সূর্যব্রত-সংগীত
সূর্যপূজার রেওয়াজ মানবসভ্যতা শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রচলিত রয়েছে। আদিম মানুষেরা এই সূর্যকে শক্তি হিসেবে কল্পনা করে তার পূজা-অর্চনা করত। তবে আলোচ্য রচনার বিষয়বস্তু কিন্তু সেই সূর্যপূজাকে ঘিরে নয়। এখানে মূল আলোচনার বিষয় হলো-সূর্যব্রত সংগীত, গোপিনী কীর্তন কিংবা কৃষ্ণলীলা-গীতি প্রসঙ্গে। বাঙালি হিন্দু নারীরাই মূলত এ ধরনের সংগীত প্রচার ও বিস্তারকারী। ঠিক কবে থেকে এ গীতির প্রচলন সেটি গবেষকেরা বিস্তর অনুসন্ধান করেও বের করতে পারেননি। প্রসঙ্গক্রমে শ্রী সরোজ প্রভাদেবীর মন্তব্য এখানে স্মর্তব্য। তিনি তাঁর সংকলিত শ্রীশ্রী সূর্য্যব্রত সঙ্গীত বা গোপিনী কীর্ত্তন (১৩৯০ বাংলা) বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘বহু শতাব্দী হইতে প্রতি বৎসর মাঘ মাসে রমণীগণ সূর্য্যব্রত করিয়া রাধাকৃষ্ণের লীলাকীর্ত্তন করিয়া থাকেন।’
‘বহু শতাব্দী’ হতে প্রচলিত সূর্যব্রত হাওরাঞ্চলের নারীদের এক প্রধান ধর্মীয় রেওয়াজেই পরিণত হয়ে গিয়েছে। তবে ধর্মীয় এ রীতি-রেওয়াজের পাশাপাশি পূজাকে কেন্দ্র করে নারীরা দিনভর যে গানের আসর বসান, সেটি বাংলা লোকসংস্কৃতির এক উর্বর ও অমূল্য অধ্যায় হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে সূর্যব্রতের প্রচলন থাকলেও বিশেষত বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল অর্থাৎ সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা এ পূজার সঙ্গে অত্যাবশকভাবে কৃষ্ণের মহিমা-সম্বলিত গান পরিবেশন করে থাকে। এসব গান সূর্যব্রত-সংগীত হিসেবেই বেশি পরিচিত, এর বাইরে কেউ কেউ এ ধারার গানকে গোপিনী কীর্তন এবং কৃষ্ণলীলা-গীতি হিসেবেও অভিহিত করে থাকে।
সূর্যব্রতের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও অর্ঘ্য নিবেদন। তাই এ পূজায় গীত গানের মূল বিষয়বস্তুই হচ্ছে কৃষ্ণের মহিমা এবং প্রশংসাসূচক র্মকান্ড বর্ণনা করা। কৃষ্ণের জন্ম থেকে শুরু করে যুগলমিলন-সব কাহিনিই সূর্যব্রত-সংগীতে স্থান পেয়েছে। এছাড়া কৃষ্ণ কর্তৃক রাক্ষসী পুতনা, তৃণাবর্ত, বকাসুর, অঘাসুর বধ এবং কালীনাগ দমনের কাহিনিও এসব গানের বিস্তৃত অংশ জুড়ে রয়েছে।
দুই
বাংলা বছরের মাঘ মাসে প্রতি রোববার সূর্যব্রত পালন করে থাকেন নারীরা। এদিন খুব ভোরে সূর্যোদয়ের আগে প্রদীপ প্রজ্বলন করে সেসব হাতে নিয়ে নারীরা দল বেঁধে পাশ্ববর্তী পুকুর, নদী বা খালে স্নান করতে যান। এবং স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে বাড়ির উঠোনে পূজা উপলক্ষে স্থাপিত অস্থায়ী কৃষ্ণ-মন্দিরে।কৃষ্ণ-মন্ডপে এসে সেই প্রদীপ এনে রাখেন। প্রদীপটি যেন কোনও অবস্থাতেই নিভে না-যায় সেদিকে নজরদারি রাখতে হয়, সম্ভবত সে-কারণেই অস্থায়ী মন্দিরটি টিন কিংবা খড়ের বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। প্রদীপটি মন্দিরে রেখে নারীরা মন্দিরের সামনের উঠোনে গোল হয়ে নেচে নেচে করতাল বাজিয়ে সূর্যব্রত-সংগীত পরিবেশন করেন।
পূজার রীতি অনুযায়ী যেহেতু সূর্যাস্তের আগে মাটি, খাট কিংবা অন্য কোথাও বসা যাবে না, তাই সারাদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই অনেকটা ধামাইলগান পরিবেশনার মতোই করতাল ও করতালি-সহযোগে সূর্যব্রত-সংগীত পরিবেশন করেন নারীরা। পরিবেশিত এসব গান আবার বিভিন্ন পর্বে বিভক্ত। এ পর্বগুলোর মধ্যে গুরুবন্দনা, সৃষ্টি পতন, দশবতার বন্দনা, দৈবকীর বিবাহ, দৈবকীর স্তব, শ্রীকৃষ্ণের জন্ম, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বসুদেবের যমুনা নদী পার, শ্রীকৃষ্ণের মুখ দেখে নন্দরানির আনন্দ, সূর্যপূজার অধিবাস, মঙ্গল আরতি, শ্রীকৃষ্ণ জাগানি, রাধা জাগানি, নন্দোৎসব, শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম, কংসরাজার স্বপ্ন দর্শন, পুতনা বধ, তৃণাবর্ত বধ, শ্রীকৃষ্ণের নাচন, মৃত্তিকা ভক্ষণ ছলে মুখে ত্রিভুবন দর্শন, শ্রীকৃষ্ণের খেলাতে নন্দরানির আনন্দ, ব্রজগোপীর ঘরে ননী চুরি, শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক বুড়ির অপমান, ধেনু দোহন, ননী মথন, নন্দরানি কর্তৃক শ্রীকৃষ্ণকে বন্ধন, গোপালের ননী চুরি, কর্ণ মুনির পারণ, রন্ধন করার জন্য শ্রীমতীকে আনয়ন, শ্রীমতীর রন্ধন, জটিলার দুঃখকথন, গোষ্ঠ, কংসের তাল ও খেজুরবন ধ্বংস, বকাসুর বধ, শ্রীকৃষ্ণের বনবিহার, যুগল মিলন, সূর্যপূজা, শ্রীমতীর কুঞ্জে গমন, সুবল মিলন, নৌকা বিলাস, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে শ্রীমতীর বনে বনে ভ্রমণ, শ্রীমতীর নারায়ণ স্তব, ফিরা গোষ্ঠ, নাম কীর্তন, সমাপন ও হরির লোট উল্লেখযোগ্য। এসব পর্বে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম, বাল্য, শৈশব, যৌবনকালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখের পাশাপাশি শ্রীমতির সঙ্গে তাঁর প্রেম, বিচ্ছেদ এবং মিলনের বিষয়গুলোই পরিস্ফুট হয়েছে।
কণ্ঠের সাময়িক বিশ্রামের জন্য মাঝে-মাঝে কিছু বিরতি ছাড়া গান পরিবেশনা চলে প্রায় একটানা। এ পর্ব শেষ হয় সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ আগে। সে-সময় নারীরা মন্দিরে রাখা সেই প্রদীপ হাতে নিয়ে সূর্যকে ভক্তি করে ওই দিনের মতো পূজাকার্য সমাপ্তি করে প্রসাদ বিতরণ করে ঘরে ফেরেন। এখানে উল্লেখ্য যে, যেসব নারী এ পূজায় অংশ নেন, তাঁরা সূর্যাস্তের আগে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না এবং দিনভর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ও গান পরিবেশন করেই কাটাতে হবে বলে বিধান রয়েছে। এছাড়া পূজায় অংশগ্রহণকারী নারীরা এদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্জলা উপবাস থাকেন।
তনি
সূর্যব্রতগানের গীতিকারদের মধ্যে সুনামগঞ্জের কাঠইড় গ্রামের মধুসূদন দাস, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার টাইলা গ্রামের প্রতাপরঞ্জন তালুকদার, জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামের রাধারমণ দত্তপুরকায়স্থ, মেঘারকান্দি গ্রামের কাশীনাথ দাশতালুকদার, সিলেটের টিলাগড় গোপালটিলা এলাকার সন্ধ্যা রানী চন্দের পাশাপাশি সরোজ প্রভাদেবী, ধর্মদাস, ব্রজনাথ, বসুদেব ঘোষ, কৃষ্ণদাস, নরহরি, স্বরূপ দাস, রাধানাথ, শংকর দাস, দীনহীন, ব্রজমোহন, বৈষ্ণব দাস, কৃষ্ণচরণ দাস, অমূল্য, চৈতন্য চরণ, দুর্গাপ্রসাদ, ঘনশ্যাম দাস, কুসুম কুমারী, দীনবন্ধু দাস, কালীকিংকর, বলরাম দাস, জয়চন্দ্র প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। গানের ভণিতা থেকে এসব গীতিকারদের নাম জানা গেলেও অনেকেরই ব্যক্তিগত পরিচিতি ও ঠিঁকুজি বের করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান নিবন্ধকার ২০০৬ থেকে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুনামগঞ্জের শাল্লা, দিরাই, জামালগঞ্জ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ এবং নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলার অন্তত ২৭টি গ্রাম ঘুরে গ্রামীণ নারীদের সংগ্রহে থাকা গানের পান্ডুলিপি ও মুদ্রিত পুস্তিকা হতে প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাধিক সূর্যব্রত-সংগীত সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন পর্বের ১৪টি সূর্যব্রতের গান রসজ্ঞ পাঠকের সামনে উপস্থিত হলো।
১ [বন্দনা]
শ্রীগুরু গৌরাঙ্গ প্রভু শচীর নন্দন
নদীয়াতে অবতীর্ণ পতিত পাবন।
জয় জয় গৌরাঙ্গ জয় নিত্যানন্দ
জয় অদ্বৈত চন্দ্র জয় গৌরভক্তবৃন্দ।
প্রথমে বন্দনা করি অনাদির চরণ
দ্বিতীয় বন্দিনু ব্রহ্মা পরম কারণ।
তৃতীয়ে বন্দিনু বিষ্ণু জগতের পতি
তাহার দুই ভার্ষ্যা বন্দি লক্ষ্মী সরস্বতী।
সরস্বতী মা বন্দি বিষ্ণুর বণিতা
কণ্ঠে বসি জোগায় গীত, সুরস কবিতা।
এসো মাগো সরস্বতী কণ্ঠে করো ভর
গায়কের দেও মাগো কোকিলের স্বর।
চতুর্থ বন্দিনু শিব গণেশ সহিতে
অর্ধ অঙ্গে দুর্গা শোভে গঙা শোভে মাথে।
পুষ্প মধ্যে বন্দিলাম আদ্যের তুলসী
ব্রত মধ্যে বন্দি মুই ভৈমী একাদশী।
পিতামাতা আদি গুরু বন্দি দুইজন
শিক্ষাগুরু বন্দি যেই শিখাইল গায়ন।
২ [শ্রীকৃষ্ণের জন্ম]
হরি দামোদর, জন্ম লইয়া দৈবকীর উদর
জন্ম লইলা মায়ের নীলমণি, হরি দামোদর।
ষোলো দন্ড নিশা ঘোর, শিলাবৃষ্টি মথুরাপুর
ঘোর নিদ্রায় পাইক প্রহরী
ভাদ্রের কৃষ্ণাষ্টমী, নক্ষত্র যে রোহণী
হেনকালে জন্মিলা শ্রীহরি।
চক্রধারী রূপ দেখি, বিলাপ করে দৈবকী
কেন হরি আইলায় আমার ঘরে
আর সাত পুত্র ছিল, কংস নিয়া বধিল
কোথায় রাখি লুকাইয়া তোমারে।
রক্তবিন্দু কাঁচা গা, কেন কান্দ দৈবকী মা
পাঠাও আমায় নন্দ ঘোষের ঘরে
আমারে বদল দিয়া, মহামায়া আনো গিয়া
মহামায়া দেখাও কংসেরে।
শুনিয়া শিশুর বাণী, বসুদেবকে ডাকি আনি
দিলা হরি কোলেতে তুলিয়া
দীনহীন সরোজে কয়, পথে নাহি কোনো ভয়
শীঘ্র যাও হরিধনকে লইয়া।
৩ [সূর্যপূজার অধিবাস]
জয় জয় শ্রীগোবিন্দ ব্রজের নন্দন
জয় জয় ব্রজ গোপীর মানস পূরণ।
মনেতে স্মরিয়া রাই মদনমোহন
সূর্যপূজার অধিবাস করলা আরম্ভন।
প্রণমিয়া দিলা রাই বসিতে আসন
কাল প্রভাতে পাই যেন সবার শ্রীচরণ।
দেব ঋষি মুনি আদি যত সব জন
কাইল আসিবায় আমি করলাম নিমন্ত্রণ।
সবাকে বাত্তিলাম আমি করলাম নিমন্ত্রণ
কৈলাস বলে আজি হলো অধিবাস কীর্তন।
৪ [কংস কর্তৃক মহামায়া বধ]
রজনি পোহাইয়া যায় কোকিলায় পঞ্চম গায়
নানা পাখি করে কণ্ঠধ্বনি।
প্রভাত হইল নিশি জাগিল মধুরাবাসী
কংসচর আইলা শব্দ শুনি।
হুয়া হুয়া রব করে শিশু কান্দে উচ্চস্বরে
দুত আসি দুয়ারে দাঁড়াইল।
শিশু দেখি দ্রুত বেগে কহিল কংসের আগে
দৈবকী যে প্রসব করিলা।
বার্তা শুনি আচম্বিত কংসরাজ চমকিত
ঊর্ধ্বশাসে উপস্থিত হইলা।
হস্ত বাড়াইল বলে শিশু দেও মোর কোলে
ভয়ে দেবী কাঁপিতে লাগিলা।
টান মারি হাতে নিলো ঘরে বাহিরে আইল
আছাড়িল পাষাণ উপরে।
ছদ্মবেশী মায়া ছিল আকাশে উড়িয়া গেল
ডাক দিয়া কহিলা কংসরে।
শোনো কংস দুরাচার বলি সব সমাচার
অকারণে নারী বধ কইলে।
তোরে যে বধিতে পারে সে আছে নন্দের ঘরে
নিশ্চয় মরিবে মধু বলে।
৫ [নন্দালয়ে আনন্দ উৎসব]
দেখিয়া পুত্রের মুখ রানি যশোমতি
নন্দরাজে ডাকি বলে আসো শীঘ্রগতি।
বিষ্ণু কৃপায় পাইলাম কৃষ্ণ মহামতি
সদ্য প্রসূত শিশুর অপরূপ জ্যোতি।
নারীগণ করে কত মঙ্গল আরতি
প্রথমে দেয় উলুধ্বনি মিলে যত সতী।
শুনিয়া সকল নারী ধেয়ে আসে অতি
ঘুঘুরাদি বাজু দেয় রত্ন হার মতি।
কেহ দেয় পট্ট বস্ত্র সুবর্ণের পাতি
কুমকুম, হরিদ্রা, তৈল দেয় করে প্রীতি।
ব্রাহ্মণে ভোজন করান গোকুলের পতি
দরিদ্র ব্রাহ্মণে দিলা ধন রত্ন অতি।
দেবলোকের নারী যত গৌরি সরস্বতী
ব্রাহ্মণীর বেশে তারা আসি করে স্তুতি।
ব্রহ্মা, ভব দেবগণ আসি সুরপতি
পুষ্প বৃষ্টি করে তারা বাদ্য নৃত্য গীতি।
এইরূপে নন্দালয়ে আনন্দের ভাতি
কাশীনাথ চাহে পদে থাকে যেন মতি।
৬ [পুতনা বধ]
পুতনা চলে রে বিষের স্তন লইয়া
ষাইট তোলা বিষ নিলো স্তনেতে ভরিয়া।
বসন ভূষণ অঙ্গে পরিয়া অপার
সাজিল মোহিনী যেন বিদ্যুৎ সঞ্চার।
রাজপথে পুতনা চলিল ধীরে ধীরে
সত্বর মিলিল গিয়া নন্দরানির ঘরে।
ভইন ভইন করি পুতনা ডাকে ঘন ঘন
পুত্র কোলে নন্দরানি আসিলা তখন।
সহোদর ভইন যেমন ডাকে পুন পুন
মায়া করি ভুলাইল সবাকার মন।
একবার কোলে দেও বাছা জুড়াই গো জীবন
কত পুণ্যে পাইছ ভইন গো হেন পুত্রধন।
কোলেতে আনিয়া মুখে তুলিয়া দিলা স্তন
কৃষ্ণ বলে সাক্ষী থাকিও যত দেবগণ।
স্তনে মুখ দিয়া হরি দিলা এক টান
বজ্রটানে রাক্ষসীর বাহির হইল প্রাণ।
যশোদা দেখিয়া হইলা আনন্দিত মন
মুখে স্তন দিয়া বলে সাফল্য জীবন।
দীনহীন বলে গোবিন্দ মঙ্গল
অবিশাসী জনে হরি দিও প্রতিফল।
৭ [গোষ্ঠ]
রানি দেও গো তোমার গোপাল মাঠে লইয়া যাই
তোমার গোপাল মাঠে গেলে বড়ো সুখ পাই।
সকল রাখালের রাজা তোমার কানাই
বনফুলে সব মিলি তাহারে সাজাই।
বেনু রবে ধেনু ফিরে বইসে রঙ্গ চাই
এর লাগি তার সঙ্গে গোচারণে যাই।
রাখালের জীবন মাগো তোমার কানাই
মরিলে বাঁচিতে পারে কানু গুণের ভাই।
কানাই লইয়া সবে অরণ্যে বেড়াই
বনে বনে গিয়া কত বনফুল খাই।
যশোদার নিকটে গিয়া কহিছে বলাই
শীঘ্র করি সাজাও মাগো প্রাণের কানাই।
যতেক রাখাল গেলা যশোদার ঠাঁই
মধু বলে যশোদা গো কানু ভিক্ষা চাই।
৮ [সুবল মিলন]
ওহে সুবল সখা ধন
রাধাকে দেখাও আনি রাখো হে জীবন।
একদিন কৃষ্ণচন্দ্র খেলি ঘোর বন
রাধাকুন্ডতীরে আসি বসিল তখন।
চম্পকের মালা গাঁথি করিয়া যতন
সুবল পরাইয়া দিলো হয়ে হর্ষ মন।
মালা গলে দিয়া কৃষ্ণ বলেন তখন
রাধারানির কথা মনে হইল স্মরণ।
বিরহ অনলে অনু দহে অনুক্ষণ
রাধা আনি প্রাণ রাখো ওহে সুবল ধন।
শীঘ্র করি যাও সখা রাধার সদন
তাহাকে বলিবে আমার প্রাণের বেদন।
সুবল চলিলা তখন হাঁটে ঘন ঘন
জাবট নগরে পৌঁছে রাধার ভবন।
কাশীনাথ বলে শোনো জগৎ জীবন
তোমার অপূর্ব লীলা কে করে বর্ণন।
৯ [সূর্যপূজা]
সূর্যপূজা করে সাধে রস বৃন্দাবনে
মাধুর্য সাধিতে পরে মর্ম সখীগণে।
অর্ঘ্য পূজার ছল করি, মাধুর্য সাধে কিশোরী
কর্মচারী শ্রীমধুসূদন।
মৃগ মদ কস্তুরী, গন্ধপুষ্প চৈর্য্য করি
আহলাদেতে নৈবেদ্য সাজন।
আনন্দ ঘটের বারি, মদন আ্রদল পুরি
পাদ্য অর্ঘ্য এ রূপ যৌবন।
মহাভাবে করি তন্ত্র, জপিয়া অজপা মন্ত্র
পক্ষে পক্ষে করিয়া মিলন।
রক্তজবা বিল্ব দলে অঞ্জলি দেয় সকলে
এই ভাবে পূজা সমাপণ।
যোগমায়ার আচ্ছাদনে, অন্য কেহ নাহি জানে
জানে মাত্র সব সখীগণ।
নমঃ নমঃ দিবাকর বাক্য কহে দ্বিজবর
বেদমন্ত্র করি উচ্চারণ।
করজোড়ে পুষ্পাঞ্জলি, দেয় সখীগণ মিলি
বাক্য মন্ত্র করি সমাপণ।
তারপর চন্দন মালা, পুরোহিতের গলে দিলা
পঞ্চামৃত করাইলা ভোজন।
অবশেষে যাহা ছিল, গোপীরা বাটিয়া খাইল
দক্ষিণা দেয় প্রেম আলিঙ্গনে।
বলে দীন কৃষ্ণদাস, পুরাইও মনে আশ
স্থান দিও ওই রাঙা চরণে।
১০ [নৌকাবিলাস]
হইল বেলা অবসান
দধি বেচিয়া হইল বেলা অবসান।
কুটিলা আসিল ধাইয়া বলে ওগো চান
মধুরায় গিয়া তুই বিসর্জিলে মান।
নারীগণ তব কথা করিল প্রয়াণ
কালার নিকটে গেছ ওহে বেইমান।
কালার লাগি আনিয়াছ গুয়া আর পান
মা তোরে নিষেধ করলা না দিলায় কান।
লজ্জা শরম নাই তোর এই কি বিধান
দাদা আসলে বলে দিব নিবে তোর জান।
শুনিয়া কুটিলার কথা থাক সাবধান
জটিলা বলিলা মাগো কইলে যাবে মান।
রাধারানি মনে মনে কৃষ্ণ করে ধ্যান
কাশীনাথ বলে কৃষ্ণ রাখিবে পরান।
১১ [যুগল মিলন]
আমার রাই মিলিল গো শ্যামের সনে
এগো আলো করল নিধুবন রুশের কিরণে।
চন্দ্র বৃষ্টি যেমন হের নক্ষত্রগণে
এগো তেমনই মতো রাইখে ঘিরে সব সখীগণে।
গাঁথিয়া মালতীর মালা অতি যতনে
আনন্দ মনে এগো পরাইয়া শ্যামের গলে মিশাইয়া চন্দনে।
শ্যামের বামে রাই কিশোরী এক আসনে মিলে দুজনে
এগো দীনহীনের বাঞ্ছা যুগল চরণে সেবনে।
১২ [কীর্তন]
তোমার শ্রীচরণে নিবেদন, কৃপা করো প্রভু নারায়ণ
তুমি নিজ গুণে কৃপা করে দাও হে প্রভু দরশন।
আমি হীনজন অতি, তোমার পদে নাই মতি
এ কারণে ঘটল ভবে এত দুর্গতি।
আমি জন্মাবধি অপরাধী, না জানি সাধন-ভজন
প্রভু তুমি কৃপাময়, প্রভু তুমি সর্বময়
সৃষ্টি স্থিতি লয় প্রলয় তবে হতে হয়।
তোমার আজ্ঞা বিনে এ জগতে বৃক্ষপত্র না হয় ক্ষয়
তুমি আদি নিরঞ্জন, তোমায় চেনে বা কয়জন।
সর্বদায় খুঁজিয়া মরি বিষয় আশায় ধন
অজ্ঞান সন্ধ্যায় বলে মরণকালে পাই যে প্রভুর শ্রীচরণ।
১৩ [লুট]
ডাকইন নন্দরানি মায় কে নিবে কে নিবে লুট
আয় রে তোরা আয়
ওহে রাখাল রাজা সুবল সখা শ্রীদাম নটরায়।
ব্রজবাসী ছিলেন যত সবই হলেন সমবেত
বালক বৃদ্ধ আঁতুর অন্ধ কৃষ্ণ গুণ গায়।
চিনির বরফি জোড়া পেড়া নকুলদানা রসগোল্লা
দুই হাত ভরিয়া লুট আনন্দে বিলায়।
আম কাঁঠাল নারিকেল কলা কমলা বেল
নন্দরানি হাসি হাসি, আনন্দে বিলায়।
সন্ধ্যায় বলে ভুলের তরে জন্ম গেল অবহেলে
পাইলাম না গো নামের লুট কর্মফলের দায়।
১৪ [আসর ভঙ্গ]
আসর ভাঙি যায় রে, বাজার ভাঙি যায়
নবরঙ্গ বাঁশিটি বাজায় শ্যামরায়।
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশর হইলা বিদায়
ধন দিলা গৃহস্থের কল্যাণে সদায়।
ইন্দ্র চন্দ্র দিবাকর হইলা বিদায়
আরোগ্য থাকিতে বর সবে দিয়া যায়।
ব্রতী ঘরে যায় রে নৈবিদ্য ঘরে যায়
তালযন্ত্র লইয়া গায়ক ঘরে যায়।
মধু বলে আজি কীর্তন হইল সামাধায়
হরি বলে প্রেমানন্দে নাচে গোপীকায়।
