নকশা-কাটা কবজ – ১
১
রাজু শেলফ থেকে মোটা বইটা নামাল। বইয়ের নাম ‘ক্রীতদাস ব্যবসার
চারশ বছর’ লেখকের নাম ‘হার্বাট মিজো’। ছোট ছোট টাইপে ছাপানো সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার বই। বইয়ের মাঝামাঝি আর্ট পেপারে ছাপানো বেশ কিছু ছবি। কিছু আগের দিনের সাদা-কালো ছবি, কিছু হাতে আঁকা। কয়েকটা ম্যাপ—ক্রীতদাসদের কোন পথে সমুদ্র পার করে আনতো ম্যাপে সেগুলো দেখানো আছে। রাজু বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টাল, হঠাৎ এক জায়গায় তার চোখ পড়ে, ‘…জাহাজের পেছনে ক্ষুধার্ত হাঙর। সমুদ্রপথে এরা জাহাজের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। মৃতদেহগুলো সমুদ্রে ছুড়ে ফেলা মাত্র হাঙরের মচ্ছব শুরু হয়ে যায়।…’ রাজু বইটার দাম দেখল, মূল্য ছয়শ টাকা। পনেরো পার্সেন্ট কমিশন দেওয়ার পরও পাঁচশ টাকা থেকে বেশি। রাজু একটা নিশ্বাস ফেলল, এত দাম দিয়ে তার একটা বই কেনার ক্ষমতা নেই। একধরনের লোভাতুর দৃষ্টি দিয়ে বইটার দিকে তাকিয়ে রাজু বইটা আবার শেলফে তুলে রাখতে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ করে শুনল পিছন থেকে একটা মেয়ে তার নাম ধরে ডাকল, “এই! রাজু।”
রাজু ঘুরে তাকাল, তাদের ক্লাসের মিলিয়া। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস শুরুর কয়দিন পরেই ছেলেমেয়েরা নিজেদের মাঝে ভাগাভাগি হয়ে যায়—শহরের আর মফস্বলের ছেলেমেয়ের মাঝে ভাগটা সবচেয়ে বেশি প্রকট। রাজু মোটামুটি মফস্বলের ছেলে, শহরের ছেলেমেয়েদের থেকে খানিকটা দূরে তার জায়গা। মিলিয়া শুধু যে শহরের মেয়ে তা না, যে ক’জন নিজে গাড়ি চালিয়ে ক্লাস করতে আসে সে তাদের একজন। তাই মিলিয়া এভাবে বইয়ের দোকানে তাকে পিছন থেকে ডাকছে দেখে সে এক একটু অবাক হলো। রাজু তার থতমত ভাব কাটিয়ে বলল, “মিলিয়া! কী খবর?”
মিলিয়া বলল, “এত মোটা বই টানাটানি করছিস?”
রাজু আবার থতমত খেল, ক্লাসের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে নিজেরা নিজেদের সাথে তুই তুই করে কথা বলে। রাজু যেহেতু একটু দূরে দূরে থাকে অন্তরঙ্গ হওয়ার সে রকম সুযোগ পায় না। তাই চট করে কারো সাথে তুই সম্পর্কে যেতে পারে না। রাজু তুমি-তুই জটিলতা বাঁচিয়ে বলল, “এই তো, দেখছি।”
“কী বই? দেখি।”
রাজু বইটা দেখাল এবং বইয়ের নাম দেখে মিলিয়া চোখটা একটু বড় করে মাথা নাড়ল, বলল, “ও! তুই আঁতেল!”
কথাটা খুব সহজেই টিটকারি হতে পারত কিন্তু মিলিয়া এত সহজে হাসি হাসি মুখে বলল যে রাজু হেসে ফেলল, বলল, “আঁতেল হওয়া এত সোজা না।”
মিলিয়া বলল, “আমি উপন্যাসের বাইরে জন্মেও কোনো বই পড়ি নাই! তাও শুধু রোমান্টিক উপন্যাস। আঠা আঠা প্রেম না থাকলে পড়তেই পারি না!”
রাজু একটু অবাক হয়ে মিলিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ক্লাসে মেয়েটাকে যেরকম মনে হয়, এই বইয়ের দোকানে মোটেও সে রকম না। শুধু তা-ই না, শাড়ি পরে আছে, চুল উড়ছে, কপালে বিচিত্র একটা টিপ। রাজু কিছু বলার আগেই মিলিয়া বলল, “বইটা রেখে দিচ্ছিস? কিনবি না?”
“নাহ!” অন্য কখনো অন্য কাউকে সে বলতে পারত না কিন্তু মিলিয়াকে কেন জানি খুব সহজে বলে ফেলল, “পয়সা নাই।”
“ধার দিবো?”
রাজু হাসল। বলল, “না, লাগবে না। থ্যাঙ্ক ইউ!”
মিলিয়া মাথা নাড়ল, কিছু বলল না! মেয়েটা মনে হয় জানে না যে তার পকেটে পাঁচশ টাকা নাই সেটা সমস্যা না, তার সমস্যা হচ্ছে এই বইয়ের পেছনে পাঁচশ টাকা খরচ করে ফেললে তার কয়েক দিন শুকনো রুটি খেয়ে থাকতে হবে।
মিলিয়ার হাতে বেশ কয়েকটা বই, চকচকে মলাট, মনে হয় বাচ্চাদের বই। রাজুকে বইগুলো দেখতে দেখে মিলিয়া অনেকটা কৈফিয়তের মতো বলল, “এগুলো কিনিছে গিফট দেবার জন্য।”
রাজু বলল, “ও।” আলাপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এখন তার কিছু একটা বলা উচিত, কিন্তু যেটাই বলতে চায় সেটাতেই তুই কিংবা তুমি বলতে হবে। শেষ পর্যন্ত সাহস করে বলেই ফেলল, “তুই এখানে প্রায়ই আসিস?”
মিলিয়া মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ।”
“আঁতেল?”
মিলিয়া হাসল, বলল, “না, এইখানে কফি খুব ভালো।”
বইয়ের দোকানে কফি খুব ভালো এবং সেটা খাওয়ার জন্য একজন প্রায়ই বইয়ের দোকানে আসে সেটা রাজুর জন্য একটা নূতন তথ্য।
মিলিয়া বলল, “তুই খেয়েছিস এখানকার কফি?”
“নাহ্।”
“আয় তোকে খাওয়াব।”
কফি খাওয়ার ব্যাপারে রাজুর নিজস্ব কোনো মতামত থাকতে পারে কি না সেটা নিয়ে মিলিয়ার কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হলো না। সে তার বইগুলো বুকে চেপে ধরে হাঁটতে থাকে। রাজু তার পিছন পিছন হেঁটে যায়। বইয়ের দোকানটি বিশাল, এক পাশে ছোট একটা ক্যাফে। বেশিরভাগ বসার জায়গায় কেউ-না-কেউ বসে আছে। মিলিয়া তার মাঝে দুইজনের একটা বসার জায়গা বের করে ফেলল। বসে জিজ্ঞেস করল, “কোন কফি খাবি? লাটে নাকি আমেরিকানা?”
রাজু বলল, “কফির আরো রকম আছে নাকি? কফি তো কফিই!”
“না। কফির আরো রকম আছে। এসপ্রেসো হচ্ছে বিষের মতো তিতা, ছোট কাপে দেয়। ফ্রস্টেড দুধ দিয়ে মিশালে সেটা হচ্ছে লাটে। দুধ আরেকটু কম হলে কাপাচিনো। আর দুধ চিনি ছাড়া হচ্ছে আমেরিকানা কোনটা খাবি?”
“বেশি করে দুধ-চিনি দিয়ে যে পায়েশের মতো একটা আছে—”
মিলিয়া হাসল, বলল, “বুঝেছি। তুই এখনও কফি খাওয়া শিখিস নাই।”
রাজু মাথা নাড়ল, বলল, “না শিখি নাই।”
“ঠিক আছে, লাটে অর্ডার দিই। সাথে কী খাবি?”
“কিছু না।”
“এদের ডোনাট খুব ভালো। বস্টন ক্রিম?”
রাজু মাথা নাড়ল, বলল, “তুই খেতে চাইলে খা। আমার লাগবে না।”
রাজুর আসলে একটু খিদে লেগেছে। বড়সড় একটা ডোনাট পেলে খারাপ হতো না। কিন্তু চোখের কোনা দিয়ে সে দেখে ফেলেছে ডোনাট আর কফির দাম দিয়ে সে ক্রীতদাসের বইটা কিনে ফেলতে পারত!
মিলিয়া কফির অর্ডার দিলো। একটু পরেই একজন বড় বড় মগে করে তাদের কফি দিয়ে যায়। রাজু বেশ কৌতূহল নিয়ে দেখল কফির উপরে দুটি হার্ট আঁকা, ভালোবাসায় জড়াজড়ি করে আছে। কফির ওপরে যে ছবি আঁকা যায় রাজু সেটাও জানত না!
মিলিয়া কফির ওপরে জোড়া হার্টের ছবি দেখে মুখ টিপে হাসল, বলল, “এরা ভালো কফি বানায়, কিন্তু মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি বেশি নাই!”
“কেন?”
“ছেলে আর মেয়ে আসলেই ধরে নেয় রোমান্টিক কাপল, আর কফির ওপরে থাকে হার্টের ছবি!”
“একা আসলে কী ছবি দেয় দেখা দরকার।”
“নির্ঘাত ভাঙা হার্টের ছবি দিবে।”
রাজু একটু হেসে কফিতে চুমুক দিলো। কফি বলতে যা সে এতদিন খেয়ে এসেছে তার থেকে যথেষ্ট ভালো। সে বেশ শখ করে লাটের মগে চুমুক দিতে থাকে।
মিলিয়া কফি খেতে খেতে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। এতক্ষণ সে-ই কথা চালিয়ে গেছে। চুপ করে থাকার পর হঠাৎ করে একধরনের নীরবতা নেমে এলো। কী বলে আবার কথাবার্তা শুরু করা যায় রাজু চিন্তা করতে থাকে কিন্তু বলার মতো সে সে রকম কিছু খুঁজে পেল না। এভাবে আরও কিছুক্ষণ কেটে যায়, কফির মগে চুমুক দেওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। তখন হঠাৎ করে মিলিয়া বলল, “কাজটা ঠিক হয় নাই!”
রাজু অবাক হয়ে বলল, “কোন কাজটা?”
“এই যে তোকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছি! তোর হয়তো আসার ইচ্ছা ছিল না, নিজের কাজ ছিল। এখন মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিস, কথা বলার কিছু খুঁজে পাচ্ছিস না—মুখ শক্ত করে বসে আছিস-
রাজু কফি চুমুক দিতে গিয়ে একটা বিষম খেল। ছোট একটা কাশি দিয়ে হেসে বলল, “আমি মুখ শক্ত করে বসে নাই। আমার মুখটাই এ রকম। আর আমার কথা বলার কিছু না থাকলে তোর সমস্যা কী?”
মিলিয়া মাথা নাড়ল, বলল, “না। সমস্যা নাই।”
“তুই কথা বল। আমি শুনি।”
মিলিয়া মাথা নাড়ল, বলল, “আসলে হয়েছে কী—” তারপর হঠাৎ করে কথার মাঝখানে থেমে যায়।
রাজু জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
“আজকে আমি একটা খবর পেয়েছি। তাই মনটা ভালো নেই। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ফোনে না— সামনাসামনি। ভেবেছিলাম এখানে কাউকে পাব। কেউ নাই—তখন তোকে দেখলাম। কী মনে হলো—”
রাজু সূক্ষ্ম একটা অপমান বোধ করে, কেন কে জানে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করল না। মুখটা হাসি হাসি করে বলল, “কী বলতে চাস তুই চাইলে আমাকে বলতে পারিস। আমি খুবই ভালো শ্রোতা। আমি শুধু শুনি, বলি না।”
মিলিয়া বলল, “তাহলে তোকে বলে লাভ কী? একটা চেয়ারকে বললেই পারি।”
“আমি চেয়ার থেকে ভালো। যেখানে হাসার কথা হাসি, যেখানে মন খারাপ করার কথা সেখানে মন খারাপ করি, যেখানে রাগ হওয়ার কথা সেখানে রাগ হই—চেয়ার এগুলো করতে পারে না।”
মিলিয়া ভুরু কুঁচকে রাজুর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “তুই বোকা বোকা ভান করে থাকিস, আসলে তোর মাথায় ফিচলে বুদ্ধি—”
রাজু মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। অনেকেই সেটা বলে।”
মিলিয়া হাত নেড়ে পুরো ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার ভান করে বলল, “আসলে আমার ব্যাপারটা খুবই পারসোনাল। এইটা আমার কাউকে বলার কথা না! কেন যে-”
মিলিয়া আবার কথার মাঝখানে থেমে গেল। রাজু মুখটা একটু গম্ভীর করে বলল, “যখন কেউ কিছু নিয়ে একধরনের চাপের মাঝে থাকে, মন খারাপ থাকে তখন সেটা নিয়ে কথা বললে আসলে মনটা হালকা হয়। আমি পড়েছি এটার ওপর বেস করে সুইসাইড হটলাইন তৈরি হয়। যারা সুইসাইড করতে চায়—”
মিলিয়া বাধা দিলো, “আমি সুইসাইড করতে যাচ্ছি না।”
রাজু হাসল, বলল, “আমি জানি তুই সুইসাইড করতে যাচ্ছিস না। আমার পয়েন্টটা তোকে বোঝানোর জন্য”
“থাক আর বোঝাতে হবে না। আমি সরি তোকে ডেকে এনেছি—”
“আমি কি তাহলে চলে যাব? কফিটা শেষ করে যাই?”
মিলিয়া হাসল, বলল, “ইয়ারকি করিস না। আমি তোকে চলে যেতে বলছি না। কফি খা। আরেক মগ খেতে চাইলে বল অর্ডার দেই—”
“না, আরেক মগ লাগবে না।” রাজু কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “বসেই যখন আছি তাহলে বলে ফেল কী বলতে চাস। তোর ভয় নাই, আমি তোর পারসোনাল কথা বলে বেড়াব না।”
মিলিয়া মাথা নাড়ল, “উঁহু।”
“বল। তোর মন খারাপ কমে যাবে।”
মিলিয়া হঠাৎ গলা নামিয়ে বলল, “আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
রাজু আবার বিষম খেল। নিজেকে সামলে বলল, “কংগ্রাচুলেশন্স। এটা তো ভালো খবর, তোর মন খারাপ কেন?”
মিলিয়া কোনো কথা না বলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে তার নখ দেখতে থাকে। নখগুলো সুন্দর। রাজু সেটা মনে মনে স্বীকার না করে পারল না।
রাজু বলল, “বলেই যখন ফেলেছিস, আরো একটু বল। বিয়ের খবর তো ভালো খবর, তোর মন খারাপ কেন?”
মিলিয়া তার দিকে তাকাল, মনে হলো কিছু বলবে কিন্তু বলল না। রাজু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল, “ছেলে কী করে? আমরা কি চিনি?”
মিলিয়া একটা নিশ্বাস ফেলল, তারপর বলল, “আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করিস না। আমি এটা নিয়ে কথা বলতে চাই না।”
রাজু বলল, “তুই কি জানিস তোর কথার মাঝে কোনো লজিক নাই!”
“কেন, লজিক থাকবে না কেন?”
“প্রথমে বললি মন খারাপ তাই কারো সাথে কথা বলতে চাইছিস সেই জন্য আমাকে ডেকে এনেছিস। তারপর বললি কাজটা ঠিক হয় নাই, এখন আর কোনো কথা বলতে চাস না। তারপর হঠাৎ করে বললি তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বিয়ে ঠিক হওয়া আনন্দের খবর, সেই জন্য তোর মন কেন খারাপ বোঝার কোনো উপায় নাই। এখন আমি যখন জানতে চাইছি তুই মুখ বন্ধ করে অন্যদিকে তাকিয়ে বসে আছিস। এর মাঝে কোন জায়গাটা লজিক্যাল?”
মিলিয়া মুখটা শক্ত করে রেখেই বলল, “তুই একটু আগে বলেছিস কাউকে মনের কথা জানালে মন ভালো হবে। আমি তোকে বললাম, কই, আমার মন একটুও ভালো হয় নাই।”
রাজুর হঠাৎ এই মেয়েটার জন্য কেমন যেন মায়া হলো। সে নরম গলায় বলল, “মিলিয়া, আমি হয়তো তোর কথা শোনার জন্য ঠিক মানুষ না! তোর মনে হয় কোনো একজন ক্লোজ বন্ধুর সাথে কথা বলা দরকার। কাউকে ফোন কর—ডেকে আন।”
মিলিয়া বলল, “আমার কোনো ক্লোজ বন্ধু নাই।”
“নিশ্চয় আছে। সবার থাকে।”
“আমার নাই।”
“ঠিক আছে, তাহলে মনে কর আমি তোর ক্লোজ বন্ধু। কী বলতে চাস বলে ফেল।”
“উঁহু।” মিলিয়া আবার তার নখের দিকে মনোযোগ দিলো। রাজুর কফি শেষের দিকে। সে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, আমি প্রশ্ন করি তুই উত্তর দে।”
মিলিয়া কিছু বলল না, রাজুর দিকে তাকিয়ে রইল। রাজু সেটাকে সম্মতি হিসেবে ধরে নিল। একটু চিন্তা করে জিজ্ঞেস করল, “যার সাথে তোর বিয়ে হবে তাকে তুই কতদিন থেকে চিনিস?”
মিলিয়া উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল।
“কিছু একটা বল।”
মিলিয়া তবুও কিছু বলল না।
রাজু বলল, “প্রশ্নের উত্তর দিবি না?”
“যে প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নাই সেটা কেমন করে দিব?”
রাজু বলল, “উত্তর জানা নাই মানে?”
“মানে হচ্ছে, জন্ম থেকে শুনে আসছি শাফকাতের সাথে আমার বিয়ে হবে। মাঝে মাঝে দেশে আসে তখন তার সাথে চায়নিজ খেতে যাই। আমেরিকা থেকে ফোন করে, কথা হয়—এখন বল আমি শাফকাতকে চিনি নাকি চিনি না?”
রাজু একটু অবাক হয়ে মিলিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, তার মুখটা কেমন যেন লালচে হয়ে উঠেছে, ঠোঁট দুটো সরু হয়ে গেছে, চোখের দৃষ্টি তীব্র। রাজু তার চোখের দিকে তাকাতে পারল না। চোখ নামিয়ে নরম গলায় বলল, “আই অ্যাম সরি মিলিয়া, আমি বুঝি নাই তুই রেগে যাবি।”
মিলিয়া সত্যি সত্যি রেগে উঠে বলল, “আমি রাগী নাই।”
রাজু বলল, “ঠিক আছে। ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারি নাই।”
“কী বুঝতে পারিস নাই?”
“তুই এ রকম আপসেট হবি।”
রাজু ভেবেছিল মিলিয়া এবারেও রেগে কিছু একটা বলবে কিন্তু হঠাৎ করে মিলিয়া শান্ত গলায় বলল, “রাজু, তুই কিছু মনে করিস না। আমি জানি আমার ব্যবহার খুব খারাপ–কার সাথে কী বলি তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। তুই এসেছিস বই দেখতে—তোকে ধরে এনে তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করছি! ছিঃ ছিঃ ছিঃ।”
রাজু বলল, “আমার সাথে তুই খারাপ ব্যবহার করিসনি।”
“করেছি। আমি জানি। যাই হোক তুই সহ্য করেছিস সে জন্য তোকে থ্যাংকু। আমার মেজাজ খারাপ, সেটা আমি তোর ওপর দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছি।”
রাজুর ইচ্ছা হলো জিজ্ঞেস করে কেন মেজাজ খারাপ কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু না বলে চুপ করে বসে রইল। মিলিয়া নিজেই আবার কথা বলতে শুরু করে, “আমার মেজাজ কেন খারাপ জানিস? কারণ শাফকাতের মতো ভালো ছেলে পৃথিবীতে নাই, একেবারে ফেরেশতার মতো। দেখতেও নায়কের মতো। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখলেও তার কোনো দোষ খুঁজে পাবি না। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে টিন এজার মেয়েরা আহা-উঁহু করে। কিন্তু—”
মিলিয়া আবার থামল, রাজু এবারেও চুপ করে রইল। মিলিয়া আবার শুরু করল, বলল, “কিন্তু আমি হাজব্যান্ড হিসেবে কোনোদিন একটা ফেরেশতা চাই নাই। আমি একটা মানুষ চেয়েছিলাম। সাধারণ মানুষ—যার সাথে ঝগড়া করা যায়, চিৎকার করা যায়, আবার মিলমিশ করা যায়—”
মিলিয়া কেমন যেন অদ্ভুতভাবে রাজুর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “কিন্তু আমার সমস্যাটি কি বুঝেছিস?”
রাজু এবারে কথা বলল, জিজ্ঞেস করল, “কী?”
“আমি এই কথাটা কাউকে বলতে পারব না! কেউ আমাকে বুঝবে না। সবাই বলবে আমার মাথা খারাপ।”
মিলিয়া একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমি তোর থিওরিমতো কথা বলেছি, কিন্তু আমার মন হালকা হয় নাই। তোর থিওরি ভুয়া।”
রাজু হাসার চেষ্টা করে বলল, “আমি একটা কথা বলব?”
“বল।”
“তুই শাফকাতকে বিয়ে করিস না।”
মিলিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, “তাহলে কাকে বিয়ে করব?”
“এখনই বিয়ে করতে হবে কে বলেছে? হয়তো কাউকে পেয়ে যাবি, যার সাথে ঝগড়া করতে পারবি, চিৎকার করতে পারবি, আবার মিলমিশ করতে পারবি।”
মিলিয়া হাসার চেষ্টা করল, বলল, “তুই ব্যাপারটা ধরতেই পারিস নাই। তুই বুঝতেই পারিস নাই। তোর কোনো ধারণাই নাই। তুই চিন্তাও করতে পারবি না শাফকাত কী রকম অসাধারণ ছেলে—”
রাজু মিলিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার কেন জানি মনে হতে থাকে, এই মেয়েটার কপালে দুঃখ আছে।
