১৩. বিভাগ-পরবর্তী পশ্চিম পাঞ্জাব ও পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু-শিখ নরমেধ যজ্ঞ
ত্রয়োদশ অধ্যায় – বিভাগ পরবর্তী পশ্চিম পাঞ্জাব ও পূর্বপাকিস্তানে হিন্দু-শিখ নরমেধযজ্ঞ : বঙ্গ বিভাগের যৌক্তিকতা প্রমাণিত
পাকিস্তানে হিন্দু-শিখদের প্রতি বর্বরোচিত আচরণ— জিন্নার জীবিতকালে
সাম্প্রতিককালে মিঃ জিন্নার পাক-পার্লামেন্টের উদ্বোধনী ভাষণের (১৪ আগস্ট ১৯৪৭) দু’এক কলি উদ্ধৃত করে এদেশের অমুসলিম সেকুলারবাদীরা (এদের হিন্দু বললে এরা চটে যান) তাঁকে ধর্মীয় ঐক্য ও জাতীয় সংহতির ফেরেস্তা বলে জাহির করতে চান। সত্য বটে তিনি বলেছিলেন—”You are free. You are free to go to your mosques or any other places of worship in this State of Pakistan. You may belong to any religion, caste or creed-that has nothing to do with the business of the State.” তারপর তিনি পাকিস্তানের ভাবী শাসনতন্ত্রের রূপরেখার আভাস দিয়ে বলেন :
“ To maintain law and order so that the life, property, and religious beliefs of its subject are fully protected by the State.”
কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে যে মুসলিম জনতাকে অবিরত হিন্দু-শিখ বিদ্বেষে বিদ্বিষ্ট করে তোলা হয়েছে, তারা এখন জিন্না সাহেবের এসব উদার বাণীতে কর্ণপাত করবে কেন? জিন্না সাহেব যাই বলুন তারা যা বুঝবার বুঝল। তাঁর মুখের জবান খসতে না খসতে তারা সংখ্যালঘু হিন্দু-শিখদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে লোমহর্ষক বর্বরতার বিবরণ এদেশের সেকুলারবাদীদের জ্ঞাতার্থে কিঞ্চিৎ দেওয়া গেল। সমগ্র পাঞ্জাব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে, ষোল আনা হিন্দু ও শিখ সমাজের কি পরিণতি হতো, তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় নিম্নোক্ত লোমহর্ষক কাহিনী থেকে :
শেখুপুরার হত্যাকাণ্ড — ১৯৪৭
শ্ৰীকিশান সিং
হিন্দুস্থানে ব্রিটিশ রাজত্বের শেষভাগে এক বিষম বিপদ হিন্দু সমাজ ও হিন্দু সত্তাকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। একদিকে ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদ ও অপরদিকে ইসলামের প্রত্যক্ষ যুদ্ধোন্মাদনার জন্যে হিন্দু সমাজ হীনবীর্য হয়ে পড়ে। এর প্রভাব হিন্দুস্থানের দুই প্রান্তের দুটি প্রদেশ বাংলা এবং পাঞ্জাবের উপর পড়ে। অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ইসলামের যুদ্ধ ঘোষণা নতুন কিছু নয়, কিন্তু একটি রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে এবং তার কিয়দংশে সংখ্যালঘু অমুসলিমদের ব্যাপক নরহত্যা, নারী নির্যাতন এবং রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে যুদ্ধঘোষণা সতত ইসলামের এক নতুন অত্যাচার-শৈলীর নিদর্শন। ব্রিটিশ রাজত্বের শেষভাগের সুসভ্য হিন্দু জাতিকে ধ্বংস করার এবং তার স্বাধীন সত্তাকে হেয় করার এক ঘৃণ্য চক্রান্ত শুরু হয়। তাতে অনুঘটকের কাজ করে ১০০০ বছরের ইসলামিক অধীনতা এবং প্রায় ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক (ব্রিটিশ) অধীনতায় সৃষ্ট হীনম্মন্য ও দাসসুলভ মানসিকতা। ব্রিটিশ রাজত্বের শেষভাগে যুক্ত হয়েছিল উগ্র ইসলামিক মৌলবাদ। এই মৌলবাদ ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক উভয় মঞ্চতেই কম-বেশি প্রভাব বিস্তার করে। হিন্দু নেতৃবর্গের অদূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় ওয়াহাবী আন্দোলনকে সমর্থনের মধ্যে থেকে অহেতুক মুসলিম তুষ্টিকরণ ডেকে আনে মুসলিম লীগ কেন্দ্রিক রাজনীতি ঘেঁষা ইসলামিক মৌলবাদ। একে আরও শক্তিশালী করে তোলে মোহন দাস গান্ধীর নেতৃত্বে “জাতীয় কংগ্রেসের” খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন ও অহেতুক মুসলিম জমিদার শ্রেণীর তোষামোদ। হিন্দুদের নিজস্ব কোন শক্তিশালী মঞ্চ না থাকায় পৃথিবীর সবচেয়ে সুসভ্য জাতির এক হীনবীর্য পরিণতি ও স্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সর্বোপরি মুসলিম লীগের হিন্দু-বিরোধী “প্রত্যক্ষ সংগ্রামের” রণহুঙ্কার হিন্দুস্থানের হিন্দু জাতির মধ্যে এক ত্রাসের সৃষ্টি করে। হিন্দুস্থানের তৎকালীন সর্ববৃহৎ সংগঠন “জাতীয় কংগ্রেসের” মুসলিম লীগের দাবির সামনে আত্মসমর্পণ হিন্দুস্থানকে প্রত্যক্ষ দাঙ্গা ও বিভাজনের দিকে এগিয়ে দেয়।
মধ্য পাঞ্জাবের ‘মাঝা’ অঞ্চলের এক জেলা শেখুপুরা। কৃষি ও শহুরে তেজারতি কারবার এই জেলার মূল অর্থনীতির উৎস। মধ্যযুগে ও মোগল শক্তির উত্থানের সময় হতেই পাঞ্জাব তথা পশ্চিম ভারতের ধর্ম, শিক্ষা ও চেতনার এক কেন্দ্র হয়ে ওঠে শেখুপুরা। তৎকালীন পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরের পশ্চিমাংশে প্রবাহিত পবিত্র রাভী, (ইরাবতী) নদীর পশ্চিম তীরভূমি থেকেই শেখুপুরা জেলার অবস্থান। মূলত দুটি নদী চেনাব (চন্দ্রভাগা) এবং রাভীর মধ্যাংশে এই জেলার অবস্থান, পাঞ্জাবের ধর্মীয় মানচিত্রে এই জেলার গুরুত্ব সবচেয়ে উপরে। পাঞ্জাবের কেশধারী হিন্দু সমাজ যারা মূলত শিখ নামেই বেশি পরিচিত, সেই শিখ সমাজের প্রথম গুরু নানকদেবের জন্মস্থান পবিত্র নানকানা সাহিব এই জেলাতেই। প্রায় নয়শ একর জমি সমন্বিত নানকানা সাহিব গুরুদ্বারা পাঞ্জাবের হিন্দু সমাজের এক পবিত্র ধর্মস্থান। এটা বলা হয়ে থাকে যে নানকানা সাহিবের দর্শন ভিন্ন কেশধারী হিন্দুদের (শিখদের) জীবন অসম্পূর্ণ। দেশভাগের পূর্বে শিখ সমাজের দ্বারা নানকানা সাহেবের বাৎসরিক কর সংগ্রহ হতো প্রায় বিশ লক্ষ টাকা। মহারাজা রণজিৎ সিংহের সময়ে নানকানা সাহিব অঞ্চলের প্রতিটি ঐতিহাসিক গুরুদ্বারার সংস্কার করা হত এবং বিপুল সম্পত্তি ধর্মস্থানের ব্যয়নির্বাহে দেওয়া হত। এদের মধ্যে গুরুদ্বারা বাললীলা সাহিব, গুরুদ্বারা মাল সাহিব, গুরুদ্বারা কিয়ারা সাহিব এবং গুরুদ্বারা তাম্বু সাহিব বিখ্যাত। এই অঞ্চলের অধিকাংশ জমির মালিকানা জাট শিখ সম্প্রদায়ের হাতে ছিল এবং শহরের ব্যবসায়িক বর্গও মূলত হিন্দুরাই। এই জেলার অধিকাংশ জমিই উর্বর ও সেচনালাযুক্ত। এই জেলার মুসলিমরা মূলত ছিল ভূমিহীন কৃষক এবং শহরের দিনমজুর শ্রেণী। শেখুপুরা জেলার মুসলমান জনসংখ্যার মাত্র ১০% ছিল ধনী।
শেখুপুরা জেলার সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা কেশধারী ও সনাতনী হিন্দুসমাজ কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে ছিল সংখ্যালঘু। তৎকালীন ব্রিটিশ গেজেটিয়ার থেকে পাওয়া জনবিন্যাস নিম্নরূপ :
মুসলিমদের শতকরা জনসংখ্যা— ৬৩.৫২
কেশধারী(শিখ) ও সনাতনী হিন্দুর জনসংখ্যা—৩৪.৫৭
পাকিস্তান সৃষ্টির আগে ও পরে রাওয়ালপিণ্ডি ও মুলতান জেলার পরেই এই জেলার হিন্দুদের উপর সবচেয়ে বেশি অত্যাচার হয়। এই জেলার হিন্দু সমাজের মধ্যে শিখেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও লাঞ্ছিত হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে দাঙ্গার তীব্রতা এতই বৃদ্ধি পায় যে আগস্ট মাসের শেষে মাত্র দুদিনের মধ্যে প্রায় বিশ হাজার মানুষের এক জঘন্য হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়। এটিই ইতিহাসের পৃষ্ঠায় শেখুপুরার হত্যাকাণ্ড (The Great Sheikhupura killings) নামে বিখ্যাত। এই হত্যাকাণ্ড মুসলিম সমাজের গুণ্ডারা করলেও এই দাঙ্গার পিছনে প্রচ্ছন্ন মদত ছিল মুসলিম লীগ নেতৃবর্গের এবং মুসলিম পুলিশ ও সিভিল অফিসারদের। পাকিস্তানের প্রশাসনিক কর্তারা এবং আমলারা এই দাঙ্গার সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক, নানকানা সাহিবের অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এই জেলার ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া একরকম ঠিক ছিল। যার ফলে মার্চ মাসের পাঞ্জাবের দাঙ্গায় যখন অমৃতসর, রাওয়ালপিণ্ডি, মুলতান, গুজরানওয়ালা এবং লাহোর বহ্নিমান, তখন এই জেলা ছিল সম্পূর্ণ শান্ত। ১৯৪৭ সালের মার্চ মাস হতে জুলাই মাস পর্যন্ত এই জেলার মুসলিম সমাজে হিন্দুবিদ্বেষ লক্ষ্য করা গেলেও তারা সাহস পায়নি কোন অত্যাচার বা দাঙ্গা করতে। হিন্দুসমাজও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ছিল যে ‘মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাবের’ ফলে এই জেলা পূর্ব পাঞ্জাবে যুক্ত হবে।
কিন্তু গোধূলির পর যেভাবে তমসাচ্ছন্ন রাত্রি নেমে আসে ঠিক সেভাবেই ১৭ই আগস্ট ১৯৪৭, শেখুপুরায় শিখ ও সনাতনী হিন্দু সমাজের উপর নেমে এল ঘোরতর অন্ধকারময় দিন। ১৭ই আগস্ট বাউণ্ডারি কমিশনের (Boundary Commission Award of 17 August ) ঘোষণায় জানা গেল শেখুপুরা জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে। এমনকি সেই দিনেও অনেকের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল যে অন্তত নানকানা সাহিব এবং শাহদরা তহসিল পূর্ব পাঞ্জাবে যুক্ত হবে। যার ফলে মুসলিম লীগ ও মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের মতো দুটি উগ্রবাদী মুসলিম সংগঠনের জঙ্গি কর্মীরা খানিকটা নিষ্ক্রিয় ছিল।
কিন্তু ১৭ই আগস্ট রাত্রিতে যখন জানা গেল যে, সম্পূর্ণ শেখুপুরা জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তখন ‘মুসলিম লীগ’, ‘মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড’ এবং ‘খাকসার বাহিনীর’ নরপিশাচেরা সংখ্যালঘু শিখ ও সনাতনী হিন্দুদের উপর এক আদিম ও জান্তব মানসিকতার দ্বারা চালিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো হিন্দুস্থানের আর এক কুখ্যাত রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের। দাঙ্গা মূলত চরম রূপ ধারণ করে ১৮ই আগস্ট সকাল হতে। শহরে ১৭ই আগস্ট রাত্রিতেই দাঙ্গা শুরু হলেও গ্রামাঞ্চলে এই একতরফা পৈশাচিক আক্রমণ শুরু হয় ১৮ই আগস্ট সকাল হতে। এই দাঙ্গার তীব্রতা কখনই কমাতে দেয়নি তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতারা। কারণ তারা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেখুপুরা জেলাকে একশ শতাংশ মুসলিম বহুল জেলায় পরিণত করতে চেয়েছিল।
এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের চক্রান্ত কিন্তু শুরু হয়েছিল ১০ই আগস্ট হতে। এই দিন একটি মুসলিম জনসভার আয়োজন করা হয় “ক্যাটল-ফেয়ার” ময়দানে (Cattle-fair Ground)। মূল উদ্যোক্তা ছিল মুসলিম লীগ ও তার সহযোগীরা। কিন্তু এই জনসভার ব্যাপারে প্রচার হয়েছিল যে, এটি কোরান পাঠ ও প্রচুর বৃষ্টিপাতের জন্য ‘আল্লার’ কাছে প্রার্থনা জানানো হবে। স্বাভাবিক ভাবেই কোন অমুসলিম ব্যক্তি এই জনসভায় যাননি এবং এর ফলে মুসলিম নেতৃবর্গ খোলাখুলি দাঙ্গার ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন। মুসলিমরাও এই জনসভার ব্যাপারে গোপনীয়তা বজায় রাখে এবং কোনো মুসলিমই প্রতিবেশী হিন্দুকে এই জনসভা সম্পর্কে কিছু জানায়নি। এই জনসভার পরে মুসলিম E.A.C. এবং অন্য উচ্চপদস্থ অফিসারেরা যারা পাকিস্তানপন্থী তাদের নিয়ে গোপন আলোচনায় বসেন। শেখুপুরার মুসলিম লীগ নেতা এবং পরবর্তীকালে পশ্চিম পাঞ্জাবের মন্ত্রী শেখ করামত্ আলি উচ্চপদস্থ মুসলিম লীগপন্থী পুলিশ অফিসারদের সাথে নিজের বাড়ীতে গোপন আলোচনায় বসেন। তৎকালীন পাঞ্জাবের পুলিশ বাহিনীতে ৮০% ছিল মুসলিম এবং হিন্দু পুলিশেরা মূলত পূর্বের জেলাগুলিতে কার্যরত ছিলেন। যার ফলে পাঞ্জাবের পুলিশ বাহিনীর আচরণে মাঝে মধ্যেই উগ্র মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার ছাপ থাকত। শেখ করামত আলির উপস্থিতিতে পুলিশ অফিসারেরা শেখুপুরার প্রভাবশালী শিখ ও সনাতনী হিন্দুদের একটি তালিকা তৈরি হয়। এটিই ছিল শেখুপুরার মুসলিম লীগের খতম তালিকা (Murder List )। কিন্তু এই তালিকাটি দুর্ঘটনাবশত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ডেপুটি কমিশনার মিস্টার ডিজনীর এক অফিস কর্মীর হাতে পড়ে যায়, এর ফলেই এই গোপন চক্রান্তের বিস্তারিত তথ্যাদি জানাজানি হয়ে যায়।
পূর্ব পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন হক নওয়াজ। কিন্তু ১৫ই আগস্টের পূর্বেই তাকে পশ্চিম পাঞ্জাবের সরগোধা জেলায় বদলি করে দেওয়া হয়। সরগোধায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব নিতে যাওয়ার পথে অহেতুক হক নওয়াজ শেখুপুরায় দুদিন কাটান। শেখ করামত আলি ও অন্যান্য লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে তার বিস্তারিত আলোচনা হয়। লীগ নেতাদের ভীষণভাবে উত্তেজিত করে তোলেন হক নওয়াজ। এই সময় শেখ করামত আলির বাসগৃহে প্রাত্যহিক মিটিং এবং নির্দেশাবলী দেওয়া হতো।
শেখুপুরা সহ অন্যান্য শহরের অবস্থা চিন্তাজনক হয়ে উঠেছিল। সর্বত্র পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে দাঙ্গার গুজব রটছে। সংখ্যালঘু শিখ ও হিন্দুদের (সনাতনী) সমস্ত রকম পেট্রোল ও অন্যান্য দাহ্য বস্তুর সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলো। অপরদিকে মুসলিমরা নিজের নিজের ঘরে এবং বিশেষ করে পীর-ফকিরদের দরগাতে পেট্রোল ও কেরোসিন মজুত করতে থাকে। দাঙ্গা শুরুর প্রথমাংশে মুসলিমরা অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে চাঁদা ধার্য করে এবং তা মুসলিম লীগ কার্যালয়ে জমাও হয়। কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতাও মুসলিমদের সখ্য লাভের আশায় অর্থ সাহায্য করেন। দাঙ্গার তীব্রতা বৃদ্ধির পর এই কম্যুনিস্ট পার্টির নেতারা ব্রিটিশ অফিসারদের সহায়তায় পূর্ব পাঞ্জাবে ও দিল্লীতে পালিয়ে যান। অবশিষ্ট নেতারা হয় নিহত কিংবা ধর্মান্তরিত হয়ে প্রাণভিক্ষা পান। শেখুপুরা জেলার অল্প প্রভাবী কম্যুনিস্ট পার্টির ও তার নেতৃবৃন্দের এই ভয়াবহ পরিণতি হয়। অনেকটা আচমকাই ২০শে আগস্ট শেখুপুরা শহরে মিলিটারী ফ্ল্যাগমার্চ শুরু করে এবং সেই সাথে স্থানে স্থানে মুসলিম লীগ সমর্থকদের মিছিল বের হয়। আতঙ্কিত হয়ে ওঠে শেখুপুরার সম্পূর্ণ হিন্দু সমাজ। মিলিটারী ও পুলিশের ফ্ল্যাগমার্চ ২৪শে আগস্ট পর্যন্ত চলতে থাকে। এই সময়ে সংখ্যালঘু শিখ ও সনাতনী হিন্দুরা মূলত নিজেদের মহল্লার মধ্যেই আটকে থাকেন। কোন সংঘর্ষ এই সময়ে হয়নি।
এইভাবে হঠাৎ ২৪শে আগস্ট রাত্রে পাকিস্তান সরকার শেখুপুরা শহরে কার্টু জারি করে। শেখুপুরার ইতিহাসে এই প্রথম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণে কার্ফু জারি করা হলো। পাকিস্তানের অন্যান্য উপদ্রুত শহরের মতোই মুসলিমরা এই কার্ফর আওতার বাইরেই থেকে গেল, অলিখিত ভাবে। অমুসলিমদের হত্যা এবং দাঙ্গার উদ্দেশ্যে মুসলিমদের একতরফাভাবে ছাড় দেওয়া হলো। শহরের শিখ ও সনাতনী হিন্দু নেতৃবর্গ ডেপুটি কমিশনারের (D.C.) কাছে গিয়ে কার্ফু তুলে নেওয়ার এবং মজুত অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধারের জন্যে বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন; কিন্তু .তিনি তাতে কর্ণপাতই করলেন না, এদিকে শেখ করামত আলির বাসগৃহ হতে অর্থ এবং অস্ত্র-শস্ত্র মুসলিম গুণ্ডাদের বিতরণ করা হতে থাকল। ২৫শে আগস্ট সকালেই প্রথম সংঘর্ষের সূত্রপাত হলো গুরদোয়ারা বাজারে। নিকটবর্তী মুসলিম বস্তির গুণ্ডারা বাজারে শিখেদের দোকানে ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। মন্দিরে এবং গুরদোয়ারার মধ্যে হিন্দু ও শিখেরা অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হতে থাকলো। সারা শেখুপুরায় মুসলিমদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে শিখেরা মুসলিমদের উপর হামলা শুরু করেছে। এর ফলে ২৫শে আগস্ট দুপুরে এক মুসলিম বাহিনী রামগড়হা নামক মহল্লা আক্রমণ করে। এখানকার নিবাসী প্রায় ১২০০০ শিখ, মুসলিমদের এই আক্রমণ প্রতিহত করেন, দুপক্ষেই প্রচুর হতাহত হন এবং মুসলিমরা পিছিয়ে যায়। দুপুর ২টো নাগাদ পাকিস্তান মিলিটারী রামগড়হার বাইরে পজিশন নেয় এবং মেশিনগানের ও রাইফেলের গুলির বন্যা বইয়ে দেয় শিখদের উপরে। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে এই এলাকার সম্পূর্ণ শিখ ও সনাতনী হিন্দুরা নিহত হয়। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা কেউই রেহাই পাননি মেশিনগানের গুলি থেকে। সমস্ত মহল্লাটি জতুগৃহে পরিণত হয়ে যায়। নারীরা অনেকে মান সম্ভ্রম বাঁচাতে কুয়ায় ঝাঁপ দেন অথবা জ্বলন্ত ঘরের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রামগড়হা এলাকাটি ধ্বংসের পর মুসলিম লীগের গুণ্ডারা এবং পাকিস্তান মিলিটারী ও পুলিশের জওয়ানেরা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, অপহরণ, বলাৎকার একতরফা ভাবে চলতে থাকে। অল্প কিছু সংখ্যক শিখ ও সনাতনী হিন্দু নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলো বন্ধ ঘরে বা কোনো গুদামে লুকিয়ে। কিছু ব্যক্তি. রাতের অন্ধকারের সুযোগে পার্শ্ববর্তী এলাকায় পালিয়ে গেলেন। পাকিস্তানী মিলিটারী ২৫শে আগস্ট রাতে সর্দার আত্মা সিং-এর কারখানায় লুকিয়ে থাকা তিন হাজার নিরপরাধ মানুষকে মেশিনগান চালিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর জওয়ানেরা মৃতদেহগুলিকে টুকরো টুকরো করে পার্শ্ববর্তী সেচ নালায় ভাসিয়ে দেয়। এর ফলে সেচনালার জল টকটকে লাল হয়ে যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহেরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান যখন শেখুপুরা পরিদর্শন করেন, তখন তাঁরা এই দাঙ্গার ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা লক্ষ্য করে স্তম্ভিত হয়ে যান। নেহেরু ও লিয়াকত আলি সাংবাদিকদের সামনে স্বীকার করেন যে প্রায় ২২০০০ মানুষ শেখুপুরা শহরে নিহত হন। যুবতীরা এমনকি বৃদ্ধারাও যত্রতত্র অপহরণ ও বলাৎকারের শিকার হন। গর্ভবতী মহিলাদের পেট চিরে দেওয়া হয়। যে যে ব্যক্তি সম্প্রদায়ের মহিলাদের রক্ষার্থে এগিয়ে গেছেন তাকেই পুলিশ ও মিলিটারী রাইফেল ও মেশিনগান চালিয়ে হত্যা করে। বাউণ্ডারী ফোর্সের লেফটেনান্ট কর্ণেল ডঃ সুরাত সিং যখন শেখুপুরা পরিদর্শনে আসেন তখন দেখতে পান যে শহরের বিখ্যাত নামধারী গুরদোয়ারার দুটি কূয়া সম্পূর্ণ মহিলাদের মৃতদেহে ভর্তি হয়ে আছে। তিনি আরও জানতে পারেন যে শহরের মূল বাজার যখন ২৫শে আগস্ট রাতে জ্বলছে তখন সেখানে ডেপুটি কমিশনার দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন। শেখুপুরার সেকশন ৩০ ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ সফি, সুরাত সিংহের পাকিস্তান ত্যাগের সময় জানায় যে মুসলিমরা শিখদের সাথে দুদিনে যা করেছে শিখেরা তা জীবনেও করতে পারবে না।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর যেখানে প্রথম হিন্দু-বিরোধী দাঙ্গা শুরু হয় তা হল শাহদর তহসিলের পশ্চিমাংশের মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম কোট পিণ্ডিদাম ও সংলগ্ন এলাকায়। লাহোরের মতোই শেখুপুরা জেলার এই অংশের থেকে সংখ্যালঘু হিন্দু ও কেশধারী শিখেদের বিতাড়নও লুটপাট মূল হয়ে দাঁড়ায়। ১৫ই আগস্টের এই দাঙ্গায় মৃতের সংখ্যা কম ছিল। শিখ ও সনাতনী হিন্দুরা মূলত পূর্ব পাঞ্জাবের দিকে পালাতে থাকে। তবে ঠিক কতজন সফলভাবে রাভী নদীর ব্রিজে (বলোকি হেড) পৌঁছান এবং তা পার হতে পারেন তা বলা জটিল। এর প্রধান কারণ পাকিস্তানী মিলিটারী ও মুসলিম দুর্বৃত্তরা ব্রিজের মুখে ব্যারিকেড গড়ে তোলে এবং অর্থাদি ও যুবতীদের অপহরণ করতে থাকে। বাধাদানকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মৃতদেহ নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এইখানে একটি লড়াই এর ঘটনা উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। শাহদরা তহসিলের একটি শিখ অধ্যুষিত গ্রাম নাঙ্গাল ভূচার আক্রান্ত হয় ২১শে আগস্ট। এই গ্রামের শিখ অধিবাসীরা একত্রিত হয়ে গ্রামের গুরুদ্বারায় শেষবারের মতো সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে অমৃতসরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তারা তাদের সমস্ত সম্পত্তি ছেড়ে কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ‘পট্টন ভিন্দিয়ান’ নামক স্থানে এসে উপস্থিত হয়। এখানে রাভী নদীর ব্রিজ অতিক্রম করার সময় তারা আক্রান্ত হয় এবং প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেক শিখ যুবক ও বৃদ্ধ খোলা কৃপাণ হাতে লড়তে থাকে এবং অবশেষে ব্রিজ ঘিরে রাখা পাঠান দস্যুরা রণে ভঙ্গ দেয়। এরা নিরাপদে রাভী নদী অতিক্রম করে। শাহদরা তহসিলের আর একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম ‘মাছোচস্ক’ আক্রান্ত হয় ২২শে আগস্ট, নিকটবর্তী দশটি গ্রামের মুসলিম দস্যুরা এই গ্রামের উপর পাশবিক প্রবৃত্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রায় ৫০ জন নিহত হয় এবং বাকীরা উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়। এই সময় পার্শ্ববর্তী গুজরানওয়ালা জেলার দুটি শহরে ‘ঘোরী ‘ এবং ‘নাঙ্গাল দুনা সিং’-এর সংখ্যালঘু শিখ ও সনাতনী উদ্বাস্তু হিন্দুদের মিছিল ‘পট্টন ভিন্দিয়ান’ ব্রিজে পুনরায় আক্রান্ত হয়, বহুলোক হতাহত হয়। চৌক নং ৯২,যা মূলত গোবিন্দ গড় নামক স্থান বলেই পরিচিতি পায়, ২৭শে আগস্ট প্রায় দুই হাজার মুসলিম মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আক্রমণ করে। প্রায় ২৫ জন নিহত হন প্রচুর আহত হন এবং বহু মহিলা অপহৃতা হন। চৌক নং ৪৯, ২৫ তারিখে রাত হতেই ক্রমাগত আক্রান্ত হতে থাকে। গ্রামটিকে বাঁচাতে গিয়ে প্রায় ৭০ জন শিখ যুবক শহীদ হন। অবশিষ্ট গ্রমবাসী ৪ মাইল দূরবর্তী ‘ধরমকে’ নামক স্থানের উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়। ২৪শে আগস্টের দাঙ্গায় ‘ধনোই’ গ্রামের লোকজন পাশের ‘ববাকওয়াল’ গ্রামে আশ্রয় নেন। কিন্তু ২৭শে আগস্ট সেখানেও দাঙ্গা শুরু হয়ে যায় এবং পাঁচ শতাধিক শিখ ও সনাতনী হিন্দু নিহত হন। বহু যুবতী ও শিশুকন্যা অপহৃতা হন। শাহদরা শহরের দাঙ্গা মারাত্মক আকার ধারণ করে ১৯শে আগস্ট। ঐ দিন একটি রিফিউজি ট্রেন ভারতে আসার পথে শাহদরা স্টেশনে আক্রান্ত হয়। প্রচুর হতাহত হন এবং পাকিস্তান মিলিটারী হিন্দু শিখ উদ্বাস্তুদের কাছ থেকে সমস্ত ব্যবহার্য সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। প্রচুর সংখ্যায় হিন্দু যুবতীদের অপহরণ করা হয়। এদের কোন খোঁজ আর কখনও পাওয়া যায় নি।
শ্রীগুরু নানকদেবের জন্মস্থান নানকানা সাহিবের উপর মুসলিম লীগের গুণ্ডাদের নজর ছিল প্রখর। যার ফলে ১৫ই আগস্টের পর হতে মুসলিমরা চোরা-গোপ্তা আঘাত হানতে থাকে। ১৭ই আগস্ট হতে এই হামলা আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। গ্রামাঞ্চল থেকে মুসলিমরা দলবেঁধে হামলা করতে থাকে। শহরের আশি শতাংশ নাগরিক শিখসম্প্রদায়ভুক্ত হলেও তাদের অধিকাংশই পাকিস্তান মিলিটারীর ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে এবং নানকানা সাহিব ত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করতে থাকে। শ্রীনানকানা সাহিব গুরুদ্বারটি ১৭ই আগস্ট ও ১৮ই আগস্ট তিনবার মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের আক্রমণের মুখে পড়ে। স্থানীয় শিখ যুবকেরা দলবেঁধে বাধা দেওয়ায় আক্রমণকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার খাদ্য সরবরাহ ও জল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ভারতে চলে আসার জন্যে নানকানা সাহিব রেল রোড স্টেশনে অপেক্ষারত উদ্বাস্তুদের উপর বর্বর আক্রমণ হতে থাকল। প্রতি ট্রেনে পাকিস্তান মিলিটারী জওয়ানরা লুটপাট চালাতে থাকল। এরই মধ্যে ২৪শে আগস্ট বাললীলা সাহিব, কিয়ারা সাহিব এবং মালসাহিবের উপর মারাত্মক আক্রমণ হলো। তিনটি গুরুদ্বারেই অগ্নিসংযোগ করা হলো এবং গুরুদ্বারে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তুরা নির্মমভাবে খুন হলেন। এর পরেই জেনারেল রিজ’ তার বাউণ্ডারি ফোর্সের জওয়ানদের ঐতিহাসিক গুরুদ্বারগুলির রক্ষণাবেক্ষণে পাঠালেন। যার ফলে নানকানা সাহিবের সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধন কোনক্রমে রক্ষা পেল। কিন্তু শহরের অলিগলিতে ভীত পলায়মান হিন্দু ও শিখ উদ্বাস্তুদের চোরাগোপ্তা হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে। এর পরে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম হতেই পূর্বপাঞ্জাব থেকে আগত মুসলিম উদ্বাস্তুদের নানকানা সাহিব অঞ্চলে জোর করে বসিয়ে দেওয়া হয়। যার ফলে নানকানা সাহিবের সমস্ত জমির মালিক হয়ে উঠল টাঙ্গাওয়ালা ও গুণ্ডাশ্রেণীর মুসলিমরা। নানকানা সাহিবের সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী আর একটি তীর্থস্থান ‘সালা সৌদা’ আক্রান্ত হয় ১৫ই আগস্ট রাত্রিতে। ১৮ই আগস্ট পর্যন্ত এই দাঙ্গা চলতে থাকে; প্রায় দেড় শতাধিক নিহত হন এবং প্রচুর মহিলা অপহৃতা হন। সাচ্চা সৌদ রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা মুসলিম লীগ গুণ্ডাদের আক্রমণের শিকার হন। অবশেষে সম্পূর্ণ সাচ্চা সৌদা শিখ ও সনাতনী হিন্দুরা পাকিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। নানকানা সাহিব তহসিলের আর একটি গ্রাম ফরিদাবাদের উপর আক্রমণ হয় ২৬শে আগস্ট হতে। মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র হাতে মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড এবং খাকসার বাহিনীর গুণ্ডারা ঝাঁপিয়ে পড়ে, প্রচুর হতাহত হয়। মন্দির ও গুরুদ্বারাগুলিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ফরিদাবাদের সম্পূর্ণ জনসংখ্যার মাত্র অর্ধেক জীবিত ভাবে ভারতে পৌঁছাতে পেরেছিলন। অবশিষ্টদের হয় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা নয়তো ইসলামে বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়। আর একটি গ্রাম রাইসালা আক্রান্ত হয় ২৬শে আগস্ট এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ২৮শে আগস্ট পর্যন্ত চলে। রাইসালা গ্রামটি ওয়ারটন পুলিশ স্টেশনের অন্তর্গত এবং এখানকার শিখ অধিবাসীদের অনেকেই ছিলেন প্রাক্তন সেনাকর্মী। যার ফলে মুসলিম লীগের গুণ্ডারা ইসলাম স্বীকার করার হুমকি দিলে স্থানীয় শিখ ও সনাতনী হিন্দু তা অস্বীকার করে এবং প্রাক্তন সেনাকর্মীদের সহায়তায় পাল্টা আক্রমণ করে এবং মুসলিম গুণ্ডাদের রাইসালার বাইরে চলে যেতে বাধ্য করে। কিন্তু পাকিস্তান মিলিটারী রাইসালা গ্রামটিকে ঘিরে ফেলতে পারে ভেবে এখানকার অধিকাংশ অধিবাসীই পাকিস্তান ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং ২৮শে আগস্ট রাত্রিতে তাঁরা রাইসালা ত্যাগ করেন।
এই রকম আর একটি লড়াইএর খবর পাওয়া যায় সাংগলা হিল পুলিশ থানার অন্তর্গত ভূলার চক নামক স্থানে। এই অঞ্চলটি পার্শ্ববর্তী জেলা গুজরানওয়ালার নিকটবর্তী এবং মূলত শিখ অধ্যুষিত ছিল। সারা আগস্ট মাস ধরে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলিমরা ভূলার চকের উপর আক্রমণ হানার পরিকল্পনা নেয় ও প্রস্তুতি শুরু করে। ১৫ই আগস্টের পর নিকটবর্তী স্থানের হিন্দুরা ভূলার চকে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। এর পরে ৩০শে আগস্ট প্রায় পঁচিশ হাজার মুসলিমের এক বিশাল বাহিনী ভূলার চকের চারিদিক ঘিরে ফেলে এবং স্থানীয় শিখ প্রধানদের পাকিস্তান ত্যাগের হুমকি দিতে থাকে। কিন্তু শিখেরা তা অগ্রাহ্য করায় পয়লা সেপ্টেম্বর প্রায় পঁচিশ হাজার মুসলিম ভূলার চক আক্রমণ করে। কিন্তু স্থানীয় শিখেরা দৃঢ়ভাবে বাধা দিতে থাকে এবং মুসলিম দস্যুরা ভূলার চকের বিশেষ ক্ষতি করতে পারে না। এই সময় লাহোর থেকে আসা উগ্র মুসলিম ম্যাজিস্ট্রেট এম. জে. চিমা সাংগলা হিল শহরটিকে একটি দাঙ্গা ও মৃতদেহের শহরে পরিণত করে। শহরের এক প্রান্ত হতে আর এক প্রান্তে ম্যাজিস্ট্রেট চিমা মুসলিম গুণ্ডাদের সঙ্গে নিয়ে খুনখারাপি ও অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। ম্যাজিস্ট্রেট এম. জে. চিমা স্থানীয় হিন্দু নেতাদের হুমকি দেন যে তারা যেন তাদের শিখ আত্মীয়দের ঘর হতে বার করে দেয় অথবা মুসলিম লীগের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু স্থানীয় হিন্দুরা এই হুমকি অগ্রাহ্য করতে থাকায় এম.জে.চিমা ৩০শে আগস্ট অবশিষ্ট নাগরিকদের উপর বর্বর হামলা চালায় এবং তাদের হত্যা করে। এরপরে চিমা বালুচ মিলিটারীর সহায়তায় ভূলার চক আক্রমণ করে। অসমযুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে শিখেরা লড়তে লড়তে পাকিস্তান ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। ভূলার চকে শুধুমাত্র মিলিটারীর বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে দুইশত শিখ মৃত্যু বরণ করে। বিভিন্ন সূত্র হতে প্রাপ্ত খবরে জানা যায় যে, সাংগলা হিল ও ভূলার চকে প্রায় একহাজার নিহত এবং তিনশত মহিলা অপহৃতা হন। প্রায় শতাধিক ধর্মস্থান বিনষ্ট কিংবা অপবিত্র করা হয়। শেখুপুরা জেলা জুড়ে এই দাঙ্গায় পশ্চিম পাঞ্জাবের গভর্নর স্যার ফ্রান্সিস মুডির ও জিন্নার চক্রান্ত পরিষ্কার বোঝা যায় জিন্নার নিকট লিখিত এক চিঠি থেকে; যার বাংলা অনুবাদ এখানে দেওয়া হল :
গভর্নর হাউস,
লাহোর,৫, সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭
প্ৰিয় জিন্না,
আপনাকে ২৬শে আগস্টের চিঠির জন্যে ধন্যবাদ……… পশ্চিম পাঞ্জাবের উদ্বাস্ত সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কেবলমাত্র সেন্সাস রিপোর্টের মাধ্যমেই এ সম্বন্ধে ধারণা লাভ করা চলে। রিপোর্ট অনুযায়ী দিনে প্রায় একলক্ষ উদ্বাস্তু দুদিকের সীমান্ত অতিক্রম করছে। শেখুপুরা জেলার চূহড়কানা নামক স্থানে প্রায় এক থেকে দেড় লক্ষ শিখ তাদের বাড়িতে, ছাদে ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এককাট্টা অবস্থায় দেখেছি। এটা দেখে আমার এলাহাবাদের মাঘ মেলার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়। এই উদ্বাস্তুদের ভারতে পাঠাতে হলে প্রায় ৪৫টি ট্রেনের প্রয়োজন, যার প্রতিটিতে প্রায় ৪০০০ হাজার উদ্বাস্তু যেতে পারবে। অথবা যদি তারা এখানে থাকে তাহলে প্রতিদিন ৫০ টন আটা তাদের সরবরাহ করতে হবে। এই জেলার গোবিন্দগড় নামক স্থানে প্রায় ৩০০০০ থেকে ৪০০০০ অস্ত্রশস্ত্রধারী মাঝারি শিখ অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান ডেপুটি কমিশনারকে লক্ষ্য করে গুলিও চালায় এবং ব্যর্থ হয়। অবশেষে এদের ভারতে পাঠাবার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমি সবাইকে বলছি যে, আমি কিছুই মনে করব না যে কেমন ভাবে শিখেদের ভারতে পাঠানো হচ্ছে…….
……নিবেদক
ফ্রান্সিস মুডি
এর পরে পাকিস্তান মিলিটারী নতুন উদ্যমে সংখ্যালঘুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গোবিন্দগড়ে পার্শ্ববর্তী আট নয়টি গ্রমের শিখেরা জড়ো হয়। ২৪শে আগস্ট গোবিন্দগড়ে প্রথম আক্রমণ হলে শিখেরা তা প্রতিহত করে। এরপরে মুসলিম গুণ্ডারা খানিকটা স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রায় একমাস পরে ১১ই অক্টোবরে মুসলিম গুণ্ডারা ও পাকিস্তান পুলিশ যৌথভাবে গোবিন্দগড় আক্রমণ করে। এর ফলে সমস্ত জীবিত নাগরিকরা ভারতের উদ্দেশে পলায়ন করে। এইভাবে অত্যাচার ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার মাধ্যমে শেখুপুরা জেলাটিকে হিন্দু-শিখ শূন্য করা হয়। এই দাঙ্গায় সরকারি ভাবে প্রায় ৩৫,৯০৪ জন নিহত হন এবং স্থায়ী ভাবে পঙ্গু হয়ে যান কমবেশি ১০,০০০ ব্যক্তি। প্রায় ৪৩৪১জন যুবতী ও মহিলা অপহৃতা হন এবং কমবেশি ৩৩০০ জনকে ধর্মান্তরিত করা হয়।
পেশোয়ার থেকে লাহোর : দুপাশে আগুন আর মৃতদেহ
“দেখতে দেখতে কাছে চলে এল ১৫ আগস্ট। আমাদের গাড়ওয়াল রেজিমেন্টের এই ব্যাটেলিয়ানকে এবার দেশে ফিরতে হবে। পেশোয়ার থেকে আমরা যখন চলে আসছি, সেখানকার অনেকেই কেঁদে চোখ ভাসালো।……
কিন্তু পেশোয়ার থেকে ট্রেন ছাড়ার পরই সব যেন কেমন ওলট-পালট মনে হল। আমরা বোধহয় ১৩ আগস্ট ট্রেনে উঠেছিলাম, পৌঁছোনোর কথা ১৫ আগস্ট, একেবারে স্বাধীনতা পাওয়ার দিন। কিন্তু পরদিন ওয়াজিরাবাদ পৌঁছেই আমরা দেখলাম, পরিস্থিতি ভয়াবহ। আমাদের ট্রেন যখন ওয়াজিরাবাদ স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল, এক রিটায়ার্ড সুবেদার ছুটে এলেন আমাদের কাছে। বললেন, আমাদের বাঁচাও, আমার পুরো ঘরবাড়ি ঘিরে ফেলেছে দুশমনেরা। আমাদের কমান্ডিং অফিসার তখন একজন ব্রিটিশ, নাম কর্নেল অলিভার। তিনি এক প্লেটুন সেনা পাঠিয়ে বললেন, সুবেদারের পরিবারকে এই ট্রেনে নিয়ে এসো।
আবার ট্রেন চলল। সুবেদারের পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে বউ-মেয়ে নিয়ে আরও কয়েকজন উঠে এলেন আমাদের ট্রেনে। ট্রেন তখন তার নিজের গতিতে চলছে, কিন্তু জানলা দিয়ে যেটুকু দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, সব জায়গাতেই কেমন যেন একটা থমথমে ভাব। রাতে লাহোরে ট্রেন ঢোকার পর আমাদের সকলেরই প্রায় চক্ষু চড়কগাছ। যতদূর দৃষ্টি যাচ্ছে, দেখছি দাউ দাউ করে দাবানলের মতো আগুন জ্বলছে চারিদিকে। ট্রেনটা স্টেশনে ঢোকার পর আরও বীভৎস দৃশ্যের সামনাসামনি হলাম। দেখলাম, গোটা স্টেশনে বহু শিখদের মেরে ফেলে রাখা হয়েছে। অনেকের মুখে আবার গুঁজে দেওয়া হয়েছে সিগারেট। সেদিন বোধহয় কোনও ট্রেনে নতুন সাইকেল আসছিল, লুট হয়েছে। তাই দেখি স্টেশনের চারিদিকে প্রচুর সাইকেলও ছড়িয়ে পড়ে আছে।
এরই মধ্যে আরও একটা বিপত্তি ঘটল। আমাদের ট্রেনের ড্রাইভার দুটো ছিলো মুসলিম, তারা ট্রেন ছেড়ে ভয়ে পালাল। পরিস্থিতি সুবিধের নয় দেখে, আমাদের কয়েকটা প্লেটুন ওই স্টেশনেই পজিশন নিয়ে দাঁড়াল। কে জানে, শত্রু হয়তো আচমকা আঘাত হানতে পারে। আমাদের ট্রেনটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, ড্রাইভার নেই। পরে সেখানকার সেনাদের সঙ্গে কথা বলে ধরে আনা হল দুজন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ড্রাইভারকে। তাঁরা অবশ্য অরাজি হল না।
লাহোর থেকে ট্রেন ছাড়ার আগে, আমরা ওখানকার বহু হিন্দুকে আমাদের ট্রেনে তুললাম। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, একেকটা ট্রেনের কামরায় তিনশো থেকে চারশো জন উঠেছিল, কেউ কেউ আবার পোঁটলা-পাঁটলি নিয়ে উঠেছিল ট্রেনের মাথায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ট্রেন আবার আস্তে আস্তে এগোতে লাগল। কিন্তু কিছুটা দূর যাওয়ার পরই আমরা খবর পেলাম, সীমান্তের একটি স্টেশনে আমাদের সকলকে খতম করার জন্য শত্রুরা অপেক্ষা করছে। আমরা খবরটা পাওয়ার পর বেশি দেরি করলাম না। ট্রেনের জানলায় জানলায় পজিশন নিয়ে নিলাম। কিন্তু কোনও সংঘর্ষ হওয়ার আগেই বাঁচিয়ে দিল সেই অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান ড্রাইভার দুটো। তারা এমন একটা রাস্তা জানত, যেখান দিয়ে ওই স্টেশনটাকে অনায়াসে এড়ানো যায়। আমরা মৃত্যুর ভয় করিনি, কিন্তু যাঁরা আমাদের সঙ্গে ট্রেনে উঠেছিল ভয় হচ্ছিল তাঁদের জন্যই।”
(ব্রিগেডিয়ার কে. পি. লাহিড়ী–
সাপ্তাহিক বর্তমান, ১০ জুলাই, ১৯৯৯)
অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তী
“মিঃ জিন্না পাকিস্তান গণপরিষদের সাময়িক সভাপতি হলেন। তাঁর (উদ্বোধনী) বক্তৃতায় তিনি বললেন—পাকিস্তানের জনগণ হিন্দু, মুসলমান, খ্রীস্টিয়ান বা বৌদ্ধ বলে অতঃপর পরিচিত হবেন না। সকলেই সমান ক্ষমতাবলে পাকিস্তানী নাগরিক বলে গণ্য ও পরিচিত হবে। মিঃ জিন্না এক মধুর ভাষণে আমাদিগকে সাম্য ও মৈত্রীর কথা শুনালেন।…………
কিন্তু সত্যই এই ধারণা যে ভুল, তা দেখা গেল অচিরেই। আমাদের অনেকের মনেও এরূপ একটা আশঙ্কা ছিল। লাহোর হয়ে প্রথমে করাচী গেলাম। লাহোরে শুনলাম, পাকিস্তান হতে না হতে হিন্দুরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। আবার করাচীর ১৪ আগস্টের অধিবেশনের পর যখন ট্রেনে দিল্লী রওনা হলাম, তখন সামসাত্বা নামক এক রেল জংশনে এসে দেখি সব ট্রেন বন্ধ স্টেশন মাস্টার বললেন— লাহোরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে, সব ট্রেন বন্ধ। ঐ জংশনে ৬/৭ ঘণ্টা বসে রইলাম। তারপর একটা ট্রেন পেলাম। কোন রকমে একটু জায়গা করে দিল্লী এলাম। পরদিন শুনলাম, সামসাত্বার সব হিন্দু নিহত হয়েছে। আমরাও যদি আর একঘণ্টা সামসাত্বায় থাকতাম, তা হলে লাহোর হতে আগত খুনীদের হাতে আমাদেরও ঐ দুর্ভাগ্য হত।”
(পাকিস্তানের জন্মলগ্নে—অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তী,
পাকিস্তান পার্লামেন্টের সদস্য)
এবার সিন্ধুর হিন্দুদের পালা
পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশকে তো হিন্দু-শিখ শূন্য করা হল। বাকী রইল সিন্ধু প্রদেশ।
ইতিমধ্যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়মাস অতিবাহিত হয়েছে। হিন্দু-শিখদের পক্ষে শ্মশানের শান্তি হলে পাকিস্তানে শান্তিশৃঙ্খলা কিছুটা ফিরে এসেছে। খোদ রাজধানী করাচীতে হিন্দুরা আগের মতোই কাজ কারবার করে যাচ্ছে। সিন্ধুতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের তেমন নজির নেই। কিন্তু নিয়তি কেন বাধ্যতে। করাচীর শান্তিপূর্ণ পরিবেশও এক লহমায় তছনছ হয়ে গেল এক মনগড়া খবরকে কেন্দ্র করে।
সিন্ধুর গ্রামাঞ্চল থেকে একদল নিরীহ শিখ পুরোহিতকে নিয়ে আসা হচ্ছিল করাচীতে। তাদের জাহাজে করে ভারতে পাঠান হবে। তারা ১৩খানা ছ্যাকড়া গাড়ি করে রেল স্টেশন থেকে করাচী গুরুদোয়ারা অভিমুখে যাচ্ছিল। এমন সময় রটে গেল শিখেরা করাচীতে মুসলমানদের আক্রমণ করতে এসেছে। ব্যস আর যায় কোথা! তার পরের ঘটনা :
“চারদিকে রটে গেল কথাটা। দলে দলে লোক জমা হল—ছুটে গেল গাড়িগুলো যেখানে গেছে সেই দিকে। গাড়িগুলো থামল এক গুরুদোয়ারার সামনে। তা থেকে নামল গাড়ির যাত্রীরা। লোকের ভিড় দেখে গুরুদোয়ারার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। তখন উন্মত্ত মানুষেরা দেওয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে যাকে পেল তাকে খুন করল—পুরুষ নারী শিশু নির্বিশেষে। ১০৩টি মানুষের জীবন নাশ হল।
(পাকিস্তান : গোড়ার দিনগুলি— নির্মল সেনগুপ্ত)
তারপর শুরু হল সারা শহরে লুটপাট—আনুষঙ্গিক হত্যা ও অগ্নিসংযোগ। সঙ্গে সঙ্গে সিন্ধীদের দেশত্যাগ। কয়েক দিনের মধ্যে সিন্ধু হিন্দুশূন্য হয়ে গেল। সিন্ধুসভ্যতা নিয়ে গর্ব করার কেউ রইল না সিন্ধু প্রদেশে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আড়াই বছর পরে : পূর্ব পাকিস্তানে
পশ্চিম পাকিস্তানে য়ে ঘটনা ঘটল এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক মাসের মধ্যে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান যে হিন্দু-শিখ শূন্য হয়ে গেল, পূর্ব পাকিস্তানে তার পুনরাবৃত্তি ঘটে আড়াই বছর পরে ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। বাংলা ভাগের পরেও পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের আর্থিক ও সামাজিক বনিয়াদে তেমন গুরুতর ভাঙন ধরেনি; এবং সেটাই হল হিন্দুদের পক্ষে কাল। এবার তাদের মেরুদণ্ড ভাঙা ও পূর্ব বঙ্গ থেকে বিতাড়নের পালা! পূর্ব-পাকিস্তান বিধান সভার সদস্য প্রয়াত বিপ্লবী প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীর স্মৃতিকথা থেকে সেসব তাণ্ডবলীলার কিঞ্চিৎ বিবরণ দেওয়া যাক :
ঢাকা শহরে ধ্বংসযজ্ঞ
“৫১ নং হেমেন্দ্ৰ দাস রোডের আমাদের ঢাকার বাসায় তখন আমরা চারজন এম.এল.-এ. ও অতীত দিনের ২ জন বিপ্লবী বন্ধু থাকতেম। বিধানসভা সদস্য চারজন হচ্ছেন, (১) শ্রদ্ধেয় শ্রীধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (তিনি তখন কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট ও সংবিধান গঠন সভারও (Constituent Assembly) সদস্য, (২) খুলনার শ্রীরাজেন্দ্রনাথ সরকার, (৩) মৈমনসিংহের শ্রীপ্রফুল্লরঞ্জন সরকার (উভয়েই অনুন্নত সম্প্রদায়ের কংগ্রেসী প্রতিনিধি) ও রাজসাহীর শ্রীপ্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী (বর্তমান প্রবন্ধের লেখক) এবং বিপ্লবী বন্ধু দু’জন হচ্ছেন— (১) ঢাকার শ্রীস্বদেশরঞ্জন নাগ ও (২) চাটগাঁয়ের অধ্যাপক শ্রীপুলিন দে। ঢাকা-ই অতীতে বিপ্লবী সংস্থা অনুশীলন সমিতির প্রধান ও প্রাণকেন্দ্র ছিল। সুতরাং ঢাকা শহরে ও জেলার মধ্যে বহু অনুশীলন সমিতির সদস্য আগে ছিলেন; কিন্তু দেশ বিভাগের পরে বেশির ভাগই ঢাকা (পাকিস্তান) ছেড়ে পশ্চিমবাংলায় (ভারতে) চলে গিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তখনও বেশ কিছু সংখ্যক অতীতের বিপ্লবী দলের সদস্য ঢাকায় ছিলেন। শ্রীস্বদেশ নাগও সেইরূপই একজন; আর শ্রীপুলিন দে তখন তরুণ যুবক মাত্র ছিলেন; তিনি সু-বিখ্যাত চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলার সাথে জড়িত হয়ে প্রথমে রাজনীতি ক্ষেত্রে দেখা দেন। কয়েক বছরকাল নিরাপত্তা বন্দী হিসাবে জেলে কাটিয়ে মুক্তি পাওয়ার পরে “মহারাজের” (প্রবীণ ও প্রখ্যাত বিপ্লবী নেতা শ্রীত্রৈলোক্য চক্রবর্তী মহাশয়ের) সাথে সমাজতান্ত্রিক দল করেন এবং পূর্ববঙ্গে ঐ দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আমারও রাজনীতিক জীবনের সূত্রপাত হয়, ‘অনুশীলন সমিতির’ই সদস্য হিসাবে। এবং পরে গান্ধীজীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সংগ্রামী রূপ নিল এবং আমি কংগ্রেসেই যোগ দিয়ে কাজ করি; ফলে, আমার সাথে বাংলার বিপ্লবী দলের বন্ধুদেরও যেমন জানা-শোনা ছিল, তেমনই জানা-শোনা ছিল একেবারে খাঁটি ও অকৃত্রিম কংগ্রেসী বন্ধুদের সাথেও। এই উভয় শ্রেণীর বন্ধুরাই মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসতেন। যখন বাইরের কোনও বন্ধু আসতেন— বিশেষ করে ‘এসেম্বলি’ বর্জন করার পরেই কর্মবিহীন দিনগুলোতে কেউ এলে তো—একেবারে যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছি মনে হত। সেই সুযোগই ১০ই ফেব্রুয়ারীতে বেলা প্ৰায় গোটা নয়েকের সময় ঘটে যায়। আসেন অনুশীলন সমিতিরই ভূতপূর্ব স্বাধীনতার সংগ্রামী বন্ধু— ঢাকার শ্রীঅতুলানন্দ গুহ। তিনি আসার পর পরই এসে জোটেন আমাদের বাসারই সন্নিকটবর্তী একটি বাড়ি থেকে ঢাকা জেলার বারোদি গ্রামের বিখ্যাত নাগ পরিবারের সন্তান—শ্রীসুবোধচন্দ্র নাগ মহাশয়। তিনিও ছিলেন অনুশীলন সমিতিরই একজন ভূতপূর্ব সদস্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই কয়েক বছর জেলেও কাটিয়েছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পরে কংগ্রেসেও কাজ করেছেন।
আমি নিজেও একজন বিপ্লবী হিসাবেই আমার রাজনীতিক জীবন শুরু করি। সেই কথা আগেই বলেছি। সুতরাং আমার পক্ষে এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, অতীতের বিপ্লবী বন্ধুরা কেউ এলে আমার মন খুশিতে
ভরে উঠবে। অতুলানন্দবাবু ও সুবোধবাবু আসাতে আমারও তাই হয়েছিল। বন্ধুদের নিয়ে গল্পে মেতে উঠেছিলাম। কোন্ দিক দিয়ে ১১টা বেজে গিয়েছে আমরা কেউ টেরও পাই নি।
বিসমিল্লাহ্ বলে দাঙ্গা শুরু
অতুলানন্দবাবু হঠাৎ তাঁর হাতে বাঁধা ঘড়ির দিকে দেখেই অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে ওঠেন এবং বলেন,—“আর না, এখনই বাসায় ফিরতে হবে। আমার এক মুসলমান বন্ধু বলেছেন, আজ শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পরই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরম্ভ হবে। যেখানেই থাক নামাজের আগেই কিন্তু বাড়িতে ফিরো, নইলে প্রাণে মারা পড়তে পার।” বলেই তিনি অত্যন্ত ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাঁর বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে যান। তিনি যাওয়ার পর পরই বোধহয় তখন বেলা ১১টা কি ১১।। টা হবে, ঢাকা জেলার সদর মহকুমার এস. ডি. ও. (S.D.O.) শ্রীধীরাজ ভট্টাচার্য ও ঢাকা জেলার কাশিমপুরের জমিদার শ্রীঅরুণকুমার রায়চৌধুরী মহাশয়—এক সাথেই আসেন আমাদের বাসায়। অরুণবাবুও ছিলেন প্রথম শ্রেণীর অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট। সেদিন ছিল শুক্রবার। সম্ভবত উভয়েই কোর্ট থেকেই কাজ শেষ করে এলেন। শুক্রবারে পাকিস্তানে সকালেই কোর্টের কাজ আরম্ভ হয়। সকল মুসলমানকেই জুম্মার নমাজের সুযোগ দেওয়ার জন্য। আর এই পবিত্র জুম্মার দিনেই নমাজের সময় খোদার পবিত্র নাম নিয়েই মুসলিম লীগ দল যত কিছু অ-পবিত্র সমাজ-বিরোধী কাজ করে থাকেন! অতীতে তাই দেখেছি। ১৯৪৬ সালের ‘ডাইরেক্ট একশানও’ (Direct action) শুরু হয়েছিল সেই শুক্রবারেই। নমাজের পরই সেটা আরম্ভ করার পরিকল্পনা ছিল; কিন্তু অতি উৎসাহী জনতার এক অংশের উচ্ছৃঙ্খল মনোভাবের জন্য সকালের দিকেই দাঙ্গা আরম্ভ হয়।
শ্রীঅরুণবাবু ও শ্রীধীরাজবাবু কেবলমাত্র বসে কথা-বার্তা শুরু করেছেন, শ্রদ্ধেয় বন্ধু শ্রীধীরেনবাবুও উপস্থিত আছেন। ধীরাজবাবু এস. ডি. ও. হলেও ধীরেনবাবুদের পুরোহিত বংশের সন্তান। সেই সুবাদেই তিনি ধীরেনবাবুর কাছে আসতেন এবং সেই সূত্রেই আমাদের সাথেও তাঁর সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে। গল্প ভাল করে তখনও জমে ওঠে নি। কেবল শুরু হয়েছে। এমন সময় আমি বলি যে, আমাদের বন্ধু অতুলানন্দবাবু এইমাত্র বলে গেলেন যে, আজ নমাজের পরেই নাকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরম্ভ হবে। কথাটা শুনেই, ধীরাজবাবুই ঘাবড়ালেন বেশি; কারণ, তাঁর বাসা গেণ্ডারিয়া অঞ্চলে মুসলমান বস্তীর মধ্যে। তিনি ঘড়ি দেখে দেখেন যে নমাজের সময় হয়ে এসেছে; ফলে, তিনি এতই ভয় পেয়ে যান যে, একাকী বাসায় যেতেও সাহস পান না। তখন অরুণবাবু তাঁর অবস্থা দেখে বলেন যে, – “চলুন, আমি আমার মোটরে করে নিয়ে আপনার বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি।” তাই হল। তাঁরা চলে গেলেন।
এর কিছুক্ষণ পরেই খবর পেলাম, দাঙ্গা আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। পূর্ববঙ্গ সরকারের সচিবালয় (সেক্রেটারিয়েট) প্রাঙ্গণেই দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। তার বিবরণ একটু পরেই দিচ্ছি। ইতিমধ্যে আমাদের বাসায় খবর আসে যে, অতুলানন্দবাবুর বাড়িও দাঙ্গাকারীরা আক্রমণ করে তার পৃষ্ঠদেশে ছোরা মেরেছে। তাঁর বাড়িতেই। তাঁরও বাড়ি কাঠের পুলের ওপারে গেণ্ডারিয়া অঞ্চলেই। খবরটি শুনেই বন্ধু সুবোধ নাগ ও স্বদেশ নাগ—উভয়েই ছোটেন অতুলানন্দবাবুর বাড়ির উদ্দেশে। একে তো তাঁরা উভয়েই ছিলেন অতীতের বিপ্লবী, তার উপর তাঁরা ঢাকার লোক। ঢাকার হিন্দু-মুসলমান সকলকেই সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘর্ষের মধ্য দিয়েই এতকাল টিকে থাকতে হয়েছে; তাই তাঁদের সাহসও অন্য স্থানের লোকের চেয়ে কিছুটা বেশি। তাঁরা গেলেন। আমরা যাঁরা বাসায় থাকলেম তাঁরা তাঁদের ফিরে আসা পর্যন্ত অধীর আগ্রহ নিয়েই থাকি।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে উভয়েই গলদঘর্ম হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে আসেন। তাঁদের কাছে শুনি, দাঙ্গাকারীরা অতুলানন্দবাবুর বাড়ির ভেতরে ঢুকেই সামনে পায় তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে। ছেলেকেই তারা ছোরা নিয়ে যখন আক্রমণ করতে যায়, তখন অতুলবাবু ছুটে গিয়ে ছেলেকে বুকের মধ্যে নিয়ে ঢেকে ফেলেন। সেই অবস্থার উপরেই ছোরা চলে; ফলে, ছোরার আঘাতগুলো পড়ে অতুলানন্দবাবুর পিঠের উপরে। সুবোধবাবু ও স্বদেশবাবু অতুলানন্দবাবুর অবস্থা দেখে ঢাকা হাসপাতালে খবর দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স গাড়ি আনিয়ে তাঁকে হাসপাতালে পাঠিয়ে ফিরে এসেছেন। ফেরার পথে তাঁদেরও একদল দাঙ্গাকারী গুণ্ডা আক্রমণ করার জন্য তাড়া করে। তাঁরা দৌড়তে দৌড়তে কাঠের পুল পার হয়ে এপারে এসে পড়লে গুণ্ডারা আর তাঁদের পেছনে আসে না।
ঢাকায় আগে হিন্দু অঞ্চল ও মুসলমান অঞ্চল আলাদা আলাদা ছিল। ১৯৪৬ সালের মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশানের’ দাঙ্গায় দেখেছি কলকাতাতেও তাই-ই ছিল। হ্যারিসন রোডের (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী রোড) এক দিকে হিন্দু অঞ্চল আর অপর দিকে মুসলমান অঞ্চল। দাঙ্গার সময়ে হিন্দু অঞ্চলে মুসলমান বা মুসলমান অঞ্চলে হিন্দু ঢুকলে জ্যান্ত অবস্থায় খুব কম লোকই বের হতে পারতেন; তাই, যাঁরা স্থানীয় লোক তাঁরা কখনও অপর সম্প্রদায়ের অঞ্চলে ঢুকতেন না। ঢাকাতেও তখনকার অর্থাৎ ১৯৫০ সালের দাঙ্গার প্রথম দিন পর্যন্ত সেই মনোভাবই দেখা গিয়েছে। সেই জন্যই সুবোধবাবু ও স্বদেশবাবু সে যাত্রায় বেঁচে যান, কিন্তু দাঙ্গার প্রথম দিনের পরে আর সে মনোভাব ছিল না। মুসলমান দাঙ্গাকারীরা দেখেছিল যে, হিন্দুদের আর আগের সেই মনোবল নেই; তাই তারা— এমন কি ১৫/১৬ বছরের দাঙ্গাকারী মুসলমান তরুণ যুবকদের মধ্যেও কেউ কেউ নির্ভয়ে হিন্দু মহল্লায় এসে হিন্দুর বাড়ির মধ্যে ঢুকে গিয়েও হিন্দুর উপরে ছোরা চালিয়েছে বা হিন্দুর বাড়ি লুট করেছে।” (কারণ ২৫ বছর ধরে গান্ধীজী অহিংসা মন্ত্র জপিয়ে হিন্দুদের নির্বীর্য কাপুরুষে পরিণত করেছেন— লেখক)
ঢাকায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব আক্রান্ত
“কিছুক্ষণ পরেই আমরা আমাদের বাসায় থেকেই দাঙ্গার মূল কেন্দ্রস্থল পূর্ববঙ্গ সরকারের সচিবালয়ের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাই। বিবরণ দেন সচিবালয়েরই একজন হিন্দু কেরানী। তাঁর কাছে শুনি— “পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব শ্রীসুকুমার সেন মহাশয় (বর্তমানে পরলোকগত) পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের দুই মুখ্য সচিবদের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকের জন্য ঢাকায় এসে পূর্ববঙ্গের মুখ্য সচিব জনাব আজিজ আহমেদের সাথে তাঁর ঘরেই বৈঠক শেষ করে শুক্রবারের জুম্মার নমাজের জন্য সচিবালয়ের সেদিনের মত ছুটি হয়ে যাওয়ায় যখন বের হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সচিবালয়েরই কর্মচারীদের একটা দল নাকি তাঁকেই সর্ব প্রথমে ঘিরে ধরে এবং ভারত-বিরোধী ও হিন্দু-বিরোধী ধ্বনি করতে থাকে। তিনি আরও বলেন যে, শ্রীসেনকেও অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে হয় ঐ কর্মচারীদের কাছ থেকে। যাই হোক, পরে তাঁরা দলবদ্ধ হয়ে শোভাযাত্রা করে ভারত ও হিন্দু-বিরোধী ধ্বনি দিতে দিতে নবাবপুরের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলতে থাকে। অহিংস সত্যাগ্রহীর মত তাঁরা শুধুমাত্র ধ্বনি দিয়েই তাঁদের কাজ শেষ করেন না। পূর্ব থেকে চিহ্নিত হিন্দুর দোকানগুলো লুটও করতে এবং হিন্দুদের উপর ছোরা-লাঠিও চালাতে থাকেন। সচিবালয়ের কর্মচারীরা রাস্তায় নেমে আসার পরে, বাইরের আরও বহু লোকই মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে দল ভারী করে। হিন্দুর সেই দুঃসময়েও শুনেছি, ২।১টি বাঙালী মুসলমান যুবক সাইকেলে চড়ে নবাবপুরের রাস্তা দিয়ে হিন্দুদের সতর্ক করে, চিৎকার করতে করতে যান। তাঁরা নাকি বলেন,—”হিন্দু দোকানদাররা তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ ক’রে নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান। দাঙ্গা আরম্ভ হয়েছে এবং দাঙ্গাকারীরা লুটপাট করতে করতে আসছে।” হিন্দু দোকানীরা যাঁরা যাঁরা পারলেন, দোকান বন্ধ করে বাড়ীর দিকে ছুটলেন এবং যাঁরা তা করলেন না বা করতে পারলেন না, তাঁরা তাঁদের দীর্ঘসূত্রতার জন্য উচিত মূল্য নিজের রক্ত দিয়েই শোধ করলেন। তাঁদের দোকানও রক্ষা হল না; অবশ্য, যাঁরা তাঁদের দোকান বন্ধ করে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও দোকান রক্ষা পায়নি, তবে প্রাণটা হয়তো রক্ষা পেয়েছে। তাও সকলেরই যে রক্ষা পেয়েছে, তা সঠিক বলা যায় না : কারণ, মহল্লায় মহল্লায়ও হিন্দুহত্যা ও হিন্দুর বাড়ী লুট-পর্ব ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াড়ী অঞ্চলের বহু হিন্দুই তাঁদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদি নিয়ে নিজের বাড়ী ছেড়ে প্রাণের ভয়ে গিয়ে ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনারের অফিস ও প্রাঙ্গণ ভরে ফেলেছেন।
দাঙ্গাকারীরা নবাবপুরের রাস্তা দিয়ে ক্রমশঃ এগিয়ে চলতে থাকে। শ্রীস্বদেশ নাগ, আবারও বাসা থেকে বাইরে বের হয়েছিলেন। আমাদের বাসা যেখানে ছিল, অর্থাৎ সূত্রাপুর থানার অধীন হেমেন্দ্র দাস রোড, সে স্থানটিই শুধু নয়, সূত্রাপুর থানা এলাকার প্রায় সমুদয় অঞ্চলটাই ছিল পূর্বে হিন্দু এলাকা; সুতরাং স্বদেশবাবু, তাই হয়তো কতকটা নির্ভয়েই রাস্তায় বের হয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পরেই তিনি ‘হন্তদন্ত’ হয়ে ছুটে এসে বলেন—তাঁর এক মুসলমান বন্ধুর কাছে তিনি শুনে এলেন যে, বিরোধী দলের কংগ্রেসী ‘এম.এল.এ.’-দের বাড়িগুলোও নাকি আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছে দাঙ্গাকারীরা। আমাদের বাসার ফটকে আমাদের নামলেখা কাঠের ফলক ( নেমপ্লেট) লোহার কাঁটা দিয়ে আটকানো ছিল। স্বদেশবাবু তাড়াতাড়ি গিয়ে সেই নাম লেখা ফলকটি তুলে ফেললেন।
ইতিমধ্যেই খবর পাই যে বাংলা বাজারে যে হোটেলে শ্রীমনোহর ঢালি (এম.এল.এ.) ছিলেন এবং যিনি খুলনা জেলার কালশিরা গ্রামের ঘটনা নিয়ে পূর্ববঙ্গ এসেম্বলিতে একটি মুলতুবি প্রস্তাব তুলতে চেষ্টা করেছিলেন, সেই হোটেলটি আক্রান্ত হয়েছে। শ্রীমনোহর ঢালি মহাশয়, আক্রমণকারীদের মারমুখী মূর্তিতে আসতে দেখেই একবস্ত্রে খালি গায়ে পাগলের মত রাস্তায় বেরিয়ে চিৎকার করতে করতে ছুটে চলেন। দাঙ্গার পর তাঁর কাছে শুনেছি, তিনি তখন কী বলে চিৎকার করছিলেন এবং কোথায় ছুটে চলেছিলেন, তাঁর সে সম্বন্ধে কোনই জ্ঞান ছিল না। হিন্দুরা তো সকলেই তখন নিজের প্রাণ বাঁচাতেই প্রাণান্ত! কে কাকে সাহায্য করে? মনোহরবাবুর সেই পাগলের মত অবস্থা দেখে একজন বাঙালী মুসলমান ভদ্রলোকই তাঁকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তিনদিন রেখেছিলেন; তাই তিনি সে যাত্রায় বেঁচে যান। তিনদিনের মধ্যে তাঁর কোনই খবর না পেয়ে তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা সকলেই মনে করেছিলেন যে, তিনি ‘খতম’ হয়ে গিয়েছেন!
হারান ঘোষচৌধুরীর মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা
সেই সময় সারা ঢাকা শহর ও জেলার গ্রামাঞ্চলে যে কী তাণ্ডব চলছিল, তা আমার পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভবপর নয়। আমার বিশিষ্ট বন্ধু নোয়াখালির ‘এম.এল.এ.’ শ্রীহারানচন্দ্র ঘোষচৌধুরী (সম্প্রতি এই বহু সংগ্রামের নির্ভীক যোদ্ধা, পরলোকগমন করেছেন) মশায় সেই সময় ‘ভিক্টোরিয়া পার্কে’র কাছে অবস্থিত সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়ার বাড়ির তে-তলায় ছিলেন। তিনি সেই তে-তলায় থেকে ঐ অঞ্চলের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য নিজচোখে দেখে যে একটা বীভৎস চিত্র দেন, তা শুনলেও লোকে আতঙ্কিত হয়ে উঠবেন। ঐ পার্কেরই অপর এক কোণে একটি বাড়িতে একটা কমার্শিয়াল স্কুল ছিল। তার মালিক ছিলেন,….মুখার্জী উপাধিধারী একজন বিশিষ্ট বাঙালী হিন্দু। তাঁকে যেভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলতে দেখেছেন হারানবাবু, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়-বিদারক। হারানবাবু বলেছিলেন, কুডুল দিয়ে যেভাবে লোকে কাঠ ফাঁড়ে সেইভাবে দুর্বৃত্তেরা শ্রীমুখার্জিকে লাঠি, লোহার রড প্রভৃতি দিয়ে আঘাত করতে থাকে, তিনি আহত হয়ে আর্ত চীৎকার করতে থাকেন, কিন্তু ঐ অঞ্চল হিন্দু-অধ্যুষিত হলেও কেউ তাঁর সাহায্যে এগিয়ে যান নি।
হিন্দুদের কাপুরুষতা : দায়ী কে?
পূর্বেই বলেছি, ঢাকার হিন্দু-মুসলমানগণ বরাবর সবগুলো সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘর্ষের মধ্য দিয়েই আত্মরক্ষার কৌশল বেশ ভালভাবেই আয়ত্ত করে নিজেদের রক্ষাই শুধু করেননি, প্রতিপক্ষকে চরম আঘাতও হেনেছেন। হিন্দুরাও যে সেদিক দিয়ে মুসলমানের পেছনে ছিলেন, তা’ মোটেই না। তার প্রমাণ আমরা দেখেছি ঢাকার নবাবপুরে রাস্তার পাশে একেবারে জেলা-কোর্টের গায়ে লাগা একটা মসজিদের ভাঙা স্তূপ থেকে। ঢাকার হিন্দুরাও ছিলেন বে-পরোয়া, অকুতোভয়। দেশ বিভাগ, তথা পাকিস্তান সৃষ্টির এই আড়াই বছরেরও কিছু কম সময়ের মধ্যেই হিন্দুর সেই সাহস—সেই মনোবল একদম ভেঙে গিয়েছে। আমরা ঢাকায় থেকে ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় যা’ দেখেছি তাকে ‘দাঙ্গা’ বলা ঠিক নয়। সেটা হয়েছিল একতরফা হিন্দু-গৃহ লুণ্ঠন ও হিন্দুর হত্যা। ‘দাঙ্গা’ হয় উভয় পক্ষের সংঘর্ষে। এই দাঙ্গায় আমরা দেখেছি একতরফা আক্রমণ; অপর পক্ষের কোন প্রতিরোধ তো ছিলই না—প্রকাশ্য প্রতিবাদেও তাঁদের মুখর হতে শুনিনি। এই পরাজিতের মনোভাব যে হিন্দুদের মধ্যে দেখা দিয়েছে, তার জন্য দায়ী কে? ঢাকার আদরণ হিন্দুরা, না কংগ্রেস নেতারা যাঁরা সাম্প্রদায়িকতার কাছে পরাজয় স্বীকার করে দেশ বিভাগ মেনে নিয়েছিলেন? আমার মত স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন ক্ষুদ্র সৈনিকের পক্ষে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া চূড়ান্ত ধৃষ্টতাই হবে। তাই আমার মতামত এখানে তুলে ধরতে ক্ষান্ত থেকে ভবিষ্যৎ ঐতিহাসিকদের উপরই এই প্রশ্নের মীমাংসার ভার ছেড়ে দিয়ে রাখলেম।
১৯৫০ সালের দাঙ্গায় দেখেছি ঢাকায় হিন্দু এলাকা বলে পৃথক সত্তার অস্তিত্ব একেবারে লোপ পেয়ে গিয়েছিল। দাঙ্গাকারীরা আমাদের বাসার দিকে ক্রমশঃ এগিয়ে আসছিল, কিন্তু রাস্তার মধ্যে হিন্দু বাড়ি লুট করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। সেদিনের মত তারা লুটের মালপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। ইতিমধ্যে আমরা খবর পাই এস.ডি.ও. শ্রীধীরাজ ভট্টাচার্য মহাশয়ের বাসার আশেপাশে আক্রমণ চলতে থাকায় তিনি সপরিবারে গিয়ে ওঠেন একটি আশ্রয় শিবিরে। সাময়িকভাবে তখন তখনই একটা আশ্রয় শিবির খোলা হয়েছিল।
শ্রীশ চট্টোপাধ্যায়ের অসীম সাহসিকতা
গেণ্ডারিয়া অঞ্চলেই তখন ঢাকার প্রখ্যাত নেতা শ্ৰীশ্ৰীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয় ছিলেন। তাঁর বাড়িও আক্রান্ত হয়েছিল। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, অন্তত ঐ অঞ্চলে যিনি আক্রমণকারীদের সামনে সিংহ-গর্জনে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বলে শুনেছি। তাঁর প্রতিরোধশক্তি দেখে আক্রমণকারীরা পিছিয়ে যায়। এই শ্রীশবাবুর রাজনীতিক জীবন শুরু হয় পূর্ববঙ্গে ‘অনুশীলন সমিতি’র স্রষ্টা পুলিনবিহারী দাস মহাশয়ের সহকর্মী হিসাবে। তিনি ঢাকার উকিল ছিলেন এবং বিপ্লবী কর্মীদের বহু মামলায় তিনি আসামীপক্ষের সমর্থনে বরাবর এগিয়ে গিয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আসামের গৌহাটি শহরে ফেরারী বিপ্লবীদের সাথে পুলিশের যে খণ্ডযুদ্ধ হয় এবং যার ফলে আমাদের দলের আমরা ৫ (পাঁচ) জন ধৃত হই—আমি পুলিশের রাইফেলের গুলীতে আহত হয়ে পরে কামাখ্যা পাহাড়ের উপরে ধরা পড়ি, এবং সেই ঘটনাকে অবলম্বন করে যখন আমাদের তৎকালীন ভারতরক্ষা আইনে ‘স্পেশাল ট্ৰিবিউনালে’ বিচার হয়, তখন সেই মামলায় কলকাতা থেকে ব্যারিস্টার শ্রীএস.এন. হালদার সাহেব ও ঢাকা থেকে শ্রীশবাবু আমাদের পক্ষ সমর্থন করতে বাংলা দেশ থেকে যান। শ্রীশবাবু বরাবরই ছিলেন অত্যন্ত নির্ভীক। ১৯২১ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মহাশয়ই তাঁকে গান্ধীজী পরিচালিত কংগ্রেসের নেতৃত্বে নিয়ে আসেন। তিনি গান্ধীজী পরিচালিত কংগ্রেসে আসেন বটে এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত (তিনি কিছুকাল আগে পশ্চিম বাংলায় এসে ৯১ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন)। তিনি যদিও কংগ্রেস-সেবীই ছিলেন, তবু তিনি কোনও দিনই গান্ধীজীকে “মহাত্মা” বলতেন না। আমার রচিত “India Partitioned and minorities in Pakistan” ইংরাজী বইখানির ভূমিকা তিনিই লিখেছিলেন। তাতেই দেখবেন, গান্ধীজীর নামের আগে তিনি ‘মহাত্মা’ কথাটি লেখেননি—আমি বলা সত্ত্বেও তিনি লিখতে রাজী হন নি। এইরকম একরোখা তিনি বরাবরই ছিলেন। এইটেই ছিল তাঁর চরিত্রের ও স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য ছিল বলেই তিনি সেদিন তাঁর বাড়িতে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পেরেছিলেন।
প্রহরা না নজরদারি?
স্বদেশবাবুকে তাঁর মুসলমান বন্ধুর দেওয়া খবর, অর্থাৎ আমাদের বাড়িও যে আক্রান্ত হবে সেই খবর সত্য বলেই আমরা ধরে নিয়েছিলেম। অতুলানন্দ বাবুকে, তাঁর জনৈক মুসলমান বন্ধুর দেওয়া দাঙ্গা আরম্ভ হওয়ার খবর সত্যে পরিণত হতে দেখে, আর মুসলমানদের দেওয়া খবর অবিশ্বাস করার আমাদের কোন কারণ ছিল না। ১৯৫০ সালের দাঙ্গা যে সুপরিকল্পিত ও পূর্বনির্দিষ্ট ছিল সে বিষয়ে অন্তত আমাদের মনে আর কোনও সন্দেহ ছিল না। তখনও না, এখনও না। সেটারই প্রমাণ আমি ক্রমশ আরও তুলে ধরবো। যাক, আমাদের বাড়ীও আক্রান্ত হবে ধরে নিয়েই আমরাও প্রস্তুতই হয়েছিলেম। আমরা ঠিক করেছিলেম, মরতেই যদি হয় তবে কোনওরূপ দুর্বলতা না দেখিয়ে বীরের মতই মৃত্যুকে বরণ করবো। কিন্তু আমাদের বাড়ি আর আক্রান্ত হল না। কেন যে হতে পারলো না, সেই কথাটিই বলছি। সন্ধ্যার পরই তিনজন মন্ত্রী-বন্ধু— (১) ডাঃ এ. এম. মালেক, (২) জনাব হবিবুল্লা বাহার ও (৩) জনাব তফাজ্জল আলি সাহেব, এক ‘ট্রাক’ ভর্তি বন্দুকধারী পুলিশ নিয়ে আমাদের বাসায় আসেন। পুলিশরা বন্দুক নিয়ে রাস্তায় টহল’ দিতে থাকেন; আর মন্ত্রীরা আমাদের উপরতলায় এসে আমাদের সাথে আলোচনা আরম্ভ করেন। নানা বিষয়েই আমরা আলোচনা করি। মন্ত্রীদের আমরা বলি যে একখানি ‘জীপ’ গাড়ি দু-একজন পুলিশ পাহারা সহ আমাদের দিলে যে সব হিন্দু মুসলমান মহল্লায় আটক পড়ে (marooned হয়ে) আছেন, তাঁদের আমরা নিরাপদ স্থানে উদ্ধার করে আনতে পারি। মন্ত্রী-বন্ধুরা তা’ দিতে রাজীও হন। কিন্তু তাঁরা তা’ দেন নি। আমার বিশ্বাস দিতে পারেন নি। কেন আমার ঐ বিশ্বাস হয়েছে, তাও আমি ক্রমশঃ দেখাতে চেষ্টা করবো। তাঁরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি ঠিক না রাখলেও, বা না রাখতে পারলেও তাঁরা যে একদল বন্দুকধারী পুলিশ নিয়ে এসে রাত ১২টা পর্যন্ত আমাদের বাসায় থাকেন এবং সিপাহীরা রাস্তায় টহল দিয়ে চলেন, শক্তির এই বহিঃপ্রকাশ (demonstration) যে ভবিষ্যৎ আক্রমণকারীদের উপর এমন একটা প্রভাব বিস্তার করেছিল, যার ফলে আর আমাদের বাড়ি আক্রান্ত হয়নি, সে বিষয়ে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই। মন্ত্রী-বন্ধুরাও হয়তো পূর্ব থেকে অন্যান্য মুসলমানদের মত খবর পেয়েই হোক, বা আশঙ্কা করেই হোক, একদল সশস্ত্র সিপাহী নিয়ে এসেছিলেনও বোধহয় সেই উদ্দেশ্যেই। যাক, আমাদের বাড়ি আর আক্রান্ত হল না; তবে, পুলিশ পাহারা সহ ‘জীপ’ না পাওয়ায় আমরা আর অন্যান্য হিন্দুকে উদ্ধার করতে পারলেম না।” (মন্ত্রী-বন্ধুরা প্রাক্তন বিপ্লবী কংগ্রেসী এম.এল.এ.দের পাহারা দিতে এসেছেন, না এরা কোনও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন কিনা সে সম্পর্কে নজর রাখতে এসেছেন সে সম্পর্কে ঘোর সন্দেহ আছে। যখন ঢাকা জ্বলছে তখন তিনজন মন্ত্রী ৫/৬ ঘণ্টা বসে বসে আড্ডা দিলেন; অথচ তারা একখানি ‘জীপ’ গাড়ি দিলে ঐ ৬ ঘণ্টায় কয়েকশ’ হিন্দুর প্রাণ রক্ষা হতো। তা তাঁরা করলেন না —লেখক)।
উদ্ধারকার্যে মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
“তবে, ভগবানই হয়তো অনেকের উদ্ধারের একটা যোগাযোগ অন্যের মারফত করে দিলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী তখন ছিলেন শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। তাঁকে আমি ১৯৪৬ সাল থেকেই দেখেছি। সুরাবর্দীর মন্ত্রিসভায় ও দেশ বিভাগের আগেই তিনি বাংলা দেশের মন্ত্রী ছিলেন। তিনি মুসলিম লীগের একজন উগ্র সমর্থক ছিলেন। দেশ বিভাগের পরেও তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন। বরাবরের সেই মুসলিম লীগ সমর্থক শ্রীযোগেন্দ্র মণ্ডল মহাশয় হঠাৎ ১০ই ফেব্রুয়ারী তারিখেই করাচি থেকে ঢাকায় এসে উপস্থিত হন। অতীতে তিনি যাই করুন না কেন, সেদিন ঢাকার কিছু সংখ্যক হিন্দুর—তার মধ্যে তাঁর সমগোত্রীয় হিন্দুই হয়তো বেশি ছিলেন—তিনি যথেষ্ট উপকার করেছেন। তিনি তাঁর গাড়ি ও পুলিশ নিয়ে গিয়ে অনেক হিন্দুকেই উদ্ধার করেছেন। হোক না কেন তাঁদের বেশির ভাগই তাঁর স্বজাতীয়, তবু তাঁরা হিন্দু, তাঁরা বিপন্ন মানুষ। যা আমরা করতে পারলেম না, তিনি তা’ সেদিন তাঁর মন্ত্রিত্বের পদাধিকারবলে করেছিলেন। সেজন্য তাঁকে আমি ধন্যবাদ না জানিয়ে পারি না। ইংরাজীতে একটা প্রবাদ আছে,”devils must be given their due shares.” অর্থাৎ মানুষ যতই মন্দ হোক না কেন, তার করা ভাল কাজও অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। যোগেনবাবুর রাজনীতিক মতের সাথে কোনও দিনই অতীতে আমরা একমত তো হতেই পারি নি, বরং সব সময়েই দেখেছি, তিনি আমাদের মতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী কাজই করেছেন; তবু, তাঁর সেদিনের কাজের জন্য আমি তাঁকে অকুণ্ঠচিত্তে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
হিন্দুদের ধুতি পরা শেষ : হিন্দু সংস্কৃতির বিনাশ শুরু
“অবশেষে ১০ই ফেব্রুয়ারীর সেই ভয়াবহ রাতও শেষ হয়। রাত ১২টা পর্যন্ত তো মন্ত্রীরাই ছিলেন আমাদের বাসায়। তাঁরা চলে যাওয়ার পরে বাকী রাতটুকু আমাদের কাটে না-ঘুম, না-জাগা অবস্থায়। বন্ধু রাজেনবাবু তো বেশ একটু ঘাবড়িয়েই গিয়েছিলেন! রোজ তিনি রাতে ‘লুঙ্গি’ পরে শুতেন। সেদিনে ধুতি-পরা অবস্থায়ই শুয়ে পড়লেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘লুঙ্গি’ পরলেন না? উত্তরে তিনি বললেন, ‘মরি তো নিজেদের পোশাকেই মরতে চাই!’ সেই দাঙ্গার পরে কিন্তু দেখা গিয়েছে যে পূর্ববঙ্গের অনেক হিন্দুই তাঁদের এতকালের অভ্যস্ত হিন্দুয়ানি জ্ঞাপক ধুতিই শুধু ছাড়েননি, তাঁদের ভাষা-কৃষ্টি প্রভৃতিও ছেড়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যেকার বাইরের ব্যবধান ক্রমশঃ সঙ্কুচিত করে আনছিলেন। সে সম্বন্ধে যথাসময়ে আরও বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করবো। এখন, দাঙ্গা সম্পর্কে যা বলছিলেম তার বিষয়েই বলি।”
ঢাকার গ্রামাঞ্চলে তাণ্ডবলীলা
“১১ই তারিখ সকাল থেকেই ঢাকা শহরে, আগের রাতে কোথায় কী হয়েছে, তার মোটামুটি খবর পেতে থাকি। গ্রামের দিকের খবরও ক্রমশ আসতে থাকে। ঐ ১১ই তারিখের পর থেকে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কোথায় কী হয়েছে, তারও অনেক খবরই ক্রমশঃ আমরা জানতে পারি; তবে, একথাও ঠিকই যে আমরা যা জেনেছি, তাও সম্পূর্ণ খবর নয়। আংশিক মাত্র। পুরোপুরি সঠিক খবর সরকারপক্ষ থেকে যতটা সম্ভব তা’ গোপনে রাখারই সবিশেষ চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা যে সব খবর পরে পেয়েছি বা সংগ্রহ করতে পেরেছি, তা আসল ঘটনার ‘ছিটে-ফোঁটা’ মাত্র। পুরো খবর আমরাও সংগ্রহ করতে পারিনি। কেউ আর কোনও দিন পারবেন বলেও আমি মনে করি না। ঐ দাঙ্গায় পূর্ববঙ্গের কোন্ জেলার কত লোক প্ৰাণ হারিয়েছেন, কত টাকার ধন-সম্পত্তি লুণ্ঠিত বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত নারী ধর্ষিতা বা অপহৃতা হয়েছেন, তার সঠিক খবর আর কারো পক্ষেই দেওয়া সম্ভবপর নয়, তবু, আমরা যেটুকু খবর পেয়েছিলেম বা সংগ্রহ করতে পেরেছিলেম তাই এখানে তুলে ধরবো।
ঢাকা জেলার গ্রামের খবর হচ্ছে, হিন্দুহত্যা ও হিন্দুর উপর নানা রকমের নির্যাতন, নারী-ধর্ষণ, নারী-হরণ সহ আগুনের তাণ্ডবে গৃহদাহ প্রভৃতি। ঢাকার গ্রামাঞ্চলের প্রতিনিধি, আমাদের বন্ধু শ্রীগণেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য এম. এল. এ. মহাশয়ের গভর্নরের কাছে ২১।১১।৫১ তারিখে প্রেরিত পদত্যাগপত্রে তিনি সে সম্পর্কে কিছু কিছু বলেছিলেন। গ্রামের যে সব হতভাগ্য হিন্দু ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় তাঁদের আত্নীয়স্বজন হারিয়েছিলেন, যাঁদের বাড়িঘর সব পুড়িয়ে দিয়ে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল, যাঁদের জমিজমাও বে-দখল করে জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল, সেই সব হতভাগ্যদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য সব রকম চেষ্টা করেও—এমন কি, কেন্দ্রীয় সরকারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রক্ষণাবেক্ষণের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ডাঃ মালেক সাহেবকে নিয়ে গিয়ে কয়েকটি গ্রাম দেখানোর পরে তিনি তাঁর সাথেই ভ্রমণরত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ও এস. ডি. ও.-কে অবিলম্বে উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করার মৌখিক আদেশ দেওয়া সত্ত্বেও যখন কিছুই ফল হয় না, তখনই তিনি (গণেনবাবু) হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করার আর তাঁর কোনও অধিকার নেই মনে করে এসেম্বলির সদস্যপদ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঐ পদত্যাগপত্র পাঠান।”
ভৈরব ব্রীজের উপর হত্যালীলা : মেঘনার কাল জল লাল হয়ে গেল
“আরও মর্মান্তিক, আরও ভয়াবহ ঘটনার খবর আমরা পাই। সেটি হচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে রেল গাড়িতে ভ্রমণরত নিরীহ নিঃসন্দিগ্ধ হিন্দু যাত্রীদের অমানুষিকভাবে হত্যা। সব কথা শুনে মনে হয়, বিভিন্ন কেন্দ্র এবং কোন্ তারিখে কোথায় ট্রেন থামিয়ে ঐ হত্যাকার্য সু-সমাধা করা হবে, তার পরিকল্পনা আগেই ঠিক করা হয়েছিল এবং রেল বিভাগের মুসলমান কর্মচারীদের অনেকেই তা’ জানতেন, যেমন জানতেন এই দাঙ্গা আরম্ভ হওয়ার দিন-ক্ষণ-তারিখ, অনেক মুসলমানই! আগেই বলেছি, সেই তারিখ ও সময় একজন মুসলমান বন্ধুর কাছে জেনেই অতুলানন্দবাবু ১০ই ফেব্রুয়ারীর সকালেই আমাদের বাসায় এসে বলেছিলেন। রেলের হত্যাকাণ্ডের একটা ঘাঁটি হয়েছিল, মৈমনসিংহ জেলার ভৈরববাজার রেল স্টেশন পার হয়ে মেঘনা নদীর উপর যে ‘এণ্ডারসন ব্রীজ’ আছে তার উপর ভৈরববাজার স্টেশন দিয়ে সেদিনে যত গাড়ি কুমিল্লা বা চট্টগ্রামের দিকে গিয়েছে, সব গাড়িগুলোকে নিয়ে গিয়ে মেঘনার উপরের রেল-সেতুর (যাকে সাধারণত বলা হয়, “ভৈরবী ব্রীজ”) উপর দাঁড় করিয়ে হিন্দুদের বেছে বেছে বের করে হত্যা করা হয়েছে এবং মৃত বা আহতদের দেহ মেঘনায় বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। সেদিনের কত লোক যে সেখানে নিহত হন, তার কোনও সঠিক হিসাব কেউ দিতে পারবেন না। তবে, ঐ অঞ্চলের হিন্দুদের কারো কারো কাছ থেকে পরবর্তীকালে শুনেছি যে মেঘনার কাল জল সেদিন হিন্দুর তাজা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। ট্রেনে ভ্রমণরত কোন হিন্দুই বাদ পড়তে পারে নি। ঐ ভীষণ হত্যাকাণ্ড দেখে যদি কোনও যাত্রী বলেছেন যে তিনি হিন্দু নন—মুসলমান, তখন তাঁকে উলঙ্গ করে দেখা হয়েছে যে তিনি সত্যিই হিন্দু, না মুসলমান! ঢাকায় দাঙ্গা আরম্ভ হওয়ার দিনে শ্রীবসন্তকুমার দাস (বিধানসভার বিরোধী দলের নেতা) মহাশয়ের বাসায় সিলেট থেকে তাঁর জনৈক আত্মীয় এসে আটক পড়েন। পূর্ববঙ্গের সর্বত্রই দাঙ্গা আরম্ভ হয়েছে শুনে তিনি তাঁর বাড়িতে যাওয়ার জন্য অতিমাত্রায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বসন্তবাবু তাঁকে নানাভাবেই নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করেন; কিন্তু পারেন না। তিনি ঢাকা ছেড়ে যান কিন্তু তিনি তাঁর সিলেটের বাড়িতে পৌঁছননি— আর কোনও দিন পৌঁছবেনও না!”
সান্তাহার স্টেশনে নির্বিচারে হিন্দু রেলযাত্রী হত্যা
“ভৈরব ব্রীজের হত্যাকাণ্ড ছাড়াও যে আরও একটি কেন্দ্র উত্তরবঙ্গে সেখানেও অনুরূপই হিন্দু-হত্যা একই দিনে হয়; সেই ঘটনা পূর্ব বা পশ্চিমবঙ্গের কোনও সংবাদপত্রে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সে ঘটনাটি বেমালুম লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে গিয়েছিল। আমি ঘটনাটির বিষয় পরে বিশেষভাবে জানতে পারি এবং আমার “India partitioned and minorities in Pakistan” নামক ইংরাজী বইয়ে—যে বইখানি U. NO.-এর ‘Human Rights Committee-’তে পাঠান হয়েছিল এবং সেখান থেকে পুস্তকখানি তাঁরা যে পেয়েছেন এবং তাঁদের সীমিত ক্ষমতার মধ্যে যা করণীয়, তা করেছেনও, বলে আমাকে জানিয়েছেনও—সে বিষয় উল্লেখ করেছি। সেই ঘটনার কেন্দ্রস্থল ছিল, রাজসাহী ও বগুড়া (উভয় জেলাই পাকিস্তানে) জেলার সীমান্তে ‘সান্তাহার’ নামক রেল স্টেশনে। স্থানটি নির্দিষ্ট হয়েছিল, সান্তাহার রেল স্টেশনের ‘আপ’-এর ‘ডিস্ট্যান্ট সিগনালের’ কাছে। ঐ দিনের সমস্ত ‘আপ’(Up) এবং ‘ডাউন’ (Down) ট্রেনগুলোকে ঐ ডিস্ট্যান্ট সিগনালের কাছে থামানো হয় এবং ট্রেনে সব হিন্দু যাত্রীকে ভৈরব ব্রীজের হত্যাকাণ্ডের মত একই পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়।
সেদিনের ‘ডাউন’ ট্রেন যতগুলোই কলকাতার পথে সান্তাহার স্টেশনের দিকে গিয়েছিল, সবগুলোকেই ডিস্ট্যান্ট সিগনালের কাছে থামিয়ে তার মধ্যকার হিন্দুযাত্রীদের হত্যা করা হয়েছিল। কত সংখ্যা যে ঐভাবে মারা গিয়েছিল, তা’ কেউ সেদিনেও বলতে পারেনি—আজ তো এতদিন পরে আর কারো পক্ষেই তার সঠিক সংবাদ দেওয়া সম্ভবপরই নয়, তবে শুনেছি যে ‘ডাউন ট্রেনের’ হিন্দুরাই ‘আপ ট্রেনের’ হিন্দুদের চেয়ে অনেক বেশি মারা গিয়েছিলেন; কারণ ‘আপ ট্রেনের’ হিন্দুদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে বা জোর করেও সান্তাহারের কয়েক স্টেশন আগে, ‘আত্রাই’ রেল স্টেশনে একটি তরুণ মুসলমান যুবক নামান। ঐ যুবকটি ছিলেন আত্রাই-এরই একটি বিশিষ্ট মুসলমান পরিবারের সন্তান। নাম মোল্লা আবুল কালাম আজাদ। মরহুম মোল্লা আহশানুল্লা সাহেবের ছেলে। মোল্লা-আবুল কালাম প্রায় সব হিন্দুকে— স্ত্রী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ প্রায় সকলকেই গাড়ি থেকে নামিয়ে নেন। অনেক হিন্দুই তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান হয়েছিলেন; তাই যেখানে আবুল কালাম সাহেব জানতে পেরেছিলেন যে, যাত্রী হিন্দু, সেখানে প্রয়োজনবোধে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা জোর করেও তাঁদের নামিয়েছিলেন। সন্দিগ্ধ হিন্দু যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য আত্মপরিচয় একদম গোপন করেই ঐ ট্রেনেই চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁরা তাঁদের গন্তব্যস্থানে কেউ পৌঁছতে পারেন নি—তাঁদের হয় প্রাণ দিতে হয়েছে, নয় তো আহত অবস্থায় মাঠে পড়ে থাকার পর ভাগ্যের জোরে পরে চিকিৎসায় ভাল হয়েছেন। আবুল কালাম সাহেব কিন্তু যাঁদের নামিয়েছিলেন, তাঁদের খাওয়ার জন্য চিঁড়া-গুড় ও শিশুদের জন্য দুধ—সবই দিয়ে তাঁদের সেদিনের বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলেন। এই ঘটনার ফলে, ঐ অঞ্চলের—আত্রাই, পাঁচপুর প্রভৃতি স্থানের হিন্দুরা—নানাভাবেই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।”
বরিশাল রক্তে লাল : নির্বাক লীগ বন্ধু যোগেন্দ্ৰ মণ্ডল
“১১ই ফেব্রুয়ারী ও তার পর থেকে আমরা নানা স্থানেরই দাঙ্গার খবর পেতে থাকি। ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বোধ হয় হয়েছিল বরিশাল জেলা। তার মধ্যে আবার বরিশাল জেলার নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের ক্ষতিই হয় সর্বাধিক। তাঁদের বাড়িঘরও পুড়েছিল বেশি এবং লোকও নিহত হয়েছিলেন সব চেয়ে বেশি। বরিশাল, ফরিদপুর খুলনা প্রভৃতি জেলায় বহু সংখ্যক নমঃশূদ্রের বাস ছিল। তাঁরা সঙ্ঘবদ্ধও ছিলেন এবং মনোবলও তাঁদের ছিল অটুট। তাঁরা সংগ্রামী ও ছিলেন বরাবরই। মুসলমান ও নমঃশূদ্রের মধ্যে ইংরাজ আমলেও বহুবার সঙ্ঘর্ষ ও দাঙ্গা হয়েছে কিন্তু কোনও সঙ্ঘর্ষেই মুসলমানগণ, নমঃশূদ্রগণকে পর্যুদস্ত করতে পারেন নি; বরং, তাঁদের হাতে পাল্টা মারই খেয়েছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সেখানে সাম্প্রদায়িক সংগ্রামের যে ধারা দেখেছি, তা’ ভালোভাবে পর্যালোচনা করে দেখলে এই সত্যই প্রকাশ পাবে যে হিন্দুর জোট ও সঙ্ঘবদ্ধতা ভেঙে দিয়ে তাঁদের মনোবল একদম ভেঙে দেওয়াই ছিল মুসলিম লীগের নীতি ও উদ্দেশ্য। এই সত্যটাই আমি উদ্ঘাটন করে ক্রমশঃ তুলে ধরতে চেষ্টা করবো। বরিশালের নমঃশূদ্রদের উপর ১৯৫০ সালের আক্রমণ সেই নীতিরই ফল। শ্রীযোগেন্দ্র মণ্ডল মহাশয় দাঙ্গা বাধার ২।৩ দিনের মধ্যেই বরিশাল গিয়ে পৌঁছান। তখনও তিনি কেন্দ্রের একজন মন্ত্রী। মন্ত্রী থেকেও তিনি তাঁরই আত্মীয়স্বজন ও স্বজাতীয়দের রক্ষা করতে পারেননি। হয়তো, তাঁর পৌঁছানোর আগেই গৃহদাহ, লুটপাট ও হত্যা—সবই হয়ে গিয়েছিল; তবু তিনি মন্ত্রী হিসাবেই সেই বীভৎসতার স্বরূপ প্রকাশ করে দিতে পারতেন; কিন্তু তিন তা’ করেননি। তিনি ক্রুদ্ধ ও মর্মাহত হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু তার অভিব্যক্তি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেননি। মন্ত্রী হিসাবে তিনি সে কথা প্রকাশ করলে, তার একটা বিশেষ মূল্য বিশ্বের দরবারে হয়তো হতে পারতো। তা’ হয়নি। তিনি কিছু না বললেও বরিশালে একটি হিন্দু-বাঘও ছিলেন। তিনি গর্জে উঠেছিলেন। শ্রদ্ধেয় বন্ধু সতীন সেন (পরে পাকিস্তান সরকারের বন্দী অবস্থায় ঢাকায় পরলোকগমন করেন) ছিলেন সেই বাঘ। তিনি জোর গলায় প্রকাশ্যভাবেই তৎকালীন ঐ জেলার ম্যাজিস্ট্রেট— মিঃ ফারুকির (আই. সি. এস.) সম্পর্কে অভিযোগ করেছিলেন যে তিনি পুলিশ দলকে নিষ্ক্রিয় রেখে ঐ গৃহদাহ, হত্যাকাণ্ড প্রভৃতি সমাজবিরোধী কাজে উস্কানি দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন; ফলে, সতীনবাবুকে ও তাঁর সহকর্মী শ্রীপ্রাণকুমার সেনকে (১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান এসেম্বলির সদস্য হন। বর্তমানে পরলোকগত) পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠান হয়।”
নাই, নাই, নাই : ছাই আর ছাই
“তার পরের দিনই তিনি (যোগেন্দ্রবাবু) সম্ভবত খবর পেয়েই, তাঁর জেলা বরিশালে চলে যান। সেখানে গিয়েই সব অবস্থা স্ব-চোখে দেখে ও জীবিত আত্মীয়স্বজনের কাছে পূর্ণ বিবরণ শুনে তাঁর এতকালের সযত্নে পোষিত মুসলিম লীগের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের মোহমুক্তি ঘটে। তাঁর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও তাঁর সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে যাঁর কাছেই খোঁজ করেন তাঁর কাছ থেকেই শোনেন—”নাই, নাই, নাই, আর শোনেন, চার দিকেই বুকফাটা আর্তনাদ ও মর্মভেদী হাহাকার! তিনি বরিশালে গিয়ে দেখেন, তাঁর সমাজের বস্তিগুলোর শশ্মশানের দৃশ্য। বাড়ি নেই, ঘর নেই, নেই বলতে কিছুই নেই; আছে শুধু—ছাই, আর ছাই!” (পাক-ভারতের রূপরেখা —প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী)
উদ্ধৃতি হয়তো দীর্ঘ হয়েছে; কিন্তু বিভাগ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের দুঃখদুর্দশাময় জীবনের চিত্র এমন নির্ভীক ও নিরপেক্ষভাবে আর কোনও রাজনীতিক বা লেখক লিপিবদ্ধ করে যান নি। বলতে গেলে সারা পৃথিবীতে কোনও দেশে একটি সুসংবদ্ধ সমৃদ্ধিশালী জনগোষ্ঠীকে ধর্মীয় বিভেদ হেতু এমন পরিকল্পিত নৃশংসতার মাধ্যমে উচ্চাসন থেকে টেনে নামিয়ে ধুলায় মিশিয়ে দেবার দ্বিতীয় নজির আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যাদের আত্মত্যাগে রক্তদানে স্বাধীনতা এল, শুধুমাত্র সংখ্যাধিক্যতার জোরে তাদের সে স্বাধীনতার ফলভোগ করতে তো দেওয়াই হল না; বরং ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করে দেশ থেকে তাড়িয়ে ছাড়ল। সে হিসাবে দেখতে গেলে প্রভাসবাবুর এই নির্মম কাহিনী এক অনবদ্য তথ্যচিত্র বিশেষ।
যা হোক যোগেন্দ্রবাবুর শেষ পরিণতি সম্পর্কে প্রভাসবাবু বলে গেছেন : “আমাদের যে সব বন্ধু পাকিস্তান পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন, তাঁদের কারো কারো কাছে পরে শুনেছি যে যোগেনবাবু ক্রুদ্ধ অবস্থায় করাচিতে ফিরে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি সাহেবকে সব বলেন। সেই নিয়ে জনাব লিয়াকত আলি সাহেবের সাথে কিছু গরম গরম কথাও নাকি হয় এবং লিয়াকত আলি সাহেব যোগেনবাবুকে মন্ত্রীর গদী থেকে নামিয়ে জেলখানার আরামঘরে (!) পাঠানোর নাকি ব্যবস্থা করেন। যোগেনবাবু তার আভাষ পেয়েই করাচি থেকে কেটে পড়েন।” এবং অবিলম্বে শ্যামাপ্রসাদ সৃষ্ট পশ্চিমবঙ্গেই সপরিবারে আশ্রয় নেন— একা নন, তাঁর স্ব-সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ নির্যাতিত নরনারী সমেত।”
বিচিত্র তথ্য—প্রায় ১০,০০০ মৃত : পুরুষদের হত্যা, নারীদের বণ্টন
প্রভাসবাবুর কলমে তো যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের প্রতিক্রিয়ার কথা জানলাম। এখন যোগেনবাবু তাঁর পদত্যাগ পত্রে বরিশালে তাঁর প্রত্যক্ষলব্ধ অভিজ্ঞতার কথা যা লিখেছেন তা শোনা যাক :
‘ঢাকায় নয়দিন অবস্থানকালে আমি ঢাকা ও তার সন্নিহিত এলাকার প্রায় সব দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে শত শত নিরপরাধ হিন্দুর হত্যালীলার সংবাদ আমাকে যৎপরোনাস্তি ব্যথিত করল। ঢাকা দাঙ্গার ২য় দিনে আমি পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। জেলা শহরগুলিতে, মফস্বলে এবং গ্রামাঞ্চলে যাতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়িয়ে না পড়তে পারে সেদিকে দৃষ্টি রেখে জেলা কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে তৎক্ষণাৎ জরুরী নির্দেশ পাঠাতে অনুরোধ জানালাম তাঁকে। ইং ২০শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫০ আমি বরিশাল পৌঁছলাম এবং সেখানকার দাঙ্গার ঘটনাবলী জেনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সেই জেলা শহরে প্রচুর ভ্রহিন্দু বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে। এই জেলার প্রায় প্রত্যেকটি দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এলাকা আমি পরিদর্শন করি। আমি সত্যিই বুঝতে পারি না কি করে জেলা শহর থেকে মাত্র ৬ মাইল পরিধির মধ্যে মোটর রাস্তা দ্বারা যুক্ত কাশীপুর, মাধবপুর, মাধবপাশা এবং লাকুটিয়ার মত স্থানেও মুসলিম দাঙ্গাবাজরা বীভৎস তাণ্ডব সৃষ্টি করতে পারে! মাধবপাশার জমিদার বাড়ীতে প্রায় ২০০ জনকে হত্যা ও ৪০ জনকে আহত করা হয়। মূলাদি নামক একটি স্থানে নরকের বিভীষিকা নামিয়ে আনা হয়। স্থানীয় মুসলমান এবং অফিসারদের বক্তব্য অনুযায়ী একমাত্র মূলাদি বন্দরেই ৩০০ জনের বেশি লোককে হত্যা করা হয়। মূলাদি গ্রাম পরিদর্শনকালে আমি স্থানে স্থানে মৃত ব্যক্তিদের পড়ে থাকতে দেখেছি। দেখলাম নদীর ধারে ধারে কুকুর-শকুনেরা মৃতদেহ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। আমি জানতে পারলাম, সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে পাইকারীভাবে হত্যা করার পর সব যুবতী নারীকে দুষ্কৃতকারীগণের সর্দারদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। রাজাপুর থানার অন্তর্গত কৈবর্তখালি গ্রামে ৬৩ জনকে হত্যা করা হয়। ঐ থানা অফিসের অনতিদূরে অবস্থিত হিন্দুর বাড়িগুলি লুট করে জ্বালিয়ে দিয়ে গৃহবাসিগণকে হত্যা করা হয়। বাবুগঞ্জ বাজারের সমস্ত হিন্দুর দোকান প্রথমে লুঠ করে পরে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিস্তৃত বিবরণ যা হাতে এসেছে, তা থেকে খুব কম করে ধরলেও একমাত্র বরিশাল জেলাতেই হত্যা করা হয়েছে ২৫০০ জনকে। ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গের দাঙ্গার বলির সংখ্যা মোট ১০,০০০ হাজারের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। এক সত্যিকারের গভীর দুঃখে আমি কাতর হয়ে পড়লাম। প্রিয় পরিজন-স্বজন হারানো নারী-পুরুষ ও শিশুদের সব-হারানোর কান্না-বেদনা-বিলাপে আমার ভগ্ন হৃদয় হাহাকার করে উঠল। আমি নিজেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম, “পাকিস্তানে ইসলামের নামে এসব কি চলছে!”
যোগেন্দ্রবাবু চিরদিন মুসলিম লীগের দোস্ত ও পাকিস্তান দাবির উগ্র সমর্থক ছিলেন। এখন আত্মীয়-স্বজন হারাবার বেদনায় তাঁর আত্মগ্লানির কথা ভবলে দুঃখ হয় না, করুণা হয়।
কিভাবে মূলাদির হিন্দুদের খতম করা হয়েছিল : প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে মূলাদি ‘অপারেশন’
“…. মূলাদিতে অ্যাটাক হয়েছিল ১৯৫০-এর মার্চে। সন্ধ্যাবেলা বিরাট একটা ‘মব’ আল্লা হো আকবর বলতে বলতে গ্রামের দিকে থেকে বেরিয়ে আসে। তাদের বেশির ভাগই ছিল বাইরের লোক। হিন্দুরা ভয় পেয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। সেখানে সারারাত কাটিয়ে পরের দিন ফিরে দেখে, বাড়িঘর ব্যবসার গদি—সবই লুট হয়ে গেছে। এই সময় আবার চীৎকার শোনা গেলে হিন্দুরা জঙ্গলে চলে যায়। সেখানে একটা মুসলমান ছেলে, সে ইস্কুলে আমার সঙ্গেই পড়ত, স্রেফ একটা লাঠি নিয়ে ভয় দেখিয়ে ছিনতাই করতে শুরু করে। আমার বোনের গলার হারটা সে নিয়ে গিয়েছিল।
আখ্যানের এই জায়গায় এসে বেনুধর ঘোষ অদ্ভুত হাসেন-সে হাসিতে বেদনার চেয়ে তিক্ততাই বেশি। ‘আর্মড মব’-কে তিনি একরকম করে বোঝেন; কিন্তু মেলাতে পারেন না সহপাঠী কিশোরের এই আচরণ।
…সন্ধ্যার দিকে আকাশে একটা পাখাওলা এরোপ্লেন দেখা গিয়েছিল। হিন্দুদের আশা হয়, তাদের সাহায্যের জন্যে হয়ত পুলিস বা মিলিটারি আসছে। তাঁরা জঙ্গ ল থেকে বেরিয়ে এসে থানায় গিয়ে দারোগার কাছে আবেদন করেন–তাঁরা থানার সামনে খোলা মাঠে রাতটা কাটাতে চান—পুলিশ তাদের পাহারা দিক। দারোগা আনসার বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে রাজী হন। বাহিনীর লোকেরা রাতে পাহারায় থাকে, একটা হামলাও ঠেকিয়ে দেয়। তবে ঘরছাড়া পরিবারগুলির সঙ্গে যা যা ছিল, সবই তা নিঃশব্দে লুট করে নেয়।
দুদিন এইভাবে খোলা মাঠে পরিবারগুলিকে থাকতে দিয়ে তৃতীয় দিনে দারোগা এসে বলেন, তারা গদিঘরে চলে যাক— সেখানে শেড আছে; নিরাপদে থাকতে পারবে। হিন্দুরা এই কথায় রাজী হয়ে যান। তাঁরা বুঝতে পারেননি, কী ধরনের চক্রান্ত এর পেছনে আছে।
গদিঘরে যাবার মুখে দু-একটি খুনজখমের কথা শোনা যায়। জগন্নাথ মন্দিরের ওড়িয়া পুরোহিত ক্ষতবিক্ষত দেহে পড়ে আছে; আর তার ওপর উপুড় হয়ে আছেন পুরোহিতের নববিবাহিতা স্ত্রী—বারো বছরের বালক বেণুধর ঘোষ স্বচক্ষে দেখেন সেই দৃশ্য।
গদিঘরে চলে আসার পরের দিন সকাল দশটা নাগাদ আবার এল সেই হানাদার বাহিনী। এবার তাদের উদ্দেশ্য একটাই : হত্যা। পুরুষদের তারা টেনে টেনে বের করতে লাগল। কেউ বাধা দিতে গিয়ে জখম হলেন। কেউ কেউ পালিয়ে নদী সাঁতরে নিজেদের প্রাণ বাঁচালেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন বক্তার ছোটকাকা।
নারী শিশুরা ততক্ষণে গদিঘরের মাচায় উঠে পড়েছেন। সেখানে থেকে তারা দেখতে পাচ্ছেন পুরুষদের একে একে হত্যা করা হচ্ছে। যাঁরা দেখতে পাচ্ছেন, তাঁরা শুনছেন আক্রান্ত মানুষগুলির মরণ-মুহূর্তের আর্তনাদ। ‘…….আমার বাবাকেও টেনে বের করল। … বাবার ঘাড়ে একটা কোপ দিচ্ছে এইটুকু দেখতে পেয়েছিলাম। তারপরে কী হয়েছে জানি না। পরে যেন দেখেছিলাম, পায়ে দড়ি বেঁধে দেহটা নদীতে ফেলে দিচ্ছে। আমার দুই জ্যাঠাকেও এইভাব খুন করে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল।
স্মৃতি এইখানে ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়: বেণুধর ঘোষ যতটুকু বলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুক্ত রয়ে যায়। তবু ভাষা গেঁথে গেঁথেই তৈরি হয় কয়েকটি খণ্ডচিত্র। বেণুধর ঘোষ বলে যান : ‘আমাকেও ওরা টেনে নামিয়েছিল কাটবে বলে। আমার মা ওদের পায়ে লুটিয়ে পড়ে বলে, ওকে তোমরা মুসলমান করে নাও—প্রাণে মেরো না। কী ভেবে ওরা আমাকে ছেড়ে দিল। পরে খবর পাই, আমার দুই জ্যাঠতুতো দাদাও খুন হয়েছে।
মূলাদির পরই অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হল অদূরবর্তী রাজপুর গ্রাম। সে গ্রামে জনৈক ভুক্তভোগীর মুখ থেকে :
“১৯৫০-এর এপ্রিল মাস শিবরাত্রির দিন সেটা। সন্ধ্যের পরই আগুন দেখা গেল। যারা আগুন লাগাচ্ছে, তারা এগিয়ে আসছে, চীৎকার শোনা যাচ্ছে। বাড়ির সবাই ছাদে উঠে গেছে। বাবা কিন্তু যেতে চাইলেন না। বাবা তখনও বলে যাচ্ছেন আমাদের কে অ্যাটাক করবে? কী করেছি আমরা! বাবা আর জ্যাঠামশাই নিচে রয়ে গেলেন। আর সবাই ছাদে উঠে গেল। সেখান থেকে ওরা শুনতে পাচ্ছিল, দরজা ভাঙা হচ্ছে। তারপর সিঁড়িঘরে আগুন লাগানো হলো।’
বরিশালের ঝালোকাটি অঞ্চলের রাজপুর গ্রামের সন্তান সুকুমার মুখোপাধ্যায় ৪৩ বছর পরে কলকাতায় বসে সেই কাহিনী শোনাতে গিয়ে অস্থির হয়ে পায়চারি করতে শুরু করেন। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে একবারও না থেমে বলে যান কাহিনীর সবচেয়ে মর্মন্তুদ অংশটি :
জ্যাঠামশাই ঘরের মধ্যেই পুড়ে মারা গিয়েছিলেন। আমার এক ভাইঝি আর পাশের বাড়ির কয়েকজন মোট ন’জনকে কেটে ফেলেছিল। সিঁড়ির ধাপে ধাপে বসিয়ে রেখে গিয়েছিল কাটা মুণ্ডুগুলো। বাবা আর দাদার দারুণ চোট লেগেছিল। মার কোমরে ল্যাজার একটা কোপ পড়েছিল।”
(দেশভাগ : স্মৃতি আর সত্তা-সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়)
খালেবিলে মৃতদেহ : কবিচিত্ত বিষাদিত
বরিশালের প্রলয়ঙ্কর দাঙ্গার আর একজন প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী ছিলেন পূর্ববঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিয়াল নকুলেশ্বর সরকার (ঝালকাটি-বরিশাল)। তিনি তাঁর নিদারুণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন তাঁর নিজের মুখে :
“১৯৫০-এর আরম্ভ। নকুলেশ্বর কুমিল্লা জেলার গৌরীপুর বাজারের কাছাকাছি অঞ্চলে গান গাইছেন। হঠাৎ সংবাদ এলো যে নোয়াখালির ‘রায়টের’ চেয়েও খুব বড় ‘রায়ট’ আরম্ভ হয়েছে বরিশালে। স্থানীয় গুণ্ডাদের সঙ্গে বিহারী মুসলমানরা যোগ দিয়ে হিন্দু-ধ্বংস অভিযান শুরু করেছে। সংবাদ শুনে নকুলেশ্বর বড় বিচলিত হয়ে পড়লেন। দল বন্ধ করে দেশে যাওয়ার মনস্থ করলেন। স্থানীয় হিন্দু মুসলমান সকলেই তাঁকে নিষেধ করতে লাগলেন— আপনি এসময় বরিশাল রওনা হবেন না, পথে আপনার বিপদ হতে পারে। শুনেছি ষণ্ডাগুণ্ডার দল এক অরাজকতা আরম্ভ করেছে—নদীপথে বেপারী মহাজন যার নৌকা পায়, খুন-জখম করে সব লুটপাট করে নিয়ে যায়।
নকুলেশ্বর বললেন— দেশের আত্মীয়-পরিজন যারা আছে তাদেরই যদি মেরে ফেলে তবে আমি বেঁচে থেকে লাভ কি! আমায় যেতেই হবে। গৌরীপুর বাজারে সোনা মিঞা নামে একজন বড় কাপড়ের ব্যবসায়ীর সঙ্গে নকুলেশ্বরের বন্ধুত্ব হয়েছিল। তিনি বললেন—একান্তই যদি যেতে হয়, তবে হিন্দু পরিচয় দেবেন না— পথে-ঘাটে মুসলমান পরিচয় দেবেন। এই বলে তিনি দলের সব পুরুষদের একটা করে লুঙ্গী ও একটা করে সাদা টুপী এবং মেয়েদের তিন জনের জন্য তিনটা বোরখা দিয়ে বললেন—বন্ধুর এই দান গ্রহণ করুন। খোদার কি মজি, জানি না আর দেখা হবে কিনা। খোদার কাছে মোনাজাত করি যেন আপনাদের মঙ্গলে রাখেন—এই বলে সাশ্রু নয়নে নকুলেশ্বরকে বিদায় দিলেন।
বরিশাল অভিমুখে নৌকা চলল—মাঝিমাল্লাসহ সকলের ঐ মুসলমানী পোশাক। বাদাম দিয়ে নৌকা ছুটেছে, সবার প্রাণে আতঙ্ক; কি হয় কি হয়! নৌকার মধ্যে কোন সাড়া-শব্দ নেই।
নকুলেশ্বরের দলে তখন গায়িকা ছিল চারজন—মানদা, হিরণবালা, কিরণবালা ও শরৎবালা। এরা সবাই বোরখা পরে নিয়েছিল। পুরুষদের মধ্যে দলের ধরতা দোহার ছিল–আচার্যকর্তার দলের সেই সুবল ও বিহারী। তাদের বাড়ী ছিল কুমিল্লায়। দল বরিশাল আসার পথে তারা বাড়ি চলে গেল। নৌকায় রইলেন নকুলেশ্বর স্বয়ং, ঢুলি হরিচরণ, হারমোনিবাদক অশ্বিনী শীল, আর তিন জন মাঝি— তাদের নাম শিশু মণ্ডল, বাহেরালী ওরফে কালাচাদ এবং নকুলেশ্বরের বাড়ীর পাশের ইঞ্চি হাওলাদার— সে বারোমাস নৌকা-রক্ষক হিসেবে নৌকায় থাকত।
মোট এই নয়টি প্রাণী প্রাণ হাতে করে বরিশাল অভিমুখে মেঘনার বুক চিরে অগ্রসর হলো। মাঝি মাল্লা সহ সকলের ঐ মুসলমানী পোশাক। বাদাম দিয়ে নৌকা ছুটেছে। আশেপাশে অন্য নৌকা দেখলেই বুক ঢিপ্ ঢিপ্ করতে থাকে। নৌকা পাশ কেটে গেলে একটু স্বস্তি। নৌকার মধ্যে কোন সাড়াশব্দ নেই। যে নকুলেশ্বরের পানসী নৌকা সর্বদা গানবাজনার শব্দে থাকত আনন্দ কোলাহলে মুখরিত, সেই নৌকা আজ নিষ্প্রাণ নিস্পন্দ। নৌকা থেকে তাঁর বিজয় কেতন “বীণাপাণি কবি পার্টি” নামাঙ্কিত বোর্ড সরিয়ে “সার্কেল অফিসার” নামাঙ্কিত ভূয়া বোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হোল।
বারো আনা পথ কেটে গেল। কোন বিপদের চিহ্ন নেই। প্রায় বরিশাল জেলার কাছাকাছি ফরিদপুর-বরিশালের বর্ডারে নৌকা এসেছে। বেলা ১০টা। এমন সময় দেখা গেল, পনের বিশ খানা ডিঙ্গি ছিপ্ নৌকা—এক এক নৌকায় বিশ-পঁচিশ জন করে লোক— ল্যাজা, সড়কি, রামদাও ইত্যাদি হাতে নিয়ে নকুলেশ্বরের নৌকা ঘিরে ফেলে হাঁক দিচ্ছে—নৌকা থামা, বাদাম নামা ইত্যাদি কোলাহল।
নকুলেশ্বর মাঝিদের বললেন—সাহস করে তোরাও একটু জোরে জোরে বল—কেন রে, নৌকা থামাব কেন রে? এটা সার্কেল অফিসারের নৌকা। বরিশাল কোর্টে যেতে হবে, এখন সময় নাই। মাঝিরা এবং দলের লুঙ্গীপরা পুরুষ কয়জন একত্র হয়ে ঐ কথা বলে খুব জোরে জোরে উত্তর দিচ্ছে।
গুণ্ডারা বলে—কেমন সারকেল্ অফিসার আমরা দেখব। ভাগ্য ভালো ছিল, নৌকাগুলি ত্রিশ-চল্লিশ হাত তফাতে ছিল।
নকুলেশ্বর ভাবলেন—ওরা যদি নৌকার পার্শ্বে এসে নৌকায় উঠে পড়ে তখন তো আর করণীয় কিছু থাকবে না; আগেই বাধা দেওয়া দরকার। এই ভেবে নকুলেশ্বর একটা ভালো জামা গায় দিয়ে গুলির বাক্স ও বন্দুক নিয়ে লাফ দিয়ে ছাদের উপরে উঠে সেই ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন এবং বন্দুকে গুলি ভরে বললেন—আয়, সারকেল অফিসার দেখবি তো আয় শালারা! মগের মুল্লুক পেয়েছিস্? এই বলে দুম্দাম্ করে ২/৩টা ফাঁকা আওয়াজ করামাত্র—-পাখির ঝাঁকে ঢিল পড়ার মতো ওরা সব ছুট্ ছাট্ চারদিকে পালিয়ে গেল। নকুলেশ্বর ভগবানকে শত শত ধন্যবাদ দিতে দিতে খালের মধ্যে ঢুকে বললেন—যাও, ফাঁড়া কেটে গেছে।
খালের মধ্যে দিয়ে যত অগ্রসর হচ্ছেন ততই রায়টের বীভৎস দৃশ্য চোখে পড়ছে। হিন্দুর গ্রাম বলতে কোন চিহ্ন নেই। শুধু ভস্মের স্তূপ। এমনভাবে আগুনে পুড়িয়েছে যে তাল-নারিকেল গাছের মাথা পর্যন্ত পুড়ে গেছে।
খালের দুই ধারে ঝাড় জঙ্গলে খালের জলে অসংখ্য মরা মানুষ ভেসে যাচ্ছে। এইসব দৃশ্য দেখে নকুলেশ্বরের চোখে জল এলো—হায় ভগবান! একি প্রলয় দৃশ্য দেখালে? দু’তিন মাস আগে এই খাল দিয়ে যখন ঢাকা, ত্রিপুরা যাচ্ছিলেন তখন প্রত্যেকটা বাড়ি ধনে জনে শিশুর কলকোলাহলে পূর্ণ; আজ সব বাড়িতে শ্মশানের নিস্তব্ধতা!
নকুলেশ্বর মনে মনে ভাবছেন— আমাদের গ্রামেও কেউ বোধ হয় বেঁচে নেই। কালিজিরা নদীতে পড়ে বাড়ির দিকে যত এগুচ্ছেন ততই যেন তাঁর হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। এই নদীর পাড়েই তাঁর বাড়ী! নদীর ঘাট হতে রসি দুই তফাত।
গৃহ না শ্মশান – কলকাতায় আশ্রয়ের সন্ধানে
বাড়ির ঘাটে গিয়ে নকুলেশ্বর মাঝিদের বললেন—নৌকা ঘাটে ভিড়িও না; মাঝ গাঙ্গে নোঙ্গর কর। নকুলেশ্বরের নৌকা দেখে গ্রামের কয়েকজন মাতব্বর মুসলমান নদীর কূলে এসে ডাকলেন—সরকার মহাশয়, মাঝগাঙ্গে নৌকা বাঁধলেন কেন? কিনারে আসুন। আপনার কোন ভয় নেই। আমাদের এখানে ‘রায়ট’ হয়েছে বটে, কিন্তু কাটাকাটি হয় নাই। আসুন— নেমে বাড়ি যান।
নকুলেশ্বর বললেন—বাড়ি যাব—বাড়ি কি আছে?
মাতব্বররা বললেন—আছে আছে; গ্রামের অন্যান্য বাড়ি-ঘর পুড়ে গিয়েছে। আপনার জারিগানের ‘বয়াতি’ শিষ্যেরা আপনার ঘরে আগুন দিতে দেয় নাই, যান বাড়ি যান। নকুলেশ্বর ঘাটে নৌকা এনে ছুটে বাড়ি গেলেন। গিয়ে দেখেন বাড়ি তো নয় যেন শ্মশান। ঘরখানা মাত্র সাক্ষীস্বরূপ দাঁড়িয়ে আছে; চাল বেড়া ছাড়া আর কিছুই নেই; এমন কি ঘর কুড়ানো ঝাঁটা গাছাটা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। অন্যান্য কোন বাড়ীতে ঘরের চিহ্নও নেই— সব পুড়ে ছাই করে গিয়েছে। নকুলেশ্বরের স্ত্রী-পুত্র পরিজন সব কেউ বনজঙ্গলে, কেউ মুসলমান বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে কোন প্রকারে বেঁচে আছে।
নকুলেশ্বর বাড়ি এসেছে সংবাদ পেয়ে সকলে এসে জড়ো হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। সে দৃশ্য বর্ণনাতীত। ওদিকে গ্রামের মাতব্বর মুসলমানরাও এসে নানারকম সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। তাঁরা বললেন—পশুর দলেরা যা করেছে, খুব অন্যায় করেছে। আপনি গ্রামের সকলকে বলুন, কেউ যেন সরকারী ক্যাম্পে না যায়। আমরা লুটের মাল ফেরত দেবার ব্যবস্থা করব।
প্রকাশ্যে নকুলেশ্বর বললেন—আপনারা যা ভালো মনে করেন তাই করুন। কিন্তু মনে মনে বললেন—কি বিশ্বাসঘাতকতা, কি অকৃতজ্ঞতা! এদের অসাধ্য কর্ম কি আছে? যাদের পূজা-পার্বণ আনন্দ-উৎসবে নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছি, বাবার শ্রাদ্ধে গ্রামশুদ্ধ সবাইকে নিমন্ত্রণ করেছি, আমার বাড়ির দরজায় রান্না করে তারা খেয়ে গেছে। আজ তাদেরই এই কাজ? আর ওদের কথায় বিশ্বাস করব না। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বললেন না।
প্রত্যেক দিন সন্ধ্যাবেলা মাতব্বর মিঞারা এসে বসতেন। আর সামান্য কিছু লুট করা মাল—ভাঙ্গা পিঁড়ি, টুটা থালা এনে ফেরত দিতেন। ইস্লামী রাষ্ট্রে “জিম্মি”র অবস্থা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল।
দু’চার দিন এভাবে চলার পর নকুলেশ্বর মাঝিমাল্লা ছাড়া আর সকলকে বিদায় দিলেন। কারো কাছে কিছু না বলে একদিন কলকাতা রওনা হলেন। কিন্তু সে কি এক অস্বস্তিকর অবস্থা! স্টীমারে ট্রেনে সূঁচ ফোটাবার জায়গা নেই। লক্ষ লক্ষ লোক পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয়ের জন্য একবস্ত্রে ছুটেছে। জনস্রোতের ঢেউ যেন পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে। প্রাণ-ভয়ে ভীত মানুষের চেহারা কি ভীষণ হতে পারে—তিনি সেদিন তা প্রত্যক্ষ করলেন। আর তাদের মধ্যেই দেখলেন তাঁর কবিগানের পরমভক্ত—মণ্ডল-বিশ্বাস-হাওলাদার-দে-দত্ত-দাস-ঘোষ-
বসু-গুহ-মিত্র-মজুমদার-সিংহ-পাল-ভট্ট-সাহা-বণিক-কুণ্ডু-মুখার্জী-ব্যানার্জী-চক্রবর্তী-ভট্টাচার্য-নাথ-শীল-ধূপী-গুপ্ত-সেন-রায়-চৌধুরী-চ্যাটার্জী-গাঙ্গুলী প্রভৃতি উপাধিধারী পূর্ববঙ্গের কবিরসিক শ্রোতাদের ধনমান-জীবনহারা অসহায় মলিন মুখ। সাত পুরুষের ভিটামাটি ছেড়ে অনিশ্চিত নিরুদ্দেশ তাদের পদক্ষেপ।” (কবিয়াল : কবিগান—দীনেশচন্দ্ৰ সিংহ)।
ডঃ শ্যামাপ্রসাদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত : বিকলাঙ্গ পশ্চিমবঙ্গেই হিন্দুরা পায়ের তলায় মাটি পেল
১৯৫০-এর দাঙ্গায় পূর্ববঙ্গের হিন্দুসমাজ থেকে গানবাজনা বিদায় নিয়েছে; হিন্দুদের মনের আনন্দরস শুষে নিয়েছে।
১৯৫০ সালে সারা পূর্ব ও উত্তর বঙ্গব্যাপী হিন্দু বিধ্বংসী দাঙ্গার পর লক্ষ লক্ষ লোক সাত পুরুষের ভিটা মাটি ছেড়ে প্রাণ ও মান রক্ষার্থে পশ্চিমবঙ্গের দিকে ছুটল। তখনই বাংলার হিন্দুরা কেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্বাধীন যুক্তবঙ্গের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তার মর্ম অনুভব করতে পারে। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন যুক্তবঙ্গেও হিন্দুদের যে এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো, সেটুকু বোঝার মতো দূরদৃষ্টি তাঁর ছিল বলেই তিনি ঐ ফাঁদে পা না দিতে হিন্দুদের সাবধান করেছিলেন, সঙ্ঘবদ্ধ করেছিলেন এবং হিন্দুস্বার্থ-বিরোধী যুক্তবঙ্গ প্রতিরোধ করেছিলেন। স্বাধীন বঙ্গের প্রস্তাব দানা বাঁধবার আগেই তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের কবল থেকে হিন্দুদের আশ্রয়স্থল হিসাবে বাংলার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ছিনিয়ে রাখার অত্যাবশ্যকতা ও যৌক্তিকতা সম্পর্কে যা বলেছিলেন, তার যাথার্থ্য বিশেষভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
