কুরুক্ষেত্র – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
কুরুক্ষেত্র – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
যখনই কোনও কাজ খুব মন দিয়ে করতে যায় বজ্ৰকুমার, তখনই আপনমনে সে কেবল ‘তেরে কেটে তাক, তেরে কেটে তাক’ আওড়াতে থাকে। এটাই তার মুদ্রাদোষ। এমন নয় যে, সে একজন ডাকসাইটে তবলচি। তবলার কিছুই সে জানে না। তবু মুখে কেন যে তেরে কেটে তাক উচ্চারণ হতে থাকে, তা সে নিজেও জানে না। বজ্ৰকুমার আসলে একজন শিক্ষানবিশ চোর। এ ব্যাপারে সে একজন বড় ওস্তাদের কাছে নাড়া বেঁধেছিল। বিশ্বনাথ রায় পাল খুবই সিদ্ধহস্ত চোর। তার কাছে নানারকম কলাকৌশল শিখতে শুরু করেছিল। আর বছরটাক লেগে থাকতে পারলেই হত। কিন্তু বিশে পালের বুড়ো বয়সে ভীমরতি হল। কাশীতে বিশ্বনাথ দর্শন করতে গিয়ে সে সাধু হয়ে হিমালয়ে চলে গেল। আর ফিরল না।
বিদ্যেটা পুরোপুরি শেখা না হলেও বজ্ৰকুমার যেটুকু শিখেছে তাতে পেট চলে যায়। কিন্তু সূক্ষ্ম কৌশলগুলি না জানলে দাও মারা সম্ভব নয়। বিশে ওস্তাদ বছরে একটা কি দুটোর বেশি চুরি করতই না ! ওই একটি বা দুটিই ছিল মারাত্মক ধরনের। হেসেখেলে বড়লোকি চালে দু’-চার বছর কাটিয়ে দেওয়া যেত। কী নেই বিশে ওস্তাদের? জোতভরা ধান, গোয়ালভরা গোরু, পুকুরভরা মাছ, বাক্স-ভরতি টাকা, ঘর-ভরতি ছেলেমেয়ে, মন-ভরতি আনন্দ। মাথায় টেরি, কানে আতর, পরনে মলমলের পাঞ্জাবি, ফাইন ধুতি। দুপুরে গরম ভাতে ঘি, রাতে শেষ পাতে ক্ষীর, একবেলা মাছের মুড়ো তো অন্যবেলা কচি পাঁঠার ঝোল। বিশে গিন্নির পা থেকে মাথা অবধি সোনার গয়না।
বজ্রকুমারের আর বিশে ওস্তাদ হওয়া ঘটে নেই। তবু বাঁচতে তো হবে। সে এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে রোজই ছিঁচকে চুরি করে পেটটা চালায়। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ বই তো নয়। সে হল ওস্তাদের কনিষ্ঠ চেলা। বিশের বড় বড় চেলারাও কম যায় না। দেশে-বিদেশে তারা সব ভাল ভাল শহরে জমিয়ে বসেছে। টাকাপয়সার ভাগাভাগি।
বজ্রকুমার মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। বড় বড় বাড়িতে ঢোকার এলেম তার নেই। সে এখনও সিন্দুক বা ভারী লোহার আলমারি খুলতে পারে না। এখনও হাঁচি বা কাশির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আসেনি। সবচেয়ে বড় কথা, এখনও কাজ করার সময় সে তেরে কেটে তাক বলার বদ অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। প্রায়ই তাকে কুকুরে তাড়া করে, গেরস্ত সজাগ হয়ে পড়ে। আর নানারকম গণ্ডগোল বেধে যায়।
সনাতন কর্মকার একজন সোনার বেনে। তার বাড়িতে সোনাদানার আশায় হানা দিয়েছিল বজ্র। জানালার গরাদে ফাঁক করে ঢুকে পড়েছিল। একটু এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করছে, এমন সময় সনাতন হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে পড়ল। হাঁক মেরে বলল, “অ্যাই ফটকে, খুব তবলাবাজ হয়েছিস তো! মাঝরাতে তবলার বোল আওড়াচ্ছিস!”
আর এক ঘর থেকে ফটকে বলে উঠল, “তুমি গান-বাজনার বোঝোটা কী বলো তো দাদা? অ্যাঁ! সোনা গালিয়ে গয়না বানাচ্ছ, তাই নিয়েই থাকো না!”
“কে বললে আমি গান বুঝি না? নিধুবাবুর টপ্পা, কেত্তন, ভজন সব বুঝি। তোর মতো বে-আক্কেলে নাকি? রাতবিরেতে তবলার বোল ফুটিয়ে পাঁচজনের ঘুমের বারোটা বাজাচ্ছিস!”
ফটকে বলল, “ইচ্ছে করে বোল তুলেছি নাকি? ঘুমোতে ঘুমোতে শুনতে পেলুম কে যেন তেরে কেটে তাক, তেরে কেটে তাক করছে। তাই ঘুম ভাঙতে কয়েকটা বোল একটু ঝালিয়ে নিচ্ছিলুম মুখে মুখে।”
“উদ্ধার করছ। ঘর-ভরতি সোনাদানা দিয়ে এমনিতেই আমার ঘুম হয় না। যাও-বা একটু তন্দ্রা এসেছিল দিলি তার পিত্তি চটকে। যাই, নন্দীবাবুর মেয়ের নেকলেসটা রাত জেগে শেষ করে ফেলি।”
বজ্রকুমার তাড়াতাড়ি গরাদের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। একখানা অ্যালুমিনিয়ামের বাটি মাত্র জুটেছিল।
একদিন গণেশ সাঁতরার বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল বজ্ৰকুমার। ঢুকতেই ভারী বিপদ। যে ঘরখানায় ঢুকেছিল সেটাতে গণেশ সাঁতরার নব্বই বছর বয়সি পিসিমা থাকেন। বায়ু-চড়া বলে বোধ হয় ঘুমের বালাই নেই। দরজা ফাঁক করে আঙুল ঢুকিয়ে কায়দা করে ছিটকিনি খুলে ভেতরে পা দিতেই একেবারে মুখোমুখি।
পিসিমা একগাল হেসে বললেন, “এলি দাদা? আয়। সেই সন্ধে থেকে হাঁটুর ব্যথায় মরে যাচ্ছি। বাতের তেলটা তুই ছাড়া আর কে মালিশ করে? ওদের সব কড়া-পড়া হাত। তোর হাত দুটি যেন মখমলের মতো। তখন থেকে ডাক-খোঁজ করছি, শুনলুম নাকি পটলডাঙা গেছিস, ফিরতে রাত হবে। তা রাত বেশি হয়নি বোধ হয়। আয় দাদা, একটু মালিশটা করে দিয়ে যা, গোপাল আমার।”
নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিতে দিতে বজ্ৰকুমারকে সে কাজও করতে হয়েছিল। বুড়ি চোখে মোটে দেখতে পান না, তাই রক্ষে। সব কথায় কেবল হুঁ দিয়ে গিয়েছিল সে। বেরনোর সময় একখানা পেতলের ঘটি আর একখানা হারিকেন সঙ্গে নিতে পেরেছিল সে।
মনটা খুব বিগড়ে আছে। বড় না হোক, ছোটখাটো একখানা দাঁও না মারলেই নয়। বিশে ওস্তাদের চেলা। বলে নিজের পরিচয় দিতেও লজ্জা করে তার।
আজও নিশুত রাতে বেরিয়েছে বজ্ৰকুমার। মনের মতো একখানা বাড়ি খুঁজছে। কোনও বাড়িই তেমন পছন্দ হচ্ছে না। ঘনঘন মাথা নাড়ছে আর তেরে কেটে তাক করে যাচ্ছে।
হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে। আরে! এ বাড়িটা তো কখনও নজরে পড়েনি তার। রোজই এসব পথ দিয়ে যাতায়াত। তবু পড়েনি। ভারী লজ্জা হল বজ্রর। বিশে ওস্তাদ কি আর সাধে বলে, “ওরে চোখ চাই, চোখ। তোদের চোখ থেকেও যে অন্ধ।” কথাটা অতি খাঁটি। তেমন চোখ থাকলে কি আর এতকাল বাড়িটা চোখ এড়িয়ে যেত তার? রায়চৌধুরীদের আমবাগানের পশ্চিমে একটু আবডালে চমৎকার ছোটখাটো একটি প্রাসাদ বললেই হয়।
বজ্ৰকুমার বাড়িটা ঘুরে একটু জরিপ করে নিল। জানালা-দরজা খুবই মজবুত। গোটা দুই জানালা খোলা ছিল। বেশ পোক্ত শিক দেওয়া। বজ্র খুব বেছেবুছে একখানা জানালা পছন্দ করে ফেলল। তারপর চাড় দেওয়া যন্ত্র বের করে অনেক মেহনতে দু’খানা শিক বাঁকিয়ে ভেতরে ঢোকার ফোকর করে নিল।
একটু জিরিয়ে ওস্তাদ আর মা কালীর উদ্দেশে দুটো পেন্নাম ঠুকে ঢুকে পড়ল ঘরে।
অন্ধকারটা চোখে একটু সইয়ে নিয়ে সে চারদিকটা যা দেখল তা কহতব্য নয়। মেলাই জিনিস। ঘরে অন্তত দশখানা লোহার আলমারি। সিন্দুক আছে। কাঠের বাক্স-টাক্সও আছে। পরের ঘরটা আরও সরেস। দেওয়াল আলমারিতে কাচের আড়ালে রুপোর বাসন। আরও ঘুরেফিরে দেখতে ইচ্ছে যাচ্ছিল। কিন্তু লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। যা পাওয়া যাচ্ছে তাও কম নয়। সে খন্তা বের করে কাচ কাটতে লেগে গেল।
হঠাৎ কানের কাছে কে যেন চাপা গলায় বলে উঠল, “তুই কে?”
ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল বজ্ৰকুমারের। তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আজ্ঞে, ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না।”
“ভুল হয়ে গেছে? মজার আর জায়গা পাসনি? তুই বেজা চোর, বিশের চেলা।”
“যে আজ্ঞে।”
“আমাকে চিনিস? আমি হলাম গুলে ওস্তাদের এক নম্বর চেলা। গোবিন্দ। বিশের মতো এলেবেলে লোকের কাছে চুরি শিখিনি। তুই চুরির জানিস কী রে হতচ্ছাড়া গবেট?”
এ কথায় বজ্ৰকুমারের রাগ হল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, রাগের চোটে তা ফের গরম হল। সে বেশ তেজালো গলায় বলল, “বিশ্বনাথ রায় পালের কাছে গুলে ওস্তাদ! হাসালে দাদা! এ যেন সমুদ্রের পাশে গোষ্পদ!”
“কে গোষ্পদ রে গবেট?” বলেই গোবিন্দ টকাস করে একটা গাট্টা মারল বজ্রর মাথায়। বলল, “যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! বিশে আবার ওস্তাদ হল কবে?”
বজ্রকুমার মাথায় হাত বুলিয়ে নিয়ে ফুঁসে উঠে বলল, “গুলে আবার চুরির জানেটা কী? বিশের হাত-ধোয়া জলও সে নয়।”
“তবে রে!” বলে গোবিন্দ সাপটে ধরল বজ্রকে।
বজ্রও কম যায় না। বলল, “দেখাচ্ছি মজা!”
দেখতে না দেখতে দু’জনের মধ্যে তুমুল লড়াই লেগে গেল। কিল, ঘুসি, চড়। ঝনঝন করে কাচ ভেঙে পড়ল। চেয়ার টেবিল পড়তে লাগল উলটে। এ যে পরের বাড়ি, গেরস্ত উঠে পড়তে পারে, এসব কথা কেউ খেয়াল করল না। ভাঙা কাচে দু’জনেরই হাত-পা কেটেকুটে একশা। একখানা ঝাড়বাতি অবধি খসে পড়ে শতখান হল।
ঘুসাঘুসি ছেড়ে দু’জনে দু’জনকে কুস্তির প্যাঁচে কাহিল করার চেষ্টা করতে লাগল। তাতে কুমড়ো-গড়াগড়ি হল অনেকক্ষণ।
শেষমেশ লড়াই থামল বটে। কিন্তু দু’জনের আর তখন উঠে বসবার ক্ষমতা নেই। গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা। সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত। দু’জনে হ্যা হ্যা করে হাঁপাচ্ছে। আধমরা অবস্থা।
ওদিকে আকাশ ফরসা হল। জানালা দিয়ে সকালের রাঙা রোদ এসে পড়ল ঘরে।
এমন সময় একটা জাম্বুবানের মতো লোক এসে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে পেল্লায় একখানা হাই তুলে তাদের দিকে চেয়ে বলল, “তোরা চোর নাকি?”
বজ্র আর গোবিন্দ দু’জনেই ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে বলল, “আর হবে না।”
লোকটা আড়মোড়া ভেঙে রাজ্যের আলিস্যি আর বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, “ছ্যাঃ।”
মাটিতে পড়ে থাকা কাহিল দুই চোর জুলজুল করে চেয়ে রইল।
লোকটা মাথা নেড়ে বলল, “তোদের হবে না। ওদেরও হয়নি কিনা।”
“কাদের কথা বলছেন আজ্ঞে?”
“বিশে আর গুলে। শেখাচ্ছিলুম। মাঝপথেই হঠাৎ শেখা ছেড়ে কাজে নেমে গেল। তোদের দেখেই বুঝেছি, তোরা তোদের ওস্তাদের মতোই অপদার্থ।”
দু’জনেই ওস্তাদের নিন্দায় গরম হয়ে উঠল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করল একটু, পারল না।
লোকটা তাচ্ছিল্যের চোখে চেয়ে বলল, “আমার নাম কালু সারেঙ। নামটা চেনা ঠেকছে?”
দু’জনেই চমকে উঠল। কালু সারেঙের নাম কে না জানে? তবে…
বজ্র বলল, “তিনি তো প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। কিন্তু তিনি তো গত হয়েছেন।”
“গত হয়েছেন!” বলে লোকটা মুখ ভেংচে বলল, “গত হলেই কি সুবিধে হল তোদের? চুরি ছেড়ে অন্য লাইন ধর। সারারাত তোদের যা কীর্তি দেখলাম।”
বলেই লোকটা হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল যেন। আর বাড়িটা হয়ে গেল বেবাক ফাঁকা, পোড়ো একখানা বাড়ি।
দুই চোর পড়ি-কি-মরি করে উঠে দৌড়তে লাগল।
১৪ এপ্রিল ১৯৯৩
