পাতালঘরের পিশাচ – অনীশ দাস অপু
পাতালঘরের পিশাচ
লোকে আমাকে অদ্ভুত মনে করে। কারণ আমি সারাক্ষণ সেকেলে আমলের হাই কলারের শার্ট পরে থাকি। জানি ওরা পেছনে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে এবং এত গরমের মধ্যেও উঁচু কলারের জামা পরে আছি দেখে তাদের চোখে- মুখে ফুটে ওঠে বিস্ময়। আমাকে নিয়ে তাদের মনে সর্বক্ষণ প্রশ্ন জাগে-কেন? কিন্তু জবাবটি আমি ওদেরকে দিতে পারি না। সাহস পাই না। ওরা যদি জানতে পারে আমার কলারের নিচে কী লুকিয়ে আছে, আঁতকে উঠবে ভয়ে। জামা খুলে ফেললে নির্ঘাত চিৎকার দেবে।
পেশায় আমি স্থপতি এবং শিল্প সমালোচক। বছর দশেক আগে আমাকে একটি বিষয়ে বক্তৃতা দিতে অনুরোধ করা হয়। খুব প্রিয় বিষয় আমার: ইংলিশ ফ্রেসকো। ফ্রেসকো কী জানেন নিশ্চয়? দেয়ালচিত্র। সাধারণত ধর্মীয় থিম নিয়ে আঁকা হয় দেয়ালের ছবি। আর এরকম উদাহরণ ভূরি-ভূরি ছড়িয়ে রয়েছে গোটা ইংল্যাণ্ড জুড়ে। বক্তৃতার প্রস্তুতির জন্য আমি একখানা বই পড়ছিলাম: ‘The English Fresco in the Northern Countries’. একটি পৃষ্ঠার নিচে হাতে লেখা নোট: ওয়েটওয়েস্ট ইয়র্কশায়ার-চার্চের ভূগর্ভস্থ কক্ষ বা পাতালঘরে দেয়ালচিত্রের এক অনবদ্য উদাহরণ।
আমার কৌতূহল জাগল। ঠিক করলাম ওয়েটওয়েস্টে যাব এই ‘অনবদ্য’ দেয়ালচিত্র দেখতে।
ট্রেনে এবং ডাকগাড়িতে যাত্রা ছিল ভাবনার চেয়েও ক্লান্তিকর, তার ওপর আবার ওয়েটওয়েস্টের মাইল পাঁচেক বুনো জলা পাড়ি দিতে হলো পদব্রজে। শ্রান্তিতে আমার নেতিয়ে পড়ার দশা, কিন্তু ব্রিন হন্টন সফরটি বেশ উপভোগ করছিল। ব্রিন আমার কুকুর। তবে চেহারা নেকড়ের মত, বিশেষ করে যখন দাঁতমুখ খিঁচোয়। যদিও ও অতিশয় ভদ্র।
ওয়েটওয়েস্টের মত এমন বিবর্ণ ও নিরানন্দ জায়গা জীবনে দেখিনি। মেঠো পথের পাশে এলোপাতাড়ি গড়ে ওঠা দুই সারি কুটির। রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে তার এক মাথায় হতচ্ছাড়া চেহারার একটি সরাইখানা, আরেক ধারে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি গির্জা। বিষণ্ণ, মলিন বদন।
বিধ্বস্ত আমি সরাইখানায় ঢুকে একটি রুম ভাড়া চাইলাম। ওই গাঁয়ে আমিই প্রথম আগন্তুক শুনলেও অবাক হতাম না, কারণ আমার সাধারণ অনুরোধই বিস্মিত করে তুলল সরাইঅলাকে।
সকালে রুটি আর পনির দিয়ে নাশ্তা সারছি, সরাইঅলার পরিবারসহ গ্রামের আধডজন লোক আমাকে অবাক হয়ে লক্ষ করছিল, যেন আমি দূর দেশ থেকে আসা কোন বিচিত্র প্রাণী। আমার নজর কাড়ল মুখে কালিঝুলি মাখা, নগ্ন পায়ের ছোট একটি মেয়ে, হাঁ করে তাকিয়ে আছে। নাশতা শেষ করে যেন হাঁপ ছাড়লাম। বেরুলাম স্থানীয় পাদ্রীর খোঁজে।
লোকটির নিবাস গির্জার পেছনে, পাথরের তৈরি বাড়িতে। প্রাচীন চেহারার এক ভৃত্য আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল ছোট একটি স্টাডিরুমে। ওখানে আলমারি ভর্তি বই। ঘরের এক কোনায় একখানা আরামকেদারায় বসে নাক ডাকছিলেন ভৃত্যের প্রাচীন চেহারার মনিব।
‘গুড হেভেনস,’ আমার আগমন সংবাদের ঘোষণায় ঘুম ভেঙে লাফিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ।
‘আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।’
নিজের পরিচয় দিলাম। টুকটাক আলোচনা শেষে আসল কথায় চলে এলাম। জানালাম গির্জার পাতালঘরের দেয়ালচিত্র দেখার মানসে এসেছি।
‘পাতালঘর?’ তিনি অবিশ্বাসের সুরে পুনরাবৃত্তি করলেন। ‘ওটা প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তালাবদ্ধ।
‘চাবিটি দিতে পারবেন আমাকে?’
মাথা নাড়লেন তিনি।
‘কেন পারবেন না?’
বুড়ো এবার ভয়ে যেন সিঁটিয়ে গেলেন আরামকেদারার ভেতরে। ‘সে ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। বললে বিশ্বাসও করবেন না।’
আমি যা চাই তা পেয়ে ছাড়ি বলে আমার একটা বদনাম আছে। অগোছাল স্টাডিরুমের চারপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে মতলব ভাঁজছিলাম কীভাবে বুড়োকে পটানো যায়। লক্ষ করলাম একটি আলমারিতে পাখির ওপর অনেক বইপত্র রয়েছে।
‘আপনাদের এ এলাকায় পরিযায়ী বাজপাখি অনেক আসে নাকি?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘আসে তো! ভারি সুন্দর দেখতে পাখিগুলো, মি. … . ‘ব্লেক।’
‘পক্ষিবিজ্ঞানে আপনার আগ্রহ আছে, মি. ব্লেক?’
‘দারুণ,’ চাপা মারলাম।
বুড়োর চোখ জ্বলে উঠল খুশিতে।
‘তাহলে আরাম করে একটু বসুন। এক কাপ চা দিতে বলি?’
.
আমরা কথা বললাম- বলা উচিত বকবক করে গেলেন বুড়ো-পাখিদের সম্পর্কে; ফ্লাইক্যাচার, ফিঞ্চ, ডুবুরি পাখি গ্রিব, রাজহাঁস, গায়ক পাখি ওয়াধলার, ওয়েডার, খঞ্জনসহ আরও হরেকরকম পাখি। আধঘণ্টার মধ্যে তিনি সোৎসাহে বারকয়েক আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন, যেন আমি তাঁর জিগরি দোস্ত। আমি সুযোগ বুঝে পাতালঘরের কথা আরেকবার তুললাম।
‘ওহ,’ তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ‘আপনি আসলে বুঝতে পারছেন না, মি. ব্লেক, ওই পাতালঘরের ভয়ে থরহরিকম্প গ্রামবাসী। অনেক বছর আগে একটা ভীতিকর ঘটনা ঘটেছিল এ গাঁয়ে। ওরা যদি জানতে পারে পাতালঘর আবার খোলা হয়েছে, ডরেই মরে যাবে। এখানকার মানুষজন বড্ড কুসংস্কারাচ্ছন্ন।’
‘আমরা ছাড়া আর কারই বা জানা দরকার?’ বললাম আমি।
‘তাও বটে…তবে জানাজানি হতে তো সময় লাগে না।’
‘চার্চ অভ ইংল্যাণ্ড তো সবসময়ই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, নয় কি?’ নিরীহ গলায় প্রশ্ন করি আমি।
‘হ্যাঁ…অবশ্যই। আমি নিজেও এসব কুসংস্কারে বিশ্বাসী নই……
‘আপনার মত বুদ্ধিমান মানুষদের বিশ্বাস না করারই কথা,’ বিড়বিড় করলাম এ আশায় যদি তৈলমর্দনে কাজ হয়।
‘তা ঠিকই বলেছেন,’ ইতস্তত গলায় সায় দিলেন বৃদ্ধ।
চেয়ার ছাড়লেন তিনি। কিনারের ওক কাঠের কাবার্ড খুলে দুটো চাবির একটা গোছা বের করলেন। হাতে চাবির গোছা ঝুলছে, এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলেন বুড়ো, তারপর ফিরলেন আমার দিকে।
‘আমি চাবি দিতে পারি তবে একটি শর্তে, মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে বুড়োর। : অনুরোধটি রক্ষা করতে হবে আপনাকে।’
‘নিশ্চয়ই।’
‘গির্জার উত্তর দিকের দেয়ালের বাইরে, এক প্রস্থ সিঁড়ির নিচে পাতালঘর। ওখানে দুটি দরজা। এই ছোট চাবিটি দিয়ে বাইরের দরজা খোলা যাবে। এরপরে একটি প্যাসেজ দেখতে পাবেন। প্যাসেজে ঢোকা মাত্র পেছনে দরজা বন্ধ করে দেবেন।’
‘আচ্ছা।’
‘আর এই বড় চাবিটি দিয়ে ভেতরের দরজা খুলতে পারবেন। দরজার পরেই পাতালঘর। চটজলদি ঢুকবেন পাতালঘরে এবং পেছনে দরজা বন্ধ করে দেবেন সাথে সাথে। আমার কথা বুঝতে পারলেন?
‘পেরেছি।’
‘পাতালঘর থেকে বেরিয়ে আসার পরে একই প্রক্রিয়া অবলম্বন করবেন। অর্থাৎ বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পেছনে বন্ধ করে দেবেন দরজা। যা যা বললাম ঠিক তেমনটি করবেন তো?’
‘অবশ্যই করব।’
‘বেশ। আমার কথা আপনার কাছে বুড়ো মানুষের প্রলাপ মনে হতে পারে, কিন্তু যদি শুনতেন ওই পাতালঘর সম্পর্কে আমি কী জানি…’
‘কী জানেন?’
বুড়ো মুখ কঠিন করে রইলেন। জবাব মিলল না।
.
গির্জার উত্তর দিকের দেয়ালের সিঁড়িতে আরেকটু হলেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। ঘাস আর আগাছার যথেচ্ছ বৃদ্ধিতে প্রবেশপথ প্রায় ঢেকে আছে। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম কেউ আমাকে লক্ষ করছে কিনা দেখতে। তারপর ঘাসের জঙ্গল হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে স্যাঁতসেঁতে শেওলাধরা সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলাম।
‘ব্রিন! এদিকে আয়!’
প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে আমার কুকুর আমাকে অনুসরণ করল। একটি মোমবাতি জ্বাললাম, অপর মুক্ত হাতে বাইরের দরজার তালায় ঢোকালাম দুটি চাবির অপেক্ষাকৃত ছোটটি। খানিক ধস্তাধস্তির পরে চাবি ঘোরানো গেল। হাতল ধরে টান দিলাম। প্রথম টানে খুলল না দরজা। জোর খাটাতে হলো জংধরা দোর খুলতে। অবশেষে খুলে গেল দরজা।
বুড়োকে কথা দিয়েছি, কাজেই কথা রাখতেই হবে। দরজা খুলে ব্রিনকে নিয়ে চট করে ছোট প্যাসেজটিতে ঢুকেই পেছনে বন্ধ করে দিলাম কপাট। ভেতরে কেমন বোটকা গন্ধ। দরজা বন্ধ করতে আপত্তির স্বরে খুনখুন করে উঠল ব্রিন। ভেতরের দরজায় দ্বিতীয় চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই খুলে গেল তালা। আমরা দু’জনেই এখন পাতালঘরে প্রবেশ করেছি।
আরও দুটো মোমবাতি জ্বালতে আলোকিত হয়ে উঠল ভূগর্ভস্থ কক্ষ। নিরেট পাথরে তৈরি একটি কামরায় চলে এসেছি আমরা। কর্কশ খিলান আর স্থূল চেহারার খাম্বার ওপর শুয়ে আছে ছাদ। একদিকের দেয়ালে রীতিমত পিলে চমকানো একটি দৃশ্য চোখে পড়ল: পাথুরে একখানা তাকে থরে-থরে সাজানো শত-শত হাড়গোড় আর কয়েক ডজন খুলি। ছাদ ছুঁইছুঁই স্তূপাকার হাড় আর খুলি। তবে বিপরীত দিকের দেয়ালে অপূর্ব এক দেয়ালচিত্র চোখে পড়ল। অমন সুন্দর ফ্রেসকো জিন্দেগিতে দেখিনি।
.
এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এত সুন্দর পেইন্টিঙের কথা কল্পনাই করা যায় না। চিত্রাঙ্কনের বিষয়বস্তু অ্যাসেনসন বা যিশুর পুনরুজ্জীবনের চল্লিশ দিন পরের স্বর্গারোহণ। অনুমান করলাম এ দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছে পঞ্চদশ শতকের প্রথমভাগে। কী যে সুন্দর ফিনিশিং, ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে আমি ইজেল এবং পেন্সিল হাতে নিয়ে আঁকতে শুরু করলাম।
কাজে ডুবে ছিলাম বলে লক্ষ করিনি ব্রিন এখানে কিছুতেই থিতু হতে পারছে না। অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। দেয়ালচিত্র দেখে আমার কুকুরটা মোহিত হবে এতটা আশা নিশ্চয়ই করা যায় না। তবে আধঘণ্টা চলে যাওয়ার পরেও ওর অস্থিরতা কমল না। ব্রিন যেন বুঝতেই পারছে না কী করবে। আমি ওকে হুকুম দিলাম চুপচাপ শুয়ে থাকতে। বেজার মুখে আমার আদেশ পালন করল ব্রিন, হাড়গোড় ভরা পাথুরে তাকের নিচে শুয়ে থেকে বাকি সময়টা আমার দিকে তাকিয়ে রইল দুই থাবার মধ্যে মুখখানা রেখে। তবে চেহারায় ফুটে থাকল অস্বস্তি।
ঘণ্টাখানেক পার হয়েছে কিনা সন্দেহ, দেখি মোমবাতির আলো প্রায় নিভু-নিভু। ছ’টা বাজে। আমি ইজেল, পেন্সিল ইত্যাদি গোছাতে শুরু করলাম। লাফ মেরে সিধে হলো ব্রিন, এক ছুটে চলে গেল দরজার কাছে। কপাট খামচাতে লাগল। এখান থেকে বেরুতে পারলেই যেন বাঁচে। আমি ওর পাশে এসে দাঁড়ালাম। ব্রিন ততক্ষণে অস্থিরভাবে ঢুস দিতে শুরু করেছে দরজায়।
আমি তালায় চাবি ঢুকিয়ে খুলে ফেললাম দরজা। ব্রিন এক লাফে ছুটে গেল সরু প্যাসেজে, পাতালঘরে আমাকে একা ফেলে রেখে। এমন সময় একটা ঘটনা ঘটল।
আমি খুব একটা ভীতু প্রকৃতির মানুষ নই, তবে পেছনে একটা শব্দ হতে লাফিয়ে উঠলাম। শব্দ নয়। আসলে হুড়মুড় করে কী যেন ভেঙে পড়েছে। যেন ফুলদানি মেঝেতে আছড়ে পড়ে টুকরো হয়ে গেছে। আমার ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল, বগলের নিচে অদ্ভুত একটা সুড়সুড়ি অনুভূত হলো। মন্থর গতিতে ঘুরে দাঁড়ালাম হাতের পাঁচ একমাত্র মোমবাতিটিকে সম্বল করে। ফিরে চললাম পাতালঘরে।
মেঝেতে, হাড়ের তাকের নিচে ভেঙে চৌচির একটি মানুষের মাথার খুলি। ভয়ানক কোন ব্যাপার নয় দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ পাতালঘরে কেউ প্রবেশ করেনি। কাজেই আমার আগমনে কোন না কোনভাবে এখানকার কোন কিছুতে ছন্দপতন ঘটে গেছে। দমকা বাতাসেই হয়তো খুলিটি পড়ে গেছে তাক থেকে। ভাঙা টুকরোগুলো তুলে নিলাম। এগুলো একসময় যা-ই থাকুক না কেন, এখন ক্যালসিয়াম ফসফেটের খণ্ডাংশ ছাড়া কিছু নয়। ওগুলো সাবধানে রেখে দিলাম অন্যান্য হাড়গোড় এবং খুলির মাথার ওপর। তারপর বেরিয়ে এলাম প্যাসেজে। ওখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল কম্পমান ব্রিন। আমি পাতালঘরের দরজায় তালা মেরে দিলাম।
অস্বীকার করব না, ছোট প্যাসেজটি ধরে হাঁটার সময় এক ধরনের অস্বস্তি ঘিরে থাকল আমাকে। হয়তো ব্রিনই এজন্য দায়ী। কারণ কোন কারণে সে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। মোমের আলো বড্ড বড্ড দুর্বল, মেঝে বা প্যাসেজের কোনাকাঞ্চিগুলো পুরোপুরি আলোকিত করতে পারেনি। আমি পকেট হাত ঢুকিয়ে চাবি হাতড়ালাম।
বাইরের দরজাটি খুলেছি, এমন সময় আমার পায়ে কী যেন ঘষা খেল। একই সঙ্গে, মনে হলো কয়েক ইঞ্চি ফাঁকা দরজার ফাঁক দিয়ে কী যেন সাঁৎ করে বেরিয়ে গেল। কী দেখেছি বলা মুশকিল। ইঁদুর? হয়তোবা। কিন্তু অমন জায়গায় কোন ইঁদুর কি বেঁচে থাকতে পারে? তবে ওটা যা-ই হোক, সবেগে ছুটে গেলে দরজা খোলা পেয়ে। আমি আরও ফাঁক করলাম দরজা। ব্রিন লাফ মেরে বেরুল। তবে সেঁটে থাকল আমার সঙ্গে। মুক্ত, তাজা বাতাসে শ্বাস নিতে ভাল্লাগছে।
পাদ্রীর বাড়ি ফিরে তাকে চাবি দেয়ার সময় মনে-মনে বললাম আমি আসলে তখন ইঁদুরই দেখেছি। অন্য কিছু ভাবা মানে পাদ্রী প্যাট্রিক হিগিন্সের মত কুসংস্কারে বিশ্বাস করা।
.
পরদিন সকালে নাশ্তা করতে এসে একটি দুঃসংবাদ শুনতে পেলাম। কালিঝুলি মাখা, নগ্ন পায়ের সেই ছোট মেয়েটি গত রাতে মারা গেছে। সে সরাইমালিকের পড়শীর মেয়ে। নাশ্তা দেয়ার সময় অশ্রুসজল চোখে খবরটি আমাকে জানাল সরাইমালিকের বউ। মেয়েটিকে দেখে মনে হয়েছিল সামান্য অপুষ্টিতে ভুগছে, এছাড়া শরীর-স্বাস্থ্য তো খারাপ ছিল না। যখন জানতে চাইলাম কীভাবে মারা গেছে মেয়েটি সরাইঅলার স্ত্রী আঞ্চলিক উচ্চারণে, কাঁদতে-কাঁদতে যে
বলল প্রায় কিছুই বুঝতে পারলাম না। শুধু এটুকু উদ্ধার হলো বেচারী তার বোনদের সঙ্গে যে বিছানায় ঘুমাত, সেখানে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আমার মনটাই গেল খারাপ হয়ে, তবু নাস্তা সেরে, পাদ্রীর কাছ থেকে চাবি নিলাম সেই পাতালঘরে গিয়ে আঁকার কাজটি শেষ করব বলে। ওয়েটওয়েস্টে আমি আগন্তুক মাত্র, সহানুভূতি জানানো ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারি।
যাজক মহাশয় চাবির গোছা হাতে তুলে দেয়ার সময় আবারও আগের সতর্কবাণীর পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি সম্ভবত জানেন না গাঁয়ে একজন মারা গেছে, তাই আমি ঘটনাটি বললাম। তিনি সঙ্গে-সঙ্গে কোট গায়ে দিয়ে মেয়োটর বাড়ি চললেন তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে।
.
গির্জার তলকুঠুরিতে আজ কিছু ঘটল না। আমি ব্রিনকে বাইরে ছেড়ে দিলাম খরগোশ তাড়া করতে। পাতালঘরে ও গিয়ে কী করবে? ভেতরে আজ কোন মড়ার খুলি তাক থেকে খসে পড়ল না কিংবা কোন ইঁদুর অকস্মাৎ ছোটাছুটি করে আমার পিলে চমকে দিল না। শব্দ বলতে শুধু ক্যানভাসের বুকে আমার পেন্সিল আর ব্রাশ ঘষার খসখস। দিনটি বেশ দ্রুতই শেষ হয়ে গেল। সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ পাদ্রীকে পাতালঘরের চাবি ফেরত দিতে এলাম।
‘বাচ্চা মেয়েটা,’ জিজ্ঞেস করলাম তাঁকে, ‘ওর মৃত্যুর কারণ জানা গেছে?’
‘নাহ্। আমি ডাক্তার ডাকতে পাঠিয়েছি। কিন্তু সে থাকে কুড়ি মাইল দূরে। কাল সকালের আগে আসতে পারবে না। শুধু জানলাম সকালে ওরা দেখেছে মেয়েটির শরীর হিমশীতল হয়ে আছে। ওর বাবা-মা আমাকে লাশ দেখতে দেয়নি।’
‘খুবই দুঃখজনক ঘটনা।’
‘ঠিকই বলেছেন, মি. ব্লেক। খুব দুঃখজনক ঘটনা।’ আমি ফিরে এলাম সরাইখানায়। রাতের খাবার খেয়ে সোজা চলে গেলাম নিজের রুমে।
.
পরদিন, তৃতীয় এবং শেষবারের মত চাবি আনতে গেলাম। দেয়ালচিত্র নকলের কাজ প্রায় শেষ, আর দুই-তিন ঘণ্টা কাজ করলেই হবে। কিন্তু যাজক মহাশয়কে দেখলাম চাবি দিতে মোটেই আগ্রহবোধ করছেন না। পড়ার ঘরে, কপাল টিপে ধরে জোরে-জোরে পায়চারি করছেন। আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমার দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘মি. ব্লেক, আমি এবং আপনি গুরুতর একটি অন্যায় করে ফেলেছি।’
তাঁর কথা শুনে এমন অবাক হয়ে গেলাম, রা জোগাল না মুখে।
‘আব্রাহাম কেলি মারা গেছে-খুন হয়েছে-এবং এজন্য আমরাই দায়ী।’
‘কিন্তু…কে আব্রাহাম কেলি? আর তার মৃত্যুর জন্য আমরা দায়ী হব কেন?’
‘সে গাঁয়ের কামার। আজ সকালে তাকে তার বিছানায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেই বাচ্চা মেয়েটির মত।’ পাদ্রী ধপ করে বসে পড়লেন আরামকেদারায়, চোখে প্রায় জল এসে গেছে।
‘ডাক্তার এসেছিলেন আমার কাছে। দুটো লাশই পরীক্ষা করেছেন। মৃত্যুর কারণও বলেছেন। শ্বাসরোধ করে হত্যা! বাচ্চাটাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে, মি. ব্লেক। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ওয়েটওয়েস্টে সেই শয়তানটার আবার আবির্ভাব ঘটবে!’
আমি কিছুই বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, ‘সাহেব, আপনি কী বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না!’
তিনি আমার দিকে বিতৃষ্ণার দৃষ্টিতে তাকালেন।
‘আপনাকে একটা গল্প শোনাই, মি. ব্লেক। পঞ্চাশ বছর আগে, আমি তখন বয়সে তরুণ, এ গাঁয়ে এসেছিলাম। ওইসময় ওয়েটওয়েস্টে একজন ভূস্বামী ছিলেন। তাঁকে সবাই চিনত লৰ্ড অভ দ্য ম্যানর অভ ওয়েটওয়েস্ট হিসেবে। তাঁর আসল নাম স্যর রজার ডেসপার্ড এবং তিনি…’
‘ওয়েটওয়েস্টে ম্যানর হাউস ছিল নাকি?’ মাঝপথে কথা বলে উঠলাম।
‘এখন আর নেই। স্যর রজারের মৃত্যুর পরে বাড়িটি ভেঙে সমস্ত পাথর নিয়ে যাওয়া হয়। বাগান খোঁড়া হয়, গোটা উঠনে লাগানো হয় ঘাস, এখন কোন ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
‘কিন্তু…কেন?’
‘কারণ স্যর রজার ডেসপার্ড ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে শয়তান মানুষ। পঞ্চাশ বছর আগে আমি যখন এখানে আসি, স্যর রজার তখন মৃত্যুশয্যায়। অত্যাচারী এ জমিদার কত মানুষ যে খুন করেছেন তার হিসেব নেই। নিষ্ঠুরতার কাছে তিনি যেন নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
‘কিন্তু কেউ তাঁকে কিছু বলত না?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘কর্তৃপক্ষ….
‘তিনিই ছিলেন কর্তৃপক্ষ। তিনি ছিলেন জুডিশিয়াল অফিসার এবং পার্লামেন্ট সদস্য। ওইসব দিনে খুব বেশি পুলিশ ফোর্স ছিল না। কাজেই এরকম ছোট একটি জমিদারিতে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা।’
আমি শুধু সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালাম।
‘এ গাঁয়ে মাস ছয়েক থাকার পরে,’ বলে চললেন পাদ্রী, ‘আমি ক্রমে স্যর রজারের ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পর্কে জানতে পারি। কী করব বা কী করা উচিত তা নিয়ে বিবেকের সঙ্গে আমার যুদ্ধ চলছিল। তবে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়ে গেল যেদিন ম্যানর হাউস থেকে আমাকে ডেকে পাঠানো হলো। তখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন স্যর রজার। ওই খুনি বাড়িতে ঢুকতে আমার ভয় লাগছিল। কিন্তু একজন ধর্মযাজক হিসেবে তাঁর সঙ্গে দেখা করা ছিল আমার কর্তব্য। অনেক ভয়ঙ্কর পাপীতাপীকে দেখেছি মৃত্যু সন্নিকট জেনে অনুতাপ করেছে।’
তিনি ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারের কিনারা চেপে ধরলেন। চেহারায় ফুটে উঠেছে এক ধরনের হাল ছেড়ে দেয়া ভাব আর হতাশা।
‘সেই ভবনটির কথা আজও আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে, যেন সেদিনই দেখেছি। যদিও ওই বাড়ি বহু আগে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। চার কোণে চারটে খাড়া টাওয়ার, সময়ের কষাঘাতে কালো হয়ে গেছে। শোনা যায়, স্যর রজার চারটে টাওয়ারের একেকটি বেছে নিতেন নানারকম নির্যাতন আর অত্যাচারের গবেষণা চালাতে।
লোহার তৈরি প্রকাণ্ড সদর দরজা। আমি ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো যেন কোন অন্ধকূপে প্রবেশ করেছি। স্যর রজারের এক চাকর যেভাবে আসুরিক শক্তিতে আমার হাত খামচে ধরে থাকল, যেন আমি এক কয়েদী। লোকটা বিশালদেহী। বোবা। চেহারা বনমানুষের মত। সে আমাকে অন্ধকার করিডোর ধরে টানতে-টানতে নিয়ে চলল স্যর রজার ডেসপার্ডের বেডরুমে। সেখানে এক ভয়ানক দৃশ্য দেখতে পেলাম। ঘরটি বোঝাই নানান অস্ত্র। ছুরি, কুঠার, গদা, ডাণ্ডা, তরবারি, গাদা বন্দুক, পিস্তল-কী নেই ওখানে! ঘরের মাঝখানে, পর্দা ঘেরা প্রকাণ্ড এক পালঙ্কে দানব লোকটি শুয়ে আছেন।’
‘আপনি তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলেন?’
‘না। তবে তাঁর সাড়া পাচ্ছিলাম। তিনি ঘড়ঘড় শব্দে লম্বা-লম্বা শ্বাস নিচ্ছিলেন। আমি বাইবেল বুকে চেপে, সাহস সঞ্চয় করে, তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললাম: “আজ আপনার প্রায়শ্চিত্তের দিন। যদিও আপনি জীবনে অনেক পাপ করেছেন, তবু প্রভু তাদেরকে দয়া করেন যারা অনুতপ্ত হয়, তিনি তাদেরকে তার দরবারে ঠাঁই দেন।”
‘ঘড়ঘড় শ্বাসের আওয়াজ একটু কমে এল। আমি ভাবলাম তিনি হয়তো আমার কথার মাজেজা নিয়ে ভাবছেন।’
পাদ্রী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। জানালার সামনে গেলেন। বাইরের রুক্ষ অনাবাদি জমির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘এরপরে কী বলব ভাবছি, এমন সময় ক্রোধ এবং যন্ত্রণার সংমিশ্রণের একটা গর্জন শুনতে পেলাম। পর্দাটা টেনে সরানো হলো এবং দেখতে পেলাম…..
জাফরি কাটা জানালার কাচে কপাল ঠেকালেন পাদ্রী।
‘…দেখতে পেলাম এক জ্যান্ত নরকঙ্কালকে। অত্যন্ত ভয়ঙ্কর চেহারা। তাঁর গায়ের বিবর্ণ চামড়া অসুখের কারণে বেগুনি-ধূসর রঙ ধারণ করেছে। কোটর ঠেলে আসা বিরাট দুই চোখ। শীতল এবং নিষ্পলক। চোখের তারা দুটো ছোট, সাদা অংশের বিস্তৃত ব্যাপ্তি উন্মাদের চাউনি দান করেছে। হাঁ করা মুখ বেঁকে আছে একদিকে, বেরিয়ে পড়েছে হলুদ দাঁত। কালো ঠোঁট জোড়া ডেলা পাকানো। এ যেন ফাঁসিকাঠে ঝোলানো কোন নৃশংস অপরাধীর চেহারা কিংবা পিশাচের মুখ।
আমি কুসংস্কারাচ্ছন্ন না হলেও অর্ধ মানব, অর্ধ দানব স্যর রজার ডেসপার্ডের এহেন বর্ণনা শুনে শিরশির করে উঠল শরীর। পাদ্রী জানালা থেকে ঘুরে দাঁড়ালেন, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। গা ছমছমে এ গল্পের শেষটা শোনার জন্য আমি নীরবে অপেক্ষা করছি।
‘তিনি উঠে বসার চেষ্টা করলেন। গুঙিয়ে উঠলেন ব্যথায়। লম্বা, হাড্ডিসার আঙুল দিয়ে আমাকে ইশারা করলেন তাঁর কাছে যেতে। আমি কদম বাড়ালাম। ভাবলাম যন্ত্রণাদায়ক এ মৃত্যুভয় হয়তো তাঁর মনে অনুতাপের জন্ম দিয়েছে। তিনি অনুতাপ করে কিছু বলবেন। “বলুন, ফিসফিস করলাম আমি।
“আমি…তোমাকে… খুন… করব…” গুঙিয়ে উঠলেন তিনি। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, মি. ব্লেক, ভয়ে আমি এক লাফে· পিছিয়ে গেলাম, ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে সিধে হওয়ার চেষ্টা করছি, তিনি খনখনে গলায় হেসে উঠলেন। তারপর খ্যাক্কর-খ্যাক্কর কাশতে লাগলেন।
“ভয় পেয়ো না,” কাশির দমক শেষ হলে ফিসফিসালেন তিনি। “আমার অত শক্তি নেই।”
‘“আপনার পাপ স্বীকার করুন,” অনুনয় করলাম আমি, “নতুবা অনন্তকাল কাটাতে হবে নরকের গভীরতম গর্তে।”
‘প্রত্যুত্তরে তিনি শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করলেন, “বেশ!”
‘আমি তখন ভয়ে কাঁপছি। তাঁকে দেখে আস্ত একটি শয়তান বলে মনে হচ্ছিল।
“আপনার কোন আফসোস আছে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘তাঁর বিকৃত মুখে বেদনার ছাপ ফুটে উঠল। তবে শারীরিক ব্যথা নয়, মানসিক যন্ত্রণা।
“আছে!”
“তাহলে বলুন কী সেই আফসোস,” আমি এবারে একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম।
“কাছে এসো; যাজক, হিসিয়ে উঠলেন তিনি, হাড়সর্বস্ব আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন। “আমি জোরে কথা বলতে পারছি না।”
‘সাহস করে তাঁর কাছে গেলাম। তিনি বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় আছেন, হাপাচ্ছেন।
“বলুন আপনার আফসোস কী।”
“যাজক, আমি পারছি না-আমি ভাবতেই পারছি না যে-”
“হ্যাঁ, বলুন!”
“আরও কাছে এসো।”
‘আমি তাঁর আদেশ পালন করলাম। তিনি আমার দিকে ঝুঁকে এলেন। তাঁর কালো ঠোঁট আমার কান থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক দূরে।
“আমি ভাবতেই পারছি না যে আর মানুষ খুন করতে পারব না!”
‘তাঁর কথা শুনে আঁতকে উঠেছিলাম, মি. ব্লেক। ভয়ে জমে গিয়েছিল শরীর। তিনি আবার খলখল করে হেসে উঠলেন এবং সেই সঙ্গে শুরু হলো বেদম কাশি। আমি এক লাফে পিছু হটলাম। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। কাশতে কাশতে তাঁর দম প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। এমন সময় শরীরে খিঁচুনি শুরু হলো। বুঝতে পারছিলাম এ লোকের আয়ু আর বেশি নেই। তিনি রাগে-দুঃখে ফোঁপাতে শুরু করলেন, মারা যাচ্ছেন ভেবে নয়, আর কাউকে হত্যা করতে পারবেন না সেই শোকে।
“আমি আরও একবার হত্যা করব!” ষাঁড়ের মত গাঁকগাঁক করে উঠলেন স্যর রজার ডেসপার্ড। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি জড় করে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লেন মেঝেতে, হাতে ছুরি এবং…’
আমি আর কৌতূহল ধরে রাখতে পারলাম না।
‘এবং কী?’
‘এবং নিজের হাতে ছুরিকাঘাত করতে লাগলেন!’
‘ওহ, মাই গড!’
‘গায়ে ছুরি দিয়ে কোপ মারার শক্তি তাঁর ছিল না। তবু তিনি তা করতে চাইছিলেন। আমি এমন ভয় পেয়ে যাই যে তাঁকে বাধা দেয়ার সাহসও হয়নি। তিনি ছুরি দিয়ে নিজের হাতে পোঁচ মেরে যেতে লাগলেন। শেষে তাঁর হাত রক্তাক্ত একটি মাংসপিণ্ডে পরিণত হলো। কাটা হাতখানা পড়ে রইল তাঁর পাশে মেঝের ওপর। মোচড় খাচ্ছে।
“এটাই আপনার শেষ সুযোগ,” আমি নিচু গলায়
বললাম তাঁকে। “অনুশোচনা করুন।”
‘আমার দিকে তাকালেন তিনি। তাঁর চোখের জ্যোতি ইতিমধ্যে নিভে যেতে শুরু করেছে। তবে তখনো তাঁর কিছু কথা বলার বাকি ছিল।
“আমি, স্যর রজার ডেসপার্ড,” হিসহিসে শোনাল তাঁর কণ্ঠ, “এই কাটা হাতখানা রেখে যাচ্ছি হত্যা করা এবং অঙ্গচ্ছেদ…”
‘আর কথা জোগাল না তাঁর মুখে। আমার চোখে চোখ রেখে স্থির হয়ে গেলেন।’
পাদ্রী ফিরে এলেন নিজের চেয়ারে। ক্লান্ত চেহারা নিয়ে বসে চোখ ঘষতে লাগলেন।
“তলকুঠুরির ঘরে, হাড়গোড়ের তাকের পেছনে, পাথরের কফিনে ডেসপার্ডকে কবর দেয়া হয়, সঙ্গে কাটা হাতখানাও। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ওই পাতালঘর কোনদিন খোলা হবে না। খোলা হতও না যদি না আপনি ওয়েটওয়েস্টে এসে হাজির হতেন এবং আপনার কথায় যদি আমি পটে না যেতাম।’
তিনি হাত ইশারায় আমাকে চলে যেতে বললেন। আবার ঘুরলেন জানালায়, দৃষ্টি পুনরায় নিবদ্ধ হলো অনাবাদি জমিতে।
পাদ্রীর আতঙ্কের গল্প শুনে গা শিরশির করলেও আমি এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করিনি যে মরা মানুষটার কাটা হাতখানা পাতালঘর থেকে বেরিয়ে এসে দু’দুটো খুন করেছে। চিন্তাটাই তো হাস্যকর। তবে পাদ্রী কিছুতেই চাবি দিতে রাজি হলেন না। তাঁর এ আচরণ কোন যুক্তির মধ্যেই পড়ে না। কাটা হাত যদি সত্যি পালিয়ে গিয়ে থাকে যা একেবারেই অবাস্তব এবং অসম্ভব—ওটা তো এখন বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর সত্যি যদি ওটা বাইরে থাকে, তাহলে পাতালঘর তালা মেরে রাখলেও তো কোন লাভ হচ্ছে না।
পাঠকদের মনে আছে নিশ্চয়ই, শুরুতেই বলেছিলাম- আমি যা চাই তা অবশেষে পেয়ে ছাড়ি। দেয়ালচিত্র নকলের কাজটি প্রায় শেষ করে এনেছি, পুরোপুরি শেষ না করাটা মোটেই ঠিক হবে না। তাই ঠিক করলাম আরও দু’একদিন ওয়েটওয়েস্টে থাকব, যদি কোনভাবে চাবি জোড়া হাতে পাওয়া যায়। যেভাবেই হোক ওই চাবি আমাকে পেতেই হবে।
.
সেই রাতে তাড়াতাড়ি বিছানায় গেলাম। তবে বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারলাম না ব্রিনের গোঙানিতে। নিচু গলায় গোঁ-গোঁ করছে। মাঝে-মাঝে ঘুমের মধ্যে এরকম করে ও। আমি ওকে চুপ করতে বললাম। তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে চাদরের নিচে গুঁজে দিলাম মাথা। কিন্তু ব্রিনের গোঙানি থামল না। চিৎকারের মাত্রা এমন বেড়ে গেল যে বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল ওটা আমার পোষা কুকুর।
‘ব্রিন, চুপ কর!’ অন্ধকারে খেঁকিয়ে উঠলাম আমি।
কিন্তু আমার ধমকে কাজ হলো না। বেডসাইড টেবিলে হাত বাড়িয়ে জ্বেলে নিলাম একটি মোমবাতি। জানোয়ারটার কি মাথা-টাথা খারাপ হয়ে গেছে? ওর চোখ কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমার দিকে তাকিয়ে আছে ভীষণ দৃষ্টিতে। আমি শেষবারের মত ওকে চেঁচামেচি করতে মানা করলাম। কিন্তু ব্রিন আমার কথায় কান না দিয়ে দাঁত- মুখ খিঁচিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি চকিতে পিছু. হটতে গিয়ে হাতের ধাক্কায় মোমটা নিচে পড়ে গিয়ে নিভে গেল। ঘর ডুবে গেল অন্ধকারে। টার্গেট মিস হলো। জোরে লাফ দিয়েছিল ব্রিন। কিন্তু ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনি। আমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়ল মেঝেতে। ক্রুদ্ধ গর্জন ছাড়ছে।
কুত্তাটা পাগল হয়ে গেছে, নিশ্চিত আমি। এক লাফে নেমে পড়লাম বিছানা থেকে। দিলাম ছুট দরজার দিকে পালাবার ব্যর্থ চেষ্টায়। হাতলে হাত রেখেছি, ঘাড়ের পেছনে হামলে পড়ল ব্রিন। কামড়ে ধরেছে ঘাড়। আমি হাঁটু ভেঙে বসে পড়লাম মেঝেতে। বন্ধ হয়ে আসছে শ্বাস। ব্রিনকে ছাড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা করছি। কিন্তু মাথার পেছনে হাত নিয়ে যাওয়াই সার হলো। আমার হাত শূন্যে বাতাস কাটল। ওখানে কেউ নেই, কিছু নেই!
প্রবল ভয় আমাকে পেয়ে বসল। ব্রিন আমাকে কামড়ে ধরেনি, অথচ তীব্র ব্যথা অনুভব করছি গলায় এবং ফুসফুসে। আবার ঘাড়ে চলে গেল হাত। এবারে পিচ্ছিল, ভয়ঙ্কর এবং শীতল একটা জিনিসের স্পর্শ পেলাম। ওটা স্যর রজারের কাটা হাত। আমার গলা চেপে ধরেছে! অন্ধকারে আমি ডিগবাজি খেয়ে পড়ে গেলাম। প্রাণপণ চেষ্টা করছি গলায় সাঁড়াশির মত চেপে থাকা ভীতিকর জিনিসটা থেকে মুক্ত হতে।
ব্রিন নিশ্চয়ই আবারও লাফ দিয়েছে। কারণ একটা ধাক্কা লাগল গায়ে। আমি মেঝেতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছি, আমার গলা চেপে ধরা হাতটাকে বোধহয় কামড়ে ছুটিয়ে ফেলার চেষ্টা করছিল ব্রিন। কারণ একটু পরে প্রচণ্ড শক্তিতে আমার গলা চেপে রাখা মুঠো আলগা হলো। আমি মেঝেতে চিত হয়ে বেদম হাঁপাতে লাগলাম। হাঁ করে বাতাস টানছি। শকের মাত্রা একটু কমলে সেখানে আশ্রয় নিল ব্যথা। প্রচণ্ড দুর্বল লাগছে শরীর। বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে মাথা। ব্রিন যদি আর কয়েক সেকেণ্ড দেরি করত তাহলেই গেছিলাম আর কী!
তবে ব্রিনের সঙ্গে কাটা হাতের লড়াই তখনো থামেনি। মেঝেতে দুমদাম শব্দে পড়ছে তৈজসপত্র এবং আসবাব। ব্রিন গরগর শব্দ করছে, শব্দ শুনে মনে হলো কিছু একটা কামড়ে ধরেছে। তারপর সে করুণ, দীর্ঘ স্বরে গোঙাতে লাগল, প্রায় ফোঁপানির মত আওয়াজ। তারপর সব চুপচাপ। আমি অন্ধকারে শুয়ে থাকলাম, প্রায় অর্ধ মৃত, কিছু শুনতে পাচ্ছি না, তারপর…ওটা কী? কীসের শব্দ? খসখস একটা আওয়াজ। না, ঠিক তা নয়। কিছু একটা ঘষটে ঘষটে এগিয়ে আসছে মেঝে দিয়ে।
আমি কোনমতে সিধে হয়ে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে পড়লাম বিছানায়। খাটের পাশের টেবিলটি এখনো আস্ত আছে, হাতড়ে মোমবাতি এবং দেশলাইও পাওয়া গেল। একটি মোমবাতি জ্বেলে নিলাম। দপদপ করে জ্বলল শিখা। সেই আলোতে দেখতে পেলাম…
এই প্রথম হাতটাকে দেখছি আমি। প্রচণ্ড ভয়ে আকাশ- বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার দিলাম। হাতটা থেঁতলে গেছে, ক্ষতবিক্ষত, তবু ওটা মেঝের ওপর দিয়ে সরীসৃপের মত এঁকেবেঁকে এগিয়ে আসছে আমার দিকে দৃঢ় সঙ্কল্প নিয়ে। ওটার ক্ষত থেকে ঝরছে কালো রক্ত। কাটা হাতটির পেছনে, গলায় গভীর কাটা দাগ নিয়ে এগিয়ে আসছে ব্রিন। ওটার কবল থেকে আমাকে বাঁচাতে চাইছে। কিন্তু ওই প্রায় ছিন্নভিন্ন গলা নিয়ে ও নিজেই বাঁচবে কিনা সন্দেহ।
ওইসময় নিজের ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ আমার চলে যায়। অজ্ঞানের মত হয়ে গিয়েছিলাম আমি। পড়ে গেলাম মেঝেতে। ফোঁপাচ্ছি। নড়াচড়া করতে অক্ষম আমি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলাম ভয়ানক জিনিসটার দিকে। ওটা ঘষটে-ঘষটে এখনো এগিয়ে আসছে নিথর আমার শরীরের দিকে। মৃত্যু আমার সুনিশ্চিত ভেবে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। তবে জ্ঞান হারাবার পূর্বমুহূর্তের যে স্মৃতিটি মনে আছে তা হলো ক্ষতবিক্ষত হাতটি মন্থর গতিতে আমার ঘাড় লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছিল। ওটার মধ্যমা ধীরে-ধীরে প্রসারিত হয়, হলুদ থাবার মত নখ আমার গলার চামড়ায় গেঁথে যায়। মৃত্যুর সেই ভয়াল স্পর্শের পরে আমার আর কিছু মনে নেই।
.
কেউ একজন বলল, ‘হ্যাঁ, ওনার জ্ঞান ফিরছে।’
চোখ মেলে চাইলাম। অচেনা একটা ঘরে আমি, অচেনা এক লোক আমার ওপর ঝুঁকে আছে।
‘কী…… আমার গলা দিয়ে ব্যাঙের আওয়াজ বেরিয়ে এসে থেমে গেল। গলায় অসহ্য ব্যথা।
‘কথা বলবেন না,’ বলল লোকটা। ‘আমি একজন ডাক্তার। আপনার গলা একদম থেঁতলে গিয়েছিল। আপনি চার দিন অজ্ঞান হয়ে ছিলেন। তকদিরের জোরে বেঁচে ফিরেছেন। এটা পাদ্রী সাহেবের ঘর। আপনি বিশ্রাম নিন।’
আরও সপ্তাহখানেক বাদে রা ফিরে এল আমার। তবে দুই সপ্তাহের আগে আমাকে কথা বলতে দিলেন না পাদ্রী সাহেব।
‘কী হয়েছিল?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘পরিচারকের পরিবার আপনার রুম থেকে দুড়ুম-দাড়ুম আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল,’ বললেন তিনি। ‘ওরা বুঝতে পারছিল ওসব ওই কাটা হাতের কাণ্ড। তবে আপনাকে সাহায্য করতে ভয় পাচ্ছিল বলে আমাকে খবর দেয়।’
‘আপনি?’ বিছানার ধারে বসা ভগ্নপ্রায় চেহারার বৃদ্ধের- দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলাম আমি। ‘আপনি গিয়ে কী দেখলেন?’
‘ভয়ানক এক দৃশ্য, মি. ব্লেক: এক মরণাপন্ন মানুষ, একটা ভয়ঙ্কর হাত এবং একটি মরা কুকুর। আমি ভেবেছিলাম আপনিও মারা গেছেন। আপনার মুখ নীল হয়ে গিয়েছিল। জিভ বাইরে ঝুলছে। ওই জিনিসটা আপনার গলা টিপে ধরে রেখেছিল। তবে…’
‘তবে কী?’
তিনি বিরতি নিলেন।
‘কাটা হাতখানা আটকে ছিল মৃত জানোয়ারটির দুই সারি দাঁতের ফাঁকে।
‘ব্রিন,’ ফিসফিস করলাম আমি। শেষ মুহূর্তেও ও আমাকে জানে বাঁচিয়েছে।
‘ওটাকে আপনার গলা থেকে আমার ছুটিয়ে নিতে হয়। ‘কীভাবে করলেন কাজটা?”
‘নিচতলায় ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছিল। আমি এক ছুটে ওখান থেকে চিমটায় করে লাল টকটকে এক টুকরো কয়লা নিয়ে আসি। তারপর হাতটার উল্টো পিঠে সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরি জ্বলন্ত কয়লা এবং…’
‘কী?’
ওটা আপনার গলা ছেড়ে এমন জোরে লাফ মেরে ওঠে যে আমি উল্টে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি এবার কয়লাটি হাতের তালুতে ঠেসে ধরি। আঙুলগুলো বারবার মুঠো হচ্ছিল আর খুলছিল। শেষে মাংসপোড়ার গা গোলানো গন্ধ এসে ধাক্কা মারে নাকে। হাতটা মোচড় খাচ্ছিল কুকুরটার দাঁত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে। বেশ কয়েকবার তড়পেছে মেঝের ওপর। তারপর ওটা নিশ্চল হয়ে যায়।’
.
আমি এখনো বেঁচে আছি বলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ব্রিনের কথা প্রায়ই স্মরণ করি যে নিজের জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছে। দশ বছর আগে প্রিয় কুকুরটি মারা গেছে। কিন্তু সে এমন জোরে কামড়ে ধরে রেখেছিল কাটা হাতখানা যে মৃত্যুর পরেও ওটাকে তার মুখ থেকে ছোটানো সম্ভব হয়নি। শেষে হাতসহ ব্রিনের আশ্রয় হয় সেই তলকুঠুরিতে।
আমার গলায় এখনো ওই পিশাচের থাবার চিহ্ন রয়েছে : বেগুনি রঙের পাঁচটি আঙুলের ছাপ। এ রঙ কখনো ম্লান হয় না। এখন বুঝতে পারলেন তো কেন আমি সবসময় উঁচু কলারের জামা পরে ঢেকে রাখি গলা?
