ভূতুড়ে রসিকতা – আনন্দ বাগচী
কতকাল আগের ঘটনা, তবু চোখ বুজলে সেদিনের কথা বলে মনে হয় আমার কাছে। কিছুতেই ভুলতে পারি না। এতকাল পরে এই কলকাতায় বসেও গায়ে কাঁটা দেয়। ঘটনাটা লিখতে বসে এই রাত্তিরে এখনো আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে সত্যি সত্যি।
গণপতিদের বাড়ির দোতলার হলঘরে বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। অবিশ্যি আড্ডা দিচ্ছিলাম বললে ভুল বলা হবে, আমরা আড্ডা দেবার ভান করছিলাম। আসলে ফটকের অপেক্ষা করছিলাম সেই বিকেল পাঁচটা থেকে। যদিও পাঁচটার সময়ে ও কদাচিৎই এখানে আসে, ওর আসতে আসতে সন্ধ্যা লেগে যায়। মাসীমা, মানে গণপতির মা যখন চা আর জলখাবার পাঠিয়ে দেন এঘরে, ঠিক তার কিছু আগে ও এসে হাজির হয় কান এঁটো করা একমুখ হাসি নিয়ে। তারপর সিঙারার চুবড়ির খুব কাছ ঘেঁসে বসে পড়ে রোজ একটি মাত্র বাক্যই মুখস্থ সংলাপের মত আওড়ে যাবে, ইস, আজ বড্ড দেরি করে ফেললাম তাই না?
আগে আগে জবাব দিতাম, এখন আর দিই না। এখন আমরা সবাই ওর ওপরে তিতিবিরক্ত, কেউ আর ওকে পছন্দ করি না। ওর মতিগতি বুঝে ফেলার পর অসহ্য লাগবারই কথা। আসলে ফটকে আমাদের বন্ধু-টন্ধু কেউ নয়, ফাঁক তালে আমাদের মধ্যে এসে ভিড়ে গেছে। গল্প করতে, আড্ডা দিতে আদৌ আসে না, আসে জম্পেশ খ্যাটনের লোভে। মাসীমার হাতের ওই বোম্বাই সাইজের গব্য ঘৃতে ভাজা সিঙারা আর প্রায় টেনিস বলের সাইজের কাঁচা গোল্লার কথা ভাবলে আমাদেরই জিবে জল আসে, তা ওর মত হ্যাংলা পেটুকের তো কথাই নেই। টপ স্পীডে মুখ চালিয়ে ও শেষ তক আমাদের ভাগেও ভাগ বসায়। তারপর চায়ের কাপের শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত শুষে খেয়ে মিনিট পাঁচেক ক্লাউন মার্কা হাসিমুখে কেমন ঘোরের মধ্যে বসে থাকে। শেষে যেন ধড়মড় করে জেগে উঠে বলে, ইস, আজ বড্ড দেরি করে ফেললাম তাই না? বলেই নিঃশব্দে ভ্যানিশ হয়ে যায়। ওর ওপরে আমরা চটেছি কি সাথে। কিন্তু গণপতি নিতান্ত ভদ্র ছেলে, ভালমানুষ। বাড়িতে কেউ বন্ধুর মত এলে তাকে অপমান করে তাড়ানো তো দূরের কথা, দুটো কড়া কথা বলাও ওর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই অনেক শলাপরামর্শ এঁটে আমরা আজ তৈরী হয়েছি ফটকেকে এমন শিক্ষা দিতে, যাতে নিজে থেকেই ও সটকে পড়ে, আর কখনও না এ বাড়িমুখো হয়।
কিন্তু এই গল্পের আগেও একটা গল্প আছে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে তখন হঠাৎই বেকার হয়ে পড়েছি। সামনে ধু ধু ছুটি, অখন্ড অবসর, অথচ কিছুই করার নেই। আচমকা স্বাধীনতা পেয়ে গেলে যে দশা হয় আর কি। এটা ভাঙছি, ওটা জুড়ছি। গল্পের বই পড়েও যেন সময় কাটতে চায় না। সকাল বিকেল টো টো কোম্পানির বিনে মাইনের চাকরি বেছে নিয়েছি শেষ ইস্তক। আহিরীটোলায় বি কে পাল এভিনিউতে তখন দুপুরবেলায় ছেলেরা সাইকেল শিখত। শহর তখন কি রকম ফাঁকা ছিল বুঝতেই পার। ঘন্টা পিছু নামমাত্র ভাড়ায় সাইকেল পাওয়া যেত। সাইকেল জানাই ছিল আমাদের। শুধু পুরনো অভ্যেস ঝালাই করতে উঠে পড়ে লেগে গেলাম আমরা।
দু’চাকার ভাড়া করা পক্ষীরাজ ছুটিয়ে আমরা শহরতলীর তেপান্তরের দিকে চলে গিয়েছিলাম সেদিন। শুধু আমাদের ঘোড়ার নয়, আমাদেরও তখন পাবা গজিয়েছে। একেক দিন একেক দিক আবিষ্কার করতে বেরিয়ে পড়ি। আজ শুনে হাসবে তোমরা, কিন্তু তখন কলকাতা শহরটাকেই অনক বড় মনে হত, শহরতলী মানেই যেন বিদেশ। আহিরীটোলা থেকে চিড়িয়ার মোড় কিংবা ঘুঘুডাঙা তখন অনেক দূর। বি টি রোড দিয়ে এত বাস-মিনি-ট্যাক্সি তো তখন চলত না, সেটা ছিল পায়ে হাঁটার যুগ। টালার নতুন পুল পেরিয়ে সবে পাকপাড়ার মুখে পৌঁছেছি অমনি কে যেন ডাকল আমাদের নাম ধরে। আমি লালু আর অবনী সাইকেল থামিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে দেখি গণপতি। গণপতি সামন্ত। ওরিয়েন্টাল ইস্কুলে ক্লাস নাইনে এসে ভর্তি হয়েছিল, সামান্য বন্ধুত্ব ছিল এক সেকশনেই পড়ি বলে, কিন্তু ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তবু পোশাকে-আসাকে আর হালচালে ঘুঝতাম ও আমাদের মতন না, বড়লোকের ছেলে।
হাতে একগোছা নেমন্তন্নের চিঠি নিয়ে ও এগিয়ে এল আমাদের দিকে তোমরা এদিকে?
বেড়াচ্ছি। কিন্তু তুমি? এদিকেই থাক বুঝি?
না। তবে এবার থেকে থাকব। বলেই সাইকেলের সীটের ওপর রেখে তিনটে খামের ওপরে আমাদের তিনজনের নাম লিখে দিয়ে বলল, রাস্তায় চিঠি দিলাম বলে মনে কিছু করো না। কাল আমাদের নতুন বাড়িতে গৃহ প্রবেশের নেমন্তন্ন। এসো কিন্তু।
মনে করব কি, নেমন্তন্নটা লুফে নিলাম। পরদিন গিয়ে দেখি, নতুন বাড়ি ঠিক না, একটা পুরনো বাগানবাড়িকেই ঘষে মেজে চমৎকার তিনতলা বানানো হয়েছে। আর এলাহি আয়োজন করেছেন গণপতির বাবা। দম ভর খেয়ে আমরা ফিরে আসছিলাম, কিন্তু গণপতি ওর বাড়ির সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। আমরা ওর স্কুলের বন্ধু শুনে সবাই খুব খুশি। ওর মা তো বলেই বসলেন, বাঃ ভালোই বল, রোজ বিকেলে তোমরা বেড়াতে বেড়াতে চলে আসবে। নতুন এ পাড়ায় এসে গণুও বড্ড একলা হয়ে গেছে।
সেই থেকে আমরা গণপতির বন্ধু, রোজ আসি গল্প করতে। চারপাশ খোলামেলা, ফাঁকা, চমৎকার। বেড়াতে আসার মত জায়গাই বটে। দোতলার হলঘরটায় বসে নিরিবিলিতে জমিয়ে আড্ডা দিই। নিমাই ফাইফরমাস খাটে, চা জলখাবার পৌঁছে দিয়ে যায়। প্রথম রাউডে আসে বড় এক গ্লাস করে ঘরে পাকানো গুলাবী লস্যি। আহিরীটোলার ঘিঞ্জি পাড়া আর মুড়ি তেলেভাজার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি আমরা। শুধু অস্বস্তি ওই ফটিকচন্দ্র। ও মাঝখানে এসেই যা রসভঙ্গ করে। আমাদের নিরঙ্কুশ আড্ডায় বেরসিকের মত থাবা বসায়। যেমন মোটা চেহারা, তেমনি মোটা বুদ্ধি ছেলেটার। আর তেমন কিম্ভূত রুচি। চুনোট করা ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবী পরে, গায়ে এক গাদা সেন্ট ঢেলে যেন ধেড়ে নিতবর সেজে হাজির হয়। এই বয়সে এই চেহারায় কেউ আড্ডা দিতে আসে ভাবাই যায় না। সিঁড়ির মুখে ওর জুতোর শব্দ পাবার আগেই সেন্টের গন্ধ পাই। এসেই সরু মেয়েলি গলায় ওর মুখস্থ বয়ান ছুঁড়ে দেয় আমাদের দিকে। লালু বাঁকা গলায় আমার কানে কানে বলে, বাবু কালচার।
শেষে থাকতে না পেরে একদিন বলেই ফেললাম গণপতিকে, তোমার বন্ধুটি ভাই কেমন যেন! কিছু মনে করো না।
ফটিক সেই মাত্র একরাশ সিঙারা আর কাঁচাগোল্লাকে গোল্লায় পাঠিয়ে উঠে গেছে।
গণপতি আমার কথায় চমকে উঠে বলল, কার কথা বলছ?
–ফটিকচন্দ্র। আমি গলায় ঝাঁঝ মিশিয়ে বলি, আড্ডাটাকে রোজ কেমন মাটি করে দেয়।
এবার দ্বিতীয় দফা চমকাবার পালা গণপতির। বলল, সে কি। ও তোমাদের সঙ্গে আসে, আমি ভাবি তোমাদের বন্ধু।
লালু বলল, না। আমরা কস্মিনকালেও আগে ওকে দেখিনি।
অবনী বলল, গৃহপ্রবেশের দিন প্রথম দেখেছি। আমার পাশে বসে ছত্রিশখানা লুচি আর পঁচিশটা রসগোল্লা খেয়েছিল রাক্ষসের নত। কিরে, ঠিক না? আমার দিকে সমর্থনের চোখে তাকাল অবনী।
আমি বললাম, হ্যাঁ ভাই। ওর খাদ্য তালিকাটা ওই রসগোল্লা আর লুচিতেই ঠেকে থাকেনি সেদিন। আমি তো ভেবেছিলাম ব্যাটা সেই রাত্তিরেই কলেরা হয়ে মরবে।
গণপতি বলল, যাঃ ওরকম বলিসনি। খেতে একটু ভালবাসে আর কি।
লালু চটে গেল। বলল, একটু। ওকে তুই একটু খাওয়া বলিস? খাওয়া ছাড়া ও জানেটা কী? এখানে কি ও আড্ডা দিতে আসে ভাবিস। রামছাগল ব্যাটা।
আমি চিন্তিত গলায় বললাম, যে ছাগলই হোক, আমি ভাবছি রহস্যটা কী! ও কে? কোত্থেকে আসে?
গণপতি মাথা চুলকে বলল, তাহলে বোধহয় পাড়ারই কেউ। বাবা নেমন্তন্ন পত্র ছড়িয়েছিল এস্তার। এই পাড়ারই কোন বাড়ির ছেলে। তবে প্রথম কদিন কিন্তু তোদের পেছন পেছনই এসেছে। তাই আমি ভেবেছিলাম–
অবনী বলল, রবাহূত বলে একটা কথা আছে, এবার বাংলার কোশ্চেনে বাক্য রচনা করতে দিয়েছিল। কিন্তু ওতো দেখছি রবাহূতও নয়।
লালু রাগী গলায় বলল, তাহলে এবার এর একটা বিহিত করা দরকার। একটা মোক্ষম দাওয়াই বাতলা দিকি, অবনী। তোর মাথায় তো নানারকম ফন্দি-ফিকির ভাল খোলে।
অবনী গণপতির দিকে তাকিয়ে বলল, কী, রাজী?
গণপতি একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারব না। কোন কৌশলে যদি ওকে ভাগাতে পার আমার আপত্তি নেই।
আমি বললাম, মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। ছেলেটাকে দেখে মনে হয় ভীতু টাইপের, ওকে ভূতের ভয় দেখাতে হবে। তাহলে অন্তত সন্ধ্যেবেলা তোদের এই নির্জন বাড়ির ধারে কাছে আসতে সাহস পাবে না।
অবনীর মুখ চোখ সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
লালু মৃদু আপত্তি জানাল, ভূতের ভয় ওর নাও থাকতে পারে।
না থাকলেও পাইয়ে দিতে পারব। — অবনী রহস্যময় হাসি হাসল, কিরে গণু, তোদের নিমাইকে দলে পাওয়া যাবে না বল?
স্বচ্ছন্দে।–গণপতি ঘাড় হেলাল। শূন্যে একটা তুড়ি ফাটিয়ে অবনী বলল, তাহলে শোন।
আমরা ঘন হয়ে বসলাম। অবনী তার প্ল্যান রসিয়ে রসিয়ে বলল। এই ঘরে আগে নাকি একজন বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করেছিল। খবরটা বাড়ি কেনার আগে গণপতির বাবা জানতে পারেননি। কিন্তু পরশু রাত্তির থেকে হঠাৎ ভুতুড়ে উৎপাত শুরু হয়েছে। সন্ধ্যে থেকেই একটার পর একটা ঘরের বাল্ব ফিউজ হয়ে যেতে থাকে। আবার দিনের বেলা সেগুলি দিব্যি জ্বলে ওঠে। স্কাইলাইটগুলো খোলে আর বন্ধ হয়। দরজাগুলো আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে থেকে শাটার টেনে রেখে যায়। ঘরের ভেতর যখন তখন গুলির শব্দ শোনা যায় আর বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এমনি ধরণের নানা উৎপাত। শুকনো মুখে, বেশ ভয় পাওয়া গলায় এই গল্পটা ফটকে আসার পর গণপতি বলবে। যেন সকলকেই বলছে, এই প্রথম। তার আগে কাল সকালেই একটা ফিউজ বাল্ব যোগাড় করে লাগিয়ে রাখতে হবে এই ঘরে। কালীপটকা ভরে দুটো মোটা মোমবাতি রেডি করে আনার ভার অবনী নিজেই নিল। ইলেকট্রিক আলোর বদলে ওই মোম দুটো জ্বলবে এই ঘরে। পটকা এমনভাবে সেট করতে হবে যাতে মিনিট দশেকের মধ্যে ওর পলতেয় আগুন ধরে যায়। সেই সঙ্গে আর একটা কাজ সেরে রাখতে হবে। এ ঘরের স্কাইলাইটগুলোয় কালো সুতো বেঁধে সেই সুতোর প্রাস্তগুলো ওপরের তলার জানলার শিকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখতে হবে এমনভাবে যাতে নিমাই তিনতলার ঘর থেকেই এ ঘরের স্কাইলাইট খুলতে আর বন্ধ করতে পারে।
জলখাবার দিয়ে যাবার পর নিমাইয়ের কাজ হবে এ ঘরের ভেজান দরজা দুটোয় নিঃশব্দে ছিটকিনি টেনে দিয়ে যাবে। তারপর মিনিট কয়েক পরে স্কাইলাইটের খেলা শুরু করবে। এদিকে ভূতের গপ্পো জমে উঠেছে। ওই ওই! বলে আমরা খুব ভয় পেয়ে যাব। তারপরে যেই দড়াম করে মোমবাতি নিবে যাবে আমরা আঁতকে উঠে জড়ামরি করে ছুটে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করব। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ, সুতরাং খুলবে না। লালু অন্ধকারের মধ্যে কুকুর কান্নার ডাক ডেকে আমাদের পিলে চমকে দেবে। বহুদিনের প্র্যাকটিস, ওই ডাকটা ও মোক্ষম ডাকতে পারে। তারপর দেখা যাবে মজাটা।
পরের দিন যথারীতি আমরা আগে ভাগেই গণপতিদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম।
সব ব্যবস্থা পাকা। আমরা চারজন অপেক্ষা করে আছি কিন্তু ফটকে আসছে না। ধীরে ধীরে বিকেল মরে সন্ধ্যে হল। বাইরে অন্ধকারও ধীরে ধীরে ঘন হল। মাসীমার পাঠানো সিঙারার গামলা আর কাঁচাগোল্লার থালা নিয়ে নিমাই এসে গেল। অবনী অগত্যা মোমদুটো জ্বেলে দিল। তারপর নিমাইকে ইশারায় কাছে ডেকে কানে কানে বলল, তুই চলে যাস না, ধারে কাছেই থাকিস। ওই দাদাবাবু এনে আস্তে করে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে চলে যাবি। বাকি সব মনে আছে তো?
নিমাই দাঁত বের করে হাসল।
এক মিনিট দু মিনিট করে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। উত্তেজনায় আমাদের হাতের আঙুল ঠান্ডা হয়ে এসেছে। গরম সিঙারাও জুড়েয়ে আসছে ক্রমশ, কিন্তু আমাদের সেদিকে কোন খেয়ালই নেই। গোটা প্ল্যানটা না আপসেট করে দেয় ফটকে। হতভাগা কি জানতে পেরে গেছে আমাদের মতলব। কিন্তু তাই বা কি করে হবে। দিম বুঝেই কি ব্যাটা আজ কামাই করে বসল। এরকম টেনশন নিয়ে কি বসে থাকা যায়? মোম দুটো তো আর বসে নেই, নিয়ম মাফিক গলে ছোট হয়ে আসছে। যেন বোমার পলতেয় আগুন ধরিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি।
লালু আর থাকতে না পেরে ককিয়ে উঠল। মোমবাতি মা ফেটে যায় দুম করে।
চুপ কর। অবনী ধমকে উঠল, যখন তখন ফাটলেই হল। আমি ঘড়ি দেখছি না? এখনো পাক্কা ছ মিমিট বাকি।
সস্স্। ঠোটে আঙুল ছুঁইয়ে গণপতি ইশারা করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়ার মত সেন্টের তীব্র গন্ধ আমার নাকে এসে পৌঁছাল। পরের মুহূর্তেই জুতোর শব্দ। ফটকে মুখ বাড়াল ঘরের মধ্যে। এক মুহূর্ত থমকে ঘরের মধ্যে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, ইস। আজ বড্ডই দেরি করে ফেললাম, তাই না?
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, হ্যাঁ। সিঙারাগুলো বোধহয় এতক্ষণে ঠান্ডা হয়েই গেল।
অ্যাঁ! বলেই ফটকে গামলা থেকে মিখারা ভুলে নিল, এক ভাষায় দুটো। তারপরেই সিঙারায় জলহস্তীর মত কামড় বসাতে দমাতে বলল, একী মাইরি, তোমরা ভূতের মত মোম জ্বালিয়ে বসে আছ কেন?
লালু তাড়াতাড়ি বলল, বাল্ব ফিউজ হয়ে গেছে।
অবনী বলল, তাইতো গণপতি, আর একটা বালব কিনিয়ে আন না নিমাইকে দিয়ে।
কানে পৌঁছাবার মত নয় তবু আমরা টের পেলাম দরজায় ছিটকিনি আঁটা হয়ে গেল। শব্দটা ভুল শুনিনি তার প্রমাণ লালু আমাকে চিমটি কাটল।
গণপতি যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতে একটা সিঙারা তুলে নিয়েছিল, বলল, লাভ নেই। সেই তো আবার ফিউজ হয়ে যাবে।
ফিউজ হয়ে যাবে। তার মানে? প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে অরনী গণপতিকে চোখ টিপল। কিন্তু ফটকের তখন প্রায় বেহুঁশ অবস্থা। তার হাত একবার গামলা, একবার থালা ছুঁয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে আজ দেরিতে আসার জন্যে বুঝি মরিয়া হয়ে উঠেছে। গণপতি অবনীর ধরতাই পেয়ে সবিস্তারে গল্পটা শুরু করল। বেশ জোরে জোরেই, যাতে ফটকের কর্ণগোচর হয় প্রতিটা শব্দ।
উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে মনে হল, কারণ ফটকে খাওয়া থামিয়ে বার দুই গণপতির মুখের দিকে তাকাল। এমন সময় বেশ শব্দ করে স্কাইলাইট দুটো নাচানাচি শুরু করে দিল।
ওই ওই! আমি আঁতকে ওঠার মত করে চেঁচিয়ে উঠলাম।
লালু এক হাত লাফিয়ে উঠে ‘উরি বাবা’ বলে আমাকে জাপটে ধরল। অবনী পাংশু মুখে বলল, এ কী রে গণা। এ যে ভুতুড়ে কান্ডই শুরু হয়ে গেল!
এই তো সবে শুরু। গণপতি বলল, একটু বস, সবই নিজের চোখে দেখতে পাবে। কিভাবে যে আমরা দিন কাটাচ্ছি … রাতে ঘুমোতে পারি না, ভাইরে!
ইস বড্ড দেরি হয়ে গেল আজ! শেষ কাঁচাগোল্লাটা মুখে পুরে দিয়ে ফটকে আচমকা উঠে দাঁড়াল, আচ্ছা
তার মুখ দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু সত্যিই ভয় পেয়েছে। টের পেয়ে আনন্দই হচ্ছিল আমার।
ভয় পাওয়া গলা করে আমি দাঁত মুখ খিঁচিয়ে উঠলাম, বস! যাবে কী। যেতে গিয়ে শেষে কি প্রাণটা খোয়াবে? দেখছ না কী শুরু হয়ে গেছে।
ফটকের মুখ দিয়ে কেমন গোঁ গোঁ শব্দ বেরলো। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, আমাদের বহুক্ষণের উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে বন্ধ ঘরের মধ্যে পরপর দুটো বোমা ফাটার আওয়াজ হল। মোমবাতি দুটো ছিটকে গিয়ে ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। সেই সঙ্গে আর্ত চিৎকার। হুড়োহুড়ি। অবনীর গলা পেলাম দরজার কাছ থেকে। দরজায় দুমদুম আওয়াজ করছে ভয়ার্ত গলায় চেঁচাচ্ছে, খোল খোল দরজা খোল। এ কী। কে আটকে দিল বাইরে থেকে?
একটা কুকুরের কান্না ঘরের অন্ধকারকে যেন ফালা ফালা করে দিল এই সময়ে। সেই সঙ্গে গণপতির আর্তনাদ, ছাড় ছাড়। একটা ঝটাপটির শব্দ। পেতলের গামলা আর থালাটা ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর ঝনঝন করে। হঠাৎ মনে হল বরফের মত ঠান্ডা দুখানা হাত সাঁড়াশির মত আমার গলা চেপে ধরছে। প্রাণপণে চেঁচাতে গেলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে গোঙানীর মত সামান্য একটু আওয়াজ বেরল মাত্র। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মুহূর্তে বুঝতে পারলাম আমাদের তৈরী ছকের বাইরে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটছে। আর রক্ষা নেই।
সেকেন্ড কয়েকের জন্য বোধহয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। চোখ মেলে দেখি মেঝের ওপরে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছি। সিলিং-এর আলোটা দিব্যি জ্বলছে। ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম অবনী আর লালু ঘরের এককোণে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। বিধ্বস্ত চেহারায় গণপতি পড়ে আছে তক্তপোশের ওপর চোখ উল্টে। ধড়মড় করে উঠে গণপতির কাছে গেলাম। না, বেঁচেই আছে, তবে অজ্ঞান।
অতি কষ্টে বলল, জল শিগগীর জল আন।
অবনী আর লালু দুজনেই উঠে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু ঘরের মধ্যে কোথাও জলের কুঁজো নেই। জলের গেলাসগুলো উলটে জল গড়াচ্ছিল মেঝেময়। দুই হাতে সেই জল থাবড়ে আমি গণপতির চোখেমুখে জলের ছিটে দিলাম। লালু ছুটে গেল দরজা খুলে নিমাইকে ডাকতে। কিন্তু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ
অবনী আঁতকে উঠে বলল, আরে একী কান্ড! ফটকে, ফটকে গেল কোথায়?
সত্যি আমাদের কারো মনেই ছিল না ফটিকের কথা। তক্তপোশের নিচে টিচে সব জায়গা দেখা হল, ফটকে ভ্যানিশ। একেবারে কর্পূরের মত উবে গেছে যেন।
এরপরে আর কোনদিন ফটকে ও বাড়িতে আসেনি। আমরাও যাইনি। পরে শুনেছিলাম ঘটনাটা। ফটিকচন্দ্র কুন্ডু বলে একটা ছেলে সত্যিই ছিল গণপতিদের পাড়ায়। কিন্তু সে ছিলই, এখন নেই। কমাস আগে নাকি দীঘার দিকে কোথায় বরযাত্রী হয়ে যাচ্ছিল বাসে করে। অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়। তারপর তাকে ওপাড়ার নেমন্তন্ন বাড়িতে কেউ কেউ দেখেছে। ওই বরযাত্রীর পোশাকেই। গিলে করা পাঞ্জাবী, চুনোট করা ধুতি, গায়ে সেন্টের গন্ধ। …
