Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ইতি স্মৃতিগন্ধা – সাদাত হোসাইন

    September 5, 2026

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    September 5, 2026

    ঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

    September 5, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায় এক পাতা গল্প2426 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৬. দুলালবাবুর যখন চেতনা ফিরল

    দুলালবাবুর যখন চেতনা ফিরল তখন সকাল হয়েছে। ঘরে পুবের জানালা দিয়ে বেশ খানিকটা রোদ এসে ঘরটা ঝলমল করছে আলোয়। আর সেই আলোয় ভুবন রায় ভূত-দেখা চোখে দুলালবাবুর মুখের দিকে চেয়ে কাঠ হয়ে বসে আছেন।

    দুলালবাবু নিজের পরিস্থিতিটা বুঝতে একটু সময় নিলেন। তিনি প্রথম যে জিনিসটা বুঝতে পারলেন, সেটা অতিশয় বিস্ময়কর। বাইরে পাখি ডাকছে। বহুঙ্কাল পাখির ডাক শোনেননি। আরও অনেক কিছুই শোনেননি। হঠাৎ পাখির ডাক এত জোরে কানের পর্দায় এসে লাগছিল যে, তিনি দু’কানে আঙুল দিয়ে উঠে বসলেন।

    তারপর ভুবনবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “বড্ড বেশি আওয়াজ করছে পাখিগুলো।”

    ভুবন রায় এমন কাঠ হয়ে বসে আছেন যে, তাঁকে তাঁর স্ট্যাচু বলে মনে হচ্ছিল। দুলালবাবুর কথায় হ্যাঁ-না কিছুই করলেন না, তবে খানিকটা হাঁ করে যেমন চেয়েছিলেন তেমনিই চেয়ে রইলেন।

    দুলালবাবু দুটো কান দুই আঙুলে কিছুক্ষণ খোঁচাখুঁচি করে নিয়ে বললেন, “বেশ খিদেও হচ্ছে মশাই। পেট রীতিমতো চোঁচোঁ করছে।”

    কে যেন পিছন থেকে অত্যন্ত বিস্মিত গলায় বলে উঠল, “খিদে? আপনার আবার খিদে পাচ্ছে?”

    দুলালবাবু ঘাড়টা ঘুরিয়ে দেখলেন, দরজার কাছে আরও দুটো প্রস্তরমূর্তি। একজন রামলাল, অন্যজন নন্দলাল। দুজনের মুখই একটু করে হাঁ।

    দুলালবাবু খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, “কেন বাপু, খিদে পাবে না-ই বা কেন? খিদে পেলে কি দোষ হয় কিছু? নাকি তোমাদের বাড়িতে খিদে পাওয়ার নিয়ম নেই? এমন ভাবখানা করছ যে, খিদে কথাটা জীবনে এই প্রথম শুনলে। বলি তোমাদের খিদে-টিদে পায় না?”

    দুলালবাবুর এরকম কড়া ধমকানিতে নন্দবাবু বেশ ঘাবড়ে গিয়ে মাথা চুলকোতে-চুলকোতে আমতা-আমতা করে বললেন, “না, খিদের আর দোষ কী? খিদে পেতেই পারে। আমাদেরও পায়। তবে কিনা কাল রাত দুটোর সময় আপনি একাই এক পালোয়ানের ভোজ খেয়েছেন। এত তাড়াতাড়ি আবার খিদে পেয়ে থাকলে ভালই, স্বাস্থ্যের লক্ষণ! তার মানে হজমটজম ভালই হচ্ছে। আর ইয়ে…”

    দুলালবাবু নিজের এই বেয়াদব ছাত্রটির দিকে কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে চেয়ে থেকে বললেন, “কাল রাত দুটোয় কে আমাকে ভোজ খাওয়াল বলো তো? আমি

    তো নেমন্তন্নবাড়িতে যাওয়া ছেড়েই দিয়েছি।”

    নন্দবাবু সখেদে বললেন, “নেমন্তন্ন তো আপনাকে করাও হয়নি স্যার। আপনি নিজেই আমাদের রান্নাঘরে ঢুকে স্বহস্তে নিজেকে পরিবেশন করেছেন। তারপর বাসনগুলো বেঁধে নিয়ে আপনার শাকরেদদের হাতে চালান করে এলেন। সব স্বচক্ষে দেখা।”

    দুলালবাবু আর সহ্য করতে পারলেন না। টপ করে দাঁড়িয়ে নন্দলালের গালে চটাস করে একখানা চড় বসিয়ে বললেন, “বাঁদর ছেলে, আবার মিথ্যে কথা বলা হচ্ছে!”

    চড় খেয়ে নন্দবাবু চোখে অন্ধকার দেখলেন। ক্রমে সেই অন্ধকারে অনেক সরষে ফুল ফুটে উঠতে দেখলেন। তাঁর পায়ের তলা থেকে মেঝেটাও কে যেন, কার্পেটের মতো টেনে নিল। নন্দলাল কাটা কলাগাছের মতো পড়ে গেলেন।

    রামলাল এই কাণ্ড দেখে তড়াক করে দরজার ওপাশে গিয়ে লাফ দিয়ে পড়লেন। একসময়ে তিনিও দুলালবাবুর ছাত্র ছিলেন। আর দুলালবাবুর মস্ত দোষ হল একজন ছাত্র দোষ করলে শুধু তাকে মেরেই ক্ষান্ত হতেন না, আরও দু পাঁচজনকে ফাউ হিসাবে ঠেঙিয়ে নিতেন। সেই কথা রামবাবুর খুব মনে আছে। ভুবনবাবু নীরবে দৃশ্যটা দেখলেন। কয়েক সেকেন্ড হাঁ হুঁ কিছু করলেন না।

    তবে হাঁ করে যেমন চেয়েছিলেন, তেমনিই চেয়ে রইলেন দুলালবাবুর দিকে।

    দুলালবাবু তাঁর দিকে চেয়ে বললেন, “বেয়াদবটার কথা শুনলেন? আমি নাকি রাত পটোয়….”

    ভুবনবাবু একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁ বন্ধ করলেন। তারপর দুলালবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “বলবান লোক আমি পছন্দই করি দুলালবাবু। আপনার গায়ে যে যথেষ্ট জোর হয়েছে, এতে আমি খুবই খুশি। কিন্তু সত্যকে চাপা দেওয়ার জন্য গায়ের জোর খাটানোটা বোধহয় ভাল কাজ নয়।”

    দুলালবাবু মাথা চুলকোতে লাগলেন। বললেন, “আপনার মতো মান্যগণ্য লোককে কী করে বলব। কিন্তু কথাটা ডাহা মিথ্যে।”

    ভুবনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “মোটেই মিথ্যে নয়। কাল যে মাঝরাত্তিরে আপনি রান্নাঘরে ঢুকে খেয়েছেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আর বাসনকোসনও যে সরিয়েছিলেন তার সাক্ষী হিসেবে পাঁচু মোদক নামে একটা লোককেও নন্দলাল ধরে এনেছে। সে আমাদের নীচের তলার ঘরে বসে রয়েছে।”

    দুলালবাবুর চোখ দুখানা বিস্ফারিত হয়ে গেল, “পাঁচু মোদক? কস্মিনকালেও এরকম নাম শুনিনি।”

    “শুধু তাই নয় দুলালবাবু, নন্দলালের কাছে ধরা পড়ে নিজেকে আপনি পাঁচু মোদক বলে চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। আর আপনি যে চুরি করতেই বাড়িতে ঢুকেছেন, সে-কথাও কবুল করেছেন। ঘটনা অনেক ঘটে গেছে দুলালবাবু, কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা হচ্ছে, আপনি আমাদের আসল দুলালবাবু নন। আমাদের দুলালবাবু ছিলেন রোগা মানুষ, বুড়ো, কানে একেবারেই শোনেন না, নিরীহ। কিন্তু আপনি রীতিমতো স্বাস্থ্যবান, হিংস্র, সুপুরুষ। সুতরাং আমি জানতে চাই, আপনি লোকটা কে? আর আমাদের আসল দুলালবাবুই বা কোথায় গেলেন? আমার ঘোরতর সন্দেহ, আসল দুলালবাবুকে আপনি গুম করেছেন। খুনও করে থাকতে পারেন।”

    দুলালবাবু এত অবাক হলেন যে, মুখ দিয়ে বাক্য সরল না। অনেকক্ষণ বাদে বললেন, “এ-সবের মানে কী? কী সব বলছেন ভুবনবাবু?”

    ভুবনবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “অস্বীকার করছি না যে, আপনার সঙ্গে দুলালবাবুর চেহারার অনেক মিল আছে। কিন্তু মিল থাকলেই যে একজন অন্যজন হয়ে যা-খুশি করবেন, তা তো হয় না!”

    দুলালবাবু এবার নিজের দিকে তাকানোর একটা অক্ষম চেষ্টা করলেন। তাঁর মনে হল, তিনি আগের মতো রোগা নেই। হাত-টাতগুলো বেশ সবল আর শক্তিমান দেখাচ্ছে। ছাতিটাও চওড়া মনে হচ্ছে। গায়ে বেশ শক্তি অনুভব করছেন। না, তিনি তো বাস্তবিকই তা হলে দুলাল সেন নন।

    দুলালবাবু হঠাৎ বললেন, “আপনার কাছে আয়না আছে!”

    ভুবনবাবু পশ্চিমের দেওয়ালে টাঙানো আয়নাটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “ওই তো!” দুলালবাবু গিয়ে আয়নায় নিজের মুখোনা ভাল করে দেখলেন। সেই আগেকার রোগা ভাঙা বুড়োটে মুখ এ তো নয়। রীতিমতো অল্পবয়সী একটা মুখ। দুলালবাবু হঠাৎ বুঝতে পারলেন, কোথায় একটা বস্ত বড় গণ্ডগোল হয়ে গেছে।

    ভুবনবাবু বললেন, “কী হল, আপনি কে তা বুঝতে পারলেন?”

    দুলালবাবু দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “না। ঠিক চিনে উঠতে পারছি। অথচ চেনা-চেনা ঠেকছে।”

    “তা হলে?”

    দুলালবাবু মাথা চুলকে বললেন, “তা হলে…”

    ভুবনবাবু অত্যন্ত কঠিন চোখে দুলালবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “তা হলে আপনাকে পুলিশে দেওয়া উচিত কি না?”

    নন্দবাবু থাপ্পড় খেয়ে ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। এবার গালটা হাতের তেলোয় ঘষতে ঘষতে উঠে বসে বললেন, “খুব উচিত।”

    দুলালবাবু আর একবার ভাল করে নিজের মুখোনা দেখলেন। প্রথমটায় ঘাবড়ে গেলেও বারবার দেখার পর নিজের মুখোনা তাঁর বেশ পছন্দই হল। এর আগে তাঁর যে রোগা, ভাঙা লম্বাটে, বুড়োটে মুখোনা ছিল, সেটা তাঁর বিশেষ পছন্দও ছিল না। তাই আয়নায় মুখ দেখা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। মুখোনা দেখতে-দেখতে তিনি খুশি হয়ে একটু হেসেও ফেললেন। তারপর হঠাৎ বুদ্ধি খাঁটিয়ে বললেন, “কিন্তু পুলিশে দেবেন কাকে? আমি যে কে, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”

    ভুবনবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, “পুলিশের ভয়ে ওরকম অনেকেই নিজের পরিচয় গোপন করে। তঁতোর চোটে নামধাম সবই শেষে বেরিয়ে পড়ে।”

    রামলাল একটু ভয়েভয়ে ফের ঘরে ঢুকে বললেন, “তা ছাড়া কাল রাতে কে বা কারা আমাদের ল্যাবরেটরিতে একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। আমার মনে হয়, তাতে আপনার হাত থাকা অসম্ভব নয়। আমার আরও মনে হয়, দুলালবাবু কোনও একটা অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। আর সেটা নষ্ট করার জন্যই আপনি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।”

    দুলালবাবু নিজের মুখ দেখতে-দেখতে বেশ নেশায় পড়ে গেছেন। বাঃ ভারি ভাল দেখতে লাগছে তো মুখোনা। আর শরীরটাও যেন শক্তপোক্ত দেখাচ্ছে। গায়ে-গতরে যেন শক্তির একটা বন্যা বয়ে যাচ্ছে। হাত-পা নিশপিশ করছে কিছু একটা করে ফেলার জন্য। তিনি সুতরাং হাতের গুলি ফুলিয়ে রামলালের দিকে দু’পা এগিয়ে গিয়ে বললেন, “কিন্তু আমাকে আটকে রাখবে কে? পুলিশের হাতেই বা তুলে দেবে কে? তুমি নাকি?”

    রমলাল সভয়ে দু’পা পেছিয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি নন্দবাবুর দিকে আঙুল তুলে বলে উঠলেন, “আমি না, ও।”

    “বটে!” বলে দুলালবাবু নন্দলালের দিকে ফিরে দাঁড়ালেন।

    নন্দবাবু খুব অবাক হয়ে বললেন, “আমি মোটেই বলিনি যে, আপনাকে আটকে রাখব। কোন্ দুঃখে বলুন?”

    দুলালবাবু একটা হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “পুলিসকে খবর দিয়েছে কে?”

    রামলাল কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে উঠলেন, “কেউ দেয়নি। দেওয়ার কথা ভাবিনি পর্যন্ত আমরা।”

    নিজের দুই কাপুরুষ সন্তানকে খুব সমালোচকের চোখে লক্ষ করছিলেন ভুবন রায়। তাঁর ছেলে হয়ে এরা যে কেন এত ভীরু আর দুর্বলচিত্ত হল, তা তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না।

    কিন্তু ভুবন রায় নিজে কাপুরুষ নন। রীতিমতো সাহসী ও সক্ষম। সুতরাং তিনি বললেন, “দেখুন মশাই, আপনাকে আমিই পুলিশে দেব বলেছি।”

    দুলাল সেন হো-হো করে হেসে উঠলেন। তারপর বুক ফুলিয়ে বললেন, “পুলিশ আসার আগেই আমি সরে পড়ছি। যদি পারেন তো আটকানোর চেষ্টা করুন।”

    এই বলে দুলালবাবু দরজার দিকে এগোতেই ভুবনবাবু তাঁর মজবুত বেতের লাঠিটা বাগিয়ে পথ আটকালেন। দুলাল সেন অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ভুবন রায়ের হাত থেকে লাঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে স্রেফ দু’হাতের চাপে মটাত করে দুমড়ে ফেললেন। তারপর গটগট করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে হাওয়া হয়ে গেলেন।

    নন্দলাল, রামলাল আর ভুবনবাবু পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কী বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।

    .

    ভুবনবাবু যে চটেছেন, তা তাঁর কান দেখলেই বোঝা যায়। ভুবন রায়ের কান তখন নড়ে। ভয়ঙ্কর রেগে গেলেই এটা হয়।

    তিনি তাঁর দুই অপদার্থ ছেলের দিকে রোষকষায়িত-লোচনে চেয়ে কিছুক্ষণ তাঁদের ভস্ম করে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তারপর অতিশয় শীতল কঠিন গলায় বললেন, “তোমরা অপদার্থ, ভীরু এবং কাপুরুষ। তোমাদের মতো ছেলেকেই শাস্ত্রে কুলাঙ্গার বলা হয়ে থাকে রামলাল!”

    “যে আজ্ঞে।”

    “দুলালবাবুর লাশ যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে লেগে যাও। মনে রেখো, লাশ পাওয়া না গেলে তোমার অন্নজল বন্ধ, নন্দলাল!”

    “আজ্ঞে বলুন।”

    “তুমি অত্যন্ত অকর্মণ্য আর বায়ুগ্রস্ত হয়ে পড়ছ। তোমার ভিতরে একটা ভালরকম ওলটপালট দরকার। যাও, নীচে ভিতরের ঘেরা মাঠে একনাগাড়ে দেড়শো ডিগবাজি খাও। গুনে-গুনে দেড়শো। আমি জানালা নিয়ে নজর রাখব।”

    রামলাল আর নন্দলাল দু’জনেই মাথা চুলকোতে লাগলেন। কিন্তু জানেন, ভুবন রায়ের আদেশ অমান্য করলে ঘোরতর সমস্যা দেখা দেবে।

    রামলাল কাঁচুমাচু মুখে বললেন, “ইয়ে আমার মনে হচ্ছে দুলালবাবু মরেননি। কাজেই তাঁর লাশও পাওয়া যাবে না।”

    “দুলালবাবু যদি না-ই মরে থাকেন, তবে গেলেন কোথায়?”

    রামলাল এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারলেন না। তাই মাথা চুলকোতে-চুলকোতে লাশ খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন।

    নন্দবাবু বিরস মুখে ভিতরের ঘেরা-মাঠে নেমে সভয়ে চারদিকে চেয়ে দেখলেন। ভাইপো-ভাইঝিরা কাছাকাছি আছে কি না। তারপর নিতান্তই অনিচ্ছের সঙ্গে এবং রাগে গরগর করতে করতে ডিগবাজি খেতে শুরু করলেন।

    দেখতে-না-দেখতে পিলপিল করে ভাইপো-ভাইঝি, ভাগ্নে-ভাগ্নিরা এসে জুটে গেল চারদিকে। এত বড় একটা মানুষকে প্রকাশ্যে ডিগবাজি খেতে তারা কখনও দ্যাখেনি।

    “ও কাকু, তুমি ডিগবাজি খাচ্ছ কেন?”

    “কাকু, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?”

    “মামা গো, তুমি তো দিব্যি ডিগবাজি খেতে পারো দেখছি!”

    নন্দবাবু হাসি-হাসি মুখে করে বললেন, “ডিগবাজি খাওয়া খুব ভাল। সাহেবরা বলে, ডিগবাজিতে স্মৃতিশক্তি বাড়ে, গায়ে জোর হয়, খিদে হয়।”

    “তা হলে আমরাও খাই?”

    “যা-না, খা। যত খুশি খা।”

    সঙ্গে সঙ্গে মাঠময় ডিগবাজির হররা পড়ে গেল। এতে নন্দবাবুর মনের জ্বালাটা একটু জুড়োল। বেশ ভালই লাগতে লাগল তাঁর। দেড়শোর জায়গায় তিনি ও শ’দুই ডিগবাজি খাবেন বলে মনে-মনে স্থির করে ফেললেন।

    ওপরের জানালা দিয়ে দৃশ্যটা খুব মনোযোগ দিয়েই দেখলেন ভুবন রায়। দেখতে-দেখতে তাঁর শৈশবের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। ডিগবাজি খাওয়া, আর্চ করা, ব্যাঙ লাফ দেওয়া, কত কী করেছেন ছেলেবেলায়।

    ভুবন রায় আর থাকতে পারলেন না। দোতলা থেকে তরতর করে নেমে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে ডিগবাজি খেতে শুরু করলেন।

    কাণ্ড দেখে নন্দবাবু ভয়ে জড়োসড় হয়ে বললেন, “বাবা, করছেন কি? এই বয়সে ডিগবাজি খাচ্ছেন, কোমর-টোমরে লেগে যাবে যে!”

    ভুবন রায় ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “এ তো তোমাদের মতো পলকা কোমর নয়। ভুবন রায়ের কোমরের ওপর ইমারত তোলা যায় বুঝলে! দেখলুম তো, মাত্র দেড়শোটা ডিগবাজি খেতেই তোমার জিভ বেরিয়ে গেল। দেখবে, সত্যিকারের ডিগবাজি কাকে বলে? তবে দ্যাখো।” বলে ভুবনবাবু আবার টপাটপ ডিগবাজি খেতে লাগলেন।

    এমন সময় ওপর থেকে একজন দাসী এসে বলল, “কতাবাবু আপনার মা আপনাকে আর ডিগবাজি খেতে মানা করে দিয়েছেন।”

    ভুবনবাবু মাকে ভক্তিও করেন, ভয়ও খান। সুতরাং ক্ষান্ত দিলেন। নাতি নাতনিরা ভুবনবাবুকে ভয়ঙ্কর ভয় পায়। তাঁর ডিগবাজি দেখে সবাই হকচকিয়ে গিয়েছিল। ভুবনবাবু চলে যাওয়ার পর ফের সবাই হল্লা শুরু করে দিল।

    একটা ঝোঁপের আড়াল থেকে রামলাল সন্তর্পণে ভুতোকে ডাকলেন, “ভুতো, ভুতো, শুনে যা বাবা।”

    ভুতো একটু অবাক হয়ে এগিয়ে গেল, “কী বলছেন?”

    “একটু এদিকে আয়। তোর সঙ্গে একটা গোপন কথা আছে।” রামলাল ভুতোকে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে একগাল হাসলেন।

    “তুই বেশ ভাল ছেলে।”

    ভুতো এই প্রশংসাবাক্যে খুবই অবাক হল। কারণ, রামলাল বিজ্ঞানের লোক বলে ভুতোকে মোটেই পছন্দ করেন না। ভুতোকে যে পরি নিয়ে গিয়েছিল বা ভুতো যে অনেক সময় অনেক অশৈলী কথা বলে ফেলে, তাকে তিনি বুজরুকি বলেই মনে করেন। আর ভুতো এইসব কারণে রামলালের চক্ষুশূল। কাজেই আজ এই সমাদর দেখে ভুতো মনে-মনে প্রমাদ গুনল।

    রামলাল ওপরের দিকে চেয়ে খানিকক্ষণ গলা চুলকোলেন। তারপর বললেন, “বুঝলি ভুতো, আমাদের দুলালবাবু এই ঘরেই রাতে কোনও এক সময়ে, মানে, কী যে হয়েছিল, তা আমি ঠিক জানি না। তবে সকাল থেকে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বুঝলি?”

    ভুত চোখ গোল করে বলল, “ভাল করে খুঁজে দেখেছেন?”

    রামলাল মাথা নেড়ে বললেন, “না, খুঁজে এখনও দেখিনি অবশ্য। তবে দেখে লাভও নেই। বলছিলাম কি, ভুতো, তোর তো সব ইয়েটিয়ে আছে শুনতে পাই। ওই কী যেন বলে।”

    ভুত মাথাটা নীচু করে বলল, “আমার কী আছে?”

    রামলাল খুব আমতা-আমতা করে বললেন, “আমি হলাম তো বিজ্ঞানের লোক, বুঝলি! আমি ওসব বিশ্বাস-টিশ্বাস করি না।”

    ভুতো খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল, “বিশ্বাস করার দরকার কী?”

    রামলাল গলাটা কষে আবার চুলকে নিয়ে বললেন, “না, মানে, বিশ্বাস না করলেও, বলছিলাম কি, বিজ্ঞানের বাইরেও তো কত জিনিস আছে। আমরা আর কতটুকু খবর রাখি বল।”

    ভুতো মাথা নেড়ে বলল, “বিজ্ঞানের বাইরে আবার কী থাকবে?”

    রামলাল ভুতোর ঘাড়ে হাত রেখে মিষ্টি করে একটু হেসে বললেন, “বলছিলাম কি, যদি দুলালবাবুর একটা হদিস তোর ওই পরিরা দিতে পারে, তবে বড় ভাল হবে।”

    ভুতো অবাক হয়ে বলল, “দুলালবাবুর জন্য পরিদের ডাকাডাকি করে কী হবে? আমরা সবাই মিলে খুঁজে ধরে নিয়ে আসছি।”

    রামলাল কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, “তাহলে খুব ভাল হয় বাবা। জ্যান্ত বা মরা যে-কোনও অবস্থাতেই তাকে খুঁজে পাওয়াটা খুব দরকার। নইলে আমাকে কাঠ-উপোস করে থাকতে হবে।”

    .

    ডিগবাজি খেয়ে ভুবন রায়ের মনটা বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠল। তিনি ভাবলেন, পাঁচু মোদক যদিও চোর এবং অনধিকার অনুপ্রবেশকারী তবু অতিথি তো! একটু খোঁজখবর নেওয়া দরকার।

    তিনি যখন তালা খুলে নীচের তলার অন্ধকার ঘরখানায় গিয়ে ঢুকলেন, তখন হাতে লাঠিটা বাগিয়ে ধরা। ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করলে বা পালাতে চেষ্টা করলে কাজে লাগবে।

    ঘরে ঢুকে দেখলেন, পাঁচু মোদক মেঝের ওপর শুয়ে ভোঁস-ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে। তবে সাড়া পেয়ে উঠে বসল। পালানোর কোনও চেষ্টাই করল না। প্রকাণ্ড হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, “সারারাত বিস্তর ধকল গেছে মশাই, কাঁচা ঘুমটা কি না ভাঙালেই চলত না?”

    ভুবন রায়ের সঙ্গে এরকমভাবে কেউ কথা বলে না। কাজেই তিনি একটু দমে গিয়ে বললেন, “তোমাকে তো ঘুমনোর জন্য ধরে রাখা হয়নি।”

    পাঁচু মোদক ‘ফুঃ শব্দ করে গা থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “ধরে তো রেখেছেন কচু। জানালার তিনটে শিক নড়বড় করছে, পশ্চিমের দেওয়ালটা এক জায়গায় নোনা ধরে ঝুরঝুরে হয়ে আছে। পাঁচুকে ধরে রাখা অত সহজ নয় মশাই। ইচ্ছে করলেই পালাতে পারতুম। শুধু পাগলা বাবুটির খবর না নিয়ে যেতে ইচ্ছে করল না বলেই এখনও আছি।”

    “বটে!”

    পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “তা বাবু, এটা কি ভিখিরির বাড়ি, নাকি হাড় কেপ্পনের আচ্ছা?”

    “কেন বলো তো?”

    “সকাল থেকে দাঁতে দানাটা কাটিনি, কেউ একটু খবরও নিল না মশাই। এটা কী রকম ব্যবহার আপনাদের?”

    ভুবন রায় এবার লজ্জিত হলেন। চোর-ছ্যাচড় যাই হোক, একটু তদারক করা দরকার ছিল।

    ভুবন রায় বললেন, “কিছু মনে করে না বাপু, ঝামেলায় একটু দেরিই হয় গেছে। বোসো, খাবারের ব্যবস্থা হচ্ছে।”

    পাঁচু গম্ভীর গলায় বলল, “একটু মোটা ব্যবস্থাই করবেন। গরিবের খিদে একটু বেশি কিনা।”

    ভুবন রায় কাজের লোকদের ডাকাডাকি করলো জলখাবারের হুকুম হল। এবং একটু বাদে ছ’খানা গরম রুটি আর আলু-কপির তরকারি সাজিয়ে দেওয়া হল পাঁচুর সামনে।

    পাঁচু ঠা-ঠা করে হেসে উঠে বলল, “ছ’খানা! ছ’খানা! উরে বাবা, হাসতে হাসতে মরে যাব। এ যে আমার চেয়ে গরিব লোকের বাড়ি, অ্যাঁ!

    ভুবন রায় উত্তেজিত হয়ে বললেন, “এটা কি মামার বাড়ি নাকি হে বেয়াদব? ওই ছ’খানার বেশি একখানাও আর নয়। বেশি খাওয়া আমি একদম পছন্দ করি না।”

    পাঁচু আর দ্বিরুক্তি না করে খাওয়া শুরু করে দিল। বলল, “একটু চা পাব। তো কাবাবু? বেশ বড় এক গেলাস? চায়ে অভ্যেস অবশ্য আমার নেই। দুধই খাই, তা আপনাদের মতো কেপ্পনের বাড়িতে তো আর দুধের আশা নেই। চা দিয়েই চালাতে হবে। তবে একটু যেন বেশি করে দুধ দিয়ে করে, দেখবেন।”

    খাওয়া শেষ করার পর চায়ের গেলাসটি হাতে নিয়ে পাঁচু খুব ভাবুকের মতো ভুবনবাবুর দিকে চাইল।

    ভুবনবাবু আগাগোড়া তার হাবভাব তীক্ষ্ণ নজরে দেখে নিচ্ছিলেন। লোকটাকে তাঁর খুব উঁচুদরের ঘড়েল বলে মনে হচ্ছিল। অমায়িক, কিন্তু সাঙ্ঘাতিক ধূর্ত।

    ভুবনবাবু গলাখাঁকারি দিয়ে তৈরি হলেন। বললেন, “দ্যাখো বাপু, তুমি অত্যন্ত পাজি লোক। তোমার ব্যবস্থা পরে হবে। কিন্তু তোমার শাগরেদটির পরিচয় আমাদের আগে দরকার।”

    পাঁচু একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “বললে প্রত্যয় হবে না, কিন্তু আমার শাগরেদ টাগরেদ নেই। আগে দু-চারজনকৈ শাগরেদ করে খুব শিক্ষা হয়েছে কিনা, শিখিয়ে-পড়িয়ে যেই মানুষ করলাম অমনি যে-যার নিজের পথ দেখা। তারপর মশাই সেই শাগরেদদের সঙ্গেই পাল্লা টানতে হল। একবার তো গোপেশ্বর ঘটকের ঠাকুরদালানে সেঁদিয়েছি, অমনি ষণ্ডা দারোয়ানটা মহা শোরগোল তুলল। তখন করি কী? তাড়াতাড়ি কুম্ভক করে একেবারে ব্যাঙের মতো চ্যাপটা হয়ে বিগ্রহের সিংহাসনের তলায়, মশাই কী বলব, বেড়ালেরও যেখানে সেঁধোবার জায়গা নেই সেখানে ঘাপটি মারতে গিয়ে দেখি আর এক মক্কেলও সেখানে কুম্ভক করে পড়ে আছে। কার এত ক্ষমতা দেখতে গিয়ে কী দৈখলম জানেন? আমারই এক শাগরেদ। বড় ঘেন্না হল মশাই জীবাটার ওপর। একবার তো ঠিক করেই ফেললুম যে, এ-ব্যবসা আর নয়। কিন্তু নেশাট এমন যে…..”

    “তা হলে লোকটি কে?”

    পাঁচু চা শেষ করে একটা ঢেকুর তুলে বল, “মিষ্টিটা বড় কম দিয়েছেন, আর দুধটাও বড্ড টানটান এ চা কি ভদ্দরলোকে খেতে পারে? আমাদের চা হবে একেবারে গুড়ে গরগরে, দুধের সর ভাসবে আর চায়ের কাথটিও হবে বেশ ঘন, তবে চা?”

    ভুবনবাবু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলেন তারপর বললেন, “এবার আসল কথায় এস বাপু। বাবুটি কে?”

    “আজ্ঞে তা তো আপনাদেরই জানবার কথা। আপনাদের গোয়ালঘরে ভুল করে ঢুকে পড়ে ভারি কেলেঙ্কারিতে পড়ে গিয়েছিলুম। সেইখানে বাবুটিও পড়েছিলেন। ঘরে কেমন যেন বিদঘুঁটে একটা গন্ধ, আর ধোঁয়াটে ভাব। হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আমাকে এমন ধরলেন যে, প্রাণ যায় আর কি। দেখলুম, বাবুটি বোকাসোকা ভালমন্দ গোছের, গোবরগণেশই বলা যায়, ছিটিয়ালও বটেন। কিন্তু মানুষটি বেশ ভদ্র, নিজের নামই তাঁর মনে নেই। আমার বড় কম ধকল যায়নি মশাই বাবুটিকে নিয়ে। তার একটা নাম দিতে হল, কাজটাজও শেখাতে হল, তারপর তো সবই জানেন।”

    “তা হলে বাবুটিকে তুমি চেনো না?”

    পাঁচু মাথা চুলকে বলল, “একেবারে চিনি না বলাটা কী ঠিক হবে। মুখোনা চেনাই বটে, তবে নামধাম জানি না। আমার আবার বড়লোকদের সঙ্গে কারবার। গরিব গুবোদের তত্ত্ব খুব বেশি জানা নেই। বাবুটি বোধহয় মাস্টারি-টাস্টারি কিছু করতেন।”

    ভুবনবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “ভিজে বেড়াল। যাকগে, প্রশ্ন হল, সেই মাস্টারমশাই গেলেন কোথায়? তাঁকে তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আর একটা লোক কোথা থেকে এসে উদয় হয়েছিল, রীতিমত গুণ্ডা প্রকৃতির। লোকটা পালিয়ে গেছে। এই দু’নম্বর লোকটা কে?”

    “আজ্ঞে, আমি দু’নম্বরদের কথা কিছু জানি না।”

    “খুব জানো। না জানলে চলবে কী করে? এই গুণ্ডা লোকটা দুলালবাবুকে হয় গুম না হয় খুন করেছে।”

    পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “অঙ্কটা মিলছে না।”

    “তার মানে?”

    পাঁচু একগাল হেসে বল্ল, “আপনারা লেখাপড়া জানা লোক তো! তা লেখাপড়া জানা লোকদের একটা ভারি মুশকিল হয়। তারা নিজেদের বুদ্ধি তেমন খাটাতে পারে না। মাথাটা অন্য সব পণ্ডিতদের কাছে বাঁধা রাখা থাকে তো! আপনারা হলেন সব লেখাপড়া জানা লোক! আমাদের মাথায় ওসব আজেবাজে আগডম-বাগডম জিনিস নেই। যা পাবেন তা খাঁটি জিনিস।”

    “আচ্ছা বেয়াদব তো।”

    পাঁচু গম্ভীর হয়ে বলল, “তা আজ্ঞে বেয়াদবি হয়তো একটু হচ্ছে। কিন্তু আপনাদের বুদ্ধিরও বলিহারি যাই। দুটো লোককে আপনার পেলেন কোথায়? লোক তো একটাই। আপনাদের চোখের সামনেই লোকটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। তারপর যখন পাশ ফিরল তখন সেই লোকটাই অন্য লোক হয়ে গেল কীভাবে?”

    ভুবনবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমাদের দুলালবাবু মোটেই চোর ছিলেন। গুণ্ডা তো হওয়ার উপায়ই তাঁর নেই। তা ছাড়া ওরকম হাবভাব আর হাতের গুলিও তার কস্মিনকালে ছিল না। সুতরাং আমাদের চোখে ধূলো দেওয়া অত সহজ নয় হে। লোক দুটোই ছিল। একজন দুলালবাবু, অন্যজন তোমার শাগরেদ।”

    পাঁচু মাথাটা নেড়ে নেড়ে খানিকক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “না মশাই, অঙ্কটা ঠিকঠাক মিলছে না। আমাকেই মেলাতে হবে। এসব আপনাদের কর্ম নয়। বাবুটিকে খুঁজে তো আগে বার করি।”

    “তার মানে? তোমাকে কি আমি ছেড়ে দিচ্ছি নাকি? মোটেই ভেবো না যে, চালাকি করে পালাবে। পুলিশ আসছে।”

    পাঁচু মিষ্টি করে হেসে বলল, “এজন্যই তো লেখাপড়া-জানা লোকদের কিছু হয় না। মাথাটা খেলে না কিনা। পাঁচু মোদক কি এতই সোজা লোক মশাই? পুলিশ ডেকে তাকে ধরাবেন! গত ষাট বছরে এই শর্মা একবারও পুলিশের হাতে ধরা পড়েনি, তা জানেন?”

    ভুবন রায় ভারি অবাক হলেন। ডাকসাইটে ভুবন রায়ের মুখের ওপর কথা বলার মতো বুকের পাটাওয়ালা লোক তা হলে এখনও এই শহরে আছে? তাও আবার একটা ছিচকে চোর! এত অবাক হলেন যে, তিনি কথাই বলতে পারলেন না।

    পাঁচু মোদক যথেষ্ট অভিমান-ভরা গলায় বলল, “এইরকম ঘরে আটকে রেখে আপনারা আমাকে কী অপমানটাই না করলেন। পাঁচু মোদককে আটকাতে হলে লোহার ঘর লাগে মশাই। তাও পেরে উঠবেন না। লোহা কেটে পাঁচু ঠিক পালাবে। আমি তো লজ্জায় অধোবদন হয়ে আছি তখন থেকে। মনে-মনে ভাবছি, ওরে পাঁচু, তোর হল কী? তোকে যে এরা কুকুর-বেড়ালের সমান জ্ঞান করছে!”

    ভুবনবাবুর গলাধাকরি দিয়ে বললেন, “বেশি কথা বলার দরকার নেই। পুলিশ আসছে! যা বলার তাদের কাছে বোলো।”

    “পুলিশের সঙ্গে কথা! ও-বাবা। পুলিশের সঙ্গে কথা বলা শুরুর বারণ। বললে আঠারোবার গঙ্গাস্নান করতে হবে। তা বাবু, পেন্নাম হই, আজকের মতো বিদেয় হচ্ছি।”

    এই বলে পাঁচু উঠে দাঁড়াল।

    ভুবনবাবু কিছু বুঝে উঠবার আগেই পাঁচু একটা বেড়ালের মতো লাফ দিয়ে জানালায় উঠে চোখের পলকে দু’খানা শিক সরিয়ে বাইরে লাফিয়ে পড়ল।

    ভুবনবাবু চেঁচাতে লাগলেন, “পালাল! পালাল! ধর রে তোরা, ধর!”

    চেঁচানিতে লোকজন ছুটে এল। কিন্তু ঘটনাটা কী ঘটেছে; তা বুঝতে যে সময়টা গেল, তাতে পাঁচু মোদকের একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ার কথা। তবু লোকে লাঠিসোঁটা আর দড়িদড়া নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে বেরিয়ে পড়ল।

    রামলাল তাঁর বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন। ওইসব ডেনজারাস লোক যত দূরে থাকে ততই ভাল।”

    ভুবনবাবু খ্যাঁক করে উঠলেন, “কাপুরুষের মতো কথা বোলো না। লোকটাকে আমাদের পুলিশের হাতে দেওয়া উচিত ছিল। তোমরা এতগুলো লোক থাকতেও দিনে-দুপুরে সকলের চোখের সামনে দিয়ে একটা জলজ্যান্ত লোক কী করে গায়েব হয়ে যায়, বলতে পারো?”

    “লোকটা বোধহয় কোনও ম্যাজিক-ট্যাজিক জানে। কালাচাঁদ সাধু তো দিনে দুপুরে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। সেইরকমই কিছু…”।

    ভুবনবাবু ছেলের দিকে কটমট করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, “এই তোমার বিজ্ঞানমনস্কতা? তুকতাক, মাদুলি কবচ, ভূত-প্রেত এইসব যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে, তাহলে কী হবে জানো? তোমার ল্যাবরেটরিতে ক’দিন পরে ঘাস গজাবে। হুঁ, উনি আবার বিজ্ঞানী! কুলাঙ্গার কোথাকার!”

    রামলাল এই ভর্ৎসনায় খুবই লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করলেন।

    কিন্তু কথাটা নাবুর খুব লাগল। তিনি যদিও বাবাকে খুবই ভয় পান, কিন্তু তুকতাক ভূত-প্রেত ইত্যাদির অপমান ঠিক হজম করতে পারলেন না খুবই বিনীতভাবে তিনি বললেন, “কিন্তু বাবা, ওসবই আছে।”

    ভুবনবাবু হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, “কী আছে বললে?”

    নন্দবাবু আমতা-আমতা করে বললেন, “আজ্ঞে স্বচক্ষেই দেখেছি যে…”

    নন্দবাবু ভুবনবাবুর ভাবসাব দেখে দু’পা পিছু হটে বলেন, “আমাদের ভৌত ক্লাবের অনেকেই কিন্তু দেখেছে।”

    ভুবনবাব আর একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, “ভৌত ক্লাব। কতগুলো পাগল তর ইডিয়ট মিলে একটা গাঁজাখুরি আড্ডা বসিয়েছে, আর তাদের সব গু-গল্প আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। তোমার অধঃপতন দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। ভূত-প্রেত নিয়ে মানুষ কখন মাথা ঘামায় জানো? যখন তার হাতে কোনও কাজ থাকে না। কাজের লোকেরা কখনও বাজে ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না। বহুদিন নিষ্কর্মা বসে থেকে-থেকে তোমার মাথাটাই অকেজো হয়ে গেছে।”

    নবাবু এই অভিযোগের কোনও সদুত্তর খুঁজে পেলেন না। আসলে বলার মতো অনেক কথাই আছে, তবে সেগুলো এখন বললে ভুবন রায় তাঁকে ছিঁড়ে ফেলবেন।

    ভুবন রায় তাঁর দুই অপদার্থ পুত্রের দিকে বাঘা চোখে নীরবে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, “পাঁচু মোদক, তার শাগরেদ আর আমাদের দুলালবাবু- এই তিনজন লোককে খুঁজে বের করা খুবই জরুরি। যদিও আমাদের তেমন কিছু চুরি যায়নি এবং খুনখারাবি বা মারদাঙ্গাও হয়নি, কিন্তু এসব ছোটখাটো ব্যাপারকে উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে। আমার তো ঘোর সন্দেহ হচ্ছে, গত কিছুদিন যাবৎ আমি যেসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেছি, সেগুলোর ফর্মুলা বাগানোর জন্যই দুষ্টু লোকের আনাগোনা শুরু হয়েছে।”

    এই সময়ে ভুবন রায়ের তৃতীয় পুত্র শ্যামলাল এসে ঘরে ঢুকল।

    শ্যামলালকে বাইরে থেকে বুঝে ওঠা খুবই শক্ত। কারণ শ্যামল কথাবার্তা খুবই কম বলে। তার বয়স পঁচিশের মধ্যেই। এই বয়সেই সে এমন গম্ভীর হয়ে থাকে যে, তাকে ছেলেমানুষ বলে মনে হয় না। সে মাঝে-মাঝে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় এবং কখনও কখনও এক-দেড় মাস পর হঠাৎ আবার ফিরে আসে। ভুবন রায় প্রথম-প্রথম তাকে খুবই শাসন করতেন। কিন্তু শ্যামলাল নীরবে শাসন-মারধর বকাঝকা সহ্য করে যায়, কখনও প্রতিবাদ করে না, এবং সে কোথায় যায় তাও কাউকে বলে না। ভুবন রায় তাঁর এই রহস্যময় ছেলেটিকে বিশেষ পছন্দ করেন না বটে, কিন্তু ঘটানও না। দি-পনেরো আগে শ্যামলাল উধাও হয়ে গিয়েছিল।

    ভুবন রায় শ্যামলালের দিকে ভ্রূ কুঁচকে চেয়ে থেকে বললেন, “তুমি আবার কোথা থেকে উদয় হলে?”

    শ্যামলাল জবাব দিল না, নীরবে চেয়ে রইল।

    ভুবন রায় বলেন, “তোমরা এক একজন এক একরকম। বাড়িটা ক্রমেই চিড়িয়াখানা হয়ে উঠছে। যাকগে, তোমরা এখন যে যার কাজে যাও। আমি ল্যাবরেটরিতে গিয়ে এখন বিজ্ঞানচর্চা করব, বিজ্ঞান নিয়ে বসে থাকলে মাথায় বাজে জিনিস ঢুকতে পারে না।

    শ্যামলাল হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, “আমার একটা কথা ছিল।”

    “কী কথা?”

    “আপনি একটা ভুল করছেন।”

    ভুবন রায় এমন অবাক বহুঁকাল হননি। চোখ গোল করে বললেন, “ভুল! আমি!”

    “আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি বলছেন কাল রাতে আমাদের বাড়িতে দু’জন চোর ঢুকেছিল। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়।”

    “তার মানে?”

    “চোর একজনই ঢুকেছিল। সে পাঁচু মোদক। দ্বিতীয় লোকটা দুলালবাবু। আপনি দুলালবাবুকে চিনতে পেরেছিলেন, কিন্তু তবু কেন কে জানে তাকে ফের অন্য একটা লোক বলে ধরে নিচ্ছেন।”

    ভুবন রায় খুবই অবাক হয়ে বললেন, “রাতের বেলা তাঁকে আমি দুলালবাবু বলে ভুল করেছিলাম ঠিকই। কিন্তু সকালের আলোয় দেখলাম লোকটার বয়স অনেক কম, দিব্যি তাগড়া চেহারা আর হাবভাবও অন্যরকম।

    ‘ঠিকই দেখেছেন। আমাদের রোগাভোগা দুলালবাবুরই এটা অন্য চেহারা।”

    “বলো কী? তুমি কি বলতে চাও যে, দুলালবাবু নিজের চেহারা পালটে ফেলতে পারেন? এই বিজ্ঞানের যুগে কি ওসব বুজরুকি চলে?”

    শ্যামলাল মাথা নেড়ে বলল, “আমি বিজ্ঞানের বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে বিজ্ঞানও নানারকম ভেলকি দেখাতে পারে। লোকটা যে দুলালবাবুই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”

    “তুমি কী করে বুঝলে?”

    “আমি নিজের চোখে ব্যাপারটা দেখেছি।”

    “কী দেখেছ?”

    “আপনি তো জানেন যে, আমি পনেরো দিন আগে নিরুদ্দেশ হয়ে যাই। কাল অনেক রাতে আমি ফিরে এসেছি। কিন্তু এসে প্রথমে বাড়ির মধ্যে না ঢুকে ল্যাবরেটরির দিকে যাই। কারণ ল্যাবরেটরিতে একটা অদ্ভুত আলো দেখা যাচ্ছিল।”

    “বটে!”

    “আজ্ঞ হ্যাঁ। শুধু ভালোই নয়, ল্যাবরেটরি থেকে একটি রঙিন বেও বেরোচ্ছিল। আমি গিয়ে কাঁচের শার্শি দিয়ে উঁকি মেরে দেখি, দুলালবাবু মেঝের ওপর পড়ে আছেন। আমি চট করে ঢুকতে ভরসা পাইনি। ভয় হয়েছিল, এই গ্যাসটা বোধহয় বিষাক্ত। তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি ল্যাবরেটরিতে ঢুকে দুলালবাবুকে পরীক্ষা করে দেখলাম, উনি মারা যাননি। তবে নাড়ির গতি বেশ বেশি ছিল। মাঝে-মাঝে কেমন যেন কেঁপে-কেঁপে উঠছিলেন।

    ভুবনবাবু এবার ব্যগ্র হয়ে বললেন, “তারপর?”

    “তারপর এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা দেখলাম। আমার চোখের সামনে দুলালবাবুর চেহারার মধ্যে একটা পরিবর্তন ফুটে উঠতে লাগল।”

    “কী রকম পরিবর্তন?”

    “প্রথমে দেখলাম, দুলালবাবুর মুখের চামড়ায় যে-সব ভাঁজটাজ ছিল, সেগুলো মিলিয়ে গিয়ে চামড়াটা বেশ টান-টান হয়ে উঠছে। রোগা শরীরটার মাসলগুলো যেন ঠেলে উঠতে চাইছে। আর বয়সটা যেন বেশ কমে যাচ্ছে।”

    “বলো কী?”

    “আজ্ঞে যা বলছি সব সত্যি। নিজের চোখে দেখা।”

    “তখন তুমি কী করলে?”

    “প্রথমে ভুতুড়ে কাণ্ড ভেবে একটু ভড়কে গিয়েছিলাম। তারপর মনে পড়ল, ল্যাবরেটরিতে আমি একটা আলো আর ধোঁয়া দেখেছি। তাই উঠে গিয়ে টেবিলের ওপরটা ভাল করে দেখলাম।”

    “কিছু পেলে?”

    “আজ্ঞে হ্যাঁ। মনে হল, একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণের মতো কিছু ঘটে গেছে। একটা টেস্টটিউবের মধ্যে একটা জিনিস দেখে খুবই অবাক হলাম। সেটা থেকে তখনও একটা বিকিরণ বেরিয়ে আসছিল। অবশ্য দেখতে-দেখতেই সেটা মিলিয়ে গেল। তবু আমি টেবিলের ওপরে রাখা ভাঙা শিশিগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম। আমার মনে হল, দুলালবাবু কোনও একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলেন।”

    “বটে!” ভুবনবাবুর চোখে-মুখে রীতিমত আলো ফুঠে উঠল।

    “আজ্ঞে হ্যাঁ। দুলালবাবু বোধহয় যৌবন ফিরে পাওয়ার কোনও ফর্মুলা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। শিশিগুলো অধিকাংশই পুড়ে কালো হয়ে গেছে। তবে আমি কয়েকটা শিশির লেবেল থেকে কেমিক্যালগুলোর নাম টুকে নিতে পেরেছি। বাকিগুলো পারিনি।”

    ভুবনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “এ তো যুগান্তকারী ঘটনা।”

    শ্যামলাল বলল, “যে আজ্ঞে। তবে দুলালবাবু ছাড়া এই ঘটনা বোধহয় আর ঘটানো যাবে না। কারণ অন্তত সাত-তাটটা শিশি-বোতল একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে।”

    ভুবনবাবু বিজ্ঞের মতো হেসে বললেন, “কুছ পরোয়া নেই। কোন কোন শিশি কাজে লাগানো হয়েছিল, তা অনায়াসে বাই সিম্পল প্রসেস অব এলিমিনেশন বের করা যাবে। আমাদের কাছে সব কেমিক্যালের লিস্ট করা আছে। যেগুলো পাওয়া যাবে না সেগুলোই কাজে লাগানো হয়েছে বলে ধরতে হবে।”

    “যে আজ্ঞে।”

    “তোমাকে যতটা গবেট মনে করতাম, শ্যামলাল, তুমি বোধহয় ততটা নও। যাকগে, এখন ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ব্যাপারটা দেখি।”

    .

    দুলাল সেন ভুবনবাবুর বাড়ি থেকে সেই যে বেরিয়ে এসেছিলেন, তারপর থেকেই তার একটা বিরাট সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারছেন যে, তিনি আর আগেকার দুলাল সেন নন। আবার পুরনো দুলাল সেনকে যে মন থেকে তাড়াবেন তাও পারছেন না। ফলে এখন একটা মানুষের মধ্যেই দু-দুটো মানুষ ঢুকে বসে আছে।

    সবেগে রাস্তা দিয়ে সোজা অনেকটা হাঁটলেন দুলালবাবু। আসলে তার যাওয়ার কোনও তেমন জায়গা নেই। তাঁর তৈজপত্র বলতে যা-কিছু তা হল একটা টিনের সুটকেস আর শতরঞ্চিতে বাঁধা বিছানা। তা সে-দুটো ভুবনবাবুর ল্যাবরেটরিতেই পড়ে আছে, উদ্ধার করার কোনও আশা আপাতত নেই। সেখানে নিশ্চয়ই এতক্ষণে পুলিশ গিসগিস করছে। তবে দুলালবাবু জিনিসপত্রের জন্য বিশেষ চিন্তিত নন। তাঁর এখন প্রধান চিন্তা হল, নিজের ভিতর দু-দুটো মানুষকে তিনি সামলাবেন কী করে?

    ভেবেচিন্তে তিনি দেখছেন যে তার ভিতরে একটা হল সাবেক দুলাল। সে লোকটা নিরীহ, শান্ত, ভালমানুষ, ভিতু, বুড়োটে। আর একটা হল নতুন দুলাল। সে মহা চ্যাংড়া, গুণ্ডা, ফচকে, ইয়ারবাজ, সাহসী, মারকুট্টে। ফলে দুই দুলালে বনিবনা হচ্ছে না।

    রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি স্পষ্ট টের পাচ্ছিলেন, তাঁর ভিতরকার সাবেক দুলাল আর নতুন দুলালের মধ্যে বেশ-একটা ঠেলাঠেলি, ওঁতেওঁতি লেগে পড়েছে। তবে নতুন দুলালের মধ্যে মসমস করছে জোর আর তেজ।

    দুলালবাবু হঠাৎ রাস্তা থেকে একটা আধলা ইট তুলে নিয়ে হালদারবাবুর টিনের চালে ধাঁই করে ছুঁড়ে মারলেন। পিলে চমকে দেওয়ার মতো শব্দ হল।

    দুলালবাবুর ভিতরকার সাবেক দুলাল হাঁ-হাঁ করে বলে উঠল, “এসব কী হচ্ছে? এসব তো মহা অন্যায় কাজ! এ যে ঘোরতর দুষ্টুমি!”

    নতুন দুলাল জবাবে বলে উঠল, “রাখো, রাখো, তোমার ভালমানুষি। এই হালদার তোমার অভাবের সময় নিজের গবেট ছেলেকে চার মাস পড়িয়ে নিয়ে মাত্র এগারো টাকা ঠেকিয়েছিল, তা মনে আছে হে!”

    “আহা, তাতে কী! বিদ্যাদান মহা পুণ্যকর্ম। টাকা-পয়সা কিছু নয়।”

    “নয় মানে? টাকা-পয়সা কিছু নয় বললেই হল? এখন পকেটে গোটা-দশেক টাকা থাকলে নবীন ময়রার দোকানে বসে গরম-গরম কচুরি আর হালুয়া খাওয়া যেত না?”

    এদিকে চালে ঢিল পড়ায় খিটকেল হালদারবাবু রে-রে করে তেড়ে বেরিয়ে এলেন। এসে দুলালবাবুকে দেখে তাজ্জব। আমতা-আমতা করে বললেন, “দুলালবাবু যে! তা ঢিলটা কে মারল দেখেছেন নাকি?”

    দুলালবাবু বুকটা একটু চিতিয়ে বললেন, “আমিই মেরেছি। আপনি লোকটা খুবই খারাপ। ভীষণ রকমের খারাপ।”

    হালদার চোখ পাকিয়ে বললেন, “বটে! কে বলল আমি খারাপ?”

    “আমিই বলছি।”

    “আপনার তো খুব তেল হয়েছে দেখছি!”

    “মুখ সামলে কথা কইবেন।”

    “বটে! না হলে কী করবেন শুনি!”

    দুলালবাবু আর একটা ইট তুলে নিলেন। তাঁর বিবেক বলল বটে যে, কাজটা ঠিক হচ্ছে না, তবু ধাঁই করে সেটাও টিনের চালে মারলেন তিনি।

    হালদারবাবু এক লাফে এসে দুলালবাবুর টুটি টিপে ধরলেন। কিন্তু নতুন দুলালের সঙ্গে পারবেন কেন? দুলালবাবু এক ঘুসিতে তাঁকে সাত হাত দূরে ছিটকে ফেলে হাঃহাঃ করে হেসে উঠলেন।

    ওদিকে হালদারের ছেলে শিবু বেরিয়ে এসে বাপের হেনস্তা দেখে আর থাকতে পারল না। সে মহা গুণ্ডা প্রকৃতির। ছুটে এসে সে দুলালবাবুকে জাপটে ধরে বলল, “স্যার, আপনাকে আমি মারব না, শত হলেও মাস্টারমশাই, কিন্তু পুলিশের হাতে তুলে দেব।”

    দুলালবাবু ফের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে শিবুকে স্রেফ বেড়ালছানার মতো তুলে দূরে ছুঁড়ে দিলেন।

    এই কাণ্ড দেখে চারদিক থেকে লোকজন ছুটে আসতে লাগল। দুলালবাবু আর দাঁড়ালেন না। তাড়াতাড়ি অন্য রাস্তায় ঢুকে ছুটতে ছুটতে ভিন পাড়ায় চলে এলেন। তাঁর বেশ ফুর্তি লাগছিল। নাঃ, এতদিনে বেঁচে থাকাটাকে প্রথম উপভোগ করা যাচ্ছে।

    এই পাড়াতে ফটিকবাবুর বাস। ফটিকবাবুর সঙ্গে একসময়ে খুব দহরম-মহরম ছিল। সেই সময় একদিন ফটিক তাঁর কাছ থেকে দশটা টাকা ধার নিয়েছিল। এতকাল ঘটনাটা খেয়াল ছিল না দুলালবাবুর। এখন স্মৃতিশক্তি প্রখর হয়ে ওঠায় মনে পড়ে গেল।

    তিনি সোজা গিয়ে ফটিকের দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে হেঁড়ে গলায় ডাকলেন, “ফটিক! ফটিক!”

    ফটিকবাবু ঘুম থেকে উঠলেও ভাল করে ঘুমের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। গতকাল রাতে ভূতের খোঁজে মহানন্দ কাঁপালিকের ডেরায় রাত তিনটে অবধি ধরনা দিয়ে বসে ছিলেন। ভূত দেখতে পাননি। তাই মেজাজটাও খিচড়ে আছে। তাঁর শালা খুব ঠেস দিয়ে কথা বলছে আজকাল। বাজিটা একরকম হেরেই গেছেন বলা যায়।

    দুলাল সেনকে দেখে তিনি বিশেষ আহ্লাদিত হলেন না। হাই তুলে বললেন, “দুলালদা যে! এত সকালে কী মনে করে?”

    “বছর-পাঁচেক আগে তুমি দশটা টাকা ধার নিয়ে আর শোধ দাওনি। আমি এখন গরম কচুরি খেতে যাচ্ছি, বড্ড খিদে পেয়েছে। দশটা টাকা দাও।”

    ফটিকবাবু একটু কৃপণ লোক। চোখ কপালে তুলে বললেন, “দশটা টাকা! ধার! এসব কী বলছ দুলালদা? আমার তো মনে নেই!”

    “চোপ, দুলাল সেন একটা পেল্লায় ধমক দিয়ে বললেন, “তোমার মনে না থাকলেও আমার আছে। টাকাটা দাও শিগগির।

    ফটিকবাবু কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে খানিকক্ষণ দুলালবাবুর দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “উঁহু, তুমি তো দুলালবাবু নও হে চাঁদু? আমাদের দুলাল সেন রোগা-ভোগা মাস্টার-মানুষ, তার এত তেজ নেই। তোমাকে দেখতে খানিকটা ওরকম হলেও সে তো নও!”

    দুলালবাবুর এই ভয়টাই ছিল। তাঁর চেহারায় দুলালবাবুর আদল থাকলেও একটা মস্ত পরিবর্তনও যে ঘটে গেছে, তা তিনি বেশ টের পাচ্ছেন। কিন্তু তা বলে তা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য। তার ওপর প্রচণ্ড খিদেও পেয়েছে। ভ্যাজর-ভ্যাজর করলে তো চলবে না।

    দুলালবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “সোজা আঙুলে যে ঘি উঠবে না, তা আমি আগেই জানতুম হে। আমি মুখচোরা আর লাজুক মানুষ বলে তোমরা খুব জো পেয়ে গেছ, না? এবার শঠে শাঠ্যং। আমি আর সেই সাবেক দুলাল নই। টাকাটা ছাড়বে কি না!”

    ফটিকবাবু হঠাৎ “বাঁচাও, বাঁচাও, ডাকাত! ডাকাত!” বলে বিকট চেঁচাতে লাগলেন।

    দুলালবাবু খপ করে ফটিকবাবুর মুখটা চেপে ধরে অন্য হাতে পটাং করে একটা চড় কষালেন তাঁর গালে। ফটিকবাবু চোখে অন্ধকার দেখে বসে পড়লেন।

    দুলাল সেন ঘরে ঢুকে বালিশের পাশে রাখা ফটিকবাবুর মানিব্যাগ থেকে দশটা টাকা নিয়ে বেরিয়ে এলেন। ফটিকবাবুর উদ্দেশে বললেন, “দশটা টাকাই নিলাম, এই দেখে রাখো। সুদ ধরলেও পাঁচ বছরে আরও গোটা পাঁচেক টাকা বেশি হয়। কিন্তু আমি সুদখোর নই বলে শুধু আসলটা নিয়েই ছেড়ে দিচ্ছি।”

    আর কোনওদিকে দৃকপাত না করে দুলালবাবু সটান গিয়ে ময়রার দোকানে হাজির হলেন। গরম কচুরির গন্ধে জায়গাটা মাত হয়ে আছে।

    দুলালবাবু বাজখাই গলায় হুকুম দিলেন, “দশটা কচুরি আর এক পোয়া হালুয়া।”

    নবীন ময়রা দুলালবাবুকে চেনে। নিতান্তই পেটরোগা গোবেচারা মানুষ। জীবনে কেউ তাঁকে দোকানে বসে কুপথ্য করতে দ্যাখেনি। তার ওপর মানুষটার হাবভাবও যেন কেমন-কেমন!

    কচুরি ক’টা স্রেফ দু’মিনিটে উড়িয়ে এবং হালুয়া এক মিনিটে নস্যাৎ করে দুলালবাবু উঠে আড়মোড়া ভেঙে বললেন, “না, এসব হালকা-পলকা জিনিসে কি পেট ভরে?”

    নবীন ময়রার হঠাৎ দয়া হল। বলল, “মাস্টারমশাই, আপনি যে কচুরি ভালবাসেন তা তো জানতাম না। আচ্ছা, আপনি বসুন, পেট ভরে যা খুশি খান, আজ আপনাকে দাম দিতে হবে না। আপনার চেষ্টাতেই না গবেট ছেলে রেমো পাশ করতে পেরেছিল। ওরে, মাস্টারমশাইকে আরও দে!”

    দুলালবাবু ফের বসে গেলেন এবং তারপর যা খেতে লাগলেন, সে-একটা দৃশ্যই বটে। স্বয়ং নবীন আর তার কর্মচারীরা দুলালবাবুর খাওয়া দেখে এমন বিহ্বল হয়ে গেল যে, কাকে এসে জিলিপি তুলে নিয়ে গেল, বেড়াল এসে দুধ খেয়ে যেতে লাগল, কড়াইতে কচুরি পুড়ে ঝামা হয়ে গেল।

    নবীন ময়রা দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “সাক্ষাৎ বৃকোদরের দেখা পেলাম আজ। চক্ষু সার্থক, ময়রাজন্মও সার্থক। ওরে মাস্টারমশাইকে আরও দে, হাঁ করে দেখছিস কী?”

    তা দুলালবাবুর তাতে আপত্তি হল না। এক ঝুড়ি কচুরি আর এক বারকোশ হালুয়া খেয়ে ডজন-চারেক জিলিপি আর সেরটাক রাবড়ি চালিয়ে দিলেন ভিতরে। তারপর ঠেলে-ওঠা পেটটার ওপর একটু তেরে-কেটে-তাক বাজিয়ে নিয়ে বললেন, “না, এতেই দুপুর পর্যন্ত চলে যাবে।”

    খেয়েদেয়ে মনটা বেশ প্রসন্ন লাগল দুলালবাবুর, হাসিমুখেই বেরিয়ে পড়লেন। শরীরটা চনমন করছে একটা কিছু করার জন্য। দৌড়তে ইচ্ছে করছে, লাফাতে ইচ্ছে করছে, ছুঁড়তে হচ্ছে করছে।

    দুলালবাবু খানিকদূর হেঁটে যেতেই দেখতে পেলেন বি.এন. ক্লাবের মাঠে খুব জম্পেশ করে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। বি.এন. মানে বিবেকানন্দ ক্লাব। এই অঞ্চলে বিবেকানন্দ ক্লাবের খুব নামডাক। তারা জেলার শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট টিম। বাঘা-বাঘা সব বোলার আর ব্যাটসম্যান খেলে। বাঘা সেন আর বিক্রম সিংহ দুই সাঙ্ঘাতিক ফাস্ট বোলার। তেজেশ বাগ আর সূর্যজিৎ পালধি বিখ্যাত ব্যাটসম্যান। তারাই সব খেলছে।

    দুলালবাবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ খেলা দেখলেন। তাঁর মনে হল বাঘা সেন-এর বল মোটেই তেমন জোরালো নয়। বিক্রম সিংহও নিতান্তই ম্যান্তামারা।

    ধুতিটা একটু গুটিয়ে পরে নিলেন দুলালবাবু। তারপর সোজা মাঠের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

    “এই যে বাঘা, ও কী বল করছ ভাই? এই কি হাতের জোর? দাও তো। দেখি আমাকে একবার।”

    বাঘা সেন দুলালবাবুর প্রাক্তন ছাত্র। মাস্টারমশাইকে সে ভালই চেনে। জীবনে খেলাধুলার ধারে-কাছেও ঘেঁষেননি দুলালবাবু। তাই সে অবাক হয়ে বলল, “স্যার, আপনি বল করবেন?”

    দুলালবাবু হাত বাড়িয়ে বললেন, “আরে দ্যাখোই না, কীরকম করি।”

    বাঘা তাড়াতাড়ি বলটা দুলালবাবুর হাতে দিল। দুলালবাবু বল করার কায়দাটা খানিকক্ষণ দেখে মনে মনে রপ্ত করে নিয়েছেন। অনেকটা দৌড়ে এসে তিনি বলটা হাত ঘুরিয়ে চমৎকার ছেড়ে দিলেন।

    ব্যাট করছিল বিখ্যাত সূর্যজিৎ। বলটা পিচে পড়েই এমন অদৃশ্য হয়ে গেল যে, সূর্যজিৎ ব্যাট হাতে হাঁ করে রইল। ততক্ষণে অবশ্য বলটা তার লেগ আর মিডল স্টাম্প উপড়ে দিয়ে বাউন্ডারিতে চলে গেছে।

    চারধারে নিস্তব্ধতা নেমে এল বিস্ময়ের। তারপরেই অবশ্য সবাই হাততালি দিয়ে উঠল।

    সূর্যজিৎও দুলালবাবুর পুরনো ছাত্র। সে এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, আপনার ভিতরে যে এত বড় একজন ফাস্ট বোলার লুকিয়ে ছিল, তা তো কখনও টের পাইনি।”

    দুলালবাবু একটু উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে বললেন, “ক্রমে ক্রমে আরও কত কী টের পাবে!”

    মাত্র চার ওভারের মধ্যেই দুলালবাবু দশজনকে আউট করে দিলেন। চারদিকে একটা হইচই পড়ে গেল। বি.এন. ক্লাবের সেক্রেটারি স্বয়ং এসে বললে ‘দুলালবাবু আপনি আমাদের ক্লাবে জয়েন করুন।”

    দুলালবাবু মিটমিট করে হেসে বললেন, “আমাকে রিক্রুট করা বড় চাট্টিখানি কথা নয়। আমার খোরাক কে দেবে?”

    “সে আর বেশি কথা কী? আমার বাড়িতেই খাবেন।”

    “বটে! পারবেন তো খাওয়াতে?”

    সেক্রেটারি জয়ন্ত সোম মস্ত বড়লোক। টাকাপয়সার অভাব নেই। তাঁর আত্মসম্মানে লাগল। বললেন, “পারব না মানে? কত আর খাবেন আপনি?”

    দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “ঠিক আছে। ভেবে বলব।”

    “এর আর ভাবাভাবির কী আছে? আগামীকালই আমাদের সঙ্গে রসুলপুরের রামকৃষ্ণ ক্লাবের খেলা। আর, কে, ক্লাব খুবই ভাল টিম। আপনাকে এ-খেলায় নামতেই হবে।”

    দুলালবাবু নিমরাজি হয়ে বললেন, “ঠিক আছে, দেখব।”

    জয়ন্ত নোম বললেন, “আর আজ দুপুরে আমার ওখানেই চাট্টি খাবেন।”

    দুলালবাবু একটু তেরিয়া হয়ে বললেন, “চাট্টি মানে? ওসব চাট্টি-ফাট্টিতে আমার আজকাল হয় না বাপু। আর খেতে বসলে লজ্জা-উজ্জার বালাইও থাকেনা।”

    জয়ন্ত নোম একটু লাল হয়ে বললেন, “ঠিক আছে। লজ্জা করার মতো ব্যবস্থা হবে না, ভাল করেই খাওয়াব।”

    দুলালবাবুকে এরপর ব্যাটও করতে হল। কিন্তু সেটায় তেমন জুত করতে পারলেন না। তবে আনতাবড়ি ব্যাট চালিয়ে যে কটা লাগাতে পারলেন সব ক’টাই ছক্কা হওয়ায় গোটা-ষাটেক রান তুলে আউট হয়ে গেলেন।

    দুলালবাবুর অসামান্য ক্রীড়াপ্রতিভা এতকাল কোথায় লুকানো ছিল, তা সবাই জানতে বিশেষ আগ্রহী। খেলার পর সবাই দুলালবাবুকে ঘিরে ধরল।

    আর তখনই সেই দুলালবাবুর সঙ্গে এই দুলালবাবুর নানা খুঁটিনাটি পার্থক্য সকলের চোখে পড়তে লাগল। সেই দুলালবাবু ছিলেন রোগা, সুটকো, দুবলা, আর এই দুলালবাবু ছিপছিপে হলেও তাগড়াই, লড়াকু, জোরদার। বয়সটাও বেশ তফাত।

    সূর্যজিৎ আমতা-আমতা করে বলল, “কিছু মনে করবেন না, আপনি কি দুলালবাবুর ছোট ভাই?”

    দুলালবাবু অভিজ্ঞতার বলে সেয়ানা হয়েছেন। বুঝতে পেরেছেন যে, নিজেকে আর দুলালবাবু বলে চালানোর চেষ্টা বৃথা। তাই তিনি কথাটা স্বীকার করে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। দাদার সঙ্গে আমার চেহারার বড্ড মিল বলে সকলেই ভুল করে।”

    “আপনার নাম কী?” দুলালবাবু উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে বললেন, “নামে কীই বা আসে যায়! পাঁচু মোদক নামটা কেমন?”

    সবাই অবাক হয়ে বলল, “দুলাল সেনের ভাই পাঁচু মোদক হয় কী করে?”

    “হয় না বুঝি! তা হলে সুলাল সেন নামটাই চলুক।”

    সবাই একটু মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। দুলাল সেনের ভাইয়ের মাথায় একটু ছিট আছে কি? তবে থাকলেও ক্ষতি নেই। লোকটা খেলে ভাল।

    দুলালবাবুর নাম ক্লাবের খাতায় সুলাল সেন বলেই লেখা হল।

    দুপুরবেলা জয়ন্ত সোম নিজের গাড়িতে করে মহা সমাদরে দুলালবাবুকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। বিশাল আয়োজন হয়েছে খাওয়ার। স্নান করে বেশ চা বোধ করলেন দুলালবাবু, খিদেটাও চাগিয়ে উঠল। খেতে বসবার কিছুক্ষণ পর নিজের খাওয়া দেখে দুলালবাবুর নিজেরই লজ্জা করতে লাগল। আসলে লজ্জা পাচ্ছিল তাঁর ভিতরকার সাবেক দুলাল। নতুন দুলাল ওসবের তোয়াক্কা করে না, সে আস্তিন গুটিয়ে তেড়ে-মেড়ে শুধু খেয়েই চলে। পাহাড়-পর্বত খেয়ে ফেলতে চায়।

    সাবেক দুলাল বলে, “আস্তে হে দুলাল, আস্তে। অতটা মাংস না-ই বা খেলে! ঘি, গরমমশলা, লঙ্কাবাটা কি রোগা পেটে সইবে!”

    নতুন দুলাল খেঁকিয়ে উঠে বলে, “নজর দেবে তো মারব দুই থাবড়া। নিজে খেতে পারতে না বলে এখন হিংসে হচ্ছে, না?”

    সাবেক দুলাল দুঃখের গলায় বলে, “না ভাই, হিংসে নয়। তোমার জন্য বরং দুশ্চিন্তাই হচ্ছে। ওই যে সাতখানা কই মাছ ওড়ানোর পর ফের মাছ চাইলে, তোমার লজ্জা করল না? ভদ্রলোকেরা কি অত খায়? আর গেরস্তর দিকটাও

    তো ভাববে! তাদেরও তো কম পড়ে যেতে পারে।”

    “দ্যাখো হে সুটকো দুলাল, তুমি একটি আস্ত শনিঠাকুর। সর্বদা টিক টিক করো বলেই তোমার উন্নতি নেই। কিন্তু এখন আমার মাথা গরম কোরো না। খাওয়ার সময় দিক করলে আমার মাথার ঠিক থাকে না।”

    দুলালবাবু মোট ষোলোটা কই মাছ, সেরটাক মাংস, জামবাটি-ভর্তি পায়েস ও অন্যান্য উপকরণ শেষ করে যখন উঠলেন, তখন বাস্তবিকই জয়ন্ত সোমের ভিতর বাড়িতে ভাঁড়ার ফাঁকা। নতুন করে রান্না চাপাতে হয়েছে।

    দুলালবাবু নিজের পেটে আবার একটু তেরে-কেটে-তাক বাজিয়ে নিলেন। না, মোটামুটি ভরেছে বলেই মনে হচ্ছে।

    খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিতে যাবেন, এমন সময় সদর দরজায় কড়াতকড়াত করে কড়া নাড়ার শব্দ হল। বেশ জোরালো আর মেজাজি আওয়াজ।

    জয়ন্ত সোম দরজা খুলতেই পুলিশের দারোগার অত্যন্ত গম্ভীর মুখ দেখা গেল। তিনি গুরুতর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “দুলাল সেন এখানে আছে বলে আমরা খবর পেয়েছি।”

    জয়ন্ত সোম উৎকণ্ঠ হয়ে বললেন, “আজ্ঞে না, তবে তাঁর ভাই …”।

    দারোগা বাধা দিয়ে বললেন, “লোকটা যে দুলাল সেন নয় তা আমরাক্টজামি। লোকটা আসলে খুনি। ইমপস্টার। কখনও নিজের নাম বলছে পাঁচু মোদক, কখনও দুলাল সেন…”।

    “অ্যাঁ!” বলে হাঁ করে রইলেন জয়ন্ত সোম।

    “হল কী মশাই? হাঁ করে রইলেন কেন?”

    জয়ন্ত আমতা-আমতা করে বললেন, “আমাদের কাছেও যে তাই বলেছে। নতুন একটা নামও বলেছে। সুলাল সেন।”

    “কই, চলুন, চলুন লোকটাকে এক্ষুণি গ্রেফতার করতে হবে। সাঙ্ঘাতিক খুনি। দুলাল সেনকে মেরে পুঁতে ফেলেছে…..”

    দারোগা-পুলিশ সব হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল। তারপর চারদিকে তুমুল তল্লাশি হতে লাগল। কিন্তু কোথাও দুলাল সেনকে খুঁজে পাওয়া গেল না।

    দুলাল সেনের দোষ নেই। পুলিশ এসেছে টের পেয়েই তিনি জানালা গলিয়ে ঘরের পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে পড়ে দৌড়োতে লেগেছেন। যদিও তিনি জানেন যে, নিজেকে খুন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, তবু আপাতত গা-ঢাকা দিতেই হচ্ছে।

    ছুটতে ছুটতে দুলাল সেন যে-জায়গাটায় এসে থামলেন, সেটা ভৌত-ক্লাবের পিছনের পোডড়া বাড়ি। জায়গাটা এক নজরেই তাঁর পছন্দ হয়ে গেল। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, আগাছার দুর্ভেদ্য বেড়া। এখানে চট করে ঢুকতে কেউ সাহস পাবে না।

    দুলালবাবু গুঁড়ি মেরে কাঁটাঝোঁপের জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন। হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে পড়লেন একটা দেওয়ালের কানায়। তারপর পাঁচ ফুট নীচে লাফ দিয়ে নেমে একটা ঢিবি পেরোলেন। আরও গলিখুঁজি এবং ভুলভুলাইয়া পার হয়ে ভিতরে ঢুকে বেশ একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরে এসে ঢুকলেন।

    ঘরখানা দেখে খুবই অবাক। এমন একখানা পোড়ো এবং ভাঙা বাড়ির মধ্যে এই ঘরখানা যেন হাসছে। দিব্যি ঘর। রোজ ঝাঁটপাট হয় বলে মনে হচ্ছে। একধারে একখানা তক্তাপোশ, তার ওপর শতরঞ্চি আর চাঁদর পাতা। একখানা বালিশ আর ভাঁজ করা কম্বল। আর আছে জলের কুঁজো। ঘরের কোণে একটা কুলুঙ্গি তে কিছু অদ্ভুত ধরনের যন্ত্রপাতি। ঘুরে-ঘুরে সবটাই দেখে নিলেন দুলালবাবু। এ-ঘরে কেউ থাকে!

    যে থাকে থাকুক, আসল কথা হচ্ছে লোক্টা এখন নেই। সুতরাং তার বিছানাটা দখল করতে কোনও আপত্তি ওঠার কথাও নেই। দুলালবাবুর মধ্যাহ্নভোজন ভালই হয়েছে। এখন চোখ বুজে বিশ্রাম করা দরকার। পুলিশ তাঁকে এই পোড়া বাড়ির ভিতরে খুঁজতে আসবে না, এ-বিষয়ে তিনি নিশ্চিন্ত।

    দুলালবাবু বিছানায় শুয়ে গায়ে কম্বলটা টেনে নিলেন। তারপর চোখ বুজে কাল রাত থেকে আজকের এই অবধি ঘটনাটা ভাবতে লাগলেন।

    সাবেক দুলাল আর নতুন দুলালের মধ্যে খটাখটিটা এখনও চলছে। সাবেক দুলাল বলছে, “না হে, না বলে কয়ে অন্যে বিছানাটা দখল করা ঠিক কাজ হল না।”

    নতুন দুলাল, নাক সিঁটকে বলল, “তা হলে মেঝেতে পড়ে থাকাই বোধহয় তোমার মতে ভাল কাজ ছিল?”

    ‘দ্যাখো দুলাল, তোমার বড় বাড় বেড়েছে। অতি বাড় ভাল নয় জানো তো!”

    “তোমার মতো শুটকো দুর্বল লোকেরাই যত নীতিবাগীশ হয়। ভিতুদের তো নীতিই সম্বল। যার জোর আছে সে ওসব পরোয়া-টরোয়া করে না।”

    দুলালবাবু ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে ঝগড়াটা অনুধাবন আর উপভোগ করছিলেন। বেশ লাগছে।

    একটু বাদেই দুলালবাবুর বেশ নিদ্রাবেশ হল। তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। হ্যাপা তো কিছু কম যায়নি।

    ঘুম ভাঙল একটা প্রবল দীর্ঘশ্বাসের শব্দে। চেয়ে দেখলেন, সামনে নরহরি দাঁড়িয়ে। মুখে সেই বিগলিত হাসি নেই। একটু শুকনোও দেখাচ্ছে।

    “এই যে নরহরি!”

    “পেন্নাম হই পাঁচুবাবু।”

    “তা খবর-কবর সব ভাল তো নরহরি!”

    পাঁচু মোদক ওরফে নরহরি বলল, “সকলের খবর কি একসঙ্গে ভাল হতে পারে পাঁচুবাবু? কথায় বলে, কারও পৌষমাস, কারও সর্বনাশ।”

    “তা বটে। তরে তোমার কোষ্টা?”

    “আজ্ঞে আমার সাড়ে সর্বনাশ।”

    “‘তার মানে?”

    “আপনার জন্য কাল রাত থেকে কী হয়রানিটাই গেল। জীবনে যা কখনও হয়নি তাও আজ হয়ে গেছে। আমি চোর-দায়ে গেরস্তবাড়িতে ধরা পড়েছিলুম। লজ্জায় আর মুখ দেখানোর জো নেই। তারা খুনের দায়ে ফেলবেন, না চুরির দায়ে, তা ঠিক করতে পারছিলেন না।”

    “বটে! ভারি মজা তো!”

    “মজা আপনার, আমার নয়।”

    “ওই হল। আমার মজা হলে তোমারই বা হতে বাধা কী?”

    “আছে। বাধা আছে। আপনার হাসি হাসি মুখ আর চকচকে চেহারা দেখে মালুম হচ্ছে বেশ সাঁটিয়ে খেয়েছেন।”

    “তা বলতে পারো। সাঁটনটা আজ মন্দ হয়নি। সকাল থেকে বেশ ভালই হচ্ছে।”

    “বাজে কথা বলবেন না পাঁচুবাবু, সকাল থেকে নয়, রাত থেকেই আপনার সাঁটন চলছে।”

    “রাতের কথাটা মনে ছিল না। কিন্তু খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছ কেন বলো তো! না হয় খোরাকটা একটু বেড়েছেই।”

    “আজ্ঞে খোরাক তো আমারও বড় কম নয়। কিন্তু আজ সারা দিনে কী জুটছে জানেন? রায়বাড়িতে ছ’খানা রুটি। মাত্র ছ’খানা।”

    “তা হলে তো খুবই অসুবিধে তোমার।”

    “আজ্ঞে। তার ওপর চারিদিকে পুলিশ ঘুরে বেড়াচ্ছে আপনাকে আর আপনার লাশকে খুঁজতে। সঙ্গে আমাকেও। তা হলেই বুঝুন, সর্বনাশ আর কাকে বলে। মেলা চোরাগোপ্তা পথ আর গলখুঁজি জাঙ্গাল-পাঙ্গাল ডিঙিয়ে নিজের ডেরায় এসে দেখছি কী দেখছি, না পাঁচুবাবু ভুড়িটি ভাসিয়ে আমার বিছানা দখল করে পড়ে ঘুমোচ্ছন। বুঝুন তা হলে, পৌষমাস ছাড়া একে আর কী বলা যায়।”

    দুলালবাবু ভূ একটু কুঁচকে বললেন, “ওহে শোনো, আমাকে তোমার আর পাঁচু নামে ডাকতে হবে না। নিজের নামটা আমার মনে পড়ে গেছে।”

    পাঁচু মুখটা বিকৃত করে বলল, “তবে আর কী, কৃতার্থ করেছেন! এবার নাম বিক্রির টাকাটাও বোধহয় ফেরত চাইবেন!”

    দুলালবাবু অমায়িক হেসে বললেন, “পুরোটা দিতে হবে না। এক টাকা নামের ভাড়া বাবদ কেটে চারটে টাকাই না-হয় দাও। এক রাত্তিরের ভাড়া হিসেবে এক টাকা কিছু কমও নয় কী বলো!”

    “চাইছেন তা হলে!”

    “চাইছি। আজকাল আমার বড় কথায় কথায় খিদে পায়।”

    পাঁচু মুখোনা গোমড়া করে ট্যাঁক থেকে পাঁচটা টাকা বের করে বলল, “এই নিন, পুরোটাই ফেরত দিচ্ছি। ভাড়া লাগবে না। দয়া করে বিছানাটা ছাড়েন তা হলে উপোসী শরীরটাকে একটু জিরেন দিতে পারি।”

    দুলালবাবু তাড়াতাড়ি উঠে বললেন, “আহা, শোও হে শোও। আমার যথেষ্ট ঘুম হয়েছে।”

    দুলালবাবু উঠে পড়লেন। শরীটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। মনেও বেশ ফুর্তি। গুনগুন করে গান ভাঁজতে-ভাঁজতে ঘরেই পায়চারি করতে লাগলেন।

    “আচ্ছা নরহরি?”

    “আবার নরহরি কেন? নামটা তো ফেরত দিলেন।”

    “তা বটে। আচ্ছা পাঁচু।”

    “বলুন দুলালবাবু।”

    “এসব কী হচ্ছে বলে তো?”

    “কোন্ সব?”

    “এই যে, যা সব হচ্ছে, একি ভাল হচ্ছে?”

    পাঁচু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আপনার পক্ষে তো বেশ ভালই হচ্ছে দেখছি মশাই। তবে সকলের ভাল তো একসঙ্গে হতে পারে না। ভগবান মানুষটাই এমনি, একজনের পিঠে যখন হাত বোলান তখন আর একজনকে তাঁর চিমটি না কাটলেই নয়। আপনার যেমন ভাল হচ্ছে ওদিকে তেমনি আমার হেনস্থা। ফলে রাতে ওই মোটে কয়েকখানা বাসন তাও রায়মশাই কেড়েকুড়ে নিয়ে নিলেন। তারপর সারাদিন উপোসী পেটে ছোটাছুটি করে দম একেবারে শেষ। তা হোক, আপনার তত ভাল হচ্ছে।”

    দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “ভাল হচ্ছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। এত ভাল, ভাল নয়। আজ দুটো লোককে এমন ঢিট করলুম যে, বাবা রে মা রে বলে চিতপাত হয়ে পড়ে গেল। জীবনে আমি কখনও কারও সঙ্গে গায়ের জোরে পেরে উঠিনি। তা হলে জোরটা এল কোত্থেকে? তারপর খাওয়া। আমি যা খাই বিশ গুণেরও বেশি খেয়ে ফেলেছি, অথচ পেটে খিদেটা কেমন যেন খাচচি মেরে রয়েই গেছে। এই দ্যাখো, বলতে বলতেই আবার খিদে পেয়ে গেল। না হে পাঁচু, এত ভাল, ভাল নয়।”

    পাঁচু চোখ বুজে পড়ে ছিল, স্তিমিত গলায় বলল, আপনার ভাবসাব আমারও ভাল ঠেকছে না। রাত্রিবেলা চুরি শেখালুম, একটি পয়সা গুরুদক্ষিণা বলে ঠেকালেন। চুরির মাল ফেরত দিতে হল। নাঃ, আমার সময়টাই খারাপ পড়েছে…

    দুলালবাবু পায়চারি করতে করতে বললেন, “আমার খুব মারপিট, দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে হচ্ছে। লাফাতে ইচ্ছে করছে। কী করি বলো তো?”

    পাঁচু জুলজুল করে দুলালবাবুর দিকে চেয়ে থেকে বলল, “ওরে বাবা, তা হলে তো চিন্তার কথা মশাই।”

    “চলো, দুজনে মিলে একটা কিছু করে আসি।”

    পাঁচু সভয়ে বলল, “কী করতে চান?”

    “একটা হই-হট্টগোল পাকিয়ে দিয়ে আসি শহরে। চলো, চলো….”

    “আজ্ঞে আমার বয়স যে সত্তর পেরিয়েছে।”

    “তাতে কী? বসে থেকে-থেকেই যে জাতটা শেষ হয়ে গেল। ওঠো, একটা হুটোপাটি করে আসি গিয়ে।”

    .

    সন্ধে হয়ে গেছে। পোড়ো বাড়ির সামনের দিকে ভৌত ক্লাবের সদস্যরা একে একে জড়ো হয়েছেন। ফটিকবাবু, সাত্যকীবাবু, নরেনবাবু, সবাই আছেন। নন্দবাবুও এসে হাজির হলেন। মড়ার খুলির দু’পাশে মোমবাতি জ্বলছে। বেশ ভৌতিক আবহাওয়া। কিন্তু সকলের মুখেই একটা উদ্বেগের ভাব।

    নন্দবাবু বললেন, “দুলালবাবুর মতো চেহারার সেই লোকটার কাণ্ডকারখানা সব শুনেছেন তো?”

    সবাই ‘হুঁ’ দিল।

    ফটিকবাবু বললেন, “আজ আমাকে লোকটা খুন করার চেষ্টা করেছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। তবে টাকাপয়সা সবই ডাকাতি করে নিয়ে গেছেন। ভাবা যায় না।”

    একজন বলল, “তবে লোকটা যা ক্রিকেট খেলেছে আজ তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। লারউডও ওরকম খেলতে পারতেন না।”

    ক্রিকেটের কথাও সবাই শুনেছে।

    নন্দবাবু বলে উঠলেন, “কিন্তু লোকটা কে?”

    অল্পবয়সীরা সমস্বরে বলে উঠল, “উনি দুলাল স্যারই হবেন।”

    “কিন্তু দুলালবাবুর মতো দেখতে হলেও এঁর যে বয়স কম, জোর বেশি।”

    একটি ছোরা মাথা নেড়ে বলল, “কায়কল্প, আর যোগ ব্যায়ামের ফল। দুলালবাবু রিটায়ার করার পর যোগ ব্যায়াম শুরু করেছিলেন। আর তাতেই চেহারাটা একেবারে ছোঁকরা-মাকা হয়ে গেছে।”

    সাতকীবাবু বললেন, “শুনেছি, কুমিরের রক্ত খেলে নাকি বয়স কমে যায়?”

    “না না, বানরের ঘিলু।”

    “ওরে, তোরা কিছুই জানিস না। বয়স কমানোর জন্য দরকার হল বাঘের চর্বি। গায়ে মেখে সাত দিন বসে থাকতে হয়।”

    এই নিয়ে একটা তর্ক পাকিয়ে উঠল।

    হঠাৎ পোড়া বাড়ির দিককার বন্ধ জানলাটা দড়াম করে খুলে গেল, আর একটা বাতাসের ঝাঁপটায় নিভে গেল মোমবাতি।

    ঘুরঘুটি অন্ধকার।

    জানালার বাইরে থেকে একটা রক্ত জল করা খোলা হাসির শব্দ এল।

    .

    পোড়ো বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে ভাঙা পাঁচিলটা ডিঙোবার পর দুলালবাবু পাঁচু মোদককে বললেন, “একটা চেঁচামেচি হচ্ছে যেন!”

    পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে ভুতোবাবুরা মনে হয় ভয়টয় পেয়েছেন।”

    “ভুতোবাবু কারা?”

    “আজ্ঞে ওই ক’জন বাবু মিলেমিশে একটা ক্লাব করেছেন। ভারি মজার ক্লাব আজ্ঞে। তাঁরা সব ভূত নামানোর জন্য নানা কসরত করেন।”

    “ভূত কি নামে?”

    “আজ্ঞে এখনও নামেনি। তবে আমি যাতায়াতের পথে মাঝে-মাঝে ঢিল ছুঁড়ে বা ফাঁকা গলায় আওয়াজ তুলে বাবুদের ভয়টয় দেখাই আর কি।”

    “তা আজ চেঁচামেচি হচ্ছে কেন?”

    চেঁচামেচি বেশ ভালই হচ্ছিল। কে যেন তারস্বরে “রাম, রাম করে চেঁচাচ্ছে! আর-একজন “হরেকৃষ্ণ, হরেকৃষ্ণ।”

    একজন চেঁচিয়ে বলছে, এইবার…এইবার…জয় ভূত…জয় ভূত… ব্যোম কালী….এবার আমার শালা বাজি হারবেই…।”

    আর দরজা খুলে সটাসট দৌড়ে কিছু লোক পালিয়েও গেল।

    দুলালবাবু বললেন, “ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে হে পাঁচু।”

    পাঁচু বেজার মুখে বলল, “দেখার কিছু নেই। বাবুরা ওরকম মাঝে-মাঝেই করেন। “ভিতুর ডিম সব। এই তো সেদিন নন্দবাবু একখানা হেলমেট ফেলেই পালিয়ে গেলেন। আমি সেখানা যত্ন করে তুলে রেখেছি। কখন কোন কাজে লাগে। বলা তো যায় না।”

    দুলালবাবু উৎকর্ণ হয়ে কিছুই শুনছিলেন। বললেন, “উত্তর দিকের জঙ্গলে কে যেন হাসছে, শুনতে পাচ্ছ?”

    পাঁচু শুনল, তারপর গম্ভীর হয়ে বলল, “ও গণেশ।”

    “তার মানে?”

    “আজ্ঞে গণেশ গন্ধবণিক। এই তো হপ্তাখানেক আগে জঙ্গলের একটা জামগাছে গলায় গামছা দিয়ে ম’ল।”

    দুলালবাবু আঁতকে উঠে বললেন, “মরেছে?”

    “আজ্ঞে একেবারে নির্যস মরাই মরেছে। নিজের চোখে দেখা।”

    “তবে হাসছে কী করে?”

    “আজ্ঞে সেইটেই তো গোলমেলে। বেঁচে থাকতে গণেশকে কেউ হাসতে দ্যাখেনি। মুখোনা গোমড়া করে ঘুরে বেড়াত। ঘরে দজ্জাল বউ। তা এখন মনের সুখে হাসছে। বেশ ফুর্তিতেই আছে মনে হয়।”

    “গণেশ কি তা হলে ভূত হয়ে?”

    পাঁচু মাথা চুলকে বলল, “তা না হলে আর হাসে কী করে বলুন। নতুন ভূত হয়েছে তো, এসময়টায় একটু দুষ্টুবুদ্ধি কাজ করে। এই যেমন ছেলেপুলেরা করে আর কি।”

    “তুমি ভূত দেখেছ?”

    “বিস্তর। রাত-বিরেতেই তো আমার কাজ। নিশুত রাতে কত তেনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।”

    “বলো কী?”

    পাঁচু খুব বিনয়ের সঙ্গে হেঃ হেঃ করে একটু হাসল। মাথা চুলকোতে-চুলকোতে বলল, “তবে তাঁরা সকলেই কিছু খারাপ লোক নয়। দু’চারজন তো রীতিমত স্নেহই করেন। দেখা হলেই খোঁজখবর নেন।”

    “বটে! কিন্তু আমি হচ্ছি বিজ্ঞানের লোক। ভূতটুত মানি না। তবে ভূত যদি দেখাতে পারো, তা হলে মানতে আমার আপত্তি নেই।”

    পাঁচু বেজার মুখ করে বলল, “আপনাকে ভূত দেখিয়ে আমার কাজ কী? ভূত আপনি মানুন বা না মানুন তাতে আমার কচুপোড়া। তার চেয়ে ভূত-পাগলা ফটিকবাবুকে দেখাতে পারলে একটা কাজ” হাসি হাসি মুখ করে বলল, “আজ্ঞে ফটিকবাবু, একটু গুরুতর কথা ছিল। এমন সুযোগ আর হবে না।”

    ভৌত ক্লাবের ভিতরে তখন তিনজন মূর্ছা গেছেন, দু’জন হতভম্ব, ফটিকবাবু শুধু ছটফট করছেন আর বলছেন, কোথায় ভূত? কোথায় ভূত?”

    পাঁচুর কথা শুনে একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “তুমি কে?”

    “অধমের নাম পাঁচু মোদক। এমন সুযোগ আর পাবেন না।”

    “কিসের সুযোগ?”

    “আজ্ঞে, গণেশের ভূত এই কাছেই ঘাপটি মেরে আছে। আমি বন্ধন মন্ত্র দিয়ে বাছাধনকে একেবারে বেঁধে রেখে এসেছি। তবে কি না…”

    “তবে কী?”

    “আজ্ঞে আমি গরিব মানুষ, পেটের দায়েই এইসব করতে হয়। তাই বলছিলাম কি….”

    “কত দিতে হবে?”

    “আজ্ঞে শ-পাঁচেক হলে বেশ হয়। শ-চারেক হলেও মন্দ হয় না। আর দুশো টাকা হলে মন্দের ভাল।”

    কে যেন পিছন থেকে একটা হ্যাঁচকা টানে পাঁচুকে সরিয়ে নিয়ে বলল, “আহাম্মক কোথাকার! ওভাবে দর কমাতে হয়?”

    .

    ভুবনবাবু আর রামলালবাবু মিলে ল্যাবরেটরিটা সারাদিন খেটে ফের সাজিয়ে তুলেছেন। আসল ধকলটা অবশ্য রামলালবাবুর ওপর দিয়েই গেছে, ভুবনবাবু শুধু তদারকি করেছেন। শুধু সাজিয়ে তুলেই রেহাই নেই। কোন্-কোন্ কেমিক্যাল মিলিয়ে মিশিয়ে দুলালবাবু রাত্রিবেলা একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন তাও হিসেব করে করে বের করতে হয়েছে রামলালবাবুকে। এখন তিনি খুবই ক্লান্ত। তবু ছুটি নেই। কারণ, ল্যাবরেটরিতে বসে ভুবনবাবু কাল রাত থেকে এ-পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে, তা লিপিবদ্ধ করছেন। মাঝে-মাঝে রামবাবুর কাছ থেকে তথ্য জেনে নিচ্ছেন।

    লিখতে লিখতে মাঝে-মাঝে তিনি ভাবছেনও। গোটা ঘটনাটাই তাঁর কাছে ভীষণ ধোঁয়াটে বলে মনে হচ্ছে।

    রামলাল ঢুলছিলেন চেয়ারে বসে। ভুবনবাবু তাঁর দিকে একবার তাচ্ছিল্যের চোখে চেয়ে বললেন, “বুঝলে রামলাল, ব্যাপারটা এখনও কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না…”

    “আজ্ঞে না।”

    ভুবনবাবু ভ্রূ কুঁচকে ছেলেকে নীরবে একটু ভর্ৎসনা করলেন যেন। তারপর বললেন, “তুমি কি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছ?”

    “আজ্ঞে ভাবছি। খুব ভাবছি।”

    “তোমার ভাবসাব দেখে তা মনে হচ্ছে না। তোমার তো দেখছি ঘুমও পাচ্ছে। কিন্তু এরকম এটা রহস্যময় রোমহর্ষক ঘটনার পর ঘুম আসা বা খিদে পাওয়া বা হাস্যোদ্রেক হওয়ার কথাই নয়।”

    ‘আজ্ঞে, তা বটে।”

    “ঘুম বেশি পায় গবেটদের।”

    “আজ্ঞে বটেই তো।” ভুবনবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “যাকগে, এখন বলো তো আমাদের এবার কী করা উচিত?

    রামলাল একটা বিকট হাইকে চাপতে গেলেন, দুটো কান দিয়ে বাতাস বেরিয়ে গেল। বললেন, “আমার তো মনে হয় এই ল্যাবরেটরিটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।”

    “বলো কী! কেন?”

    “আজ্ঞে, এখানে ভূতটুত কিছু আছে, সবটাই ভুতুড়ে কাণ্ড।”

    ভুবনবাবু চোখ কপালে তুলে অতিশয় বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, “এই বিজ্ঞানের যুগে তুমি ভূতে বিশ্বাস করো, নিজে একজন বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও?”

    রামলালবাবু বিনয়ের সঙ্গে কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়স্বরে বললেন, “কিন্তু আপনিই তো ভৌত চশমা আবিষ্কার করেছেন এবং তার ভিতর দিয়ে বিস্তর ভূতও দেখা গেছে। ভূত না থাকলে কি সেটা সম্ভব হত?”

    ভুবনবাবু বিপাকে পড়ে একটু আমতা-আমতা করে বললেন, “আমারটা হল সায়েন্টিফিক রিসার্চের ফল, আর তোমাদেরটা হল কুসংস্কার। একটা হল বৈজ্ঞানিক ভূত, আর-একটা হল কল্পনার ভূত।”

    রামলালবাবু বিনয় এবং দৃঢ়তার সমান মিশেল দিয়ে বললেন, “বিজ্ঞানে ভূতের কোনও স্থান নেই। সেইজন্যই আপনার ভৌত চশমা নিয়ে লোকের মনে নানারকম সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছে, চশমা দিয়ে যা দেখা যায় তা চোখের ভুল।“

    ভুবনবাবু মহা খাপ্পা হয়ে টেবিলে মস্ত একটা থাপ্পড় কষিয়ে বললেন, “কোন্ আহাম্মক এত বড় কথা বলেছে? তার নাম বলো।”

    ভুবনবাবুর রুদ্রমূর্তি দেখে রামলাল মিইয়ে গিয়ে বললেন, “কেউ বলেনি এখনও, তবে বলতে পারে।”

    “কে এমন কথা বলতে পারে? কার ঘাড়ে দু’টো মাথা গজিয়েছে?”

    রামলাল দৃঢ়তা ছেড়ে পুরোটাই বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “আজ্ঞে, সেরকম লোক নেই বলেই মনে হয়। তবে কিনা, আমিও আগে ভূতে বিশ্বাস করতাম না, আপনার ভৌত চশমাটা আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই ভূতপ্রেতে বেশ বিশ্বাস হয়েছে। এরকম অদ্ভুত আবিষ্কার আর তো কেউ করতে পারেনি।”

    এ কথায় ভুবনবাবুর মুখ উজ্জ্বল হল। তিনি খুশি হয়ে বললেন, “তা বটে। তবে হ্যাঁ, ভূতপ্রেত থাকলেও তাতে অত বিশ্বাস রাখতে নেই। আর হ্যাঁ, ল্যাবরেটরিটা বন্ধ করে দেওয়াও মূখের মতো কাজ হবে। আমার মনে হয়, দুলালবাবু যুগান্তকারী একটা কিছু আবিষ্কারের গন্ধ পেয়ে ফেলাতেই তাঁর বিপত্তি হয়েছে। কোনও দুষ্টচক্র আবিষ্কারের গন্ধ পেয়ে তাঁকে গুম করেছে এবং তাঁর জায়গায় তাঁর মতো দেখতে আর-একটা লোককে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। এইসব সম্ভাবনার কথা তোমার মগজে আসছে না কেন?”

    “আজ্ঞে আসছে। আমার মগজেও এইসব সম্ভাবনার কথাই আসছে। তবে ব্যাপারটা ভারি গোলমেলে আর ভুতুড়ে।”

    ভুবনবাবু একটা লিস্ট টেনে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে বললেন, “এই কেমিক্যালগুলোই দুলালবাবু ব্যবহার করেছিলেন, তাঁর আবিষ্কারে। তা তুমি এসব মিশিয়ে দ্যাখো কিছু একটা হয় কি না। হয়তো এর সঙ্গে আরও কিছু ছিল, সেসব তুমি বিচার করে দেখবে। সহজে হাল ছেড়ে দিও না।”

    “যে আজ্ঞে।”

    ভুবন রায় উঠে পড়লেন। সারাদিন বড্ড ধকল গেছে।

    হরমোহিনীর ঘর পার হয়ে ভুবনবাবুর ঘর। মায়ের ঘরের দরজা পেরনোর। সময় হরমোহিনী হাঁক দিলেন, “কে যায় রে?”

    “আমি মা, আমি ভুবন।”

    “ভুবন! না বাবা, আমি মুখের কথায় বিশ্বাস করি না। শুনলুম, কাল সারা রাত্তির ধরে এ বাড়িতে চোরের উপদ্রব হয়েছে। দেখি বাবা, তোর মুখোনা আগে দেখি। আজকালকার চোরেরা ভারি সেয়ানা, তারা নানারকম নাম নেয় যখন তখন। আগে মুখ দেখব, তবে বিশ্বাস করব। ও মোক্ষদা, আমার ঠ্যাঙাটা দে তো, হাতে রাখি। আর তুইও ওই মুগুরখানা নিয়ে তৈরি থাক।”

    মোক্ষদা ধমক দিয়ে বলে উঠল, “তোমার কি মাথাটা একেবারেই গেল? ওমা, কোথা যাব গো! বলি বড়বাবুকে চিনতে পারছ না গলা শুনে! আর সাঁঝরাতে কি গেরস্তর বাড়িতে চোর ঢোকে?”

    হরমোহিনী গলা তুলে বললেন, “দ্যাখ মোক্ষদা, ভুবনকে আমি পেটে ধরেছি, তার গলা আমি চিনব না তো কে চিনবে? বাছা আমার দিনে ক’বার শ্বাস-প্রশ্বাস নেয় তারও হিসেব আমার আছে।”

    “এতই যদি চেনো তা হলে লাঠি-ঠ্যাঙা চাইছ কেন?”

    “সে তুই বুঝবি না। দিনকাল ভাল নয়। লোকটা ফশ করে ঢুকে পড়ার পর যদি দেখি, সে আমার ভুবন নয়, একটা মুশকোমতো ঝাঁটা গোঁফ মিশমিশে কালো আর ভাঁটার মতো চোখওয়ালা বিচ্ছিরি লোক, তখন কী হবে লা? চোরেরা কত লোকে গলা নকল করতে পারে তা জানিস?”

    “খুব জানি গো, খুব জানি। চোরের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, লোক জানান দিয়ে মাঝের রাত্তিরে ঘরে ঢুকবে।”

    ভুবনবাবু ঘরে ঢুকে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। হরমোহিনী তাঁর দিকে ফিরেও তাকালেন না। গায়ের লেপটা সরিয়ে ঠ্যাঙা হাতে উঠে বসলেন। তারপর মোক্ষদার দিকে চেয়ে দ্বিগুণ গলায় বললেন, “দ্যাখ মোক্ষদা, তুই হচ্ছিস সেদিনকার মেয়ে, তুই ক’টা চোর দেখেছিস র‍্যা জীবনে? চোর কতরকমের হয় তা জানিস?”

    “আমার নাতির বয়স কত, তা জানো? খুব যে আমাকে কচি খুকি বলে উড়িয়ে দিচ্ছ, আর চোর তুমি আমাকে কী চেনাবে, চোর দেখে-দেখে চোখ পচে গেছে। এখন হাঁটুটা দাও, তেলটা মালিশ করে চলে যাই। অনেক কাজ পড়ে আছে।”

    কাজের কথায় কান দিলেন না হরমোহিনী। হাতের ঠ্যাঙাটা নাচাতে নাচাতে বললেন, “আমাকে আর কাজ দেখাস না মোদা, কী কাজ যে তুই করিস তা খুব জানি। আমার বাঁ হাটুতে ব্যথা আর তুই রোজ চুপিচুপি আমার ডান হাঁটুতে মালিশ করে যাস। কাল রাতে চোর এল আর তুই পড়ে-পড়ে ঘুমোলি। আর আজ আমাকে যা নয় তাই বলে মুখে-মুখে জবাব করছিস। অতই যদি চোর দেখেছিস তবে বল দেখি চোরের কথা। তুইও বল, আমিও বলি। পাঁচজনে শুনে বলুক, চোরের কথা কে বেশি জানে।”

    “আমারও বলে কাজ নেই, তোমার শুনে কাজ নেই। ওই বড়বাবু দাঁড়িয়ে আছেন, ঘরে আলো জ্বলছে, ভাল করে দেখে নাও।”

    হরমোহিনী বললেন, “দেখার আবার কী আছে রে, নিজের পেটের ছেলে, সেই

    এতটুকুন বেলা থেকে দেখে আসছি।”

    “তাই তো বলছি গো, নিজের ছেলে চিনতে পারো না, তুমি কেমনধারা লোক?”

    হরমোহিনী চোখ পাকিয়ে বললেন, “চিনতে পারিনি এ কথা তোকে কে বলল? হ্যাঁ রে ভুবন, আমি কি বলেছি যে, তোকে চিনতে পারিনি? আমার কি তেমন ভীমরতি ধরেছে?”

    ভুবন রায় মাথা নেড়ে বললেন, “না তো।”

    “ওই শোন্ মোদা, শুনলি তো। আমি আমার ভুবনকে চিনতে পারব না তাও কি কখনও হয়? তোর যে দিন-দিন কী আক্কেল হচ্ছে তাই ভাবি।”

    মোক্ষদা গজ গজ করতে লাগল, “আমার আক্কেল ঠিকই আছে। তোমার আক্কেলেরই বলিহারি যাই। দিন-রাত হাতে ঠ্যাঙা নিয়ে বসে আছ। বলি চোর আসুক না আসুক, ভুল করে ঠ্যাঙাটা আবার কার মাথায় বসিয়ে দাও তার তো ঠিক নেই।”

    ‘আমি বুঝি সেরকম লোক! মানুষকে ধরে ধরে মাথায় ঠ্যাঙার বাড়ি মেরে বেড়াই বুঝি?”

    “তা মোটেই বলিনি। চোখে ভাল দেখতে পাও না, কানেও ভাল শুনতে পাও না, বুদ্ধিও ঘোলাটে, এই বয়সে ভুলটুল তো হতেই পারে।”

    “কবে আবার চোখে দেখলুম না, কবে আবার কানে শুনলুম না রে পাজি? নিয়ে আয় উঁচ সুতো, এক্ষুণি ছুঁচে সুতো পরিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি। আর কানের কথা বলছিস? একতলায় কেউ ফিসফিস করে কথা বললেও দোতলায় আমার কানে আসে।”

    “ঘাট হয়েছে বাপু। তবু বলি, ঠ্যাঙাটা তোমার হাতে মোটেই আমার সুবিধে ঠেকছে না।”

    ভুবনবাবু সারা দুনিয়ায় এই একটিমাত্র মানুষকে বড় সমঝে চলেন। তিনি হলেন তাঁর মা হরমোহিনী। ভুবনবাবু আশি ছাড়িয়েছেন সেই কবে, কিন্তু হরমোহিনী এখনও তাঁকে নিতান্তই নাবালক মনে করেন। শাসন-তর্জনও বড় কম করেন না।

    মোক্ষদা আর হরমোহিনীর ঝগড়ায় ভুবনবাবুর কোনও ভূমিকা নেই। অথচ চলেও যেতে পারছেন না।

    হরমোহিনী তাঁর দিকে চেয়ে বললেন, “হ্যাঁ রে ভুবন, আমি কি চোখে দেখি? কানে শুনি না? আমার কি বুদ্ধিনাশ হয়েছে?”

    ভুবনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “না মা, তোমার চোখ কান বুদ্ধি সবই ঠিক আছে।”

    “তবে যে মোক্ষদা বলে! হ্যাঁ রে মোক্ষদা, ছুঁচ সুতো আনলি? নিয়ে আয়, তারপর দ্যাখ পিদিমের আলোতেও সুতো পরাতে পারি কি না, তারপর কানের পরীক্ষা…”

    হরমোহিনীর কথা শেষ হল না, তার আগেই সিঁড়িতে দুদ্দাড় পায়ের শব্দ হল। কে যেন দৌড়ে আসছে। নীচের তলা থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, “কে যায় ঐ কে যায় রে? ডাকাত নাকি?”

    ভুবনবাবু আঁতকে উঠে ঘরের দরজাটা তাড়াতাড়ি বন্ধ করতে গেলেন, তারপর চেঁচাতে লাগলেন, “ডাকাত! ডাকাত! সব দৌড়ে এসো….”।

    হরমোহিনী ঠ্যাঙাটা বাগিয়ে প্রায় লাফ মেরে খাট থেকে নেমে ভুবনবাবুকে টেনে আনলেন দরজার কাছ থেকে, “তুই ছেলেমানুষ, গিয়ে খাটের তলায় লুকিয়ে থাক। আমি দেখছি, কে আমার বাছার গায়ে হাত দেয়। যা যা, খাটের তলায় যা।”

    মায়ের হুকুম। ভুবনবাবু হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলায় সেঁধিয়ে গেলেন। হরমোহিনী ঠ্যাঙা হাতে দরজা আগলে দাঁড়ালেন দেখে মোক্ষদা মূর্ছা গেল।

    ডাকাত দৌড়ে আসছিল ঠিকই। কিন্তু বারান্দায় রাখা এক বালতি জলে হোঁচট খেয়ে দড়াম করে আছাড় খেল।

    হরমোহিনী দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। ডাকাতটা সামনেই পড়ে আছে দেখে হরমোহিনী ঠ্যাঙাটা তুলে বললেন, “দেখলি তো, কেমন ধর্মের কল বাতাসে নড়ে! এবার দিই মাথাটা ভেঙে!”

    ‘ঠাকুমা মেরো না।”

    “বিপদে পড়ে ঠাকুমা বলে ডাকলেই কি আর আমি ভুলি রে বাপু! তোরও। আক্কেল নেই! রোজ রোজ একটা বাড়িতে এসে হামলা করিস কেন রে বেআক্কেলে? কেন, ওই তো হরিপদ পালের অত বড় আড়ত রয়েছে, কালী স্যাকরার দোকান। রয়েছে, রহিম শেখের তেজারতি রয়েছে, সেসব তোর চোখে পড়ে না? কানা নাকি? এ বাড়িতে কিসের মধু রে অলপ্লেয়ে?”

    “ঠাকুমা, আমি নন্দ।”

    “নন্দ! বলিস কী? তুই নন্দ হতে যাবি কোন্ দুঃখে?”

    নন্দবাবু শীতে কাঁপতে কাঁপতে ভেজা গায়ে উঠে দাঁড়ালেন। ককিয়ে উঠে বললেন, “ও মাজাটা গেছে, হাঁটুটার অবস্থাও ভাল নয়। ও, তারপর ভূতের তাড়া।”

    হরমোহিনী নাতিকে চিনতে পেরে ঠ্যাঙাটা নামিয়ে বললেন, “তাই তো! তুই তো নন্দই মনে হচ্ছে।”

    “নন্দই বটে গো ঠাকুমা, তবে নিজের নামটা ভুলবারই জো হয়েছে। সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড।”

    “আয় ভাই, ঘরে আয়। দিনকাল ভাল নয়, অমন দৌড়াদৌড়ি হুটোপাটি করতে আছে?”

    নন্দবাবু খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরে ঢুকলেন। আর সেই সময় খাটের তলা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে ভুবনবাবুও বেরিয়ে আসছিলেন। নন্দবাবু দেখে হাঁ, নিজের ডাকসাইটে বাবাকে এরকম হামাগুড়ি দিতে জীবনে দ্যাখেননি।

    ভুবনবাবুও যথেষ্ট লজ্জা পেয়েছেন। সেটা ঢাকা দিতেই ভ্রূকুটি করে গম্ভীর মুখে বললেন, “ভূতের কথা কী বলছিলে? তোমাদের দুই ভাইকেই দেখছি আজকাল বেশ ভূতে ধরেছে। ব্যাপারটা কী বলো তো!”

    নন্দবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “আজ্ঞে, ভৌত-ক্লাবে আজ যথার্থই ভূত এসেছিল।”

    ভুবনবাবু অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “এই বিজ্ঞানের যুগে তোমরা যে কী করে ভূতে বিশ্বাস করো তা আমি তো ভেবেই পাই না। কাজকর্ম না করে তুমি বায়ুগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছ। ভীতু, অলস, নিষ্কর্মা…”

    হরমোহিনী অত্যন্ত কঠোর গলায় ডাকলেন, “ভুবন! কোন্ সাহসে আমার সামনে তুই বাচ্চাটাকে বকছিস!”

    ভুবন রায় সঙ্গে সঙ্গে কেঁচো হয়ে গেলেন। এ বাড়িতে বড়দের সামনে ছোটদের মেজাজ দেখানোর রেওয়াজ নেই।

    হরমোহিনী অত্যন্ত কঠোর গলায় বললেন, “খুব পণ্ডিত হয়েছিস না? ভূত প্রেত নেই তোকে কে বলল? না থাকলে তোর বাবা, তোর দাদু, তোর জ্যাঠা, তোর ঠাকুমাকে আমি রোজ দেখতে পাই কেন? তারা যে সর্বদা ঘুরঘুর করে চারদিকে। এই তো কাল রাতেও শুনলুম, তোর দাদু কাসছে পাশের ঘরে। ভাবলুম, গিয়ে একটু তেল মালিশ করে দিয়ে আসি বুকে। তারপর মনে হল, বায়ুভূত অবস্থায় মালিশটা ঠিকমতো বসবে না। তোর বাবা তো ফিরাতে এসে বলে যায়, “ওগো ভুবনটাকে দেখো, লেখাপড়া ঠিকমতো করছে তো! না কি কেবল খেলে বেড়াচ্ছে! বল তা হলে ভূত না থাকলে এসব হচ্ছে কোত্থেকে।”

    .

    ওদিকে ভৌত ক্লাবের দরজার বাইরে আর এক নাটক চলছে। পাঁচু পাঁচশো। টাকা থেকে দুশো টাকায় নেমে আসায় কে যেন পিছন থেকে হ্যাঁচকা টান মেরে তাকে সরিয়ে দিয়ে বলে উঠল, “আহাম্মক কোথাকার! ওভাবে দর কমাতে হয়!”

    হ্যাঁচকা টানে পাঁচু অনেকটাই ছিটকে গিয়ে কুলতলায় পড়ে ভিরমি খেল। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দেখল তার স্থান নিয়েছেন স্বয়ং দুলালবাবু।

    দুলালবাবু ফটিকবাবুকে বেশ চড়া গলায় বললেন, “ওই পাঁচশোই, এক পয়সাও কম নয়। ভূত দেখতে চাও তো টাকাটা ফ্যালো হে ফটিক।

    ফটিকবাবু দুলালবাবুকে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেছেন। কারণ আজ সকালেই এই লোকটা তাঁর ওপর বিস্তর হামলা করে এসেছে। লোকটাকে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। শোনা যাচ্ছে সেই নকল দুলাল আসল দুলালকে খুন করে লাশ সরিয়ে ফেলেছে।

    ফটিকবাবু সভয়ে তিন হাত পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “আমি ভূত দেখতে চাই না।”

    “আলবাত চাও। ভূত তোমাকে দেখতেই হবে।”

    “আমি ভূত-টুত বিশ্বাসই করি না। আপনি যেতে পারেন। দুলালবাবু হাঃ হাঃ করে হেসে উঠে বললেন, “তা হলে শালার কাছে তোমার যে মাথা হেঁট হতে হবে হে ফটিক। সেটা কি ভাল হবে?”

    “শালার কাছে মাথা হেঁট হয় হোক। আমি ভূত দেখতে চাই না। এখন আমি বাড়ি যাব, বড্ড খিদে পেয়েছে।”

    দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “উঁহু, সেটি তো হওয়ার উপায় নেই হে ফটিক। তুমি ভূত দেখতে চাও বলে সারাদিন ছোটাছুটি করে আমি আর পাঁচু মিলে কত কষ্টে একটা ভূত ধরেছি, এখন তুমি দেখতে না চাইলে হবে কী করে? পাঁচশো। টাকা না থাকে তো চারশো নিরানব্বই টাকা পঁচানব্বই পয়সাই দাও। একেবারে জলের দর। রিডাকশন সেল যাকে বলে।”

    ফটিকবাবু আরও তিন হাত পিছোতে গিয়ে মড়ার খুলি ও মোমবাতিসহ টেবিলটায় ধাক্কা খেলেন। বললেন, “না-না, ভূত-টুত খুব খারাপ জিনিস। ও আমি দেখতে চাই না। যদি কেউ ভূত ধরে আমার সামনে নিয়ে আসে তাহলেও আমি চোখ বুজে থাকব।”

    দুলালবাবু এখন আর আগের দুলাল নেই। গায়ের জোর যেমন বেড়েছে, তেমনি মেজাজটাও তিরিক্ষি হয়েছে। ফটিকবাবু পিছোচ্ছেন দেখে তিনি তার মেজাজ ঠিক রাখতে পারলেন না। এক লাফ মেরে ঘরে ঢুকে তিনি ফটিকবাবুর ঘাড়টা চেপে ধরে একেবারে শূন্যে তুলে ফেললেন, “ভূত দেখতে চাও না? তা হলে এতদিন ধরে সবাইকে বলে বেড়ালে কেন যে, ভূত না দেখলে তোমার পেটের ভাত হজম হচ্ছে না? অ্যাঁ! ভূত যদি না দেখতে চাও তা হলে তোমাকেই ভূতের দেশে পাঠাব।”

    এই সময়ে কে যেন পিছন থেকে মোলায়েমভাবে দুলালবাবুর পিঠে তিনটে টোকা দিয়ে অমায়িক গলায় বলল, “আজ্ঞে দুলালবাবু, যে পরিমাণ চেঁচামেচি

    করছেন তাতে যে গণেশ ভয় খেয়ে আকাশে তিন মাইল ওপরে উঠে গেছে।” দুলালবাবু বিরক্ত হয়ে ফিরে দেখলেন, পাঁচু গম্ভীর ও করুণ মুখে দাঁড়িয়ে।

    “কী বললে?”

    “বলছিলুম, আপনার চেঁচামেচিতে ভূত হাওয়া। আমি দুশো টাকা দর দিয়েছিলুম, এখন তো দু’পয়সাও আশা নেই।”

    দুলালবাবু ফটিকবাবুকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “ভূতটা তা হলে গেল কোথায়?”

    “বললুম তো পালিয়েছে।”

    দুলালবাবু খানিকক্ষণ গুম হয়ে থেকে বললেন, “ভূতটাকে বলল, ফের যদি পালায় তা হলে আমি তাকে আস্ত রাখব না।”

    “বলব খন।”

    “আর কাল যেন সে অবশ্যই এখানে হাজির থাকে। নইলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

    ফটিকবাবু সভয়ে বাক্যহারা হয়ে দৃশ্যটা দেখছিলেন। বললেন, “আমি কালও ভূত দেখতে চাই না। ভূত দেখার ইচ্ছে চলে গেছে।”

    “চোপ!” বলে তাঁকে একটা পেল্লায় ধমক মারলেন দুলালবাবু।

    ফটিকবাবু আবার পিছোলেন।

    দুলালবাবু পাঁচুর দিকে চেয়ে বললেন, “চলো তা হলে আমার অন্য কাজে যাই।”

    “কী কাজ?”

    “চুরি-ডাকাতি যা হোক। কিছু তো করতে হবে।”

    পাঁচু খুবই ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “আপনার দোষ কী জানেন দুলালবাবু, সব ব্যাপারই বড় তাড়াহুড়ো করেন। ভূতের কারবারটায় জলের মতো দুদুশোটাকা চলে আসছিল হাতে, আপনি নাক গলিয়ে বারোটা বাজালেন। এসব কাজে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ধীর স্থিরভাবে কাজ করতে হয়। খুব সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচের ব্যাপার কিনা। কথার একটু এদিক-ওদিক হলেই মক্কেল সন্দেহ করতে শুরু করবে, পিছিয়ে যাবে, শেষে পালাবে।”

    দুলালবাবু একটু অপ্রস্তুত মুখে বললেন, “তাবটে হে পাঁচু, কাজটা খারাপই করলাম। তবে আমাদের আয়ুটাও যে বেজায় কম। এত কম সময়ে কত কাজ করার আছে বলো তো। ওই হাড়কেপ্পন ফটিকের পিছনে মূল্যবান সময় নষ্ট করার মানেই হয় না।”

    পাঁচু গম্ভীর হয়ে বলল, “একটা ভুল করে ফেলেছেন, কিছু বলছি না, কিন্তু এরপর কথাবার্তা যা বলার তা আমিই বলব, আপনি পিছনে থাকবেন।”

    “তাই হবে হে পাঁচু, কিন্তু এখন কী করা যায় বলো তো! কিছু একটা না করলে যে শরীরটা ঠাণ্ডা হবে না। চলো, কাউকে ধরে কিছুক্ষণ খুব পেটাই, তাতে শরীরটা ধাতস্থ হবে, মাথাটাও ঠাণ্ডা হয়ে আসবে।”

    পাঁচু গম্ভীরতর হওয়ার চেষ্টা করে বলল, “আমাদের শাস্ত্রে আছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে নেই। শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে হয়। ঠিক সময়ে ক্ষমতা কাজে লাগে।”

    দুলালবাবু করুণ স্বরে বললে, “কিন্তু আমার হাত-পা যে বড্ড নিশপিশ করছে। কীরকম জানো? অনেকটা সুড়সুড়ির মতো। কিছু না করলে বড় কষ্ট হবে।”

    পাঁচু বুঝদার মানুষ। দুলালবাবুকে এখনই একটু হাঙ্গামায় নামাতে না পারলে উনি আরও কিছু কেলেঙ্কারি করে বসতে পারেন। তাই সে বলল, “খুব উচাটন হয়ে থাকলে একটা কাজ করুন। ওই যে ঝুপসিমতো গাছটা দেখছেন ওটার গায়ে কয়েকটা ঘুসিটুসি মেরে আসুন।”

    “মারব?” বলে দুলালবাবু রোষকষায়িত লোচনে গাছটার দিকে একবার তাকালেন। তারপর একটা হুঙ্কার দিয়ে গিয়ে কয়েকটা ঘুসি বসিয়ে দিলেন গাছটার গায়ে। বললেন, “তবে রে! তোরই একদিন কি আমারই একদিন!”

    দুলালবাবুর গায়ে এখন সাঙ্ঘাতিক জোর। তাঁর ঘুসির চোটে গাছটা থরথর করে কেঁপে উঠল। গাছে যত পাখি ছিল তারা কিচিরমিচির করে চেঁচাতে লাগল। আর গাছ থেকে বড় বড় সব গোল ও কালো ফল ধপাধপ পড়তে লাগল মাটিতে।

    ফল দেখে দুলালবাবু খুশি হয়ে বললেন, “ওহে পাঁচু, দেখেছ কত ফল পড়েছে। কী ফল বলো তো! এরকম কালো আর বড় ফল তো জন্মেও দেখিনি! এ কি খাওয়া যায়?

    পাঁচু কিছুক্ষণ হাঁ করে চেয়ে থেকে বলল, “আজ্ঞে, ও হল জিকা গাছ। কস্মিনকালেও ও-গাছে ওরকম ফল হয় না।”

    “হয় না, তা হলে ফল পড়ল কী করে?”

    “সেটাই তো ভাবছি।”

    ভাবতে হল না। ফলগুলো পড়ে নিজে থেকে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ ফট করে একটা ফল যেন ফেটে গেল। ভিতর থেকে খানিকটা ধোঁয়ার মতো জিনিস বেরিয়ে এসে লম্বা সুড়ঙ্গে একটি চেহারা ধরে ফেলল। সেই চেহারা দেখলে ভিরমি খেতে হয়। দু’খানা ভাটার মতো চোখ ধকধক করে জ্বলছে।

    পাঁচু দৃশ্য দেখে হাঁ, দুলালবাবু মাথা চুলকোতে লাগলেন।

    মূর্তিটা খখানা স্বরে বলল, “কে রে? কার এত বুকের পাটা? দেড় হাজার বছরের ঘুমটা মাটি করলি হতভাগা? আজ তোর মুণ্ডু যদি চিবিয়ে না খাই তবে আমার নাম পতিতপাবনই নয়।”

    দেখতে-দেখতে অন্য ফলগুলোও ফটাফট ফাটতে লাগল আর একে একে সুড়ঙ্গে সুড়ঙ্গে সব মূর্তি সুড়ত সুড়ুত করে বেরিয়ে আসতে লাগল। তারা যে বেজায় অসন্তুষ্ট, তা তাদের চেঁচামেচি আর হাবভাবে বেশ ভালই বোঝা যাচ্ছিল।

    পাঁচু একটু চাপা গলায় বলল, “দুলালবাবু, ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না!”

    “আমারও না।”

    “কেটে পড়াই ভাল।”

    “আমিও তাই বলি।”

    “কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে কাজটা ভাল করেননি।”

    “তুমিই তো গাছে ঘুসি মারতে বললে হে।”

    মূর্তিগুলো কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে সঠিক বুঝতে পারছিল না, কীর্তিটা কার। তাই নিজেদের মধ্যেই একটু ঝগড়া বিবাদ করছিল। সেই ফাঁকে পাঁচু আর দুলালবাবু দৌড় লাগালেন।

    বাজারের কাছ বরাবর পোঁছে দুলালবাবু পাঁচুর ডাক শুনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পাঁচু পিছিয়ে পড়েছিল।

    “দুলালবাবু, একটু দাঁড়ান, হাঁফ ছেড়ে নিই।”

    “‘আমার যে আরও দৌড়তে ইচ্ছে করছে হে পাঁচু! আমি যে এখনও মাইল দশেক দৌড়তে পারি।”

    “লাভ কী? ক্ষমতার অপচয় করতে নেই। তেনারা সব পিছিয়ে পড়েছেন!” দুলালবাবু একটু লাজুক গলায় বললেন, “লোকগুলো কে বলো তো পাঁচু?”

    “আজ্ঞে, এখন আর এঁরা লোক নন, পরলোকের লোক। তবে আপনি ভারি একটা উপকারও করেছেন আমার। ওই গাছটাতেই যে তেনাদের বাসা, সেটা টের পাইনি এতদিন। পেয়ে খুব ভাল হল। ভূতের কারবারে কাঁচা পয়সা।”

    দুলালবাবু উৎসাহিত হয়ে বললেন, “তবে চলো একটা থলে নিয়ে গিয়ে সব ক’টাকে ভরে ফেলি।”

    পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “আগেই বলেছি আপনাকে, সব কাজে তাড়াহুড়ো করতে নেই। এখন যদি ফিরে যান তবে তেনারা রাগের মাথায় এখন ছিঁড়ে ফেলবেন। ঘাপটি মেরে থাকুন। তেনারা আবার ঠাণ্ডা হয়ে গাছে উঠে গুটি পাকিয়ে ঘুমোতে থাকুন, পরে ব্যবস্থা হবে।”

    “বলছ।”

    “বলছি।”

    “কিন্তু এখন তবে কী করা যায়?”

    “চলুন, ওই রকটায় বসে একটু ভাবি। সব কাজ কি গায়ের জোরে হয়? বুদ্ধি খাটাতে হয়।”

    রাত খুব বেশি হয়নি। তবে মফস্বলের শহর আর শীতকাল বলে এর মধ্যেই চারদিকটা বেশ নির্জন হয়ে গেছে। বাজারের দোকানপাটও সবই প্রায় বন্ধ। দু একটা খোলা আছে মাত্র।

    দু’জনে রক-এ বসে ভাবতে লাগল। কিছুক্ষণ পর পাঁচু বলল, “দুলালবাবু।”

    ‘হুঁ।”

    “বাজারের শেষ মাথায় হরেন কর্মকারের দোকানে এখনও আলো জ্বলছে, দেখতে পাচ্ছেন?”

    “পাচ্ছি।”

    “হরেনের মেলা টাকা। রাত্রিবেলা যখন দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরে তখন কোমরের গেঁজের মধ্যে দশ-বিশ হাজার টাকা হেসে খেলে থাকে।”

    দুলালবাবু উঠে পড়তে-পড়তে বললেন, “তাই নাকি? তবে তো দেখতে হচ্ছে।”

    পাঁচু হাত তুলে বলল, “দাঁড়ান, আরও কথা আছে। হরেনের সঙ্গে দুটো বিশ্বাসী পাহারাদার থাকে। তাদের হাতে লাঠি, কোমরে ভোজালি।

    দুলালবাবু একটা তাচ্ছিল্যের ভাব করে বললেন, “ফুঃ! মোটে দুটো পাহারাদার। ও আমি এক লহমায় উড়িয়ে দেব।”

    বিচক্ষণ পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “কাজটা সহজ হবে না দুলালবাবু। হরেনের কাছে ছোট বন্দুকও আছে। কৌশল করা ছাড়া উপায় নেই।”

    “কৌশলটা কী?”

    “আপনার হাতে একটা আংটি দেখছি। ওটা কি সোনার আংটি?” দুলালবাবু বললেন, “হ্যাঁ সোনা বইকী!

    “তা হলে ওটা খুলে নিয়ে সোজা হরেনের কাছে চলে যান। ও সোনা বাঁধা রাখে। বাঁধা দেওয়ার নাম করে লোকটাকে পরখ করে নিন। তারপর কথাটথা বলতে থাকুন। সুযোগের সন্ধান করতে থাকুন।”

    দুলালবাবু অধৈর্য হয়ে বললেন, “ওসব আমার পোষাবে না। কথাটথা আমার আসে না। আমি চাই কাজ।”

    “তা হলে আংটিটা আমার হাতেই দিন! আমি গিয়ে ব্যাপারটা একটু বুঝে আসি। ভয় নেই, আংটি নিয়ে পালাব না। আমার ঘাড়ে তো একটা বই দুটো মাথা নেই।”

    দুলালবাবু হেলাভরে আংটিটা খুলে পাঁচুর হাতে দিয়ে বললেন, “সামান্য আংটিও তোমাকে গুরুদক্ষিণাই দিলাম ধরে নাও। সামান্য আংটি গেলে যাক, তার বদলে যদি কয়েক হাজার টাকা আসে।”

    পাঁচু আংটিটা নিয়ে উঠল, গুটিগুটি গিয়ে সে যখন হরেনের দোকানে ঢুকল, তখন হরেন একটা হিরে বা মুক্তো মন দিয়ে দেখছে। সামনে দু’জন খদ্দের বসা। দরজায় দুটো ভোজপুরি দারোয়ান। তাদের চোখ একেবারে বুকের ভিতরে এসে সেঁধোয়।

    হরেন পাঁচুকে পাত্তাও দিল না! পাথরটা রেখে সে খদ্দেরদের সঙ্গে নিচু স্বরে কথা বলতে লাগল, পাঁচু দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। সে ধৈর্যশীল লোক। জানে সবুরে মেওয়া ফলে। তবে দাঁড়িয়ে থেকে সেসব দিকে চোখ রাখছিল। কোথায় কী আছে, কী থাকতে পারে।

    অনেকেক্ষণ বাদে খদ্দেররা বিদায় নিলে হরেন পাঁচুর দিকে চেয়ে চোখ ছোট করে বলল, “কী হে, তোমার মুখোনা যেন চেনা-চেনা ঠেকছে।”

    “আজ্ঞে, এই বাজারেই পান বেচি।”

    “বটে! তবে কী মনে করে?”

    “একটু বিপদে পড়ে গেছি হঠাৎ। বড্ড টাকার দরকার।”

    “বটে! দরকার ছাড়া আর এই অধমের কাছে কে আসবে বলো। তা জিনিসপত্তর কী এনেছ?”

    “এই আংটিটা। আমার দাদামশায়ের জিনিস, সাবেক মাল।”

    হরেন আংটিটা নিয়ে কয়েক সেকেন্ড মাত্র দেখল, তারপর কষ্টিপাথরে ঘষে রংটা দেখে বলল, “অনেক ভেজাল আছে হে, তা কত চাও?”

    “আজ্ঞে দু-চার হাজার যা দেবেন।” হাজার শুনে হরেন অট্টহাস্য করে উঠল। মিনিটখানেক সে হাসির দমকে কথাই বলতে পারল না। তাতে তার গায়ের ফতুয়া ভূঁড়ির ওপরে উঠে গেল। কোমরের গেজেটা টপ করে দেখে নিল পাঁচু। তার আন্দাজ নির্ভুল। গেজেতেই মালপত্র থাকে তা হলে।

    হরেন হাসি থামিয়ে আংটিটা ফেরত দিয়ে বলল, “তুমি বেশ মজার লোক হে। এই আংটিতে দু-চার হাজার টাকা যে চায় তার স্থান হল পাগলাগারদ। যাও তো, এখন আমি উঠব।”

    “যে আজ্ঞে।” বলে পাঁচু উঠল।”

    কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই বাধা পড়ল। দুই দরোয়ান একসঙ্গে “এই, এই’’বলে চেঁচিয়ে উঠল বিকট স্বরে।

    পাঁচু চোখ বুজে ফেলল।

    চোখ বুজলেই কি আর রক্ষে পাওয়া যায়? পাঁচু চোখ বুজেও রেহাই পেল। কান তো আর বন্ধ নেই। শুনতে পেল দুমদাম দমাস সব সাঙ্ঘাতিক শব্দ। দুলালবাবু হেঁড়ে গলায় চেঁচাচ্ছেন, “আমাকে রুখবি এত ক্ষমতা তোদের? অ্যাঁ! এই দিলুম এক ঘুষো… কেমন বুঝছিস রে পাজি?…… ওরে ছুঁচো, আমাকে ল্যাং মারা হচ্ছে? এই নে, তোকেও দিলুম এক রদ্দা….কেমন লাগছে রে? ছ্যাঃ, দু দুটো মুশকো জোয়ান তোরা, দু’বেলা নিশ্চয়ই ভরপেট খাস, ডন বৈঠক দিস, ফুলের ঘায়ে মূর্ছা গেলি বাবা! না, না, হরেন, এ কোনও কাজের কথা নয়, এই দরোয়ান তোমার চলবে না…”

    বলতে বলতে দুলালবাবু হাতটাত ঝেড়ে হাসি-হাসি মুখে দোকানে ঢুকলেন। ভাবখানা এমন, যেন কিছুই হয়নি।

    পাঁচু চোখ চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কারণ সে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে, হরেন কর্মকার তার রিভলভারটা বের করে ইতিমধ্যে বাগিয়ে ধরেছে আর বাঘা চোখে দুলালবাবুর কীর্তিকলাপ লক্ষ করছে। হরেন পাকা লোক, খামোখা ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচামেচি করেনি। দরকার হলে তার হয়ে হাতের অস্ত্রটাই কথা কইবে।

    কিন্তু দুলালবাবুর সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। হরেন কর্মকারের দিকে চেয়ে বললেন, “তা ভাল আছ তো হরেনভায়া? অনেকদিন বাদে দেখা। একটু শুকনো-শুকনো দেখাচ্ছে যেন! তা ভাল। বয়স হলে রোগা হওয়া স্বাস্থ্যের লক্ষণ। তা আর সব খবরটবর কী? কাজ কারবার তা হলে ভালই চলছে! অ্যাঁ?”

    হরেন তার অস্ত্রটা আর-একটু শক্ত করে ধরে ঠাণ্ডা গলায় বলল, আপনি কে? এখানে আগমনই বা কিসের জন্য?”

    দুলালবাবু ভারি অভিমানের গলায় বললেন, “সে কী! আমাকে চিনতে পারছ

    হরেনভাই? কলিকালটা যে বড়ই জাঁকিয়ে বসেছে বলে মনে হচ্ছে! সেই যে গো, বছর-পনেরো আগে আমার মরা মায়ের একজোড়া কানপাশা বাঁধা রেখে তোমার কাছ থেকে পঞ্চাশটা টাকা কর্জ করেছিলুম, মনে নেই! সুদে-আসলে দেড়শো টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। সে আর জোগাড় হল না বলে কানপাশা দুটো তুমি গাপ করে ফেললে!”

    হরেন কর্মকার ঠাণ্ডা গলাতেই বলল, “জিনিস বাঁধা রাখাই আমার ব্যবসা। দিনরাত হাজারটা লোক আসছে। সবাইকে মনে রাখা আমার কাজ নয়।”

    “সে কী হে! দুলাল-মাস্টারকে ভুলে গেলে হে হরেন? এরপর তো নিজের মায়ের পেটের ভাইকেও চিনতে পারবে না! কলিকালে যে কত কী হয়! তা সে কথা থাক ভায়া, কাজের কথাটাই বরং হয়ে যাক। ওই যে দেখছ দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ভালমানুষের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, ও হল পাঁচু মোদক। মুখ দেখে কিচ্ছুটি বুঝতে পারবে না রে ভাই, একেবারে বিচ্ছু একটি। দিনে-দুপুরে রাহাজানি করে বেড়ায়। আর আমি হলুম যে, ওরই শাগরেদ, দুলাল গুণ্ডা। হেঁ হেঁ। রাজযোটক যাকে বলে।”

    হরেন দরজার কাছে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা তার দু-দুটো দরোয়ানের দিকে একবার করুণ নয়নে চাইল। তারপর রিভলভারটা দুলালবাবুর দিকে তাক করে বলল, “আমি পোড়-খাওয়া লোক, অনেক দেখেছি, অনেক শয়তান বদমাশকে ঢিটও করেছি। এখানে খুব সুবিধে হবে না। মাথার ওপর হাত তুলে দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ান, নইলে গুলি চালাব।”

    দুলালবাবু একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন, হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর দুঃখিত গলায় বললেন, “তোমাদের দরোয়ানদের নয় ভদ্রতাবোধ নেই, তা বলে তুমিও কি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেললে ভায়া? অতিথি হল নারায়ণ। আগের দিনে অতিথি-অভ্যাগতদের কত সম্মান ছিল। কলিকালে দেখছি সবই গেছে। তা তায়া, অতিথি-সকার না-হয় না-ই করলে, কিন্তু একটু বসতে তো দেবে, একটু জলটল তো খাওয়াবে! এ কী ব্যবহার তোমার!”

    হরেন রিভলভারের ঘোড়ায় আঙুলটা কি একটু জোরেই টিপে ধরল? পাঁচু সভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল আবার। না, পৈতৃক প্রাণটা নিয়ে আজ আর বোধহয় ফেরা যাবে না।

    হরেন গর্জন করে উঠল, “খবর্দার! আর এগোলে কিন্তু…”

    দুলালবাবু হরেনের হুমকি অগ্ৰহ্য করে তবু এক পা এগিয়ে গিয়ে একগাল হেসে বললেন, “আমি জানি হে হরেন, তোমার বড় দয়ার শরীর। তুমি পিঁপড়ে পর্যন্ত মারতে শেখোনি। ওইসব বন্দুক পিস্তল কি ভাই তোমার হাতে শোভা পায়? বড় বিপজ্জনক জিনিস। ও তুমি রেখে দাও বাক্সের মধ্যে। ওসব ঘাঁটাঘাঁটি করলে মনের মধ্যে জিঘাংসা আসে, নিরীহ লোকের মাথাতেও খুন চেপে যায়। রেখে দাও ভাই। অনেকদিন বাদে তোমাকে দেখে ভারি ভাল লাগছে। আঙুল ফুলে কলাগাছটি হয়েছে, দিব্যি ফলাও কারবার ফেঁদে বসেছ, দু’পয়সা আসছে, এ দেখেও চক্ষু সার্থক।”

    হরেন এবার বাস্তবিকই চঞ্চল হল। কথাটা ঠিকই যে, সে কখনও খুন-খারাপি করেনি। দরকারও হয়নি বড় একটা। এখনও করতে চাইছে না। শুধু ভয় দেখাতে চাইছে। কিন্তু লোকটা যে কেন ভয় পাচ্ছে না, তাও বুঝে ওঠা দুষ্কর। সে এবার। একটু কাঁপা গলায় বলল, “এবার ভয় না পেলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

    দুলালবাবু খুব হাসলেন। একেবারে খিকখিক করে হাসতে লাগলেন। যেন এরকম মজার কথা জীবনে শোনেনি। তারপর গদগদ করে বললেন, “তোমাকে ভয় পাব! কেন হে হরেন? তোমার মতো একজন নিরীহ সজ্জনকে ভক্তি করব, শ্রদ্ধা করব, কিন্তু ভয় পাব কেন? এই যে তুমি এত উন্নতি করেছ, এতে কি আমার আনন্দ হচ্ছে না? আমি গর্ব অনুভব করছি না? খুব করছি হে হরেন, খুব করছি। বাঙালির আজ ভারি দুর্দশা। তার মধ্যে তুমি যে উন্নতি করেছ, এটা যে খুব আশার কথা ভাই। ভয়ের কথা এখানে উঠছে কিসে?”

    ওই বলে দুলালবাবু দু’হাত বাড়িয়ে একেবারে প্রেমানন্দে হরেনের দিকে এগিয়ে গেলেন, বললেন, “এসো এসো ভাই, বাঙালির গৌরব, আমাদের গৌরব, এসো কোলাকুলি করি। আমার মায়ের কানপাশাজোড়া গাপ করেছ বটে, কিন্তু আমি ভাই চৈতন্যদেবের ওই কথাটা বড় বিশ্বাস করি, মেরেছ কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেব না….”

    হরেন সভয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে রিভলভার তুলে বলল, “খবর্দার বলছি, ভাল হবে! খুন হয়ে গেলে কিন্তু আমাকে দায়ী করতে পারবেন না বলে দিচ্ছি। এই তবে ছুঁড়লুম গুলি…..”

    বলে বাস্তবিকই হরেন তার রিভলভারের ঘোড়া টিপে দিল। পাঁচু বিপাক বুঝে আগেই মেঝেয় শুয়ে পড়েছিল। এবার চোখ বুজে ফেলল। ভয় হল, দুলালবাবুর লাশটা নির্ঘাত তার ঘাড়েই এসে পড়বে। রক্তক্তও লেগে যেতে পারে। সে তো গেল একটা ঝামেলা। তারপর খুনের মামলায় সাক্ষীটাক্ষি দেওয়ার হ্যাপাও কি কম? নাঃ, দুলালবাবুর সঙ্গে কাজ কারবারে নামাটাই একটা মস্ত ভুল কাজ হয়েছে।

    ‘ঢিসুম’ শব্দ করে হরেনের রিভলভারের গুলি ছুটল। তবে হরেনের কাঁপা হাতের গুলি কারও কোনও ক্ষতি করল না। দরজা দিয়ে উড়ে গিয়ে উলটো দিকের একটা চালাঘরের চালে গিয়ে সেঁধোল।

    কিন্তু হরেন ভাবল, তার গুলিতে নির্ঘাত লোকটা মরেছে। জীবনে এই প্রথম তার গুলি ছোঁড়া। শব্দে সে নিজেই ঘাবড়ে গেল। চোখ বুজে রিভলভারটা ফেলে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল সে। তারপর দু’হাতে মুখ ঢেকে “রাম রাম, হরি হরি” করতে লাগল। নরহত্যার মতো পাপ নেই। আর তার হাতেই কিনা আজ একটা নরহত্যা হয়ে গেল! এই হাতে যে রোজ সকালে ঠাকুরের ফুল তোলে, লক্ষ্মীনারায়ণের পট পরিষ্কার করে, নারায়ণশিলাকে দুবো-গঙ্গাজলে স্নান করায়। এখন এই খুনে হাত দিয়ে আর কি সেসব পুণ্যের কাজ করা যাবে? ঠাকুর কি আর তার দিকে মুখ তুলে চাইবেন? ছিঃ ছিঃ, এ কী হল? না-হয় যেতই কয়েক হাজার টাকা, কিছু সোনাদানা আর হিরে-জহরত! গেলেও অনেক থাকত হরেনের। কিন্তু নরহত্যা করে যে সে নিজের স্বর্গে যাওয়ার রাস্তাটাই বন্ধ করে দিল। তার মতো পাতকীকে এখন ক’হাজার বছর নরকবাস করতে হয় কে জানে!

    ভাবতে-ভাবতে হরেন ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

    হরেনের দুঃখ দেখে দুলালবাবুও স্থির থাকতে পারলেন না। সামনের লোহার বেড়াটা ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকে ক্যাশবাক্সের ওপর বসে হরেনের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “কেঁদো না হে হরেন, কেঁদো না। জানি তুমি হিসেবী মানুষ, একটু-একটু কিপ্টেও, একটা গুলি খরচ হয়ে যাওয়ার শোকটা সামলাতে পারছ না। কিন্তু আমি বলি কি, একটা গুলির কীই বা এমন দাম! দু-আড়াই টাকার বেশি হবে কি? তা বেঁচে থাকতে গেলে ওরকম দু-আড়াই তো ভাই কতদিক দিয়েই যায়। ভেবে কী করবে?”

    হরেন দু’হাতে মুখ ঢেকেই কাঁদতে কাঁদতে বলল, “দু-আড়াই গেছে যাক, কিন্তু একটা নরহত্যা হয়ে গেল যে! মহাপাপ হয়ে গেল। এখন কী হবে।”

    দুলালবাবু বিজ্ঞের মতো হেসে বললেন, “তাই বলো। পাপ নিয়ে ভাবছ! ভাই রে দুনিয়াতে এমন কোনও সমস্যাটা আছে যার সমাধান নেই? নরহত্যা, মিথ্যে কথা, চুরি-জোচ্চুরি সব কিছুরই নিদান আছে, আমি বলি কি ভায়া, কিছু মূল্য ধরে দাও, তা হলেই পাপটাপ সব কেটে যাবে। বেঁচে থাকতে গেলে ওরকম দু চারটে নরহত্যা না করে উপায়ই বা কী?”

    হরেন যেন একথায় একটু শান্ত হল। লাল দু’খানা চোখ মেলে বলল, “নরহত্যার রেট কত জানেন?”

    একগাল হেসে দুলালবাবু বললেন, “তা আর জানি না ভায়া! এই কর্ম করে করেই তো চুল পাকিয়ে ফেললুম। তা হাজার-পাঁচেক যদি ছাড়ো তো লাশ-টাশ একদম গুম করে ফেলব। কেউ টেরটিও পাবে না।

    হরেন হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে বড় বড় চোখে চেয়ে বলল, “কিন্তু আপনি তো মরেননি! দিব্যি বেঁচে আছেন।”

    দুলালবাবু মুখটা গোমড়া করে বললেন, “ভাই রে, আমি মরলে তবু ভাল ছিল। যাকে মেরেছ সে আমার গুরু। ওই দ্যাখো, পাঁচু মোদকের লাশ পড়ে আছে। যে-সে লোক তো নয়, কাঁচা-খেকো তান্ত্রিক। মাটি থেকে চার হাত শূন্যে উঠে ভাসতে ভাসতে ধ্যানজপ করে, শবসিদ্ধ পিশাচসিদ্ধ যোগীপুরুষ। এমন মানুষকে মারলে পাপ কতগুণ বেড়ে যায় তা জানো? আমাকে মারলে যদি তোমার এক কেজি পাপ হয় তো পাঁচু মোদককে মারলে হয় পঁচাত্তর কেজি। পাঁচ হাজার রীতিমত কমই বলেছি হে।”

    হরেন একটু কিন্তু কিন্তু করতে লাগল। বলল, “লোকটা যে সত্যিই মরেছে তার প্রমাণ কী? আমি তো ওর দিকে তাক করে গুলি ছুঁড়িনি।”

    দুলালবাবু বললেন, “আমাকে ফসকে গিয়ে ওকেই লাগল কিনা। একেবারে মাথা ফুটো করে বেরিয়ে গেছে। দ্যাখো না, কেমন দাঁত ছরকুটে পড়ে আছে। আর দেরি কোরো না ভায়া, বন্দুকের শব্দ বহুদূরে যায়। লোকজন এসে পড়ার আগেই লাশ সরাতে হবে। পরের জন্য খেটে খেটেই গেলুম।”

    “কত বললেন?”

    “পাঁচ হাজারই দাও। প্রাণের দাম তার চেয়ে ঢের বেশি।”

    ঠিক এই সময়ে “এঃ, এই লোকটা কেবল আমাকে কাতুকুতু দিচ্ছে” বলে হরেনের পাহারাদারদের একজন সটান উঠে বসল।

    পাঁচু লোকটাকে কাতুকুতু মোটেই দেয়নি। তার কোমরের কাছে একটা মশা কামড়েছে। সে চুলকোচ্ছিল। লোকটা পাশেই ছিল বলে হাতটা একটু লেগে গেছে হয়তো। কিন্তু সে প্রতিবাদ না করে মড়া সেজে পড়ে রইল।

    কিন্তু লোকটা মহা ত্যাঁদড়। উঠে বসে তাকে একটা ঠেলা দিয়ে বলল, “এই লোকটা, ওঠো, উঠে পড়ো। অনেকক্ষণ ধরে বদমায়েশি করে যাচ্ছ।”

    পাঁচু একটা চোখ খুলে লোকটাকে দেখে নিয়ে চাপা গলায় বলল, “আমি না। আমি কিছু করিনি। ওই লোকটা করেছে।” বলে দুলালবাবুকে দেখিয়ে দিল।

    পাঁচুর কথা শুনে পাহারাদারটা দুলালবাবুর দিকে চাইল। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই লোকটাই তো! একটু আগে বেকায়দায় পেয়ে আমাকে রদ্দা মেরেছিল। তবে রে…।”

    বলে লোকটা এক লাফে লোহার বেড়াটা ডিঙিয়ে দুলালবাবুকে জাপটে ধরল।

    দুলালবাবু ভারি বিরক্ত হয়ে লোকটাকে আর-একটা রদ্দা কষিয়ে হাঁটুর নীচে চেপে ধরে রেখে বললেন, “একটা জরুরি কথা হচ্ছে, এর মধ্যে কি হুটোপাটি করতে হয় রে দুষ্টু ছেলে : তারপর হরেনভায়া, বলো।”

    হরেন বড় বড় চোখে দৃশ্যটা দেখল। তারপর চোখ বুজে ফেলে বলল, পাহারাদারগুলোকে কালই বিদায় করে দেব।”

    দুলালবাবু খুব উৎসাহের গলায় বললেন, “সে খুব ভাল কথা। এসব রোগা দুবলা জীব দিয়ে কি আর ডানপিটেদের কাজ হয়! ও, কাল থেকে আমি আর পাঁচু মিলেই তোমার দোকান পাহারা দেব’খন। মাথাপিছু মাসে হাজারখানেক করে টাকা দিও, তাতেই হবে। আমাদের খাই বেশি নয়, আর তোমার দিকটাও তো দেখতে হবে।”

    হরেন এবার চোখ খুলল, “ওকে ছেড়ে দিন। আর বেশিক্ষণ ওভাবে চেপে রাখলে মরে যাবে। রদ্দা খেয়েই বেচারা অজ্ঞান হয়ে গেছে।”

     “তাই নাকি!” বলে ভারি লজ্জিত মুখ করে দুলালবাবু লোকটাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “আর দেরি কোরো না ভায়া। টাকাটা ফেলে দাও, আমি লাশটা ঘাড়ে করে বেরিয়ে পড়ি। সেই পশ্চিমের জঙ্গলে গিয়ে কোদাল-গাঁইতি নিয়ে গর্ত করতে হবে, লাশ পুঁততে হবে, অনেক ঝামেলা। তোমার মুখ চেয়েই কষ্টটা স্বীকার করছি।”

    হরেন মুখোনা তোম্বা করে বলল, “কাকে পুঁতবেন? লোকটা তো মরেনি।”

    দুলালবাবু অবাক হয়ে বললেন, “মরেনি মানে? আলবত মরেছে। ওর ঘাড় মরেছে। না মরে ওর উপায় আছে।”

    হরেন মাথা নেড়ে বলে, “আমি বলছি মরেনি। একটু আগেই আমি ওকে মশা মারতে দেখেছি।”

    দুলালবাবু খুব হেসেটেসে মাথা নেড়ে বললেন, “না রে ভাই, না। ও তোমার চোখের ভুল।”

    “মোটেই ভুল নয়। ওর কনুইয়ের গুঁতোয় আমার দারোয়ান রাম সিং পর্যন্ত মুছা ভেঙে উঠে পড়েছে।”

    দুলালবাবু নিতান্ত ভালমানুষের মতো মুখ করে বললেন, “ওরকম হয়, মরার পরও হাত-পা একটু-আধটু নড়ে।”

    “তার মানে?”

    “পাঁঠা বলি দ্যাখোনি? গলা কেটে ফেলার পরও পাঁঠাটা কেমন ছটপট করে পা টানা দেয়, ম্যা-ম্যা করে ডাকে!”

    “মোটেই ম্যা-ম্যা করে ডাকে না।”

    “আহা, না ডাকলেও ছটফট তো করে। এও তাই। লোকটার মাথা ফুটো করে গুলি বেরিয়ে গেল, স্বচক্ষে দেখলাম। গুলির সঙ্গে ওর প্রাণটা লেগে ছিল। প্রাণটা নিয়েই গুলিটা বেরিয়ে গেল কিনা। একেবারে টা-টা গুডবাই করে চলে গেল।”

    ‘আপনারা দুজনেই জোচ্চার। ওই দেখুন, লোকটার চোখ মিটমিট করছে। ওই যে, কোমরের নীচে হাত দিয়ে চুলকোচ্ছে।”

    “বটে! এত বড় সাহস!” বলে দুলালবাবু এক লাফে গিয়ে পাঁচুর ঘাড়টা চেপে ধরে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করালেন। তারপর বললেন “বলি দু’দণ্ড চুপ করে মটকা মেরে শুয়ে থাকতে পারো না, আর এই বিদ্যে নিয়ে বড়াই করে বেড়াও! ছিঃ ছিঃ!”

    পাঁচু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “বড্ড মশা যে!”

    ‘মশা! সামান্য মশার কামড়েই এই দশা! পায়ে কামড়েছে! দিলে তো দাঁওটার বারোটা বাজিয়ে। লোক্টাকে ভজিয়ে-ভজিয়ে যখন কাজটা প্রায় সেরে এনেছি তখনই উনি মশা মারতে লাগলেন।”

    পাঁচুআমতা-আমতা করে বলল, “সব কাজেই যে কেন আপনার এত তাড়াহুড়ো তা বুঝি না। বুদ্ধিটাও বড্ড গোলমেলে। হরেন যখন অস্ত্র ফেলে কাঁদতে বসেছিল তখনই তো ওকে একটা রদ্দা মেরে টাকাটা কেড়ে নিতে পারতেন। তা না করে আপনি আমাকে মড়া সাজাতে গেলেন। এই বুদ্ধি নিয়ে কি কাজ হয়?”

    “তাও তো বটে!” বলে দুলালবাবু হরেনের দিকে তাকালেন। কিন্তু হরেন এখন অস্ত্রটা তুলে নিয়ে ফের বাগিয়ে ধরেছে। দুলালবাবু দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন, “এঃ হেঃ, বড্ড ভুল হয়ে গেছে হে।”

    পাঁচু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আজকের দিনটাই দেখছি অপয়া।” হরেন কর্মকার মৃদু একটু বিজ্ঞের হাসি হেসে বলল, “সেটা যদি বুঝতে পেরে থাকে, তা হলে এক মিনিটের মধ্যে আমার দোকান থেকে বেরোও। নইলে পুলিশে দেব।”

    দুলালবাবু একটু হেসে অমায়িকভাবে বললেন, “তাই ডাকো হরেনভায়া, সেইটেই ভাল হবে। আমি বরং পাঁচুকে বেঁধে ফেলে পাহারা দিতে থাকি, তুমি ততক্ষণে গিয়ে চট করে পুলিশ ডেকে আনো। এসব লোককে ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। তোমার দয়ার শরীর, জানি। তবু বলি, সমাজের ভালোর জন্যই এইসব লোককে যখন-তখন ক্ষমা করে দেওয়াটাও কাজের কথা নয়। যাও, তুমি বেরিয়ে পড়ো। আর দেরি করো না।”

    হরেন গম্ভীর হয়ে বলল, “ওসব চালাকি আর খাটবে না। যা বলছি শোনো, এক মিনিটের মধ্যে যদি বেরিয়ে না যাও তো আমি গুলি চালাব।”

    “এই যে বললে পুলিশ ডাকবে।”

    “বলেছিলাম বটে, তবে ভেবে দেখলাম, যা করার নিজের হাতেই করা ভাল। গত বছর এক জ্যোতিষী আমার হাত দেখে বলেছিল বটে যে, আমার হাতে নরহত্যা আছে। তখন বিশ্বাস করিনি। এখন মনে হচ্ছে, কথাটা মিথ্যে বলেনি, আছেই যখন নরহত্যা, তখন ঘটেই যাক আজ।”

    এই বলে হরেন তার অস্ত্রটা তুলে দুলালবাবুর দিকে তাক করল।

    দুলালবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “নলটা আমার দিকে তাক না করে তোমার উচিত ছিল পাঁচুর দিকে তাক করা। আমি মানুষ তো খারাপ নই হে হরেনভায়া। সুযোগ পেয়েও তোমায় রদ্দা মারলুম না, নিজের চোখেই তো দেখলে। যাকগে, কলিকালে কারও ভাল কতে নেই। মানুষ বড্ড নেমকহারাম হয়ে গেছে। চলে হে পাঁচু, হরেনভায়ার এখানে আর সুবিধে হবে না।”

    পাঁচু বিবেচকের মতোই ঘাড় নেড়ে বলল, “আমারও তাই মত। যেখানে লাভের আশা নেই সেখানে সময় নষ্ট করার কোনও মানেই হয় না।”

    দুলালবাবু হরেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা হলে আসি ভায়া, দেখা হয়ে বড় আনন্দ পেলুম। আমার মায়ের দুলজোড়া যে তোমার কাছেই বাঁধা। সেটা ভেবে ভারি আনন্দ হচ্ছে। তোমার মতো ভাল লোক হয় না।”

    হরেন ধমক মেরে বলল, “আর কথা বাড়িও না। কেটে পড়ো।”

    “যাচ্ছি, যাচ্ছি। তাড়া দিতে হবে না বলে দরজার দিকে পা বাড়িয়েও দুলালবাবু ফিরে এলেন, “একটা কথা মনে পড়ল ভায়া। দারোয়ানটাকে বড্ড জোরে চেপে ধরে রেখেছিলুম, এখন কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে, সত্যি সত্যি মরে যায়নি তো? দ্যাখো তো নাকের সামনে হাত দিয়ে শ্বাস চলছে কি না! মরে গিয়ে থাকলে হ্যাপাটা তোমাকেই তো সামলাতে হবে।”

    হরেন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলে গেল। তারপর কী ভেবে একটু নিচু হয়ে লোকটার নাকের সামনে হাত রাখল।

    এই সুযোগটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন দুলালবাবু। হরেন যেই নিচু হয়েছে অমনি তিনি হনুমানের মতো লাফ মেরে বেড়া ডিঙিয়ে সোজা তার ঘাড়ের ওপর পড়লেন। তারপরেই এক রদ্দা।

    পাঁচু চোখ বুজে ফেলেছিল। সে চোর বটে, কিন্তু খুনে নয়। চোখ বুজেই সে বলল, “রক্ষে করুন দুলালবাবু, লোকটাকে মেরে ফেলবেন না।”

    দুলালবাবু একগাল হেসে বললেন, “আরে না। এই দ্যাখো, লোকটার সেঁজের মধ্যে কত টাকা। বিশ-ত্রিশ হাজার তো হবেই।”

    পাঁচু চোখ খুলে গদগদ হয়ে বলল, “বলেন কী! এ তো আমার ছ’মাসের রোজগারের চেয়েও বেশি। নাঃ, আপনি বাহাদুর বটে!”

    দুলালবাবু হরেনের চাবি নিয়ে তাড়াতাড়ি সিন্দুক খুলে ফেললেন। তার মধ্যে বিস্তর সোনাদানা, দামি পাথর, রুপোর বাসন থরে থরে সাজানো।

    “দ্যাখো হে পাঁচু।”

    “আজ্ঞে দেখছি। চোখের পলক পড়ছে না। তবে দুলালবাবু, একটু হাত চালিয়ে। এসব কাজে সময় নিতে নেই।”

    “সে কি হে পাঁচু। এই যে তুমি বলো আমি তাড়াতাড়ি করে কাজ পণ্ড করি।”

    “আজ্ঞে সে কথাটাও ঠিক। কিন্তু এখন তাড়াতাড়ি না করলে লোকজন এসে পড়তে পারে।”

    পাঁচু কথাটা শেষ করতে না করতেই দরজার বাইরে থেকে কার যেন গলা পাওয়া গেল, “হরেন, আছ নাকি হে!”

    পরমুহূর্তে দেখা গেল, বিশাল চেহারার খাকি পোশাক-পরা একটা লোক দরজা জুড়ে দাঁড়াল, তারপরই বলে উঠল, “এ কী? এসব কী কাণ্ড?”

    পাঁচু ফুট করে একটা আলমারির পাশে ঢুকে গাঢাকা দিল।

    দুলালবাবু নির্বিকারভাবে সিন্দুক থেকে জিনিসপত্র বের করতে করতে বললেন, “আর বলবেন না দারোগাবাবু, দিনকাল যা পড়েছে আর কহতব্য নয়।”

    দারোগাবাবু তাঁর রিভলভারের বাঁটে হাত রেখে বললেন, “তিন তিনটে লাশ পড়ে আছে, জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড, কী ব্যাপার? আর আপনিই বা কে?”

    দুলালবাবু সোনারুপো সব গুছিয়ে হরেনের আলোয়ানে পোঁটলা বাঁধতে বাঁধতে বললেন, “চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটে গেল দারোগাবাবু। ভয়ে তো আমার মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়। মায়ের একজোড়া দুল বাঁধা দিয়ে কয়েকটা টাকা ধার নেব বলে হরেনভায়ার কাছে এসেছিলাম। অনেকদিন বাদে দেখা তো, বসে বসে দুচারটে সুখ-দুঃখের কথাও বলছিলাম। এমন সময়ে চার-চারটে বন্দুকধারী ডাকাত এসে হাজির।”

    “বলেন কী?”

    “আজ্ঞে, তাই তো বলছি, দেশে আইনকানুন বলে আর কিছু রাইল না দারোগাবাবু। ভরসন্ধেবেলা হরেনভায়ার মতো একটা নিরীহ লোকের ওপর চড়াও হয়ে এসব কী কাণ্ড বলুন তো।”

    দাবোগাবাবু তিনজন মূৰ্ছিত লোকের দিকে চেয়ে বললেন “এরা কি বেঁচে আছে?”

    “বলতে পারছি না। না থাকারই কথা। আমি হরেনভায়ার জিনিসগুলো একটু গুছিয়ে দিচ্ছি। নেইও বিশেষ কিছু, সব চেঁছেপুঁছে নিয়ে গেছে। যা আছে তা ওর বউকে পৌঁছে দিয়ে আসি।”

    “ডাকাতরা কোনদিকে গেল বলুন তো?”

    “ওইদিকে। গেলে এখনও ধরে ফেলতে পারবেন।”

    দারোগাবাবু তবু কূট সন্দেহের চোখে দুলালবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, “আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না, অথচ চেনা-চেনাও লাগছে।”

    “অনেকেরই লাগে। ওটা কিছু নয় দারোগাবাবু, চোখের ভুল।”

    “আমরা একটা সাঙ্ঘাতিক খুনিকে খুঁজছি। সে এই শহরেই কোথাও পালিয়ে আছে। সে ভাল ক্রিকেট খেলে, গায়ে ভীষণ জোর, প্রচণ্ড খেতে পারে, আর দেখতে অনেকটা সায়েন্সের মাস্টার দুলালবাবুর মতো। এরকম লোক কাউকে দেখেছেন নাকি?”

    দুলালবাবু ভ্রূ কুঁচকে একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “দাঁড়ান, দাঁড়ান! হুঁ হুঁ, ঠিক তো। চারজন ডাকাতের একজনের চেহারা তো বাস্তবিকই দুলালবাবুর মতোই! সে খুনি নাকি দারোগাবাবু? কী সর্বনাশ! খুব জোর বেঁচে গেছি তা হলে।”

    দারোগাবাবু খাপ থেকে রিভলবারটা বের করে মাথা নেড়ে বললেন, “না, আপনি বেঁচে যাননি। বাঁচার কোনও উপায় আপনার সামনে নেই।”

    দুলালবাবু মিষ্টি করে হেসে বললেন, “এত কম বয়সে তো কারও ভীমরতি হয় না দারোগাবাবু! আপনার হল কী করে?”

    “ভীমরতি যে হয়নি তা আপনিও নির্ঘাত হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। এবার মানে-মানে পোঁটলাটা যেখানকার সেখানেই রেখে দু’হাত তুলে এগিয়ে আসুন, আপনাকে আমি অ্যারেস্ট করলাম।”

    পোঁটলাটা ছেড়ে দুলালবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “গাড়লদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে এরকমই হয় দারোগাবাবু। ওই যে দেখুন, আমার স্যাঙাত পাঁচু মোদক কেমন আলমারির আড়ালে ভালমানুষের মতো গা বাঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেনেন তো ওকে? বিখ্যাত চোর। এখন কি ওর উচিত ছিল না একটা মুগুর টুগুর বা নিদেন একটা ইট দিয়ে পিছন থেকে আপনার মাথায় মারা? আপনিই বলুন! এই বিপদের সময় এটা কি বন্ধুর মতো কাজ হল? ছ্যাঃ ছ্যাঃ। দেশটার এই জন্যই কোনও উন্নতি নেই, বুঝলেন দারোগাবাবু! অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে যদি না পড়লি তা হলে আর মানুষ কিসের! তাই না দারোগাবাবু?”

    পাঁচু মাথা চুলকোতে-চুলকোতে ভারি লাজুক গলায় আলমারির আড়াল থেকে বলল, “তা কি করব? এখানে যে মুগুর-টুগুর কিছু নেই। ইটও তো দেখছি না। কেবল একটা জলের কুঁজো আছে। কিন্তু তাই দিয়ে কি কাজ হয়?”

    দুলালবাবু ব্যথির গলায় বললেন, “শুনুন দারোগাবাবু, শুনুন উনি জলের কুঁজোটা হাতের কাছে পেয়েও ভাবছেন ওতে কাজ হবে কিনা! আচ্ছ দারোগাবাবু, আপনিই বলুন, জলের কুঁজো মাথায় মারলে কাজ হয় না একথা শুনে কে না হাসবে!”

    দারেগাবাবু বিস্ফারিত চোখে পাঁচুকে দেখছিলেন। হঠাৎ প্রবল একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন, “পাঁচু, পাঁচু মোদক! সেই বিটকেল চোর যে আমার বাড়িতে ঢুকে অবধি দেওয়ালঘড়ি আর বাসন চুরি করে নিয়ে গেছে!”

    দুলালবাবু একগাল হেসে বললেন, “আজ্ঞে সে-ই। ওই সেই পাঁচু মোদক। তবে আপনাকেও বলি দারোগাবাবু, পাঁচুর মতো আনাড়ি চোরের কাছে জব্দ হওয়া আপনার উচিত হয়নি। দেখছেন তো কেমন ভ্যাবাগঙ্গারাম। আপনি যখন আমার দিকে পিস্তল তাক করে আছেন তখন অনায়াসে কুঁজোটা তুলে আপনার মাথায় বসিয়ে দিতে পারত। তা না করে বোকার মতো কনেবউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে দেখুন!”

    দারোগাবাবু হুঙ্কার দিলেন, “খবর্দার, জলের কুঁজোয় হাত দেবেন না বলছি।”

    পাঁচু হাত দেয়নি। সভয়ে মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে না, জলের কুঁজোয় হাত দেওয়া খুব খারাপ জিনিস। ও পাপ আমি কখনও করব না দারোগাবাবু। কিন্তু আপনি ওদিকটা দেখুন। উনি লোক সুবিধের নন।”

    দারোগাবাবু চট করে দুলালবাবুর দিকে ফিরে বললেন, “খবর্দার….!”

    দুলালবাবু অমায়িক গলায় বললেন, “আজ্ঞে, আমি তো কিছু করিনি। আমি শুধু পাঁচুকে নজরে রাখছি। যদি এই সুযোগে ও কিছু একটা করে বসে…।”

    দারোগাবাবু সঙ্গে সঙ্গে পাঁচুর দিকে ঘুরে বললেন, “খবর্দার!”

    পাঁচু সঙ্গে সঙ্গে নিজের নাক কান মলে বলল, “ওঁকে বিশ্বাস করবেন না। দারোগাবাবু, নড়া তো দূরের কথা, আমি শ্বাস অবধি ফেলছি না ভয়ে। তবে কি

    দুলালবাবু নানা কায়দা জানেন। কখন যে কী করে বসবেন!” দারোগাবাবু ফের দুলালবাবুর দিকে ফিরে বললেন “খবর্দার!”

    দু’জন ঘরের দু’দিকে। ফলে দু’জনকে পিস্তলের পাল্লায় আনা বা একসঙ্গে নজরে রাখা যাচ্ছে না। দারেগাবাবু বেশ ফাঁপরে পড়লেন। একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে মোচড় মারতে মারতে তিনি হন্যে হয়ে গেলেন। তারপর পাঁচুর দিকে ফিরে বললেন, “ওহে পাঁচু, যাও গিয়ে ওই লোকটার পাশে দাঁড়াও।”

    “যে আজ্ঞে”, বলে পাঁচু এগোতে লাগল।

    দুলালবাবু এই সুযোগে হারানের অস্ত্রটা তুলে নিয়ে ভারি অমায়িক গলায় বললেন, “আচ্ছা দারোগাবাবু, এটা কী জিনিস বলুন তো? হারানভায়ার কাছে ছিল। আমি ভাবলুম, কী জানি বাবু কী জিনিস। বোধহয় বিপদে আপদে কাজে লাগে, তাই না দারোগাবাবু?”

    দারোগাবাবুর চোখ জিনিসটা দেখে গোলাকার হয়ে গেল। অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় বললেন, “শিগগির ফেলে দিন। ও খুব বিপজ্জনক জিনিস।”

    দুলালবাবু অস্ত্রটা বাগিয়ে ধরে বললেন, “আমিও তো সেই কথাই বলি, এ সব খুব বিপজ্জনক জিনিস। আপনিও ওটা ফেলে দিন।”

    দারোগাবাবু গর্জন করে বললেন, “ভাল হবে না বলছি, ফেলে দিন নইলে গুলি করব।”

    দুলালবাবু একগাল হেসে বললেন, “আমারও ওই কথা, ফেলে দিন নইলে গুলি করব।”

    দারোগাবাবু এক পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “ভাল হবে না বলছি, খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

    “আজ্ঞে, আমিও তো সেই কথাই বলতে চাইছি। ভাল হবে না বলছি, খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

    দাবোগাবাবু আরও এক পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “ট্রিগার থেকে আঙুল সরিয়ে নিন। দুম করে গুলি বেরিয়ে যেতে পারে।”, …।

    “আজ্ঞে, যথার্থই বলেছেন। আমি আবার আনাড়িও বটে। হাতটাত কাঁপছে, যে-কোনও সময়ে গুলি ছুটে যেতে পারে।”

    দাবোগাবাবু আরও এক পা পিছতে গেলেন, কিন্তু চৌকাঠে পা ঠেকে একেবারে চিতপটাং হয়ে উলটে ঘরের বাইরে পড়লেন। তারপর গড়িয়ে পড়ে গেলেন সিঁড়ির নীচে।

    দুলালবাবু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে দাবোগাবাবুর নাড়ি দেখে বললেন “মূর্ছা গেছে। ওহে পাঁচু!”

    পাঁচু পোটলাটা ঘাড়ে করে বেরিয়ে এল। একগাল হেসে বলল, “যে আজ্ঞে।”

    “আজ তা হলে কাজ কারবার বেশ ভালই হল, কী বলো!”

    “কী আর বলববাবু, একটু পায়ের ধুলোদিন। এত এলেম আমার পেটেও নেই।”

    দুলালবাবু বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “এ আর কী দেখছ! এরপর আরও তো কত কী হবে। সবে তোত সন্ধে।”

    পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “আজ আর নয়। সোনায়-দানায় মিলিয়ে অনেক হয়েছে। লাখ টাকার মাল তো বটেই।”

    দুলালবাবু একটু তাচ্ছিল্যের ভাব করে বললেন “ছোঃ! লাখ টাকা আবার একটা টাকা নাকি?”

    “বেশি লোভ করা ভাল নয় বাবু। অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।”

    দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “লোভ নয় হে, লোভ নয়। কাজ করার একটা আনন্দও আছে। যত বিপদ তত আনন্দ, যত বাধা তত উত্তেজনা।”

    পাঁচু গম্ভীর হয়ে বলল, “আপনাকে নিয়ে মুশকিল কী জানেন? আপনার মতলবের ঠিক নেই। কখন যে কী করে বসবেন তাই ভেবেই আমার দুশ্চিন্তা হয়। এখন চলুন তো, ঘরে গিয়ে আগে মালপত্র রাখি।”

    দুলালবাবু হঠাৎ উৎকর্ণ হয়ে বললেন, “আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও! কাঁদের যে পায়ের শব্দ পাচ্ছি! চারদিক থেকে কারা যেন আসছে! বেশ ভারী ভারী বুটের আওয়াজ!”

    পাঁচুও শব্দটা শুনতে পেল। মুখ শুকনো করে বলল, “সর্বনাশ! এ যে পুলিশের বুট। দারোগাবাবুর সেপাইরাই হবে।”

    কথা শেষ হওয়ার আগেই কয়েকটা ঝাঁঝালো টর্চবাতির আলো এসে তাদের ওপর পড়ল। কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, “পাকড়ো! পাকড়ো! ওই ডাকাত।”

    পাঁচু পোঁটলাটা ফেলে চোখের পলকে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে ফেলল। সেপাইরা এসে দুলালবাবুকে ঘিরে ফেলল।

    দুলালবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “না, শেষরক্ষা হল না।”

    এক সেপাই বলল, “কী বলছেন?”

    দুলালবাবু করুণ মুখ করে বললেন ‘দাবোগাবাবুর কথাই বলছি। ওই যে পড়ে আছেন ময়দার বস্তার মতো।”

    সেপাইদের কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে দারোগাবাবুকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, “সর্বনাশ! ইনি তো খুন হয়ে গেছেন।”

    দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “যেতেন, যেভাবে ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করছিলেন, তাতে খুন হওয়ারই কথা। তবে শেষ অবধি হননি।”

    একজন সেপাই কঠিন গলায় বলল, “আপনি কে?”

    “আমি একজন লোক। এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলুম। হঠাৎ দেখি দারোগাবাবু একা পাঁচ-সাতটা মুশকো লোকের সঙ্গে লড়াই করছেন। তা আমি এসব। মারদাঙ্গা দেখতে খুব ভালোবাসি। ওই দোকানঘরটার দেওয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে লড়াই দেখলাম। আহা, এমনটা বহুদিন দেখিনি। খানিকটা অরণ্যদেব, খানিকটা টিনটিন, খানিকটা টারজান মিলিয়ে-মিশিয়ে যেন ভগবান আমাদের দারোগাবাবুকে তৈরি করেছেন। কী ঘুসি রে বাবা! যেন বোমা ফাটছে। ক্যারাটে, কুংফু সবই দেখাতে লাগলেন।”

    সেপাইটা সন্দিহান গলায় বলল, “আমাদের দারোগাবাবু তো জলঢোসকা মানুষ, তার গায়ে একরত্তি জোর নেই। আর সাহস! হিঃ হিঃ! আরশোলা, ভূত, পেতনি সব কিছুকেই ভারি ভয় পান।”

    দুলালবাবু নিমীলিত নয়নে বললেন, “না না, আপনি ভুল করছেন, দারোগাবাবুকে বাইরে থেকে বোঝা যায় না বটে, কিন্তু ভিতরে তিনি অন্য জিনিস।”

    সেপাইটা দুলালবাবুর সঙ্গে মোটেই একমত হয় না। বলল, “মোটই নয়। উনি একটা জিনিসই পারেন সেটা হল খাওয়া, হাঁড়ি-হাঁড়ি রসগোল্লা, কাঁড়ি কাঁড়ি মাছ মাংস খেয়ে ফেলতে পারেন। আর কোনও কাজই করেন না। চোর-টোর তো আমরাই ধরি। উনি কিছু করেন না।”

    “তা হলে কি ভুল দেখলাম! কালকেই গণেশ-ডাক্তারের কাছে গিয়ে চোখটা পরীক্ষা করাতে হবে। যাই, গিয়ে একটু জিরোই, বড্ড ধকল গেছে।”

    “জিরোবেন কি? আপনাকে যে থানায় যেতে হবে। আপনি যে ঘটনার সাক্ষী!”

    .

    ভুতোর পরিদের গল্প যে কেউ বিশ্বাস করে না, তা সে জানে। সবাই বলে ওটা নাকি স্বপ্ন। কিন্তু ভুতো জানে, তা নয়। পরিদের ব্যাপারটা একদম জলজ্যন্ত সত্যি। একটা কথা ভুতো কাউকে কখনও বলেনি। সেটা হল, ছোট একটি ডিবে। ডিবেটা কোন ধাতু দিয়ে তৈরি তা ভুতো অনেক ভেবেও বুঝতে পারেনি। রংটা রুপোলি, চ্যাপটা আর চৌকোমলতা। আড়ে-দীর্ঘে এক আর দেড় ইঞ্চি মাত্র। কৌটোটা সে অনেক চেষ্টা করেও কখনও খুলতে পারেনি। ছুরি দিয়ে, টিন কাটার দিয়ে অনেক চেষ্টা করে দেখেছে। কিছু হয়নি। একদিন তো খুলতে না পেরে রেগে গিয়ে বশে কয়েকটা আছাড় দিয়েছিল। কিছু হয়নি। পরিরা এই ডিবেটা তাকে দিয়ে বলেছিল, “যত্ন করে রেখো। কাজে দেবে।” কী কাজে দেবে তা অবশ্য ভুত জানে না। তার বিশেষ কোনও সমস্যাও নেই। এবাড়িতে সে বেশ বাড়ির ছেলের মতোই আছে। ফাঁইফরমাশ করতে হয় বটে, কিন্তু পড়াশোনার জন্য তাকে স্কুলেও ভর্তি করা হয়েছে। সে খেলাধুলো করে, লেখাপড়া করে, খায়-দায়, তার আর সমস্যা কী? কিন্তু একটা ব্যাপার ভুতো লক্ষ করেছে, ডিবেটা হাতে নিলে সে বেশ একটা মনের জোর পায়। কোনও শক্ত অঙ্ক কষতে না পারলে ডিবেটা বাঁ হাতে মুঠো করে ধরে কষলেই অঙ্ক জলের মত মিলে যায়। পরীক্ষার সময়েও সে ডিবেটা পকেটে নিয়ে যায়। ডিবের গুণেই কি না কে জানে, ভুতো প্রত্যেক পরীক্ষায় ক্লাসে ফার্স্ট হয়।

    কিন্তু এসব ভুতো কাউকে বলে না। তবে একবার ভারি অদ্ভুত কাণ্ড হয়েছিল। স্কুলে তার প্রাণের বন্ধু হচ্ছে সেকেন্ড বয় চিতু। একবার চিতুকে সে কৌটোটা লুকিয়ে দেখিয়েছিল। হাতের তেলোয় কৌটোটা নিয়ে সে চিতুকে দেখিয়ে বলল, “বল তো এটা কী?”

    চিতু অবাক হয়ে বলল, “কোথায় কী?

    “এই যে আমার হাতে!”

    চিতু তার হাতের তেলোর দিকে চেয়ে থেকে বলল, “তোর হাতে? তোর হাতে তো কিছুই নেই! হাত তত খালি!”

    ভুলতা তখন নিজেও অবাক হয়ে দেখল, তার হাতের চেটোটায় কিছু নেই। অথচ সে স্পষ্ট টের পাচ্ছিল ডিবেটা তার হাতেই রয়েছে। কিন্তু চোখে দেখা যাচ্ছেনা। সে ভয় খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে কৌটোটা পকেটে ভরে ফেলে বলল, “ইয়ার্কি করছিলাম।”

    ওই একবারই কাণ্ডটা হয়েছিল। সেই রাতেই কিন্তু পরি এল। একজন রোগা বিষণ্ণ মুখওয়ালা পরি, খুব গম্ভীর হয়ে বলল, “তোমাকে সাবধান করা সত্ত্বেও তুমি কৌটোটা অন্যকে দেখানো চেষ্টা করেছিলে। সাবধান, আর এরকম করো না। ওই কৌটোর ভিতর তোমাকে প্রোগ্রাম করা আছে। মাঝে-মাঝে এটা হাতে নিয়ে চুপ করে চোখ বুজে বসে থাকবে। ওটা আর কখনও ঘরের বাইরে নিয়ে যেও না।”

    “তোমাকে প্রোগ্রাম করা আছে”, এই কথাটা ভুতো বুঝতে পারেনি। জিজ্ঞেস করবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু পরিটা তার কথা শেষ করেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

    .

    সবে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন বাচ্চাদের আর পড়াশুনোর কোনও চাপ নেই। এ-সময়টায় এক-একদিন নিয়ম করে তার কেউ বাগান করে, কেউ পশুপাখির পরিচর্যা করে, সকলে মিলে দল বেঁধে পিকনিক করতে যায়, খেলাধুলো তো আছেই। আজ ভুবন রায় তাঁর বড় ছেলে রামলালকে হুকুম দিয়েছেন, “বাচ্চাদের হাতেকলমে একটু বিজ্ঞান শেখাও। ওদের মধ্যেও হয়তো সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে। নানারকম অ্যাপারেটাস দাও, যে-যার নিজের মতো কিছু করুক। তুমি নিজে সঙ্গে থেকো, নইলে আবার বিপদ ঘটতে পারে।”

    তাই আজ বাচ্চারা সব ল্যাবরেটরিতে এসেছে। মন্টু, লালু, গদাই, টিকলি, কাজু আর ভুতো। রামলাল তাদের যথাসাধ্য বিজ্ঞান বোঝানোর চেষ্টা করছেন।

    ভুতো হঠাৎ লালুকে চুপিচুপি বলল, “আগের দিন যে ল্যাবরেটরিতে একটা বিস্ফোরণ হয়েছিল তার কারণ জানিস?”

    লালু চাপা স্বরে বলল, “চুপ, শুনতে পেলে রক্ষে নেই।”

    ভুতো চাপা গলায় বলল, “সেই বিস্ফোরণের পর থেকে আর দুলালবাবুকে দেখা যাচ্ছে না।”

    “হ্যাঁ। কিন্তু দুলালবাবু তো খুন হয়েছেন। ঠিক তাঁর মতোই দেখতে আর একটা লোক তাঁকে খুন করেছে বলে শোনা যাচ্ছে।”

    ভুতো বলে, “দুলালবাবুকে খুন করার পিছনে কারও কোনও মোটিভ নেই। দুলালবাবুর টাকা-পয়সা ছিল না, তাঁর ওপর কারও কোনও রাগও ছিল না, তবে খুন করবে কেন?”

    “সেই রাতে একটা চোরও এসেছিল এ বাড়িতে।”

    “একটা নয়, দুটো। তবে আমার মনে হয়, দু’জনের একজন সত্যিই চোর, আর অন্যজন চোর নন, দুলালবাবু।”

    “দুলালবাবু! যাঃ, দুলালবাবুর গায়ে অত জোর ছিল কখনও? দুলালবাবুর বয়স অত কম ছিল? আর দুলালস্যারকে আমরা চিনতে পারব না নাকি?”

    ভুতো গম্ভীর হয়ে বলল, “কিন্তু আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে।”

    “কিসের সন্দেহ?”

    “কোথায় যেন একটা গুবলেট পাকিয়ে গেছে। সেদিন কী কী কেমিক্যাল মেশানো হয়েছিল মনে আছে?”

    “তাই কখনও থাকে? যা খুশি মিশিয়ে একটা খিচুড়ি পাকানো হয়েছিল। কেউ তো আর লিখে রাখেনি।”

    “তা বটে।” বলে ভুলো গম্ভীর হয়ে গেল। শহরে চারিদিকে এখন বেশ একটা আতঙ্কের ভাব। কোথাও চুরি, কোথাও ডাকাতির চেষ্টা হচ্ছে। স্বয়ং দারোগাবাবু কাল রাতে ডাকাতদের হাতে খুন হতে-হতে বেঁচে গেছেন। আর শোনা যাচ্ছে ডাকাতদের সদার হচ্ছে সেই লোকটা, যে নাকি অনেকটা দুলালবাবুর মতো দেখতে। বাজারের স্যাকরা আর তার দুই দরোয়ানও সাক্ষী দিয়েছে যে, এই সেই খুনে-লোক। শহরে এই নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা হচ্ছে। ভৌত ক্লাবের মেম্বাররা পর্যন্ত বলছেন যে, সেই লোকটা সেখানেও হামলা করেছিল। আবার শোনা যাচ্ছে এই লোকটা সাঙ্ঘাতিক ভাল ক্রিকেট খেলে।

    ভুতো কিছুতেই অঙ্কটা মেলাতে পারছে না।

    .

    রামলালবাবু সায়েন্স নিয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। তারপর দু-একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। তারপর বিরক্ত ও গলদঘর্ম হয়ে বললেন “যাও সব, গিয়ে খেলা-টেলা করোগে।”

    সন্ধের পর আজকাল বাচ্চারা কেউ ক্যারাম খেলে, কেউ বই পড়ে, কেউ গল্প

    টল্প করে। কারও ওপর পড়ার চাপ নেই।

    ভুতো সন্ধেবেলায় তার একা ঘরটায় এসে চুপচাপ ডিবেটা হাতে নিয়ে চোখ বুজে স্থির হয়ে বসে রইল।

    হঠাৎ সে শুনতে পেল একটা গলার স্বর খুব চিচি করে তার কানের কাছে মশার পনপনানির মতো কিছু বলছে।

    সে কৌটোটা আরও জোরে চেপে ধরল। গলার স্বরটা খুব দূর থেকে আসছে। অনেক দূর থেকে। খুব ক্ষীণ। ভুতো কান খুব সজাগ করল।

    গলার স্বরটা বলল, “লাল হেলমেট পরো, বুঝতে পারবে।” ভুতো সভয়ে বলল, “লাল হেলমেট! সেটা আবার কী?”

    “খুঁজে বের করো। কাছাকাছি কোথাও আছে।”

    “সেটা দিয়ে কী হবে?”

    “মজা হবে। খুব মজা।”

    “দুলালবাবুর কী হল?”

    “হেলমেট জানে। তাকে জিজ্ঞেস করো।”

    “কোন দিকে খুঁজব?”

    “জঙ্গলের দিকে, আর কিছু বলতে পারছি না। ক্ষমা করো।”

    ভুতো অবাক হয়ে ডিবে হাতে বসে ভাবতে লাগল।

    ভুতো জানে এটা স্বপ্ন নয়। যা ঘটছে তা সব সত্যি। হেলমেটটার খোঁজ পেলে হয়তো যা সব ঘটছে তার একটা হদিস পাওয়া যাবে।

    ভুতো উঠে পড়ল এবং চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা হল।

    জঙ্গল বলতে যে সাঙ্ঘাতিক কিছু ব্যাপার তা নয়। তবে দুর্গম বটে। কেননা, জঙ্গলটায় বিছুটি আর কাঁটা গাছ সাঙ্ঘাতিক। সাপখোপ, বিছেটিছে আছে। আগে প্রায়ই চিতাবাঘ বেরোত। আজকাল চিতাবাঘ নেই, শেয়াল আছে।

    ভুতের ভয়ডর এমনিতেই কম। তার ওপর মাথায় নানা ফন্দি খেলছে বলে ভয়ডরের বালাই রইল না।

    জঙ্গলে ঢুকতে হলে ভৌত-ক্লাবের পাশ দিয়ে খুঁড়িপথ ধরে যেতে হয়। আজ ভৌত ক্লাবে কেউ আসেনি। দরজায় তালা ঝুলছে। ক্লাবের ঘরটা পার হয়ে একটা দুর্গম ধ্বংসস্তূপ, সেটাকে ডাইনে ফেলে কয়েক পা এগোলেই জঙ্গলের শুরু।

    বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। চারপাশে কুয়াশায় ঢাকা অস্পষ্টতা। ভুতো পথ ঠাওর করে করে হাঁটছে। হেলমেটটা এই বিশাল জায়গায় কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে তা সে জানে না, কিন্তু বিশ্বাস আছে পাবেই।

    সামনেই গাছের তলায় একটা গোলামতো জিনিস পড়ে আছে। ভূতো জিনিসটা কী দেখার জন্য নিচু হয়ে তুলে নিন। এত হাল্কা জিনিস সে কখনও দ্যাখেনি। একেবারে যেন বেলুনের চেয়েও হাল্কা। বলটা তার হাতের মধ্যে একটু যেন নড়ানড়ি করে উঠল। ভুতো নিতান্তই ছেলেমানুষ। জিনিসটা নিয়ে একটু লোফালুফি করে তারপর একটু চেপে ধরে দেখল ফাটে কি না।

    আশ্চর্যের বিষয়, বলটা দুম করে না হলেও, হুস করে ফেটে গেল। ভুতো ভারি অবাক হয়ে দেখল, ভিতর থেকে ধোঁয়ার মতো কী যেন বেরিয়ে আসছে।

    থতমত খেয়ে তিন হাত পেছিয়ে গেল ভুতো, তারপর হাঁ করে রইল। এরকম কাণ্ড সে জীবনে দ্যাখেনি। গলগল করে ধোঁয়া বেরিয়ে একটা সুড়ঙ্গে কালো ঢ্যাঙা মূর্তি সামনে দাঁড়াল। তার দু’খানা চোখ ভাটার মতো জ্বলছে।

    “কে তুই?” ভুতো আমতা-আমতা করে বলল, “ভু-ভুতো।”

    “ভুতো! চালাকি কারবার জায়গা পেলে না? ভুতো বললেই ভুতো!”

    ভুতো এবার যথার্থই ভয় খেয়ে বলল, “বিশ্বাস করুন, আমার নাম ভুতনাথ, সবাই ভুতো বলে ডাকে। আপনি কে?”

    “তোর সে খোঁজে দরকার কী? এখন বল আমাকে ঘাঁটালি কেন?” আজ্ঞে, ইচ্ছে করে নয়। জিনিসটা কী দেখতে গিয়ে ফট করে ফেটে গেল।”

    “কী ফাটালি জানিস?”

    “আজ্ঞে না।”

    “পুরনো ভুতেরা একরকম গুটি পাকিয়ে তার মধ্যে থাকে। আমি কত বছরের পুরনো জানিস?”

    “আজ্ঞে না।”

    “দেড় হাজার বছরের। কালও একটা পাজি লোক আমার ঘুম ভাঙিয়েছিল। আজ আবার। তা হলে তুই-ই এসব করিস?”

    “কাল আমি ভাঙাইনি।”

    “তবে কে?”

    “আজ্ঞে, আমি জানি না।”

    “বললেই বিশ্বাস করব? লোকটাকে ধরার জন্য আজ আমি বুদ্ধি করে পথের ওপর পড়েছিলুম।”

    “কিন্তু আমি নই।”

    সুড়ঙ্গে ভুতটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ঢেউয়ের মতো হেলদোল খেল। তারপর বলল, “তুই নোস তো কে? অবশ্য আমরা গন্ধ চিনি। তোর গায়ের গন্ধটা অন্যরকম। তা বলে তোকে যে ছেড়ে দেব তা ভাবিস না।”

    ভুতো ভয় খেয়ে বলল, “কী করবেন তা হলে?”

    ছায়াভূৰ্তি বলল, “কী করব তা ঠিক করবে লম্বোদর। সে-ই আমাদের সর্দার কিনা।”

    “লম্বোদর? সে কে?” ভূতটার এতক্ষণ কোনও হাত-পা ছিল না। কেবল লম্বাটে এক ধোঁয়াটে মূর্তি আর দুটো জ্বলন্ত চোখ। কিন্তু এবার একটা লিকলিকে হাত দেখা দিল। মনে হল যেন ভূতটা সেই হাত দিয়ে চিন্তিতভাবে মাথা চুলকোল, তারপর বলল, লম্বোদর যে কে তা কি আর আমরাই জানি? ভারি গোলমেলে ব্যাপার।”

    “আপনিই তো লম্বাদরের কথা বললেন?”

    “বলেছি ঘাট হয়েছে। লম্বোদর আমাদের সর্দার ঠিকই, প্রায় হাজার বছর ধরেই সে সদার। কিন্তু ভূতের তো শরীর থাকে না, তার চেহারারও কোনও ঠিক নেই। তারপর পুরনো ভূত তো, চেহারা চিমসে মেরে একেবারে সব ধোঁয়াটে হয়ে গেছে। তারপর ধরো, ফ্যাসাদ তো একটা নয়। মাঝেমধ্যে আমাদের ঝগড়া কাজিয়া মারপিট হয়, তখন সব আমরা গুলিয়ে যাই। তারপর ঝড়-বাতাস তুফান এলেও একেবারে তালগোল পাকিয়ে ফেলে আমাদের। তারপর যখন ফের আলাদা হই, তখনই হয় মুশকিল। কে যে লম্বোদর ছিলুম, আর কে যে বিশ্বনাথ সেইটে ঠিক করাই হয় সমস্যা। তা আমরা কী করি জানো? আমরা ওই লম্বোদর নামটাই ধরে রেখেছি। এক-একবার এক-একজন পালা করে লম্বোদর হয়ে যাই। একটা ভোটের মতো ব্যাপারও হয়। বেশিরভাগ ভূত যাকে লম্বোদর বলে ঠিক করে সেই হয়।”

     “আপনার কোনও নাম নেই?”

    ভূতটা মাথা-টাথা চুলকে বলে, “না থেকে কি পারে? তবে কথা হল, ভূত তো আর নাম নিয়ে জন্মায় না। যখন জ্যান্ত ছিলুম তখন বোধহয় আমার নাম ছিল জনার্দন। কিন্তু এত পুরনো দিনের কথা কি মনে থাকে রে বাপু? জনার্দনও হয়তো লম্বোদরের মতোই গুলিয়ে গেছে আর কারও সঙ্গে।“

    ভূতো কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “তাহলে আমাকে আর লম্বোদরের কাছে নিয়ে গিয়ে লাভ কী? আপনিই বরং নিজেকে লম্বোদর মনে করে শাস্তি দিয়ে দিন। এই নাক কান মলছি, দশবার ওঠ-বোস করছি।”

    “উঁহু, উহুঁ, সব কিছুরই একটা নিয়ম আছে। চল, ওই শ্যাওড়া গাছের নীচে আজ আমাদের জলসা বসবার কথা। সবাই সেখানে আসবে। সেখানেই বোঝা যাবে এবার লম্বোদরটা কে। লম্বোদর ছাড়া তোর বিচার হওয়া সম্ভব নয়।”

    “ওরে বাবা!”

    ভূতটা বিরক্ত হয়ে বলল, “তোর কি ভূতের ভয় আছে নাকি?”

    “বেজায় আছে।”

    “লক্ষণ তো দেখছি না। দিব্যি তো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কথা বলছিস। একবার মূৰ্ছা গেলেও না হয় বুঝতাম।”

    “মূর্ছা যাওয়ার ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু এত ভয় খেয়েছি যে মূর্ছাটাও হতে চাইছে না।”

    “কিন্তু আমার তো উপায় নেই, একজনকে যে হাজির করতেই হবে। আমার ওপর ভার ছিল লোকটাকে খুঁজে বের করার।”

    “কিন্তু আমি তো সেই লোক নই।”

    “ওসব আমি জানি না আমি তোকে লম্বোদরের সভায় হাজির করে দেব, ব্যস।”

    ভুতো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, “আপনাদের লম্বোরের সভায় আজ কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?”

    “দুটো লোক মিত্তিরদের পোড় ভিটে জবরদখল করে বসে আছে। তাদের কীভাবে তাড়ানো যায় সেই পরামর্শ হচ্ছে। তোক দুটো ভারি বদমাশ, একটা চোর, অন্যটা ডাকাত। আমাদের চোদ্দটা ভূত ওবাড়িতে বসবাস করে, তাদের ভারি অসুবিধে হচ্ছে।”

    “লোক দুটো কে? নাম জানেন?”

    “একজন পাঁচু মোদক। অন্যজন দুলাল সেন।”

    দুলাল সেন। ভুতো ফের চমকে উঠে বলল, “দুলালবাবু কি তা হলে ওখানে লুকিয়ে আছেন?”

    “শুধু লুকিয়েই নেই এইমাত্র হরগোপাল খবর এনেছে যে, ওরা দু’জন নাকি ভূত বেচে দু’পয়সা আয় করার কথাও ভাবছে।”

    ভুতো অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু ভূত কিনবে কে?”

    “আজকাল সবাই সব কিছু কেনে। একবার ব্যবসাটা চালু হয়ে গেলে কাণ্ডখানা কী হবে ভাব তো! দলে দলে লোক জালদড়ি দিয়ে ভূত ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়বেনা?”

    “ভূত কি ধরা যায়?”

    “ধরা তো সোজা। সাত বছর মাছ ধরা হয়েছে এমন মেছো-জালে গাবের আঠা। আর লোহার গুঁড়ো মিশিয়ে মাখিয়ে নিলেই হয়ে গেল। ঝপাঝপ ধরা পড়বে। তবে কায়দাটা সবাই জানে না বলে রক্ষে। ওই যাঃ, তোকে যে বড় বলে দিলাম!”

    ভুতো ভয় খেয়ে বলল, “আমি ভাল করে শুনতেই পাইনি। কী যেন বললেন, হেঁসোতে ডাবের জল আর সোহাগার গুঁড়ো না কী যেন!”

    “যাক বাবা। বেঁচে গেছি। অবশ্য শুনে ফেললেও তোর লাভ হত না। তোকে তো আজ রাতেই ঘাড় মটকে মারা হবে।”

    “আমার কী মনে হচ্ছে জানেন জনার্দনদা? আমার মনে হচ্ছে, ওই দুলাল সেন আর পাঁচু মোদকই আপনাদের সঙ্গে গণ্ডগোল করেছে। ওদের ধরলেই সব সমস্যার সমাধান।”

    জনার্দন একটা ধমক দিয়ে বলল, “ফ্যাচফ্যাচ করিস না তো! ধরব! ওদের ধরা কি সোজা? দুটোই মহা ধূর্ত, আর তারাই আমাদের ধরার তাল করছে।”

    ভুতো এবার বেশ একটু রাগের গলায় বলল, “আসলে আপনারা ভীষণ ভিতু ভূত। ভিতু বলেই ওদের ধরতে ভয় পাচ্ছেন। আর আমি নিরীহ বলে আমাকে ধরে এনেছেন।”

    জনার্দন ফের খিঁচিয়ে উঠে বলল, “আমরা ভিতু? ছাই জানিস। আমরা ভয় খাব কেন রে? তবে সবাইকে সবসময়ে ধরা যায় না। ধরার একটা নিয়ম আছে। যেখানে তেকাঠির ছায়া, নিমের ছায়া, শিমুলের গন্ধ সেখানে ঈশেন কোণ থেকে যে আসে ভরসন্ধেবেলা শুধুমাত্র তাকেই ধরা সম্ভব।”

    “আমি কি তাই আসছিলাম?”

    জনার্দন খুক করে একটু হেসে বলল, “একেবারে ঠিক বলেছিস। যেখানে তোকে ধরলুম সেখানে একটা জারুল গাছ ছিল। তার তেকাঠির ছায়া পড়ে নীচে। নিমের হাওয়া দিব্যি বইছিল। আর শিমুল গাছের ছালের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছিল। তাই তো ওখানে ঘাপটি মেরে ছিলুম রে। আর তুইও এলি ঈশেন কোণ থেকে। বায়ু বা অগ্নিকোণ থেকে এলে কিছুই করতে পারতুম না।”

    ‘ইস, বড্ড ভুল হয়ে গেছে তো তা হলে।”

    “এখন চুপ। এবার বোধহয় তোর পালা।” বাতাসে জোর ফিসফাস হচ্ছিল। কে কী বলছে তা শুনতে।

    “তা হলে কি তুই ভৌত ক্লাবের মেম্বার। সেই লোকগুলোকেও আমরা খুঁজছি। বাগে পেলে একবোরে পিণ্ডি চটকে দেব। মড়ার মাথার খুলি সাজিয়ে রোজ-রোজ ভূত নিয়ে ওরা ইয়ার্কি দেয়।”

    “আমি ওই ক্লাবে জীবনে যাইনি।”

    ভূতদের নিশ্চয়ই নিজস্ব বেতারবার্তার ব্যবস্থা আছে। ভূতটা হঠাৎ স্থির হয়ে শরীরের ঢেউটা বন্ধ করে কী যেন একটু শুনল। তারপর হঠাৎ স্পাইডারম্যানের মতোই ঝাঁ করে ভুতোর দিকে একটা সূক্ষ্ম জালের মতো কী যেন ছুঁড়ে দিল। বলল, “আয় আমার সঙ্গে। লম্বোদর তোকে ধরে নিয়ে যেতে হুকুম দিয়েছে।”

    ভুতোকে হেঁটে যেতে হল না। যেন হালকা একটা ব্যাগের মধ্যে ভরে তাকে শূন্যে তুলে দোলাতে-দোলাতে জনার্দন তাকে নিয়ে ফেলল শ্যাওড়া গাছের গোড়ায়।

    ভুতো সভয়ে দেখল, সেখানে আবছা অন্ধকারে ছায়া-ছায়া সুড়ঙ্গে চেহারা। প্রত্যেকটা শরীরেই অনবরত ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সংখ্যায় তারা ক’ হাজার হবে তার হিসেব করা খুবই কঠিন। কারণ মাঝে-মধ্যেই ছায়ামূর্তিগুলো জড়াজড়ি হয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তখন আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না কাউকে। জনার্দন মিথ্যে বলেনি। এর মধ্যে কে লম্বোদর, কে জনার্দন তা বুঝে ওঠা শিবেরও অসাধ্য।

    জনার্দন তাকে বসিয়ে, নিজে চারদিকে একটা পাক খেয়ে এসে বলল, “ওই যে দ্যাখ, লম্বোদর সিংহাসনে বসে আছে। দেখতে পাচ্ছিস?”

    ভুতো দেখতে পেল, একটা ঢিবির মাথায় গোলমতো ছোট্ট একটা জিনিসের ওপর একটা ছায়ামূর্তি বসে আছে বটে।

    “ওইটা বুঝি আপনাদের সিংহাসন?”

    “হ্যাঁ। খুব দামি জিনিস। কদিন আগে ওটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। ওটার ওপর অনেকের নজর আছে। খবরদার, ওদিকে নজর দিস না। সিংহাসন যে চুরি করবে তার রক্ষে নেই। আজ হোক কাল হোক, তার মুণ্ডু দিয়ে আমরা গেণ্ডুয়া খেলবই। গেলবার ওটা চুরি করেছিল ওই ভৌত-ক্লাবের একটা লোক। তার নাম নন্দলাল। তাকে কী শাস্তি দেওয়া যায় তাও আজকের মিটিং-এ ঠিক করা হবে।”

    নন্দলাল নাম শুনে ভুলো একটু চমকেউঠল।নন্দবাবুভাল লোক, চুরিটুরি করেন কখনও। ভূতের সিংহাসন চুরি করতে যাবেন কেন তাও ভুতো বুঝতে পারল না। ভয়ে সে সিঁটিয়ে রইল। চারদিকে গিজগিজ করছে ছায়া-ছায়া সব লম্বাটে মূর্তি। তাদের শরীরে অনবরত ঢেউ খেলে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে শুধু ধকধক করছে জ্বলছে চোখ। কথাবার্তা হচ্ছে ফিসফিস করে। সেটাকে মনে হচ্ছে বাতাসের হাহাকারের মতো।

    ভুতোর মনে হচ্ছিল, সভার কাজ চলছে। কিন্তু কীভাবে চলছে তা সে বুঝতে পারছে না। সে এখনও জালদড়িতে বাঁধা। জনার্দন পাশেই গোল বলের মতো পাকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে।

    ভুতো খুব নরম স্বরে ডাকল, “জনার্দনদা।”

    জনার্দন খ্যাক করে উঠল, “দিলি তো ফের ঘুমটা ভাঙিয়ে!”

    “ঘুমোচ্ছিলেন নাকি?”

    “আমি মওকা পেলেই ঘুমোই।”

    “বলছিলাম কি, এরা সব কোন ভাষায় কথা বলছে?”

    “ও তুই বুঝবি না। আমরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলি তখন টেলিপ্যাথিতে কথা হয়।”

    “তবে ফিসফাস হচ্ছে কেন?”

    “তাও হয়। আমাদের টেলিপ্যাথি অন্যরকম। বাতাসে নাড়া দিয়ে পাচ্ছিল না ভুতো। তবে একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছিল। জনার্দন তাকে শূন্যে দুলিয়ে ঢিবিটার নীচে নিয়ে মাটির ওপর রাখল। তারপর বলল, “লম্বোদর, এই মানুষের ছানাটাকে ধরে এনেছি।”

    লম্বোদরের লম্বা গলা ঢিবির ওপর থেকে ক্রেনের মতো নেমে এল। দুটো চোখ ধকধক করে জ্বলতে লাগল ভুতোর মুখের ওপর। তারপর হঠাৎ লম্বোদর একটা চাপা আর্তনাদ করে বলল, “এ কাকে এনেছিস?”

    “তার মানে?”

    “এ-তো ভূতনাথ সমাজপতি!”

    “তাতে কী হল?”

    “লম্বোদর সমাজপতির ছেলে হল বৃকোদর, তস্য পুত্র দামোদর, তস্য পুত্র শিবচন্দ্র, এ হল শিবচন্দ্রের ছেলে ভূতনাথ সমাজপতি। লম্বোদরের বংশধর।”

    জনার্দন মাথা চুলকোতে-চুলকোতে বলল, “তা হলে তো বড্ড গণ্ডগোল হয়ে গেছে! জুতমতো পেয়ে ধরে এনেছিলাম।”

    “ছিঃ ছিঃ! এরকম ভুল হবেই বা কেন? আমরা তো গন্ধেই বুঝতে পারি কে কোন্ বংশের।”

    “মাপ চাইছি। তা হলে এটাকে কী করি?”

    “জায়গামতো পৌঁছে দিয়ে আয়।”

    জনার্দন ফের তাকে শূন্যে তুলে নিয়ে চলল বটে, কিন্তু লম্বোদরের সিংহাসনটা ততক্ষণে ভাল করেই দেখে নিয়েছে ভুতো। সিংহাসনটা আসলে একটা লাল হেলমেট।

    .

    ভুবন রায় আজ নিজেই ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে এসেছেন। অনেকদিন নানা গণ্ডগোলে কিছুই আবিষ্কার করতে পারেননি। আজ কিছু আবিষ্কার না করলেই নয়।

    অনেকদিন আগে তিনি রথের মেলায় ‘আঁটুলের গুপ্তবিদ্যা’ নামে একখানা বই কিনেছিলেন। তাতে অদ্ভুত-অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা করার কৌশল ছিল। একটা ছিল ‘পাখির মতো উড়িবার কৌশল’, ছেলেবেলায় সেই কৌশল আয়ত্ত করার অনেক চেষ্টা তিনি করেছেন। তবে সফল হয়নি।

    আজ অনেকদিন বাদে তার কৌশলটা নিয়ে একটু মাথা ঘামানোর ইচ্ছে হল। ল্যাবরেটরিতে বসে তিনি রামলালকে ডেকে পাঠালেন।

    “হ্যাঁ হে রামলাল, তোমার কাছে এয়ারোডাইনামিক্সের বই আছে?”

    “আজ্ঞে আছে। আপনিই কিনিয়েছিলেন। এনে দেব?”

    “না বাপু, ওসব খটোমটো বই পড়ে আমি কিছু বুঝতে পারি না। মোদ্দা কথায় ব্যাপারটা আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও।”

    রামলাল ঘাড় চুলকে বললেন, “মোদ্দা কথায় এয়ারোডাইনামিক্স বোঝানো খুব শক্ত। অঙ্ক-টঙ্কেরও ব্যাপার আছে।”

    “অঙ্ক!” বলে ভুবন রায় চোখ কপালে তুললেন। তারপর তিক্ত গলায় বললেন, “তোমাদের বৈজ্ঞানিকগুলোও হয়েছে বড় হামবাগ। সহজ সরল জিনিসকে এমন পেঁচিয়ে দেখাবে। যাহোক, তুমি যা জানো তাই বলো। এমনভাবে বলো যাতে বুঝতে পারি।”

    রামলাল একটু ভয় খেয়ে বললেন, “ওটা যে আমার সাবজেক্ট নয়। বইটা আপনাকে পড়ে শোনাতে পারি।”

    “আহা, ওড়ার তো একটা কৌশল আছে। সেটা কী? এই যে হাজার-হাজার পাখি আকাশে উড়ছে, চিল শকুন কাক, এরা কি সব অঙ্ক-টঙ্ক শিখে নিয়ে আকাশে উড়ছে?নাকি এরা এয়ারোডাইনামিক্সের কোনও খবর রাখে!বিশুদ্ধবিজ্ঞানের মধ্যে ওই অঙ্কের ভজঘট্ট ঢুকিয়ে তোমরা একেবারে বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড করে রেখেছ।”

    রামলাল ঘনঘন মাথা চুলকে বললেন, “আপনি কী আবিষ্কার করতে চাইছেন তা জানলে না-হয় একটু ভেবে দেখতাম।”

    “আরে অতি সামান্য ব্যাপার। ধরো, বিকেলের দিকে আমি একটু আমার বন্ধু সত্যশঙ্করের বাড়ি যাব। তা রোজই তো হেঁটে যাই। এক-একদিন একটু উড়ে উড়ে গেলাম। গায়ে হাওয়াও লাগল, চারদিকটা দেখাও হল, বুঝলে না?”

    “যে আজ্ঞে।”

    “কাজটা খুব শক্ত মনে হচ্ছে কি?”

    “তা শক্তই হবে বোধহয়।”

    ভুবন রায় কঠোর গলায় বললেন, “তোমাকে তো আর এরোপ্লেন বা হেলিকপ্টার বানাতে বলিনি হে বাপু! শক্ত আবার কী? আঁটুলের গুপ্তবিদ্যায় এসব অনেক কৌশল ছিল। ছেলেবেলায় পড়েছিলুম। এখন আর মনে নেই।”

    “সেবই আমি পড়িনি।”

    “পৃথিবীতে ভাল জিনিস কিছুই টিকে থাকে না। সেসব বই কি আর পাওয়া যাবে? যাকগে, যা বলেছিলাম। ওড়ার ব্যাপারটার কী হবে?”

    “ভেবে দেখি।”

    “আমিও চেষ্টা করছি। তুমিও বেশ করে ভেবে দ্যাখো। এমন কিছু বের করতে হবে, যা নিতান্তই হালকা, পকেটে নেওয়া যায়। দিব্যি ভেসে থাকা যায়।”

    “যে আজ্ঞে।” ||||||||||

    “বেশি দেরি কোরো না। আমি কালকের মধ্যেই জিনিসটা আবিষ্কার করে ফেলতে চাই। শুভস্য শীঘ্রম। যন্ত্রটা আবিষ্কার করে ফেলতে পারলে বাজারহাট করারও বেজায় সুবিধে হয়ে যাবে। বাজারের রাস্তাটা খুঁড়ে মেরামত করছে বলে যাতায়াতের বেশ অসুবিধে।”

    “যে আজ্ঞে।”

    “তুমিও কোনও-কোনওদিন ওটায় করে কলেজে যেতে পারবে।”

    “যে আজ্ঞে।”

    “ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে আর কষ্ট পাবে না। কী বলো?”

    “যে আজ্ঞে।”

    “আর মাকেও গঙ্গাস্নান করিয়ে আনা যাবে।”

    “সে তো বটেই।”

    “আর ধরো, নীচে পরিষ্কার বাতাসের অভাব হলে ওপরে উঠে কিছুক্ষণ বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করে আসা যাবে।”

    “ঠিকই তো।”

    “ধরো, আকাশে একটা এরোপ্লেন উড়ে দিল্লি যাচ্ছে। আমার হয়তো দিল্লিতে মাসির বাড়িতে একটা খবর পাঠানো দরকার। আমি চট করে উড়ে গিয়ে পাইলটকে খবরটা দিয়ে দিলুম, সে পৌঁছে খবরটা পাঠিয়ে দেবে। এতে ভাল হবে না?”

    “খুবই ভাল হবে।”

    “তারপর ধরো, এর জন্য যদি ওরা নোবেল প্রাইজটা নেহাত দিতেই চায়, তা হলে সেটা প্রত্যাখ্যান করার কোনও মানেই হয় না। বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য আমাদের যথেষ্ট টাকার দরকার।” ||||||||||

    “সে তো বটেই।”

    “নোবেল পেলে নামটামও একটু ছড়ায়।”

    “যে আজ্ঞে। নোবেল খুব ভাল জিনিস।”

    “কাজেই আর দেরি কোরো না। অঙ্ক-টঙ্ক যদি কিছু কষতেই হয় সে তুমি কষে ফেলোগে। আমাকে শুধু মোদ্দা কথাটা জানালেই হবে।”

    “আজ্ঞে তাই ভাল।”

    রামলাল চলে যাওয়ার পর ভুবন রায় কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন। তারপর হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা আইডিয়া এসে গেল। পরিদের কথা তাঁর তো এতক্ষণ মাথাতেই আসেনি। পরিরাও মানুষের মতোই হয় বলে তিনি শুনেছেন।

    “রামলাল! রামলাল!”

    কিছুক্ষণ পর খবর পেয়ে রামলাল হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন।

    ‘আজ্ঞে?”

    “আচ্ছা পরিদের ডানা কী দিয়ে তৈরি বলো তো?”

    “পরি! আজ্ঞে পরিদের কথা তো জানি না।”

    “জানো না! জানো না মানে! এসব কি শেখানো হয় না নাকি?”

    “বিজ্ঞানে পরিদের কোনও স্থান নেই।”

    “অ। আচ্ছা ফড়িংকে কি তোমরা বিজ্ঞানে স্থান দাও?”

    “আজ্ঞে তা দিই। এন্টেমোলজিতে ফড়িং গুরুত্বই পায়।”

    “আমার মনে হয় ফড়িং এবং পরির ডানা একই মেটেরিয়ালে তৈরি।”

    “তা হতেই পারে।”

    “ভাল করে খোঁজ নাও। ফড়িংয়ের ডানা কী দিয়ে তৈরি সেটাও দেখতে হবে।”

    “যে আজ্ঞে।”

    “তবে তোমাকে এও বলে রাখি, ডানা-টানা আমার পছন্দ নয়। ডানার অনেক ঝাট। সেটা ক্রমান্বয়ে নাড়তে হয়। আমি আরও সিম্পল জিনিস চাই। ধরো, দেশলাইয়ের বাক্সের মতো। বুঝেছ?”

    “খুব বুঝেছি।”

    “তাতে সুবিধে বেশি। তাই না?”

    “আমিও সেই কথাই বলি।”

    “কোন কথা?”

    ‘ডানার চেয়ে দেশলাই ঢের ভাল। ঝামেলা কম।”

    “হ্যাঁ। কথাটা মাথায় রেখে কাজ করো।”

    “যে আজ্ঞে।”

    রামলাল চলে যাওয়ার পর চঞ্চলমতি ভুবন রায় স্থির থাকতে পারলেন না। নানারকম জিনিসপত্র নিয়ে উড়ান-যন্ত্র তৈরি করতে বসে গেলেন। কাজে সাঙ্ঘাতিক মগ্ন।

    ঘণ্টা-দুয়েক বাদে তিনি একটা বাক্সের মতো জিনিস বানিয়েও ফেললেন। ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে আপনমনেই বললেন, “এটা দিয়ে কি সত্যিই ওড়া যাবে?”

    কে যেন কানের কাছে বলে উঠল, “যাবে।”

    “কে?”

    “আজ্ঞে আমি দৈববাণী।”

    দৈববাণী? বিজ্ঞানে কি দৈববাণীর কোনও স্থান আছে? ভুবন রায় ভ্রূ কুঁচকে ভাবলেন, তারপর তাঁর মনে হল, না হবেই বা কেন? ঈশ্বর তাঁকে অনন্ত ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছেন। তাঁর ভিতর দয়েই হয়তো ঈশ্বরের কোনও ইচ্ছা পূর্ণ হবে।

    তিনি গলাখাঁকারি দিয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন, “তা হ্যাঁ হে দৈববাণী, তুমি এখনও ধারেকাছে আছ নাকি?”

    “বিলক্ষণ।”

    “তা ইয়ে ভগবানের কাছে গিয়ে ব্যাপারটা তা হলে বোলো।” তা তো বলবই। ভগবানও জানেন কিনা, তিনিই পাঠালেন।”

    ভুবন রায় দু’হাতআনন্দের সঙ্গে ঘষে নিয়ে বললেন, “বাঃ, চমৎকার। এতদিনে তা হলে নোবেলটাও পাওয়া যাবে, তা হ্যাঁ দৈববাণী, একটা কথা বলবে?”

    “নিশ্চয়।” তা ওখানে আইনস্টাইন বা নিউটনের সঙ্গে দেখা হয়? “রোজ দু’বেলা হচ্ছে মশাই।”

    “তা তাঁরা সব আমাকে নিয়ে আলোচনা করেন নাকি?”

    “খুব করেন। রীতিমত ভাবনায় পড়েছেন সবাই।”

    “কীরকম?”

    “আপনি যা কাণ্ড করছেন, তাতে তো তাঁদের নাম দুনিয়া থেকে মুছে যাওয়ার দাখিল হয়েছে। কারও আর চোখে ঘুম নেই, খাওয়া কমে গেছে।”

    “বটে!”

    “তবে হ্যাঁ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আর জগদীশচন্দ্র বসু খুব খুশি। আপনি বাঙালি হয়ে যেভাবে সাহেবদের টেক্কা দিলেন তার তুলনাই হয় না।”

    “হেঃ হেঃ, এ আর এমন কী, সাহেবরাও এতদিন কম কিছু করেনি।”

    “তা করলেও আপনার কাজে লাগে না।”

    “তা বটে, আমার ধাতটা একটু অন্যরকম কিনা। এই তো রামলাল আমাকে অঙ্ক দিয়ে ভয় দেখাচ্ছিল, দিয়েছি ধমকে।”

    “রামোঃ, অঙ্ক আবার একটা জিনিস নাকি?”

    “আমার তো অঙ্কের দরকারই হল না। কেমন ওড়ার যন্ত্র বানিয়ে ফেললুম।”

    “সেকথাই তো আমরা স্বর্গে আলাপ-আলোচনা করি।”

    “বটে! বটে! তা কী কথা হয়?

    “ভগবান নিজেই আপনার কথা তুলে মাঝে-মাঝে বলেন, হ্যাঁ, মানুষের মতো একখানা মানুষ বটে ভুবন রায়। যেমন রোখ, তেমনি ঝোঁক! ওরকম আর-একখানা মানুষ বানাতে পারলে বড় আনন্দ পেতাম। কিন্তু ছাঁচ ভেঙে ফেলেছি, আর তো হওয়ার নয়।”

    “ছাঁচটা আবার কী?”

    “প্রত্যেকটা মানুষের জন্য আলাদা-আলাদা ছাঁচ থাকে তো? যেই একটা তৈরি হয় অমনি ছাঁচ ভেঙে দেওয়াই নিয়ম। তাই একটার মতো আর-একটা হয় না কি না।”

    ভুবন রায় খুব হাসলেন, বললেন, “তা বটে, আচ্ছা ওরা কি এর জন্য নোবেলটা আমাকেই দেবে?”

    ‘না দিয়ে যাবে কোথায়? একবার নয়, নোবেল আপনার বার-চারেক পাওয়া উচিত।”

    ভুবন রায় চোখ কপালে তুলে বললেন, “বলো কী হে দৈববাণী! নোবেল চারবার! সে যে অনেক টাকা?”

    “তা বলতে পারেন দু’কোটির কিছু ওপরেই হবে।”

    “দু’কোটি!” বলে ভুবন রায় মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়লেন।

    “ঘাবড়াচ্ছেন কেন? দু’কোটি তো নস্যি। এ জিনিস বিক্রি করলে তো আরও কত কোটি আসবে গুনে শেষ করতে পারবেন না।”

    উঃ, এ যে ভাবা যায় না। মাত্র কয়েক ঘণ্টার কাজে এত?”

    “ভগবান যাকে দেন ছল্পর ছুঁড়ে দেন।”

    “তাই দেখছি।”

    “তারপর খ্যাতির কথাটাও ধরুন। পৃথিবীতে সবাই এক ডাকে ভুবন রায়কে চিনে যাবে।”

    “তা তো বটেই।”

    “সেটারও তো দাম হয় না।”

    “খ্যাতি তো আছেই। তবে খ্যাতির বিড়ম্বনাও কম নয়।”

    “তা ঠিক। খাত্যি বলেই দুনিয়ার সব দেশ ডাকাডাকি করবে। আজ আমেরিকা, কাল রাশিয়া, পরশু চীন। খুব ছোটাছুটি পড়ে যাবে।”

    ভুবন রায় উজ্জ্বল হয়ে বলেন,”তা নাকি?”

    “নাকি মানে? ডাক এল বলে।”

    “তা হলে এখন কি একটু চড়ে দেখব?”

    “এখন কী দরকার? দৈববাণী তো বলছে যন্ত্রটা তৈরি হয়ে গেছে। বাইরে এখন বেশ অন্ধকার। এ সময়ে ওড়াউড়ি করতে গেলে বাদুড় বা প্যাঁচার সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে। বাদুড়ের আবার ধারালো নখ আছে।”

    “ও বাবা, তা হলে থাক।”

    “ইয়ে একটা কথা ছিল।”

    “কী কথা?”

    “এত বড় একটা কাজ করলেন, ভগবানকে কিছু দেবেন-টেবেন না?”

    “ভগবান কিছু চান নাকি?”

    “না, না, ওসব চাওয়া-টাওয়া তাঁর ধাতে নেই। তবে কিনা দেওয়াটাই দস্তুর।”

    “তা দেব না কেন। সোয়া পাঁচ আনা বা পাঁচ সিকে দিলেই তো হয়।”

    “এটা একটা কথা হল?”

    “কেন আমরা তো ওই রেটেই পুজো দিই।”

    “সে আপনার অর্ডিনারি পুজো। চার-চারটে নোবেল পেলে কি আর পাঁচ সিকেতে হয়! নোবেলের পিছনে ভগবানের খাটুনিটার কথাও ভাবনু। কত সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচের ছাঁচ বানাতে হয়েছিল।”

    তা হলে পাঁচ টাকাই দেব না হয়।”

    “ছিঃ ছিঃ, নজরটা একটু উঁচু করুন ভুবনবাবু। আপনার উচিত পাঁচ লাখ দেওয়া। আমরা না হয় আপনার সম্মানে কিছু কমিয়ে দিচ্ছি। পাঁচ হাজার।”

    ভুবন রায় আবার মাথায় হাত দিলেন, “পাঁচ হাজার?”

    “ওর কমে আজকালকার বাজারে কি চারটে নোবেল পাওয়া যায়! পাঁচজনকে জিজ্ঞেস করে দেখুন না!”

    “না হে দৈববাণী, তোমার রেটটা বড্ড বেশি।”

    “আমি নিমিত্ত মাত্র। ভগবানেরই ভোগে লাগবে। স্বর্গেও এখন জিনিসের দাম বেশ চড়া।”

    “আচ্ছা, পঞ্চাশটা টাকা কাল সকালে থোক পুরুতমশাইকে দেব’খন, পুজো দিয়ে দেবে।”

    “কী যে বলেন, পুরুত দিয়ে পুজো করাবেন কোন দুঃখে! ওসব মারফতি কারবার আর কেন? টাকাটা ফেলে দিন, আমরা টুক করে নিয়ে স্বর্গে একেবারে ভগবানের শ্রীচরণে ফেলে দিয়ে আসব। তিনি খুশিও হবেন। তবে পঞ্চাশ নয়।”

    “কত?

    ‘চার হাজার নশো নিরানব্বই। এক টাকা ছেড়ে দিচ্ছি।”

    “ও আমি পারব না।”

    “পুরো সাড়ে চার হাজারই দিন তবে। মেলা কমে গেল। জলের দরে নোবেল।”

    ভুবন রায় পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা গুনে বললেন, “না হে, হচ্ছে না।”

    “কত আছে?”

    “পাঁচশো টাকার মতো।”

    “এখন ওটাই আগাম দিন। বাকিটা কাল নেব।”

    “কোথায় রাখব।”

    “টেবিলে ওই উড়ানযন্ত্রের পাশে রেখে একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়ান, মিনিটখানেক।” ভুবন রায় তাই করলেন। এক মিনিট বাদে ঘরে ঢুকে দেখলেন, টাকাটা নেই। যন্ত্রটা হাতে তুলে নিয়ে তিনি বিকটস্বরে চেঁচাতে লাগলেন, ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’

    .

    ভুতোকে শূন্যে ঝুলিয়ে এনে তার ঘরের দরজায় ঝপাস করে ফেলে জনার্দন বলল, “এ যাত্রা খুব বেঁচে গেলি যাহোক।”

    ভুতো চির্চি করে বলল, “জনার্দনদা, একটা কথা ছিল।”

    “আবার কী কথা?”

    “লয়োদর আমার একটা বংশপরিচয় দিচ্ছিল।”

    “তার জন্যই তো বেঁচে গেলি।”

    “কিন্তু আমার বংশপরিচয়টা এমন কী যে তোমরা খাতির করলে!”

    “তা আমি জানি না, লম্বোদর জানে।”

    “আমি কি লম্বোদরেরই বংশধর?”

    “তাই তো মনে হল।”

    “সেই লম্বোদর আর এই লম্বোদর কি এক?”

    “ওসব বড় গোলমেলে কথা। মারপ্যাঁচের ব্যাপার। কিন্তু তোর অত খতেনে কাজ কী? গদানটা যে বাঁচাতে পেরেছিস সেই ঢের।”

    “তা বটে। তবে আমি যদি লম্বোদরের বংশধর হয়ে থাকি তা হলে কিন্তু আমাকে তোমার একটু খাতিরটাতির করা উচিত।”

    জনার্দন একটু বিপন্ন গলায় বলল, “আবার খাতির চাইছিস! কেন, খাতিরটা কম কী করা হল শুনি!”

    “তুমি মোটেই আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করোনি। কেবল ধমকেধামকে কথা বলছ। কিছু জিজ্ঞেস করলে কাটা কাটা জবাব দিচ্ছ। তোমার ব্যবহার মোটেই ভাল লোকের মতো নয়।”

    “তা না-ই বা হল। লম্বোদরের বংশধর হয়ে কি মাথাটা কিনে নিয়েছিস নাকি?”

    “তা আমি জানি না, লম্বোদরের সঙ্গে তো আর আমার তেমন সাক্ষাৎ-পরিচয় নেই। সে কেমন লোক তাও জানি না, তবে লম্বোদর যদি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে তা হলে বলে দেব যে, তুমি আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছ।”

    “কখন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলুম? মহা পাজি ছেলে তো।”

    “করোনি! এই যে সাত হাত ওপর থেকে দমাস করে ফেলে দিলে, আমার কোমরে কীরকম লেগেছে জানো?”

    “আহা, ওরকম একটু-আধটু লেগেই থাকে। দাঁড়া, মালিশ করে দিচ্ছি।” মালিশের দরকার নেই। তবে শোধ তুলতে আমিও ছাড়ব না। সাত বছরের মেছো জালে গাবের আঠা আর লোহার গুড়ো মাখিয়ে যখন ভূত ধরব, তখন দ্যাখাব মজা।”

    “সর্বনাশ! তুই তখন বড় বললি যে, শুনতে পাসনি!”

    “তা ওরকম একটু-আধটু বলতে হয়।”

    “তুই মহা নচ্ছার দেখছি। তা ভাই; কী চাস বল তো?”

    “যা চাই দেবে?”

    ‘ভূতের সাধ্যে যা কুলোয় দেব।কিন্তু আমরা যে সব পারি তা কিন্তু নয়। অনেক কিছুই আমরা পারি না।”

    “আমাদের ল্যাবরেটরিতে কয়েকদিন আগে এবাড়ির একটা ছেলে কয়েকটা কেমিক্যাল মিশিয়ে একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। সেই কেমিক্যালগুলো কী তা বের করতে পারবে?”

    “ও বাবা, সে যে বিজ্ঞানের ব্যাপার?”

    “বিজ্ঞান কি কিছুই জানো না?”

    “না রে বাপু। বিজ্ঞানের সঙ্গে আমাদের ঘোর শত্রুতা, সবাই বলে, বিজ্ঞানের বাড়বাড়ন্ত হলে ভূতে মন্দা দেখা দেয়।”

    “তা হলে উপায়টা কী! ফরমুলাটা যে আমাদের দরকার।”

    “কিন্তু আমাদের যে বিজ্ঞানের ধারে কাছে যাওয়া বারণ। লম্বোদরের কড়া হুকুম আছে।”

    “লম্বোদর কিছু জানতে পারবে না। দুলাল সেন ভারী নিরীহ মানুষ ছিলেন। কিন্তু ওই বিস্ফোরণের ধোঁয়া নাকে যাওয়ার পরই তিনি ভীষণ গুণ্ডা আর ডাকাত হয়ে উঠেছেন। যদি তাঁকে আবার আগেকার মতো মানুষ করতে হয় তা হলে আমাদের ফরমুলাটা জানা দরকার।”

    “বটে! দুলাল সেন মানে সেই বজ্জাত লোকটা তো।”

    “হ্যাঁ, যিনি ভূতের ব্যবসা করতে চাইছেন।”

    “তা হলে তো ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে।”

    জনার্দন চোখের পলকে ল্যাবরেটরিতে এসে হাজির হয়ে গেল। হাজির হয়ে যা দেখল, না দেখলে তার প্রত্যয় হতনা। দেখল, ভুবন রায় একটা চেয়ারে বসেনানা কথা বলছেন আর দুটো লোক আলমারির পিছনে ঘাপটি মেরে থেকে সেইসব কথার জবাব দিয়ে যাচ্ছে। মেদ্দা কথাটা হল, ভুবন রায় একটা আকাশে ওড়ার যন্ত্র বের করেছেন বলে খুব তড়পাচ্ছেন, আর তোক দুটো দৈববাণী করে খুব সায় দিয়ে যাচ্ছে। লোক দুটোকে চিনতে মোটেই কষ্ট হল না জনার্দনের। একজন দুলাল সেন, অন্যজন পাঁচু মোদক। কথাবার্তা দুলাল সেনই চালাচ্ছেন। কায়দাটাও বেশ ভালই। ভুবন রায় মাথা-পাগলা লোক, তাঁকে টুপি পরানো শক্ত নয়।

    জনার্দন রাগে দাঁত কিড়মিড় করার চেষ্টা করল। তবে দাঁত নেই বলে কিড়মিড়টা তেমন জমল না, দুলাল সেন আর পাঁচু মোদক যে মহা ধূর্ত লোক তাতে সন্দেহ নেই। এই দু’জনের জন্যই আজ দুনিয়ার যত ভূতের চোখে ঘুম নেই। খাওয়া অর্ধেক হয়ে গেছে। এরা যে যথেষ্ট এলেম রাখে তা জনার্দনও স্বচক্ষেই দেখল।

    উড়ান-যন্ত্রটা যে কোনও কর্মের নয় তা জনার্দন হাড়ে-হাড়ে জানে। তবে তার মাথাতেও দুষ্টবুদ্ধি কিছু কম খেলে না। সে সুড়ক করে দেশলাইয়ের বাক্সের মতো যন্ত্রটার মধ্যে ঢুকে ঘাপটি মেরে রইল।

    ওদিকে ইউরেকা, ইউরেকা’ বলে চেঁচাতে-চেঁচাতে ভুবন রায় বাইরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুলাল সেন আর পাঁচু মোদক হাসতে হাসতে আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।

    পাঁচু বলল, “দুলালবাবু, আমার ওস্তাদ কালী তপাদার বলতেন, ‘ওরে দুনিয়াময় চুরি অনেকেই করে, কিন্তু সত্যিকারের জাত-চোর ক’জন? ক’জন সত্যিকারের ওস্তাদ? ক’জন সত্যিকারের শিল্পী?’ তা বলতে নেই দুলালবাবু, কালী তপাদারের চেলা হয়ে আমরা এতকাল যা করে বেড়িয়েছি তা নিছক ধ্যাষ্টামো, আপনি হলেন জাত-শিল্পী, আহা, কী বুদ্ধি, কি সাহস, কী বুকের পাটা!”

    দুলাল সেন বুকটা একটু চিতিয়ে বললেন, “তা বলতে পারো, তবে কিনা এ হল কলির সন্ধে, এখনই কী দেখছ! এরপর আরও কত হবে।”

    পাঁচু একটু গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, “আপনার সবই ভাল দুলালবাবু, কিন্তু দোষের মধ্যে ওই খইটা, আপনি অল্পে খুশি নন, কেবল আরও চান, আরও চান। একসঙ্গে অত চাইতে নেই, আমার ওস্তাদ কালী তপাদার বলতেন, ‘ওরে থামতে জানতে হয়। থামতে না জানলে অতি বড়রও পতন অনিবার্য।’ আপনি ওই থামাটাই শেখেননি।”

    “আহা, চটো কেন পাঁচু? বাচ্চাদের যখন প্রথম দাঁত ওঠে তখন তারা সবকিছুই কামড়াতে চায়। আমারও সেই দশা। চুরি করতে নেমে এমন নেশায় পেয়ে বসেছে যে, আর থামতে ইচ্ছে করছে না। তবে ক্রমে ক্রমে ধাত আসবে। থামতেও শিখব, তা হলে এবার কী করা যায় বলো তো!”

    “এখন আর নতুন কাজে হাত দেবেন না, রাত পুইয়ে এল, এবার একটু ঘুমিয়ে নেওয়া দরকার। কাল রাতেও তো আবার কাজে নামতে হবে।”

    “তা বটে, তবে ঘুমোতে আমার তেমন ইচ্ছে করছে না।”

    “তা বললে হবে কেন? আপনার শরীরে এখন হাতির বল, কিন্তু আমি বুড়ো মানুষ, আমার অত সয় না।”

    “তা হলে এক কাজ করো, ওইপাশে আমার পুরনো বিছানাটা আছে, সটান গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমি একটু যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করি। ভুবনবাবু এই ল্যাবরেটরির জন্যই আমাকে আনিয়েছিলেন, মনে পড়ছে।”

    “এখানে পোব কী? ধরে ফেলবে যে!”

    “আমি আছি, চিন্তা নেই।”

    “কাজটা বিপজ্জনক হবে মশাই।”

    “আরে আমাদের বিপদে ফেলবে তেমন মানুষ জন্মায়নি, তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমোও, আমি সব সামলাব।”

    পাঁচু অগত্যা হাই তুলতে তুলতে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। দুলালবাবু ভুবন রায়ের বানানো উড়ান-যন্ত্রটা হাতে নিয়ে একটু হেসে আপনমনে বললেন, “এঃ, উড়ান-যন্তর বানিয়েছে! নোবেল পাবে।”

    ভুবন রায় যখন আনন্দে উদ্বাহু হয়ে ‘ইউরেকা, ইউরেকা,’ বলে চেঁচাচ্ছেন তখন চেঁচানির চোটে লোকজন দৌড়ে আসছে। কালী তপাদারের চেলা পাঁচু বিপদের গন্ধ পাঁচ মাইল দূর থেকে পায়। সে লাফিয়ে উঠে দুলালবাবুর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলল, “কর্তা, এবার পালান।”

    “আহা, হলটা কী? এখন তো কলির সন্ধে।”

    “বিপদ। যে বিপদের গন্ধ না পায় সে চোর হওয়ার যোগ্যই নয়।”

    দু’জনে একটা জানলা গলে বাইরে এলেন। পাঁচু বলে, “এবারটা ক্ষ্যামা দিন দুলালকা, হরেনের দোকান থেকে লুঠ করা সব জিনিস তো ফেলেই চলে আসতে হল, শুধু যদি বেশি লোভ না করতেন তা হলেই সোনাদানায় মিলিয়ে আমরা একক্ষণে লাখ টাকার মালিক হতুম। এখন যদি আর বেশি লোভ করেন তা হলে এই পাঁচশোও যাবে।”

    দুলাল সেন চাপা গলায় ধমক দিয়ে বললেন, “নজরটা একটু উঁচু করতে শেখো তো! পাঁচশোতে কেন খুশি হতে যাব! লোকটা তো পাঁচ হাজার কবুল করেছে!”

    “পাঁচ হাজার নয়, সাড়ে চার হাজার। আপনিই তোদর কমিয়ে দিলেন।”

    “ওই হল। আরও চার হাজার আদায় না করে ছাড়ছি না।”

    পাঁচু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “আপনি চার হাজার আশা করে বসে থাকুন তবে। কাল সকালে যখন যন্তর নিয়ে উড়তে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে তখন বুঝবেন।”

    ‘আহা, তখন আর কোনও ফন্দি বের করা যাবে মাথা থেকে! এখন আমার মাথায় যে কত ফন্দি-ফিকির খেলছে সে আর তোমাকে কী বলব! মাথা-ভর্তি শুধু নানারকম ফন্দি-ফিকির। কী করে যে মাথাটা এত খুলে গেল, কিছু বুঝতে পারছি না। তবে এতদিনে মাথাটা বেশ কাজ করতে লেগেছে।”

    পাঁচু আর-একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আহা, আপনার মাথাটা যদি আর একটু কম কাজ করত তা হলে আজ রাতেই আমরা রাজা হয়ে যেতুম।”

    “রাজা হতে আর কীই বা পরিশ্রম! রাজা তিন দিনে বানিয়ে দেব। রোসো, মজাটা আগে দেখি। তোমার দোষ কী জানো?”

    পাঁচু মাথা নেড়ে দুঃখের সঙ্গে বলে, “গুনে দেখিনি, তবে দোষ মেলাই থাকবার কথা। আমার মতো লোক তো দোষে-গুণেই মানুষ। তা দোষটা কী দেখলেন?”

    দুলালবাবু বললেন, “তুমি কাজের মধ্যে কেবল লাভ খোঁজো মজাটা খোঁজো। এসব কাজে লাভ যেমন, মজাও তেমনই। বরং মজাটাই বেশি।”

    “যে আজ্ঞে। তা এক কাজ করলে হয় না? এ কারবারে মজাটা আপনি নিন, টাকাটা আমি। একেবারে ন্যায্য ভাগাভাগি।”

    দুলালবাবু একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, “সেটা ভাল দেখাবে না। মজা জিনিসটা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। সব সময়ে টাকা-টাকা করলে মজাটা মাটি হয়। তোমাকে আমি মজা থেকে বঞ্চিত করতে চাই না।”

    পাঁচু আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “যে আজ্ঞে।”

    দুলালবাবু অত্যন্ত গম্ভীর মুখ করে বললেন, “এমনকী, এই পাঁচশো টাকাও আমি নিতে চাই না। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ। এসব ছোটখাটো কাজ করতে আজকাল আমার ঘেন্না হয়।”

    এই বলে বিস্মিত পাঁচু মোদকের চোখের সামনেই টাকার তাড়াটা ফের ল্যাবরেটরির মধ্যে জানলা গলিয়ে ছুঁড়ে দিলেন দুলালবাবু। পাঁচু হাঁ-হাঁ করে উঠেছিল, দুলালবাবু তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে বললেন, “মজাটার কথা ভাবো। মজাই যদি না পেলে তা হলে টাকা কোন ভুতের বাপের শ্রাদ্ধে লাগাবে?”

    “পাঁচশো টাকায় যে গন্ধমাদন হয়ে যেত মশাই।”

    “গন্ধমাদন তো কিছুই নয়। টাকার বান ডাকিয়ে দেব। চলো।” পাঁচু গোপনে চোখের কোলটা মুছে নিয়ে বলল, “যে আজ্ঞে।”

    জনার্দন উড়ান-যন্ত্রে মধ্যে ঢুকে বেশ একটু ঘুমিয়ে নিল। তবে ভুতের ঘুম মানুষের ঘুমের মতো তো নয়। চারদিকে যা-যা ঘটছে, তা সব তার মগজে একেবারে ভিডিও রেকর্ডিং-এর মতো উঠে যেতে লাগল। গাড়ল ভুবনবাবু চেঁচিয়ে লোক জড়ো করছেন, সেই ফাঁকে জাঁহাবাজ দুলাল সেন আর ফচকে পাঁচু হাওয়া হল। সে ফস করে বাক্স থেকে বেরিয়ে দুলালবাবু আর পাঁচু মোদকের গতিবিধিও লক্ষ করে নিল। খুব নিশ্চিন্তে, দুলকিচালে দু’জনে অন্ধকারের মধ্যে হেঁটে পোড় বাড়ির দিকেই যাচ্ছে। ভূতের সমাজ এদের ভয়েই আজকাল সিঁটিয়ে আছে। এরা ভুত ধরার ব্যবসা করতে চায়। যা এলেম দু’জনের দেখা গেল, তাতে কাজটা

    অসম্ভব বলেও মনে হল না জনার্দনের।

    জনার্দন ফের ফিরে এসে যন্ত্রের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

    জাঁহাবাজ দুলাল আর ফচকে পাঁচু যদিও লোকটাকে বোকা বানানোর তাল করছে, কিন্তু এই সুযোগে ওদেরই বোকা বানানো যাক। ভুবনবাবুকে সে উড়িয়ে আসবে।

    ওদিকে ভুবনবাবুর চেঁচামেচিতে রামলাল, নন্দলাল, শ্যামলাল সবাই ছুটে এসেছেন। তাঁর নাতি-নাতনিরাও এসে গেছে।

    ভুবনবাবু বিশ্বজয়ীর হাসি হেসে বললেন, “ইউরেকা!”

    রামলাল এগিয়ে এসে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু বানালেন নাকি?”

    “বানালুম মানে! পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বললে কম বলা হয়। ওদিকে শুনলুম, নিউটন আর আইনস্টাইনেরও টনক নড়ে গেছে। স্বয়ং ভগবান অবশ্য খুব খুশি।”

    কেউ ব্যাপারটা ধরতে না পেরে পরস্পর মুখ-তাকাতাকি করছিল।

    ভুবনবাবু সহাস্যে বললেন, “কাজটা যে-ই শেষ করেছি অমনি দৈববাণী।”

    রামলাল প্রতিধ্বনি করলেন, “দৈববাণী? বলেন কী?”

    “আর বলো কেন, একেবারে খাঁটি দৈববাণী। বললে, একবার নয়, চার পাঁচবার নাকি আমি নোবেল পাব।”

    রামলাল মাথা চুলকে বললেন, “ঠিক আছে। আপনি বরং খেয়েদেয়ে একটু ঘুমোন, অনেক খাটুনি গেছে তো।”

    ভুবন রায় ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “এত বড় একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার করে ফেললুম, অথচ সেটাকে গুরুত্ব না দিয়ে তুমি আমার খাওয়া আর ঘুম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে কেন বলো তো!”

    রামলাল সভয়ে বললেন, “আজ্ঞে, বলছিলুম, খুব ধকল গেছে তো।”

    ভুবন রায় হিমশীতল গলায় বললেন, “তার মানে তোমার ব্যাপারটা বিশ্বাস হচ্ছে না! এই তো?”

    রামলাল জিব কেটে বললেন, “কী যে বলেন! আপনার আরও সব অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারের কথা কে না জানে!”

    “দৈববাণীর কথাটাও তোমার বিশ্বাস হয়নি মনে হচ্ছে।”

    রামলাল সবেগে মাথা নেড়ে বললেন, “দৈববাণীকে বিশ্বাস না করার কিছুই নেই। দৈববাণী হতেই পারে। হয়ও।”

    “তুমি শুনেছ কখনও?”

    “আজ্ঞে না। তবে কি আমি যুগান্তকারী কোনও আবিষ্কারও তো করিনি!”

    ভুবন রায় চারদিকে তাকিয়ে সকলের মুখ দেখলেন। মুখে যা দেখলেন তাতে খুশি হলেন না। তাঁর মনে হল, এরা কেউ তাঁর কথায় ঠিকমতো বিশ্বাস করতে পারছে না। খুঁতখুঁত করছে।

    ভুবন রায়, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বড় বড় বিজ্ঞানীদের অনেক মেহনত করে লোককে বিজ্ঞান বিশ্বাস করাতে হয়েছিল। আমার কপালেও সেই কষ্টই আছে। বহোত আচ্ছা, বাদুড়ের নখ, প্যাঁচার অ্যাটাক সব উপেক্ষা করে এই রাতেই আমি আকাশে উড়ে তোমাদের দেখাচ্ছি।”

    এই বলে কেউ বাধা দেওয়ার আগেই ভুবন রায় দৌড়ে তাঁর ল্যাবরেটরিতে ঢুকে হাতে দেশলাইয়ের বাক্সের মতো যন্ত্রটা নিয়ে ফের দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। তারপর বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “দেখবে? তা হলে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য দেখার জন্য প্রস্তুত হও। চার-পাঁচটা নোবেল আমার কেন পাওয়া উচিত তা তোমাদের নিরেট মাথায় এবার ঢুকবে।”

    যন্ত্রটা নিয়ে কী একটু কারিকুরি করলেন ভুবনবাবু কে জানে। সবাই সভয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ বাস্তবিকই সকলের চোখ গোল-গোল হয়ে উঠতে লাগল।

    যন্ত্রটার মধ্যে খুব একটা কারিকুরি করার মতো কিছু ছিল না। ভুবনবাবু খানিকটা পারদ, খানিকটা হাইড্রোজেন গ্যাস, খানিকটা আরও সব আগড়ম বাগড়ম মিশিয়ে যা-খুশি একটা কিছু করে যাচ্ছিলেন। তিনি শুনেছেন বিজ্ঞানের বেশিরভাগ আবিষ্কারই হয়েছে হঠাৎ এবং অপ্রত্যাশিতভাবে। এরকম কোনও অঘটন ঘটাতেই তাঁর চেষ্টা ছিল। দৈববাণীর ভরসা পেয়ে তিনি নিশ্চিত হলেন যে, তাঁর অঘটনঘটনপটিয়ান মাথা সত্যিকারের উড়ানযন্ত্র তৈরি করে ফেলেছে।

    কিন্তু কী করে যন্ত্রটা ক্রিয়াশীল করতে হবে তা তাঁর জানা ছিল না। তিনি যন্ত্রটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে না করতেই জনার্দন যন্ত্র থেকে বেরিয়ে এসে ভুবনবাবুকে সাপটে ধরে আকাশে উঠে যেতে লাগল। বেশ ধীরে ধীরে দুলকি চালেই সে উঠছিল। কিন্তু ভুবনবাবু ঘাবড়ে গিয়ে “বাবা গো, মা গো” বলে চেঁচিয়ে হাত পা ছুঁড়তে লাগলেন। উত্তেজনার মাথায় রামলালকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি উড়তে চেয়েছিলেন বটে কিন্তু যে-ই পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল অমনি তাঁর সাহসের বেলুন গেল চুপসে।

    এদিকে তাঁর পরিবারের লোকজন, ছেলেপুলে, নাতি-নাতনি, সব বাক্যহারা হয়ে গোল গোল চোখ করে চেয়ে আছে। এ যে সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড! দেখতে-দেখতে ভুবনবাবু দশ হাত, বিশ হাত ওপরে উঠে গেলেন। এবং তারপরও উঠতেই লাগলেন। অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলে ভুবনবাবুর গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছিল।

    ভুবনবাবু ওপর থেকে রামলালের উদ্দেশে বিকট হাঁক মেরে বললেন, “ওহে, অমন উজবুকের মতো চেয়ে দেখছ কী? শিগগির আমাকে নামানোর ব্যবস্থা করো। এই বুড়ো বয়সে পড়ে গেলে যে মাজা ভাঙবে, সে মাজা আর জোড়া লাগবে না।”

    রামলাল বললেন, “যে আজ্ঞে। তবে কীভাবে নামানো যায় সেটাই ভাবছি। আপনার যন্ত্র তো খুবই সাকসেসফুল দেখতে পাচ্ছি। তা ওটায় নামবার গ্যাজেট নেই?”

    ভুবনবাবু খিঁচিয়ে উঠে বললেন, “যন্ত্রে কী আছে না আছে তা কি ছাই আমিই জানি? তুমি বরং একখানা মই জোগাড় করে নিয়ে এসো। তাড়াতাড়ি করে, আমার বড্ড ভয় করছে।”

    শুধু রামলাল নন, ভুবনবাবুর বিপদ দেখে সকলেই মইয়ের জন্য ছোটাছুটি শুরু করে দিল। বাঁশের একটা মই বাড়ির নানা কাজে প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। সেইটে যখন নিয়ে এসে দাঁড় করানো হল, তখন ভুবনবাবু মই-এর নাগালের অনেকটা ওপরে ঝুলে আছেন। মই বেয়ে নামা অসম্ভব।

    ভুবনবাবু পেঁচিয়ে উঠে বললেন, “আর লম্বা মই পেলে না? কেন যে তোমরা ছোট-ছোট মই তৈরি করো তাও বুঝি না। লম্বা লম্বা মই না বানালে মানুষের উন্নতিই বা হবে কী করে? ওহে নন্দলাল, যাও না একটু দমকলে খবর দাও। ওদের কাছে ওম্বা মই থাকে বলে শুনেছি।”

    “যে আজ্ঞে!” বলে নন্দলাল ছুটলেন।

    কিন্তু ভুবনবাবু ধীরে ধীরে এত ওপরে উঠে যাচ্ছিলেন যে, দুনিয়ার কোনও মই তাঁর নাগাল পাবে বলে মনে হচ্ছিল না। শ্যামলাল টর্চ জ্বেলে দিলেন। কিন্তু টর্চের আলোও আর ভুবনবাবুর কাছে পৌঁছচ্ছিল না।

    ভুবনবাবু ওপর থেকে খুব চেঁচামেচি করতে লাগলেন, “এই নাক মলছি, কান মলছি, আর এরকম বিদঘুঁটে আবিষ্কার করব না। আমি বিজ্ঞান একেবারেই ছেড়ে দিচ্ছি। রামমাঃ, কোন পাগলে বিজ্ঞান জিনিসটা আবিষ্কার করেছে কে জানে বাবা। এর মতো খারাপ জিনিস হয় না। ও হে রামলাল, তোমারও আর বিজ্ঞানচর্চা করার দরকার নেই। কাল থেকে তুমি বরং সংস্কৃত শিখতে লেগে যাও। ল্যাবরেটরিটা তুলে দিয়ে শিব মন্দির করে ফেলব এবার। ওহে রামলাল, শিবমন্দির করাটাই কি ভাল হবে? নাকি কালী প্রতিষ্ঠা করবে? নাঃ এখানে দেখছি বড্ড ঠাণ্ডা….”

    ভুবনবাবু বারকয়েক হাঁচলেন।

    এদিকে ভুবনবাবুর গগনবিহারের খবর পেয়ে পাড়া-প্রতিবেশী এসে জড়ো হতে লাগল। তারপর শহর ভেঙে পড়ল। হ্যাঁজাক, টর্চ, গাড়ির হেডলাইট ইত্যাদি জ্বেলে ভুবনবাবুর উড্ডীন অবস্থা সবাই দেখার চেষ্টা করতে লাগল।

    বনবিহারীবাবুর বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। তিনি আকাশের দিকে চেয়ে গদগদ স্বরে বললেন, “আহা, ভুবনবাবু সশরীরে স্বর্গে যাচ্ছেন। এমন কপাল কি আর আমাদের হবে! কত বড় পুণ্যাত্মা ছিলেন। আহা!”

    শহরের সবচেয়ে বোকা হলেন হরিপদ রায়। তিনি অনেকক্ষণ ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করে বললেন, “পেটে খুব গ্যাস হয়েছিল নিশ্চয়ই।”

    করালীর মা বরণকুলো নিয়ে এসে বসেবসে চোখের জল ফেলছিলেন, আর তাঁর তিন নাতনি তিনটে শাঁখে ক্রমান্বয়ে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছিল। কালীর মা বলছিলেন, “আমার অনেকদিন থেকেই মনে হচ্ছিল আমাদের ভুবনখুড়োই কল্কি অবতার। মুখে কখনও কথাটা উচ্চারণ করিনি বটে, পাছে পাঁচকান হয়, এখন দেখলে তো, কল্কি অবতার আসলে কে।”

    জনার্দন ভুবনবাবুকে অনেকটা উঁচুতে তুলে ফেলেছিল। কিন্তু বুঝতে পারল, এতে মজাটা মাটি হচ্ছে। তা ছাড়া ভুবনবাবু ভয় খেয়ে কেমন যে গোঁ গোঁ করতে লেগেছেন। সুতরাং জনার্দন ঝড়াক করে ত্রিশ-চল্লিশ ফুট নীচে নামিয়ে এনে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখল।

    ভুবনবাবুকে টর্চের ফোকাসের মধ্যে পেয়ে সবাই খুব চেঁচাতে লাগল।

    “এই যে ভুবনবাবু, নমস্কার…” “অভিনন্দন ভুবনবাবু…” “ও ভুবনদাদু, আমাকে একটু ওড়াবে?…” “পেন্নাম হই ভুবনকর্তা, এ যা দেখালেন একেবারে জম্পেশ ব্যাপার, একটু শিখিয়ে দিতে হবে কতা, দুটো পয়সা আসবে তা হলে গরিবের ঘরে….” “আচ্ছা ভুবনদাদু, ওখানে খাবার পাওয়া যায়…..” “ভুবনদাদু কি পাখি হয়ে গেল বাবা?”

    ভুবনবাবু একটু নীচে নেমেছেন বলে ধাতস্থও হয়েছেন। ওপর থেকে হাঁক মারলেন, “রামলাল, নন্দলাল, শ্যামলাল, তোমরা করছটা কী? পাঁচজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে তোমরাও মজা দেখছ? যাদের বাপের এত বড় বিপদ তারা দাঁড়িয়ে কী করে মজা দেখতে পারে তা তো আমার মাথায় আসে না।

    রামলাল ব্যথাহত গলায় বললেন, “বাবা, আপনি কী বলছেন! আমি তো আপনার এই অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেছি। বাস্তবিকই আপনার চার-পাঁচবার নোবেল পাওয়া উচিত।”

    ভুবনবাবু অত্যন্ত তিক্ত গলায় বললেন, “নোবেল! বিজ্ঞানে নোবেল! ও আমি ছোঁবও না। এ-যাত্রা যদি বেঁচে যাই তাহলে আমি পদ্য লিখতে শুরু করব। রবি ঠাকুরের মতো পদ্য লিখেই নোবেল পাব। বিজ্ঞান-টিজ্ঞান আর নয়।”

    ভিড়ের মধ্যে আরও দুটি লোক গা-ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে কাণ্ডটা দেখছিল। একজন দুলাল সেন, অন্যজন পাঁচু মোদক।

    দুলালবাবু চাপা গলায় বললেন, “ও পাঁচু, লোকটা যে আমাদের বোকা বানিয়ে দিল. হে! সত্যিই কি ওটা ওড়ার যন্ত্র নাকি!”

    পাঁচু ড্যাবড্যাব করে ভুবনবাবুর দিকে চেয়েছিল। বলল, “বাপের জন্মে এমন কাণ্ড দেখিনি। আমার ব্যাপারটা তেমন সুবিধের ঠেকছে না।”

    “দুলালবাবু র‍্যাপারে মুখটা ভাল করে ঢেকে নিয়ে একটু অন্ধকারের দিকে সরে গিয়ে হঠাৎ হাঁক মারলেন, “ভুবনবাবু, শুনতে পাচ্ছেন?”

    দুলালবাবুর বজ্রকণ্ঠ; শুনে সবাই চুপ মেরে গেল। ভুবনবাবু একটু চমকে উঠে বললেন, “এ যে দৈববাণীর গলা মনে হচ্ছে!”

    “আজ্ঞে, ঠিকই ধরেছেন। দেখলেন তো, কেমন উড়লেন!”.

    ভুবনবাবু কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “তা খুব দেখছি বাপ দৈববাণী! আর দেখতে ইচ্ছে নেই। তা এই অবস্থা থেকে উদ্ধারের পথ বাতলাতে পারো?”

    “খুব পারি। আপনাকে যে বারণ করলুম রাতবিরেতে ওড়বার দরকার নেই, তা কথাটা তো শুনলেন না। তার ওপর চার হাজার টাকা বকেয়া পড়ে আছে, সেটা উশুল না হলে যন্ত্রটাই বা নামে কী করে? যার-তার কাছে তো আর বাকি পড়ে নেই, স্বয়ং ভগবানের কাছে বাকিবকেয়া রাখাটা কি ঠিক হচ্ছে?”

    “ঘাট হয়েছে দৈববাণী, মাটিতে পা রাখতে দাও, তক্ষুণি টাকাটা ফেলে দেব।”

    “আজ্ঞে কথাটা মনে রাখবেন।”

    “হাড়ে হাড়ে মনে রাখব। কিন্তু নামাবে কী করে?”

    “ঢিল ছুঁড়ে।”

    “ও বাবা! বলো কী?”

    ‘ভয় পাবেন না, ঢিল বেঁধে দড়ির একটা প্রান্ত ছুঁড়ে দেব, আপনি টপ করে ধরে কোমরে দড়িটা ধরে বেঁধে ফেলবেন। আমরা সবাই মিলে দড়ি ধরে টেনে নামিয়ে আনব।”

    ভুতো তার ঘরে এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল। চেঁচামেচি শুনে হঠাৎ বেরিয়ে এসে কাণ্ডটা দেখে অবাক হল। ভুবনবাবু যে কেন এবং কীভাবে আকাশে ঝুলছেন তা একমাত্র সেই জানে।

    সে একটু রাগের সঙ্গেই চেঁচিয়ে বলল, “জনার্দনদা, দাদুকে নামিয়ে দাও বলছি, নইলে লম্বোদরকে বলে দেব।”

    একথায় ভয় খেয়ে জনার্দন ফুটদশেক নেমে এসে একটু উঁচু থেকে আলগোছে ভুবন রায়কে ছেড়ে দিল।

    ভুবন রায় মাটিতে পড়েই চেঁচিয়ে উঠলেন, “বাবা রে!”

    না, বেশি চোটটোট লাগেনি। হাঁটুটা একটু ঝিনঝিন করল আর মাথাটা একটু টাল খেল। তবু ভুবনবাবু রামলালকে বললেন, “দ্যাখো দ্যাখো, হাড়টাড় ভাঙল টাঙল কি না।”

    রামলাল দেখেটেখে বললেন, “আজ্ঞে না, সব ঠিক আছে।”

    বহু অটোগ্রাফের খাতা এগিয়ে এল ভুবন রায়ের দিকে। অনেক টেপরেকর্ডার। ভুরন রায় সূক্ষেপও করলেন না। বললেন, “আমার আর এসব দিকে মন নেই। আগে একটু ঠাণ্ডা হই। তারপর দেখা যাবে।”

    হাতের যন্ত্রটা রামলালের দিকে এগিয়ে দিয়ে ভুবন রায় বললেন, “এটা এক্ষুনি নষ্ট করে ফ্যাল। এসব জিনিস অত্যন্ত বিপজ্জনক। হামানদিস্তায় ফেলে গুড়ো করো, তারপর অ্যাসিড ঢালো, তারপর পেট্রল ঢেলে আগুন দাও, তারপর মাটি সাত হাত গর্ত করে পুঁতে ফ্যালো। তার আগে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারব না।”

    রামলাল যন্ত্রটা নিয়ে বললেন, “যে আজ্ঞে। তবে এমন একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার এভাবে নষ্ট করলে যদি লোকে আপনাকে খারাপ ভাবে?”

    ভুবন রায় মাথা নেড়ে বললেন, “যে যাই ভাবুক, ও-জিনিস নষ্ট না করলে আমি রাতে ঘুমোত পারব না।”

    ভুবন রায় তাঁর ঘরে এসে যখন ঘরের পোশাক পরে বাথরুমে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন তখন জানলা দিয়ে একটা গলা খাঁকারির শব্দ এল, “আজ্ঞে দৈববাণী বলছিলুম।”

    ভুবন রায় বিরক্ত হয়ে বললেন, “ও, তোমার সেই টাকাটা বুঝি?”

    “যে আজ্ঞে। টাকাটা জানলার কাছে টেবিলের ওপর রাখলেই হবে।”

    ভুবনবাবু বাক্স খুলে টাকা বের করে চার হাজার গুনে টেবিলে রেখে বললেন, “শোনো বাপু, ভগবানকে গিয়ে বোলো আর নোবেলের দরকার নেই। যথেষ্ট হয়েছে।”

    “যে আজ্ঞে। তবে কিনা নোবেল আপনার বাঁধা। বিজ্ঞানে হল না তো কী! পদ্যে হবে।”

    “হবে!” ভুবনবাবু ভারি অবাক হলেন।

    “পদ্যেই হবে। লিখে দেখুন।”

    ভুবনবাবুর আর বাথরুমে যাওয়া হল না। জানালার কাছে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। তারপর জানালার দিকে চেয়ে ভারি খুশিয়াল গলায় বললেন, “কী করে বুঝলে যে পদ্য আমার হাতে হবে?”

    “ও বুঝতে দেরি হয় না মশাই। যার ভিতরে ভগবান এলেম দিয়েছেন তিনি যাতে হাত দেবেন তাতেই সোনা ফলবে। পদ্য লিখতে চান তাও হবে, যাত্রার পালা লিখতে চান তাতেও নোবেল এসে যাবে, চিন্তাশক্তির জন্য কোমর বেঁধে যদি লেগে পড়েন তাতেও নোবেল থেকে রেহাই পাবেন না। তা টাকাটা তোলা আছে তো মশাই?”

    “আছে। কিন্তু মুশকিল হল কী জানো হে দৈববাণী, আমি জীবনে পদ্যটদ্য বড় একটা লিখিনি।”

    “তাতে কী? আপনার ভেতরে কী আছে তা কি ছাই আপনি জানেন? কলম ধরলেই দেখবেন হুড়হুড় করে সব বেরিয়ে পড়বে। এই যে আপনি বিজ্ঞানের ‘ব’ ও জানতেন না, তবু দেখলেন তো কেমন চট করে ওড়বার যন্ত্র বানিয়ে ফেললেন!”

    ভুবনবাবু প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, “না না, আর এই সব্বোনেশে যন্ত্রটার কথা মুখেও এনো না হে দৈববাণী। যন্ত্রটার কথা আমি বেবাক ভুলে যেতে চাই। তুমিও ভুলে যাও।”

    “তা না হয় চেষ্টা করব মশাই, কিন্তু ভোলাও কি সহজ কাজ, ভগবান আপনার মধ্যে বিজ্ঞানটা যে বড্ড বেশি করে দিয়েছেন, তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল বিজ্ঞানটা আপনি চালিয়ে যান।”

    ভুবনবাবু আবার মাথা নেড়ে আতঙ্কিত গলায় বললেন, “না না, কক্ষনো না, বিজ্ঞানে আমার সাঙ্ঘাতিক অরুচি এসে গেছে। ওর ধারে কাছেও আমি আর মাড়াচ্ছি না।”

    “ভগবান কি ব্যাপারটা ভাল চোখে দেখবেন? আপনার ক্ষমতাতে তো আপনি আলু দিয়ে অ্যাটম বোমা, মোচা দিয়ে রকেট, চাই এক নস্যির ডিবে দিয়ে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন বানিয়ে ফেলতে পারেন। এতখানি প্রতিভা নষ্ট করবেন মশাই? ভগবান যে ভারি দুঃখ পাবেন।”

    ভুবনবাবু একটু চাপা গলায় বললেন, “ভগবানকে কথাটা বলার এখন দরকারটাই বা কী দৈববাণী? সব কথা কি তাকে বলা ভাল?”

    “আরও মুশকিল কী জানেন, লোকে তাঁকে অন্তর্যামী বলে বটে, আসলে তিনি অত খোঁজখবর রাখেন না, এই আমরা তাঁর চেলা চামুণ্ডারাই তাঁকে গিয়ে যা সব খবরটবর দিই আর কি। কিন্তু তা হলে আপনার মতো একজন গণ্যমান্য লোকের খবর তো আর চেপে রাখা যায় না। আমি গিয়ে হাজির হলেই প্রথমেই তিনি আপনার খবরই জানতে চাইবেন যে।”

    “নাঃ, বড় মুশকিল হল দেখছি।”

    “আজ্ঞে, মুশকিল একটু আছে। তিনি যদি জানতে পারেন যে, আপনি বিজ্ঞান ছেড়ে দিচ্ছেন তা হলে হয়তো তিনি কলকাঠি নেড়ে ফের আপনাকে বিজ্ঞানের দিকেই ঠেলে দিকটা খুলে দেবেন।”

    “অ্যাঁ! ওরে বাবা! কিন্তু আমার যে ভয়ঙ্কর বিজ্ঞানভীতি হয়েছে হে দৈববাণী! ফের বিজ্ঞান নিয়ে পড়লে আমি যে মারা পড়ব। কোনও উপায় হয় না?”

    “তা কি আর হয় না মশাই। হয়। তবে কিনা খরচাপাতিও তত বড় কম হবে না। প্রণামীটা একটু মোটা করে ফেললে ভগবান হয়তো খুশি হয়ে বিজ্ঞানটা মকুব করে পদ্যের দিকটা খুলে দেবেন। গুছিয়ে কথাটা বলতে হবে, এই যা।”

    “সে তো খুবই ন্যায্য কথা হে। তা প্রণামীটা কত হলে হয় বলে তো!”

    “তা ধরুন গিয়ে লাখ পাঁচেক।”

    “ও বাবা, সে যে অনেক টাকা।”

    “কাজটাও তো শক্ত। না হয় হাজার পাঁচেক কমই দেবেন।”

    “তাতেও অনেক রয়ে গেল।”

    “তা আপনি একটা দর রাখুন। “ধরো, যদি হাজার-পাঁচেক দিই?”

    “না মশাই, সেটা বড় খারাপ দেখাবে। আসলে ওসব হাজার ফাজার ভগবানের চোখেই পড়ে না।”

    “ধরো আরও হাজার পাঁচেক যদি দিই!”

    “আর একটু উঠুন।”

    “ওঠার কথা আর বোলো না হে দৈববাণী। উঠতে আজকাল যে-আমি বড় ভয় পাই। একটু আগেই তো দেখলে ওঠার কী সাঙ্ঘাতিক ঝক্কি।”

    “টাকাটা বড় কথা নয় ভুবনবাবু। আর ভগবানেরই বা টাকাপয়সা কোন কাজে লাগবে? আসল কথাটা হল নজরটা ছোট করতে নেই। কে কত দিল সেটা দেখেই তার বিচার হয় কি না। তা ছাড়া আপনার কেসটাও গোলমেলে। বিজ্ঞান কেটে পদ্য করতে হবে। ধরা পড়লে দৈববাণীরই গদান যাবে, আপনার আর কী?”

    ভুবনবাবু একটু বিরস মুখে বললেন, “পনেরো পর্যন্ত যেতে পারি। তার বেশি পেরে উঠছি না।”

    “পনেরো!”

    “পনেরো দিয়েই চালিয়ে দাও ভায়া। নোবেল পেলে বাদবাকি শোধ করে দেব।”

    “খুব ঝামেলায় ফেললেন মশাই। তা আপনি ভগবানেরও পেয়ারের লোক, আপনার কথাটা আর ফেলি কী করে? তবে ওই পনেরো হাজারই টেবিলের ওপর রেখে একটু আড়ালে যান।”

    “বাঁচালে!” ভুবনবাবু তাড়াতাড়ি আলমারি খুলে টাকা বের করে যথাস্থানে রেখে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন।

    দুলালবাবু টাকাটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে অন্ধকারে পাঁচুসমেত হাওয়া হলেন।

    পাঁচুর মেজাজটা ভাল যাচ্ছে না। বলল, “টাকা তো দু’হাতে লুটছেন, কিন্তু আপনার কপালে লক্ষ্মী বড় অস্থির। ভাল করে বসতে পারছেন না।”

    “তোমার বড় লোভ পাঁচু। ওইজন্যই তোমার উন্নতি হচ্ছে না।”

    “আজ্ঞে তা যা বলেছেন। তবে কিনা গরিবের কথা বাসী হলে মিষ্টি হয়। এই যে টাকাকে টাকা মনে করছেন না, দু-পাঁচ হাজার টাকা ফেলে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এতে মা লক্ষ্মী চটে যান। পরে দেখবেন হা-টাকা হো-টাকা করে মরতে হবে।”

    “আহা, হবে হবে। টাকাও হবে, নামও হবে, ফুর্তিও হবে। শুধু টাকায় কোনও মজা নেই।”

    “আজ রাতের মতো ক্ষ্যামা দিন কর্তা। দুটো চোখের পাতা এক হল না আজ। আমি বুড়োমানুষ, আপনার মতো তেজী লোকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর পেরে উঠছিনে।”

    “তাও হবে। বিশ্রাম তো সকলেরই দরকার। তবে গা আর একটু ঘামিয়ে তবে বিশ্রাম করলে আরাম পাবে। পনেরো হাজার টাকারও একটু ব্যবস্থা করা দরকার।”

    পাঁচু আঁতকে উঠে বলে, “ব্যবস্থা! সে আবার কী? টাকাটা আমাদের আজ রাতের শেষ রোজগার। ওটা আর জলে ফেলবেন না।”

    দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “না না জলে ফেলব কেন? কোথায় ফেলব সেটাই ভাবছি।”

    সকালবেলা ঘুম ভেঙে চোখ মেলতেই ভুবনবাবুর মনে একটা শব্দ যেন ডুগডুগি বাজাতে লাগল, “কবিতা! কবিতা! কবিতা!” ভুবনবাবু সটান উঠে বসলেন। অনুভব করলেন তাঁর মাথা থেকে কে যেন রাতভর ঝেটিয়ে বিজ্ঞানের আবর্জনা সব বিদেয় করে দিয়েছে। বিজ্ঞানের আর তলানিও তাঁর মাথার মধ্যে পড়ে নেই।

    ভুবনবাবু হাসি হাসি মুখ করে বিছানা ছেড়ে উঠলেন। তারপর জানলা দিয়ে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে লাগলেন। সূর্য উঠি-উঠি করছে। গাছে-গাছে পাখি ডাকছে। বেশ কুয়াশা হয়েছে আজ। টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ছে গাছ থেকে। ভুবনবাবুর মনে হল, পৃথিবীটা যেন কবিতায় কবিতায় ছয়লাপ হয়ে আছে। আকাশে যেন অজস্র কবিতা ঘুড়ির মতো উড়ে-উড়ে লাট খাচ্ছে।

    কবিতা যেন গাছে-গাছে বানরের মতো ঝুল খাচ্ছে। পাখিদের গলা থেকেও যেন কবিতারই কিচিরমিচির বেরিয়ে আসছে। তিনি শিশিরের শব্দের মধ্যও কবিতার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেন। কে যেন লিখেছিলেন, “কবিতা তোমায় আজকে দিলাম ছুটি!” না, ভুবনবাবুর মন আজ উলটো কথাই বলতে চাইছে, “কবিতা, আমার মুঠিতে তোমার ঝুঁটি।” কিংবা ঝুঁটির বদলে টুটিও চলতে পারে। কবিতাকে ছুটি দেবেন কি, কবিতা থেকে কি কারও ছুটি আছে?

    ভুবনবাবু হাত-মুখ ধুয়েটুয়ে তৈরি হয়ে রামলালকে ডেকে পাঠালেন। রামলাল কাঁচুমাচু মুখে এসে দাঁড়ালেন, “আজ্ঞে, আমাকে ডেকেছেন?”

    ভুবনবাবু অতিশয় উদার গলায় বললেন, “ওহে রামলাল, তোমার কবিতা টবিতা আসে?”

    “আজ্ঞে না।”

    ভুবনবাবু বিরক্তিতে ক্রু কুঁচকে বললেন, “বিজ্ঞান শিখে একেবারে গোল্লায় গেছ। কবিতা হল গিয়ে পৃথিবীর একেবারে যাকে বলে সব। কবিতা যদি বুঝতে না পারে তা হলে জীবনটারই অর্থ তোমার বোঝা হল না।”

    “যে আজ্ঞে।”

    “আমি বলি কি, আজ থেকেই তুমি কবিতার একটা হেস্তনেস্ত করতে লেগে যাও। এখনই বাজারে গিয়ে সবচেয়ে মোটা বাঁধানো খাতা গোটা দশেক আমার জন্য আর গোটা দশেক তোমার জন্য কিনে আনেনা। নন্দ আর শ্যামকেও জিজ্ঞেস করে দ্যাখো। চায় তো ওদের জন্যও খানকয়েক খাতা এনে দিও, আর কয়েক বোতল কালিও লাগবে। বইয়ের দোকানে গিয়ে যে ক’খানা কবিতার বই পাবে নিয়ে আসবে। আর ছন্দটল শেখার বই পাওয়া যায় না?”

    “খুঁজে দেখতে হবে।”

    “দেখো। না পাওয়া গেলে কলকাতায় চিঠি লিখে ওসব বইও আনিয়ে নাও। আর ভাল দেখে কয়েকটা ডিকশনারি।”

    “যে আজ্ঞে।”

    “আর শোনো।”

    “যে আজ্ঞে।”

    “রবীন্দ্রনাথ যে পোশাক পরতেন সেটা লক্ষ্য করেছ?”

    “রবীন্দ্রনাথ একটা জোব্বা পরতেন।”

    “হ্যাঁ। ওরকম জোব্বাও গোটাকয়েক তৈরি করাতে হবে। ভাল দেখে রেশমি কাপড় কিনে আমার আর তোমাদের তিন ভাইয়ের মাপে অন্তত চারটে করে জোব্বা আজই ইরফান দর্জিকে তৈরি করতে দিয়ে এসো।”

    “যে আজ্ঞে।”

    রামলালকে বিদায় দিয়ে ভুবনবাবু একটু বাগানে এলেন। অনেক গোলাপ ফুল ফুটে আছে। তিনি একটি রক্তগোলাপ তুলে নিয়ে গন্ধ শুকলেন। ফুল, চাঁদ, পাখির ডাক, প্রকৃতি এসব না হলে কবিতার মেজাজ আসে না।

    ভুবনবাবু বাগানে পায়চারি করতে করতে ফের টের পেলেন তাঁর চারদিকটায় জীবাণুর মতো কবিতা গিজগিজ করছে। কবিতা দিয়েই যেন ভগবান দুনিয়াটাকে বানিয়েছেন। তাঁর হাত কবিতা লেখবার জন্য নিশপিশ করতে লাগল।

    সমস্যা হল, জীবনে একমাত্র পাঠ্যপুস্তক ছাড়া আর তিনি কবিতা-টবিতা কখনও বিশেষ পড়েননি। কবিতা জিনিসটা যে নিতান্তই বাহুল্য জিনিস, তা তিনি এককালে বেশ জোর গলাতেই প্রচার করতেন।

    আনমনে হাঁটতে হাঁটতে তিনি নন্দলালবাবুর ঘরের সামনে এসে পড়েছেন। ভেজানো দরজায় টোকা দিয়ে বললেন, “ওহে নন্দলাল, ঘরে আছ নাকি?”

    নন্দলাল ঘরেই ছিলেন। প্রাতঃকালে এই সময়টায় তিনি প্রাণায়াম করেন। ভুবনবাবুর গলা পেয়ে তটস্থ হয়ে বললেন, “যে আজ্ঞে।”

    ভুবনবাবু ঘরে ঢুকে নন্দলালকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, “ও কী! ব্যায়াম করছ নাকি? ছিঃ ছিঃ, ব্যায়াম করা যে খুব খারাপ অভ্যাস হে?” ওতে মনটা শরীরের দিকে চলে যায়। মাথায় সূক্ষ্ম ভাবনাচিন্তা আসতে চায় না, ব্যায়াম করলে কবিতা লিখবে কী করে?”

    নন্দবাবু কিছু বুঝতে পারলেন না। তবে মৃদু গলায় বললেন, “কবিতা! আমি তো কবিতা-টবিতা লিখি না। কবিতা খুব খারাপ জিনিস। কবিতা লিখলে ধর্মভাব নষ্ট হয়ে যায়।”

    ভুবনবাবু গম্ভীর হয়ে অত্যন্ত থমথমে গলায় বললেন, “তোমার মুখ থেকে এরকম কথা শুনব বলে আশা করিনি। শুনে মর্মাহত হলাম। কবিতা সম্পর্কে তোমার মনোভাব অত্যন্ত নিন্দনীয়। জানো, কবিতা দিয়েই ভগবান দুনিয়াটাকে বানিয়েছেন? যদি দেখার চোখ থাকত তা হলে দেখতে পেতে আকাশে বাতাসে কবিতারই অনুরণন হচ্ছে। আমি তো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।”

    নন্দলালবাবু ভারি বোকাঁপানা মুখ করে চেয়ে রইলেন। ভুবনবাবুর মুখে কবিতার প্রশংসা শোনার মতো অবাক কাণ্ড আর কী আছে?

    ভুবনবাবু নিমীলিত নয়নে চারদিকটা একবার দেখে নিয়ে বললেন, “শুধু শোনা কেন, দেখতেও পাওয়া যায়। আজ সকালে কী দেখলুম জানো? দেখলুম, আকাশে কবিতার ঘুড়ি উড়ছে হাজার-হাজার। গাছের ডালে ডালে বানরের মতো স্কুল খাচ্ছে কবিতা। জীবাণুর মতো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কবিতা।”

    নন্দলালবাবু ‘খ্যঙ’ করে একটা শব্দ করলেন।

    “কিছু বললে নন্দলাল?”

    “আজ্ঞে না।”

    “একটা শব্দ শুনলুম যেন! যাকগে। যা বলছিলুম, কবিতা বোঝবার, কবিতা দেখবার চোখ চাই। ওসব ব্যায়াম-ট্যায়াম করো বলেই তোমার কবিতার অনুভূতিটা তেমন হচ্ছে না। আমি রামলালকে খাতা আনতে পাঠিয়েছি। আজ থেকেই কবিতা মকসো করতে বসে যাও। এমন কিছু শক্ত ব্যাপারও নয়। একটু একটু করে ভাববে আর লিখবে।”

    নন্দবাবুর মুখে আর শব্দ নেই। চোখের পলক পড়ছেনা। খানিকক্ষণ বস্ত্রহাতের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, “যে আজ্ঞে।”

    এদিকে রাতের ঘটনার খবর চারদিকে ছড়িয়ে যাওয়ায় ভোর হতে না হতেই . দলে দলে লোক এসে বাড়িতে ভিড় করে ফেলল। তাদের মধ্যে খবরের কাগজের লোকও আছে।

    ভুবনবাবু ভারি বিরক্ত হয়ে চাকরকে ডেকে বলেছিলেন, “ওরে, ওদের বলে দে, আমার শরীর খুব খারাপ, দেখা হবে না।”

    একজন রিপোর্টার কয়লাওয়ালা সেজে ঢুকে পড়েছে, সে এসে জানলায় উঁকি দিয়ে বলল, “অভিনন্দন ভুবনবাবু, আমাদের কাগজের জন্য ছোট্ট একটা ইন্টারভিউ না দিলেই নয়।”

    ভুবনবাবু ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললেন, “হবে না, আমার শরীর খুব খারাপ।”

    “ইন্টারভিউ নিতে না পারলে আমার চাকরি থাকবে না।”

    “চাকরি ছেড়ে কবিতা লেখো। কবিতার মতো জিনিস হয় না।”

    “বলেন কি, আপনি কি কবিতারও ভক্ত? বিজ্ঞান আর কবিতাকে কীভাবে মেলাচ্ছেন সার?”

    “মেলাচ্ছি না হে। বিজ্ঞান ছেড়ে কবিতা ধরেছি, কবিতা ছাড়া দেশের উন্নতি নেই।”

    লোকটা খসখস করে নোটবইতে ভুবনবাবুর এসব কথা লিখে নিতে নিতে বলল, “বিজ্ঞান কেন ছাড়লেন তা যদি দু-এক কথায় বলেন!”

    “বিজ্ঞান একটা যাচ্ছেতাই জিনিস। যার কাণ্ডজ্ঞান আছে সে কখনও বিজ্ঞানচর্চা করবেই না। বিজ্ঞানই দুনিয়াটাকে রসাতলে দিচ্ছে।”

    “কিন্তু আপনি যে অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার করেছেন তার জন্য ইতিমধ্যেই চারদিকে হইচই পড়ে গেছে। লোকে বলছে, আপনি আগামী পৃথিবীর চেহারাই পালটে দেবেন।”

    “শোনো হে বাপু, ঈশ্বর আমাকে মেলা প্রতিভা দিয়েছেন। আমি যদি ফুটবল খেলতুম, তা হলেও মারদাঙ্গা বা পালু হতে পারতুন

    রিপোর্টার একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “মারদাঙ্গা আর পালু কে বলুত তো?”

    ভুবনবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “কেন, ওই যে দু’জন বিশ্ববিখ্যাত খেলুড়ে–খুব নাকি ভাল খেলে!”

    “ওঃ! মারাদোনা আর পেলের কথা বলছেন কি?”

    “তাই হবে। কথা হল, যার প্রতিভা আছে সে বিজ্ঞানেও যেমন, কবিতাতেও তেমন, ফুটবল ক্রিকেটেও কেউকেটা। বুঝলে।”

    “আজ্ঞে তা তো বটেই।”

    “প্রতিভা বড্ড বেশি হয়ে যাওয়ায় খানিকটা চলকে ওই বিজ্ঞানে গিয়ে পড়েছিল। তবে যা হওয়ার হয়েছে। বিজ্ঞানের ছায়াও আমি আর মাড়াচ্ছি না।”

    রিপোর্টার মাথাটাথা চুলকে বলল, “সার, একটা কথা বলব? কিছু মনে করবেন

    তো! আমি রিপোর্টার মানুষ, যখন-তখন যেখানে-সেখানে ছুটতে হয়। তাই বলছিলাম, বিজ্ঞান যখন ছেড়েই দিচ্ছেন তখন ওই যন্ত্রটাঘদি আমাকে দান করেন।”

    ভুবনবাবু চমকে উঠে বললেন, “ওই সব্বনেশে জিনিস তুমি চাইছ? তুমিও তো দেখছি সব্বনেশে লোক! ওই যন্ত্র আমি রামলালকে গুড়ো করতে দিয়েছি। গুঁড়ো করে অ্যাসিডে ছড়িয়ে সাত হাত মাটির তলায় পুঁতে ফেলা হবে।

    “ইস, বড্ড লস হয়ে গেল সার। দেখি যদি এখনও গুঁড়ো করা না হয়ে থাকে–” বলে রিপোর্টার দৌড় লাগাল।

    রামলাল অবশ্য যন্ত্রটাকে গুঁড়ো করেননি। তিনি ল্যাবরেটরিতে বসে খুব মন দিয়ে যন্ত্রটাকে নানাভাবে পরীক্ষা করছিলেন। বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট কিছু ধারণা আছে। কিন্তু কোনও ধারণা দিয়েই তিনি যন্ত্রটার রহস্য ধরতে পারছিলেন না। বলতে কি, যন্ত্রটার মধ্যে তেমন জটিল কলকজা কিছুই নেই। একনজরে ছেলেমানুষি কাটুমকুটুম বলেই মনে হয়। অথচ তাঁর বাবা ভুবনবাবু এই যন্ত্রে ভর করেই আকাশে উঠে গিয়েছিলেন কী করে সেটা সম্ভব হল তা রামবাবু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না।

    সকালবেলা তিনি খবর পাঠিয়ে কলেজের আর কয়েকজন বিজ্ঞানের অধ্যাপককে ডাকিয়ে এনেছেন। তাঁরা অবশ্য ভুবন রায়ের গগনবিহারের খবর জানতেন। দু একজন নিজের চোখেই ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁরাও ভারি ভাবিত এবং অপ্রস্তুত বোধ করছেন।

    ফিজিক্সের গুণময়বাবু বললেন, “বিজ্ঞানের যে আমরা এখনও কিছুই জানি এই যন্ত্রটা তা-ই প্রমাণ করছে।”

    অঙ্কের শৈলেনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “আমার মনে হচ্ছে, এটা বিজ্ঞান টিজ্ঞান নয়। এ হল যোগ। ভুবনবাবু যোগবলে শূন্যে উঠেছিলেন। আমার বাবার

    এক মেসো প্রায়ই এরকম উঠে যেতেন।”

    কেমিস্ত্রির প্রসাদবাবু যন্ত্রটা দেখেশুনে বললেন, “আমাদের উচিত ব্যাপারটা সায়েন্স কংগ্রেসে জানানো।”

    রামলাল বললেন, “আপনারা আর একটু বিষয়টি নিয়ে ভাবুন। আমার বাবা বিজ্ঞানের কিছুই জানেন না। বুড়োবয়সে তাঁকে কিছু ছেলেমানুষিতে পেয়েছে। তবে অনেক সময়ে নিতান্ত অবিজ্ঞানীর হাতেও হঠাৎ করে কিছু একটা আবিষ্কার ঘটতে পারে। কিন্তু এ-যন্ত্রটা লক্ষ্য করলেই আপনারা বুঝতে পারবেন, এর মধ্যে তেমন কিছু নেই। সকাল থেকে নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও আমি বহুবার এই যন্ত্রটার সাহায্যে ওড়বার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। বাবা তা হলে কীভাবে উঠলেন?”

    শৈলেনবাবু ফের বললেন, “যোগ।” বিজ্ঞানীরা অনেকক্ষণ ভাবলেন এবং যন্ত্রটাকে নানাভাবে পরীক্ষা করলেন। অবশেষে প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর স্বীকার করলেন যে, সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম বা বিজ্ঞানের ধর্ম অনুযায়ী যন্ত্রটাকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।

    রামলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “এই যন্ত্রটা আবিষ্কারের ফলে অবশ্য একটা উপকার হয়েছে। বাবা বিজ্ঞান ছেড়েছেন এবং আমিও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। কিন্তু বাবার মাথায় নতুন যে আইডিয়া এসেছে সেটা আরও সাঙ্ঘাতিক।”

    সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন, “কী সেটা?”

    “উনি এখন কবিতা লেখার দিকে ঝুঁকেছেন। বাজারে খাতা কিনতে লোক পাঠানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, উনি চান আমিও বিজ্ঞান ছেড়ে কবিতা লিখতে শুরু করি।”

    ফিজিক্স গম্ভীর হয়ে বললেন, “কবিতা! সে তো খুব খারাপ জিনিস।”

    অঙ্ক বললেন, “অতি বিচ্ছিরি, কিছুই বোঝা যায় না।”

    কেমিষ্ট্রি বললেন, “কবিতা দেখলেই আমার মাথা ঘোরে।”

    রামলাল বিরস বদনে বললেন, “তা হলে আমার অবস্থাটা কীরকম তা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন।”

    “হনুমানের মতে, শৈলেনবাবু বললেন। রামলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর দুর্দশায় সমবেদনা জানিয়ে সহকর্মীরা বিদায় হওয়ার পর রামলাল একা বসে ফের চিন্তা করতে লাগলেন। ভুবনবাবু বিজ্ঞানের বাতিক খুবই অস্বস্তিকর ছিল বটে, কিন্তু কবিতা ঘাড়ে চাপলে কি আর রামলাল বাঁচবেন! আবার তাঁর দীর্ঘশ্বাস পড়ল।

    এমন সময় কে যেন বলে উঠল, “তা কবিতাও তেমন খারাপ জিনিস নয়! কবিতা দিয়েও কত কী হয়!”

    রামলাল চমকে উঠে বললেন, “কে?” ||||||||||

    দাড়িগোঁফওয়ালা কালো চশমা চোখে একটা লোক আর-একজন দাড়িগোঁফওয়ালা চশমা চোখে লোককে নিয়ে ঘরে ঢুকে ভারি অমায়িক হেসে বলল, “এই আমরাই কথাটা বলছিলুম।”

    “আপনারা কারা?”

    “আমরা হলুম ‘সাপ্তাহিক নবযুগ’ পত্রিকার প্রতিনিধি। কবিতা খুঁজতে বেরিয়েছি। ভাল কবিতা দেখলেই কিনে ফেলি আমাদের বিখ্যাত পত্রিকার জন্য। তা শুনলুম এখানে নাকি খুব কবিতার চর্চা হচ্ছে।”

    রামলাল দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “এ বাড়িতে কস্মিনকালেও কবিতার চচা হয়নি। তবে হবে। কিন্তু সে যে কী জিনিস হবে, তা ঈশ্বর জানেন।”

    লোকটা মাথা নেড়ে বলল, “জিনিস আমরা চিনি। শুনুন মশাই, আমাদের নগদ কারবার। কবিতা পছন্দ হলেই আমরা এক-এক কবিতা একশো টাকায় কিনে নেব। একেবারে নগদ টাকা ফেলে।”

    “বলেন কী! প্রতি কবিতায় একশো টাকা?”

    “তেমন–তেমন কবিতা হলে দু’গুণ টাকা। অর্থাৎ দুশো।”

    রামলাল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, “তা হলে আপনারা আমার বাবার সঙ্গে দেখা করুন।”

    “আরে, দেখা করতেই তো আসা। চলুন। শুভস্য শীঘ্রম।”

    রামলাল বিস্ময়ে ঘনঘন মাথা নাড়তে নাড়তে দু’জনকে ভুবন রায়ের সামনে এনে হাজির করলেন।

    সকালে জলখাবারটি খেয়ে ভুবনবাবু কাগজ কলম নিয়ে বাগানে টেবিল চেয়ার পেতে বসেছেন। নিমের ছায়ায় চিকড়ি-মিকড়ি রোদে শীতের সকালে বসে তিনি কবিতা লেখার জন্য অনেকক্ষণ ধরে কসরত করার পর একটা মাত্র লাইন লিখতে পেরেছেন। কলার কাঁদির মতো কবিতা ঝুলিছে গাছে-গাছে। পোষা বেড়ালের মতো কবিতা ফিরিছে পাছে পাছে।

    প্রথম কবিতাটা কবিতা বিষয়ে লেখা ভাল। কিন্তু কবিতাকে বিষয় করে লেখা যে বেশ শক্ত, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন ভুবনবাবু। দামি পাকার কলমে পেছনটা কামড়ে কামড়ে প্রায় ক্ষতবিক্ষত করে ফেললেন। মাথার চুলও বার বার টানাটানি করায় কয়েক গাছি ছিঁড়ে গেল। উঠে পায়চারি করে নিলেন বারকয়েক। বিজ্ঞানে নতুন কিছু আবিষ্কার করেই যেমন আর্কিমিডিসির মতো ইউরেকা’ বলে চেঁচাতে-চেঁচাতে বেরিয়ে আসতেন, কবিতায় তেমনই আদি কবি বাল্মীকির মতো এক লাইন লিখেই তিনি বার কয়েক বলে ফেলেছেন “কিমিদং কিমিদং!”

    ভুবনবাবু যখন দ্বিতীয় পঙক্তির সন্ধানে আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘাড় ব্যথা করে ফেলেছেন সেই সময়ে রামলাল এসে সামনে দাঁড়িয়ে বিনীত স্বরে ডাকলেন, “বাবা।”

    ভুবনবাবু খাড়া হয়ে বসে বললেন, “খাতাটাতা সব এনেছ তো! কালির বোতল! ডিকশনারি! কবিতার বই?”

    “আজ্ঞে সেসব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আপনি কবিতা লিখছেন শুনে এই এঁরা সব কলকাতা থেকে এসে পড়েছেন।”

    ভুবনবাবু এবার দাড়ি আর চশমাওলা লোক দুটোর দিকে তাকালেন। শশব্যস্ত বলে উঠলেন, “বিদেয় করে দাও, বিদেয় করে দাও। আমি এখন ভীষণ ব্যস্ত।”

    “আজ্ঞে এঁদের বিদেয় করাটা যুক্তিযুক্ত হবে না। এঁরা সাপ্তাহিক নবযুগ পত্রিকার লোক, কবিতা কিনতে বেরিয়েছেন। এক-একটা কবিতা একশো থেকে দু’শো টাকা।”

    ভুবনবাবু নড়েচড়ে বসে বললেন, “বটে! তা নেহাত খারাপ ব্যাপার তো নয়। বসতে দাও ওঁদের।”

    রামলাল তাড়াতাড়ি চেয়ার-টেবিল আনিয়ে দু’জনকে ভুবনবাবুর মুখোমুখি বসালেন। দাড়ি ও চশমাওলা দু’জন গম্ভীর মুখে বসলেন। তারপর দুজনের একজন বললেন, “আমরা কবিতার খোঁজে বেরিয়েছি। ভাল কবিতা পেলে মোটা টাকায় কিনে নেব।”

    ভুবনবাবু বিগলিত মুখে বললেন, “নবযুগ তো বিখ্যাত কাগজ।”

    “আজ্ঞে হ্যাঁ। দেড়-দু’লাখ সার্কুলেশন। একটা কবিতা কোনওক্রমে ছাপতে পারলেই রাতারাতি বিখ্যাত।”

    “ও বাবা, তা আমিও কবিতা লিখি বটে, কিন্তু…”

    “কিন্তু কী?”

    “ইয়ে মানে এখনও ব্যাপারটা ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারিনি আর কি।”

    লোকটা খুব মিষ্টি করে বলল, “ওরকম হওয়াই তো স্বাভাবিক। কবিতা কি সোজা জিনিস। অনেক ধৈর্য অনেক অধ্যবসায়ে হয়। তাও প্রতিভা না থাকলে শত চেষ্টাতেও হয় না।”

    “আজ্ঞে তা তো বটেই।”

    “আপনি কি এক-আধটা কবিতা শোনাতে পারেন আমাদের?”

    “বিলক্ষণ! কবিতা শোনাব এ তো আনন্দের কথা। তবে আপনারা অনেক দূর থেকে আসছেন, একটু বিশ্রাম-টিশ্রাম করলে হয় না? ধরুন, একটু জলখাবারেও বন্দোবস্ত করা উচিত। তা উঠেছেন কোথায়?”

    লোটা মাথা নেড়ে বলল, “কোথাও উঠিনি। সবে গাড়ি থেকে নেবে ঘুরে টুরে দেখছি আর কি। হোটেল-টোটেল খুঁজে নিতে হবে।”

    ভুবনবাবু লাফিয়ে উঠে বললেন, “ছিঃ ছিঃ, আমি থাকতে হোটেলে উঠবেন, তাই কি হয়? ওরে কে আছিস…”

    ভুবনবাবু হাঁকডাকে বাড়িতে একটা হুলুস্থুল পড়ে গেল। এক তলার সবচেয়ে ভাল ঘরখানা ঝাড়পোঁছ করে কাজের লোকেরা ঘরটাকে ঝকঝকে করে তুলতে লেগে গেল। রান্নাঘরে গাওয়া ঘিয়ের লুচি আর আলুর দমের ব্যবস্থা হতে লাগল। গরম চা এসে গেল।

    নবযুগের লোক দুটো বেশ নিশ্চিন্ত মনে চা খেতে-খেতে ঠ্যাঙ নাচাতে লাগল। মুখপাত্র লোকটি চা শেষ করে ভুবনবাবুর দিকে চেয়ে হঠাৎ বলে উঠল, “আপনার হবে।”

    ভুবনবাবু হাসি হাসি মুখ করে বললেন, “কী হবে?”

    “কবিতা।”

    “বলছেন! সত্যিই বলছেন! কী করে বুঝলেন?”

    “এই কম্ম করতে করতে চুল পাকিয়ে ফেললাম। কবিতা না শুনেও বলে দিতে পারি কোন লোকটার ভিতরে কবিতার মালমশলা আছে।”

    ভুবনবাবু ভারি তৃপ্ত হয়ে বললেন, “সেটা আমিও টের পাচ্ছি। আমার চারদিকটা যেন কবিতায় একেবারে ঠাসা। কবিতার যেন একেবারে মড়ক…ইয়ে…না….মড়ক কথাটা ঠিক জুতসই হল না–”

    লোকটা হাত তুলে ভুবনবাবুকে বাড়া দিয়ে বলল, “কিছু ভুল বলেননি। মহামারী থেকেই মড়ক লাগে। আপনি চারদিকে জীবাণুর মতো কবিতার ভিড় দেখতে পাচ্ছেন তো!”

    ভুবনবাবু বললেন, “আজ্ঞে, ঠিক তাই।”

    “তবে মড়কের আর বাকি কী?”

    “তা বটে।”

    “দুটো লাইন তো লিখে ফেলেছেন দেখছি। আমি এক ফাঁকে লাইন দুটো পড়েও নিয়েছি।”

    ভুবনবাবু সাগ্রহে বললেন, “কেমন হয়েছে বলুন তো!”

    লোকটা ভারি আনমনা হয়ে অনেক দূরের দিকে চেয়ে থেকে আপনমনে ভরাট গলায় আবৃত্তি করল, “কলার কাঁদির মতো কবিতা ঝুলিছে গাছে-গাছে। পোষা বেড়ালের মতো কবিতা ফিরিছে পাছে পাছে। আহা! কী অপূর্ব!”

    “বলছেন! সত্যিই অপূর্ব!”

    লোটা গম্ভীরভাবে পকেট থেকে দুটো একশো টাকার নোট বের করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, “আগাম।”

    “আগাম, বলেন কী!” ভুবনবাবুর যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না।

    লোকটা বলল, “নতুন কবিদের রেট একশো টাকা। কিন্তু আপনার এই কবিতাটার মাত্র দু’লাইন দেখেই বুঝতে পেরেছি আপনার ভিতরে কবিতার সমুদ্র রয়েছে। সেই সমুদ্র গর্জন করছে, যুঁসছে, বিরাট তরঙ্গ তুলে তেড়ে বেরিয়ে এসে সাহিত্যের জগৎকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আপনি মশাই একটা লণ্ডভণ্ড কাণ্ড করেই ছাড়বেন না।”

    ভুবনবাবু আনন্দে লাফিয়ে ওঠবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। বসা অবস্থায় লাফিয়ে ওঠা যায় না তো। কিছুক্ষণ আবেগটাকে দমন করে নিজেকে সামলালেন। তারপর গদগদ স্বরে বললেন, “দুপুরে আজ কী খাবেন বলুন তো?”

    লোকটা মাথা নেড়ে বলল, “আমাদের খাওয়া-দাওয়ার বায়নাক্কা নেই। নুনভাত ডালভাত হলেই হল। কালিয়া কোপ্তা খাওয়াতে চান তো তাও সই, আবার পোলাও মাংস খাওয়াতে চান তো তো তাও সই। তবে আমার এই সহকর্মীটির রোজ একটু ক্ষীর চাই। আর আমি নতুন গুড়ের পায়েসটা বেশ পছন্দ করি।”

    “হবে। সব হবে। এখন চলুন একটু জলযোগ করে নেবেন।”

    দু’জনে উঠল। খাওয়ার ঘরে বসে দু’জনে বেশ তৃপ্তি করে খেয়ে-টেয়ে বলল, “না, কবি হলেও আপনার নজরটা বেশ উঁচু। এমনিতে বেশির ভাগ কবিই হাড়হাভাতে। সেইজন্যই কিছু হয় না। আপনার হবে।”

    ভুবনবাবুআনন্দেমাথা নাড়তে নাড়তেদুখানা একশো টাকার নোট জয়পতাকার মতো ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ভিতর বাড়িতে গেলেন মান্যগণ্য লোক দুটির আপ্যায়নের জোরদার বন্দোবস্ত করতে। মাত্র দু’লাইন লিখতে-না-লিখতেই দু-দুশো টাকা এসে গেল। তা হলে যখন রাশি রাশি লিখবেন তখন তো টাকার বৃষ্টি হবে! শুরুতেই এরকম সাফল্য তো খুব কম লোকের ভাগ্যেই ঘটে।

    .

    ভুতো ক’দিন যাবৎ ভারি চিন্তার মধ্যে আছে। চিন্তা হল তার নিজেকে নিয়েই। তার বয়স নিতান্ত কম হলেও এর মধ্যেই তার বেশ কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে। সে বুঝতে পারছে না, যা সব ঘটছে তা সত্যি ঘটনা কি না। পরিরা তাকে একবার একটা অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, আবার সেদিন জনাদন নিয়ে গেল ভূতের মিটিং-এ। এসবের মানে কী? আর ওই হেলমেটটারই বা রহস্য কী?

    দুপুরবেলা আজ বেজায় ভোজের আয়োজন হয়েছে। দুটো দাড়ি-গোঁফওয়ালা লোক এসে বুড়োকতার কবিতা কিনে নিচ্ছে, দুশো টাকা আগাম দিয়েছে। তাদের খাতিরে আজ বিয়েবাড়ির ভোজ। লোক দুটোকে খুব সুবিধের ঠেকল না ভুতোর। দাড়ি-গোঁফওয়ালা লোক দেখলেই তার একটু সন্দেহ হয়। তার ওপর এ-লোকদুটোর ভাবগতিকও সন্দেহজনক। কিন্তু কিছু করারও নেই। এরা বুড়োকতার পেয়ারের লোক। একটা ভাল ব্যাপার হল, এদের খাতিরে খাওয়াটা আজ হল পেল্লায় রকমের। কিন্তু মনটা উড়ুউড়ু বলে জিভে তেমন স্বাদ পেল না ভুতো। দাড়ি-গোঁফওয়ালা লোক দুটো অবশ্য সাঙ্ঘাতিক খেল। এত খাওয়া কাউকে কখনও খেতে দেখেনি সে। তবে আঁচানোর সময় দাড়ি-গোঁফওয়ালাদের একজন হঠাৎ হাঁ-হাঁ করে ওঠায় ভুতো দেখল লোকটার গোঁফ একদিকে খুলে ঝুলে পড়েছে। ভুত গাড় থেকে তার হাতে জল ঢেলে দিচ্ছিল। দৃশ্যটা দেখে ভারি অবাক হল সে। তারপর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে গোঁফটা খপ করে ধরে একটানে ছাড়িয়ে আনল সে। দুষ্টুমি করে নয়, সে ঝুলন্ত গোঁফ দেখে এত অবাক হয়েছিল যে, টান মারার লোভ সামলাতে পারেনি।

    এই বেয়াদপিতে লোকটা এক হাতে মুখ চাপা দিয়ে অন্য হাতে একটা পেল্লায় থাপ্পড় উঁচিয়ে বলল, “পাজি ছোঁড়া! দে গোঁফ!”

    ভুতো আর দাঁড়ায়নি। দাওয়া থেকেলাফদিয়ে নেমে ছুটতে শুরু করেছে।পিছনে পিছনে গোঁফ-হারানো লোকটাও।

    ‘গোঁফ দে! গোঁফ দে! নইলে খুন করে ফেলব বলছি কিন্তু!”

    ভুতো গোঁফ মুঠো করে ধরে হরিণের বেগে দৌড়চ্ছে।

    ছুটতে ছুটতে জঙ্গলে ঢুকে পড়তেই কে যেন কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল, “কী হয়েছে বলো তো! অমন ছুটছো কেন?”

    গলাটা জনার্দনের। ভুত দৌড়তে-দৌড়তে বলল, “পিছনে যে লোকটা আসছে ওটা একটা ঠকবাজ। ওকে ধরো।”

    “আর ছুটো না। ওই বেলগাছটার নীচে দাঁড়াও। আমাদের ওপর হুকুম আছে,

    তোমার দেখাশোনা করার। আমি লোকটাকে ঢিট করছি।”

    গোঁফ নিয়ে পাঁচু মোদকের সমস্যাটা পাঁচজনে বুঝবে না। এইসব ছদ্মবেশ টদ্মবেশ তার লাইনে নয়। সে সাদামাঠা চুরিটুরি করতেই ভালবাসে। এসব বাবুগিরি কি তার পোয়? কিন্তু দুলালবাবুর পাল্লায় পড়ে যা নয়, তা-ই করতে হচ্ছে। দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে এই সঙ সাজাবার কী যে দরকার ছিল, তা তার মাথায় ঢুকছেনা। তার ওপর এই দাড়ি-গোঁফে গাল-গলা ভারি কুটকুট করে। ছারপোকাও থাকতে পারে ভিতরে। তার চেয়েও বড় বিপদ আঁচানোর সময় জল লেগে আঠা আলগা হওয়ায় গোঁফ খুলে গেছে আর বদ ছোঁড়াটা গোঁফ নিয়ে পালিয়েছে। গোঁফ ছাড়া বাড়িতে আর ঢোকাও যাবে না।

    কিন্তু বয়স তো কম হল না। দৌড়ঝাঁপ কি তার পোষায়?

    ভুতোকে ধরার আশা যখন প্রায় ছেড়ে দিয়েছে পাঁচু, তখনই হঠাৎ ঝড়াক করে কে যেন তাকে শূন্যে তুলে নিল।

    পাঁচুর এরকম অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি। প্রথমটায় সে ভাবল মরে গিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। কিন্তু নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখল, মরেছে বলে মনে হল না, তা ছাড়া নীচে তার দেহটাও সে পড়ে থাকতে দেখল না। তা হলে হচ্ছেটা কী?

    কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে থেকে হ্যাঁ-হ্যাঁ করে খানিকক্ষণ হাঁপিয়ে নিল পাঁচু। তারপর চারদিকটা ভাল করে তাকিয়ে দেখল। ওই মিত্তিরদের পোড়ো ভিটে আর, ভৌত ক্লাব দেখা যাচ্ছে। নীচে জঙ্গল। ওপাশে গঞ্জ। দিনের আলোয় সব ফুটফুটে পরিষ্কার।

    পাঁচু ঘাড় ঘুরিয়ে একটু দূরে ভুবনবাবুদের দোতলা বাড়িটাও দেখতে পেল। তা হলে এটা নিশ্চিত যে, সেমরেনি। তবে এই অশৈলী কাণ্ডটা হচ্ছে কেন? ভুবনবাবুও কাল রাত্তিরে আকাশে উঠে গিয়েছিলেন। কাণ্ডটা যে কী, তা বুঝতে পারছেনা পাঁচু। তবে সে কিছুক্ষণ হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করল। কাজ হল না। আকাশে ভেসে ভেসে খানিকটা দূরে এসেও পড়ল সে। সামনেই একটা মস্ত অশ্বথ গাছ।

    উড়তে উড়তে গাছটার কাছ বরাবর আসতেইঝুপকরে কে যেন পাঁচুকে গাছটার মগডালের ওপর ফেলে দিন। বয়স হলেও পাঁচুর হাত-পা ভারি সচল। তার যা পেশা তাতে শরীরটা ঠিক রাখতেই হয়। তাই পড়েও পাঁচু হাত-পা ছরকুটে পপাত ধরণীতলে হল না। সামনে যা পেল তাই আঁকড়ে ধরে পড়াটা আটকাল।

    কিন্তু যেখানে পড়েছে সেটা ভারি উঁচুতে একটা তেকাঠির মতো জায়গা। এখান থেকে নামা ভারি শক্ত। পাঁচু প্রথমটায় নামবার চেষ্টাও করল না। চুপচাপ বসে খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিল। তারপর অবস্থাটা দেখল। অবস্থাটা মোটেই ভাল নয়। তার ওপর টানাহ্যাঁচড়ায় তার নকল দাড়িও খসে কোথায় পড়ে গেছে। ভারি দুরবস্থা। এখন আবার নতুন দাড়ি-গোঁফ না লাগিয়ে ভুবনবাবুর বাড়িতে ফিরেও যাওয়া যাবে না। অথচ আজ রাতে যে বাড়িতে আরও পেল্লায় ভোজ রয়েছে। কিন্তু সে কথা পরে। খুব সাবধানে পাঁচু গাছ থেকে নামবার চেষ্টা করতে লাগল।

    জনার্দন আজ আর দেখাই দিচ্ছে না। আড়াল থেকে বলল, তোমার যে পিছু নিয়েছিল সে লোকটাকে চেনো?”

    “না, জনার্দনদা। কে বলো তো!”

    “সাঙ্ঘাতিক লোক। ভূত ধরার ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল প্রায়। ও হল পাঁচু মোদক!”

    ‘নামটা চেনা-চেনা ঠেকছে।”

    “খুব নামডাকওয়ালা লোক। সবাই চেনে। বিখ্যাত চোর।”

    “চোর! বলো কী! কর্তাবাবার যে সর্বনাশ করে ছাড়বে! ও বাড়িতে এর একজন স্যাঙাত আছে।”

    “সে আরও সাঙ্ঘাতিক লোক। তার নাম দুলাল সেন।”

    ‘দুলাল সেন! বলো কী! সে তো গুম হয়ে গেছে। ল্যাবরেটরিতে যে সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড হল সেদিন তারপর থেকে আর দুলালবাবুকে পাওয়া যাচ্ছে না।”

    “দুলালবাবু সম্পর্কে আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। তোমাদের ওসব ভুতুড়ে কাণ্ডের ফলে দুলালবাবু এখন অন্য মানুষ হয়ে গেছেন। তাঁর গায়ে এখন ভীষণ জোর, মাথায় নানা দুষ্টুবুদ্ধি।”

    “যাঃ, দুলালবাবু তো ভীষণ ভিতু, গায়ে একটুও জোর নেই।”

    “সেই দুলালবাবুর কথা ভুলে যাও। এই দুলাল সেন হল কালাপাহাড়।”

    “বটে!”

    “খুবই বটে!”

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57 58 59 60 61 62 63 64 65 66 67 68 69 70 71 72 73 74 75 76 77 78 79 80 81 82 83 84 85 86 87 88 89 90 91 92 93 94 95 96 97 98 99 100 101 102 103 104 105 106 107 108 109 110 111 112 113 114 115 116 117 118 119 120 121 122 123 124 125 126 127 128 129 130 131 132 133 134 135 136 137 138 139 140 141 142 143 144 145 146 147 148 149 150 151 152 153 154 155 156 157 158 159 160 161 162 163 164
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleহায়নার গুহা – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    Next Article অথ রম্যকথা – অনন্যা পাল

    Related Articles

    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    মানবজমিন – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    August 7, 2026
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    অসুখের পরে – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 26, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    সাঁতারু ও জলকন্যা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 26, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    ৫০টি প্রেমের গল্প – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 26, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    শীর্ষেন্দুর সেরা ১০১ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 26, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    ঘুণপোকা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 25, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অঁতোয়ান দ্য সাঁত-এক্সুপেরি
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অনীশ দেব
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাসরুর আরেফিন
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    মোহিত কামাল
    রকিব হাসান
    রজতশুভ্র মজুমদার
    রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রশীদ করীম
    রাজর্ষি দাশ ভৌমিক
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রাফিক হারিরি
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শওকত আলী
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শহীদুল্লা কায়সার
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাহীন আখতার
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শৈবাল মিত্ৰ
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রীপারাবত
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্তোষকুমার ঘোষ
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সন্মাত্রানন্দ
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমীরণ গুহ
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সরোজকুমার রায়চৌধুরী
    সাগরময় ঘোষ
    সাদাত হোসাইন
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুপ্রতিম সরকার
    সুব্রত গুহ
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সেলিনা হোসেন
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৈয়দ শামসুল হক
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বপ্নময় চক্রবর্তী
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হরিশংকর জলদাস
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    ইতি স্মৃতিগন্ধা – সাদাত হোসাইন

    September 5, 2026

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    September 5, 2026

    ঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

    September 5, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    ইতি স্মৃতিগন্ধা – সাদাত হোসাইন

    September 5, 2026

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    September 5, 2026

    ঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

    September 5, 2026
    Our Picks

    ইতি স্মৃতিগন্ধা – সাদাত হোসাইন

    September 5, 2026

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    September 5, 2026

    ঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

    September 5, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }