জগু যাবে বেড়াতে – বাণী বসু
জগু যাবে বেড়াতে – বাণী বসু
জগু যাবে বেড়াতে, সঙ্গে যাবে কে? / সঙ্গে যাবেন নিবারণদা স্যার, অন্য আবার কে?— জগু আর নিবারণদার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা নিশ্চয়ই সবাই জানো। জগু হল এক উদীয়মান বৈজ্ঞানিক। গোবরের সঙ্গে মিউরিয়্যাটিক অ্যাসিড, তার মধ্যে ঘুমের ওষুধ (পিসিমার দপ্তর থেকে হাতানো) আরও কী কী সব গুলে সে এক সাংঘাতিক জৈব-রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করে। আমেরিকা বা ইরাক, আলফা বা আলকায়দা যে কেউ সন্ধান পেয়ে গেলে প্রলয় হয়ে যাবে, এই যুক্তিতে নিবারণদা স্যার অনেক কষ্টে তাকে অস্ত্রটি রাস্তার নর্দমার ধারে ফেলে দিতে রাজি করান। সেই নর্দমা এখনও সাদা হয়ে আছে। জগু তারপর দিনতিনেক ভাল করে খায়নি দায়নি। কিন্তু পরে সেটা সামলে নিয়েছে, কারণ জৈব-রাসায়নিক অস্ত্রের অসংখ্য ফরমুলা তো তার মাথার মধ্যেই গিজগিজ করছে। নামিয়ে নিলেই হল। কিন্তু প্রলয় বা পৃথিবীময় লোকক্ষয়ের কারণ হতে চায় না সে। আর যে লোকক্ষয় করুক, সে বিবেকী, সে করবে না।
নিবারণদা এইভাবে বিজ্ঞানী জগুর মধ্যে বিশ্ববিবেকী জগুকে জাগিয়ে তুলেছেন। সে এখন ব্রহ্মাস্ত্র ছেড়ে ব্রহ্মান্ন আবিষ্কারের দিকে মন দিয়েছে। না, ব্রহ্মাণ্ড নয়, ব্রহ্মান্ন। সারা পৃথিবীর লোকে অল্প দামে প্রচুর ক্যালরিঅলা খাদ্য পাবে, এটাই সে চায়, সে অন্নপূর্ণ হতে চায়, ব্রহ্মা-বিষ্ণু নয়। এর ফলে রান্না ও ভাঁড়ার ঘর থেকে, ফ্রিজ থেকে রান্না করা ও নামকরা নানাবিধ খাদ্যবস্তু হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। মাসের মাসকাবারি বা বাজার খরচের হিসেব মিলছে না। বাড়ির কাজের লোকদের সন্দেহ করা হয়েছিল প্রথমে, তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয়। পিসিমা ভূতের ভয় করছিলেন, মা প্রথমটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু অতঃপর যথারীতি জগু মহারাজকেই সন্দেহের খাতায় তুলেছেন। সন্দেহটা সত্যি, জগু জানে, তবু সে মাকে একচোখা ও সন্দেহপরায়ণ বলে থাকে এবং এই সূত্রে পিসিমার ও মা’র একটা কম্পেয়ার ও কনট্রাস্ট চট করে খাড়া করে ফেলে।
পিসিমা জগুকে ভালবাসেন, মা বাসেন না।
পিসিমা জগুকে বিশ্বাস করেন, মা করেন না।
পিসিমার জগুর প্রতিভায় আস্থা আছে, মায়ের নেই।
পিসিমা বরং ভূতের কথা ভাববেন, তবু জগুকে চোর সন্দেহ করবেন না।
মা বরং জগুকে ভূত সন্দেহ করবেন, তবু ভূতকে চোর ভাববেন না।
কম্পেয়ার কনট্রাস্টের লিস্টি মস্ত বড়। ফুলস্ক্যাপ কাগজের একপাতা ছাড়িয়ে যায়। সেটি সে যথারীতি নিবারণদা স্যারের দরবারে পেশ করেছিল। পড়েটড়ে নিবারণদা গম্ভীরভাবে বললেন, “হুঁ।”
জগু অনেক আশার সঙ্গে অপেক্ষা করে আছে। নিবারণদা আকাশের দিকে চোখ তুলে বললেন, “হবে, মহাপ্রভু হবে, তোমার হবে, এবার বেশ করে একখানা প্রিয়দর্শী অশোক আর মহামতি আকবরের কম্পেয়ার-কনট্রাস্ট লিখে ফেলো দেখি! বুঝতেই পারছ আকবর-শেরশাহ বা আকবর-ঔরংজেব এসব তুচ্ছ ব্যাপার, অনবরত ছেলেরা লিখে লিখে এমন মুখস্থ করে ফেলেছে যে! কিন্তু অশোক-আকবর একটা আনকমন কম্বিনেশন, তুমিই বলো, ঠিক বলেছি কিনা! এটার জন্য একস্ট্রা মগজ লাগবে।”
জগু মুখ গোমড়া করে শুনছিল, এবার সে ঝেঁঝে ওঠে। “একটা টাস্ক করে আনলুম তো আপনি আবার আর একটা টাস্ক দিয়ে দিলেন! কত খাটুনি বলুন তো!”
“আহা! মা-পিসিমাটা করতে তো আর তোমায় তেমন খাটতে হয়নি, মাথাতেই ছিল, ধোঁয়াচ্ছিল, তুমি তাকে নামিয়ে সলিড স্টেটে এনে ফেলেছ। এটাকে আমি আদৌ খাটুনি বলে মানতে রাজি নই।”
জগু ঠোঁট গোল করে বলল, “আপনি এটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না, তাই বলুন না স্যার। আপনার আর কী? আপনার তো আর মা-পিসিমা নেই যে, কম্পেয়ার-কনট্রাস্ট করতে কত খাটুনি জানবেন!” জগুর অভিমান হয়েছে।
নিবারণদা ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, “শ্ শ্ শ্। সব আছে, সব আছেন। মা, পিসিমা, বাবা, কাকা, দিদিমা, দাদু— যে যেখানে থাকে সব। আমারও অভিজ্ঞতা নেহাত কম নয়। কিন্তু তুমি করবেটা কী বলো! কী করতে পারো? বাবাকে যেরকম বশীকরণ করতে গিয়েছিলে, সেইরকম কিছু? করতে গিয়ে তো তোমার টাইফয়েড না নিউমোনিয়া কী একটা হয়ে গেল, মনে নেই?”
পুরনো কথা মনে করতে জগুর একদম ভাল লাগে না। যখন ছোট ছিল, তখন সে অনেক দিকেই তার সুপ্ত প্রতিভার শুঁড় বাড়িয়ে দিয়েছে। সব জায়গায় তো ফল হয়নি, হতেই পারে না। মারি কুরি কতবার চেষ্টার পর রেডিয়াম আবিষ্কার করেছিলেন? তা ছাড়া বশীকরণ, মারণ উচাটন নিয়ে যে এক্সপেরিমেন্টটা করেছিল, তাতে সাময়িক ফলও কি হয়নি? বাবা কি বশীকৃত হয়ে যাননি? মা? তার অসুখের সময়ে কি সে মা-বাবার অন্য মূর্তি দেখেনি? কিন্তু ওসব পুরনো দিনের ওষুধবিষুধে আজকাল আর তেমন কাজ দেয় না। অ্যান্টিবায়োটিকের যুগে কি আর হোমিয়োপ্যাথির মিষ্টি বড়ি চলে? এখন বৈজ্ঞানিক পন্থা আবিষ্কার করতে হবে। উদ্ভাবন। সেই ব্যাপারেই সে নিবারণদার সাহায্য চায়। কেননা, নিবারণদা একটু ভুলো হলেও মাথাটা খোলতাই।
নিবারণদাকে মনে আছে তো? সেই যিনি ধুতির মধ্যে শার্ট গুঁজে, টাই পরে, দু’পায়ে দু’রকম চটি পরে ঢিকিতং ঢিকিতং করে ক্লাসে ঢোকেন অর্ধেক দিন আর ধুতির কোঁচা দিয়ে বোর্ড মুছে সেই কোঁচা দিয়ে মুখ মুছে ভূত হয়ে যান। সেই নিবারণদা যিনি ‘চিতপটাং’ শব্দের মানে বুঝতে তক্তপোশ থেকে তোশক সরিয়ে দিয়ে অনবরত চিত আর সোজা হচ্ছিলেন এবং পটাং আওয়াজ শুনতে না পেয়ে শব্দটাকে ‘ব্যাকরণের ভুল’ বলে রায় দিয়েছিলেন। সেই নিবারণদা যিনি কোটের পকেটে দানাদার ভরে সভায় গিয়ে খুব বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলেন, কেননা লক্ষ লক্ষ সুড়সুড়ি পিঁপড়ে তাঁকে কাতুকুতু দিয়েছিল। এবং সেই নিবারণদা, যিনি পিটসবার্গ না কোন একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে, সুট-কোট সব কিনেও, স্কুলের ফেয়ারওয়েলে নিজের সম্পর্কে রাশি রাশি প্রশংসা শোনবার পরেও জগুর মতো মহাপ্রভু ছাত্রদের লোভে শেষ পর্যন্ত বিদেশের চিঠিফিঠি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন।
এবার ব্যাপারটা তোমাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে আশা করি।
জগু খুব ভদ্র ছেলে। সে এত্তখানি জিভ কেটে বলল, “কিছু মনে করলেন না তো স্যার? আপনার মা-পিসিমাদের আমি না করে দিচ্ছিলুম।”
নিবারণদা একগাল হেসে বললেন, “তাই কখনও করি? আমি এখানে একলা ঘরে রাজ্যের টিকটিকি আর জোমেট্রি অ্যালজেব্রা নিয়ে ঘর করি। তুমি কী করে জানবে মহাপ্রভু যে, আমি মা-পিসিমাঅলা? ও সব ঠিক আছে। এখন তুমি কী করতে চাও বলো এ ব্যাপারে?”
অনেকক্ষণ গালে হাত দিয়ে ভাবল জগু। আঙুলে হাতের পাতায় কীসব অঙ্কটঙ্ক কষল। তারপর বলল, “বাড়ি থেকে পালানো ছাড়া তো আর কিছুই ভেবে পাচ্ছি না স্যার। আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই। আপনি ওয়চ করুন।”
নিবারণদা চোখ পিটপিট করে অনেকগুলো আঙুল মটকে ফেললেন। বললেন, “ওয়চ করে?”
“যদি ফল ভাল হচ্ছে দেখেন তো আমায় গ্রিন সিগন্যাল দেবেন। আমি এসে পড়ব।”
“আর যদি লাল সিগন্যাল দিই?”
“তা হলে ডুব!”
“কিন্তু মহাপ্রভু, কোথায় সেই জায়গা যেখান থেকে তুমি সবুজ সংকেত, লাল সংকেত সব দেখতে পাবে? কোথায় জায়গাখানা?”
“আপনার এখানেই আমার হয়ে যাবে স্যার। যদি আপনি অ্যালাও করেন। দিনের বেলায় তক্তপোশের তলায় শুয়ে থাকব। ইট দিয়ে একটু উঁচু করে দেবেন তক্তপোশটা, আর রাত্তির হলে স্কুলের বাগানে ঘুরে বেড়াব।”
“বাঃ, চমৎকার। আর তোমার ইস্কুল? পড়াশোনা?”
“ইস্কুল যাব না আর পড়াশোনাটা আপনার কাছে করব, নিশুতি রাতে।”
“তার মানে তুমি আমার রাত্তিরের ঘুমটা মাটি করতে চাইছ? না, না, মহাপ্রভু, ওটা কোরো না। তা হলে আমার মাথাটা আর মাথা থাকবে না, ভোঁতা হয়ে যাবে। ভোঁতা, ফালতু রামদা একখানা। তুমি কি সেটা চাও?”
“না, স্যার কখনওই না,” মনে মনে জগু বলল, ‘এতেই দু’পায়ে দু’রকম চটি পরছেন, তখন তা হলে এক চটি পায়ে আর এক চটি হাতে পরবেন। ও রিসকের মধ্যে আমি যাচ্ছি না।’
সে বলে, “বেশ তা হলে আপনি দরজা বন্ধ করে চলে যাবেন, আমি আপনার রান্না ভাত খেয়ে বসে বসে সব হোম টাস্ক করে ফেলব, একেবারে আপ-টু-ডেট। আপনি সন্ধেবেলায় দেখে দেবেন।”
হ্যাঁচ্চো করে একটা হাঁচি হেঁচে তারপরই বিষম কেশেটেশে নিবারণদা বললেন, “আমার রান্না ভাত? সন্ধেবেলায় দেখে দেব? তুমি তো আচ্ছা ফ্যাসাদেই আমায় ফেললে হে! সকাল-বিকেল যে ছাত্র পড়তে আসে তাদের কোথায় পড়াব?”
“বাগানে পড়াবেন স্যার, শান্তিনিকেতনের মতো, অত বড় বাগান ইস্কুলের!”
“বাগানে? উঃ তোমার মাথাখানা মহাপ্রভু। একেবারে লাখে এক! কিন্তু সকালবেলায় যেমন যেমন, সন্ধেবেলায়? তখন তো অন্ধকার মশা!”
“স্যার, আপনি বড় আরামকুঁড়ে স্যার। সন্ধেবেলায় লণ্ঠন নেই? মশার মলম নেই? বিকেল বিকেল গাছের তলায় একটু গন্ধক পুড়িয়ে দিলেও তো হয়। আর, তা ছাড়া ক’দিন না হয় আপনি নাই পড়ালেন স্যার!” এই জায়গায়ও জগুর ঠোঁট আবার গোল হয়ে যায়। সে অভিমান করেছে।
“আহা হা, ব্যাপারটা ভাল করে বোঝো, বুঝে নাও। আরে বাবা ছেলেগুলোর অনেকেই তো পড়ানো বন্ধ করলে গাড্ডু খাবে আসন্ন এগজামিনে।”
“খাক না, মাথামোটাদের তো গাড্ডু খাওয়াই উচিত।”
“কথাটা তুমি বলেছ একরকম ঠিকই। কিন্তু আর একটা দিকও তোমার ভেবে দেখা উচিত। হঠাৎ যদি পড়ানো বন্ধ করে দিই, সন্দেহ তো ঘনীভূত হবে। পুলিশে তোমার গৃহত্যাগ বলো গৃহত্যাগ, তুমি-চুরি বলো তুমি-চুরির খবর যাবে। পুলিশ খোঁজতল্লাশ করতে করতে খবর পাবে— এরকম একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। নিবারণ মাস্টার আর পড়াচ্ছে না। দুয়ে দুয়ে চার হয়ে যাবে মহাপ্রভু, সন্ধেয় নিঝঝুমে সারি সারি মুখ জানলায়। পুলিশের স্পাই। তারপরে আর কী! জগুর মাস্টার শ্বশুরবাড়ি। হাতে কড়া, কোমড়ে দড়ি! সেটা কি তুমি চাও?”
এইবার জগুব রাগ হয়ে যায়। নিবারণদা স্যারকে কোমরে দড়ি বেঁধে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে এ-দৃশ্যটা তার আদৌ ভাল লাগেনি বলে দুশ্চিন্তার চোটে রাগটা একটু বেশিই হয়ে যায়।
“কী তখন থেকে ‘সেটা কি তুমি চাও’ ‘সেটা কি তুমি চাও’ করে যাচ্ছেন স্যার। আমি কিছু চাই না। আমি শুধু বাড়ি থেকে পালাতে চাই।”
“আর গ্রিন সিগন্যাল, রেড সিগন্যাল?”
“দরকার নেই, চাই না।”
“ইস্কুল? পড়াশোনা? ক্লাসে ফাস্ট? তারিণীমোহন গোল্ড মেডেল? থ্রি চিয়ার্স ফর?”
“কিচ্ছু দরকার নেই। ফার্স্টটার্স্ট নুটু হোকগে যাক।”
“কিন্তু ফার্স্ট হলেও তো তারিণীমোহন আর থ্রি চিয়ার্সটা ওরা পাচ্ছে না। সে-ধরনের রেকর্ড পারফরম্যান্স তো ওদের নেই।”
“নাই থাকুকগে। কে কী পেল, তাতে আমার ভারী বয়েই গেল। আমি ভবঘুরে হয়ে যাব।”
“নাঃ, তুমি একেবারে মরিয়া হয়ে গেছ দেখছি। দেখি আমাকে একটু ভাবতে দাও।”
আঙুল তুলে জগু বলে, “এক ঘণ্টা, এক ঘণ্টা সময়, তার মধ্যে ভেবে ফেলতে হবে। নইলে…” বলে জগু উঠে পড়ল। একটু ঘুরেঘেরে আসা যাক। ভবঘুরে হওয়ার ঠিক আগেটায়।
স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে জগু স্কুল-বাগানে অনেকক্ষণ উদাস মনে ঘুরে বেড়াল। চিরদিনের মতো চলে যাওয়ার আগে সব একটু দেখে নেওয়া যাক। এই বাগান তার কত যে প্রিয়! তার ছোটভাই প্রচণ্ড পরাক্রমশালী গজু যখন রেগেমেগে তাকে খোঁজে, হয়তো কোনও সামান্য কারণে অসামান্য রেগে গিয়ে— ধরো, গজুর ড্রয়ারে জগু আরশোলা ভরে রেখেছে আর গজু তাতে হাত দিয়েই গঁদটঁদ উলটে গিয়ে বইখাতা সব আঠা আঠা হয়ে গিয়ে একেবারে যাচ্ছেতাই। গজু বুঝছে না তার আরশোলার ভয় কাটাবার জন্যে, আর তাকে সাবধান যত্নশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়ার জন্যেই তার দাদা এই কাজটা করেছে! সে দাদাকে খুঁজছে, একবার পেলে ভীমের গদার মতো গজু তালপাতার সেপাই জগুকে শুইয়ে দেবে— সে এক ভয়াবহ ব্যাপার। কাজেই জগুকে লুকোতে হবে। তা সেই জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো সময়টা সে তো স্কুলের বাগানেই কাটাতে পছন্দ করে। গজু আর সে যেদিকেই যাক, ইস্কুলের আওতা থেকে একবার বেরিয়ে আবার সেই জায়গায় আসতে মোটেই পছন্দ করে না। জগু সারা বিকেল সারা সন্ধে এই বাগানের ঝুপসি গাছপালার মধ্যে চুপটি করে বসে থাকে। মশার মলম তার সঙ্গেই থাকে, আর তার কিছু দরকার হয় না। এই সময়টা সে ধ্যান প্র্যাকটিস করে। তারপর রাত আটটা সওয়া আটটা বাজলে বুক ফুলিয়ে বাড়ি ফেরে। হাতে একগাদা খাতা, পকেটে গোঁজা পেন। পিসিমা যথারীতি দরজায় দাড়িয়ে থাকেন, “কী রে জগু, এত দেরি?”
“পড়তে পড়তে দেরি হয়ে গেল। অঙ্কটাও মিলবে না, আমিও সেটা করে ছাড়ব।” জুতো খুলতে খুলতে হেলাফেলায় জগু বলতে থাকে।
“গজুর ড্রয়ারে আরশোলা ভরে রেখেছিল কে?” মাতৃদেবী ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ান।
“আরশোলা? ড্রয়ার? মানে?”
“মানে? মানে আবার কী? ড্রয়ার খুলতেই একগাদা আরশোলা ফরফর করে উড়ে…,ছেলেটার বাঁ পাটা একেবারে মচকে গেছে।”
“ইশশশ্!” জগু ভীষণ দুশ্চিন্তিত হয়ে পড়ে, “মচকে গেছে? ঠিক জানো ভাঙেনি? আরশোলাকে যে ওর অত ভয় কীসের?”
“তা যে জিনিসটাতে ভয় পায়, দাদা হয়ে সেটাই তুমি…”
“দাঁড়াও দাঁড়াও দাঁড়াও দাঁড়াও। ভয় পায়? দাদা হয়ে? মা, তুমি কী বলতে চাইছ?”
“বলতে চাইছি ড্রয়ারে আরশোলাগুলো তুমিই ভরে রেখেছিলে। তোমার তো কিছুতেই ঘেন্নাপিত্তি নেই।”
“তোমাদের মাথাতে আসেও তো মা? আরশোলা যদি ড্রয়ারে থেকে থাকে তো তাদের আমাকেই ভরে রাখতে হবে? ওরা নিজেরা আসতে পারে না? আশ্চর্য তো! আরশোলা কাগজ খেতে প্রচণ্ড ভালবাসে, বইয়ের পাতায় ডিম পেড়ে রাখতে ভালবাসে, এসব কি তুমি জানো না? আমি রোজ আমার ড্রয়ার পরিষ্কার করি ওইজন্যে, তা সত্ত্বেও…”
মা বলেন, “আঠার শিশির ঢাকনি আলগা করেছিল কে? নিজে নিজে শিশি নিজের ঢাকনা আলগা করেছে?”
“গঁদের শিশি? ওঃ, গঁদের শিশিও উলটেছে গজু। উঃ, কতবার ওকে বলেছি, কালির শিশি, গঁদের বোতল খুব সাবধানে রাখতে হয়। তা কি ও শুনবে?”
“ও বলছে, ও টাইট করেই এঁটে রেখেছিল।”
“আর আমি নিবারণদার কোচিং ক্লাস থেকে ভূতের মতো লম্বা হাত বাড়িয়ে ওর গঁদের শিশির ঢাকনা আলগা করে দিলুম। বাঃ!”
“কেন ইস্কুল থেকে তুমি বাড়ি ফেরোনি?”
“কেন ফিরব না? তোমার সামনেই তো লুচি তরকারি খেলুম। আর তারপরই তো কোচিং-এ চলে গেছি।”
পিসিমা বলেন, “সত্যি কিন্তু, ও জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে গেল।”
আহত দৃষ্টিতে একবার মায়ের দিকে একবার পিসিমার দিকে তাকায় জগু, তারপর দু’-তিন সিঁড়ি টপকে টপকে উপরে চলে যায় গজুকে দেখতে।
সাবেক নিয়মমতো চুনহলুদ গোড়ালিতে মেখে গজু শুয়ে থাকে। জগুকে দেখে রাগে কেঁদে ফেলে।
জগু সাবধানে তার হাতের নাগালের বাইরে চেয়ারটা টেনে বসে। পা-টাই গেছে, হাত তো আর যায়নি। সে বলে, “ইশশশ, কাঁদতে আছে? ছেলেদের কাঁদতে নেই রে গজু, কাঁদতে নেই, তার ওপরে তোর মতন একজন বীরম্যান!”
“বীরম্যানটা আবার কী? নতুন নাম বার করেছিস আবার?” গজু ফোঁস ফোঁস করে।
“দুর ভাই। ব্যাটম্যান স্পাইডারম্যান-টাইপ নয়। বীর মানে বীর, বীরপুরুষ। আর ম্যান মানে মানুষ,” স্নেহভরে হেসে সে বলে, “এই ধারণাগুলো তোর মাথায় কে ঢোকায় বল তো গজু, আমি আরশোলা ভরে রেখেছি, আমি গঁদের শিশি…”
“তুই করিসনি?” জলভরা জ্বলন্ত চোখে চেয়ে গজু বলে।
“তুই যখন বলছিস করেছি, তা হলে হয়তো করেছি। যদিও আমি নিজে ব্যাপারটার কিছুই জানি না।” জগুর ঠোঁট গোল হয়ে যায়। সে অভিমান করেছে।
সে যাই হোক, এইসব স্মৃতির সঙ্গে ইস্কুলের বাগান জড়িয়ে আছে। ওই পাকুড় গাছ, অশথেরই মতো, কিন্তু পাতাগুলো কালচে আর পাতায় শুঁড় নেই। বা ওই বকুল গাছ, যার তলায় বেদি করা আছে, মনশ্চক্ষে গজু দেখতে পায় বকুলতলায় দুটো ঠনঠনে লণ্ঠন নিয়ে নিবারণদা স্যার বসে আঁক কষছেন। আর চারপাশ থেকে হাঁদারামগুলো ডিঙি মেরে মেরে দেখছে। কী ক্ষতি হত স্যারের ক’দিন বকুলতলায় এমন চমৎকার তপোবন-ক্লাস করলে। নিবারণদা আর মাস্টার বা স্যার থাকতেন না, নিবারণমুনি হয়ে যেতেন। মুনি-ঋষি হওয়াটাও কি একটা লাভ নয়? সে জানে নিবারণদার আসল ভয় তাকে বেঁধে খাওয়ানো। নিবারণদা নিজের রান্না নিজে করেন। তার মানে আর কী! একটা কেরোসিনের স্টোভে ভাতের মধ্যে আলু, পটল, বেগুন, ঢ্যাঁড়স সব ফেলে দেন, তারপর সেদ্ধমতো হয়ে গেলে, সবটা থালায় ঢেলে একদলা মাখন আর নুন দিয়ে খেয়ে নেন। দু’বেলা, তিরিশ দিন, বারো মাস। আর সেইজন্যেই সে তার পিসিমার করা টিফিন নিবারণদাকে দিয়ে নিজে আলুকাবলিটাবলি খেলে নিবারণদা খুব বাধ্য স্যার হয়ে যান। জগুর মা-পিসিমা মাঝে মাঝেই তাঁকে ভুরিভোজ করান। অন্য ছাত্ররাও নানারকম খাবারদাবার নিয়ে আসে।
“নিবারণদা, পাটিসাপটা খাবেন?”
“নিবারণদা, ডিমের কচুরি খাবেন?”
“নিবারণদা, মাংসের ঘুগনি খাবেন?”
“কেন বলো তো?”
ওদের ধারণা খাওয়ালে-দাওয়ালেই নিবারণদার ঘুম আসবে। আর সেই ফাঁকে আলগা মগজ থেকে বুদ্ধিগুলো ওদের মাথায় ঢুকে পড়বে। অ্যাত্ত বোকা, অ্যাত্ত বোকা।
তা নিবারণদা এসব ব্যাপারে কখনও না বলেন না। সোজাসুজি হ্যাঁও বলবেন না, এত চালাক।
“বলছ যখন! তোমার মা করেছেন বললে? না খেলে আবার কষ্ট পাবেন।” কিংবা “চেখেই দেখা যাক, বাড়ির মাংসের ঘুগনি কেমন হয়। রঘুর ঘুগনি খেয়ে খেয়ে তো পেটে চড়াই পড়ে গেল।”
“ডিমের কচুরি? এ যে কাঁঠালের আমসত্ত্ব হে। কে বানালেন? দিদা! ও হো হো হো, এঃ, এমন করে সন্দেহ প্রকাশ করা ঠিক হয়নি। ডিমের সেদ্ধ পোচ, অমলেট ছাড়াও কচুরি হয়, নির্ঘাত হয়?” বলে কচুরিতে কামড় দিয়ে আহ্লাদে একেবারে শিবনেত্র হয়ে যাবেন স্যার।
“চমৎকার! চমৎকার! দিদাকে বলো গিয়ে তাঁর এই এক্সপিডিশন সাকসেসফুল। হানড্রেড পার্সেন্ট। দিদা যেন এমন এক্সপিডিশন আরও করেন”… ইত্যাদি ইত্যাদি।
জগু স্যারের চালাকি সব বোঝে। জগুকে বেঁধে খাওয়ানোর কথাতেই স্যার অত ভড়কে গেছেন। ভাবছেন জগু পিসিমার আদরের ভাইপো, না জানি। কী খেতে চাইবে, তিনি পেরে উঠবেন না। তখন জগু খুঁতখুঁত করে শান্তি করবে। স্যার যদি এই ভেবে থাকে, তা হলে তিনি জগুর কিছুই জানেন না। জগু বিরিয়ানি কাবাব খেয়ে পেট বোঝাই করে ফেলতে পারে, আবার পেটে কিল মেরে উপোস করেও কাটিয়ে যেতে পারে। নিবারণদার গলাভাতে তার খুবই লোভ। ভাতে মাখনটা পড়লেই গন্ধটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। খাদ্যাখাদ্যের মধ্যে তার একমাত্র অপছন্দ শিঙি মাছের ঝোলে। মায়ের ধারণা সে পেটরোগা, তাই তাকে প্রায়ই এটা খেতে হয়। যাকগে, স্যার যখন অ্যালাও করবেন না, তখন ওসব ভেবে আর লাভ নেই। বাগানের মায়াও এবার কাটাতে হবে, কেননা সন্ধেতারা উঠে পড়েছে। এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। জগুর কোনও ঘড়ি নেই। বাবা পছন্দ করেন না। তার ছোট ভাই, দু’-আড়াই বছরের ছোট ভাই গজুর কিন্তু ঘড়ি আছে। ভাল রিস্ট ওয়াচ। সেটা অবশ্য বাবা কিনে দেননি। গজু তো মস্ত খেলোয়াড়, তাই ওর ক্লাব কৃতজ্ঞতায় ওকে দিয়েছে। সে নাকি ‘নাকপাতা নবজাগরণী’র সবগুলো গোলই ঠেকিয়ে ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ান করেছিল। বাবাকে লুকিয়ে গজু মাঝে মাঝে পরে। মা জানেন, কিচ্ছুটি বলেন না।
যাক, এসব ভেবে তো মন খারাপ করে লাভ নেই। উপায় দুটো। একটা নিবারণদা যদি কিছু বাতলাতে পারেন। আর এক জগু যা ঠিক করেছে, অর্থাৎ ভবঘুরে হয়ে যাওয়া। নিবারণদাও তার মতো ভবঘুরে হয়ে গেলে সে আর একটু উৎসাহ পেত। দুই ভবঘুরে মিলে সারা পৃথিবীটা ঘুরে ফেলত। কিন্তু নিবারণদা কোচিংই ছাড়তে চান না। এত ঘরকুনো হলে হয় না এসব। তার ওপর সন্ধেরাতে জানলায় পুলিশের চরের ভয় পান। মনে এত ভয় নিয়ে কি আর ভবঘুরে হওয়া যায়? ভবঘুরে হিসেবে নিবারণদাকে মানাত চমৎকার। ঝোল্লা জামা, ঝোল্লা প্যান্ট ব্লিচিং পাউডার দিয়ে কেচেছিলেন কবে, ছোপকা ছোপকা দাগ, মাথার চুল উসকোখুসকো, হাতের নখ লম্বা লম্বা, খোঁচা দিলে মারাত্মক লাগে, আর মাঝে-মাঝে এমন করে পুঁচিয়ে কাটেন যেন আঙুলের মাথাসুদ্ধ কেটে ফেলেছেন। লাল হয়ে থাকে ডগাগুলো।
“কী করা যায় বলো তো মহাপ্রভু, কীরকম খালি খালি লাগছে ডগাগুলো, ব্যথা করছে, জ্বালাজ্বালা করছে।”
জগু একছুটে বাড়ি চলে যায়। মলম নিয়ে আসে, লাগিয়ে দেয়। “দেখুন, এক্ষুনি কমে যাবে। রাত্তিরে আর একবার লাগাবেন, কাল সকালে আবার, বিকেলে আবার, পরশু সকালে…”
“বুঝেছি, বুঝেছি,” নিবারণদা তার ডাক্তারি প্রেসক্রিপশনের মাঝে বাধা দেন।
“কিন্তু খাব কী করে? হাতে মলম, পাতে মলম!”
“কেন স্যার, চামচে দিয়ে।”
“ঠিক, ঠিক বলেছ। এটা আমার মাথায় একবারও আসেনি। সাধে কি আর বলি, তোমার মগজখানা! লাখে এক, একেবারে লাখে এক!”
ইস, এত ভাল মানাত নিবারণদাকে! ঝোল্লাঝাল্লা পরে যেতেন, বাসে-ট্রেনে কেউ টিকিট চাইত না। স্টেশনের চায়ের দোকানে কী সুন্দর দয়া করে চা দিত, কেউ হয়তো বা একটা দুটো জিলিপি।
সত্যি কথা বলতে কী, মানানো হিসেবে যদি বলতে হয় তা হলে নিবারণদারই বাড়ি থেকে পালানো উচিত। কেউ ধরতে পারবে না। কিন্তু সে জগু। যতই চুল খোঁচা-খোঁচা হোক, খুব ফিটফাট ছেলে। তাকে উটকো জায়গায় দেখলেই লোকে ফিসফিস করে। পুলিশ খুঁজবে, একজন কেউ এসে খপ করে হাত পাকড়ে ধরবে।
“খবরদার পালাবার চেষ্টা করবে না। বাড়ি থেকে পালিয়েছ না? ঠিক ধরেছি। কত টাকার পুরস্কার দিচ্ছেন বাবা, জানো কিছু?”
ভবিষ্যৎটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পায় জগু। অনেক দূর ভেবে তবে কাজ করে। ভবঘুরে বলে বাধ্য হতে গেলে তাকে কী কী করতে হবে ভাবতে ভাবতে জগু শাঁ করে নিবারণদার ঘরে।
“একঘণ্টা হয়ে গেছে স্যার।”
“আমারও সময় হয়ে এসেছে, ছাত্ররা সব এল বলে।”
জগু আর দাঁড়ায় না পেছন ফিরে।
“আরে, আরে, কোথায় যাও মহাপ্রভু, তোমার অঙ্ক আমার সলভ করা হয়ে গেছে।”
জ্বলজ্বলে চোখে জগু নিবারণদার কাছ ঘেঁষে বসে পড়ে।
“প্রথম কথা তোমার প্লাস-মাইনাস কিন্তু কাটাকুটি হয়ে যাচ্ছে বৎস।”
“কী করে?”
“পিসিমা সবেতে প্লাস, মা সবেতে মাইনাস, তা হলে হাতে কী থাকে? শূন্য। শূন্য তো?”
“হ্যাঁ।”
“শূন্য মানে?”
“শূন্য মানে শূন্য!” জগু বলে।
“অঙ্কটা তুমি অ্যাপ্লাই করো তোমার পরিস্থিতিটাতে। সেখানে শূন্য মানে হল নো অ্যাকশন। কিচ্ছুটি না। একেবারে কিচ্ছুটি করার উপায় নেই তোমার। হাত-পা বাঁধা। মানে তুমি যদি অঙ্ক জানো। আর জানোই তো। অঙ্কের সত্য একেবারে সত্য নাম্বার ওয়ান। যদি বৈজ্ঞানিক হতে চাও, মানতেই হবে।”
জগু উঠে পড়ে। নিবারণদা তাঁর জীবনের দুঃখজনক একটা প্রবলেমে এইভাবে অঙ্ক প্রয়োগ করবেন, এমন আশঙ্কা সে কখনও করেনি। না, সে আর নিবারণদার সাহায্য চাইবে না। স্বাবলম্বী হবে। নিজে নিজেই ভেবে ঠিক করবে কোনটা করবে আর কোনটা করবে না। আর বেশি ভাববার দরকারটাই বা কী? সে তো ভেবেই ফেলেছে।
নিবারণদা খপ করে তার হাতটা ধরে ফেললেন, তারপরে মুচকি হেসে ঠিক সেই কথাটিই বললেন, যেটি শুনলে জগুর মেজাজ একেবারে ফরসা হয়ে যাবে। কী সে কথা? কথাটা তো গোড়াতেই বলে নিয়েছি।
জগু যাবে বেড়াতে, সঙ্গে যাবে কে?
সঙ্গে যাবেন নিবারণদা স্যার, অন্য আবার কে?
কবে বেড়ানো? কীরকম বেড়ানো? কোথায় বেড়ানো?
সে আবার অন্য গল্প।
অক্টোবর ২০০৩
