Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পুনর্যাত্রা – সমরেশ বসু

    সমরেশ বসু এক পাতা গল্প180 Mins Read0
    ⤷

    ১. শেষ সিদ্ধান্ত

    একসপেলড!

    অলক এই শেষ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। বাকি ছ’জন হাত তুলেছিল। সাত জন এক দিকে। প্রায় অর্ধবৃত্তাকারে বসে ছিল। কয়েক হাত দূরে সকলের মুখোমুখি তাপস। ও চমকায়নি, অবাক হয়নি। চোখের সামনে একটা হাতে তৈরি কাগজের অষ্টাদশ শতাব্দীর সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি ভাসছিল। কিন্তু অন্যমনস্ক ছিল না। ছোট ঘর। দরজা জানালা সব বন্ধ। সিমেন্টের সাধারণ মেঝের ওপর একটা মাদুরের ওপর সবাই বসে ছিল। মাঝখানে একটা হ্যারিকেন জ্বলছিল। সাতজনের ছায়া দেওয়ালের এক দিকে। বড় বড় ছায়ায়, ওদের পিছনটা অন্ধকার হয়েছিল। মুখোমুখি তাপসের ছায়াটা বিপরীত দিকে। বন্ধ ঘর। গরমে সবাই কম-বেশি ঘামছিল।

    অঞ্চল, পূর্ব চব্বিশ পরগনার মহকুমা শহরের এক প্রান্ত। ইস্কুলমাস্টার মহিমদার বাড়ি। মহিম নস্কর। পার্টির অত্যন্ত বিশ্বস্ত ব্যক্তি। বউদিও। বউদিও একটি প্রাইমারি ইস্কুলের শিক্ষিকা। ইটের দেওয়াল, সিমেন্টের মেঝে, মাথায় টালি। বাড়ির চারপাশে ফণীমনসার বেড়া। একটা ঝাড়ালো আম গাছ। বছর খানেক বয়সের কিছু নারকেল সুপুরির চারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সীমানার এদিকে-ওদিকে। লাউ কুমড়োর মাচা। টালির চালে বঁধুলের লতানো ঝাড়। আশেপাশে ছড়ানো ছিটানো এ রকমই আরও কয়েকটি বাড়ি। গরিব শান্তিপ্রিয় মধ্যবিত্ত গৃহস্থদের নতুন পাড়া। সকলেই আনে, নেয়, খায়, কোনও ঝামেলায় থাকে না। অতএব, এ পাড়ার দিকে কারোরই তেমন নজর নেই। পুলিশেরও না। মহিমদার সঙ্গে অতীতে কখনও কোনও রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ ছিল না। শান্তিপ্রিয় সাধারণ ইস্কুলমাস্টার ছাড়া তাঁর আর কোনও পরিচয় নেই। অথচ তাঁর বড় ছেলে মানিকের রাজনীতির একজন সমর্থক হয়ে উঠেছেন। মানিক বাংলায় অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেছে। এম এ পড়তে গিয়েই এই গুপ্ত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ। লেখাপড়ার সেইখানেই ইতি। কারণ, এ লেখাপড়া তার দলীয় রাজনৈতিক মতাদর্শে মূল্যহীন। মহিমদা আপত্তি করেননি। বরং ছেলের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস। এই মধ্যবয়সে তাই তিনি ছেলের একজন সমর্থক। বউদিও। ছেলেকে নিয়ে তাঁদের একটা গর্বও আছে। তাঁরা দলের সদস্য নন। কিন্তু অনিবার্যভাবেই দলের সমর্থক। বর্তমানের এই পচা ধসা বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তাঁদেরও তীব্র বিদ্বেষ। কিন্তু চাকরি চালিয়ে যেতেই হচ্ছে। মহিমাকে তাঁর নিজের মতোই থাকতে হবে। তা না হলে এ গোপন আশ্ৰয়টা ভেঙে যাবে।

    অতএব, গোপন যোগাযোগ, আর প্রয়োজনে পার্টি মিটিং-এর পক্ষে এ বাড়ি সবথেকে নিরাপদ। আদর্শ জায়গা। বিশেষ করে, এই দুঃসময়ে। পার্টি যখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। সেন্ট্রাল কমিটির সঙ্গে জেলা কমিটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। জেলা কমিটিগুলোর সঙ্গে অধিকাংশ লোকাল ইউনিটগুলিও বিচ্ছিন্ন। যেমন এই ইউনিট। এখানকার ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগকারী দু জন কুরিয়রের মধ্যে এক জন পুলিশের হাতে নিহত হয়েছে। আর এক জন নিখোঁজ। নেতারা এবং অনেক সদস্য ধরা পড়েছে। কোনও কোনও নেতা আর অসংখ্য কমরেড খুন হয়েছে। কেন্দ্রের বিভিন্ন গুপ্তচর সংস্থা আর পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে গোটা দেশটা যেন একটা উকুন ভরতি ঘন ঠাসা চুলের মাথা। সেই মাথার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত চিরুনি চালিয়ে চলেছে। ধরা পড়লেই টিপে মারা। কোথাও কোথাও এনকাউন্টারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পার্টি হেরে যাচ্ছে। মূল সংগঠন বলতে কিছু নেই। সব তছনছ হয়ে ভেঙে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিন্নভিন্ন। বন্ধুর ছদ্মবেশে গুপ্তচরদের চেনা যায় না। অতএব, নতুন কোনও মেম্বারশিপের প্রশ্ন নেই। ভাঙাচোরা সেলগুলো এখন এক-একটা বিচ্ছিন্ন গ্রুপ মাত্র। পার্টির শেষ নির্দেশ ছিল, মৌল নীতি অনুযায়ী, গ্রুপগুলো একত্রে বসে যখন যা সিদ্ধান্ত নেবে, তা-ই কার্যকরী করবে। এখন থেকে গ্রুপগুলোই একটা পূর্ণ ইউনিটের এবং পার্টির ভূমিকা নেবে।

    গ্রুপের নেতা নির্বাচনের কোনও স্পষ্ট নির্দেশ না থাকলেও আপাতত এ গ্রুপের নেতা অলক। গায়ের জোরে না। অলকের নেতৃত্ব সবাই মেনে নিয়েছে। মানিক, মনীষা আর রুকনুদ্দিন ছাড়া কেউ স্থানীয় নয়। সকলেই কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের। কিন্তু এই অঞ্চলের বিভিন্ন গোপন আশ্রয়ে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যোগাযোগ রাখে, মিটিং করে, সিদ্ধান্ত নেয়। প্রয়োজনে কারোকে অঞ্চলের বাইরে যেতে হলে গ্রুপের সম্মতি নিতে হয়।

    বাইরে থেকে বাড়িটির চেহারা একটি নিরীহ গৃহস্থের। এবং বস্তুত তা-ই। রাত্রি মাত্র আটটা। মহিমা বাইরের বাঁধানো রকে দুই ছোট ছেলেমেয়েকে পড়াচ্ছেন। বউদি রান্না করছেন। ভিতরে দুটি ঘরের একটিতে মিটিং চলছিল। মহিমদার পড়ানো, বউদির রান্না, পড়ুয়া ভাইবোনের পড়া, এখন সবটাই ছলনা। সকলেই চারদিকে পাহারা দিচ্ছে, নজর রাখছে।

    আজকের মিটিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তেজনা তীব্র। অ্যাজেন্ডা মাত্র একটা। পার্টির নির্দেশ অমান্য করার বিচার। নির্দেশ অমান্য করেছে তাপস। অতএব ও একলা এক দিকে সকলের মুখোমুখি। বাকিরা সবাই বিপরীত দিকে, প্রায় অর্ধবৃত্তাকারে ওর মুখোমুখি। আলোচনা করার কিছু ছিল না। পার্টির নির্ধারিত নীতি নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলাও অপ্রয়োজনীয়। কেবল কিছু জিজ্ঞাসাবাদ। কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না। জিজ্ঞাসা একটি।

    তাপস এসেছিল সকলের পরে। ইচ্ছা করেই এসেছিল। জানত, আজকের গ্রুপ মিট করার একমাত্র লক্ষ্য ও। সকলের শেষে আসার উদ্দেশ্য ছিল, গ্রুপ যদি ওর সম্পর্কে আগে কিছু কথাবার্তা নিজেদের মধ্যে বলে নিতে চায়, সেই সময় দেওয়া। কিন্তু ও ঘরে ঢুকে দেখেছিল, সবাই চুপচাপ এক দিকে বসে আছে। কেউ কোনও কথা বলছিল না। সকলেরই চোখ ছিল দরজার দিকে। তাপস ঢুকেছিল। মহিমা বাইরে থেকে দরজার শিকলটা টেনে দিয়েছিলেন। আজকের জন্য এটা কোনও বিশেষ ব্যবস্থা না। গ্রুপ মিট করতে বসলেই দরজার শিকল টেনে দেওয়া হয়। মিটিং শেষে দরজার টোকা দিলেই শিকল খুলে দেওয়া হয়। পিছন দিকেও একটা দরজায় আছে। সেটা ভিতর থেকে বন্ধ।

    তাপসের কাঁধে সাইড ব্যাগ। ঘরে ঢুকে দেখেছিল, ওর ওপর সকলের চোখ। তীক্ষ্ণ জ্বলন্ত দৃষ্টি সকলের চোখে। সাতটি শক্ত মুখ। গ্রুপ মিটিং-এর এই প্রথম নতুন চেহারা। তাপস মাদুরের ওপর পা দিয়েই বুঝেছিল, আজ ওর সকলের পাশে বসার দিন না। ও মুখোমুখি বসেছিল। ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে রেখেছিল। গম্ভীর মুখে সকলের দিকেই নির্বিকার চোখে দেখেছিল। দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভয়ের কোনও চিহ্ন ছিল না ওর মুখে। যে কোনও চরম ব্যবস্থার জন্য ও মনে মনে প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। অলক প্রথম মুখ খুলেছিল। ওর মাথায় অনেক দিনের আকাটা চুল। মুখে গোঁফ দাড়ি। যথাসম্ভব নিচু স্বরে কথা বলা। নিয়ম। অলক নিচু তীক্ষ্ণ স্বরে বলেছিল, ওয়াইপারটা।

    তাপস ব্যাগের ভিতর হাত ঢুকিয়েছিল। বের করেছিল কোল্ট পয়েন্ট থ্রি এইটটা। গ্রুপের সবথেকে দামি অস্ত্র। হাত বাড়িয়ে অলকের সামনে মাদুরের ওপর রেখেছিল। অলকের পাশে কল্যাণ। ওরও মাথার চুল বড়। ভরাট মুখে একজোড়া চৈনিক গোঁফ। কল্যাণ রিভলবারটা নিজের কাছে টেনে নিয়েছিল। আনলক করে দেখে নিয়েছিল, বুলেট লোড করা আছে। সব বুলেটগুলোই ছিল। তাপস ব্যাগের ভিতর থেকে টিফিন বক্সের মতো একটা স্টিলের বক্সও এগিয়ে দিয়েছিল। ওয়াইপার–অর্থাৎ, রিভলবারটা প্রথম চেয়ে নেওয়ার অর্থই হল তাপসের কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে নেওয়া। বক্সটার মধ্যে কিছু আলাদা বুলেট ছিল। কল্যাণ বক্সটার ঢাকনা খুলে দেখে নিয়েছিল। রিভলবারের পাশে বক্সটা রেখেছিল। নির্দেশ অনুযায়ী পার্টির সমস্ত গোপন দলিলপত্র নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। অতএব, তাপসের কাছে আর কিছুই ছিল না।

    কল্যাণের পাশে মনীষা বসে ছিল। (মনীষা এখন ওর বন্ধুদের সঙ্গে শহরের বুকে সিনেমা হলে ইভনিং শো দেখছে। বাড়িতে ওর মা তা-ই জানেন। ওর বাবা এ শহরের সব থেকে বড় আর ব্যস্ত ডাক্তার। তিনি এখন তাঁর চেম্বারে।) মনীষার পাশে মানিক। গ্রুপের সবথেকে কমবয়সি ছেলে। মুখে কচি দূর্বা ঘাসের মতো পাতলা গোঁফ দাড়ি গজিয়েছে। মানিকের পাশে পশুপতি। গোঁফ দাড়ি কামানো মুখ। মাঝারি লম্বা চুল। পশুপতির পাশে রুকুন। পুরো নাম রুকনুদ্দিন। ওর মাথায়ও লম্বা চুল। মুখে গোঁফ দাড়ি। রুকুনের পাশে অজয়। গোঁফ দাড়ি কামানো মুখ। মাথার চুল ছোট করে কাটা। বয়স সকলের একুশ থেকে ছাব্বিশ-সাতাশের মধ্যে।

    কারোর গায়ে ময়লা আধ ময়লা ট্রাউজার শার্ট। কারোর পায়জামা পাঞ্জাবি। মনীষা অবশ্যিই শাড়ি আর জামা পরেছিল। সিনেমা দেখতে যেতে হলে যতটা সাজগোজ করা উচিত, করেছিল। বাসন্তী রঙের লাল পাড় শাড়ি, লাল জামা। মাথায় এক বেণী করা ছিল। বাঁ হাতে ঘড়ি। কোনও অলংকার বা প্রসাধনের চিহ্ন ছিল না। এমনিতেও থাকত না। একমাত্র তাপসের পোশাক আধময়লা ধুতির ওপরে, কয়েক দিনের ব্যবহৃত গেরুয়া পাঞ্জাবি। মাথার চুল খুব বড় নয়। গোঁফ দাড়ি ছোট করে ছাঁটা।

    অলক আর কল্যাণ কলকাতা থেকে এসেছে। পশুপতি বরানগর থেকে। অজয় ইছাপুর। তাপস কলকাতা থেকে পঁয়ত্রিশ মাইল দূরের হলেও আসলে কলকাতা থেকেই এখানে এসেছিল। কল্যাণ, অলক, ও আর মনোজ একসঙ্গে এক কলেজে পড়েছিল। এক সঙ্গেই কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করেছিল। বিষয় ছিল ইংরেজি। তারপরেও তাপস সংস্কৃত নিয়ে পড়া শুরু করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, বিশেষ করে বেদ উপনিষদ ও পুরাণ থেকে ভারতীয় ইতিহাস চর্চা। সেই সঙ্গে অবিশ্যিই সংস্কৃত কাব্য ও সাহিত্য। সময়টা উনসত্তর সালের শুরু। সেই সময়েই মননজের কাছে রাজনীতির দীক্ষা।

    মনোজ কলেজে থাকতেই ছাত্র আন্দোলনের নেতা ছিল। তারপরে এই পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ। মনোজ এ অঞ্চলের ছেলে। জেলা কমিটি থেকে ভারপ্রাপ্ত, এ অঞ্চলে পার্টির প্রথম সংগঠক এবং নেতা। অলক, কল্যাণ আর তাপসকে ও-ই এ অঞ্চলে নিয়ে এসেছিল। পশুপতি আর অজয় এসেছিল ওদের লোকাল পার্টির নির্দেশে। আন্দোলনের ক্ষেত্র ছিল আশেপাশের গ্রামে। মনোজের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামগুলোর কৃষকদের মধ্যে একটা ছোটখাটো মিলিট্যান্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছিল। তাপসরা সবাই গ্রামেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। মাঝে মধ্যে শহরে আসতে হত। কলকাতা এবং জেলার অন্যান্য অঞ্চলের পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ আর নির্দেশের জন্য। যোগাযোগের জায়গা ছিল দুটো। মহিমদার এই বাড়ি আর মনীষাদের বাড়ি। মননজের বোন দীপা আর মনীষা স্থানীয় কলেজে পড়ত। মনীষাকে পার্টিতে এনেছিল দীপা।

    তাপস এখানে আসার আগেই শহর থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরের একটি পুলিশ আউটপোস্ট আক্রমণ করে, দুটি বন্দুক সংগ্রহ হয়েছিল। মারা গিয়েছিল এক জন সেপাই। বাকিরা বোমায় আহত। জমাদার পালাতে পেরেছিল। এ অঞ্চলে সেই প্রথম সাড়া। পাইপগান ছিল তিনটি। কোল্ট পয়েন্ট থ্রি এইট এসেছিল তাপস আসার পরে। ছুরি বল্লম, দা কাটারি ছিল গ্রামের নিজস্ব সংগ্রহ। লোকাল ইউনিটের আওতায় নদীর এপার-ওপার মিলিয়ে প্রায় এক ডজন গ্রাম ছিল। প্রথম জোতদার খতম করা হয় নদীর ওপারে। মনোজই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ওপারে খতম করে এপারে এসে গা ঢাকা দেওয়া। এ অঞ্চলে সেই প্রথম জোতদার নিধন। জোতদার বা মহাজন খতমের মাধ্যমে জনজমায়েত, লক্ষ্য ছিল এটাই। প্রথম খতমে জনজমায়েত হয়নি, কিন্তু প্রবল সাড়া পড়ে গিয়েছিল। মনোজের সিদ্ধান্ত কার্যকরী হয়েছিল। পুলিশ গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নদীর ওপারে। তাদের একটা সন্দেহ হয়েছিল, নদীর ওপারেই অ্যাকশন করে দলের লোকেরা ভারতের সীমানা পেরিয়ে পাশের দেশে গিয়ে আত্মগোপন করছে। কিন্তু গুপ্তচরের দল ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। এপারে, ওপারে। শহরের মধ্যে, এ পারের গ্রামে ও গঞ্জে।

    জনজমায়েত না হলেও খতমের প্রথম ফলশ্রুতি, পুলিশ আর গুপ্তচরদের আবির্ভাব ঘটেছিল অনিবার্যভাবেই। গ্রামে অচেনা মুখ দেখলেই বুঝতে হবে গুপ্তচর। লক্ষ রাখার বিষয় ছিল, গ্রামের কারা শহরে, কোথায় যায়। কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। গুপ্তচর গ্রামের মধ্যেও ছিল। ওপারের জোতদার খতমের দু সপ্তাহ পরে এপারের গ্রামে একজন কুখ্যাত সুদখোর মহাজনকে খতম করা হয়েছিল। ইউনিট সরে এসেছিল শহরের আশেপাশে। জনজমায়েত হয়নি। কিন্তু একটা প্রবল আলোড়ন আর উৎসাহের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল বিরাট এলাকা জুড়ে। সেই সঙ্গে অবিশ্যিই দ্বিধা এবং ত্রাস। গ্রামে ও শহরে, দু জায়গাতেই।

    শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার পড়েছিল। সাদা কাগজে লাল টকটকে অক্ষরের পোস্টার। আগুনের শিখা। সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন।.. জনশত্রুদের খতমে এগিয়ে আসুন।’…চীনের চ্যায়ারম্যান আমাদের চ্যায়ারম্যান।’…

    নদীটা অনেকখানি সহায় হয়েছিল। এপারে কাজ সেরে, ওপারে পালিয়ে যাওয়া। ওপারে কাজ সেরে এপারে পালিয়ে আসা। একাত্তরের শেষাশেষি পর্যন্ত টোটাল তিন জন জোতদার এক জন মহাজন এক জন সেপাই খতম হয়েছিল। ওপারের দ্বিতীয় জোতদার খতমের খণ্ডযুদ্ধের প্রথম শহিদ মনোজ আর রুকুনের বাবা আবদুল। পুলিশ তখনই সমস্ত গ্রামগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। সাধারণ কৃষকদের ওপর শুরু হয়েছিল অত্যাচার। মিলিট্যান্ট গ্রুপের পাঁচ জন পুলিশের হাতে খুন হয়েছিল। তার মধ্যে জগত মাহাতো৷ যার নেতৃত্বে তৃতীয় জোতদার খতম হয়েছিল। জগতের বউকে কতজন পুলিশ ধর্ষণ করেছিল, হিসাব ছিল না। তারপর খুন। তখনই খবর এসেছিল, একজন কুরিয়র ধরা পড়ে খুন হয়েছে। সেই প্রথম জেলা কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার শুরু। এ বারের (বাহাত্তরের) নির্বাচনের মুখে, আর এক জন কুরিয়র নিখোঁজ। ধরে নেওয়া হয়েছে, সেও ধরা পড়েছে। মনীষাদের বাড়ি আর মহিমদের বাড়ি, কিছুকাল যাওয়া আসা একেবারে বন্ধ রাখা হয়েছিল।

    খতমের মাধ্যমে জনজমায়েত সার্থক হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তার ফলশ্রুতি, পুলিশ ও দালালদের আবির্ভাব হয়েছিল। হলেও, তাদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল পুরোপুরি গড়ে ওঠবার আগেই। গ্রামে গ্রামে উলটো বাতাস বইতে আরম্ভ করেছিল। জনজমায়েতে শাসক শ্রেণীর আগমন ঘটলেই থার্ড স্টেপ। গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে গেরিলা যুদ্ধ। স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল সৃষ্টি।

    শ্ৰেণী শত্রু বলতে যাদের প্রথমে বেছে নেওয়া হয়েছিল, নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করা গিয়েছিল। শহরের সমর্থনের প্রতি আদৌ আস্থা রাখা যায়নি। অথচ গ্রামগুলোকে যথাযথ সংগঠিত করে তোলা যায়নি৷ কেন্দ্র এবং সর্বস্তরের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, দালাল বাহিনী, আর সবথেকে মারাত্মক ছদ্মবেশী গুপ্তচরদল চারদিক থেকে ঘিরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

    তাপসের প্রথম ধারণা: মূল নীতি হিসাবে যা ভাবা হয়েছিল, খতমের সূত্র ধরে গ্রামের গরিব ভূমিহীন কৃষকরাই নেতৃত্ব নিয়ে লড়াইয়ে নেমে পড়বে, কার্যত তা হয়নি। সম্ভবত এর একটা উলটো মনস্তাত্ত্বিক দিক ছিল। নেতৃত্ব দেবে শহরের কমরেডরাই, তাদের সাহসই কৃষকদের প্রাণে সঞ্চারিত হবে এবং তারা লড়বে। শত্রুর বিশাল শক্তির কথা ভেবে চিরকাল বসে থাকা যায় না। ঠিক কথা। কিন্তু নিজেদের শক্তি সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা থাকা উচিত ছিল। নিজেদের শক্তি, এই অর্থে, কিছু অস্ত্র না। আসলে গ্রামের সংগ্রামী কৃষক বাহিনী। যেহেতু কৃষকদের মধ্যে, শত্রুর প্রতি ঘৃণা ক্রোধ বর্তমান। সেই হেতুই তারা, একটা সুযোগ ও সংকেত পেলেই লড়াইয়ে নেমে পড়বে, বাস্তবে তা ঘটে না। এ ক্ষেত্রে দাহ্য পদার্থ থাকলেই জ্বলে উঠবে, এ রকম নিশ্চিত হওয়াটাও দেখা গেল অবৈজ্ঞানিক। যার অনিবার্য ফল, গ্রামের লোকেরা ক্রমাগত পুলিশের হাতে মার খেয়ে তাপসদের তাড়া করল। গ্রাম ছাড়া করল। তাপসরা ছড়িয়ে পড়ল শহরের মধ্যে।

    এই অবস্থার মধ্যেও পার্টির শেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লোকাল ইউনিট গ্রুপ হিসাবে কাজ করে যেতে লাগল। তাপসের মনের প্রশ্নগুলো মনেই থাকল। পরিস্থিতি আলোচনা করার মতো মনের অবস্থা কারোরই ছিল না। বরং পুলিশের অত্যাচারে, বহু কমরেডের খুনের বদলা নেবার জন্য খতম অভিযান চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত বহাল রইল। আর এই সময় থেকেই ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাকশনের দায়িত্ব দেওয়া হল। খতম করবে একজন। বাকিরা চারপাশে লুকিয়ে থাকবে। অবস্থা বুঝলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। কাকে খতম করা হবে, গ্রুপের বৈঠকে আগেই তা ঠিক করে নেওয়া হত।

    এই পরবর্তী অভিযানে প্রথম খতম করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল, বারো মাইল দূরের এক বি ডি ও-কে। দায়িত্ব ছিল কল্যাণের। বাকিরা কাছেপিঠে ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু ভুলক্রমে মারা পড়েছিল বি ডি ও অফিসের একজন সাধারণ কেরানি। দু সপ্তাহ পরে কলকাতা থেকে এ শহরে ফেরার পথে এই রুটের একজন প্রাইভেট বাসের মালিককে খতম করে তাপস। বৈঠকে এই খতমের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করবে ভেবেও করতে পারেনি। লোকটির একটি বাস ছিল। খতম করা হয়েছিল শহরের বাইরে, বাস থেকে নামিয়ে। তাপস নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেরেছিল। কিন্তু গ্রুপকে সে কথা বলেনি। পরবর্তী বৈঠকে ও এস ডি ও-কে খতমের প্রস্তাব তুলেছিল। প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। অলকের বক্তব্য ছিল, এস ডি ও-কে মারলে এ-শহর থেকে চিরদিনের জন্য সরে যেতে হবে। এবং পরিস্থিতিও অনুকূল ছিল না। সবাই অলককে সমর্থন করেছিল। পরিবর্তে বেছে নেওয়া হল একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারকে। ডাক্তারটি নতুন এসে বসেছিল শহরের বড় রাস্তার ওপর একটি দোকান ঘরের স্বত্ব কিনে। সন্দেহ করা হয়েছিল, সে গুপ্তচর। সে রকম একটা খবরও ছিল। অলক তাকে খতম করে। পরে অবিশ্যি জানা যায়, লোকটির বাড়ি ছিল সাত মাইল দূরে। কলকাতার জি পি ও-র এক জন রিটায়ার্ড কর্মচারী। তাপস পার্টির মূল নীতি নিয়ে আলোচনা তুলেছিল। স্পষ্টই বলেছিল, ভুল ব্যক্তিদের খতম করা হচ্ছে। বলেছিল, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আবার গ্রামে ফিরে গিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করার সুযোগ নেওয়া উচিত।

    অলক প্রতিকূল পরিবেশের কথা তুলে আপত্তি করেছিল। খতমের বিষয়ে তাপসের কথার তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। দু-একটা ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু খতমের নীতি থেকে বিচ্যুত হওয়া কোনও রকমেই চলবে না। কেন না, সেটাই পার্টির নির্দেশ। শত্রুকে এভাবেই ভীত সন্ত্রস্ত প্রাণের ভয়ে অস্থির করে রাখতে হবে। জনসাধারণের কাছে পার্টির অস্তিত্বকে এ ভাবেই প্রমাণ করে যেতে হবে। এবং মনোবলকে জিইয়ে রাখতে হবে।

    গ্রুপ অলককে সমর্থন করেছিল। তারপরই কোর্টের এক জন হাবিলদারকে খতমের প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। লোকটি শহরের অন্য এক প্রান্তের অধিবাসী। ছাপোষা গৃহস্থ। মাইনের সঙ্গে নিয়মমাফিক পাওনা-দস্তুরি বা কিছু ঘুষ উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত। খতমের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাপসকে। তাপস ওর দ্বিধা অনিচ্ছা বা হাবিলদারের সংসারের কথা বৈঠকে প্রকাশ করতে পারেনি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হাবিলদারকে মারেনি।

    .

    একসপেলড!

    অলক এই শেষ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। অনেকটাই যেন নিয়তি নির্দেশিত দৈব ঘোষণার মতো। বাকি ছজন তার সমর্থনে হাত তুলেছিল। তাপস সকলের শক্ত ঘাম চকচকে মুখের দিকে এক বার তাকিয়ে দেখেছিল। ও নিজেও ঘামছিল। শেষ সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে আলোচনা করার তেমন কিছুই ছিল না। সমস্ত ব্যাপারটাই ছিল স্পষ্ট আর জানাজানি। ওর চোখের সামনে পলকের জন্য একটি প্রাচীন সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি আবার ভেসে উঠেছিল। এবং ও এক মুহূর্ত বেশি তাকিয়েছিল মনীষার মুখের দিকে। কেউ ওর দিক থেকে বিদ্বেষের চোখ নামায়নি। মনীষা চোখে চোখ রাখতে পারেনি। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

    অলক প্রথম বলেছিল, আমার মনে হয়, তাপসকে জিজ্ঞেস করার কিছু নেই। পার্টির নীতি নিয়ে আলোচনা করারও কিছু নেই। তাপস পার্টির নীতিতে বিশ্বাসী নয়, এ কথা আমরা আগেই জেনেছি। তবু জিজ্ঞেস করছি, কিছু বলার আছে?

    তাপস সকলের পাথরের মতো শক্ত আর জ্বলন্ত স্থির দৃষ্টি চোখের দিকে এক বার দেখেছিল। বলেছিল, আমি পার্টির মৌল নীতিতে বিশ্বাসী।

    মিথ্যা কথা। কল্যাণ বলেছিল, আমরা মূল নীতি থেকে বিচ্যুত হইনি। পার্টির নির্দেশেই আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ব্যক্তিগত মতামতের কোনও মূল্য নেই। সেটা পার্টি-নীতিরই বিরোধিতা। ঘটনা যা ঘটেছে, তাতে প্রমাণ হয়ে গেছে, ডেলিবারেটলি পার্টির সিদ্ধান্ত অমান্য করা হয়েছে। এটা বিশ্বাসঘাতকতা। বিশ্বাসঘাতকের জায়গা পার্টিতে নেই, থাকতে পারে না।

    তাপস চুপ করেছিল। তাকিয়েছিল সকলের মুখের দিকে।

    হ্যারিকেনের লালচে আলোয়, পিছনের বড় বড় ছায়ার এপারে, সমস্ত মুখগুলোকে এক রকম দেখাচ্ছিল। চকচকে শক্ত, পাথরের মুখ। জ্বলন্ত চোখ। কেউ একটা কথাও বলছিল না। যেন সকলের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অলকেরও। প্রায় এক মিনিট পরে অলক তীক্ষ্ণ চাপা স্বরে উচ্চারণ করেছিল, একসপেলড।

    সকলেই হাত তুলেছিল। হাতের ছায়াগুলো পিছনের দলা পাকানো ছায়ার মাথার ওপরে যেন বেয়নেটের মতো খোঁচা হয়ে উঠেছিল। তাপস তাকিয়েছিল সকলের দিকে। বুঝতে পারছিল, সকলেই অনুমান করেছিল, সম্ভবত ও কিছু বলবে। কিন্তু ও জানত, বলার কিছুই ছিল না। পার্টি এখন ওর নিয়তির ভূমিকা নিয়েছে। গ্রুপ এখানে মিট করার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কি না, বা কোনও আলোচনা করেছিল কি না, ও জানে না। অলক ওর নাম বলতে গিয়ে, কমরেড উচ্চারণ করেনি। ওটাই সংকেত হিসাবে যথেষ্ট।

    আমি মনে করি, আমাদের আজকের বৈঠক এখানেই শেষ হওয়া উচিত। অলক বলেছিল, ‘এ বাড়িতে আর কখনও বৈঠক করা বোধ হয় সম্ভব হবে না, কারণ আমরা ধরে নিতে পারি, আজ থেকে এ জায়গা আর নিরাপদ নয়।’

    তাপস অলকের দিকে তাকিয়েছিল। কথাগুলো তাপসের উদ্দেশেই ও বলেছিল। ইঙ্গিতটাও স্পষ্ট ছিল। বিশ্বাসঘাতক তাপস এর পরে এ গুপ্ত আস্তানার কথা পুলিশকে জানিয়ে দিতে পারে। তাপস জানত, প্রতিবাদ অর্থহীন হত। সকলেই তখন হাত নামিয়ে নিয়েছিল।

    ওয়াইপ আউট। কল্যাণের স্বরে চাপা গর্জন শোনা গিয়েছিল। ওর হাত ঠেকেছিল পয়েন্ট থ্রি এইটে। ও অলকের দিকে তাকিয়েছিল।

    সবাই অলকের দিকে তাকিয়েছিল। সকলের উত্তেজনা তখন চরমে। তাকিয়েছিল তাপসের দিকে। ওয়াইপ আউট মানে খতম। তাপসকে। তাপস মনে মনে প্রস্তুত হয়ে এলেও, গলার কাছে ওর নিশ্বাস ঠেকেছিল। কিন্তু এক বার মাত্র মনীষার দিকে দেখে, মুখ নামিয়ে রেখেছিল। কারোর দিকে না তাকিয়ে অপেক্ষা করেছিল।

    এই ডিসিশন আমরা এখানে নেব না। অলক বলেছিল, ‘হাতে কিছু সময় রাখছি।’ ও সকলের দিকে তাকিয়েছিল।

    মনীষা বলে উঠেছিল, রেনিগেড!

    তাপস চোখ তুলে তাকায়নি। কিন্তু মনীষার স্বরে বিদ্বেষ এবং ঘৃণার থেকে ক্ষোভের ঝাঁজ ফুটে উঠেছিল। তাপস মনে মনে অবাক হয়েছিল। মনীষার হঠাৎ দলত্যাগী’র কথা মনে এসেছিল কেন? দলত্যাগ ও করেনি, তার কোনও প্রশ্নও ছিল না। মনীষার কি মনে হয়েছিল, তাপস ওদের ত্যাগ করে যেতে চাইছে?

    অলক উঠে দাঁড়িয়েছিল। তার সঙ্গে সকলেই। তাপসও। অলক বলেছিল, মনীষা, তোমার যদি তাপসের সঙ্গে এর পরে কোনও কথা থাকে, বলে নিতে পারো। আমরা বাইরে যাচ্ছি।

    সকলেই মনীষার দিকে তাকিয়েছিল। তাপস চকিতে এক বার অলকের মুখের দিকে দেখেছিল। তাপস আর মনীষার সম্পর্কের কথা গ্রুপের সবাই জানত। তাপস এ অঞ্চলে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই মনীষার সঙ্গে ওর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মনোজও জানত, ঠাট্টা করে বলত, ‘পার্টি করতে এসে প্রেমে পড়ে গেলি তাপস?’ তার বেশি কিছু না।

    মনোজের বোন দীপাও ঘটনাটা জানত। দীপা এখন জেলে। বাইরে থাকলে কী বলত কে জানে। কিন্তু দীপা মনীষাকে তাপসের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতে সাহায্য করত। কখনও কখনও তাপসকে ঠাট্টা করে ‘কমরেড জামাই’ বলত। তাপস বাইরে থেকে এসেছিল, মনীষা স্থানীয় মেয়ে। দীপার ‘জামাই’ সম্বোধনের ঠাট্টাটা সেইজন্যই ছিল। অবিশ্যি মনীষার সামনে ছাড়া বলত না।

    অলক, কল্যাণ, কলকাতায় ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রাবস্থায় প্রেমে পড়েছিল। তাপসের সঙ্গে বন্ধুর প্রেমিকাদের পরিচয় ছিল। কফি হাউসের রেস্তোঁরায় গল্পগুজব হত। তারাও তাপসের বন্ধু ছিল। কখনও ভাববার প্রয়োজন হয়নি, প্রেম কী, কেন, কেমন করে ঘটে। অনেকেই প্রেম করত, অনেকে করত না। তাপসের মনে এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না। সহপাঠিনী অনেকের সঙ্গেই ওর হৃদ্যতা ছিল। যেমন ছিল অনেক সহপাঠীর সঙ্গে। অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্বের মাত্রাভেদ ছিল। সকলের সঙ্গে সমানভাবে মিশতে পারত না। কে-ই বা পারত। স্মার্ট বলতে যে রকম বোঝায়, ও তা ছিল না। কিন্তু ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেকসও ছিল না। বন্ধুদের কাছে ও ছিল সিরিয়াস আর ভাল ছেলে। আসলে ও ছিল অনমনীয় আর জেদি। কখনও কখনও ওর সেই চরিত্রটা টের পাওয়া যেত। ধরে নেওয়া হয়েছিল, মফস্বলের রক্ষণশীল পরিবারের ছেলেরা যে রকম হয়, তাপস ঠিক সেই রকম।

    বন্ধুদের সেই ধরে নেওয়া সম্পর্কে তাপস অবহিত ছিল। জানত, ওটা একটা কলকাতাই ধারণার মনগড়া তফাত নিশ্চয়ই ছিল। ছেলেবেলা থেকে বেড়ে ওঠার মধ্যে, কলকাতা আর মফস্বলের একটা তফাত কোথাও থাকেই। কিন্তু সেটা নিতান্ত একটা ওপরের ব্যাপার। মূলে কোনও তফাত নেই। চিন্তা ভাবনায় মূলত সবাই এক। জীবনধারণের চেহারাটা আলাদা। সেটাও ধর্তব্যের মধ্যে না। কলকাতা আর। মফস্বলের অতীতের দূরত্ব আর নেই বললেই চলে। সবই প্রায় এক রকম হয়ে উঠেছে। তবু কলকাতা। কলকাতাই, নগর এবং রাজধানী।

    তাপস ভাবত, ও মূলত কলকাতার বাইরের অধিবাসী। অথচ ও কলকাতারও। দুয়ের মধ্যে কোনও বিরুদ্ধ টানাপোড়েন ছিল না। পঁয়ত্রিশ মাইলের ব্যবধানে, দু জায়গাতেই ও সহজ আর অনায়াস ছিল। কলকাতার কফিহাউস থেকে পঁয়ত্রিশ মাইল দূরের আধা গ্রামীণ এক প্রাচীন পাড়ার চায়ের দোকান, ওর মনে বিশেষ কোনও ব্যবধান সৃষ্টি করত না।

    কলকাতার সহপাঠিনী আর পঁয়ত্রিশ মাইল দূরের ছেলেবেলার প্রতিবেশিনী বন্ধু, দু জায়গাতেই ছিল। প্রেম সর্বত্রই। প্রেম কি কোনও আবিষ্কারের ঘটনা। যদি হয়, তা হলে তাপস এখানে এসেই তা। প্রথম আবিষ্কার করেছিল। অনেকটা নিজেকে আবিষ্কারের মতোই। মনীষার চোখের দিকে তাকিয়ে ও প্রথম অনুভব করেছিল ওর মনের জগতে কোথাও একটা ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। অবাক হয়েছিল। চিন্তিত হয়েছিল। এবং বুঝতে পারছিল না, মনীষার নিজের কোনও দায় ছিল কি না। ছিল। সেই সব। দ্বিধা দ্বন্দ্ব অস্পষ্টতা দীপা পরিষ্কার করে দিয়েছিল।

    তাপস এ অঞ্চলে আসার পরে পার্টির নির্দেশে ওকে কয়েক মাস মহিমদার বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। সেই সময়ে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। তারপরে গ্রামে। গ্রাম থেকে মাঝে মধ্যে শহরে এলে দেখা হত। তখন উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গাঢ়তর হয়েছিল। উদ্বেগ ও উত্তেজনায় আবেগ ছিল গভীর। যে কোনও দিনই তাপসের মৃত্যুসংবাদ আসতে পারত। তখন ক্ষণেকের নিবিড় সান্নিধ্য আরও ব্যাকুল করে তুলত। বর্তমান বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দুজনেই ছিল জীবনের ভবিষ্যৎ পরিণতির সংকটে উদ্বিগ্ন। মনীষা গৃহত্যাগের জন্য প্রস্তুত ছিল। বিয়ে রেজিস্ট্রি করার কোনও উপায় ছিল না। ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা ছিল। গ্রুপ কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না।

    তারপরে এই পরিস্থিতি। তাপস মুখ ফিরিয়ে মনীষার দিকে তাকিয়েছিল। কোনও প্রত্যাশা বা আবেগ নিয়ে তাকায়নি। মনীষা যা বলবার, তা আগেই বলেছিল। তবু অলকের কথার জবাবে বলেছিল, আমার কোনও কথাই নেই। বানচাক আর আনার গল্প শোনা আমার শেষ হয়ে গেছে।

    সকলেই অবাক বিভ্রান্ত চোখে মনীষার দিকে তাকিয়েছিল। ওর কথার অর্থ কেউ বুঝতে পারেনি। তাপসের ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গিয়েছিল। শলোখভের অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য ডন’-এর দুই চরিত্র বানচাক আর আনা। বিপ্লবী গোলন্দাজ বাহিনীর নেতা ও সদস্য। তাপস মনীষাকে গল্প শুনিয়েছিল। প্রতি দিনই বানচাক আর আনা, রাত্রের গভীরে, প্রতিবিপ্লবী বন্দিদের কামানের গোলায় খতম করে আসত। বানচাক শেষ মুহূর্তে ভেঙে পড়েছিল। আনা মমত্বের সঙ্গে পার্টির কঠিন কর্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। সেই কথাটাই মনীষা বলেছিল। কিন্তু তাপস বলতে পারেনি, বানচাক আর আনার গল্পের পটভূমি, পরিস্থিতি, কোনওটার সঙ্গেই বর্তমানের কোনও মিল ছিল না।

    কল্যাণ বন্ধ দরজায় ঠক ঠুক শব্দ করছিল। মহিমা দরজা খুলে দিয়েছিলেন। কেউ ঘর থেকে বেরোয়নি। তাপসের পথ করে দিয়ে সবাই সরে দাঁড়িয়েছিল। আজ কেউ অন্ধকারে একসঙ্গে তাপসের সঙ্গে বেরোয়নি। ও আজ একলা। একসপেলড ফ্রম দ্য পার্টি। মনীষার দিকে একবার তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছা করেছিল। তাকায়নি। না, প্রেমের জন্য সবকিছু জলাঞ্জলি দেওয়া যায় না। তবু তাপসের বুকে টনটন করে উঠেছিল কেন? মনীষা প্রেমকে একেবারে জলাঞ্জলি দেয়নি। ও অলকের প্রতি আকৃষ্ট। হয়েছিল। ও জানত। অলকও জানত।

    তাপস দরজা দিয়ে বেরোবার সময় মহিমদার দিকে তাকিয়েছিল। মহিমা তাকাননি। শক্ত মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে রেখেছিলেন। বউদিও। কেবল মানিকের দুই ভাইবোন রাগ রাগ চোখে তাকিয়েছিল। তাপস অন্ধকারে রাস্তায় এসে পড়েছিল। এ শহরে ওর আশ্রয়ে আর ফিরে যায়নি। তখন ও শেষ বাসটা ধরবার কথা ভাবছিল। আশ্রয়ে কয়েকটা জামাকাপড় ছাড়া কিছুই ছিল না। কিন্তু ও ফিরে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়েছিল। সেই সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি ওর চোখে ভাসছিল। মনে হচ্ছিল, একটা বিরাট কাজ পড়ে আছে। কাজটা শেষ করার সুযোগ পাওয়া যাবে কি না, সে কথাই কেবল ভাবছিল। পিছনটাকে একেবারে ভুলে যাবার চেষ্টা করছিল।

    সহজে ভোলা সম্ভব ছিল না। শেষ বাসটা পেলেও গ্রুপ ওকে আদৌ শহর ত্যাগ করতে দেবে কি না, নিশ্চিত ছিল না। আপাতত দিলেও পরে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কল্যাণের ওয়াইপ আউট! কিন্তু যাই ঘটুক, তাপসের লক্ষ্য ছিল, শেষ বাস। এবং শেষ বাসটা পেয়ে গিয়েছিল। কলকাতায় পৌঁছে ট্রেনও ধরতে পেরেছিল। পঁয়ত্রিশ মাইল দূরে, স্টেশনে যখন পৌঁছেছিল, তখন রাত্রি এগারোটা। গোটা পথটা চোখের সামনে সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর বারে বারেই মনে হচ্ছিল, পার্টি কী আশ্চর্য রকম ভাবে নিয়তির ভূমিকা নেয়।

    তাপস ট্রেনের একেবারে শেষের কামরায় উঠেছিল। গাড়ি প্ল্যাটফরমে থামবার আগেই ঝটিতি নেমে পড়ল। পিছন দিকের অন্ধকারে লাইনের ওপর দিয়ে দ্রুত হেঁটে গেল। কিছুটা গিয়ে স্টেশনের দিকে তাকাল। তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হল, ওকে কেউ অনুসরণ করছে না। বাড়িতে ফেরবার সময়, পুলিশের কথা ওকে মনে রাখতে হয়। এখানেও ওর ওপর নজর রাখা হয়। বাড়িতে দু বার সার্চ হয়ে গিয়েছে। স্টেশনের সামনে দিয়ে যাবার কোনও উপায় নেই। লাইনের ওপর দিয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে ও পশ্চিমের উঁচু জমি থেকে নীচের দিকে নেমে গেল। স্টেশন, বাজারের আশেপাশে এবং গ্রামের ভিতর দিকেও বিদ্যুৎ এসে গিয়েছে। রাস্তায় আলো নেই। এ দিকটা গ্রামের শেষ বলা যায়। পথ চেনা। অন্ধকারে কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু বাড়ির সদর দিয়ে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। রাত যতই হোক। এই শেষ ট্রেনটার জন্য বাড়ির সদরে নজর রাখতে পারে।

    তাপস বাড়িতে এলে, রাত্রেই আসে। কোনও সময়েই সদর দিয়ে ঢোকে না। বাড়ির পিছন দিয়ে, বাগানের পাঁচিল টপকে ঢোকে। আজও তাই করল। বাড়ির পিছনে, দূর থেকে অন্ধকারে এক বার। দেখে নিল। তারপরে, পাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকল। পুরনো দোতলা বাড়ি। একতলায় রান্নাঘরের দিকে এখনও আলো জ্বলছে। এবং নীচে ওপরে এখনও কোনও কোনও ঘরে আলো জ্বলছে। এত রাত্রে, ঘরে ঘরে আলো জ্বলবার কথা নয়। রান্নাঘরের দিকে শেষ পাট মেটাবার জন্য আলো জ্বলতে পারে। রাঁধুনি লক্ষ্মীমাসি আর ঝি হয়তো শোবার ব্যবস্থা করছে। রান্নাঘরের দিকেই খিড়কি দরজা। খিড়কির বাইরে একটা পুকুর আছে। পানা পুকুর, ব্যবহার করা হয় না। বাড়ির মধ্যে কুয়ো আর টিউবওয়েল আছে।

    তাপস বাগান দিয়ে ঘুরে খিড়কির দিকে গেল। ভাত ব্যঞ্জন কিছু যদি অবশিষ্ট থেকে থাকে, লক্ষ্মীমাসির কাছে চেয়ে খেয়ে নেবে। খিদে পেয়েছে খুবই। তারপরে চিলেকোঠায় চলে যাবে। ইদানীং দু-এক দিনের জন্য বাড়িতে এলে ও চিলেকোঠাতেই থাকে। এ বার আর দু-একদিনের জন্য নয়, বেশ কয়েক দিন থাকতে হবে। চিলেকোঠায় যে সংস্কৃত পাণ্ডুলিপিটা রয়েছে, যা ও একাধিক বার পড়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ওর পিতামহের একটি বাংলা লিপি, আজ এই মুহূর্তে সেই পাণ্ডুলিপিটা ওকে চুম্বকের মতো টানছে। পিতামহের লিপি ছাড়াই পাণ্ডুলিপিটি পড়ে ও বুঝতে পেরেছিল, তাপসদের এই বন্দ্যোবংশের স্রষ্টা ছিলেন সেই পাণ্ডুলিপিরই রচয়িতা। ‘চতুর্নবত্বধিক ষোড়শ শকাব্দে’–অর্থাৎ সতেরোশো বাহাত্তর খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়েছিল। এটা উনিশশো বাহাত্তর। একশো বছরে তিন পুরুষের হিসাব ধরলে, তাপস এ বংশের ষষ্ঠ পুরুষের অন্তর্গত। কিন্তু পাণ্ডুলিপির লেখকের জীবিতকাল ধরে তাপসের মনে হয়েছে ও অধস্তন সাতপুরুষ। যে মুহূর্তে অলক সেই অনিবার্য একসপেলড’কথাটি উচ্চারণ করেছিল সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, পাণ্ডুলিপিটি অনুবাদ করা ওর প্রথম কাজ। পাণ্ডুলিপিটি লেখকের জীবনকাহিনী। দু শো বছর আগের যে জীবন, নিঃশব্দে পায়ে পায়ে এসে আজ তাপসের কাছে দাঁড়িয়েছে। ও জানে, ওর বাবা জীবিতকালে এ পাণ্ডুলিপি পড়েননি। দাদারা বা আশেপাশে বাড়ির জ্ঞাতি শরিকেরা, কেউ পাণ্ডুলিপিটির কথা জানে না। ইদানীং বছর খানেকের মধ্যে কয়েক বার চিলেকোঠায় আত্মগোপন করে থাকার সময় পুঁথিটি ওর চোখে পড়ে। পড়তে পড়তে একটা অসহায় কষ্ট আর যন্ত্রণা বোধ করেছিল। আজ মনে হচ্ছে, পাণ্ডুলিপিটিকে সংস্কৃত ভাষার থেকে মুক্ত করতে হবে। বাংলায় অনুবাদ করতে হবে। ছাপা হবে, বা কেউ পড়বে, সেটা বড় কথা নয়। এখন এ। কাজটা ওর কাছে অমোঘ, নিয়তির নির্দেশের মতো।

    তাপস রান্নাঘরের পিছনের বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে দরজায় ঠুক চুক শব্দ করল। সঙ্গে সঙ্গেই ভিতর থেকে উৎকণ্ঠিত স্বর শোনা গেল, কে?

    আশ্চর্য! বড়বউদির গলা। বউদি এখনও শুতে যাননি? তাপস দরজায় প্রায় মুখ ঠেকিয়ে বলল, আমি, তাপস।

    দরজাটা খুলে গেল। তাপসের গায়ে আলো পড়ল। ও তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরের দিকে তাকিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। রান্নাঘর লণ্ডভণ্ড। ভাত ব্যঞ্জন ছড়াছড়ি। দুটো। উনোন ভাঙাচোরা। লক্ষ্মীমাসি এক পাশ থেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তাপস অবাক চোখে বড়বউদির দিকে তাকাল। ঘোমটা খোলা, ধূসর চুলের মাঝখানে সিথেয় সিঁদুর। বয়স ষাটের কাছাকাছি। তাপস জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার?

    বড়বউদি কোনও জবাব না দিয়ে সামনের দরজা দিয়ে দালানে চলে গেলেন। তাপস পিছনে পিছনে গেল। দালানে বড়দা মেজদা সেজদা আর ন’দা এবং বউদিরা সকলেই আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। গোটা দালানে বাক্স সুটকেস, ট্রাঙ্ক বিছানা জামাকাপড়। দেখলেই বোঝা যায়, একটা তছনছ লণ্ডভণ্ড কাণ্ড ঘটে গিয়েছে। কোনও ঘর থেকে কান্নার সঙ্গে কথা ভেসে আসছে, ‘তার চেয়ে ও যদি মরে যেত, এ সংসারের কল্যেণ হত। ভগবান ওকে যখন এই মতি দিয়েছে, তখন আমাদের নিয়ে টানাটানি কেন? আর কতকাল সইতে হবে…।’ বৃদ্ধা মা কাঁদছেন। তাঁর কথাগুলো শুনে সেই পাণ্ডুলিপির কথাই মনে পড়ছে। তাপসের দিকে সকলের চোখ। ওর মনে হল, ও মহিমার ঘরেই যেন এখনও রয়েছে। দাদা বউদির সকলের চোখে বিস্ময় বিদ্বেষ রাগ। এক পরে বলবার দরকার হয় না, পুলিশ ওর খোঁজে এসেছিল। গোটা বাড়ি তল্লাশ করে, অন্ধ আক্রোশে সব ভেঙেচুরে ছুঁড়ে তছনছ করে গিয়েছে। এর আগেও দু বার পুলিশ এসেছে। কিন্তু এতটা বাড়াবাড়ি কখনও করেনি। দাদারা ইতিপূর্বেই এক রকম। জানিয়ে দিয়েছে, তাপস যেন আর এ বাড়িতে না আসে। ভাইবোনদের মধ্যে ও সকলের ছোট।

    বড়দার বড় ছেলে তাপসের বয়সি। কলকাতায় থাকে। অন্যান্য ভাইপো ভাইঝিরা নিশ্চয় ওপরে রয়েছে। ছোটরা সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে। তাপস জিজ্ঞেস করতে পারছে না, পুলিশ কখন এসেছিল। হয়তো এক-দেড় ঘণ্টা আগে এসেছিল। রান্না ভাত তরকারি নষ্ট করার অর্থ এখনও অনেকেরই খাওয়া হয়নি।

    পুলিশ তোর খোঁজে এসেছিল। বড়দা প্রথম মুখ খুললেন, তাদের কাছে নাকি খবর ছিল, তুই আজ এ বাড়িতে সন্ধেবেলাতে এসেছিস। পুলিশ যাই বলুক, তুই এখন কী করতে চাস?

    সেজদা প্রায় গর্জন করে উঠলেন, কী আবার? এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। এখুনি, এ মুহূর্তে।

    ‘তাতেই বা লাভ কী?’ ন’দা শক্ত মুখে, শান্তস্বরে বলল, তারপরে আবার পুলিশ আসবে, আবার এই সব কাণ্ড করবে। তার চেয়ে থানায় খবর দিয়ে দেওয়াই ভাল।

    ন’দা ধরিয়ে দিতে চায়। স্বাভাবিক। চাকরিতে, ব্যবসায়ে প্রতিষ্ঠিত পরিবার। এ অত্যাচার তাদের সহ্য করবার কথা নয়। বিশেষ করে, পুরনো শাসক দলকে সমর্থন করা ছাড়া, এ বাড়িতে অন্য কোনও রাজনৈতিক বিশ্বাস বা মতামত নেই। তাপস একমাত্র ব্যতিক্রম। ও বড়দার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘থানায়। খবর দিলেও, তার আগেই আমি পালিয়ে যেতে পারব। ধরিয়ে দেবার দরকার নেই। আমি লিখে দিয়ে যাচ্ছি, এ বাড়িতে আর কখনও আসব না, কোনও সম্পর্ক রাখব না। তোমরা পুলিশকে সেটা দেখিয়ে দিয়ো।’

    দাদাদের চোখ পরস্পরের দিকে। ভিতর থেকে মায়ের গলা শোনা গেল, কে? কে কথা বলছে?

    তাপস সকলের দিকে এক বার দেখে নিয়ে বলল, আমি এক বার ওপরে যাচ্ছি। আমার কয়েকটা জামাকাপড়, বই খাতা নিয়ে এখুনি আসছি। বলেই ও দালানের প্রান্তে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। ওপরের দালানে দু-তিনজন বারো চৌদ্দ বছরের ভাইপো ভাইঝি ছিল। তাপসের আসার ঘটনা ওরা টের পায়নি। চমকে অবাক চোখে তাকাল।

    তাপস ওর নিজের নির্দিষ্ট ঘরে গেল। সবই এলোমেলো তছনছ অবস্থা। দেওয়াল আলমারিতে রাখা সমস্ত বই, খাটের বিছানা, স্টিলের ট্রাঙ্কে রাখা জামাকাপড় সমস্ত কিছুই ঘরের মেঝেয় ছড়ানো ছিটানো। অনেক বইয়ের এবং খাতার পাতা পর্যন্ত এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। পুলিশ বই খাতার পাতা ছিঁড়ে ছিড়ে দেখেছে। পার্টির কাগজপত্র খোঁজার ছলে আক্রোশবশত খাতাপত্র ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করেছে।

    তাপস এক মুহূর্ত ঘরের অবস্থা দেখল। খুঁজে নেবার কিছুই ছিল না। সবই চারদিকে ছড়ানো। ঘরের এক কোণে পড়েছিল, চামড়ার গায়ে কাজ করা একটা বড় ব্যাগ। ও সেটা তুলে নিল। দ্রুত হাতে কয়েকটা জামাকাপড় ঢুকিয়ে দিল ব্যাগের মধ্যে। হাতের সামনে যে কটা আস্ত খাতা পেল, ঢুকিয়ে নিল। সারা মেঝে খুঁজে খুঁজে গোটা পাঁচেক পেন্সিল আর কলম পেল। এগুলোর বিশেষ প্রয়োজন আছে। কলমগুলো পরীক্ষা করে নিল। সবগুলোই বন্ধুদের উপহার, বিদেশি কলম। কালি আছে কি না, পরীক্ষা করে, আগেই একটি খাতার পাতা খুলে দ্রুত হাতে লিখল, ‘আমি আর এ বাড়িতে কখনও আসব না। কোনও সম্পর্কও রাখব না। অতএব, এ বাড়িতে আমাকে অনুসন্ধান করা বৃথা।–ইতি…’ তাপসের গলার কাছে মুহূর্তের জন্য যেন শক্ত কিছু আটকে গেল। বুকের মধ্যে টনটন করে উঠল। পরমুহূর্তেই একটি নিশ্বাস ফেলে তারিখ লিখে নিজের নাম সই করল। পুলিশ হয়তো এ চিঠির বয়ান বিশ্বাস করবে না। ছলনা আর চাতুরি ভাববে, এবং আবার ওর খোঁজে আসবে। কিন্তু ও অন্তর থেকে মিথ্যা কথা লেখেনি। দাদারা নিশ্চয়ই অনেকটা নিশ্চিন্ত হবেন।

    এ কি সবই কোইন্সিডেন্স? আজ পার্টি থেকে একত্সপেলড। মনীষার সঙ্গে সব সম্পর্কের শেষ। গৃহত্যাগ। এক সপ্তাহ আগেও এর কোনওটাই ও ভাবতে পারেনি। আজকের বৈঠকে ও মিথ্যা বলেনি, পার্টির মৌলনীতিতে ও বিশ্বাসী। যদিও বলার কোনও দরকার ছিল না। কারণ কল্যাণ তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করেছিল, মিথ্যা কথা।…মনীষাকে নিয়ে ও অনেক কথা ভবিষ্যতের জন্য ভেবেছিল। আজ সব শেষ হয়ে গেল। কিন্তু মনীষা ওর কাছে যা ছিল, তা-ই আছে। এই সব ভাবতে ভাবতেই, পাণ্ডুলিপিটার কথা ওর মনে পড়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য একটা বিভ্রান্তি, শেষ বিদায়ের কষ্ট ওকে অন্যমনস্ক করে তুলেছিল। পাণ্ডুলিপিটাই ওকে বিদ্যুচ্চমকে চকিত করে তুলল। খাতার পাতা থেকে লেখা কাগজটা ছিঁড়ে নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রাখল। ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত ঘরের বাইরে এল।

    ভাইপো ভাইঝিরা দালানে দাঁড়িয়েছিল। সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত অবাক। স্বাভাবিক। কিছুক্ষণ আগেই বাড়ির মধ্যে ওদের চোখের সামনে পুলিশ তাণ্ডব করে গিয়েছে। আর সেটা ওরই জন্য। কিছু বলতে ইচ্ছা করলেও কোনও কথা বলতে পারল না। এক রকম ছুটেই অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। দেখল, ছাদের দরজাটা খোলা। তার মানে পুলিশ চিলেকোঠায়ও এসেছিল। বুকটা ধড়াস করে উঠল। চিলেকোঠায় পাণ্ডুলিপিটা ছিঁড়েখুঁড়ে রেখে যায়নি তো?

    তাপস খোলা দরজা দিয়ে ছাদে পা দিয়ে ডান দিকে সুইচে হাত বাড়াল। বাড়িয়েই তৎক্ষণাৎ হাত ফিরিয়ে নিয়ে এল। ছাদে বাতি জ্বলে উঠলেই দূর থেকে দেখা যাবে। ও ডান দিকে চিলেকোঠার সিঁড়িতে পা দিয়ে দেখল ঘরের দরজা খোলা। এটা ঠাকুরঘরও বটে। বংশের গৃহদেবতা নারায়ণের শিলা আছে। এখনও প্রতি দিন পূজা হয়।

    তাপস দরজাটা বন্ধ করে দিল। পকেট থেকে দেশলাই বের করে কাঠি জ্বালল। উঁচু একটা ধাপে নারায়ণশিলা ও অন্যান্য দেবদেবীর পট। গীতা চণ্ডী এবং ব্রতকথার বই, চন্দন আর সিন্দুর চর্চিত। অন্য পাশে, কিছু পুরনো বই। তার মধ্যেই সেই পাণ্ডুলিপিটি থাকবার কথা। যার দু পিঠে, দুটি কাঠের মোটা তক্তা দিয়ে বাঁধা। পাতাগুলো আলগা।

    সবকিছু দেখে ওঠবার আগেই দেশলাইয়ের কাঠি নিভে গেল। তাপস আবার একটি কাঠি জ্বালিয়ে নারায়ণ শিলার কাছে রাখা প্রদীপটি জ্বালাল। দেখল, সমস্ত কিছুতেই হাত পড়েছে। পুরনো বইগুলো ছড়ানো। তার মধ্যে পাণ্ডুলিপিটি, কাঠের তক্তার জোড় খোলা। পুলিশ এটিতেও হাত দিয়েছে। বাতাস থাকলে তুলোট কাগজের জীর্ণ পাতাগুলো ভেঙেচুরে উড়ে যেত। এ বন্ধ ঘরে সে সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু এখন আর কাঠের তক্তার জোড় দিয়ে বাঁধার সময় নেই। ব্যাগের ভিতর থেকে একটি কাপড় বের করে ভাঁজ খুলে পাণ্ডুলিপিটি জড়িয়ে নিল। সাবধানে ঢুকিয়ে দিল ব্যাগের ভিতরে। প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে দরজা খুলে বাইরে এল। দ্রুত নেমে এল নীচে।

    দাদারা কিছু আলোচনা করছিলেন। তাপসকে দেখে থেমে গেলেন। মা একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাপসকে দেখেই ডুকরে উঠলেন, ওরে সর্বনেশে, তুই কি এই বংশ, এ সোনার সংসার ছারেখারে দিবি?

    তাপস জানে, মায়ের সঙ্গে এখন কোনও কথা বলা নিরর্থক। ও পকেট থেকে লেখা কাগজটা বের করে বড়দার দিকে বাড়িয়ে দিল। বড়দা হাতে নিয়ে পড়লেন। পড়ে মেজদার দিকে এগিয়ে দিলেন। তাপস বলল, আমি যাচ্ছি। পুলিশ আমার হাতের লেখা চেনে। তবু হয়তো বিশ্বাস করবে না, ভাববে। এটা একটা চাল। কিন্তু এ ছাড়া আমার কোনও উপায় নেই। আমার আজ আসা, আর চলে যাবার কথা পুলিশকে সবই বলবেন। কলকাতার হায়ার অথরিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখতে পারেন, তাতেফল হতে পারে। ও বউদিদের দিকে এক বার দেখে আর এক বার মায়ের দিকে দেখল। এগিয়ে গেল রান্নাঘরের দিকেই। রান্নাঘর থেকে বাগান এবং বাগানের পাঁচিল টপকে বাইরে। দাঁড়াতে ভরসা পেল না। অন্ধকারের চেনা পথে উত্তরের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করল।

    কলকাতায় গেলে হয়তো আশ্রয় একটা জুটতে পারে। কিন্তু আশা কম। এখন ট্রেনও নেই। সকালে ট্রেনে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। সারা রাত্রি পথে পথে ঘোরা বিপজ্জনক। উত্তরে এগিয়ে গেলেও ক্রমেই ও পশ্চিমের দিকে বাঁক নিয়ে চলেছে। ও যেন এখনও নিশ্চিত না, কোথায় যাবে। অথচ ওর চোখের সামনে গঙ্গা ভাসছে। ওর চেতন ও অচেতন মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলছে। একটা অচেনা নিরাপদ আস্তানার চিন্তা ওর মস্তিষ্ক জুড়ে রয়েছে। কোথায় গেলে সে রকম একটা আস্তানা পাওয়া যাবে, এই অনিশ্চিত অনুসন্ধিৎসার মধ্যেও ও ক্রমেই পশ্চিমের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর চোখের সামনে গঙ্গা ভাসছে। টাকার চিন্তাও মাথার মধ্যে রয়েছে। পকেট একেবারে শূন্য নেই। অন্তত চল্লিশ টাকার কিছু বেশি ওর পকেটে আছে। পরশু দিনই পঞ্চাশ টাকা মনীষা ওকে দিয়েছিল। সেই দিনই কোর্টের হাবিলদারকে মারার কথা ছিল। মনীষা ওকে প্রায়ই টাকা দিত। গ্রুপের কেউ এ কথা জানত না। মনীষা কিছু দিতেই বাকি রাখেনি। ও একসঙ্গে অনেক টাকা দিয়ে রাখবার কথাও বলত। তাপস নেয়নি। অনেক টাকা কাছে রাখার কোনও সঙ্গত কারণ ছিল না। এখন মনে হচ্ছে, বেশি টাকা থাকলে দূরে কোথাও চলে যাওয়া যেত। উড়িষ্যা বা বিহারের কোনও অঞ্চলে। যদিও অচেনা জায়গাও নিরাপদ নয়। অচেনা জায়গায় অচেনা লোক, স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ জাগায়।

    তাপস এই সব চিন্তার মধ্যেও গ্রামগুলোর বাইরে দিয়ে ক্রমেই পশ্চিমের দিকে এগিয়ে চলেছে। মনে মনে একটা হিসাব আছে, চার থেকে পাঁচ মাইল। ওদের বাড়ি থেকে গঙ্গার দূরত্ব। গঙ্গা ক্রমেই এই পুব দিকে থাবা বাড়িয়ে, মাটি গ্রাস করছে। ওপারের পশ্চিমে চর পড়ছে। গঙ্গার ধার খাঁ খাঁ করছে। চাষের উঁচু জমির পরেই গঙ্গার থাবা গ্রামগুলোর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কয়েক বছর ধরে খুব ধীরে এ পাড় ভাঙছে। কিন্তু ওর চোখের ওপর ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, ভাঙা ঘাট। যার ওপরের চাতাল, দুমড়ে উলটে একটা খোঁচা বোলডারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সিঁড়ির ধাপগুলোর কোনও চিহ্ন নেই। পাশেই পুরনো বটগাছ, যার অজগরের মতো শিকড় পাশের গঙ্গাযাত্রীর ঘরটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। সেই জায়গা এখন শ্মশানের থেকেও যেন ভয়ংকর। একটা ভুতুড়ে পরিবেশ। লোকজন কেউ ওদিকে যায় না। গঙ্গাযাত্রীর সেই ঘরটার এখন কী অবস্থা?

    তাপস কতক্ষণ হেঁটেছে হিসাব করতে পারে না। কোথাও কোথাও কাদা আর পাঁকে স্যান্ডেল কোঁচার কাপড় ভিজে মোটা আর ভারী হয়ে গিয়েছে। ওর চোখের সামনে গঙ্গা। মাথা উঁচু বোলডারের মতো সেই চাতাল। বটের অন্ধকার কুপসিতে ঝুরি আর শিকড়ের খামচার মধ্যে গঙ্গাযাত্রীর ঘরটা ঢাকা পড়ে আছে। আগে চাতালের ওপর দিয়ে ঘরটার মধ্যে যাওয়া যেত। এখন বটের মোটা গুঁড়ি, শিকড় আর ক্ষয়ে যাওয়া ভিতের এবড়ো খেবড়ো চাংড়ার ওপর দিয়ে ঘরে ঢোকা যায়। ভিতরে কি কোনও মানুষ আছে? সম্ভবত না। থাকলে সাপখোপ বিছে থাকতে পারে। কয়েক বছর আগেও এ ঘরে দু-একজন ভিখিরি এসে থাকত। তার আগে গঙ্গার ধারের গ্রামের লোকেরা এটাকে তাদের আড্ডা-ঘর হিসাবে ব্যবহার করত।

    দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে লাভ নেই। নিভে যায়। এ অন্ধকারে কিছুই দেখা যাবে না। তাপস গাছের গুঁড়িতে উঠে সাবধানে শিকড়ের সন্ধানে পা বাড়াল। শিকড়গুলো বিরাট আর চওড়া। কয়েকটা শিকড় পেরিয়ে ভাঙা ভিতের ছোঁয়া পেল। খানিকটা ওপরে উঠে, একটা গাঢ় অন্ধকার হা-মুখের সামনে দাঁড়াল। ঘরে ঢোকার দরজা। পাল্লা চৌকাঠ কিছুই নেই। গঙ্গার স্রোতে চকিত আলোর রেখা। অন্ধকারের আলো না, আকাশের তারার প্রতিবিম্বরা স্রোতের ধারায় অস্থির বেগে মিলিয়ে যাচ্ছে। তাপস হাতের ব্যাগটা দু হাতে চেপে ধরল। আশ্চর্য! ও গঙ্গাযাত্রীর ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ও এখানেই আসতে চেয়েছিল। এই মুমূর্ষ ঘরে। বাড়ি থেকে বেরোবার মুহূর্তে এই আস্তানাটাই ওর মস্তিষ্কে বিদ্যুচ্চমকের মতো ঝিলিক দিয়েছিল। নিশ্চিত ছিল না। তবু ওর ভিতর থেকেই কেউ যেন এ দিকে ঠেলে এনেছে। গঙ্গাযাত্রীর ঘর। পাণ্ডুলিপিটা কি জীবন্ত? না হলে, এই গঙ্গাযাত্রীর ঘরেই ওকে আসতে হল কেন? পাণ্ডুলিপিরই নির্দেশ নাকি?

    তাপসের ঠোঁটে ম্লান হাসি ফুটল। ও অন্ধকার ঘরের ভিতর পা দিল। আর তৎক্ষণাৎ ঘড়ঘড়ে গলায় কেউ কেশে উঠল। মানুষ! মানুষের কাশি। মানুষ আছে এখানে? তাপস জিজ্ঞেস করল, কে?

    কোনও জবাব পাওয়া গেল না। কিন্তু খসখস শব্দের সঙ্গে আঙুল মটকাবার মতো শব্দ শোনা গেল। তারপরেই মেঝেতে কোনও ধাতব শব্দের ঘষা লাগার শব্দ। কাশির পরে দীর্ঘশ্বাস এবং ঘড়ঘড়ে গলায় নিরীহ স্বর শোনা গেল, আমি অকুর, ভিখ মেগে খাই, এখেনে থাকি। কারুর কোন ক্ষতি করিনে বাবা। তাড়িয়ে দেবে আমাকে?

    তাপস মনে মনে হাসল। কে কাকে তাড়ায়। ও বলল, না, তাড়াব কেন? বাতি টাতি আছে?

    ‘বাতি কোথায় পাব বাবা?’ অকুর নামের মানুষের স্বর শোনা গেল, তেল কোতায় পাব? ডিবেন্টন কিছু নেই। আগুন জ্বালাবার কাটকুটো আছে, তা সে ত নিবে গেছে। স্যালাই একটা আছে।

    স্যালাই মানে দেশলাই। লোকটাকে বুড়ো মনে হচ্ছে। এখনও তা হলে এ ঘরে ভিখিরি থাকে? তাপস বলল, দেশলাই আমার কাছেও আছে। একটা কোনও আলোটালো জ্বালতে পারলে ভাল হত।

    অ্যাই, হ্যাঁ, মনে পড়েচে।অকুর ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল, কড়ে আঙুলের মতন এ্যাটটা মমবাতি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম, দেখছি সেটা কোতায় আছে।

    তাপস অকুরের স্বর লক্ষ্য করে দু পা এগিয়ে গেল। গঙ্গার দিকে দুটো পাল্লাবিহীন দরজা। অকুর একটা কোণে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে দেখা যাচ্ছে না। সে কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করছে। খস খস, ঠুং ঠাং নানা রকম শব্দ হচ্ছে। শোনা গেল, পেয়েছি।

    তাপস ব্যাগটা নামিয়ে রেখে পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বালল। গঙ্গার দিকের খোলা দরজা গিয়ে হাওয়া আসছে। ও পিছন ফিরে অকুরের দিকে এগিয়ে গেল। একরাশ গোঁফ দাড়ি মাথা ভরতি। চুলের মাঝখানে দুটো চোখ বিন্দুর মতো দেখা গেল। বাড়ানো হাতে একটা দু ইঞ্চি লম্বা সরু মোমবাতি। তাপস সেটা নিয়ে জ্বালাল। সামান্য আলো, বাতাসে ছোট শিখা কাঁপছে। নিজের শরীরের আড়ালে মোমবাতিটা রেখে ও ভাল করে অকুরের দিকে দেখলে। নিরীহ বুড়ো মানুষ। তাপসের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। একটা চটের ওপর সে বসে আছে। ওটার ওপরেই শুয়ে ছিল। পাশে কয়েকটা ঝোলাঝুলি। কাছেই কয়েকটা ইট জড়ো করে উনোন করেছে। তার ওপরে একটা কালো মাটির হাঁড়ি। আরও কয়েকটা মাটির মালসা, গেলাস ইত্যাদি রয়েছে। অকুরের সংসার।

    ‘মোমবাতিটা আমাকে দাও বাবা, আমি রাখচি।’ অকুর হাত বাড়াল নিববে না।

    তাপস মোমবাতিটা অকুরের হাতে দিল। অকুর পিছন ফিরে কোণের দিকে একটা লোহার ছোট কৌটার মধ্যে বসিয়ে দিল। আলো কমে গেল। কিন্তু মোটামুটি সবই দেখা যাচ্ছে। কৌটার ভিতরে হাওয়া ঢুকছে না। ঘরের মেঝে এবড়ো খেবড়ো হলেও মোটামুটি পরিষ্কার আছে। অকুরই নিশ্চয় পরিষ্কার রাখে। তাপস ব্যাগটা সরিয়ে এনে বলল, বসতে পারি?

    ‘কেন বসবে না বাবা?’ অকুর মোটা ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, এ ঘরের মালিক ত কেউ নয়।

    তাপস পকেট থেকে এই প্রথম সিগারেটের প্যাকেট বের করল। অকুরকে জিজ্ঞেস করল, খাবে?

    ‘দাও।’ হাত বাড়াল।

    তাপস অকুরকে একটা সিগারেট দিল। নিজে একটা নিল। দেশলাইয়ের কাটি জ্বালিয়ে আগে নিজেরটা ধরাল। অকুরেরটা ধরাতে গেল। অকুর তাড়াতাড়ি জ্বলন্ত কাটিটা নিয়ে নিজেই নিজেরটা ধরাল। তার দাড়ি বুকের ওপর নেমে এসেছে। মাথার চুলে জটা। গোঁফ দাড়ি চুল আর ভুরু সবই ধূসর আর তামাটে দেখাচ্ছে। কোল বসা চোখ দুটো আকাশের দূরের তারার মতো স্তিমিত। কিন্তু খুব একটা অশক্ত মনে হচ্ছে না। গায়ে একটা ময়লা কাঁথার মতো কিছু জড়ানো। তাপস জিজ্ঞেস করল, এখানে কত দিন আছ?

    তা পেরায় বছর খানেক। অকুর কাশতে আরম্ভ করল। তাপস একটু অপেক্ষা করল। কাশিটা সামলে ওঠার পরে আবার জিজ্ঞেস করল, এ দিকে লোকজন আসে?

    না, কেউ আসে না।

    তুমি কি রোজ ভিক্ষেয় বেরোও?

    শরীর গতিক খারাপ থাকলে এক-আধ দিন বাদ যায়। চাল ডাল বেশি জুটলে মাজে মধ্যে কামাই দিই।

    তাপস চুপচাপ মিনিট খানেক সিগারেট টানল। তারপরে বলল, আমি এখানে কয়েক দিন থাকতে চাই।

    অকুরের দুই বিন্দু স্তিমিত চোখে বিস্ময়। বলল, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে বাবু ভদ্দরনোকদের ছেলে। এখানে কী করে থাকবে?

    সে আমি যেমন করে হোক থাকব।তাপস অকুরের দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু তুমি একটা কথা দিলে, তবে আমি থাকতে পারব।

    অকুর জিজ্ঞেস করল, কী কতা বাবা?

    তুমি যখন ভিক্ষেয় বেরোবে, আমার কথা কারোকে বলবে না।

    অকুর নিরীহ অবাক স্বরে বলল, তা যদি বল, আমি কেন নোককে বলতে যাব?

    তুমি যেমন ভিক্ষেয় বেরোও, সেই রকমই বেরোবে। আমি তোমাকে কয়েকটা করে টাকা দেব। আমার জন্য চাল ডাল কিনে আনবে। তোমার সঙ্গেই আমি খাব। তুমি কত দূরে যাও?

    তা দিন বুঝে ইস্টিশানতক যাই। কিন্তু বাবা, আমার কাছে টাকা দেখলে নোকে আমাকে চোর। ভাববে। আমি ভিখিরি মানুষ, টাকা দিয়ে সওদা করব কেমন করে?

    সহজ সত্যি বাস্তব কথা। অথচ তাপসের কাছে কিছু খুচরো ছাড়া, কয়েকটি দশ টাকার নোট। শুধু খাওয়া না। তিন-চার দিন থাকতে হলেও কয়েকটা মোমবাতি, কিছু সিগারেটও দরকার হবে। অবিশ্যি এ সব ভেবে ও এখানে আসেনি। জানত না, অকুরকে পাওয়া যাবে। এখন মনে হচ্ছে, এগুলো অত্যাবশ্যক। ও ব্যাগটার ওপর হাত রেখে বসে পড়ল। চিন্তিত স্বরে বলল, তা হলে কী করা যায় অকুর। আমার কাছে তো টাকার নোট ছাড়া কিছু নেই।

    অকুর কোনও কথা বলল না। গঙ্গার ছলছল শব্দ আর ঝিঁঝির ডাক শোনা যাচ্ছে। মোমবাতির আলোয় এ ঘর, অকুর, এবং তাপসের নিজেকেও যেন অবাস্তব লাগছে। অকুর একটু কেশে বলল, আমার কাছে অনেক খুচরো পয়সা আছে, তা দিয়ে তোমার সওদা করে দিতে পারি। তুমি হিসেব করে আমাকে ললাটের টাকা দিয়ো।

    আর একটা সহজ সত্যি বাস্তব কথা। তাপস খুশি আর অবাক চোখে অকুরের দিকে তাকাল। অকুর ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। অকুরের চোখে দ্বিধা ও সংশয়। নিজের পয়সার কথা বলে সে একটু ভয় পেয়েছে। তাপসকে বিশ্বাস করে পয়সার কথা বলা ঠিক হয়েছে কি না বুঝতে পারছে না। ও বলল, তুমি যদি বলল, তা হলে আমি এখনই তোমাকে টাকা দিয়ে রাখতে পারি।

    ‘তার কী দরকার বাবা?’ অকুর ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল, তোমাকে বিশ্বেস করে বলেচি। টাকা তুমি পরে, হিসেব দিও। আমার পয়সা ত এ ঘরেই থাকবে। কিন্তু তুমি কে বাবা? এখেনে কেন থাকবে?

    তাপস বলল, ভয় নেই, আমি চোর ডাকাত নই। দায়ে পড়ে আমাকে কয়েক দিন এখানে লুকিয়ে থাকতে হবে। তারপরেই আমি আবার চলে যাব। তোমাকে বিশ্বাস করেই আমাকে এখানে থাকতে হবে। জানাজানি হলে আমি বিপদে পড়ে যাব।

    বলেচি ত বাবা, আমি কারুককে তোমার কথা বলব না। অকুর তার শ্লেষ্ম জড়ানো স্বরে বলল, এখেনে কেউ আসেও না, তুমি নিশ্চিন্দিতে থাক। তোমাকে দেখে চোর ডাকাত মনে হয় না। কিন্তু। তোমার মতন ছেলে এখেনে থাকবে কেমন করে, আমার হাতে খাবে কেমন করে, তাই ভাবছি।

    তাপস বলল, আমি ঠিক চালিয়ে নেব।

    অকুর কোনও কথা বলল না। বাইরে একটা পাখি ডেকে উঠল। এক বার, আচমকা। তাপস গঙ্গার দিকে দেখছে। নদীর স্রোতে তারার ঝিলিক বাঁকা আর দেখা যাচ্ছে না। মেঘ করল নাকি? কিন্তু ওপারের অন্ধকার আকাশে, গাছপালার রেখা ঈষৎ দেখা যাচ্ছে। গঙ্গাযাত্রীর ঘর। তাপসকে পাণ্ডুলিপিটা নিয়ে এখানেই আসতে হল। বাস্তবতার মধ্যেও কী অসামান্য অপ্রাকৃত রহস্য। পাণ্ডুলিপির লেখকের সঙ্গে গঙ্গাযাত্রীর ঘরের একটা অচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সেখান থেকেই তার নতুন জীবনের শুরু। গঙ্গাযাত্রীর ঘর মানেই মুমূর্ষ গৃহ। পুণ্য মৃত্যুর শেষ দিনের জন্য অপেক্ষাগৃহ। কত লোক এ ঘরে নিশ্বাস ত্যাগ করেছে? একমাত্র, গঙ্গার নিরন্তর উজান-ভাটা, এ ঘরের বোবা ইট, ভাঙা ঘাট তার হিসাব জানে। যে হিসাবের সংখ্যা মানুষ রাখেনি।

    আবার পাখি ডেকে উঠল। এক বার না কয়েক বার। একটা না কয়েকটা। অকুর বলল, রাত পুইয়ে এল। দেখতে দেখতে চাদ্দিক দিন হয়ে যাবে।

    অকুরের কথা শেষ হবার আগেই বাইরে গাছের পাতায় ঝাপটানো শব্দ শোনা গেল। আবার পাখির ডাক। তাপস বুঝতে পারল, এ সবই রাত শেষের লক্ষণ। আকাশের তারা ক্রমে বিলীয়মান। নদীর স্রোতে ঝিলিক নেই। ওপারের আকাশে গাছপালার রেখা দ্রুত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অকুর আবার বলল, তুমি যদি বাবা লোকজনের নজর ফাঁকি দিয়ে থাকতে চাও, তবে ঘাটের কাজ সেরে এস। নাইতে হলে এখন নেয়েধুয়ে নাও। দিনের বেলা দূরের মাঠ ঘর থেকে লোকজন দেখতে পাবে।

    অভিজ্ঞ অকুরের প্রত্যেকটা কথাই বাস্তব। তাপস জিজ্ঞেস করল, অকুর, তুমি কি রাস্তাঘাট থেকে খাবার কুড়িয়ে আনেনা?

    না বাবা, সে আমি পারিনে। অকুর তার ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল, আমি জাত চাষি। আবাদ ছিল। দিনকাল খারাপ হল। নিজে বুড়ো হলাম। ছেলেরা খেতে দিতে পারল না। না খেয়ে মরতে বড় কষ্ট। আমি ঠাকুরের নাম নিয়ে মেগে পেতে খাই। ঘুরতে ঘুরতে এ ঘরে এসে উটেচি, গঙ্গার ধারে এখেনেই মরব। এখেনে মলে পুণ্যি। রাস্তাঘাটে কুড়িয়ে খাব কেন?

    তাপসের বিবেকে লাগল। এ ভাবে কথাটা জিজ্ঞেস করা উচিত হয়নি। কিন্তু অকুরও তা হলে এক রকম গঙ্গাযাত্রী। ও বলল, কিছু মনে করো না। অনেককে দেখেছি, রাস্তাঘাটে ময়লা ঘাঁটে, তাই বলেছি।

    না, বাবা, আমি তা ঘাঁটিনে। ভগবান এখনও দুটো জুটিয়ে দেয়। তবে, না খেয়ে মরতে বড় কষ্ট। কপালে কী আছে জানিনে।

    তাপস জিজ্ঞেস করল, তুমি চা খাও?

    খাই। চা আর গুড় আছে। দুধ নেই। ঘড়ায় গঙ্গার জল আছে। খাবে ত বল, কাটকুটো জ্বেলে, চা করি। অকুর ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল, খই আছে, এক মুঠো চিবতে পার। মুড়ি রাখিনে। দাঁত নেই, চিবতে পারিনে।

    বিপ্লবী তাপস হঠাৎ যেন ভাগ্যবাদী হয়ে উঠল। নিজেকে ওর সৌভাগ্যবান মনে হল। ও দু চোখ ভরা খুশি আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে অকুরের দিকে তাকাল। অকুর আর তাপসের জবাবের অপেক্ষায় থাকল না। সে ইটের উনোনে কাটকুটো জ্বেলে একটা টিনের কৌটায় জল গরম করে চা তৈরি করল। একটা মাটির গেলাসে চা ঢেলে তাপসকে দিল। দেওয়ালের ফোকর থেকে একটা ঠোঙা বের করে এগিয়ে দিয়ে বলল, এতে খই আছে।

    ক্ষুধার্ত তাপস সাগ্রহে আগে চায়ের মাটির গেলাসে চুমুক দিল। গিলতে গিয়ে গলায় আটকাল। মনে হল, ভেলি গুড় গোলা গরম জল। কিন্তু গিলে ফেলল। খই মুখে চিবোতে চিবোতে কয়েক চুমুকেই সব চা খেয়ে নিল। প্রথম চুমুকটায় যা বাধা। তারপরে সবটাই অমৃত। একটা সিগারেট ধরিয়ে, উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে একটা ধুতি বের করে বলল, আমি ঘাট সেরে আসি। মনে হচ্ছে, ভোর হয়ে আসছে।

    হ্যাঁ, আর দেরি করো না বাবা। তুমি এলে আমি যাব। ভাঙা ঘাটের দিকে যেও না, ওভেনে জলে ঘূর্ণি আছে, মুণ্ডু ধরে তলিয়ে নিয়ে যাবে। গাঁয়ের কয়েকজন মরেছে, তাই আর এখেনে কেউ আসে না। ঘরের পেছু দিয়ে দখিনে গিয়ে হাঁটু জলে ডুব দিয়ে এস। গঙ্গা এ দিকটা খাচ্ছে ত, তলে বড় টান আর ঘূর্ণি। এ ঘরটা কবে ভেঙে পড়বে, কে জানে।

    অকুর সব জানে। বাঁচবার জন্য জানতে হয়েছে। ছেলেরা খেতে দিতে পারেনি। কিন্তু তাদের দোষ দেয়নি। না খেয়ে মরা বড় কষ্ট। তাই এই বৃদ্ধ বয়সে বেরিয়ে পড়েছে। নদীর কোথায় টান ঘূর্ণি, সবই জানে। তাপস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অন্ধকার একেবারে কাটেনি। পূবের দূরে আকাশে যেন জ্যোৎস্নার আবছা আলো। পাখিগুলো এখন গলা খুলে ডাকতে আরম্ভ করেছে।

    ⤷
    1 2 3 4 5
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদিগন্ত – সমরেশ বসু
    Next Article বিপর্যস্ত – সমরেশ বসু

    Related Articles

    সমরেশ বসু

    প্রজাপতি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    গঙ্গা – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    বিবর – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    অকালবৃষ্টি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    নয়নপুরের মাটি – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    সমরেশ বসু

    শ্রীমতি কাফে – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }