লোকসাহিত্য : সংকট ও সম্ভাবনা
‘সামাজিক পরিবর্তনের স্রোতে ছোটোবড়ো অনেক জিনিস অলক্ষিতভাবে ভাসিয়া যাইতেছে।’-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করেছিলেন তাঁর ‘ছেলেভুলানো ছড়া : ১’ প্রবন্ধে। ১৩১৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত লোকসাহিত্য শীর্ষক বইয়ে প্রবন্ধটি সংকলিত হয়েছিল। ১১১ বছর পর, এই ১৪২৫ বঙ্গাব্দে এসে লোকছড়াই বলি আর লোকসাহিত্যই বলি, সেটা ‘ভাসিয়া’-‘ভাসিয়া’ এখন ঠিক কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিশ্চয়ই সবার কাছে অনুমেয়। ১১১ বছর আগে ‘সামাজিক পরিবর্তনের স্রোত’ এখনকার সমাজব্যবস্থার মতো এতটা প্রবল ছিল না। রবীন্দ্রনাথ যখন এসব কথা বলেছিলেন, তখনও ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়নি, তখনও বাংলার গ্রামীণ শত-সহস্র ভাবুক-দার্শনিক-শিল্পী নানা ধারার গান-নাট্য-সংস্কৃতি-আচার-সাহিত্যকে জিইয়ে রেখেছিলেন। সে-সময় মুঠোফোন তো নয়ই, বেতার-টিভিরও তেমন প্রাবল্য ছিল না, তখনও গ্রামে-গ্রামে নানা ‘রঙ্গে-ঢঙ্গে’ লোকাচার-সংস্কৃতি পালিত হতো, ঔৎসুক ভাবপ্রবর শ্রোতামন্ডলী ছিল। এসত্ত্বে ও রবীন্দ্রনাথ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আর, এখন?-এই তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার শিখরে এসে যখন গ্রাম আর শহরের মধ্যে পার্থক্য অনেকটাই ঘুচে গেছে, এ অবস্থায় ‘অলিক্ষিতভাবে’ নয়, বরং অবহেলা-অযত্নেই লোকসাহিত্যের ধারা সংকুচিত হয়ে প্রায় তলানিতে ঠেকেছে!
কিন্তু দিনে-দিনে লোকসাহিত্য যে তলানিতে ঠেকছে-তা নিয়ে কাউকে খুব একটা চিন্তিত বলে মনে হয় না। লোকসাহিত্যপ্রেমী মুষ্ঠিমেয় অনুরাগীজন ছাড়া বিষয়টির গুরুত্বও সবাই তেমন অনুধাবন করতে পারছেন না। অথচ শৈশব-কৈশোর-যৌবনে যাত্রা-পালা-বাউল-কীর্তন-ভাটিয়ালি-জারি-সারি-মুর্শিদিগানের আসরে কে-ই বা না সময় কাটিয়েছেন? লোকগান-লোকনাট্য-লোকসাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ধারা গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় প্রচলিত ছিল, সেটা হুট করেই যেন ক্রমশ পানসে হয়ে যাচ্ছে। তবে এতসব সত্ত্বে ও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এখনও গ্রামে-গ্রামে লোকসাহিত্যের নানা উপকরণ স্বমহিমায় বহমান রয়েছে। যখন শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার খাটিয়াভাঙ্গা গ্রামের পঁয়ষট্টি বছর বয়সি মো. জহুর হককে ‘মেহের নিগার’ কিংবা ‘আলোমতি গান’ নামের লোকনাট্য লিখতে শুনি কিংবা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা মেহেরপুরের হিতিমপাড়া নিবাসী কবিয়াল রমজান আলী (৮০) ও তাঁরই ভাই কমরুদ্দীনকে (৬৫) রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলাকেন্দ্রিক কবিগানের লড়াইয়ে মেতে উঠতে দেখি-তখন আশাবাদী হতেই হয়। কবিয়ালদ্বয় আর তাঁদের ছয় দোহার মুসলিম ধর্মানুসারী হওয়া সত্ত্বে ও যখন সমস্বরে উচ্চারণ করেন-‘নমস্তে সুরদায়িনী, সুরেন্দ্র বন্দিনী বাণী…’, তখন সেটা ধর্মের প্রথাগত গন্ডি ছাপিয়ে গ্রামীণ বাংলার চিরায়ত সমন্বয়বাদী ঐতিহ্য বিকাশের ধারাকেই সমর্থন করে।
ময়মনসিংহে যেমন ভাট কবিতাচর্চার ধারা এখনও প্রাণবন্ত, তেমনই কথা বলা চলে রংপুর, নীলফামারি, নোয়াখালি জেলার ক্ষেত্রেও। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার দিগনগর গ্রামের মু. মঈনউদ্দীন সাতষট্টি বছর বয়সেও মরমিধারার গান লিখে চলেছেন, একইভাবে শরিয়তপুরের দলিলউদ্দিন বয়াতি বিচারগান গেয়ে মাতাচ্ছেন আসরের পর আসর। যশোরের দীপালি মন্ডল, অপূর্ব মন্ডলরা যেভাবে মতুয়া ধর্মকে লালন করে চলেছেন, ঠিক তেমনইভাবে সুনামগঞ্জের অনিতা দাস, সুকমল রায়রা চৈতন্যবাদী মানুষ ভজনার ধারাকে উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করে চলেছেন। বাংলাদেশের চৌষট্টি জেলাজুড়েই এ-রকম লোকসাহিত্যের নানা ধারা এখনও দুর্নিরীক্ষ্য নয়। এসব ধারা চিরতরে বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়ার আগেই যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার হাত প্রসারিত করা উচিত।
দুই
‘দুইটি বৎসরের একই ঋতুর আবহাওয়া একই মাপের হয় না কেন?’-জুতসই একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন আরজ আলী মাতুব্বর। এই ঋতু।আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে চাষবাসে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। চাষাবাদে সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার সুবাদে আরজ আলী ধীরে ধীরে টের পেয়েছিলেন-প্রকৃতির নিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। তাই তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ মন চাষিকুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিল! একই অবস্থা বলা চলে গ্রামীণ লোকসাহিত্যের ক্ষেত্রেও। এক্ষেত্রে ‘প্রকৃতি’ হিসাবে ধরতে হবে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা লোকসাহিত্য পরিবেশনার জন্য কেমন উপযোগী।বান্ধব?, সে-টুকু। আবহাওয়া অনুকূলে না-থাকলে যেমন কৃষকের পক্ষে ফসল উৎপাদন করা একেবারেই অসম্ভব, তেমনই সামাজিক পরিবেশ প্রতিকূলে থাকলে কোনওভাবেই লোকসাহিত্যের চর্চা সম্ভব নয়।
একজন চাষি যেমন প্রাণান্ত পরিশ্রম করে মাঠে ফসল ফলান, ঠিক তেমনই একজন শিল্পী সুরের সাধনা করে গান (লোকসাহিত্যের নানা ক্ষেত্রগুলোও) চাষ করেন। বছরান্তে কৃষক তবেই ভালো ফসল উৎপাদন করতে পারেন, যদি সে-বছরের আবহাওয়া ভালো থাকে। কিন্তু একজন লোকগায়ক কিংবা লোকগীতিকারকে প্রায় প্রতিদিনই সংগ্রামমুখর জীবনযাপন করতে হয়, প্রায়ই তাঁকে মৌলবাদী-চক্রের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে হয়। কারণ ওই ধর্মীয় উগ্রবাদী মহলটি গ্রামীণ লোকসমাজ-ব্যবস্থাকে পুরোপুরিরূপে বিধ্বস্ত করে দেওয়ার জন্য একটি সুনিপুণ নকশায় পথ এগুচ্ছে, আর বোঝে-না বোঝে সে নকশায় ঢুকে পড়ছেন গ্রামীণ সাধারণ মানুষও।
মুঠোফোন-দূরদর্শনের বদৌলতে বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন যেমন গ্রামীণ সমাজে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো ঢুকছে, ঠিক তেমনই কিছু-কিছু কট্টরপন্থি মানুষ সেটিকে ‘অপসংস্কৃতি’ আখ্যা দিয়ে তার বদলে ঘটা করে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন। এবং সেখান থেকে বিদেশি সংস্কৃতির পাশাপাশি এ-দেশীয় নিজস্ব সংস্কৃতিকেও ঢালাওভাবে ‘অপসংস্কৃতি’ হিসেবে ব্যাখা করে অনবরত বক্তব্য রাখা হচ্ছে। গ্রামীণ সাধারণ মানুষের অনেকেই ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকায় সেসব বক্তব্য প্রায় বিনাযুক্তিতেই গ্রহণ করছেন। এর ফলে এ-দেশীয় সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করতে অনেকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন, ফতোয়া দিচ্ছেন বাংলা নববর্ষ আয়োজন থেকে লোকমেলা, বাউলগান, যাত্রাগান আয়োজনের বিরুদ্ধেও।
কোথাও-কোথাও আয়োজন ঠেকাতে না-পেরে ধর্মান্ধ মহল ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর অভিযোগ সেঁটে দিয়ে থানাপুলিশে নালিশ জানাচ্ছেন, এ-নালিশ পেয়ে তদন্ত ছাড়াই অতি-উৎসাহী পুলিশ।স্থানীয় প্রশাসন তড়িঘড়ি বন্ধ করে দিচ্ছে লোক-আয়োজনগুলো। একদিকে মৌলবাদী শক্তির দাপট অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের বৈরী আচরণ-সবমিলিয়ে লোক-অনুষ্ঠানের আয়োজনগুলো বার বার বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বাধা পেয়ে-পেয়ে তাই গায়ক, গীতিকারেরা পেশা বদল করে অন্যদিকে ঝুঁকছেন। এভাবেই হারাচ্ছে গান, হারাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের সমৃদ্ধিশালী লোকসাহিত্যের ভান্ডার
প্রতি বছর জলবায়ু পরিবর্তন যেমন একজন কৃষকের জন্য উদ্বিগ্নের, তেমনই তথ্যপ্রযুক্তি-মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থানের কারণে প্রতিটি দিনই লোকশিল্পীদের জন্য উদ্বিগ্নের। এ সংকট দূর করা না-গেলে এখনও জিইয়ে থাকা লোকসাহিত্যের ধারাগুলো অচিরেই বিলুপ্তির পথে ঠেকবে!
তিন
বর্তমান গ্রামীণ সমাজে লোকসাহিত্যের বিকাশে যেমন নানামুখী সংকট তৈরি হয়েছে, তেমনই এ সংকট থেকে উত্তরণের একাধিক পথও রয়েছে। এখনও লোকসাহিত্যের নানা সম্ভাবনাময় ধারা সমাজে প্রচলিত রয়েছে। সেসব ধারাকে প্রয়োজনীয় সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এখনও সম্ভব। লোকসাহিত্য।সংস্কৃতির আগের ঐশ্বর্য হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না, তবে যেটুকু এখনও অবশিষ্ট রয়েছে-তার সংরক্ষণে ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কারণ এখনও গ্রামীণ বাংলায় লোকসাহিত্যের নানা উপকরণ-সম্ভাবনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
গ্রামীণ বাংলার খাওয়াদাওয়া, স্থাপত্য, ফ্যাশন, পুরাকীর্তি, লোকধর্ম, দর্শন, বাদ্যযন্ত্র, ভেষজ ও জাদুচর্চা, লোকনৃত্য, লোকসংগীত, কাঠের ভাস্কর্য, লোকনাট্য-সবকিছুই যুগের পর যুগ ধরে গৌরবান্বিত ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এটা ঠিক যে, নিত্যনতুন বিদেশি সংস্কৃতি ঢুকে সেসব ঐতিহ্যে বার বার আঘাত হানছে। গ্রামীণ মানুষ রং-চাকচিক্যে বুঁদ হয়ে অনেকসময় নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি অনীহা।অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। নতুন বিষয় গ্রহণ করার এ-প্রক্রিয়া যদিও স্বাভাবিক, তবু অতীত-ঐতিহ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে গ্রামীণ সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্রগুলো সংরক্ষণ করা দরকার। কারণ ধীরে ধীরে গ্রামীণ যশস্বী শিল্পী-সাধকেরা যেমন দেহত্যাগ করছেন, তেমনই ঐতিহ্যপ্রেমী শ্রোতাদের পরিমাণও কমছে। আর এ-কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির নানা দিক অনেকটা অগোছালোভাবেই বেড়ে উঠছে। নিজেদের ঐতিহ্যের কথা তাই বিবেচনায় নিয়ে শত সংকট-প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বে ও লোকসাহিত্যের সম্ভাবনাময় দিকগুলোকে বিকশিত করতে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
