কুঞ্জবাবুর পিঁপড়ে বাতিক – অমিতাভ গঙ্গোপাধ্যায়
কুঞ্জবাবুর পিঁপড়ে বাতিক – অমিতাভ গঙ্গোপাধ্যায়
সকালবেলাই কুঞ্জবাবুর মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। শীতের সকাল। একটু আগেই প্রাতঃভ্রমণ সেরে বাড়ি ফিরেছেন। মাথার মাঙ্কি ক্যাপ এবং গলার মাফলারটি এখনও খোলেননি। কাজের মেয়েটি এককাপ চা আর দু’খানা নোনতা বিস্কুট রেখে গেছে প্লেটে। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। সকালবেলা এটাই কুঞ্জবাবুর একমাত্র বিলাস। বেশ কিছুক্ষণ আয়েস করে দামি চায়ের স্বাদ নেবেন। মনটাও সঙ্গে সঙ্গে ফুরফুরিয়ে উঠবে টাটকা হাওয়ার মতো। কিন্তু চায়ের কাপে নজর পড়তেই আঁতকে উঠলেন ভদ্রলোক। কী সর্বনাশ! চায়ের ঠিক মাঝখানে ভাসছে দুটি পিঁপড়ে। ব্যস, হয়ে গেল তাঁর চা খাওয়া। মুহূর্তে যত রাজ্যের রাগ আর বিরক্তি এসে ভর করল তাঁকে। চায়ের কাপটা প্রবল বিতৃষ্ণায় সরিয়ে রেখে কুঞ্জবাবু রক্তজল করা হুংকার ছাড়লেন, “পুটি, এদিকে আয়।”
বাচ্চা মেয়েটার নাম পুটি। সবে একমাস মাত্র কাজে বহাল হয়েছে। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল বেচারা, “কী হয়েছে মেসোমশাই, ডাকছিলেন?”
“হয়েছে আমার মাথা আর মুন্ডু।” রাগে কাঁপতে থাকেন কুঞ্জবাবু, “চোখে দেখতে পাস না নাকি? চায়ের কাপে ভাসছে দু’-দুটো পিঁপড়ে। সকালটাই মাটি করে দিলি একেবারে।”
রাগের চোটে কুঞ্জবাবুর মুখে ফেনা জমে যায় আর কী। বেচারা পুটি কাঁচুমাচু মুখে চায়ের কাপটা সরিয়ে নিয়ে যায় সামনে থেকে। ব্যাপারটার গুরুত্ব সে যেন পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না।
বাঁদুরে টুপি আর গলাবন্ধ মুক্ত হয়ে শোকার্ত মানুষের মতো কিছুক্ষণ বসে থাকেন কুঞ্জবাবু। সকালবেলার টাটকা মেজাজটাকে একেবারে ভিজে কম্বল বানিয়ে ছেড়েছে বোকা মেয়েটা। পিঁপড়ে বস্তুটা কুঞ্জবাবুর দু’চোখের বিষ। একেবারে সহ্য করতে পারেন না। আর জলখাবারের মধ্যে পেলে তো কথাই নেই। ছুড়েই ফেলে দেবেন হয়তো। শুধু কি তাই, টেবিলে কিংবা চেয়ারে, তকতকে মেঝেতে পিঁপড়ে দেখলেই জিঘাংসা জেগে ওঠে তাঁর। পায়ের হাওয়াই চটি খুলে মুহূর্তে সংহারকর্মে মেতে যান। এ নিয়ে বাড়িতে গিন্নি আর ছেলেমেয়েদের ঠাট্টা শুনেছেন কম নয়। কিন্তু তাতে কুঞ্জবাবুর বয়েই গেল। সেই ছেলেবেলা থেকেই পিঁপড়ে তিনি সহ্য করতে পারেন না। পিঁপড়েতে তাঁর ভীষণ অ্যালার্জি।
পিঁপড়ের বংশ ধ্বংস না করা পর্যন্ত শান্তি নেই কুঞ্জবাবুর।
ছেলেবেলায় আচ্ছা বেকুব বনে যাওয়ার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল ভদ্রলোকের। মামাবাড়িতে ছিল মস্ত পুকুর। মামাতো ভাইবোনেরা সাঁতাঁর কাটত সে পুকুরে। প্রত্যেকেই ছিল যেন জলের পোকা। একবার জলে নামলে আর ওঠার নাম নেই। পুকুরের তলা থেকে ডুবসাঁতারে পাঁক তুলে আনত ডাকাবুকো মামাতো ভাই বিচ্ছু। বাপ রে, কী দম ছিল তাঁর। মস্ত বড় পুকুরটাকে দু’বার পারাপার করা তাঁর কাছে ছিল একেবারে ছেলেখেলা। এসব দেখে সেই ছেলেবেলাতেই শখ জেগেছিল কুঞ্জবিহারীর। সাঁতার শিখতে হবে। কিন্তু শিখিয়ে দেবে কে?
মায়ের আবার বড্ড ভয় এই পুকুর নিয়ে। কবে যেন এই পুকুরের জলেই ডুবে মরেছিল মায়ের এক তুতো বোন। সেই থেকেই মায়ের এই জলাতঙ্ক। মানে পুকুরের জল সম্পর্কে ভীষণ ভীতি। সাঁতারটা নিজেরও শেখা হয়নি তাঁর। আর প্রতিজ্ঞা করেছেন, প্রাণ থাকতে ছেলেকে ঘেঁষতে দেবেন না পুকুরের কাছে। ছেলেবেলায় কী যে রাগ হত কুঞ্জবিহারীর। সবাই মনের আনন্দে সাঁতার কাটছে, হাত-পা ছুড়ে দাপিয়ে জল তছনছ করে মজা পাচ্ছে। আর কুঞ্জ কিনা নীরব দর্শক হয়ে পুকুরপাড়ে গালে হাত দিয়ে বসে সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু উপায় কী, মায়ের হুকুম, নট নড়নচড়ন। মামাতো ভাইবোনদের চোখা চোখা বাক্যবাণ কম সহ্য করতে হয়েছে! কত আর বয়স হবে তখন। সাত-আট বছর খুব বেশি হলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে উঠলেন কুঞ্জবিহারী।
মামাবাড়ির ছোকরা কাজের লোক অনন্ত একেবারে সবদিকে এক্সপার্ট। কুঞ্জের সাঁতার শেখার আগ্রহ দেখে পথটা সে-ই বাতলে দিল চুপিচুপি। অবশ্য তাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞাও করিয়ে নিল আগেভাগে। কাউকে এ-ব্যাপারে বলা চলবে না। তা হলে কিন্তু খাটবে না কোনও মন্তর। সাঁতার শেখাও হয়ে উঠবে না আর। কুঞ্জর অগাধ বিশ্বাস অনন্তর উপর। ঘাড় নেড়ে বাধ্য ছেলের মতো সায় জানিয়েছিলেন, কাউকে কিচ্ছুটি বলবেন না। তারপর প্রায় সপ্তাহখানেক কেটে গিয়েছিল। কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। তারপর হঠাৎ শুরু হল কুঞ্জর পেট জুড়ে অসহ্য যন্ত্রণা। ব্যথার ঠেলায় কাটা পাঁঠার মতো হাত-পা ছুড়তে লাগল। চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসার জোগাড়। কীসের থেকে কী হয়েছে কেউ আন্দাজ করতে পারল না। কুঞ্জর মা তো ভয়ে চোখ দুটো একেবারে লাল করে ফেললেন কেঁদেকেটে। দু’দিন পরেই বাড়ি ফিরে যাবেন। হঠাৎ এ কী বিপত্তি। মামাবাড়ির গৃহচিকিৎসক ছিলেন বৃদ্ধ অক্ষয় কবিরাজ। চোখের কোল দেখে আর পেটটা ভাল করে টিপেটুপে বললেন, “বেয়াড়া রকমের হজমের গণ্ডগোল হয়েছে ওর। ওষুধ দিচ্ছি দু’দিনের।”
সে ওষুধ খেয়েই ব্যাপারটা ধরা পড়ল শেষ পর্যন্ত। বমি হতে শুরু করল একনাগাড়ে। আর সেই বমির মধ্যে গাদা গাদা মরা পিঁপড়ে। আসল কথা, চালিয়াত অনন্তের পরামর্শমতো কয়েকদিন এন্তার পিঁপড়ে ধরে খেয়েছিল কুঞ্জ। শর্তমতো কাউকে বলেনি কিছু, পাছে মন্তরের গুণ নষ্ট হয়ে যায়। অনন্ত চুপিচুপি বলেছিল, সাতদিন ধরে এন্তার কালো পিঁপড়ে খেয়ে যেতে। তা হলেই সাঁতার শেখা হয়ে যাবে। সপ্তাহখানেক বাদে পূর্ণিমার দিন পুকুরের জলে নামলেই একেবারে মাছের মত সাঁতার কাটতে পারবে সে। তাই এই পিপীলিকা ভক্ষণ, যার ফলস্বরূপ পেটের এই ভয়ংকর দুর্বিপাক। সব শোনার পর বেজায় রাগী বড়মামা পায়ের চটিজোড়া খুলে রক্তজলকরা হুংকার ছেড়েছিলেন, “কোথায় হতভাগা অন্তা। আজ ওর চামড়া ছাড়িয়ে ফেলব।”
কিন্তু চালাক অনন্ত কি আর থাকে! ইতিমধ্যেই ভাল কাজের সন্ধান পেয়ে সে পিঠটান দিয়েছে ভিনগাঁয়ে। তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। বেচারা কুঞ্জবিহারীকে ভুগতে হল বেশ কয়েকটা দিন। দারুণ বিস্বাদ আর যমতেতো সেই ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় পিঁপড়ে বেরোতে লাগল সমানে। মামাতো ভাইরা আড়ালে আবডালে ঠাট্টা করে বলতে লাগল, “কুঞ্জর পেটের মধ্যে পিঁপড়ের কারখানা আছে। ওখানে পিঁপড়ে তৈরি হয়।”
ছেলেবেলার ওইসব রামবোকামির কথা হঠাৎই মনে পড়ে গেল কুঞ্জবিহারীর। সেই থেকেই পিঁপড়ের ব্যাপারে ঘোর বিতৃষ্ণা। একেবারেই সহ্য করতে পারেন না বস্তুটিকে। পিঁপড়ে দেখলেই মাথায় তাঁর আগুন জ্বলে ওঠে। পিঁপড়েশূন্য এই পৃথিবী কবে যে ভদ্রলোকের বাসযোগ্য হবে কে জানে!
পুটি ততক্ষণে আর-এক প্রস্থ গরম চা ভয়ে ভয়ে দিয়ে গেছে। চোখের মাইক্রোস্কোপিক দৃষ্টিতে কুঞ্জবিহারী ভাল করে নিরীক্ষণ করে নিলেন। না, এবার অন্তত পিঁপড়ের কোনও চিহ্ন নেই। রাগটা নিঃশব্দে হজম করে চায়ের কাপে চুমুক লাগালেন এবার। বলা বাহুল্য, হৃদয়ের প্রফুল্লতা এবং ফুরফুরে মেজাজটাও ফিরে এল সেইসঙ্গে।
ছুটির দিন আজ। ব্যস্ততা নেই খুব বেশি। একটু পরেই বাজারে যাবেন। তার আগে দৈনিক কাগজটায় একটু চোখ বুলিয়ে নেবেন। হঠাৎই কুঞ্জবিহারীর গতবছর কাটিহারে ভয়ংকর বিপত্তির কথা মনে পড়ে গেল। এমনিতেই ঘরকুনো, শামুক প্রকৃতির মানুষ তিনি। বিশেষ দরকার না পড়লে পরিচিত চৌহদ্দির বাইরে বড় একটা যেতে চান না। কিন্তু গতবছর যেতে হয়েছিল কাটিহার। স্টেশনের কাছেই মিরচাইবাড়িতে পিসতুতো ভাই অক্ষয়ের বাড়ি। অনেকদিন থেকেই সে বিহারের বাসিন্দা। তারই একমাত্র মেয়ের বিয়ে, না গেলেই নয়। একাই গিয়েছিলেন তিনি। গিন্নির হাঁটুর জয়েন্টে ব্যথা। ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজের পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। সঙ্গে কেউ যেতে পারেনি। রাতের বাস ধরলেন ধর্মতলার গুমটি থেকে। সকালবেলায় রায়গঞ্জে নেমে রাধিকাপুর লোকাল ট্রেন। বেলাবেলিই পৌঁছে গেলেন অক্ষয়ের বাড়ি। খুব একটা খোঁজাখুঁজিও করতে হল না। অনেকদিন পর দেখা, উৎসবের জমজমাট বাড়ি। সুতরাং গল্পগাছা, পুরনো দিনের কাসুন্দি ঘাঁটা, সবকিছুই চলল বেশ। কুঞ্জবিহারীর মনে হচ্ছিল বয়সটা যেন উলটো চাকায় পিছন দিকেই গড়গড়িয়ে ছুটে চলছে।
ছেলেবেলার নানারকম ফন্দিফিকির, আর লোক জ্বালাতন করা উপাখ্যান সব যেন স্মৃতির অতল থেকে ভুস করে ভেসে উঠল।
খাওয়াদাওয়ার সুব্যবস্থা, রাত্রিবেলা পরিপাটি বিছানায়, নরম গদির উপর ভুঁড়ি ভাসিয়ে সবেমাত্র তিনি ঘুমের উদ্যোগ করছিলেন, এমন সময় পিঠের উপর বিজাতীয় একটি স্পর্শ অনুভব করলেন। স্পর্শটি গতিশীল এবং নিম্নমুখী। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন। মাথার কাছেই খোলা জানলা। ভারী মিষ্টি একটা ফুলের গন্ধ আসছিল বাগান থেকে। হঠাৎ বিরক্তি মনে চেপে রেখেই মশারি ফাঁক করে বেরিয়ে কুঞ্জবিহারী ঘরের আলোটা জ্বালালেন। গরমের দিন বলে খালি গায়েই শুয়েছিলেন। পিঠের ওই নির্দিষ্ট জায়গাটায় অঙ্গুলি সঞ্চালন করে বিরক্তিকর বস্তুটিকে তুলে আনলেন। একটি কালো রঙের বড় আকারের পিঁপড়ে। এ ধরনের পিঁপড়েকে অনেকে বলে ওল্লা। মুহূর্তে মাথায় খুন চেপে গেল তাঁর। মেঝের উপর দুরাত্মাকে ফেলে এক নিমেষে পায়ের চটি দিয়ে সংহার করলেন। কিন্তু ঘুমের সেখানেই দফারফা। আলোটা জ্বালিয়ে রেখেই এবার তাঁর চিরুনিতল্লাশি চলল পিঁপড়ের জন্য। প্রথমেই বিছানার গদিটাকে উলটে নীচটা দেখে নিলেন ভাল করে। তাঁরপর ক্রমান্বয়ে পাশবালিশ, মাথার বালিশ, পায়ের কাছে পাট করে রাখা পাতলা চাদর, সবকিছুই দেখলেন। পিঁপড়েটা এল তবে কোত্থেকে। তারপর বিদ্যুৎ চমকের মতো তাঁর মনে পড়ল, খাটের নীচেও পিঁপড়ের একটা বড় আস্তানা থাকা বিচিত্র নয়। সুতরাং টর্চ জ্বালিয়ে খাটের নীচে ঢুকলেন এবার। পুরনো দিনের উঁচু খাট। তলায় ঢুকতে খুব একটা অসুবিধে হল না। টর্চের জোরালো আলোয় প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে খাটের নীচটা পরীক্ষা করলেন। না, পিঁপড়ে নেই এখানে। কিন্তু ওই পিঁপড়েটাই বা কোত্থেকে মরতে এল। খানিকটা ঝুল-ময়লা মাথায় জড়িয়ে গিয়েছিল কুঞ্জবাবুর। সেসব ঝেড়েঝুড়ে আলো নিভিয়ে আবার কোটরবাসী হলেন তিনি। পিঁপড়ে আর জ্বালাতে এল না ঠিকই। কিন্তু পচা সারের দুর্গন্ধ সারারাত সেঁটে রইল গায়ের সঙ্গে। এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম এল না। ভুরভুর করা সেই বমন উদ্রেককারী গন্ধের ঠেলায় প্রাণটা যেন পালাই পালাই করতে লাগল প্রথম রাত থেকেই। দু’দিন মাত্র ছিলেন। পরেরদিন বাগানে পায়চারি করার সময় সভয়ে লক্ষ করলেন, বাগানের বড়সড় ডুমুরগাছটায় ডেঁয়োপিঁপড়ের বাসা। সংখ্যায় তারা মন্দ হবে না। তাদের জাতিগত লাল পোশাকে, হিংস্র চোখে তদারকি করে বেড়াচ্ছে। কুঞ্জবাবুর মনে হল ওরা যেন নিঃশব্দে তাঁকে বলছে, ‘দাঁড়াও, একবার তোমায় বাগে পাই, নাম ভুলিয়ে ছাড়ব।’
বলতে গেলে পালিয়ে এলেন প্রায়। বিয়ের পরের দিনই বিকেলবেলা ট্রেন ধরলেন কাটিহার থেকে। অক্ষয় একটু মনমরা হল। পূর্ণিয়ায় বউভাতের আসরে থাকতে পারলেন না। খারাপ নিজেরও লাগছিল। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, পিঁপড়ের আতঙ্কেই কলকাতায় ফিরে এলেন কুঞ্জবিহারী। পূর্ণিয়ার একনম্বর রসগোল্লা আর দরবেশ খাওয়াই হল না তাঁর।
বাজার থেকে ফেরার পথে বন্ধু পরাশরের সঙ্গে দেখা। “চলো হে, অনেকদিন বাদে একদান দাবা হয়ে যাক,” হাসতে হাসতে বললেন পরাশর। “তুমি আজকাল আসো না বলে দাবার চালগুলোই প্রায় ভুলতে বসেছি।”
বন্ধুর কথাগুলো উপভোগ করে কুঞ্জবাবু বললেন, “এ তুমি বাড়িয়ে বলছ। এমন কী আর চাল দিই। ঠিক আছে, বলছ যখন, একহাত হয়ে যাক। বাড়িতে বাজারটা নামিয়ে রেখে চটজলদি চলে আসছি। তোমার স্পেশ্যাল ব্র্যান্ডের চায়ের জোগাড় রেখো। জানো তো, চা ছাড়া…।”
“সে আর বলতে!” আশ্বস্ত করেন পরাশর। “তাড়াতাড়ি চলে এসো হে কুঞ্জ। আমি বোর্ড সাজিয়ে বসছি গিয়ে।”
ফেরার পথে পাড়ার সবচেয়ে চালু স্টেশনারি দোকানটায় ঢুকে পড়েন পরাশর। একটু পরেই বেরিয়ে আসেন হাতে একটা চকচকে বস্তু নিয়ে। “আর বোলো না কুঞ্জ, পিঁপড়ের উৎপাতে একেবারে জেরবার হয়ে গেলাম। জামাকাপড় পর্যন্ত ফুটো করে দিচ্ছে। কোত্থেকে যে আসে হতচ্ছাড়ারা। এই দ্যাখো, নামী কোম্পানির পিঁপড়ে বিনাশক লক্ষ্মণরেখা কিনলাম। এই দিয়ে যদি ওদের ঠেকিয়ে রাখা যায়।”
পরাশরের কথা শুনে মুষড়ে পড়েন কুঞ্জবিহারী। এখানেও সেই পিঁপড়ের সমস্যা। কোথায় গিয়ে বাঁচবেন তবে! দাবা খেলার আগ্রহ আর উৎসাহ দুই-ই হারিয়ে ফেললেন হঠাৎ। পরাশরকে অবাক করে দিয়ে বলে ফেললেন, “কিচ্ছু মনে কোরো না ভায়া। হঠাৎই মনে পড়ে গেল আমার, একবার হাওড়া যেতে হবে আজ। ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয় গুরুতর অসুস্থ। মরণবাঁচনের ব্যাপার। সুতরাং…।” মনে মনে বিড়বিড় করেন কুঞ্জবিহারী। বাপ রে, পিঁপড়ের আস্তানায় নাক গলানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তাঁর। বাড়ির কাছাকাছি এসে দু’জনেই আলাদা হয়ে গেলেন।
পরাশর হতাশ গলায় বললেন, “তবে সামনের রোববার এসো কুঞ্জ। ঠিক এসো কিন্তু!”
ছুটির পরদিন অফিসে এসেই কুঞ্জবিহারী শুনলেন, বড়সাহেব তাঁর খোঁজ করছিলেন। এই অফিসটা এক মার্চেন্ট অফিস। অনেকদিন চাকরি হল কুঞ্জবাবুর। সম্প্রতি বৃদ্ধবয়সে একটা পদোন্নতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু মাদ্রাজি বড়সাহেব যে-কোনও কারণেই হোক, ব্যাপারটায় এখনও পর্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অথচ পুরো ব্যাপারটাই তাঁর হাতে। জরুরি একটা ফাইল নিয়ে বড়সাহেবের ঘরে নক করে ঢুকলেন কুঞ্জ। বদমেজাজি, তিরিক্ষে স্বভাবের মানুষ হিসেবে বড়সাহেবের একটা দুর্নাম আছে। তার উপর আজ মুখটা আবার ভীষণ গম্ভীর। ফুলো গালটাকে আরও ফুলিয়ে বড়সাহেব কী যেন একটা জরুরি ফাইল দেখছিলেন। হাতের কাগজপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কুঞ্জবিহারী। কখন যে হুজুরের দয়া হবে! পদোন্নতির সম্ভাবনা আছে বলেই ইদানীং মেপে মেপে কথা বলেন কুঞ্জবাবু। কে জানে, কখন কী কথায় সাহেব চটে যান। স্বল্পবাক হওয়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ।
ঘরের ভিতরটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। তবু তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে থেকে ঘামতে শুরু করেন কুঞ্জ। সাহেবের কি মেজাজটা আজ ভাল নেই? চোখ দুটোও কেমন যেন লাল টকটকে দেখাচ্ছে। ব্যাপারটা কী? কিছুই বুঝতে না পেরে ন যযৌ ন তস্থৌ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন অফিসের বড়বাবু কুঞ্জবিহারী।
হঠাৎই তাঁর দম আটকে এল। কুঞ্জবাবু যেন এ জগতে নেই আর। প্রায় বিস্ফারিত চোখ দুটো মেলে তিনি হঠাৎই লক্ষ করলেন রোমহর্ষক ব্যাপারটা। জাঁদরেল বড়সাহেবের তেলচকচকে মসৃণ টাকের উপর নির্ভয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে একটা কালো পিঁপড়ে। চেম্বারের উজ্জ্বল আলোয় দেখার ভুল হয়নি তাঁর। আশ্চর্য! এই ঝাঁ-চকচকে ফিটফাট এয়ারকন্ডিশনড কামরায় কোত্থেকে এল দুঃসাহসী পিঁপড়েটা। আর এল তো এল, একেবারে টাকের উপর। যেন বিকেলের হাওয়া খেতে বেরিয়েছে এমন ভাবসাব।
কুঞ্জবিহারীর ভিতরে ভিতরে কী যেন একটা বিপ্লব ঘটে যায় হঠাৎ। যেন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির হঠাৎ লাভা বর্ষণ। সহসা ফাইলটা নামিয়ে রাখেন কাচের টেবিলে। সাহেব এখনও তাঁর দিকে তাকানোর ফুরসত পাননি। ডুবে আছেন ফাইলের মধ্যে।
সে যাক গে, কুঞ্জবিহারীর আর তর সইল না। কয়েক পা নিঃশব্দে এগিয়ে সাহেবের পাশে গিয়েই পেল্লায় এক চাটি কষালেন তেলচকচকে টাকের একেবারে মাঝখানটায়। নির্ভুল লক্ষ্য, আর পিঁপড়েও শেষ। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নিদারুণ এক বিচ্ছিরি কাণ্ড ঘটে গেল। হাউমাউ করে চেয়ার ঠেলে বিকট শব্দে উঠে পড়লেন বড়সাহেব। আর ভয়ে-বিস্ময়ে-রাগে বিশাল হাঁ-করা মুখের গহ্বর থেকে ছোট একটা লালচে দাঁত টুপ করে এসে পড়ল কাচের টেবিলটার উপর।
ততক্ষণে সংবিৎ ফিরে পেয়েছেন কুঞ্জবিহারী। সর্বনাশ, এ কী কাণ্ড করে ফেলেছেন মুহূর্তের উত্তেজনায়! পিঁপড়ের উপর বিদ্বেষের বশে চাটি হাঁকড়েছেন খোদ বড়সাহেবের টাকের উপর। আর কি চাকরি থাকবে তাঁর? এবার অবধারিত পুলিশ কেসে জড়িয়ে পড়ে হাজতবাস নাচছে তাঁর কপালে। চোখের সামনে সবকিছু কেমন ধোঁয়াটে হয়ে যাচ্ছে। ভূত দেখার মতো ভঙ্গি করে দুদ্দাড় চেম্বার থেকে যেন ছিটকে বেরোলেন তিনি। নিজের চেয়ারের দিকে আর ভুলেও গেলেন না। সহকর্মী একজনকে দেখে শরীর খুব খারাপ লাগছে বলতে বলতে অফিস থেকে যেন প্রাণের দায়েই বেরিয়ে পড়লেন কুঞ্জবিহারী। বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন, কাল কেন, কোনওদিনই আর ঢুকতে পারবেন না এতদিনের অফিসে।
সারারাত ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম আর দুঃস্বপ্নের পিছতাড়ায় রাত কাটল। স্বপ্নে দেখলেন, হাজার হাজার পিঁপড়ে নৃশংসভাবে কামড়াচ্ছে তাঁকে। এমনকী চোখের হাই পাওয়ারের চশমাটাকেও রেহাই দিচ্ছে না। আর তিনি মোটা ভারী শরীরটাকে বাঁকিয়ে, কাঁপিয়ে মুক্তি পেতে চাইছেন ওদের কবল থেকে।
পরদিন ইচ্ছে করেই অফিসে গেলেন না কুঞ্জবিহারী। গিয়ে আর কী লাভ হবে। উপরন্তু অপমানিত না হতে হয়! চাকরিটা যে একেবারে ফুটুস হয়ে গেছে, সেটা তাঁর চেয়ে ভাল আর কে জানবে! দুপুরবেলা ভাল করে খাওয়াদাওয়া পর্যন্ত করলেন না। এমনকী একটা গোবেচারা পিঁপড়ে যখন ভয়ে ভয়ে তাঁর ভুঁড়ির উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, তখন দেখেও মারলেন না পিঁপড়েটাকে। আহা কেষ্টর জীব, থাক না।
বিকেলবেলার দিকে অফিসের পুরনো বেয়ারা রামপদ একটা চিঠি নিয়ে এল তাঁর জন্য। দুর্গানাম স্মরণ করতে করতে ভয়ে ভয়ে চিঠিটা খুললেন কুঞ্জবিহারী। কিন্তু এ কী কাণ্ড! প্রমোশন হয়েছে তাঁর এতদিনে। আর সেই জরুরি চিঠিটায় স্বাক্ষর করেছেন খোদ বড়সাহেব। সঙ্গে অন্য একটা ব্যক্তিগত চিঠি। মাদ্রাজি সাহেব ব্যক্তিগত চিঠিতে বিশদভাবে জানিয়েছেন, কয়েকদিন ধরে নড়া একটা দাঁত নিয়ে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। গতকাল কুঞ্জবাবুর এক চাপড়েই সেই বেয়াড়া দাঁতটা খসে পড়েছে। তিনিও মুক্তি পেয়েছেন যমযন্ত্রণা থেকে। সেইসঙ্গে জানিয়েছেন কৃতজ্ঞতা। পাঁচ টাকার রসগোল্লার মতো হাঁ হয়ে গেল কুঞ্জবিহারীর মুখ। তারপর চলকে উঠল হাসি। নাঃ, দেখা যাচ্ছে পিঁপড়েদের সবটাই একেবারে খারাপ নয়।
সেপ্টেম্বর ২০০৪
