Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    নীললোহিতের অন্তরঙ্গ – নীললোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

    August 7, 2026

    আকাশ পাতাল – নীললোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

    August 7, 2026

    হেঁটে যাই জনমভর – সেলিনা হোসেন

    August 7, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    হেঁটে যাই জনমভর – সেলিনা হোসেন

    সেলিনা হোসেন এক পাতা গল্প266 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    হেঁটে যাই জনমভর – ৫

    ৫

     ওসমান আলী দ্রুত উঠে বদরুলকে জড়িয়ে ধরে। বলে, তুই আমার মায়ের মতো কথা বললি। আমার মায়ের পান্তার হাঁড়িতে ব্যাঙ থাকত। আমি সেই ব্যাঙের ডাক শুনতে পাচ্ছি।

     কি বললি, তোর মায়ের পান্তার হাঁড়ি-

     আমার মায়ের পান্তার হাঁড়ি আমার মায়ের স্বপ্ন।

     আর ব্যাঙের ডাক?

     কানামাছি খেলা। কানামাছি ভোঁ-ভোঁ যারে পাবি তারে ছোঁ…।

     তুই আসলে শালা একটা রংবাজ-বদরুল উঠে ওকে ঠেলে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। বসে থাক শালা। তোর কোথাও যেতে হবে না। তোর বুকের মধ্যে হাজার রকম তেপান্তর আছে। তোর বাইরে যাবার দরকার হবে না।

     ওসমান আলী চেঁচিয়ে বলে, হবে। হবে। একশোবার হবে।

     কোথায় যাবি? তোর কোনো ইচ্ছে-পিচ্ছে আছে বলে তো মনে হয় না।

     তোদের সাধ্য নেই আমাকে বোঝার। আমি ঠিক করেছি দেশের পাহাড়ি এলাকায় যাব। পাহাড়-ঝর্ণা দেখব। গাছ-পাখি-ফুল দেখব। খুঁজে দেখব ওখানে আমার শৈশব আছে কি না। শৈশব ফিরে পাবার স্বপ্ন আমাকে ভীষণ কাঁদায়।

     বুঝেছি,একাএকা থেকে হাজার রকমের চিন্তা তোর মাথায় ঘোরে। চল বাইরে যাই।

     আমি কিছু টাকা জমিয়েছি। দূরে কোথাও যাব।

     বদরুল এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলে, তোর সঙ্গে আমিও যাব। চল আমরা সাজেক ভ্যালিতে যাব। রাঙামাটির সীমান্ত এলাকা। পাহাড় দিয়ে বর্ডার আছে ওই সীমান্ত এলাকায়। মেঘালয় বর্ডার।

     এলাকায় বাড়িঘর আছে না খালি পাহাড়?

     বাড়িঘর আছে। ওখানে লুসাইরা বাস করে। চমৎকার জায়গা। ওখানে গেলে ফিরে আসতে মন চায় না।

     ঠিক আছে যাব। ওখানে গিয়ে আমি একজনকে খুঁজব।

     কাকে? ওখানে তোর কোন জনমের আত্মীয় আছে?

     আত্মার আত্মীয় আছে। বেঁচে থাকার আত্মীয় আছে। এখন তুই যা বদরুল। আমি দরজা বন্ধ করব।

     বদরুল জানে ও আর কথা বলবে না। এই ওর এক স্বভাব। ঠাস করে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে। এক অদ্ভুত ছেলে। বদরুলের ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওসমান আলী ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে। রুমমেট হাসিব দেশের বাড়িতে গেছে। এখন ওর একা থাকার পালা। তারপরও তো বলতে হবে যে জীবন ওর একার নয় সে জীবন ভাগ করবে কার সঙ্গে? ছেড়ে আসা পরিবারের বাইরে ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে? রুমমেটের সঙ্গে? টিচাররা ওকে ভালোবাসে। ওর পরীক্ষার খাতা নাকি টিচারদের গভীর আনন্দ দেয়। খাতায় লাল কালির দাগ পড়ে না। ও ইতিহাসের ছাত্র। পাশাপাশি ভালোবাসে সাহিত্য ও চলচ্চিত্র। খরচ কুলাতে পারে না বলে সব সিনেমা দেখা হয় না। সব বইও কেনা হয় না। কদিন আগে জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটি কিনেছে। পড়ে শেষ করা হয়নি। খুব যত্ন করে রাখার জন্য বইটিতে মলাট দিয়েছে ক্যালেন্ডারের পাতা দিয়ে। ধবধবে সাদা মলাটের ওপর লাল কালি দিয়ে নিজের নাম লিখেছে। এক মুহূর্ত থেমে নিজে নিজে বলেছে, আপনি কোথায় আছেন জহির রায়হান? শেষ ঠিকানা কোথায় হলো আমাকে জানাবেন কি? একবার দেখে আসব আপনাকে। দু-চারটে কথা বলব? জিজ্ঞেস করব ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের কথা। হাজার হাজার হাজার বছর ধরে আপনাকে খুঁজতেই থাকবে এ দেশের মানুষ। কারণ সবাইকে সমবেত কণ্ঠে বলতে হবে স্টপ জেনোসাইড।

     ও ঘর ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে, হ্যাঁ, বলতেই হবে স্টপ জেনোসাইড। শুধু নিজের দেশের জন্য না। বিশ্বজুড়ে সব দেশের জন্য। জেনোসাইড একটি বর্বর সন্ধি। এমন সন্ধির জায়গায় অনবরত থুতু ছিটাতে হবে সবাইকে। ও শুনতে পায় বাইরে থেকে ভেসে আসা গাড়ির শব্দ। ও কান খাড়া করে ভাবে, এটা কি গাড়ির শব্দ নাকি মিলিটারি কনভয়?

     আকস্মিকভাবে ও চুপ করে যায়। ওর প্রশ্নের সাড়া দেওয়ার কেউ নেই। ও তো এক শৈশবহীন বালক। কত বয়সই বা হলো ওর? বয়সের হিসাব নিয়ে ও আর মাথা ঘামায় না। ওর বয়স শৈশবে থেমে গেছে বলেই ওর ধারণা। ও এর বাইরে যেতে চায় না। বয়স থেমে থাকুক বা বাড়তেই থাকুক তাতে কি আর আসে যায়। জীবনের হিসাব তো ওর এক বয়সে হয়েই গেছে। ও ঠিক করে আজ ও রাতের ঢাকা দেখতে বের হবে।

     ও তো জানে নিঃসঙ্গতা ওর কাছে কোনো শব্দ মাত্র নয়। নিঃসঙ্গতা গল্প, সিনেমা। ইতিহাস, দর্শন। ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান। হা হা করে হাসতে হাসতে ঘরের চারদিকে তাকালে ওর মনে হলো এটি একটি আয়নার ঘর। দেয়ালজুড়ে চারদিকে ওর ছবি দেখা যাচ্ছে। কোনো এক অদৃশ্য শিল্পী রঙতুলিতে ফুটিয়ে তুলেছে এই দেয়ালচিত্র। ওকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে, যেন ভিন্ন কোনো এক দেশের রাজকুমার। ও দশ বছর বয়সী ছোট্ট রাজকুমার। ঝলমলে পোশাকে ওকে অপরূপ দেখাচ্ছে। ও হাততালি দিয়ে নাচতে নাচতে বলছে, বাহ, কি সুন্দর আমার শৈশব। ওকে মায়ের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। মা বলছে, তোর জন্য আজ বিরিয়ানি রান্না হয়েছে। স্কুল থেকে এসে খাবি।

     ওর বাবা গরজ আলী বড় একটি পাজেরো গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরেছে। গাড়ি থেকে নামতে নামতে ডাইভারকে বলছে, বিকেলে মিটিং আছে। তুমি কোথাও যেও না। গটগট করে ঢুকে যাচ্ছে বাড়িতে। ওর একমাত্র বোন তুষা। স্টেজে গান গাইছে। ও এক পপ-তারকা। হলভর্তি লোক। ওর গানের শেষে করতালিতে ভরে উঠছে হল। শিস বাজাচ্ছে ইয়াংরা। তুমুল করতালি। শব্দ ওকে বিস্মিত করছে। এক সময় শেষ হয় অনুষ্ঠান। ওর বড় ভাই সবুর আলী। বিদেশ যাবে ব্যবসার কাজে। প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি করবে। ওকে বলছে, তোর জন্য কী আনব রে? ও বলছে, আমার কিছু লাগবে না। দেশেই তো সব আছে। বিদেশের জিনিসও দেশে পাওয়া যায়। সবুর আলী চোখ গরম করে বলে, তবু বল একটা কিছু। ও একমুহূর্ত ভেবে বলে, আমার জন্য ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ বইটা এনো। সবুর আলী দাঁত খিঁচিয়ে বলে, ফুঃ, একটা বই মাত্র। ছেলেটা ভালো কিছু চাইতেও শেখেনি। ও বলেছিল, ভাইয়া বেশি কিছু চাইলে লোভ বাড়ে। আমি লোভ বাড়াতে চাই না। লোভ? এই বয়সে তুই লোভের কি বুঝিস? যেটুকু বুঝি সেটুকুই বলেছি। কাঁচের ঘরের চারদিকে গুমগুম ধ্বনি। ও জানে এই সুদৃশ্য দেয়ালচিত্র ওর জীবন নয়। তবে এমন চিত্র কেন ঘরের দেয়ালে ভেসে ওঠে।

     ও নিজের ওপর রেগে উঠে পা দাপায়। ইলেকট্রিসিটি ফেল করে। ও আরো রেগে যায়। মানুষের যন্ত্রণার সঙ্গে রসিকতা! ও বিড়বিড় করে। রাষ্ট্রও অনেক সময় মানুষের যন্ত্রণার সঙ্গে রসিকতা করে। হাঃ, রসিকতা সাপ নিয়ে খেলা। সেটা সব সময় সুন্দর থাকে না। অন্ধকারের রসিকতা বড় তীব্র ভেদ করে অন্তরের অন্তস্থল। ঘুটে কুড়ানির ছেলে ঈশ্বর প্রদত্ত অলৌকিক মেধার জোরে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে পৌঁছেছে। লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়েছে ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’। তাতে তার হারানো শৈশব ফিরে আসেনি। পাঠের আনন্দ হয়েছে, কিন্তু আত্মার সুখ হয়নি। ইট ভাঙার দিনমজুর মা মরার সময় বলেছিল, মাথায় ইটের বোঝা টাইনা মাজা ভাঙছি রে বাজান, কইলজা ভাঙি নাই। তুই ম্যালা বড় হবি। আল্লাহ তোরে বড় হওয়ার লাইগা দিনমজুরের ঘরে পাডাইচে। তোর তো বেবাক দুনিয়া দেখা লাগব রে চান্দ।

     মাগো তুমি নাই তো দুনিয়ায় আমার আর কেউ নাই।

     একলা থাইকলে মনের জোর বাড়ে। তোর তো ভাই আছে, বইন আছে। আর মনের জোর আছে। বাজান রে তুই মাথা তুইলা খাড়া। তাইলে আমার ইট ভাঙার খাটনি আর খাটনি থাকব না। হেইডা সোনার মুকুট হইব।

     ওহ্ আল্লাহ রে। ওসমান আলি অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে আলনা থেকে নিজের হাফ শার্টটা টেনে নেয়। গত বছর ও একটা প্যান্ট একটা হাফ শার্ট পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করেছে। এ বছর আর একটা প্যান্ট ও শার্ট কেনা হয়েছে। ও শার্ট পরে দরজা খোলে। যারা বারান্দায় চলাফেরা করছে তাদের মোবাইলের আলো খানিকটুকু অন্ধকার কাটিয়েছে। ও ঘরে তালা দেয়। কেউ একজন পাশ থেকে বলে, বেরোচ্ছিস?

     হ্যাঁ।

     কোথায় যাবি?

     দেখি কোনদিকে যাই।

     বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় তো –

     জানি। আন্ধার। আন্ধারেই তো বড় হলাম। আলো আর দেখলাম কই।

     তোর সঙ্গে কথা বলে মজা নেই। কথা বলতে বলতে এমন এক জায়গায় চলে যাস যে কথা শুনতে ভালোলাগে না।

     ওসমান হাত উল্টে মুখভঙ্গি করে বলে, ভালো না লাগলে শুনবি না। সে জন্য তো কথা বলি না। তোরাই আমাকে কথা বলার জন্য খোঁচাস। গেলাম।

     ফিরবি তো? নাকি পার্কে রাত কাটাবি?

     দেখি কী করি। তবে তোদের মতো নষ্ট হইনি।

     তুই আমাদের হলের গুডি গুডি বয়। এখন পর্যন্ত তো কোনো মেয়ের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকালি না। প্রেমে পড়বি না?

     অন্ধকারে কথা মিলিয়ে যায়। কারো কারো পায়ের শব্দ ভেসে আসে কিংবা বেসুরো গলার গান। ওসমান আলী কোনো কিছু গায়ে না মেখে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।

     রাত হয়েছে। যানবাহন কমেছে। পায়ে হাঁটা লোকের সংখ্যাও কম। ঘুরে ঘুরে এই শহরটাকে দেখা ওর নেশা। ওর প্রিয় বলতে যদি কিছু থাকে তবে তা এই রাতের শহর। আলো-আঁধারের মগ্নতায় ও নিজের শৈশব খোঁজে একজন মানুষের মাঝে, যিনি একদিন এই শহর থেকে উধাও হয়ে গেলেন। তিনি সেলুলয়েডের ফিতায় নিজের চিন্তা গেঁথেছেন। আবেগ ফুটিয়েছেন। মানুষের সামনে নিজেকে হাজির করে বলেছেন, দেখ আমাকে। কোনো কোনো মানুষের রহস্য এমনই। মানুষ রহস্যের আড়াল থেকে দৃশ্যমান হয়ে উঠলে সেটাই কি তার বড় বৈশিষ্ট্য? ও নিজেকে ওর শৈশব খোঁজা থেকে দূরে রাখতে পারে না। ছেলেরা বলে ভবিষ্যতে ও একটা কিছু করতে পারবে। দেশের মানুষ ওকে চিনবে। ও যেই পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে, সেই সেখানেই ওর সামনে মুক্তা বিছানো পথ আছে। ও পারবে উঠতে। কি পারব ও? কতটুকু পারবে? এই ভাবনা মাথায় রেখে ও হাঁটতে থাকে। নীলক্ষেত পার হয়ে আজিমপুর গোরস্থানের সামনে এসে দাঁড়ায়। কবরস্থানের পাহারাদারদের সঙ্গে ওর খাতির জমে উঠেছে। গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই জমিরুদ্দিন এগিয়ে আসে।

     কেমন আছেন আলি ভাই? মেলা দিন পরে আইলেন।

     আমি ভালোই আছি। তুমি কেমন আছ জমির ভাই?

     কালকে আপনের পরীক্ষা নাই। আপনেরে কিছু জিগাইলে ক্যাবল পরীক্ষার কথা কন, বলেই হাসে জমিরুদ্দিন।

     কাল আমাদের ছুটি জমির ভাই।

     কিসের ছুটি?

     বুদ্ধপূর্ণিমা।

     বুজলাম না। কিসের লাইগা এই ছুডি হুনি নাই কনুদিন। যাউকগা। কবরস্থানের ভিতরে ঢুইকবেন?

     হ্যাঁ, সে জন্যই তো এসেছি।

     দিনের বেলায় আইলেন না ক্যান?

     ক্লাস থাকে। লাইব্রেরিতে থাকতে হয়। টিউটোরিয়াল লিখতে হয়।

     মেলা কাজের কথা কইলেন। আমার মনে অয় কারণটা এই রহম না।

     বল, কী রকম।

     আপনে যা খোঁজেন তা দিনের বেলা দ্যাহা যায় না।

     কথাটা খানিকটুকু ঠিক। সবটুকু না। আমি যা খুঁজি তা আমি কখনো পাব না। সে জন্য রাতে আসি। আসলে দিনরাত আমার কাছে সমান।

     তাইলে খোঁজেন ক্যান?

     খুঁজি কেন তা তুমি বুঝবে না জমির ভাই। খোঁজা আমার ফিলসফি।

     মানে? কি কইলেন? জমিরুদ্দিন রাতের আঁধার ভেদ করে তীক্ষ্ণ শব্দ করে। আশপাশ থেকে একজন বলে, কী হইল রে জমির?

     ওসমান জমিরের হাত টেনে ধরে বলে, চলো। ভেতরে যাই।

     কোন দিকে যাইবেন? সোজা যামু?

     না পশ্চিমে চলো।

     ক্যান, পশ্চিমে ক্যান?

     ঢাকা শহর থেকে পশ্চিমে আমার বাবা-মায়ের কবর আছে।

     এইডার লগে ওইডার সম্পর্ক কি? আপনের কতা বুজাই কঠিন।

     আমার কথা তোমাকে বুঝতে হবে না। চলো।

     ওসমান গেটের ভেতর ঢুকে হাঁটতে থাকে।

     এমুন কইরা খুঁজা কি সহজ কাম?

     রাতের অন্ধকারে জমিরুদ্দিনের কণ্ঠস্বর ভেসে যায়। ব্যাঙের ডাক শোনা যায়। থেমে থেমে সে ডাক আসে কবরস্থানের বিভিন্ন জায়গা থেকে। হয়তো ফোকরে কোনো পানি জমেছে। কিংবা ঘাস-লতাপাতার ভেতরে অপেক্ষায় আছে পুরুষ ব্যাঙ। জানান দিচ্ছে তার অবস্থান। ব্যাঙের ডাক শুনে এক মুহূর্ত দাঁড়ায় ওসমান। জানে ও কোনো ব্যাঙ দেখতে পাবে না। অন্ধকার চারদিকে কিংবা অন্ধকার না থাকা, অন্ধকারই তো ওর জীবনে আলো-কোথাও কিছু যায় আসে না। কবরের মাঝখানের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাউন্ডারি ওয়ালের কাছে আসে ওসমান। দেখতে পায় দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে জলফু। এই কবরস্থানেই ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। ও এক কিশোর বালক। কথা শুনে মনে হয় পনেরো কিংবা ষোল বছর বয়স হবে। বেশিও হতে পারে। ওসমান এসব নিয়ে ভাবে না, ভাবে কৈশোরের ছোঁয়ায় ওকে অনেক কাছের মনে হয়, যেন ওর নিজের কৈশোরের ছোঁয়া আছে ওর ভেতরে। পার্থক্য যেটুকু সেটা হলো জলফু স্কুলে যায় না, আর ও নিজে স্কুলে ফার্স্ট হওয়ার কারণে লেখাপড়ার জগতে ঢুকেছিল। টিচারদের শাসনে ফঁকি দেয়ার সুযোগ ছিল না। টিচাররা ভাবতেন ওকে দিয়ে স্কুলের সুনাম বাড়াবেন। ও নিজেও ততোদিনে পড়ালেখায় ডুবে গিয়েছিল। ভেবেছিল, পড়ালেখার দুনিয়া নিজের ঘরে পাওয়া মানে পুরো দুনিয়া পাওয়া। ও জলফুর সানে এসে দাঁড়ায়। ও ঘাড় কাত করে মাথা হেলিয়ে রেখেছে। ওসমান ওকে সবুজ ব্যাঙ ডাকে। ওসমানকে দেখে আজ ও উঠে দাঁড়ায় না। নড়েও না। হাত বাড়ায় না। বলে না, আজ পেট ভরে ভাত খেয়েছি। কবর খুঁড়ে ভালোই টাকা পেয়েছি। দুই থালা ভাত আর দুই থালা গরুর গোশত জম্পেস খাওয়া।

     ওসমান আশপাশে তাকায়। জমিরুদ্দিন নেই। আজ ওর পিছু পিছু আসেনি। পেছন থেকে কখন কেটে পড়েছে ও তা টের পায়নি। বলেওনি যে আমি কাজে যাচ্ছি আলী ভাই। ওসমান গিয়ে জলফুর পাশে বসে।

     কথা বলছিস না যে জলফু? মনে হচ্ছে তুই আমাকে দেখতেই পাসনি।

     দেখতে পাব না কেন, একশোবার পেয়েছি। আমি ইচ্ছ করে আপনার দিকে তাকাইনি। আপনি তো আমাকে খুঁজতে আসেননি।

     তা তো আসিনি। তবু তোর সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল।

     কপাল। জলফু চেঁচিয়ে বলে, কপালে থাকলে যা হবার তা তো হবে। এ্যাঁ-

    চেঁচাচ্ছিস কেন? তোর কি হয়েছে রে সবুজ ব্যাঙ?

     চেঁচাইনি। এটা আপনার সবুজ ব্যাঙের ডাক। ব্যাঙ খোঁজেন আর ব্যাঙের ডাক বোঝেন না।

     তোর কি মন খারাপ জলফু? আমার সঙ্গে এমন ঠাস ঠাস কথা বলছিস কেন?

     হ্যাঁ আমার মন তো খারাপই, অনেক খারাপ। অনেক মন খারাপ।

     আজ কয়টা কবর খুঁড়েছিস?

     তিনটা। আমার বয়সী একটি মেয়ের বাবা মরে গেছে। মেয়েটি খুব কাঁদছিল। মনে হয়েছিল মেয়েটিকে বুকে টেনে বলি, কাঁদিস না রে। আমারও বাবা মরে গেছে। অ্যাকসিডেন্টে। তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর।

     মেয়েটিকে এই কথা বলতে পারিসনি দেখে কি তোর মন খারাপ? সব কথা সবাইকে বলা যায় না। মনে অনেক কথা আসবে সেসব কথা মনের ভেতরেই রাখতে হবে। উপায় নেই।

     উপদেশ দেন কেন আলী ভাই? পড়ালেখা বেশি শিখি নাই। কিন্তু অনেক কিছু বুঝতে পারি। কবর খোঁড়ার কাজ করে যেই ছেলে সে কি করে ক্লাস নাইনে পড়া মেয়েকে এমন কথা বলবে? এটা আমিই জানি। আপনাকে বলে দিতে হবে না।

     আমি তো জানি যে তুই একজন পন্ডিত।

     পন্ডিতই। দেখে দেখে শিখেছি। দেখতে দেখতে বুড়ো হয়ে গেছি।

     ওসমান হা হা করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে, তুই দশটা বুড়ো ব্যাঙ।

     আপনার হাসিও ব্যাঙের ডাকের মতো লাগছে।

     তাহলে আমি তোর গুরু। নাকি রে?

     এবার জলফু হা হা করে হাসে। হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ায়। ওসমানের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে বলে, ভালো আছেন আলী ভাই?

     ভালো তো আছি। বেশ ভালো আছি।

     আজকে কবরস্থানে কেন এসেছেন?

     একজন প্রিয় মানুষকে খুঁজতে।

     আমি জানি আপনি কাকে খুঁজতে এসেছেন। তাঁর নাম জহির রায়হান। আপনার কাছ থেকে শুনেছি তাঁকে আপনি কোনো দিনও পাবেন না।

     পাব। পাব রে পাব। তুই বেশি ডেঁপোমি করিস না।

     আবার হো হো হাসিতে নিজেকে মাতিয়ে তোলে ছেলেটি। কবরস্থানে রাতের অন্ধকারে হাসা যায় না, এমন ধারণাই সবার। কিন্তু ওসমানের মনে হয় প্রিয়জনের সঙ্গে তো হাসা যায়। তাদের অনুভব যদি বুকের ভেতর ঝড় তোলে তাহলে মৃত্যুকে সত্য মেনে হাসা যাবে না কেন? মৃত্যু তো জীবনের সত্য। আমার মা নেই, বাবা নেই- তাদের জন্য আমার ভালোবাসা আছে, হাসি-আনন্দ আছে। তাদের জন্য সবটুকুই আমার দুঃখ না। এই সিদ্ধান্তে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওসমানও হো হো হাসিতে যুক্ত হয় জলফুর সঙ্গে। এক সময় জলফু জিজ্ঞেস করে, আপনি হাসছেন কেন?

     হেসেই আমার মাকে ভালোবাসার কথা বললাম। মা না হলে আমি এত দূর আসতে পারতাম না।

     এই কবরস্থানে আপনের মা নাই।

     তাতে কী, মা যে কবরেই থাকুক না কেন, আমার হাসি শুনতে পাবে।

     আর যে মানুষটিকে আপনি খোঁজেন তিনিও কি শুনতে পাবেন?

     অবশ্যই পাবেন। আমার ভালোবাসাও তাঁর কাছে পৌঁছে যায়। এটুকু বলে থামে ওসমান। তারপর জলফুর বাঁকা মাথা নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলে, তোর কি খিদে পেয়েছে সবুজ ব্যাঙ?

     আজ আমি দুপুরের পর থেকে কিছু খাইনি। পেট চোঁ চোঁ করছে। মাঝে মাঝে গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে পেটের ভেতরে।

     ব্যাঙ ডাকছে মনে হচ্ছে? আমারতো মনে হচ্ছে আমি তোর ভেতর থেকে ব্যাঙের ডাকই শুনতে পাচ্ছি।

     খিদে ব্যাঙ হয়ে ডাকছে। হি-হি করে হাসে জলফু। ওর হাসি শুনে ওসমানের মন স্নিগ্ধ হয়ে যায়। কবরস্থানের নীরব স্নিগ্ধতায় ওর প্রবল টান আছে। জলফু ওর সঙ্গে থাকা আর এক ধরণের অনুভব। ওসমান ওকে খুব পছন্দ করে, মনে হয় কবরস্থানের ওই একমাত্র জীবিত মানুষ।

     ওর মাথায় হাত রেখে বলে, তোর খিদে ব্যাঙ হয়, ভালোই বলেছিস। গুড বয়, আমার সবুজ ব্যাঙ। তুই এখানে কিছুক্ষণ বসে থাক। আমি তোকে ভাত খাওয়াব। আমি কবরস্থান ঘুরে আসি।

     কতক্ষণ লাগাবেন? আপনার তো অনেক সময় লাগে। যদি রাত দুপুর হয়ে যায়?

     যেতে পারে। দুপুর রাতেও রেস্টুরেন্টে খাবার পাওয়া যায়। এসব রেস্টুরেন্ট রাতজাগা মানুষের জন্য খোলা থাকে। ওদের হাঁড়িতে যা থাকবে খেয়ে শেষ করে ফেলবি।

    হাঁড়ি ভর্তি থাকলে?

     এত রাতে হাঁড়ি ভর্তি থাকবে না।

     গেটের দিকে যাই। আপনি কবরস্থান ঘুরে আসেন আলী ভাই।

     কোথায় যাবি? দূরে কোথাও যাবি না তো?

     ওসমানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ও হনহনিয়ে হেঁটে যায়। ওসমান ওর পেছনে পেছনে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, ছেলেটি এমনই। স্মার্ট এবং স্পষ্ট বক্তা। এই মুহূর্তে ও ওসমানের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। ভবঘুরে ছেলেদের জীবনে প্রশ্ন এবং উত্তর কোনো সমাধান নয়। ওরা নিজের ইচ্ছেমতো নিজেকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। ওর বাবা-মা-ভাইবোন কামারাঙ্গীরচরে থাকে। ও বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে। ওসমানকে বলেছে, ঘরের চেয়ে পথই ভালো। পথে থাকলে পথ ঘর হয়। না হলে অন্য জায়গা। যেমন এই কবরস্থান কিংবা পার্ক কিংবা ফুটপাথ কিংবা ওভারব্রিজ কিংবা ফ্লাইওভার। যেখানে খুশি সেখানে। ঝড়-বৃষ্টি-শীত-গ্রীষ্ম সবই আপন। হা হা হাসিতে নিজেকে ভরিয়ে দিয়ে ওসমানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমার কোনো দিন ঘর হবে না।

     ওসমান বলেছিল, বউ চাস না? ছেলেমেয়ে? একটা বিছানা? একটা রান্নাঘর?

     হ্যাঁ, চাই। তবে সবার মতো ঘর না।

     তাহলে তোর ঘর কী?

     মরণ। ওর মুখে মৃদু হাসি।

     মরণ? কী বলিস? বুঝতে পারছি না।

     আপনি বললে বলতেন মৃত্যু। আমার ঘর মৃত্যু। যে ঘুম আর কোনো দিন ভাঙবে না। ওই ঘরে আমি শুয়ে থাকব।

     তারপর হঠাৎ করে বামে তাকিয়ে পাশের কবরের কোণা থেকে একটি ব্যাঙ ধরে ওসমানের চোখের সামনে দুলিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ওসমান চমকিত হয়েছিল। ভেবেছিল, এমন একটি ছেলের গল্প নিয়ে জহির রায়হান সিনেমা বানাবেন। তাঁকে তো ওর খুঁজে পেতেই হবে।

     ও পা বাড়ায় ডানে। খানিকটুকু এগোতেই দেখতে পায় তিনটে নতুন কবর। এর আগে কেউ এই কবরে ছিল। কবরস্থান শুরুর সময় থেকে এখন পর্যন্ত কতজন আছে এখানে? ওসমান মাথার ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। কোন কবরটি আপনার প্রিয় জহির রায়হান? আমি এখন আজিমপুরে। আমি জানি আপনার বেঁচে থাকার শেষ জায়গা ছিল মিরপুর। তারপর আপনি কোথায় গেলেন সে খোঁজ আর পাওয়া যায়নি।

     ওসমান এটুকু ভেবে নিজের সিদ্ধান্তে আসে। ভাবে তিনি সর্বত্র আছেন। এমনকি ভবঘুরে জলফুর মস্তিষ্কেও। ওর চেতনার মধ্যমণিতে। ওর মেধার সরোবরে কিংবা সমুদ্রের মতো বিশাল জগতে যেখানে জলফু মানব-সম্পর্কের বাইরের ছেলে হয়ে যায়। ওর ভেতরে একা থাকার কনসেপ্ট ডেভেলপ করে। সে কনসেপ্ট সামাজিক নয়। সমাজের বাইরের দলছুট চিন্তা। তবু জলফুর মতো কেউ কেউ এভাবেই জীবনের পৃষ্ঠা ভরাতে চায়। ওকে জিজ্ঞেস করলে ও বলবে, মানুষ তো মায়ের পেটে একাই থাকে। বের হয় একা একা। তার সঙ্গে তো আর কেউ বের হয় না।

     ওসমান ওর এমন ধারণাকে ভেঙে দেয় না। ভাবে, সামাজিক বন্ধনে অন্যরকম মানুষ না থাকলে বন্ধন একপেশে হয়ে যেত। যেমন ছাত্রদের সবাইকে ওর ভালো লাগে না। বড় একরকম মনে হয়। তার চাইতে অনেক বৈচিত্র্যময় জলফুর মতো বালকেরা। বেঁচে থাকাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে বলের মতো ছোঁড়ে-ধরে কিংবা মাটিতে গড়িয়ে দেয়। কৈশোর ছাড়িয়ে তারুণ্যের পথে যেতে শুরু করা এমন একটি ছেলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে। ও হেঁটে যায় কবরস্থানের সরু পথে। মাথার ওপরে নানা ধরনের গাছের ডালপালার বিস্তার আছে। ছুঁয়ে দেয় ওর মাথা। এই স্পর্শও বেশ লাগে। ভাবে, মায়ের হাত কি? ওর হারানো শৈশবে মায়ের এমন একটা হাত ছিল। অনবরত মাথা ছুঁয়ে রাখত সে হাত – সেটা ডান না বাম হাত তা ও জানত না। ছুঁয়ে থাকাটাই আনন্দের ছিল। এখন মনে হয় কখনো ডান হাত থাকত, কখনো বাম। হাত ছিল অদৃশ্য অঙ্গ-মায়ের সেই হাত কখনোই তার নিজের চোখের পানি মোছায়নি। ওর মাথার ওপর মায়ের দুই হাতই ছিল। সে জন্য সেই হাত আর কোনো কাজে নড়েনি, নিজের চোখের পানি মোছার জন্যও না।

     তখন ওর নিজের চোখেই পানি আসে। ও দুই হাতে পানি মোছে। হাঁটতে হাঁটতে আরো খানিকটুকু এগিয়ে গেলে ওর মনে হয় – ওর মা হুরমুতুন বানুও একটি সিনেমার চরিত্র হতে পারত। একজন ইটভাঙা দিনমজুর যার হাত আছে, তবু সেই হাত নেই। এমন এক মানসিক অবস্থায় মৃত্যুর কথা ভাবতে ভাবতে বলল, বাবা ওসমু রে তোর কি অইতে সাধ হয় ক আমারে।

     সাধ আবার কী? শব্দটি শুনতে বিরক্ত লাগে ওর।

     তোর কী অইতে ইচ্ছা অয়। বড় হইয়া কী হইবি?

     সিনেমা বানামু। এমুন সিনেমা যে মানষে দেইখা চোখের পানি মুইছতে পারব না। চোখের পানির বান অইব। দুই কূল ভাসানো বান।

     সেদিন হুরমুতুন বানু গুনগুনিয়ে কেঁদেছিল। ছেলে কী হতে চেয়েছিল তা সে বুঝতে পারেনি। ও যে বাজারে গিয়ে সিনেমা দেখত সে খবর তার কাছে ছিল। সিনেমা বানানো কারো ইচ্ছা হতে পারে তা হুরমুতুন বানুর মাথায় আসছিল না। নিজেকে বোঝার আপ্রাণ চেষ্টায় তার জান বেরিয়ে যাচ্ছিল। সেই কষ্ট বুকে নিয়ে মরে গিয়েছিল হুরমুতুন, মাত্র দুই দিনের মাথায়। ওসমান আলীর এসএসসি পরীক্ষা ছিল সামনে। মায়ের মৃত্যুতে ওর হারানো শৈশবের বাকিটুকু শূন্য হয়ে গিয়েছিল। বলে দিয়েছিল, ও আর পড়ালেখা করবে না। স্কুলে যাবে না। এসএসসি পরীক্ষা দেবে না। স্কুলের হেডমাস্টার ওর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, তুই আমাদের স্কুলের গর্ব। মায়ের জন্য কাঁদবি আবার পরীক্ষাও দিবি। তেমন হলে একদিকে চোখের পানি ফেলবি, অন্যদিকে পরীক্ষা দিবি। শুধু খেয়াল রাখতে হবে চোখের পানিতে যেন খাতা ভিজে না যায়। বুঝলি বাবা, বাবা-মা তো সবার জীবনে-ওসমান আলী কাঁদতে শুরু করলে হেডমাস্টার কথা বলেননি আর। ওর হাত ধরে বলেছিলেন, আয় আমার সঙ্গে। তারপর তিনি ওর হাত ধরে বিভিন্ন পথে অনেকক্ষণ হেঁটেছিলেন। কখনো পাকা সড়কে, কখনো মেঠো পথে। কোথাও বসেননি, কোথাও দাঁড়াননি। এমনকি একটি কথাও বলেননি। শেষে ওদের বাড়ির সামনে ওকে ছেড়ে দিয়ে বলেছিলেন, তোর বড় ভাইয়ের কথা শুনবি। ঘরে থাকবি। লেখাপড়া করবি। ভালো রেজাল্ট চাই।

     বোর্ডে স্ট্যান্ড করে ভালো রেজাল্টই তো করেছিল ও। সেজন্য এখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। পথের ধারে ছিটকে পড়েনি। দিনমজুর থাকতে হয়নি। হলে থেকে পড়াশোনার খরচ চালাতে কষ্ট হয়। মিরপুরে গিয়ে পড়াতে হয় একটি ছেলেকে। ওর বাপের বিত্ত আছে, কিন্তু ছেলের মেধা নেই। গাধার একশেষ। ওসমানের মনে হয় বড় হতে হতে ছেলেটি বখাটে হয়ে যাবে। বাপের টাকা ওকে সর্বনাশের মাথায় চড়িয়ে দেবে। একদিন ছেলেটির বাবাকে ও বলেছিল, শাওনের পড়ালেখায় মনোযোগ নেই। ও পর্নো ছবি দেখতে ভালোবাসে। আমাকেও দেখতে বলে।

     তাতে তোর কি রে শুয়োরের বাচ্চা। আমার ছেলে যা খুশি তা করবে। একটা ভ্যানচালকের ছেলে তার আবার বড় বড় কথা। খবরদার আমার ছেলেকে যদি কিছু বলবি তো তোর দাঁত ফেলে দেব। মনে থাকে যেন।

     ওই ভর্ৎসনার সময় ও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল, ভ্যানচালক বাবার মর্যাদার কথা ভাবেনি। মাথা সোজা করে বলেনি, ভ্যান চালায় তো কী হয়েছে, তিনি মানুষ হিসেবে অনেক বড়। কারো ক্ষতি করেননি। কারো টাকা মেরে দেননি। ভর্ৎসনা করে লোকটি চলে গেলেও চুপ করে দাঁড়িয়েছিল ওসমান আলি। দেখেছিল ঘরের দেয়ালজুড়ে আয়নায় ওর নিজের ছবি। সেই ছবিতে ফুটে আছে শৈশবে ইটের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে হেঁটে যাওয়া ছেলে। কৈশোরে ভ্যান চালিয়ে চলে যাওয়া একটি ছেলে। যৌবনে কবরস্থানে খুঁজতে আসা একজন শহীদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলে।

     অস্পষ্ট হয়ে আছে ফেলে আসা দিনের ছবি। কত ধরনের ছবি যে তার, সবগুলোর আকার বোঝা যায় না। সেখানে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বলেছিল, তুমিও একটি নষ্ট ছেলে। তুমি যাকে পড়াও তার চেয়েও বেশি খারাপ – এত কথা শোনার পরেও যে ছেলে ওই লোকের ঘরে টিউশনি করে, সে তো নষ্ট ছেলেই। এখন এই কবরস্থানে দাঁড়িয়ে মনে হয় শাওন কতটুকু নষ্ট হয়েছে তার চেয়ে ও বেশি নষ্ট। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ চালাতে হবে। সে জন্য ওই বাড়ির ছেলেটিকে পড়ানোর কাজ ছেড়ে চলে আসতে পারেনি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দায় কাঁধে নেওয়া সহজ মনে হয়নি। যার জীবন থেকে শৈশব হারায় তার সাহসও কি দমে যায়? নিজের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই ওর। এই প্রশ্নের উত্তর ও খুঁজবে না। যার দ্রুত সমাধান নেই তার উত্তর খোঁজার দরকার নেই। একদিন ওই লোকের ঔদ্ধত্যের জবাব দিয়ে আসবে। সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

     ও সব ভাবনা ঝেড়ে দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে যায় – জহির রায়হান কদিন আগে আমি যে সিনেমাটি দেখেছি তার নাম ‘হোটেল রুয়ান্ডা’। রুয়ান্ডার গণহত্যার পটভূমিতে তৈরি। আপনি নির্মাণ করেছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’, তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার কথা। মানুষের ইতিহাস সংলগ্নতা মানুষকে কাছে আনে। মানুষের শিল্পবোধ সেই ইতিহাসকে মূর্ত করে। আমি আপনাকে খুঁজছি জহির রায়হান। কোথায় আছেন এখন? ওসমান আলী পুরো কবরস্থান ঘুরে আবার নিজে নিজে কথা বলে, আমি আপনার সঙ্গে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…’ গানটি গাইতে চাই। শহীদ বরকত এই কবরস্থানে আছেন। আমি তাঁর কবরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি। খুঁজছি এই গানের গীতিকারকেও। তিনিও হারিয়েছেন। কোথাও নেই তাঁর কবর। তিনি একজন অমর সুরকার। শহীদ আলতাফ মাহমুদ।

     ওসমান আলী ইলেকট্রিক বাতির আধো অন্ধকারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। সময় এখানে কলমের খোঁচা মাত্র নয় যে টান দিলেই খাতার সাদা পৃষ্ঠায় ঢাকা পড়ে যাবে। সময় এখানে ধারাবাহিকতা এই মুহূর্তে শহীদ বরকত থেকে আলতাফ মাহমুদ-জহির রায়হান। একাত্তরের গণহত্যা থেকে রুয়ান্ডার গণহত্যা। আরো হাজার হাজার বছরের ধারাবাহিকতা, যেখানে কেউ আঁচড় টানতে পারে না। স্রোত রুদ্ধ করতে পারে না। ওসমান আলী কবরের পাশে বসে বলে, আপনি ভালো আছেন তো শহীদ করকত? কোথায় আছেন? পুরো বাংলাদেশের সবখানে। আপনি তো এক জায়গার মানুষ মাত্র নন। আপনি দেশের দেশের মানুষের। ওর মাথার ভেতরে রুদ্ধ আলোর ঝলকানি। ‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমার নানা দৃশ্য মাথার ভেতরের এক কোনা থেকে অন্য কোনা অতিক্রম করে। ও নিজের ভেতরে সেই জায়গাটি খুঁজতে থাকে। যেখানে খানিকটা স্বস্তি আছে, কিন্তু খুঁজে পাওয়া কঠিন।

     নিঃশব্দে পাশে এসে বসে জলফু। ওসমান জলফুর ঘাড়ে হাত রাখে। ওর দিকে তাকায় না। জলফু মাথা থেকে হাত সরিয়ে বলে, আলী ভাই আপনি কি আমার খিদের কথা ভুলে গেছেন?

     না, ভুলিনি। যা কিছু হারিয়ে যায় তাকেও আমি মনে করি।

     তাহলে এখানে বসে আছেন যে? রেস্টুরেন্ট তো বন্ধ হয়ে যাবে।

     ওদের হাঁড়িতে ভাত-মাংস আছে?

     আছে। আপনি খেলেও শেষ হবে না।

     আজকে কি ওদের কাস্টমার কম হয়েছে?

     আমি কেমন করে জানব, আমি কি ওখানে কাজ করি? নাকি দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি?

     তুই খুব রেগে যাচ্ছিস সবুজ ব্যাঙ।

     খিদেয় আমার পেট চোঁ চোঁ করছে। রাগে আমার মাথায় আগুন জ্বলছে।

     চল, চল। আমারই ভুল হয়েছে সবুজ ব্যাঙ। ওসমান আলী জলফুর হাত ধরে। আমারও খিদে পেয়েছে রে। হলে আমার ভাত তো এত রাতে আর পাব না। আমিও তোর সঙ্গে ভাত খাব।

     ওই ছেলেটার বাবা আজ আপনাকে বেতন দিয়েছে? টিউশনির টাকা?

     মাস তো ফুরোয়নি। তুই ভুলে গেছিস। মাস শেষ না হলে বেতন দেবে কেন? এই শহরে দয়ার মানুষ কি আছে? তুই বল?

     আমি মানুষের খোঁজ রাখি না। খোঁজ রেখে কী হবে? খোঁজ রাখার ইচ্ছে আমার হয় না।

     তোর কাছে আমি কি মানুষ?

     না, হি হি করে হাসে ও। হাসতেই থাকে। এক সময় হাসি থামিয়ে বলে, আপনি আমার কাছে জোনাকি আলী ভাই।

     কেন, জোনাকি পোকা কেন রে?

     জোনাকি যেমন জ্বলে আর নিভে, আপনিও তেমন জ্বলেন আর নিভেন।

     ওরে পাজির পা-ঝাড়া। তবে একটি দামি কথা বলেছিস ব্যাঙের ছানা। তোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আজ আমি ভাত খাব।

     দুজনে রেস্টুরেন্টে ঢোকে। ওসমান বুঝতে পারে জলফু আয়োজন ঠিক রেখেই ওকে ডাকতে গেছে। একটি টেবিলে দুটি থালা, দুই গ্লাস পানি, নুনের বাটি দেওয়া আছে। ওদের দেখে ভাত-মাংস নিয়ে আসে রেস্টুরেন্টের মালিক। বলে, পেটভরে খান স্যার। আপনি আমার শেষ কাস্টমার।

     আরো কেউ তো আসতে পারে।

     আসবে না। তল্লাট খালি হয়ে গেছে।

     তাহলে আপনিও আসেন। আমরা একসঙ্গে খাই। এই জলফু, যা ওনার জন্য একটা প্লেট নিয়ে আয়।

     না, না, প্লেট আনতে হবে না। আমার খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। আপনারা খান।

     জলফু ততক্ষণে খেতে শুরু করেছে। ওসমান আলীও হাত লাগায়। এক লোকমা ভাত মুখে পুরলে মনে হয়, কয়েক দিন পরে সুস্বাদু মাংসের তরকারির ভাত ওর প্রাণ জুড়িয়ে দিল। খাওয়া নিয়ে ওর তেমন কোনো বাড়াবাড়ি নেই। তারপরও জিহ্বা এমন সুস্বাদু খাবার দাবি করে। আকস্মিকভাবে। কখনো কোনো একসময়ে। আজকের এই মধ্যরাতের সময় ওর কাছে অন্য রকম এ কারণে যে পথের ছেলে জলফু বলেছে, আপনি জোনাকির মতো জ্বলেন আর নিভেন। আশ্চর্য! ছেলেটি কত অবলীলায় ওকে একটি জায়গায় নিয়ে গেল। এক মুহূর্ত ভাবতে হয়নি। তাহলে ওর মাথার ঘিলুতে কি জোনাকির আলো জ্বলেই থাকে? যা ওর মগজে আলোর দীপ শিখা? তা-ই হবে। প্লেটের ওপর ওর হাত থেমে এসেছিল। সে হাত আবার দ্রুত হয়। মুখে উঠে যায় ঘন ঘন। ওর ভাবনা আবার জাগে। ভাবে, পথের ছেলের জ্ঞানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া ছেলের ছাপ আছে। যখন ও বর্তমানে থাকে তখন ও জ্বলে থাকে। যখন ও হারানো শৈশব খুঁজে পায় না তখন ও নিভে যায়। এই সরল সত্য ওকে আনন্দ দেয়। আজ রাতের খাবার গভীর আনন্দ হয়ে ওঠে। প্রতিদিন এমন খাওয়া হয় না। হোস্টেলের রান্না গতানুগতিক। কোনো মৌলিকত্ব নেই। দায়সারা রান্না বলতে যা বোঝায় তা-ই। ডাল মানে পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ মেশানো রঙিন পানি। বাবুর্চিকে বললে বলে, পানির মতো খান। মনে করেন স্যুপ। এত কম পয়সায় ভালো রান্না খোঁজা কি ঠিক!

     তাই তো। শব্দটি ও জোরেই বলে। এবং সঙ্গে সঙ্গে জলফুর দিকে তাকায়। জলফু হাতের তালু চাটতে চাটতে বলে, আপনি কার সঙ্গে কথা বললেন আলী ভাই।

     ধর তোর সঙ্গে? তুই ছাড়া তো কেউ নেই এখানে।

     আমার সঙ্গে বললে তো আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতেন। আপনি তা করেননি। বলেছেন, তাই তো।

     তাহলে ধরে নে আমি নিজের সঙ্গে কথা বলেছি।

     তাহলে আপনার ভেতরে কেউ আছে?

     আছেই তো, অনেক মানুষ আছে।

     হি হি করে হাসতে হাসতে বলে, ও এ জন্য আমি আপনাকে জোনাকি বলি। জ্বলা আর নেভা। যাই, হাত ধুয়ে আসি। আপনার প্লেটও দেন, একসঙ্গে ধুয়ে আনব।

     ও থালা নিয়ে চলে গেলে এগিয়ে আসে মালিক।

     আমি হাত ধুয়ে এসে আপনার বিল দেব। পকেটে বেশি টাকা নাই। যদি কম হয় তাহলে বাকিটা কালকে এসে দিয়ে যাব।

     পকেটে টাকা কম? দেখি। লোকটি ওকে আটকে দিয়ে ওর সব পকেটে হাত ঢোকায়। ওসমান আলী অবাক হয়ে বলে, করেন কী? আমার পকেটে হাত দিচ্ছেন কেন?

    যা আছে সব নেব সে জন্য।

     সব নিবেন? মগের মুল্লুক নাকি?

     এত রাতে ভাত খেলে খেসারত দিতে হয়। ভাত বেশিও খেয়েছেন। একদম গলা পর্যন্ত। খাওয়ার সময় হুঁশ থাকে না?

     ওসমান আলি বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। এমন সুনসান হয়ে যাওয়া চারদিকে যখন নিঃশব্দ স্তব্ধতা, তখন কি ও হাইজ্যাকারের পাল্লায় পড়ল। লোকটি ক্রূর হাসি হেসে বলে, ভাবাভাবির কিছু নেই। টাকা বের কর।

     তুমি করো। দেখো কত আছে? ওসমান দুই হাত ওপরে তুলে দাঁড়ায়। ছুটে আসে জলফু।

     আপনি আলী ভাইয়ের পকেট হাতড়ান কেন? তাঁর পকেটে টাকা না থাকলে আমি আপনার ভাত-গোশতের দাম খাটনি দিয়ে শোধ করব। খবরদার! ছাড়েন তাঁরে।

     ওরে শয়তান, আমার ভাত খেয়ে আমার ওপর কথা।

     লোকটা জলফুর গালে ঠাস করে চড় মারে। লম্বা-চওড়া শক্তিধর মানুষটির চড় খেয়ে উল্টে যায় জলফু। কোনো রকমে পাশে রাখা চেয়ার ধরে নিজেকে সামলায়। তারপর আবার রুখে দাঁড়াতে চাইলে লোকটি ওর হাত মুচড়ে ধরে বলে, তুই কি মরতে চাস? দিব শেষ করে?

     তুমি কি তাহলে বাঁচবে শয়তান? পুলিশের প্যাঁদানি খেয়ে-

     আবার চড় পড়ে ছেলেটির গালে। ও লোকটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে ওসমান আলী ওকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে টেনে সরায়। জোরে জোরে বলে, থাম রে জলফু, থাম। তারপর লোকটির দিকে তাকিয়ে বলে, পকেট থেকে যা পেয়েছেন তাতে কি ভাতের দাম হয়েছে?

     বেশিই হয়েছে।

     বাকিটা ফেরত দেন। এই টাকা আমার হালাল রুজি।

     এই সময়ে হারাম-হালাল বুঝতে চান মিয়া। আপনে কোন জনমের মানুষ? যান, বারান। ওইডারে ছাড়েন। ওইডারে রাইতে আমার লাগব।

     মানে? ওসমান আলীর বিমূঢ় কণ্ঠস্বর থমকে যায়।

     কথা বাড়াইয়েন না। যান বারান।

     রেস্টুরেন্টের মালিক ওকে এক রকম ঠেলে বের করে দরজা বন্ধ করে দেয়। দরজা পুরো লাগানোর আগে ওসমান ধাক্কা দিয়ে খুলে ডাকে, সবুজ ব্যাঙ।

     এখন আমার বিছানা পাতা লাগবে আলী ভাই। মাঝে মাঝে লোকটার বিছানা পেতে দিতে হয়। তারপর আমার ঘুমাতে হয়।

     এক বিছানায় ঘুমাবি? ওসমানের কন্ঠে ঘড়ঘড় শব্দ হয়, যেন এই প্রথম ও নতুন করে কোনো কথা বলছে। একজন অপরিচিত কারো সঙ্গে।

     হ্যাঁ। আপনি যান। আমার জন্য ভাববেন না। আমি ভালো থাকব।

     তারপর ও মালিকের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, তুই আলী ভাইয়ের টাকাটা ফেরত দে।

     এই চুপ। বেশি কথা বলবি না।

     আচ্ছা বেশি কথা বলব না। তবে না দিলে আজ রাতে তোর কপালে দুঃখ আছে। দে, দে বলছি।

     জলফু চিৎকার করে ওঠে। তারপর দরজার কাছে এসে বলে, আমি গেলাম পার্কে ঘুমাতে।

     লোকটা ওর হাত চেপে ধরে রেখে পকেট থেকে টাকা বের করে ওসমানের দিকে ছুঁড়ে মারে। টাকাগুলো ছড়িয়ে যায় চারদিকে। ওসমান দুই পা পিছিয়ে এসে হনহন করে হাঁটতে শুরু করে। তারপর দৌড়াতে থাকে। এক দৌড়ে ওর হলের গেটে এসে দাঁড়ায়। গেটের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে দম নেয়। এতটা দৌড়াতে পেরেছে দেখে নিজের ওপর মায়া হয়। মধ্যরাতের এই শহর ওর চারদিকে কাঁচের দেয়াল হয়ে যায়। ও খুঁজতে বেরিয়েছিল একজন মানুষকে। যার সঙ্গে ও অনবরত ভাগাভাগি করে নিজের চিন্তা। আজ ওর চারদিকের আয়নায় নানা দৃশ্য ওকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যায়। দেখতে পায়, সময় কোথায় থেকে কোথায় চলে গেছে। সময়ের হিসেবে আজ ওর স্থিতি নেই। ও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। দুই পা টনটন করছে। নিজের ভার ধরে রাখা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে কখনো এমন কঠিন সময় ওকে দেখতে হয়নি। ও গেটের সামনে বসে পড়ে। কাচের দেয়ালে ভেসে ওঠে ওর ফেলে আসা জীবন। সেখানে ওর শৈশব নেই।

     স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে একজন কিশোর বালক ওসমান আলী খুঁজে বেড়াচ্ছে ওর শৈশব। কিছুক্ষণ আগে ও দেখে এসেছে আর একটি বালক, যে হারাচ্ছে তার কৈশোর। এই কৈশোর ও আর কোনো দিন খুঁজে পাবে না। আগামীতে ও যদি নষ্ট মানুষ না হয়, তবে এই কৈশোরের জন্য ও কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাবে। ওর আদরের সবুজ ব্যাঙ কৈশোর হারিয়ে যাওয়া বালক হবে, এটা ও দেখতে চায়নি। ওর ভেতরের সবটুকু গুঁড়িয়ে যায়। গুঁড়িয়ে সমান হয়ে যায় বুকের পাটাতন। ও প্রাণপণে ভুলতে চেষ্টা করে মধ্যরাতের ঘটনাটি। লোকটি যখন টাকা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, তখন চিৎকার করে বলছিল, আজকে বিছানায় তোকে থেঁতলে শেষ করব। বুঝবি তখন মাতবরী কাকে বলে। জলফু চেঁচিয়ে বলছিল, তুই একটা হারামি। এমন হারামি আমি দেখিনি।

     ওসমানের মনে হচ্ছিল ও দৌড়াতে ভুলে যাচ্ছে। ওর সামনে গভীর অন্ধকার, সেই অন্ধকারে ছেলেটিকে নিয়ে লোকটির মধ্যরাতের উৎসব জমে। বিনিময়ে ছেলেটি পায় বিছানা এবং ভাত। পাশাপাশি পেয়েছে লোকটির মুখের ওপর কথা বলার সাহস। ওকে আদেশও দিতে পারে এবং লোকটি সেই আদেশ মানে। ওসমান প্রাণপণে ভুলতে চেষ্টা করে লোকটির চেহারা। ভুলে যাওয়ার বিষয়টি ওর কাছে একদমই সহজ না। মধ্যরাতের দৃশ্যটি স্থির হয়ে যায় ওর মস্তিষ্কে। ছোটবেলা থেকে লোকের কাছে শুনেছে, ছেলেটির মাথা ভালো এই ভালো মাথা নিয়ে ওর বুকের কষ্টে ধস। ও আস্তে আস্তে উঠে বসে। দেখতে পায়, আশপাশের ফুলগাছের ঝোপঝাড়ে জোনাকির আলো জ্বলছে আর নিভছে। শোনা যায় ওর কণ্ঠস্বর, আলী ভাই তুমি একটা জোনাকি। জ্বলো আর নেভো। আলী ভাই ওসমান চিৎকার করে বলে, চুপ কর শুয়োরের বাচ্চা। তোর জীবনের জোনাকিরা কোনো দিন জ্বলবে না। আজ থেকে তুই আর আমার কাছে নেই। তোর আয়ু এখানেই শেষ। শুনতে পায় সেই একই কণ্ঠস্বর, আমার কী দোষ! আমার চারদিকে তো শুধু লড়াই। ভাতের লড়াই। ঘুমানোর লড়াই। তুমি কী করতে পারবে আমার জন্য? বড় কথা তোমার মুখে মানায় না। ছেলেটি ঠিকই বলেছে। ওসমান নিজেকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ওর সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটি যখন দুটো চড় গালে নিয়েছে, তখনো তো কিছুই করতে পারেনি। তাহলে ছেলেটিকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে কেন? কী রাইট আছে ওর?

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleতার চোখের তারায় – সায়ক আমান
    Next Article আকাশ পাতাল – নীললোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

    Related Articles

    সেলিনা হোসেন

    যমুনা নদীর মুশায়রা – সেলিনা হোসেন

    August 3, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অঁতোয়ান দ্য সাঁত-এক্সুপেরি
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অনীশ দেব
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাসরুর আরেফিন
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রশীদ করীম
    রাজর্ষি দাশ ভৌমিক
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রাফিক হারিরি
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শওকত আলী
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শহীদুল্লা কায়সার
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শৈবাল মিত্ৰ
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রীপারাবত
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সন্মাত্রানন্দ
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমীরণ গুহ
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সরোজকুমার রায়চৌধুরী
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুব্রত গুহ
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সেলিনা হোসেন
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৈয়দ শামসুল হক
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বপ্নময় চক্রবর্তী
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হরিশংকর জলদাস
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    নীললোহিতের অন্তরঙ্গ – নীললোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

    August 7, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    নীললোহিতের অন্তরঙ্গ – নীললোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

    August 7, 2026
    Our Picks

    নীললোহিতের অন্তরঙ্গ – নীললোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

    August 7, 2026

    আকাশ পাতাল – নীললোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

    August 7, 2026

    হেঁটে যাই জনমভর – সেলিনা হোসেন

    August 7, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }