৫. অরাজনৈতিক ৭৭নং বাড়িটি
পঞ্চম অধ্যায় – অরাজনৈতিক ৭৭নং বাড়িটি : শিক্ষাবিদ শ্যামাপ্রসাদ : বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ছায়া : ৭৭নং বাড়িতে রাজনীতির প্রবেশ
অরাজনৈতিক পরিবেশে শ্যামাপ্রসাদের জন্ম : শিক্ষা ও ছাত্রজীবন
কলিকাতায় ভবানীপুরের ৭৭নং বাড়িটির কোনও রাজনৈতিক ঐতিহ্য ছিল না। ভেতরে ভেতরে জাতীয়তার ফল্গুধারা প্রবাহিত থাকলেও এ বাড়ির কেউ প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। চিকিৎসাবিদ্যা, অঙ্কশাস্ত্র ও আইনচর্চা এবং শিক্ষার উন্নতি ও প্রসারে এ বাড়ির তিন পুরুষ একান্তভাবে নিজেদের ব্যাপৃত রেখেছিলেন। এ বাড়িরই ক্ষণজন্মা পুরুষ বাণীর বরপুত্র স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীমতী যোগমায়া দেবীর দ্বিতীয় পুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯০১ সালের ৬ জুলাই ঐ ঐতিহাসিক বাড়িতে (বর্তমানে ৭৭নং আশুতোষ মুখার্জী রোড)। পরিবারস্থ সকলের স্নেহ-মমতায় বাল্যকাল অতিবাহিত করে শ্যামাপ্রসাদ স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৭ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং প্রেসিডেন্সী কলেজে আই.এ.তে ভর্তি হন। দু’বছর পর “১৯১৯ সালে আই.এ. পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯২১ সালে বি.এ.তে ইংরেজী অনার্স-এ প্রথম শ্রেণীতে শীর্ষস্থান লাভ করেন। আই.এ. এবং বি.এ.-দুই পরীক্ষাতেই বাঙলাতেও প্রথম হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র রৌপ্য ও স্বর্ণপদক পারিতোষিক পান। বাঙলা সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। মাত্র তিন বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ভাষাগুলিতে এম.এ. পরীক্ষাগ্রহণের ধারা প্রবর্তিত হয়েছে। মেজদাও ১৯২৩ সালে বাঙলাভাষায় এম.এ. পরীক্ষা দিলেন। তাতেও শীর্ষস্থান অধিকার করেন। সেই পরীক্ষায় দুই ‘পেপার’-এর পরিবর্তে তিনি যে থিসিস’– মৌলিক প্রবন্ধ রচনা করেন তা ছিল গিরিশচন্দ্রের সামাজিক নাটকগুলি সম্বন্ধে—”The social plays of Girishchandra.”—(উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় — শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরী ও মুখোপাধ্যায়—শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু প্রসঙ্গ)।
পিতার ইচ্ছা পূরণে বাংলায় এম.এ. পাশ
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে সারা ভারতে স্যার আশুতোষের ঐকান্তিক চেষ্টার ফলেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ই সর্বপ্রথম মাতৃভাষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী লাভের ব্যবস্থা করে। এই যুগান্তকারী বিধানকে স্বাগত না জানিয়ে শিক্ষিত সমাজের একাংশ “বাংলা ভাষায় এম.এ. পাশদের নিয়ে নানা রঙ্গব্যঙ্গ কার্টুন প্রকাশ করতে থাকে পত্রপত্রিকায়। নিজ মাতৃভাষার গৌরবে গৌরব বোধ না করে তাকে হেয় করার মনোবৃত্তিতে স্যার আশুতোষ দুঃখিত হলেন; কিন্তু দমলেন না। বাংলা বিষয়ের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তাঁর মধ্যমপুত্র ইংরেজী ভাষায় বি. এ. অনার্সে সর্বোচ্চ স্থানাধিকারী শ্যামাপ্রসাদকে বাংলা এম. এ. ক্লাসে ভর্তি করে দিলেন। (তিনি) ‘আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখায়’ নীতি পুরোপুরি মেনে চলতেন। এখনকার রাজনীতি-নির্ভর নেতাদের মতো ‘আংরেজি হঠাও’ বলে নিজ পুত্র-পৌত্রকে নার্সারি, কে.জি., ইংলিশ মিডিয়ামে প্রেরণ করতেন না।”
(আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষাচিন্তা –ডঃ দীনেশচন্দ্র সিংহ)। পারিবারিক ঐতিহ্য শিক্ষা ও আইন ব্যবসায় ছেড়ে কেন রাজনীতিতে এলেন—পরবর্তীকালে একথা তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করলে শ্যামাপ্রসাদ গম্ভীর হয়ে বলতেন— ‘কি করবো বল—বাবা আমার ভাত মেরে গেছেন। তাঁর আদর্শ রক্ষা করতে গিয়ে বাংলায় এম. এ. পাশ করেছি। কিন্তু বাংলার এম.এ.-কে চাকরি দেবে কে? তাই তো রাজনীতিতে এসেছি অন্ন সংস্থানের আশায়।’—বলেই উচ্চরোল হাসি।
আশুতোষের আকস্মিক মৃত্যু : পিতার শূন্যস্থানে শ্যামাপ্রসাদ
শ্যামাপ্রসাদের ছাত্রাবস্থাতেই আশুতোষ তাঁর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ, বিধিবিধান, কার্যপদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে কথাবার্তা আলোচনা করতেন। তাঁর প্রতিভা যাতে শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, সর্বতোমুখী হয়ে বিকশিত হয়, সেদিকে আশুতোষের প্রখর দৃষ্টি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অটুট স্বাধীনতা ও অম্লান মর্যাদা সংরক্ষণের প্রেরণা তিনি পিতৃদেবের নিকট থেকেই লাভ করেন।
কিন্তু পুত্রকে কর্মজগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করবার আগেই বিনামেঘে বজ্রাঘাত। ১৯২৪ সালের ২৫শে মে পাটনা শহরে অকস্মাৎ আশুতোষের জীবনদীপ নির্বাপিত হয়। শ্যামাপ্রসাদ তখন ট্রেনে–সিমলা থেকে ছুটে আসছেন পিতৃদেবের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে। সঙ্গে ডাঃ নীলরতন সরকার। এসে দেখেন— “বাবা শুয়ে আছেন। মাথার কাছে গীতা আর তুলসী গাছ। মাটিতে বসে প্রমথ আর বড়দা। সব শেষ।” শ্যামাপ্রসাদ লিখেছেন, “১৯২৪ সালের ২৫শে মে থেকে জীবনের গতি সব পরিবর্তন হয়ে গেল। এক রাত্রির মধ্যে সব চাপল্য, খেলাধুলা যেন শেষ হয়ে গেল। নতুন জীবনের অধ্যায় আরম্ভ হল।”
তখন শ্যামাপ্রসাদের বয়স মাত্র ২৩ বছর। এম.এ. ও ল’ পাশ করেছেন। সবে আইন ব্যবসায়ে যোগদান করেছেন। কিছুদিন পূর্বে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফেলো” মনোনীত হন। পরে আশুতোষের শূন্যস্থলে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সদস্যও নির্বাচিত হন। ১৯২৬ সালে তিনি বিলাত যান—এবং ব্যারিস্টারি পাশ করে ফিরে আসেন।
বিলাত থেকে ফিরে এসে শ্যামাপ্রসাদ আইন ব্যবসায়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আংশিক সময়ের জন্য অধ্যাপনায় এবং সেনেট/সিন্ডিকেটের সদস্য হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও একাগ্রতা লক্ষ্য করে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র আশুতোষের মৃত্যুর একবছর না পেরোতে শ্যামাপ্রসাদকে লিখেছিলেন, “University-র সাধারণ কাজে তুমি দেখি বাপকা বেটা হইয়াছ। কেননা এত অক্লান্ত পরিশ্রম ও স্বার্থত্যাগ কেহই করিতে রাজী নয়।”
সেনেট/সিন্ডিকেট সদস্য হিসাবে তাঁর প্রথম অক্ষয় কীর্তি পরলোকগত পিতার অসমাপ্ত কাজের পূর্ণতা দান; অর্থাৎ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার মাধ্যমরূপে মাতৃভাষার স্বীকৃতি।
রাজনীতির সঙ্গে স্বল্পকালীন যোগাযোগ
১৯২৯ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কংগ্রেস প্রার্থী হিসাবে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। তার আগে দেশের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে কংগ্রেসের কাউন্সিল বর্জনের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। কিন্তু ১৯৩০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকেই নির্দল সদস্যরূপে তিনি পুনরায় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। এই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর সরকারি থাবা প্রায় পুরোপুরি বসান হয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ তখন বিশ্ববিদ্যালয় সেনেট / সিন্ডিকেটের সবচেয়ে কর্মদক্ষ ও কর্মব্যস্ত সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষানীতি সম্পর্কে সরকারের মতিগতি অন্ধিসন্ধি জানা বিশেষ আবশ্যক বিধায় তিনি আইন পরিষদের সদস্য থাকাই যুক্তিযুক্ত মনে করেছিলেন।
বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনিষ্ঠতম উপাচার্য : বাপকা বেটা
১৯৩৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হলেন। বয়স তখন তাঁর মাত্র ৩৩ বছর। পরপর দু’বার অর্থাৎ ১৯৩৮ পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন থাকেন। উপাচার্য হিসাবে তাঁর কার্যকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজকর্মের ফিরিস্তি দেবার অবকাশ এখানে নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস সাড়ম্বরে উদ্যাপন, বাংলা বানান সংস্কার, বাংলা পরিভাষা সমিতি গঠন, রবীন্দ্রনাথকে বাংলা ভাষায় সমাবর্তন ভাষণদানে আহ্বান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক চিহ্নের পরিবর্তন ইত্যাদি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা আজ অনেকেরই হয়তো জানা নেই। শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর চিন্তাধারা প্রকাশ পেয়েছে কলকাতা, বোম্বাই, পাটনা, বেনারস ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত সমাবর্তন ভাষণগুলিতে।
দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনিষ্ঠতম উপাচার্য পদে অধিষ্ঠিত হয়ে এবং প্রতিকূল সরকার ও বিরোধী পক্ষের চাপের মাঝেও জ্যেষ্ঠসুলভ বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে, তরঙ্গ-সঙ্কুল তটিনীর বুকে তরণী চালানর মতো যেভাবে তিনি দক্ষহাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল ধরেছিলেন তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন কর্মকর্তারাও বিস্মিত হয়েছিলেন।
দক্ষ ও দলনিরপেক্ষ উপাচার্য
১৯৩৪-৩৮ এই চার বছর তিনি উপাচার্য পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই চার বছরের মধ্যে তিনি বহু সুদূর-প্রসারী ও সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও রূপায়ণ করে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলের প্রশংসা অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় চৌহদ্দির বাইরে যে রাজনীতির টানা-পোড়েন চলছিল, সে সম্পর্কে বাহ্যত তিনি কোনও কৌতূহল দেখাননি। ছাত্রসমাজের মাঝে জাতীয়তাবোধ শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত করা, পঠনপাঠনের উন্নতি ঘটিয়ে তাদের দেশের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারী হিসাবে গড়ে তোলাতেই তিনি তাঁর সমস্ত শ্রম ও নিষ্ঠা নিয়োজিত করেন। উপাচার্য হিসাবে তাঁর কাছে হিন্দু মুসলমান ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে কোনও ভেদ বিচার ছিল না। পারিবারিক ও পৈতৃক সূত্রে তিনি যে উদার দৃষ্টিভঙ্গী ও মানবিক গুণাবলীর উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে সে ধারা বজায় রেখেই তিনি প্রতিকূল ও বিরুদ্ধবাদী সেনেট সদস্যদের নিয়ে স্বচ্ছন্দে কার্য পরিচালনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সময়কার দু’একটি ঘটনা তাঁকে বাংলার ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
শ্রী ও পদ্ম : বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে বিশ্রী আন্দোলন
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক চিহ্নটি (crest) পরিবর্তন করার ব্যাপারে বেশ কিছু কাল ধরে আলাপ-আলোচনা চলছিল। কারণ, দেশ যখন ক্ৰমশঃ স্বায়ত্তশাসন লাভের দিকে এগোচ্ছে তখন ব্রিটিশ রাজশক্তির দম্ভ ও ঔদ্ধত্যের দ্যোতক সম্বলিত প্রতীক চিহ্নটি সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিরে শোভাবর্ধন করতে দেখা অনেকের কাছেই দৃষ্টিনন্দন ঠেকেনি। সুতরাং অনেক কমিটি, মিটিং, বৈঠক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত জানার পর প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের ওপর বাংলায় ‘শ্রী’ অক্ষর শোভিত প্রতীক চিহ্নটি গৃহীত ও প্রচলিত হয়।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যেন ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ল। এই পদ্মোপরি ‘শ্রী’ লাঞ্ছিত প্রতীকটি নাকি ইসলাম-বিরোধী; এতে নাকি পৌত্তলিকতার স্পর্শ রয়েছে, এটা নাকি মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসে নিদারুণ আঘাত করেছে ইত্যাদি।
‘শ্রী ও পদ্ম’ নিয়ে বাক্বিতণ্ডার মাঝেই ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীত নিয়ে তুমুল হট্টগোল তোলা হল। ভাবখানা এমন যেন মুসলমানরা দেশের জন্য জান লড়িয়ে দিতে একপায়ে খাড়া, কেবল বন্দে মাতরম্ গানটাই পথের কাঁটা। এরই সঙ্গে আপত্তি তোলা হল ত্রিবর্ণ রঞ্জিত কংগ্রেস পতাকা নিয়ে যা জাতীয় পতাকা বলে অধিকাংশ ভারতবাসীর কাছে পরিচিত।
একেবারে ত্র্যহস্পর্শ যোগ। নতুন রাজনৈতিক অধিকার লাভে আত্মহারা এবং হিন্দুদের চিরকালের জন্য শাসন ক্ষমতার অলিন্দ থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থায় উল্লসিত মুসলিম নেতা, ধর্মীয় নেতা এবং ছাত্র ও শিক্ষিত সমাজ বাংলায় ইসলামী রাজ কায়েম হয়েছে মনে করে সাহিত্যে শিল্পে সঙ্গীতে সংস্কৃতিতে সর্বত্র হিন্দুয়ানির ছায়া দেখে আঁৎকে উঠল এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হল। ১৯৩৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন সভায় রবীন্দ্রনাথকে বাংলা ভাষায় সমাবর্তন ভাষণ দানের আহ্বান জানিয়ে শ্যামাপ্রসাদ ইতিহাস সৃষ্টি করেন। মুসলমান ছাত্ররা সেই সমাবর্তন বর্জন করে কবির প্রতি অসৌজন্য প্রকাশেও পেছপা হয়নি।
‘শ্রী’ লুপ্ত, বন্দে মাতরম্ খণ্ডিত
অবশেষে শিক্ষাক্ষেত্রে স্থিরতা আনা ও শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক চিহ্ন থেকে ‘শ্রী’ অপসৃত হল। বলতে গেলে তখন থেকে বাঙালীজীবন থেকেও শ্রী ও সৌন্দর্য অন্তর্হিত হল।
আর কংগ্রেস নেতারা মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সামিল করার অলীক আশায় শত শহীদের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতকে কর্তন করে অদূর ভবিষ্যতে জন্মভূমি কর্তনের মঙ্গলাচরণ করে রাখলেন। সে সঙ্গে প্রকাশ্য স্থানে তেরঙ্গা ঝাণ্ডা ওড়াবার ক্ষেত্রেও স্ব-আরোপিত বিধি-নিষেধ জারি করেন।
ভারতীয় সংস্কৃতি ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি এই তাচ্ছিল্য, ফাঁসির মঞ্চে উচ্চারিত ‘বন্দে মাতরম্’-এর উপর ছুরি চালনা, তেরঙা ঝাণ্ডা হাতে পুলিশের ডাণ্ডায় রক্তাপ্লুত স্বদেশসেবকদের স্মৃতি বিজড়িত পতাকার প্রকাশ্য উত্তোলনে বাধানিষেধ প্রত্যেক দেশপ্রেমী ভারতবাসীর বুকে বড় বেজেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে শ্যামাপ্রসাদ এই মুসলিম মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতার নগ্নরূপ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন।
১৯৩৮ সালের আগস্ট মাসে তাঁর উপাচার্য পদের মেয়াদ শেষ হতেই মুসলিম লীগ সরকার একজন মুসলমান উপাচার্য নিযুক্ত করে; রাইটার্স বিলডিংসের মতো দারভাঙ্গা বিলডিং-এও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ প্রশস্ত করার খেলায় মাতে।
অদূরদর্শী কংগ্রেস : হিন্দুদের সর্বনাশের সূচনা
সর্বোপরি কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতাদের মূঢ়তায় বাংলার হিন্দুর সর্বনাশের ষোল কলা পূর্ণ হল ১৯৩৭ সালের নির্বাচনী ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে ফজলুল হক সাহেবের কৃষকপ্রজা পার্টির সঙ্গে কংগ্রেসের যুক্ত মন্ত্রিসভা গঠনের অনুমতি না দিয়ে। এই আত্মহননকারী সিদ্ধান্তের তিন পাণ্ডা ছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, নলিনীরঞ্জন সরকার ও জি. ডি বিড়লা। নলিনী সরকার ও বিড়লা নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে এবং মৌলানা আজাদ সাম্প্রদায়িক মুসলিম রাজনীতির নাফার স্বার্থে যুক্ত মন্ত্রিসভা গঠনের প্রায় পাকাপাকি সিদ্ধান্ত কাঁচিয়ে দেন। ব্যাপারটা একটু খোলসা করেই বলা যাক।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি প্রদেশেও একক শক্তিতে ক্ষমতা দখল করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা জঙ্গী মুসলিম অধ্যুষিত পাঞ্জাবে ৮৬টি মুসলিম আসনের মধ্যে তারা পায় মাত্র ১টি। বাংলায় মুসলিম ভোট কার্যত তিন ভাগ হয়ে যায়। ফজলুল হকের একান্ত ইচ্ছা কংগ্রেসের সঙ্গে একত্রে যুক্ত মন্ত্রিসভা গঠন করেন। কারণ মাঝে মাঝে আবোল-তাবোল বললেও লোকটা ছিল মনেপ্রাণে খাঁটি বাঙালী। বাংলার মুসলিম জন-মানসে তাঁর একটা আলাদা আসন ছিল। মুসলিম লীগের জঘন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির তিনি পুরোপুরি অংশীদার হতে চাননি। গান্ধীজীও বাংলার কংগ্রেসীদের এ ব্যাপারে এগিয়ে যাবার সম্মতি দিয়েছেন বলে জানা যায়।
মৌলানা আজাদের কুপরামর্শ : বাংলার দুর্দশার সূচনা
কিন্তু পেছন থেকে কলকাঠি নাড়তে শুরু করেন তথাকথিত জাতীয়তাবাদী মুসলমান মৌলানা আজাদ সাহেব। তাঁর বক্তব্য— যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব প্রদেশে কোনও মুসলিম দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না করলে একাধিক মুসলিম দল মিলে মুসলমান মন্ত্রিসভা গঠন করতে দেওয়া উচিত। মুসলমানদের কোন এক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কংগ্রেসের মন্ত্রিসভায় যোগদান করা ঠিক হবে না। তাতে
বৃহত্তর মুসলমান সমাজ বেখুশ হবে।
আজাদ গান্ধীজীর কাছে কাছে থাকতেন, আর তাঁর কানে কানে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে মুসলিম স্বার্থ বিষয়ে ফুসমন্তর দিতেন। গান্ধীজী তাকেই কোরান-বাক্য বলে মনে করতেন। তিনি আজাদের এই কুমন্ত্রণা শুনে বাংলার কংগ্রেসীদের ফজলুল হকের সঙ্গে মিলিত মন্ত্রিসভা গঠন করতে নিষেধ করেন। তিনি এ ব্যাপারে এমনকি কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে আলোচনা করাও প্রয়োজন বোধ করেননি। দু’চারজন বাদে বাংলার ভেডুয়া কংগ্রেসীরা কংগ্রেস High Command-এর এই অপরিণামদর্শী ‘low command’ নত মস্তকে মেনে নিল। আজাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল, নলিনী সরকারের মন্ত্রিত্ব জুটল, আর বিড়লাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিরাপদ রইল। ভোটের ফলাফলে ক্ষমতার অলিন্দ থেকে বহু দূরে ছিটকে পড়া মুসলিমলীগ ফজলুল হকের অনিচ্ছুক কাঁধে চড়ে বীরদর্পে রাইটার্স বিলডিংসে ঢুকল। ১৯৪৭-এর ১০ বছর আগে বাংলায় পাকিস্তান-এর জয়যাত্রা শুরু হল। তারপর আর তাকে রোখে কে?
সুভাষচন্দ্রের তীব্র প্রতিবাদ
কংগ্রেস সভাপতির অগোচরে গান্ধীজীর এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত সুভাষচন্দ্র অত্যন্ত কড়া ভাষায় গান্ধীজীকে লেখেন :
“আপনার চিঠি পাইয়া গভীরভাবে বিচলিত হইলাম। বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা গঠন সম্পর্কে বহুবার আপনার সহিত আলোচনা করিয়াছি। কিছুদিন পূর্বে ওয়ার্ধাতে এ বিষয়টি পুনরায় আমাদের মধ্যে আলোচিত হইয়াছে। আমার দাদা শরৎ বসুও এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করিয়াছেন। আমাদের দুই জনেরই পরিষ্কার মনে আছে যে আপনি বরাবর কংগ্রেস ও কৃষক প্রজা পার্টির যুক্ত মন্ত্রিসভা সমর্থন করিয়াছেন। ওয়ার্ধায় আমাদের সাক্ষাতের পর কি কারণে আপনার মতের এরূপ গুরুতর পরিবর্তন হইয়াছে জানি না। বেশ বোঝা যাইতেছে যে আজাদ, নলিনী সরকার ও বিড়লার সহিত কথাবার্তার ফলেই আপনার মতের এই পরিবর্তন ঘটিয়াছে। তাহা হইলে ব্যাপারটা দাঁড়াইতেছে এই যে, যাহাদের উপর বাংলাদেশের কংগ্রেস চালাইবার দায়িত্ব অর্পিত হইয়াছে তাহাদের মতামতের চেয়ে উল্লিখিত তিনজনের মতই আপনার নিকট বেশি মূল্যবান।” (দূরদর্শী রাজনীতিক শ্যামাপ্রসাদ-শ্যামলেশ দাস)
কংগ্রেসের হঠকারী সিদ্ধান্তে বাংলার সর্বনাশ—শ্যামাপ্রসাদ
তখনকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে শ্যামাপ্রসাদ বলেছেন : “After the 1937 election, the Congress swept the polls so far as Hindu seats were concerned. In Bengal, as elsewhere, the Muslim League did not cut much ice. Fazlul Haq was certainly stronger here and his Krishak Praja Party came to the Legislature with a fairly large representation. He defeated Nazimuddin at Patuakhali and it looked as if the reactionary elements among the Muslims had received a death blow.
Fazlul Haq, lovable and emotional as he is, was dying for power… He did not wish to fall into the arms of the League. He implored the Congress to form a coalition ministry in Bengal with himself as Premier. If this had been done, Bengal would never have gone under the heels of League-cum-British conspiracy. The province would have developed into a strong and healthy province with the common efforts of representative Hindus and Muslims. The High Command of the Congress did not allow this to be done” (Leaves from a Diary -Syamaprasad Mookerjee).
কংগ্রেসের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের পরিণতি যা হবার তাই হল। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রথম পরীক্ষাতেই বাংলায় কার্যত মুসলমান শাসন স্থাপিত হল। ব্যাপারটা কি রকম বিসদৃশ তা ভেবে দেখা যাক। বাংলার শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্য, অর্থনীতি ইত্যাদি জনজীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে হিন্দুরা অগ্রবর্তী ভূমিকায়; কিন্তু প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থায় তাদের কোন কার্যকরী ভূমিকা নেই–বিধানসভায় আলঙ্কারিক ভাষায় গরম গরম বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া। এদিকে মুসলমান সম্প্রদায় নিজেদের শাসকের আসনে অধিষ্ঠিত দেখে আহ্লাদে আটষট্টি খানা—হঠাৎ নবাবি প্রাপ্তিতে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করতে থাকে। শহরে গ্রামে কারণে অকারণে হিন্দুদের উপর আক্রমণ চলতে থাকে। সামাজিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে হিন্দুদের প্রভাব খর্ব করার কাজও শুরু হয়। উপযুক্ততা অনুপযুক্ততা বাছবিচার না করে সরকারী চাকরি ক্ষেত্রে সমতানীতি চালু হল। ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল বিল মারফত অন্যায্যভাবে কর্পোরেশনে হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব হ্রাস করা হয়। সেকেণ্ডারী এডুকেশন বিল মারফত মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্তিয়ার থেকে সরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে ভাতে মারার এবং সেকেন্ডারি বোর্ডে মুসলমানদের কর্তৃত্ব স্থাপনের পাকাপাকি ব্যবস্থা রাখা হল—যদিও শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের অবদান শতকরা পাঁচ ভাগও নয়।
লীগ গভর্নমেন্টের শিক্ষাক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ
মুসলিম লীগ সরকারের এসব দুরভিসন্ধি ও পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো সাংগঠনিক দৃঢ়তা কংগ্রেসের মধ্যে দেখা গেল না। শ্যামাপ্রসাদ তথন পর্যন্ত প্রত্যক্ষ কোন দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত নেই। শিক্ষাক্ষেত্রকেই তিনি তাঁর বিচরণক্ষেত্র হিসাবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু হিন্দুস্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে দেখে তিনি কংগ্রেস নেতাদের দ্বারস্থ হলেন; তাঁরা যেন সক্রিয়ভাবে হিন্দু স্বার্থবিরোধী সরকারী নীতির প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেন। কিন্তু পাছে কংগ্রেসকে কেউ সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বলে এই লোকভয়ে কংগ্রেসের পক্ষে সংখ্যালঘু হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা নিয়ে কথা বলা সম্ভব হল না; যদিও শুধুমাত্র হিন্দুদের ভোটেই কংগ্রেসীরা নির্বাচনে জিতে এসেছে। এই সময়কার পরিস্থিতি সুন্দরভাবে পর্যালোচনা করে শ্যামাপ্রসাদ লিখেছেন :
“1939 continued to be a year of Hindu oppression at the hands of a communal ministry with Fazlul Haq at its head. Legislative and administrative measures were either adopted or advocated which aimed at a deliberate curtailment of Hindu rights. So long as such activities related to depart-ments other than education, I had my protests recorded in the Assembly but did not find it possible to mobilise public opinion outside.
The reasons were mainly two fold. My tendencies lay in the sphere of educational administration and I did not feel attracted by the noisy and dusty career of a politician. I thought the best way to serve my country would be through the path of education. Secondly, I belonged to no active political party whose platform I could utilise for rousing public opinion outside the legislature.
The party which evoked my sympathy and support was the Congress. The Congress, however, lamentably betrayed the interest of the Hindus. “ ( Leaves from a diary -S. P. Mookerjee.)
হিন্দুস্বার্থ বিনাশে নির্বিকার কংগ্রেস : বিচলিত শ্যামা প্রসাদ
হিন্দু স্বার্থ সংরক্ষণে কংগ্রেসের উদাসীনতার— যা বিশ্বাসহন্তার নামান্তর-সুযোগ নিয়ে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ প্রশাসন কেমন করে বাংলার হিন্দুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে তুলেছিল তা তুলে ধরেন শ্যামাপ্রসাদ :
“In regard to the Communal Award, its (Congress) policy of non-committal was a grave blunder. In Bengal it did not allow a coalition ministry and thereby greatly strengthened the Muslim League and in fact consolidated it. It hesitated to oppose Acts and Bills, avowedly anti-Hindu and anti-national, lest it should be dubbed a communal body. It represented Hindu electorates and yet it faltered in its sacred duty of defending Hindu rights. The ratio of commu-nal representation in respect of the services; the defilement of Hindu images; the suppression and supercession of better qualifications in respect of Hindus, and preferential treat-ment of Muslims in educational and other technical spheres; the passing of laws specially jeopardising Hindus; the encouragement of riots; attacks on Hindu women; were some of the glaring instances of our suffering. (Leaves from a Diary -S P Mookherjee.)
কিন্তু কংগ্রেস নির্বিকার। হিন্দুদের বঞ্চনা ও অবিচারে তাঁদের হৃদয়ে করুণার উদ্রেক হয়নি। তাঁরা তাঁদের চরিত্র অর্থাৎ সতীত্ব অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি রক্ষা করতেই ব্যস্ত। শ্যামাপ্রসাদের আবেদনে তাঁরা সাড়া দিলেন না। তারপরই এল দু’টি কালা কানুন :
“Then came two black Bills. The Calcutta Municipal Bill and the Secondary Education Bill. It was really, the latter which forced me out of my academic seclusion. Where edu-cation was made the plaything of party and communal poli-tics, I felt it my duty to rouse public opinion. I approached both Sarat Bose and Subhas Bose and requsted them to take up the Hindu cause. I asked them to do so, not on any ground of communal favouritism but in order to fight against oppression and injustice. The Congress in Bengal was already divided. Subhas being almost driven out of the Presidentship has started his rival Forward Block and had thrown out a challenge to Gandhi. The Official Congress was decidedly a weaker body in Bengal. But both were re-luctant to stand by the Hindu cause openly.” (Leaves from a Diary-S. P. Mookerjee)
হিন্দুস্বার্থ সংরক্ষণ সংগ্রামে কংগ্রেস যোগদানে অসম্মত
শ্যামাপ্রসাদ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারমুক্ত, কিন্তু বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বাঙালী হিন্দুর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাঁর চিত্ত চিন্তাভারাক্রান্ত। কংগ্রেস নেতারা সবাই হিন্দু; কিন্তু হিন্দুস্বার্থ বিপন্ন দেখেও তাঁরা উদাসীন। হিন্দু জনতা কংগ্রেস বলতে অজ্ঞান। তারা কংগ্রেসের হাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছে। এদিকে সুভাষচন্দ্রকে বিতাড়নের পর কংগ্রেস নেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত; কেউ সুভাষবাদী, কেউ গান্ধীবাদী। তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে বিবাদে ব্যস্ত। বাঙালী হিন্দুর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার অবকাশ কোথায়? যখন Calcutta Municipal Bill এবং Secondary Education Bill-এর মতো ‘কালাকানুন’ পাশ করানোর উদ্যোগ চলল, তখন শ্যামাপ্রসাদ বাধ্য হয়ে তাঁর শিক্ষাজগতের নির্বাসন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নিতে তৈরি হলেন। তখনও পর্যন্ত তাঁর যে দলের প্রতি সমর্থন ছিল, সে হল কংগ্রেস। তিনি শরৎচন্দ্র ও সুভাষচন্দ্র বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের নিকট গিয়ে বাংলার সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর অবিচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আবেদন জানান। কিন্তু কংগ্রেসের উভয় গোষ্ঠীই সাম্প্রদায়িক বলে চিহ্নিত হবার ভয়ে আধমরা। স্বজাতি স্বধর্মাবলম্বীর অস্তিত্ব বিপন্ন হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু কেউ যেন সাম্প্রদায়িক বলে মার্কা না মারে। ফলে কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীই কম্পিটিশনে মুসলিম তোষণে নেমে পড়ে। কেউই খোলাখুলি হিন্দুদের স্বার্থসংরক্ষণে এগিয়ে এল না। উপরন্তু কলকাতা কর্পোরেশনের শাসনভার সুভাষচন্দ্র হিন্দু মহাসভার সঙ্গে আসনসংখ্যা নিয়ে খেয়োখেয়ি করে মুসলিম লীগের হাতে অর্পণ করলেন।
কংগ্রেসী মন্ত্রিসভার পদত্যাগ : রাজনৈতিক দেউলেপনার চরম নিদর্শন : হিন্দু মহাসভায় যোগদানের চিন্তাভাবনা
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ভারতবাসীর মতামত না নিয়ে ভারতকে যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে বিভিন্ন প্রদেশের কংগ্রেস সরকারগুলি পদত্যাগ করে বসল। এরকম হঠকারী সিদ্ধান্ত কোনও রাজনৈতিক দল করতে পারে বলে কেউ ভাবতে পারেনি। ইংরেজ ও মুসলিম লীগের আহ্লাদের সীমা-পরিসীমা রইল না। মুসলিম লীগ মুক্তিদিবস পালন করল, আর ব্রিটিশরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কেউ এমন খালি মাঠ ছেড়ে দেয়, বিশ্বে বোধ হয় এর দ্বিতীয় নজির নেই। গান্ধীজীর রাজনীতি ক্ষেত্রে পদার্পণের পর একের পর এক পাহাড়প্রমাণ পর্বতপ্রমাণ ভুলের সঙ্গে আর একটি নতুন ভুল যুক্ত হল। কংগ্রেসের ক্রমাগত ভুল সিদ্ধান্তে হিন্দুদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে থাকলেও সেদিকে নেতাদের খেয়াল নেই। এই পরিস্থিতিতে শ্যামাপ্রসাদ দেখলেন একমাত্র হিন্দু মহাসভাই হিন্দুদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কিছু ভাবনাচিন্তা করছে, সম্ভাব্যক্ষেত্রে প্রতিবাদ করছে। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি হিন্দু মহাসভার দিকেই ঝুঁকলেন। এসব ঘটনাবলী ঘটাকালেই তিনি হিন্দু মহাসভার নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। ১৯৩৯ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে হিন্দু মহাসভার সভাপতি বীর সাভারকর বাংলায় আসেন এবং মহাসভার নতুন আদর্শ ও নীতির কথা প্রচার করেন। বীর সাভারকরের বক্তব্য তাঁর মনে রেখাপাত করে এবং ক্রমশঃ সেই প্রভাব বিশ্বাসের গভীরে প্রবেশ করে। তখন সাভারকর খুলনায় মহাসভার প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছিলেন। এই সম্মেলন হিন্দুদের মনে প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল। তারপর শ্যামাপ্রসাদের কথায় :
“He (Savarkar) presided over the Khulna Provincial Mahasabha Session. Being then greatly perturbed at the helpless position of Bengal Hindus-whom the Congress failed to rouse and protect some of us were drawn to Savarkar’s influence and it gradually took root. Nirmal Chatterjee, S. N. Banerjee, Asutosh Lahiry and others pressed me to join the Mahasabha”
হিন্দু মহাসভায় যোগদানের সিদ্ধান্ত
শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভায় যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে নির্মলচন্দ্র চ্যাটার্জি, এস. এন. ব্যানার্জি, আশুতোষ লাহিড়ী প্রমুখ হিন্দু মহাসভা নেতাদের যথেষ্ট চাপ ছিল। তাছাড়া শ্যামাপ্রসাদ ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দজীর নিকট উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা লাভ করেন। স্বামী প্রণবানন্দ হিন্দু মহাসভার রাজনৈতিক আন্দোলন এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে পরস্পরের অনু-পূর্বক ও পরিপূরক করতে চেয়েছিলেন। প্রায়ই তিনি বি. সি. চ্যাটার্জি, স্যার মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ প্রমুখকে আহ্বান করে উৎসাহ দিতেন।
“তাৎকালিক রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের ভয়াবহতা ও হিন্দুদের আসন্ন বিপর্যয় আচার্যকে এতই উদ্বিগ্ন করে তোলে যে ধর্মগুরু হয়েও তিনি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিন্দু মহাসভার সহিত সংযোগ রক্ষা করে চলতে দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি মহাসভার রাজনৈতিক আন্দোলন এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সংগঠন আন্দোলনকে পরস্পর অনুপূরক ও পরিপূরকরূপে গ্রহণ করেন। এবং বলেন—হিন্দু মহাসভা রাজনৈতিকভাবে সংগ্রাম করুক, আর আমরা করি গ্রামগুলির সংগঠন। তিনি বি. সি. চ্যাটার্জি, স্যার মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায়, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে প্রায়শঃ ডেকে আনতেন নিজের কাছে, উৎসাহ দিতেন, অনুপ্রেরণা সঞ্চার করতেন। কিন্তু ত্রিকালজ্ঞ মহাপুরুষ জানতেন তাঁর আয়ুষ্কাল স্বল্প। তাই ডঃ শ্যামাপ্রসাদের কণ্ঠে আপন কণ্ঠস্থিত মালা পরিয়ে দিয়ে তাঁকে করেন আশীর্বাদ ও করেন শক্তিসঞ্চার। স্বীয় বিশ্রামকক্ষে এসে প্রসন্ন হাস্যে বলেন—”বিশ্বহিন্দুর সম্মুখে দাঁড়াতে পারে সেই নেতা ঠিক করে দিয়ে গেলাম।” (বঙ্গের হিন্দু ও সমাজ বিবর্তন—স্বামী নির্মলানন্দ, প্রণব, জ্যৈষ্ঠ ১৪০৩)।
