Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    July 14, 2026

    অথ রম্যকথা – অনন্যা পাল

    July 14, 2026

    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    July 13, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায় এক পাতা গল্প2426 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৪. বিপদে পড়লে মানুষের বুদ্ধি খোলে

    বিপদে পড়লে মানুষের বুদ্ধি খোলে। বাবুরাম যখনই বুঝতে পারলেন, বনি নিরাপদ নয় এবং তাঁদের ওপর কিছু লোক নজর রাখছে, তখন ঘাবড়ে গেলেও তিনি হাল ছাড়লেন না। বিপদ থেকে বুদ্ধি খাঁটিয়ে উদ্ধার পেতে হবে। এবং জানতে হবে, বনির জন্মের ভিতরে কী রহস্য আছে। সুতরাং ডেলাওয়্যার ওয়াটার গ্যাপের রাস্তায় সেই দুর্ঘটনার জায়গায় যাওয়া ঠিক করলেও তিনি গোপনে যাওয়াই স্থির করলেন। নিজের গাড়িতে যাওয়া চলবে না, গাড়িটা শত্রুপক্ষ নিশ্চয়ই চেনে। তা ছাড়া সেই পোডড়া বাড়িটায় যেতে গেলে শক্তপোক্ত গাড়ির দরকার, শৌখিন গাড়ি ধকল সইতে পারবে না।

    আমেরিকায় গাড়ি কেনা খুব সহজ। যে-কোনও শহরেই গাড়ির দোকানে সারি-সারি নতুন বা পুরনো গাড়ি সাজানো আছে। নগদ টাকাতেও কিনতে হবে না, ক্রেডিট কার্ডেই কেনা যায়। বাবুরাম উইক এণ্ডের আগের দিন গাড়ির ডিলারের কাছে গিয়ে খুব দেখেশুনে একটা জাপানি হোণ্ডা গাড়ি কিনলেন। জিপগাড়ির মতোই সেটার ফোর হুইল ড্রাইভের ব্যবস্থা আছে। সেলফ সিলিং টায়ার থাকার ফলে ফুটো হওয়ার ভয় নেই। পুরু ইস্পাতের পাতে তৈরি গাড়িটা খুব মজবুত। গাড়ি কিনে তিনি সেটা বাড়ি নিয়ে গেলেন না। সেটা বোকামি হবে। ডিলারকে বললেন, একটা বিশেষ জায়গায়, পার্কের ধারে যেন গাড়িটা আজ রাতের মধ্যেই রেখে আসা হয় এবং গাড়ির চাবি যেন ডিকির ভিতরে রেখে দেওয়া হয়।

    আমেরিকায় গাড়ি চুরির ঘটনা খুব কমই ঘটে। আর বেশির ভাগ গাড়িই রাস্তাঘাটেই ফেলে রাখা হয়।

    শনিবার বাবুরাম আর প্রতিভা সকালে উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলেন। তারা একসঙ্গে বোলেন না। বাবুরাম যেন কোনও কাজে যাচ্ছেন, এমনভাবে ব্যাগট্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিউ ইয়র্কের দিকে চলে গেলেন। আর প্রতিভা বনিকে প্যারামবুলেটারে বসিয়ে, যেন ছেলেকে নিয়ে একটু হাঁটতে বেরিয়েছেন, এমনভাবে বেরোলেন। পার্কের কাছাকাছি এসে তিনি গাড়িটা দেখতে পেলেন। চারদিকটা লক্ষ করে দেখলেন, কোনও সন্দেহজনক লোককে দেখা যাচ্ছে না। তিনি ধীরে ধীরে বনিকে নিয়ে গাড়িটার কাছে এসে ডিকি থেকে চাবিটা বের করে গাড়ির দরজা খুলে বনিকে কোলে নিয়ে উঠে পড়লেন। প্যারামবুলেটরটা পার্কে একটা ঝোঁপের ভিতরে খুঁজে দিলেন।

    খুব জোরে গাড়ি চালালে পাছে কেউ সন্দেহ করে এজন্য মোটামুটি স্বাভাবিক গতিতে চালিয়ে তিনি নিউ ইয়র্কের রাস্তায় খানিক দূর এগোলেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন, একটা লোক বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লিফট চাইছে।

    প্রতিভা গাড়ি থামালে বাবুরাম উঠে এলেন গাড়িতে।

    এর পর রুট এইট্টি ধরে সোজা পেনসিলভানিয়ার দিকে গাড়ি চালিয়ে দিলেন প্রতিভা।

    জায়গাটা খুঁজে পেতে বিশেষ অসুবিধে হল না। অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছিল একটা গ্যাস-স্টেশন সাইনের দু’ শো গজ দূরে, তাঁদের মনে আছে। পাশেই একজিট–অর্থাৎ হাইওয়ে থেকে বেরিয়ে ছোটখাটো শহর বা পল্লী অঞ্চলে যাওয়ার রাস্তা। প্রতিভা একজিট দিয়ে হাইওয়ে থেকে নেমে এলেন। কিছু দূর গিয়েই বাঁ ধারে জঙ্গলের সেই রাস্তাটা দেখতে পেলেন।

    হোণ্ডা গাড়িটা সত্যিই ভাল। জঙ্গলের রাস্তায় একটু টাল খেতে-খেতে দিব্যি চলতে লাগল। ঘুমন্ত বনিকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন বাবুরাম। হঠাৎ লক্ষ করলেন, বনি চোখ মেলে তাঁর দিকে চেয়ে আছে।

    ছেলেকে আদর করে বাবুরাম বললেন, “বনি, তুই কিছু বলতে চাস? খিদে পেয়েছে?”

    বনি চেয়ে থাকা ছাড়া আর খাওয়া এবং ঘুম ছাড়া আর কিছুই পারে না। তবু ওকে নিয়ে কেন যে কিছু লোকের এত মাথাব্যথা!

    জঙ্গল পার হয়ে গাড়িটা একটু ফাঁকা জায়গায় এসে পড়ল। সামনেই সেই ঝুরঝুরে পোড়ো বাড়িটা।

    বাবুরাম জিজ্ঞেস করলেন, “প্রতিভা, তোমার ভয় করছে না

    প্রতিভা মাথা নেড়ে বললেন, “না। ভয় কিসের? বনির জন্য আমি সব করতে পারি।”

    “তা হলে এসো, বাড়িটা ভাল করে দেখা যাক। বিশেষ করে বেসমেন্টটা।”

    বাবুরাম বনিকে কোলে নিয়ে নামলেন, সঙ্গে প্রতিভা। ধীরে-ধীরে তাঁরা বাড়ির মধ্যে ঢুকলেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত আমেরিকানদের বাড়ি যেমন হয় এবাড়িটাও তেমনই। একতলায় লিভিং রুম, ড্রয়িং রুম, রান্নাঘর, খাওয়ার ঘর ইত্যাদি। সবই ফাঁকা। তবে রান্নাঘরে গ্যাস উনুনটা রয়েছে। ফলে জলও আছে।

    তাঁরা ধীরে-ধীরে বেসমেন্ট-অর্থাৎ মাটির তলার ঘরটিতে নামলেন। ঘরটা মাটির তলায় হলেও স্কাইলাইট দিয়ে যথেষ্ট আলো আসছে। বিশাল ঘর। এবং এ-ঘরটাও ফাঁকা। বাবুরাম সুইচ টিপলেন। অবাক কাণ্ড! আলো জ্বলল। তার মানে, বাড়িটার ইলেকট্রিক কানেকশন এখনও আছে।

    বাবুরাম চারদিক ঘুরে দেখছিলেন। একটা ওয়েস্ট বাস্কেট ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেল না। বাবুরাম ওয়েস্ট বাস্কেটটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দেখলেন, ভিতরে দু-চারটে জিনিস রয়েছে। তার মধ্যে একটা ডিসপোজেবল ইনজেকশন, যার উঁচটা খুব লম্বা। আর লেবেলহীন কয়েকটা ইনজেকশনের অ্যামপুল। বাবুরাম জিনিসগুলি সংগ্রহ করে একটা চামড়ার ব্যাগে ভরে নিলেন।

    প্রতিভাও চারদিক ঘুরে-ঘুরে দেখছিলেন। টয়লেটটা দেখতে ঢুকলেন প্রতিভা। টয়লেটেও একটি ওয়েস্ট বাসকেট রয়েছে। প্রতিভা দেখলেন তার মধ্যে কিছু টুকরো কাগজ। তিনি টুকরোগুলো বের করলেন। দু-চারটে ব্যবহৃত টিসু পেপার। আর ভেঁড়া একটা কার্ড। কার্ডের চারটে টুকরো জুড়লেন প্রতিভা। একটা ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন। ডক্টর লিভিংস্টোনস ক্লিনিক, পোর্টল্যান্ড, পেনসিলভানিয়া।

    তিনি বাবুরামকে কার্ডটা দেখালেন। বাবুরাম সেটাও ব্যাগে ভরে নিলেন। বললেন, “আর তো কিছু দেখার নেই দেখছি।”

    প্রতিভা চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “হয়তো আছে। কিন্তু আমরা তো আর ডিটেকটিভ নই।”

    হতাশ হয়ে দু’জনে ওপরে উঠে এলেন। আর উঠেই শুনতে পেলেন জঙ্গল ভেদ করে একটা শক্তিশালী মোটরবাইক এগিয়ে আসছে। সম্ভবত তাঁদের দিকেই।

    প্রতিভার মুখ শুকনো, “শুনতে পাচ্ছ?”

    “পাচ্ছি। চলো, গাড়িতে উঠে পড়া যাক।”

    প্রায় দৌড়ে গিয়ে তাঁরা দু’জন গাড়িতে উঠলেন। বাবুরাম বনিকে প্রতিভার কোলে দিয়ে বললেন, “এবার আমি চালাব। তুমি মাথা নিচু করে বসে থাকো।”

    “মাথা নিচু করব কেন?”

    “যদি গুলি-টুলি চালায়। ওরা কেমন লোক তা তো জানি না।”

    প্রতিভা তাই করলেন। বাবুরাম গাড়িটা ঘুরিয়ে নিতে-না-নিতেই ভীমবেগে প্রকাণ্ড একটা মোটরবাইক জঙ্গল ফুড়ে ফাঁকা জায়গাটায় পড়েই ব্রেক কষল। বাইকে দু’জন লোক। দু’জনেরই মাথায় কপাল-ঢাকা টুপি, চোখে প্রকাণ্ড গগলস। মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবে বোঝা গেল, একজন শ্বেতাঙ্গ, অন্যজন কৃষ্ণাঙ্গ। দু’জনেরই বিশাল চেহারা। তাদের গাড়িটা দেখেই একজন চেঁচিয়ে ইংরিজিতে বলল, “ওই তো ওরা! রোখো ওদের।”

    জঙ্গলের রাস্তাটা সরু। মোটরবাইকটা টক করে ঘুরে গিয়ে পথটা আটকানোর চেষ্টা করল। বাবুরাম তার আগেই গাড়িটা চালিয়ে দিয়েছেন। এক সেকেণ্ডের ভগ্নাংশ সময়ের তফাতে বাবুরাম বেরিয়ে গেলেন।

    কিন্তু বেরিয়ে গিয়েও ওদের হাত থেকে রেহাই পেলেন না। সরু রাস্তায় গাড়ির চেয়ে মোটরবাইক অনেক বেশি সচল। সুতরাং বাইকটা গর্জন করতে-করতে পিছু নিয়ে ধেয়ে এল।

    প্রতিভা আতঙ্কিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “ওরা পিছু নিয়েছে কেন? কী চায় ওরা?”

    বাবুরাম দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “ওরা ভেবেছে আমরা বনিকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি। যতদূর মনে হচ্ছে ওরা আমাদের আটকাতে চাইছে।”

    বলতে বলতেই একটা গুলির শব্দ হল। বাবুরাম আয়নায় দেখলেন, বাইকের পিছনে বসা লোকটার হাতে একটা বিপজ্জনক আগ্নেয়াস্ত্র গুলিটা কোথায় লাগল কিংবা লাগল না, তা বুঝতে পারলেন না বাবুরাম। তবে তিনি গাড়িটা যতদূর সম্ভব দ্রুতবেগে চালাতে লাগলেন।

    পর-পর কয়েকবার গুলির আওয়াজ হল। প্রতিভা বনিকে বুকে চেপে উপুড় হয়ে ছিলেন। বললেন, “তোমাকে যে ওরা মেরে ফেলবে।”

    বাবুরাম বললেন, “বোধ হয় পারবে না। মনে হচ্ছে গাড়ির কাঁচগুলোও বুলেটপ্রুফ। ঠাকুরকে ডাকো প্রতিভা।”

    হোণ্ডা গাড়িটা লাফিয়ে লাফিয়ে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে চলছে, কিন্তু মোটরবাইকটাও সমানে পাল্লা দিচ্ছে। এভাবে রেস দিয়ে কতক্ষণ পারা যাবে? বাবুরাম এ-ও জানেন, পালাতে পারলেও লাভ নেই। এরা গিয়ে এদের দলকে জানাবে এবং তাঁর গাড়ি খুঁজে বের করতে ওদের অসুবিধে হবে না। বিশেষ করে বাবুরামের পালিয়ে থাকার জায়গা নেই। সুতরাং তিনি মাথা খাটাতে লাগলেন। যেমন করেই হোক এদের নিষ্ক্রিয় করা দরকার।

    জঙ্গল সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও ঘন, কোথাও পাতলা, মাঝে-মাঝে ফাঁকা জায়গাও আছে। সামনে এরকম একটা ফাঁকা জায়গা দেখতে পেয়ে বাবুরাম দাঁতে দাঁত চেপে তৈরি হলেন। এখন তাঁকে একটা নিষ্ঠুর কাজ করতে হবে। এরকম কাজ তিনি জীবনে কখনও করেননি। তবে আত্মরক্ষার জন্য এ ছাড়া আর পথও নেই।

    বাবুরাম চাপা স্বরে বললেন, “প্রতিভা, ভয় পেও না। বনিকে খুব শক্ত করে চেপে ধরে থাকো, আর নিজেও সাবধান হও। একটা ঝাঁকুনি লাগতে পারে।”

    ফাঁকা জায়গাটার চারধারে বিশাল বিশাল গাছ। বাবুরাম ফাঁকায় পড়েই বাঁ দিকে বাঁক নিলেন। গাড়িটা বোধ হয় খানাখন্দে পড়ে লাফিয়ে উঠল। কিন্তু থামল না। বাবুরাম অ্যাকসেলেটরে প্রবল চাপ দিয়ে স্টিয়ারিং ডান দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। আচমকা বাঁক নিয়ে গাড়িটা উলটো মুখে ঘুরে যেতেই বাবুরাম দেখলেন মোটরবাইকটা লাফাতে লাফাতে ফাঁকায় এসে পৌঁছেছে। বাবুরাম আর দেরি করলেন না। সোজা গাড়িটা চালিয়ে দিলেন মোটরবাইকটার দিকে।

    প্রবল একটা ধাতব সংঘর্ষের শব্দ হল। দু’জন লোক ছিটকে এবং খানিকটা উড়ে গিয়ে দু’ধারে পড়ল। মোটরবাইকটা একটা ডিগবাজি খেয়ে দুমড়ে-মুচড়ে গেল।

    বাবুরাম গাড়ি থামালেন।

    প্রতিভা সাদা মুখে বললেন, “কী হল?”

    “যা হওয়ার হয়ে গেছে। তোমরা ঠিক আছ?”

    “আছি।”

    বাবুরাম গাড়ি থেকে নামলেন। শ্বেতাঙ্গ লোকটার মাথা একটা গাছের গুঁড়িতে লেগে থেতলে গেছে। লোকটা মরেনি বটে, কিন্তু অজ্ঞান হয়ে আছে। প্রচর রক্তে ভেসে যাচ্ছে ওর উইনচিটার। কালোলোকটার অবস্থা খুবই খারাপ। ওর পিস্তলের নল গলায় ঢুকে গেছে। লোকটার ঘাড়ও মনে হল ভাঙা।

    বাবুরাম ঘামছিলেন। তাঁর বমি পাচ্ছিল। বিবর্ণ মুখে ফিরে এসে গাড়িতে বসে তিনি বললেন, “প্রতিভা, একটা লোককে আমি মেরে ফেলেছি। অন্যটার কথা বলতে পারছি না।”

    প্রতিভা সোজা হয়ে বসে বললেন, “যা করেছ সে তো ইচ্ছে করে নয়। না মারলে ওরাই আমাদের মারত। তোমাকে আর গাড়ি চালাতে হবে না। বনিকে নিয়ে বোসো। আমি গাড়ি চালাচ্ছি।”

    বাবুরামের হাত পা থর-থর করে কাঁপছে। পাংশুমুখে তিনি বললেন, “আমাদের কি উচিত নয় ওদের হাসপাতালে নিয়ে পৌঁছে দেওয়া?”

    প্রতিভা মাথা নেড়ে কঠিন গলায় বললেন, “হাসপাতালে পৌঁছে। দিলে আমাদের অনেক জবাবদিহির মধ্যে পড়তে হবে।”

    “এভাবে পড়ে থাকলে ওরা এমনিতেই মরে যাবে প্রতিভা।”

    প্রতিভা একটু ভাবলেন। বিপদে পড়লে পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের মাথাই বেশি ঠাণ্ডা থাকে। ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, “ডক্টর লিভিংস্টোনের ক্লিনিককে ফোন করলে কেমন হয়। পোর্টল্যাণ্ড শহরটা এখান থেকে খুব কাছে।”

    বাবুরাম মাথা নেড়ে বললেন, “সেটা তবু ভাল।”

    প্রতিভা গাড়ি চালাতে লাগলেন। বনিকে কোলে নিয়ে বসে বাবুরাম নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে পড়ছে। কষ্ট প্রতিভারও হচ্ছে। দু-দুটো লোককে ওভাবে জখম করা তো সোজা নিষ্ঠুর কাজ নয়। কিন্তু প্রতিভার বাস্তববোধ বেশি। তিনি জানেন এ ছাড়া উপায় ছিল না।

    গ্যাস স্টেশনটায় এসে প্রতিভা গাড়ি থামিয়ে তেল ভরে নিতে লাগলেন। বাবুরাম গিয়ে ডক্টর লিভিংস্টোনের ছেঁড়া কার্ডটা বের করে ফোন নম্বর দেখে ডায়াল করলেন।

    একজন মহিলা ফোন তুলে বললেন, “ডক্টর লিভিংস্টোনের ক্লিনিক।”

    বাবুরাম কাঁপা গলায় বললেন, “ম্যাডাম, জঙ্গলের মধ্যে দুটো লোক সাঙ্ঘাতিক আহত, ওদের সাহায্য দরকার।”

    “কোন জঙ্গল?”

    বাবুরাম কাঁপা গলাতেই কোনওরকমে জায়গাটার বিবরণ দিলেন।

    “কীরকম অ্যাকসিডেন্ট?”

    “খুব গুরুতর। ওদের মেডিক্যাল অ্যাটেনশন দরকার। ওদের মোটরবাইক….”।

    বাবুরাম হঠাৎ সতর্ক হয়ে গেলেন। হঠাৎ মেয়েটির গলা তীক্ষ্ণ শোনাল, “আপনি কে বলছেন?”

    “আমার নাম বাবুরাম গাঙ্গুলি।”

    “ওঃ।” বলে মেয়েটি এমনভাবে চুপ করে গেল যেটা বেশ সন্দেহজনক মনে হল বাবুরামের।

    “আপনারা কি ব্যবস্থা নেবেন?”

    মেয়েটি হঠাৎ মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করল, “এই ক্লিনিকের ফোন নম্বর আপনাকে কে দিল মিস্টার গাঙ্গুলি?”

    “একটা গ্যাস স্টেশনের টেলিফোন ডিরেক্টরিতে।” বাবুরাম কোনওরকমে বানিয়ে বললেন।

    “ঠিক আছে মিস্টার গাঙ্গুলি, আমাদের অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে। আপনি। স্পটের কাছে হাইওয়েতে অপেক্ষা করুন।”

    “আচ্ছা।” বলে বাবুরাম ফোন ছেড়ে তাড়াতাড়ি এসে গাড়িতে উঠলেন। বনিকে সিট থেকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, “প্রতিভা, তাড়াতাড়ি করো। আমার সন্দেহ হচ্ছে ওই ক্লিনিকটা খুব সুবিধের নয়।”

    প্রতিভা প্রশ্ন না করে গাড়ি ছেড়ে দিলেন। একটু এগিয়ে গিয়েই তিনি একটা একজিট ধরে হাইওয়ে থেকে নেমে অনেকটা ঘরে উলটো দিকের পথ ধরতে আবার হাইওয়েতে উঠে এলেন।

    বাবুরাম চোখ বুজে ছিলেন। বিড়বিড় করে বললেন, “বাড়িতে ফিরে যাওয়াটাও এখন নিরাপদ হবে কি না কে জানে!”

    “প্রতিভা দৃঢ় গলায় বললেন, “ভয় নেই, আমরা বাড়ি যাচ্ছি না।”

    “তা হলে কোথায়?”

    জার্সি শহরের একটু বাইরের দিকে কয়েকটা পুরনো গুদামঘরের একটা সারি আছে। এখানে কিছু ভবঘুরে আস্তানা গেড়ে আছে। পুলিশ মাঝে-মাঝে এসে জায়গাটা তল্লাশ করে যায়। প্রতিভা সোজা এসে গুদামঘরের চত্বরে গাড়ি থামালেন।

    প্রথমে দু-চারটে বাচ্চা ছুটে এল। পিছনে এক বুড়ি। এরা খুব সন্দিহান স্বভাবের লোক। উগ্রও বটে। ভ ভদ্রলোকদের এরা একদম পছন্দ করে না।

    বুড়ি একটু এগিয়ে এসে বলল, “কী চাই?”

    প্রতিভা জিজ্ঞেস করলেন, “ফ্রেড কোথায়?”

    “তোমরা কি পুলিশের লোক?”

    “না। ফ্রেডকে এবং তার দলবলকে বলল, আমি বনিকে নিয়ে এসেছি। আমার সাহায্য চাই।”

    এই কথাবার্তার মাঝখানেই বিভিন্ন দরজা দিয়ে কয়েকজন নোংরা চেহারার মেয়ে আর পুরুষ বেরিয়ে এল। প্রত্যেকের চেহারাতেই একটা উগ্র ভাব।

    বনিকে কোলে নিয়ে বাবুরাম নেমে চারদিকে চেয়ে বললেন, “এ কোথায় নিয়ে এলে প্রতিভা? এ যে ভবঘুরেদের আস্তানা। এরা ভয়ঙ্কর লোক”।

    প্রতিভা মৃদুস্বরে বললেন, “এখন এ ছাড়া উপায় নেই।”

    মেয়ে পুরুষগুলো এগিয়ে এসে তাঁদের একরকম ঘিরে ফেলল। হঠাৎই তাদের মধ্যে একটি মেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এ তো সেই বাচ্চাটা! এই তো সেই দেবশিশু! দ্যাখো, দ্যাখো, ওর চোখের রং পালটে যাচ্ছে!”

    বাবুরাম আর প্রতিভাও দেখলেন। বনির কালো চোখ হঠাৎ নীলকান্তমণি হয়ে উঠেছে। যেন আলো বেরিয়ে আসছে চোখ দিয়ে।

    সকলে খানিকক্ষণ পরস্পরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে বনির দিকে বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে একে-একে হাঁটু গেড়ে বসে ভূমি চুম্বন করল। সেই বুড়িটা প্রায় কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তোমাদের আমরা কী সাহায্য করতে পারি?”

    প্রতিভা সংক্ষেপে বললেন, “শোনো, বেশি কথা বলার সময় নেই। কিছু দুষ্টু লোক আমাদের ছেলেটাকে চুরি করতে চায়। তারা আমাকে আর আমার স্বামীকে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। আমরা ভারতবর্ষে চলে যেতে চাই। তোমরা আমাদের সাহায্য করবে?”

    একজন পুরুষ বলল, “অবশ্যই করব। কী করতে বলল?”

    “আমাদের বাড়ির ওপর ওরা নজর রেখেছে। আমাদের সেখানে যাওয়ার উপায় নেই। কিন্তু আমাদের পাশপোর্ট চাই, প্লেনের টিকিট চাই। সবই আমাদের বাড়ির মধ্যে রয়েছে।”

    পুরুষটি একটু হাসল, “ওটা কোনও ব্যাপার নয়।”

    প্রতিভা বলল, “টিকিট বা পাশপোর্ট বের করে আনা বিপজ্জনক হবে। ওরা খুব খারাপ লোক খুনখারাপিও করতে পারে।”

    বুড়িটা বলল, “ভেবো না বাছা। আমরা অনেক সুলুকসন্ধান। জানি। একটা বাড়িতে ঢুকে কী করে জিনিস বের করতে হয় তা আমাদের বাচ্চারাও জানে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।”

    প্রতিভা বললেন, “আমাদের এই গাড়িটাও লুকিয়ে ফেলা দরকার। এটা ওরা বোধ হয় চিনে ফেলেছে!”

    বাবুরাম অবাক হয়ে বললেন, “কী করে?”

    “যে গ্যাস স্টেশনে আমরা তেল ভরেছি সেখানেও ওরা খোঁজ নেবে এবং উন্ডেড লোক দুটোও বলে দিতে পারে। সাবধানের মার নেই।”

    বাবুরাম গলা চুলকে বললেন, “তা বটে। বিপদে তোমার বুদ্ধি খোলে। কিন্তু আমার বুদ্ধি ঘুলিয়ে যাচ্ছে।”

    “ঘাবড়াবার কিছু নেই। এরা বনিকে দেবশিশু বলে ধরে নিয়েছে। এরা ওকে বাঁচাবেই।”

    “কিন্তু দেশে ফিরতে হলে আমাদের টাকা চাই। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলার কী হবে? আজ যে ব্যাঙ্ক বন্ধ। সেই সোমবার খুলবে।”

    “ওটা নিয়ে ভেবো না। দেশে যেতে আমাদের সামান্য টাকা লাগবে। শুধু এয়ারপোর্টে যাওয়ার যেটুকু খরচ। আমার ব্যাগে পাঁচশো ডলার আছে। যথেষ্ট। দেশে গেলে টাকার তো অভাব হবে না।”

    বাবুরাম তবু বললেন, “লাগেজ? আমাদের সঙ্গে তো জিনিসপত্র কিছুই নেই।”

    “লাগবে না। তুমি বনিকে আমার কাছে রেখে কাছাকাছি কোনও জায়গা থেকে প্যান অ্যাম-এর কাছে খোঁজ করে দ্যাখো আজকের ফ্লাইটে দুটো সিট পাওয়া যায় কি না। যদি ভারতবর্ষের টিকিট না পাওয়া যায় তা হলেও ক্ষতি নেই। আমরা ইউরোপ পৌঁছতে পারলেও হবে। সেখানে দু’দিন অপেক্ষা করে দেশে ফিরবার ব্যবস্থা করব।”

    বাবুরাম এই প্রস্তাব মেনে নিলেন।

    পুরুষটি এগিয়ে এসে বলল, “তোমরা কী নিয়ে আলোচনা করছ। তা জানতে পারি?”

    প্রতিভা লোকটাকে তাঁদের সমস্যার কথা বুঝিয়ে বললেন।

    লোকটা মন দিয়ে শুনে বলল, “নো প্রবলেম। তোমাদের কিছু জামাকাপড় আমি একটা স্যুটকেসে ভরে নিয়ে আসব। আলমারির চাবি দাও, ডলারও বের করে আনব। আমি তোমাদের গাড়িটা নিয়েই যাচ্ছি। গাড়িটা আমি ফিরিয়ে আনব না। আর যদি কাউকে টেলিফোন করতে চাও তো ওই যে ল্যাম্পপোস্টটা দেখছ ওর পরেই বাঁ ধারে পাবলিক টেলিফোন পাবে।”

    লোকটা গাড়ি নিয়ে চলে গেল। বাবুরাম গেলেন টেলিফোন করতে। দুরুদুরু বুকে প্রতিভা ভবঘুরেদের সঙ্গে তাদের নোংরা ঘরে গিয়ে বনিকে নিয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

    প্রায় এক ঘন্টা বাদে বাবুরাম ফিরে এসে বললেন, “প্যান অ্যাম-এর দিল্লি ফ্লাইটে দুটো সিট পাওয়া গেছে।”

    প্রতিভা চিন্তিত মুখে বললেন, “এখন ভালয়-ভালয় প্লেনে উঠতে পারলে হয়”।

    বুড়িটা এসে তাদের সামনে দুটো প্লাস্টিকের প্লেটে কিছু খাবার রেখে বলল, “শোনো বাছারা, যদি দুষ্ট লোকের চোখে ধুলো দিয়ে পালাতে হয় তা হলে ওরকম বাবু বিবির মতো পোশাক পরলে চলবে। এই আমাদের মতো উলোঝুলো পোশাক আর উইগ চাই।”

    ওরকম নোংরা পোশাক পরার প্রস্তাবে বাবুরাম নাক সিটকোলেন। কিন্তু প্রতিভা বললেন, “আমরা ওই পোশাকই পরব বুড়িমা, আমাদের জোগাড় করে দাও।”

    বুড়ি নির্বিকার মুখে বলল, “আমাদের দুটো বুড়োবুড়ি সেদিন মারা গেছে। ওই মেপল গাছটার তলায় তাদের পুঁতে দিয়েছি। তাদের একজোড়া পোশক আমার কাছে আছে। অন্য কেউ হলে পোশাক দুটোর জন্য অন্তত পাঁচ ডলার নিতুম। তোমাদের কাছ থেকে নেব না। তোমরা বনির মা বাবা কি না।”

    বুড়ি পোশাক দুটো এনে দিল। একজোড়া পরচুলাও। পোশাক বলতে অত্যন্ত ময়লা একটা ঘন নীল রঙের কোট আর তাপ্লিমারা ট্রাউজার্স, একটা বেঢপ কামিজ আর জিনসের প্যান্ট।

    বাবুরাম পোশাক দেখে বিবর্ণ হলেন ঘেন্নায়। প্রতিভা চাপাস্বরে বললেন, “বাঁচবার জন্য সব কিছু করতে হয়। ঘেন্না পেলে চলবে না।”

    .

    বাবুরামের বাড়ি থেকে অন্তত আধ মাইল দূরে হোন্ডা গাড়িটা একটা লেন-এর মধ্যে নিয়ে গেল মাইক-অর্থাৎ ভবঘুরে পুরুষটি। তারপর একটা আজঙ্গল জায়গায় গাড়িটা ঢুকিয়ে দিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা হল। সমস্ত অঞ্চলটা মাইকের নখদর্পণে। কাজেই বড় রাস্তা ছেড়ে নানা ছোটখাটো বাজে-রাস্তা পেরিয়ে সে বাবুরামের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে চারদিকটা ভাল করে লক্ষ করল। এমনিতেই শহর দিনের বেলায় জনশূন্য থাকে। তবে আজ উইক এন্ড শুরু হয়েছে বলে অনেকে ঘরের কাজ করতে বাড়িতে রয়েছে।

    সন্দেহজনক কিছু না দেখে মাইক রাস্তাটা পেরিয়ে বাবুরামের দরজায় উপস্থিত হল। ভবঘুরেরা ভিক্ষে-টিক্ষে চেয়ে বেড়ায়, সুতরাং তাকে চট করে কেউ সন্দেহ করবে না। মাইক চারপাশটা দেখে নিয়ে দরজাটা পরীক্ষা করল। কাঠ আর কাঁচের দরজা। খোলা শক্ত নয়। সাধারণ তালা। কেউ লক্ষ রাখছে কি না আড়াল থেকে কে জানে। সুতরাং ডোরবেলটা বারকয়েক বাজানোই ভাল। নজরদার তা হলে বুঝবে যে, সে ভিক্ষে চাইতেই এসেছে।

    কিন্তু ডোরবেল বাজাতেই মাইক অবাক হয়ে দেখল, দরজাটা খুলে গেল। দরজা জুড়ে প্রকাণ্ড একটা শ্বেতাঙ্গ। বজ্রগম্ভীর গলায় লোকটা বলল, “কী চাও?”

    মাইক ঘাবড়ে যাওয়ার মানুষ নয়। মুখটা একটু বিকৃত করে বলল, “রুটিটুটি কিছু আছে?”

    “দূর হও!” বলে লোকটা দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিল।

    “দাঁড়াও।” বলে মাইক তার জুতো দরজার ফাঁকে ঢুকিয়ে সেটা আটকাল।

    দৈত্যাকার লোকটা বিভীষণ মুখে মাইকের দিকে তাকিয়ে তার দুঃসাহস দেখছিল।

    মাইক বলল, “আমি খবর এনেছি। বনির খবর।”

    লোকটা দরজা খুলে বিনা বাক্যব্যয়ে মাইকের কোটের কলার ধরে প্রায় ইঁদুরছানার মতো তুলে ঘরে টেনে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। “বনির খবর তুমি জানো? বলল কী খবর, বনি কোথায় আছে?”

    লোকটা তার কলার ছাড়েনি। এরকম শক্তিশালী লোকের পাল্লায় এর আগে কখনও পড়েনি মাইক। সে হাঁফাতে-হাঁফাতে বলল, “বলছি বলছি। কিন্তু আমি কী পাব?”

    “পাবে! বলেই লোকটা তাকে শূন্যে তুলে মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বুকের ওপর একটা ভারী পা তুলে দাঁড়াল, নোংরা নেশাখোর, চোর, বাউণ্ডুলে, তোমাকে যে খুন না করে ছেড়ে দেব সেটাই বড় পাওনা বলে জেনো। এখন ঝেড়ে কাসো তো বাছাধন, বনি কোথায়?”

    মাইক বুঝল, এই দৈত্যের হাত থেকে রেহাই পাওয়া শক্ত হবে। শুধু এ লোকটাই নয়, আড়চোখে সে দেখতে পেল, আরও দুটো লোক লিভিংরুমের দরজার কাছে বুকে আড়াআড়ি হাত রেখে দাঁড়িয়ে। তাদের চেহারা ভাড়াটে খুনির মতোই। এরকম বিপদে পড়তে হবে জানলে সে বোকার মতো কিছুতেই ডোরবেল বাজাত ভারী পায়ের চাপে বুকের পাঁজরা মড়মড় করছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে মাইকের। সে চি-চি করে বলতে চেষ্টা করল, “বনিকে দিয়ে তোমরা কী করবে? সে দেবশিশু।”

    “সে খবরে তোর কী দরকার? সোজা কথায় জবাব দে, বনি কোথায়? তার মা বাবাকেও আমরা চাই। বাবুরাম আর তার বউ দুই শয়তান আমাদের আদেশ অমান্য করেছে, ওদের বেঁচে থাকবার অধিকার নেই।”

    বুটের নিষ্পেষণে মাইকের বুকে এত যন্ত্রণা হচ্ছিল যে, সে আর বেশিক্ষণ চেতনা ধরে রাখতে পারবে না।

    বাবুরামের বাড়ির অভ্যন্তরে যখন এই ঘটনা ঘটছে তখন বাড়ির বাইরে আরও একটি ঘটনা দানা বাঁধছে। বাড়ির অনতিদূরেই অনেকক্ষণ ধরে একটি ছোট গাড়ি পার্ক করা আছে। গাড়ির কাঁচ স্বচ্ছ বলে ভিতরটা দেখা যায় না। বাতানুকুল গাড়ির অভ্যন্তরে দু’জন মানুষ পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে অনেকক্ষণ। তারা দেখেছে, একজন ভবঘুরে এল এবং তাকে অত্যন্ত কর্কশভাবে টেনে নেওয়া হল ভিতরে।

    দু’জনের একজন বেঁটেখাটো ডক্টর ওয়াং। তিনি হঠাৎ মৃদুস্বরে বললেন, “যতদূর মনে হচ্ছে, বাড়ির ভিতরে আসল লোকেরা নেই। কিছু অবাঞ্ছিত লোক ঢুকে পড়েছে। আর ওই ভবঘুরেটা, নাঃ, ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে লি চিং।”

    “আমি আপনার সঙ্গে যাব কি?”

    ওয়াং মাথা নেড়ে বললেন, “কক্ষনো নয়। আমেরিকায় আমার লোকবল সামান্য। তোমার কিছু হলে আমি দুর্বল হয়ে পড়ব।”

    “কিন্তু আপনার যদি কিছু হয় ডক্টর ওয়াং?”

    ওয়াং মাথা নাড়লেন, “বর্বররা কখনওই আমার ক্ষতি করতে পারে না। জীবনে আমি অজস্র বিপদে পড়েছি। তুমি সতর্ক সজাগ হয়ে বাড়িটার ওপর নজর রাখো। আমাকে ভিতরে ঢুকতে হবে।”

    ওয়াং গাড়ি থেকে নেমে সোজা গিয়ে ডোরবেল টিপলেন।

    দু সেকেণ্ডের মধ্যে দরজা খুলে গেল। একজন ছিপছিপে লম্বা বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের মতো চেহারার লোক দরজার সামনে দাঁড়াতেই ওয়াং মাথা নত করে অভিবাদন জানিয়ে একগাল হেসে বললেন, “সেই ওয়াণ্ডার চাইল্ড বনিকে দেখতে এসেছি আমি।”

    “আপনি কে?”

    “ডক্টর ওয়াং–একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান বৈজ্ঞানিক। পদার্থবিদ এবং ইলেকট্রনিক্স বিশেষজ্ঞ।”

    “বনি এখন নেই। ওরা বেড়াতে গেছে।”

    ওয়াং ফের অভিবাদন করে বললেন, “আমি জানি কৌতূহলী মানুষেরা আপনাদের বিরক্ত করে। দয়া করে বিরক্ত হবেন না। আমি যথেষ্ট ধনী ব্যক্তি। শিশুটিকে পাঁচ মিনিট পরীক্ষা করতে দিলে আমি তার জন্য পাঁচশো ডলার দিতে প্রস্তুত।”

    লোকটা হাত বাড়িয়ে বলল, “আগে পাঁচশো ডলার দাও, তারপর দেখব কী করা যায়।”

    “অবশ্য, অবশ্য।” বলে ওয়াং হিপ-পকেট থেকে যে নোটের তাড়াটা বের করলেন তাতে একশো ডলারের নোটে অন্তত হাজার-দশেক ডলার আছে। অত্যন্ত অমায়িকভাবে ওয়াং পাঁচখানা নোট লোকটার হাতে দিয়ে বললেন, “আমি ধন্য।”

    লম্বা লোকটা দরজাটা আর-একটু ফাঁক করে ধরে বলল, “চলে আসুন।”

    ওয়াং ঘরে ঢুকতেই একটা হোঁচটের মতো খেলেন। তাঁর মনে হল, ঠিক হোঁচট এটা নয়, ওই লোকটাই তার জুতোর ডগায় একটু ঠোক্কর মারল।

    লোকটা দরজাটা বন্ধ করে দিল।

    সামনের দৃশ্যটা দেখে ওয়াং-এর যেন মুখ শুকিয়ে গেল। হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এ কী? এসব কী হচ্ছে এখানে! অ্যাঁ!”

    দৈত্য-চেহারার লোকটা মাইকের বুক থেকে পা নামিয়ে ওয়াং-এর দিকে ফিরে বলল, “এ লোকটা চোর।”

    ওয়াং পকেট থেকে রুমাল বের করে কাঁপা কাঁপা হাতে কপালের ঘাম মুছতে-মুছতে বললেন, “চোর! চোর খুবই খারাপ জিনিস।”

    প্রকাণ্ড লোকটা হাত বাড়িয়ে ওয়াং-এর সঙ্গে করমর্দন করে বলল, “এই বিশ্রী ব্যাপারটা তোমাকে দেখতে হল বলে দুঃখিত ডক্টর ওয়াং। আমার নাম জন স্মিথ।”

    ওয়াং খুব অমায়িক গলায় বললেন, “আপনার পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলাম মিস্টার স্মিথ। কিন্তু আমি সেই অদ্ভুত শিশুটিকে দেখতে চাই।”

    “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই ডক্টর ওয়াং। আগে এই চোরটার একটা ব্যবস্থা করে নিই।”

    ওয়াং মেঝেয় আধমরা হয়ে পড়ে থাকা মাইকের দিকে তাকালেন। লোকটা ভবঘুরে। ওয়াং খুব বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “এ লোকটার অপরাধ কী? ও কী করেছে?”

    মাইক নিজের বুক চেপে ধরে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে বলল, “আমাকে ছেড়ে দাও, বনি কোথায় আছে আমি জানি না, টাকার লোভে মিথ্যে কথা বলেছিলুম।”

    দৈত্যাকার লোকটা একটা রবার হোসের টুকরো জ্যাকেটের তলা থেকে বের করে সজোরে মাইকের গালে বসিয়ে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে মাইক যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো শিউরে উঠে অজ্ঞান হয়ে গেল।

    ওয়াং অত্যন্ত নাভাস হয়ে বললেন, “আমি…আমি কোনও নিষ্ঠুর দৃশ্য সহ্য করতে পারি না। আমার শরীর অস্থির লাগছে…”

    সেই লম্বা নোকটা পিছন থেকে এসে ওয়াং-এর কাঁধে হাত রেখে বলল, “আপনি বসুন ডক্টর ওয়াং।”

    একরকম চেপেই সে ওয়াংকে সোফায় বসিয়ে দিল। ওয়াং টের

    পেলেন, বসানোর সময় তাঁর হিপ পকেট থেকে লোকটা ডলারের বান্ডিলটা অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে তুলে নিল।

    ওয়াং বসে রুমালে কপাল মুছলেন। তারপর রুমালটা বুক পকেটে রাখলেন। তাঁর কুশলী হাতে পকেট থেকে একটা ডটপেন উঠে এল।

    ওয়াং কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “মিস্টার জন স্মিথ, আমি একটু জল খেতে চাই।”

    স্মিথ তাঁর সামনে এসে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে বলল, “নিশ্চয়ই ডক্টর ওয়াং। এই টম, একটু জল আনো।”

    টম জল আনতে গেল। স্মিথ ওয়াং-এর দিকে চেয়ে একটু হাসল। তারপর কী হল তা স্মিথ কখনও বলতে পারবে না। পিং করে একটা মৃদু শব্দ সে শুনল। তারপর আর তার কিছু মনে নেই।

    তিন নম্বর লোকটা লিভিং রুমে টিভি চালিয়ে কোনও প্রোগ্রাম দেখছিল। ওয়াং নিঃশব্দে লিভিং রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। লোকটা তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে অবাক হয়ে কী যেন বলতে যাচ্ছিল। বলাটা আর হয়ে উঠল না তার। একটা ছোট্ট ছুঁচ গিয়ে সোজা তার মুখগহ্বরে ঢুকে গেল।

    টম জল নিয়ে রান্নাঘর থেকে শিস দিতে দিতে ফিরে আসছিল। আচমকাই ঘাড়ে একটা সূক্ষ্ম ব্যথা টের পেল সে। জলের গেলাসটা পড়ে গেল হাত থেকে। তারপর সেও পড়ল।

    ওয়াং আর দেরি করলেন না। বাড়িটা ঘুরে দেখে নিলেন। বুঝলেন, বনি ও বাড়িতে তো নেই-ই, সম্ভবত কারও ভয়ে ওরা পালিয়েছে।

    ওয়াং আগে গুন্ডাদের পকেট থেকে তাঁর ডলারগুলো বের করে নিলেন। তারপর ঠাণ্ডা জল নিয়ে এসে মাইকের পরিচর্যা করতে বসলেন। তার বুকে আর কপালে অত্যন্ত কুশলী হাতে কিছুক্ষণ মাসাজ করার পর মাইক ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চোখে আতঙ্ক।

    ওয়াং বললেন, “কোনও ভয় নেই।”

    “ওরা কোথায়?”

    ওয়াং হেসে বললেন, “ঘুমোচ্ছে। ওই দ্যাখো কী নিশ্চিন্ত ঘুম!”

    মাইক উঠে বসল। যেন গ্রহান্তরের জীব দেখছে এমনভাবে ওয়াং-এর দিকে হাঁ করে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, “তুমি এই তিনটে দানবের মহড়া একা নিয়েছ! তাজ্জব। তোমাকে তো এরা মশামাছির মত টিপে মেরে ফেলতে পারে।”

    ওয়াং খুব অমায়িকভাবে বলল, “দুর্বলের ভগবান আছেন। আর আছে ঈশ্বরদত্ত বুদ্ধি এবং কৌশল। এখন ওঠো। এখানে থাকা আর আমাদের পক্ষে নিরাপদ নয়।”

    “দাঁড়াও। আমার কিছু কাজ আছে।”

    এই বলে মাইক টপ করে উঠে সোজা দোতলায় শোওয়ার ঘরে গিয়ে ঢুকল। কাবার্ড থেকে নির্দিষ্ট অ্যাটাচি কেস এবং বাক্স থেকে টাকার একটা বান্ডিল বের করে নিল। তারপর নেমে এসে বলল, “আমি যাচ্ছি। তোমাকে ধন্যবাদ।”

    ওয়াং নিচু হয়ে অভিবাদন করে বললেন, “মাননীয় মহাশয়, তুমি অবশ্যই যেতে পারে। কিন্তু তোমাকে নিশ্চিন্ত করার জন্যই জানাতে চাই যে, আমি খুব ভাল লোক। আমি এদের মতো বদমাশ নই। আর তোমাকেও গৃহস্বামীর অনুপস্থিতিতে কিছু চুরি করে পালাতে দিতে পারি না।”

    মাইক ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “আমি চুরি করছি না।”

    “তোমার হাতে একটা অ্যাটাচি কেস দেখতে পাচ্ছি। ওটা তোমার নয়। কারণ তোমার পোশাকটোশাক বা চেহারার সঙ্গে ওই দামি জিনিসটা মানাচ্ছে না।”

    মাইক নিরুপায় হয়ে বলল, “এটা এ বাড়ির মালিকের জন্যই নিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বাস করো।”

    “বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। প্রমাণ কী?” মাইক সন্দিহান চোখে লোকটাকে নিরিখ করে বলল, “তোমাকে বলা যাবে না।”

    “তা হলে তোমাকেও ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়।”

    মাইক বিপন্ন হয়ে চোখ মিটমিট করে বলল, “ওরা খুব বিপদে পড়েছে। কিছু দুষ্ট লোক ওদের খুন করে ওদের বাচ্চাটাকে চুরি করতে চাইছে।”

    ওয়াং মাইকের কাঁধে হাত রেখে বলল, “পাঁচশো ডলার পেতে তোমার কেমন লাগবে?”

    “খুব ভাল। কিন্তু আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।”

    “বিশ্বাসঘাতকতা করার দরকার হলে আমি তোমার মুখ থেকেই জোর করে কথা বের করতে পারতুম। মনে রেখো ডক্টর ওয়াং একজন জিনিয়াস। আমার কাছে এমন জিনিস আছে যা দিয়ে তোমাকে অবশ বিহ্বল করে কথা বের করতে পারি। কিন্তু আমি সেরকম লোক নই।”

    “তোমাকে বিশ্বাস করি কী করে?”

    “করলে ঠকবে না। বনি নামক বাচ্চাটির যে অলৌকিক ক্ষমতা আছে তা আমি জানি। আমি তাকে একবার দেখব বলে পৃথিবীর আর এক প্রান্ত থেকে অনেক কষ্ট করে ছুটে এসেছি। যতদূর অনুমান করছি এইসব বদমাশদের ভয়ে বনিকে নিয়ে তার মা বাবা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং তুমি তাদের সাহায্য করছ। খুব ভাল কথা। আমার মনে হয় সেটাই উচিত। তবে একটুক্ষণের জন্য হলেও বনিকে আমি দেখতে চাই।”

    মাইক দ্বিধায় পড়লেও বুঝল, এ-লোকটাকে এড়ানো সহজ হবে। লোকটা ভয়ঙ্কর ধূর্ত। তবে মাইককে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে বলে মাইক খানিকটা কৃতজ্ঞও বোধ করছিল। দোনোমোনো করে সে বলল, “দ্যাখো, তোমাকে আমি নিয়ে যেতে রাজি। কিন্তু আমাদের ডেরায় ঢুকে কোনওরকম বেগড়বাঁই করলে কিন্তু আমরা সবাই মিলে তোমাকে ঢিট করে দেব।”

    ওয়াং আবার প্রাচ্য রীতিতে অভিবাদন করে বলেন, “কথা দিচ্ছি বনির কোনও ক্ষতি আমরা করব না। আমি ভাল লোক।”

    মাইক অগত্যা ওয়াং-এর সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে তার ছোট্ট গাড়িটায় উঠল। সতর্কতার জন্য ওয়াং-এর নির্দেশে গাড়িটি নানা ঘুরপথে চালানো হল কিছুক্ষণ। তারপর ওয়াং বললেন, “নাঃ, কেউ আমাদের অনুসরণ করছে না। মাইক, এবার তুমি তোমার ডেরার পথ দেখাও।”

    .

    মাইককে গাড়িতে চেপে অন্য লোকের সঙ্গে ডেরায় আসতে দেখে ভবঘুরেরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিন্তু ওয়াং গাড়ি থেকে নেমে সকলকে এমন বিনীতভাবে প্রচুর অভিবাদন করতে লাগলেন। যে, ভবঘুরেরা তাঁর সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসতে পারল না।

    বাবুরাম একটু দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিলেন। দেখতে-দেখতে হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা খবর চিড়িক দিয়ে গেল। এ-লোকটা ডক্টর ওয়াং না? চিনের বিশ্ববিখ্যাত দেশত্যাগী বৈজ্ঞানিক! বাঁ গালে লাল জড়লটা অবধি আছে। কিন্তু গতকালই তো এন বি সির খবরে বলেছে, ডক্টর ওয়াং লন্ডনে সেফ কাস্টডি থেকে পালিয়ে গেছেন। তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না গত বুধবার থেকে।

    বাবুরাম এগিয়ে এসে ওয়াং-এর সামনে দাঁড়ালেন। খানিকক্ষণ কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, “আমার যদি খুব ভুল না হয়ে থাকে তা হলে আপনি ডক্টর ওয়াং।”

    ওয়াং আভূমি নত হয়ে অভিবাদন করে বিগলিত কণ্ঠে বললেন, “দেখা যাচ্ছে আমি সত্যিই বিশ্ববিখ্যাত। বাবুরাম গাঙ্গুলি, আপনিও কম বিশ্ববিখ্যাত নন। আমি টিভিতে আপনার ছবি দেখেছি। আপনার স্ত্রী এবং ছেলেকেও সবাই চিনে ফেলেছে।”

    “ডক্টর ওয়াং, আপনি তো আমেরিকাতেই এলেন, তবে লন্ডনের সেফ হাউস থেকে পালালেন কেন?”

    ওয়াং ব্যথিত গলায় বললেন, “না পালালে ওরা কী করত জানেন? আমাকে ভি আই পি সাজিয়ে এখানে এনে একরকম নজরবন্দী করে নানারকম জেরায় পেটের কথা বের করত। দেশত্যাগীদের কি ঝামেলার অন্ত আছে? তাতে আমার মূল্যবান সময় নষ্ট হত, কাজের কাজ হত না। তাই পালিয়ে বন্ধুদের সাহায্যে ছদ্মবেশে ভূয়া পাসপোর্ট দেখিয়ে চলে এসেছি।”

    বাবুরাম মাথা নেড়ে বললেন, “বুঝেছি, আপনি দুঃসাহসী মানুষ। দেশ ছেড়ে পালালেন কেন ডক্টর ওয়াং?”

    “প্রতিভাবানদের কোনও দেশ নেই গাঙ্গুলি। পুরো পৃথিবীটাই তাদের কাজের জায়গা। একটা দেশে আটকে থাকলে তাদের চলে না। আমাকে আপনি বিশ্বনাগরিক বলে ভাবতে পারেন।”

    বাবুরাম এই দুঃখেও ওয়াং-এর কথায় হাসলেন। বললেন, “আপনার কী একটা আবিষ্কার চুরি গেছে বলে শুনেছি।”

    ডক্টর একথায় হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর চোখ ছলছল করতে লাগল। রুমাল বের করে তিনি চোখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠে বললেন, “ওকথা মনে করিয়ে দেবেন না বাবুরাম গাঙ্গুলি। সে ছিল আমার বুকের হাড়, চোখের মণির চেয়েও মূল্যবান। ওরকম বায়োমেকানিক রোবট কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি আজও। তার ভিতরে আমি এক অনন্ত শক্তির উৎস সৃষ্টি করেছিলাম। শুধু সেটার একটাই দোষ ছিল, সে নিজে থেকে কিছু করতে পারত না। তবে কাছাকাছি মানুষের ইচ্ছে বা চাহিদা অনুসারে সে অনেক অসম্ভব সম্ভব করতে পারে। তার নাম দিয়েছিলাম চি চেং। আমার ছেলে থাকলে সেও আমার এত প্রিয়পাত্র হত না, যতটা ছিল চি চেং।”

    ওয়াং খানিকটা সামলে ওঠার পর বললেন, “গাঙ্গুলি, আপনার ছেলের বিষয়ে আমি শুনেছি। আমি কি তাকে একবার দেখতে পারি?”

    “নিশ্চয়ই। আসুন ডক্টর ওয়াং।”

    বাবুরাম গুদামের ভিতরে, যেখানে বনিকে কোলে নিয়ে প্রতিভা বসে ছিলেন, সেখানে নিয়ে গেলেন। প্রতিভা প্রথমে ওয়াংকে দেখে অস্বস্তি বোধ করলেও বাবুরামের ইশারায় বনিকে ওয়াং-এর হাতে দিলেন।

    সঙ্গে-সঙ্গে বনির চোখ দুখানা প্রথমে নীল তারপর সবুজ হয়ে গেল।

    ওয়াং কিছুক্ষণ চোখ দুটোর দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “এই রংগুলোর অর্থ আছে। ও আমাকে দেখে খুশি হয়েছে।”

    বাবুরাম মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “বনির অসুখটা কী ডক্টর ওয়াং?”

    ওয়াং বনিকে শুইয়ে দিয়ে তার সঙ্গীকে ডেকে একটা হুকুম দিলেন। তার সঙ্গী দৌড়ে গিয়ে একটা কালো বাক্স নিয়ে এল। ওয়াং সেই বাক্সটার ডালা খুলতে দেখা গেল ভিতরে নানা জটিল ও সূক্ষ্ম সব যন্ত্রপাতি রয়েছে। এত জটিল যে, বাবুরাম অবধি যন্ত্রটার প্রকৃতি বুঝতে পারলেন না।

    ওয়াং বললেন, “এটা অত্যাধুনিক একটা স্ক্যানার। কোনও ভয় নেই, এই যন্ত্র আপনার ছেলের কোনও ক্ষতি করবে না।”

    আধ ঘণ্টা ধরে ওয়াং বনির শরীরের সর্বত্র একটা স্টেথসকোপ জাতীয় জিনিস লাগিয়ে পরীক্ষা করলেন। তার ভূ কুঞ্চিত, মুখে চিন্তার বলিরেখা। তারপর যন্ত্র গুটিয়ে নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, “ব্যর্থতা! আবার একটা ব্যর্থতা! লোকগুলো অপদার্থ।”

    বাবুরাম উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ডক্টর ওয়াং?”

    “আপনার ছেলের এমব্রায়োতে একটি বায়োনিক মাইক্রোচিপ কেউ সেট করে দিয়েছিল। জিনিসটা এত ছোট যে আপনার সে সম্পর্কে ধারণাই হবে না। চিপটা ঠিকমতো সেট হয়ে গেলে আপনার ছেলে হয়ে উঠত আধা-যন্ত্র, আধা-মানুষ। কিন্তু গবেষণাটি এখন পরীক্ষামূলক স্তরে আছে বলেই আমার ধারণা, যারা এটা করছে তারা খবর রাখছে, কোন মা কখন সন্তানসম্ভবা হয়েছেন। তাদের অজান্তেই গর্ভস্থ সন্তানের মধ্যে ইনজেকশন দিয়ে ওই মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই মাইক্রোচিপের ধর্মই হল তা ভূণের শরীরে ঢুকেই শিরা-উপশিরা দিয়ে মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছয়। সেই ভুণ যখন। সন্তান হয়ে জন্মাবে তখন হবে অত্যধিক মেধাবী, অত্যধিক কর্মপটু, কিন্তু তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে অন্য লোক। এইসব সন্তান মাঝে-মাঝে রিমোট কন্ট্রোলে প্রত্যাদেশ পাবে। এবং সেই আদেশ এরা অক্ষরে-অক্ষরে মানতে বাধ্য। এদের দিয়ে যা খুশি করানো যাবে। মিস্টার বাবুরাম গাঙ্গুলি, আমি দুঃখিত, আপনিও এইসব শয়তনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তবে বনির ক্ষেত্রে মাইক্রোচিপটা কোনও কারণে ঠিকমতো কাজ করছে না। কোনও একটা বায়ো মেকানিকাল গোলমাল ওর মস্তিষ্ক আর শরীরের মধ্যে একটা পরদা পড়ে গেছে। ওর মাথা ক্রিয়াশীল, কিন্তু শরীর নয়।”

    বাবুরাম স্তম্ভিত হয়ে বললেন, “সর্বনাশ!”

    “এব্যাপারে একসময়ে আমিও কিছুদূর গবেষণা করেছি। তাই আমি ব্যাপারটা এত চট করে ধরে ফেলতে পারলাম। তবে মিস্টার গাঙ্গুলি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস বনির মধ্যে এমন কিছু প্রতিক্রিয়া ওরা ওদের রিমোট সেনসরে ধরতে পেরেছে যাতে ওরাও উদ্বিগ্ন। ওরা হয়তো বনিকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করবে। আপনার এখন ওকে। নিয়ে পালিয়ে যাওয়াই উচিত।”

    “আমরা পালাতেই চাইছি ডক্টর ওয়াং।”

    “সেটা সহজ হবে না। আপনার বাড়িতে আজ তিনজন অতিকায় গুণ্ডাকে ঘায়েল করে মাইককে মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করতে হয়েছে।”

    “সর্বনাশ!”

    “তাই বলছি, ওরা আপনার পালানোর পথ বন্ধ করার সবরকম চেষ্টা করবে।”

    উদ্বেগে আতঙ্কে অস্থির হয়ে বাবুরাম বললেন, “তা হলে কী করব ওয়াং?”

    তবু বিপদের ঝুঁকি নিয়েও আপনাকে পালাতেই হবে। নইলে ওরা বনিকে নিয়ে গিয়ে ল্যাবরেটরিতে ওর মাথা চিরে দেখবে কেন ওদের প্ল্যানমতো কাজ হয়নি। ওরা হয়তো আরও অনেক শিশুকেই এরকম গবেষণার বস্তু করেছে। জানি না সেসব শিশুর ভাগ্যে কী ঘটছে। ওরা বর্বর! ওরা মানুষের চরম শত্রু!”

    বাবুরাম স্ত্রীর দিকে তাকালেন। প্রতিভা মৃদুস্বরে বললেন, “ভয় পেও না। ঠাকুরের ওপর ভরসা রাখো। আমরা ঠিক পালাতে পারব। বিপদে মাথা ঠিক রাখতে হয়।”

    বাবুরাম স্ত্রীর কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তায় একটু শান্ত হলেন।

    ওয়াং বললেন, “শুনেছি আপনি ভবঘুরের ছদ্মবেশে পালাতে চান। ভাল পরিকল্পনা। তবে এয়ারপোর্টে তো আর ছদ্মবেশ চলবে না। পাশপোর্ট দেখানোর সময় ছদ্মবেশ খুলতেই হবে। তখন বিপদ। বাবুরাম গাঙ্গুলি, বিজ্ঞানের স্বার্থে আমি আপনাকে সাহায্য করব।”

    “করবেন! বাঁচলাম।”

    “এখন আমি যাচ্ছি। যথাসময়ে আমার দেখা পাবেন।”

    “শুনুন ওয়াং। ডাক্তার লিভিংস্টোনের ক্লিনিক সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন?”

    “ক্লিনিকটা পোর্টল্যান্ডে?”

    ওয়াং-এর খুদে-খুদে চোখ যতদূর সম্ভব বিস্ফারিত হল, “পোর্টল্যান্ডের ডক্টর লিভিংস্টোন?”

    “হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি চেনেন?”

    ওয়াং বড় বড় কয়েকটা শ্বাস ছেড়ে বললেন, “ঠিক আছে। ও কথা পরে হবে আপনি আর দেরি করবেন না।”

    বাবুরামের মনে হল, ডক্টর লিভিংস্টোন সম্পর্কে কী-একটা কথা চেপে গেলেন ওয়াং। একটু দ্রুত পদেই যেন ওয়াং বেরিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন। গাড়িটা বেশ দ্রুত বেরিয়ে গেল।

    বাবুরাম আর প্রতিভা কিছুই খেতে পারলেন না। তাদের অনেক সাধাসাধি করে বডি হার মানল। তবে বনির খাবার যথেষ্টই সঙ্গে ছিল। তাকে প্রতিভা খাওয়ালেন। বিকেল হয়ে আসতেই বাবুরাম আর প্রতিভা তাঁদের ছদ্মবেশ পরে নিলেন। বনির মাথাতেও একটা পরচুলা পরিয়ে নেওয়া হল আর গায়ে মাখিয়ে দেওয়া হল শরীর ট্যান করার রং। বুড়িটা দু’জোড়া রোদ-চশমাও এনে দিল। এসব জিনিস ওরা কুড়িয়েও পায়, চুরিও করে।

    ফ্রেড কোথাও গিয়েছিল। দুপুরেই ফিরে এসেছে। সে বলল, “এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌঁছনোর কোনও চিন্তা নেই। আমি একটা ডাম্প ইয়ার্ড থেকে পুরনো ফোর্ড গাড়ি জোগাড় করেছি। সেটা বেশ চলে। তবে পুলিশে ধরলে বিপদ আছে। আমাদের লাইসেন্স নেই।”

    বাবুরাম বললেন, “সাবধানে চালালে পুলিশ ধরবে না। ঠিক আছে, আমিই চালাব।”

    সন্ধের কিছু আগে ফ্রেড আর মাইককে নিয়ে বাবুরাম সপরিবারে এয়ারপোর্টে রওনা হলেন। মুশকিল হল, তাঁরা নিজেদের নামেই প্লেনে টিকিট বুক করতে বাধ্য হয়েছেন। শত্রুপক্ষ খবর পেলে বিপদ আছে কপালে।

    নিউ জার্সি পেরিয়ে গাড়ি ব্রুকলিন ব্রিজে উঠল, তারপর নিউ ইয়র্ক শহরকে পাশে ফেলে চলল সোজা জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি এয়ারপোর্টের দিকে। অনেকটা রাস্তা। কিন্তু রাস্তায় আর কিছু ঘটল না। গাড়িটা একটু-আধটু আওয়াজ করলেও শেষ অবধি বিশেষ গণ্ডগোল করল না!

    টার্মিনালের সামনে তাঁদের নামিয়ে দিয়ে মাইক আর ফ্রেড গেল গাড়িটা পার্ক করে আসতে। পার্ক করা বেশ ঝামেলার ব্যাপার।

    দু’জন ভবঘুরের ছদ্মবেশে টার্মিনালে ঢুকতে যেতেই লোজন বেশ তাকাতে লাগল তাদের দিকে। তবে দেশটা আমেরিকা। এখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা খুব বেশি বলে কেউ কারও ব্যাপারে মাথা ঘামায় না।

    টার্মিনালে ঢুকে রেস্টরুম-এ গিয়ে দু’জনেই পর্যায়ক্রমে ছদ্মবেশ ছেড়ে এলেন।

    বাবুরাম উদ্বেগের গলায় বললেন, “চারদিকে চোখ রেখো প্রতিভা।”

    প্রতিভা ছেলেকে আঁকড়ে ধরে আছেন। শান্ত গলায় বললেন, “কিছু হবে না। শান্ত হও। আমি চোখ রেখেছি।”

    বাবুরাম চঞ্চল চোখে চারদিকে চাইতে লাগলেন। অনেক যাত্রীর ভিড়ে কাকে তিনি শত্রুপক্ষের লোক বলে চিহ্নিত করবেন? সামনের লাইনটাও বেশ লম্বা। একজন দীর্ঘকায় তোক এসে বাবুরামের পিছনে দাঁড়াল। শ্বেতাঙ্গ। মখচোখ যেন কেমন পাথরে। বাবুরাম একবার তাকিয়েই ভয়ে ভয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন। চোরা চোখে লক্ষ করলেন লোকটা তার কোটের পকেটে হাত ভরে আছে।

    লোকটা হঠাৎ খুব চাপাস্বরে বলল, “একটা পিস্তলের নল তোমার শরীরের দিকে তাক করা আছে। তোমার স্ত্রীকে বলো কোনওরকম চেঁচামেচি বা গণ্ডগোল না করে ধীরে-ধীরে টার্মিনালের বাইরে যেতে। তুমিও তাই করবে। বাইরে গাড়ি এসে তোমাদের তুলে নেবে।”

    বাবুরাম ঠাণ্ডা হয়ে গেলেন ভয়ে। একেবারে কাঠ।

    লোকটা পিঠে বাস্তবিকই একটা কঠিন জিনিসের খোঁচা দিয়ে বলল, “পনেরো সেকেণ্ডের বেশি সময় দেব না। চারদিকে আমাদের লোক আছে মনে রেখো।

    বাবুরাম সম্বিৎ ফিরে পেয়ে প্রতিভার কানে কানে বললেন, “আমার পিঠে পিস্তলের নল। বাইরে যেতে বলছে। কী করব প্রতিভা?”

    প্রতিভা শান্ত গলায় বললেন, “এ যা বলছে তাই করতে হবে। কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রাখো আর আমার পিছনেই থেকো।”

    প্রতিভা বনিকে কোলে নিয়ে ধীর পায়ে লাইন থেকে বেরিয়ে এলেন, “তারপর দরজার দিকে এগোতে লাগলেন। পিছনে বাবুরাম। তার পিছনে সেই লোকটি।”

    দরজার কাছ বরাবর যেতেই ব্যস্তসমস্ত এক যাত্রী মালের ট্রলি নিয়ে দরজা দিয়ে ঢুকলেন। ট্রলিতে বেশ বড় বড় দুটো স্যুটকেস, ব্যাগ, ছাতা ইত্যাদি। লোকটি ট্রলিটা নিয়ে হুড়মড় করে ঢুকেই সোজা যেন বাবুরামের ঘাড়েই এসে পড়ছিলেন। বাবুরাম সরে দাঁড়ালেন। কিন্তু লোকটা প্রায় উন্মাদের মতো ট্রলিটার একটা প্রবল ধাক্কা দিয়ে কনুইয়ের তোয় বাবুরামকে ছিটকে দিলেন।

    একটা “ওঃ গড!” চিৎকার শোনা গেল। বাবুরাম সামলে উঠে পিছন ফিরে দেখলেন তাঁর অনুসরণকারী লম্বা লোকটা হাঁটু চেপে ধরে মেঝের ওপর বসে আছে। চোখে-মুখে বোকার মতো ভাব। যাত্রীটি নিচু হয়ে বারবার ক্ষমা চাইছে লোকটার কাছে, বড় তাড়াহুড়োয় তোমাকে জখম করে ফেলেছি। কিছু মনে কোরো না…

    বলতে বলতে যাত্রীটি লোকটার বগলের তলায় হাত দিয়ে তাকে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু বাবুরাম স্পষ্ট দেখলেন যাত্রীটির হাতে একটি চাকতির মতো কী জিনিস যেন। আহত লোকটা একবার উঠবার চেষ্টা করতে গিয়ে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে গেল।

    এই গণ্ডগোলে হঠাৎ বাবুরাম দেখতে পেলেন, চার-পাঁচটা লোক এসে জলদিবাজ যাত্রীটিকে ঘিরে ফেলেছে। তাদের চেহারা বা হাবভাব সুবিধের নয়। যাত্রীটি হাত-পা নেড়ে কী যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে তাদের। লোকটা ওয়াং নন। তবে তাঁর শাকরেদ হতে পারে।

    বাবুরাম প্রতিভার দিকে চেয়ে বললেন, “ফিরে এসো। বোধ হয় এ যাত্রা বেঁচে যাব।”

    “ও লোকটা কে?”

    “চিনি না।”

    “ইচ্ছে করে এরকম করল নাকি?”

    “তাই তো মনে হচ্ছে।”

    “ তা হলে কিন্তু তোমার উচিত ওকেও সাহায্য করা। ওই দ্যাখো, কতগুলো লোক ওকে কেমন ঘিরে ধরেছে।”

    বাবুরামের মনে হল, প্রতিভা ঠিকই বলেছে। লোকটা যদি তাঁদের বাঁচানোর জন্যই ওই কাণ্ড করে থাকে তাহলে বাবুরামেরও উচিত। লোকটার সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া।

    বাবুরাম কখনও মারপিট করেননি। বরাবর ভাল ছেলে ছিলেন। তবে খেলাধুলা করতেন। এখনও জগিং করেন, দু-চারটে আসনও। গায়ে তাঁর জোর আছে কি না তা তিনি জানেন না। এ সুযোগে একটা পরীক্ষা হয়ে যাক।

    তিনি এগিয়ে যেতে যেতেই দেখলেন, দানবাকৃতি পাঁচটা লোক প্রায় ঠেসে ধরে যাত্রীটিকে পায়ে পায়ে দরজার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। বাবুরাম চিন্তাভাবনা না করেই সামনে যে পড়ল সোজা তার মাজায় নিজের বুটসুষ্ঠু পা সজোরে বসিয়ে দিলেন।

    বলতেই হবে মারটা বেশ জোরালোই হল। লোকটা লাথির চোটে ছিটকে পড়ে গেল। আর বাকি চারটে লোক এত অবাক হয়ে বাবুরামের দিকে তাকাল যে, বলার নয়।

    ভূপাতিত লোকটার বিশেষ লাগেনি। মারটার খেয়ে এরা বেশ তৈরি হয়ে গেছে। লোকটা এক লাফে উঠে এসে বাবুরামের মুখে একটা ঘুসি চালিয়ে দিল। বাবুরাম খানিকটা শূন্যে উঠে চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে দড়াম করে আছড়ে পড়লেন। লোকটা বাবুরামকে লাথি মারতে পা তুলেছিল, এমন সময় মশার কামড়ের মতো কিছু বিধল বোধ হয় তার ঘাড়ে। কেমন যেন বিহুলের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল সে। তারপর ধীরে-ধীরে ভেঙে পড়ে গেল।

    অন্য চারজন ধৃত লোকটিকে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তাড়াতাড়ি এসে প্রতিভাকে পাকড়াও করল টেনে নিয়ে যেতে লাগল দরজার দিকে।

    কিন্তু এ-সময়ে দরজাটা জ্যাম করে দু-দুটো মালের ট্রলি এসে এমন আটকে গেল যে, কিছুতেই ছাড়ানো যায় না দুটোকে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।

    দু’জন চিনা যাত্রী এই কাণ্ডের জন্য সকলের কাছে প্রচুর ক্ষমা চাইতে লাগলেন। কিন্তু তাতে পথ পরিষ্কার হল না। চারটে গুণ্ডা খেপে গিয়ে দমাদম ট্রলি থেকে মালপত্র তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে লাগল। তাদের ধাক্কায় যাত্রীরাও ছিটকে যাচ্ছে এদিক-ওদিক ছুটে এল সিকিউরিটির লোকেরা। আর এই গণ্ডগোলে লাল জড়লওলা বেঁটেমতো একটা লোক একটু দূরে দাঁড়িয়ে শান্তমুখে একটু হাসল।

    আগন্তুক চিনা, যাত্রী দুজনের মাল গুণ্ডারা ফেলে দেওয়ায় খেপে গিয়ে লাফ দিয়ে তারা ট্রলি ডিঙিয়ে এসে প্রবল বিক্রমে আক্রমণ করল গুণ্ডাদের। হাত লাগাল আগের যাত্রীটিও। এই ফাঁকে বনিকে নিয়ে সরে এসে স্বামীর পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন প্রতিভা। তাঁর পাশে সেই বেঁটে চিনা ভ ভদ্রলোকও।

    মৃদুস্বরে ওয়াং বললেন, “দ্যাট ওয়াজ এ ন্যাস্টি নক আউট পানচ। তোমার স্বামী কখনও বকসিং করেছে?

    “না। জীবনে নয়।”

    ওয়াং পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করে এনে তা থেকে কয়েকটা লম্বা ছুঁচ তুলে নিলেন, বললেন, “আকুপাংচার, খুব কাজ হয়। ওর মুখে চোখে একটু জল দাও।”

    বনির বোতলে জল ছিল। প্রতিভা সেই জল ঢেলে হাতের কোষে নিয়ে মুখে-চোখে ছিটিয়ে দিলেন বাবুরামের। আর দক্ষ হাতে বাবুরামের ঘাড়ে এবং আশপাশে উঁচগুলো বিধিয়ে দিলেন ওয়াং।

    তিন চিনা কী কায়দা কবল কে জানে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই চার-চারটে গুণ্ডার দুজন ধরাশায়ী হয়ে প্রাণ হারাল। দু’জন পালাল।

    ওয়াং মৃদুস্বরে বললেন, “এরা সব আমার চ্যালা। জরুরি পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য এদের বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছি আমি। আমেরিকান গুণ্ডারা ঘুসি আর ছোরাঘুরি আর পিস্তল ছাড়া কিছুই জানে না। বড় ক্রুড। বিজ্ঞানের যুগে কতরকম উপকরণ বেরিয়ে গেছে, এরা সেসব গ্রাহই করে না। দেখলে তো, তিনটে রোগাপটকা চিনার কাছে কেমন নাকাল হল চার-চারটে দশাসই আমেরিকান!”

    এত দুঃখেও একটু হাসলেন প্রতিভা। বললেন, “আপনি না থাকলে কী যে হত!”

    বাবুরাম চোখ মেললেন, কাতর শব্দ করলেন, তারপর উঠে বসে বললেন, “আমার চোয়াল বোধহয় ভেঙে গেছে।”

    ওয়াং মৃদু হেসে বলেন, “না মিস্টার গাঙ্গুলি। আপনার শরীরে ষাঁড়ের মতো ক্ষমতা আছে। যাকগে, লড়াই শেষ হয়েছে। মনে হচ্ছে আর বিপদ ঘটবে না। পুলিশও এসে গেছে। আর দেরী না করে লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ুন। ভাবখানা এমন করবেন যেন কিছুই হয়নি।”

    বাবুরাম দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বললেন, “সবকিছুর জন্যই। আপনাকে ধন্যবাদ। আমরা কৃতজ্ঞ।”

    ওয়াং সংক্ষেপে যা বললেন, তার অর্থ, সব ভাল যার শেষ ভাল। বাবুরাম আর প্রতিভা লাইনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হাতে পাশপোর্ট, টিকিট। হই-হট্টগোলে তাঁদের কেউ আলাদা করে লক্ষ করল না।

    .

    আতঙ্কিত, বিধ্বস্ত, ক্লান্ত অবস্থায় বাবুরাম আর প্রতিভা যখন কলকাতায় পৌঁছলেন তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। তবে কলকাতার মাটিতে পা রেখে তাঁরা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন। হঠাৎ এসেছেন বলে

    তাঁদের নিয়ে যেতে কেউ বিমানবন্দরে আসেনি।

    মালপত্র বলতে তাঁদের সঙ্গে সামান্যই জিনিস। কাস্টমস পেরিয়ে তাঁরা একটা প্রি-পেইড ট্যাক্সি নিলেন। বাড়ির দরজায় যখন এসে নামলেন তখন ঘুটঘুট্টি লোডশেডিং-এর অন্ধকার চারদিকে।

    বাড়ির লোক খেয়ে-দেয়ে ঘুমোনোর আয়োজন করছিল। তাঁদের আগমনে সারা বাড়ি আনন্দে বিস্ময়ে ফের জেগে উঠল। বাবুরামের বাবা বলাইবাবু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তিনিও প্রায় লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন। তাঁর নাতি এসেছে যে!

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57 58 59 60 61 62 63 64 65 66 67 68 69 70 71 72 73 74 75 76 77 78 79 80 81 82 83 84 85 86 87 88 89 90 91 92 93 94 95 96 97 98 99 100 101 102 103 104 105 106 107 108 109 110 111 112 113 114 115 116 117 118 119 120 121 122 123 124 125 126 127 128 129 130 131 132 133 134 135 136 137 138 139 140 141 142 143 144 145 146 147 148 149 150 151 152 153 154 155 156 157 158 159 160 161 162 163 164
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleহায়নার গুহা – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    Next Article অথ রম্যকথা – অনন্যা পাল

    Related Articles

    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    অসুখের পরে – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 26, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    সাঁতারু ও জলকন্যা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 26, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    ৫০টি প্রেমের গল্প – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 26, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    শীর্ষেন্দুর সেরা ১০১ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 26, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    ঘুণপোকা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 25, 2025
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়

    বাসস্টপে কেউ নেই – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    November 25, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    July 14, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    July 14, 2026
    Our Picks

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    July 14, 2026

    অথ রম্যকথা – অনন্যা পাল

    July 14, 2026

    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    July 13, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }