ভেংচে, ব্যঙ্গ করে, উত্তেজিত কুসুমের জ্বররা মুখ অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, তুই উঠে এলি কেন?

    হরকাকাও বলে উঠলেন, তুই কথা বলছিস কেন?

    কুসুম তেমনি ছুঁড়ে মারা ভাবে বলল, না, তা বলব কেন? তুমি ভর দুপুরে মদ খেয়ে গেরস্থের বাড়িতে মাতলামি করতে আসবে, তোমাকে আমি বলব কেন? ফুল বেলপাতা দিয়ে তোমাকে পুজো করব।

    হরকাকা চিৎকার করে উঠলেন, এইওপ, খবরদার বলে দিলাম। মুখ সামলে কথা কোস।

    কুসুমও পা দাপিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল, এসো। মুরোদ নেই কানাকড়ি, দুপুরবেলা আর মাতলামি করার জায়গা পেলে না। হাজার বার আসবে নগেন ডাক্তার, এখন বেরোবে কি না বলো।

    শুনি বুনো ওলের বাঘা তেঁতুল দরকার। এ প্রায় সেই রকমের। আমাকে কতক্ষণ বকতে হত জানিনে। হরকাকা দেখলাম পিছু হটলেন, যদিও সসম্মানে। অর্থাৎ বলতে বলতে গেলেন, আচ্ছা, আমিও দেখে নেব টোপন। মেয়ের যদি একটা কিছু হয়ে যায়, তা হলে আর একবার খুনের দায়ে জেলে যেতে হবে তোমাকে। নগা শুদুরকেও আমি ছেড়ে কথা কইব না।

    কুসুম সাঁ করে, উঠোন পেরিয়ে দরজার ওপরে গিয়ে পড়ল। চেঁচিয়ে বলল, খুব হয়েছে, এখন পথ দেখো।

    বলে সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আমি কুসুমের জন্যেই ভয় পেলাম। গায়ে একশো এক-এর ওপরে জ্বর। তাতে এই উত্তেজনা দাপাদাপি। পিসিও বাড়িতে ছিলেন না কিছুক্ষণ সময়ের জন্য। বললাম, করিস কী কুসুম। যা যা শুয়ে পড়গে যা।

    কুসুম বিনা বাক্যে গিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি কাছে গিয়ে বললাম, হ্যাঁ রে, বাপকে অমন করে বলতে আছে?

    কুসুমের কাঁথা মুড়ি দেওয়া তীক্ষ্ণ চাপা গলা শোনা গেল, বাপ অমন বাপের আমার দরকার নেই।

    বললাম, না, তুই ওরকম বলিস নে, আমার শুনতে লজ্জা করে।

    কুসুমের গলা শোনা গেল, আর আমার বুঝি বাবার জন্য লজ্জা করে না?

    আর এক দিনও নগেন ডাক্তারকে ডাকতে হয়েছিল। যদিও পিসি ও কুসুমের মতে ছোটখাটো অসুখ বিসুখে ডাক্তার ডাকার প্রয়োজন নেই। তাদের কাছে ছোটখাটো অসুখ কী, কে জানে। একশো দুই-তিন জ্বর উঠে গেলে, সেটা ছোটখাটো মনে করতে পারিনে। অনেক সময় অনেক ছোটখাটো অসুখের কথা আমি পারিনে জানতেও। কারণ একশো জ্বর নিয়ে কুসুম, রীতিমতো হেসে ছুটে ওর গিন্নিপনা বজায় রাখে। চোখে দেখে ধরবার উপায় থাকে না কিছু।

    নগেন ডাক্তার এসে দেখে যাবার পরেই হরলালকাকা এলেন। কার কাছে যে খবর পান কে জানে। এসেই হাঁক দিয়ে ডেকে বললেন, অ হে টোপন, বলি টাকা কি তোমার বেশি হয়েছে?

    বেরিয়ে এসে বললাম, কেন বলুন তো?

    তাই তো দেখছি বাবা। হাঁচি কাশি হলেই তুমি নগাকে ডাক। কেন গাঁয়ে কি আর ডাক্তার নেই?

    সেই একই কথা। আমি জানি, ওঁর সবথেকে বেশি বিক্ষোভ, উনি থাকতে কেন নগেন ডাক্তার মেয়ের চিকিৎসা করবে। কী করব। আমাদের অপরাধ, আমরা হরলালকাকার ডাক্তারিতে আস্থা রাখতে পারিনে।

    হরলালকাকা তাড়াতাড়ি আমার কাছে এসে, প্রায় চুপি চুপি গলায় বললেন, কেন মিছিমিছি ওকে বেশি টাকা দিয়ে ডাকতে যাও? তুমি তো বাবা লেখাপড়া জানা ছেলে, বুদ্ধিমান। গাঁয়ের মধ্যে নগা দুটাকা ভিজিট নেয়, আমার মাত্তর আট আনা। অথচ চিকিচ্ছে সেই একই হবে। একবার বুঝে দেখো।

    আমার বুঝতে হল না। তার আগেই কুসুম কখন উঠে এসে দাঁড়িয়েছে। সরু গলায় ফোঁস করে উঠল, খুব বুঝেছে, আর বোঝাতে হবে না। চিকিচ্ছে করতে চাও, না ভিক্ষে চাইতে এসেছ?

    আমি ফিরে বললাম, উঠে এলি কেন কুসুম, শুতে যা!

    হরলালকাকা বলে উঠলেন, আমি ভিক্ষে চাইতে আসব? শুনেছ টোপন, আস্পর্ধার কথা শুনেছ।

    ঠোঁট বাঁকিয়ে, ঘাড় দুলিয়ে কুসুম বলল, খুব শুনেছে। কত টাকা চেয়ে মেগে নিয়েছ, তার হিসেব করগে, তারপরে আস্পর্ধার কথা বলতে এসো।

    কথাটা মিথ্যে নয়। ইতিমধ্যে হরলালকাকা আমার কাছে তাঁর ঋণের বোঝা বেশ ভারী করে ফেলেছেন। কিন্তু এতে উনি দমলেন না। চেঁচিয়ে বললেন, চেয়ে মেগে নেব কেন? ধার করেছি, ধার শোধ করব। এ তো সবাই করে।

    –তবে তাই করো। আগে ধার শোধ করো, তারপরে আবার মাগতে এসো।

    এ সবই ঘৃতে আহুতি পড়ছিল। হরলালকাকা বললেন, দ্যাখ কুসি, মুখ সামলে কথা বলিস। আমি মাগতে আসিনি, চিকিচ্ছের কথা বলতে এসেছি।

    ইতিমধ্যে পিসি এসে পড়লেন। বললেন, কী হয়েছে কী? সকালবেলাতেই এত হাঁক ডাক কীসের?

    হরলাল বলে উঠলেন, আপনি আর মুখ বাড়িয়ে কথা বলতে আসবেন না বউঠান। মেয়েটাকে তো বিষ করে তুলেছেন, আবার আমার ওপরেই পেছন থেকে লেলিয়ে দেন।

    কুসুম ঘাড় কাত করে বলে উঠল, দেয় বুঝি?

    পিসি বললেন, লেলিয়ে দিই?

    হরকাকা বললে, দেন বইকী, নিশ্চয় দেন।

    –বেশ করবেন হাজার বার লেলিয়ে দেবেন।

    কুসুমের তীব্র জবাব শুনে হরকাকা খেপে উঠলেন। পিসিকে বললেন, দেখুন, একবার দেখুন, কী চিজ তৈরি করেছেন।

    পিসি বললেন, সে আমি দেখছি। এখন তুমি যাও দিকি, যাও।

    হরকাকা ছাড়বার পাত্র নন। বললেন, মনে করেছেন আমাকে এভাবে তাড়ালেই হবে? শুনে রাখুন, জেনে শুনে ও মেয়েকে আমি আর নষ্ট হতে দেব না।

    কুসুম অবলীলাক্রমে, চোখ কপালে তুলে বলল, ও মা, তাই কি কখনও হয়? কখন যাব বলো? এখুনি তোমার সঙ্গে যাব?

    কুসুমের অমন ভঙ্গি দেখে বিরক্তিতেও আমার হাসি পাচ্ছিল। লজ্জাও করছিল। হরকাকা ততক্ষণে পিছনে ফিরেছেন। চলতে চলতে বললেন, পরের বাড়ি থেকে বাপকে অবগেরাহ্যি করা। মজাটা দেখাব। মনে করেছিস, তোর নাগাল আর কেউ পাবে না। কী করে ঢিট করতে হয়…।

    পিসি কুসুমকে ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। শুনতে পেলাম, পিসি বলছেন, কাঁদছিস কেন? তোর বাপ কি আজ নতুন ওরকম করছে? তুই কথা বলতে যাস কেন।

    কুসুম বলল, গায়ের মধ্যে আমার জ্বলে যায়। টোপনদা যে কিছু বলতে পারে না।

    .

    আর একজন আছে তারকা অর্থাৎ তারক। হরলালকাকার ভাবী জামাই বলে একরকম স্থির করেই রেখেছেন। যে সাত-আট বিঘা জমি কাকিমার দৌলতে টিকে আছে, সেটা তিনি বড় জামাইকে দেবেন, এটাও ঘোষিত। এতে অপরাপরের মতামত না-ই বললাম, কুসুম বলেছে, খ্যাংরাতে বিশেষ কিছু মাখিয়ে একদিন না একদিন সে তারককে মারবেই। তারকও কিঞ্চিৎ সন্ত্রস্ত। দিনের বেলা উত্তরপাড়ায় ঢোকাই তার বন্ধ হয়েছে। কিন্তু রাত্রে হরলালকাকার পিছু পিছু আসে। ও সময়টা হয়তো আমিও বাড়ি থাকিনে। কী করবে, তারক যে প্রেমে পড়ে গেছে। শুধু চুরি করে একটু চোখের দেখা বই তো নয়।

    একদিন দুপুরের দিকে, সাধারণত যখন বাড়ি আসি, তার আগেই ফিরে এলাম। রান্না ঘরে খুন্তি নাড়ার ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ শুনতে পেলাম। ঘরের দিকেই পা বাড়ালাম। জানি কুসুম খুশি হবে, তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছি। দালানে পা দেবার আগেই কানে এল, কে যেন ডাকছে, কুসি, এ্যাই কুসি।

    গলাটা পুরুষের এবং স্বরটা ভেসে আসছে পিছনের বাগান থেকে। অবাক হয়ে ঘরে ঢুকে পিছনের জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম। দেখলাম, শ্রীমান তারক। অনেকখানি পশ্চিমে বেঁকে, পিসির পাশের ঘরের জানালা দিয়ে, যেখান থেকে রান্নাঘর দেখা যায়, সেখানে থেকে তারক জামরুল গাছের নীচে, কোমর ডোবা সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। চাপা গলায় ডেকে চলেছে, এ্যাই কুসি, কুসি!

    হাসব না, রাগব, কয়েক মুহূর্ত বুঝতে পারলাম না। মনে হল পিসি বাড়ি নেই। ওদিকে খুন্তি নাড়া ও ছ্যাঁক ছ্যাঁক সমানে চলেছে। তাতে তারকের গলা চাপা পড়ে যাচ্ছে। আমার বাড়ি ঢোকা কুসুমও টের পায়নি। চুপ করেই রইলাম!

    একটু পরেই রান্নাঘরের শব্দ থামল। তারকের ডাক এবার পরিষ্কার শোনা গেল। পরমুহূর্তেই কুসুমের বিস্ময়চকিত গলা শোনা গেল, কে রে?

    –আমি, আমি রে কুসি।

    তারকের গাল চোপসানো মুখে আমি হাসি দেখতে পেলাম। কচুরিপানার শেকড়ের মতো এক মাথা চুল, ঘাড় কামানো তারকের খালি দেহটি লিকলিকে সরু পাকানো পাকানো।

    কুসুমকে দেখতে পাচ্ছিনে। ওর গলা শুনতে পেলাম, আবার এসেছ মরতে। জেটিকে ডাকব?

    তারকের হাসি বিস্ফারিত হল। বলল, তোর, জেটি বাড়ি নেই আমি জানি। তাইতেই তো এলাম।

    কুসুমের গলা, অ, খবর নিয়েই এসেছ! চেঁচাব দেখবে, এখুনি পাড়ার লোক জড়ো করে ফেলব বলছি।

    তারক বলল, চেঁচাস না। এদিকে শোন না, একটা কথা বলব।

    -কী কথা?

    –এদিকে আয় না। সব কথা কি চেঁচিয়ে বলা যায়?

    কুসুমের গলাটি নিতান্ত কচি। অন্যথায় যুবতী মেয়ের বয়ান বলে মনে হত। তারক এদিক ওদিক এক বার দেখে, চাপা গলাতেই বলল, আহা, জানিস না যেন কী বলব। হরোকা বলছিল, এই জষ্টি আষাঢ়েই বিয়ে লাগিয়ে দেবে, জানলি? তুই যেন অমত করিস না।

    তারকের কথা শেষ হয়নি। কুসুমের গলা শোনা গেল, ওরে, আবার সেই কথা। বিয়ে না নুড়ো জ্বেলেদেব তোদের মুখে।

    তারকের মুখ গম্ভীর হল। বলল, কেন নুড়ো জ্বেলে দিবি? চিরকাল কি তুই টোপন চাটুয্যের ঘরে আইবুড়ো হয়ে থাকবি?

    কুসুমের গলা: সে কথা তোকে বলতে যাচ্ছি কেন রে মড়া। বিটলে, মাতাল, ওলাউঠো, আমি যার ঘরেই আইবুড়ো হয়ে থাকি, তাতে তোর কীরে, মা শেতলার অরুচি।

    পিছনের বাঁশ ঝাড়ে শুকনো পাতার শব্দে তারক এক বার পিছন ফিরে দেখল। তারপর বলল, তবে তুই কি ভেবেছিস টোপন চাটুয্যে তোকে বিয়ে করবে?

    কুসুমের সরু গলায় গর্জন শোনা গেল, কী বললি ড্যাকরা? তুই বামুনের ছেলে, না বাউরির? খচ্চর, শুয়োর, ইতর।

    আমি আমার নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তারক আর কুসুমের এ রকম বাক্য-বিনিময় এই আমি প্রথম শুনছি। রাগ দুঃখ এবং হাসি, এই তিনে মিলে আমার অবস্থা নিজের কাছেই অবর্ণনীয়। ওদিকের অবস্থাও অবর্ণনীয়। কুসুমের গালাগালিগুলি আর কান পেতে শোনা যাচ্ছিল না। কুসুমের গলা শুনতে পাচ্ছিলাম, এত বড় সাহস তোর, টোপনদার নাম মুখে নিচ্ছিস? নিব্বংশে, মড়ার মাথাথেকো, গোরুচোর, গো-খেকো, তোর মুখে যদি না আজ আগুন গুজি…।

    দেখলাম, তারকের চোখে ভয় ও বিস্ময়। বলল, এ্যাই দ্যাখ, জ্বলন্ত কাঠ তুলিস না ওরকম। আগুন নিয়ে খেলা নয় বলে দিচ্ছি।

    কুসুমের গলা, খেলা! ওরে বিষ্টাখেগো!

    হঠাৎ তারক ছিটকে খানিকটা সরে গেলে, আর তৎক্ষণাৎ দেখলাম একটা আধ জ্বলন্ত কাঠ জানালা গলে সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ে গিয়ে পড়ল। তারক বলে উঠল, দ্যাখ তো, গায়ে লাগলে কী হত?

    কুসুমের কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। তারক সন্দিগ্ধ চোখে, বাগানের দরজার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত পরেই, কুসুমকেও আমি দেখতে পেলাম বাগানে। ছুটে গিয়ে বড় ঢ্যালা তুলে, তারকের দিকে ছুড়ছে, আর অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি দিচ্ছে। তারক বেগতিক দেখে, বাঁশঝাড়ের দিকে দৌড়ল। কুসুম থামল না। ছুঁড়তে ছুঁড়তে পিছনে তাড়া করল।

    দৌড়তে দৌড়তেই তারক বলল, দ্যাখ কুসি, মেয়েমানুষের এত তেজ ভাল নয়, আমি বলে দিচ্ছি।

    দেখলাম, কুসুমের লক্ষ্যভেদ একেবারে ব্যর্থ নয়। তারকের গায়ে এক-আধটা গিয়ে ঠিক পড়ছে। নিতান্ত শুকনো মাটির ঢেলা তাই রক্ষে। সেই হলুদ মাখা ছেঁড়া ন্যাকড়ার আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে। কুসুমের শরীরটি বারো-তেরো বছরের ছেলের মতো। নীল জামাটি তাতে ঢলঢল করছে। চুল খোলা। সে দৃশ্য দেখে, অনেক দুঃখেও হাসি সামলানো দায় হয়ে উঠল আমার।

    একটু পরেই তারক বাঁশঝাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। আড়াল থেকেই তার তড়পানি শোনা গেল, আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। হরো বাঁড়ুজ্জের দেনা কী করে শোধ হয়, দেখব। আমার নামও তারক চক্কোত্তি।

    কুসুম সে কথার কোনও জবাব দিল না। বাঁশঝাড়ের দিকে এলোপাথাড়ি আরও কয়েকবার ঢিল ছুঁড়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তারকের আর সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। কুসুম ফিরে দাঁড়াল। সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে আপন মনেই ফুঁসে ফুঁসে উঠতে লাগল, মড়া। এত লোক মরে, এটাকে ডেঙা শিব নেয় না?

    সন্ধ্যামালতীর ঝাড়ে তখনও ধোঁয়া উঠছিল। কুসুম জ্বলন্ত কাঠটি উদ্ধার করে বাগানের দরজার দিকে চলে গেল। রান্নাঘর থেকে কুসুমের গলা ভেসে এল, কত দিন জেটিকে বলেছি, বাগানের পেছুতে একটু শক্ত করে উঁচু বেড়া দাও। তা আর কিছুতেই হবে না।

    আমি তেমনিভাবেই জানালায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবলাম, কুসুমের অকালপক্কতায় কেন মিছে ভেবে মরি। এই আবহাওয়ার ও পরিবেশে কেমন করে আশা করি, ওর মন কাঁচা ছেলেমানুষের মতো থাকবে। আমি যে ছেলেমানুষির কথা চিন্তা করি, কুসুমের জীবনের চার পাশে কোথাও তার ছায়া নেই। বরং সেটা অবান্তর এবং হাস্যকর। জীবনের নানান আবর্তে পড়ে, ওর সবই জানা হয়ে গেছে। কে জানে, আরও কত জটিল গহনে কুসুমের মন চলা ফেরা করে।

    এই সব মিলিয়ে বড় করুণ মনে হয় কুসুমকে। মনটা সহসা টনটনিয়ে উঠল। কী দুর্দৈব! কুসুম যেন এই পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। অথচ সত্যি একেবারে ছেলেমানুষ। আমার হয়তো এমনি একটি ছোট বোন থাকতে পারত। গ্রামের অনেকের মতো খুব অল্প বয়সে বিয়ে করলে, প্রায় কুসুমের মতোই আমার একটি মেয়ে থাকত। এ অবস্থায় তার জন্যেও যা প্রার্থনা করতাম, কুসুমের জন্যেও তাই করি। ও যেন নিশ্চিন্ত নিরাপত্তাময় পরিবেশে, সহজ সুখে থাকে। কুসুম তাড়াতাড়ি বড় হোক, বড় হোক।

    একটু পরেই দালানে পায়ের শব্দ শোনা গেল। পরমুহূর্তেই আমার ঘরের দরজায় কুসুমের গলার অস্ফুট আর্তনাদ। আমি সহসা পিছন ফিরে তাকালাম না। ওর বিস্মিত সন্ত্রস্ত গলা শুনলাম, কখন এলে টোপনদা?

    না ফিরেই বললাম, কাঠটা উনুনে গুঁজেছিস তো, নাকি এখনও বাইরে রেখেছিস। তা হলে একটা লঙ্কাকাণ্ড হবে।

    আর সাড়া নেই। পিছন ফিরে দেখি, কুসুম অদৃশ্য। এগিয়ে দেখলাম দালানেও নেই। দালান পেরিয়ে, রান্নাঘরের পিছনে ইঁদারাতলায় দেয়াল ঘেঁষে কুসুম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। দেখলেই বোঝা যায় ও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখখানিও শক্ত, ভ্রুকুটি দৃষ্টি স্থির। যেন কিছু বললেই প্রতিবাদে ফেটে পড়বে। আমি বললাম, কী রে!

    বাকি কথা শোনবার আগেই ও বলে উঠল, তা আমার কী দোষ। তারা আমার পেছুতে লাগতে এল কেন?

    এক মুহূর্ত দেখেই বুঝতে পারলাম, কুসুম ভেবেছে, ওর ব্যবহারে আমি রাগ করেছি। সুযোগটা ছাড়তে চাইলাম না। বললাম, তা বুঝলাম। কিন্তু অমন গালাগালিগুলো–

    কুসুম তাড়াতাড়ি বলে উঠল, তা আমার মুখ ওরকমই খারাপ। এ কুসুম কিন্তু আলাদা। এ ওর সেই বেঁকে যাওয়া ভাব। মাঝে মাঝে ও নিজেই যেমন বিরক্ত গম্ভীর ও শক্ত হয়ে যায়। এখন তো তবু মোটামুটি কার্যকারণ বোঝা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তাও বোঝা যায় না। তখন আমি বিস্মিত হই, পিসি চটেন।

    জানি এসময়ে কুসুম কিছুতেই আত্মসমর্পণ করে না। উলটোপালটা বললে, ও বকবক করবে। তাই ধরে নিতে হয়, রাগ দুঃখটা ওরই এখন সব থেকে বেশি। বললাম, অ! তা হলে তো আমাকেও তুই ওরকম বলতে পারিস।

    কুসুম চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ইস, তাই কিনা!

    নয়?

    –তুমি কি আমাকে তারকার মতন বলবে নাকি?

    –যদি বলি?

    কুসুম সন্দিগ্ধ বড় চোখে আবার তাকিয়ে দেখল আমার দিকে। বলল, তাই কিনা তুমি বলতে পারো, আমি যেন বুঝি নে?

    এরকম অটল বিশ্বাস টলানো মুশকিল। ওর শক্ত আড়ষ্টতা কাটাবার জন্যে অন্য কথা বললাম, বাগানের পেছনে একটা পাকা পাঁচিল তুলে দিলে কেমন হয় রে?

    কুসুমের মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে গেল। চোখে ঝলক লাগল। বলল, দেবে? খুব ভাল হয়।

    বললাম, দিতেই হবে। অন্তত তোর মুখটা তো তাতে শুদ্ধ হবে।

    কুসুম ঠোঁট টিপে, প্রায় কানের কাছে চোখের মণি টেনে আমার দিকে তাকাল। তারপর আমি ঘরে ফিরে গেলাম। পিছন থেকে কুসুমের চিৎকার শোনা গেল, আমার রান্না হয়ে গেছে কিন্তু। আবার যেন এখন বেরিয়ো না।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleস্বর্ণচঞ্চু – সমরেশ বসু
    Next Article ভানুমতী – সমরেশ বসু

    Related Articles

    সমরেশ বসু

    প্রজাপতি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    গঙ্গা – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    বিবর – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    অকালবৃষ্টি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    নয়নপুরের মাটি – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    সমরেশ বসু

    শ্রীমতি কাফে – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }