প্রতাপবান্ধা
চোখে ভাসছে সেই মুহূর্তটুকু। ভাঙা নড়বড়ে একটি চৌকির উপর ছেঁড়া সাদা রঙের পাঞ্জাবি আর কুঁচকে-যাওয়া লুঙ্গি পরে বসে আছেন বয়স্ক এক লোক। আন্দাজ করা যায়, বয়স ৬০-৬২-এর কাছাকাছি। তাঁর চোখমুখ জানান দেয়-জীবনের প্রতি তিনি যেন মাত্রাতিরিক্ত ত্যক্ত-বিরক্ত। প্রাথমিক বিবেচনায়, অন্তত কপালের ভাঁজগুলো দেখে সেই ধারণা যে কেউ করেই নিতে পারেন। তবে ওই লোকটির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে সকল ভ্রান্তি দূর হয় নিমেষেই।
তাঁর চেহারাটা এখনও জ্বলজ্বল করে চোখে ভাসে, কথাগুলো কানে গেঁথে আছে। সহজসরল-সাধারণ মানুষটির বাচনভঙ্গি বেশ উদ্দীপনার সঞ্চার করে। তবে আলাপের একপর্যায়ে যখন তাঁর পরিচয় জানতে পারি, তখন চমকে উঠি। বহুদিনের প্রত্যাশিত মানুষটির সঙ্গে এমনভাবে পরিচয় হবে-স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। ঘটনার আকস্মিকতা যখন ভাঙল তখন নিঃশব্দে দুই হাত জোড় করে তাঁকে নমস্কার জানালাম।
বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের কাছে মানুষটি দেবতাতুল্য; এসব নারীরা পরম যত্নে ‘যক্ষের ধন’-এর মতো যাঁর গানের বাণী মনের মধ্যে গেঁথে দিনের পর দিন গেয়ে যাচ্ছেন-সেই প্রতাপরঞ্জন তালুকদার আমার সামনাসামনি। ধামাইলগানের কিংবদন্তিতুল্য এই মানুষটির কথা ছোটোবেলা থেকেই মা-জেঠি-কাকিদের মুখে শুনে আসছি। তাঁর লেখা গান ‘প্রতাপবান্ধা’ হিসেবে বহুল প্রচলিত। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় প্রত্যেকটি বিয়ের সময় ধামাইলগানের আসরে প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের গান গীত হওয়াটা যেন ইদানীং রীতিতে পরিণত হয়েছে।
হয়তো বছর আঠারো হবে, কিংবা এরও বেশ আগে, আমার নিজ গ্রামে কোনও এক বিয়ের আসরে শুনেছিলাম : ‘আমি বন্ধুর আশায় কাটাইলাম দিনরজনী গো।’ তখন বালক বয়সে অতশত বুঝিনি। ওই বয়সে প্রেম-বিরহ খুব একটা বুঝিটুঝিনি। তবু কেন জানি এই গানটি মনে গেঁথে গিয়েছিল, মা-বাবা সামান্য বকুনি দিলে আপন মনেই এই গানটি বেসুরো গলায় গাইতাম, মনে বেশ শান্তিও পেতাম। পরে বড়ো হয়ে যখন গান নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলাম তখন বহুকাল আগের শোনা সেই গানটি আবারও মনে পড়ল।
বাংলাদেশের ধামাইল গান গ্রন্থনা ও সম্পাদনার সূত্রে ২০০৬ সালের দিকে আমার দূরসম্পর্কীয় এক বউদিকে গানের কলিটি শোনাই, তিনি বলেছিলেন এটি তো ‘প্রতাপবান্ধা’, তবে সম্পূর্ণ গানটি বলতে পারেননি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সে গানটির আর খোঁজ পাইনি। প্রথম দিনের পরিচয়ে প্রতাপরঞ্জন তালুকদারকে ওই গল্পটি শুনিয়েছিলাম। তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘কত গান লিখেছি, কত গান হারিয়েছি, তার সংখ্যা নিছক কম নয়।’ পরে তিনি যা বলেছিলেন তা শুনে তো আমি রীতিমতো হতবাক! তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘আমার অনেক গান রাধারমণের নামে, আবার রাধারমণের অনেক গান আমার নাম-পদ ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চলে এখনও নারীরা গেয়ে থাকে।’
এটি তো আরও বিপজ্জনক। এমনটি কেন হচ্ছে? প্রতাপরঞ্জন বললেন, ‘অনেক সময় বিভিন্ন গ্রামে গেলে পরিচিত নারীরা গান লিখে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তাৎক্ষণিকভাবে অনেকের খাতায় গান লিখেও দিয়েছি। সেক্ষেত্রে আসরে ওই গান গাওয়ার সুবাদে মুখে মুখে এসব গান ছড়িয়ে পড়ছে। ছড়িয়ে যাওয়া এসব গান অনেক সময় এক মহাজনের নাম ভুল করে অন্য মহাজনের নামে শিল্পীরা গেয়ে ফেলে। যেহেতু রাধারমণ এবং আমার গান ধামাইল আসরে বেশি গাওয়া হয়, তাই আমাদের দুজনের গান নিয়ে ওই ভুলটুকু বেশি হয়।’
প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের কথার সূত্র ধরে জনৈক গবেষকের সম্পাদনায় প্রকাশিত রাধারমণের গানের একটি সংকলনের কথা আমার তাৎক্ষণিকভাবে মনে পড়ে যায়। তিনি রাধারমণের গানের সংকলনটিতে প্রতাপরঞ্জনের লেখা গোটা তিনেক গান রাধারমণের গান হিসেবে গ্রন্থিত করেছেন। অবশ্য ওই গবেষকেরই-বা কী দোষ! যেখানে গীতিকার প্রতাপরঞ্জন নিজেই স্বীকার করছেন, গ্রামের শিল্পীরা গান গাওয়ার সময় ভণিতা অদল-বদল করছেন। হয়তো সে কারণেই প্রকৃতপক্ষে কোনটা কার গান সেটা নির্ণয় করা একেবারেই কঠিন হয়ে পড়ছে সংকলকদের জন্য।
এটা যে শুধু ধামাইলগানের ক্ষেত্রে হচ্ছে, তা তো নয়। কোনও ধরনের লিখিত রূপ না-থাকার কারণে প্রাচীন লোকগানের ক্ষেত্রেও হরহামেশাই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তবে আগের চেয়ে এখন অবস্থা ঢের ভালো। এখন অন্তত অধিকাংশ গীতিকারদের গানের একটা লিখিত রূপ পাওয়া যাচ্ছে। সেটা হোক গীতিকারের নিজের লেখা অথবা তাঁর শিষ্য-ভাবশিষ্যদের বদৌলতে প্রাপ্ত। মোটকথা, একটা লিখিত রূপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় একজনের গান অন্যজনের নামে চালিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কম। এক্ষেত্রে প্রতাপরঞ্জনের গান বেহাত হয়ে যাওয়াটা একটু ভাবায় বৈ কি। যেহেতু প্রতাপরঞ্জনের গানের একটা লিখিত রূপের পাশাপাশি তাঁর বেশ কয়েকটি মুদ্রিত বইও রয়েছে, সেক্ষেত্রে রাধারমণের গানের সংকলনটি প্রস্তুত করার আগে সংগৃহীত গানগুলোর একটু যাচাই-বাছাই করলে অন্তত এ ভ্রমটুকু হতো না। আর প্রতাপরঞ্জনের গানও রাধারমণের নামে সংকলনভুক্ত হওয়া থেকে অনেকটা রেহাই পেত।
প্রতাপরঞ্জনের রচিত ধামাইলগানের জনপ্রিয়তা টের পাওয়া যায় তাঁর বইয়ের মুদ্রণসংখ্যা জানা থাকলে। নাগরিক মানুষের কাছে অখ্যাত এক গ্রাম্য লোককবির লেখা সপ্ত রং কারিকা অথবা ধামাইল সংগীত নামের একটি পুস্তিকা প্রায় দেড় লাখ কপি বিক্রি হয়েছে, সেটা ভাবা যায়! একজন গ্রাম্য লোককবির সর্বসাকুল্যে মাত্র ৮৫টি গানের এ সংকলনের জনপ্রিয়তা আমাদের অন্য এক বার্তা দেয়, আর সেটা হচ্ছে-আমাদের নাগরিক জীবনে যতই বিচ্ছিন্নতা থাকুক না কেন, গ্রামবাংলার মানুষের কাছে উৎসবের রং এখনও ফিকে হয়ে যায়নি।
বেশ কয়েক বছর আগে ভারতের শিলচরের সংস্কৃতিকর্মী সুব্রত পাল আমাকে জানিয়েছিলেন, শিলচরে বিয়ের আসরে যখন ধামাইলগানের আয়োজন হয়, তখন রাধারমণ এবং প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের গানই সবচেয়ে বেশি গীত হয়। তাঁর মতে, রাধারমণের হাত ধরে ধামাইলগানের উদ্ভব হয়েছে আর প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের হাত ধরে এই গান বিকশিত হয়েছে। আমার মনে হয় এ কথা মেনে নিতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। শুধু ধামাইলগান কেন, সূর্যব্রতসংগীতসহ বিভিন্ন নারীসংগীত রচনায়ও প্রতাপরঞ্জন ছিলেন সমান দক্ষ। তাঁর এসব গানও নারীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের মুদ্রিত গানে তাল ও সুরের উল্লেখ আছে। যেটা লালন, দুদ্দু শাহ, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম কিংবা অন্য কোনও গীতিকারের গানে উল্লেখ নেই। প্রতাপরঞ্জন তালুকদার তাঁর প্রায় প্রত্যেকটি গানের, বিশেষ করে ধামাইলগানের একটা নিজস্ব সুর তৈরি করেছেন। সুরগুলোর নাম ঠিক এ-রকম : হেমারত্ন, সেতান, বিভুরা, পূরবী, কপিলা, পর্ণবা, জয়ন্তী, গাওয়ালি, অগ্নিকণা, মাধুরী, ভারতী, করুণ, কাকলি, ভাওয়ালি, লাবণিকা, লহরি, মিতালি, মধ্যমা, ঝাকড়া, তারকা, কপিলা, সৌরভী, প্রভাতি, দিপালি, চৌতারা, তরঙ্গময়, পৌরভী, মেঘমালা ও কৃতারলী। এসব সুরের প্রণয়নের কারণ প্রসঙ্গে প্রতাপরঞ্জনকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম; তাঁর জবাব ছিল অনেকটা এ-রকম : ‘নিজের গানের সুর অক্ষুন্ন রাখতে নিজেই এ ধরনের নাম দিয়ে গানের সুরারোপ করেছি। হাওরাঞ্চলের মানুষেরা এসব সুর গ্রহণও করেছেন। এখন আপনি যদি কোনও শিল্পীকে বলেন, একটা পূরবী সুরের ধামাইলগান গাও, সে কিন্তু ঠিকই এই সুরে গানটি গাইতে পারবে। মুখে মুখে আমার প্রদত্ত এসব সুর এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।’
সেদিন প্রতাপরঞ্জনের কাছ থেকে বিদায় নিই। তাঁর কাছে নিজের নোটখাতাটা এগিয়ে দিয়ে নাম-ঠিকানা লিখে দেওয়ার অনুরোধ জানাই। তিনি এবড়ো-খেবড়ো অক্ষরে লিখলেন: নাম-প্রতাপরঞ্জন তালুকদার, গ্রাম-টাইলা, জেলা-সুনামগঞ্জ।’ ঠিকানা লিখে একটি মুঠোফোন নম্বর লিখে সেটার পাশে প্রথম বন্ধনীর ভেতরে লিখলেন : ‘ফোন কইরা আমার নাম কইলে সে ডাইকা দিবে।’ এরই ফাঁকে আমার সঙ্গে থাকা ক্যামেরা দিয়ে প্রতাপরঞ্জনের গোটা দশেক ছবি তুলে নিই। আমি নিজে থেকে তাঁর বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে বিদায় নিই।
আমি বসেছিলাম একটা জলচৌকিতে, দীর্ঘক্ষণ ওই স্থানে বসার কারণে পা ঝিনঝিন করায় বারকয়েক ডান-পাটা এদিক-ওদিক নাড়াই। একসময় দরজার দিকে পা বাড়াই। প্রতাপরঞ্জন আমাকে ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দাদা, আমার মতন গরিবের বাড়িতে যদি আসেন, তাইলে খুব খুশি অইমু।’
প্রতাপরঞ্জনের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ২০০৭ সালের দিকে। সেটা ছিল আমার নিজ উপজেলা শাল্লার ডুমরা গ্রামে। এ সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক কৃষ্ণকান্ত তালুকদার। পরে তাঁকে নিয়ে একাধিকবার প্রতাপরঞ্জনের বাড়িতে গিয়েছি। প্রথমবারের মতো যখন প্রতাপরঞ্জনের বাড়িতে যাই, সেদিন সম্ভবত আশুরার বন্ধ ছিল। ছুটি পেয়ে কৃষ্ণকান্ত তালুকদারকে ফোন দিলাম। তাঁকে বাড়ি থেকে আসতে বলে আমি সিলেট থেকে দিরাইগামী গাড়িতে চেপে বসি। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে যাই। আগে থেকেই আমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন কৃষ্ণকান্ত। এরপর দুইজনে মিলে একটি রিকশায় চেপে বসলাম। মিনিট বিশেক রিকশা কখনও পাকা আবার কখনও কাঁচা রাস্তা পাড়ি দিয়ে একটা নদীর কাছে আমাদের নামিয়ে দেয়। অতঃপর একটা খেয়া নৌকা করে সরাসরি পৌঁছে যাই টাইলাবাজার। এরপর মানুষকে জিজ্ঞেস করে করে উপস্থিত হই প্রতাপরঞ্জনের বাড়িতে। সেদিনকার দৃশ্যটা এখনও বেশ মনে পড়ে।
এ ঘটনার দীর্ঘদিন পর হঠাৎ একদিন প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের স্ত্রী সুচিত্রারানি রায় আমাকে ফোন করেন। তিনি ফোনে জানান, প্রতাপরঞ্জনের গলায় ক্যানসার ধরা পড়েছে। ইতোমধ্যে কিছু চিকিৎসাও হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন-তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। তাঁর স্ত্রীর কথা শুনে আঁতকে উঠি। সে কী কথা! এ কথা শোনার পর তাৎক্ষণিকভাবে পরদিনই প্রতাপরঞ্জনের বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। গিয়ে দেখলাম, প্রতাপরঞ্জনের গলার স্বর অনেকটাই চিকন ও অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। কথা বলতে তাঁর খুব কষ্ট হয়। শুনলাম-গলার প্রচন্ড যন্ত্রণার কারণে এক মাস ধরে কিছু খেতে পারছেন না। তিনি আমাকে দেখে কথা বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কথাগুলো কেমন যেন খসখসে শোনায়। আমি পাশে গিয়ে বসি। আমার হাত ধরে আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘আফনে আইছেন ভালা অইছে। মনটায় আফনেরে দেখবার লাগি খুউব টানতাছিল। আমার সব পান্ডুলিপি আর গান আফনারে দিতাম চাই। আমি চাই আমার সব গান দিয়া একটা বই আফনে বার কইরা দেন। আমি বইটা দেইখা যাইতাম পারমু বইলা মনে অয় না, তবে দেইখা যাইতে পারলে খুব খুশি হইমু।’
বিকেল শেষ হয়ে যখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করে, তখন প্রতাপরঞ্জনের বাড়ি থেকে ফিরতি পথে পা বাড়াই। আমার হাতে প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের সকল গ্রন্থিত ও অগ্রন্থিত গানের পান্ডুলিপি। সেই পান্ডুলিপির মধ্যে একটা অপূর্ণ মনসামঙ্গল-এর পান্ডুলিপিও রয়েছে। প্রতাপরঞ্জনের খুব ইচ্ছে ছিল সহজ-সাধারণ ভাষায় গ্রাম্য নারীদের পাঠের জন্য পদ্মপুরাণ অর্থাৎ মনসামঙ্গল রচনা করবেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে সামান্য একটু লিখেই তাঁকে থেমে যেতে হয়েছে। এ-লেখা শেষ করা আর সম্ভব নয় জেনেই সেই অসম্পূর্ণ মনসামঙ্গল-এর পান্ডুলিপির লিখিত পাতাগুলো আমাকে তুলে দেন।
আমি সিলেট ফেরার উদ্দেশ্যে দিরাই উপজেলা সদর থেকে রাত দশটার ঢাকাগামী গাড়িতে চেপে বসি। গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে ভাবছিলাম প্রতাপরঞ্জনের কথা। আর বারবার তাকাচ্ছিলাম আমার কোলে পলিথিন দিয়ে মোড়ানো প্রতাপরঞ্জনের পান্ডুলিপির দিকে। তাঁর ছোটোমেয়ে কমনরানি তালুকদার অতি তৎসহকারে কয়েকটি পাতলা আর ছেঁড়া পলিথিন দিয়ে পান্ডুলিপিগুলো বেঁধে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল।
সেদিনের পর বাসায় ফিরে অসংখ্যবার প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের পান্ডুলিপিগুলো নাড়াচাড়া করেছি। ধামাইলগান ছাড়াও তিনি কীর্তন, বৈঠকি, গোষ্ঠগান আর বিভিন্ন ধরনের নারীসংগীত রচনা করেছেন। লিখেছেন একাধিক জনসচেতনতামূলক গানও। তাঁর কীর্তন গানে বৈষ্ণব ভাবধারার ব্যপক প্রভাব রয়েছে। তবে তাঁর ধামাইলগানের মতো অন্য গানগুলোর ক্ষেত্রে খুব বেশি জনপ্রিয়তা ঘটেনি। প্রতাপরঞ্জনের ধামাইলগান হাওরাঞ্চলের গ্রামীণ নারীদের নাচের তালে অনন্য বিশিষ্টতায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সেই ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি, এখনও সমানতালে জনপ্রিয় ‘প্রতাপবান্ধা’।
লিপিরানি দাশ নামে আমার এক কাকাতো বোন রয়েছে। ধামাইলগানের জন্য নিজ গ্রাম ছাড়িয়ে আশপাশের উপজেলায়ও তাঁর কণ্ঠের সুনাম ছিল। একদিন কথাপ্রসঙ্গে সে আমাকে জানিয়েছিল-সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও ময়মনসিংহ জেলার হাওর অধ্যুষিত উপজেলাগুলোর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে বিয়ে হলেই নারীরা ধামাইলগান পরিবেশন করে থাকে। এটা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে-বিয়েবাড়িতে ধামাইল পরিবেশন যেন কোনও লৌকিক অনুষ্ঠান। এ সময় ধামাইল পরিবেশনার সময় প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের গান পরিবেশিত হয়-না এমন কোনও উদাহরণ পাওয়া যাবে না।
যে প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের গান ছাড়া ধামাইল পরিবেশনা অপূর্ণ থাকে কিংবা যাঁর গানের বই প্রায় দেড় লাখ কপি বিক্রি হয়ে যায়-এসব তথ্য জানার পর তাঁর সম্পর্কে একটু ঔৎসুক্য জাগাটাই স্বাভাবিক। এমনকী গীতিকারের রচিত গানের কয়েকটা পঙ্ক্তি শোনার ইচ্ছেও জাগতে পারে। তবে তাঁর গান মোটেই গভীর তত্তে¡ ঠাসা কোনও বাণী নয়। তাঁর সাদামাটা পঙ্ক্তিগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যাবে এ গান গ্রামের নিরক্ষর নারীদের কাছে কেন এত জনপ্রিয়।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় হাজারো দুঃখকষ্ট আর বঞ্চনায় জর্জরিত নারীদের কাছে বিয়ে-উৎসব ভরখরায় হঠাৎ বৃষ্টির মতন আবির্ভূত হয়। কারণ দিনের পর দিন সংসারের নানা রকম কাজে যখন বিনোদন বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, তখন কোনও বাড়িতে বিয়ে মানেই নৃত্যের তালে ধামাইলগান পরিবেশনা আর বিয়েকে ঘিরে কয়েকদিনের বিরতিহীন আড্ডা-উচ্ছ্বাস। এছাড়া ধামাইল পরিবেশনার সময় যেসব গান পরিবেশিত হয়, সেগুলো যদি নিজের জীবনের সঙ্গে কিছুটা হলেও মিলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই! অনেকটা আশ্রয়।অবলম্বনহীন পোড়খাওয়া নারীর জলে ভাসমান কচুরিপানাকে আকড়ে ধরার চেষ্টার মতন। সেই কচুরিপানা হয়তো সামান্য বাতাসেই দুলে ওঠে, তবু তো একরকম অবলম্বন। সে রকমই বিয়ের সময় সারারাত একনাগাড়ে ধামাইলগান পরিবেশন করে সাময়িকভাবে পরমানন্দে মেতে ওঠে গ্রামীণ নারীরা।
প্রতাপরঞ্জন তালুকদার গ্রামীণ নারীদের ঠিক সেই বিষয়গুলোতেই কড়া নেড়েছেন। একজন নারীর অসহায়ত্ব আর বঞ্চনার কথাগুলোকে তাঁর গানে অত্যন্ত সহজসরল ভাষায় তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ নারীরা বিয়ে উপলক্ষকে কেন্দ্র করে যেসব গান পরিবেশন করেন, সেসব গানের পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে রয়েছে তাঁদেরই মতো রাধারূপী এক অবলা নারীর সুখদুঃখ-হাসি-আনন্দ-বিরহ-বেদনা। যেটা তাঁদেরও নিজেদের জীবনের সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। হয়তো সে কারণেই প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের গান গ্রামের নারীদের কাছে এত জনপ্রিয়।
প্রতাপরঞ্জনের একটা গানের কথা এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে। এটি ১৯৯৯ সালের দিকে আমার বড়ো বোনের বিয়েতে শুনেছিলাম। কয়েকদিন আগে ওই বিয়ের ভিডিও ফুটেজগুলো দেখতে গিয়ে প্রযুক্তির কল্যাণে এত বছর আগের সেই দৃশ্য আবারও যেন পুরোপুরি আমার স্মৃতিতে ফিরে আসে। আমি একটি লুঙ্গি পরে বেঞ্চিতে বসে আরও জনা পঞ্চাশেক মানুষের সঙ্গে ধামাইল পরিবেশনা দেখছি। বাড়ির খোলা উঠোনে ত্রিপল টানিয়ে একটা খুঁটিমতন বাঁশের মধ্যভাগে হ্যাজাক লাইট টাঙানো হয়েছে। সেই আলোয় প্রায় পঁচিশেক নারী বরকে মাঝখানে রেখে তাঁকে ঘিরে গোল হয়ে একজন ঢোলবাদকের বাদ্যের তালে তালে হাতে তালি দিয়ে বিশেষ ভঙিমায় নৃত্যসমেত গান পরিবেশন করছে।
সেদিন ওই ধামাইল পরিবেশনকারীরা রাত দশটায় পরিবেশনা শুরু করেছিল, আর তা শেষ হয়েছিল ভোররাতে। আসর, বন্দনা, সভাস্তুতি, জলধামালি, শিক্ষামূলক ধামাইল, গৌররূপ, শ্যামরূপ, বিচ্ছেদ, কোকিলসংবাদ, ভ্রমরসংবাদ, স্বপন, চন্দ্রার কুঞ্জ হইতে বিদায়, সাক্ষাৎ খেদ, মিলনসহ ধামাইলগানের পর্যায়ভুক্ত সবকটি শ্রেণির পরিবেশনা ওইদিন ছিল। ভিডিও ফুটেজ হাতে পাওয়ার পর একটা আগ্রহ জন্মালো-প্রতাপরঞ্জন তালুকদারের কতগুলো ধামাইলগান পরিবেশিত হয়েছে তা জানার জন্য! সেদিনের পরিবেশিত প্রায় একশটি গানের যাচাই-বাছাই শেষে গুনে গুনে দেখলাম ওইদিন প্রতাপরঞ্জনের ৫১টি গান গাওয়া হয়েছিল। আর বাকিগুলো ছিল রাধারমণ, মধুসূদন দাস, শাহ আবদুল করিম, রোহী ঠাকুরসহ অন্য গীতিকারদের।
ভিডিও ফুটেজের মাস্টার প্রিন্ট কপি চালানো অবস্থাতেই রইল। কানে বাজছে প্রতাপরঞ্জন তালুকদারেরই সভাস্তুতি পর্যায়ভুক্ত সেই জনপ্রিয় গানটি, একটু আগেই যে গানটির কথা বলছিলাম। গানের পঙ্ক্তিগুলো ঠিক এ-রকম :
ধন্য এ জীবন সভায় দেইখে শ্রোতাগণ,
শুনেন ভদ্র শ্রোতাগণ করি নিবেদন
করি নিবেদন গো, আমি করি নিবেদন।
শুনেন ভদ্র শ্রোতাগণ করি নিবেদন,
করি নমস্কার আমি চরণে সবার
ধামালির অনুষ্ঠান করি উদ্বোধন।
করি উদ্বোধন গো আমি করি উদ্বোধন,
ধামালির অনুষ্ঠান করি উদ্বোধন।
মূঢ়-তাহে মন আমার ওহে শ্রোতাগণ,
লত্রুটি হইতে পারে করবেন মার্জন।
করিবেন মার্জন গো আমায় করিবেন মার্জন,
লত্রুটি হইতে পারে করিবেন মার্জন।
শুনেন দিয়া মন, শুনেন ওহে শ্রোতাগণ,
দয়া করে ছেড়ে দিয়েন অন্য আলাপন।
অন্য আলাপন গো, অন্য আলাপন,
সভাকারে বলে দাও, দাও পদধূলি গো সভায়
আশিসও পেয়ে প্রীত হবে মন।
প্রীত হবে মন গো, প্রীত হবে মন,
সভায় আশিসও পেয়ে প্রীত হবে মন।
প্রতাপরঞ্জন কয় সভায় করিয়া বিনয়,
লত্রুটি অধমের করিবেন মার্জন।
করিবেন মার্জন গো করিবেন মার্জন,
লত্রুটি অধমের করিবেন মার্জন।
প্রতাপরঞ্জন তালুকদার (১৯৪৫-২০০৯) মারা গেছেন, চলে গেছেন সব খ্যাতি-প্রতিপত্তি আর লত্রুটির ঊর্ধ্বে। তিনি আর কখনও গান বাঁধবেন না। কিন্তু সেই পাতলা ও ছেঁড়া পলিথিনগুলো, যেগুলো দিয়ে তাঁর পান্ডুলিপিগুলো বাঁধা হয়েছিল, সেগুলো এখনও আমার ঘরে রয়ে গেছে। প্রতাপরঞ্জনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আজও পূরণ করা হয়নি। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর সব গান দিয়ে এখনও কোনও সংকলন প্রকাশ করতে পারিনি। তবে অদূর ভবিষ্যতে তাঁর রচনাসমূহ প্রকাশিত হবার ব্যাপারে আমি আশাবাদী। আজ এ কথা বলব, প্রতাপরঞ্জন আমার স্মৃতির অনেকটাই জুড়ে রয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর যখন প্রতাপরঞ্জনকে নিয়ে লিখছি তখন মনে পড়ছে তাঁর সহাস্য মুখ; শত অভাব-অনটনে থেকে যে-মুখ একটুও ভ্রুকুঞ্চিত হয়নি।
