ভূত আছে কি নেই – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
আজ তোমাদের এমনই এক ভূতের কাহিনী শোনাচ্ছি। এ কাহিনীর সঙ্গে আমি কিছুটা জড়িত। কাজেই এটা যে নির্ভেজাল সত্যি কাহিনী এ বিষয়ে তোমাদের কাছে আমি হলফ করে বলতে পারি।
আমার একজন খুব নিকট আত্মীয়, নাম আরতি বন্দ্যোপাধ্যায় এম.এ. বি.এল., কিন্তু ওকালতি করেন না। বেসরকারী অফিসের আইন বিভাগের উচ্চপদস্থ অফিসার।
থাকত পাইকপাড়ায়। এক বান্ধবীর সঙ্গে একটি ফ্ল্যাট নিয়ে।
বান্ধবীটি এক স্কুলের শিক্ষিকা।
জীবন দুজনের বেশ ভালই কাটছিল. ছুটির দিন সিনেমা, কিংবা আরো অনেক বান্ধবী মিলে বনভোজন, অথবা গড়ের মাঠে প্রদর্শনী দেখতে যাওয়া।
হঠাৎ আরতির বিয়ে ঠিক হলো। পাত্রও উচ্চশিক্ষিত। এক যন্ত্রপাতির কারখানার আধা মালিক।
আরতি আমার কাছে এসে দাঁড়াল।
আপনি তো অনেক কিছুর সন্ধান রাখেন। আমাকে একটা বাড়ি খুঁজে দিন।
তিন মাস ঘোরাঘুরির পর কালিঘাট অঞ্চলে এক বাড়ির সন্ধান মিলল।
পার্কের সামনে প্রায় নতুন বাড়ি। সদ্য রং করা হয়েছে। খান তিনেক কামরা। বারান্দা, বাথরুম, আবার এরই মধ্যে একফালি উঠানও আছে।
সেই অনুপাতে ভাড়াও খুব বেশী নয়। দুশো কুড়ি। বাড়ির মালিক পাশের বাড়িতেই থাকেন।
এ বাড়ি আরতির পছন্দ হয়ে গেল।
শুধু আরতির নয়, আরতির স্বামী আশিসেরও।
আর দেরি না করে সে দিনই ‘দু’ মাসের ভাড়া আগাম দেওয়া হলো।
মাসখানেক পর আরতির বাসায় বেড়াতে গিয়ে খুব ভাল লাগল।
নতুন আসবাবপত্র দিয়ে চমৎকার সাজিয়েছে। উঠানের পাশে সারি সারি টব।
দেশি ফুল বেল, জুঁই যেমন আছে, তেমনি বিদেশী ফুল ডালিয়া, পপি, হলিহকও রয়েছে।
এমন বাসা খুঁজে দেবার জন্য আরতি-আশিস দুজনেই আমাকে বারবার ধন্যবাদ দিল। এরপর অনেকদিন আরতির সঙ্গে দেখা হয়নি।
অফিসের কাজে দিল্লী যেতে হয়েছিল সেখানে মাস তিনেক কাটিয়ে কানপুর। সেখানেও এক মাসের ওপর লেগে গেল। কলকাতা ফিরলাম প্রায় পাঁচ মাস পর।
এক ছুটির দিনে বন্ধুবান্ধব নিয়ে গল্প করছি, আরতি এসে ঢুকল।
প্রথম নজরেই মনে হলো চেহারা একটু ম্লান। আরতি ভিতরে চলে গেল।
বন্ধুরা বিদায় হতে আমিও ভিতরে গেলাম।
দেখলাম, আরতি চুপচাপ সোফার ওপর বসে আছে। আমাকে দেখে বলল- আপনার সঙ্গে কথা আছে।
কি বল? শরীর খারাপ নাকি। চেহারাটা কেমন দেখাচ্ছে।
আরতি মুখ তুলে বলল – রাত্রে একেবারে ঘুম হচ্ছে না।
সে কি। ডাক্তার দেখাও, নইলে শক্ত অসুখে পড়ে যাবে।
ডাক্তার কিছু করতে পারবে না।
তার মানে?
মানে বাড়িটা ভাল নয়।
সেকি, স্যাঁতস্যাঁতে বা অন্ধকার এমন তো নয়। রোদ বাতাস প্রচুর।
সে সব কিছু নয় অন্য ভয় আছে।
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
আরতি কিছুক্ষণ কি ভাবল, তারপরে আস্তে আস্তে বলল– ও বাড়িতে আমরা দুজন ছাড়াও অন্য একজন আছে।
অন্য একজন আছে?
হ্যাঁ, তাকে মধ্যে মধ্যে গভীর রাতে দেখা যায়। অন্য লোক হলে কথাটা হেসে উড়িয়ে দিত। শুনতেই চাইত না।
কথাগুলো বলবার সময়ে দেখলাম আরতির মুখচোখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে বলল, দড়ি হাতে নিয়ে রাত্রে একটা লোক ঘুরে বেড়ায়।
আমি বললাম এরকম যখন ব্যাপার, তখন না হয় এবাড়ি ছেড়ে দাও। অন্য কোথাও বাড়ি খুঁজি।
আরতি উত্তর দিল তাতেও তো মুশকিল, আপনি বোধহয় লক্ষ্য করেননি বাড়ির দেয়াল ভেঙেচুরে আমি দুটো ঘর বাড়িয়েছি। বাইরেটা চুনকাম করেছি, ভিতরে রং দিয়েছি। গ্যাস বসাবার জন্য রান্নাঘরেও অনেক অদল বদল করেছি। অবশ্য এসব বাড়িওয়ালার মত নিয়েই করেছি। ভাড়া থেকে মাসে মাসে কিছু টাকা কেটে রাখছি। সে টাকা শোধ হতে বছর দুয়েক লাগবে। তার আগে বাড়ি ছেড়ে দিলে আমার অনেক টাকা লোকসান হয়ে যাবে।
একটু ভেবে বললাম–ঠিক আছে আমি একবার তোমার বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা করব। তিনি কি বলেন শুনি।
দিন দুয়েকের মধ্যেই বাড়িওয়ালার কাছে গিয়ে হাজির হলাম।
ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ, বিপুলকায়। কলকাতায় কিছু বাড়ি আছে কাঠের ব্যবসা। একটা ইজিচেয়ারে বসেছিল। আমাকে দেখে ওঠবার চেষ্টা করল পারল না।
কি খবর? আমার কাছে হঠাৎ?
আরতির কাছে শোনা সব কিছু বললাম। শেষকালে জিজ্ঞাসা করলাম, ঠিক কবে বলুন তো? ও বাড়িটার কোন দোষ আছে?
দোষ মানে?
মানে, কেউ ও বাড়িতে অপঘাতে মারা গিয়েছিলেন। আগের কোন ভাড়াটে?
বাড়িওয়ালা মাথা নাড়ল।
না মশায়, এর আগে মাত্র দুঘর অড়াটে ছিল। অপঘাতে তো দূরের কথা এমনিই মৃত্যু কারো হয়নি। তাছাড়া এই বিজ্ঞানের যুগে মানুষ যখন পায়চারি করার জন্য চাঁদে যাচ্ছে, তখন কি সব ভূত প্রেতের কাহিনী আমদানি করছেন।
তর্ক করলাম না। অনেক বিষয় আছে তর্ক করে বোঝান যায় না। স্কুল উদাহরণ দেওয়া যেখানে সম্ভব নয়।
চলে এলাম।
তারপর মাস দুয়েক আরতির কোন খবর নেই।
আমি নিশ্চিন্ত। যাক অপদেবতার উপদ্রব আর নেই, সব শান্ত।
কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণ করে একদিন সকালে আশিস এল।
কোটরগত চোখ, বিবর্ণ মুখ, ঘোলাটে দৃষ্টি। বললাম, কি হে শরীর খারাপ নাকি? আরতি কেমন আছে।
আমার কথার উত্তর না দিয়ে অস্পষ্ট গলায় বলল – একটু জল দিন।
জল শুধু খেল না, মুখে চোখেও দিল। তারপর বলল, আরতিকে টালিগঞ্জে তার দিদির বাড়ি দিয়ে এসেছি। কালিঘাটের বাড়িতে আর আমাদের থাকা চলবে না।
কেন, কি হল?
আরতির কাছে তো কিছু কিছু শুনেছেন। আমি কিন্তু এ পর্যন্ত কিছু দেখিনি। কোন শব্দও শুনিনি। সেইজন্য এতদিন আমি আরতিকে ঠাট্টা করতাম। তাছাড়া ভূত আত্মা ওসবে আমার কোনদিন কোন বিশ্বাস নেই।
কাল একটা কাজে হাওড়ায় আটকে পড়েছিলাম। বাস বন্ধ, ট্যাক্সিও পাই না। কিছুটা হেঁটে তারপর ট্রামে বাড়ি পৌঁছতে প্রায় বারটা হয়ে গিয়েছিল।
আরতি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিল।
যাক, আরতিকে খাবার সাজাতে বলে আমি হাত মুখ ধোওয়ার জন্য বাথরুমে ঢুকে পড়লাম।
নীচু হয়ে বেসিনে মুখ ধুয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই মাথায় ঠক করে কি একটা লাগল।
বাথরুমে আবার কে কি রাখল।
একটু কমজোর বাতি। কিন্তু সে বাতিতেও দেখতে কোন অসুবিধে হল না।
ঠান্ডা একটা বরফের স্রোত আমার মেরুদন্ড বেয়ে নেমে গেল।
বাথরুমটা অ্যাসবেসটসের ছাউনি দেওয়া। আগে টালির ছাদ ছিল। আমরাই খরচ করে অ্যাসবেসটস দিয়েছিলাম।
ওপরে দুটো কাঠের কড়ি। একটা কড়িতে দেহটা ঝুলছে।
গলায় দড়ির ফাঁস। মাথাটা একদিকে কাত হয়ে পড়েছে। দুটো চোখ আধবোজা, জিভটা অনেকখানি বের হয়ে গেছে। বোধহয় জিভের ওপর দাঁতের চাপ পড়েছিল। তাই জিভটা কেটে রক্তের ফোঁটা ঝরে পড়েছে। কিছুটা দেহের ওপর, কিছুটা মেঝেতে।
পরনে আধময়লা ধুতি, কাঁধে পৈতে।
মাথা উঁচু করবার সময় ঝুলন্ত দেহের পা আমার মাথায় ঠেকে গিয়েছিল। আমি সব কিছু ভুলে আরতি বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম।
আরতি আমার অপেক্ষায় খাবার টেবিলে বসেছিল।
আমার চিৎকারে ছুটে এসে বাথরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল।
প্রথমে সে বুঝতে পারেনি।
তারপর ওপর দিকে চোখ যেতেই ‘ও মাগো’ বলে মেঝের ওপর ছিটকে পড়ে অজ্ঞান।
আরতির মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে কোনরকমে জ্ঞান ফিরিয়ে আনলাম।
তারপর বাকি রাতটা দুজনে বাইরের ঘরে বসে কাটালাম। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে ট্রামে উঠে আরতিকে নিয়ে যখন তার দিদির বাড়ি এলাম, তখন জ্বরে আরতির গা পুড়ে যাচ্ছে। দুটো চোখ করমচার মত লাল।
আমি চুপ করে সব শুনলাম।
আশিসের কথা শেষ হতে জিজ্ঞাসা করলাম, আরতি এখন কেমন আছে?
খুব ভাল নয়। বিকারের ঘোরে মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠছে, ওই লোকটা, ওই লোকটাই তো ঘুরে বেড়াচ্ছিল দড়ি হাতে। আমি এখানে থাকব না। আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে চল।
অবশ্য আরতির জন্য খুব চিন্তা নেই। ভয়টা কেটে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সব কিছু নিজের চোখে দেখবার দারুণ ইচ্ছে হলো। এমন তো নয়, এক সময় দরজা খোলা পেয়ে বাইরের কোন লোক বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে আত্মহত্যা করছে?
সে হয়তো আত্মহত্যা করবার নির্জন একটা জায়গা খুঁজছি।
তাই আশিসকে বললাম চল একবার নিজের চোখে দেখে আসি। তাছাড়া তোমরা ব্যাপারটাকে ভৌতিক ভাবছ, তাতো নাও হতে পারে। পুলিশে খবর দেওয়াও তোমাদের একটা কর্তব্য। তারা এসে মৃতদেহের ভার নেবে।
আশিস আমার সঙ্গে চলল।
তালা খুলে ভিতরে ঢুকলাম।
বাথরুমের মধ্যে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। কোথাও কিছু নেই। সব পরিষ্কার।
আশিসকে জিজ্ঞাসা করলাম–কই হে? কোথায় তোমার ঝুলন্ত দেহ? রক্তের একটি ফোটাও তো কোথাও দেখছি না। আশিস রীতিমত অপ্রস্তুত।
সব চোখের ভুল বুঝলে?
আশিস মাথা নাড়ল।
কিন্তু দুজনেই ভুল দেখলাম?
ওরকম হয়। একজনের ভয় আর একজনের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে তাকেও এক ধরণের কাল্পনিক দৃশ্য দেখায়। তুমিও দেখ না কাল রাতে তুমি যদি সত্যিই ওরকম একটা দৃশ্য দেখে থাক, তাহলে আজ কোথাও কিছু নেই, তা কি হতে পারে? এইখানটাই তো দেখেছিলে?
মুখ তুলে ওপরের দিকে দেখেই আমি থেমে গেলাম?
কি আশ্চর্য, এটা তো আগে দেখিনি। কড়ির সঙ্গে একটা মোটা দড়ি বাধা! দড়িটা ফাঁসের আকারে ঝুলছে।
অস্বীকার করব না, আমার হাত পা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেল। বুকের দাপাদাপি এত জোরে যে ভয় হলো, স্পন্দন থেমে না যায়। ও দড়ির ফাঁস তো প্রথমবার দেখিনি। আরও অবাক কান্ড দড়ির ফাঁসটা ‘অল্প দুলছে’ অথচ কোথাও বাতাস নেই।
বাইরে বাতাস থাকলেও বাথরুমে বাতাস ঢোকবার কোন সুযোগই নেই।
আশিসের সঙ্গে বেরিয়ে এলাম।
এটা যে ভৌতিক ব্যাপার নয়, কোন মানুষের কারসাজি তা হওয়াও সম্ভব নয়। কোন যুক্তি তর্ক বিস্তার করেও সমাধান করতে পারলাম না।
আরতিরা আর ও বাড়িতে ফিরে যায় নি। ভবানীপুরে একটা বাড়ি ঠিক করে উঠে গিয়েছিল। আর্থিক লোকসান সত্ত্বেও।
এ ঘটনার প্রায় মাস তিনেক পর এক বিকেলে কালিঘাট পার্ক দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ আরতির বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। বেঞ্চে বসে আছে।
আমি তার পাশে বসে পড়ে জিজ্ঞাসা করলাম মশাই সত্যি কথা বলুন তো। বাড়িটার কি রহস্য? আমার আত্মীয়টি তো থাকতে পারল না, পালাল।
প্রথমে কিচ্ছুতেই বলবে না। অবশেষে আমার পীড়াপীড়িতে বলল।
এক বুড়ো ভদ্রলোক ওই বাড়িতে আত্মহত্যা করেছিল। তা প্রায় বছর দশেক আগে। পেটে শূল বেদনা ছিল। বাড়ির সবাই নিমন্ত্রণ খেতে বাইরে গিয়েছিল, তখন বাথরুমে বুড়ো গলায় দড়ি দেয়। তারপর থেকে যে ভাড়াটে আসে, তারাই ভয় পায়। বেশীদিন থাকতে পারে না।
আমি বললাম – গয়ায় পিন্ডদানের ব্যবস্থা করেননি কেন?
করার চেষ্টা করেছি মশাই, অনেক বার করেছি। প্রত্যেকবার এক একটা বিঘ্ন বুড়োর আত্মীয়রা গয়া গিয়েছিল পিন্ড দিতে, তিন দিন ধরে দারুণ ঝড়বৃষ্টি ধর্মশালা থেকে বের হতেই পারল না।
আমি নিজে একবার গিয়েছিলাম। ট্রেন থেকে স্টেশনে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে একমাস হাসপাতালে শয্যাগত
পুরোহিত দিয়ে শান্তি স্বস্ত্যয়নের আয়োজন করার চেষ্টা করেছিলাম। সেখানেও বিপত্তি।
পুরোহিত আসনে বসবার সঙ্গে সঙ্গে ছাদ ভেঙে একটা চাঙর তার মাথায় পড়ল। পুরোহিত জ্ঞান হারিয়ে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ল।
ব্যস, তারপর থেকে আর কোন পুরোহিত আসতে রাজী হলো না। কি করি বলুন তো?
সে উত্তর দিতে পারিনি। একটা কথা শুধু মনে হয়েছে। পৃথিবীর সব অবিশ্বাসী মানুষদের জড় করে চিৎকার করে বলি, যাঁরা মনে করেন, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই সব শেষ হয়ে যায়, প্রেতযোনি বলে কিছু নেই, তাঁরা কালীঘাট অঞ্চলের এই বাড়িটায় রাত কাটিয়ে যান। বাড়িটা এখনও খালি।
ঠিকানা আমার কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে যাবেন। অবশ্য আমি ভাল মন্দ কোন কিছুর জন্য দায়ী থাকব না। এই মর্মে আমাকে একটা লিখিত চুক্তিপত্র দিতে হবে।
