Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    সরদার ফজলুল করিম এক পাতা গল্প669 Mins Read0
    ⤷

    ভূমিকা ও রিপাবলিকের প্রধান আলোচ্য বিষয়

    ভূমিকা

    গত শতকের ইংল্যান্ডের সাহিত্য ও শিক্ষার জগতে বেনজামিন জোয়েট (১৮১৭-১৮৯৩) একটি বিখ্যাত নাম। সাহিত্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের মধ্যে সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে ইংরেজি ভাষায় গ্রীক দার্শনিক প্লেটো এবং এ্যারিস্টটলের রচনাসমূহের অনুবাদ। বস্তুত, একথা বলা চলে জোয়েট ইংরেজি ভাষার জন্য গ্রীক দার্শনিকদের নূতন করে আবিষ্কার করেন।[১] ১৮৭১ সালে তাঁর প্লেটোর সংলাপসমূহের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ১৮৮১ সালে তিনি গ্রীক ঐতিহাসিক থুসিডাইডিসের ‘গ্রীসের ইতিহাস’ অনুবাদ করেন এবং ১৮৮৫ সালে এ্যারিস্টটলের ‘পলিটিকস’ গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশিত হয়। প্রাচ্য জগতের, বিশেষ করে আমাদের দেশের ইংরেজি-শিক্ষিত জনাংশের নিকট প্লেটোর সংলাপরাজি বেনজামিন জোয়েটের অনুবাদের মাধ্যমেই পরিচিত হয়। ইংরেজি ভাষায় প্লেটোর রচনাসমূহের, বিশেষ করে ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থের একাধিক এবং নূতনতর অনুবাদ পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয়েছে। মূল গ্ৰীক ভাষায় পাঠের সঙ্গে কোন্ ইংরেজি অনুবাদের কতখানি মিল কিংবা পার্থক্য সে-বিচার গ্রীক ভাষাজ্ঞাত পণ্ডিতগণই করতে পারেন। সে-বিচার আমাদের নয়। তার প্রয়োজনীয়তা আমাদের জন্য তত অধিক নয়। প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থের সুপরিচিত ইংরেজি অনুবাদসমূহের মধ্যে গুরুতর কোনো পার্থক্য নেই। সাম্প্রতিক এবং নূতন একাধিক অনুবাদ সত্ত্বেও অধ্যাপক জোয়েটের অনুবাদ—তাঁর অনুবাদের ভাষা-মাধুর্য এবং সাবলীলতার কারণে আজও সাহিত্যানুরাগীর নিকট আদরণীয়। প্রকৃতপক্ষে জোয়েট-কৃত প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ এবং অন্যান্য সংলাপের পাঁচ ভল্যুমের অনুবাদ ইংরেজি সাহিত্যে একটি স্থায়ী আসন দখল করে আছে।

    অধ্যাপক বেনজামিন জোয়েট ‘রিপাবলিক’ অনুবাদের দীর্ঘ ভূমিকায় ‘রিপাবলিক’-এর মূল্যায়ন করতে যেয়ে বলেছেন :

    প্লেটোর সংলাপসমূহের মধ্যে বিধান বা ‘লজ’ গ্রন্থকে ছেড়ে দিলে ‘রিপাবলিক’ কেবল যে বৃহত্তম সংলাপ-গ্রন্থ, তা-ই নয়; ‘রিপাবলিক’ অবশ্যই প্লেটোর শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থ। উচ্চতর দর্শন বা তত্ত্ববিদ্যার সাক্ষাৎ আমরা ‘ফিলেবাস’ এবং ‘সফিস্ট’-এ পাই। তাঁর ‘স্টেটসম্যান’ ‘রিপাবলিক’- এর চেয়ে অধিকতর আদর্শমূলক। ‘লজ’-এর মধ্যে রাষ্ট্রের কাঠামো এবং রাষ্ট্র প্রকারের আলোচনা ‘রিপাবলিক’-এর চেয়ে অধিকতর স্পষ্ট। শিল্পো ৎকর্ষের দিক থেকে ‘সিম্পোজিয়াম’ এবং ‘প্রোটাগোরাস’-এর স্থান অবশ্যই ‘রিপাবলিক’-এর চেয়ে ঊর্ধ্বে। তথাপি ‘রিপাবলিক’-এর মধ্যে আমরা প্লেটোর দৃষ্টির যে বিস্তার দেখতে পাই এবং সংলাপরীতির উৎকর্ষের যে চরম সাফল্য ‘রিপাবলিক’-এ অর্জিত হয়েছে তার নিদর্শন অপর কোনো সংলাপে নেই। জগৎ এবং জীবনের জ্ঞানের এমন ব্যাপ্তি, চিন্তার ক্ষেত্রে শুধু এক যুগের নয়, সকল যুগের নূতন এবং পুরাতনের এই সম্মিলন অপর কোনো সংলাপে আমরা দেখিনে। কেবল তা-ই নয়, ব্যঙ্গ, পরিহাস, উপমা এবং নাটকীয় ক্ষমতার এমন পরাকাষ্ঠাও অন্যত্র বিরল। জীবন এবং কল্পনার মধ্যে, রাষ্ট্রনীতি এবং দর্শনের মধ্যে গভীর সম্পর্কস্থাপনের যে-প্রয়াস প্লেটো ‘রিপাবলিক’-এ প্রদর্শন করেছেন, এমন প্রয়াসের সাক্ষাৎ অপর কোনো সংলাপে দেখা যায় না। এদিক থেকে বলা চলে : ‘রিপাবলিক’ হচ্ছে প্লেটোর সকল সংলাপের কেন্দ্রবিশেষ। ‘রিপাবলিক’-কে কেন্দ্র করেই অপর সকল সংলাপ গ্রথিত হয়েছে। ‘রিপাবলিক’-এ, বিশেষ করে ‘রিপাবলিক’-এর পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম পুস্তকে প্রাচীন দর্শনের সাফল্যের চরমবিন্দু যেন অর্জিত হয়েছে।’[২]

    জোয়েট অকৃপণভাবে প্লেটোর দর্শনের, প্লেটোর দার্শনিক চিন্তার প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, যুক্তিবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের পরবর্তীকালের পদক্ষেপগুলো মানুষের পক্ষে সক্রেটিস এবং প্লেটোর বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই মাত্র সম্ভব হয়েছে।

    কোনো বিষয়ের সংজ্ঞাদানের নীতি, বিরোধিতার বিধান কিংবা চক্রাকারে যুক্তিদানের ভ্রান্তি, পরিহার্য এবং অপরিহার্যের ব্যবধান, উদ্দেশ্য এবং উপায়ের পার্থক্য, এবং মনকে তার প্রজ্ঞা, প্রবৃত্তি এবং আবেগের বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টকরণ কিংবা প্রবৃত্তি এবং ভোগকে পরিহার্য এবং অপরিহার্য বিভাগকরণ এবং চিন্তার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার সুসংবদ্ধ প্রয়াস প্রাচীন দার্শনিকদের মধ্যে প্লেটোর রচনাতেই আমরা প্রথম দেখি। বস্তু এবং মানুষের ভাষায় বস্তুর প্রকাশকারী শব্দের মধ্যে যে একটা ব্যবধান রয়েছে এবং সে-ব্যবধান জীবনের ক্ষেত্রে যে একটি গুরুতর সমস্যা –এর প্রতি প্লেটোই জ্ঞানীদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছেন। অনেক দার্শনিক একে বিস্মৃত হলেও প্লেটোর এ-অবদান নিঃসন্দেহে এক বিরাট অবদান। [রিপাবলিক : ৪৫৪ দ্রষ্টব্য] …

    আবার ইউটোপিয়া বা কল্পলোক সৃষ্টির ক্ষেত্র যদি ধরা যায়, তবে প্লেটোকে আমরা এ-ক্ষেত্রেও পথপ্রদর্শক বলে গণ্য করতে পারি। … পুনর্জাগরণের যুগে ইউরোপে জ্ঞানের আলোর উদ্ভাসনে যে-সমস্ত চিন্তাবিদের দান রয়েছে, তাঁদের মধ্যেও প্লেটোর প্রভাবই সর্বাধিক। শিক্ষার ক্ষেত্রে ‘রিপাবলিক’ অবশ্যই সর্বপ্রথম গ্রন্থ। মিল্টন, রুশো, গ্যেটে : এঁরা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্লেটোর উত্তর-পথিক। … … দর্শন, রাষ্ট্রনীতি এবং সাহিত্যে ভাববাদের জনক হচ্ছেন প্লেটো।[৩]

    সুপরিচিত লেখক উইল ডুরান্টও প্লেটোকে পাঠকসাধারণের নিকট উপস্থিত করতে গিয়ে বলেছেন :

    প্লেটোর বিরুদ্ধে সমালোচনা যা-ই থাকুক না কেন, একথা অনস্বীকার্য যে, প্লেটোর সংলাপ বিশ্বে জ্ঞানভাণ্ডারের অমূল্য সম্পদ এবং সমস্ত সংলাপের মধ্যে ‘রিপাবলিক’ হচ্ছে সর্বোত্তম। ‘রিপাবলিক’ একখানি সামগ্রিক তত্ত্বগ্রন্থ। বলা চলে এ-গ্রন্থে সমগ্র প্লেটো একখানি গ্রন্থের আকার লাভ করেছেন। এই সংলাপে আমরা যেমন তাঁর অধিবিদ্যা (দর্শন), তাঁর ধর্মতত্ত্ব, তাঁর নীতিতত্ত্ব, তাঁর মনোবিদ্যার ধারণা পাই, তেমনি পাই তাঁর শিক্ষা, রাষ্ট্রনীতি এবং শিল্পতত্ত্বেরও। এই গ্রন্থে যে-সমস্যাসমূহের আমরা সাক্ষাৎ পাই, সে-সমস্যা আধুনিককালের জন্য অপরিচিত কোনো সমস্যা নয়। আধুনিকতার স্পষ্ট আভাস আমরা প্লেটোর সাম্যবাদ এবং সমাজতত্ত্ব, তার নারীতত্ত্ব এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সুপ্রজনন তত্ত্বের মধ্যে দেখতে পাই। এখানে নীৎসের নীতিদর্শন এবং অভিজাততন্ত্রের যেমন প্রকাশ রয়েছে, তেমনি প্রকাশ রয়েছে রুশোর শিক্ষানীতির এবং তাঁর প্রাকৃতিক রাজ্যের উত্তমতার চিন্তার, বার্গসঁর জীবনশক্তির এবং ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষার। এক কথায় : ‘রিপাবলিক’-এর মধ্যে কী নেই? সবকিছুই ‘রিপাবলিক-এর মধ্যে দৃষ্ট হয়। এ যেন বিদ্বজ্জনের ভোজসভায় অতিথিপরায়ণউদারহৃদয় গৃহস্বামী প্লেটোর অকৃপণ আপ্যায়ন।[৪]

    জোয়েট কিংবা ডুরান্টের এই মূল্যায়নে যেমন প্লেটোর অতুলনীয় প্রজ্ঞার যথার্থ স্বীকৃতি রয়েছে, তেমনি এ-মূল্যায়ন এরূপ একটি ধারণারও সৃষ্টি করে, যেন প্লেটোর মধ্যেই প্রাচীন গ্রীক জ্ঞানবিজ্ঞানের, চিন্তা-মনীষার চরম প্রকাশ ঘটেছে। এরূপ ধারণা যথার্থ নয়। সময়ের গতিতে পর্যায় থেকে পর্যায়ন্তর অবশ্যই মানুষের অভিজ্ঞতার সম্ভারে সমৃদ্ধতর। কিন্তু তাই বলে কোনো পর্যায়ের কোনো প্রতিভাধর ব্যক্তিকে বিকাশের চরম বলে ব্যাখ্যাদান পরিপূর্ণ যথার্থতা বহন করে না।

    প্লেটো এবং এ্যারিষ্টটল গ্রীকসভ্যতার অত্যুজ্জ্বল রত্ন। তাঁদের ব্যক্তিগত ধীশক্তি এবং সৃজনক্ষমতা কালজয়ী হয়ে পৃথিবীর মানুষের চিন্তাভাবনাকে আজও প্রভাবিত করে চলেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্লেটোর যুগ কিংবা প্লেটোর দর্শন যে সর্বতোভাবেই তাঁর সমসাময়িক কিংবা পূর্বগামী জ্ঞানী এবং দার্শনিকদের চেয়ে উৎকৃষ্টতার উত্তুঙ্গতা অর্জন করেছে—এরূপ দাবি সকল চিন্তাবিদ করেন না। বেনজামিন ফ্যারিংটন ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে বলেছেন :

    প্লেটো, বিকশিত গ্রীক মননের দায়িত্বপূর্ণতা এবং বিজ্ঞতার যথার্থ প্রতিনিধি—এমন কথা বলা চলে না। প্লেটো অবশ্যই বিরাট ধীশক্তি এবং সৃজনক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের এসকাইলাস, হিপোক্রাটিস এবং থুসিডাইডিসের ন্যায় বিরাট ব্যক্তিদের মননের উচ্চস্তরে প্লেটোর স্থান নির্দিষ্ট করা চলে না। গ্রীক দর্শন, তথা গ্ৰীক মননের ক্ষেত্রে প্লেটোকে আমরা আয়োনীয় মুক্তবুদ্ধির বিরুদ্ধে দাসদের শোষণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সঙ্কীর্ণতাবাদী ধ্বংসোন্মুখ নগররাষ্ট্রের শাসকশ্রেণীর স্বার্থে একটি রাজনীতিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে চিহ্নিত করতে পারি। হোমারের কাব্য, আয়োনীয় প্রকৃতি-দর্শন এবং এথেন্সের নাট্যকলা, অর্থাৎ গ্রীক সংস্কৃতির সবচেয়ে মূল্যবান যে-সম্পদ, প্লেটো আমরণ সংগ্রাম করেছেন তার বিরুদ্ধে, তার পূর্ণতর বিকাশের জন্য নয়।[৫]

    এর চাইতেও গুরুততর এমন উক্তি আছে যে “… প্লেটোর দর্শন হচ্ছে সবরকম উদারনীতির ভাবধারার উপর ইতিহাসে দৃষ্ট সবচাইতে নির্মম এবং সবচাইতে গভীর আক্রমণ। প্রগতিশীল ভাবনাসূত্র বলতে যা-কিছুই বোঝাক-না কেন এবং আদর্শ হিসাবে এমন চিন্তার আরাধ্য যা-ই হোক না কেন সব কিছুই প্লেটো-দর্শন নস্যাৎ করার লক্ষ্যে উদ্যত। প্লেটোর নিকট সাম্য, স্বাধীনতা, স্ব-শাসন—সবই আবেগতাড়িত আদর্শবাদী অবাস্তব মরিচীকা বই আরকিছু নয়।”[৬]

    প্লেটোর মূল্যায়নে এই মতপার্থক্য থেকে একথা স্পষ্ট যে, প্লেটো আজও একটি বিতর্কিত প্রতিভা। প্লেটো আজও প্রভাবশালী এবং ক্রিয়াশীল।

    ইতিহাসের যে-কোনো চিন্তাবিদ এবং লেখককে কেবলমাত্র তাঁর সময়ের পরিপ্রেক্ষিতেই যথার্থরূপে বোঝা সম্ভব। তাঁর মূল্যায়নের জন্য আমাদের একটি ইতিহাস-বোধের আবশ্যক। প্লেটোর ক্ষেত্রেও একথা সত্য। প্লেটো কোন সমাজে কোন্ যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন : বিকাশের কোন্ পর্যায়ে সে-সমাজ তখন পৌঁছেছিল, সমাজের অর্থনীতিক শ্রেণীবিন্যাস কী ছিল এবং সেক্ষেত্রে এই বিশেষ চিন্তাবিদের অবস্থান কোন্ শ্রেণীতে ঘটেছিল, কোন্ শ্রেণীর স্বার্থ-পরিপোষক ছিল তাঁর চিন্তা এবং কর্ম, সমাজের অগ্রগতির ক্ষেত্রে এই চিন্তাবিদের চিন্তা এবং কর্ম সহায়ক কিংবা প্রতিরোধী ভূমিকা পালন করেছিল—এ-সমস্ত প্রশ্নের বিবেচনা আবশ্যক।

    আমাদের বর্তমান আলোচনা গ্রীক-ইতিহাস নিয়ে নয়। তবু প্লেটোকে অনুধাবনের জন্য গ্রীক-ইতিহাসের বিকাশের বহিঃরেখাটি আমাদের স্মরণ করা আবশ্যক। আমাদের স্মরণ করা আবশ্যক, প্লেটো গ্রীক-ইতিহাসের বিকাশের কোন্ স্তরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন? তাঁর পূর্বে গ্রীক-রাষ্ট্রসমূহ, বিশেষ করে এথেন্সে জ্ঞানবিজ্ঞানের, তার অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রনীতির কী বিকাশ সাধিত হয়েছিল? সমসাময়িক সমাজব্যবস্থার মূল সংকট কী ছিল এবং প্লেটোর সঙ্গে এ-সংকটের সম্পর্ক কীরূপ ছিল?

    প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ একটি আদর্শ রাষ্ট্রের কল্পনা, একটি ইউটোপিয়া বা কল্প-চিত্র। এ-কারণে প্লেটোকে ইউটোপিয়ার অন্যতম জনক বলে অভিহিত করা হয়। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র কাল্পনিক হলেও প্লেটো সমাজের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য কল্পনাবিলাসী সন্ন্যাসী ছিলেন না। প্লেটোর জীবনকাহিনী থেকে দেখা যায়, প্লেটো এথেন্স নগররাষ্ট্র তথা সমগ্র গ্রীকজগতের সামাজিক রাজনীতিক ঘটনাবলী এবং সমস্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিলেন। প্লেটো সমস্যাকণ্টকিত জীবনের মধ্যে বাস করেছেন, সমস্যার তীব্রতা তিনি বোধ করেছেন এবং তার সমাধানের তিনি প্রয়াস পেয়েছেন। সে-প্রয়াসের বহুমুখীতা তাঁর জীবনকাহিনীতে বিধৃত রয়েছে।

    প্রায় আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৮ কিংবা ৪২৭ সনে প্লেটো গ্রীসের এথেন্স নগরীতে একটি অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন (প্লেটোর জীবনকাল : ৪২৮–৩৪৭ খ্রিঃ পূঃ)। প্লেটোর পিতা এরিষ্টন প্লেটোর অল্পবয়সেই মারা যান। কেবল পিতার সূত্রে নয়, প্লেটোর মাতা পেরিকটিয়নও অভিজাত বংশীয়া ছিলেন। ‘রিপাবলিক’-এর সংলাপে অংশগ্রহণকারী অ্যাডিম্যান্টাস এবং গ্লকন প্লেটোর সহোদর ছিলেন। এরিস্টনের মৃত্যুর পরে প্লেটোর মাতা দ্বিতীয় বিবাহ করেন। পেরিকটিয়নের দ্বিতীয় স্বামী পাইরিল্যামপিস যেমন রাষ্ট্রনেতা পেরিক্লিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, তেমনি তিনি নিজেও এথেন্সের রাজনীতিক জীবনের এক উল্লেখযোগ্য নাগরিক ছিলেন।[৭]

    পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহের ইতিহাসে গ্রীক নগররাষ্ট্রসমূহের অভ্যুদয় বিশেষ বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত। প্রাচীনকালের সভ্যতাসমূহের বিকাশ ঘটেছিল সমুদ্র এবং নদীতীরে। সেদিক থেকে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চল এবং দ্বীপের ন্যায় তার উত্তর উপকূলের গ্রীক-উপদ্বীপে বহু প্রাচীনকালেই জনবসতি স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু এই জনসবতি পাহাড়-পর্বত-অধ্যুষিত এই উপদ্বীপের প্রাকৃতিক চরিত্রের কারণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্রের রূপ লাভ করে। গ্রীকসভ্যতার বিকাশের সময়ে এবং তারও পূর্বে মিশর, সিরিয়া এবং প্রাচ্যে : ভারতবর্ষ এবং চীনে সভ্যতা বিকাশলাভ করে। কিন্তু উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা প্রাচ্য অঞ্চলের রাষ্ট্রের রূপ সমতটের বিস্তারের কারণে ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্রের পরিবর্তে বৃহদায়তন রাষ্ট্রের আকার গ্রহণ করে। বৃহদাকার এবং ক্ষুদ্রাকার রাষ্ট্রের পার্থক্য কেবল আয়তনের পার্থক্য নয়। ক্ষুদ্রতরসংখ্যক মানুষের সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা অধিকতর সংখ্যক মানুষ এবং বৃহদায়তন সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বহুলাংশে পৃথক হতে বাধ্য। ক্ষুদ্রায়তন গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলি আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রের তুলনায় এক-একটি ক্ষুদ্র শহর-প্রায় ছিল, একথা বলা চলে। এথেন্স নগররাষ্ট্রের মোট অধিবাসীর মধ্যে আড়াই লক্ষ ছিল দাস এবং দাসদের কোনো রাজনীতিক অধিকার ছিল না।”[৮] অবশিষ্ট দেড় লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যতীত অপর সকলেই যে নাগরিক বলে গণ্য হত তা নয়। অপর দ্বীপ বা নগররাষ্ট্র থেকে যারা ব্যবসায়কর্মে কিংবা অপর কারণে এথেন্সে এসে বসবাস করত তারাও নাগরিক বলে গণ্য হত না। ফলে যথার্থভাবে যারা এথেন্সের নাগরিক ছিল তাদের সংখ্যা খুব কম। এই অল্পসংখ্যক নাগরিকগণ প্রায় গোষ্ঠীগতভাবে বাস করত। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ এবং প্রত্যক্ষ। প্রাচীন এথেন্সে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র-বিকাশের এটাই ছিল পটভূমি। এই গণতন্ত্র সম্পর্কে দুটি বিষয় আমাদের স্মরণ রাখা আবশ্যক : ১. এ-গণতন্ত্র নগরের সকল অধিবাসীর উপর বিস্তারিত ছিল না। ২. যারা নাগরিক ছিল তারাও অর্থনীতিকভাবে কেবলমাত্র একটি শ্রেণীভুক্ত ছিল, না। নাগরিকদের মধ্যেও শ্রেণীভেদ এবং রাজনীতিক দ্বন্দ্ব ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এথেন্স রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে অভিজাত (পুরনো পরিবার এবং প্রচুর জমির মালিক), ব্যবসায়ী, কৃষক এবং নিঃস্ব—এরূপ কয়েকটি অর্থনীতিক শ্রেণীর সাক্ষাৎ মেলে। এদের সকলকে নিয়েই এথেন্সের শাসকশ্রেণী গঠিত ছিল। এদের রাজনীতিক দ্বন্দ্ব অভিজাততন্ত্র এবং গণতন্ত্র বলে অভিহিত হত। গণতন্ত্রীগণ শাসনব্যবস্থায় অধিকতর-সংখ্যক নাগরিকদের অংশগ্রহণে বিশ্বাসী ছিল। অভিজাততন্ত্রীগণ অর্থ, বুদ্ধি এবং শিক্ষার যোগ্যতার ভিত্তিতে শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা সীমিত রাখার চেষ্টা করত। গণতন্ত্রীদলের মধ্যেই গ্রীসে, বিশেষ করে এথেন্সে ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ অধিকতর হত।

    গ্রীসের রাজনীতিক ইতিহাসে বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের মধ্যে রাজনীতিক দ্বন্দ্ব প্রধানত এই অভিজাততন্ত্রী এবং গণতন্ত্রীদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। কখনো নগরশাসনের ক্ষমতা অভিজাতদের হাতে রক্ষিত হয়েছে, কখনো গণতন্ত্রী শক্তিগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে অভিজাতদের হাত থেকে ক্ষমতা দখল করেছে। শাসনের এই রকমফের গ্রীক-ইতিহাসে অভিজাততন্ত্র, কতিপয়তন্ত্র (অলিগার্কি) স্বৈরতন্ত্র এবং গণতন্ত্ররূপে পরিচিত এবং প্লেটো-এ্যারিস্টটলের রচনায় ব্যাখ্যাত হয়েছে।

    গ্রীকদের বসতি এবং সভ্যতা ক্রমান্বয়ে গ্রীক উপদ্বীপ অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলি একদিকে যেরূপ ক্ষুদ্রকায় ছিল তেমনি এই নগররাষ্ট্রগুলি এবং বিভিন্ন দ্বীপের গ্রীক বসতি আফ্রিকা এবং এশিয়ার সভ্যতা থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্নতা এবং জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে তাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা গ্রীকদের মনে একটি সংকীর্ণ গর্ববোধের সৃষ্টি করে। খ্রিষ্টপূর্ব নবম এবং অষ্টম শতকের অন্ধ গ্রীক কবি হোমারের কাব্যগাথাই গ্রীসের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য। এই সময়েই দেখা যায় যে, গ্রীকগণ নিজেদেরকে সভ্য এবং অগ্রীসবাসীদের বর্বর বলে আখ্যায়িত করছে।

    কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের প্রথমার্ধে অতীতের দৈহিক বিচ্ছিন্নতার স্থলে গ্রীস এবং এশিয়ার মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক এবং সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯০ এবং ৪৮০ সনে পরপর দুবার পারস্য সাম্রাজ্যের সম্রাট দারায়ুস (Darius) এবং জারাক্সিস গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলিকে বিরাট বাহিনীসহ আক্রমণ করেন। কিন্তু উভয় আক্রমণেই গ্রীক নগর রাষ্ট্রের প্রধান দুটি নগররাষ্ট্র এথেন্স এবং স্পার্টা ঐক্যবদ্ধভাবে পারসিক সম্রাটের বাহিনীকে প্রতিরোধ করে এবং আক্রমণকারী বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে। পারস্যের বাহিনী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এশিয়ায় প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হয়। গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলির এই যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতারক্ষার যুদ্ধ। এর সাফল্য গ্রীকদের গৌরববোধ পূর্বের চেয়েও বৃদ্ধি করে দেয়। এই যুদ্ধে গ্ৰীক নগররাষ্ট্রের ‘নাগরিকদের’ সকল শ্রেণীকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করতে হয়েছে। ফলে গ্রীস-পারস্য যুদ্ধের পরবর্তীকালে গ্রীসের নগররাষ্ট্রগুলির, বিশেষ করে এথেন্সের শাসনপদ্ধতি অধিকতর সার্বজনীন এবং গণতান্ত্রিক রূপ গ্রহণ করে। (দাসরা অবশ্য এই গণতন্ত্রের আওতার বহির্ভূত ছিল)। এথেন্সের অর্থনীতি গ্রীস-পারস্য যুদ্ধের বিজয়ের ফলে অধিকতর শক্তিশালী হয়। যুদ্ধবন্দি থেকে দাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসার লাভ করে। প্রায় দুইশত দ্বীপীয় বসতি বা নগররাষ্ট্রের উপর এথেন্সের নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এথেন্স প্রায় একটি সাম্রাজ্যের অধিনায়ক হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিকদের জীবনে শিল্প-দর্শন-সংস্কৃতিরও বিকাশ ঘটতে থাকে। এই পর্যায়ের মধ্যভাগে এথেন্সের রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে পেরিক্লিসের নাম (খ্রিঃ পূঃ ৪৯০-৪২৯) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পেরিক্লিস খ্রিঃ পূঃ ৪৪৩ সনে এথেন্সের রাষ্ট্রনেতা নির্বাচিত হন। তিনি অভিজাত পরিবারের সন্তান হলেও তাঁর শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ছিল। পেরিক্লিসের যুগকে প্রাচীন গ্রীক-গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ যুগ বলা হয়।

    কিন্তু কালক্রমে গ্রীসের নগররাষ্ট্রগুলি পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং কলহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এথেন্স ক্ষমতার ক্ষেত্রে যেমন সর্বপ্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি অপর নগররাষ্ট্রগুলির সঙ্গে তার সম্পর্ক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রূপ ধারণ করেছিল। ফলে অনেক নগররাষ্ট্র দ্বিতীয় প্রধান নগররাষ্ট্র স্পার্টার নেতৃত্বে এথেন্সের বিরুদ্ধবাদী হয়ে ওঠে। এক সময়ে সমগ্র গ্রীক অঞ্চল এথেন্স এবং স্পার্টার নেতৃত্বে পরস্পরবিরোধী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের শেষার্ধে ৪৩১ সনে দুই পক্ষের মধ্যে মারাত্মক এবং দীর্ঘস্থায়ী আত্মঘাতী এক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই যুদ্ধ ইতিহাসে পিলোপনেশীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত। প্রায় ত্ৰিশ বৎসরকাল এই যুদ্ধ চলতে থাকে।

    এবং এই যুদ্ধেই এথেন্সের সংকট এবং বিপর্যয়ের শুরু। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরবর্তী বৎসরে ৪৩০ সনে এক ভয়াবহ প্লেগ মহামারি আকারে এথেন্সকে আক্রমণ করে। ত্রিশ হাজারের অধিকসংখ্যক অধিবাসী এই ভয়ঙ্কর মহামারিতে প্রাণ হারায়। সামাজিক ও নৈতিক জীবনকে এক মর্মান্তিক অসহায়তা এবং অরাজকতা গ্রাস করে। ঐতিহাসিক থুসিডাইডিস তাঁর ‘পিলোপনেসীয় যুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থে এই মহামারির এক গভীর অন্তর্দৃষ্টিমূলক বর্ণনা দিয়েছেন।[৯] যুদ্ধের দ্বিতীয় বৎসরে প্লেগের এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে ৪২৯ সনে এথেন্সের শ্রেষ্ঠ নেতা পেরিক্লিস মারা যান। গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলির এই পারস্পরিক আত্মঘাতী যুদ্ধে পক্ষ, প্রতিপক্ষ নির্মমনীতি অনুসরণ করে। বিজয়ী নগর বিজিত নগরকে পরিপূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলে। স্পার্টার শাসনব্যবস্থা সামরিক ধরনের ছিল। যুদ্ধে স্পার্টা এথেন্সকে একাধিক সংঘর্ষে বিপর্যস্ত করে ফেলে। যুদ্ধের ধারাবাহিক বিপর্যয় এথেন্সের সামাজিক ও অর্থনীতিক জীবনের সংকটকে তীব্র করে তোলে। এথেন্সের শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক থাকায় যুদ্ধের ব্যর্থতার কারণ প্রতিপক্ষীয়, বিশেষ করে অভিজাত মহল গনতন্ত্রীদের উপর ন্যস্ত করতে থাকে। ক্ষমতাদখলের চেষ্টা পরস্পরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা এবং গুপ্তহত্যার রূপ ধারণ করে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪১১ সনে অভিজাতদের তরফ থেকে ক্ষমতা দখল করা হয় এবং ৪০০ নেতার শাসন বলে এক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এ-শাসন বৎসরকালের অধিক স্থায়ী হয় না। পুনরায় গণতন্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ওদিকে স্পার্টার সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে। খ্রিঃ পূঃ ৪০৪ সনে স্পার্টার হাতে এথেন্স চরম পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয় এবং নগরের এই সংকট-মুহূর্তকে উত্তম সময় বিবেচনা করে অভিজাত দল পুনরায় অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। খ্রিঃ পূঃ ৪০৪ সনেই ‘ত্রিশের শাসন’ নামে এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন স্থাপিত হয়। কিন্তু পরবর্তী বছরে গণতন্ত্রীগণ পুনরায় ‘ত্রিশের শাসনকে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু নগরের অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ে। দাসদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে। নাগরিকদের মধ্যে আন্তঃনগর যুদ্ধের কারণে, ভূস্বামীদের ভূমি এবং দাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।

    প্লোটোর সংলাপরাজির অবিস্মরণীয় নায়ক ‘সক্রেটিস’ এই সংকটকালীন এথেন্সের কোনো বিখ্যাত রাষ্ট্রীয় নেতা না হলেও সক্রেটিস ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন। সক্রেটিসের জন্ম হয় ৪৬৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে।[১০] একজন বিবেকবান, সৎ, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, সাহসী এবং কর্তব্যপরায়ণ নাগরিক হিসাবে সক্রেটিস এথেন্সের সকলের নিকট পরিচিত ছিলেন। পারিবারিকভাবে সক্রেটিস কোনো ভুস্বামী বা অভিজাত ছিলেন না। এক ভাস্করশিল্পীর সন্তান ছিলেন তিনি। পিলোপনেশীয় যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। নগরের সংকট তাঁকে চিন্তান্বিত করে তুলত এবং তিনি বাজার ও জনসম্মেলনে প্রশ্ন-উত্তর পদ্ধতিতে মানুষের জীবনের করণীয়-অকরণীয়, সৎ-অসৎ, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা পাপ-পুণ্য—সর্ব বিষয় নিয়ে আলোচনা তুলতেন; রাজনীতিক্ষেত্রে নিজের স্বাধীন মতামত তিনি বজায় রাখতেন। জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নগর কমিটিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং সভাপতি হিসাবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনকালে যেমন তিনি শাসকদের অন্যায় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন তেমনি স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের অন্যায় হুকুমকেও তিনি উপেক্ষা করেছেন—এরূপ দৃষ্টান্ত ইতিহাসকারগণ লিপিবদ্ধ করেছেন। ফলে, ব্যক্তি হিসাবে তিনি কোনো শাসকদলেরই বিশ্বাসভাজন না হলেও, তরুণদের মধ্যে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। এবং এ-কারণেই খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৩ সনে গণতন্ত্রীগণ শাসনক্ষমতা দখল করে তাদের প্রতিপক্ষীয়দের বিনাশ করার যে-ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তার মধ্যে সক্রেটিসকেও অন্তর্ভুক্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে এথেন্সের ধর্ম না মানা এবং তরুণদের মনকে বিদ্রোহী করার অভিযোগ তুলে তাকে বিচারে সোপর্দ করে। এ-বিচারে সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সনে সক্রেটিস হেমলক পান করে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।

    সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডের সময়ে প্লেটোর বয়স ২৮ বৎসর। প্লেটো সক্রেটিসের হত্যাকাণ্ডে গভীরভাবে আলোড়িত হন। প্লেটোর কৈশোর এবং যৌবন কাটে এথেন্স নগরীর এই সংকটের মধ্যে। অভিজাত অন্যান্য তরুণের ন্যায় কিশোর বয়সেই প্লেটো সক্রেটিসের মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞান, পরিহাসক্ষমতা এবং বিচারমূলক চরিত্র দ্বারা আকৃষ্ট হন। প্লেটোর শৈশব এবং কৈশোর সম্পর্কে তেমন কিছু বিস্তারিতভাবে জানা না গেলেও একথা নিশ্চিত যে, এথেন্সের অভিজাত শ্রেণীর এবং রাজনীতিকভাবে নেতৃস্থানীয় পরিবারের সন্তান হিসাবে প্লেটো সকলরকম শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার সুযোগ লাভ করেন। যৌবনে স্বাভাবিকভাবে প্লেটো এথেন্সের রাজনীতিক জীবনে অংশগ্রহণের আগ্রহ পোষণ করতে থাকেন। রাষ্ট্রের সামাজিক এবং রাজনীতিক সংকট তাঁর সংবেদনশীল তরুণ-মনকে আলোড়িত করে। পারিবারিক এবং শ্রেণীগতভাবে গণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে মনোভাব তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। অধিকন্তু এথেন্সের সংকটকালে গণতান্ত্রিক শাসনের ব্যর্থতা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর মনোভাবকে দৃঢ়তর করে তোলে। কিন্তু সাধারণ দলীয় নেতার ন্যায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যর্থ বলে অভিজাত সম্প্রদায়ের উপদলীয় শাসনও তিনি আন্তরিকভাবে সমর্থন করতে পারেননি। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৪-এর অভ্যুত্থানে প্লেটোর আত্মীয়বর্গ জড়িত থাকলেও, প্লেটো নিজে তাতে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু তাঁর আশা ছিল অভিজাতদের শাসনে রাষ্ট্রের উন্নতি ঘটবে। কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের শাসনপ্রণালী এবং প্রতিপক্ষের উপর তাদের প্রতিহিংসামূলক হত্যাকাণ্ড তাঁকে ‘ত্রিশের শাসন’ সম্পর্কে মোহমুক্ত করে। বস্তুত, রাষ্ট্রের সংকট প্রচলিত অভিজাত বা গণতন্ত্রী— কোনো শাসনব্যবস্থার মাধ্যমেই নিরসন করা সম্ভব নয় বলে তাঁর বিশ্বাস দৃঢ় হতে থাকে। প্লেটো এই সংকটের মূল কারণ সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করেন। প্লেটো যাঁকে গুরু বলে মনে করতেন, যিনি ছিলেন এথেন্সের বিবেকের প্রতিভূস্বরূপ, গণতন্ত্রী শাসকদের হাতে সেই সক্রেটিসের বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড প্লেটোর মনকে যেরূপ গভীরভাবে আলোড়িত করে তার চিরায়ত চিত্র প্লেটো তাঁর ‘সক্রেটিসের জবানবন্দি’ এবং অপর কয়েকটি সংলাপে অবিস্মরণীয়ভাবে অঙ্কন করেছেন।[১১] এ ছাড়া প্লেটোর যৌবনকালের মনোভাবের স্মৃতিচারণের পরিচয় পাওয়া যায় বৃদ্ধ বয়সে লিখিত তাঁর একটি পত্রে। এই পত্রকে প্লেটোর ‘সপ্তম পত্র’ বলে গবেষকগণ চিহ্নিত করেছেন। তাঁর এই স্মৃতিচারণে প্লেটো বলেন :

    তরুণ বয়সে অপর তরুণদের যেমন আশা থাকে, আমারও তেমনি আশা ছিল, যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হব, যখন আমি নিজেই নিজের প্রভুতে পরিণত হব, তখন আমি রাজনীতিক জীবনে প্রবেশ করব। এথেন্সের রাজনীতিক অবস্থায় কতকগুলি ঘটনা আমার এই আকাঙ্ক্ষার অনুকূলেই সংঘটিত হয়েছিল। প্রচলিত শাসনের বিরুদ্ধে জনমত সংঘবদ্ধ হচ্ছিল এবং পরিশেষে একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থানের কতিপয় নেতা আমার আত্মীয় এবং সুহৃদ ছিলেন।[১২] এঁরা আমাকে তাঁদের সঙ্গে তাঁদের শাসনে যোগদানের আহ্বান জানান। তাঁরা একে স্বাভাবিকই ভেবেছিলেন। আমার নিজেরও প্রত্যাশা ছিল ত্রিশের শাসন রাষ্ট্রে সুস্থতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবে। আমি তাই তাঁদের কার্যাবলি বিশেষ আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। কিন্তু সময়ের স্রোত অধিককাল প্রবাহিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ল না। অচিরকাল মধ্যেই দেখা গেল, ত্রিশের শাসন তাদের পূর্ববর্তী শাসনকে স্বর্গরাজ্য বলে প্রতিভাত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে আমার প্রবীণ সুহৃদ সক্রেটিসের ক্ষেত্রে তাদের আচরণ আমাকে বিস্মিত করে দিল। সক্রেটিস ছিলেন সমগ্র এথেন্সের সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। একথা বলতে আমার কোনো দ্বিধার কারণ নেই। ত্রিশের শাসন নিজেদের অপকর্মের সঙ্গে সক্রেটিসকে জড়িত করার উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁকে অন্যায়ভাবে হুকুম করল একজন নাগরিককে বধ্যভূমিতে বেঁধে আনতে।[১৩] সক্রেটিস তাদের এই অন্যায় হুকুমকে পালন করতে অস্বীকার করলেন। তাদের অপকর্মের শরিক হওয়ার চেয়ে সক্রেটিস অপর যে-কোনো পরিণতিকেই শ্রেয় বলে গণ্য করলেন। রাজনীতিক জীবনের এই দৃশ্যাবলী আমার মনকে ঘৃণায় পূর্ণ করে তুলল এবং আমি প্রচলিত কালের এই কোলাহল থেকে সরে দাঁড়ানোকে উত্তম বলে বিবেচনা করলাম।… কিছুকালের মধ্যে ত্রিশের পতন ঘটল। শাসনপদ্ধতি আবার পুরোপুরি পালটে গেল।[১৪] আবার আমার আশা হল, হয়তো অবস্থার উন্নতি ঘটবে, হয়তো আমি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে সক্ষম হব। নির্বাসিত গণতন্ত্রী নেতারা নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তন করে গণতন্ত্রী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আর প্রতিহিংসার আবহাওয়া তখন বিরাজমান। প্রতিপক্ষ তার শত্রুর বিরুদ্ধে বর্বর প্রতিশোধের পন্থা গ্রহণ করেছে। এগুলো অস্বাভাবিক ছিল না। বরঞ্চ আমি বলব, সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রী শাসন নমনীয়তারই পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু যেটা মর্মান্তিক, সে হল আমার সুহৃদ সক্রেটিসের বিচার। শাসকগোষ্ঠীর কতিপয় নেতা সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য অভিযোগ উত্থাপন করে তাঁকে বিচারে সোপর্দ করল। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ উত্থাপিত হল। দোষী সাব্যস্ত করে বিচারসভা তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করল। এই শাসকদল হত্যা করল সক্রেটিসকে—হত্যা করল এমন এক বিবেকবান ব্যক্তিকে যিনি নিজে একদিন এই নির্বাসিত গণতান্ত্রিক নেতাদের বন্ধুদের বিরুদ্ধে ত্রিশের হুকুম পালন করতে অস্বীকার করেছিলেন। এ সবই আমার চোখের সামনে ঘটল। আমি রাষ্ট্রের সংকট সম্পর্কে চিন্তা করতে লাগলাম। বয়স আমার এতদিনে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রের কারা পরিচালক, তা আমি অবলোকন করলাম। যে-বিধি, বিধান, আচারে রাষ্ট্র চলে তার সম্পর্কে আমি সম্যকভাবে ভাবতে লাগলাম। আমি যত চিন্তা করলাম তত দেখতে পেলাম একটা রাষ্ট্রকে উত্তমভাবে শাসন করা দুরূহ ব্যাপার। সুহৃদ এবং বিশ্বস্ত সঙ্গীহীন ব্যক্তি এই ক্ষেত্রে অক্ষম। তার পক্ষে সংকটে কোনো সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ অসম্ভব। কিন্তু এই এথেন্সে আমার সুহৃদ কোথায়? এ-এথেন্স আর পুরাতন এথেন্স নয়। পুরাতন এথেন্সের, আমাদের পূর্বপুরুষদের আচার, আচরণ, প্রতিষ্ঠান আজ পরিত্যক্ত। এখানে নূতন সুহৃদ সংগ্রহ আমার পক্ষে সহজ নয়। রাষ্ট্রের সমগ্র আচার, আচরণ, প্রথা, বিশ্বাস, বিধানের দ্রুত এবং ভয়ংকর অবনতি ঘটছে। এই চিন্তার ফলে, আমার এই অভিজ্ঞতার ফলে, আমি যখন দেখলাম, চারদিকে সবকিছু ভেঙে পড়ছে, তখন আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম। একথা ঠিক যে, রাষ্ট্রের সংকট সম্পর্কে আমি চিন্তা করা থেকে বিরত হলাম না। আমার চিন্তা হল, কীভাবে এই সংকট থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটতে পারে, বিশেষ করে সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থার সংশোধন কিসে সম্ভব। এ-চিন্তা আমার সর্বক্ষণের চিন্তা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু আমি প্রতীক্ষা করতে লাগলাম সেই উত্তম মুহূর্তের যখন আমার পক্ষে সম্ভব হবে রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কোনো সক্রিয় ভূমিকা পালন করার।[১৫]

    সক্রেটিসের মৃত্যুর পরে প্লেটোর এই মানসিক অবস্থাতেই হয়তো তাঁর রচনার গোড়ার দিকের সংলাপগুলি রচিত হয়েছিল। কিন্তু এর পরবর্তীকালে প্লেটোর জীবনে একটি পর্যটনের পর্যায় দেখা যায়। গবেষকগণ মনে করেন, প্লেটো এর পর এথেন্স পরিত্যাগ করে মিশর, সিরিয়া, দক্ষিণ ইতালি এবং সিসিলি ভ্রমণ করেন। দক্ষিণ ইতালিতে তখন পাইথাগোরাসের অনুসারীদের একটি বসতি ছিল। তাদের মধ্যে প্লেটো গণিত এবং সংখ্যাশাস্ত্রের সর্বশেষ চর্চার সাক্ষাৎ পান। মিশরে প্লেটো শাসনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ গোষ্ঠী, অর্থাৎ ধর্মীয় পুরোহিতগোষ্ঠীর অবস্থান দেখেন। প্লেটোর মনে ইতিমধ্যে এরূপ ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে যে, রাষ্ট্রের এই সামগ্রিক সংকট কেবলমাত্র দার্শনিক অর্থাৎ জ্ঞানী ব্যক্তিই দূর করতে পারে। সক্রেটিস বলেছিলেন : জ্ঞানেই ধর্ম, জ্ঞানেই মুক্তি। তার ভিত্তিতে প্লেটোও মনে করেন যে, রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা অজ্ঞদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে যতক্ষণ না দার্শনিক অর্থাৎ জ্ঞানীর হস্তে ন্যস্ত হবে, ততক্ষণ মানুষের মুক্তি নেই। রাষ্ট্রীয় শাসন দার্শনিকদের হাতে ন্যস্ত করার দুটি পথ : হয় শাসক দার্শনিক হবে, নয়তো দার্শনিককে শাসক হতে হবে। সিসিলি দ্বীপে সাইরাক্যুজ নগর নামে একটি নগররাষ্ট্র ছিল। প্লেটো দক্ষিণ ইতালি থেকে সাইরাক্যুজ নগরে এসে সাইরাক্যুজের একনায়ক ডায়োনিসাসকে দর্শনপাঠের মাধ্যমে দার্শনিক করার প্রয়াস পান। কিন্তু মনে হয়, তাঁর এ-চেষ্টা একনায়ক ডায়োনিসাস খুব প্রীতির সঙ্গে গ্রহণ করে না। এবং দর্শনচর্চার দুরূহতায় রুষ্ট হয়ে প্লেটোকে সে দাস হিসাবে বিক্রি করে দেয়।

    সাইরাক্যুজের শাসককে দার্শনিক করার প্রয়াস তাঁর প্রথম ব্যর্থতায় শেষ হয় না। পরবর্তীকালে তরুণ দ্বিতীয় ডায়োনিসাসকে তিনি পুনরায় দার্শনিকে পরিণত করার প্রয়াস পান। সে-কাহিনীতে না গিয়ে আমরা বলতে পারি, প্রাথমিক ব্যর্থতার পরে প্লেটো এথেন্সে প্রত্যাবর্তন করেন এবং এই পর্যায়ে খ্রিঃ পূঃ ৩৮৬ সনে তিনি এথেন্সে তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা এ্যাকাডেমী (প্লেটোর এ্যাকাডেমী) স্থাপন করেন এবং প্রত্যক্ষভাবে এথেন্সকে তাঁর কল্পনানুযায়ী আদর্শ রাষ্ট্রে পরিবর্তিত করতে সক্ষম না হলেও প্লেটো তাঁর এ্যাকাডেমীতে দর্শন,

    গণিত এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যার উপর তাঁর মতামত তাঁর শিষ্য এবং ছাত্রদের শিক্ষা দিতে শুরু করেন। তাঁর এরূপ আশা ছিল, তাঁর এ্যাকাডেমীতে শিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণরা রাষ্ট্রের কর্ণধার হলে গ্রীসের সমাজ ও সভ্যতার সংকট দূরীভূত হবে। প্লেটোর এই তত্ত্বের এবং চিন্তার সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থ সম্ভবত তাঁর এ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালেই রচিত হয়।

    গ্রীসীয় রাষ্ট্রীয় জীবনের সংকট ইতিমধ্যে তীব্রতর হয়েছে। পিলোপনেশীয় যুদ্ধে এথেন্সের চরম পরাজয় এথেন্সের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এই অবস্থায় কেবল যে দাসশ্রেণী শোষিত হতে থাকে এবং তাদের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে, তা-ই নয়; নাগরিকদের মধ্যেও জমি এবং জীবিকাহীন নিঃস্বের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এথেন্স সকলের নেতা, এথেন্স সবার শ্রেষ্ঠ বলে এতদিন এথেন্সের শাসকশ্রেণীর যে গর্ববোধ ছিল সে গর্ব অসার বলে প্রতিপন্ন হয়। সামাজিক জীবনে নানা প্রশ্নের উদয় হতে থাকে। দাসপ্রথা যে অস্বাভাবিক এবং অমানবিক—একথা স্বাধীন শিক্ষক সম্প্রদায়, সফিস্টদের মধ্যে দেখা দিতে শুরু করে। সফিস্টগণ পুরাতন কোনো নীতিকেই অলংঘনীয় বলে বিবেচনা করত না। বাস্তবজীবনে ব্যক্তির বাঁচার জন্য যা প্রয়োজন তাকে সঙ্গত এবং সত্য বলে প্রমাণের প্রবণতা সফিস্টদের শিক্ষার মধ্যে প্রকশিত হতে থাকে। প্রখ্যাত সফিস্ট প্রোটাগোরাস বলেন : মানুষই সত্যের নিয়ামক। অনন্যনির্ভর সত্যের কোনো অস্তিত্ব নেই।[১৬]

    ‘রিপাবলিক’ বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী গ্রন্থ। গ্রীকসভ্যতার এক ক্রান্তিকালে এই গ্রন্থ রচিত হয়। গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলি যখন ক্ষয়গ্রস্ত হয়ে পড়ছিল, যখন তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রব্যবস্থা সমাজের একটা বৃহৎ অংশ দাসের শোষণে আর পরিপোষিত এবং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে পারছিল না, তখনই প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-এর রচনা। অভিজাত এবং গণতন্ত্রী নিয়ে গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলিতে যারা শাসক শ্রেণী, তারা সকলেই এই সংকটে জড়িত হয়ে পড়েছিল। শাসকশ্রেণীর চিন্তাবিদ মাত্রই এই সংকট থেকে মুক্তির কথা চিন্তা করেছেন। খ্রিঃ পূঃ ৩৬৭ সনে প্লেটোর এ্যাকাডেমিতে অ্যারিস্টটল এসে যোগদান করেন। অ্যারিস্টটল তখন সতেরো বছরের যুবক।[১৭] প্লেটোর বয়স : ষাট কিংবা একষট্টি। পক্ককেশ বৃদ্ধ।

    প্লেটোর রাষ্ট্রচিন্তা এবং দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এ-দর্শন সংকটগ্রস্ত গ্রীক নগররাষ্ট্রের শাসকশ্রেণীর সংকটমুক্তির দর্শন। কিন্তু এ-সংকটমুক্তির জন্য প্লেটো ইতিহাসের পরবর্তী বিকাশকে চিহ্নিত করতে পারেননি। তাঁর শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতাই তাঁর মতো ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির দৃষ্টিকে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বদলে অতীতের বিলুপ্ত অবস্থা এবং ব্যবস্থার প্রতি নিবদ্ধ রাখে। প্লেটো এ সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হন যে, গ্রীসের নগররাষ্ট্রগুলি তাদের অর্থনীতিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বিকাশের এক ক্রান্তিমুহূর্তে উপস্থিত হয়েছে। পরবর্তী সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন, নূতনকে অস্বীকার করা নয়, নূতনকে স্বাগত জানানো। এই নূতনের দাবি হচ্ছে একথা স্বীকার করা যে, কোনো মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দাস নয়, গ্রীকরা সভ্য এবং অপর জাতি বর্বর, একথা সত্য নয়। গ্রীস পৃথিবীর কেন্দ্র নয়। প্রয়োজন হচ্ছে, মানুষে মানুষে মৌলিক কোনো ভেদ নেই, এ-সত্য ঘোষণা করা এবং সংকীর্ণ নগররাষ্ট্রের প্রাকারকে ভেঙে ফেলে বৃহত্তর জগৎ এবং মানবসমাজের প্রতি দৃষ্টিকে প্রসারিত করা। দৃষ্টির দিগন্তকে অবারিত করে দেওয়া। এ-দৃষ্টিভঙ্গি প্লেটোর মধ্যে দৃষ্ট হয় না। তাঁর শিষ্য এ্যারিস্টটলের মধ্যে অধিকতর বাস্তবতার পরিচয় মিললেও এ্যারিস্টটলও তাঁর ইতিহাস-সমীক্ষাকে গ্রীক নগররাষ্ট্রের বাইরে প্রসারিত করতে পারেননি। এ্যারিস্টটলের নিকটও গ্রীক নগররাষ্ট্রই আদর্শ রাষ্ট্র।

    কিন্তু কোনো জ্ঞানীর চিন্তার সীমাবদ্ধতা বা তাঁর আপন অর্থনৈতিক অবস্থানের স্বার্থ ইতিহাসের গতিকে রোধ করতে পারে না। একদিক থেকে দেখলে প্লেটোর এই চিন্তাধারা প্লেটো-পূর্ব যুগের প্রকৃতিবিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের বিকাশের এবং তার অধিকতর অগ্রগতির বিরুদ্ধে অভিজাত শ্রেণীর প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া-বিশেষ।

    প্লেটোর কাল যদি রাষ্ট্র এবং চিন্তার ক্ষেত্রে এক সংকটের কাল, তবে তাঁর পূর্ববর্তী যুগ গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের সূচনা এবং বিকাশের যুগ। এই যুগেই ধর্মীয় কোনো বিশ্বাস বা কাল্পনিক কোনো ভাবের ভিত্তিতে নয়, বস্তুজগতের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশ্বজগৎকে ব্যাখ্যার প্রয়াস দেখা গেছে। থেলিস, এ্যানাকসিমেনিস, এ্যানাকসিমেন্ডার, ডিমোক্রিটাস এবং হিরাক্লিটাস, এ্যানাকসাগোরাস, পাইথাগোরাস, থুসিডাইডিস, হিপোক্রাটিস, এসকাইলাস, ইউরিপাইডিস এবং সফোক্লিস[১৮] কেবল গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-নাট্যের পথিকৃৎ এবং স্রষ্টাই নন; এই পর্যায়ের জ্ঞানীদের মধ্যে বস্তুবাদী দর্শনের বোধই প্রবল। এই বস্তুবাদী বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের অধিকতর বিকাশের প্রতিবন্ধক শক্তি হিসাবে প্লেটো, এমনকি এ্যারিস্টটলের ভূমিকা।[১৯]

    ইতিহাসের মূল নিয়ামক কোনো আদর্শ সসমাধানের কল্পনা নয়, কোনো ধীশক্তিসম্পন্ন পুরুষের অভিনব কোনো ভাব নয়। ইতিহাসকে মূলত নিয়ন্ত্রণ করে এবং অগ্রসর করে নিয়ে চলে মানুষের বাস্তব অর্থনীতিক, সামাজিক পরিবেশ : এই পরিবেশে মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিরোধাত্মক সম্পর্ক। ভাব এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবশ্যই এক চালকশক্তির কাজ করে। ভাব দ্বারাই মানুষ চালিত হয়। কিন্তু মানুষের সব ভাব বাস্তবকে নিজের স্বার্থে পরিবর্তিত করার জন্যই উদ্ভূত হয় এবং বাস্তব অবস্থাই মানুষের ভাবের স্রষ্টা।

    প্লেটো যখন আদর্শ নগররাষ্ট্রের কল্পনা করছিলেন তখন গ্রীক উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলে মেসিডোনিয়ায় এমন এক নূতন শক্তির অভ্যুদয় ঘটছিল, যে-শক্তি বৃহত্তর জগতের আভাসে যেমন চমকিত হয়েছে, তেমনি তাকে জয় করার সংকল্পে সংকল্পবদ্ধ হয়ে উঠেছে। প্লেটোর মৃত্যু ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪৭ সনে এবং তাঁর মৃত্যুর দশ বৎসরের মধ্যে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৮ সনে মেসিডোনিয়ার সম্রাট ফিলিপ এথেন্সসহ নগররাষ্ট্রগুলি দখল করে নেন এবং চোদ্দ বৎসরের মধ্যেই সম্রাট ফিলিপের পুত্র এবং এ্যারিস্টটলের ছাত্র আলেকজান্ডার পৃথিবীবিজয়ের অভিযানে প্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন।

    ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থের সীমাবদ্ধতা যা-ই থাকুক না কেন, ‘রিপাবলিক’ এক কালজয়ী সৃষ্টি। রাষ্ট্রনীতি, দর্শন, সাহিত্য, সমাজতত্ত্বের ক্ষেত্রে ‘রিপাবলিক’ এক মৌলিক গ্রন্থ। ‘রিপাবলিক’ বিচারের ক্ষেত্রে যেমন একদিকে আমাদের একটি ইতিহাস-বোধ থাকা আবশ্যক, ‘রিপাবলিক’-এর সমকালীন এবং পূর্বকালীন সমাজকে জানা দরকার, তেমনি এ-বোধও আবশ্যক যে, কোনো চিন্তাবিদের কাছে মানুষের দাবি তার জীবনের সমস্যার চিরন্তন কোনো সমধান নয়। মানুষের জীবন প্রবহমান। মানুষের জীবনই সমস্যা এবং সমস্যাই জীবন। সমস্যার কোনো চিরন্তন সমাধান নেই। প্রতি যুগ এবং সমাজব্যবস্থার মানুষকে তার আপন সমস্যার সমাধানের সন্ধান করতে হবে। তার এই প্রচেষ্টায় কোন যুগের চিন্তাবিদের অবদান সমাধানদানে তত নয়, যত মানুষের সমস্যার পর্যবেক্ষণে, তার অনুধাবনে এবং তাকে চিহ্নিতকরণে। মানুষের জীবনের সমস্যার সামগ্রিক বিশ্লেষণেই ‘রিপাবলিক’ অতুলনীয়, অনন্য। আধুনিক বাংলাদেশ, আধুনিক ভারত বা আধুনিক আমেরিকার মানুষকে অনুসন্ধান করতে হবে তাদের আজকের জীবনের সমস্যার সমাধান। ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্র এথেন্সের অভিজাততন্ত্র বা গণতন্ত্র আজকের মানুষের সমস্যার সমাধান হয়তো নয়। কিন্তু একথা নিশ্চিত যে, এই ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্রগুলির ন্যায় জীবনময়, সংকট ও সংঘাতময় এবং ক্রিয়াশীল রাষ্ট্রীয় জীবনের দৃষ্টান্তও ইতিহাসে খুব কম আছে। এই ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্রগুলি জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গবেষণাগার হিসাবে যেন এককালে ক্রিয়াশীল ছিল। জীবনের সে-গবেষণাগারে আধুনিক জীবনের সমস্যারও প্রায় সবগুলিরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ঘটেছে। প্লেটোর ‘রিপাবলিকে’ও আমরা উল্লেখিত এবং আলোচিত হতে দেখি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রায় সকল সমস্যা। এখানেই ‘রিপাবলিক’-এর চিরন্তনতা এবং প্লেটোর কালজয়ী শক্তির পরিচয়। এ-কারণেই ‘রিপাবলিক’ আজও অপরিসীম বিস্ময়-উদ্রেককারী গ্রন্থ।

    ‘রিপাবলিক’ একটি নাটক। ঘটনার নয়, যুক্তির নাটক। গ্রন্থের মধ্যে যুক্তি হচ্ছে চরিত্র। সক্রেটিসকে বলা চলে যুক্তির কথক, যুক্তির উপস্থাপক। এ-নাটকের শুরু কোনো নাটকীয় বিস্ফোরণ, দৃশ্য-উন্মোচন বা ঘণ্টাধ্বনিতে নয়। সক্রেটিস তাঁর সহচর গ্লকনকে সঙ্গে নিয়ে পাইরিউস বন্দরের অশ্বদৌড় দেখে এথেন্স প্রত্যাবর্তন করছেন। এমন সময়ে সিফালাসপুত্র পলিমারকাস তাঁদের প্রত্যাবর্তনের পথরোধ করে তাঁদের গৃহে রাত্রি যাপনের জন্য অনুরোধ করেন। তাঁর নিরতিশয় অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে সক্রেটিস সঙ্গী সমভিব্যাহারে সিফালাসের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেই গৃহে বৃদ্ধ সিফালাসের সঙ্গে আলোচনাক্রমে বার্ধক্যের লাভালাভের প্রশ্ন ওঠে। এ-সমস্যার প্রশ্নোত্তর থেকে ‘ন্যায় কী’ এ-প্রশ্নও এক পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবে উত্থাপিত হয়। …এমনি অ-নাটকীয়ভাবে ‘রিপাবলিক’ নাটকের উন্মোচন ঘটেছে। এমন বৈশিষ্ট্যহীন সূচনা যেন আমাদের এই কথাটিকেই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবনের সমস্যা এবং তা নিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের যুক্তিভিত্তিক আলোচনা কোনো নাটকীয় আকস্মিক ব্যাপার নয়। সংলাপের মাধ্যমে এর পরে আলোচনাটি অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু এ-আলোচনা সূত্র, সঙ্গতি এবং পরিকল্পনাশূন্য নয়। কথার টানে কথা আসছে বা যুক্তির সান্নিধ্যে যুক্তি আসছে—’রিপাবলিক’-এর আলোচনা এরূপ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ‘রিপাবলিক’ পাঠ করতে গিয়ে যেখানে মনে হয়, যেন কথার টানে কথা আসছে, যুক্তির টানে যুক্তি আসছে, সেখানে আসলে একটি মূল পরিকল্পনার ভিত্তিতেই সমস্যার পর সমস্যা উত্থাপিত হচ্ছে এবং সে-সমস্যার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যুক্তি প্রদর্শিত হচ্ছে। একথাটি আমাদের স্মরণ রাখা আবশ্যক। ‘রিপাবলিক’-এর অন্তর্গত যুক্তির এই প্রাসঙ্গিকতা এবং ধারাবাহিকতা সহজে পাঠকের চোখে ধরা পড়ে না বলে বর্তমান অনুবাদগ্রন্থখানিকে তার সমস্যাসমূহের দিকে দৃষ্টি রেখে পঁচিশটি অধ্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেকটি অধ্যায়ের একটি উপযুক্ত নামসহ অধ্যায়ের প্রথমে অধ্যায়ের অন্তর্গত বিষয়ের একটি ব্যাখ্যামূলক চুম্বক দেওয়া হয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য, পাঠককে যুক্তির পর্যায়গুলিকে কেবল ধরিয়ে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে ‘রিপাবলিক’-এর সামগ্রিক অনুধাবনে যথাসাধ্য সাহায্য করা। ‘রিপাবলিক’-এর বিশ্লেষণমূলক উপলব্ধি পাঠকের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অনুবাদক এটুকু বোধ করেছেন যে, গ্রন্থের সমস্যাসমূহ উল্লেখের মাধ্যমে তাদের অন্তর্নিহিত সম্পর্কটি ধরিয়ে দিলে পাঠকের পক্ষে ‘রিপাবলিক’-এর বিশ্লেষণ এবং বিচারমূলক অনুধাবন সহজ হবে। এ ছাড়া প্রতি অন্তর-পৃষ্ঠার শীর্ষদেশে ঐ স্থলে কিংবা নিকটবর্তী স্থলে আলোচিত বিষয়ের একটি উপযুক্ত শিরোনাম মুদ্রিত হয়েছে। পাঠক পৃষ্ঠা শীর্ষের এই এই শিরোনামগুলির ওপর দৃষ্টিক্ষেপ করেও ‘রিপাবলিক’-এর যুক্তির অগ্রগতিকে লক্ষ করতে পারবেন। পৃষ্ঠাশীর্ষে প্রচলিত সকল ইংরেজি অনুবাদে উদ্ধৃত মূল গ্রীক গ্রন্থের বিষয়সূচক পুস্তক এবং পৃষ্ঠাসংখ্যাও মুদ্রিত হয়েছে। এর ফলে অধিকতর অনুসন্ধিৎসু পাঠক বর্তমান অনুবাদের যে-কোনো পৃষ্ঠার বিষয়কে ইংরেজি যে-কোনো অনুবাদের মধ্যে সহজেই নির্দিষ্ট করতে পারবেন।

    প্লেটো শক্তিশালী সাহিত্যিক ছিলেন। কিন্তু প্লেটো সাহিত্যসৃষ্টির জন্য তাঁর গ্রন্থরাজি রচনা করেননি। একথা সত্য, সংলাপ বা নাটক আকারে তিনি তাঁর গ্রন্থসমূহ রচনা করেছেন। কিন্তু তারও প্রধান উদ্দেশ্য নাটক সৃষ্টি করা নয়। প্লেটো নাটক লিখেছেন। কিন্তু প্লেটো ‘নাট্যকার’ ছিলেন না। প্লেটো সংলাপের মাধ্যমে জগৎ, জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর দর্শন এবং অভিমতসমূহ ব্যক্ত করেছেন। নিবন্ধমূলক রচনাই আজকাল আমাদের নিকট দর্শন এবং অভিমত প্রকাশের স্বাভাবিক রীতি বলে বোধ হয়। কেবল আধুনিককালেই নয়। প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটল তাঁর দর্শন এবং অভিমত প্রকাশের জন্য সংলাপের বদলে নিবন্ধ বা আলোচনামূলক রচনাকে গ্রহণ করেছেন। এ-কারণে প্লেটোর রচনার ক্ষেত্রে সংলাপের প্রাধান্য একটি প্রশ্ন হিসাবে আমাদের চোখে ধরা পড়ে এবং বিষয়টি কিছুটা আলোচনার দাবি রাখে। গবেষকগণ এরূপ মনে করেন না যে, প্লেটো আদৌ কোনো নিবন্ধ রচনা করেননি। কালের হাতে অবশ্য তাঁর সেই রীতির রচনা রক্ষিত হয়নি। কাল রক্ষা করেছে তাঁর সংলাপরাজিকে। কালই মানুষের সৃষ্টির মূল্যায়নে প্রধান বিচারক। প্লেটোর সৃজনক্ষমতার শ্রেষ্ঠ ফসলকেই হয়তো কাল মানুষের সভ্যতার জন্য রক্ষা করেছে। এ্যারিস্টটলও হয়তো সংলাপ রচনা করেছিলেন। কিন্তু কাল সংলাপের বদলে তাঁর নিবন্ধ এবং আলোচনামূলক বিশ্বকোষিক সৃষ্টিকে সভ্যতার জন্য বহন করেছে। প্লেটোর সংলাপ থেকে এ্যারিস্টটলের নিবন্ধ—এটা চিন্তার প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি বিকাশের সূচক নিশ্চয়ই। এ বিকাশে প্লেটো পূর্ববর্তী, এ্যারিস্টটল পরবর্তী। কিন্তু কেবল কালের ব্যবধানই প্লেটোর রচনার রীতি সংলাপমূলক হওয়ার কারণ নয়। এ্যারিস্টটল প্লেটোর শিষ্য। তাই তাঁর সমকালীনও। তা ছাড়া প্লেটোর সমকালীন বা পূর্ববর্তী অন্যান্য গ্রীক চিন্তাবিদের সকলে যে প্লেটোর ন্যায় সংলাপ রচনা করেছেন, এমন নয়। ‘সংলাপে’র ওপর প্লেটোর আকর্ষণের কারণ হিসাবে বলা যায় : ১. সক্রেটিস প্লেটোর জীবনের পরম শ্রদ্ধেয় এবং আরাধ্য গুরু ছিলেন। গুরুকে অমর করার বাসনা নিয়ে তাঁকে নায়ক হিসাবে চিত্রিত করে প্লেটো নিজের দর্শন প্রকাশ করতে চেয়েছেন। এজন্য নাটকের প্রয়োজন ছিল। ২. সক্রেটিসের নিজের অভিমত-প্রকাশের মাধ্যম ছিল সংলাপ অর্থাৎ সাথিদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তরের পদ্ধতি। সক্রেটিসের নিজের কোনো লিখিত রচনার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। সক্রেটিস এথেন্সের পথে-ঘাটে, বাজারে-বন্দরে, জনসম্মেলনে সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলাপ করা পছন্দ করতেন। তাঁর নিজের অভিমতকে সরাসরি শ্রোতার উপর চাপিয়ে দেবার বদলে সক্রেটিস ক্রমান্বয়ে শ্রোতাকে সেই অভিমতের বিন্দুটিতে যুক্তির ক্রমগতির মাধ্যমে পৌঁছে দিতেন। শ্রোতার তখন উপলব্ধি হত, যে-সত্যে সে পৌঁছেছে সে-সত্য তারই আহৃত সত্য, তার নিজের আত্মায় উপলব্ধ সত্য। অপর কারও আরোপিত সত্য নয়। সক্রেটিসের বিশ্বাস ছিল, জ্ঞানকে বাইরে থেকে দান করা যায় না। শিক্ষকের দায়িত্ব জ্ঞানকে দান করা নয়। শিক্ষকের দায়িত্ব শিক্ষার্থীর আত্মাকে জ্ঞানের অভিমুখী করে দেওয়া, যেন আত্মা নিজেই তার জ্ঞান অবলোকন করতে পারে। সক্রেটিসের এই অভিমতকে প্লেটো সঠিক বলে বিবেচনা করতেন। এ-কারণেও প্লেটো সক্রেটিসকে নায়ক করে যখন গ্রন্থ রচনা করেছেন তখন তাঁর রীতি স্বাভাবিকভাবে সংলাপের আকার গ্রহণ করেছে, নিবন্ধের নয়। ৩. প্লেটো নিজেও বিশ্বাস করতেন, অভিমত আরোপের চেয়ে আলাপের মাধ্যমে অভিমতে আরোহণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে অধিকতর উত্তম পদ্ধতি। এ-কারণে প্লেটোর একাডেমিতে অধ্যাপকের বক্তৃতার চেয়ে গুরু-শিষ্য কিংবা জ্ঞানের অন্বেষণে সহযাত্রীদের মধ্যে ‘প্রশ্ন এবং উত্তর, পুনরায় প্রশ্ন এবং পুনরায় উত্তর’–আলাপের এরূপ আবহাওয়া বিরাজ করত। বস্তুত, সংলাপের এই রীতির পক্ষে প্লেটো তাঁর অপর একটি বিখ্যাত সংলাপ ‘ফিডরাস’-এ যুক্তি উপস্থিত করে বলেছেন যে, কোনো সত্যকে উন্মোচিত করার জন্য পারস্পরিক সংলাপই হচ্ছে উত্তম উপায়। তাঁর মতে নিবন্ধে আমরা সরাসরি একটি সিদ্ধান্তকে লাভ করি—কিন্তু সিদ্ধান্তে পৌঁছার প্রক্রিয়াকে আমরা প্রত্যক্ষ করিনে এর ফলে নিবন্ধমূলক গ্রন্থের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান অলীক জ্ঞান। উপলব্ধি এবং প্রত্যয়হীন জ্ঞান। কিন্তু সংলাপের বৈশিষ্ট্য এই যে, সংলাপ যদি লিখিত হয় তথাপি তার মধ্যে চিন্তার ক্রমগতির একটি আভাস থাকে। সংলাপের মধ্যে সত্যের জন্য আমাদের মনের প্রয়াস এবং অপর মনের সঙ্গে তার আলাপ ও দ্বন্দ্বের প্রক্রিয়াটি প্রকাশিত হয়। এর উত্তম ফল এই যে, সংলাপের শ্রোতা বা পাঠকও সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ক্রমান্বয়ে সত্যে আরোহণের উপলব্ধি বোধ করে।[২০]

    ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থকে প্রাচীনকালে ‘রিপাবলিক’ নামে আখ্যায়িত করা হত না। এর দ্বিতীয় নাম ছিল : ‘ন্যায় সম্পর্কে আলোচনা’। ‘রিপাবলিক’ বলতে

    আধুনিককালে একটি বিশেষ ধরনের শাসনব্যবস্থার কথা মনে আসে : গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। কিন্তু গ্রীক ভাষায় ‘রিপাবলিক’ শব্দের অর্থ অধিকতর ব্যাপক ছিল। রিপাবলিক বলতে সাধারণভাবে শাসনতন্ত্র, রাষ্ট্র বা সমাজকে বোঝাত।[২১] প্লেটো সাধারণভাবে রাষ্ট্র এবং সমাজের সমস্যাসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। হয়তো সে-কারণেই ‘রিপাবলিক’ নামটি অধিক ব্যবহৃত হয়েছে এবং বর্তমানে ‘রিপাবলিক’ নামেই এই সংলাপ সর্বভাষায় পরিচিত।

    কিন্তু সাধারণভাবে ‘রাষ্ট্র’ কথাটির উপর জোর দিয়ে অগ্রসর হলে পাঠকের মনে একটি আশা থাকবে যে, এই গ্রন্থে রাষ্ট্রের সংবিধান কী, রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তি কে, আইন প্রণয়নকারী সংস্থা কী, শাসন, আইন ও বিচার – এদের কোনটি কে কীভাবে সম্পাদন করছে—ইত্যাদির আলোচনা পাওয়া যাবে। কিন্তু ‘রিপাবলিক’-এর মধ্যে প্রবেশ করে এ-সকল বিষয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো আলাপের সাক্ষাৎ আমরা পাইনে। ‘রিপাবলিক’-এ সামাজিক এবং রাজনীতিক বিষয়ে অবশ্য আলোচনা আছে। ‘রিপাবলিক’ দশটি পুস্তকে বিভক্ত। এই গ্রন্থের অষ্টম এবং নবম পুস্তকের একাংশে আদর্শ রাষ্ট্রের বিচ্যুতি হিসাবে যেসব রাষ্ট্রের আলোচনা প্লেটো করেছেন সেসব রাষ্ট্র গ্রীক রাষ্ট্রীয় জগতেরই দৃষ্টান্ত। [কেবল প্রাচীন গ্রীক জগতের নয়, এই আলোচনায় আধুনিক রাষ্ট্রপ্রকারেরও আভাস মেলে।] আবার দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ পুস্তকে রাজনীতিক এবং সামাজিক বিষয়সমূহের আলোচনা করা হয়েছে। [রাষ্ট্রের প্রাথমিক গঠন, সমৃদ্ধতর রাষ্ট্র, শাসকের আবশ্যকীয় গুণ, রাষ্ট্রের নাগরিকদের শ্রেণীবিভাগ ও শসকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি।] কিন্তু এ-আলোচনাতেও প্লেটোর জোর এ-সমস্ত বিষয়ের অন্তর্গত নীতির উপর, এর কোনো দৃষ্টান্তের বিস্তারিত বর্ণনার ওপর নয়। গ্রন্থের বাকি অংশ প্রধানত ন্যায়, শিক্ষা, দর্শন, কাব্য এবং আত্মার অমরতাসংক্রান্ত আলোচনা।

    ন্যায় সম্পর্কে প্লেটোর বক্তব্য ‘রিপাবলিক’-এর কোনো একটি অংশে কেন্দ্রীভূত নয়। ‘রিপাবলিক’-এর সমগ্র আলোচনার মধ্য থেকে ন্যায়ের ধারণাটি আমাদের তৈরি করতে হবে। প্লেটোর নিকট ‘ন্যায়’ দয়া, মহত্ত্ব, সাহস কিংবা জ্ঞানের মতো রাষ্ট্র বা ব্যক্তির কোনো বিশিষ্ট গুণ নয়। ন্যায় হচ্ছে রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কর্ম, উপাদান বা গুণ, অঙ্গ, অংশ বা শ্রেণীর মধ্যে সঙ্গতির সম্পর্ক। এ-সম্পর্কে বর্তমান পুস্তকের সূচনাতে একটি আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া অধ্যায় : ১১-এর মুখবন্ধটিও উল্লেখযোগ্য।

    পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলি আয়তনে এবং লোকসংখ্যায় আধুনিক রাষ্ট্রের তুলনায় খুবই ক্ষুদ্রাকারের ছিল। এ কারণে নাগরিকে নাগরিকে ঘনিষ্ঠতা ছিল স্বাভাবিক এবং তাদের আচরণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় আচরণের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য ছিল না। জীবনে আমাদের আচরণের একটা দিক হচ্ছে ব্যক্তিগত আচরণ, যেখানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে আমরা অনভিপ্রেত বলে মনে করি। কিন্তু গ্রীক নগররাষ্ট্রে ব্যক্তির জীবনে ব্যক্তিগত এবং সমাজগত আচরণে কোন পার্থক্যের সুযোগ ছিল না। গ্রীক নাগরিকগণ রাষ্ট্রকেই তাদের একমাত্র মূল সংস্থা বলে বিবেচনা করত। রাষ্ট্রের বাইরে ব্যক্তির জীবনের কোন অস্তিত্বের কথা তারা চিন্তা করতে পারত না।

    ‘রিপাবলিক’ একাডেমী প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে রচিত হয়েছিল। একাডেমীর উদ্দেশ্য ছিল দার্শনিক-শাসকদের শিক্ষাদান—অর্থাৎ শিক্ষাদানের মাধ্যমে দার্শনিক-শাসক তৈরি করা। ‘রিপাবলিক’-এ প্লেটো তাঁর সেই শিক্ষা-নীতির বিস্তারিত আলোচনা করবেন—এটাই স্বাভাবিক। বস্তুত, আদর্শ রাষ্ট্রের শাসকদের প্রয়োজনীয় গুণ নির্দিষ্ট করার পরে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন আসে : এই গুণ অনুযায়ী শাসক কেমন করে পাওয়া যাবে? এর সুস্পষ্ট জবাব দিয়ে প্লেটো বলেছেন, শিক্ষাই হচ্ছে এর উপায়। শিক্ষার মাধ্যমেই নাগরিকদের প্রকৃতিদত্ত গুণের পরিস্ফুটন এবং বৃদ্ধি ঘটবে। উত্তম রাষ্ট্র শাসনের মূল সমস্যা হচ্ছে শাসকদের শিক্ষা। শাসকদের শিক্ষিত করা গেলে শাসনের বিষয়ে, আইন বা বিচারের বিষয়ে আর চিন্তার কারণ থাকবে না। কারণ, উত্তম শিক্ষা যে লাভ করেছে সে আইন, শাসন বা বিচার কোথাও উত্তম বই অধমের কোন উৎস হতে পারে না। তার দ্বারা কোনো অধম কার্য সাধিত হতে পারে না। এ জন্যই ‘রিপাবলিক’-এ শিক্ষার বিস্তারিত আলোচনা এবং এ-কারণেই সমাজ সংগঠনের খুঁটিনাটির চেয়ে তার মৌলনীতির ব্যাখ্যাতেই প্লেটোর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ। তা ছাড়া সর্বোত্তম জ্ঞান যার অর্জিত হয়েছে, খুঁটিনাটি আইন তার শৃঙ্খলবিশেষ। দার্শনিক শাসক তার উত্তমের জ্ঞান দ্বারা রাষ্ট্রের জন্য উত্তম বিধান তৈরি করবে। সাধারণ নাগরিকের কিংবা আইনসভার আইনের বাধন তার উত্তম শাসনের ক্ষমতাকে ব্যাহত করবে। এই তত্ত্বের মধ্যেই ‘রিপাবলিক’-এ আইন প্রণয়নের বিস্তারিত বিবরণ না থাকার কারণ নিহিত।

    দার্শনিক শাসককে শিক্ষিত করতে হবে। কিংবা বলা চলে শিক্ষার মাধ্যমে দার্শনিক শাসক তৈরি করতে হবে। কিন্তু দর্শন ব্যতীত দার্শনিক শাসক তৈরি হতে পারে না। তাই প্লেটোর শিক্ষাসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে দর্শন-শিক্ষা। কিন্তু ‘রিপাবলিক’-এ আমরা প্লেটোর দর্শনকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করিনে। শিক্ষার আলোচনায় প্লেটো দর্শনের গুরুত্বের কথা যত বলেছেন, দর্শন কাকে বলে, দর্শন কি তা তত ব্যাখ্যা করেননি। এর একটি কারণ হয়তো এই যে, প্লেটো দৰ্শনকে সহজে ব্যাখ্যাযোগ্য ভাবতেন না। তাঁর সপ্তম পত্রে প্লেটো এ প্রসঙ্গে বলেছেন :

    অপরাপর বিষয়ের মতো দর্শনের সত্যকে আমরা সহজে প্রকাশ করতে পারিনে। দর্শনের সত্য প্রকাশযোগ্য নয়। কিন্তু দক্ষ অভিজ্ঞ শিক্ষকের অধীনে শিক্ষার্থী যদি দীর্ঘদিন দর্শনের শিক্ষা ও আলোচনায় অতিবাহিত করে, তাহলে তার অন্তরে হয়তো সত্যের আলো আকস্মিকভাবেই উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে এবং একবার উদ্ভাসিত হলে অন্তর থেকে অন্তরে সে আলো বিস্তার লাভ করবে। জ্ঞানের আলো একবার প্রজ্জ্বলিত হলে আলোই আলোর ইন্ধন যোগাবে, তাকে প্রজ্জ্বলিত রাখবে।[২২]

    তথাপি ‘রিপাবলিক’-এ প্লেটোর মূল দর্শনের যে আভাস আমরা পাই তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার ‘দুই সত্য’ বা ‘দুই জগতের’ তত্ত্ব। এই দুই জগতের এক জগৎ হচ্ছে আমাদের নিত্যকার দৃশ্য, পরিবর্তমান জগৎ; দ্বিতীয় জগৎ হচ্ছে এই দৃশ্য জগতের উৎস বা চিরন্তন, অদৃশ্য এবং অপরিবর্তনের জগৎ। প্লেটোর মতে এই দ্বিতীয় অদৃশ্য জগতই চরম সত্য; এই অদৃশ্য জগতই চরম ভাব।

    ‘রিপাবলিক’-এ সমাজ রাষ্ট্রনীতির আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্লেটো কর্তৃক রাষ্ট্রের অধিবাসীদের শ্রেণীকরণ। প্লেটো রাষ্ট্রের মানুষকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন : উৎপাদক, দেশরক্ষক এবং শাসক। উৎপাদক বলতে তিনি কৃষক, কারিগর এবং ব্যবসায়ী-এদের সকলকে বুঝিয়েছেন। এদের কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন করা। ‘রিপাবলিক’-এর গোড়াতে প্লেটো রাষ্ট্রকে দুটো শ্ৰেণী, অৰ্থাৎ উৎপাদক এবং অভিভাবকে বিভক্ত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির ফলে অভিভাবককে প্লেটো দেশরক্ষক এবং শাসক হিসাবে পুনরায় বিভক্ত করেছেন। এই পরিবর্তনের কারণ হয়তো এই যে, কেবল কল্পনায় নয়, বাস্তব রাষ্ট্রের বিকাশেও পূর্বে শাসক এবং দেশরক্ষকে কোন পার্থক্য ছিল না। পূর্বে, যারা নাগরিক এবং শাসক—তারাই দেশকে প্রয়োজন হলে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করে রক্ষা করত। কিন্তু পরবর্তীকালে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ বিগ্রহ যত বৃদ্ধি পেয়েছে, তত যুদ্ধকলার প্রশিক্ষণের আবশ্যক হয়েছে এবং নাগরিক মাত্রের পক্ষেই বিনা প্রশিক্ষণে উপযুক্ত যোদ্ধা হওয়া সম্ভব হয়নি। পেশাদার সৈন্যবাহিনীর প্রয়োজন হয়েছে। বিকাশের এই পর্যায়ের পরিচয় ঘটেছে প্লেটোর সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের বর্ণনায়।

    কর্মের ভিত্তিতে এই শ্রেণীবিভাগ সংঘটিত হলেও কর্মে কর্মে গুরুত্বের পার্থক্য রয়েছে। সেদিক থেকে প্লেটো রাষ্ট্রশাসনকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্ম বলেছেন। তার পরে দেশরক্ষা। এবং সর্বনিম্নে উৎপাদন। ফলে তাঁর শ্রেণীবিভাগ পর্যায়ক্রমিক তিনটি উঁচু নিচু স্তরের রূপ লাভ করেছে। যদিও প্লেটো এই বিভাগকে অনড় বলে মনে করেননি এবং তাঁর শিক্ষাব্যবস্থায় নিম্নতর শ্রেণীর মধ্যে গুণের সাক্ষাতে তাকে উচ্চতর শ্রেণীতে কিংবা উচ্চতরের গুণহীনকে নিম্নতর শ্রেণীতে স্থাপনের কথা তিনি বলেছেন, তবু প্লেটোর এই শ্রেণীবিভাগ যে কালক্রমে অনড় শ্রেণীভেদে পর্যবসিত হতে পারে—এ-কথাকে অস্বীকার করা চলে না। মানুষের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নানা চাহিদা। তাই তার নানা কর্ম। মানুষের মধ্যে কর্মের ক্ষেত্রে দক্ষতারও পার্থক্য আছে। ‘রিপাবলিক’-এ এই কর্মের বিভাগ এবং দক্ষতার পার্থক্যের উল্লেখ আছে। এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। “আমাদের সকলের প্রকৃতি এক নয়।” একথা সত্য। কিন্তু এ-পার্থক্য মানুষকে গোষ্ঠীগতভাব অপরিবর্তনীয় উচ্চতর এবং নিম্নতর শ্রেণীতে বিভক্ত করে ফেলে না। ‘রিপাবলিক’-এ অভিভাবক তথা শাসক ও সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে যেরূপ বিস্তারিত আলোচনা আছে, তৃতীয়, অর্থাৎ উৎপাদকশ্রেণী সম্পর্কে সেরূপ কোনো আলোচনা নেই। এ থেকেও এটি ানুমিত হয় যে, প্লেটো উৎপাদকশ্রেণীকে নিম্নতর পর্যায়ের বলে বিবেচনা করেছেন। ‘রিপাবলিক’-এ আলোচিত আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হচ্ছে শাসকশ্রেণীর সাম্যবাদ। শাসকশ্রেণীর শাসনের দায়িত্বপালনকে নির্বিঘ্ন করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্লেটো অভিভাবক তথা শাসক ও সৈন্যবাহিনীর জন্য ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং ব্যক্তিগত পরিবার বিলোপের প্রস্তাব করেছেন। এই প্রস্তাবই ‘প্লেটোর সাম্যবাদ’ নামে অভিহিত হয়েছে। প্লেটোর প্রস্তাবে তৃতীয় অর্থাৎ উৎপাদকশ্রেণীর উপর এই সাম্যবাদ প্রযোজ্য নয়। উৎপাদকশ্রেণীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং ব্যক্তিগত পরিবারে প্লেটোর কোনো আপত্তি থাকেনি। আধুনিককালে সাম্যবাদ কথাটি বিশেষ প্রচলিত। এ-কারণে প্লেটোর সাম্যবাদের সঙ্গে আধুনিক সাম্যবাদী তত্ত্বের তুলনার প্রশ্ন এসে পড়ে। প্লেটোর সাম্যবাদের প্রস্তাবটিকে আজ বিস্ময়কর বোধ হতে পারে। কিন্তু প্লেটোর ন্যায় প্রাচীন লেখকের রচনায় সাম্যবাদের প্রস্তাব থেকে বুঝতে পারা যায়, সমাজ-সংগঠনে সাম্যবাদী চিন্তা কেবল আধুনিক কালের চিন্তা নয়। মানুষের সমাজ সংখ্যা, সম্পর্ক, সংগঠন এবং সম্পদের ক্ষেত্রে সহজ থেকে জটিল হয়েছে। তার বিকাশের ধারাটি এরূপ এবং সেদিক থেকে কল্পনা করা চলে, আদিমকালে শক্তি, সংখ্যা এবং সম্পদের দুর্বল অবস্থায় মানুষকে যূথবদ্ধ হয়ে একপ্রকার সাম্যবাদী সম্পর্কের ভিত্তিতেই বসবাস করতে হয়েছে এবং এ-অনুমান যে নিছক কল্পনা নয় তা আদিম মানুষের সভ্যতার বিশ্লেষণ এবং নৃতাত্ত্বিক গবেষণার মাধমে গবেষকগণ স্থির করেছেন। প্লেটো-এ্যারিস্টটলের রচনায় বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসাবেই এরূপ সাম্যবাদী সমাজসংস্থার উল্লেখ দেখা যায়। কাজেই প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-এ সাম্যবাদের প্রস্তাব আধুনিক পাঠকের মনে বিস্ময়ের সঞ্চার করলেও এ-প্রস্তাব পেশ করতে প্লেটোর খুব অভিনবত্ব বা সাহস প্রদর্শন করতে হয়েছে, এরূপ বলা চলে না। কিন্তু তা হলেও আদিম সাম্যবাদের সঙ্গে যেমন, আধুনিক সাম্যবাদী পরিকল্পনার সঙ্গেও তেমনি প্লেটোর সাম্যবাদের যথার্থ কোনো সাদৃশ্য নেই। আদিম সাম্যবাদে কোনো শ্রেণী ছিল না। সম্পত্তির উপর ব্যক্তিগত মালিকানার অস্তিত্ব সে-সমাজে ছিল না। ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং সম্পদ সৃষ্টি হওয়ার স্তরে সমাজ তখনও পৌঁছেনি। এ কারণে সে-সমাজে সাম্যবাদী সম্পর্ক সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, প্লেটোর সাম্যবাদের ন্যায় কোনো অংশ সে-সম্পর্কের বাইরে ছিল না। আধুনিক সাম্যবাদী চিন্তাও কোনো বিশেষ শ্রেণীর জন্য নয়। আধুনিক সাম্যবাদী তত্ত্বের মূল কথা, আর্থিক ক্ষেত্রে শ্রেণীগত পার্থক্য বিলোপ করা। সকলকেই উৎপাদকে পরিণত করা, কাউকে কেবলমাত্র শাসক করা নয়। প্লেটোর সাম্যবাদে অর্থ উৎপাদনের কাজ প্রয়োজনীয় বটে, কিন্তু উত্তম বা সম্মানের কোনো কাজ তা নয়। এজন্য উচ্চতর শ্রেণীকে (শাসক ও সৈন্যবাহিনী অর্থোৎপাদনের কাজ থেকে তিনি অব্যাহতি দিয়েছেন। আধুনিক সাম্যবাদে অর্থের উৎপাদনই মূল কাজ। অর্থের উৎপাদনের ভিত্তিতেই সমাজ এবং রাষ্ট্র চলে। আর তাই অর্থের উৎপাদকশ্রেণীই সমাজ এবং রাষ্ট্রের মূল শ্রেণী। আর সে-উৎপাদকশ্রেণীরও মূল শক্তি শ্রমিক। সাম্যবাদী তত্ত্বে এই মূল শক্তিই রাষ্ট্রের নিয়ামক হবে। অর্থের ক্ষেত্রে শোষণের বিলোপ ঘটবে এবং তার সঙ্গে ‘শোষক-শোষিত’ সমাজের এরূপ বৈষম্যেরও অবসান হবে। একটা শ্রেণীহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত তবে। প্লেটোর সাম্যবাদে শ্রেণীবৈষম্যের বিলোপের কল্পনা করা হয়নি। শ্রেণীপার্থক্যকে স্থায়ী করার কথাই প্লেটো চিন্তা করেছেন। শাসকের সাম্যবাদকে তিনি সমাজের প্রচলিত শ্রেণীবিন্যাসকে বজায় রাখার মাধ্যম হিসাবেই দেখেছেন। তা ছাড়া, প্লেটোর সাম্যবাদে ব্যক্তিগত পরিবারকে শাসকের উত্তম শাসনের প্রতিবন্ধকরূপে গণ্য করা হয়েছে। সে-কারণে ব্যক্তিগত পরিবারের বিলোপের প্রস্তাব প্লেটো উত্থাপন করেছেন। আধুনিক সাম্যবাদে ব্যক্তিগত পরিবারের বিলোপ নয়, পরিবারের সন্তানপালন এবং অন্যান্য কাজকে রাষ্ট্রীয় করার মাধ্যমে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীর অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের পথ মুক্ত করার কথা চিন্তা করা হয়েছে। কিন্তু এ-তুলনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্লেটো এবং আধুনিক সাম্যবাদের রাষ্ট্র সম্পর্কে দর্শনের পার্থক্য। প্লেটো সমাজ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য স্থির করেননি। তিনি রাষ্ট্রকে মানুষের স্থায়ী, অপরিহার্য এবং ব্যক্তির মুক্তির একমাত্র সংস্থা বলে গণ্য করেছেন। তাই ব্যক্তির সকল মঙ্গল-অমঙ্গলের চিন্তা রাষ্ট্রের উপর সমর্পিত। প্লেটো তাঁর রাষ্ট্রের নিয়ামক শক্তি করেছেন কতিপয় জ্ঞানী ব্যক্তিকে যাঁরা চরম উত্তমকে জ্ঞাত হয়েছেন। এই জ্ঞানীরাই সকল চিন্তার এবং জ্ঞানের অধিকারী। সাধারণ মানুষ জ্ঞানী শাসককে রাষ্ট্রর সর্বরোগ নিরাময়ের ধন্বন্তরি চিকিৎসক মনে করে বাধ্য রোগীর ন্যায় তাকে কেবল মান্য করবে, তার অনুশাসনকে পালন করবে। এ ছাড়া তার স্বাধীন চিন্তা বা অপর কোনো দায়িত্ব পালন বা সিদ্ধান্তগ্রহণের কোনো আবশ্যকতা নেই। প্লেটোর রাষ্ট্র তাই কেবল যে ব্যক্তির জীবনের সর্বগ্রাসী সংস্থা তা-ই নয়, ‘কতিপয় জ্ঞানীর’ ইচ্ছার ক্রীড়নক। আধুনিক সাম্যবাদের ব্যাখ্যায়, অর্থনৈতিক শ্রেণীবৈষম্যে বিভক্ত সমাজে রাষ্ট্র হচ্ছে শাসকশ্রেণীর হাতে শোষিতশ্রেণীকে অবদমনের যন্ত্রবিশেষ। আধুনিক সাম্যবাদীদের কল্পনা, মানুষের আদিম সাম্যবাদী অবস্থায় এরূপ দমনমূলক কোনো সংস্থার যেমন অস্তিত্ব ছিল না, তেমনি ভবিষ্যৎকালে আর্থিক ক্ষেত্রে শোষক এবং শোষিত-রূপ বৈষম্যের পরিপূর্ণ বিলুপ্তির পরে রাষ্ট্রের বর্তমান রূপ আর ক্রিয়াশীল থাকবে না। তখন রাষ্ট্র মানুষের স্বেচ্ছাভিত্তিক দায়িত্ব পালনের সংস্থায় পরিণত হবে। তার নির্যাতনমূলক কোনো ভূমিকা থাকবে না। বস্তুত প্রাচীন ইতিহাসে সাম্যবাদের চিন্তা (সীমাবদ্ধভাবে হলেও) প্লেটোর মধ্যে অভিনব নয়। বরঞ্চ, গ্রীক রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক ক্ষেত্রে যখন পিতৃতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীকে সধারণভাবে যেখানে পুরুষের চেয়ে হীন এবং অক্ষম বলে গণ্য করা হয়, সেখানে নারীও পুরুষের ন্যায় সমপরিমাণেই রাষ্ট্রের শাসক হওয়ার উপযুক্ত, প্লেটোর এই প্রস্তাবটিকেই সময়ের প্রেক্ষিতে অধিকতর অভিনব এবং প্রগতিমূলক বলে বিবেচনা করা আবশ্যক।

    কাজেই আমাদেরও সর্বপ্রকার সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যেন রাষ্ট্রের নাগরিকদের চেয়ে সশস্ত্র এবং শক্তিশালী যে-রক্ষিবাহিনী তারা যেন নাগরিকদের সুহৃদ এবং মিত্রের পরিবর্তে বর্বর স্বেচ্ছাচারী বাহিনীতে পরিণত হয়ে নাগরিকদের জন্য ভীতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। রিপাবলিক : ৩ : ৪১৬

    আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় কারোর পক্ষে বিপদকে এড়িয়ে ন্যায়পথে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া যথার্থই অলৌকিক ঘটনা। রিপাবলিক : ৬ : ৪৯৩

    জ্ঞান, নীতি এবং সত্য—এই হচ্ছে আত্মার সবচেয়ে উত্তম রক্ষক। রিপাবলিক : ৮ : ৫৬০

    অধম প্রবৃত্তির দল এবার তাদের হাতে বন্দি আত্মাকে তার সকল মহৎ গুণ থেকে শোধন করতে শুরু করে। এবার তারা দম্ভ, অনাচার, অমিতব্যয় এবং নির্লজ্জতাকে মশাল শোভাযাত্রা সহকারে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করে এবং প্রশংসার মধুর বাণী উচ্চারণ করে বরণ করে এনে আত্মাশূন্য ঘরে তাদের প্রতিষ্ঠা করে। এবার তারা ঔদ্ধত্যকে অভিহিত করে আভিজাত্য বলে, অরাজকতাকে বলে স্বাধীনতা এবং অপব্যয়কে মহানুভবতা আর মূর্খতাকে বলে বিক্রম। রিপাবলিক : ৮ : ৫৬০

    ***

    ১. Everyman’s Encyclopaedia.

    ২. Dialogues of Plato : B. Jowett, Vol. III, 3rd Edn. Introduction.

    ৩. Dialogues of Plato : B. Jowett. Vol III, Introduction.

    ৪. The Story of Philosophy : Will Durant, Pocket Library Edn. 1954, p. 15.

    ৫. Science and Politics in the Ancient World: Benjamin Farrington, p. 119.

    ৬. Plato Today : R. H. S. Crossman, p. 84.

    ৭. The Republic : H. D. P. Lee : Introduction. P. 9.

    ৮. The Story of Philosophy : Will Durant. P. 4.

    ৯. The Peloponnesian War : Thucydides. Translated by R. Craw- ley. Everyman’s Library, pp 100-102 : A History of Creece : J. B. Bury. p. 402.

    ১০. A History of Greece : J. B. Bury, pp 76-81.

    ১১. প্লেটোর সংলাপ : সরদার ফজলুল করিম : সক্রেটিসের জবানবন্দী, ক্রিটো, ফিডো চারমিডিস, লীসিস এবং ল্যাচেস – ছয়টি সংলাপের অনুবাদ। প্রথম তিনটি সংলাপ সক্রেটিসের বিচার, কারাগারে সক্রেটিসের আলাপ এবং মৃত্যুর উপর রচিত।

    ১২. এখানে খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৪-এ সংঘটিত অভিজাতদের অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখিত হচ্ছে। প্লেটোর বয়স তখন ২৩। কিন্তু ক্লিয়েসথেনিসের আইন অনুযায়ী শাসনে অংশগ্রহণের বয়স তখনও প্লেটোর হয়নি। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ‘ত্রিশের শাসন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ত্রিশের মধ্যে প্লেটোর পিতৃব্য চারমিডিস এবং ভ্রাতৃত্বসম্পর্কিত ক্রিটিয়াস অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দ্রষ্টব্য : Republic of Plato : Cornford: Introduction. p. xv

    ১৩. প্লেটোর সংলাপ : সক্রেটিসের জবানবন্দী পৃঃ ২৯-৩০ (২য় সংস্করণ)।

    ১৪. খ্রিষ্টপূর্ব ৪০৩-এ গণতন্ত্রী শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে। পুনঃপ্রতিষ্ঠিত শাসনের অন্যতম নেতা অ্যানিটাস সক্রেটিসের বিরুদ্ধে দেবতায় অবিশ্বাস এবং তরুণদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ উত্থাপন করেন।

    ১৫. প্লেটোর সপ্তম পত্র। এ-পত্র রচনার সময় ৩৭৩ খ্রিঃ পূঃ। দ্রষ্টব্য—কর্নফোর্ড : The Re- public of Plato : Introduction George Sabine : A History of Political Theory, p. 37.

    ১৬. ‘Man is the measure of all things’.

    ১৭. এ্যারিস্টটলের জীবনকাল ৩৮৪-৩২২ খ্রিঃ পূঃ।

    ১৮. উল্লিখিত জ্ঞানীদের খ্রিষ্টপূর্ব জীবনকাল : থেলিস (৬৪০-৫৫০), এ্যানাকসিমেনিস (৫৮৫-৫২৫), এ্যানাকসিমেন্ডার (৬১০-৫৪৬), ডিমোক্রিটাস (৪৬০–৩৭০), হিরাক্লিটাস (৫৩৫–৪৭৫), এ্যানাকসাগোরাস (৫০০–৪২৮), পাইথাগোরাস (৫৮০-৫০০), থুসিডাইডিস (৪৭১-৪০০), হিপোক্রাটিস (৪৬০–৩৭৫), এসকাইলাস (৫২৫–৪৫৬), ইউরিপাইডিস (৪৮০–৪০৭) এবং সফোক্লিস (৪৯০-৪০৬)।

    ১৯. দর্শনকোষ : সরদার ফজলুল করিম। প্রকাশক : বাংলা একাডেমী, Science and Politics in the Ancient World Greek Science: Benjamin Farrington.

    ২০. An Introduction to the Republic of Plato : William Boyd.

    ২১. The Republic: H. D. P. Lee: Introduction, p. 26.

    ২২. The Republic : HD. P. Lee : Introduction, p. 35.

    রিপাবলিকের প্রধান আলোচ্য বিষয়

    ‘রিপাবলিক’ সংলাপের প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে : ন্যায়। ন্যায় কাকে বলে? মানুষের সমাজে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা কেমন করে সম্ভব হতে পারে?

    ‘ন্যায়’ একটি বিশ্লিষ্ট নীতিবোধক কথা। প্রত্যেক ভাষা এবং সমাজের মতো প্রাচীন গ্রীসের ভাষা এবং সমাজে ‘ন্যায়’ একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হত। ন্যায় বলতে সব যুগে সব সমাজে সাধারণতঃ দায়িত্ব পালন করা, অপরের ঋণ পরিশোধ করা, সৎভাবে চলা, দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করা, অন্যের ক্ষতিসাধন না করা প্রভৃতি গুণকে বোঝায়। মোট কথা, ‘ন্যায়’ হচ্ছে ব্যক্তির সামাজিক ব্যবহারের ঔচিত্য-অনৌচিত্যবোধক কথা। সমস্ত মহৎ গুণের সমন্বয়ে ন্যায়ের সৃষ্টি। তাই সব দেশেই সাধারণভাবে ‘ন্যায়’ মানেই যা-কিছু মহৎ এবং উত্তম।

    রিপাবলিক বা ‘ন্যায়বিষয়ক আলোচনা’ (এই দ্বিতীয় শিরোনামেও রিপাবলিক পরিচিত হত) শুরু হয়েছে ন্যায়ের সংজ্ঞা-নির্ধারণের প্রয়াসে :

    “…কিন্তু তোমার নিকট আমার আর একটি প্রশ্ন রয়েছে, সিফালাস আমার প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পদ থেকে কী শান্তি তুমি লাভ করেছ?”

    সিফালাস বললেন : … সম্পদের যেটা বড় আশীর্বাদ সে হচ্ছে উত্তম এবং সৎকে এই অভয়দান যে, ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় কাউকে প্রতারণা কিংবা বঞ্চিত করার কোনো কারণ তার ঘটেনি।

    আমি বললাম : তুমি ঠিকই বলেছ সিফালাস, এর চেয়ে সম্পদের বড় আশীর্বাদ আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু তা হলে ন্যায় সম্পর্কে আমরা কী বলব?” (৩৩০-৩৩১ রিপাবলিক]

    অন্য সব গুণ বাদ দিয়ে ‘ন্যায়ের’ সংজ্ঞা দাবি করার তাৎপর্য কী? এর তিনটি কারণের কথা চিন্তা করা চলে।

    ১. সমস্ত মহৎ গুণের সমন্বিত আধার হচ্ছে ন্যায়। কাজেই নীতি অর্থাৎ মানুষের সামাজিক ব্যবহারের আদর্শ নির্ধারণে ন্যায়ের সংজ্ঞা সর্বপ্রথম আবশ্যক। এবং ন্যায়ের সংজ্ঞাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

    ২. গ্রীকসমাজের যে-বিকাশ খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ শতক পর্যন্ত ঘটেছিল তাতে মানুষের ধ্যানধারণার কতকগুলি মূল সূত্রকে চিহ্নিত করা যায়। সামাজিক, ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রনীতিক এই ধারণাগুলি সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল। এগুলিকে প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত ধারণা বলা চলে। জনসমাজে এবং চিন্তাবিদদের মধ্যে এর যে কোনো প্রতিবাদী অর্থাৎ বিরোধী চিন্তা ছিল না এমন নয়। কিন্তু এরাই প্রধান ছিল। এই প্রধান চিন্তাসমূহের মধ্যে গ্রীক নীতিশাস্ত্রবিদগণ মনে করতেন যে, ন্যায় কোনো বিশ্লিষ্ট কথামাত্র নয়। ন্যায়ের অস্তিত্ব এবং সত্তা কোথাও আছে। ন্যায়ের সে-ভাবমূর্তি মানুষের জীবনের আকর্ষণীয় বা পরিচালক শক্তি হিসাবে কাজ করে। মানুষের সর্বসময়ের চেষ্টা হবে ন্যায়ের সেই অবিচল সত্তাকে অনুধাবন করা, ন্যায়কে জানার চেষ্টা করা, তাকে সংজ্ঞার মধ্যে প্রকাশ করা এবং সেই আদর্শে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবন ক্রমাধিক পরিমাণে পরিচালিত করা। সক্রেটিস এবং প্লেটোর দর্শনের মূল সুর এটি। এ-দর্শন কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত রচনা নয়। এ তাঁদের চিন্তায় প্রচলিত এবং প্রধান সামাজিক দর্শনের প্রতিফলন। মোট কথা : ‘ন্যায়’ একটি সত্তাবান অবিচল অস্তিত্ব। তাকে জানা যায়। তাকে জানার মাধ্যমেই মাত্র মানুষ ক্রমান্বয়ে মহৎ জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।

    ৩. খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪০ থেকে ৪০০ পর্যন্ত এথেন্স এবং স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ চলেছিল। এই যুদ্ধ ইতিহাসে পিলোপনেশীয় যুদ্ধ বলে পরিচিত। এই যুদ্ধে এথেন্স স্পার্টার নিকট পরাজিত হয়। দাস এবং শ্রমজীবী মানুষের শোষণের ভিত্তিতে বৃহৎ সামুদ্রিক এবং উপদ্বীপীয় গ্রীক বসতি ও সাম্রাজ্যের নেতা হিসাবে এতকাল এথেন্সের যে আর্থিক ও রাজনীতিক শৌর্যবীর্য ছিল তা এই যুদ্ধে সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আইন, শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা, সম্মান, রাষ্ট্রীয় ভয়, দায়িত্ববোধ ইত্যাদির ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। গুপ্তহত্যা, বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র, দেশদ্রোহ, দলীয় প্রভুত্বের অদলবদল এথেন্সীয় রাষ্ট্র এবং সমাজের সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সক্রেটিস এবং প্লেটোর ধারণায় : ন্যায়ের সার্বিক সংকট দেখা দেয়। সংকটগ্রস্ত এথেন্সের (তথা সমগ্র গ্রীক রাষ্ট্রব্যবস্থার) সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে সুস্থ করার দায়িত্ব চিন্তাবিদগণ, বিশেষ করে সক্রেটিস এবং প্লেটো গভীরভাবে বোধ করতে থাকেন। তাঁদের বিশ্বাস, পুরাতন প্ৰতিষ্ঠিত নীতি বর্তমানের অরাজকতায় বিপদগ্রস্ত হয়েছে বলেই এথেন্স সর্বদিকে হীনশক্তি হয়ে পড়েছে। পুরনো নীতি বিভিন্ন প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেই সমস্ত মৌলিক নীতিকে যুক্তির ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই মাত্র সমাজে আবার সুস্থতা ফিরিয়ে আনা যাবে। এক কথায় ‘ন্যায়কে’ সমাজের সর্বক্ষেত্রে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সুতরাং সমাজ ও রাষ্ট্রের সমস্যার আলোচনায় ন্যায়ের প্রশ্নই প্রধান এবং ন্যায়ের সংজ্ঞাই সর্বপ্রথমে আবশ্যক।

    ন্যায়ের এই অত্যাবশ্যক সংজ্ঞা-নির্ধারণের প্রয়াসে অর্থাৎ ন্যায়ের অন্বেষণেই রাষ্ট্রীয় সংগঠনের প্রশ্ন এসেছে। সক্রেটিসের যুক্তির ধারাটি এরূপ : ন্যায় অবশ্যই সূক্ষ্ম ব্যাপার। চোখের শক্তিপরীক্ষার মতো ন্যায়কে বৃহৎ অবয়বে প্রত্যক্ষ করতে পারলে পরবর্তীকালে তাকে ব্যক্তির ক্ষুদ্র অবয়বে প্রত্যক্ষ করা সহজতর হবে। রাষ্ট্র হচ্ছে ব্যক্তির চেয়ে বৃহৎ। রাষ্ট্র হচ্ছে ব্যক্তিরই বৃহদাকার সংগঠন। সুতরাং রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়কে আবিষ্কার করতে সক্ষম হলে ব্যক্তির মধ্যে তাকে নির্দিষ্ট করা সহজে সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তব রাষ্ট্রে ন্যায়কে পাওয়া যেতে পারে না। কেননা বাস্তব রাষ্ট্রে অন্যায়ের প্রতিপত্তি। অন্যায়ের শাসন। ন্যায়কে পাওয়া যাবে আদর্শ রাষ্ট্রে; উত্তম রাষ্ট্রে। সুতরাং উত্তম রাষ্ট্র বাস্তবে না থাক, কল্পনায় গঠন করে তার মধ্যে ন্যায়কে অন্বেষণ করা আবশ্যক। এই পর্যায়ে ‘রিপাবলিক’ সংলাপে আদর্শ রাষ্ট্র রচনা শুরু হয়। পরবর্তী পর্যায়ে সক্রেটিস এই আদর্শ রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনাক্রমে বাস্তব রাষ্ট্রের ত্রুটির স্বরূপ নির্ধারণ করেন। আদর্শ রাষ্ট্রের মধ্যেই ন্যায়ের মূলনীতি (যার যা করণীয় তা সম্পাদন করাই হচ্ছে ন্যায়) সক্রেটিস নির্ধারণ করেন এবং এই নীতির ভিত্তিতে শুধু রাষ্ট্র নয়, ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য স্থির করেন এবং পরিশেষে ন্যায়বান ব্যক্তিই যে সুখী ব্যক্তি এবং অন্যায়কারী স্বৈরাচারী ব্যক্তি বা শাসক অসুখী তা প্রমাণ করেন। ব্যক্তির সামগ্রিক শিক্ষা, শাসকের গুণ-নির্ধারণ, পরিবার এবং সম্পত্তির ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ব্যক্তিগত স্বত্বের বিলোপ, মানুষের জ্ঞানের প্রকারভেদ প্রভৃতি অন্যান্য সব প্রশ্নই সংলাপের উল্লিখিত মূল প্রশ্নের সমাধান-নির্ধারণে প্রসঙ্গক্রমে এসেছে। ‘রিপাবলিক’ বিপুলাকার সংলাপগ্রন্থ। কিন্তু এর কোনো প্রশ্ন বা আলোচনাই অপর প্রশ্ন বা আলোচনা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সূত্রহীন নয়। বস্তুত, একথা যথার্থ যে, ‘রিপাবলিকের’ মতো যুক্তিপরম্পরায় ঘনিষ্ঠভাবে গ্রথিত এবং সুসমন্বিত গ্রন্থ খুব কমই আছে।[১]

    ১. জি. এইচ. স্যাবাইন : হিস্টরী অব পলিটিক্যাল থিওরী : পূঃ ৬৩

    সংলাপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিগণ

    সক্রেটিস : সূত্রকার

    গ্লকন ও অ্যাডিম্যান্টাস : প্লেটোর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদ্বয়

    সিফালাস

    থ্র্যাসিমেকাস

    ক্লিটোফন

    পলিমারকাস

    এবং

    নির্বাক দর্শক ও শ্রোতৃবৃন্দ

    দৃশ্য

    পাইরিউস বন্দরে সিফালাসের গৃহ। সম্পূর্ণ সংলাপটি ঘটেছে একদিন পূর্বে। তাতে প্রধান অংশগ্রহণকারী ছিলেন সক্রেটিস, টিমিউস, হারমোক্রাটিস, ক্রিটিয়াস এবং অপর এক ব্যক্তি যাঁর নাম জানা যায়নি। এঁদের নিকট সক্রেটিস আজ সমগ্র কাহিনীটির বর্ণনা দিচ্ছেন

    ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার
    Next Article প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Our Picks

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }