Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026

    শ্মশানকোকিলের ডাক – সৌভিক চক্রবর্তী

    May 1, 2026

    এসো না অসময়ে – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    গল্পসম্ভার – আব্দুর রউফ চৌধুরী

    লেখক এক পাতা গল্প75 Mins Read0
    ⤶

    ট্যাকরা-ট্যুকরি

    (ছোটোগল্প)

    আব্দুর রউফ চৌধুরী

    চৈত্রদুপুর এবং শ্বাসকষ্টকর সময়

    সরুজ আলি তার মা’কে নিয়ে কোনাকুনি, ফাঁকা মাঠের মধ্য দিয়ে, পায়ে-হাঁটা সিঁথিহীন পথ ছিঁড়ে হেঁটে চলেছে। মাঘেমেঘে দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষক যে-জমি চাষ করেছে সেই জমিতে পথের কোনও চিহ্ন নেই। শীঘ্র যদি আবার বৃষ্টি না হয় তবে মাটির রস শুকিয়ে যাবে—  এই ভেবে শীতের প্রথম বৃষ্টিতে যে-জমি চাষ করা হয়নি সেই জমি দিয়ে তারা পা চালিয়ে এগিয়ে চলেছে। এ-জমি, সে-জমি, এ-মাঠ, সে-মাঠ করে করে শ্লথগতিতে এই পথ অতিক্রম করতে ঘণ্টা কয়েক লাগবে তাদের। মাথার ওপর দিগন্তপ্রসারী উন্মুক্ত আকাশ; গাছ নেই, ছায়া নেই, ঘাস নেই, হাওয়া নেই, লোকও নেই—  শুধু খাঁখাঁ মাঠ; আর পালশূন্য চৈত্রদুপুরের তেজময় সূর্যটি মেঘশূন্য আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অসহ্য রোদে দামাল ধুলো উড়ছে, যেমনতেমনভাবে। পায়ের নিচে শক্ত ইটের মতো মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে মা’র আঙুলের ডগায় আঘাত লাগছে; সরুজ আলি সে কষ্ট বুঝতে পারে; সে এও বুঝতে পারছে, বোরকা-পরা তার মায়ের পক্ষে স্যান্ডেল পায়ে তিন মাইল পথ অতিক্রম করা চাট্টিখানি কথা নয়! তবুও হাঁটতে হচ্ছে। প্রথম নাতির মুখ দেখার স্বাদ-আরমান এতবেশি যে স্যান্ডেলের ফিতা আঙুলের সঙ্গে ঘষা খেয়ে খেয়ে ফোসকো উঠে গেলেও ছেলের সঙ্গে পা মিলিয়ে তিনি তবুও হাঁটছেন; অবশেষে তার পা যখন আর চলতে চাচ্ছে না তখন জিজ্ঞেস করলেন, আর কতদূর বাবা?

    সামনেই কুশিয়ারা নদী, তারপর সোয়া মাইল।

    কীভাবে নদী পার হবো?

    খেয়া নৌকায়। মনে নেই, গত বর্ষায় যখন তুমি তোমার বেয়াইনের বাড়ি গিয়েছিলে তখনও তো নদী পার হতে হয়েছিল।

    তখন তো নৌকায় গিয়েছিলাম, আর নৌকায় গেলে এত কষ্ট হয় না। পোড়া ইটের মতো শক্ত এই মাঠের মাটি। আঙুলের মাথা আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না। গায়ের ব্যথা কতদিন থাকবে কে জানে! তবুও আল্লাহ যদি আমার নাতির মুখ দেখতে দেন, তাহলে আমি জোড়া ছাগল তাঁর নামে উৎসর্গ করব।

    আর বেশি দূর নয় মাইজি! এই তো এসে পড়েছি। মাকে কথা দিয়ে ব্যস্ত রাখতে চাচ্ছে সরুজ আলি, তার মায়ের হাঁটার কষ্ট লাঘব করার বাসনায়। আসলে পথ কমছে না, শুধু মনমগজকে অন্যভাবে ব্যস্ত রাখা আর কী! সে পুনঃ বলল, নদী পার হলেই শিবগঞ্জ বাজার। তার একপাশে শিবনগর, আর অন্যপাশে নূরপুর। নূরপুরই হচ্ছে আমাদের গন্তব্য।

    পেতনির দাঁতের মতো জমির মাঠি ফেঁটে আছে। পথ কি শেষ হবে না, ভেবে চলেছেন সরুজ আলির মা, ভাবনার মাঝেই তার মন চলে যায় গতরাতের এক স্বপ্নে। তিনি তার শাশুড়িকে স্বপ্নে দেখেছিলেন। মৃতমানুষ স্বপ্নে দেখা দিলে আর কথা নেই, অজানা বিপদ ঘনিয়ে আসবেই। শাশুড়ি তার হাত বাড়িয়ে কাকে যেন কোলে নিতে চেয়েছিলেন। স্বপ্নের কথা কেউ বিশ্বাস করে না, তাই কাউকে বলেননি, ছেলেকেও বলতে তিনি সাহস পাননি, তাই কথাটি বুকে নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন, এবং দিচ্ছেন। মুখ শক্ত করে বন্ধ রেখেই হাঁটছেন; প্রতিটি পদক্ষেপে, বুকের মধ্যে আটকে থাকা স্বপ্নটি মাথায় চক্কর মারছে, ভ্রমরের মতো বোঁ বোঁ করছে, বেরুনোর পথ পাচ্ছে না, একটি রন্ধ্র পেলেই হয়তো-বা বেরিয়ে আসবে। সূর্য-ফাটা দুপুর। তীব্র রোদের ঝাপটায় মাটির দিকে কাহিল চোখে তাকিয়ে হেঁটে চলেছেন তিনি, আর মনে মনে বলছেন, বাবা আমি তো আর পারছি না। নাতির জন্য মন যে আমার কাতর হয়ে আছে। এতটা পথ মাড়িয়ে যাওয়া কি চাট্টিখানি কথা! একটি চিল খাবারের আশায় আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। একটু সময়ের জন্য চিলের ছায়া তার গা স্পর্শ করে চলে গেল। ফের মরুবালি মাখানো তপ্ত সূর্য ঝলসাচ্ছে, দিগন্ত জুড়ে। তার ওপর গাজ্বালা হাওয়া, রণপায়ে ছুটে বেড়াচ্ছে যেন। দূরে— নতুন টিনে নেচে বেড়াচ্ছে সূর্যের কিরণও। মনের কথা সযত্নে বুকে চেপে তিনি বললেন, আচ্ছা বাবা পরশু তুমি আসার সময় আমার নাতিকে কেমন দেখে এলে?

    এই কথার উত্তর না দিয়ে খরাতপক্লিষ্ট সুরুজ আলি বলল, খেয়াঘাটে পৌঁছানোর আগে, পথের পাশে যে চায়ের একটি দোকান রয়েছে, সেখানে বসে বিশ্রাম নিলে তোমার ক্লান্তি কিছুটা দূর হবে। তখন চা খেতে খেতে তোমার সব প্রশ্নের জবাব দেবো।

    বিশ্রাম দরকার। কিন্তু বাবা, পুরুষ মানুষের সামনে বসে আমি কেমন করে চা খাব! এই গরমে বোরকার ভেতর গোসল করে ফেলেছি যে।

    দোকানের ভেতর মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। বোরকা খুলে বসতে তোমার কোনও অসুবিধে হবে না। চা-ও ভালো। পরশু এখান থেকে আমি এক কাপ চা খেয়েছিলাম।

    তাহলে যাওয়া যায় বাবা।

    চা-স্টলে ঢুকে, দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে, কোণের এক ক্যাবিনে বসে সুরুজ আলি তার মায়ের প্রশ্নের জবাব দিতে লাগল, পরশু গিয়ে দেখি, নবজাত শিশুকে কোলে নিয়ে রাহেলা বসে আছে, চৌকির একপাশে। বিমর্ষ অবস্থা। কিছুক্ষণ পরই আলাউদ্দিন মিয়া এলেন। সঙ্গে একজন আধবুড়ো লোক, পরনে হাজির পোশাক, তবে মাথা ঢাকার চাদরটি ছিল তার কাঁধে। শিশুকে বিছানায় রেখে পাশের রুমে চলে যাওয়ার জন্য রাহেলাকে নির্দেশ দিলেন আলাউদ্দিন মিয়া। বিছানার ধারে বসে আধবুড়ো লোকটি বিড়বিড় করতে লাগলেন। তারপর শিশুর মুখের ওপর ঝোঁকে পোঁদেগুদে একটি দীর্ঘ ফুঁ বসিয়ে দিলেন। কেঁপে উঠল শিশুর সারা শরীর। জবেহ করা মুরগির বাচ্চার মতো আছাড়িপিছাড়ি শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় ছটফট করতে লাগল সে মিনিট কয়েক। একসময় তার শ্বাস ফিরে এলো। তারপর আধাবুড়ো লোকটি পানের খিলি মুখে পুরে, চিবাতে চিবাতে ইসম্ পড়ে ফুঁ দিলেন। বাচ্চাটির ছটফটানির সঙ্গে আধবুড়ো লোকটির চোখেমুখে সন্তুষ্টির ভাব ফুটে উঠল। তারপর তিনি বললেন, দেখছ, ট্যাকরা-ট্যুকরি পালানোর পথ খুঁজছে।

    তারপর!

    আধবুড়ো লোকটির অর্থাৎ হাজি কাম পিরের অজ্ঞতায় আমি অবাক হই! আর তোমার দামান্দ১ বেতরিবত বুজুর্গের মেহেদি রাঙা দাড়ির অগ্রভাগের নাচনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে নিশ্চুপ বসে রইলেন; তা লক্ষ্য করে তাকে বলেছিলাম, আপনাদের গ্রামে না একজন ভালো হোমিওপ্যাথ ডাক্তার আছেন তাকে খবর দিলে হয় না?

    আলাউদ্দিন মিয়া উত্তর দিলেন না। দিলেন আধবুড়ো লোকটি, এ হচ্ছে ট্যাকরা-ট্যুকরির ব্যাপার, ডাক্তার কি করবে! কিচ্ছু করতে পারবে না। তার কথা শুনে থ হয়ে বসে রইলাম।

    হ্যাঁ বাবা, দৈও-দানবের বিষয়, ডাক্তারি এসব কাজে আসে না। উপরি ধরায় ঝাড়ফুঁ করতে হয়। ভ‚তপেতনির বেলায় শাস্ত্রসম্মত মন্ত্রই মোক্ষম। এর ওপর আর কিছুই নেই। তবে ট্যাকরা-ট্যুকরির কথা সবাই বিশ্বাস করে না।

    মাকে আশ্বাস দিয়ে সুরুজ আলি বলল, আদতে এই নামের কিছুই নেই। সাধারণ মানুষকে ঠকানোর ফন্দি মাত্র, ফেরেববাজি। ট্যাকরা-ট্যুকরি হচ্ছে কুসংকারাচ্ছন্ন মগজপ্রসূত শব্দদ্বয়। আসলে—  মানব দেহের রক্তে লাল জীবকোষ, শাদা জীবকোষ ও রক্তকণিকা বাহক স্বচ্ছ হলুদাভ তরল পদার্থ (প্ল্যাজা) রয়েছে। লাল জীবকোষের কারণে রক্ত লাল হয়, আর এর স্বল্পতায় হলুদ রঙ ধারণ করে। রক্তের একটি প্রধান কাজ হচ্ছে— অক্সিজেনকে দেহের সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া। হৃৎপিণ্ড যদি দুর্বল হয় তবে রক্ত পাম্প করতে পারে না, ঠিকমতো; ফলে শিশুর শ্বাসকষ্ট হয় এবং প্ল্যাজমার কারণে গায়ের রং কখনও হলুদ, কখনও সবুজ-হলুদ, কখনও সবুজ হয়। বড়োই পরিতাপের বিষয় এই-যে, যেখানে বাংলা তথা ভারতবর্ষের অধিকাংশ মানুষ আদিম যুগের গুহাবাসীর ধ্যানধারণা নিয়ে জীবন ধারণ করছে, সেখানে সভ্যমানবগোষ্ঠী আকাশযান তৈরিতে সময় কাটাচ্ছে।

    সুরুজ আলির মা কী যেন কী বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেকথা ছেলের চিন্তাচেতনার বিরুদ্ধে যাবে অনুমান করে বললেন, যাই হোক এখন উঠা প্রয়োজন।

    ছায়াঙ্কিত চৈত্র এবং একটি নাইওর

    সমস্ত দুপুর তাল-বেতাল হাঁটতে হাঁটতে গাঁয়ে ঢোকার পথে উঠল সুরুজ আলি, সঙ্গে তার মা। গতপরশু ফেরার পথে রাস্তাটি অন্যরকম ছিল, আজ যেন ভ্যাপসা গরমে থমথমে, মৃত্তিকার দেহেও আলাদা তাপ। বাড়ির সামনের পুকুরপাড়ে, বকুলতলায় ছোট্ট একটি কবর দেখে থমকে দাঁড়ালেন সুরুজ আলির মা। ছোটো ছোটো অনেক বুনোফুল ছড়িয়ে আছে কবরটির চারপাশে, তাদেরই একটু দূরে শ্বেতকাঞ্চনের গাছটি জিমোচ্ছে। ছায়াঙ্কিত চৈত্রের সূর্য শীর্ণ কবরের ওপর কেমন যেন স্নিগ্ধকোমল রুদ্রছায়া ছড়িয়ে দিয়েছে। কবরের পাশের পুকুরটির জলও শান্ত, নিস্তব্ধ। বনোফুলের ঘনগন্ধপূর্ণ চৈত্রের স্নিগ্ধকোমল রুদ্রছায়ার মধ্যে নীরব কবরটি দেখে সুরুজ আলির মা’র বুকভরা মমতা উথলে উঠল। তিনি আবেগপ্রবণ হৃদয়ে উদবেলিত হয়ে উঠলেন। বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন। তিনি শোকাভিভ‚ত। চৈত্রের লুকানো যত জল ছিল তা যেন গাল-মুখ বেয়ে ঝরতে লাগল। সুরুজ আলি তার মায়ের মতো করে বিলাপ করতে পারছে না, তাই হয়তো মায়ের পিছনে নীরবে দাঁড়িয়ে একহাতে মায়ের উত্তপ্ত ও শীর্ণ হাত আঁকড়ে ধরে, অন্যহাতে নিজের ঘাড়-গলা মুছতে মুছতে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকে। আবছা অন্ধকারে যেন তার অন্তর ঢেকে যাচ্ছে। সমস্ত অবিশ্বাস-পরিহাস-প্রত্যাশাহীনতাকে অতিক্রম করে মায়ের হাত টেনে সুরুজ আলি বলল, আর বাড়ির ভেতর গিয়ে কি হবে! চলো ফিরে যাই।

    চৈত্রের রোদের তীব্রতা ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে যেন, একটি কাকের ক্রমাগতই কা কা ডাকে সুরুজ আলির মায়ের বুক অস্থির হতে থাকে। চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, না বাবা, রাহেলাকে একবার দেখে যাই। আর আয়েশাকে তো সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।

    সুরুজ আলির মনেই ছিল না, আয়েশা আজ মাসখানেক হলো রাহেলার সেবাযত্নে নিয়োজিত রয়েছে। রাহেলার আরোগ্যলাভের সেবাকাজে আয়েশা কখনও পরিশ্রান্ত হয়নি, অন্ততপক্ষে আশাহীন সুদীর্ঘ মরুপথ অতিক্রম করা পরিশ্রান্তের কথা সে সুরুজ আলিকে বলেনি। জ্যেষ্ঠভগ্নীর সেবার মধ্যে কনিষ্ঠভগ্নী হয়তো একরকম আন্তরিক শ্রান্তি পেয়েছে তা-ই বলেনি। এই কাজে অবশ্য বাধা দেওয়ার কল্পনা সুরুজ আলির মনে কখনও উদয় হয়নি, তাই হয়তো সে তার কনিষ্ঠভগ্নীর কথা ভুলেই গিয়েছিল।

    উঠোনে পৌঁছতেই সুরুজ আলির মায়ের নাক ঘেঁষে একটি ফড়িং উড়ে গেল, আগরের গন্ধও। বুনোনিমের পাতা সরিয়ে ডালের ফাঁকে সূর্যটি উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। লাউপাতা ছুঁয়ে নিঃশব্দে, সর্তক পদক্ষেপে বেলা ভাটির দিকে এগিয়ে চলেছে। বারান্দায় উঠে আসতেই আয়েশা এসে তার দাদাকে২ জড়িয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, দুলাভাই৩ শুধু ভর্ৎসনা বা কটুবাক্যই প্রয়োগ করেননি, ভীষণভাবে বুবুর৪ চুল ধরে ধ্বস্তাধ্বস্তি করেছেন। নির্মমভাবে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পিটিয়ে বুবুর পিঠ কেটে রক্ত ঝরিয়েছেন।

    পিতৃহীন দুটো বোনের একমাত্র সম্বলই তাদের দাদা—  সুরুজ আলি, সে-ই যেন তাদের সর্ব ভরসা; দাদার প্রশস্ত বুকে তারা মুখ রেখে কেঁদে শান্তি পায়। আয়েশার কান্না থামানোর চেষ্টা করল না সুরজ আলি, শুধু তার হাতটি শক্তবন্ধমুষ্টিতে বোনের মেরুদণ্ডে স্থাপন করল, এ-যেন নিশ্চিত আশ্বাসের প্রতীকি; একথা বুঝে তার দুটি বোন, তাই আয়েশা পূর্বাপর চিন্তা না করে বলে যেতে লাগল, আমরা তিনজনে মিলে দুলাভাইয়ের নারী নির্যাতনের প্রতিশোধ নেবো।

    আয়েশার কথায় সুরুজ আলি ভাবতে লাগল, রাহেলার মতো শোচনীয় অবস্থায় অনেক বিবাহিত নারী আছে, এই ভারতবর্ষে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তারা সেবাদাসী এবং রতিক্রিয়ার উপকরণ হিশেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সামাজিক রীতিনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, নবযুগের সূচনাকারী বলে সত্যিকার অর্থে যদি কাউকে আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে সে অবশ্যই নারী; কারণ, পুরুষ তখন ছিল পশুচারণের ছাত্র, আর নারী উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ বলেই হয়তো-বা তার হাতে ছিল বিদ্যার চাবিকাঠি। জীবনজীবিকার ধান্ধায় নারী যখন ব্যস্ত তখন পশুপালক পুরুষ অঢেল সময় ও সুযোগ পেয়ে যায়, উদ্ভাবনী চিন্তা করার জন্য। সে প্রথমেই ভাবল, ধর্ম দিয়ে নারীর প্রাধান্য কীভাবে খর্ব করা যায়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমভাগ বসাতে পুরুষ নারাজ— তাই বলে, পুরুষ আর নারী সমান হতে পারে না। সৃষ্টিকর্তার নিদের্শ— নারীর ওপর পুরুষ সত্য, তাই নারী পুরুষের উপভোগের বস্তু। পুরুষের প্রয়োজনেই তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তুমি গর্ভধারিণী। তুমি দুর্বল। সেই অতীত থেকে আজ পর্যন্ত একই ব্যবস্থা চলে আসছে। যখনই কোনও কবি, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ নারীর পক্ষে কলম ধরলেন তখনই তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হলো ধর্মের খড়্গহস্ত—  মৃত্যুদণ্ড। ভাবনার জগৎ থেকে সরুজ আলি ফিরে এসে বলল, তোদের আর চিন্তা করতে হবে না, যা কিছু করার আমিই করব।

    আয়েশা তার শিক্ষিত দাদার জন্য গর্ব করে। আয়শাকে শিক্ষিত করার পেছনেও সুরুজ আলি সবসময় যত্নবান; রাহেলার বেলাতেও ছিল, কিন্তু তার অমতে ও অনুপস্থিতে রাহেলার বিয়ে হয়ে গেলে সে আর কিইবা করতে পারে। আলাউদ্দিনের বাবা পূর্ব আত্মীয়তার দাবি নিয়ে রাহেলার মা’র কাছ থেকে কন্যাদানের সম্মতি আদায় করেন। প্রথম দিকে ভালোই চলছিল—  নাইওর আসত, সময়মতো আবার শ্বশুরবাড়ি ফেরত যেত; ঘোমটা টেনে সংসার টানার ফাঁকে, সুখের সংসার সৃষ্টি করার ভরসায়, শ্বশুরবাড়ির একখণ্ড জমিতে সাদাসিধে ও নিতান্ত দেশীয় সবজির বাগান করে; লাউ, কুমড়ো ছাড়াও ছিল শসা, ঝিঙে, মিষ্টিকুমড়ো; সমস্ত স্নেহ, সমস্ত হৃদয়, সমস্ত যত্ন দিয়ে সে শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলোকে খুশি রাখার চেষ্টা করে; কিন্তু রাহেলার শ্বশুরের আকস্মিক মৃত্যু ঘটায় আলাউদ্দিনের অবস্থানের অবনতি ঘটতে থাকে; হঠাৎ কর্তৃত্ব পেলে উচ্ছৃক্সখল যুবকের যা হওয়ার কথা তাই ঘটে। এখন রাহেলার দুঃখে মর্মাহত হওয়া ছাড়া সুরুজ আলির কিইবা করার আছে! একসময় আয়শাকে জিজ্ঞেস করল সুরুজ আলি, এখন তোর দুলাভাই কোথায়?

    আয়েশা বলল, শেষ দফা বুবুর পিঠে কঞ্চি ভেঙে চাকরনকর নিয়ে বোরো ধান তোলার জন্য হাওরে গেছেন। এবার ফসল ভালো হয়েছে তাই তার দম্ভ বেড়ে গেছে। ফলে তার চোখকে যেন হাতির কানের মতো ঘিরে ফেলেছে তার অহংকার। এখন তিনি আর সঠিক পথের সন্ধান পাচ্ছেন না।

    সুরুজ আলি তার মাকে বলল, আমি হাওরে লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। তুমি বরং মাঐমাকে খুঁজে বের করো।

    আয়েশা বলল, তোমরা আসার সংকেত পেয়েই তিনি চলে গেছেন শোবারঘরে। যেন আমরা সব্বাই তার শত্রু। বোনপোর মৃত্যুর জন্য আমরা সব্বাই যেন তার কাছে অপরাধী। আমাদের মৃত্যুদণ্ড অনিবার্য।

    আয়েশার মুখের দিকে সুরুজ আলি তাকাতেই দেখতে পেল, বোনের কপালের ভাঁজে ভাঁজে যেন মরুভূমির একের-পর-এক মরীচিকা সৃষ্টি হয়ে চলেছে। হঠাৎ সে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। নিস্তব্ধ বারান্দায় ঘুরে বেড়ানো ভ্রমরের ভনভন শব্দটি তার কাছে স্পষ্টই। হঠাৎ বলল, ঠিক আছে মাইজি তুমি যাও, আমি দেখি কী করা যায়।

    রাহেলার শোবারঘরে না গিয়ে আয়েশাকে নিয়ে সুরুজ আলির মা উপস্থিত হলেন বেয়ানের সন্ধানে তার শোবারঘরে। এ যেন নিরানন্দাশ্রম। পুত্রবধূর মাকে দেখেই মৃত নাতির শোকাক্রান্ত বিষণ্ণ দাদি৫ দপ করে জ্বলে উঠলেন, তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন আগুনের দহন শুরু হয়ে গেছে। মুখের পেশিতে অন্তরের গোপন ক্ষোভ ও চোখের পাতায় মগজে সযত্নে রাখা গোপন ক্রোধ প্রকাশিত হলো, যেন অগ্নিয়গিরির উত্তাপ শুরু হয়েছে। তার বুকে উত্তাল কম্পন আর দৃষ্টিতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয়ে গেছে। তার ভাবভঙ্গি যেন জ্বলন্ত চিতা। তিনি খেঁকিয়ে উঠলেন, পুতখাউরি৬ পুরি৭ জন্মাইছ, আর এখন আইছ৮ কিতার৯ লাগি১০?

    তিনপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙা চেয়ারের পাশে রাখা পিড়িতে বসা পড়শি—  মোল্লাগিন্নি—  দাদির সুরে সুর মিলাতে ভুল করলেন না। বাইরে, ম্লান রোদের মৃদু তেজ থাকলেও তার মুখে এর প্রভাব পড়ল না, বরং মেঘকালো হয়েই রইল, তেমনি তার হৃদয়ও যেন তেনাছেড়া। বাইরে, ধুলোমাখা বাতাসে ঝাউবেতের কাঁপন থেমে গেলেও তার দেহের উত্তেজিত কম্পন থামল না। তার এই কাঁপন এড়িয়ে সুরুজ আলির মা বললেন, শোক তো আমারও কম নয় বেয়ান। একটু হলেও আপনার দুঃখ বুঝি। কিন্তু কী আর করার আছে। সবই তো আল্লাহর ইচ্ছে।

    বেঁকে বসলেন বেয়ান। তিনি বিবর্ণমুখে, বিস্ফোরিত চোখে বললেন, আপনার পুরিরে আল্লায় কইছলানি১১ বাচ্চারে পিছ১২ দিয়া ঘুমাইবার লাগি?

    সুরুজ আলির মা উদ্বিগ্নভাবে আলাউদ্দিনের মায়ের দিকে তাকিয়ে, কিঞ্চিৎ সংকোচে বললেন, বুঝলাম না।

    পির কইছইন১৩ যে, মা যদি পিছ দিয়া ঘুমায়, তখনঐ সুযোগ পায় সন্তানের ওপর ট্যাকরা-ট্যুকরি আছর১৪ করতে। পুতখাউরি ঘুমের ঘোরে খাইল১৫ আমার নাতিটার। দৈও-ভ‚তর আঙুলর দাগ কিলাকান১৬ বড়ো হয় তা বুঝতায় পারতায় যদি দেখতায় আমার নাতির পিঠটা। ইয়া বড়ো পাঁচ আঙুলর থাপ্পর।

    বেয়ানকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য সুরুজ আলির মা বললেন, আল্লাতালা দিয়েছিলেন, তিনিই আবার উঠিয়ে নিয়েছেন; সবই তাঁর লীলা। তিনি তাঁর চোখ দিয়ে দেখছেন আমাদের আহাজারি১৭। আশাকরি তিনি তাঁর নিজ হাতে এর প্রতিকার করবেন।

    মোল্লার বাড়ির বিড়ালও সবকদুই ইলেম জানে, আর তার স্ত্রী জানবে না! এর প্রমাণ পাওয়া গেল যখন মোল্লাগিন্নি বললেন, আল্লাতালার হাত, নাক, মুখ, চোখ আছে—  এমন কথা বলিলে জবরদস্ত গোনাহ্ অইব। আল্লাহ নিরাকার, লা-শরিক আল্লাহ—  একথা আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করিয়া আইতাছি।

    অযাচিত একটুখানি হাসি সুরুজ আলির মা’র ঠোঁটের কোণে উঁকি দিয়ে আবার তার অজান্তেই মিলিয়ে গেল, বললেন, আমার শ্বশুর একজন বিশেষ আলেম ছিলেন। তাঁকে বলতে শোনেছি যে, কোরআন শরিফে বর্ণিত কোনও কথা যদি কোনও ব্যক্তি অস্বীকার করেন, তবে সে কাফের হতে বাধ্য। আর…।

    তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আলাউদ্দিনের মা পানদান থেকে একদলা চুন পানে ঘষে, তারপর মুখে পুরে বললেন, বেয়ান অমন বুলি কইলা যা ওকলঐ১৮ জানঐন১৯।

    উম্মা সংবরণ করে সুরুজ আলির মা বললেন, আপনি যেকথা জানেন না, সেকথা শোনার শক্তি আপনার নেই বলেই হয়তো আমার মুখের কথা কেড়ে নিলেন। আপনাকে জানিয়ে দেওয়া উচিত তাই কথাটি বললাম; কারণ, আপনার ঈমানে খললজলল২০ থাকুক তা আমি চাই না। তাই …।

    আবারও সরুজ আলির মায়ের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে উম্মার সঙ্গে আলাউদ্দিনের মা বললেন, আমার ইমান-আমান লইয়া প্রশ্ন করতাছ?

    না, আমি করছি না। করছে কোরআন শরিফ। সেখানে দেখতে পাবেন, আল্লাহর হাত, মুখ, চোখের কথা লেখা আছে। কাজেই তা অস্বীকার করার পরিনাম মুসলমান মাত্রই বোঝেন। এর অধিক আমি আর কিছু বলতে চাই না। কারণ, আজ আমাদের শোকার্ত অন্তর।

    এমন সময় সুরুজ আলি এসে বলল, মাঔমা রাহেলার যে অবস্থা তার চিকিৎসার প্রয়োজন।

    আলাউদ্দিনের মা বললেন, ও-মা, চিকিচ্চা! সুয়ামি বেত দিয়া বারদুই  পেতপেত২১ করিল, তারঐ লাগি অতসব? আলাউদ্দিনের মা দৃষ্টি ফিরালেন সুরুজ আলির মায়ের দিকে, তারপর যোগ করলেন, সুয়ামির পাউওর২২ নিচ হিস্ত্রীর বেহেশ্ত। এই শিক্ষা দিছ না তোমরা পুরিটার?

    মোল্লাগিন্নী যোগ করলেন, সুয়ামির ইচ্ছাইত হিস্ত্রীর মান্য করা উচিত। এইটাইত অইল কিতাবর বুলি। হিস্ত্রীর ওপর সুয়ামির দাবি বহুত— তাই তিনি শাসন করব, তর্জনগর্জন করব, আবার রক্ষা করব, মাধুর্য দিব।

    সুরুজ আলি বলল, অপরের মেয়েকে মায়া করার মতো উদার মন সবার থাকে না, তাই বলে আপনাকে দোষ দিচ্ছি না, তবে বোনের বিষবেদনা উপশমের জন্য সাধারণ পেনকিলার কিনে দেওয়া ভাইয়ের জন্য ওয়াজিব। তাই আমি বাজারে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে আশাকরি তিনি মাঠ থেকে ফিরবেন। তিনি এলে তার ও আপনার অনুমতি নিয়ে বোনকে কিছুদিনের জন্য আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাব।

    ফসল তোলার সময় কেউ কিতা বউকে নাইওর দেয় না কিতা? চাকরি করতাছ। মাস মাস বেতন পাইতাছ। ইতা দিয়া হাটর চাউল ঘাটর পানি খাইতাছ …। এটুকু বলেই আলাউদ্দিনের মা’র খেয়াল হলো, সুরুজ আলিকে এভাবে ধোলাই করা ঠিক হচ্ছে না, তাই সুর কিছুটা পরিবর্তন করে যোগ করলেন, গৃহস্থির মর্ম তোমার মা বুঝবা কেমন করিয়া।

    আলাউদ্দিনের মায়ের সঙ্গে তর্ক করে ফায়দা নেই, বরং উলটো ফল হতে পারে, বিগড়ে গেলে নাইওর নেওয়া কঠিন হবে, তাই সুরুজ আলি আর কথা বাড়াল না, শুধু বলল, শীঘ্রই ফিরে আসব।

    শিবগঞ্জ বাজার এবং অলকানন্দ ঔষধালয়

    সরুজ আলি বেরিয়ে গেল শিবগঞ্জ বাজারে উদ্দেশে, ওষুধের অনুসন্ধানে। জৈন্তার রাজবংশের এক উত্তরাধিকারী শিবচন্দ্র নারায়ণ বাবুর শানশওকত কিংবদন্তীতুল্য ছিল। তিনি নাকি গৌহাটি যেতে পারতেন পরভ‚মে পা না ফেলে। তারই অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয় শিবসাগর দিঘি। ব্রিটিশ-ভারত সরকার তাকে ক্ষমতা দেয় তার অঞ্চলের অপরাধীদের ছয়মাস পর্যন্ত বন্দি করে রাখার। শিংমাছের গর্তে গলাজলে ডুবিয়ে রেখে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের দেহকে বিষিয়ে দেওয়ার অধিকারও ছিল তার। শিবচন্দ্র নারায়ণ বাবুর স্থাপন করা শিবগঞ্জ বাজারটি তার পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবুর আমলে শ্রীভূমি (সিলেট) ও কাছাড় অঞ্চলের প্রধান বিক্রয়কেন্দ্র হিশেবে পরিচিতি লাভ করে। বাজারের চারপাশে অনেকগুলো আনারস ও কাঁঠালের বাগান ছিল। এখান থেকেই শ্রীভূমি ও কাছাড় জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে কাঁচামাল স্যাপ্লাই করা হতো। চেরাপুঞ্জির কলমালেবু ও খাসিয়াপুঞ্জির পানের জন্য পাইকাররা বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে এসে জড়ো হতো। ইউরোপীয় যুবতীর কোমরের মতো সরু ছিল বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সুরমা নদীর প্রবাহটি; তবুও এখান থেকেই জন্ম নেয় কোরাঙ্গি নদীটি। নদীপথে যাতায়াতের সুবিধে থাকায় শিবগঞ্জ বাজারের ব্যাবসা বিস্তার হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে; তবে বাজারের উন্নতির সঙ্গে পার্শ্ববর্তী নূরপুর গ্রামের মানুষগুলোর আর্থিক অবস্থা ম্লান হয়ে যায়। স্বল্পায়ের প্রায় চল্লিশটি পরিবার তাই সস্তা শ্রমিক হিশেবে কাজ করতে বাধ্য হয় এবং জমিদারের হুকুম বরদান হিশেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। ব্যতিক্রম শুধু তালুকদাররাই।

    ‘অলকানন্দ ঔষধালয়’-এ পৌঁছতেই সরুজ আলির সঙ্গে দেখা হলো ডাক্তার নালিনীকান্ত নাগের। তিনি পূর্বপরিচিত। ঘনিষ্ঠ পরিচিত সহৃদয় মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় নিজের মনের কষ্ট বেরিয়ে আসে অজান্তে, সুরুজ আলির তাই হলো। সহজেই ডাক্তার বাবুর কাছে রাহেলার নির্যাযিত জীবনের কথা বলে ফেলল। সব শোনে, একজন রোগীকে কয়েকটা পেনকিলার দিয়ে, চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, প্রাক্-ঐতিহাসিক যুগে শিশুর জন্ম নিয়ে কেউ প্রশ্ন করত না। সন্তান মায়ের নামে পরিচিত হতো। কিন্তু অতীতের সাক্ষীসাবুদে মনে হয় প্রস্তরযুগের প্রথম দিকের কোনও এক সময়, মেষপালক পুরুষগুলো বুঝতে পারে তাকে ছাড়া একা  নারী সন্তান জন্মদানে সক্ষম নয়; হয়তো সে লক্ষ্য করে যে, মেষ ব্যতীত মেষী জননপ্রক্রিয়ায় সফলতা অর্জনে অক্ষম, ফলে তার ক্ষমতা সম্বন্ধে সে সজাগ হয়ে ওঠে। ক্রমশ সন্তান ও খাদ্য সরবরাহের ব্যাপারে নারীর যোগ্যতা যেমনি হ্রাস পায়, তেমনি পুরুষের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে পুরুষ নারীকে হেরেমে বন্দি রেখে, ভোগ্যপণ্যে পরিণত করে, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে থাকে। আজও কি তারা এ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে! নারীরা স্বাধীন চিন্তায় মাথা তুলতে চাইলে ধর্মের মুগুরের আঘাতে তাদের কপাল ভেঙে দেওয়া হয়।

    একজন ভিক্ষুক এসে একটি টাকা প্রার্থনা করল। ডাক্তার তা আমলে নিলেন না। কিন্তু সুরুজ আলি তার পকেট থেকে একটি টাকা বের করে ভিক্ষুককে দিলো। ডাক্তার বাবু বললেন, যতই তুমি দান করো না কেন, এতে ভিক্ষুকের সংখ্যা কমবে না। কারণ, ভিক্ষুক হওয়ার মূলে রয়েছে ধনিকবণিকের সৃষ্ট আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ও বিশ্ববাজার অর্থনীতির অসম প্রতিযোগিতা। ম্যানচেস্টারে তৈরি পোশাকের সঙ্গে কি পেরেছিল তাঁতের তৈরি দেশীয় বস্ত্র?

    সুরুজ আলি মনে মনে বলল, বুদ্ধিজীবীর বক্তৃতায় মাঔমাকে গলানো যাবে না। তার চেয়ে বরং চেষ্টা করতে হবে, তার পছন্দমতো হাতানোমাতানো ভাষা ব্যবহার করে রাহেলাকে নাইওর নেওয়ার অনুমতি আদায় করে নেওয়া। এই চিন্তা মাথায় নিয়ে সুরুজ আলি ওষুধের টাকা পরিশোধ করে, ডাক্তার বাবুর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে, ত্রস্তপদে যাত্রা করল ভগ্নীপতির বাড়ির উদ্দেশে।

    একটি আমগাছ এবং ভগ্নীপতি

    পুকুরপাড়ে আসতেই সুরুজ আলি টের পেল, আলাউদ্দিন পুকরঘাটে হাতপা ধুয়ে, সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠে আসছে। সরুজ আলিকে না দেখার ভান করে সে বকতে লাগল, আমার পিতামহ ছিলেন রাজনায়েব। স্বয়ং রাজা তাঁকে নাম ধরে ডাকতেন না, বরং তিনি তাকে সম্বোধন করতেন তালুকদার বলে। কত প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল তাঁর, সেকথা কি কেরানির পিতামহ কল্পনা করতে পারেন!

    সুরুজ আলি জানে, একথার উত্তর দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু এসব বলেই সে ক্ষান্ত হলো না; সঙ্গে একটি হাসিও ছড়িয়ে দিলো, সেই হাসিতে লজ্জা নেই, আছে সুখ, কিঞ্চিৎ অবিশ্বাস, পরিহাসের তীব্রতা। সুরুজ আলি প্রতিবাদ করতে পারল না। এরকম হাসির জন্য আলাউদ্দিনের সঙ্গে ভালোভাবে আলাপ করতে পারল না সে; কোনওদিনও পারেনি, তার অসাক্ষাতে যতসব কথা সুরুজ আলির মনে উদয় হয়, তার সম্মুখে এলে সবই যেন হৃদয়ের অতলে তলিয়ে যায়। সুরুজ আলি জানে, আলাউদ্দিন ঠিকই বলেছে, মাহতাব উদ্দিনের প্রতাপ ছিল রাজতুল্য, রাজনায়েবের মতোই। তাঁর প্রায় সত্তর বছর জীবনের জানাশোনা কাণ্ডকারখানা একত্রিত করলে যে-কাহিনি দাঁড়ায় তা হচ্ছে : আলাউদ্দিনের পিতামহ মাহতাব উদ্দিন গ্রামের সেরা জোতদার তালুকদার ছিলেন। এই তল্লাটের প্রভাবশালী জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবুর কৃপাদৃষ্টি তাঁর ওপর ছিল বলেই তিনি অনেক সুযোগসুবিধে ভোগ করতেন। জমিদার বাবুর ভোগকৃত কোনও জমি যদি তাঁর পছন্দ হতো, তাহলে বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই সেই ভূখণ্ড তাঁর দখলে এসে যেত, ভোজবাজি প্রয়োগে। মাহতাব উদ্দিনের প্রতি জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবুর হৃদ্যতায় এই অঞ্চলের লোক বিস্ময়াভিভ‚ত হয়ে তাঁকে দুই নম্বর জমিদার জ্ঞানে সমীহ করত। তারা বুঝত যে, লোকটার উপকার করার সদিচ্ছা না থাকলেও ক্ষতি করার ক্ষমতা অনেক ছিল। কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবুর সাহায্য সহায়তায় উত্তরোত্তর আর্থিক অবস্থার উন্নতির সঙ্গে তাঁর সামাজিক সম্মানও বেড়ে যায়। ক্রমশ তিনি মুসলিম জমিদার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হন, স্বয়ং জমিদার তাঁকে তালুকদার বলে সম্বোধন করতেন কিনা তাই।

    আমগাছের আড়াল থেকে সুরুজ আলি বেরিয়ে আসতেই ‘আস্সালামু আলাইকিুম’ বলে আলাউদ্দিন অন্তঃবাড়িতে প্রবেশ করার জন্য আহ্বান জানাল। আমগাছের যে শাখা পুকুরের ওপর পক্ষবিস্তার করে আছে তা থেকে একটি আম টুপ করে জলে পড়ে ডুব দিলো, সঙ্গে সঙ্গেই আবার ভেসেও উঠল, তবে মাথা নত হয়েই রইল। আমটিকে আরেকবার দেখে সুরুজ আলি তার ভগ্নীপতিকে অনুসরণ করল, আর মনে মনে বলতে লাগল, এবার খরার বছর, ঝড়তুফান কম হয়েছে বলে আমের মুকুল তেমন নষ্ট হয়নি, আম-কাঁঠাল পেকেছে অসময়ে, আর শিলাবৃষ্টি বা বন্যার জল অন্য বছরের মতো বোরো ফসলের কোনও ক্ষতি করতে পারেনি বলেই ফসল ফলেছে আশাতীত, তাই আলাউদ্দিনের মতো বেলাল্লা কৃষকের মুখ দিয়ে বেলাগাম কথা বেরুতে সমস্যা কীসের! স্ত্রীর ওপর প্রভুত্ব ফলাতেও অসুবিধে নেই। নারীনির্যাতনে সমাজের নীরবতা সত্যি বিস্ময়কর। না, এ-ই আমাদের সমাজব্যবস্থা। একজন পুরুষ ও একজন নারী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষ হয়ে যায় পতি-¯স্বামী-প্রভু; আর নারী পরিণত হয় সেবাদাসীতে। অধিকন্তু, কামিনী ও রমণী বলে আখ্যায়িত করে নারীকে হেয় করা আর কী! পুরুষ তার মনে যৌনসম্ভোগেচ্ছার উদ্রেক ঘটিয়ে কামিনীরমণের মাধ্যমে এর অবসান ঘটায়। নারী তুমি পুরুষপ্রদায়িণীরমণী, তুমি পুরুষসন্তোষবিধায়িত্রী।

    আলাউদ্দিন এই ব্যাপারে ইউনিক নয়। প্রভুত্বপরায়ণতা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। এতে মানুষ একধরনের আনন্দ পায়। এর সঙ্গে যদি নারীনির্যাতন যোগ করা হয় তাহলে আনন্দের মাত্রা বেড়ে যায়। দাসপ্রথা তার ঔ্যজ্জ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। প্রাচীন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সভ্যতা দাসপ্রথার ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীতেও তার বিলোপসাধন কি সম্ভব হয়েছে! এখনও তো সৌদি আরবে বহালতবিয়তে দাসপ্রথা বিরাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন প্রকারে, প্রযুজ্যমান ধর্ম-বর্ণ-জাতিভেদপ্রথাই দাসপ্রথার আধুনিক সংস্করণ। আজকাল দাস পোষার প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য নেই বলেই বোধ হয় স্ত্রীকে সেবাদাসীতে পরিণত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, বুদ্ধিহারা জনগোষ্ঠীর মধ্যে। রাহেলা তারই নিরীহ শিকার। না, দর্শন চিন্তায় এখন ফায়দা হবে না। এই মুহ‚র্তে যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে রাহেলাকে আলাউদ্দিনের খপ্পর থেকে এবং তার গৃহাগ্নি থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা। সরুজ আলি একসময় প্রবেশ করল অন্তঃবাড়ি। মা ও মাঐমাকে আলাপরত অবস্থায় দেখে সে মনে মনে খুশি হলো। পরক্ষণেই জানতে পারল, তার মায়ের বিনয়াবনত ব্যবহারে তার মাঔমা সন্তুষ্ট হয়ে রাহেলাকে নাইওর দিতে রাজি হয়েছেন। এই খবর শোনামাত্র আলাউদ্দিন ক্ষুব্ধ হয়ে, না খেয়ে মাঠে চলে গেল; হয়তো ধারণা ছিল তার অনুমতি ছাড়া রাহেলাকে নিয়ে যেতে সরুজ আলি সাহস পাবে না। ভগ্নীপতির বেপরোয়া ব্যবহারে সরুজ আলির চোখেমুখে প্রতিশোধের এবং অভিমানের আগুন ধপধপ করে জ্বলে উঠল। ভগ্নীপতিকে সমুচিত শিক্ষা দিতে সে বদ্ধপরিকর।

    একটি নৌকা এবং গৃহপালিত কুকুর

    মাঔমার কাছ থেকে বিদায়পালা সেরে স্বস্তিতে নিশ্বাস ফেলে সরুজ আলি তার দুই বোন ও মাকে নিয়ে কুশিয়ারা নদীর তীরে এসে উপস্থিত হলো। একসময় কষ্টক্লিষ্ট রাহেলার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা এখানে দাঁড়াও, আমি দেখি কী করতে পারি!

    দাদার কথায় মাথা ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই রাহেলা দেখতে পেল, তার শ্বশুরবাড়ির কুকুরটি নদীর পাড়ে, বিধ্বস্ত ভিটের মহাজনের মতো, ভাঙা পায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

    সুরুজ আলি একখানা ভাড়াটে ছইওয়ালা নৌকা সংগ্রহ করে তার মা ও বোনকে নিয়ে নৌকায় উঠল। ছইটি বেশ ছিপছিপে ও মজবুত। গাবের কষের প্রলেপে ঝাউবেতগুলো যেন শীতল পাটির মতো শুয়ে আছে। ছইয়ের ভেতর বিছানা পাতা আছে, শুধু একটি বালিশ ছেঁড়া কাঁথার ভাঁজে আত্মগোপন করে আছে। কাঁথার গায়ে নানা রঙের তালিগুলো মাঝির সংসারের অভাবের বাহার প্রকাশ করে যাচ্ছে শুধু। সুরুজ আলি এই আয়োজনেই শুইয়ে দিলো তার অসুস্থ বোন ও পথশ্রান্ত মাকে। তারপর আয়েশাকে নিয়ে ছোটো দরজা খুলে ছইয়ের বাইরে এলো। দরজার দুপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খিরখিগুলো লাল ও সবুজ রঙের লতাফুলের মধ্যে লুকিয়ে রইল, তবে নৌকার তলায় জমে ওঠা জলে একটি পাত্র ছলাৎ ছলাৎ করতে লাগল। পাটাতনে বসে পড়ল সুরুজ আলি ও আয়েশা। সুরুজ আলি নিশ্চিত হলো, রাত যতই হোক না কেন নৌকা এবার ঠিকই পৌঁছে যাবে তাদের গন্তব্যস্থলে, তাদের ঘাটে। ঘাট থেকে বাড়ির অন্তঃমহল শুধু এইটুকু পথ।

    নৌকায় গুণই প্রয়োজন; তবে বৃদ্ধ মাঝির নৌকার গলুই ছাড়াতেই কষ্ট হচ্ছে, তারপর না গুণ টানা। সুরুজ আলি জানতে চাইল, কাকা, এই বুড়ো বয়সে গয়না নৌকার কাজ করছ কেন? গলুই ছাড়াতেই তো তোমার কষ্ট হচ্ছে। তোমার কি কোনও উপযুক্ত ছেলে নেই?

    পুয়া২৩ তাকিয়াও নাই। অকলতাই২৪ কপাল বাবাজি। কপালের লেখন খণ্ডাইতে পারে কেটা!

    বুঝলাম না। যদি একটু বুঝিয়ে বলতে, তবে আমার সুবিধে হয়।

    পুয়ারে বিয়া করাইলাম ধনীবাপের সুন্দরী ঝি। ছয়মাস না যাইতঐ সে তার সুয়ামিকে কানমন্ত্র দিলো। অই২৫ তাকি আমার পুয়াটা ওউরবাড়িত২৬ তাকতাছে। এখন আমার পুয়া তার হুউরবাড়িত বেগার খাটিয়া খাইতাছে। আর তার বউর দিন কাটতাছে হাসিতে খুশিতে। আমার দুঃখের কিচ্ছা হুনিয়া লাভ নাই বাবাজি। আচ্ছা তোমরা কার বাড়িত গেছিলায়?

    নূরপুরের আলাউদ্দিন মিয়ার বাড়ি।

    চিনি, তার দাদা২৭ পর্যন্ত চিনি। মাঝি বলে যেতে লাগল আলাউদ্দিনের পিতামহ মাহতাব উদ্দিনের জীবন কাহিনি। একদিন তাঁরও পতন ঘটে, যেন রূপকথার সেই মূষিকরাজ্যের মতো। এই কাহিনি সত্যি অদ্ভুত। কোনও এক মাঘের সকাল। প্রায় সকল শীত সকালের মতোই। মাহতাব উদ্দিন প্রভুগৃহে আগমন করেন গৃহকর্তার চিত্তবিনোদনকারী গল্প শোনানোর জন্য, তখন শূদ্রশ্রেণির চাকরদুটো বনশণ, লতাপাতা দিয়ে আগুন পোহাচ্ছে। আসামের এণ্ডির চাদর গায়ে জড়িয়ে আগুনের আঁচে বসে কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবু রাজার মতো গোপাল ভাঁড়ের গল্প শোনছিলেন। প্রৌঢ় মনমানসিকতায় তিনি ভালোবাসতেন যৌনসংক্রান্ত গল্প শুনতে, যৌবনের অতৃপ্ত কামনার বিকৃত পরিতৃপ্তি যেন। জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবুর চাদরে অকস্মাৎ আগুন ধরে যায়। নিমিষে তার দেহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। চারদিকে শুধুই লেলিহান শিখা। উপস্থিত তিনজনের কেউই, শিষ্টাচার ভাঙার আশঙ্কায়, সাহস পেলেন না কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবুকে বস্তা মুড়ি দিয়ে আগুন নিভানোর। তাদের এমন থতমত খাওয়া অবস্থায়, ঘটনার আকস্মিকতার ঘোর কেটে যাওয়ার আগেই, কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবুর দেহ দগ্ধ হয়ে যায়; শুধু বাকি থাকে মৃত্যুপথযাত্রীকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে শেষকৃত্য সমাপন করার। কৃষ্ণচন্দ্র নারায়ণ বাবুর জ্যেষ্ঠপুত্র বিষ্ণুচন্দ্র নারায়ণ বাবু এই দুঃসংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরে এলেন। তিনি বাড়ি ফিরে যা শোনলেন এতে তাঁর মনে ধারণা জন্মায় যে, তাঁর পিতার মৃত্যুর জন্য একমাত্র মাহতাব উদ্দিনই দায়ী। তাই যত শীঘ্র এই নিমকহারামকে সম্মচিত শাস্তি দেওয়া উচিত। তিনি মোড়ল পাঠিয়ে জানিয়ে দিলেন, মাহতাব উদ্দিন জমিদার বাড়ির ত্রিসীমানায় যেন আর না আসেন; পা যেন না মাড়ান এই তল্লাটে। তারপর তিনি হুকুম জারি করলেন এই মর্মে যে, তাঁর পিতার দেওয়া জমিগুলো যেন অগ্রহায়ণ মাসে ফসল সংগ্রহের পর জমিদারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। মাহতাব উদ্দিনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। হঠাৎ জোতদারী চলে যাওয়ার ফলে আর্থসামাজিকভাবে যে পতন ঘটে, এর সঙ্গে আপোশ করে চলার মনমানসিকতা সৃষ্টি হওয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় তাঁর সামাজিক ঠাঁটবাট— টুনকো আভিজাত্যাভিমান— বজায় রাখার ব্যর্থ চেষ্টায় একে একে অবশিষ্ট জমিজায়গা হাতছাড়া হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্লানির হাত থেকে রক্ষা করতে মৃত্যুই কাম্য হয়ে পড়ে। তাঁর মৃত্যু ঘটে। মাঝির কাছ থেকে এই কাহিনি শুনে সুরুজ আলি মনে মনে বলল, আলাউদ্দিনের অহংকার অমূলক না হলেও তার ঔদ্ধতা সহ্য করা সম্ভব নয়। পিতামহ ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন বলে নিজের হাতে ঘ্রিতগন্ধ শুঁকার কি কোনও অর্থ থাকতে পারে!

    পাল পতপত করে আকাশে উড়ল, আর রাহেলা ছইয়ের নিচে তার মৃতপুত্রের মূর্তিটি খুঁজতে থাকে। গত কয়েক দিন, সে তার সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টায় অহর্নিশি এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নেয়নি। এখন যদিও তার বিশ্রাম নেওয়াই উচিত, তবুও বালিশ থেকে মাথা তুলে বাইরে তাকাতেই দেখতে পেল, নদীর পাড়ে, ভাঙা নৌকাঘাটে, তার শ্বশুরবাড়ির কুকুরটি দাঁড়িয়ে আছে। কুকুরটির দিকে চোখ রেখে  মনে মনে বলল, ব্যাকুলতার সঙ্গে সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রাণপণ আমার সন্তানকে রক্ষা করার জন্য যমদূতের সঙ্গে কতই না যুদ্ধ করেছি। সবই তো আল্লাহ জানেন। তিনি জানেন আমার আহার ছিল না, নিদ্রাও না। তবুও স্বামী-শাশুড়ির যত্নসেবা করতে হয়েছে। চেয়েছিলাম যেকোনও মূল্যে আমার সন্তানের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখব, কিন্তু পারিনি। রাহেলার চোখ বেয়ে স্থিরনিস্তব্ধ যন্ত্রণার অশ্রু ঝরতে থাকে, যেন তার অন্তরে পুত্রশোক আগের চেয়ে অনেক ঘন হয়ে উঠেছে। সেই বেদনা উপলব্ধি করেই হয়তো-বা কুকুরটি আর অগ্রসর হলো না। তবে রাহেলার মন, পুত্রশোকের যন্ত্রণার মধ্যেও, নিশ্চিত হলো যে, শ্বশুরবাড়ির কোনও লোক তার সাথী হয়ে বাপের বাড়ি যাচ্ছে না। এই প্রথমবারের মতো সে তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়কুটুম্ব ছাড়াই পিতৃগৃহে যাচ্ছে। এমনকি কুকুরটিও তার সঙ্গ নিচ্ছে না।

    পূবালি বাতাসে দাঁড়ই যথেষ্ট। নদীর জল ভেঙে নৌকা এগিয়ে চলল আপনমনে।

    [Footnotes : ১ মেয়ের পতি। ২ জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে। ৩ ভগ্নীপতি। ৪ দিদির। ৫ পিতামহী। ৬ ছেলের মৃত্যুর জন্য যে মা দায়ী। ৭ মেয়ে। ৮ এসেছ। ৯ কীসের। ১০ জন্য। ১১ বলেছিলেন কি! ১২  পেছন। ১৩ বলেছেন। ১৪  ভর। ১৫ খেয়ে ফেলল। ১৬ কেমন। ১৭ দুঃখশোক প্রকাশ। ১৮ সকলেই। ১৯ জানে। ২০ ভুলভ্রান্তি। ২১ আঘাত। ২২ পায়ের। ২৩ ছেলে। ২৪ সকলই। ২৫ সেই। ২৬ শ্বশুরবাড়ি। ২৭ পিতামহ।]

    লেখক পরিচিতি :

    জন্ম : ১ মার্চ ১৯২৯। মুকিমপুর, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ।

    মৃত্যু : ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬। মুক্ত স্কাউট ভবন, হবিগঞ্জ।

    ১৯৪৭। আউশকান্দি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু। ১৯৪৯। আউশকান্দি হাইস্কুলে শিক্ষকতার সময় পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগদান। তারপর সপরিবারে পাকিস্তানে বসবাস শুরু। ১৯৬১। বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ এবং সপরিবারে পূর্ব-বাংলায় প্রত্যাবর্তন। ১৯৬২। ব্রিটিশ সরকারের মিনিস্ট্রি-অফ-অ্যাভিয়েশনের গবেষণাকেন্দ্রে চাকুরি গ্রহণ। ১৯৬৬–১৯৭১। ক্রমাগত পেশা বদল—  ম্যানেজার, ইলেকট্রিকমিস্ত্রি, ফিটার ইত্যাদি। ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধের একজন সক্রিয় সংগঠক। ১৯৭২। সিভিল সার্ভিসে যোগদান। ১৯৮৯। অবসর গ্রহণ এবং স্ত্রী সমেত বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন। সংগ্রাম-উন্মুখর বিচিত্র জীবনধারা থেকে সংগৃহিত হয় তাঁর অভিজ্ঞতা। দারিদ্র্যের প্রচণ্ড চাপ আর সামাজিক বিষমতা ও পীড়নে লেখালেখিতে প্ররোচিত। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬।  সকাল। ১১.৪০। তাঁর প্রিয় সংগঠন হবিগঞ্জ সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত হবিগঞ্জ মুক্ত স্কাউট ভবনে মহান একুশ স্মরণে আয়োজিত আলোচনা মঞ্চে বাংলা ভাষার পক্ষে উত্তেজিতমূলক বক্তৃতারত অবস্থায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু জীবনের শাশ্বত সত্য জেনে তাকে গ্রহণ করেন।

    প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত অসংখ্য উপন্যাস, ছোটোগল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা সমেত রউফসৃষ্টিনিদর্শন বাংলাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী আগামী দিনেও বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃজনকর্মের গৌরবে।

    ⤶
    1 2 3
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleআবুল হাসান গল্প সংগ্রহ
    Next Article ইহুদী জাতির ইতিহাস ২ (ইসরাইলের উত্থান-পতন) – আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ

    Related Articles

    আশাপূর্ণা দেবী

    সমুদ্র কন্যা – আশাপূর্ণা দেবী

    April 24, 2026
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    আমাদের মহাভারত – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    March 20, 2026
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    January 8, 2026
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    ভয় সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    প্রকাশ্য দিবালোকে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 18, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Our Picks

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026

    শ্মশানকোকিলের ডাক – সৌভিক চক্রবর্তী

    May 1, 2026

    এসো না অসময়ে – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }