একান্ত সাক্ষাৎকারে বাউল মাহতাব উদ্দিন
* আপনার প্রাথমিক পরিচয় কী?
উত্তর : আমি একজন বাউল মাহতাব উদ্দিন। আমার বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা, তারন্দিয়া ইউনিয়নের মামদিপুর গ্রামে। আমার পিতার নাম : মনির উদ্দিন, মাতার নাম : নুলুক জান বিবী।
* আপনার জন্ম তারিখ মনে আছে কী?
উত্তর : আমার জন্ম ১৩৪০ সালে ১৪ ই বৈশাখ।
* কত বছর থেকে গান গাওয়া শুরু করলেন?
উত্তর : ছোটবেলা থেকেই। সেই অল্প বয়সেই একতারাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছি।
* আপনার ওস্তাদের নাম কী?
উত্তর : কেরামত আলী নামের একজন বাউলের সাথে আমি গান শিক্ষা করি।
* কখনো কী বিদেশে গান গেয়েছেন?
উত্তর : হ্যাঁ, ভারতের আসাম প্রদেশে প্রায় দুই শতাদিক বাউলের সাথে পাল্টাপাল্টি গান গেয়েছি।
* দর্শক শ্রোতার জমজমাট আসরে না বেতার টিভিতে গান গাইতে ভালোবাসেন?
উত্তর : যেহেতু আসরে গান গাইলে শ্রোতাদের খুব কাছে থাকা যায় সেই জন্য আমি সব সময় জমজমাট আসরে গান গাইতে খুব ভালোবাসি।
* আপনি এখন পর্যন্ত কটি গান লিখেছেন?
উত্তর : প্রায় একশত হবে।
* আপনি কী এখনো গান লিখেন?
উত্তর : হ্যাঁ, মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত লিখে যাব।
* আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন?
উত্তর : আমার তিন ছেলে, চার মেয়ে।
* আপনার স্ত্রী সর্ম্পকে কিছু বলুন।
উত্তর : আমার স্ত্রীর নাম নুরজাহান বিবী, আমি তাকে ডাকতাম নুর নামে। আমার প্রায় ১০/১২টি গান আমার স্ত্রীকে নিয়েই লেখা। আজকের এই বাউল মাহতাব উদ্দিন কখনো হয়ে উঠতে পারত না যদি কপালের ফেরে নুরজাহান বিবির মত বউ না পেতাম। দীর্ঘ বাউল জীবনে দিনের পর দিন রাতের পর রাত বাড়ি ঘড় ছেড়ে ঘুরে বেরিয়েছি, কিন্তু আমার নুরজাহান বিবী তার নুন্যতম কষ্ট আমাকে বুঝতে দেয়নি।
* আপনার শিষ্যদের মধ্যে ক’জন আপনাকে এখন দেখতে আসেই?
উত্তর : বাউল রাব্বানি সরকার একজন জাতীয় পর্যায়ের শিল্পী সে এখন আমার দেখাশুনা করেন। তাছাড়া অনেকেই আমাকে মাঝে মধ্যে দেখতে আসে।
* আপনি আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছেন? আপনি নাকি মোটেই খাওয়া দাওয়া করেন না?
উত্তর : এখন তো আমার অনেক বয়স হয়েছে, আমার সঙ্গে অনেক মানুষই কবর দেশে চলে গেছে, একসঙ্গে বড় হয়েছি খুঁজেও আপনি পাবেন না। আর খাওয়ার প্রতি রুচি আমার আগে থেকেই ছিল না। তাছাড়া সঙ্গিত সাধনা করতে হলে সব লোভই সংযম করা প্রয়োজন। অতি খাদ্য গ্রহণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। হাত ইশারায় প্রথমবার যা আসে তাই খাই দ্বিতীয়বার আর নেই না।
* আপনার স্বপ্ন কী?
উত্তর : আমার একটাই স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা বা উপজেলায় একটি করে হলেও বাউল গানের স্কুল থাকবে। যাতে এখানকার ছেলে মেয়েরা বাউল গান শিক্ষা লাভ করতে পারে।
* ঐ সময়ে আপনি কী ধরনের গান করতেন?
উত্তর : আগে প্রায় প্রতিদিন পালাগানের আসর বসতো। দিনে গান রচনা করতাম আর রাতে আসরে সেই গান গাইতাম। বেশিরভাগ সময় একজন প্রতিদ্বন্দী বাউল থাকতো। প্রশ্ন উত্তরে রাত কেটে যেত। একে আমাদের ভাষায় মালজোড়া বলে। * আপনার ছেলে বা মেয়েরা কী গান শিখেছেন?
উত্তর : না।
* কেন?
উত্তর : গান অনেক কষ্টের সাধনা তাই তাদেরকে আমি গানে আসতে দেইনি।
* ঢাকার অনেক বড় বড় অনেক শিল্পী তো আপনার গান গেয়ে নাম, ডাক, টাকা পয়সা অর্জন করছে তাদের কেউ কী আপনার খোঁজ খবর নেয়?
উত্তর : অনেকেই আমার খোঁজ খবর নেয়। ওরা তো এখন আমার ছেলের মতো। ওরা যে আমার গান গায় আমি তাতেই খুশি।
* এ প্রজন্মের যে সব বাউল শিল্পীরা আপনার গান গেয়েছে তাদের জন্য কিছু বলুন।
উত্তর : আমি সবার জন্য দোয়া করি। সবাই ভালো থাকুক। আমার শুধু একটাই দাবি আমার গানের কথা ও সুর যেন আমার মতোই থাকে।
* আপনার গানগুলো সব সংগ্রহে আছে কী?
উত্তর : সবগুলো নাই। তবে আমার সংগ্রহের সবগুলি আমি আপনার হাতে তুলে দিলাম। আপনি বই আকারে প্রকাশ করেন। আমি সেই অনুমতি আপনাকে দিলাম।
* আপনি কী আমাকে চিনেন?
উত্তর : আপনি বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের একজন তরুণ প্রজন্মের কবি ও কথা সাহিত্যিক এস.এম মাসুদ রানা। আমি আপনার বেশ কয়েকটি বইও পড়েছি। আর আপনি আমার জীবনী প্রকাশ করতে চাচ্ছেন। আমি আপনার জন্য দোয়া করি। আপনি অনেক বড় মাপের সাহিত্যিক হউন।
