এথেন্সের শেকল বাঁধা ভূত – হেমেন্দ্রকুমার রায়
সে অনেক দিন আগের কথা। তখনও যীশুখৃষ্টের জন্ম হয়নি। আড়াই কি তিন হাজার বছর হবে। প্রাচীন গ্রীসে এথেন্স বলে একটা জায়গা ছিল। এথেন্স কিছু অপরিচিত নাম নয়, সবাই এর নাম শুনেছে। সেই এথেন্সেরই একটা পাহাড় ঘেরা ছোট্ট গ্রামে এক জঙ্গলের মধ্যে পুরনো একটা বাড়ি ছিল। বাড়িটা অবশ্য অনেক দিন ধরেই খালি পড়েছিল। একে তো নির্জন পাহাড়ি অঞ্চল। তার ওপর বন জঙ্গল দিয়ে ঘেরা পরিবেশ। তায় পরিত্যক্ত। লোকজনও না থাকলেও বাড়িটা কিন্তু খুব একটা ভাঙ্গা চোরা অবস্থায় ছিল না। অর্থাৎ ইচ্ছে করলে পরিষ্কার করে বা সামান্য সাজিয়ে গুছিয়ে নিলে লোকে অনায়াসেই সেখানে বসবাস করতে পারত। আসলে সবাই কি আর লোকজনে ঠাসা ভিড় হৈ-হট্টগোলের মধ্যে বাস করতে পছন্দ করে? অনেকেই নির্জন শান্ত পরিবেশে নিজের মত করে থাকতে ভালবাসে।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার ঐ বাড়ির যে মালিক সে কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও অনেকদিন পর্যন্ত কাউকে ঐ কুঠিটা ভাড়া দিতে পারেনি। আসলে পাহাড়ের ওপর নির্জন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত কুঠিটার বেশ বদনাম হয়ে গিয়েছিল। একবার এক শান্তিপ্রিয় ভদ্রলোক কুঠিটা দেখে লোভ সামলাতে পারেননি। তিনি ছুটির অবকাশ কাটাবার জন্য ঐ নির্জন কুঠিটাকে বেছে নিয়েছিলেন কয়েকদিন শান্তিতে কাটাবেন বলে। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল লোকটির মৃতদেহ পড়ে আছে কুঠির দালানে। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা নিয়ে তেমন কেউ মাথা ঘামায়নি। তবে যারা তাঁর মৃতদেহ দেখেছিল তাদের মধ্যে কিছু সন্দেহ দানা পাকিয়েছিল। কারণ মৃত্যুর পরেও লোকটির চোখে মুখে একটা অস্বাভাবিক ভয় লেগে ছিল। আর চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু, পরে, মানে বেশ কিছুদিন পর আর একজন সৈনিক ধরণের লোক সেই বাড়িতে এসেছিল রাত কাটাতে : লোকটি ছিল অসম্ভব সাহসী। সেই লোকটি প্রাণে মরেনি ঠিকই, কিন্তু তার মুখ থেকে রাত্রির অভিজ্ঞতা যা শোনা গিয়েছিল তা ছিল রীতিমত ভয়াবহ। খাওয়া দাওয়া সেরে রাত্রে সবে সে শুতে গিয়েছিল এমন সময় সে হঠাৎ দেখতে পেল ছাই- রঙের দাড়িওয়ালা ইয়া চেহারার বিশাল এক বুড়ো হাতে পায়ে শেকল লাগানো অবস্থায় ঘুমন্ত সৈনিকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তার মুখ থেকে কেমন এক ধরণের গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরুচ্ছিল। সৈনিক পুরুষটি মারা যায়নি। কিন্তু অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। পরদিন জ্ঞান ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে সেই কুঠি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল। সৈনিকটির মুখে সব কথা শোনার পর সারা গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। এমন কি দিনের বেলাতেও আর কোন সাহসী লোক ঐ বাড়ির দিকে পা বাড়াতো না। লোকমুখে কথাটা ছড়িয়ে পড়ায় পরই ভূতের বাড়ি বলে চুঠিটার অপবাদ হয়ে গেল। কেউ আর সাহস করে ঐ কুঠির ত্রিসীমানায় পা বাড়াতো না। কুঠির মালিক যে ছিল সে লোকটি কুঠিটা ভাড়া দিয়ে নিজের সংসার চালাতো। কিন্তু যে মুহূর্তে ঐ ধরণের একটা ভূতুড়ে প্রবাদ ছড়িয়ে পড়ল তারপর থেকে আর কেউই কুঠিটা ভাড়া নিয়ে কয়েকদিন থাকার কথা ভাবতেও পারত না। ফলে হল কি কুঠিটা সবার কাছে ‘ভূতকুঠি’ নামে পরিচিত হয়ে গেল। কেই বা সাধ করে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে যাবে? শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই জলের দরে কুঠিটা বিক্রি করে দিতে চাইল কুঠির মালিক। কিন্তু কিনবে কে? সখ করে ভূতের হাতে প্রাণ খোয়াতে কেউ রাজী নয়।
তবু একজন রাজী হল। কুঠির মালিক একজন খদ্দের পেলেন। লোকটি ছিলেন তখনকার দিনে একজন নামকরা দার্শনিক। দার্শনিক মানুষেরা সাধারণত নির্জন জায়াগায় থাকতেই ভালবাসেন। তিনি যুক্তি এবং তর্ক দিয়েই সব কিছু বিচার বা বিশ্লেষণ করতে ভালবাসেন। লোকমুখে কুঠিটার অপবাদের কথা তাঁরও কানে এসেছিল। কিন্তু দার্শনিক ভদ্রলোক মনে প্রাণে কোন অলৌকিক ব্যাপার বিশ্বাস করতে চাইতেন না। তিনি ভাবলেন বাড়িটায় গিয়ে তিনি উঠবেন। মানুষের মধ্যে ভূতের ভয়ের অযৌক্তিক সংস্কারকে উড়িয়ে দিতে চাইলেন। কুঠির মালিকের কাছে গিয়ে তিনি কুঠিটি কেনার বাসনা জানালেন। মালিক তো হাতে স্বর্গ পেলেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন এমন ভুতুড়ে বাড়ি কোনদিনও ভাড়া বা বিক্রি হবে না। তাই দার্শনিক ভদ্রলোকের প্রস্তাব শুনে মালিক আকাশ থেকে পড়লেন। বলে কি এই বুড়ো, ভাড়া নয় একেবারে কিনতে চাইছেন? অত্যন্ত কম দামে তিনি সঙ্গে সঙ্গে কুঠিটি বিক্রি করে হাঁফ ছাড়লেন।
আগেই বলেছি মুক্তি ছাড়া দার্শনিক চলেন না। যা চোখে দেখা যায় না, হাত দিয়ে যাকে ছোঁয়া যায় না অথবা অন্তর দিয়ে যাকে উপলব্ধি করা যায় না তেমন কিছুতে তাঁর বিশ্বাস আসবে কেন?
নিজের সব জিনিষপত্তর নিয়ে গিয়ে উঠলেন সদ্য কেনা সেই বাড়িটায়। সারা দিন ধরে নিজের হাতে সব কিছু সাজালেন। নিজের হাতেই তাঁকে সব কিছু করতে হয়েছিল, তার কারণ বাড়িটার ভুতুড়ে কান্ডকারখানা নিয়ে এমন সব গল্পগুজব তৈরী হয়েছিল যে তিনি অনেক বেশী পয়সার লোভ দেখিয়েও কোন চাকর বাকর পাননি।
যাইহোক, সারাদিন পরিশ্রমের পর দার্শনিক ভদ্রলোক বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। খুব একটা খাওয়া-দাওয়ার ইচ্ছেও ছিল না। সামান্য রুটি মাংস আর কফি দিয়ে রাতের আহার শেষ করলেন। তারপর গিয়ে শুলেন তাঁর ছোট্ট বিছানায়। মাথার কাছে বিশাল সেকেলে ধরণের একটা জানালা ছিল। সেটাও খুলে রাখলেন। গরমের দিন। সন্ধ্যে রাতের ফুরফুরে হাওয়া বইছিল। দেহেও ছিল অত্যন্ত ক্লান্তি। বাতি নিবিয়ে শোবার সঙ্গে সঙ্গে দু চোখের পাতায় নেমে এল রাজ্যের ঘুম।
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলেন কে জানে! হঠাৎ একটা অদ্ভুত আওয়াজ আর অস্বস্তির মধ্যে তাঁর ঘুমটা গেল ভেঙে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মানুষের হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে সামান্য সময় লাগে প্রকৃতিস্থ হতে। দার্শনিক ভদ্রলোকেরও সামান্য সময় লাগলো তিনি কোথায় আছেন, কেমনভাবে আছেন এটুকু বুঝতে। তারপর তাঁর সব কিছু একে একে মনে পড়ে গেল। তাঁর মনে পড়ল তিনি এসেছেন এক নতুন বাড়িতে। আর এই নতুন বাড়িতেই তাঁর প্রথম রাত্রিবাস। কান খাড়া করে অদ্ভুত আওয়াজ আর অস্বস্তিটা তিনি বোঝার চেষ্টা করতে চাইলেন। মিনিট দুই তিন মড়ার মত বিছানায় শুয়ে থেকে তিনি বুঝলেন আওয়াজটা অনেকটা শেকলের ঝনঝন আওয়াজের মত। কিন্তু খুব স্পষ্ট নয়। কে যেন অনেক দূর থেকে শেকল টেনে টেনে আসছে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন। জমাট অন্ধকার সারা ঘরে ছড়িয়ে আছে। মাথার কাছে জানালা দিয়ে কেবল আকাশটুকু দেখা যায়। অবশ্য সেই সময় আকাশটাকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না। আকাশের রঙ আর ঘরের রঙ এক হয়ে গিয়েছিল। দার্শনিক ভদ্রলোক কিন্তু চট করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন না। তিনি লক্ষ্য করতে চাইলেন ব্যাপারটা কি? আরও একটা জিনিষ তিনি অনুভব করলেন। সমস্ত ঘরের বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। একটা দম বন্ধ করা গুমোট পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
অনেকটা সময় যখন এইভাবে কেটে গেল, আর জমাট বাঁধা অন্ধকারটা যখন ধীরে ধীরে সয়ে এল, হঠাৎই তিনি আবিষ্কার করলেন হাতে পায়ে শেকল বাঁধা একটা অশরীরীর হাল্কা ছায়া মূৰ্তি আস্তে আস্তে ভেসে উঠছে। হাত নেড়ে সেই ছায়ামূর্তিটা কি যেন বলতে চাইছে। মূর্তিটার দুটো চোখ আর মুখের হাঁ থেকে জ্বলন্ত আগুনের আভা ঠিকরে বেরুচ্ছে।
দার্শনিক ভদ্রলোক ছিলেন প্রচন্ড সাহসী। ভৌতিক কিছুতে তাঁর তেমন বিশ্বাস বা সংস্কার কিছুই ছিল না। তবু, ভয় না পেলেও, একটা অদ্ভুত বিস্ময় তাঁকে কিছুক্ষণের জন্য আচ্ছন্ন করে রাখল।
তিনি বুঝতে চাইলেন, এটা কি? কোন ভয়ংকর দানব নাকি কোন অসৎ মানুষ ঐভাবে সাজগোজ করে তাঁকে ভয় দেখাতে চাইছে?
শুয়ে শুয়ে এইসব নানান যুক্তি তর্ক যখন তাঁর মনে ঝড় তুলেছে তখনই তিনি দেখলেন সেই হাতে পায়ে শেকল পরা ছায়া ছায়া মূর্তিটা ধীরে ধীরে তাঁরই দিকে এগিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত মূর্তিটা তাঁর একেবারে খাটের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো। দু চোখ আর মুখের গহ্বর থেকে তখনও সেই লাল আগুনের আভাটা ঠিকরে পড়ছিল। সে যেন মুখ হাঁ করে হাত পা নেড়ে কিছু একটা বলতে চাইছিল। আর তার হাত নাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেকলের ঝনঝন আওয়াজটাও ক্রমাগত শব্দ তুলে যাচ্ছিল। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে নিশ্চয় অজ্ঞান হয়ে যেত অথবা দুর্বল,হৃদয়ের কোন রোগী হলে নির্ঘাৎ তার মৃত্যু হত। কিন্তু অত্যন্ত সাহসী সেই দার্শনিক ভদ্রলোকটির কিছুই হলো না। বরং তিনি যেমন ছিলেন সেইভাবেই তাকিয়ে রইলেন ছায়ামূর্তিটার দিকে। আসলে তিনি দেখতে চাইছিলেন অশরীরী মূর্তিটি এরপর কি করে?
এক মুখ দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, আর এক মাথা রুক্ষ চুলে মূর্তিটিকে তখন বেশ বীভৎস এবং ভয়াবহ বলে মনে হচ্ছিল। তার ওপর তার হাতের নখগুলো ছিল বেশ বড় বড়। হাতের তীক্ষ্ণ আর বড় বড় নখ দেখে দার্শনিকের মনে একটা অন্য ধরনের ভয় এল। ভূত তিনি বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু জ্যান্ত দেহের কোন চোর ডাকাতকে তাঁর ভয় না করার কোন কারণ ছিল না। মৃত্যুর পর প্রেতাত্মা মানুষের কতটা ক্ষতি করতে পারে সে সম্বন্ধে তাঁর কোন ধারণাই ছিল না। অদেখা এমন কিছু পৃথিবীতে আছে বলেও তাঁর বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু জ্যান্ত চোর ডাকাত মানুষের অনেক ক্ষতি করতে পারে। তাছাড়া তাঁর কাছে আত্মরক্ষার মত তেমন কোন অস্ত্রই ছিল না। মনে মনে যখন তিনি ভাবছিলেন সত্যিই যদি লোকটি কোন চোর ডাকাত হয় তাহলে তাঁর করার কিছু থাকবে না। তার ওপর লোকটাকে দেখে মনে হয় তার গায়ে বেশ জোরও আছে। তাই তিনি যখন সম্ভাব্য বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কি করা যায় তাই ভাবছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলেন মূর্তিটি আর এক পাও না এগিয়ে এসে ক্রমাগত পিছু হঠতে শুরু করল। পিছতে পিছতে সে একসময় ঘর পরিত্যাগ করল।
অশরীরী মূর্তিটিকে পিছিয়ে যেতে দেখে দার্শনিক ভদ্রলোকটি ক্ষণিকের অবশ অবস্থা ত্যাগ করে তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। তারপর নিজেও ছুটে ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন।
অশরীরী মূর্তিটি ভূত বা অদ্ভুত যাই হোক না কেন দার্শনিক পরম বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন বারান্দা পার হয়ে মূর্তিটি ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল। তারপর লম্বা উঠোনের ঠিক মাঝ বরাবর গিয়ে হঠাৎই যেন কর্পূরের মত উধাও হয়ে গেল। দার্শনিক ঠিক তখনই একবার চিৎকার করে উঠলেন ‘কে কে’ বলে। কিন্তু উত্তরে কেবল অনেক দূর থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট গোঙানী ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেলেন না।
উঠোনের ঠিক যে জায়গায় মূর্তিটি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সেইখানে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ গুম হয়ে কি যেন ভাবলেন। আরো দু-একবার ডাকাডাকি করেও কারো উত্তর কিছু পেলেন না। বিফল মনোরথে তিনি ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লেন। বাকি রাতটা এই অদ্ভুত ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তা করতে করতে কাটিয়ে দিলেন।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গত রাত্রে ঠিক যে জায়গা থেকে মূর্তিটা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সেখানে এসে অনেক কিছু পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে থাকলেন। কিন্তু দিনের আলোয় কোন কিছুই তাঁর অস্বাভাবিক বলে মনে হল না।
পাহাড়ের টিলায় এই বাড়িটি ছিল লোকালয় থেকে বেশ কিছু দূরে। লোকজন কেউ তেমন থাকত না। হয়ত সেটা কুঠি বাড়িকে কেন্দ্র করে যে সব গল্প এবং গুজব আছে তারই ভয়ে কোন সাহসী পুরুষও এ বাড়ির ত্রিসীমানায় আসত না।
নির্বান্ধব এবং নির্জন বাড়িটায় দার্শনিক আবার তন্ময় হয়ে গেলেন তাঁর নিজের কাজে। নিজের চিন্তায়। নিজের পড়াশুনায়। প্রায় সারাদিনই তিনি বই-এর জগতে ডুবে রইলেন। ফলে রাতের সেই অশরীরী এবং অদ্ভুত ঘটনার কথা তিনি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে যখন তিনি বিছানায় শুতে গেলেন তখনই একবার গত রাতের কথা মনে এল। কিন্তু ঘটনাটিকে তিনি তেমন আমল দিলেন না। ভাবলেন অত্যধিক চিন্তাগ্রস্ত থাকার জন্য আধা ঘুম আধা জাগরণে কি দেখতে কি দেখেছিলেন। বিছানায় শোবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম না এলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন।
ভয়ডর না থাকার জন্যে সমস্ত কিছুকে অলীক বলে উড়িয়ে দিলেও পরের রাতে কিন্তু সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। তার পরের রাতেও সেই একই ব্যাপার। পর পর তিন রাত্রি একইভাবে অশরীরী মূর্তির আবির্ভাব এবং একইভাবে হাত নেড়ে কিছু বলতে চাওয়ার চেষ্টা এবং একইভাবে উঠোনের ঠিক একই জায়গায় এসে মিলিয়ে যাওয়া, তাঁকে বেশ ভাবিয়ে তুলল। তিনি কিছুতেই কোন ব্যাখ্যা দিয়েই বুঝতে পারছিলেন না এটা কেমন করে হয়? কিভাবে হয়? তবে কি এটা নতুন ধরণের যাদুবিদ্যা? অবশেষে চতুর্থ দিন সকালে দার্শনিক কিন্তু আর নিছকই কল্পনা বলে সব কিছু উড়িয়ে দিতে পারলেন না। আবার ভয় পেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েও গেলেন না। তিমি মনে মনে ভাবলেন নিশ্চয় এর মধ্যে কিছু অনুসন্ধানের আছে। নিছক মায়া বা যাদুবিদ্যা নয়। আর সত্যিই যদি অশরীরী কোন প্রেত হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয় সে কিছু বলতে চাইছে। আর সব থেকে দার্শনিককে বেশী আকৃষ্ট করল উঠোনের সেই নির্দিষ্ট স্থানটি। কেনই বা প্ৰতি রাতে অদ্ভুত এবং বীভৎস আকৃতির সেই মূর্তি ঐ বিশেষ একটি জায়গায় এসে হারিয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি ঐ জায়গাটিতেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু লুকিয়ে আছে? এর একটা বিশেষ তদস্ত হওয়ার প্রয়োজন।
চতুর্থ দিন সকালে আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দার্শনিক আর বাড়িতে বসে রইলেন না। চলে গেলেন শহরে। প্রথমেই তিনি যোগাযোগ করলেন স্থানীয় ম্যাজিষ্ট্রেটের সঙ্গে। সব কথা তাঁকে খুলে বললেন। অন্য কেউ হলে হয়ত পাগলের খেয়াল ভেবে ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু এই দার্শনিক ছিলেন বেশ নামী লোক। জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান হিসেবে তিনি প্রায় সকলেরই পরিচিত। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের মত একজন গণ্যমান্য লোকের সঙ্গে যে তিনি মস্করা করবেন না এটা ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব নিজেও জানতেন। কালবিলম্ব না করে তিনি বেশ কিছু মঞ্জুর নিয়ে ফিরে এলেন দার্শনিকের কেনা নতুন বাড়িতে। উঠোনের ঠিক যে জায়গায় এসে অশরীরী মূর্তিটি গত তিন রাত্রে অদৃশ্য হয়ে যেত সেই জায়গায় মাটি খোঁড়া শুরু হল। অবশ্য বেশী দূর খুঁড়তে হল না। সামান্য কয়েক হাত জমির নিচেই পাওয়া গেল একটি সম্পূর্ণ কঙ্কাল। কঙ্কালটির হাত পা শিকল দিয়ে বাঁধা। শিকলে মরচে ধরেছে বেশ পুরু হয়ে।
প্রেত বা ভূত কোনদিনও বিশ্বাস ছিল না দার্শনিক ভদ্রলোকটির। কিন্তু গত তিন রাত ধরে শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি মূর্তির সঙ্গে শৃঙ্খলাবদ্ধ কঙ্কালটির কোথায় যেন কি সাদৃশ্য রয়েছে। এটা অনুমান করতে তার কোন অসুবিধা হল না। সহজ এবং যুক্তিগ্রাহ্য বুদ্ধি দিয়ে দার্শনিক এর কোন অর্থই করতে পারলেন না।
ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের পরামর্শে নিয়মকানুন মেনে তাঁরা কঙ্কালটি যথাযথভাবে কবর দিলেন। আর সব থেকে অদ্ভূত ব্যাপার যা, তা হল কঙ্কালটি ভালভাবে কবরস্থ হবার পর আর কিন্তু কোনদিনও কোন রাতেই দার্শনিকের ঘরে সেই অশরীরী মূর্তির আবির্ভাব ঘটেনি।
এরপর দার্শনিক বহুদিন সেই বাড়িতে বাস করেছিলেন। বহুদিন ধরে তিনি কবরস্থ কঙ্কালটির সম্বন্ধে খোঁজ খবরও করেছিলেন। কিন্তু সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেনি ঐ বাড়িতে কাউকে কোনদিনও কবর দেওয়া হয়েছিল কি না। তবে ঐ গ্রামের এক অতি বৃদ্ধের মুখে শোনা যেত, অনেক অনেকদিন আগে এক বৃদ্ধ কৃতদাসকে সামান্য অপরাধের জন্য ঐভাবে হাতে পায়ে শেকল বেঁধে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনা সত্য কি মিথ্যা তা জানার উপায় নেই। তবে দার্শনিক এটুকু বুঝেছিলেন মৃত্যুর পর আত্মার আসা যাওয়া থাকে। আর সে আত্মা যদি অতৃপ্ত হয় তাহলে অশরীরী রূপ নিয়ে মানুষকে দেখা দিতে চায়। হয়ত বা তার অতৃপ্ত আত্মার তৃপ্তির পথ খোঁজে।
